চোদ্দোটি কবিতা। প্রতিটি কবিতায় চোদ্দোটি লাইন। এই চতুর্দশপদী কবিতাগুচ্ছের একসঙ্গে নাম ‘সোনালি কাবিন’। সাবেক কুমিল্লা জেলার ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের মৌড়াইল গ্রামের মুল্লাড়ির ভূমিপুত্র আল মাহমুদ শুধুমাত্র এই চোদ্দোটি কবিতা লিখেই স্থায়ী হতে পারতেন বাংলা সাহিত্যে। ‘বাঙালি কৌমের কেলি কল্লোলিত করো কলাবতী। জানত না যা বাৎস্যায়ন, আর যত আর্যের যুবতী’—এই প্যাশন-প্লাবিত কামনার প্রকাশে আল মাহমুদের নির্ভুল নিজস্ব স্বাক্ষর। এই কবিই কুণ্ঠাহীন লিখতে পারেন হৃদয়ের অলৌকিক অক্ষরে, ‘দেহ দিলে দেহ পাবে, দেহের অধিক মূলধন আমার তো নেই সখী, যেই পণ্যে অলংকার কিনি।’ প্রতিশ্রুতি দিতে পারেন ভালোবাসার যুবতিকে, “বিবসন হও যদি দেখতে পাবে আমাকে সরল পৌরুষ আবৃত করে জলপাই’র পাতাও থাকবে না।’ নগ্ন নারীকে কবি আর কী দিতে পারেন? দিতে পারেন স্তনের উপর নখলিখনের পদাবলি, ‘বুকের ওপর মৃদু কম্পমান নখবিলেখনে লিখতে কি দেবে নাম অনুজ্জ্বল উপাধিবিহীন?’ সেক্সের তিমিরতীর্থ আল মাহমুদের ‘সোনালি কাবিন’
‘এ কোন কলার ছলে ধরে আছ নীলাম্বর শাড়ি দরবিগলিত হয়ে ছলকে যায় রাত্রির বরণ। মনে হয় ডাক দিলে সে তিমিরে ঝাপ দিতে পারি আঁচল বিছিয়ে যদি তুলে নাও আমার মরণ।’
দরবিগলিত ছলকে যাওয়ার যৌন মিলনের অন্ধকার দ্রবতা পৌঁছোয় অপূর্ব রাগমোচনে। সংগমকালের এই উত্তেজনা ও “লিক্যুইডিটি’ কী সহজে খুঁজে পেয়েছে অব্যর্থ শব্দের নিসর্গ। এই বুনো হংসিনীর বয়েস কখনও আঠারো পেরোয় না। আঠারো বছরের মেয়েটি উদোম হয় এই ভাষায় ‘পালক উদাস করে দাও উষ্ণ অঙ্গের আরাম। আঠারো বছরের মেয়েটির সঙ্গে সেক্স হয়ে ওঠে আদিম আদিরসে ফুটন্ত প্রবাহ চরের মাটির মতো খুলে দাও শরীরের ভাঁজ উগোল মাছের মাংস তৃপ্ত হোক তোমার কাদায়, ঠোটের এ-লাক্ষারসে সিক্ত করে নর্ম কারুকাজ দ্রুত ডুবে যাই এসো ঘূর্ণমান রক্তের ধাঁধায়।”
আঠারো বছরের মেয়ের সঙ্গে তীব্র যৌনতায় গলে যাওয়া নির্ভুল নিয়ে আসে পদাবলি-আশ্লেষ ‘এ তীর্থে আসবে যদি ধীরে অতি পা ফেলো সুন্দরী, মুকুন্দরামের রক্ত মিশে আছে এ-মাটির গায়ে, ছিন্ন তালপত্র ধরে এসো সেই গ্রন্থ পাঠ করি কতো অশ্রু লেগে আছে এই জীর্ণ তালের পাতায়। মেয়েটি, এই অষ্টাদশী, কখনও ‘বুনো হংসিনী’, টেনে আনে ইয়েটস-এর সংবেদ, কখনও ‘হে বন্য বালিকা’, ফুটিয়ে তোলে তপোবনে শকুন্তলা। এমন মেয়েকে কোন মন্ত্রে কবি বরণ করতে পারে, তুলতে পারে ঘরে ও সংসারে ?
“সে কোন গোত্রে মন্ত্রে বলো বধু তোমাকে বরণ করে ঘরে তুলি? আমার তো কপিলে বিশ্বাস, প্রেমে কবে নিয়েছিলে ধর্ম কিংবা সংঘের শরণ ? “আমার তো কপিলে বিশ্বাস’–এই একটি মাত্র বাক্য বা উক্তি প্রবাহিত কত স্তরে, চোরাস্রোতে, পিনদ্ধ পরতে। মনে পড়ে যায় চৈতন্যের কপিল সাগরে’-র কথা। চৈতন্যের বা চেতনার রং কি পিঙ্গল? কপিল তো সেই প্রখ্যাত প্রজ্ঞার ঋষি, যিনি রচনা করলেন সাংখ্যদর্শন। আর ধ্বংস করলেন সগরবংশ। চেতনার পিঙ্গলবর্ণ আমাদের নিয়ে যায় আঠারো বছরের সুন্দরীর দেহবর্ণে ‘যতক্ষণ ধরো এই তাম্রবর্ণ অঙ্গের গড়ন’, মিলনের জন্য আর – কোনো মন্ত্রের প্রয়োজন নেই, তোমার শরীরই একই সঙ্গে দর্শন ও ইতিহাস, মিলন ও মৃত্যু। মৃত্যুর ইশারা এইভাবে এল ‘মরণের পরে শুধু ফিরে আসে কবরের ঘাস।’ কপিলমুনি যেমন ধ্বংস করেছিলেন সগরবংশ, তীব্র প্রেম ও কামনা তেমনি লুপ্ত করে ধর্ম ও সংঘের শরণ। তারপর আবার আসে পদাবলিবালা, রাধিকারম্যতায় ‘গলায় গুঞ্জার মালা পরো বালা, প্রাণের শবরী, কোথায় রেখেছ বলো মহুয়ার মাটির বোতল।’ এ রাধা সাঁওতাল মেয়ে। এ রাধা ট্রাইবাল। এ-রাধা কোনো ব্যাধের বউ। ‘শবরী’ এই ডাকের মধ্যে ঘুমিয়ে আছে সুদীর্ঘ প্রতীক্ষা। রামায়ণে রামের প্রণয়ের জন্য শবরীর যুগযুগান্তরের ধ্রুপদি প্রতীক্ষা মনে না পড়ে উপায় নেই। কিন্তু অন্য এক ইশারা গ্রাস করে আমাদের এই অষ্টাদশী অরণ্যযুবতি এক শরীর-শিকারি, যে লুকিয়ে রেখেছে তার নেশার বোতল। কবির পিপাসু আহ্বান ‘মহুয়ার মাটির বোতল নিয়ে এসো চন্দ্রালোকে তৃপ্ত হয়ে আচমন করি।’ তারপর মিশে যায় সেক্স ও শিকার ‘ব্যাধের আদিম সাজে কে বলে যে তোমাকে চিনব না নিষাদ কি কোনওদিন পক্ষিণীর গোত্র ভুল করে ? বদলে যায় চরিত্র ও ভূমিকা। তরল চৈতন্য বদল করে শরীর। কবিই হয়ে ওঠে শিকারি। অষ্টাদশী হয়ে ওঠে উড্ডিন পক্ষিণী। তারপর আরও এক অলৌকিক, ভাষার-অতীত প্রকাশ: “নিসর্গের গ্রন্থ থেকে, আশৈশব শিখেছি এ-পড়া প্রেমকেও ভেদ করে সর্বভেদী সবুজের মূল।’ ‘প্রেমকেও ভেদকরা সর্বভেদী’ অস্ত্রটি নিয়ে আসে যৌনমিলনের প্রমাধী প্রতীক। নিরাশ্রয় থাকে নাকো ইচ্ছা ও কল্পনা। প্রেমের জন্য, নিখাদ যৌনতার জন্য, কবি ত্যাগ করতে চান অতীত ইতিহাসের অহং ও গৌরব। কবির আমন্ত্রণ ওই আঠারো বছরের তাম্রবর্ণা সুন্দরীর শরীর ও মনের কাছে ‘এর চেয়ে ভালো নয় হয়ে যাওয়া দরিদ্র বাউল ? আরশি নগরে খোঁজা বাস করে পড়শি যে জন আমার মাথায় আজ চুড়ো করে বেঁধে দাও চুল তুমি হও একতারা, আমি এক তরুণ লালন।’ না কোনো ভক্তিরসের প্রতি আহ্বান নয়। বরং ঠিক বিপ্রতীপ বিরোধাভাস।
‘অবাঞ্ছিত ভক্তিরসে এযাবৎ করেছি যে ভুল, সব শুদ্ধ করে নিয়ে তুলি নব্য কথার কুজন।
কেমন কথা, যা শুদ্ধ করবে অবাঞ্ছিত ভক্তিরস? আদিরসের কথা। আধুনিক লজ্জাহীন কুণ্ঠালুপ্ত সেক্স টিক্ সেই অপূর্ব যৌনখেউড়ের একটি অনন্য উদাহরণ ‘এখনো আমার ঘরে পাওয়া যাবে চন্দনের শলা।
পুরুষাঙ্গের এমন বর্ণনা আর কোনো কবি কখনও ভাবতে পেরেছেন কি না জানি না যে বর্ণনায় জড়িয়ে আছে পদাবলিরতি, জড়িয়ে আছে কৃষ্ণের কাম, রাধার জাগৃিতি ও তৃপ্তি। অষ্টাদশী সুন্দরীকে | কি সম্পূর্ণ বিশ্বাস করেন মধ্যবয়সি কবি-প্রেমিক? অবিশ্বাসের উড়িধান হালকা হাওয়ায় হঠাৎ ভেসে এল: “তোমার দুধের বাটি খেয়ে যাবে সোনার মেকুর।” এই বিড়ালটিকে আমরা কে না চিনি। পাশের বাড়িতেই ঘাপটি মেরে আছে হয়তো। অষ্টাদশী কি কখনও সরায় না বুকের আঁচল? খোলে না ব্লাউজ ও ব্রা-এর হুক? সোনার বেড়াল মুখ মুছে পালিয়ে যাওয়ার পর, কবির নিদারুণ প্রশ্ন:
‘না দেখার ভান করে কতকাল দেখবে, চঞ্চলা ?’ যেন কিছুই ঘটেনি, ঘটছে না কোনোদিনই, এই ভণিতা আর কতকাল বজায় রাখবে তুমি? তবু এই অসতী-সতীকে নিয়েই কবি আশ্রিত হতে চান বেহুলাকল্পনায় ‘আমাকে উঠিয়ে নাও হে বেহুলা, শরীরে তোমার, প্রবল বাহুতে বেঁধে এ-গতর ধরো, সতী ধরো।’ ‘এ-গতর ধরো, সতী ধরো’, একই বাক্যে বা নির্দেশে ‘গতর ও সতী’-র বিপরীত ধাক্কা, অসামান্য অন্বয়, অভিঘাতে অনন্তদিনের! যতবার পড়ি, মনে হয়, ওই ‘গতর’ শব্দটি পৃথিবীর সমস্ত সতীত্বকে পরিণত করে ভণিতায়। একটি কবিতার শেষ লাইনে ‘সোনালি কাবিন’ উত্তীর্ণ হচ্ছে সতীত্ব সম্পর্কে আধুনিক তির্যকতায়
“তোমার চেয়েও বড় হে শ্যামাঙ্গী, শস্যের বিপদ।’
শস্যকে ধ্বংস করতে আসে না কোনো সোনার মেকুর। বর্গিরা লুটে নিয়ে যায় ধান। তছনছ করে জমির সতীত্ব। তাহলে কি কামনাবর্জনের মধ্যেই শেষ শুদ্ধি, মন ও শরীরের? কবির উত্তর: “ঝিঁঝির চিৎকারে ভাসে অমিতাভ গৌতমের স্তব।’
শেষপর্যন্ত গতরের ইচ্ছা ও নির্দেশই শেষ কথা! গতরের বাসনাকেই অসামান্য শব্দচয়নে প্রকাশ করেছেন আল মাহমুদ ‘আন্তরিক রতির দরদ’। রতির দরদের সঙ্গে আবার মেশে পুরুষের গতরউগ্র সেক্সুয়ালিটি নিয়ে ‘সুকণ্ঠি কবুল করো, এ অধমই তোমার মরদ।’ অষ্টাদশীর গাত্রবর্ণ কখনও পিঙ্গল। কখনও হলুদ। যেন হলুদ ফুলের প্রসারিত নগ্ন বাগান-এই হল অষ্টাদশীর গা। ‘খেতের আড়ালে এসে নগ্ন করো যৌবন জরদ।’ ‘জরদ’শব্দের অর্থ হলুদ। তাম্রবর্ণ এখানে হঠাৎ সোনালি। কেন তাম্রবর্ণ হঠাৎ সোনালি ? কারণ, জ্বলে উঠেছে কামনার সোনালি আগুন “তারপর তুলতে চাও কামের প্রসঙ্গ যদি নারী /
খেতের আড়ালে এসে নগ্ন করো যৌবন জরদ।’ আল মাহমুদের ‘সোনালি কাবিন’-এ শস্য ও খেতের অনুষঙ্গ বারবার ফিরে আসে নারীনগ্নতার বার্তাবাহক হয়ে ‘মঙ্গলকুলোয় ধান্য ধরে আছে সারা গ্রামবাসী উঠোনে বিন্নির খই, বিছানায় আতর অগুরু। শুভ এই ধানদূর্বা শিরোধার্য করে মহিয়সী আব্রু আলগা করে বাঁধো ফের চুলের স্তবক।’ আলগা-আব্রু, শরীরের খোলা আড়াল, লজ্জার মোচন, এসবের সঙ্গে শস্যের কীসের সম্পর্ক?
কেন নারী নগ্ন হবে খেতের প্রসারে? কারণ, শস্য, খেত উর্বরতার প্রতীক। উর্বরতার পিছনে আছে অনিবার্য মিলন ও যৌনতা “আমার চুম্বনরাশি ক্রমাগত তোমার গতরে ঢেলে দেব চিরদিন মুক্ত করে লজ্জার আগল।’ না হলে অষ্টাদশী কেমন করে নামবে ফসল ফলানো বৃষ্টি ?
“বৃষ্টির দোহাই বিবি, তিলবর্ণ ধানের দোহাই দোহাই মাছ-মাংস দুগ্ধবতী হালাল পশুর, লাঙল জোয়াল কাস্তে বায়ুভরা পালের দোহাই হৃদয়ের ধর্ম নিয়ে কোন কবি করে না কসুর। বৃষ্টি, ধান, মাছ-মাংস, দুগ্ধবতী পশু, হালাল, লাঙল, জোয়াল, কাস্তে, বায়ুভরা পাল—সব কিছু তীব্র কামনা ও সেক্সঅ্যাক্ট ও পৌরুষের প্রতীক। প্রশ্ন নারী কি তৃপ্ত। তাকে তৃপ্তি দেবার ক্ষমতা কি কোনো একক পুরুষ বা পৌরুষে বিদ্যমান? “ফাটানো বিদ্যুতে আজ দেখো চেয়ে কাঁপছে ঈশান ঝড়ের কলম খেয়ে বলো নারী, বলো তুমি কার?’ হে নগ্ন যুবতি, তোমার শরীরের উপরে এইমাত্র বয়ে গেল যে ঝাড়, যে ঝড় তছনছ করছে, জয় করছে, তৃপ্ত করছে তোমার শরীর যুগযুগান্তর ধরে, যে ঈশান-পৌরুষ বারবার চিরে দিচ্ছে, ফাটিয়ে দিচ্ছে তোমার ‘বিদ্যুৎ’, তুমি কি সত্যিই তার, চিরদিনের ? //
