হানড্রেড রোমান্টিক নাইটস্ – গিয়ােভানি বােকাসিও (পঞ্চম দিন ৬ষ্ঠ-১০ম গল্প)

›› অনুবাদ  ›› ১৮+  

গিয়ােভানি বােকাসিও-র ডেকামেরন টেলস এর বাংলা অনুবাদ।

ষষ্ঠ গল্প

প্রােচিদা-র জিয়াকে দেখা গেল যে মেয়েটিকে সে ভালবাসে তার পাশে সে শুয়ে আছে। ইতিপূর্বে ঐ মেয়েটিকে রাজা ফ্রেডরিককে দান করা হয়েছিল। জিয়ানি ও মেয়েটিকে একটি দণ্ডে বাধা হল। তাদের পুড়িয়ে মারা হবে। রুজ্জিয়ের ডি লােরিয়া জিয়ানিকে দেখে চিনতে পারলাে। দু’জনকে মুক্তি দেওয়া হল ও পরে তাদের বিয়ে হল।

নেফাইলের গল্পটি সকলে বিশেষ করে মেয়েরা খুব পছন্দ করলাে। বা বেশ গল্প বলেছিস। তার গল্পের পর প্যামপিনিয়াকে গল্প বলার জন্য কুইন অনুরােধ করলাে, বেশ জমাটি গল্প বলবি।।

দেখি কি বলতে পারি, বলে প্যামপিনিয়া আরম্ভ করলাে। তােমরা তাে অনেক গল্প শুনলে, দেখতে তাে প্রেমের কী অসীম তেজ, কী দৃঢ় বন্ধন। প্রেম অসাধ্য সাধন করতে পারে। আমার গল্প না নায়িকা অসাধ্য সাধন করেছিল কিনা সে বিচার তােমরাই করবে।

নেপলসের কাছে ছােট্ট একটা দ্বীপ আছে, নাম ইণ্ডিয়া আর সেই দ্বীপে অপূর্ব সুন্দরী একটি চ বাস করতাে। তার নাম ছিল রেস্টিচুটা। তার বাবার নাম ছিল মারিন বােলগারাে, দ্বীপের একজন নামী দামী ব্যক্তি।

ইশ্চিয়ার পাশেই আর একটা দ্বীপ ছিল, নাম প্রােচিদা। সেই দ্বীপে সৌম্যদর্শন এক যুবক হতে করতাে। তার নাম ছিল জিয়ান্নি। জিয়ান্নি ও রেস্টিচুটা পরস্পরকে দারুণ ভালবাসত আর দুটিতে মানিয়েছিলও ভালাে।

রেস্টিচুটাকে একবার চোখের দেখা দেখবার জন্যে প্রতিদিন জিয়ামি একবার এ দ্বীপ থেকে ও দ্বীপে যেত। দিনে একবার দেখে সে সন্তুষ্ট হতাে না তাই রাত্রেও একবার যেত। প্রিয়তমাকে সে এক ভালবাসত যে রাত্রে নৌকো না পেলে সাঁতার কেটে ঐ দ্বীপে যেত এবং প্রিয়তমাকে দেখতে না পেলে তার বাড়ির দেওয়ালটা খানিকক্ষণ ধরে দেখে ইশ্চিয়া থেকে প্রােচিন দ্বীপে ফিরে আসত।

জোয়ারের সময় অনেক সামুদ্রিক শামুক বা ঝিনুক ভেসে এসে পাথরে আটকে যেত। এইসব কামু ও ঝিনুকের ভেতরের মাংস অতি সুস্বাদু। তাই জোয়ারের পরে অন্য সময়ে স্থানীয় মানুষ এই শামুক বা ঝিনুক সংগ্রহ করতে আসত। কেউ আবার বাহারী ও নানা রঙে রঙীন ঝিনুক বালুবেলা থেকে কুড়ােতে আসতাে।

গ্রীষ্মের এক মধ্যাহ্নে হাতে ছােট একটা ছুরি নিয়ে ৱেস্টিচুটা শামুক সংগ্রহ করতে সমুদ্রে ধারে এসেছে। শামুকগুলো সময়ে সময়ে পাথরের গায়ে এমনভাবে আটকে থাকে যে, তাদের ছুরি দিয়ে খুঁচিয়ে তুলতে হয়। শামুক তুলতে তুলতে রেক্টিচুটা একটা নির্জন স্থানে এসে পড়েছে। শামুক সাথে এতই তন্ময় যে আশেপাশে কেউ আছে কিনা বা কি ঘটছে তা লক্ষ্য করে নি। লক্ষ্য করলে বা কান সজাগ রাখলে বিপদ ঘটতাে না।

এখন হয়েছে কি সিসিলিবাসী একদল যুবক নেপলস থেকে একটা ছােট জাহাজে চেপে ঐ দ্বীপে এসেছে, উদ্দেশ্য কিছুক্ষণ ফুর্তি করা ও কাছেই যে একটা সুস্বাদু জলের ঝরনা আছে সেখানে থেকে শিপে ভর্তি পানীয় জল নিয়ে যাওয়া। ওরা কয়েকটা বড় পাথরের আড়ালে ছিল এবং সম্ভবত সমুদ্রে গর্জনের জন্যে রেস্টিচুটা ওদের দেখতেও পায়নি বা ওদের গলার আওয়াজ পায়নি।

কিন্তু যুবকরা ওকে দেখে ফেলল। এমন সুতনুকা সুন্দরী কদাচিৎ দেখা যায় তায় আবার সে একা। এমন সুযােগ ছাড়া যায় না। রেস্টিচুটাকে ধরে নিজেদের জাহাজে তুলে জাহাজ ছেড়ে দিল। রেস্টিচুটার চিৎকার কেউ শুনতে পেল না।

ঝোঁকের মাথায় সুন্দরী তরুণীকে অপহরণ করা হল কিন্তু ক্যালাব্রিয়া বন্দরে এসে নিজেদের মধ্যে ঝগড়া লাগল, মেয়েটির মালিক কে হবে ?

কিছুক্ষণ ঝগড়া করার পর তাদের সুবুদ্ধির উদয় হল। তারা আশংকা করলাে একটি কুঁড়ির জন্যে তাদের বিপদ ঘটতে পারে। তার চেয়ে একে সিসিলির রাজা ফ্রেডরিককে উপহার দেওয়া যাক। রাজা এখন যুবক আর এই রকম সুন্দরী মেয়ে রাজার খুব পছন্দ, লুফে নেবে।

ক্যালব্রিয়া থেকে প্যালেরমাে গিয়ে ওরা সিসিলি রাজাকে মেয়েটি উপহার দিল। বলল এমন মেয়ে রজার পাশেই মানায়। রাজা আঙুরগুচ্ছর মতাে টসটসে রসে ভরা এমন একটি তরুণী পেয়ে উৎফুল্ল।

রাজার তখন শরীর ও মন ভালাে যাচ্ছিল না কিন্তু এমন পাকা আঙুর গুচ্ছের মতাে একটি মেয়ে পেয়ে রাজার মন ভালাে হলেও শরীর বাধা দিচ্ছে। তাই রাজা আপাতত লা কিউবা নামে তার এক প্রাসাদে রেস্টিচুটাকে সযত্নে রাখলাে। শরীর একটু ভালাে হলেই পাকা আঙুরের রস নিংড়ে চুকচুক করে চুমুক দিয়ে খাবেন। বিলাসবহুল প্রাসাদে রেস্টিচুটা আরামেই রইল।

ইশ্চিয়া থেকে রেস্টিচুটা সহসা নিরুদ্দেশ হওয়ায় দ্বীপে দারুণ চাঞ্চল্য। তার কি হল, কেউ তাকে অপরহরণ করল কিনা বা সে স্বেচ্ছায় কোথাও চলে গেল কিনা কেউ জানতে পারলো না। কোনো সূত্র পাওয়া গেল না।

সর্বাপেক্ষা ব্যথিত হল জিয়ানি। সে দারুন মনােকষ্টে ভুগতে লাগল। সে চুপ করে বসে থাকতে পাক না। কে কবে তার প্রেমিকার খবর পাবে বা কোনাে সূত্র থেকে জানা যাবে রেস্টিচুটা কোথায় আছে, অত ধৈর্য তার নেই।

ইশ্চিয়া দ্বীপের বিভিন্ন স্থানে অনেকে সেদিন শামুক সংগ্রহ করতে গিয়েছিল। তাদের কাউকে জিজ্ঞাসা করে শুধু এইটুকু জানা গেল যে সেই সময়ে একটা ছােট জাহাজ কুলে ভিড়েছিল এক কয়েকজন যুবক দ্বীপে অবতরণ করেছিল। তারপর তাদের কি হল তারা কি করলাে বা কখন সঙ্গ গেল সেসব খবর কেউ জানে না।

জিয়ামি এইটুকু খবর শুনেই অনুমান করলাে ছােট জাহাজের যুবকেরাই রেষ্টিচুটাকে অপহরণ করেছে। সে নিজে একটা বড় নৌকো যােগাড় করে সমুদ্রে উপকূল ধরে কেপ মিনার্ভা থেকে আরম্ভ করে ক্যালাব্রিয়া ও স্কালা পর্যন্ত মাঝে মাঝে নৌকো থামিয়ে, খোঁজখবর নিতে থাকল।

এই স্কালায় এসে সে খবর পেল যে তার বর্ণনা অনুযায়ী একটি সুন্দরী তরুণীকে কয়েকজন সিসিলিয় নাবিক প্যালেরমাে নিয়ে গেছে। জিয়ান্নি আর অপেক্ষা না করে তখনি প্যালেরমাের দিকে যা করলাে!

জিয়ান্নি প্যালেরমােয় নেমে রেস্টিচুটার খবর পেল। সিসিলিয় ঐ নাবিকেরা মেয়েটিকে সিসিলির রাজা ফ্রেডরিককে উপহার দিয়েছে। রাজা আপাতত মেয়েটিকে তার লা কিউবার এক প্রাসাদে রেখেছেন।

জিয়ান্নি হতাশ হল। রাজা যদি তার প্রিয়তমাকে বন্দী করে রাখেন তাহলে রক্ষী পরিবৃত প্রাস থেকে সে তার প্রিয়তমাকে কি করে উদ্ধার করবে? জিয়ান্নি হতাশ হলেও হতােদ্যম হল না। নৌকোখন ফেরত পাঠিয়ে দিয়ে সে প্যালেরমােতে থেকে গেল। তাকে কেউ চেনে না, কেউ তার পরিচয় জানে না। সে স্বচ্ছন্দে পথে পথে ঘুরে বেড়ায় বিশেষ করে লা কিউবার প্রাসাদের চারদিকে, যদি একবার চোখের দেখা পায়। সে লক্ষ্য করেছিল রক্ষীর কড়াকড়ি নেই। তােরণদ্বারে একজন মাত্র রক্ষী কখনও দাড়িয়ে থাকে, কখনও বসে ঝিমােয়।

একদিন জিয়ান্নির আশা ফলবতী হল। রেস্টিচুটা একটা ভােলা জানালার ধারে দাঁড়িয়েছিল। সেদিকটা একেবারে কঁকা ছিল, লােকজনের চলাচল ছিল না। জিয়ানি রেস্টিচুটার দৃষ্টি আকর্ষণ করলো। আনন্দে রেস্টিচুটার চোখে জল এসে গেল। সুযােগ দেখে জিয়ান্নি জানালার নিচে এসে দাঁড়াল। জিয়া শুনে পুলকিত হল যে রাজা বা কেউ তাকে এখনও স্পর্শ করে নি, সে এখনও কুমারী আছে। কিন্তু দুজনে তাে আরও কাছাকাছি হয়ে কথা বলা ও পরামর্শ করা দরকার, পালাবার চেষ্টাও করতে হবে। রেস্টিচুটা তাকে কিছু নির্দেশ দিল। রাত্রে কোন সময়ে কোথা দিয়ে এসে সে বাগানের ভেতরে ও তার ঘরে প্রবেশ করতে পারবে সে বিষয়ে কিছু তথ্য জানাল। জিয়ান্নিও ফিরে যাবার আগে বাড়ির চারদিক ভালাে করে দেখে নিল। বাগানের প্রাচীর টপকাবার মতাে সুবিধাজনক একটা জায়গা বেছে রাখল।

জিয়ান্নি আপাতত ফিরে গেল। রাত্রি বেশি এগােবার আগেই সে সেই পাচিলের কাছে ফিরে এল। পাঁচিল ডিঙিয়ে ঝুপ করে বাগানে নামল। কোথায়, একটা লম্বা বাশ পড়ে সে খবর রেস্টিফুটা তাকে আগে দিয়েছিল। বাশটা সেখানে তুলে নিয়ে জিয়ান্নি সেটার সাহায্যে খােলা জানালা দিয়ে রেস্টিচুটার বে ঢুকেই তাকে জড়িয়ে ধরে চুম্বন করতে লাগল। এই প্রথম আলিঙ্গন ও চুম্বন। রেস্টিচুটা আগেই এনালা খুলে রেখে জিয়ান্নির জন্যে অপেক্ষা করছিল।

এরপর ওরা সংক্ষেপে পরস্পরের খবর নিয়ে পালংকে গিয়ে পাশাপাশি শুয়ে পড়ল। তারপর পরস্পরকে দৃঢ় বাহবন্ধনে আবদ্ধ করলাে, হৃদয়-মনের দরজা খুলে গেল। আদি রিপুর বন্ধ দরজা জানালা খুলতেও দেরি হল না। এই প্রথম তাদের রতিমিলন। সে আনন্দ ও উত্তেজনা অপরিসীম। এক সময়ে তারা রতিক্লান্ত হয়ে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়ল। তার আগে তারা কিভাবে এই বন্দীদশা থেকে মুক্ত হতে পারবে তা নিয়ে অনেক পরামর্শ করেছিল। রেস্টিচুটা আশ্বাস দিয়েছিল যে, সে সয়াগের অপেক্ষায় থাকবে এবং তেমন সুযােগ এলেই জিয়ান্নিকে বলবে।

ভাের হবার আগেই জিয়ানি চলে যাবে এমন স্থির ছিল। হয়ত চলেও যেত কিন্তু ঠিক সেই সময়ে সহসা বাজার ঘুম ভেঙে গেল এবং লা কিউবা প্রাসাদে যে তাজা কুসুম-সুন্দরীকে রেখেছেন তার কথা মনে পড়ল। রাজার ঘুম ভালাে হয়েছিল। সুন্দরী-সঙ্গমের স্বপ্ন দেখেছিলেন। সে স্বপ্নসুখ দেহমনে জড়িয়ে রয়েছে এবং একটি নতুন সুন্দরী যুবতীও যখন মজুত রয়েছে তখন তার সদ্ব্যবহার করা যাক। সেই যুবতীও হয়ত তার অপেক্ষা বিনিদ্র রজনী যাপন করছে।

রাজা তখনি শয্যা ত্যাগ করে প্রস্তুত হয়ে পরিচারককে ডাকলেন। তাকে বললেন মশাল জ্বালতে এবং তারপর তাকে নিয়ে লা কিউবা প্রাসাদে এসে উপস্থিত হলেন। কয়েকজন রক্ষী বাড়ির ভেতরে নিদ্রা যাচ্ছিল। তাদের তােলা হল এবং বলা হল নবাগত মহিলার ঘরের দরজা আস্তে আস্তে খুলতে, কোনাে শব্দ যেন না হয়।

দরজা খােলা হল। রাজা নিঃশব্দে ঘরে ঢুকলেন। ঘরের ভেতরে একটি তেলের আলাে জ্বলছিল। রাজা যে দৃশ্য দেখলেন তাতে তার মাথায় আগুন জ্বলে গেল। তিনি দেখলেন সুন্দরী মেয়েটি একটি সুন্দর যুবককে আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে গভীর নিদ্রায় মগ্ন। দু’জনেই সম্পূর্ণ নগ্ন, বেশবাস দূরে নিক্ষিপ্ত।

রাজার কোমরবন্ধনীতে একটি ছােরা ছিল। ভাবলেন এখনি দু’জনের বুকে ছােরা বিদ্ধ করে এদের হত্যা করবে। তারপর ভাবলেন ঘুমন্ত ও নগ্ন যুগলকে হত্যা করা রাজোচিত কাজ হবে না, তার চেয়ে ওদের প্রকাশ্য স্থানে পুড়িয়ে মারলেই হবে।

তিনি ভাবলেন মেয়েটা সুন্দরী আর নিস্পাপ দেখতে হলে হবে কি স্বভাবে স্বৈরিণী। এমন জঘন্য চরিত্রের মেয়েকে নিয়ে রাজা কখনই এক শয্যায় শুতে পারেন না। তিনি যাদের সঙ্গে পরামর্শ করলেন তারাও একমত, হ্যা ও দুটোকে নগ্ন অবস্থাতেই খুঁটিতে বেঁধে আগুন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে মারা হােক। উপযুক্ত শাস্তি হবে। ছোড়ার এত সাহস যে চুরি করে প্রাসাদে ঢুকে রাজার আহারে ভাগ বসায় ?

রাজামশাই কয়েকজনকে জিজ্ঞাসা করলেন তারা কেউ যুবককে চেনে কিনা। না কেউ তাকে দেখেও নি, চেনেও না।

ভাের হয়ে এলাে। রাজামশাইয়ের আদেশে তখনি প্রাসাদের অনতিদূরে প্রকাশ্য স্থানে একটি বেদীর পর যে খুটি পোতা ছিল সেখানে জ্বালানি কাঠ মজবুত দড়ি রেখে ঢােল পিটিয়ে দেওয়া হল যে, একজোড়া ছোড়াছুঁড়িকে ঐ খুঁটিতে বেঁধে পুড়িয়ে মারা হবে। রাজামশাই আদেশ দিলেন দুটোকে তুলে নগ্ন অবস্থাতেই বেদীতে নিয়ে গিয়ে দুজনকে খুটিতে পিঠোপিঠি করে বাঁধবে। ইতিমধ্যে লােকজন জমায়েত হবে, ওদের দেখৰে, বিদ্রুপ করবে তারপর ঠিক দ্বিপ্রহরে আমার আদেশ পেলেই কাঠে আগুন ধরিয়ে দেবে। জনসাধারণের মধ্যে দুশ্চরিত্র ও ব্যাস মানুষরাও শিক্ষা লাভ করতে পারবে। তারপর তিনি নিজের প্রাসাদে ফিরে গেলেন।

রাজামশাই চলে যাবার পরই কয়েকজন লােক জিয়ান্নি ও রেস্টিচুটাকে জাগিয়ে তুলল। ওরা ধান করে উঠে নিজেদের বেশবাস খোজবার আগেই তাদের হাত বেঁধে ফেলা হল এবং সেই অবস্থা? তাদের হাঁটিয়ে সেই বেদীতে নিয়ে গিয়ে খুটির সঙ্গে পিঠোপিঠি করে বেঁধে দেওয়া হল। জ্বালানি কাঠ দেখে ওরা যে শাস্তি পাবে তা অনুমান করে শিহরিত হল। নিজেদের ভাগ্যকে দোষ দিতে লাগল আর ভাবতে লাগল ওদের কি কালঘুম পেয়েছিল। এখন আফশােস করে লাভ নেই। জিয়ান্নি প্রিয়তমাকে বলল, আমরা একসঙ্গেই মরবাে, ওপারে গিয়ে আমরা মিলিত হব।

ইতিমধ্যে অনেক নরনারী জমায়েত হয়েছে। নানাজনে নানা মন্তব্য করছে। রাজার এই শাস্তিদানের কেউ সমালােচনাও করছে। আহা এমন সুন্দর যুবক যুবতীকে পুড়িয়ে না মেরে রাজামশাই ওদের অন্য শাস্তি দিলেও তাে পারতেন। কেউ বলল, শাস্তি তাে ওরা পেয়েই গেছে এবার ছেড়ে দিলেই তো হয়।

এমন সুন্দরী যুবতী ও সুন্দর যুবক বড় একটা দেখা যায় না তায় আবার নগ্ন। পুরুষরা রেন্টিটাকে আর মেয়ের জিয়ান্নিকে চুটিয়ে দেখতে দেখতে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গর বিচার করতে লাগল। আসামী দু’জন মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। এছাড়া আর তাে কোনাে উপায় নেই।

ওদিকে বেলা বাড়ছে, সারা শহরেও গােলমাল বাড়ছে। নানা মানুষের নানা আলােচনা, কত গুজব। রাজকীয় নৌবহরের প্রধান যাকে বলা হয় অ্যাডমিরাল অফ দি ফ্লিট, যার নাম রুজ্জিয়েরি দ্য লােরিয়া তার কানে কথাটা উঠল, একজোড়া যুবক যুবতীকে উলঙ্গ অবস্থায় পুড়িয়ে মারা হচ্ছে। এ তাে বড় সাংঘাতিক কথা, প্রকাশ্যে এমন নির্মম হত্যাকাণ্ড কেন? ওরা কি অপরাধ করেছে? রাজদ্রোহিতা ? একজন বলল, মেয়েটিকে রাজামশাই উপভােগ করবার জন্যে বন্দী করেছিল কিন্তু ছেলেটি, যে মেয়েটির প্রেমিক সে বুঝি লুকিয়ে প্রাসাদে ঢুকে মেয়েটির সঙ্গে রাত্রিযাপন করছিল। অ্যাডমিরাল ভাবলেন, তাই যদি সত্যি হয় তাহলে রাজাও তাে দোষী। নিজের রানী থাকা সত্ত্বেও পরনারীর প্রতি লােভ, এ তাে আদর্শ বাজার উপযুক্ত কাজ নয়। যাই হােক খোজ নিয়ে দেখতে হচ্ছে।

প্যালেরমের চকে যেখানে বেদীতে ওদের খুটির সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছিল অ্যাডমিরাল রুজ্জিয়েরি সেইদিকে চলেন। সেখানে পেঁৗছে, যা শুনেছিলেন, এখন স্বচক্ষে তাই দেখলেন। মেয়েটি অতীব সুন্দরী, ছেলেটিও সুদর্শন। কিন্তু ছেলেটিকে তাে তিনি চেনেন। তুমি প্রােচিদার জিয়ান্নি?

জিয়ান্নি মুখ তুলে অ্যাডমিরালকে দেখে নিজের নগ্নতার জন্যে অত্যন্ত লজ্জাবােধ করলো। তবুও ক্ষমা চেয়ে বলল, হ্যা আমিই সেই হতভাগ্য তবে আর কয়েক ঘন্টার মধ্যেই আমি শেষ হয়ে যাব।

তুমি কি করেছ যে তােমাকে ও মেয়েটিকে পুড়িয়ে মারা হবে? অ্যাডমিরাল জিজ্ঞাসা করলেন।

প্রেম যদি অপরাধ হয় তাে আমি অপরাধ করেছি এবং তার ওপর রাজার ক্রোধাগ্নি। জিয়ান্নি উত্তর দিল।

আর কি হয়েছে সব খুলে বলে। অ্যাডমিরালের প্রশ্নের উত্তরে ‘জিয়ান্নি কিছু না লুকিয়ে সবই বলল। সব শুনে অ্যাডমিরাল চলে আসছিলেন, তিনি এখন রাজার সঙ্গে দেখা করবেন। চেষ্টা ছেলে ও মেয়েটির প্রাণ বাঁচানাে যায় কিনা। সেকথা তিনি জিয়ান্নিকে বললেন না। তাকে চলে যেতে দেখে জিয়ান্নি তাকে বলল, আমার একটা বিশেষ অনুরােধ। যদি সম্ভব হয় আপনি কি মহারাজাকে বলতে পারবেন?

কি অনুরােধ?

আমরা তাে শীঘ্রই মরব এবং একই সঙ্গে মরব কিন্তু আমি যাকে ভালবাসি তার মুখ দেখতে লাচ্ছি না। আমরা পরস্পরের দিকে দৃষ্টি রেখে মরতে চাই। মহারাজ যদি আমাদের ঘুরিয়ে মুখােমুখি যে দেবার আদেশ দেন, এইটুকু অনুরােধ।

অ্যাডমিরাল রুজ্জিয়েরি বললেন, বেশ, মহারাজকে আমি বলবাে।

সেখানে মহারাজার ভারপ্রাপ্ত যে কর্মী ছিল তাকে অ্যাডমিরাল বললেন, দেখ বাপু আমি মহারাজার হয়ে যাচ্ছি। তার কাছ থেকে আদেশ না পাওয়া পর্যন্ত তুমি যেন আগুন লাগিয়ে দিয়াে না।

লােকটি বলল, মহামান্য মহারাজা আমাকে বলে রেখেছেন যে, তার আদেশ পেলে তবে আমি আগুন লাগাব। আপনি চিন্তা করবেন না।

স্থানত্যাগ করবার আগে অ্যাডমিরাল মেয়েটিকে দেখে বড় কষ্ট পেলেন। সম্রান্ত বংশের মেয়ে, কোনাে কষ্ট সহ্য করা অভ্যাস নেই তার ওপর এ কি চূড়ান্ত অপমান? এত লােকের সামনে তাকে পূর্ণ উলঙ্গ করে রাখা হয়েছে। অনেক মানুষ তার দিকে আঙুল দেখিয়ে অশ্লীল মন্তব্যও করছে। মেয়েটি আর দাঁড়াতে পারছে না। নেতিয়ে পড়েছে। হাঁটু মুড়ে যাচ্ছে। তৃষ্ণায় কাতর।

অ্যাডমিরাল রুজ্জিয়েরি যখন মহারাজের কাছে গিয়ে পৌছলেন তখন মহারাজ বধ্যভূমিতে আসবার জন্যে প্রস্তুত হচ্ছিলেন। অসময়ে অ্যাডমিরালকে দেখে রাজা বিস্মিত হলেন। কি খবর, কহিয়োর কোনাে নতুন বিপদ নাকি?

না মহারাজ বিপদ আপনার নয়। বিপদ ঐ যুবতী ও যুবকটির যাদের আপনি প্রকাশ্যে উলঙ্গ করে খুটির সঙ্গে বেঁধে পুড়িয়ে মারবার নির্দেশ দিয়েছেন। আমার প্রশ্ন ওরা আপনার কি ক্ষতি করেছে, ওদের আচরণে আপনি কি পরিমাণ আঘাত পেয়েছেন?

রাজা সংক্ষেপে ঘটনার বিবরণ জানালেন। রাজার ভাষা শুনে অ্যাডমিরাল বললেন, বুঝলুম ওরা অন্যায় করেছে। শাস্তি ওদের প্রাপ্য তেমনি আবার কেউ ভালো কাজ করলে তাদের পুরস্কারও দিতে হয়, অপরাধীকে ক্ষমাও করতে হয়, মুক্তিও দিতে হয়। কিন্তু মহারাজ আপনি কি একবার খোঁজ নিয়েছেন। তাদের পরিচয় জানবার চেষ্টা করছেন ওরা কে?

মহারাজা স্বীকার করলেন তিনি ঐ দু’জন যুবক-যুবতীর বিষয়ে কিছুই জানেন না।।

রুজ্জিয়েরি বলল তাহলে মহারাজ ক্ষমা করবেন, ওদের পরিচয় আমাকেই দিতে হবে এবং কথও আমাকে বলতে হচ্ছে যে, আপনি অত্যন্ত ক্রোধান্বিত হয়ে অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করে যা করতে চলেছেন তা করা উচিত হবে কিনা। যুবকটি হল প্রােচিদা-র ল্যানডােলফোর পুত্র যার সহায়তায় আপনি এই দ্বীপের রাজা হতে পেরেছেন আর মেয়েটি হল মারিন বলগারাের কন্যা যে মারিন ইচ্ছা করলে ইণ্ডিয়া দ্বীপে কালই আপনার প্রভুত্ব ও কর্তৃত্বের অবসান ঘটাতে পারে। এ যুবক ও যুবতী দীর্ঘদিন ধরে পরস্পরকে ভালবেসে আসছে। তার মানে এই নয় যে, আপনাকে অপমান করেছে। ভালবাসা কি পাপ? অবশ্য পাপ যদি তা অবৈধ হয় কিন্তু এতে ভালবাসা পাপ নয়, যুবক-যুবতীর স্বাভাবিক ধর্ম! অতএব আপনি ওদের স্বাগত না জানিয়ে এক উপঢৌকন না দিয়ে কোন যুক্তিতে ঐ সম্রান্ত বংশের দুই সন্তানকে সর্বজনসমক্ষে উলঙ্গ করে চূড়ান্ত অপমান করে পুড়িয়ে মারবার আদেশ দিয়েছেন?

রুজ্জিয়েরির কথা শুনে রাজার জ্ঞানচক্ষু উন্মীলিত হল। তিনি ভয় পেয়ে গেলেন এবং অনুতাপ করতে লাগলেন। তিনি তৎক্ষণাৎ আদেশ দিলেন ঐ দু’জন যুবক-যুবতীকে বন্ধনমুক্ত কর এখনি তাঁর সামনে আনা হােক।

রাজাদেশ সঙ্গে সঙ্গে পালিত হল। তাদের দু’জনকে রাজার সামনে আনা হল; রাজা নতুন করে তাদের পরিচয় জিজ্ঞাসা করলেন। সব শুনে রাজা তাদের বললেন তার আতিথ্য গ্রহন করতে। তারা এখন মুক্ত। তাদের জন্য নতুন পােশাক আনা হল। তাদের যথােপযুক্ত পরিচর্যার পর তারা সুস্থ হলে তাদের উভয়ের সম্মতি নিয়ে রাজা তাদের বিবাহের আয়ােজন করলেন। বিবাহের পর রাজা তাদের প্রত্ন উপহার দিয়ে এবং তাদের সন্তুষ্ট করে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দিলেন। দেশে ফেরার পর সকলে তাদের সাদর অভ্যর্থনা জানাল।

সপ্তম গল্প

প্রভু আমেরিগাের কন্যা ভায়ােলান্তির প্রেমে পড়ল নিয়ােডােরাে। তার দ্বারা মেয়েটি গর্ভ হল। ফলে টিয়ােডােরের ফাঁসির আদেশ হল। তাকে যখন চাবুকপেটা করতে করতে ফাসিমঞ্চে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তখন তার পিতা তাকে চিনতে পেরে মুক্ত করলেন। এরপর টিয়ােডােরাে ও ভায়ােলান্তির বিবাহ হল।

গল্পের শ্রোতারা দারুণ উৎকণ্ঠিত হয়ে শুনছিল জিয়ান্নি ও রেস্টিচুটা কি সত্যই পুড়ে মরবে? কিন্তু তারা মুক্ত হল, প্রেমের মর্যাদা সুপ্রতিষ্ঠিত হল। তখন সকলে আনন্দে করতালি দিল ও দাবান ঈশ্বরকে অসংখ্যবার ধন্যবাদ জানাল। গল্প শেষ হলে কুইন লরেতাকে গল্প বলতে বলল।

তাে কোনাে ভূমিকা না করে তার গল্প আরম্ভ করলাে :

বান্ধবীর দল তােমরা তা হলে শােনাে, আমাদের দক্ষিণে সিসিলি দ্বীপে ট্রাপানি নামে যে জায়গাটি আছে, সেখানে আমেরিগাে অ্যাবেট নামে একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি বাস করতেন। বলা বাল্য তিনি রীতিমতাে একজন সম্পদশালী ও ধনাঢ্য ব্যক্তি ছিলেন আর সেইসঙ্গে ছিল তার একপাল সন্তান-সন্ততি।

আর সেইজন্যে তার অনেক পরিচারক, সেবক ও ভূত্যের প্রয়ােজন হতাে। তাই যখনি জেনােয়ার জলদস্যুদের জাহাজ আরমেনিয়া থেকে একপাল মানুষ এমনকি বালক ধরে আনতাে, তখন আমেরিগাে অ্যাবেট জাহাজ থেকে পছন্দমতাে মানুষ ও বালক কিনে নিত। ঐ জলদস্যুরা নত আসত উত্তর আরবের লেভান্ত থেকে, তাই আমেরিগাে মনে করতেন ঐসব ক্রীতদাস তুর্কি।

ঐসব ক্রীতদাসকে সাধারণত চাষী বা শ্রমিক সম্প্রদায় থেকে ধরে আনা হতাে কিন্তু একবার এদের মধ্যে একটি ভিন্ন ধরনের বালক পাওয়া গেল। মনে হল বালকটি কোনাে সম্ভ্রান্ত বংশের সন্তান। নাম টিয়াডােরাে। টিয়ােডােরােকে বালক ভূত্যের দলে ভর্তি করে নেওয়া হল কিন্তু তার ওপর ভার দেওয়া হল পরিবারের কয়েকজন বালক বালিকার তদারক করার। অন্যান্য ভৃত্য অপেক্ষা তার পরিবেশ অনেক উত্তম। আহার ও পােশাক ভালাে জুটত, কিছু পড়াশােনার সুযােগও পেত। বলতে গেলে তার চেহারা ও আচরণ দেখে অনেকে তাকে অ্যাবেট পরিবারের একজন বলেই মনে করতাে। তার এই সদ্ব্যবহার লক্ষ্য করে আমেরিগাে তার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল এবং তাকে স্বাধীনতা দিয়েছিল। ক্রীতদাসত্ব থেকে টিয়ােডােরা মুক্তি পেয়েছিল।

আমেরিগাে ধরে নিয়েছিলেন ছেলেটি তুর্কি। তার নাম বদলে রাখা হল পিয়েত্রো। পিয়েত্রো আমেরিগাের প্রিয়পাত্র। সে যখন যৌবনে উপনীত হল তখন সে কর্তার এতদূর বিশ্বাসভাজন হয়েছে যে, কর্তা তাকে তার ব্যবসার কয়েকটি বিভাগ দেখাশােনা করার ভার দিয়েছিল। পিয়েত্রো নে কাজ দক্ষতার সঙ্গে সম্পাদন করতাে।

পিয়েত্রোর সঙ্গে সঙ্গে আমেরিগাের একটি কন্যাও যৌবনপ্রাপ্ত হয়েছিল। তার নাম ভায়ােলান্তি, ন্তে কোনাে পুষ্পিত লতার মতাে ছিমছাম নয়নস্নিগ্ধ যুবতী। তার বাবা তখনও পর্যন্ত মেয়েটির বিবাহের চেষ্টা করেন নি। প্রচলিত কথা আছে ঘি ও আগুন পাশাপাশি থাকে না। পিয়েত্রো যদি, দি হয় তবে ভায়ােলান্তি আগুন। তারা পরস্পরের প্রেমে পড়ল।।

দু’জনে পরস্পরের প্রেমে পড়লেও তারা নিজেদের প্রেম প্রকাশ করেনি। তারা দু’জনেই লাজুক ছিল কিংবা পিয়েত্রো ভৃত্য বলে তার প্রেম নিবেদন করতে বােধহয় সাহস করতাে না। আর ডায়ােলান্তি তাে মেয়ে, সে তার নারীসুলভ লজ্জার জন্যে প্রেম প্রকাশ করতে পারত না। কিন্তু ওরা পরস্পরকে নীরবে ভালবাসত। তারা ভাবত মিলিত হবার জন্যে আর কতদিন ধৈর্য বার থাকতে হবে। একজন অপরজনের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে তার অন্তর থেকে শুধু নেনমিশ্রিত একটি নিশ্বাস বেরিয়ে আসতাে। আপাতত আর কিছু করার ছিল না।

আমেরিগাের নিজেস্ব বাড়ি যেখানে সেই ট্রাপানি থেকে কিছু দূরে, এই মাইলখানেক আর কি আমেরিগাের একটা সম্পত্তি ছিল। আমেরিগাে পত্নী কন্যা ও দাসদাসী নিয়ে মাঝে মাঝে সেখানে কিছুকাল কাটিয়ে আসতাে। জায়গাটি অবসর বিনােদনের পক্ষে চমৎকার ছিল। তাদের বাগান ঘিরে ছিল আকর্ষণীয় এক অরণ্য। ইচ্ছামতাে এখানে ওখানে ঘুরে বেড়াও, বাগানে প্রজাপতি ধরে, ইচ্ছামতাে খাও দাও, গান করাে।

গ্রীষ্ম ঋতুতে একদিন আমেরিগাে গৃহিনী কয়েকটা দিন কাটাবার জন্যে সেখানে গেছে। ভায়ােলাঠি ও পিয়েত্রোকেও এবার সঙ্গে নিয়েছে। বাড়ি থেকে একদিন সকলে অরণ্যপথে বেড়াতে চলল। দলে পিয়েত্রো ও ডায়ােলান্তিও ছিল। সহসা আকাশে মেঘ জমলাে। ঝড় ওঠবার আশং গৃহিনী দাসদাসী নিয়ে বাড়ির পথ ধরলাে। পিয়েত্রো ও ভায়ােলান্তি ইচ্ছে করেই পেছিয়ে পড়ল।

কয়েক মিনিটের মধ্যে ঝড় ও শিলাবৃষ্টি আরম্ভ হল। ওরা দু’জনে জড়াজড়ি করে একটা বড় গাছের নিচে আশ্রয় নিল। এই তাদের প্রথম আলিঙ্গন। পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে ওরা উত্তেজ থরথর করে কাপতে লাগল।

শিলাবৃষ্টি ও ঝড়ের বেগ কিছু কমে এলেও বৃষ্টি বাড়তে লাগল। এখানে আর বেশিক্ষণ : যাবে না। এবার গাছের পাতা বেয়ে জল পড়বে তখন সারা দেহ ভিজে যাবে। পিয়ে কাজেকর্মে এদিকে এসেছিল, পথ ও পরিবেশ তার কিছু জানা ছিল। তার মনে পড়ল কাছেই কয়েকটা পরিত্যক্ত কাঠের কুটির আছে। সে ভায়ােলান্তির হাত ধরে ছুটতে ছুটতে এমনই একটা কুটিরে এসে পৌছল।।

ভেতরে ঢুকে ওরা বিদ্যুতের আলােয় ঘরখানা মােটামুটি দেখে নিল। ঘরের একধারে সরু একটা তক্তাপােষ পড়ে আছে। ওদের পােশাকের ওপরটা ভিজে গিয়েছিল। ওপরের জামা ও ছেড়ে রাখল। তারপর দুজনে তাপােষের তক্তাপােষে পাশাপাশি বসে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে চুম্বন করলাে। এই তাদের প্রথম চুম্বন কিন্তু ওরা যেভাবে চুম্বন করতে লাগল তাতে মনে হতে পারে যে এই বুঝি তাদের শেষ চুম্বন। চুম্বনের স্বাদ তারা এই প্রথম পেল অতএব সেই গভীর স্পর্শ তাে দীর্ঘস্থায়ী হবেই। চুম্বন করতে করতেই তারা একসময়ে নিজেদের অজান্তেই শুয়ে পড়ল। দু’জনেরই এক চিন্তা, এই বৃষ্টি যেন না থামে।

চুম্বন ও স্পর্শই যথেষ্ট হল না। ওরা পরস্পরকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করতে করতে দুজনে যুক্ত হল। দু’জনের হৃদয়েও তখন প্রবল ঝড়। সব ভুলে তারা উদ্দাম।

এক সময়ে ঝড় থামল। ভায়ােলান্তি কম কথা বলে কিন্স আজ সে প্রগলভা হয়ে উঠল। কলকল করে সে কত কথাই বলে চলল। যেন ঝরনার জল পাথরের ওপর লাফিয়ে পড়ছে। সে বলল, এত আনন্দ! পিয়েত্রোও বলল, আমিও কি জানি এত আনন্দ পাবাে আমরা, অথচ দেয় আমরা এর ক্রিয়াকৌশল কিছুই জানতুম না, সব যেন আপনাআপনি হয়ে গেল।

বৃষ্টি থেমে গেল। আকাশ পরিষ্কার হল। কিছু আলাে দেখা দিল। পােশাক পরে কিছু গুছিয়ে নিয়ে ওরা কুটির থেকে বেরিয়ে বাড়ি ফেরার পথ ধরলাে। ওরা পরামর্শ করলে আজই যেন ওদের শেষ মিলন না হয়। আবার ওরা কোথায় কখন মিলিত হবে তা ঠিক করে রাখল এক তাদের গােপন অভিসার চলতে থাকল।

কিন্তু কিছুদিন পরেই যা অবশ্যম্ভাবী তাই ঘটল। মেয়েটি একদিন বুঝল তার পেটে সন্তান আসছে। গােপনে প্রচলিত কিছু বনৌষধি পান করলাে কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না। দু’জনেই শংকিত, এখন উপায়? আজ না হয় কাল তাে সবই জানাজানি হয়ে যাবে। পিয়েত্রো বলল, আমি পালিয়ে যাই। ভায়ােলান্তি বলল, সে কি? তুমি পালিয়ে গেলে আমি আত্মহত্যা করবাে।

পিয়েত্রো বলল, দেখ ভায়ােলান্তি তােমার অবস্থা প্রকাশ পেলে আমি ধরা পড়ে যাব এবং আমাকে তােমার বাবা নিশ্চই কঠোর শাস্তি দেবেন কিন্তু তুমি তার কন্যা, তােমার বাবা তােমাকে ক্ষমা করবেন।

ভায়ােলান্তি বলল, কিন্তু পিয়েত্রো তুমি যদি এখানে থাক তাহলে আমি কখনই তােমার নাম প্রকাশ করব না অবশ্য তুমি যদি প্রকাশ করাে সে আলাদা কথা।

পিয়েত্রো তখন বলল, তুমি যখন এমন প্রতিজ্ঞা করলে তখন আমাকে থাকতেই হবে তবে তুমি সাবধানে থেক।

যতদিন সম্ভব ভায়ােলান্তি তার গর্ভাবস্থা গােপন রাখবার জন্যে যথাসাধ্য চেষ্টা করলাে কিন্তু যখন বুঝল গােপন রাখা অসম্ভব তখন সে তার মায়ের কাছে তাদের সেই গ্রামের বাড়িতে চলে গেল। মায়ের কাছে কাদতে কাদতে সে তার অপরাধ স্বীকার করে বিপদ থেকে উদ্ধার করাবার জন্য কাতরভাবে অনুনয়-বিনয় করতে লাগল।

মেয়ের অবস্থা দেখে ও সব শুনে মা তাে স্তম্ভিত। তার মেয়ে এমন কাজ করতে পারে তা তাে তিনি ভাবতেই পারেন নি। তাকে তাে যতদূর সম্ভব ভৎসনা করলেন তবুও হাজার হােক মেয়ে এবং পারিবারিক সম্মান তাে বাঁচাতে হবে তাই তিনি যথােচিত ব্যবস্থা গ্রহণ করলেন। সর্বপ্রথম প্রয়ােজন ভায়ােলান্তির বাবার কাছ থেকে ব্যাপারটা গােপন রাখা। তার কানে কথা উঠলেই বাবা মেয়েকে হত্যা করতেও পিছপা হবে না।

অন্য একটা গ্রামে তাদের আর একটা বাড়ি ছিল। মা মেয়েকে সেই বাড়িতে পাঠিয়ে দিল। গ্রামের এই বাড়িতে আমেরিগাে কুচিৎ আসে, আসে না বললেই চলে। তাই মা ভাবলেন এই বাড়িটাই নিরাপদ স্থান। তাছাড়া আমেরিগাে ব্যবসার জন্যে তখন অন্যত্র ছিল।

কিন্তু ঘটনা এমনই ঘটল যে আমেরিগাে সহসা ফিরে এলাে এবং শহরে নিজের বাড়িতে ফেরবার পথে ঐ গ্রামের পাশ দিয়ে যাবার সময় ঠিক করলেন বাড়িখানা একবার দেখা যাবে এবং এমনই সময় সে বাড়িতে ঢুকল যখন ভায়ােলান্তির প্রসব বেদনা উঠেছে। | মা তাে প্রমাদ গুনলেন। আমেরিগাে টের পেল যে, তারই আদরের মেয়ে শিশু প্রসব করতে চলেছে। সে ক্ষিপ্ত হয়ে স্ত্রীর কাছে জানতে চাইল এমন ব্যাপার কি করে ঘটল। স্বামীর আগমন টের পেয়েই মা তাে অত্যন্ত ভয় পেয়েছিল। এখন তাে অস্বীকার করার কোনাে উপায় নেই। মা বাধ্য হয়েই স্বীকার করলাে স্বামী যা অনুমান করেছে তা ঠিক তবে মেয়ের এই অবস্থার জন্য কে দায়ী তা সে জানে না, মেয়ে তার নাম কিছুতেই বলে নি।

আমেরিগাে তখন স্ত্রীকে বলল, এজন্য যে দায়ী মেয়েকে তার নাম বলতে বলল তাহলে আমি তাকে ক্ষমা করব নচেৎ সে যেন চরম শাস্তির জন্যে প্রস্তুত থাকে। নাম না বললে কোনাে দয়ানয়, তাকে মরতে হবে।

মেয়ে মাকে যে কাহিনী বলেছিল মা স্বামীকে সেই কাহিনী বলল কিন্তু আমেরিগাে সে কাহিনী বিশ্বাস করবার পাত্র নয়। ইতিমধ্যে ভায়ােলান্তি একটি শিশু প্রসব করেছে এবং তার বাবা যে সহসা এই বাড়িতে এসে পড়েছে তাও সে টের পেয়েছে। আপাতত মা হওয়ার আনন্দ তাকে। স্থগিত রাখতে হয়েছে কারণ তার বাবা যে কি করতে পারে, কতদূর কঠোর হতে পারে তা সে জানে।

আমেরিগাে খােলা তলােয়ার হাতে মেয়ের ঘরে ঢুকে বলল, হয় তুই অপরাধীর নাম স্বীকার কর, নয় মর।

সন্তানের মুখ চেয়ে ভায়ােলান্তি তার প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করতে বাধ্য হল। সে পিয়েত্রোর নাম বলল। অবশ্য নাম বলতে তার বুক ভেঙে যাচ্ছিল। ভায়ােলান্তি সবই স্বীকার করলাে।

পিয়েত্রো? সেই ক্রীতদাসটা? যার সদ্ব্যবহার ও আচরণে আকৃষ্ট হয়ে যাকে দাসজীবন থেকে অব্যাহতি দিয়ে দায়িত্বপূর্ণ কাজ দেওয়া হয়েছিল, যাকে সে বিশ্বাস করতাে সে বেইমানী করে এই চরম অপরাধ করেছে? | আপাতত কন্যাকে হত্যা করা থেকে নিবৃত্ত হয়ে আমেরিগাে ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে ছুটে গিয়ে ঘােড়ায় আবার চেপে ট্রাপানির দিকে ছুটল। প্রথমে নিজের বাড়িতে না গিয়ে শহরের প্রধান ন্যায়াধীশ কুরাডাের বাড়ি গিয়ে পিয়েত্রোর নামে নালিশ করলাে। পিয়েত্রো তার মেয়ের ও তার অপূরণীয় ক্ষতি করেছে। তার মান-সম্মান ধুলােয় লুটিয়ে দিয়েছে।

এতসব যে ঘটনা ঘটে গেল পিয়েত্রো কিন্তু তখনও তার বিন্দু বিসর্গও টের পায়নি। আরক্ষা বাহিনীর লোেক এসে সহসা তাকে গ্রেফতার করে কারাগারে নিয়ে গেল। সেখানে তার প্রতি কঠোর নির্যাতন করা হল। পিয়েত্রো সবই স্বীকার করলাে।

কয়েকদিন পরে ন্যায়াধীশ তার রায় দিলেন। পিয়েত্রোকে চাবুক মারতে মারতে বধ্যভূমিতে নিয়ে গিয়ে ফাঁসিকাঠে ঝুলিয়ে দেওয়া হবে অর্থাৎ তার মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হল।

আমেরিগােও তার কন্যাকে মৃত্যুদণ্ড দিল। সে ঠিক করলাে যে সময়ে পিয়েত্রো ফাঁসিকাঠে ঝুলবে ঠিক সেই সময়ে তার মেয়ে ও তার অবৈধ সন্তানও মরবে। তাদের হত্যা করা হবে। আমেরিগাে তখনও ক্রোধে যুঁসছে।

কন্যাকে হত্যা করার পরিকল্পনা স্থির করে আমেরিগাে তার এক বিশ্বাসী ঘাতককে ভায়ােলান্তির কাছে পাঠাল। তার সঙ্গে ছিল তীব্র বিষ মেশানাে এক বােতল সুরা আর খাপ খােলা ধারালাে একখানা বড় ছােরা। এত বড় যে বুকে সজোরে বিধিয়ে দিলে পিঠ দিয়ে বেরিয়ে যাবে।

আমেরিগাে ঘাতককে নির্দেশ দিল, তুমি ভায়ােলান্তির কাছে এই দুটো নিয়ে যাও, তাকে আমার নাম নিয়ে বলবে দুটোর মধ্যে একটি তাকে বেছে নিতে হবে। হয় বিষ নয় ছােরা। তাকে মরতেই হবে। সে সময়ে পিয়েত্রোর ফাসি হবে ঠিক সেই সময়ে ঘাতক যেন ভায়ােলান্তির সামনে হাজির হয়। আমেরিগাে তাকে সেইভাবে রওনা হবার নির্দেশ দিল। আমেরিগাে আরও বলল, ভায়োেলান্তি যদি এইভাবে মরতে রাজি না হয় তাহলে তাকে বােলাে যে, শহরের সব নরনারী এক জায়গায় জড়াে করে তাকে ও তার বেজন্মা বাচ্চাটাকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা হবে। আর বিষ বা ছোরা যেটা হােক বেছে নিয়ে ও যদি মরে তাহলে তারপর বাচ্চাটাকে নিয়ে গিয়ে দেওয়ালে আহড়ে তার মাথা ভেঙে চুরমার করে দেবে। লাশটা রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলে দেবে, কুকুর কচি মাংস খেতে খুব ভালবাসে।

লােকটা পেশায় ঘাতক, শয়তান বললেও বাড়িয়ে বলা হয় না। আদেশ পেয়ে মালপত্তর নিয়ে সে রওনা হল। সে জানে কাজ হাসিল করে ফিরে এলে ইনাম মিলবে। | যে তারিখে পিয়েত্রোর ফঁসির দিন ধার্য হয়েছে সেদিন যথাসময়ে একদল সৈন্য তার জামা খুলে পিঠে চাবুক মারতে মারতে রাস্তা দিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে চলল। ছেলের পাল মজা পেয়ে তার অনুসরণ রতে লাগল আর রাস্তার পাশের মানুষ হতভাগ্যের প্রতি বিদ্রুপ বাণ বর্ষণ করতে লাগল।

ফাসিমঞ্চে যেতে হলে একটা সরাইখানার পাশ দিয়ে যেতে হয়। সেই সরাইখানায় তখন হরমেনিয়া থেকে আগত তিনজন গণ্যমান্য ব্যক্তি বাস করছিল। এরা হল আরমেনিয়ার রাজার দূত। মহামান্য পােপের সঙ্গে দেখা করবার জন্যে তারা রােম যাবে। আসন্ন ক্রুসেড ধর্মযুদ্ধ নিয়ে পােপের সঙ্গে আলােচনা করা প্রয়ােজন।

পথের ক্লান্তি দূর করবার জন্যে রাষ্ট্রদূতবা ঐ সবাই খানায় কয়েকদিন বিশ্রাম নিচ্ছিল। এই সুযােগ টাম্পানির সনামধন্য শহববাহসীরা বিশেষ করে আমেরিগাে ওদের আপ্যায়িত করছিল।

রাস্তায় (গোলমাল শুনে ঐ তিনজন রাষ্ট্রদূত কৌতুহলবশত খােলা জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দেখতে লাগলেন এত গোলমাল কেন?

ঐ তিনজনের মধ্যে যে বয়স্ক ব্যক্তিটি বিশিষ্টতম, তার নাম ফিনিয়াস। পিয়েত্রোর হাত পিছতে করে বাঁক, টাঙ্গ উন্মুক্ত। পিয়েত্রোর দিকে সহসা ফিনিয়াসের দৃষ্টি আকৃষ্ট হল। দৃষ্টি আকৃষ্ট হওয়াব কাল পিয়েত্রোর বুকে রক্তাভ একটি ল যা তার জন্ম থেকেই তার বুকে চিহ্নিত। সঙ্গে মত ফিনিয়াসের মনে গজ তার একটি নির্দিষ্ট পুত্রের কথা যার বুকে ঠিক ঐ রকম একটি চিহ্ন ছিল। সেই ছেলেকে পনেরাে বছর আগে ল্যাজাজো থেকে জলদস্যুরা অপহরণ করেছিল। তারপর থেকে তার কোনাে খোজ পাওয়া যায় নি।

ফিনিয়াস মনে মনে হিসেবে করে দেখল ঐ হতভাগ্যের বর্তমান যে বয়স হতে পারে তার পুত্র বয়স ঐরূপই হবে। এই হতভাগ্য তার সেই হারানাে ছেলে হতে পারে। তাই যদি হয় তাহলে ঐ যুবক নিন তার ও তার পিতার নাম রেখেছে এবং কিছু আরমেনিয় শব্দও মনে থাকা সম্ভব।

প্রহরীরা পিয়েত্রোকে নিয়ে যখন প্রায় জানালার সামনে এসেছে তখন ফিনিয়াস বেশ জোরে টিয়েডােরে বলে ডাকলাে। | পিয়েত্রো মুখ তুলে চাইল। ফিনিয়াস তখন আরমেনিয় ভাষায় তাকে জিজ্ঞাসা করলাে, তােমার দেশ কোথায় ? তােমার বাবার নাম কি?

পিয়েত্রো উত্তর দিল, আমার দেশ আরমেনিয়া, বাবার নাম ফিনিয়াস, এখানে আমায় বাল্যান্য থেকে একজন পালন করছিল।

ফিনিয়াস নিশ্চিত হল এই তার হারানাে ছেলে টিয়ােডােরা। ফিনিয়াসের চোখে জল এসে গেল। অপর দুজন সঙ্গীকে নিয়ে ফিনিয়াস সরাইখানা থেকে বেরিয়ে এসে প্রহরীদের বেড়া ভেদ কতে পিয়েত্রোকে জড়িয়ে ধরলাে। তারপর নিজের গা থেকে সিলকের ক্লোক খুলে ছেলের গায়ে জড়িয়ে দিলেন। তারপর প্রহরীদের নেতাকে অনুরােধ করলাে সে পরবর্তী আদেশ না পাওয়া পর্যন্ত যেন ফাসি হচ্ছি রাখে। নেতা ফাসি স্থগিত রাখতে রাজি হল।

যুবককে কে ফাঁসি দেওয়া হবে ফিনিয়াস তা ইতিমধ্যে জেনে গিয়েছিলেন কারণ এই ঘটনা সহ শহরে রাষ্ট্র হয়ে গিয়েছিলাে। ফিনিয়াস তাই সরাইখানা থেকে বেরিয়ে সরাসরি ন্যায়াধীশের বাড়ি যেয়ে এবং তাকে বলল, মহাশয় আপনি যে যুবকটিকে আজ ফাঁসিমঞ্চে পাঠাচ্ছেন সে আমার পূত্র। তাই অপরাধ সে এক কিশােরীর কুমারীত্ব হরণ করেছে কিন্তু যুবক অর্থাৎ পুত্র ঐ কিশােরীকে বিবাহ করবে অবশ্য কিশােরীর সম্মতির দরকার। আমার প্রস্তাব যে পর্যন্ত না কিশােরী যুবককে বিবাহ করতে সম্মত হয় সে পর্যন্ত আপনি ফাসি স্থগিত রাখুন। আপনি যদি আমার প্রস্তাবে সম্মত না হন তাহলে এই কাজ বেআইনী হবে।

ন্যায়াধীশ যখন জানতে পারলেন যে, উক্ত হতভাগ্য যুবক রাষ্ট্রদূত ফিনিয়াসের পুত্র এখন ডিজি বিস্ময় প্রকাশ করলেন এবং ক্ষমা চেয়ে ফিনিয়াসের প্রস্তাবে সম্মত হলেন। ফিনিয়াসকে ডিম সরাইখানায় ফেরত পাঠিয়ে দিয়ে আমেরিগােকে ডেকে পাঠালেন। আমেরিগাে আসবার পর যা ঘটেছে তিনি তাকে সব বললেন।

অকস্মাৎ এই সংবাদ শুনে আমেরিগাে ভীষণ অনুতপ্ত হল কারণ তার ধারণা হল এতক্ষণ সে যে ঘাতককে পাঠিয়েছে সে নিশ্চই তার কন্যা ও নাতিকে হত্যা করেছে। জীবিত থাকলে একটা সুষ্ঠু মীমাংসা হতে পারত কিন্তু মনে হচ্ছে সবই হাতের বাইরে চলে গেছে। হায়! হায়! সে এ কি করলাে? একেবারে হত্যার আদেশ দিয়ে বসলাে এবং ঘাতকও পাঠিয়ে দিল।

যাই হােক তবুও একবার শেষ চেষ্টা করে দেখা যাক। আমেরিগাে তখনি ক্ষিপ্রগতিসম্পন্ন এক অশ্বারােহী পাঠাল যে গ্রামে তার মেয়ে আছে। অশ্বাররােহী পৌছে দেখল তার মনিবপ্রেরিত ঘাতক ভায়ােলস্তির সামনে বিষাক্ত সুরার বােতল ও শানিত ছােরা রেখে বলছে, অনেক দেরি হয়ে গেছে, আর দেরি নয়, একটা বেছে নাও।

অশ্বারােহী দূত আর একটু বিলম্ব করলে সর্বনাশ হয়ে যেতে পারতাে। অশ্বারােহী দূত মারফত আদেশ শুনে ঘাতক তখনি প্রেরিত দূতের সঙ্গে প্রভুর কাছে ফিরে এসে তার প্রতিবেদন পেশ করলাে।

ফিনিয়াস যে সরাইখানায় বাসা নিয়েছিল আমেরিগাে তৎক্ষণাৎ সেই সরাইখানায় হাজির হয়ে অরুদ্ধ কণ্ঠে ক্ষমা ভিক্ষা করলাে। তারপর বলল, টিয়ােডাের রাজি হলে নিজ কন্যাকে তার হাতে তুলে দিতে তার আর আপত্তি নেই। এ কাজ সে আগেই করতে পারতাে যদি টিয়ােডােয়রীর আসল পরিচয়। তার জানা থাকত।

ফিনিয়াস বলল, তার পুত্র অবশ্যই এই বিবাহে তার সম্মতি দেবে নচেৎ তার প্রতি যে দণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে তা পালিত হলে তার আপত্তি নেই। আমেরিগােকে তার কৃতকর্মের জন্য সে ক্ষমা করলাে।

তখন ফিনিয়াস ও আমেরিগাে কারাগারে গিয়ে পিয়েত্রোকে জিজ্ঞাসা করল সে ভায়ােলিস্তিকে বিবাহ করতে রাজি আছে কিনা।

ফাসির আসামী এমন প্রস্তাব আশা করেনি যদিও ভায়ােলস্তকে দেখা পর্যন্ত তাকে মনে মনে তার পত্নীরূপে কল্পনা করে আসছে, এখন তাে প্রস্তাব শুনে সে প্রথমে পুতবাক তারপর সে সানন্দে তার সম্মতি জানাল। এখন তাে ভায়ােলান্তির সঙ্গে তার বিবাহ হবে শুনে তার মনে হল সে বুঝি নরক থেকে স্বর্গে প্রেরিত হল।

ভায়ােলান্তির কাছেও প্রস্তাব পাঠান হল সে পিয়েত্রোকে বিবাহ করতে রাজি আছে কিনা। ভায়ােলান্তির তাে প্রথমে বিশ্বাস করেনি। তারপর সমস্ত ঘটনা শুনে সে বলল, এর চেয়ে আনন্দের আর ছুি হতে পারে না। সে অনেক আগেই পিয়েত্রোকে মনে মনে পতিত্বে বরণ করেছে।

অচিরে এই শুভসংবাদ প্রচারিত হল। শহরবাসীরা সকলেই আনন্দিত। ফিনিয়াস ইতিমধ্যে রােমে রওনা হয়েছে। ফিরে আসতে আসতে প্রসূতি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়েছে। ফিনিয়াস ট্রাপানিতে ফেরার পর তালােন্তিকে তার কাছে উপস্থিত করা হল। এমন সুন্দরী এক কিশােরী তার পুত্রবধূ হবে অনুভব করে। নিয়াস অত্যন্ত প্রীত হল।

বিবাহে যাতে আড়ম্বর ও জাকজমকের কোনাে ত্রুটি না থাকে এজন্যে উভয়পক্ষই সচেষ্ট হল এবং যথাসময়ে আনন্দের প্লাবনে বিবাহ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হল। ফিনিয়াস পুত্র, পুত্রবধূ ও নাতিকে নিয়ে জাহাজে চেপে স্বদেশে ফিরে গেল। এখন আর পিয়েত্রো নয়, টিয়ােডাের ও ভায়ােলান্তি তাদের সন্তানকে নিয়ে দিন কাটাতে লাগল।

অষ্টম গল্প

ন্যাস্টাজিও ডেগলি ওনেস্টি ট্রাভারসারি পরিবারের একটি মেয়ের প্রেমে পড়েছিল। এজন্যে সে জলের মতাে অর্থ ব্যয় করতাে। তার বন্ধুরা তাকে সতর্ক করে দিয়ে শহর ছেড়ে চলে যেতে বলল। তাই ন্যাস্টাজিও ক্লাসে নামে একটা জায়গায় চলে গেল। সেখানে সে একদিন দেখল একজন অশ্বারােহী নাইট একটি উলঙ্গ যুবতীকে তাড়া করে এনে তারই সামনে হত্যা করে একপাল কুকুরকে তার লাশ ভক্ষণ করতে দিল। পরে ন্যাস্টাজিও এক ভােজসভার আয়ােজন করলাে যেখানে ঐ নাইট সেই একই যুবতীকে সকলের সামনে হত্যা করে যুবতীর লাশ কুকুরের সামনে নিক্ষেপ করলাে। ভােজসভায় তার প্রেমিকাও ছিল। প্রেমিকা ভয় পেল, তারও কপালে এমন ঘটতে পারে। সে এবার ন্যাস্টাজিওকে বিয়ে করতে রাজি হল।

লরেতা তার গল্প শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে ফিলােমেনাকে কুইন গল্প বলতে বলল। ফিলােমেনা যেন তৈরি হয়েই ছিল। সে বলতে আরম্ভ করলাে :

ফিলােমেনা বলল, আমরা নারীরা স্বভাবতই কোমলহৃদয়া কিন্তু সময়ে সময়ে আমরা অত্যন্ত নিষ্ঠুর হয়ে পড়ি অথচ নিষ্ঠুরতার যে কোনাে সুফল পাওয়া যায় না তারই উদাহরণস্বরূপ আমি তােমাদের এই গল্পটা শােনাচ্ছি। গল্পটার মাঝে করুণরস আছে তাহলেও উপভােগ্য এবং সমাপ্তি তােমাদের আনন্দ দেবে।

সুপ্রাচীন রােমাননা রাজ্যের মধ্যে র্যাভেনা একটি সুন্দর শহর। এই শহরে অনেক ধনাঢ্য ও সম্পদশালী ব্যক্তি বাস করতাে যাদের মধ্যে এক যুবকের নাম করতে হয়। যুবকের নাম ছিল ন্যাস্টাজিও ডেগলি ওনেস্টি। পিতার মৃত্যুর পর প্রভূত সম্পদ ও অর্থ তার হাতে এসে পড়ে। যুবক তখনও অবিবাহিত ছিল। অবিবাহিত ধনী যুবকের প্রেমে পড়তে বিলম্ব হল না। পাওলা ট্রাভারসারি নামে অভিজাত বংশীয় এক ব্যক্তির কন্যা তার প্রণয়িনী। যেহেতু যুবক অপেক্ষা তার বংশমর্যাদা আরও উচ্চে তাই বুঝি যুবতী যুবককে পাত্তা দিত না। কিন্তু যুবক এজন্যে হতােদ্যম হয়নি। তার বিশ্বাস ছিল সে যুবতীকে জয় করবেই। এজন্যে সে চেষ্টার ত্রুটি করতাে না। প্রচুর ব্যয় করতাে, যুবতীর মনােযােগ আকর্ষণের জন্যে সে অনেক কিছুই করতাে কিন্তু যুবতী তার রূপগর্ব অথবা বংশমর্যাদা যে জন্যেই হােক যুবকের দিকে ফিরেও চাইত না। তাকে বাক্যবাণে জর্জরিত করতাে, নিষ্ঠুর ব্যবহার করতাে, পাঁচজনের সামনে বিদ্রপ করতাে, অপমান করতাে। ন্যাস্টাজিও তবু নিশ্চেষ্ট হতাে না।

মাঝে মাঝে ন্যাস্টাজিওর খুব কষ্ট হতাে। বাড়ি ফিরে আফশােস করতাে, কাঁদত, প্রতিজ্ঞা করতাে আর ওর মুখ দেখবে না কিন্তু অনেক করেও নিজেকে দমন করতে পারতাে না উপরন্তু যুবতীর প্রতি তার আকর্ষণ বেড়ে যেত।

ব্যাপার-স্যাপার দেখে তার শুভানুধ্যায়ীরা তাকে সুপরামর্শ দিল। বললাে, তােমার মাথা খারাপ হয়েছে, সামান্য একটা মেয়ের জন্যে তুমি কেন জলের মতাে টাকা খরচ করছে। এ শুধু অপব্যয়। এর অর্ধেক ব্যয় করলে অনেক সুন্দরী মেয়ে তােমার গলা জড়িয়ে ধরবে। আপাতত তুমি শহর ছেড়ে কোথাও গিয়ে কিছুদিন কাটিয়ে এসাে। তারপর মনস্থির করে আর কারও সঙ্গে প্রেম করবে।

শুভানুধ্যায়ী বন্ধুদের সুপরামর্শ ন্যাস্টাজিও তাে হেসেই উড়িয়ে দিল কিন্তু বন্ধুরা ক্রমাগত চাপ দিতে থাকায় সে তাদের অনুরােধ আর উপেক্ষা করতে পারল না। সে শহর ছেড়ে বাইরে যেতে রাজি হলাে।

ন্যাস্টাজিও যেন কোনাে দূরদেশে দীর্ঘদিনের জন্যে যাচ্ছে। সে সঙ্গে অনেক মালপত্তর ও তাবু ইত্যাদি নিল। তারপর ঘােড়ায় চেপে কয়েকজন বন্ধু সঙ্গে নিয়ে একদিন সে র্যাভেনা ত্যাগ করলাে। মনে হয়েছিল সে বুঝি অনেক দূরে যাবে কিন্তু তা নয়। মাত্র তিন মাইল দূরে ক্লাসে নামে এক জায়গায় সে অভা গাড়লাে।

তাবু খাটাবার পর সে বন্ধুদের বললাে, সে এখানেই থাকবে, ইচ্ছে করলে বন্ধুরা ফিরে যেতে পারে। বন্ধুরা কয়েক দিন থেকে র্যাভেনায় ফিরে গেলাে তবে ন্যাস্টাজিও তাদের বলে দিয়েছিল মাঝে মাঝে তারা যেন ডাক পেলেই আসে। সেই অনুসারে ন্যাস্টাজিও বন্ধুদের ডেকে পাঠাতাে। তারা আসতাে, জোসে পানাহার ও ফুর্তি চলতাে।

মে মাস সবে আরম্ভ হয়েছে, আবহাওয়া চমৎকার। সেদিন শুক্রবার, সকাল। ন্যাস্টাজিও বসে বসে তার নিষ্ঠুর প্রণয়িনীর কথা চিন্তা করছিল, তারপর একসময় উঠে হাঁটতে হাঁটতে পাইন গাছের বনে প্রবেশ করলাে। বনের পরিবেশ তার বেশ ভালােই লাগছিল। আপনভােলা হয়ে হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা ভেতরে চলে গেল, তারপর সহসা তীব্র ও কর্ণবিদীর্ণ নারীকন্ঠের চিৎকার শুনে সে চমকে উঠলাে। এই নির্জন বনে এমন করে কে চিৎকার করে!

এদিক-ওদিক চাইতে চাইতে সে যা দেখল তা সে আশা করে নি। সে দেখল সে যেখানে দাঁড়িয়ে গছে সেইদিকে এক সম্পূর্ণ নগ্ন সুন্দরী যুবতী ঝােপঝাড় চিরে ছুটে আসছে। তার মাথার বিস্ত কেশ বাতাসে উড়ছে আর তার সারা দেহে ছােপ ছােপ রক্ত। দুটো হিংস্র কুৎসিতদর্শন মাস্টিফ কুকুর তার পায়ে পায়ে ছুটে আসছে আর মাঝে মাঝে তার কোমল দেহের অংশবিশেষ কামড়ে দিচ্ছে। যুবতী কাতর কণ্ঠে চিৎকার করে উঠছে। এ কি কাণ্ড! সে কি তার অজান্তে নরকে এসে পড়ল!

কুকুর দুটোর পায়ে পায়ে এল ভীমদর্শন কৃষ্ণকায় অশ্বারােহী এক নাইট। ভীষণ ক্রোধে তার সর মুখ বিকৃত। তার ঘােড়াটাও কালাে। হাতে একটা সরু তরবারি, যা দিয়ে সে মাঝে মাঝে যুবতীকে অশ্লীল ভাষায় গাল দিতে দিতে তরবারি দিয়ে খোঁচা মারছে। এমন বীভৎস দৃশ্য ন্যাস্টাজিও কোনােদিন স্বপ্নেও দেখে নি, কল্পনা করা তাে দূরের কথা।

এমন অভাবনীয় করুণ দৃশ্য দেখে ন্যাস্টাজিও হতবাক্ ও ভীত এবং সেই সঙ্গে যুবতীর জন্য অনুকম্পা। তার ইচ্ছা হল সে যুবতীকে এই চরম বিপদ থেকে উদ্ধার করে কিন্তু কি করে উদ্ধার প্রবে? তার হাতে কোনাে অস্ত্র নেই। কিছু না করতে পারলে কুকুর দুটোকে অন্তত তাড়ানাে যাক এবং নাইটকে বিনীত অনুরােধ করা যেতে পারে—এই রকম মতলব করে সে একটা গাছ থেকে লাঠির মতাে এই ডাল ভেঙে নিয়ে কুকুর দুটোকে প্রহার করতে উদ্যত হয়ে তাদের তাড়া করলাে।

পিছনে কালাে ঘােড়ায় চেপে আসছিল সেই ভীমকায় নাইট। সে চিৎকার করে উঠলাে, সরে যাও সরে যাও ন্যাস্টাজিও। আমাকে ও কুকুরদের বাধা দিয়াে না, ঐ মেয়েমানুষটা পাপী, ওকে ওর বাপ শাস্তি ভােগ করতে দাও।

নাইটের কথা শেষ হবার আগেই কুকুর দুটো ঝাপিয়ে যুবতীর নিতম্ব কামড়ে ধরে তাকে মাটিতে পেড়ে ফেললাে। নাইট কাছে এগিয়ে এসে ঘােড়া থেকে নামলাে।

ন্যাস্টাজিও তার কাছে গিয়ে বলল, আমি জানি না তুমি কে, আমার নামই বা জানলে কি করে কিন্তু একজন বলশালী ও সশস্ত্র নাইটের পক্ষে একজন অসহায় ও নগ্ন যুবতীকে উৎপীড়ন করা কি যােগ্য কাজ? যুবতীকে রক্ষা করবার জন্যে আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করবাে।

উত্তরে নাইট বললাে, ন্যাস্টাজিও আমি তােমার মতাে তােমাদের শহরের একজন নাগরিক ছিলুম। আমার নাম গুইডাে ডেগলি আনাস্তাগি। তুমি যখন নেহাতই শিশু ছিলে তখন আমি এই যুবতীর প্রেমে পড়েছিলুম। তুমি ঐ ট্রাভারসারি-কন্যাকে যত ভালােবাস আমি তার চেয়ে শতগুণ বেশি ভালবাসতুম এই যুবতীকে। কিন্তু যুবতী ছিল এত গর্বিত ও নিষ্ঠুর যে একদিন আমি এই তরবারি দিয়ে, যেটি আমার। হাতে এখন দেখছে সেটি দিয়ে আত্মহত্যা করি ফলে আমাকে আমার মরণােত্তর জীবনে শাস্তি ভােগ করতে হচ্ছে। আমি মারা যেতে যুবতী আনন্দে আত্মহারা হলাে।

কিন্তু এই আনন্দ তাকে বেশিদিন ভােগ করতে হল না কারণ অল্প কিছুদিন পরে ওরও মৃত্যু হল। যেহেতু সে আমার মৃত্যুর জন্য অনুতপ্ত হয়নি, উপরন্তু আনন্দ প্রকাশ করেছিল এবং অতিশয় নি ছিল সেজন্য ওকেও নারকীয় দণ্ড দেওয়া হল। ওকে নরকে নিক্ষেপ করার পরেই আমাদের উভয়কে এক বিশেষ সাজা দেওয়া হল। সাজাটা হল এই যে যুবতী আমাকে দেখলেই পালাতে থাকবে আর আমি ওকে আমার একদা প্রেমিকা নয়, শত্রু মনে করে অনুসরণ করবাে। যতবার আমি ওকে নাগালের মধ্যে পাবাে ততবার আমি ওকে এই তরবারি যা দিয়ে আমি আত্মহত্যা করেছি সেটি দিয়ে ওকে পুনরায় ও বারবার হত্যা করবাে আর তারপর আমি যা করব তা তুমি এখনই দেখতে পাবে। আর ওর পিঠ কেটে ওর নিষ্ঠুর হৃদয় যে হৃদয়ে একবিন্দু স্নেহ প্রেম মায়া বা মমতা নেই সেই হৃৎপিণ্ড ও অন্ত্রসমূহ নিষ্কাশিত করে ঐ কুকুর দুটিকে খেতে দেবাে।

ঈশ্বরের ইচ্ছানুসারে যুবতী আবার তার জীবন ফিরে পাবে এবং তুমি যেভাবে দেখলে ঠিক এইভাবে পালাতে থাকবে। কুকুর দুটো ওকে তাড়া করবে। আমিও ওকে তরবারি হাতে অনুসরণ করবাে, যেন আমাদের মৃত্যু হয়নি। প্রতি শুক্রবার পাইন বনের এই অংশে ও এই সময়ে এই এই শ্যের পুনরাবৃত্তি তুমি দেখতে পাবে এবং আমি ঐ শয়তানীকে কিভাবে হত্যা করি তাও তুমি দেখবে। তবে সপ্তাহের বাকি কয়েকদিন আমি নিশ্চেষ্ট থাকি না। আমি ওকে অন্যত্র, বিশেষ করে সে সব স্থানে ও আমাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল সেই সব জায়গায় আমি ওকে খুঁজে বেড়াই। সে যতদিন ধরে আমাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল ও আমার সঙ্গে দুর্বব্যহার করেছিল ততদিন আমাকে এই শাস্তি ভােগ করতে হবে, তার আগে আমার মুক্তি নেই। তুমি এখন সরে দাঁড়াও, বাধা দেবার ব্যর্থ চেষ্টা কোরাে না, ঈশ্বরের আদেশ আমাকে পালন করতে দাও।

নাইটের কথা শুনে ন্যাস্টাজিও এতদূর ভীত হল যে, তার মাথার প্রতিটি চুল দাঁড়িয়ে উঠল। নিজের কানকেও সে বিশ্বাস করতে পারছে না। তথাপি কিছু সাহস সঞ্চয় করে নাইট যা বললাে তার পরিণতি দেখবার জন্যে অপেক্ষা করতে লাগল। সে দেখল ভীত সেই যুবতী নাইটের পরবর্তী আঘাতের জন্যে কাঁপতে কাঁপতে অপেক্ষা করছে। ন্যাস্টাজিও দেখল নাইট খ্যাপা কুকুরের মতাে তরবারি হাতে উন্মত্তের মতাে যুবতীর উপর ঝাপিয়ে পড়ল। যুবতী ততক্ষণে আত্মরক্ষার ভঙ্গিতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছে। আর পাগলা কুকুর দুটো তাকে দু’দিক থেকে কামড়ে ধরে আটকে রখেছে। যুবতী প্রাণপণে চিৎকার করতে করতে দয়া ভিক্ষা করছে। নাইট তার সর্বশক্তি প্রয়ােগ করে তার তরবারি যুবতীর বকের মধ্যস্থলে বিধিয়ে দিল। তরবারি বার করে লাথি মেরে তাকে উপুড় করে দিল আর তারপর ছােরা বার করে তার পিঠ কেটে হৃদয়, ফুসফুস, যকৃত, অন্ত্র সবকিছু বার করে কুকুর দুটোর সামনে ফেলে দিল। কু দুটো চেটে সব খেয়ে ফেলল।

কিন্তু কি আশ্চর্য! কিছু পরে, এসব কিছু যেন ঘটে নি। যুবতী পূর্ণাঙ্গ হয়ে উঠে সমুদ্রের দিকে দৌড়তে লাগল। কুকুর দুটোও তাকে অনুসরণ করতে লাগল। নাইটও উঠে তরবারি হাতে যুবতীকে অনুসরণ করতে লাগল এবং তারা ক্রমশ দূরে যেতে যেতে বিলীন হয়ে গেল। ন্যাস্টাজিও তাদের আর দেখতে পেল না।

আকাশ-পাতাল কিছু উপলব্ধি করতে না পেরে ন্যাস্টাজিও সেখানে পাথরের মূর্তির মতাে দাঁড়িয়ে রইলাে। স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে তার কিছু সময় লাগলাে। সে নিজের চোখে যা দেখেছে, নিজের কানে যা শুনেছে তা অবিশ্বাস করতে পারলাে না। অলৌকিক হলেও সে যা প্রত্যক্ষ করেছে তা সত্য।

সহসা সে উপলব্ধি করলাে যে, এই ঘটনা প্রতি শুক্রবার এইখানে ও এই সময়ে অনুষ্ঠিত হয় তখন তাে সে এটি কাজে লাগাতে পারে। জায়গাটি যাতে চিনতে পারে এইজন্য গাছ ও পাথরে সে কিছু চিহ্ন অঙ্কিত করে রাখলাে ও তারপর নিজের তাবুতে ফিরে গেল।

তাবুতে ফিরে সে কিছুক্ষণ ধরে চিন্তা করলাে তারপর এক সময়ে সে তার ভৃত্যদের র্যাভেনা শহরে পাঠিয়ে তার আত্মীয় ও বন্ধুদের ডেকে পাঠাল। যথেষ্ট অর্থ আছে, প্রচুর ভৃত্য আছে অতএব সমাগত সকে পানাহারে আপ্যায়িত করতে অসুবিধে হল না। পান ও ভােজনে সকলে তৃপ্ত হবার পর ন্যাস্টাজিও তাদের বললাে, তােমরা আমার নিষ্ঠুর প্রেমিকার প্রতি মনােযােগ না দিতে ও অযথা অব্যয় না করতে পরামর্শ দিয়েছিলে এবং তােমাদের সেই পরামর্শ অনুসারে আমি শহর ছেড়ে কিছুদিনের জন্যে এই অরণ্য অঞ্চলে তাবু ফেলেছি। আমি আমার প্রেমিকার আশা একেবারে ত্যাগ করতে পারি তােমরা যদি আমার একটা অনুরােধ রক্ষা করতে পারো। অনুরােধটি রক্ষা করা এমন কিছু কঠিন নয়। আগামি শুক্রবার পাওলাে ট্রাভারসারি, তার স্ত্রী ও কন্যা, তাদের পরিবারের সকল মহিলারা এবং তােম তােমাদের পত্নী, ভগিনী এবং পরিচিত যে কোনাে মহিলারা আমার সঙ্গে ব্রেকফাস্ট খেলে আমি আনন্দিত হবে এবং কেন তােমাদের আমি নিমন্ত্রণ করছি তা তােমরা সেদিন উপস্থিত হলে জানতে পারবে।

বন্ধুরা বললাে এ আর এমন কি কঠিন কাজ। তারা ট্রাভারসারি পরিবারের সকলকে এবং নিজেও নিজেদের পরিবারের মেয়েদের শুক্রবার সকালে জড়ো করবে। হ্যা, ন্যাস্টাজিওর ভালােবাসার মেয়েটি অবশ্যই থাকবে।

নিজে যেখানে তাবু ফেলেছে সেখানে নয়, সেই পাইন বনে যেখানে সেই অলৌকিক কাণ্ড ঘটেছিল, সেখানে ন্যাস্টাজিও বিরাট ভােজসভার আয়ােজন করল। পাইন গাছের নিচে নিচে কিলগুলি এমনভাবে সাজানাে হল যাতে নিমন্ত্রিতরা নিজ আসন থেকে সমস্ত দৃশ্যটা দেখতে পায়। তার প্রণয়িনীর জন্য এমন স্থান নির্বাচন করলাে যেখান থেকে ঘটনার কোনাে অংশ যেন অদৃশ্য না থাকে।

শুক্রবার সকালে সকলে একে একে পাইন বনে সমবেত হল। ন্যাস্টাজিও তাদের সাদর অভ্যর্থনা জানিয়ে নির্দিষ্ট আসনে বসিয়ে দিতে লাগল। এ এক অভিনব ব্যাপার। বাগানে ব্রেকফাস্ট তাে প্রায়ই হচ্ছে কিন্তু বনে এই প্রথম। সকলে বেশ খুশি। উত্তম সুরা ও আহার্যের ব্যবস্থা ছিল এবং সমস্ত ব্যবস্থা নিখুত।

ব্রেকফাস্ট টেবিলে শেষ পদটি পরিবেশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নারীকণ্ঠের করুণ আর্তনাদে পাইন গাছের প্রতিটি পাতা বুঝি কেঁপে উঠল। সকলে চমকে উঠল, কেউ বা ভাত। এ কি ব্যাপার? বনের মধ্যে কেউ কি কোনাে অসহায় মেয়েকে একা পেয়ে তার ওপর অত্যাচার করছে ? সকলে দাঁড়িয়ে উঠেছে। নারীকণ্ঠে আর্তনাদের জন্যে তাদের বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না।

সকলে সবিস্ময়ে দেখল প্রথমে সেই উলঙ্গ যুবতী ছুটে আসছে। তাকে তাড়া করে আসছে দুটো মাস্টিফ কুকুর এবং সবশেষে তরবারি হাতে কৃষ্ণকায় অশ্বারূঢ় ভীমদর্শন নাইট। ন্যাস্টাজিওর মতাে কেউ কেউ যুবতীকে সাহায্য করবার জন্যে ছুটে যাচ্ছিল কিন্তু নাইট তাদের বাধা দিয়ে ন্যাস্টাজিওকে যে গল্প বলেছিল সেই গল্পই বললাে। এবং তারপর পূর্ব শুক্রবার ন্যাস্টাজিও যা প্রত্যক্ষ করেছিল এদিনও সমবেত সকলে সেই একই দৃশ্য পরপর প্রত্যক্ষ করলাে। তারপর প্রাণ ফিরে পেয়ে যুবতী, কুকুর দুটো ও নাইট তাদের চোখের সামনে অদৃশ্য হয়ে গেল। সকলে স্থাণুর মতাে বসে সবকিছু দেখছিল। এমন অদ্ভুত অভিজ্ঞতা মানুষের কদাচিৎ হয়।

মহিলারা সকলে খুবই ভয় পেয়েছিল। কিন্তু সবচেয়ে বেশি ভয় পেল সেই মেয়ে যাকে জয় করে ব্যর্থ চেষ্টা করছিল ন্যাস্টাজিও। তার ভয় হল সেও ন্যাস্টাজিওকে বার বার ফিরিয়ে তাে দিচ্ছেই উপরন্তু ঘৃণা করছে। এসবই তাে ভগবান ওপর থেকে দেখছেন। এখন ব্যর্থ ন্যাস্টাজিও যদি আত্মহত্যা করে বসে তাহলে তাকেও মরতে হবে এবং এই রকম নিষ্ঠুর শাস্তি ভােগ করতে হবে।

বাড়ি ফেরার আগে সে তার প্রিয় পরিচারিকাকে ন্যাস্টাজিওর কাছে পাঠিয়ে সন্ধ্যাবেলায় দেখা করতে বলল, ন্যাস্টাজিও যেন তার সব দোষ ভুলে অবশ্যই তার সঙ্গে দেখা করে। সে তার প্রেমিকের জন্যে অপেক্ষা করবে।

ন্যাস্টাজিও বলে পাঠাল সে এক শর্তে যাবে। সে শর্ত হল যুবতীকে তার বিবাহিত পত্নী হতে হবে। এই শর্তে যুবতীর আর আপত্তি রইল না। উপাচিকা হয়ে সে তার বাবা-মাকে বললাে, সে ন্যাস্টাজিও ছাড়া আর কাউকে বিয়ে করবে না।।

সেদিন সন্ধ্যায় প্রেমিক-প্রেমিকার মিটমাট হয়ে গেল। যুবতী অতীত ভুলে প্রেমিকের কণ্ঠলগ্না হল। পরের রবিবারেই ওদের বিয়ে হয়ে গেল।

রেভেনার সকল মেয়েই পাইন বনে সেই অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখে যথেষ্ট শিক্ষালাভ করেছিল। তারা তাদের প্রেমিক বা স্বামীদের আর অবহেলা করতে সাহসই করত না ফলে তাদের জীবন অনেক সুখের হয়েছিল।

নবম গল্প

ফেডরিগাে ডেইলি আলবেরাইট জনৈক যুবতীর প্রণয়াসক্ত হয়ে দেউলে হয়ে গেল। একটি পােষা বাজ পাখি ছাড়া তার আর কিছু বাকি রইল না। আর বাড়িতে খাদ্যাভাব হেতু এই বাজপাখি রান্না করে তার প্রেমিকাকে খাওয়াতে বাধ্য হল। প্রেমিকা তার বাড়ি এসে প্রাতরাশ করতে চেয়েছিল। প্রেমিকের দুর্দশা জানতে পেরে যুবতীর হৃদয়ের পরিবর্তন হল ওঠে প্রেমিককে স্বামীত্বে বরণ করে তাকে অর্থ ও সম্পদে পূর্ণ করল।

ফিলােমেনার গল্প শেষ হল কিন্তু এবার কে গল্প বলবে? ডায়ােনিও? না, থাক, ও পরে গল্প বলবে। কুইন স্থির করলাে সে নিজেই এবার গল্প বলবে তাই হাসতে হাসতে বললাে, আমিই এবার তােমাকেই একটা গল্প শােনাই। ফিলােমেনার গল্পর সঙ্গে আমার গল্প কিছু মিল হয়ত খুঁজে পাবে। প্রেমিক বলি ভদ্র, সৎ ও হৃদয়বান হয় তাহলে কোনো নারী শেষ পর্যন্ত উপেক্ষা করতে পারে না। আমার গল্প থেকেও তােমরা কিছু শিক্ষা লাভ করতে পারবে আশা করছি। তাহলে আরম্ভ করি, কি বলাে?

তােমরা কি কোপ্পো ডাই বরগিস ডােমিনেচির না শুনেছ? তিনি আমাদের শহরে বাস করতেন। তিনি সম্রান্ত বংশের ধনী ব্যক্তি ছিলেন কিন্তু এজন্যে নয়। তিনি একজন প্রতিভাশালী ব্যক্তি ছিলেন। তার নানা গুণ ছিল। তার স্মরণশক্তি ছিল প্রখর। তিনি নানারকম গল্প বলতেন, বানানাে গল্প নয়, সত্য। কাহিনী। অভিজাত বংশের এক সম্পদশালী যুবকের কাহিনী তিনি প্রায়ই বলতেন। |

ঐ যুবকও ফ্লোরেন্সে বাস করতাে। তার নাম ছিল ফেডরিগাে। তার পিতার নাম ফিলিপাে অ্যালবেরিখি। তার বীরত্ব কাহিনী ও সৎ আচরণ প্রবাদে পরিণত হয়েছিল। তার তুল্য একজন পরিপূর্ণ যুবক সারা টাসকানিতে বিরল ছিল। সকলে তার প্রশংসায় মুখর।

এই যুবক মােনা গিওভানা নামে সম্রান্ত বংশের এক সুন্দরী যুবতীর প্রেমে পড়ল। ফেডরিগাের মতাে এই যুবতী তার রূপ ও নানা বিরল গুণের জন্যে সর্বত্র প্রশংসিত হত। যুবতী ছিল ফ্লোরেন্সের গৌরব।

যুবতীর মন পাবার জন্যে ফেডরিগাে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতাে। বিরাট ভােজসভার আয়ােজন বুতাে, মূল্যবান উপহার পাঠাত। বেহিসেবী ভাবে সে টাকা খরচ করতাে! যুবতী সুন্দরী তাে ছিলই উপরন্তু তার ছিল চারিত্রিক দৃঢ়তা। | এইভাবে বেহিসেবী খরচ করতে করতে ফেডরিগাে একদিন নিঃশেষ হয়ে গেল। তার সিন্দুকে একটিও স্বর্ণমুদ্রা কোথাও পড়ে রইল না। বাকি রইল কিছু ক্ষেতি জমি, যা থেকে কোনােরকমে সে দুবেলা দু’টি খেতে পেত আর রইল সেরা জাতের একটি পােষা বাজপাখি যেটিকে সে তার প্রেমিকার মতােই ভালােবাসত। উভয়ই ছিল তার প্রাণপ্রিয়। দরিদ্র হয়ে ফ্লোরেন্সে আর বাস করা তার পক্ষে সম্ভব হল না, সে কাশ্চিতে গিয়ে বাস করতে লাগল। এখানেই ছিল তার ক্ষুদ্র ক্ষেত। মাঝে মাঝে সে একাই বাজপাখিটি নিয়ে শিকার করতে যেত। দারিদ্র্যকে সে মেনে নিয়েছিল।

ফেডরিগাে যখন দারিদ্রের সঙ্গে কঠোর সংগ্রাম করে চলেছে সেই সময়ে তার প্রেমিকা মােনা গিওভানার স্বামী কঠিন ব্যাধিতে আক্রান্ত। স্বামী বুঝতে পারল তার আর বাঁচবার আশা নেই, তখন সে উইল করলাে। স্বামী ধনী ছিল; প্রচুর জমি, বাড়ি, অলংকার ও নগদ অর্থের অভাব ছিল না। সবই সে তার বালক পুত্রকে দান করে দিল, তবে যদি পুত্রের মৃত্যু হয় তবে যাবতীয় সম্পত্তি মােনা পাবে। পুত্রের | আয় সম্বন্ধে পিতার সন্দেহ ছিল কারণ পুত্রটি জন্ম থেকেই রুগ্ন, ব্যাধিতে ভুগত, বৎসরের অধিকাংশ | সময়ে সে শয্যাশায়ী থাকত। এই কারণে পুত্রটি বাবা ও মায়ের অত্যন্ত প্রিয় ছিল। তার কোনাে ইচ্ছাই | তারা অপূর্ণ রাখত না।

উইল সম্পাদন করার অল্পদিন পরে মােনার স্বামীর মৃত্যু হল। বিধবা মােনা আদরের একমাত্র | পটিকে নিয়ে দিন কাটাতে লাগল। ফেডরিগাের যে গ্রামে ক্ষেত ও যেখানে ফিডরিগাে বাস করত সেই গ্রামে মােনার একটি বাগানবাড়ি ছিল। প্রতি বছর গ্রীষ্মে ওরা গ্রামের এই বাড়িতে কিছুদিন কাটিয়ে যেত।

এবার এই গ্রীষ্মে গ্রামের বাড়িতে এসে ফেডরিগাের সঙ্গে ছেলেটি ভাব জমাল। পাখি আর কুকুর তার বু ভালাে লাগত। ফেডরিগাে যখন তার বাজপাখি ও কুকর নিয়ে শিকারে যেত, তখন সেও তার সঙ্গী হতে আর অবাক হয়ে পাখি ও কুকুরের কাণ্ডকারখানা দেখত। হিংস্র বাজপাখিও যে এমন পােষ মানে তা তার জানা ছিল না। ফেডরিগাের বাজপাখিটা তার খুব পছন্দ হল। তার ইচ্ছে হল বাজপাখিটা সে চেয়ে নেয় কিন্তু পাখিটি ফিডরিগাের প্রাণ তাই সে চাইতে সাহস করতাে না।

ছেলেটি তাে একেই রুগ্ন তবুও গ্রামে এসে একটু ভালাে ছিল কিন্তু ফেডরিগাের সঙ্গে শিকার করতে যাওয়া ও ছােটাছুটির ফলে সে আবার অসুখে পড়ল এবং শয্যাশায়ী হতে হল। মা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে পালে। নয়নের মণি একমাত্র অবলম্বন পুত্রটির শয্যার পাশে মােনা প্রায় সারাক্ষণ বসে থাকত ও ছেলের পরিচর্যা করত। তাকে সর্বদা সান্ত্বনা দিত, তার সকল আবদার রক্ষা করত। ছেলে যা চাইত সে তাই দিত। মোনা জিজ্ঞাসা করতাে, তাের কি চাই বল, আমি এনে দেব। ছেলে বিশেষ কিছু চাইত না তবুও বয়সে বলক তাে, এটা সেটা চাইত। মা তার ইচ্ছা পূরণ করত।

কথায় কথায় মােনা একদিন জিজ্ঞাসা করলাে, তাের মুখ দেখে মনে হচ্ছে তুই যেন কিছু একটা চাইছিস কিন্তু বলতে সাহস করছিস না। আমাকে বল না তাের কি চাই?

ছেলে তাে প্রথমে কিছুতেই বলবে না। কারণ সে জানে যা সে চায় তা পাওয়া অসম্ভব তবুও মা বারবার অনুবােধ করতে থাকায় বললাে, তুমি কি পারবে মা? ফেডরিগাের বাজপাখিটা যদি আমাকে এনে দিতে পারাে তাে আমার অসুখ বােধহয় সেরে যাবে। আমি ভালাে হয়ে যাব। | ছেলের এই অনুরােধ শুনে মােনা দ্বিধাগ্রস্ত হল। যাকে সে প্রত্যাখ্যান করেছে তার কাছে সে হাত পাতবে কি করে? একমাত্র ছেলে বলতে গেলে চিররুগ্ন ও স্বল্পায়ু। তার এই একটিমাত্র অনুরােধ কি করে ঠেলে সরিয়ে দেওয়া যায়। সে মনে মনে জানে ফেডরিগাে তাকে একদা ভালােবাসত এবং তারই জন্যে সে বম্ব হারিয়েছে। এখনও হয়ত তাকে ভালােবাসে, বাজপাখিটা চাইলে দিয়েও দেবে তবুও সে সংকোচ বােধ ঘছে। বাকি আছে শুধু সেই বাজপাখিটা যেটা তার পরম প্রিয়। সেটাই বা চাইবে কি করে? অথচ সে চাইলেই বাজপাখি তার হাতে এসে যাবে এবং সম্ভবত সে তার ছেলের প্রাণও ফিরে পাবে। | শেষ পর্যন্ত মাতৃস্নেহ জয়ী হবে। ফেডরিগাে হয়ত ওরকম একটা বাজপাখি আবার যােগাড় করতে পারবে। প্রয়ােজন হলে যতই দাম হােক সে নিজেও একটা ভালাে বাজপাখি কিনে ফেডরিগােকে উপহার নিতে পারবে কিন্তু ছেলে চলে গেলে তাকে সে আর ফিরিয়ে আনতে পারবে না।

সব সংকোচ ও দ্বিধা কাটিয়ে সে ঠিক করলাে ফেডরিগাের কাছে যাবে এবং বাজপাখিটা চাইবে। ছেলেকে বললাে, ভালাে হয়ে যাবি বলছিস? ঠিক আছে ধরে নে তুই বাজপাখিটা পেয়ে গেছিস। আমি কাল সকালেই ফেডরিগাের বাড়ি যাবাে আর বাজপাখিটা তােকে এনে দেব।

পরদিন সকালে একজন মহিলাকে সঙ্গে নিয়ে মােনা গিওভানা বেড়াতে বেড়াতে ফেডরিগাের খামারে হাজির হল। কয়েকদিন ধরে বাজপাখি নিয়ে শিকার করার উপযােগী আবহাওয়া ছিল না তাই ফেডরিগাে তার বাগানে কিছু কাজ করছিল।

মোন এসেছে খবর পেয়েই ফেডরিগাে বাগানে কাজ ফেলে হাত ধুয়ে ছুটে এসে বললাে, আজ তার কী সৌভাগ্য। তার কুটিরে মােনা এসেছে, তাকে আমন্ত্রণও জানাতে হয়নি। তাকে নিয়ে কি করবে, কোথায় দেবে, কি বলবে ঠিক করতে না পেরে সে অতিমাত্রায় ব্যস্ত হয়ে উঠল।

মােনা বললো, এই দেখ ফেডরিগাে তুমি তাে আমার বাড়ি গেলে না কিন্তু আমি বেড়াতে বেড়াতে তোমার বাড়ি চলে এলুম। অবশ্য আমার ছেলে আসত এবং সে তােমার ও (‘তামার বাজপাখির প্রশংসায় শঙ্কামুৰ। হাজার হােক তুমি তাে আমার পুরনাে বন্ধু, আমাকে কত ভালােবাসতে। সেইসব কথা ভেবেই তাে আমি তােমার কাছে এলুম আর সেই পুরনাে দিনের স্মৃতি স্মরণ করে আমার মন চাইছে তােমার সঙ্গে ব্রেকফাস্ট করতে।

মােনা তুমি আমার সঙ্গে ব্রেকফাস্ট করবে এবং তুমি নিজে যেচে তা বলছ এর চেয়ে আমার কাছে আনন্দের আর কি হতে পারে? আমি আমার অর্থ সম্পদ সবই হারিয়েছি সত্যি, কিন্তু তুমি আমার বড় এসেছ ও আমার হাতে ব্রেকফাস্ট করতে চাইছ, এতে আমার যে আনন্দ হচ্ছে তাতে আমার মনে হচ্ছে রে আমি আমার হৃত সমস্ত সম্পদই বুঝি ফিরে পেয়েছি। আমার মতাে সৌভাগ্যবান আজ আর কেউ নেই। | বিনয়ে বিগলিত হয়ে কথাগুলি ফেডরিগাে বললাে মােনাকে সে তার ছােট ও সুন্দরভাবে সাজানাে বাগানের এক অংশে নিয়ে গিয়ে তাঘেরা একটি আসনে বসিয়ে বলল, তােমাকে উপযুক্ত অভ্য জানাবার জন্যে আমার বাড়িতে কেউ নেই। আমি তােমার জন্যে ব্রেকফাস্ট তৈরি করতে যাচ্ছি, ইতিরে আমার বাগানের মালির স্ত্রী তােমাদের বাগানের ফুল দেখাবে ও কথাবার্তা বলবে। আশা করি আর সাময়িক অনুপস্থিতিতে তােমাদের কোনাে অসুবিধা হবে না। | ওদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ফেডরিগাে ঘরে এসে ঢুকলো কিন্তু হায়! এখন সে কি করবে? সে এক উপলব্ধি করল সে কী পরিমাণ দরিদ্র হয়েছে। মােনাকে উপযুক্তভাবে আপ্যায়িত করবার মতাে আজ হি তার বাড়িতে নেই। একদা এই যুবতীর জন্যে প্রদত্ত ভােজসভার সে কী বিপুল আয়ােজন করতাে! আজ তর কিছুই অবশিষ্ট নেই। ব্রেকফাস্ট দেবার মতাে কোনাে আহার্যই তার বাড়িতে নেই। পাগলের মতাে সর বাড়ি সে তন্নতন্ন করে খুঁজল। একটা দামী জিনিসও নেই যে সেটা বিক্রি করে কিছু আনবে। এদিকে বেল বাড়ছে, ব্রেকফাস্টের সময় পার হয়ে যাচ্ছে। এখনও যে কোনাে ব্যবস্থাই করতে পারলাে না।।

সহসা তার নজর পড়লাে তার অতি প্রিয় বাজ পাখিটার ওপর! দাঁড়ের ওপর পাখিটা একা বসে মনিবকে লক্ষ্য করছিল! এই পাখি ছাড়া আর উপায় নেই। সে পাখিটাকে ধরে তার ঘাড় মটকে তাকে মেরে ফেলল। তারপর সেটি তার বাড়ির সহায়ককে দিল পালক ছাড়িয়ে রান্নার জন্যে প্রস্তুত করতে ইতিমধ্যে টেবিল সাজাতে সাজাতে ব্রেকফাস্ট তৈরি হয়ে গেল।

ফেডরিগাে বাগান থেকে মহিলা দু’জনকে ডেকে এনে অত্যন্ত বিনীতভাবে তাদের টেবিলে বসিয়ে নিজে আহার্য পরিবেশকের মতাে করজোরে দাড়িয়ে রইল যেন হুকুম পালন করতে প্রস্তুত। মানা ও তার বান্ধবী কি খাচ্ছে না জেনে রান্নার প্রশংসা করলাে। ব্রেকফাস্ট শেষ হবার পর গল্পগুজব আরম্ভ হলাে। মােনা গিওভানা যে জন্যে এসেছে সময় বুঝে সেই কথা তুললাে।

সে বলল, ফেডরিগাে আমি তােমার কাছে আসার আসল উদ্দেশ্য শুনলে অবাক হবে, বিশেষ করে একদা তুমি অত্যন্ত ধনী ছিলে এবং সেই সময়ে তুমি আমার কাছে প্রেম নিবেদন করতে এবং আমি তােমাকে ফিরিয়ে দিতুম আর এজন্যে তুমি আমাকে অহংকারী ভাবতে কিন্তু ব্যাপার তা তা নয়। আমি একজনের বিবাহিতা পত্নী, সে অবস্থায় তােমাকে আমার প্রেমিকরূপে গ্রহণ করা আমার পক্ষে নীতিবিরুদ্ধ হতাে। তাই বলছিলুম যে, আমি এখন তােমাকে যা বলবাে তা শুনে তুমি আমার ধৃষ্টতা দেখে হয়ত অবাক হবে। কিন্তু তােমার যদি নিজের সন্তান থাকতো তাহলে আমার বেদনা উপলব্ধি করতে পারতে এবং আমাকে ক্ষমা করতে। | ফেডরিগাে বললাে, তুমি তাে তােমার আসল কথা কি তাই বললে না, ধৃষ্টতা, অবাক, ক্ষমা এসবের কথা উঠছে কেন? আগে তাে তােমার উদ্দেশ্য বললাে তারপর ওসবের কথা উঠবে।

মােনা বললাে, মায়ের মর্মবেদনা পুরুষ কি বুঝবে ফেডরিগাে। মায়েদের জ্বালাযন্ত্রণা অনেক। সেসব বুঝলে তুমি আমার প্রতি করুণাই করবে। যাই হােক আসল কথাটি বলি। আমার ছেলের জন্যে তােমার কাছে এমন একটি জিনিস চাইব যার প্রতি তােমার আকর্ষণ তীব্র। তােমার একটি বাজপাখি আছে যেটি আমার ছেলেরও অত্যন্ত প্রিয়। তুমি জাননা যে আমার ছেলেটি রােগশয্যায় শায়িত, তার রােগ সারবার আমি কোনো আশা দেখছি না কিন্তু আমার ছেলে বলছে যে, তােমার। ঐ বাজপাখিটা পেলে তার রােগ সেরে যাবে। তাই তার জন্যেই আমি তােমার কাছে ঐ বাজপাখিটি চাইতে এসেছি। একদা আমাকে ভালােবাসতে আমি সেই দাবি নিয়ে তােমার কাছে আসি নি, আমি এসেছি আমার ছেলের জন্যে। আমি জানি তােমার হৃদয় উদার ও সহানুভূতিশীল। আমি জানি তােমার হৃদয় অনেক বড়, আমাকে তুমি ফিরিয়ে দেবে না। আশা করি তুমি আমার একমাত্র ছেলেটির প্রাণ বাঁচিয়ে আমাদের উভয়কে চিরঋণী করে রাখবে। | মােনার কথা শুনতে শুনতেই ফেডরিগাের চোখের কোণে জল এসে গিয়েছিল। মােনার কথা শেষ হতে সে একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস মােচন করে স্বৰ্গতােক্তি করলাে, হায় হায় এ আমি কি করেছি।

মােনা তার চোখে জল দেখে ভাবল, অতি প্রিয় পাখিটি দান করতে হবে এজন্যে পাখির শোকে বুঝি ফেডরিগাের চোখে জল এসে গেছে; তাই সে বলতে যাচ্ছিল যে পাখি তার চাই না, কিন্তু ছেলের মুখ মনে পড়তে সে কথা সে বলতে পারলাে না। তাছাড়া ফেডরিগাে তার কথা আরম্ভ করলাে, মােনা একদা তুমি আমার প্রেম প্রত্যাখ্যান করে আমাকে আঘাত দিয়েছিলে ঠিক, কিন্তু আজ তুমি না জেনে আমাকে যে আঘাত দিলে তা আমার পক্ষে সহ্য করা সম্ভব নয়। তুমি অনেক দেরি করে ফেলেছ। আমার যখন অর্থ ছিল এবং আজও যদি তার ভগ্নাংশ থাকত তাহলে আজ সকালে তােমাকে ব্রেকফাস্ট পরিবেশন করবার জন্যে আমাকে চিন্তা করতে হতাে না; কিন্তু আজ আমি একেবারেই নিঃস্ব তাই তুমি যে বস্তুটি চাইছ সেইটি হত্যা ও রন্ধন করে তােমাদের ব্রেকফাস্ট টেবিলে পরিবেশন করতে হয়েছে, তা নইলে এইমাত্র তুমি আমার কাছে যা চাইলে তা তােমাকে এখনই অবলীলায় দিতে পারতুম। কিন্তু হায় এখন যে আর কোনাে উপায়ই নেই। মােনা আমার বুক ফেটে যাচ্ছে, এ দুঃখ আমি ভুলব কি করে? আমি যে এখন নিজেকে ক্ষমা করতে পারছি না।

ফেডরিগাে তার রন্ধনশালা থেকে পাখির পালক, পা, নখ ও মাথা এনে দেখিয়ে বলল, এই দেখ আমার প্রিয় পাখির অবশিষ্ট অংশ।

সব শুনে মােনা অত্যন্ত হতাশ হল। যে জিনিসটি সে চাইতে এসেছিল সেটি এখন তার পেটে এ মনে করে তার বমি পেতে লাগল। নিজেকে সংযত করে ফেডরিগােকে বলল, এ তুমি কি করলে ফেডরিগাে, প্রথমে তুমি আমাদের তৃপ্ত করবার জন্যে তােমার প্রিয় পাখিটি হত্যা করলে, তারপর যে মাংস মহিলার খাদ্য নয় সেই খাদ্য তুমি আমাদের খাওয়ালে? যাই হােক তােমার উদ্দেশ্য সৎ এবং তুমি উদারহৃদয়, পাখি জীবিত থাকলে তুমি সেটি আমার ছেলেকে উপহার দিতে এ বিষয়ে আমার কোনাে সন্দেহ নেই, কিন্তু কি আর করা যাবে।

মােনা গিওভানাে অত্যন্ত মনমরা হয়ে ছেলের শয্যাপার্শ্বে ফিরে এসে তাকে সান্ত্বনা দিতে লাগল। ছেলেও অত্যন্ত হতাশ হল। সেইদিন থেকে তার অবস্থার অবনতি হতে লাগল। মােনা ভাবতে লাগল সে নিজে ফিডরিগাের কাছে না গিয়ে চিঠি পাঠালেই বােধহয় ভালাে হতাে। পাখিও পাওয়া যেত, ছেলেরও প্রাণ বাঁচত। এরপর অনেক চেষ্টা করেও মােনা তার একমাত্র সন্তানটিকে বাঁচাতে পারল না।

একমাত্র পুত্র বিয়ােগের শােক সহ্য করা যে কোনাে ব্যক্তির পক্ষে কঠিন। সে সর্বদা শশাকে মুহ্যমান হয়ে থাকে দেখে তার ভাইরা তাকে আবার বিয়ে করতে অনুরােধ করল। মােনা এখন রীতিমতাে ধনী বিয়ের বয়সও পার হয়নি, এখন সে যুবতী উপরন্তু সে আবার জননী হতে পারবে।

ভাইরা জানত ফেডরিগাের অনেক গুণ আছে। তারা জানত তাদের বােনকে আপ্যায়িত করবার জন্যে সে তার অতি প্রিয় পাখিটিকে হত্যা করেছে এবং তার প্রতি তাদের বােনের কিছু দুর্বলতা হয়ত আছে কিন্তু তারা চায় না চালচুলােহীন একটা লােকের সঙ্গে তাদের বােনের বিয়ে হােক।।

ভায়েদের বার বার অনুরােধ উপেক্ষা করতে না পেরে মােনা একসময় বলল, আমাকে আর বিরক্ত কোরাে না, আমি যা আছি তাই থাকতে চাই। আমি আর বিয়ে কবব না, যদি বিয়ে করতেই হয় তাে ফেডরিগােকেই বিয়ে করব।

ভায়েরা বলল, বােকা মেয়ে, এমন অসম্ভব কথা বলিস না, অমন কপর্দকশূন্য নিষ্কর্মা একটা মানুষকে বিয়ে করে কি লাভ?

মােনা বলল, আমি তা জানি কিন্তু একটা অভদ্র ধনীকে বিয়ে করা অপেক্ষা একজন দরিদ্র ভদ্রলােককে বিয়ে করা অনেক ভালাে।

ভায়েরা অবশ্য তার যুক্তি অনুধাবন করল। ফেডরিগাে সৎ এবং ভদ্র এবং তাদের বােন যখন তাকেই বিয়ে করতে চায় তখন তারা আর বাধা দিল না। একদিন ফেডরিগাের সঙ্গে মােনর বিয়ে হয়ে গেল। প্রেমিকাকে লাভ করে ফেডরিগাে আনন্দিত, সেইসঙ্গে সে এখন বিত্তশালী তবে এবার সে সতর্ক, অযথা ব্যয় থেকে সে নিবৃত্ত। মােনাকে নিয়ে সে সুখেই দিন কাটাতে লাগলো।

দশম গল্প

পিয়েত্রো ডাই ভিনচিওলাে নৈশ আহারে নিমন্ত্রিত হয়ে তার বন্ধু আরাকোলানাের বাড়ি গেছে আর সেই সুযােগে তর বউ তাকে সঙ্গ দেবার জন্যে এক যুবককে ঘরে ঢুকিয়েছে। পিয়েত্রো ফিরে এল, তার বউ যুবককে তাড়াতাড়ি মুরগির খাঁচার আড়ালে লুকিয়ে রাখল। পিয়েত্রো বলল আরকোলানাের বউ এক যুবককে তাদের বাড়িতে লুকিয়ে রেখেছিল কিন্তু ধরা পড়ে গেল। আরকোলানাের বউয়ের পিয়েত্রো নিন্দা করতে লাগল। এদিকে দুর্ভাগ্যবশত তারই বাড়িতে তার বউ কর্তৃক লুকিয়ে রাখা যুবকের একটা আঙুল একটা গাধা মাড়িয়ে দিতেই যুবক যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল। পিয়েত্রো তড়িঘড়ি ঘটনাস্থলে গিয়ে যুবককে ধরে ফেলল এবং বউয়ের চরিত্রের প্রতি দোষারােপ করতে লাগল কিন্তু বউও তাকে ছাড়ল না। পিয়েত্রো নিজের ত্রুটি বুঝতে পেরে বউয়ের সঙ্গে মিটমাট করে নিল।

কুইনের গল্প শেষ হতে সকলে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানাল। দয়াময় ঈশ্বর ফেডরিগােকে উপযুক্ত পুরস্কারই দিয়েছেন। ডায়ােনিও জানত এবার তাকে গল্প বলতে হবে তাই সে কুইনের আদেশের অপেক্ষা না করেই তার গল্প আরম্ভ করল।

সে বলল, আমাদের নিজেদেরই কত দোষ ও ত্রুটি আছে কিন্তু পরের চরিত্রে কোনাে দোষ দেখলেই আমরা সােচ্চার হয়ে উঠি, নিজের দোষ তখন ভুলে থাকি। সে যাই হােক আমি তােমাদের কিছু করুণ কাহিনী শুনিয়েছি কিন্তু এবার যে গল্পটি বলব তা খুবই মজার। গল্প শােনার পর তােমাদের অনুরােধ করবাে, তােমরা যদি বাগানে গােলাপফুল তুলতে যাও তাহলে কাটা বাঁচিয়ে ফুলটি তুলাে। আমি কিসের ইঙ্গিত করছি তা বােঝবার বুদ্ধি আশা করি তােমাদের সকলের আছে। এবার গল্পটা শােনাে।

বেশিদিনের কথা নয়, পেরুজিয়া শহরে একজন ধনী ব্যক্তি বাস করতাে, তার নাম ছিলাে পিয়েত্রো তাই ভিনচিওলাে। তার বই ছিল না, বয়সও পার হয়ে যাচ্ছিল, পাড়ার লােক সমালােচনা করতাে। লােকটার এত পয়সা, স্বাস্থ্যও মজবুত, তবে কেন বিয়ে করছে না। প্রতিবেশীদের মুখ বন্ধ করবার হন্যেই হােক বা বাড়িতে ফুলদানির মতাে একটা বউ দরকার অথবা অন্য কোনাে কারণেই হােক পিয়েত্রো একদিন ছাপামাপি এক যুবতীকে বিয়ে করে ফেলল। ঢেউ খেলানাে শরীর, মাথার চুল লাল, চটুল চোখ আর চনমনে ভাব দেখেই বােঝা যায় এ যুবতী ফুর্তিবাজ। ফুর্তি লুটতেই সে জন্মেছে এবং একাধিক স্বামীকে সামলাবার ক্ষমতা অর আছে; কিন্তু বিয়ের পরই আবিষ্কার করলাে যে তার স্বামীর হৃদয় নামে যন্ত্রটি যথাস্থানে নেই।

পত্নীর উজ্জ্বল যৌবন ও চঞ্চলতা লক্ষ্য করে পিয়েত্রো ঘাবড়ে গেল। কচি বকনা বাছুরের মতাে ছটফটে বৌকে সে সামলাবে কি করে? স্বামীর দুর্বলতা ধরতে পেরে যুবতী পত্নী স্বামীকে কটুক্তি করতে আরম্ভ করলাে। স্বামীকে সে পুরুষ বলে স্বীকার করতেই চায় না। বউ নিজে কিভাবে দিন কাটাবে সেজন্যে বউয়ের কোনাে চিন্তা নেই। স্বামী যদি তাকে সঙ্গদান করতে না পারে তাহলে সে সঙ্গী খুঁজে নেবে। সে তার আগুনের মতাে যৌবনকে অসময়ে কেন নিবিয়ে দেবে? সে তার যৌবন ও জীবনকে উপভােগ করবে। বউ ভাবে, লােকটা পুরুষ নয়। তার পৌরুষ নেই জানলে কে তাকে বিয়ে করতাে? যেমন চিন্তা তেমন কাজ। যৌবন-চঞ্চল যুবতী বধু বুঝি তাপ সহ্য করতে পারবে না তাই সে আর অপেক্ষা না করে কাজে লেগে গেল। উপযুক্ত প্রেমিক-যুবক সংগ্রহ করতে হবে। যুবতী অচিরে এক বেড়াল তপস্বিনীর সঙ্গে পরিচিত হল। এই প্রবীণাকে দেখে মনে হবে সে অতীব ধর্মপ্রাণা। যীশুর নামগান করেই সে জীবন অতিবাহিত করতে চায় কিন্তু আসলে সে হল কুটনী। যুবকের জন্যে যুবতী আর যুবতীর জন্যে যুবক সংগ্রহ করে দেওয়া বা উভয়ের মধ্যে গুপ্ত খবর চালাচালি করা তার কাজ। | পিয়েত্রোর বউয়ের চাহিদা শুনে প্রবীণা তাকে আশ্বস্ত করে বলল শীঘ্রই সে একটি উপযুক্ত যুদ্ধে সঙ্গে তার পরিচয় করিয়ে দেবে, তবে তার যদি কোনাে যুবককে পছন্দ হয়ে থাকে তাহলে সে দ্রুত যােগাযােগ ঘটিয়ে দেবে।

বলতে কি, এমন একটি যুবক পিয়েত্রোর বাড়ির সামনে দিয়ে প্রায়ই যাওয়া-আসা করতাে। যুবকটিকে দেখে পিয়েত্রো-বধূর পছন্দ হয়েছিল কিন্তু তার সঙ্গে কি করে আলাপ করবে? যুবকটি সুদর্শন ও মুখ দেখে মনে হয়েছিল রসিক চূড়ামণি।

প্রবীণাকে যুবকের বর্ণনা দিতেই প্রবীণা বলল তাকে সে চেনে। মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই সেই প্রবীণ পিয়েত্রোর অনুপস্থিতিতে তার বাড়িতে যুবককে পৌঁছে দিয়ে যুবতী বধূর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল। এরপর সুষােগ পেলেই যুবক-যুবতী মিলিত হতাে এবং পিয়েত্রোর অনুপস্থিতিতে আর তারই শয়ন কক্ষে তারই পালংকে পাশাপাশি মহানন্দে সময় কাটাতাে। নতুন বউয়ের মনে যেমন কিছু শংকা আছে তেমনি কিছু বেপরােয়া ভাবও আছে। যখন তারা নিবৃত্ত থাকে তখন শংকা, আর বেপরােয়া যখন যুবতী-যুবককে বুকে তুলে নেয়। যা হয় হবে, এই ভাব আর কি।

পিয়েত্রোর বন্ধু আরকোলানাে একদিন তাকে নৈশভােজে নিমন্ত্রণ করলাে। খবরটা বউ আগে জানতে পারে নি, পিয়েত্রো বেরােবার কিছু আগে সে খবর পেল যে স্বামী নৈশভােজে যাচ্ছে। ফিতে বিলম্ব হবে, বেশ খানিকটা সময় পাবে। সে তখনি সেই প্রবীণাকে খবর পাঠাল যুবককে যেন পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু সেদিন সেই যুবককে পাওয়া গেল না, যাকে পাওয়া গেল সে নতুন হলেও বেশি। আকর্ষণীয়। তাকে পেয়ে বউ খুশিই হল। মাঝে মাঝে স্বাদ পালটানাে ভালো। নতুন নায়কের সঙ্গে সে আজ চুটিয়ে প্রেম করবে।

প্রথমে কিছু খাওয়াদাওয়া করে নেওয়া যাক। সবে তারা খেতে আরম্ভ করেছে আর এমন সময়ে দরজায় করাঘাত। এমন সময় কে রসভঙ্গ করছে? এ শব্দ পরিচিত। নায়িকা প্রমাদ গুনল, স্বামী এত মীঃ ফিরে এলাে কেন? কি ব্যাপার? বউ ভয় পেয়ে গেল। আজ একটা কিছু ঘটবে। তার বুক ঢিব ঢিব করতে লাগল। টেবিল থেকে খাবার ও প্লেটগুলি সরিয়ে সে যুবককে লুকোবার চেষ্টা করলাে। এত শীঘ্র একটা উপযুক্ত জায়গা পাওয়া গেল না। বাড়ির একধারে মুরগির খাচার আড়ালে তাকে চুপ করে শুয়ে থাকতে বলল এবং তার ওপরে একটা খালি থলে ঢাকা দিল। এদিকে সহসা কেউ এসে পড়লে অন্ধকারে বুঝতেও পারবে না, এখানে একটা মানুষ লুকিয়ে আছে।

স্বামীকে দরজা খুলে দিল। স্বামী ভেতরে আসতে জিজ্ঞাসা করলাে, কি? তােমরা কি গিলে গিলে খেলে নাকি? এত তাড়াতাড়ি ফিরে এলে যে?

স্বামী উত্তর দিল, আমি এক টুকরােও কিছু খাই নি। খেলে না কেন? পিয়েত্রো উত্তর দিল, বলছি, আর বলাে কেন? আরকালানাে তার বউ আর আমি সবে টেবিলে বসেছি আর সেই সময়ে একটা হাঁচির শব্দ, টেবিলের কাছেই কেউ হাঁচল। একটা হাঁচি তাই আমরা গ্রহ করিনি কিন্তু সেটাই শেষ হাঁচি নয়, পর পর আরও পাঁচটা হাঁচি, কেউ যেন নস্যি নিয়ে হাঁচছে। আমরা সকলে অবাক, কে হাঁচল? আবার হাঁচি?

আরকোলানাের মেজাজ আগেই খারাপ হয়েছিল কারণ আরকোলানাে আমাকে নিয়ে যখন বাড়ি কছিল তখন তার বউ দরজা খুলতে অযথা দেরি করেছিল। সে রীতিমতাে ক্রুদ্ধ, চেয়ার ছেড়ে উঠে পঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করলাে, ব্যাপারটি কি? কে হচছে? | আরকোনাে ওপর ওঠবার সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। সিঁড়ির নিচে একটা খুপড়ি ছিল। খুপরির মধ্যে ভাঙাচোরা কাঠ জমা করে রাখা হতাে। আরও কিছু আজেবাজে সামগ্রী ফেলে রাখা হতাে। আরকোলানাের সন্দেহ হল এই খুপরির ভেতর থেকেই হাঁচির আওয়াজ আসছে। দরজা বন্ধ ছিল। আরকোলানাে দরজা খুলে ফেলল। দরজা খুলতেই গন্ধকের তীব্র গন্ধ তার নাকে ধাক্কা দিল, সারা ঘরটা গন্ধকের গন্ধে ভর্তি হয়ে গেল।

নাকে চাপা দিয়ে আরকোলানাে তার বউকে জিজ্ঞাসা করলাে, ওখানে গন্ধক কে রাখল?

তার বউ বলল, আমার মুখাবরণ ঢাকবার ভেল পরিষ্কার করবার জন্যে গন্ধক ব্যবহার করেছিলুম। গন্ধকের ধোঁয়া চাপা দেবার জন্যে আমি গন্ধকের পাত্রটা ঐ খুপরির মধ্যে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে নিয়েছিলুম। মনে হচ্ছে ধোঁয়ায় খুপরিটা ভর্তি হয়ে গেছে, দরজা খুলতেই সেই ধোঁয়া বেরিয়ে এসে ঘর ভর্তি করে দিয়েছে।

কিছুক্ষণের মধ্যে খুপরিতে জমা ধোঁয়া বেরিয়ে এলাে। ঘরের ধোঁয়াও পরিষ্কার হয়ে গেল। কিন্তু হাঁচ কে? খুপরির মধ্যে গুটিসুটি মেরে কে যেন নাকে চাপা দিয়ে বসে রয়েছে? আবার হাঁচি। সেই লােকটাই হঁচল। লােকটা যদি আর কিছুক্ষণ খুপরিতে বন্ধ থাকতাে তাহলে তাকে জীবনে আর হাঁচতে হত না।

আরকোলানাের চক্ষু রক্তবর্ণ, নাসিকা স্ফীত, মুখে ক্রোধের ছাপ সুস্পষ্ট। স্ত্রীর দিকে চেয়ে বলল, এবার বুঝলুম কেন তুমি দরজা খুলতে এত দেরি করছিলে? এই কথা শুনেই তার স্ত্রী ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। তার কি হল সে কোথায় গেল তা আমি জানি না। স্ত্রী যে পালিয়ে গেল আরকোলানাে তা লক্ষ্য করেও করলাে না। সে লােকটাকে বলল খুপরি থেকে বেরিয়ে আসতে কিন্তু তার অবস্থা সঙ্গীন, ওঠবার ক্ষমতা নেই। আরকোলানাে তার একটা পা ধরে তাকে টেনে বার করলাে, তারপর তাকে খুন করবার জন্যে ছােরা আনতে ঘরে ঢুকলাে।

আমি চেঁচিয়ে আরকোলানােকে এই হত্যা থেকে নিবৃত্ত হতে বললুম। আমিও তখন উত্তেজিত, হয়ত বেশি জোরেই চেঁচিয়ে ছিলুম। আমার ভয়ার্ত চিৎকার শুনতে পেয়ে আশেপাশের বাড়ি থেকে কয়েকজন প্রতিবেশী ছুটে এসে ঘটনা শুনে হতভাগ্যকে উঠিয়ে নিয়ে চলে গেল আর এই অভাবনীয় কান্ডের জন্যে আমার খাওয়াই হল না। আমি বাড়ি ফিরে এলুম।

ঘটনা শুনে পিয়েত্রোর বউ যে আরকোলানাের বউয়ের মতােই অপরাধী সে কিন্তু মহিলার নিন্দায় মুখর হয়ে উঠল এবং তাকে শাপশাপান্ত করতে লাগল। ছােটখাটো একটা বক্তৃতাই দিয়ে বসলাে।

আরকোলানাের বউয়ের প্রেমিকের মতাে তার প্রেমিকও যে মুরগির খাচার আড়ালে লুকিয়ে আছে, তাই সে তার স্বামীকে তাগাদা দিতে লাগল। বলল, অনেক রাত হয়েছে, এখন যাও তাে শােও গে যাও। | পিয়েত্রোর তখন ক্ষিধে পেয়েছে, শুতে যাবার ইচ্ছে নেই। জিজ্ঞাসা করলাে, রাত্রিটা কি উপবাস দেব? খেতে দাও। | কি খেতে দেব? রান্নাই করি নি। একার জন্যে কি আর রান্না করবাে? মিছে কথা বলি নি। আরকোলানাের বউয়ের মতাে আমি অন্য পুরুষ ঘরে ঢুকিয়ে ফুর্তি করতে সময় কাটাই নি যে রান্না করার সময় পাই নি। একটা রাত না খেলে কিছু হবে না, উপােস দিয়ে পাকস্থলী বিশ্রাম পাবে।

আর সেই সময়েই ঘটনাটা ঘটলাে।

সেইদিন বিকেলে পিয়েত্রোর ক্ষেতের কয়েকজন শ্রমিক গাধার পিঠে চাপিয়ে কিছু সামগ্রী এনে সেগুলি খালাস করে গাধাগুলিকে আস্তাবলে বেঁধে রেখেছিল কিন্তু শ্রমিকরা চলে যাওয়ার আগে গাধাগুলিকে জল খাওয়ায় নি। একটা গাধা বােধহয় পিপাসা সহ্য করতে না পেরে বাধন ছিড়ে ফেলে জলের সন্ধানে ইতস্তত ঘুরে বেড়াচ্ছিল। ঘুরতে ঘুরতে মুরগির খাচার পিছনে চলে আসে যেখানে যুবকটিকে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। যুবকটি খাচার নিচে উপুড় হয়ে শুয়েছিল। তার একটা হাত বাইরে বেরিয়েছিল। যুবকের দুর্ভাগ্য। গাধা এসে তার খুর দিয়ে একটা পা সজোরে মাড়িয়ে দিল কিন্তু পা সরাল না। পা চেপেই রইল। যুবক যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে উঠল।

পিয়েত্রো প্রথমে চমকে উঠেছিল পরে আশ্চর্য হয়ে ভাবল এখানেও হাঁচি’ নাকি? আওয়াজটা বাড়ির ভেতর থেকেই এসেছিল এবং কোন্ দিক থেকে তাও সে অনুমান করে বাড়ির সেইদিকে গেল। যুবক তখনও যন্ত্রণায় কাতর ধ্বনি করছে। তাকে খুঁজে বার করতে বেশি সময় লাগল না। গাধাটাকে তাড়িয়ে দিয়ে পিয়েত্রো তাকে খাঁচার তলা থেকে টেনে বার করলাে। যন্ত্রণায় কাতর, হাতটা অন্য হাত দিয়ে টিপে ধরে সে ভয়ে কাপতে লাগল। প্রাণ নিয়ে সে বুঝি আর এ বাড়ি থেকে আর বেরােতে পারবে না।

যুবককে চিনতে পেরে পিয়েত্রো জিজ্ঞাসা করলাে, তুই? এখানে কি করছিলি বল? কে তােকে বাড়িতে ঢােকালাে? নাকি চুরি করতে ঢুকেছিলি? সত্যি কথা বলবি নইলে খুন করবাে।

যুবক আগাগােড়া সত্যি কাহিনাই বলল, একটুও লুকলাে না। পিয়েত্রো তখন তাকে তার স্ত্রীর ঘরে টানতে টানতে নিয়ে গেল। স্ত্রী বেচারী তখন খাটের একপ্রান্তে বসে ভয়ে কাঁপছিল।

বলা বাহুল্য পিয়েত্রো তখন ক্ষেপে গেছে। সে তার স্ত্রীকে বলল, খুব যে আরকালােনার বউয়ের নিন্দে করছিলে, বলছিলে তাকে আগুনে পুড়িয়ে মারা উচিত, এবার তােমার কি হবে? আগুনে পুড়িয়ে মরব না মাথা ন্যাড়া করে ছেড়া জামা পরিয়ে বাড়ি থেকে বার করে দেব?

পিয়েত্রো আরও অনেক কথা বলল, অনেক গালাগাল দিল। শেষে বলল, চুপ করে আছ যে কিছু বলছে না।

বউ দেখল সবই তাে প্রকাশ হয়ে গেছে তাই সে এখন বেপরােয়া হয়ে বলল, সমস্ত দোষ তাে তােমার। তুমি নামেই শুধু স্বামী কিন্তু আমার দিকে চেয়ে দেখেছ কোনােদিন? হ্যা আমাকে অনেক দামী গহনা আর পােশাক দিয়েছ কিন্তু সদ্যবিবাহিত যুবতী স্ত্রী কি গয়না আর পােশাকেই সন্তুষ্ট? তার পুষ্ট হে ঐ গয়না আর পােশাক ছাড়া আর কিছু চায় না? তার কি অন্য ক্ষুধা নেই? তুমি যদি আমাকে গয়না না দিয়ে ছেড়া পােশাক পরিয়ে রাখতে তাতেই আমি সন্তুষ্ট হতুম যদি নাকি তুমি আমাকে নিয়ে শুতে, আমার যৌবনের দাবি মেটাতে কিন্তু তুমি তাে যুবক হয়েও যুবক নও। তােমার তাে পৌরুষই নেই, নারীসঙ্গমে তুমি অপারগ। জেনেশুনে আমকে বিয়ে করে আমার জীবনটা নষ্ট করে দিচ্ছিলে যদি না আমি আমার মনােমত পুরুষ বেছে নিতুম। তােমার ভাগ্য ভালাে যে তােমার আস্তাবলের ছোঁড়াগুলােকে তােমার খাটে তুলি নি। তাহলে ভেবে দেখ দোষটা কার?

পিয়েত্রো এবার বুঝল দোষটা কার। সে লজ্জায় অধােবদন হয়েছিল। বউয়ের কথা শেষ হতে বলল, যথেষ্ট হয়েছে আর বােলাে না। আমার ক্ষিধে পেয়েছে, তােমারও বােধহয় আর এই ছােকরা? যাই হােক আমাদের তিনজনের জন্যেই টেবিল সাজাও। | বাৰ কি? আমরা দু’জনে খেতে বসতে যাচ্ছিলুম আর ঠিক সেই সময়েই তাে তুমি দরজায় ধাক্কা দিলে।

ভালােই হয়েছে, এখন খেতে দাও। খাবার পর আমি সব ঠিক করে দিচ্ছি। তােমাকে আর নালিশ করতে হবে না। এরপর তিনজনে মিলে মহানন্দে তৃপ্তি করে আহার সমাধা করলাে।

গল্প এইখানেই শেষ। বউয়ের জন্যে পিয়েত্রো কি ব্যবস্থা করেছিল তা ডায়ােনিওর জানা নেই তবে পরদিন সকালে সেই যুবককে রাস্তায় সানন্দে ঘুরে বেড়াতে দেখা গিয়েছিল। সােজা হয়ে নয়, পা টলছিল, কোন্ সুধা বা সুরা পান করে সে মাতাল হয়েছিল কে জানে?

ডায়ােনিওর গল্প শেষ হল। হাসতে হয় তাই মেয়েরা হাসল কিন্তু সে হাসিতে আন্তরিকতা ছিল না। গল্পটা মন থেকে তারা মেনে নিতে পারে নি, কিছু অসঙ্গতি তারা লক্ষ্য করেছিল।

দশম গল্প ও আর একটা দিন শেষ হল। কুইনের রানীত্ব শেষ হল, এবার নতুন কুইন মনােনয়ন করতে হবে। বিদায়ী কুইন তাই এলিসার মাথায় মুকুটটি পরিয়ে দিয়ে বলল, ম্যাডাম এখন থেকে আমরা তােমার আদেশ পালন করবাে।

ধন্যবাদ জানিয়ে এলিসা বলল, আমি আর নতুন কি করবাে? তােমাদের পথ অনুসরণ করেই চলবাে।

অন্য কুইনদের মতাে এলিসা স্টুয়ার্ডকে ডেকে পরদিনের কাজের সমস্ত বিলি ব্যবস্থা করে সকলকে বলল, এবার আমাদের গল্পর বিষয়বস্তু একটা অন্যরকম করা যাক, কি বললা? এই ধরাে একজন মানুষ আর একজনকে বেকায়দায় ফেলল বা ফেলাবার চেষ্টা করলাে কিন্তু সফল হল না অথবা উপযুক্ত জবাব দিয়ে তার মুখ বন্ধ করলাে কিংবা কৌশলে বিপদ কাটাল।

সকলেই এলিসার প্রস্তাব সমর্থন করলাে এবং তারপর হই-হুল্লোড় আরম্ভ করলাে। অন্যদিনের মতাে যন্ত্রসঙ্গীত, নৃত্য, গান আরম্ভ হল। ডায়ােনিও গান শােনাবেই কিন্তু সে যেসব গান শােনাতে চাইল সেগুলি শালীনতা বিরােধী তাই মেয়েরা সেসব গান শুনতে চাইল না, তখন ডায়ােনিও বাধ্য হয়ে অন্য একটি গান শােনাল তবে প্রেমসঙ্গীত। এ নৃত্যগীত শেষ হবার পর আহার ও আহারের পর নিজ নিজ কক্ষ ও শয্যায় শয়ন। রাত্রিটা বেশ ঠাণ্ডা ছিল, সকলের সুনিদ্রা হয়েছিল।

|| ডেকামেরনের পঞ্চম দিন শেষ হল।।

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *