লিঙ্গোপেন – অভীক মুখোপাধ্যায়

›› গল্পের অংশ বিশেষ  

…..লিঙ্গোর ভাইদের ওইসব সহচরীরা প্রায়ই লিঙ্গোর গানবাজনা শুনতে পেত। প্রথম দিকে ব্যাপারটা না বুঝলেও পরে অদ্ভুত মোহ কাজ করত তাদের মধ্যে। লুকিয়ে চুরিয়ে শুনতে বসত। অলীক এক যুগলবন্দী জন্ম নিল এভাবেই- এক গায়ক-বাদকের সঙ্গে তার দর্শকদের। কালো কষ্টিপাথরের মতো দেহ নিয়ে মাদর চাপড়াত লিঙ্গোপেন। কামাতুর রমণীদের কটিদেশে হিল্লোল তুলত সেই তাল। কল্পনায় লিঙ্গোর আঙুলের ছন্দ যেন তাদের দেহবল্লরীতেই তুফান তুলত। লিঙ্গোর গান শুনতে শুনতে মোহিত রমণীরা আপন স্তনে এঁকে নিত অদৃশ্য আলপনা। তারা তখন পৃথিবীর প্রথম গান শুনছে। নদীর বালুচরে বসে লিঙ্গো বাঁশের বাঁশিতে ফুঁ দিত। মাদক শব্দে ভরে যেত অরণ্য। রমণীদের দুঃসাহসী
কল্পনায় সেই বায়ুপ্রবাহের স্পন্দনে জাগত তাদের আবেশ কন্টকিত স্ত্রী-অঙ্গ। একসময়ে গানের সুর শুনতে শুনতে তাদের চোখ বুজে যেত। গোপন স্পর্শজ্বরে তাদের মাতাল অঙ্গুলিসঞ্চারে নদীতট থেকে বহুদূরে থেকেও থরথর কম্পনে শিহরিত হত তাদের সুখার্জ দেহ। মাদরের শব্দে যেমন কাঁপত নদীর জল, ঠিক সেভাবে। লিঙ্গো অবশ্য এসবের কিছুই জানত না। তার ক্ষুধা ছিল না, তেষ্টা পেত না, আর এহেন শরীরী উত্তাপের বাসনা তো একদমই ছিল না। তাকে দু’চোখ ভরেই ভোগ করত ওই সাত রমণী। নিত্যদিন।
ওই সাত রমণীর সাত সহচর ফিরে আসত সন্ধে নামার আগে। এমনিতে প্রতিদিন লিঙ্গোর গীতবাদ্যের মূর্ছনায় আত্মরতিকামী রমণীর দল তাদের সহচরদের আসার আগেই সঠিক সময়ে বাসায় ফিরে এলেও একদিন দেরি হয়ে গেল। সাত ভাই ফিরে দেখল বাসায় আগুন নিভুনিভু। কেউ কোথাও নেই। যে গাছতলায় বসে বসে সাত সখী একে অন্যের চুল থেকে উকুন বেছে দিত, গা চুলকে দিত, দলাদলি করে দিত পরস্পরের পেলব দেহ, সেখানেও তখন নীরব রিক্ততা। আগুনকে ঘিরে পাথর সাজিয়ে বসে থাকা সঙ্গিনীর দল অন্যদিন মাংস ঝলসে প্রস্তুত করত তাদেরই জন্য। অথচ সেদিন সব ভোঁ ভা। অনেক দেরীতে ফিরল রমণীকুল। রতিক্লান্তি চোখেমুখে। এভাবেই বিলম্ব ঘটল একদিন, দুদিন, তিনদিন। পরপর। ক্ষেপে উঠল সাত ভাই। হচ্ছেটা কী?
আর যদিওবা তারা দেরি করে ফিরত, কোথায় গেল তাদের কোমলবাহু সালিঙ্গন মুখচুম্বন? তার বদলে তাদের ওষ্ঠে অদ্ভুত এক গুনগুন— ওরা যে তখনও জানত না, ওটাকেই গান বলে। সাত পুরুষ অবাক পানে তাকাচ্ছিল সহচরীদের উদ্দেশে। কিন্তু তাদের তখন হুঁশ নেই। উদাসীন দৃষ্টি। বিস্রস্ত কেশ। বিধ্বস্ত শরীরে যেন সঙ্গোমোত্তর শ্রান্তির চিহ্ন প্রকট।….

….আর সেইদিনই একটা মজার ঘটনা ঘটল। লিঙ্গো সাত রমণীকে দেখতে পেয়ে ডেকে নিল নিজের কাছে। সাত সখী লিঙ্গোকে ঘিরে ঘুরে ঘুরে নাচতে লাগল। লিঙ্গো তখন গাইতে গাইতে বাজনা বাজাচ্ছিল। মাদর? নাকি রামবাজনা? তখন তো কোনটার কী নাম কেউ জানত না। কেউ ঠিক করেনি বাদ্যের পরিচয়। একজন নারী লিঙ্গোর পিছনে বসে তাকে জড়িয়ে ধরার ভঙ্গীতে বাজনায় ঠাপ দিতে শুরু করল। তাল নেই, লয় নেই। অন্য একজন রমণী তুলে নিল বাঁশিটা। ফুঁ দিল। সুর নেই, কিন্তু শব্দ বের হল অস্পষ্ট। তারপর সে কেশে ফেলল- খুক খুক। দমের ব্যাপারটা যে অত সোজা নয় সেটা বুঝতে এটুকু সময় তার লাগলই। আর-এক রমণী উন্মত্ত হয়ে নিজের ডান পাটাই চাপিয়ে দিল বালুতে বসে থাকা লিঙ্গোর বাম কাঁধে। শরীরের অবিশ্বাস্য নমনীয়তা নিয়ে লিঙ্গোর মুখে নেমে এল তার মুখ। ঝাঁকড়া চুলের রাশিতে ঢেকে গেল লিঙ্গোর অবয়বের উপরি অংশ। বাইরে থেকে দেখা না গেলেও বোঝা গেল প্রগাঢ় চুম্বনে সেই নারী বেঁধে ফেলেছে লিঙ্গোকে। কারণ ততক্ষণে থেমে গেছে লিঙ্গোর গান। কিন্তু বাজিয়ে চলল লিঙ্গোপেন। ধরে নেওয়া যেতেই পারে যে, এটা গানের সেই অংশ, যখন নির্দিষ্ট ছন্দে বাদ্যি বাজতে থাকলেও গান থেমে যায় কিছুক্ষণের জন্য, হারিয়ে যায় মানুষের কণ্ঠ।….