লাল লকেট – সীমা ব্যানার্জী-রায়

›› সম্পুর্ণ গল্প  

পনেরোই ফেব্রুয়ারি। ‘ভ্যালেন্টাইন-ডে’এর ঠিক পরের এক ফেকাসে দিন। দক্ষিণপশ্চিম আমেরিকার লুইজিয়ানার স্টেটের নামকরা প্রাইভেট কলেজ ‘ব্যাটন রুজ স্কুল অফ কম্পিউটার’ এর কমনরুমে বেশ সরগরম। বাইরে কনকনে ঠান্ডা। গরম ক্যাপুচিনো আর সিন্নামন ওয়াফল-এর গন্ধে চারিদিক ম ম করছে। ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে বসে আছে টগবগে স্টুডেন্টরা। ‘হা হা, হি হি হাসিতে মুখরিত হয়ে উঠছে গোটা কমনরুম।
লীনাদের গ্রুপের প্রত্যেকেই অভিজাত পরিবারের। ওদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রাণোচ্ছ্বল মেয়ে হল বেকি। বয়স মেরে কেটে কুড়ি। ছোট্টখাটো মিষ্টি চেহারার স্মার্ট একটা মেয়ে। পড়াশুনোয় তুখোড়। সবসময় নিজেকে ফিটফাট রাখে। বাজারের সেরা জামাকাপড় ছাড়া পরে না। ‘এখনও বেকির দেখা নেই যে! আজকে তো একটা পরীক্ষাও আছে।’ লীনার প্রশ্নটা শেষ হতে না হতেই এসে পৌঁছল বেকি। সাজসজ্জাহীন ম্লান চেহারা।
‘ব্যাপারটা কি? বেকি এত উদাস!”
প্রশ্নটা সবার মনে জাগলেও শেরিই মুখ ফুটে বলে ফেলল, ‘তোকে এরকম দেখাচ্ছে! এনি প্রবলেম বেকি?”
বেকি কাঁধ ঝাঁকাল। সেই পরিচিত স্মার্ট ভঙ্গী। বলল, ‘কই না তো। কিছুই হয় নি। এ্যাম ফাইন দোও।’
“আমরা কিন্তু তোর মধ্যে একটা মন খারাপিয়া বাঁশির সুর শুনতে পাচ্ছি। ইউ লুকড পেইল।’ একসঙ্গে বলল ওরা।
বেকি কোনও উত্তর দিল না। মন খারাপ করা ওদের ধাতে নেই। অথবা বয়সটাই এমন, যে ওরা বেশিক্ষণ মন খারাপ করে থাকতে পারে না। বরং মন খারাপ নিয়ে আসলে ওদের সঙ্গে থাকার কিছুক্ষণের মধ্যে মনটা আপনা থেকেই ভাল হয়ে যায়।
শেরি হৈ হৈ করে উঠল, ‘বেকি কাল “ভি-ডে” স্পেশাল কি করলি বল? আমরা দুর্দান্ত মজা করেছি এজ ইউজুয়াল। ওয়াট এবাউট ইউ, ডিয়ার? আমাদের সব শেয়ার করা হয়ে গিয়েছে। তোরটাই শুধু শুনতে বাকি। তাছাড়া তোর তো সবে একবছর হল। প্লিজ। তাড়াতাড়ি গল্প শেয়ার কর… উই আর সো এক্সাইটেড!’ বলে চোখ মেরে দিল সবার দিকে।
– “শুনবি না দেখবি?’ বেকি যেন রহস্যময়ী।
– “তাহলে দেখিই আগে।’ সবাই মিলে উদগ্রীব যে বেকি কি দেখাবে।
নিজের হাইনেক শার্টের সামনের গলার কাছের জিপটা এক ঝটকায় খুলে ফেলল বেকি। টকটকে ফরসা গলায় নখের আঁচড়ানোর লাল লাল বুটিক। তার নিচে নীল কালশিটের দোরোখা ।
– “ও…হ মাই গড! এসব কি? কি হয়েছিল?’ কেউ কঁকিয়ে উঠল আর কেউ শিউরে চোখ বন্ধ করে ফেলল বেকির শরীরের উলকি দেখে। বেকি বলল, “আরে তোরা এরকম করছিস কেন? এগুলো হল আমার দুর্দান্ত ভালবাসার চিহ্ন। ডোন্ট ওরি। এখনও তো শোনা বাকি। শোন তাহলে?” কেউই আগ্রহ বা অনাগ্রহ দেখাল না। বেকি বলতে শুরু করল, ‘কাল ক্লাস থেকে ফিরে আমরা দুজনেই গেলাম নাইট শো পার্টিতে। তোরা তো জিনিকে চিনিস । আমার সঙ্গে স্কুলে পড়ত। সেই জিনি এখন ডিভোর্সী। আমরা পৌঁছতেই জিনি ছুটে এল আমাদের কাছে। একসঙ্গে ডিনার সারলাম। তারপরেই জিনিকে নিয়েই গানের তালে তালে নাচ শুরু করল মাই হার্ট ব্রেক লাভ মাইক। তখন মাইকের এমন মত্ত অবস্থা যেন আমাকে চেনেই না।’
বেকির বন্ধুরা নীরব। পরস্পরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছে। বেকি এক মুহূর্তের জন্যে থেমে আবার বলল, ‘আমি অনেক আশা নিয়ে গেছিলাম! প্রচণ্ড অপমানিত মনে হল নিজেকে। মাইকের জন্যে তখন আমার মনে একরাশ ঘৃণা আর ঈর্ষার বাস। তা সত্ত্বেও ওর কাছে গিয়ে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরতে গেলাম। আমি যেন অন্য কেউ। আমার হাতগুলো সরিয়ে দিল। ওদিকে জিনির মাথা তখন ওর বুকে। মনে হল এত ভিড়েও আমি একদম একলা দাঁড়িয়ে। চারিদিকে ধু ধু ফাঁকা মাঠ। এই প্রেমহীণ পৃথিবীতে কে ফিরিয়ে দেবে আমার প্রেমের ভূষিত জলধারা। আর সহ্য হল না। একটা তীব্র ছটফটানি।’
একটানা এতটা বলে বেকি হাঁপিয়ে উঠেছিল।
শেরি ওর পিঠে হাত রাখল।
‘সব মেয়েই বোধ হয় তার ভালোলাগার মানুষকে, আদরের মানুষকে একান্ত গোপনে পেতে চায়। ভিড়ের মধ্যে সেই গোপনীয়তা থাকে না। সব কিছু যেন নগ্ন। সেখানে নিজের ভালবাসার মানুষটাই যদি চোখের সামনে এদিকওদিক উকিঝুঁকি মারে! যদি অন্য পাঁচজনের সঙ্গে তুলনা করে নিজের প্রেমিকার বাজারদর যাচাই করতে চায়! তার চেয়ে বড় অপমান আর কি হতে পারে একটা প্রেমিকার জন্যে!’
বেকির গলার স্বরে আমাদের সম্বিৎ ফিরে এল। রাগে, দুঃখে, লজ্জা আর অপমানে জ্বলতে জ্বলতে গাড়ি নিয়ে চলে এলাম। ভাগ্যিস যাবার সময় গাড়িটা আমি চালিয়েছিলাম। সেইজন্যে চাবিটা আমার কাছেই ছিল। লাল ড্রেস-টাকে সহ্য করতে পারছিলাম না আর। লালের আগুন তখন সারা শরীর ঝলসে দিচ্ছিল। ফ্ল্যাটে ফিরেই একটানে খুলে ফেলে দিলাম। চারিদিকে লাল ক্যান্ডেল রেখেছিলাম। সেগুলো সরিয়ে রাখলাম বিছানাটাই সেই মূহুর্তে ছিল নিরাপদ আশ্রয়। বাইরে তখন অবিরাম বিদ্যুতের ঝলকানি। সঙ্গে ঝমঝম করে বৃষ্টি নেমেছে। মনে হল প্রকৃতি যেন আমার ব্যথাটাই ঢেলে দিচ্ছে বৃষ্টির ফোঁটার সঙ্গে।
কাঁদতে কাঁদতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম টের পাই নি। হঠাৎ বুঝলাম আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে মাইক। আমার এক বছরের উত্তাল প্রেমের সঙ্গী। আমাকে আদরে আদরে ভরিয়ে দিচ্ছে। ছিটকে ফেলে দিলাম ওকে। বললাম, ‘আমি কেন, জিনি কোথায়? আমি তো তোমার এক বছরের পুরোনো জামা। শুনে আমার উপর রাগ দেখাতে লাগল। বলে, আজকের মত দিনে এসব কথা বলার মানে কি? আবার কৈফিয়ত ও চায় আমি কেন ওকে না জানিয়ে চলে এসেছি?
অস্ফুট স্বরে শেরি শুধল, “তারপর?”
“আমি রেগে বিছানা থেকে উঠতে গেলাম। ও আমাকে জোর করে ধরে পাশবিক খেলায় মেতে উঠল। ধীরে ধীরে অবশ হয়ে গেলাম। ওর শক্ত শরীরের নিচে তখন আমি। ওকে সরানোর মত ক্ষমতাও ছিল না আমার। হাত, মুখ আর গলা বেয়ে নামতে লাগল ওর উদ্দাম ভালবাসার নিশান। অনেকটা ‘উলটি-পালটি ক্ষণেক ধরিয়া পরখ করিয়া দেখিতে চায়’। আমি কি আর তখন আমাতে ছিলাম?” বলে একটু দম নিল বেকি।
কফি এসে গিয়েছিল টেবিলে। কফির কাপে চুমুক দিয়ে, জোর করে মুখে হাসি টেনে আনল, ‘তারপর… ঠিক তারপরই আমাকে এই গাঢ় টকটকে লাল রঙের ভালবাসার প্রতীক দেওয়া লকেটটা পরিয়ে দিল। আমি তখন ওর হাতে বন্দী অবস্থায় প্রায় অচৈতন্য, অবশ। আজ সকালে চোখে পড়ল, গলায় এই লাল হার্ট-শেপড লকেটটা। কি সুন্দর লকেট! তাই না রে?”
সক্কলে চুপ। বন্ধুদের দিকে না তাকিয়ে বেকির নীল চোখ ঘোরাফেরা করছে কম্যুনিটি হলের এ সিলিং থেকে ও সিলিং। ধরাধরা গলায় বলে উঠল, ‘একটু অন্যরকম মানছি। কিন্তু এই প্রেমের গল্পটায় নতুনত্ব আছে কিনা বল? একঘেয়েমি নেই, তাই না?”
এবারও বেকির কথার কেউ উত্তর দিল না। ‘আমি কিন্তু আমার একমাত্র ভ্যালেন্টাইন মাইককে আমার চেয়েও বেশি ভালবাসি।’ বলে লকেটটায় পরপর তিনবার চুমু খেল বেকি। ওর মুখে তখন উদাসীনতার মেঘ কেটে গিয়ে স্নিগ্ধতার গোলাপী রোদ ছড়িয়ে পড়েছে।