দেখবেন, দুনিয়ায় যারা দুর্বল তারাই বেশি ভালবাসা চায়, মনোযোগ চায়। যাদের মনে অনেক জোর আছে, তারা ওসবের তেমন তোয়াক্কা করে না। আমি আবার দুর্বলের মধ্যেও দুর্বল। এতই দুর্বল যে কারও ভালবাসা বা মনোযোগ চাইতে ভয় করত। বড়জোর অনুকম্পা। সেটাই যথেষ্ট। সেটা কি ছেলেবেলা থেকেই?
হ্যাঁ। আমরা চার বোন, এক ভাই। ভাই সবচেয়ে ছোট। বোনদের মধ্যে আমি মেজো। আমার যখন সাতবছর বয়স, তখন মা আর বাবা যুক্তি করে আমাকে একটা বাড়িতে দত্তক দিয়ে দেয়। বিজন আর সুমিতা নামের এক কাপল। তাদের সন্তান হয়নি। আমরা শুনেছি, তারা আমার মাকে কিছু টাকাও দিয়েছিল। কিন্তু আমি সেই বাড়িতে গিয়ে এত কান্নাকাটি করেছিলাম যে, মাস দুই বাদে তারা আমাকে ফেরত দিয়ে যায়। কিন্তু টাকাটা ফেরত পায়নি বলে তারা খুব ঝগড়া করত এসে, পুলিশের ভয় দেখাত আমার বাবা
আর মাকে। আর তখন থেকেই আমি মা-বাবার চক্ষুশূল। মারধরের শুরু সেই থেকেই। বাড়িতে কোনও কিছু ঘটলেই মায়ের রাগ এসে পড়ত আমার উপর। বাবারও তাই। বাবা রাগী মানুষ, ট্রাক ড্রাইভাররা শুনেছি রাগী হয়। কারণে অকারণে মারধর খেতে-খেতেই আমার মনটা বড্ড দুর্বল হয়ে পড়েছিল। ভালবাসা, অপত্য স্নেহ, মায়া-মমতা এগুলো বুঝতেই পারিনি।
একেবারেই না?
সেটাই বলতে চাইছি। কিন্তু কীভাবে যে বলা যায়, ঠিক বুঝতে পারছি না। লজ্জা-ঘেন্নারও তো একটা ব্যাপার আছে।
যাক, তবে বলবার দরকার নেই।
তা কেন? ভেবে দেখলে মনে হয়, খোলা আলোর সামনে দাঁড়ালে একটু হালকা হওয়া যায়। গোপনের যন্ত্রণা বেশি। এত লুকোতে লুকোতে শঠ হয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। সত্যি-মিথ্যে গুলিয়ে যায়।
আমার মায়ের একজন প্রেমিক ছিল। বাবা তো দূরপাল্লার ট্রাক চালাত, চার পাঁচ সাতদিন বাড়িতে থাকত না। তখন একজন আসতেন, কমলমামা। বেশ হাট্টাগোট্টা চেহারা, আগে ফুটবল খেলতেন। ইনশিওরেন্সে ভাল একটা চাকরিও করতেন। আমার মায়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল।
ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক কি?
হ্যাঁ। আমার সবচেয়ে ছোট বোনটাকে যদি দেখতেন, তা হলে বুঝতে পারতেন। কমলমামার মুখ যেন কেটে বসানো। আপনার বাবা সেটা লক্ষ করেননি?
তা কে জানে! তবে উচ্চবাচ্য করেনি। আর বাবা তো বেশ কিছুদিন পরপর ঝড়ের মতো বাড়িতে আসত, রাক্ষসের মতো খেত, পাথরের মতো ঘুমোত, রাতে নেশা করে ফিরত। ছেলেমেয়েদের দিকে ফিরে তাকানোর মতো সময় কোথায়? দু’দিন পরেই আবার উধাও হয়ে যেত।
বুঝেছি।
আপনি ভালবাসার কথা জিজ্ঞেস করছিলেন। সত্যি কথা বললে বলতে হয়, ওই কমলমামাই আমাকে একটু-আধটু স্নেহ
করেছেন।
তাঁর স্নেহটা কী করে বুঝতেন?
তাই তো! কী করে বুঝতাম বলুন তো! কিন্তু বুঝতাম। বোধ হয় চোখের দৃষ্টিতে একটা কিছু থাকে যা থেকে বোঝা যায়। কখনও-সখনও মাথায় হাত রাখতেন বা বেণিটা নেড়ে দিতেন। মাকে বলতেন, মধুরিমাই তোমার মেয়েদের মধ্যে সবচেয়ে মিষ্টি। কী শান্ত স্বভাব! আর শুধু আমার হাতের চা খেতেই পছন্দ করতেন। এটা ঠিক ভালবাসা না হলেও একটু পক্ষপাত।
কিছু মনে করবেন না, আপনার প্রতি তাঁর কোনও সেক্সুয়াল অ্যাট্রাকশন ছিল না তো!
দেখুন, পুরুষমানুষের দৃষ্টিতে একটু কামভাব থাকেই। ওটাই হয়তো পুরুষমানুষের বৈশিষ্ট্য। তাদের নিষ্কলুষ চোখই নেই। তা মা-মেয়ে-ছুঁড়ি-বুড়ি যাই হোক, পুরুষের চোখে ও জিনিষ একটু- আধটু থাকবেই। শুধু কমলমামাকে দোষ দিয়ে লাভ কী? প্রকৃতিরও তো একটা নিয়ম আছে। মানুষ সমাজের মুখ চেয়ে প্রকৃতির নিয়মের উপর নিজের নিয়ম চাপিয়ে নিয়েছে বটে, কিন্তু তার বায়োলজিতে প্রকৃতিই তো লুকিয়ে টু দিচ্ছে!
বুঝেছি।
আপনাকে আগেভাগেই বলে রাখা ভাল যে, কমলমামা কিন্তু আমার ব্যাপারে কখনও চৌকাঠ ডিঙোননি।
অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন। তবু জিজ্ঞেস করি, ডিঙোলে কী করতেন? বলতে পারি না। আমার সেই বয়সের যে ভালবাসার হ্যাংলামি ছিল, তাতে হয়তো বাধাও দিতাম না। হয়তো একটু অবাক হতাম। হয়তো একটা ধারণা পালটে নিতে হত।
আপনি সাহসী। বুকের পাটা আছে। এই স্বীকারোক্তি আপনাকে চিনতে আমাকে সাহায্য করবে।
দূর! এটা কোনও সাহসের ব্যাপার নয়। মেয়ে হলে আপনি বুঝতেন, পরিবারের গুরুজন পুরুষদের কারও কাছেই মেয়েরা নিরাপদ নয়। দাদা, কাকা, মামা, এমনকী বাবারও ধর্ষণের শিকার কত মেয়েকে হতে হয় জানেন? খবরের কাগজে আজকাল প্রায় রোজ এসব ঘটনার খবর থাকে। যেসব খবর বেরোয় তার চেয়ে বহুগুণ ঘটনা ঘটে যায়। সেগুলো জানাজানিও হয় না। হ্যাঁ, সেকথা ঠিক।
তাই তো বলছিলাম, মানুষের সমাজে এগুলো অপরাধ বলে মনে করা হয়। আবার দেখুন, প্রকৃতির নিয়মে এগুলো অপরাধ নয়ও। পশুদের সমাজে যৌনমিলন অবারিত, সেখানে সম্পর্কের বালাই নেই, ইনসেস্ট বলে কিছু নেই। তাই না?
হ্যাঁ তাই। আপনি কি অবারিত যৌনমিলনের সমর্থক? শুনুন, যৌনমিলনটাকে আপনি অত গুরুতর করে তুলছেন কেন? আমি যে ভুখা পরিবারের মেয়ে, সেই পরিবারের কোনও নীতিবোধ ধরে রাখাই শক্ত। ওই সমাজে একটা মেয়ে একটা লোভনীয় উপহারের জন্য দেহ দিয়ে দিতে পারে। একটা কালো
কুচ্ছিত মেয়েও জানে তার আর কিছু না থাক, একটা যৌনাঙ্গ আছে, আর তারই যা কিছু দাম এ বাজারে পাওয়া যায়।
আপনি খুব অকপট।
অকপটকে কিন্তু মানুষ ভয় পায়, ভাল চোখে দেখে না।
অকপট হতে বুকের পাটা লাগে। মনে হল আপনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
হ্যাঁ। আপনার অকপট শব্দটা নিয়েই আমি একটু গোলমালে পড়ে গেলাম। বুঝতে পারছি না কথায় বা আচরণে বেআব্রু হওয়াটাই অকপটতা কি না। তাই যদি হয়, তা হলে নুডিস্টদের দেখুন। বেচারারা অকপট হতে গিয়ে জামাকাপড় খুলে ফেলল। কিন্তু উলঙ্গ হয়েও তেমন কিছুই করে উঠতে পারল না। ছোট-ছোট কলোনিতে গণ্ডিবন্ধ হয়ে রয়ে গেল। লোকে চিড়িয়াখানার জীবজন্তুর মতো তাদের গিয়ে দেখে আসে। আপনি তো নিশ্চয়ই কপটতার সমর্থক নন।
তা কেন। কিন্তু ঢাকাচাপা দেওয়াই তো আর কপটতা নয়। শুধু উন্মোচন কিন্তু বুদ্ধির লক্ষণ বলে আমার মনে হয় না। আমাকে আপনার অকপট বলে মনে হলেও আমি সত্যিই কিন্তু তা নই। অর্থাৎ আমি তেমন বোকা নই।
অকপট মানে কি বোকা?
কী জানি! শব্দটা শুনতে ভাল, কিন্তু গোলমেলে। সেই সব শব্দই গোলমেলে যার নানারকম অর্থ করা যায়।
কিন্তু আমরা যে একটা শব্দেই আটকে আছি শ্যামা, শব্দটা বরং সরিয়ে রাখা যাক। নইলে আমাদের কথা এগোবে না।
ঠিক কথা। আপনি নিশ্চয়ই পশুপাখিদের জীবন লক্ষ করেছেন। তাদের ঢাকাচাপা দেওয়ার বালাই নেই, তারা খোদার উপর খোদগারি করে না, আদ্যন্ত প্রকৃতির নিয়মে বাঁধা তাদের জীবন। কিন্তু কয়েক হাজার বছর ধরে তারা যেমন ছিল তেমনই আছে। একহাজার বছর আগেকার একটা বাঁদরের সঙ্গে আজকের একটা বাঁদরের কোনও তফাত নেই। কিন্তু মানুষ প্রকৃতির সব নিয়মই মেনে নেয়নি, সে কিছু কিছু এডিট করেছে। আর তাই মানুষ বদলে বদলে যায়। তাই না? হ্যাঁ, তাই। কিন্তু কথাটা উঠছে কেন?
ওই অকপট কথাটা থেকেই এসব এল। ভাবছিলাম, সভ্যতা মানেই খানিকটা কপটতা কি না।
হতেই পারে। যার যেমন ব্যাখ্যা।
কিন্তু এত পরিবর্তনের পরও, এত ঋষিবাক্য, হিতোপদেশের পরও
মানুষের ভিতরে আদিম রিপু এখনও শেষ কথা বলে। তা হলে আপনাকে পাগলুকাকার কথা বলি।
তিনি কে?
বাবার খুড়তুতো ভাই। একটু পাগলাটে গোছের এবং সবাই তাকে সাধুসন্তের মতো মানুষ বলে মনে করত। ভারী পরোপকারী ছিলেন। টাকাপয়সার প্রতি তেমন আকর্ষণ ছিল না। এককথায় একজন চমৎকার লোক। সবাই ভারী পছন্দ করত তাঁকে। আমাদের বাড়িতে মাঝে-মাঝেই আসতেন। কিন্তু সেই যে বলে না, কুসুমেও কীট! পুজোর আগে একদিন মা আমার সব ভাইবোনকে নিয়ে পুজোর জামাকাপড় কিনতে গেছে। বাড়ি পাহারা দিতে রেখে গেছে আমাকে। সেই সময়ে পাগলুকাকা এলেন। দিব্যি হাসি-হাসি মুখ, হাতে একটা শাড়ির প্যাকেট। সেটা খুলে ঝলমলে ভারী সুন্দর শাড়িটা বের করে আমার হাতে দিয়ে বললেন, পুজোর সময় পরিস। আমি তো অবাক। পাগলুকাকু হঠাৎ আমাকে শাড়ি দিচ্ছে কেন, তাও আবার এত দামি শাড়ি! আমি অবাক তো বটেই, কিন্তু খুশিতেও ডগোমগো। কী ভাল শাড়িটা! পাগলুকাকু বললেন, বউদি আর পানুদা তো তোকে তেমন যত্ন করে না। ভাবিস না, আমি তোকে চাইনিজ খাওয়াতে নিয়ে যাব। এবার আপনিই কিন্তু একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন
!
হ্যাঁ। এ হচ্ছে প্রাচীন বিনিময় প্রথা।
হ্যাঁ হ্যাঁ, আমিও আপনাকে সেটাই বলতে চাইছি। আর আশ্চর্য এই যে, আমিও ঠিক তখনই হঠাৎ বুঝতে পারলাম, পাগলুকাকা আমার কাছে কী চায়। মানুষ যেসব সম্পর্কের সৃষ্টি করেছে, গুরুজন-লঘুজন, অগম্যা-অগম্য, পিতৃবৎ-মাতৃবৎ-সন্তানবং ইত্যাদি, পাপ-পুণ্য, কর্মফল, সব কিছুই এত পলকা যে, হঠাৎ একটা প্যাশনের প্রলয়ঝড় খড়কুটোর
মতো উড়ে যায়। ওটাই হচ্ছে প্রকৃতির শক্তি। মানুষ শেষঅবধি ওই শক্তির সঙ্গে এঁটে উঠতে পারে না। সভ্যতার বিস্তর সেন্ট পাউডার মেখেও তার গায়ের বুনো গন্ধ ঠিকই ফুঁড়ে বেরোয়। আপনি রুখে উঠলেন না?
উঠেছিলাম, কিন্তু ফনাটা খুব উঁচুতে উঠল না। তার কারণ ওই সুন্দর
শাড়িটা আর চাইনিজের আশ্বাস আমাকে দুর্বল করে ফেলেছিল বোধ হয়। পাগলুকাকা সঙ্গে করে কন্ডোম এনেছিলেন। অর্থাৎ, সব কিছুই আগে থেকে ছক কষা ছিল। টাইমিং, টোপ, অ্যাপ্রোচ এবং যা হওয়ার
তা হয়েও গেল। আপনার রি-অ্যাকশন
ওই যে বললাম। খানিকটা অবাক। আর পুরনো ধারণা ও বিশ্বাসের পরিবর্তন। একটু গা ঘিনঘিন । এর পরও কি উনি…
না। ওই একবারই এবং বিস্ময়ের ব্যাপার হল, ওঁর ভীষণ মনস্তাপ হয়েছিল। কয়েকদিন পরে এসে আমার কাছে কান্নাকাটি করে ক্ষমাও চেয়ে যান।
আপনি কি ওঁকে ক্ষমা করেছিলেন?
আচ্ছা আপনিই বলুন তো, ক্ষমা ব্যাপারটা আসলে কী! ক্ষমা কীভাবে করা যায় আমাকে একটু শিখিয়ে দেবেন? যদি বলেন, ব্যাপারটা ভুলে যাওয়াই হল ক্ষমা, তা হলে বলি ভুলেই বা যাব কী করে? ইচ্ছেমতো কি ভুলে যাওয়া সম্ভব?
খুব কঠিন প্রশ্ন ম্যাডাম। আসলে ক্ষমা কথাটার প্রকৃত অর্থ আমারও জানা নেই।
আমি অনেক ভেবেছি। একবার মনে হয় ভুলে যাওয়াই বুঝি ক্ষমা, কখনও মনে হয়েছে ব্যাপারটাকে গুরুত্ব না দেওয়াই ক্ষমা, কখনও মনে হয় মেনে নেওয়াটাই বোধহয় ক্ষমা। অনেক ভেবে যা বুঝেছি তা হল, আসলে ক্ষমা করার জন্য যতটা শক্তিমান হওয়া দরকার তা আমি নই। ক্ষমা করার জন্য দুর্জয় শক্তি আর ভীষণ বুকের পাটা লাগে। হয়তো দেবতাদের থাকে, যুধিষ্ঠিরের বা যিশুর ছিল। আমরা কাউকে ক্ষমা করার যোগ্যই তো নই। আপনি কি আবার দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ? হ্যাঁ। আসলে দীর্ঘশ্বাসটা অনিবার্য ছিল, কারণ আপনি বোধহয় একটা অমোঘ সত্যের কথা বললেন। আমারও হচ্ছে, আমরা আসলে সত্যিই কাউকে ক্ষমা করতে পারি না, শুধু সিচুয়েশনটার সঙ্গে অ্যাডজাস্ট করে নিই।
ফলে আমি পাগলুকাকাকে ক্ষমা করেছি কি না তা আমি আজও বুঝতে পারি না। আর জীবন, সে যেরকমই হোক, একজায়গায় থেমে
থাকে না, সে ঘটনার পর ঘটনা ঘটিয়ে চলতেই থাকে। আপনাকে আমি আগেই বলেছি, আমরা যে সমাজে বাস করতাম সেখানে মরালিটির মূল্য খুব বেশি নয়। অর্থাৎ সেক্স কোনও গুরুতর বিষয় নয়। তবু আমি এটা নিয়েও ভেবেছি যে, ওটা পাপ কি না। যা মনে হয়েছে তা নিঃসংকোচে বলতে গেলে বলতে হয়, শরীরের কোনও পাপ হয় না। পাপ মনের। আর শরীর হল মনের দাস।
সেটা তো ঠিকই। তবু ধর্ষিতা মেয়ের ধর্মনাশ হয়েছে বলে ধরে নেওয়া হয়। আমি বলি যদি ধর্মনাশের ভয় পাও, তা হলে ধর্ষণ হতে দাও কেন? নিজেরাই বা
করো কেন? কই, কোনও মেয়ে তো কখনও কাউকে ধর্ষণ করতে যায়
না!
আমি যুক্তিটা মানছি। আপনি হয়তো একজন ধুরন্ধর পুরুষ। মুখে মেনে নিচ্ছেন, প্রতিবাদ করছেন না। ভিতরে ভিতরে হয়তো কিছুই মানছেন না। হাসছেন কেন ? আবার সেই কপটতা, অকপটতার কথা উঠে পড়বে। অর্থাৎ আপনি আমাকে একজন কপট লোক বলে ভাবতে শুরু করেছেন! কথাটা ভুল বলেননি। পুরুষদের বিশ্বাস না করাটাই আমার অভ্যেস হয়ে গেছে।
জীবনের নানা অম্ল-মধুর অভিজ্ঞতা থেকেই তো আমাদের ধারণাগুলো তৈরি হয়। কিন্তু আমাকে অকারণে কপট ভাববেন না। আমার আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছে। খুবই লঘু এবং বস্তাপচা প্রশ্ন হচ্ছে না হলে জবাব দেওয়ার দরকার নেই।
প্রশ্নটা কী ?
আপনি বোধ হয় আর নর-নারীর প্রেম- ভালবাসায় বিশ্বাসী নন?
কে বলল নই? আমার কথা শুনে কি তাই মনে হল?
মনে অবিশ্বাস থাকলে কি ভালবাসা সম্ভব?
ছেলে যদি চোর হয়, মিথ্যে কথা বলে, বদমায়েশি করে বেড়ায়, তা হলে তার মা কি ভালবাসে না? ছেলেকে বিশ্বাস না করলেও ভালবাসে।
ম্যাডাম, মা আর ছেলের ব্যাপারটা ইনস্টিংটিভ। লাভ বাই চয়েস নয়।
শুনুন, আমি আপনার একথাটাও মানলাম। ঠিক কথা। মা আর সন্তানের ভালবাসাটা সিলেক্টিভ নয়। আরও একটা ব্যাপার হল, মা তার অপত্য স্নেহের কোনও প্রতিদানও চায় না। ছেলে যদি মাকে নাও ভালবাসে তবু মা একতরফাই ছেলেকে ভালবাসতে পারে। আর জানবেন, এরকম ভালবাসা, অর্থাৎ ভালবাসার এই প্যাটার্নটা মেয়েদেরই একচেটিয়া। ছেলেদের নয়।
একটু ব্যাখ্যা করুন।
বরুণ নামে একটা ছেলে আমার প্রেমে পড়েছিল। সে কী প্রেম রে বাবা! স্বর্গ-মর্ত- পাতাল এক করতে পারে। জানালায় ঢিল মারত, চিঠি দিত, তাতে লিখত আমার জন্য প্রাণ অবধি দিতে পারে। প্রেমে একদম পাগল হয়ে গেল। দিনরাত আমাদের বাড়ির চারদিকে ঘুরে-ঘুরে যেত। একটা প্লাস্টিক ব্যাগ তৈরির ব্যবসা ছিল তার, সেই ব্যবসা লাটে ওঠার জোগাড়। আমার তখন সতেরো বছর বয়স। জীবনে সেই প্রথম ভালবাসার আঁচ পেয়ে আমিও ডগোমগো, পাগল-পাগল। ডিটেলস- এর দরকার নেই, বেশ কিছু বাধা-বিপত্তি ডিঙিয়ে একদিন আমাদের বিয়েও হয়ে গেল। আপনি হঠাৎ চুপ করে গেলেন। একটা পদ্ধ দিচ্ছেন কি?
হ্যাঁ, ভাবছি এসব বলেই বা কী হবে। হাঁড়িতে যখন ভাত ফোটে, দেখেছেন? হাঁড়ি জুড়ে উথাল-পাতাল, টগবগ। কিন্তু ভাতকে তো আর অনন্তকাল ফুটতে দেওয়া যায় না। তাকে নামাতে হয়, জুড়োতে হয়, ফ্যান ফেলে দিতে হয়। উথাল-পাথাল প্রেমের পর বিয়ে
হল হাঁড়ির ভাতের মতো। টগবগানি নেই, কিন্তু বন্ডিং আছে। ছেলেদের প্রেম আর মেয়েদের প্রেমের মধ্যে তফাত হল ওইটি। ছেলেরা কেবল টগবগানি চায়। যার জন্য পাগল হল তাকে পেয়েই তার প্রেম উবে গেল, আবেগ উধাও, পাগলামি নেই, বউয়ের মুখের দিকে না তাকিয়েও তার চলে যায়। তখন সে নতুন টগবগানির জন্য ছোঁক-ছোঁক করে বেড়ায়।
আর মেয়েরা ?
দেখবেন, বেশির ভাগ মেয়েই চায় পুরুষটিকে ঘিরে একটি নিরাপদ সংসারের রচনা। নির্ভরতা তার সবচেয়ে বড় সম্পদ। একটি মেয়ের জন্য পুরুষ হয়তো যুদ্ধ বাঁধিয়ে দিতে পারে, দাঙ্গা-হাঙ্গামা করতে পারে, কিন্তু নিজস্ব নারীটির প্রতি বিশ্বস্ত থাকা তার পক্ষে কঠিন। মেয়েদের ঠিক উলটোটা।
বরুণের সঙ্গে কি আপনারও তাই হল? হল। বিয়ের দু’মাস বাদেই সে বুঝতে পারল সে কত ভুল করে ফেলেছে। আর সেই ভুলের গুণাগার দিতে হচ্ছিল আমাকে। ঝগড়াঝাঁটি অশান্তি গরিবদের ঘরে থাকেই। সেটা তত কিছু নয়। চড়চাপড়ের পর আদর ও তো থাকে। কিন্তু বরুণের বাড়িতে চড়চাপড় বাড়তে লাগল, আদর কমতে কমতে তলানিতে চলে গেল। একদিন বরুণ, তার দুই ধুমসি বোন আর দজ্জাল মা আমাকে মারতে- মারতে উঠোনে ফেলে দিয়েছিল। নর্দমার ধারে পড়েছিলুম, কিছুক্ষণ জ্ঞানও ছিল না। চেতনা ফিরল গায়ে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ায়। মুষলধারে বৃষ্টি নেমেছিল সেদিন।
আবার বিরতি দিচ্ছেন ? বৃষ্টিতে একটা প্ররোচনা ছিল।
তার মানে?
আমার মনে হয় ওইদিন ঠিক ওই সময়ে বৃষ্টি যে নেমেছিল তা এমনি নয়। বৃষ্টিটা যেন ছিল উদ্দেশ্যমূলক। প্রবল বৃষ্টি আমার সর্বাঙ্গ ভাসিয়ে নিচ্ছিল। কেঁচোর মতো সরু সরু জলের স্রোত আমার পোশাকের ভিতরে ঢুকে শরীরে যেন ব্যথার প্রলেপ মাখিয়ে দিচ্ছিল। টোকা দিচ্ছিল আমার মাথায়, বলছিল, জাগো, জেগে ওঠো। ভাল করে তাকাও, তোমার কিছুই হারায়নি।
সেই জন্যই কি আপনার এনজিও-র নাম
বৃষ্টি ?
আপনি বুদ্ধিমান।
বৃষ্টির কাছ থেকে সেদিন কি আপনি ক্ষমা
এবং সেবার পাঠ নিলেন?
আপনি বোকা।
এই তো এক্ষুনি বললেন, বুদ্ধিমান।
তাও বলেছি, বোকাও বলছি।
কেন ?
আবার ক্ষমার কথা তুললেন বলে। ক্ষমা একটা দুর্বোধ্য শব্দ। ক্ষমা করার অধিকার কার আছে বলুন, যখন সকলেই কোনও না-কোনওভাবে অপরাধী !
আর বৃষ্টির পর কী হল? তার পরে কি আপনি একটা এনজিও খুলে ফেললেন, আর হয়ে গেলেন তার সর্বেসর্বা ? আপনার এনজিও যে বিশাল কাজ করছে তার জন্য দায়ী কি ভই বৃষ্টি ?
ওই বৃষ্টিটার কথা আমি খুব ভাবি জানেন? কী অদ্ভুত বৃষ্টি। ওটা ঠিক আমাদের নিয়ম মানা বৃষ্টির মতো নয়। হয়তো কখনও-সখনও কারও জন্য ওরকম বৃষ্টি কানে-কানে কিছু বলে দিয়ে যেতে আসে, দান উলটে দেয়, কিংবা কিছু একটা হয়। ওই বৃষ্টির পর আমরা অল্প-অল্প বদলে গেলাম। প্রতিশোধটা নিলেন কীভাবে? প্রতিশোধ! প্রতিশোধের কথা উঠছে কীসে? কেন প্রতিশোধ! কার ওপর প্রতিশোধ! ওই বৃষ্টিই তো আমাকে বুঝিয়ে দিয়ে গেল, ওরা কত দুর্বল, কত ছোট, কত অসহায়। আমার মতোই। একদল গুন্ডা আসুক বা ডাকাত ঢুকুক, ওরা নেংটি ইঁদুরের মতো
হয়ে যাবে। একজন এমএলএ বা দারোগা এসে দাঁড়ালে এদের কাপড়চোপড় নষ্ট হওয়ার জোগাড়। এদের ওপর কি প্রতিশোধ নিতে আছে?
দাঁড়ান ম্যাডাম, দাঁড়ান। হঠাৎ আমার মনে পড়ল, বৃষ্টির এগজিকিউটিভ সেক্রেটারির নাম বরুণ রায়, বাই এনি চান্স….
ও আমার বর। আপনি বুদ্ধিমান। আশ্চর্য! আশ্চর্য! তা হলে তো বলতে হয় আপনি শেষঅবধি প্রতিশোধ নিয়েছেন। উঃ । আপনি বড্ড বোকা!
