তখন সবে স্কুল পাশ করে কলেজে ঢুকেছি। ১৯৭৬ সাল। আমাদের এক বছরের বড়ো জ্যোতিদা ছিল ইংরেজির ছাত্র এবং অসম্ভব কবিতা পাগল। সুভাষ মুখোপাধ্যায় থেকে আল মাহমুদ, জীবনানন্দ থেকে মহাদেব সাহা, নির্মলেন্দু গুণ, হেলাল হাফিজের অধিকাংশ কবিতাই তার কন্ঠস্থ ছিল। অত্যন্ত মায়াবী কন্ঠে সে একের পর এক উচ্চারণ করে যেত ‘কবিতা তো কৈশোরের স্মৃতি। সে তো ভেসে ওঠা স্নান / আমার মায়ের মুখ; নিম ডালে বসে থাকা হলুদ পাখিটি/ পাতার আগুন ঘিরে রাত জাগা ছোটো ভাইবোন/ আব্বার ফিরে আসা, সাইকেলের ঘণ্টাধ্বনি – রাবেয়া রাবেয়া / আমার মায়ের নামে খুলে যাওয়া দক্ষিণের ভেজানো কপাট।
‘কবিতা চরের পাখি, কুড়ানো হাঁসের ডিম, গন্ধভরা ঘাস / স্নান-মুখ বউটির দড়ি-ছেঁড়া হারানো বাছুর গোপন চিঠির প্যাডে নীল খামে সাজানো অক্ষর কবিতা তো মক্তবের মেয়ে চুল খোলা আয়েশা আক্তার।
“কিছুই থাকে না দেখো, পত্র পুষ্প গ্রামের বৃদ্ধরা/ নদীর নাচের ভঙ্গি, পিতলের ঘড়া আর হুঁকোর আগুন/ উঠতি মেয়ের ঝাঁক একে একে কমে আসে ইলিশের মৌসুমের মতো।’
“সোনালি কাবিন’ বেরিয়েছিল ১৯৭৩-এ। প্রকাশিত হবার সঙ্গে সঙ্গেই এই বইয়ের কবিতাগুলি পাঠক-চিত্তকে লুণ্ঠন করে নিয়েছিল। আমার পড়া তাঁর ১৭টি কাব্যগ্রন্থের মধ্যে এই বইটির একটি স্বতন্ত্র চৌম্বক আকর্ষণ রয়েছে। আল মাহমুদের এই বই এবং অন্যান্য কবিতাগ্রন্থ পড়ে আমার মনে হয়েছে, জীবনানন্দ এবং জসীমউদ্দীনের মধ্যবর্তী যে কাব্যভূবন তিনি নির্মাণ করেছিলেন সেখানে মননের চাইতে হৃদয়-ধর্মই বড়ো। তাঁর কবিতার ভাষা কোনো অর্থেই দুরূহ বা দুর্বোধ্য নয়, বরং নাগরিক দূষণ-মুক্ত এক স্বচ্ছ ও সরল শোণিত-প্রবাহ তাঁর সিংহভাগ কবিতার প্রাণ। খুব অবলীলায় তিনি পাঠকের হৃদয় ও আত্মার সঙ্গে আত্মীয়তা গড়ে তুলতে পারেন। আমাদের আটপৌরে ঘর-গেরস্থালির আনাচেকানাচে ছড়িয়ে থাকা খুব সাধারণ ও পরিচিত দৃশ্যগুলিই তাঁর কবিতায় অলোক সামান্য চিত্রকল্প হয়ে ওঠে “কবিতা তো ফিরে যাওয়া পার হয়ে হাঁটুজল নদী/ কুয়াশায় ঢাকা পথ, ভোরের আজান কিংবা নাড়ার দহন / পিঠার পেটের ভাগে ফুলে ওঠা তিলের সৌরভ / মাছের আঁশটে গন্ধ, উঠোনে ছড়ানো জাল আর বাঁশঝাড়ে ঘাসে ঢাকা দাদার কবর। (কবিতা এমন)
‘আরশোলার অত্যাচারে ভিক্ত হতে হতে। আমার রূপসী পতঙ্গের গুষ্টি শুদ্ধ থেঁতলে দিতে যায় / শাড়ির প্রশংসা করে আমি কি তখন তারে প্রসন্ন করি না?’ (পলাতক)
শব্দ ব্যবহারের দিক থেকে আল মাহমুদ সর্বভুক, শুচিবায়ুতাহীন এক সাহসী কারিগর। যেসব পদ্যগন্ধী শব্দ স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ বহুদিন আগেই বর্জন করতে চেয়েছিলেন ‘পুনশ্চ’ কাব্যের ভূমিকায়, সেসব বাতিল শব্দকেও তিনি অসংকোচে প্রয়োগ করেছেন তাঁর কবিতায়। ওপরের উদ্ধৃতিতে ‘আমার রূপসী হবে’ কিংবা ‘আমি কি তখন তারে শব্দের ব্যবহার লক্ষ করুন। একালে বসে এই জাতীয় শব্দের প্রয়োগ যথেষ্ট বিস্ময়কর। পাশাপাশি একেবারে দৈনন্দিন জীবনের মুখের ভাষাকেও তুলে এনেছেন তিনি
“আজকাল কীভাবে যেন মাঝরাতে ঘুম ছুটে যায়। নিঃশব্দে শূন্য বিছানায় বসে সিগ্রেট টানি। অবলীলায় তোমার চলে যাওয়ার দৃশ্যগুলো মনে পড়তে থাকে। ভয় লাগে, মৃত্যুকে তোমার মতো আকস্মিকভাবে অতিক্রমের সাহস কই আমার ? ” (বন্ধ দেরাজ খুলে)
“যেমন রাতের নদী ঢেউয়ে ঢেউয়ে টেনে নেয় কারো হাতে ভাসানো প্রদীপ / তেমনি আয়ুর রেখাতে মনি প্রেমের রেখা দুঃখের শোকের/ সমস্ত ছকের খেলা পার হয়ে যাচ্ছি বহুদুর।” (অসুখে একজন)
“কুয়াশার শাদা পর্দা দোলাতে দোলাতে আবার আমি ঘরে ফিরবো।/ শিশিরে আমার পাজামা ভিজে যাবে। চোখের পাতায় / শীতের বিন্দু জমতে জমতে নির্লজ্জের মতন হঠাৎ/ লাল সূর্য উঠে আসবে।” (প্রত্যাবর্তনের একেবারে অমার্জিত অথচ ভীষণভাবে জীবন্তগণ ভাষ্যকেও তিনি ব্যবহার করেছেন দৃশ্যকল্প ফুটিয়ে তোলার জন্য উনিশশো তেয়াত্তর সাল। বাগান মাড়িয়ে দিয়ে জিপ যায়….
আবার গুলির শব্দ। বাঁচাও বাঁচাও ….
.. ট্যাট…. ট্যাট… ট্যাট…
খোল শালী চোরের চোদানী শাড়ি খোল
ট্যাট… ট্যাট… ট্যাট
ছেলে তুই, ছেলে তুই আমার ধর্ম বাপ তুই…
ট্যাট…..ট্যাট…ট্যাট” ( বোধের উৎস কই। কোনদিকে?)
বাংলা সাহিত্যের অহংকার আল মাহমুদের জন্ম ১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই পূর্বতন কুমিল্লা জেলার ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের মৌড়াইল গ্রামের মোল্লাবাড়ির সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। সত্যযুগ পত্রিকায় যখন “তিতাস চরের ছেলে’ গল্পটি প্রকাশিত হয় তখন তিনি সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের সমর্থনে কবিতা রচনার অপরাধে তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়। সে সময় আত্মগোপন করেছিলেন ক্লাস টেনের ছাত্র আল মাহমুদ। পেশায় মূলত সাংবাদিক ও গ্রন্থ-প্রকাশনীর কর্মকর্তা এই মানুষটি ১৯৭১ সালে প্রত্যক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেন। ১৯৭৪ সালে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিনা বিচারে একবছর কারাদণ্ডও ভোগ করেন। ১৯৭৫ সালে কারামুক্ত আল মাহমুদকে ডেকে নেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান। তখন থেকেই বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির প্রকাশনা বিভাগে যোগ দেন তিনি।
বাংলা একাডেমি পুরস্কার থেকে শুরু করে ভানু সিংহ সম্মাননা পদক পর্যন্ত ১২টি সাহিত্য পুরস্কারের অধিকারী এই কবি কবিতার পাশাপাশি নিবিড় দক্ষতার সঙ্গে রচনা করেছেন বেশ কিছু স্মরণীয় ছোটোগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, ট্রাভেলগ, আত্মজীবনী, অনুবাদ কবিতার সংকলন এবং শিশু ও কিশোরদের জন্য মনোরম কবিতা-সংকলন। সেদিক থেকে আল মাহমুদ একাই একটি যুগ, একটি স্বতন্ত্র একাডেমি। ইমদাদুল হক মিলন তাঁর অত্যন্ত ভালোবাসার এই মানুষটির সার্বিক মূল্যায়ন প্রসঙ্গে লিখেছেন ‘সারাক্ষণ কবিতার জগতে বসবাস করা, কবিতার ভেতরে নিমগ্ন থাকা আল মাহমুদ একটা সময়ে গদ্য লিখতে শুরু করলেন। সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে লিখতে শুরু করলেন গল্প। কালো নৌকা, জলবেশ্যা, পানকৌড়ির রক্ত ইত্যাদি গল্প লিখে ছোটোগল্পের পাঠক-সমালোচকদের চমকে দিলেন। কী অসাধারণ সব বিষয় গল্পের, কী অসাধারণ ভাষা, কী অসাধারণ বর্ণনা! কবিতার মতো বাংলা ছোটোগল্পেও নিজের আসন স্থায়ী করে ফেললেন আল মাহমুদ। বাংলা কবিতায় আল মাহমুদ যেমন যুক্ত করলেন সম্পূর্ণ একটি নতুন মাত্রা, বাংলা ছোটোগল্পেও ঠিক সেই কাজটিই করলেন তিনি।… কবিতায় তিনি যেমন তৈরি করলেন সম্পূর্ণ নিজস্ব এক কাব্যভাষা, গদ্যরচনাতেও তিনি তৈরি করলেন সম্পূর্ণ নিজস্ব এক ভাষা। ফলে আল মাহমুদের রচনা হয়ে উঠল শুধুই আল মাহমুদের রচনা। অন্য কারও সঙ্গেই তাঁর মেলে না। লেখালেখির দশদিক মিলিয়ে আল মাহমুদের তুলনা আল মাহমুদ নিজে। তিনি বাংলা সাহিত্যের এক জীবন্ত কিংবদন্তি।’ (ভূমিকা) সামান্য কথা, শ্রেষ্ঠ আল মাহমুদের ‘সোনালি কাবিন’-এর সনেটগুলি বিগত চার দশক ধরে বাঙালি পাঠকের হৃদয় জয় করে নিয়েছে এক দুর্নিবার আকষর্ণে। কী আশ্চর্য সাবলীল ও মসৃণ চলন এই সনেটগুলির
“এ তীর্থে আসবে যদি ধীরে অতি পা ফেলো সুন্দরী, / মুকুন্দরামের রক্ত মিশে আছে এ মাটির গায় / ছিন্ন তালপত্র ধরে এসো সেই গ্রন্থ পাঠ করি / কত অশ্রু লেগে আছে এই জীর্ণ তালের পাতায়।/ কবির কামনা হয়ে আসবে কি, হে বন্য বালিকা / অভাবে অজগর জেনো তবে আমার টোটেম,/ সতেজ খুনের মতো এঁকে দেবো হিঙ্গুলের টিকা/ তোমার কপালে লাল, আর দীন দরিদ্রের প্রেম।/ সে কোন গোত্রের মন্ত্রে বলো বন্ধু তোমাকে বরণ/ করে এই ঘরে তুলি? আমার তো কপিলে বিশ্বাস/ প্রেম করে নিয়েছিল ধর্ম কিংবা সংঘের শরণ? / মরণের পরে শুধু ফিরে আসে কবরের ঘাস।/ যতক্ষণ ধরো এই তাম্রবর্ণ অঙ্গের গড়ন / তারপর কিছু নেই, তারপর হাসে ইতিহাস।” ইতালীয়, শেকসপিরীয় এবং ফরাসি সনেটের রীতিকে আত্মস্থ করেই তিনি একটা নিজস্বতার স্বাক্ষর রেখেছেন এইসব সনেটে। বিষয়ের মাধুর্য, চলনের সাবলীল প্রশান্তি তাঁর সনেটগুলিকে প্রসাদগুণে সমৃদ্ধ করে তুলেছে। গদ্য ও পদ্য ছন্দে সমান দক্ষ জাদুকর তাঁর কবিতার ভাষাকে ইচ্ছেমতো ছন্দের শাসনে বেঁধেছেন এবং মুক্তি দিয়েছেন “আমার মায়ের সোনার নোলক হারিয়ে গেল শেষে / হেথায় খুঁজি হোথায় খুঁজি সারা বাংলাদেশে।/ নদীর কাছে গিয়েছিলাম, আছে তোমার কাছে? / –হাত দিওনা আমার শরীর ভরা বোয়াল মাছে। (নোলক)
পাশাপাশি তাঁর কবিতার গদ্যধর্মী চলনটিও অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী
“আমি কি বলেছিলাম ঘর ভেঙে আমার কাছে এসো/ আমি কি বলেছিলাম যমুনায় কলস ভাসিয়ে / সিক্ত অঙ্গে কদমতলায় মিলিত হও?/ আমি তো বলিনি লাজ লজ্জা সংসার সম্পর্ক যমুনার জলে ভাসিয়ে দাও / আমি তো নদীর স্বভাব জানি, স্রোত বুঝি, কুলভাঙা বুঝি। / কিন্তু তোমাকে বুঝতে বাঁশিতে দেখ কতগুলো ছিল / সব ছিদ্র থেকেই ফু বেরোয় / আর আমার বুক থেকে রক্ত।” (কদম ফুলের ইতিবৃত্ত)
প্রকৃতি, চেনা জীবনের ছাঁচ, দ্রোহ, প্রেম ও যৌনতা আল মাহমুদের কবিতার প্রণিধানযোগ্য উপজীব্য বিষয়। পানকৌড়ির রক্তেও এসেছে সেই অন্তরালবর্তী যৌনতা। সেটা কবিতাতেও এসেছে বারংবার নানারূপে, বিচিত্র ছদ্মবেশে “এমনকি মেয়েরা যখন কলতলায় শাড়ি পালটায়, /আমার চোখ নির্লজ্জের মতো দ্রুত দেখে নেয়।/ সাতপার্ট কাপড় যেখানে কাচের মতো স্বচ্ছ/ কে আর আমাকে অন্ধ করতে পারবে?” (উলটানো চোখ) “প্রতিটি বস্তুতে দেখি লেগে আছে চিহ্ন মানবীর/ হাওয়ায় জলের ঢেউয়ে, গুল্মের স্তবকে স্তবকে / বইছে নারী ঘ্রাণ, কমনীয় যুগান্ত সঞ্চারী। ( অস্ত্রাণ) তাঁর ছোটোগল্পগুলিতেও এসেছে কাব্যগন্ধী যৌনতার ছোঁয়া “শিশুটিকে মনে হচ্ছে হাত ফসকে
বেরিয়ে পড়া টাকি মাছের মতো লম্বমান। (জলবেশ্যা)
“অজ্ঞান দেহটা উবুড় হয়ে পড়ল বেউলার বুকের ওপর। এমনভাবে পড়ল, দেখলে মনে হবে কোনো রমণরত পুরুষ তার অংশভাগিনীকে মধুরতম পুলকের মাঝে আলোড়িত
করতে করতে দাঁত দিয়ে বক্ষ বতুল মর্দন করছে।” (জলবেশ্যা)
“পানকৌড়ির রক্ত” গল্পের শেষেও শিকারভূমি আর দাম্পত্য বিছানা একাকার হয়ে যায়। একনলা বন্দুক হয়ে ওঠে উদ্ধত পুরুষাঙ্গের এলিগরি। ত্রিকোণাকৃতি চরভূমি আর নারীর রোমাবৃত যৌনাঙ্গ মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় ‘আমি দেখলাম, একটি শ্যামবর্ণ নারী শরীর নদীর নীলিমায় আপন রক্তের মধ্যে তোলপাড় করছে। মনে হল, আলোকিত এই মুখ, বাহু, বুক যুগল উরু আমার চেনা … বারুদের গন্ধে আমার চারপাশটা ভরে যেতে
লাগল । //
