চাঁদের গায়ে চাঁদ – বিশ্বজিৎ পাণ্ডা

›› প্রবন্ধর অংশ বিশেষ  

…..সমকামীরা সামাজিক-সাহিত্যিক মর্যাদা তো পানইনি, বরং তাঁদের ব্যঙ্গ করা হয়েছে। অথচ এই যৌন-পরিচয়ের দায় তো তাঁদের নয়। প্রকৃতিগতভাবে প্রাপ্ত এহেন যৌনবোধ তাঁদের দীর্ণ করে। শরীরে এক, মনে আর এক। অন্য এক শরীরী খাঁচায় জোর করে পোরা একটা মন। পুরুষ শরীরে নারী মন; অথবা নারী শরীরে বন্দি পুরুষ মন। পুরুষ অথবা নারী— এই প্রথাগত কোনও একটি লিঙ্গ পরিচয়ে পরিচিত হতে না পারার বেদনা প্রতি মুহূর্তেই বহন করে চলতে হয় সমগ্র সত্তায়। এ তো অবজ্ঞা অবহেলা করবার বিষয় নয়। এই মানুষদের হাহাকার, খাঁচাবন্দি প্রাণের তীব্র যন্ত্রণা যে কোনও মানুষকেই ব্যথিত করবে স্বাভাবিকভাবেই। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই মানুষেরা আমাদের সহানুভূতি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এ ব্যাপারে আমাদের ঘুম ভাঙল অনেক দেরিতে। বিদেশে সমকামীরা সামাজিকভাবে স্বীকৃত হওয়ার অনেক পরে এখানে সমকামীদের নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু হয়েছে। বিদেশের সমকামিতা নিয়ে তীব্র আলোড়নের ঢেউ এখানে এসেছে সম্প্রতি।
‘পুত্রার্থে ক্রিয়তে ভাৰ্যা/ পুত্র পিশু প্রয়োজনঃ’—সৃষ্টিরক্ষার প্রয়োজনীয়তাকে জোর দেওয়া হয়েছে এই প্রাচীন শ্লোকে। আমাদের সনাতন যৌন ভাবনার মূলে ক্রিয়াশীল এই বোধ । উৎপাদক ব্যবস্থা, বংশবৃদ্ধির সঙ্গে যৌনতার যোগ। আর তার জন্য দরকার নর-নারীর যৌন সম্পর্ক—বিপরীত লিঙ্গের যৌন মিলন। তাই সমলিঙ্গের যৌনতাকে আমরা তেমন গুরুত্ব দিইনি। সমাজের মতো সাহিত্যেও অনেকদিন পর্যন্ত প্রান্তিক ছিল সমলিঙ্গের যৌনতা। সময় বদলেছে। এখন আর নিজেদের আড়াল করতে চান না সমকামীরা। বিদেশের মতো এখানেও দাপটের সঙ্গে নিজেদের যৌন-পরিচয় প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন তাঁরা। সাম্প্রতিক সাহিত্যেও আর ব্রাত্য নয় সমকাম-সমকামীরা। সমকামের বিচিত্র বর্ণিল বিভঙ্গ বিষয় হয়ে উঠে আসছে বাংলা গল্প-উপন্যাস-কবিতায় ।
দুই সমলিঙ্গের মানুষের শরীরী সম্পর্কের কথা দেখেছি জগদীশ গুপ্তের ‘অরূপের রাস’ গল্পে। পাড়ার ব্রাহ্মণ কানুদাকে ভালোবেসেছিল শূদ্রাণী রাণু। কিন্তু বিয়ে হয়নি তাদের। দু’জনেরই বিয়ে হয় দু’জায়গায়। কানুর স্ত্রী ইন্দিরার সঙ্গে খুব ভাব রাণুর। বরের বদলির চাকরির সুবাদে রাণুকে চলে যেতে হবে অন্যত্র। তার আগের দিন রাতে ইন্দিরাকে তার কাছে শোয়ার আবদার করে রাণু। পরদিন কানুর কাছে সে অভিজ্ঞতার কথা বলে তার বউ ইন্দিরা-‘ যেন স্বামী আর স্ত্রী, সে আর আমি’। কানুর অনুভব — ‘ইন্দিরার অঙ্গ হইতে আমার স্পর্শ মুছিয়া লইয়া সে ত্বক রক্তপূর্ণ করিয়া লইয়া গেছে।… আমি তৃপ্ত।’ কানুদার শরীর পায়নি রাণু। তাই কানুদার শরীরের স্পর্শ লেগে থাকা কানুদার স্ত্রীর নিবিড় সান্নিধ্যে কানুদার শরীরের স্বাদ নিয়েছে সে। সমকাম ঃ ঠিক সমকাম হয়তো বলা যাবে না একে। রাণুকে সমকামী বলা যাবে না। কিন্তু দুটি সমলিঙ্গের মানুষের যৌনসংসর্গ তো ঘটলই। এখানে পুরুষ কানুর যৌনস্বাদ পেতে রাণু অবলম্বন হিসেবে গ্রহণ করেছিল কানুর যৌনসঙ্গী ইন্দিরাকে।
তবে এর কিছু পরে লেখা কমলকুমার মজুমদারের ‘মল্লিকা বাহার’ (‘চতুরঙ্গ’, ১৩৫৮) গল্পের বিষয় হয়ে উঠেছে সমকাম । এ গল্পের শোভনা নিজের মধ্যে গ্রহণ করেছে মল্লিকাকে। সোহাগ করে মালা পরিয়ে দিয়েছে তার গলায়। চুম্বনে চুম্বনে শোক ভুলিয়ে দিয়েছে। দৃঢ়কণ্ঠে সে বলেছে, ‘আমি তোমার স্বামী তুমি’—‘বউ’। ‘শুনে শোভনা আবেগে চুম্বন করলে। শোভনার মুখসৃত লাল মল্লিকার গালে লাগল।’ দুটি নারী স্বামী-স্ত্রী হিসেবে নিজেদের সম্পর্ককে চিহ্নিত করছে। এর আগে এত দৃঢ়তার সঙ্গে আর কাউকে এ কথা বলতে শোনেনি বাঙালি পাঠক। সেদিন থেকে বাংলা সাহিত্যে ‘মল্লিকা বাহার’—এই প্রথম উঠে এল সমকামের কথা।…..

…..অহনা বিশ্বাসের ‘পুতুলখেলা এবং একটি নতুন প্রেমের কাহিনি’ গল্পে সমকামী সম্পর্কের আর এক ছবি। স্বামীর নির্যাতন অবহেলা অনাদর বাধ্য করে প্রতিবেশী বাড়ির বউটির সঙ্গে সমকামে লিপ্ত হতে। স্বামীসান্নিধ্য না পেয়ে দুটি নারী নিজেদের কামনাকে তৃপ্ত করতে সমকামী সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ল। দীর্ঘদিনের যৌন-উপবাসী ঢ্যাঙা বউ পুরুষের বদলে বেছে নিল প্রতিবেশী নতুন বউকে। সদ্য বিয়ে করেও নতুন বউ স্বামী-সান্নিধ্য পায়নি। তার খিদে মিটল এভাবে। উল্লেখ্য ঢ্যাঙা বউ এবং নতুন বউ দু’জনই স্বামীর প্রেম পায়নি শুধু নয়, প্রেমহীন শরীরও না। আর এরা দু’জনের কাছে দু’জনে শরীরের সঙ্গে প্রেম-ভালোবাসাও পেল। তাই দুটি নারীর এ সম্পর্ক শুধু যৌনতার নয়, প্রেমেরও। এখানে প্রকৃতিগতভাবে সমকামী নয় এরা। বাধ্য হয়েই সমকামী হয়ে উঠেছে এরা। বাংলা সাহিত্যে সমকামের এই বৈচিত্র্যও উঠে এসেছে। সমকামী সম্পর্কের ভিন্ন একটি মাত্রা প্রকাশিত হয়েছে এখানে।
সমকাম নিয়ে লেখা আর একটি উপন্যাস তিলোত্তমা মজুমদারের ‘চাঁদের গায়ে চাঁদ’। নারী সমকামিতার অনেকগুলি স্তর উন্মোচিত হয়েছে এই উপন্যাসে। কলকাতার একটি ছাত্রী নিবাস এই উপন্যাসের পটভূমি। হোস্টেলের একটি ঘরে থাকে শ্রুতি, শ্রেয়সী ও দেবরূপা । দেবরূপার পোশাক-আশাক কিছুটা পুরুষোচিত। শ্রেয়সী ও দেবরূপা দু’জন দু’জনকে অন্যভাবে ভালোবাসে। শ্রেয়সীর প্রেমিক শুভ্রনীলকে সহ্য করতে পারে না দেবরূপা । সে একা আঁকড়ে রাখতে চায় তাকে। দুর্বার আগ্রাসী তার প্রেম। দেবরূপা প্রেমিক। আর শ্রেয়সী প্রেমিকা। কামুক পুরুষের মতো দেবরূপা মুগ্ধ হয় শ্রেয়সীর শরীরী বিভঙ্গে। তার সঙ্গে মিলিত হয়।
এই উপন্যাসে দেবরূপার যৌন সম্ভোগের আরও একটি স্বরূপ উদ্ঘাটিত হয়েছে। অনেকদিন পরের ঘটনা। শ্রুতি একটি এনজিও-তে কাজ করে তখন। দেবরূপা ও হাজির হয় সেখানে। ঘটনাচক্রে একটি মেয়েও আসে। ললিতা তার নাম। আসলে সে শরীরে পুরুষ। কিন্তু তার মনটা নারীর। নারী সেজে থাকে সে। বুকে কাপড় বাঁধা, খোলা জায়গায় স্নান করতে চায় না। সেই ললিতার সঙ্গেও সম্ভোগে লিপ্ত হয় দেবরূপা। এ দৃশ্যও চোখে পড়ে শ্রুতির—’দেবরূপার শাড়ি উঠে গেছে কোমরে। পা ছড়ানো। ওর কোলে ললিতা। গায়ে শার্ট নেই। বুকে একটি কাপড় কাঁচুলির মতো বাঁধা। তার ওপর দেবরূপার হাত খেলছে। দু’জনের মুখ একপাশে নামানো। এর ঠোটে ওর ঠোঁট ঢুকে আছে। কোনও হুঁশ নেই। ছোট্ট সুকুমার শ্রুতির কাছে জানতে চায়, ওরা কী করছে। তার উত্তরে শ্রুতির চমৎকার মন্তব্য— ‘ওরা রাধাকৃষ্ণ খেলছে সুকুমার। কিন্তু কে রাধা আর কে কৃষ্ণ! আজ কৃষ্ণ রাধা সেজেছে আর রাধা কেষ্টটি সেজে মজা করছে। শ্রুতির জবানিতে লেখকের বক্তব্য- ‘ওরা শরীর-প্রকৃতি ছাপিয়ে গেছে। মন-প্রকৃতিতে মিলেছে। চিরন্তন পুরুষমনে মিলেছে। দেহ-গঠন এখানে বাধা হয়নি। নারীদেহধারী পুরুষ, পুরুষদেহী নারীকে জড়িয়েছে। জয় প্রকৃতির জয়।
মনে পড়ে শ্রীচৈতন্যের আবির্ভাবের কারণ সম্পর্কে বলা হয, প্রেমের তিনটি স্বরূপ আস্বাদনের জন্য রাধাভাব-সমন্বিত শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্যরূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন। রাধার প্রেমমহিমা কেমন; রাধা প্রেম-সহকারে যা আস্বাদন করেন, কৃষ্ণের সেই বিচিত্র মাধুর্যই বা কী রকম; এবং কৃষ্ণের অনুভববশত রাধা যে আনন্দ অনুভব করেন, সেই আনন্দই বা কী প্রকার – এই তিনটি বিষয়ে লোভবশবর্তী হয়ে হয়ে রাধাভাবদ্যুতি সুবলিত কৃষ্ণের জন্ম হয় শচীমাতার গর্ভে। একই দেহে রাধা ও কৃষ্ণ। নারী ও পুরুষ। দেবরূপা ললিতার মধ্যেও দুই রূপ একাধারে ।
রাধা-কৃষ্ণই খেলেছিল তারা। শরীর সেখানে অবান্তর। প্রাধান্য পেয়েছে মন। মনেরই জয়। এক মন মিলিত হয়েছে আর এক মনের সঙ্গে। এরই নাম প্রেম। এটাই তো প্রেম-মাহাত্ম্য।…..