যৌনতার নান্দনিকতা : আল মাহমুদের গল্প মনে করিয়ে দেয় মোপাসা ও তলস্তয়কে – রাহুল দাশ গুপ্ত

›› প্রবন্ধ  

আল মাহমুদের গল্পে বারবার ফিরে ফিরে আসে যৌনতা। যৌনতা নিয়ে এত অজস্র ও নান্দনিক গল্প বাংলা সাহিত্যে আর কেউ লিখেছেন কি? যে-কোনো বিষয়কে আল মাহমুদ নিয়ে যেতে পারেন যৌনতার দিকে। যৌনতার মধ্য দিয়েই তিনি ধরতে পারেন তাবৎ জীবনকে, তার বিস্তার ও গভীরতাকে। আল মাহমুদের কাছে যৌনতা নেহাত কোনো বিষয় নয়। এ এক জীবন দর্শনও বটে! অনেকটা ডি এইচ লরেন্সের মতো। এই দর্শনের একদিকে রয়েছে প্রেম, অন্যদিকে রয়েছে আধ্যাত্মিকতা। আল মাহমুদের গল্পে যৌনতা কখনও প্রেম, কখনও প্রকৃতি, কখনও আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে একাকার হয়ে গেছে। নর-নারীর সম্পর্ক নিয়ে তাঁর আগ্রহ ও কৌতূহলের কোনো শেষ নেই। তাঁর গল্পগুলি তাই নাটকীয় ঘাত-প্রতিঘাতে আর রহস্যময়তায় বারবার মনে করিয়ে দিতে পারে মোঁপাসাকে। কিন্তু আল মাহমুদ মূলত তলস্তয় ঘরানার গ্রুপদি কাহিনিকার। তলস্তয়ের মতোই তিনি জাত শিল্পী। পরিবেশ রচনায় তাঁর দক্ষতা অতি নিপুণ। পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তিনি বর্ণনা দেন। তাঁর বিবরণের মধ্য দিয়ে একটি চরিত্র ও তার পারিপার্শ্বিকের খুটিনাটি উঠে আসে। আল মাহমুদ যেন ছবি আঁকতে থাকেন। একজন চিত্রকরের মতোই শব্দ সাজিয়ে সাজিয়ে তিনি তৈরি করেন এক-একটি নান্দনিক ছবি, চোখের সামনে সেই দৃশ্যাবলিকে যেন প্রত্যক্ষ করা যায়।

বাংলাদেশের সাহিত্যে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহের পর এত বড়ো গল্পকার আর কেউ এসেছেন কি না সন্দেহ। হাসান আজিজুল হক বা আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের কথা মাথায় রেখেও একথা বলা যায়। এর একটা কারণ এই যে, আল মাহমুদ আমাদের যেভাবে বিস্মিত করতে পারেন, সেটা বাংলা সাহিত্যে খুব সহজলভ্য নয়। তাঁর প্রতিটা গল্পের মধ্য দিয়ে জীবনকে তিনি যেন নতুন নতুনভাবে আবিষ্কার করতে থাকেন। আর সেই আবিষ্কারগুলো আমাদের ভেতরে প্রবেশ করে যেন বিস্ফোরণ ঘটাতে থাকে। জীবন যে কত রহস্যময় আর ব্যাখ্যাতীত, তা উপলব্ধি করে আমরা চমকে উঠতে থাকি। আল মাহমুদের গল্পে ফিরে ফিরে আসে গ্রামজীবন। কিন্তু সেই গ্রামজীবনের এক সমান্তরাল বাস্তবতা তি নি রচনা করে যান। এ হল অন্তর্জগতের বাস্তবতা। এই বাস্তবতায় বাস্তবের সঙ্গে মিশে যায় স্বপ্ন, স্মৃতি, বিভ্রম। জীবন, জগৎ ও মানুষকে দেখার এক ভিন্ন ও মৌলিক চোখ, যা কল্পনা ও উদ্ভাবনী শক্তিতে পরিপূর্ণ, আমাদের বারবার আকস্মিকতার অভিঘাতে স্তব্ধ করে দিতে থাকে। একজন বিরল শিল্পী আল মাহমুদ, বাংলা সাহিত্যে এক নজিরবিহীন ব্যাপার, তা অনুভব করা যায়।

‘পানকৌড়ির রক্ত’ গল্পে রয়েছে পাখি শিকারের বর্ণনা। সদ্য বিয়ে হয়েছে আনোয়ারের। কিন্তু স্ত্রীর সঙ্গে এখনও সে সংগমে লিপ্ত হতে পারেনি। আদিনাও তাকে তার দূষিত রক্ত দেখতে দেয়নি। আনোয়ার অপেক্ষা করে আছে, স্ত্রী-র শুদ্ধ রক্ত দেখবে বলে। মিলনের সেই চরম মুহূর্তের জন্য ভেতরে ভেতরে অস্থির হয়ে আছে আনোয়ার। সে পাখি শিকার করতে যায়। প্রথমে সে হত্যা করে একটি সাদা বককে। এই শিকার যেন নারীর কুমারিত্ব হারানোর ইশারাকে বয়ে আনে। তারপর সে হত্যা করে একটি কালো পানকৌড়িকে। এই পানকৌড়িটির সঙ্গে, তার অঙ্গভঙ্গি ও গাত্রবর্ণের সঙ্গে সে আশ্চর্য মিল খুঁজে পায় তার স্ত্রীর। পানকৌড়িটির রক্তপাত ঘটিয়ে সে যেন যৌনমিলনের আনন্দ পায়। গল্পের শেষে আক্ষরিক অর্থেই স্ত্রীর সঙ্গে শারীরিকভাবে মিলিত হয় আনোয়ার। একজন শিকারির মতোই একজন পুরুষ যেন শিকার করতে থাকে একটি শ্যামবর্ণ নারীশরীরকে, একটু আগে যেমন সে সবেগে গুলি ছুড়েছিল শিকারের দিকে, ঠিক সেইভাবেই বীর্য নিক্ষিপ্ত হতে থাকে স্ত্রী-শরীরকে বিদ্ধ করবে বলে।

আল মাহমুদের গল্পগুলোয় রয়েছে তীব্র গতি। তাঁর প্রতিটি গল্প নানা ইশারা, ব্যঞ্জনা, প্রতীক ও চিত্রকল্পে পরিপূর্ণ। ‘কালো নৌকা’ গল্পটি নিশ্চয়ই বাংলা সাহিত্যের আর একটি ল্যান্ডমার্ক গল্প। জেলেজীবনের এই গল্প হয়তো আমাদের মনে করিয়ে নিতে পারে শিবশঙ্কর পিল্লাইয়ের ‘চিংড়ি’ উপন্যাসটিকে। দুটি রচনাই নর-নারীর সম্পর্ক নিয়ে। রাসু জলদাসের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল সতী জলদাসীর। দু’জনেরই শরীর ছিল দেখবার মতো, অতি দৃষ্টিনন্দন। সতীর অকালমৃত্যুর পর খুব একা হয়ে যায় রাসু। কিন্তু সতীকে সে ভুলতে পারেনি। সতীর রেখে যাওয়া একমাত্র স্মৃতিচিহ্ন, ওদের একমাত্র পুত্র, দামোদরকে খুব যত্নে মানুষ করে সে।

দামোদর প্রাপ্তবয়স্ক হলে তার সঙ্গে বিয়ে হয় কালীর। দামোদর ও কালী যেন ফিরে আসে যৌবনের রাসু আর সতী হয়েই। ওদের দু’জনের শরীর খুব দৃষ্টিনন্দন, যেন জীবন্ত স্থাপত্য। কিন্তু দামোদরের অকালমৃত্যু হয়। কালী অসম্ভব একা হয়ে যায়, নগ্ন হয়ে সে একা একা সমুদ্রের ধারে গিয়ে উন্মাদের মতো অপেক্ষা করে থাকে জলে ডুবে যাওয়া দামোদরের জন্য। তার ভেতরে অতৃপ্ত যৌনতা তাকে কুরে কুরে যায়। অন্যদিকে কালীর নগ্নতা কামাতুর করে তোলে রাসুকে, তার চোখে কালী আর সতী যেন একাকার হয়ে যায়। কালীকে সতী ভেবে সে সংগম করতে যায় তার সঙ্গে। আর কালীর চোখেও রাসুই হয়ে ওঠে দামোদর, সেও চায় তার অতৃপ্ত কামকে মেটাতে। দুই অতৃপ্ত, অসমবয়সি মানুষ যৌনমিলনের মুহূর্তে একটি কালো নৌকোয় চেপে নিরুদ্দেশের দিকে যাত্রা করে। তাদের সম্পর্ক তো সমাজ মেনে নেবে না। কিন্তু এই সম্পর্ক যে তাদের দু’জনেরই নিঃসঙ্গতায়, তাদের বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য ছিল, এটাই যেন দেখাতে চান লেখক।

‘রোকনের স্বপ্নদোলা’ গল্পে এসেছে একটি ট্রেনযাত্রার কথা। স্ত্রী রোকেয়াকে নিয়ে রোকন যে কামরায় ওঠে, সেখানেই তার সঙ্গে দেখা হয় এমন এক নারীর, যার সঙ্গে তার একবার বিয়ের সম্বন্ধ এসেছিল। সেবার মেয়েটিকে ভালো করে না। দেখেই সম্বন্ধটা নাকচ করে দিয়েছিল রোকন। কিন্তু এখন সেই নারী বিবাহিত এবং তাকে দেখে, তার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে, রোকন তাকে মনে মনে কামনা করতে থাকে। রোকনের অবচেতনে যেন ঘোর বা বিভ্রমের সৃষ্টি হয়, দুই নারীকেই সে নগ্ন অবস্থায় পাশাপাশি শুয়ে থাকতে দেখতে পায়। তার চোখে রোকেয়া আর সেই না পাওয়া মেয়েটি যেন একাকার হয়ে যায়, যৌনতাই তাদের একাকার করে দেয়, রোকন হয়ে ওঠে এক নির্বিশেষ পুরুষ। ‘জলবেশ্যা’ আল মাহমুদের আর একটি প্রসিদ্ধ গল্প, ‘পানকৌড়ির রক্ত’র মতোই। যৌনতা নিয়ে এই গল্পে নিষ্ঠুর কৌতুক করেছেন তিনি। একটি নারীর সঙ্গে মিলিত হতে যাচ্ছে একজন পুরুষ। এ নিছক উদাসীন যাত্রা নয়, এই যাত্রার পেছনে রয়েছে যৌনতার আদিম প্ররোচনা। ক্রমে যাত্রাটি যেন মহাকাব্যিক বিস্তার পেতে থাকে। মেঘনার বুকে জ্বলে ওঠে লণ্ঠনের আলো। অস্থায়ী বেদেদের নির্দিষ্ট একটি নৌকোকে লক্ষ্য করে মেঘনার বুকে গভীর রাতের কালো অন্ধকার ঠেলে এগোতে থাকে আবিত ব্যাপারী। অনেক প্রতিকূলতা সহ্য করে শেষপর্যন্ত পুরুষটি পৌঁছোয় সেই বেদে মেয়েটির কাছে, নিজের যৌনকামনাকে পরিতৃপ্ত করবে বলে। মেয়েটির শরীর দেখে সে মুগ্ধ হয়ে যায়, তাকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অর্থ দিয়ে কিনে নিতে চায়, আর আস্তে আস্তে করে এগোতে থাকে সেই চরম মুহূর্ত টির দিকে। আর তখনই তার সঙ্গে সেই নিষ্ঠুর কৌতুক করে মেয়েটি। নগ্ন হয়ে শুয়ে আছে সে, তার ওপর উপুড় হয়ে আছে পুরুষটি তাকে শুষে নেবে বলে, সেই অবস্থায় মেয়েটি পায়ের আলতো টোকায় খুলে দেয় ঝাঁপির মুখ, ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে বিষধর সাপটি সংগমের মুহূর্তে সাপের ছোবল খেয়ে অজ্ঞান হয়ে যায় লোকটি, তার সমস্ত অর্থ হাতিয়ে নিয়ে, তাকে সেই অবস্থায় মেঘনার জলে ভাসিয়ে দেয় মেয়েটি। এভাবেই যৌনতা আর মৃত্যু যেন একাকার হয়ে গেছে এই গল্পে। লোকটির মৃত্যু না হলেও মৃত্যুর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই সে যায় এবং এই অভিজ্ঞতা তার হয় যৌনমিলনের সময়ে, যে যৌনমিলনের জন্য রাতের মেঘনাকে পর্যন্ত তুচ্ছ করে দীর্ঘ জলপথে পাড়ি দিয়ে এসেছে একজন শিকারি পুরুষ।

‘বুনো বৃষ্টির প্ররোচনা’ গল্পে দীর্ঘ উড়ানযাত্রার পর ঘরে ফিরে আসে ব্যবসায়ী মাহমুদ। স্ত্রী মরিয়ম তাকে একা রেখে কলেজে চলে যায়। সেই নিঃসঙ্গতায় বাড়ির পরিচারিকা অল্পবয়সি জমিলার নগ্ন শরীর মাহমুদের কাছে আদিম প্ররোচনা হয়ে আসে। জমিলাকে মনে মনে কামনা করে মাহমুদ, বাইরে অঝোরে বৃষ্টি পড়তে থাকে। ‘মাংসের তোরণ’ গল্পে যৌনকর্মী দিলারাকে ভোগ করবে বলে নিজের বাড়িতে নিয়ে আসে উঠতি স্থপতি আনজাম। দিলারা আনজামের মা’র চোখে পড়ে যায় এবং তিনি মেয়েটিকে আনজামের হবু স্ত্রী বলে ভুল করেন। বৃদ্ধার দিলারাকে নিজের মেয়ের মতোই মনে হয়, অন্যদিকে অভাবী, দরিদ্র মেয়েটি এই বৃদ্ধার মধ্য দিয়ে যেন একটা অবলম্বনই খুঁজে পায়। সাময়িকভাবে দুই নারীর মধ্যে একটি মানবিক সম্পর্ক তৈরি হয়। বৃদ্ধার মতোই দিলারাও একজন মা এবং নিজের পুত্রসন্তানকে বাঁচাতেই পেটের দায়ে সে এই পেশায় নেমেছে। কিন্তু এই ভ্রান্তি শেষপর্যন্ত দুই নর-নারীর মধ্যে দু’ধরনের বিপন্নতা তৈরি করে। আনজাম অতৃপ্ত যৌনতার জ্বালায় ছটফট করতে থাকে। অন্যদিকে দিলারা বুঝতে পারে, ভোগ না করে আনজাম তাকে টাকা দেবে না, আর রোজগার না হলে তার ছেলের জন্য স্কুলের ড্রেস সে কিনতে পারবে না। ফলে কন্যা থেকে সে আবার বেশ্যা হয়ে ওঠে এবং বৃদ্ধার চোখ এড়িয়ে আনজামের কাছে গিয়ে নিজের নগ্নতাকে মেলে ধরে। সে চায়, আনজাম তাকে ভোগ করুক এবং প্রাপ্য অর্থ দিক। কিন্তু আনজামের চোখে দিলারা তখন আর বেশ্যা নেই, সে হয়ে উঠেছে একজন মা। নিজের মাকে দেখেই দিলারার ভেতর যে মাতৃত্ব রয়েছে, তাকে অনুভব করে আনজাম মেয়েটিকে ভোগ করেই সে তার প্রাপ্য অর্থ মিটিয়ে দেয়।

‘ভেজা কাফন” গল্পে রয়েছে এক দুঃসাহসিক নারী, নুরীর কথা। বিয়ের আগেই নুরী জানত, সে বেশিদিন বাঁচবে না। তার হৃদযন্ত্র দুর্বল। কিন্তু তবু সে সাজ্জাতকে বিয়ে করেছিল। নূরীর শরীর আর স্বাস্থ্যই আকৃষ্ট করেছিল সাজ্জাতকে। আর নুরীও অতৃপ্ত বাসনা নিয়ে যেতে চায়নি। নিজের শরীরকে তৃপ্ত করতে চেয়েছিল। তাই মৃত্যু আসন্ন জেনেও যৌনতাকে জিতিয়ে দিতে চেয়েছিল মেয়েটি।

একজন পুরুষ তার প্রতি শারীরিকভাবে আসক্ত বুঝতে পেরে, সে তার সুযোগ নিয়েছিল। নিজের শরীরের খিদেকে মৃত্যুর আগে মিটিয়ে যেতে চেয়েছিল। প্রবল বৃষ্টিতে একটি শবদেহকে দাহ করা হচ্ছে আর ফ্ল্যাশব্যাকে বলা হয়েছে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের গোপন এই কাহিনি। ‘নীল নাকফুল’ গল্পে দরিদ্র মজুর ওসমান অনেক কষ্টে একটি নীল নাকফুল বানিয়েছিল তার হবু স্ত্রী বানেছার জন্য। কিন্তু বানেছা নিজেকে রক্ষা করতে পারেনি। বৃদ্ধ জোতদার হাশেম তার শরীর দেখে মুগ্ধ হয়ে তাকে বিয়ে করে ফেলে। হাশেমের কাছে যাওয়ার পথে সারা রাস্তা ওসমান তার মনিব আতিলের কাছে বানেছার গল্প করতে করতেই যায়। কিন্তু হাশেমের ওখানে পৌঁছে সে আবিষ্কার করে, বানেছা এখন পরস্ত্রী, তাকে আর কোনোদিনই তার নিজের করে পাওয়া হবে না। যে পরিণতি মিলনান্তক হওয়ার কথা ছিল, তা বিয়োগান্তক হয়ে ওঠে। কিন্তু নীল নাকফুলটি থেকে যায় প্রেমের স্মৃতি হিসেবে, যাকে বানেছার কাছেই দিয়ে আসে ওসমান। নৌকো যাত্রার অনুপম বিবরণ পাওয়া যায় এই কাহিনিতে।

‘খনন’ গল্পেও এসেছে নদীর কথা। গেজরিডারের চাকরি নিয়ে এই কাহিনির নায়কের ঠাঁই হয় একটি ড্রেজারে। এখানেই তার সহকর্মী, সুখানি হাফিজ।

নদীতে খননকার্য চালিয়ে ক্লান্ত হাফিজ শহরে যায় নিজের শরীরের খিদে মেটাতে। আর এইভাবেই হুসনা বলে এক যৌনকর্মীর প্রেমে পড়ে যায় সে। হুসনা অসুস্থ হলে তার সেবা করে। হুসনা কিন্তু নিজের জীবনের সঙ্গে জড়াতে চায় না হাফিজকে। কারণ সে নিজেও হাফিজকে ভালোবাসে। আর তাই সে ঘৃণার ছলে হাফিজকে তাড়িয়ে দিতে চায়।

নারীর মনের কোনো তল খুঁজে পায় না যেন হাফিজ। খননের সন্ধানে সে অন্যত্র যাত্রা করে। “মীরবাড়ির কুরসিনামা’ গল্পে রয়েছে এক যৌথ, প্রাচীন, গেহাড়া, মুসলিম পরিবারের কথা, যৌনতা যাদের জীবনে অমোঘ কিন্তু প্রকাশ্য নয়, যা তাদের জীবনে অন্তঃসলিলা ফল্গুস্রোতের মতোই বয়ে যায়। যখন তাদের পোষা মোরগ-মুরগি প্রকাশ্যে যৌনতার খেলায় মেতে ওঠে, তখন সেদিকে তীক্ষ্ণ, কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে থাকে এই পরিবারের নারী-পুরষেরা। তীব্র ব্যঞ্জনাময় এই কাহিনিতে, যা তারা অবদমন করতে চায় তাই উন্মোচিত হয়ে যায়, নিজেদের গোপন জীবনের প্রতিফলনকে প্রকাশ্য হতে দেখে নিজেদের কৌতূহলকে তারা নিবৃত্ত করতে পারে না। তাদের পর্যবেক্ষণ ও প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়েই তাদের অবচেতনা যেন দৃশ্য হয়ে ফুটে উঠতে থাকে। ‘উত্তর পাহাড়ের ঝরনা’ গল্পে রয়েছে দুই উপজাতীয় নারী-পুরুষের কথা। মাইম্যা ভালোবাসত মং সু-কে। নিজের মা-কে খুঁজতে গিয়ে মং সু বৌদ্ধ ভিক্ষু হয়ে যায় এবং দুর্গম পাহাড়ে নির্জন জীবনযাপন বেছে নেয়। মাইম্যা তার কাছে যায়, নিজের নারীশরীরকে উন্মুক্ত করে এবং তার উপর উপগত হতে বাধ্য করে। এইভাবে যৌনতার মধ্য দিয়ে মং সুকে সে জীবনের স্রোতে ফিরিয়ে আনে। নারী-পুরষের যৌথ জীবনের মধ্যে। যে সার্থকতা রয়েছে, মং সু তার গুরুত্বকে টের পায়। মাইম্যা পুরুষের লোভের শিকার হতে চায়নি, নিজের প্রেমের কাছেই সে আত্মবিসর্জন দিতে চেয়েছে। এই প্রেমই তাকে টেনে নিয়ে যায় মং সু-র কাছে এবং শেষপর্যন্ত মং সু-কেও যৌনতার মধ্য দিয়ে সেই প্রেমের কাছে নতজানু হতে বাধ্য করে। ‘পশর নদীর গাঙচিল’ গল্পে পটভূমি হিসাবে এসেছে সুন্দরবনের বনভূমি। চোদ্দো বছরের কিশোরী কর্পূর পনেরো বছরের কিশোর রতনের সঙ্গে নৌকোয় চেপে যায় রুজি-রোজগারের ধান্দায়। বিদেশি জাহাজ তাদের ছাগল নেয়, কিন্তু বিনিময়ে কিছু দিচ্ছে না দেখে, কর্পূর প্রাপ্য আদায় করতে সচেষ্ট হয়। ক্রেনের দড়ি ধরে জাহাজে ওঠার সময় তার শাড়ি খুলে যায়। জাহাজ থেকে চুরি করা জিনিসগুলো নিয়ে পালাবার সময় পুঁটলি বানাতে সে নিজের ব্লাউজটাকে ব্যবহার করে। কর্পূরের নগ্নতা আর দুঃসাহস দেখে রতন তাকে যেন নতুন করে আবিষ্কার করে। একজন পুরুষের চোখে কিশোরী থেকে কর্পূর হয়ে ওঠে এক পরিপূর্ণ নারী। ‘পাতার শিহরণ’ গল্পে কলেজের চাকরি পায় পাতা। আনিসকে ছেড়ে যাওয়ার মুহূর্ত ঘনিয়ে আসে। আপাতত স্বামী-স্ত্রী কিছুদিন আলাদা থাকবে। কিন্তু যে মুহূর্তে সাফিয়ার মা তার মেয়েকে নিয়ে আসে, সেই সুন্দরী যুবতিকে দেখে পাতার মধ্যে নিরাপত্তার তীব্র অভাব সৃষ্টি হয়। আনিসও অকপটে স্বীকার করে, পাতা চলে গেলে নিঃসঙ্গ জীবনে মেয়েটিকে দেখে তার প্রলুব্ধ হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। স্বামী-স্ত্রী যৌথভাবে মেয়েটিকে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ‘গন্ধবণিক গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৃত্যু। মস্তু মিয়া ছিল। গন্ধের কারবারি। আতরের ব্যাবসা ছিল তার। জমিদার মহারাজাদের সঙ্গে ছিল তার কারবার।

সেই মানুষটা শেষ জীবনে একা ও দরিদ্র হয়ে যায়। শুধু বার্ধক্য নয়, তীব্র অভাবই তার মৃত্যুর কারণ। কথকের জীবনের যাবতীয় সুগন্ধের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মস্ত মিয়ার স্মৃতি। বিয়ের রাতে স্ত্রীর শরীরে সে মাখিয়ে দিয়েছিল মস্ত মিয়ার দেওয়া সুগন্ধী আতর।

সে-ই স্ত্রী চাইলেও তার সঙ্গে মিলিত হতে পারে না কথক। স্বামী-স্ত্রী দু’জনে মিলে বরং যায় মৃতদেহের কাছে। আর তখনই সারা জীবন ধরে যে সুগন্ধ বিলিয়ে এসেছে, তার শরীর থেকে নির্গত ভয়ানক দুর্গন্ধে কথক বমি করতে শুরু করে, তারপর জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। এভাবেই যৌনতা, প্রেম ও মৃত্যু আবারও একাকার হয়ে যায় আল মাহমুদের গল্পে।

বোঝাই যায়, আল মাহমুদের গল্পগুলিতে যৌনতার ভূমিকা কী অমোঘ। শরীরের অভিঘাত কী ব্যাপক! হুমায়ুন আজাদ লিখেছিলেন, ‘বাঙালির যৌনজীবন ও আচরণ একটি ভয়ঙ্কর ট্যাবু। বাঙালি যৌন ব্যাপারে অত্যন্ত আগ্রহী, প্রতিটি পুরুষ এক-একটি ক্যাসানোভা, কিন্তু তাদের কামনা সাধারণত অচরিতার্থ থাকে, তাই ভরা থাকে নানা বিকৃতিতে। অধিকাংশ বাঙালিই যৌন আলোচনায় সুখ পায়, অন্যের যৌনজীবন নিয়ে কুৎসা রটায়। কিন্তু তাদের কাছে এ-সম্পর্কিত কিছু জানতে গেলে তারা এমন ভাব করে যে যেন তারা যৌনতার কথা কখনও শোনেনি, কাম কী তারা জানে না। বাঙালির যৌনজীবনে বিজ্ঞান নেই,

বাঙালির জীবন কলাও নেই, রয়েছে পাশবিকতা। অতিবাহিত হয় অবদমিত যৌন কামনা-বাসনায়, যার ফল বিকৃতি। বাঙালির যৌবনমাত্রই ব্যর্থ ও যন্ত্রণাপীড়িত। বাঙালি নারী দেখলেই তাকে কাম্য।

বস্তু মনে করে, মনে মনে রমণ করে। এমন যৌন অসুস্থ জাতি জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে সুস্থ হতে পারে না।’

আল মাহমুদ তাঁর গল্পগুলিতে কি এই অবদমনকেই হটাতে চেয়েছেন? দেখাতে চেয়েছেন, বাঙালি জীবনে যৌনতার অমোঘ ভূমিকাকে? তাঁর গল্পগুলিতে যৌনতার অনুযঙ্গ হিসেবেই বারবার আসে নগ্নতা। তিনি কি সমস্ত মুখোশ ও পোশাক খুলে একটি জাতির অবচেতনকে আসলে এইভাবেই নগ্ন করে দেখাতে চেয়েছেন? আল মাহমুদ নিজেই একবার লিখেছিলেন, ‘যৌনতার কোনো তৃপ্তি নেই। এ আগুন একবার দেহের ভেতর জ্বলতে দিলে সে সব কিছু পুড়িয়ে শেষ করে দেয়। আমার একটা বন্ধমূল  ধারণা হয়েছিল, যৌনসুখের চেয়ে মহত্তর কোনো সুখ প্রাণীদের মধ্যে আল্লাহ সৃজন করেননি।’ তাই বোধহয় আল মাহমুদের গল্পগুলিতে যৌনতা এমনভাবে নান্দনিক হয়ে উঠতে পেরেছে… //