অসমাপ্ত আলিঙ্গন – রণজিৎ দাশ

›› কবিতা / কাব্য  ›› কাব্যগ্রন্থ  

ঝাউফল
স্তনের বোঁটার মতো ঝাউফল বালির উপরে
শান্ত ফাঁকা ঝাউবনে, সারা দিন, টুপটাপ ঝরে।
অদূরেই পরিত্যক্ত বাতিঘর, বালিয়াড়ি, সমুদ্রের ঢেউ—
প্রত্যেকে নিঃসঙ্গ, ভীত। প্রতিটি মুহূর্তে
কার পাপ, কার পুণ্য ক্রমশ বাড়ছে—
জানে কেউ?

জানে না। সেজন্য আমি অকাতরে ফাঁকা ঝাউবনে
স্তনের বোঁটার মতো ঝাউফল দু’আঙুলে তুলে
আবার স্থাপন করি ঝাউকিশোরীর বুকে—
গান, শুধু গান জাগে মনে!

আগুনের জাদুকর
আমি শুধু চক্ষু দিয়ে
আগুন জ্বালাতে পারি, আর

আমি শুধু বুক দিয়ে
আগুন নেভাতে পারি, আর

কিছুই পারি না, আমি শুধু
দৃষ্টিতে, নিঃশ্বাসে, স্পর্শে, আলিঙ্গনে,
বাকে ও সংকল্পে
আগুন জ্বালাতে আর আগুন নেভাতে পারি
তোমার শরীরে— বার বার!

 

কামসূত্র স্যূপ
ক্ষুধার্তকে ঘরে ডেকে, খোলা চুলে, আগুনের আঁচে
গণ্ডারের খাগচূর্ণ মিশিয়ে দিয়েছ তুমি
বাঘের শিশ্নের ঘন স্যুপে!
তার ওপরে ছড়িয়েছ শিলাজতু, স্বর্ণভস্ম, গাঢ় পদ্মমধু,
এবং মাদকচূর্ণে রাক্ষসীর আসঙ্গ-কামনা।
সেই স্যুপে-ভরা বাটি, লেস দেওয়া ঢাকনাটি তুলে,
দু’ঊরু বিস্তার ক’রে জাদুকরি হাতের আঙুলে
ধরেছ আমার মুখে, বলেছ—
‘নিঃশেষ করো একটি চুমুকে!’
নিঃশেষ করেছি আমি, বাটি-সহ, সমগ্র তোমাকে!

 

রতি দেবী
তোমাতেই মতি রেখো, রতি দেবী, অগতির গতি—
মৃত্যুর কালেও যেন চোখের সম্মুখে দেখি,
রূপে আর স্বাস্থ্যে ভরা ঝলমলে যুবতী!

মেরিলিন মনরো-র সঙ্গম সোফা
মেরিলিন মনরোর সঙ্গম-সোফা বিক্রি হবে নিলামে।
অভিনেতা গ্লেন ফোর্ড তাঁর বেভারলি হিলস-এর বাড়ির এই প্রশস্ত সোফাটিতে মেরিলিন মনরোর সঙ্গে সঙ্গম করেছিলেন কোনও এক অস্থির সন্ধ্যায়। গ্লেন ফোর্ড-এর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র পিটার ফোর্ড আকস্মিকভাবে, এই অবৈধ মিলনকথা জানতে পারেন তাঁর বাবারই লেখা একটি গোপন নোট থেকে। সেটি সাঁটা ছিল সোফাটির মাথায় দেয়ালে ঝোলানো একটি তৈলচিত্রের পিছনে। সেই নোটে গ্লেন ফোর্ড লিখেছিলেন, ‘নীচের এই সোফাটিতে, আমাদের মিলনশেষে, অস্ফুট স্বরে মেরিলিন বলেছিল, ‘বড়ো ইচ্ছে হয় যেন আমি এই মুহূর্তে মরে যাই। কারণ এ মুহূর্তে আমি খুব, খুব সুখী!’
সুতরাং, স্মৃতিমধুর রতিমধুর এই সোফাটি এখন বিক্রি হবে বহু মূল্যে, অভিজাত নিলাম বিপণিতে। যে ধনকুবের এই সোফাটি কিনবেন, তিনিও কি, কোনও এক অস্থির সন্ধ্যায় তাঁর গোপন সঙ্গিনীর সঙ্গে মিলিত হবেন এই অদম্য, প্ররোচনামূলক সোফায়? এবং মিলনশেষে সেই নারীও কি বলবেন একই কথা, ‘বড় ইচ্ছে হয় যেন আমি এই মুহূর্তে মরে যাই, কারণ এ মুহূর্তে আমি খুব, খুব সুখী!’ এবং সেই নারীও কি, পরবর্তীকালে মেরিলিনের মতোই আত্মঘাতী হবেন?
মনে হল, মেরিলিন মনরোর সঙ্গম-সোফা, এক ধনীগৃহ থেকে অন্য ধনীগৃহ খুঁজতে শুরু করল তার গোপন শিকার…

 

অবৈধ সঙ্গম
অবৈধ সঙ্গম শেষ হওয়ামাত্র
অবৈধ প্রণয়েরও শেষ।
পড়ে থাকে দুটি দেহ—
কামনার ভুক্তাবশেষ।
পড়ে থাকে ভাঙা জিপ, ছেঁড়া শার্ট, রক্তমাখা ব্রা
বিছানার নীচে— এক অন্ধ খাদ, বুনো জন্তু, পাহাড়ি কুয়াশা
দুজনেই উঁকি মেরে দেখে, আর তীব্র ভয় পায়।
অপরিচিতের মতো, প্রচ্ছন্ন শত্রুর মতো
দুজনেই দুজনের দিকে
নীরবে তাকায়।
তখনও গেলাসে মদ, ছাইদানের নিভু সিগারেট,
তখনও ঝুলন্ত ঘরে হিমবাহ করেনি আঘাত,
কেবল কাঁপছে জল, ফুলদানি, বুদ্ধমূর্তি,
স্থলিত পোশাক—
অবৈধ সঙ্গম শেষ হওয়ামাত্র
ডাস্টবিনে ডেকে ওঠে কাক।

চুম্বনের তথ্যচিত্র
যেভাবে পাখিরা ওড়ে উঁচু থেকে আরও উঁচুতে,
নারীরাও সেভাবেই, প্রেমের ভিতরে,
এক চুম্বনের চেয়ে উচ্চতর চুম্বনের তৃষ্ণা বুকে ধরে।
নারীরা গোপনে তাই
পুরুষ জগতে
এক চুম্বনের চেয়ে উচ্চতর চুম্বনের
সমর্থ পুরুষ খুঁজে মরে।
হীনবীর্য পুরুষেরা জানে না সেকথা, তারা
আকাশে উড়ন্ত নারীদের
তৃপ্তিহীন ঠোঁট থেকে
অর্ধমৃত ইঁদুরের মতো খসে পড়ে।
নারীরা গোপনে শুধু
এক চুম্বনের চেয়ে উচ্চতর চুম্বনের
সমর্থ পুরুষ খুঁজে মরে।