দি ইনডিসক্রিট জুয়েলস – দ্যনি দিদরো
অনুবাদকের ভূমিকা
দেনি দিদরোর The Indiscreet Jewels (১৭৪৮) অষ্টাদশ শতকের ফরাসি সাহিত্যের এক ব্যতিক্রমী সৃষ্টি। উপন্যাসটির আড়ালে রয়েছে তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ, দার্শনিক রূপক, এবং মানব কামনা ও ক্ষমতার সম্পর্কের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ। প্রথম পাঠে এটি মনে হতে পারে কেবল এক রম্য বা রতিসাহিত্যের গল্প; কিন্তু দিদরো এতে কেবল ইন্দ্রিয়ের খেলা নয়, বরং সমাজ, নীতি, ধর্ম ও রাজদরবারের ভণ্ডামিকে এক প্রকার নগ্ন রসিকতার মাধ্যমে উন্মোচন করেছেন।
এই অনুবাদ কোনও অফিসিয়াল সংস্করণ নয়—এটি কেবল বাংলা ভাষাভাষী পাঠকদের জন্য, যাতে তারা দিদরোর ব্যঙ্গ ও রসবোধের আস্বাদ নিজ ভাষায় নিতে পারেন। মূল পাঠের শৈলী ও ভাব বজায় রাখার চেষ্টা করেছি, তবে ভাষা এমন রেখেছি যেন আধুনিক পাঠকের কাছেও এটি বোধগম্য হয়।
আমি এই অনুবাদে নেমেছি একান্ত পাঠকপ্রেম থেকে—দিদরোর চিন্তাকে আমাদের ভাষায় ছুঁয়ে দেখার ইচ্ছে থেকে। এখানে কোনও বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য নেই; এটি কেবল এক সাহিত্যানুরাগীর প্রচেষ্টা, এক ক্লাসিক ইউরোপীয় কণ্ঠকে বাংলায় অনুরণিত করার প্রয়াস।
অপু চৌধুরী
উৎসর্গ: জিমার উদ্দেশ্যে
জিমা, এই মাহেন্দ্রক্ষণটি হেলায় হারিও না। আগা নারকিস এখন তোমার জননীর মনোরঞ্জনে ব্যস্ত, আর তোমার ওই কড়া মেজাজের শিক্ষয়িত্রী বারান্দায় দাঁড়িয়ে তোমার পিতার প্রত্যাবর্তনের প্রতীক্ষায় পথ চেয়ে আছেন। এই নাও, পড়ো; শঙ্কিত হইও না। অবশ্য, তোমার প্রসাধন-টেবিলের আড়ালে যদি বিজু ইনডিসক্রে (গোপন রত্নরাজি) গ্রন্থটি আবিষ্কৃত হয়, তবে কি তা খুব বিস্ময়ের কারণ হবে? না, জিমা, না; এ কথা তো সর্বজনবিদিত যে দ্য সোফা, তানজাই, এবং দ্য কনফেশনস তোমার উপাধানের নিচেই লুকায়িত ছিল।
তবুও কি দ্বিধা করছো? তবে শোনো, স্বয়ং আগ্লায়ে এই কার্যে হস্তক্ষেপ করেছেন—যে কাজটি গ্রহণ করতে তুমি লজ্জায় সংকুচিত হচ্ছো।
“আগ্লায়ে?” তুমি বিস্ময়ে প্রশ্ন করবে, “সেই গাম্ভীর্যপূর্ণ আগ্লায়ে?”
হ্যাঁ, সেই একই রমণী। যখন তুমি হয়তো তরুণ বঞ্জা আলেলুইয়ার সঙ্গে ভ্রমণে মত্ত ছিলে, কিংবা তাকে বিদায় করার ছল খুঁজছিলে; আগ্লায়ে তখন নির্দোষ আনন্দে আমাকে জাইদ, আলফানা, ফ্যানিয়ার প্রভৃতি কাহিনি শুনিয়ে কালযাপন করছিলেন। তিনি আমাকে এমন কিছু চিত্তাকর্ষক রূপরেখা প্রদান করেছিলেন, যা আমি সুলতান মাঙ্গোগুলের এই ইতিহাসে সন্নিবেশিত করেছি। তিনি আমার পাণ্ডুলিপি খুঁটিয়ে দেখেছেন এবং তা সংশোধনের পথও বাতলে দিয়েছেন। কেননা, আগ্লায়ে যদি কঙ্গোর অন্যতম সচ্চরিত্রা ও স্বল্প-শিক্ষাদায়ী নারী হন, তবুও তিনি বুদ্ধিমত্তায় অদ্বিতীয়া এবং নির্লোভ।
এখনো কি ভাবছো জিমা, তোমার পক্ষে দ্বিধাগ্রস্ত হওয়া শোভা পায়? পুনর্বার বলছি, জিমা—এই গ্রন্থটি গ্রহণ করো, পাঠ করো, এবং সম্পূর্ণই পাঠ করো; এমনকি সেই ‘চঞ্চল খেলনা’র (The Rambling Toy) ইতিবৃত্তটিও বাদ দিও না। এই অংশটি তোমার চরিত্রের কোনো হানি না ঘটিয়েই কেউ তোমার নিকট ব্যাখ্যা করতে সক্ষম—অবশ্য, যতক্ষণ না সেই ব্যাখ্যাকারী তোমার কোনো আত্মিক উপদেষ্টা কিংবা গোপন প্রেমিক হন।
প্রথম অধ্যায়: মাঙ্গোগুলের জন্মবৃত্তান্ত
হিয়াউফ জেলেস তানজাই বহুদিন ধরে চেচিয়ানিয়ার মহান সাম্রাজ্য শাসন করে আসছিলেন, আর এই ভোগবিলাসী রাজপুত্র তখনও প্রজাদের চোখের মণি হয়ে ছিলেন। এদিকে মিনুশিয়ার রাজা আকাজু বাবার ভবিষ্যদ্বাণী মেনে নিয়ে নিজের ভাগ্য বরণ করেছেন; জুলমিস আর ইহলোজে নেই; কাউন্ট দ্য (—) এখনো বেঁচে আছেন; কিন্তু স্প্লেনডিডাস, অ্যাঙ্গোলা, মিসাপুফ এবং এশিয়া ও ইন্ডিজের আরও কয়েকজন সম্রাট হঠাৎ মারা গেছেন। দুর্বল শাসকদের শাসনে ক্লান্ত প্রজারা অবশেষে ছিঁড়ে ফেলেছে আনুগত্যের শিকল; আর সেইসব হতভাগ্য রাজবংশের বংশধরেরা আজ নিজেদের সাম্রাজ্যেরই কোনো এক কোণে অচেনা বা নগণ্য হয়ে দিন কাটাচ্ছে। কেবল একজনই নিজের সিংহাসন টিকিয়ে রাখতে পেরেছেন—প্রখ্যাত সেহেরাজাদের নাতি ‘শাহ বাহাম’, যিনি তখন হিন্দুস্তানে রাজত্ব করছিলেন। ঠিক সেই সময়েই কঙ্গোতে জন্ম নিলেন মাঙ্গোগুল। তাই বলা চলে, বহু সম্রাটের মৃত্যুই মাঙ্গোগুলের জন্মের এক বিষাদমাখা পটভূমি তৈরি করেছিল।
বাবা এর্গেবজেদ ছেলের দোলনার চারপাশে পরীদের ডাকেননি; কারণ তিনি দেখেছিলেন, তাঁর সময়ের যেসব রাজপুত্র এই নারী-আত্মাদের হাতে মানুষ হয়েছেন, শেষমেশ তাঁরা নির্বোধ ছাড়া আর কিছুই হননি। তিনি কেবল একটা কাজই করলেন—ছেলের কোষ্ঠী বা জন্মছক তৈরি করার জন্য ডেকে পাঠালেন কোদিন্দো নামের এক ব্যক্তিকে। এই কোদিন্দোকে সামনাসামনি দেখার চেয়ে ছবিতে দেখলেই বেশি পণ্ডিত মনে হয়।
কোদিন্দো ছিলেন প্রাচীন রাজধানী বানজার জাদুকর বা দৈবজ্ঞদের কলেজের প্রিন্সিপাল। এর্গেবজেদ তাঁকে মোটা অঙ্কের মাসোহারা দিতেন এবং তাঁর এক নামকরা পূর্বপুরুষ—যিনি চমৎকার রাঁধুনি ছিলেন—তাঁর গুণের কদর করে কোদিন্দো ও তাঁর বংশধরদের কঙ্গোর সীমান্তে একটা বিশাল দুর্গও দান করেছিলেন। কোদিন্দোর কাজ ছিল পাখির ওড়াউড়ি আর আকাশের অবস্থা দেখে সেটা রাজসভায় জানানো—যা তিনি জঘন্যভাবে করতেন। যদি লোকে বলে যে, বানজায় আফ্রিকার শ্রেষ্ঠ নাটকগুলো মঞ্চস্থ হতো সবচেয়ে বাজে থিয়েটারে—তাহলে তার উল্টোটাও বলা যায়, সেখানে ছিল বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর কলেজ, আর সেখানে চর্চা হতো সবচেয়ে বাজে ভবিষ্যদ্বাণী।
রাজপুত্রের ভবিষ্যৎ বলার জন্য যখন এর্গেবজেদের প্রাসাদে ডাক পড়ল, কোদিন্দো বেশ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন; কারণ, আপনি বা আমি যেমন পড়তে জানি না, তিনিও ঠিক তেমনই—অক্ষরজ্ঞানহীন।
রাজদরবারে তখন অধীর অপেক্ষা। মন্ত্রী-আমলারা সব জড়ো হয়েছেন সুলতানার ঘরে। মহিলারা জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক পরে বাচ্চার দোলনার চারপাশে দাঁড়িয়ে। সবাই এর্গেবজেদকে অভিনন্দন জানাতে ব্যস্ত—বাবার মনে হচ্ছিল ছেলের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তিনি দারুণ কিছু শুনতে পাবেন। তিনি বাবা, তাই বাচ্চার কচি মুখের দিকে তাকিয়েই উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছিলেন।
অবশেষে কোদিন্দো এসে পৌঁছালেন।
“এগিয়ে এসো,” গম্ভীর গলায় আদেশ দিলেন এর্গেবজেদ, “যেই মুহূর্তে স্বর্গ আমাকে এই ছেলে উপহার দিয়েছে, আমি তার জন্মের সঠিক সময় লিখে রাখার নির্দেশ দিয়েছিলাম, সেটা নিশ্চয়ই তোমাকে জানানো হয়েছে। এবার সত্যি করে বলো, সাহস করে বলো—বিধাতা আমার ছেলের কপালে কী লিখে রেখেছেন?”
“জাহাপনা,” হাতজোড় করে বললেন কোদিন্দো, “এমন মহান ও সুখী বাবা-মায়ের ছেলে যে মহান আর ভাগ্যবান হবেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু আমি যদি এমন কোনো বিদ্যার ভান করি যা আমার জানা নেই, তবে সেটা হবে আপনার সঙ্গে প্রতারণা। নক্ষত্রগুলো সবার মতো আমার জন্যও ওঠে আর ডোবে, কিন্তু ভবিষ্যতের ব্যাপারে তারা আমাকে আপনার রাজ্যের সবচেয়ে মূর্খ প্রজাটির চেয়ে বেশি কিছুই জানায় না।”
“সে কি!” অবাক হয়ে বললেন সুলতান, “তুমি কি তবে জ্যোতিষী নও?”
“মহারাজ,” কোদিন্দো উত্তর দিলেন, “সে সম্মান আমার নেই।”
“তাহলে তুমি কোন জাতের শয়তান!”—বুড়ো অথচ রাগী এর্গেবজেদ ধমক দিয়ে উঠলেন—“একজন আরুসপেক্স! (পশুবলির মাধ্যমে ভাগ্যগণনাকারী!) খোদার কসম, আমি স্বপ্নেও ভাবিনি তুমি এমন অকেজো! শোনো কোদিন্দো, তুমি বরং তোমার হাঁস-মুরগি নিয়েই সুখে থাকো—আর আমার ছেলের ভাগ্য বলে দাও, ঠিক যেমন কিছুদিন আগে আমার স্ত্রীর তোতাপাখির সর্দিজ্বর নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলে।”
কোদিন্দো সঙ্গে সঙ্গে পকেট থেকে চশমা বের করলেন, বাচ্চার বাঁ কানটা ধরে চোখে চশমা এঁটে ভালো করে দেখলেন, তারপর ডান কানটাও ওভাবেই দেখলেন। শেষে গম্ভীর মুখে ঘোষণা করলেন:
“এই রাজপুত্রের রাজত্বকাল পরম সুখের হবে, যদি সেটা দীর্ঘস্থায়ী হয়।”
“বুঝলাম,” এর্গেবজেদ বললেন, “আমার ছেলে পৃথিবীর সেরা কাজগুলো করবে—যদি সে বেঁচে থাকে। কিন্তু বজ্রপাত হোক! আমি যেটা জানতে চাই সেটা হলো—সে আদৌ বাঁচবে তো? ও মরে যাওয়ার পর তার গৌরব দিয়ে আমি কী করব? আমি তোমাকে ডেকেছিলাম ছেলের কোষ্ঠী তৈরি করার জন্য, আর তুমি কিনা ওর শ্রাদ্ধের মন্ত্র পড়তে বসলে!”
কোদিন্দো কাঁচুমাচু হয়ে জানালেন, তিনি নিজেও চান আরও বিদ্বান হতে। তবু সুলতানের কাছে বিনীত অনুরোধ করলেন—তিনি যেন বোঝেন, নক্ষত্রবিদ্যার পথে তাঁর যাত্রা সবে শুরু হয়েছে; এই অবস্থায় যতটুকু জ্ঞান তিনি পেয়েছেন, সেটুকুই তাঁর সম্বল। কারণ, সত্যি বলতে কী, এই ঘটনার ঠিক আগের মুহূর্ত পর্যন্ত কোদিন্দো ছিলেন—আর কিছু নন, নিতান্তই এক শিক্ষানবিশ।
দ্বিতীয় অধ্যায়: মাঙ্গোগুলের শিক্ষা ও দীক্ষা
মাঙ্গোগুলের শৈশব নিয়ে আমি খুব বেশি কথা খরচ করব না। রাজপুত্রদের শৈশব সাধারণ আর দশটা বাচ্চার মতোই, তফাত শুধু একটাই—রাজপুত্ররা নাকি মুখে বুলি ফোঁটার আগেই হাজারো মণিমুক্তো ছড়িয়ে ফেলার অদ্ভুত এক “ক্ষমতা” নিয়ে জন্মায়। যেমন, এর্গেবজেদের পুত্রের বয়স চার পেরোতে না পেরোতেই তার কীর্তিকলাপ নিয়ে আস্ত একখানা ‘মাঙ্গোগুলানা’ লেখা হয়ে গিয়েছিল।
বাবা এর্গেবজেদ বেশ বুদ্ধিমান মানুষ ছিলেন। নিজের শিক্ষার বহর যা-ই হোক, ছেলের পড়াশোনায় তিনি কোনো খামতি রাখতে চাননি। তাই তিনি কঙ্গোর বাঘা বাঘা সব গুণী মানুষকে একজায়গায় করলেন—চিত্রশিল্পী, দার্শনিক, কবি, গায়ক, স্থপতি, নাচিয়ে, গণিতবিদ, ইতিহাসবিদ, তলোয়ারবাজ—কাউকে বাদ রাখলেন না। কপাল ভালো, মাঙ্গোগুলের সহজাত মেধা আর শিক্ষকদের অক্লান্ত পরিশ্রমে পনেরো বছরের মধ্যেই একজন তরুণ রাজপুত্রের যা যা শেখা উচিত, তার কিছুই তিনি বাকি রাখলেন না। আর বিশ বছর বয়সে পৌঁছাতে পৌঁছাতে তিনি খাওয়া, দাওয়া আর ঘুম—এই তিনটি মহৎ বিদ্যায় সমসাময়িক যেকোনো রাজাকে টেক্কা দেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করলেন।
এদিকে বয়সের ভারে নুব্জ এর্গেবজেদ; একদিকে রাজপাটের ক্লান্তি, অন্যদিকে বিদ্রোহের ভয়, তৃতীয়ত পুত্র মাঙ্গোগুলের অসাধারণ যোগ্যতায় অগাধ বিশ্বাস, এবং সর্বোপরি শেষ বয়সে হঠাত করে ভক্তিভাব জেগে ওঠা—যা কি না রাজপুরুষদের ক্ষেত্রে প্রায়শই মৃত্যু বা মতিভ্রমের লক্ষণ—সব মিলিয়ে তিনি সিংহাসন ছেড়ে দিয়ে ছেলেকে ক্ষমতা বুঝিয়ে দিলেন। এই মহৎ রাজা মনে করলেন, সারা জীবন তিনি যে ন্যায়পরায়ণ শাসন চালিয়েছেন, তার অদৃশ্য পাপ মোচনের জন্য এখন নির্জনবাসই শ্রেয়।
এইভাবে, পৃথিবীর বয়স যখন ১৫,০০০,০০০,০৩২,০০০,০২১ বছর আর কঙ্গো সাম্রাজ্যের বয়স ৩৯০,০০০,০৭০,০০৩ বছর—শুরু হলো মাঙ্গোগুলের শাসনকাল। তিনি ছিলেন তাঁর রাজবংশের ১২,৩৪,৫০০তম উত্তরাধিকারী।
মন্ত্রিসভার সঙ্গে ঘন ঘন বৈঠক, যুদ্ধ পরিচালনা আর রাজকার্য সামলানো—বইয়ের পাতার বাইরে জীবনের আসল শিক্ষাটা তিনি অল্প দিনেই শিখে নিলেন। তবুও, মাত্র দশ বছরের মধ্যেই মাঙ্গোগুল ‘মহান পুরুষ’ হিসেবে নাম কিনে ফেললেন। তিনি যুদ্ধ জয় করলেন, শহর দখল করলেন, সাম্রাজ্যের সীমানা বাড়ালেন, প্রদেশগুলোকে শান্ত করলেন, অর্থনীতির চাকা সচল করলেন, শিল্প-সাহিত্যের জোয়ার আনলেন, অসাধারণ সব ইমারত গড়লেন, জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান তৈরি করে নিজেকে অমর করে তুললেন, আইনসভাকে আরও শক্তিশালী করলেন, এমনকি অ্যাকাডেমিও প্রতিষ্ঠা করলেন—আর সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, ল্যাটিন ভাষার একটা শব্দ না জেনেই তিনি এত সব মহৎ কাজ করে ফেললেন; যেটা তাঁর দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কিছুতেই মেনে নিতে পারছিল না।
মাঙ্গোগুল সিংহাসনে যেমন মহান ছিলেন, অন্দরমহলে বা হারেমেও ছিলেন তেমনই উদার। দেশের সেকেলে হাস্যকর রীতিনীতি তিনি থোড়াই কেয়ার করতেন। তিনি তাঁর নারীদের প্রাসাদের দরজা ভেঙে ফেললেন; তাদের তথাকথিত ‘সতীত্ব’ রক্ষাকারী পাহারাদারদের ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বিদায় করলেন; এবং মেয়েদের সততার ভার মেয়েদের ওপরই ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত হলেন। ফ্ল্যান্ডার্সের গির্জাসংশ্লিষ্ট নারীদের (Canons) বাড়ির দরজা যেমন পুরুষদের জন্য খোলা থাকে, তাঁর হারেমের দরজাও তেমনই উন্মুক্ত করে দিলেন। আর বলাই বাহুল্য, তাঁদের আচরণও ছিল তেমনই শালীন।
আহা! কী চমৎকার সুলতান ছিলেন তিনি! তাঁর মতো আর কেউ জন্মায়নি—এমন চরিত্রের দেখা শুধু কিছু ফরাসি উপন্যাসের পাতাতেই মেলে। তিনি ছিলেন কোমল, ভদ্র, হাসিখুশি, রোমান্টিক, সুপুরুষ ও আমুদে—যেন আনন্দের জন্যই তাঁর সৃষ্টি। আর তাঁর মগজে যে পরিমাণ ঘিলু ছিল, তা তাঁর পূর্বপুরুষদের সবারটা একত্র করলেও সমান হতো না।
এতসব গুণ যার, তাকে পাওয়ার জন্য যে অসংখ্য নারী লালায়িত হবে, সেটাই স্বাভাবিক। তাদের মধ্যে কেউ কেউ সফল হয়েছিল। আর যারা মাঙ্গোগুলের হৃদয় জিততে পারল না, তারা অগত্যা রাজসভার অমাত্যদের সঙ্গেই নিজেদের সান্ত্বনা খুঁজে নিল।
ভাগ্যবতী তরুণী মির্জোজাও সেই দলেরই একজন—যিনি সুলতানের মন জয় করতে পেরেছিলেন।
আমি এই ইতিহাসে মির্জোজার রূপগুণের ফিরিস্তি দিতে বসব না; ও কাজ করলে এই লেখার আর কোনো শেষ থাকবে না। অথচ আমি প্রতিজ্ঞা করেছি—এই ইতিহাসের একটা ইতি আমি টানবই।
তৃতীয় অধ্যায়: যা এই ইতিহাসের প্রকৃত সূচনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে
মির্জোজা ইতিপূর্বেই বেশ কয়েক বছর ধরে মাঙ্গোগুলকে নিজের আঁচলে বেঁধে রেখেছিলেন। এই প্রেমিকযুগল একে অপরকে যা যা বলা সম্ভব—এবং আবেগের আতিশয্যে যা বলা সম্ভব নয়—তার সবই বারবার আউড়ে ফেলেছিলেন। তাঁদের সম্পর্ক এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, পরস্পরের কাছে জীবনের অতি তুচ্ছ কোনো ঘটনা গোপন করাকেও তাঁরা অপরাধ জ্ঞান করতেন।
তাঁরা সেই সব সনাতন প্রেমিক-সুলভ জিজ্ঞাসাবাদের স্তরও পার করে এসেছিলেন—যেমন, “উঁচু সিংহাসনে না বসিয়ে বিধাতা যদি আমাকে কোনো সাধারণ পরিবারে পাঠাতেন, তবুও কি তুমি আমাকে গ্রহণ করতে?” কিংবা “মির্জোজা যদি তার সামান্য রূপটুকুও হারিয়ে ফেলে, মাঙ্গোগুল কি তখনও তাকে ভালোবাসবেন?”—এইসব কাল্পনিক প্রশ্ন, যা বুদ্ধিদীপ্ত প্রেমিকদের উর্বর মস্তিষ্কে জন্ম নেয়, যা নিয়ে কোমল হৃদয়ের প্রেমিকরা অকারণে ঝগড়া বাধায়, আর যা প্রায়শই সত্যবাদী প্রেমিককেও মিথ্যা বলতে বাধ্য করে—আমাদের এই জুটির কাছে সেসব এখন একেবারেই বাসি হয়ে গেছে।
গল্প বলায় মির্জোজার ছিল বিরল ও সহজাত প্রতিভা, কিন্তু বানজা শহরের যাবতীয় কেলেঙ্কারির ভাণ্ডার তিনি ইতিমধ্যেই উজাড় করে ফেলেছিলেন। তাছাড়া শরীরটা খুব জুতসই না থাকায় তিনি সবসময় সুলতানের সোহাগ গ্রহণে প্রস্তুত থাকতেন না; আবার সুলতানেরও সবসময় মেজাজ মর্জি থাকত না। সোজা কথায়, এমন কিছু দিন আসত, যখন মাঙ্গোগুল ও মির্জোজার একে অপরকে বলার মতো কোনো কথা থাকত না, করার মতো কোনো কাজও থাকত না। ভালোবাসার বিন্দুমাত্র ঘাটতি না থাকলেও, তাঁরা তখন বেশ নিস্পৃহভাবে সময় কাটাতেন। যদিও এমন দিন খুব কমই আসত, তবুও আসত—আর আজকের দিনটা ছিল তেমনই এক দিন।
সুলতান সোফায় গা এলিয়ে শুয়ে ছিলেন, আর উল্টো দিকে বসে মির্জোজা নীরবে গিঁট বুনছিলেন। আবহাওয়া সুবিধের ছিল না, তাই হাঁটাহাঁটিরও উপায় নেই। মাঙ্গোগুল পিকেট খেলার প্রস্তাব দেওয়ার সাহস পেলেন না। প্রায় পনেরো মিনিট এভাবেই কাটল। হঠাত সুলতান পরপর কয়েকবার হাই তুলে নীরবতা ভাঙলেন, “স্বীকার করতেই হবে, গেলিওটা (Géliote) একেবারে দেবদূতের মতো গান গাইত।”
“আর মহামান্য সুলতান যে বিরক্তিতে মারা যাচ্ছেন, সেটাও স্বীকার করুন,” জবাব দিলেন মির্জোজা।
“না, প্রিয়তমা,” মাঙ্গোগুল হাই চাপার আপ্রাণ চেষ্টা করতে করতে বললেন, “তোমাকে দেখার মুহূর্ত কি কখনো একঘেয়ে হতে পারে?”
“এটা যদি নিছক সৌজন্যমূলক প্রশংসা না হয়, তবে দোষটা পুরোপুরি আপনার,” উত্তর দিলেন মির্জোজা। “আপনি ভাবনায় ডুবে আছেন, মন নেই, সমানে হাই তুলছেন। রাজপুত্র, আপনার হয়েছেটা কী?”
“জানি না,” বললেন সুলতান।
“তবে আমি আন্দাজ করতে পারি,” মির্জোজা বলে চললেন। “আমি যখন আপনার মন জয়ের সৌভাগ্য অর্জন করি, তখন আমার বয়স ছিল আঠারো। আপনার ভালোবাসা পাচ্ছি চার বছর হলো। আঠারো আর চার—মানে এখন আমার বয়স বত্রিশ। সুতরাং আমি এখন বেজায় বুড়ি।”
মির্জোজার এই অদ্ভুত গণিত দেখে মাঙ্গোগুল হেসে ফেললেন।
“তবে যদি আমি আর আনন্দদানের উপযুক্ত না-ও হই,” মির্জোজা যোগ করলেন, “অন্তত পরামর্শদাতা হিসেবে যোগ্যতা প্রমাণ করব। আপনার চারপাশে বিনোদনের অভাব নেই, তবু সেগুলো আপনাকে বিতৃষ্ণা থেকে বাঁচাতে পারছে না। আপনি একঘেয়েমিতে ভুগছেন, রাজপুত্র, এটাই আপনার রোগ।”
“তুমি ঠিক ধরেছ—এটা আমি পুরোপুরি স্বীকার করছি না,” বললেন মাঙ্গোগুল। “তবে তর্কের খাতিরে যদি ধরেই নিই তুমি ঠিক বলেছ, তাহলে এর কোনো দাওয়াই কি তোমার জানা আছে?”
একটু থেমে মির্জোজা উত্তর দিলেন, সুলতান তাঁর মুখ থেকে নগরের নানা প্রেমকাহিনি শুনে এত আনন্দ পেতেন যে, এখন আর তাঁর ঝুলিতে বলার মতো নতুন গল্প না থাকায় তিনি দুঃখিত। তিনি যদি দরবারের নারীদের গোপন প্রেমলীলার খবর বেশি জানতেন, তাহলে আরও কিছু বলতে পারতেন। নতুন কোনো বুদ্ধি না আসা পর্যন্ত তিনি এই পথটাই বাতলে দিলেন।
“তোমার প্রস্তাবটি মন্দ নয়,” বললেন মাঙ্গোগুল। “কিন্তু এদের সবার হাঁড়ির খবর কে রাখে বলো? আর ধরো কেউ জানেও, তাহলে কে আর তোমার মতো করে গুছিয়ে বলতে পারবে?”
“তবুও, জানা যাক না,” উত্তর দিলেন মির্জোজা। “যেই বলুক না কেন, আমি নিশ্চিত, কাহিনির রসদ থেকে মহামান্য যে আনন্দ পাবেন, তা বর্ণনার গুণে খুব একটা ম্লান হবে না।”
“তুমি চাইলে আমিও বাজি ধরতে পারি যে, দরবারের নারীদের কাহিনিগুলো বেশ মুখরোচক,” বললেন মাঙ্গোগুল। “তবে সেগুলো যদি শতগুণ মজারও হয়, কী লাভ, যদি জানাই না যায়?”
“জানা কঠিন হতে পারে,” উত্তর দিলেন মির্জোজা, “তবে আমার মতে, অসম্ভব নয়। আপনার আত্মীয় এবং বন্ধু, সেই জিনিয়াস (Genie) কুকুফা এর চেয়েও বড় বড় কাজ হাসিল করেছেন। আপনি কেন তাঁর পরামর্শ নিচ্ছেন না?”
“আহ, হৃদয়ের আনন্দ আমার!” সুলতান চেঁচিয়ে উঠলেন, “তোমার তুলনাই হয় না। আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই, সেই জিনিয়াস তার সমস্ত জাদুবল আমার উপকারে লাগাবে। এই মুহূর্তেই আমি আমার খাস কামরায় ঢুকে তাকে আহ্বান করব।”
এই বলে মাঙ্গোগুল উঠে দাঁড়ালেন, কঙ্গোর রীতি অনুযায়ী প্রিয়তমার বাম চোখে আলতো চুমু খেলেন, এবং সেখান থেকে বেরিয়ে গেলেন।
