মহাভারতে বিবাহ – শামিম আহমেদ

›› বই এর অংশ / সংক্ষেপিত  

(সংক্ষেপিত)

প্রাক্ কথন

……গ্রন্থটির প্রথম অধ্যায় হল, বিবাহের পটভূমি। সেখানে বিবাহের সংজ্ঞা বিষয়ে যেমন আলােচনা আছে, তেমনই রয়েছে বিবাহের উৎপত্তি নিয়ে নানা কথা। পরিবার ও বিবাহ— কোনটি পুর্ববর্তী, তা নিয়েও সামানা আলােকপাত করা হয়েছে অংশটিতে। দ্বিতীয় অধ্যায়ে বিবাহের নানা বিভাগের কথা বলা হয়েছে। ব্রাহ্ম, দৈব, আর্ব, প্রাজাপত্য, অসুর, গন্ধর্ব, রাক্ষস ও পৈশাচ এই আট প্রকার বিবাহের আলােচনা করে মহাভারতের কিছু দৃষ্টান্তের কথা উল্লিখিত হয়েছে। | বিবাহের পূর্বে যৌন-সম্পর্কে আবদ্ধ হওয়া এই যুগে তখন বিরল নয়। মহাভারতের সময়ে এই প্রাক-বৈবাহিক সম্পর্কের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। এতে মহিলারা গর্ভবতী হয়ে পড়াতেন। যেহেতু সেই যুগে স্বেচ্ছায় গর্ভপাতের উদাহরণ তেমন নেই বা অপ্রচলিত ছিল, তাই কুমারীকে সন্তান-প্রসবও করতে হয়। এই সময় মতাে তখনও ব্যাপারটি সমাজে অননুমোদিত, অনভিপ্রেত ও নিন্দাজনক ছিল। সত্যবতী ও কুন্তী এমনই দুই কুমারী মাত্রা। তবে ইদানীং কুমারী মায়ের বিবাহ যেমন দুষ্কর, তখন বিষয়টি এত কঠিন ছিল বলে মনে হয় । সত্যবতী ও কুন্তীর বিবাহ হয়েছিল। ঘদিও সেই কথা গােপন করে বিয়ে হয়েছিল; পরবর্তী কালে কথা প্রকাশ হলে তাঁদের শাস্তি পেতে হয়নি। ……….পুরুষ ইচ্ছা করলে একের অধিক স্ত্রী রাখতে পারে। বিচিত্রবীর্য, ধৃতরাষ্ট্র, পা থেকে পঞ্চপাণ্ডব সকলেরই একাধিক সঙ্গিনী। এই যে। বহুপত্নীবাদ, তার পিছনে ঠিক কী কারণ থাকতে পারে? পুরুষের সংখ্যা কম, এমন একটি সামাজিক কারণ তো থাকেই কিন্তু সেখানে পুরুষের সংখ্যা কম নয়, সেখানে এই বহুপত্নীবাদের মূলে আছে পুরুষের বহুগামিতা। সেই নিয়ে ষষ্ঠ অধ্যায়।

….দশম অধ্যায়ের বিষয়, বিবাহের উদ্দেশা। মিলানাক্ষীকে বিবাহের মূল উদ্দেশ্য বলে মনে হলেও মহাভারতে বিয়ের প্রধান উদ্দেশ্য হল পুত্ৰলাভ। সেই পুত্রলাভের জন্য নিয়ােগপ্রথারও সমর্থন আছে, যা আলােচিত হয়েছে একাদশ অধ্যায়। পরবর্তী অধ্যায়গুলিত্তে আছে বিধবা বিবাহ,দাসী রক্ষিতা পণিকা, নারীর বহুবিবাহ, বিবাহ বিচ্ছেদ, সতীত্ব বনাম অসতীত্ব, গর্ভাধান প্রভৃতি বিষয়। ………

পটভূমি

…………মহাভারত অনুযায়ী, উদ্দালকপুত্র শ্বেতকেতু বিবাহ-প্রথার প্রবর্তক। মহাভারতের আদিপর্বে দেখা যায়, পাণ্ডু কুন্তীকে সন্তানলাভের জন্য নিয়ােগপ্রথার দ্বারস্থ হতে বলছেন। কুন্তী ‘তাতে রাজি না হলে পান্ডূ তাকে প্রাচীন ধর্মতত্ত্ব” শােনাচ্ছেন।

“চারুহাসিনি: প্রাচীনকালে সব স্ত্রীলোক অনবরুদ্ধ ছিল এবং তারা ইচ্ছানুসারে বিহার করে বেড়াত, তারা স্বাধীন ছিল।

……..

তারা বিয়ের পর থেকে পতিকে ছেড়ে নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী পরপুরুষের সঙ্গে বিচরণ করত, এতে তাদের অধর্ম হত না। ……..

…… উত্তর কুরুদেশে এখনও এই নিয়ম চালু আছে। এই আচার স্ত্রীলােকের প্রতি অনুগ্রহসূচক।”

এখানে খেয়াল করার মতো কয়েকটা বিষয় রয়েছে। এক, কামাচারে স্ত্রী স্বাধীন ছিল। দুই, বিয়ের পর পতি ছাড়া অন্য পুরুষের সঙ্গে সঙ্গম করা যেত। তিন, স্বৈরাচার বন্ধ হয়েছে যৌন-ঈর্ষার কারণে। এস্থানে ‘বিবাহ’ নামক প্রতিষ্ঠান আছে, আবার নারী যৌনাচারে স্বাধীন (অবশ্য পুরুষও তাই)। …… ‘সুন্দরি! বেশি দিন হয়নি, যে কারণে যিনি এই দেশে এই নিয়ম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তা তুমি বিস্তারিত ভাবে শ্রবণ কর। উদ্দালক’ নামক এক মহর্ষি ছিলেন, তাঁর পুত্রের নাম ‘শ্বেতকেতু’ তিনিও মুনি ছিলেন। একদিন এক ব্রাক্ষণ উদ্দালকের সামনে শ্বেতকেতুর মায়ের হাত ধরে বলেছিলেন, ‘চলাে আমরা যাই’। ব্রাহ্মণ যখন শ্বেতাকেতুর মাকে বলিষ্ঠ ভাবে নিয়ে যাচ্ছেন, তখন শ্বেতকেতু অসহিষ্ণু হয়ে পড়লেন। তিনি প্রচণ্ড রেগেও গেলেন। তার সেই রূপ দেখে পিতা উদ্দালক বললেন, “তুমি রাগ কোরাে না, এটাই স্ত্রীলােকের চিরাচরিত ধর্ম। জগতে সকল বর্ণে স্ত্রীলােক অবরুদ্ধ। গাভী যেমন স্বেচ্ছাচরিণী, মানবীও তেমন নিজ নিজ বর্ণে স্বেচ্ছাচারিণী হয়ে থাকে। তবে তারা কখনও রন্ধনাদি গৃহকর্যে অনবধানতা কর না। কিংবা ঋতুকালে ‘ভর্তিাকে পরিত্যাগ করে অন্য পুরুষের সংসর্গ করত না।”

উদ্দালকের এই বাণী থেকে বর্ণব্যবস্থা, স্ত্রীর রন্ধনকার্যে অবহেলা না করা এবং ঋতুকালে পুরুষের বীর্য ধারণ করে সন্তানের ব্যাপারে কোনও সন্দেহ না রাখা ইত্যাদি কথাও উঠে এসেছে। | শ্বেতকেতুর অবশ্য সে দিকে নজর দেওয়ার ধৈর্য ছিল না। তিনি প্রাচিন আচার সহ্য করেন না, জগতে সব স্ত্রী-পুরুষের জন্য নিয়ম স্থাপন করলেন। আজ থেকে যে রমণী পতিকে পরিত্যাগ করে অন্য পুরুষের সংসর্গ করবে, তার ভ্রূন হত্যা তুল্য ঘোরতর দুঃখজনত পাপ হবে। আবার, কন্যাকালে ব্রহ্মচারিণী এবং বিবাহের পর পতিব্রতা— এ হেন ভার্যাকে পরিত্যাগ করে যে পুরুষ অন্য স্ত্রীর সংসর্গ করবে, তারও এরূপ পাপই হবে। আর যে রমণী ক্ষেত্রজ পুত্র উৎপাদন করবার জন্য পতির আদেশ পেয়ে সেই আদেশ পালন করবে না, তারও এরূপ পাপ হবে।……….

…..যদিও পণ্ডিতরা বলেছেন যে শ্বেতকেতু বিবাহ-প্রথার প্রবর্তন করেন, তবুও এ কথা মানতে যথেষ্ট দ্বিধা আছে। শ্বেতকেতু কেবল পত্নীকে পতিব্রতা হাতে বলছেন, নইলে তার ঘােরতর পাপ হবে। সাধ্বী পত্নীকে বাদ দিয়ে অন্য স্ত্রী সংসর্গ করলে একই দশা হবে স্বামীরও। তা হলে বিবাহ-প্রথার প্রবর্তন শ্বেতকেতু করলেন কোথায়! তিনি শুধু এর সংস্কার করেছেন। দীর্ঘতমা’ নামের এক ঋষিও নারীদের একপতিত্ব বিধানের জনক।

দীর্ঘতমা বেদজ্ঞ পণ্ডিত এবং জন্মান্ধ। তাঁর স্ত্রী প্রদ্বেষী সুন্দরী ও যুবতী। উতথ্যপুত্র দীর্ঘতমা প্রদ্বেষীর গর্ভে গৌতম প্রভৃতি পুত্রের জন্ম দেন। এ হেন পণ্ডিত দীর্ঘতমা মুনি সুরভিনন্দনের কাছে গােধর্ম শিক্ষা করেন এবং তাতে বিশ্বাসী হয় সেই ধর্মের প্রচার করেন। কী সেই গোধর্ম আচরণ? তা হল প্রকাশমৈথুন। এতে আশ্রম মুনিরা দীর্ঘতমাকে ত্যাগ করেন। তারা পরস্পরকে বলতে লাগলেন, “কী আশ্চর্য! দীর্ঘতমা শিষ্টাচার পরিত্যাগ করল। সুতরাং সে এই আশ্রমে বাস করার যােগ্য নয়। চলো, ওই পাপাত্মাকে পরিত্যাগ করি।” মুনিরা সর্বতোভাবে তার সংস্রব ত্যাগ করলেন। দীর্ঘতমার এইরূপ কার্যে তাঁর স্ত্রীও তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা হারালেন, এমনকী স্বামীর প্রতি তার বিদ্বেষ উৎপন্ন হল। দীর্ঘতমা প্রদ্বেষীকে বললেন, “তুমি আমার প্রতি বিদ্বেষ করছ কেন?”

জবাবে প্ৰদ্বেষী জানালেন, “স্ত্রীকে ভরণ করেন বলে তাকে ভর্তা বলে এবং পালন করেন বলে পতি বলে।

…কিন্তু আমিই এ যাবৎ পুত্রদের সঙ্গে সর্বদা আপনার ভরণ করে আসছি এবং তাই ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। এখন আর আপনার ভার বইতে পারব

প্রদ্বেষীর এই বাক্যবাণ দীর্ঘতমা ক্রুদ্ধ হলেন। পুত্র ও পত্নীকে বললেন, “আমাকে কোনও ক্ষত্রিয়ের বাড়ি নিয়ে চাল, সেখানে ধন লাভের যোগ আছে।”

প্রদ্বেষী কলালেন, “ধন দুঃখের জনক, তাই তা গ্রহণ করার ইচ্ছা করি না। আপনার যা প্রাণ চায় তাই করুন, আমি কিন্তু আপনার ভার আর বইতে পারব না।” | দীর্ঘতমা বিধান দিলেন, “আজ থেকে জগতে স্বামি স্ত্রীলােকের নিয়ম প্রতিষ্ঠা করছি— যাবজ্জীবন স্ত্রীলােকের একমাত্র পতিই পরম অবলম্বন হবে। পতি মারা গেলে কিংবা জীবিত থাকলে, স্ত্রী ‘অন্য পুরুষ অবলম্বন করতে পারবে না; স্ত্রী অন্য পুরুষসংসর্গ করলে পতিত হবে।……

উদ্দালকের স্ত্রী, শ্বেতকেতুর মাকে যখন এক ব্রাহ্মণ হাত ধরে টোন নিয়ে যান, ঘন মনে হওয়া স্বাভাবিক যে একটা সময়ে অবাধ যৌনাচার প্রচলিত ছিল। …..

…..দীর্ঘতমার বিধান শুনে তার স্ত্রী প্রদ্বেয়ী অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হলেন। তিনি পুত্রদের বললেন, যাও! তােমাদের পিতাকে গঙ্গায় দিয়ে এসাে। সে বেচারার আর কী করবে। লােভে এবং মােহ আক্রান্ত দীর্ঘতমাপুত্রগন পিতাকে বেঁধে একটি ভেলায় তুলে গঙ্গায় ভাসিয়ে দিল। তারা এই কথা ভাবতে ভাবতে বাড়ি ফিরল, এই বৃদ্ধ অন্ধকে ভরণপােষণ করার সত্যিই কোনও মানে নেই।  অন্ধ দীর্ঘতম ভেলায় ভাসতে ভাসতে বহু দূর চলে গেলেন। ‘বলি’ নামক এক ধার্মিক রাজা স্নান করার জনা গঙ্গায় গিয়েছিলেন, তিনি দীর্ঘতমা মুনিকে দেখতে পেলেন এবং উদ্ধার করলেন। মুনির পরিচয় পেয়ে তিনি তাকে গৃহে নিয়ে গেলেন। উদ্দেশ্য, তাঁর ভার্যাদের গর্ভে পুত্রোৎপাদন। তেজস্বী দীর্ঘতমা মুনি এই প্রস্তাবে সম্মত হলেন। রাজা তার স্ত্রী সুদেষ্ণাকে দীর্ঘতমার কাছে পাঠালেন। সুদেষ্ণা দীর্ঘতমাকে অন্ধ ও বৃদ্ধ বলে অবজ্ঞা করলেন এবং নিজের ধাত্রীকন্যাকে তাঁর কাছে পাঠালেন। দীর্ঘতমা ঋষি সেই শুদ্রার গর্ভে কাক্ষীবান প্রভৃতি এগারোটি পুত্ৰ উৎপাদন করালেন। কয়েক দিন পর মুনি বলি-রাজাকে বললেন, আপনার স্ত্রী সুদেষ্ণা মুঢ়া, আমাকে অন্ধ ও বৃদ্ধ বলে অবজ্ঞা করেছে, তাই শুভ্রাকে আমার কাছে পাঠিয়েছিলেন। বলি পুনরায় সুদেষ্ণাকে মুনির কাছে পাঠালেন। সুদেষ্ণাদেবীর গর্ভে অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, পুণ্ড্র এবং সুক্ষ্ন নামে পাঁচটি সুর্যতুল্য তেজস্বী পুত্র জন্মাল। তাদের অধিকৃত দেশগুলিও তাদের নামে জগতে প্রসিদ্ধ হল। ……..মজার কথা হল, বলি রাজা পুত্রোৎপাদনে অসমর্থ ছিলেন না। তা হলে নারীর এক পতিত্বর যে বিধান দীর্ঘতমা দিয়েছিলেন তা লঘ্নন করার দায়িত্ব যেন তিনি নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। রাজা সৌদাসও পুত্রোৎপাদনে সমর্থ ছিলেন, তা সত্ত্বেও তাঁর স্ত্রী ময়ীর গর্ভে কুলপুরােহিত বশিষ্ঠ সন্তান উৎপাদন করেন। এখানেও একপতিত্ব – নারীর পতিব্রতা থাকা (যৌনাচার বিষয়ে) লঙ্ঘিত হচ্ছে।……….

…..মহা অষ্টাবক্র স্ত্রী-সম্ভোগের ইচ্ছায় বদান্য ঋষির কন্যা সুপ্রভাকে প্রার্থনা করালেন। রূপে অদ্বিতীয়া সেই কন্যা চরিত্রেও শােনা ছিল। বসন্তকালে ফুলে-গুরা বনশ্রণির মতো ‘আয়তলােচনা-সুপ্রভাকে দেখেই অষ্টাবক্র মােহিত হয়ে পড়লেন। ……….

………কুবের বললেন, “মহর্ষি! অপ্সরাদের নৃত্য উপভােগ করবেন? আপনার অনুমতি পেলে তারা নাচ শুরু করবে।” অষ্টাবক্র প্রসন্ন হয়ে বললেন, “হােক, নাচ হােক।” উর্বশী, মিশ্রকেশী, রম্ভা, উর্বরা, অলম্বু, ঘৃতাচী, চিত্রা, চিত্রাঙ্গণী, রুচি, মনােহরা, সুকেশী, সুমুখী, হাসিনী, প্রভা, বিদ্যুতা, প্রশমী, দাস্তা, বিদ্যোতা ও রতি প্রভৃতি অপ্সরা ধুম নাচ শুরু করল, গন্ধর্বরা বাজনা বাজাতে লাগল। অষ্টাবক্র সেই স্বর্গীয় নাচগান উপভােগ করতে লাগলেন। এই ভাবে প্রায় এক বহুর কেটে গেল। কুবরই একদিন বললেন সে কথা, ‘আপনার তাে এক বছর কেটে গেল এইখানে। তাই বলছিলাম কি, ইচ্ছা হলে আরও কিছু দিন থাকুন এখানে!” অষ্টাবক্র যেন লজ্জা পেলেন, “না, না! যথেষ্ট হয়েছে, আপনারা আমাকে খুব আদরযত্ন করেছেন, এ বার আমি যাব। …….তাঁর সেই কণ্ঠ শুনে কয়েকজন রমণী বেরিয়ে এল। তাঁদের সংখ্যা সাত। অপূর্ব সেই নারীদের রূপসৌন্দর্য অষ্টাবরে মন হরণ করল। তিনি যেন চিত্তকে বাগে আনতে পারছেন না, তার মন অবসন্ন হয়ে পড়ল। কিন্তু তাকে ধৈর্য ধরতেই হবে। কন্যারা অষ্টাবক্রকে বলল, ‘আপনি প্রবেশ করুন। ………..

…ব্রাহ্মণ! পুরুষের কামব্যবহার ছাড়া অন্য কিছুতেই স্ত্রীদের ধৈর্য্য থাকে না। আমি কামে মােহিত হয়ে আপনাকে ভজনা করছি, দয়া করে আপনিও ‘আমাকে ভজনা করুন।…..ব্ৰহ্মর্ষি! আপনি আমার গাত্রসংলগ্ন হােন, ‘আমার সঙ্গে রমণ করুন। আমাকে আলিঙ্গন করুন, আমি অত্যন্তু কামার্ত হয়েছি।……

….ধর্মাম্মা এটাই আপনার তপস্যার ফল যা অত্যন্ত প্রশস্ত ও প্রসিদ্ধ। আপনাকে দেখেই আমি ভজনা শুরু করেছি, আপনিও আমাকে ভজনা করুন। এই যে ধনসম্পত্তি দেখছেন, এ সবই আপনার। ব্রাহ্মণ আপনি সন্দেহ করবেন না। সর্বকামণাত্য ও সুন্দর এই বন, তার মধ্যে আমরা রমণ করুন, আমি আপনার অভীষ্ট পুরণ করব। আপনার বশীভূত হয়ে  আপনার ইচ্ছামতাে আমার সঙ্গে সঙ্গম করবেন। স্বর্গ-মর্তের সব অভীষ্ট আমরা ভােগ করব। পুরুষসংসর্গের চেয়ে আর কিছু রমণীদের অধিক প্রিয় নয় এবং তাই আমাদের পরম কাম। কামার্তা রমণী নিজ ইচ্ছায় চলে। …..

“ব্রাহ্মণ! কামদেব যেমন নারীদের প্রিয়, তেমন প্রিয় কিন্তু বায়ু, অগ্নি, বরুন বা অন্য দেবতারা নন। কারণ রতিই স্ত্রীলােকের স্বভাব। সহ স্ত্রীলােকের মধ্যে কখনও একটি সতী পাওয়া যায় এবং লক্ষ রমণীর মধ্যে কোনও একটি পতিব্রতা হয়।

…… পিতা, মাতা, ভ্রাতা, ভর্তা, পুত্র, দেবর বা কুল- স্ত্রীলোকেরা এ সবের তােয়াক্কা করে না। বৃহৎ নদী যেমন তীর নষ্ট করে, তেমনি রতিবিলাসী রমণীরা কুল নষ্ট করে। ……

……অর্জুন পরস্ত্রী উলুপীর সঙ্গে সঙ্গম করেন, উলুপীর সঙ্গে যখন অর্জুনের সাক্ষাৎ হয়, তখন অর্জুন ছিলেন ব্রহ্মচারী। উলুপী তাকে দেখে বলছেন, “আমি তােমাকে স্নানের সময় দেখে মােহিত হয়েছি। তােমাকে স্বামী হিসাবে পেতে চাই।” অর্জুন তার ব্রহ্মচর্যের কথা জানালেও উলুপী উড়িয়ে দিয়েছেন এই বলে, “আমি তোমার শরণাগত, শরণাগত রমণীর জীবন রক্ষা করাই ধর্ম।” অর্জুন উলুপীর সঙ্গে সর্ব প্রকারের সঙ্গম বলেন। ……

…….ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়ার মিলনকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। এই প্রশ্ন যুধিষ্ঠিরের মনের উদয় হয়েছিল। তিনি প্রাচীন-বিবাহ তথা সমকালীন-বিবাহের কথা মাথায় রেখে এই প্রশ্ন করেছিলেন পিতামহ ভীষ্মকে, “পিতামহ! এটা কীভাবে সঙ্গত হয়? নিকৃষ্ট যােনিতে উৎপন্ন লােক যে ব্রাহ্মণ হয়, এটা আমি মানতে পারছি না।”

ভীষ্ম জবাব দিচ্ছেন, “এটা কৌতুকের বিষয় নয়। এই সব ব্ৰহ্মর্ষিরা আত্মার উন্নতিসাধনে সমর্থ এবং তাদের উন্নতি নিকৃষ্ট যােনি কর্তৃক বাধিত হয় না। তাদের ব্রহ্মজ্ঞান বেশি বলে বােদে এঁদের ‘ঋষি’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, ঋতুস্নাত যে কোনও স্ত্রীলােক কোনও পুরুষকে প্রার্থনা করলে তাকে উপেক্ষা করা পাপ; সে ক্ষেত্রে বর্ণবিচারের অবকাশ কোথায়! এমন কথাও বলা আছে, শুদ্রকনা-গ্রহনে চার বর্ণের অধিকার শাস্ত্রসম্মত। ভীষ্মদেবও বলছেন, এই মিলনে উৎপন্ন পুত্ররা হীনযানিতে জম্মছেন বলে নিন্দনীয় নন। তারা আপ্ত। বৈশ বা শুদ্ৰযােনিতে উৎপন্ন হলে তাদের তপস্যা ও জ্ঞান যদি থাকে তাহলে তাঁদের ব্যক্তি ও কার্য প্রমাণ বলে স্বীকৃত হবে। ……

……..ধর্মানুসারে ব্রাহ্মণের চার প্রকার স্ত্রী হতে পারে- ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়া, বৈশ্য ও শূদ্রা। ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্রা এই তিন প্রকার ক্ষত্রিয়ের ভার্যা হয় এবং বৈশ্যের দুই প্রকার পত্নী বিহিত বৈশা ও শূদ্রা। শূদ্রাদের পক্ষে এক শুদ্ৰাই ভাব হতে পারে। শূদ্র যদি প্রতিলােম বিবাহ করে অর্থাৎ তার চেয়ে উন্নত বর্ণের কন্যাকে পত্নী হিসাবে গ্রহণ করে তাহলে তার সন্তান বর্ণসঙ্কর হয়। অন্য দিকে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শুদ্র এই চার বর্ণের পুরুষ শুদ্রার পতি হতে পারে।……

………নারদ বলছেন, মানুষের আট প্রকার বিবাহ ধর্মসঙ্গত— এই বিষয়ে পরবর্তী অধ্যায়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা করা হবে। এই আট প্রকার বিবাহ হল যে সকল ভার্যা পুত্ৰবৰ্তী হায়ে হব্য ও কব্য করেন, তাঁরা ইহলােকে ও পরলােকে হিকারিণী হন। অবিবাহিত, ক্রীতা, গৃহীতা অপহৃতা কন্যা বিবাহিত হতে পারে। একগাত্রে বিবাহ করায় যে পত্নী, হয়, ক্রয় করায় যে স্ত্রী হয়, যে পরভার্যাকে নিজভার্যা করা হয়, পতি পরিত্যাগ করায় যে নিজে এসে পত্নী হয় এবং আশ্রম থেকে এলে যাকে ভার্যা করা হয়- এই পাঁচ প্রকার স্ত্রী সঙ্গমযোগ্য। আর পতি জীবিত থাকতে তার পত্নীর গর্ভে অন্যের দ্বারা উৎপন্ন পুত্র হল ‘কুণ্ড’ এবং পতির মৃত্যুর পর অন্য পুরুষের দ্বারা যে পুত্র জন্মায় সে হল ‘গােলক’। এই জাতীয় পুত্ররা চণ্ডালতুলা, গর্হিত। …..

বিবাহিতা স্ত্রীর ব্যভিচার বিষয়ে নারদ বলছেন, পুর্বে স্ত্রীলােকদের সবর্ণ পুরুষগমনে দোষ ছিল না। ব্ৰহ্মা সেই নিয়ম করেছিলেন। প্রজা সৃষ্টির নিমিত্ত তিনি ভগ ও লিঙ্গ সৃষ্টি করেন। বিষ্ণুর অনুমতিক্রমে সেই ভগ ও লিঙ্গের সংযােগের বিধান দেন। বিষ্ণুর অনুগ্রহে ভগ সমস্ত পুরুষকে ভােগ করতে পারে। এই জন্য ব্যাভিচারে পুরুষদের অধিক দোষ হয়। ব্যাভিচারিণীদের প্রায়শ্চিত্ত ও দণ্ডের বিধান আছে। স্ত্রীজাতির যােনি পুরুষাস্তর গত হতে পারে। মাসে মাসে ঋতুই তাদের পাপ নষ্ট করে থাকে। স্ত্রীসম্ভোগে লিপ্ত ও বহু জাৰ্যাযুক্ত গৃহস্থ পুরুষ নিকট থেকেও যদি ঋতুকালেও কোন ভার্যা তার কাছে গমন না করে, তা হলে তার ভ্রূন হত্যার পাপ হয়। ‘ভার্যাকে বর্জন করলে পুরুষুের অনুরূপ পাপ হবে……..

২. বিবাহের শ্রেণিবিভাগ

…….মহাভারতে মােট আট প্রকার বিবাহের সন্ধান পাওয়া যায়। সেগুলি হল ব্রাহ্মী, দৈব, আর্য, প্রাজাপত্য, আসুর, গান্ধর্ব, রাক্ষস এবং পৈশাচ। মনুও এই আট প্রকার বিবাহের কথা বলেছেন। ‘ব্রাহ্ম’ শব্দের অর্থ হল প্রজাপতি-সম্বন্ধী– ……বিশেষ বস্ত্র-অলঙ্কারাদি বর-কন্যাকে দিয়ে বিদ্যাচারবান্ বর এনে কন্যা দান করা হল ব্রাহ্মবিবাহ। ব্রাহ্মবিবাহ অর্থাৎ পণ দিয়ে কন্যার বিবাহ দেওয়ার প্রথা গৌরবান্বিত হয়েছে। …….

…..সব্রাহ্মণের এই হল ব্রাহ্মধর্ম যে, আবাহন করবার যোেগ্য পাত্রকে আবাহন করে তাকে অনুকূল ভাবে কন্যাদান করা। ক্ষত্রিয়দের এটা সনাতন ধর্ম যে, দাতার অভিপ্রেত পত্রকে পরিত্যাগ করে কন্যার অভিপ্রেত পাত্রের হাতে কন্যাদান করা। যে কন্যা যে পাত্রের অভিপ্রেত, সেই কন্যা সেই পাত্রকে দান করবে— এটা অবশ্য ব্রাহ্ম বিবাহ নয়।

দ্বিতীয় বিবাহের নাম ‘দৈব’। যজ্ঞে বৃত ঋত্বিককে যদি কন্যা দান করা হয়, তা হলে সেই বিবাহের নাম হবে ‘দৈব’-…….

‘দৈব’ শব্দের অর্থ দেবসম্বন্ধী— দেবভাবসম্পন্ন ব্রাহ্ম বিবাহের প্রচুর উদাহরণ আছে, দৈব-বিবাহের দৃষ্টান্তু বেশ কম। রাজা লােমলাদ দৈববিধানে ঋষশৃঙ্গের সঙ্গে তার পালিতা কন্যা শান্তার বিবাহ দেন। …..

……তৃতীয় বিবাহের নাম ‘আর্য’। শব্দটির অর্থ হল ঋষিসম্বন্ধী। …..এই বিবাহে বরের কাছ থেকে যাগাদির নিমিত্ত এক বা দুই গোমিথুন নিয়ে কন্যা দান করতে হয়। এটাই মনুর মত। …..

…..প্রাজাপত্য হল আট প্রকার বিবাহের চতুর্থ প্রকার। প্রজাপতি শব্দের ‘অর্থ হল প্রজাপতি-সম্বন্ধী, প্রজাপতিদেবতা। এই বিবাহে ‘তােমরা উভয়ে মিলিত হয়ে ধর্মানুষ্ঠান কর’ এই বলে যথাবিধি অর্চনা করে কন্যাদান করা হয়।…..

…..বরকে ধনরত্ন দিয়ে সন্তুষ্ট করে পরে যদি তাকে কন্যাদান করা হয়, তবে সেই বিবাহাকে ‘প্রাজাপত্য’ নামে অভিহিত করা হয়।

পঞ্চম প্রকার বিবাহের নাম ‘আসুর’ বিবাহ— ‘আসুর’ শব্দের অর্থ হল সুরসম্বন্ধী। কন্যার বন্ধুবৰ্গকে বহু ভাবে লুব্ধ করে, ধন দিয়ে কন্যাকে ক্রয় করে যে বিবাহ করা হয়, পণ্ডিতেরা তাকে আসুরবিবাহ বলেন।

………গান্ধর্ব-বিবাহ হল ষষ্ঠ প্রকার। যে কন্যা যে পাত্রের অভিপ্রেত, সেই কন্যা সেই পাত্রকে দান করবে, বেদজ্ঞ লোকেরা একেই গান্ধর্ব বিবাহ বলেন।…….বর ও কন্যার পরস্পরের মধ্যে প্রণয়পূর্বক যে বিবাহ সম্পাদিত হয়, তার নাম গন্ধর্ব বিবাহ। ….

……… সপ্তম প্রকার বিবাহের নাম রাক্ষস’ বিবাহ। কন্যাকর্তা কন্যা প্রদানে অসম্মত হলেও উদ্ধত পরিণতা যদি কন্যাপক্ষের প্রতি অমানবিক অত্যাচার করে ক্রন্দনরত কন্যাকে জোর করে গ্রহণ করেন, তা হলে সেই বিবাহকে বলা হবে রাক্ষস-বিবাহ। …….

….অষ্টম বিবাহের নাম পৈশাচ পিশাচসম্বন্ধী। সুপ্ত অথবা প্রমত্ত কন্যাকে বলাৎকার করে রমণ করার নাম পৈশাচ-বিবাহ।………

…….. ত্রিশ বছরের বর আর দশ বছরের কন্যা, একুশ বছরের পাত্র আর সাত বছরের পাত্রী অর্থাৎ পাত্রীর বয়স হবে পাত্রের বয়সের এক তৃতীয়াংশ। তবে পুরুষের ত্রিশ কিংবা একুশ নয়, ষােলো বছরও বিবাহের কাল হতে পারে। আচার্য গৌতম প্রৌঢ় উতঙ্ককে বলছেন, তুমি যদি ষোলো বছরের যুবক হতে, তাহলে আমার কন্যার সঙ্গে তােমার বিয়ে দিতাম। তবে মহাভারতে নগ্নিকাবিবাহ সে রকম দেখা যায় না। দময়ন্তী, শকুন্তলা, দেবযানী, সত্যবর্তী, অম্বিকা, গান্ধারী, কুন্তী, মাদ্রী, দ্রৌপর্ণী, উপী বিবাহের সময় পূর্ণ যুবতী ছিলেন। কুন্তী ও সত্যবতী তাে বিবাহের পূর্বেই সন্তান প্রসব করেছেন। ……..

৩. প্রাক্-বৈবাহিক সম্পর্ক

………পুরুষ বিবাহের পূর্বে ব্রহ্মচর্য থেকে বিচ্যুত হয়েছেন, এমন উদাহরণ বিরল নয়। তবে সেখানে পুরুষের ব্রহ্মচর্য দুষিত হয়েছে, এমন অভিযােগ মেলা ভার। যেমন বশিষ্ঠের পৌত্র শু শক্তির পুত্র পরাশর মুনি অবিবাহিত অবস্থায় দশিরাজকন্যার সঙ্গে মিলিত হয়েছেন, সেখানে পরাশর মুনির এই আচরণ কতটা নিন্দনীয়, সে সম্পর্কে আলােচনা নেই বললেই চলে। বরং এই আলােচনা নিতান্তই নারীকেন্দ্রিক।

শকুন্তলা, সত্যবতী ও কুন্তীর ক্ষেত্রে প্রাক্-বৈবাহিক সম্পর্কের কথা পাওয়া যায়। গান্ধর্ব-বিবাহের নামে শকুন্তলাকে বিবাহিত তকমা দেওয়া হয়েছে বটে, তবে এ ক্ষেত্রে মনে হয়, বিবাহিত দুষ্মন্তু অবিবাহিত শকুন্তলার কন্যাভাব দুষিতই করছেন। একটু বিস্তারে গিয়ে সেই ঘটনা দেখা যেতে পারে। …….একদিন দুষ্মন্তু ঠিক করলেন, তিনি মৃগয়ায় যাবেন। মালিনী নদীর তীরে কমুনির আশ্রম যেখানে সেখানেই পরিশ্রান্ত হয়ে দুষ্মন্তু প্রবেশ করলেন। ……দেখলেন এক অপরূপা কুটির আলো করে বসে আছেন। দুষ্মন্ত মুগ্ধ চোখে তাঁকে অবলােকন করতে লাগলেন। ….দুষ্মন্ত সেই কন্যার নাম জিজ্ঞাসা করলেন। জানতে পারলেন তিনি শকুন্তলা। কে তােমার পিতা?’ দুষ্মন্তের এই প্রশ্নের উরে শকুন্তলা জবাব দিলেন, ‘কণ্ব-মুনি’। সেও কি সম্ভব? তিনি তো মহামান্য মুনিবর, উর্বরতা পুরুষ। তাঁর সন্তান হয় কী রূপে? 

শকুন্তলা তার জন্মবৃত্তান্তের বর্ণনা দিলেন। বিশ্বামিত্র একদা কঠিন সাধনায় বসেছেন। এমন ধ্যান, যার প্রভাবে স্বয়ং দেবরাজ ইন্দ্রও ভীত হয়ে পড়লেন। যদি বিশ্বামিত্র এই ধ্যান নিরন্তর ভাব চালিয়ে যান তা হলে দেবরাজের ‘আসনও তাঁর দখলে চলে যাবে। অতএব, বিশ্বামিত্রের ধ্যানে বাধার সৃষ্টি করতে উঠে পড়ে লাগলেন ইন্দ্র।

স্বর্গের অপ্সরা মেনকা অসামান্য রূপসী। তাঁকে ডেকে বললেন, “যাও, যেনতেন-প্রকারে বিশ্বামিত্রের ধ্যানভঙ্গ কর ।” মেনকা এলেন স্বর্গ থেকে। সূক্ষ্ম আবরণে বিশ্বামিত্রের সামনে তিনি নৃত্যাদি পরিবেশন করতে লাগলেন। ধীরে ধীরে শরীরাবরণ উন্মুক্ত হল তার। বিশ্বামিত্রের ধ্যানভঙ্গ হল। স্বৰ্গবেশ্যার তুলনীয় যৌন আবেদন প্রত্যাখ্যান করতে পারলেন না তিনি। শরীরে শরীরে তীব্র প্রেমালাপ হল। মেনকা গর্ভবতী হলেন। কিন্তু তিনি স্বর্গের বাসিন্দা। দীর্ঘ গর্ভধারণের বদলে তিনি মুহূর্তে প্রসব করাতে পারেন গর্ভস্থ শিশুকে। সেই শিশুটিই শকুন্তলা। মালিনী নদীর তীরে তাকে পরিত্যাগ করে স্বর্গধামে ফিরে গেলেন মেনকা সুন্দরী। | নির্জন নদীতীরে শকুন্ত’ অর্থাৎ পক্ষীসকল শিশুকন্যাটিকে পাহারা দিতে লাগল। ঋষি কণ্ব সেই পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনিই শিশুকনাটিকে আশ্রমে নিয়ে এলেন। সেই শিশুকন্যাই এই যুবতী শকুন্তলা। | দুষ্মন্ত কালক্ষেপ না করে শকুন্তলাকে বলেন, “কন্যা, তােমার রূপে আমি বিমােহিত। আমি কিছুতেই নিজের শরীরকে বশে আনতে পারছি না। আমরা কি মিলিত হতে পারি ?”

শকুন্তলা এই প্রত্যক্ষ কাম-প্রস্তাবে সম্মত হলেন না। তিনি বললেন, “রাজা, আমি কন্ধ মুনির দুহিতা। পিতার সম্মতি গ্রহণ না করে আমি এই অধর্ম করতে পারি না। দুষ্মন্তু জানালেন, “এটা অধর্ম নয় শকুন্তলা! তুমি যুবতী, পরিণত। পিতার সম্মতি গ্রহণ করার কোনও প্রয়োজন দেখি না। আর তুমি শারীরিক মিলনকে অধর্ম বলছ কেন ? শাস্ত্রে যে আট প্রকার বিবাহের কথা বলা হয়েছে তার একটি হল গন্ধর্ব মতে বিবাহ। আমরা শারীরিক মিলনের মধ্য দিয়ে সেই বিবাহে আবদ্ধ হব।  এসো।

দুষ্মন্ত শকুন্তলাকে এই স্তোক দিচ্ছেন, কারণ শকুন্তলা প্রাক্-বৈবাহিক মিলনে সম্মত নন। বিশ্বামিত্র-কন্যা দুষ্মন্তের এই আহ্বানেও রাজি হলেন না। তিনি পুনরায় মিলনে অসম্মতি জানালেন। যদিও তার হৃদয়রূপ ঘনকৃষ্ণবর্ণ মেঘে জলের প্রতীক্ষা। তাঁর সারা শরীর দুষ্মন্তের ক্ষত্রিয় দেহসৌষ্ঠবের জন্য অাকূল। তবুও শকুন্তলা সংযত হলেন। বললেন, “হে রাজা, আমিও তোমার প্রণয়লাভে ইচ্ছুক। আমার পিতামাতা দুজনেই আমাকে পরিত্যাগ করেছেন। মুনি অবশ্য পিতৃস্নেহের অভাব রাখেননি। আজ যদি আমি গর্ভবতী হই, তাহলে সেই সন্তানও কি কন্ধ মুনির গৃহে আশ্রমবলিক হয়েই দিনাতিপাত করবে! একটি শর্তেই আমি দৈহিক মিলনে সম্মত হব। যদি তুমি প্রতিজ্ঞা করাে, আমার গর্ভজাত সন্তানই হবে তােমার রাজার উত্তরাধিকারী। যদি হ্যা বল, তা হলে আমি প্রস্তুত।” 

দুষ্মন্তের চোখমুখ আরক্ত সারা শরীর বেয়ে দুরন্ত অগ্নির প্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। তিনি অবিমৃষ্যকারীর মতো বলে ফেললেন, “শকুন্তলা, তােমার জন্য আমি যে কোনও অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারি। তুমি এসাে, আমার নিকট এসো।” রাজা তখন তার পুত্র জনমেজয়ের কথা ভুলে গেছেন। রাজার মৃগয়াসঙ্গীরা তখন আশ্রম থেকে বহু দুরে। শকুন্তলা ধীরে ধীরে তার আভরণ খুলে রাখলেন। দুষ্মন্তের কঠিন বাহুতে ভীত সন্ত্রস্ত হরিণীর মতাে নিজেকে সঁপে দিলেন। অনাঘ্রাতা শকুন্তলা তার উন্মুক্ত বক্ষে দুষ্মন্তুকে পেষণ করে বললেন, ‘আমাকে ভুলে যেও না রাজা। ঋতুচক্রের অমােঘ নিয়মে আমাদের এই সঙ্গম ব্যর্থ হবে না।” দুষ্মন্ত শকুন্তলার বন্ধন থেকে নিজেকে মুক্ত করলেন। তার দক্ষিণ হস্ত্রের অনামিকা থেকে আংটি পরিয়ে দিলেন শকুন্তলার মধ্যমায়। তার পর চলে গেলেন রাজধানীতে। শকুলা অশ্রামেই থেকে গেলেন। দুষ্মন্ত-শকুন্তলার এই প্রণয় আসলে দুষ্মন্তের বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্ক। শকুন্তলা যেহেতু কন্যা, তাই এটি তাঁর ক্ষত্রে প্রাক্-বৈবাহিক সম্পর্ক, যদিও তিনি অন্য পুরুষকে বিবাহ করেননি। এই রকম চিত্র পরাশর-সত্যবতীর ক্ষেত্রেও দেখা যায়।

সত্যবতীর পূর্ব নাম মৎসগন্ধা। তার পেশা ছিল নৌকা চালনা। সে যমুনা নদীতে নৌকা চালাত। একদিন পরাশর মুনি তীর্থ পর্যটন করতে করতে সেখানে এলেন। অতীব পত্রী চারুহাসিনী মৎস্যগন্ধাকে দেখে মােহিত হয় পড়েন মুনি। তিনি বললেন, “হে সুন্দরী, এই নৌকোর মালিক কোথায়?” জবাবে মৎস্যগন্ধা বললেন, “আমিই এই নৌকোর দেখভাল করি। আমার ধীবর পিতার কোনও পুত্র না থাকায় আমি সকলকে পার করি।” পরাশর মৎস্যগন্ধার নৌকায় উঠলেন। বললেন, “আমি তােমার জন্মবৃত্তান্থ জানি। তােমার সঙ্গে মিলিত হতে চাই। একত্রে বংশধরও রেখে যেতে চাই। তুমি আমার কামনা পূর্ণ করাে। এসাে, আমরা মিলিত হই— পুত্রসন্তান উৎপাদন করি।” সেই উন্মুক্ত নৌকোয়, যমুনার উপরে মৎস্যগন্ধা এইরূপ মিলনে সম্মত হলেন না। তিনি বললেন, ‘যমুনার দুই তীরে অসংখ্য মানুষ রয়েছ, তারা আমাদের এই মিলন দেখতে পাবে। আমি চাই না, এই ভাবে লােকচক্ষুর সম্মুখে আমরা মিলিত হই।” পরশির মুনি প্রজ্ঞাবলে এক কুয়াশার সৃষ্টি করলেন, যার ফলে চার দিক তমসাচ্ছন্ন হল। পরাশর পুনরায় মিলনের প্রস্তাব দিলেন, মৎস্যগন্ধা এবারেও সম্মত হালন না। তিনি বললেন, “ঋষি, আমি কুমারী। আমার এই কৌমার্য কোনও ভাবেই নষ্ট হতে দিতে চাই না। তা ছাড়া আমার পিতা রয়েছেন। এখন কৌমার্য হারালে তিনি আমাকে তাড়িয়ে দেবেন। কোন লজ্জায় তার কাছে ফিরব আমি! আমার এই কন্যাভাব দূষিত করবেন না ঋষি।” | প্রজ্ঞাবান পরাশর বললেন, “তুমি আমার সঙ্গে মিলিত হলেও তোমার কৌমার্য নষ্ট হবে না। তােমার গর্ভজাত সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরও তুমি কুমারীই থাকাৰ। এসাে।” যমুনা নদীর উপরে উন্মুক্ত নৌকায় পরাশর-মৎস্যগন্ধার মিলন হল। এই মিলন মৎস্যগন্ধার প্রাক-বৈবাহিক সম্পর্ক তিনি পরে রাজা শান্তনুর সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কে আবদ্ধ হন। এখানে লক্ষণীয়, মৎস্যগন্ধা পরাশরকে বলেছিলেন, “ভগবান, আপনি সংযত হােন। আমার কন্যাভাব দূষিত করবেন না। নানা রকমের বরের দ্বারা সম্মত করে ঋষি মৎস্যগন্ধার কন্যাত্ব নাশ করেন।

পান্ডূর স্ত্রী কুন্তীও প্রাক্-বৈবাহিক সম্পর্কে লিপ্ত হন। যদুবংশশ্রেষ্ঠ ‘শুর’ নামক এক ব্যক্তি বসুদেবের পিতা ছিলেন। ‘পৃথা’ নামে তাঁর একটি কন্যা জন্মে ছিল। জগতে সেই কন্যার রূপের তুলনা ছিল না। কুন্তিভােজ রাজা ছিলেন শূরের পিতৃস্বসার পুত্র। দারুণ বন্ধুত্বও ছিল দুজনের। কুন্তিভােজ নিঃসন্তান, তাই বন্ধু তথা ভ্রাতা শুরের কাছে সন্তান ভিক্ষা করেন। শুরও তাঁর প্রথম সন্তানটিকে কুন্তিভােজকে দেবেন বলে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন। তাই প্রথম কনা পৃথাকে তিনি কুন্তিভোজের হাতে তুলে দেন।

সেই পৃথা কুম্ভিভোজ রাজার বাড়িতে দেবতা ও অতিথি সেবায় নিযুক্ত ছিলেন। এক দিন এক কোপনস্বভাব অথচ দৃঢ়বত এক ব্রাহ্মণের পরিচর্যা করেন তিনি। এই ব্রাহ্মণ ধর্মের গুঢ় তত্ত্ব জানেন। তাঁর নাম দুর্বাসা। পৃথা সেই কোপনস্বভাব দৃঢ়ব্রত দুর্বাসাকে সর্বপ্রযত্নে সন্তুষ্ট করেন। পৃথার সন্তান হওয়ার প্রতিবন্ধক আছে— ধ্যানবল জেনে যান ঋষি দুর্বাসা। আর পৃথা যেহেতু সর্বপ্রযত্নে দুর্বাসাকে গ্রহণ করেন, তাই সন্তান প্রতিবন্ধকতা দূর হয় তাঁর। আকর্ষণ শক্তিশালী মন্ত্রগুপ্তি পান দুর্বাসার বরে। দুর্বাসা পৃথা অর্থাৎ কুন্তীকে জানালেন, “এই মন্ত্রের জােরে তুমি যে দেবতাকে আহ্বান করবে, তিনিই তোমার কাছে আসবেন এবং তােমার গর্ভে পুত্র উৎপাদন করবেন।”

যশস্বিনী কুন্তী কুমারী হয়েও কৌতুহলবশত সেই মন্ত্র প্রয়ােগ করেন সুর্যদেবের উপর। সূর্য যাবতীয় মেঘ সরিয়ে, আপন পথ করে, আয়তনয়না পৃথা নাম্নী সেই কন্যার নিকটে উপস্থিত হলেন। অনিন্দ্যসুন্দরী কুন্তী জগতের সৃষ্টিকর্তা সেই সূর্যদেবকে আসতে দেখে বিস্মিত হয়ে পড়লেন। কী অদ্ভুত, তাঁর হাতে এত ক্ষমতা! সূর্য কুন্তীর কাছে এসে বললেন, ‘নীলনয়না, এই তো আমি এসেছি তােমার আহ্বানে। তােমার অভীষ্ট কার্য করব।”

কুন্ত্রী বললেন, “হে শুক্রনাশন কোনও ব্ৰম্মজ্ঞানী আমাকে একটি বর ও একটি মন্ত্র দিয়েছেন। সেই মন্ত্র কতটা শক্তিশালী তা পরীক্ষা করার জন্য আপনাকে বেছে নিয়েছি। আমার অপরাধ নেবেন না। অামাকে অনুগ্রহ করুন।” সুর্য বললেন, “পুত্র উৎপাদনের জন্য দুর্বাসা যে তােমাকে বর ও মন্ত্র দিয়েছেন তা আমি জানি। যাক গে, তুমি ভয় পেয়াে না। সব কিছু পরিত্যাগ করে এক্ষুনি আমার সঙ্গে সঙ্গম করো। সুন্দরী, তুমি যখন আমাকে আহ্বান করছে, তখন তােমার মিলন আমার পক্ষে অব্যর্থ। হে ভয়শীলা, এই আহ্বান নিস্ফল হলে তােমারই দোষ হবে।”

কুন্তী ভীত হরিণীর ন্যায় বললেন, “আমার ভয় করছে সূর্যদেব! আমি তাে কুমারী, তা ছাড়া পিতা কী বলবেন! আমি রমণ করতে পারব না।” সূর্য বললেন, “কিছু হবে না। এসাে রানি, আমার অনুগ্রহে তােমার কোনাে দোষ হবে না।” কুন্ত্রী বললেন, “ঠিক আছে ভগবান। আপনি আমার উপর প্রসন্ন হােন। বিশ্বাস করুন, আমার কোনও অহঙ্কার নেই। কিন্তু কন্যাত্বের দােষ ঘটালে চার দিকে দুর্নাম রটবে। আপনি সেটা খেয়াল রাখবেন।” সূর্য জানালেন, “তােমার ভয় দূরীভূত হােক। তুমি শীঘ্রই পুত্র দর্শন করবে। আর, আমার আদেশে তােমার কন্যাভাব দূষিত হবে না।” প্রকাশকর্তা সূর্য কুম্ভীকে এই সব কথা বুঝিয়ে তখনই তার সঙ্গে রমণে প্রবৃত্ত হলেন। কুঙ্গী সেই রমণে যারপরনাই পুলকিত হলেন। জীবনের প্রথম রমণ এত দীর্ঘতর হবে, এমন মধুর হবে, এমন স্বর্গীয় অনিন্দপ্রাপ্তি ঘটবে তার– কখনওই ভাবেননি সুন্দরী শ্রেষ্ঠা কুন্তী।

সূর্যদেবের সঙ্গে প্রাক-বৈবাহিক সম্পর্কে কুন্তীর পুত্রও উৎপন্ন হয়, যিনি ‘কর্ণ’ নামে খ্যাত। কুন্তীর এই প্রাক-বৈবাহিক সম্পর্কের কথা তিনি ব্যাসদেবকে বলেছেন। ………

৪. বিবাহে বিধিনিষেধ

বিবাহ করলেই হয় না। বিধিনিষেধ মেনে বিবাহ করতে হয়, নইলে সমাজের চোখে হেয় প্রতিপন্ন হতে হয়। উৎপন্ন সস্তানকে পড়তে হয় বহু বিপত্তি । মহাভারতের অনুশাসনপর্বে আছে, ব্রাহ্মণের ব্রাহ্মণী, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যা এই তিন প্রকার ভার্যা হতে পারে; ক্ষত্রিয়ের ক্ষত্রিয়া ও বৈশ্যা এই দুই প্রকার স্ত্রী এবং বৈশ স্বজাতীয় কন্যা গ্রহণ করবেন। এই সকল পত্নীর গর্ভে উৎপন্ন সম্ভানই পিতার সমানবর্ণ হবে। অর্থাৎ ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়ার সম্ভান, এমনকী ব্রাহ্মণ-বৈশ্যার সন্তানও ব্রাহ্মণ হারে।….

………তবে বহুবিবাহের ক্ষেত্রে ব্রাহ্মণী-স্ত্রী অন্যান্যদের থেকে বেশি মর্যাদা পাবেন। ধরা যাক, কোনও লােকের তিন জন স্ত্রী একটি ব্রাহ্মণী, একটি ক্ষত্রিয়া এবং অন্যটি বৈশ্যা। যদি বয়সে ব্রাহ্মণী সবচেয়ে ছােট হয়, “তাহলেও তিনি জ্যেষ্ঠা বলে বিবেচিত হবেন। অনুশাসনপর্বে এমন কথা  আছে যে, ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশের রমণের জন্য শুভ্রাভার্যাও হাতে পারে— …তবে পরবর্তী সময়ে শুদ্রভার্যার উপর নিষেধাজ্ঞা চালু হয়।

……..শুদ্রার গর্ভে ব্রাহ্মণ প্রভৃতির সন্তান-উৎপাদনাকে সঠিক কাজ বলেন না। ব্রাহ্মণ শূদ্রার গর্ভে সন্তান উৎপাদন করলে প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। অতএব শূদ্রা-স্ত্রী গ্রহণে তিন বর্ণের বিধিনিষেধ রয়েছে।

বিবাহের বয়স সম্পর্কে বলা হয়েছে, তিরিশ বছরের বর দশ বছরের অরক্তস্বলা কন্যাকে বিবাহ করবে, কিংবা একুশ বছরের বর সাত বছরের কন্যার পাণিগ্রহণ করবে।

…..তবে মহাভারতে নগ্নিকা (অরজস্বলা) কন্যা বিবাহের উদাহরণ নেই। বরং বেশির ভাগ নারী যুবতী অবস্থায় বিবাহ করেছেন। | ভীষ্মদেব যুধিষ্ঠিরকে বলছেন, ‘ভরতশ্রেষ্ঠ! যে কন্যার ভ্রাতা উৎপন্ন হয়নি বা পিতা জীবিত নেই সেই কন্যাকে বিবাহ করবে না। কারণ সেই কন্যা পুত্রিকাপুত্রস্থানীয়।

…….অনুশাসনপর্বে দেখা যায়, কন্যা ঋতুমতী হয় তিন বছর অপেক্ষা করা, তাতেও যদি সে বর না পায় তা হলে চতুর্থ বছর উপস্থিত হলে নিজেই রর গ্রহণ করবে। তা হলে সেই কন্যার সন্তানও রতি লুপ্ত হবে না। কিন্তু এর অন্যথা করলে সন্তানশালী লােকদের কাছে সেই কন্যা নিন্দনীয় হবে।….

৫. স্বজনবিবাহ

প্রাচীন যুগে স্বজন বা জ্ঞাতিদের মধ্যে বিবাহ সুপ্রচলিত ছিল। মহাভারতের যুগে কঠোর অনুশাসনের দ্বারা স্বজনবিবাহ বন্ধ করার কথা বলা হলেও বহু উদাহরণ দেখা যায়, যেখানে স্বজনদের মধ্যে বিবাহ সম্পাদিত হচ্ছে। …..কয়েকটি উদাহরণ:

………

৫, বৃহস্পক্তি তার অগ্রজ উথার স্ত্রী মমতার সঙ্গে কামাচারে লিপ্ত হয়ে পুত্র-উৎপাদন করেন। যদিও বৃহস্পতি মমতাকে ধর্ষণ করেছিলেন, তবু দেবগুরুর এই আচরণ অজাচারের মধ্যে পড়ে।

৬. দেবরের সঙ্গে গুরু পত্নীর বিবাহ কিংবা শ্যালিকার সঙ্গে বিবাহ স্বজন বিবাহের মধ্যে পড়ে। এ রকম উদাহরণ মহাভারতে খুঁজলে পাওয়া যায়। বিচিত্রবীর্যের সঙ্গে অম্বিকার বিবাহের পরেই শালিকা অম্বালিকার বিবাহ হয়। যদিও এই ঘটনা দৈব-নির্ধারিত, তবু যুধিষ্ঠিরের পত্নী দ্রৌপদীর সঙ্গে দেবর ভীমসেনের বিবাহ হয়। এই ভাবে ভ্রাতৃত্বমুলক বহুবিবাহের যে উদাহরণ মহাভারতে দেখা যায়, তাকে শাস্ত্র দিয়ে অসমর্থনও করা যায়।

৭, জ্ঞ্যেষ্ঠ ভ্রাতার মৃত্যুর পর তার বিধবা স্ত্রী দেবরের সঙ্গে যৌনাচার করবে, এই রীতি কোথাও কোথাও প্রচলিত। মহাভারতে এমন উদাহরণ নেই। ব্যাসদেব অবশ্য বিধবা বধুদের গর্ভে সন্তান-উৎপাদন করেছিলেন। তবে ভারতে কোথাও কোথাও বিধবা শাশুড়ি এবং বিধবা বিমাতাকে বিবাহ করার প্রচলন আছে।

……….

মহাভারত এবং অন্যান্য গ্রন্থে গুরুপত্নী অগম্যা বলা হয়েছে, …..কারণ গুরুপত্নী মাতৃস্থানীয়, তাকে বিবাহ করা যাবে না, তার সঙ্গে যৌনাচার নিষিদ্ধ। মহাভারতে বলা হয়েছে, অত্রি মুনির পুত্র চন্দ্রের সাতাশ জন ভার্যা ছিলেন। তাঁরা পরস্পর ভগিনী ছিলেন। এটি যেমন স্বজনবিবাহের উদাহরণ, তেমনই দেখা যাবে চন্দ্র গুরুপত্নীর গর্ভে সন্তান উৎপাদন করছেন। দেবতাদের গুরু বৃহস্পতি, তার স্ত্রী তারাকে চন্দ্র হরণ করেন | এতে সন্দ্রের প্রতি অন্যান্য দেবতারা অপ্রসন্ন হন। …..উদ্দালক নামক আচার্য তার পত্নীতে সন্তান উৎপাদন করার জান্য এক শিষ্যকে নিয়ােগ করেন, সেই শিষ্যের ঔরসে শ্বেতকেতুে জন্ম। ……

……..একদিন অশ্বিনীদ্বয় যৌবনদীপ্তা সুকন্যাকে স্নানের পর বস্ত্রহীন দেখে তাঁর রূপে মুগ্ধ হন। তারা বৃদ্ধ চ্যবনকে ত্যাগ করে সুকনাকে তাদের বেছে নিতে বলেন। সিমােন ব্ৰডাবেক বলেছেন, অশ্বিনীদ্বয় সুকন্যার ভ্রাতা ও পতি। তবে মহাভারতের বনপর্ব সুকন্যাকে চ্যবন ঋষিরই পত্নী বলা হয়েছে।

যম ও যমীর উপাখ্যান সর্ববিদিত। তারা যমজ ভাইবােন। যম যমীর সহবাস আকাক্ষা করেন কিন্তু যমী তা প্রত্যাখ্যান করেন। তবে কেউ কেউ বলেছেন, যমীই নাকি যমের সঙ্গম প্রার্থনা করেন যাতে মানবজাতি অগ্রসর হতে পারে, কিন্তু যম সেই প্রস্তাবে সাড়া দেননি। …….

…..গুরুপত্নীতে সন্তান উৎপাদনের বৈধতা আছে। উদ্দালাকের এক শিষ্য উদ্দালাকের স্ত্রীর গর্ভে কেতুব জন্ম দেন, এই শ্বেতকেতু নারীর একপতিত্বের বিধান দিয়েছিলেন। আবার দেবতাদের গুরু বৃহস্পতি তাঁর অগ্রজ উতথ্যের পত্নী মমতাকে ধর্ষণ করেন। অগ্রজ-পত্নীতে উপগত হওয়া অজাচারের নামান্তর। তার উপর এটি আবার ধর্ষণ। মমতা তখন গর্ভবতী ছিলেন।…….

‘প্যারাডক্সেস অব ট্রাডিশনাল চাইনিজ লিটারেচার’ গ্রন্থে দ্রৌপদীর পঞ্চ পাণ্ডবকে স্বামীত্বে বরণ করাকে স্বজনবিবাহের তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। পঞ্চ পাণ্ডব পরস্পরের ভ্রাতা। সৌভ্রাতৃত্বমূলক বহুঝিবাহকে নানা দোশ ভাতিবিবাহ’অজাচার সম্বন্ধ বলে অভিহিত করা হয়। মহাভারতে দেখা যায়, দ্রৌপদীকে পঞ্চ ভ্ৰাতা বিবাহ করবেন স্থির করলে দ্রৌপদীর ভ্রাতা ধৃষ্টদ্যুম্ন বলছেন, জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা কীভাবে কনিষ্ঠ ভ্রাতার ভার্যাতে উপগত হাবেন; তা ধর্মবিরুদ্ধ। এই সেই ধর্ম যাকে শাশ্বত ঋত’ বলা হয়। দ্রৌপদী যেহেতু সহদেবের স্ত্রী; তাই যুধিষ্ঠির, ভীম, অর্জুন ও নকুল দ্রৌপদীতে উপগত হতে পারেন না, কারণ দ্রৌপদী তাঁদের পুত্রবধূর তুল্য। আবার দ্রৌপদী যেহেতু যুধিষ্ঠিরের স্ত্রী। তাই ভীম, অর্জুন, নকুল ও সহদেব তাকে বিবাহ করতে পারেন না, কারণ দ্রৌপদী তাদের মাতৃতুল্য। নারীর এই বহুপতিত্ব, বিশেষ করে সৌভ্রাতৃত্বমূলক বহুবিবাহ আসলে স্বজ্জনবিবাহ। বাক্ষী ও জটিলার বহুপতি ছিল, এদের মধ্যে বাক্ষী প্রচেতা-নামধারী দশ ভ্রাতাকে বিবাহ করেন।……..

…..অ্যালবার্ট ওয়েল্ড তার পেসিফিক রাইটিং ইন ইংলিশ’ গ্রন্থে অম্বিকাকে অজাচারী বলেছেন (পৃষ্ঠা ১১৬)। তিনি নাকি পুত্রবধু কুন্তীর উপর যৌন-অত্যাচার করেন। তবে অনেকেই দুই ভগ্নীর এক স্বামীকে বরণ করে নেওয়াকে স্বজনবিবাহ বলেছেন। অম্বিকা ও অম্বালিকা দুই ভগ্নী এক পুরুষকে বিবাহ করলে তা জ্ঞাতীবিবাহর মধ্যে বিবেচিত হবে। তবে এমন উদাহরণ মহাভারত ও পুরাণে বিরল নয়। মারীচ-কাশ্যপ তেরোজন কন্যাকে বিবাহ করেন, এঁরা পরস্পর ভগিনী। ধর্য দক্ষের দশ মাকে বিবাহ করেন। চন্দ্রের বিবাহ হয় সাতাশ কন্যার সঙ্গে এঁরা দক্ষকন্যা।

৬. পুরুষের বহুগামিতা

এক পুরুষের এক স্ত্রী থাকা বাঞ্ছনীয়। যদি একের অধিক পত্নী থাকে তাহালে সেই বহুপত্নীবাদ কতটা যুক্তিসিন্ধ বা কতটা অইিনপ্রথাসম্মত তা নিয়ে তর্ক ওঠে। কিন্তু যখন দেখা যায়, কোনও সমাজে বহুপত্নীবাদের প্রচলন রয়েছে, তখন তাকে যুক্তি দিয়ে প্রতিষ্ঠা করার একটা দায় থেকে যায়। পুরুষের বহুপত্নীর বহু দৃষ্টান্তু মহাভারতে রয়েছে। ……তবে শান্তনুপুত্র বিচিত্রবীর্য বহুগামিতার ধারক। কারণ তার দুই পত্নী অম্বিকা ও অম্বালি। ….তিনি অপুত্রক অবস্থায় মারা গেলে তাঁর বিধবা পত্নীদ্বয়ের গর্ভে ব্যাসদেব পুত্র-উৎপাদন করেছেন। ব্যাসদেবের ঠাকুর্দার পিতা বশিষ্ঠ মুনি (ব্যাসের পিতামহ শক্তি, পিতা পরাশর) একাধিক নারীর সঙ্গে যৌনসঙ্গম করেছেন। অরুন্ধতী বশিষ্ঠ মুনির স্ত্রী। সৌদাস রাজা পুত্র-উৎপাদনের জন্য স্ত্রীকে আদেশ করলে, তার পত্নী ময়ন্তী মহর্ষি বশিষ্ঠের সঙ্গে সঙ্গম করেন। তাদের পুত্র অশ্যক। স্বয়ং বাসদেব তিনটি নারীর সঙ্গে সহবাস করেন। ধৃতরাষ্ট্র ও পান্ডূ বহুগামী ছিলেন। ধৃতরাষ্ট্র তার স্ত্রী গান্ধারী ছাড়াও এক বৈশ্যা দাসীর গর্ভে যুযুৎসু নামক পুত্র উৎপাদন কারন। ধৃতরাষ্ট্রের বৈমাত্রেয় ভাতা পাণ্ডরও দুই স্ত্রী কুন্তী ও মাদ্ৰী।।

জনমেজয় বৈশম্পায়নাক জিজ্ঞাসা করছেন, “দ্রোণাচার্য কীভাবে জন্মেছেন?” বৈশম্পায়ন উত্তরে বললেন, ‘মহর্ষি ভরদ্বাজ দ্রোণের পিতা।” এই ভরদ্বাজ মুনির জন্মবৃত্তান্তু কী? সেই কাহিনি শুনলে বহুগামিতার ব্যাপার আরও প্রকট হবে। উতথ্য ঋষির স্ত্রী মমতার গর্ভবতী অবস্থায় দেবর দেবগুরু বৃহস্পতি সঙ্গম প্রার্থনা করলে মমতা নিষেধ কারন। তখন বৃহস্পতি মমতার সঙ্গে বলপূর্বক রমণ করেন। গর্ভস্থ শিশু পা দিয়ে বৃহস্পতির বীর্যপাত আটকায়। বৃহস্পতির বীর্য ভূমিতে পতিত হয়ে আর একটি পুত্র উৎপন্ন হয়। মমতা সেই পুত্রকে ত্যাগ করতে চান, কারণ তিনি ব্যাভিচারিণী মনে করে স্বামী তাকে ত্যাগ করবেন। ‘তখন মরুক্ষণ এই শিশুকে পালন করেন। সেই পুত্রের নাম ভরদ্বাজ। মহর্ষি ভরদ্বাজ গঙ্গার নির্জন তীরে বাস করতেন। একদিন হােমের জন্য তিনি নদীতে গমন করেন। সেখানে রূপযৌবনসম্পন্ন, যৌবনগর্বিতা এবং যৌবনমদে মন্দগমন ঘৃতাচী নাম্নী অপ্সরাকে স্নানান্তে বস্ত্র পরিত্যাগ করতে দেখলেন। নদী তীরের বায়ু ঘৃতাচীর বস্তু আকর্ষণ করে নিলে তার সমস্ত অঙ্গই ভরদ্বাজের নিকট প্রকাশিত হয়। ঘৃতাচীর সেই রূপ দেখে ভরদ্বাজের কামােদ্রেক ও শুক্রক্ষরন হয়। তিনি একটি প্রোণে সেই শুক্র রাখেন। সেই ধীমান মহর্ষির কলসে দ্রোণের জন্ম হল। দ্রোণের পিতা ভরদ্বাজের পঞ্চ সন্তান— তিনটি পুত্র এবং দুইটি কন্যা। তারা হলেন যথাক্রমে দ্রোণ, বীত, গর্গ, হুবতী ও ইড়াবিড়া। সুশীল ভরদ্বারে স্ত্রী। এ ছাড়াও তিনি ভরতের তিন স্ত্রীতে উপগত হন। ভরতের মহিষী কাহীরাজকন্যা সর্বাসনার গর্ভুে ভুরাজ পুত্ৰ উৎপন্ন করেন। ভরতের নয় পুত্র থাকা। সত্ত্বেও তাদের পক্ষ না হওয়ায় দুরত ঔরসজাত পুত্রদের পরিত্যাগ করেন। ……

….পঞ্চপাণ্ডবের বহুপত্নীর কথা সর্বজনবিদিত। স্বয়ং ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির দুইজন নারীর পতি ছিলেন। দ্রৌপদী ছাড়া তার অন্য স্ত্রীর নাম দেবিকা। ……

……..দ্রৌপদী ছাড়া ভীমসেনের আরও তিনজন স্ত্রী ছিলেন। হিড়িম্বার কথা প্রায় সকলেই জানেন। এ ছাড়া বলন্ধরা ও কালী নামে আরও দুই পত্নী ছিলেন বৃকোদরের। মদ্ররাজ শলের ভগিনী কালী, তিনি ভীমের বিমাতা মাদ্রীর বােন। ভীমসেন সম্পর্কে তার মাসীকে বিবাহ করেন। ভীম ও কালীর পুত্র সর্বগত কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে মৃত্যুবরণ করেন। ভীমের অন্য পত্নী বলন্ধরা, কাশীরাজের দুহিতা বলন্ধরা ভীমের বীর্যশুষ্কা। কলন্ধরার পুত্র সর্বগও মহাযুদ্ধে নিহত হন।

অৰ্জুনও ভীমের মত চারজন নারীর সঙ্গে সহবাস করেন। দ্রৌপদীর গর্ভে অর্জুনের একটি পুত্র জন্মায়, পঞ্চপাণ্ডবের ঔরসে যাজ্ঞসেনীর পাঁচটি পুত্ৰ জন্মলাভ করে। অর্জুন-দ্রৌপদীর পুত্রের নাম ক্ৰীর্তি। যুধিষ্ঠিরদ্রৌপদী এবং ভীম-যাসেনীর পুত্রদ্বয় হল যথাক্রমে প্রতিবিন্ধা ও সুনােম।

সুন্দ-উপসুন্দের তিলোত্তোমাকে নিয়ে লড়াই এবং দুই ভাইয়ের বিনাশ এই কাহিনি থেকে নারদ পঞ্চপাণ্ডবকে উপদেশ দিয়েছিলেন। সেই নিয়ম অনুযায়ী, দ্রৌপদী যখন যাঁর সঙ্গে থাকবেন, তখন তিনি ছাড়া অন্য কোনও ভাই যাজ্ঞসেনীর শয়নকক্ষে ঢুকতে পারবেন না। যদি কেউ এই নিয়ম না মানেন, তাহলে তাকে বারাে বছর ব্রহ্মচর্য অবলম্বন করে বনে কাটাতে হবে। একদিন এক ব্রাহ্মণের গরু চোরে নিয়ে পালাচ্ছিল। ব্রাহ্মণ সেই সংবাদ পাণ্ডবদের দেন ও তার সম্পদ উদ্ধারের আবেদন জানান। অর্জুন সেই ব্রাহ্মণকে অভয় দেন এবং অস্ত্রাগারে ঢুকে ধনুর্বাণ নিয়ে গরু-উদ্ধার করতে বেরিয়ে পড়েন। অস্ত্রাগারে যুধিষ্ঠির দ্রৌপদীর সঙ্গে কামক্রীড়ায় রত ছিলেন। অর্জুন তা দেখে ফেলেন। অর্জুন অবশ্য জানতেন যে, ওই ঘরে যুধিষ্ঠির ও দ্রৌপদী আছেন। কিন্তু অস্ত্র না নিলে ব্রাহ্মণের গরু-উহ্মার সম্ভব নয়, আবার ঘরে প্রবেশ করলে তাকে শাস্তি পেতে হবে। তিনি শাস্তিটাকেই গ্রহণ করেন এবং গরু-উদ্ধার করার পর যুধিষ্ঠিরকে জানান, বারাে বছরের জন্য তিনি বনবাসে যাবেন। যুধিষ্ঠির তাকে বলেন, অর্জুন তো বিশেষ দরকারে ওই অস্ত্রাগারে ঢুকেছিলেন, এতে কোনও অন্যায় হয়নি; অতএব বনগমনের প্রয়ােজন নেই। অর্জুন বলেন, দুলপূর্বক ধর্মাচরণ করাতে নেই— এই উপদেশ তিনি যুধিষ্ঠিরের কাছেই পেয়েছেন। ……..তিনি বনে যাত্রা করলেন। অনেক ভ্রমণ করার পর। হরিদ্বারে এসে পৌঁছলেন। গঙ্গাস্নান করে তীরে উঠবেন, সেই সময় কৌরব্যনাগর কন্যা বিবাহিতা উলুপী তাকে জলের মধ্যে আকর্ষণ করে পাতালপুরীতে নিয়ে গেলেন। অসামান্য রূপবর্তী উলুপীর গায়ের রং সুবৰ্ণর মতো। এই কন্যার বিবাহ হয়েছে, কিন্তু তার স্বামী অপহৃত। উলুপী তাই পিতৃগৃহে অবস্থান করেন। পাতালপুরীতে নিয়ে গিয়ে উলুপী অর্জুনকে বললেন, “আমি তােমাকে দেখে কামাতুর হয়েছি। হে মহাবাহাে! তোমাকে পতিরুপে পেতে ইচ্ছা করি।”অর্জুন তার প্রতিজ্ঞা ও ব্রহ্মচার্যের কথা জানানাে সত্ত্বেও সেই নারী জানান, তিনি শরণাগত; তাই তাঁর জীবনযৌবন রক্ষা করা অর্জুনের ধর্ম। উলুপী বলেন, অর্জুনের ব্রত আসলে দ্রৌপদী-বিষয়ে। দ্রৌপদীর ক্ষেত্রে তিনি ব্রহ্মচর্য করলেই হাবে, উলুপীর বাসনা পূরণ করলে তার কোনও অধর্ম হবে না। উলুপীর কাতর প্রার্থনায় অর্জুন সেই রাতে উলুপীকে সম্ভোগ করেন। কামে পীড়িত নাগকনার সঙ্গে অর্জুন সর্বপ্রকার রমণ করেন। …..

…..উলুপীর সঙ্গে সম্পর্কের পর বহু দেশ ঘুরলেন অর্জুন। একদিন এসে পৌঁছলেন দক্ষিণ-পশ্চিম ভারতের মণিপুরে। সেই রাজ্যের অধিপতি চিত্ৰবাহন। চিত্ৰবাহানের একটি কন্যা ছিল, সেটি তার একমাত্র সন্তান। সেই রাজকন্যার নাম চিত্রাঙ্গদা। তার রূপে মুগ্ধ হলেন অর্জুন। তিনি চিত্রবাহান কাছে বিবাহ-প্রস্তাব করলেন। চিত্ৰবাহন বললেন, এ ক্ষেত্রে তাঁর একটি শর্ত আছে। যেহেতু চিত্রাঙ্গদা তার একমাত্র সন্তান, তাই বিবাহের পরেও তিনি তাকে নিজের বাড়িতে রাখতে চান। এই শর্তে অর্জুন সম্মত হলে তিনি কন্যাদান করবেন। ‘অর্জুন রাজি হলেন! কামের দহনে তিনি তখন টগবগ করে ফুটছেন। ইতিপূর্বে দুজন নারীর সঙ্গে তিনি থেকেছেন। বিবাহের পরে অর্জুন তৃতীয় স্ত্রী চিত্রাঙ্গদার সাঙ্গ টানা তিন বছর চিত্রবাহনের গৃহে কাটালেন। ……

মণিপুর থেকে বিদায় নিয়ে বহু তীর্থ ঘুরলেন অর্জুন। ব্রহ্মশাপগ্রস্তু পাঁচ নারীকে উদ্ধার করলেন এবং পুনরায় মণিপুরে এলেন। তারপর দ্বারকায় গিয়ে কৃষ্ণের সঙ্গে বাস করতে লাগলেন। একদিন উৎসব উপলক্ষে সখী-পরিবৃতা কৃষ্ণ-ভগিনী সুভদ্রাকে দেখে তিনি জঁকে পাওয়ার জন্য ব্যাগ্র হয়ে উঠলেন। শ্রীকৃষ্ণের পরামর্শ নিয়ে তিনি সুভদ্রাকে জোর করে রথে তুলে ইন্দ্রপ্রস্থের দিকে যাত্রা করেন। … অর্জুনের মাতুল কন্যা এখন অর্জুনের চতুর্থ স্ত্রী। লাল শাড়ি পরে গােপবালিকার বেশে সুভদ্রাকে নিয়ে এলেন অর্জুন। অর্জুন-সুভদ্রার পুত্ৰ অভিমন্যু। ……

……..মহাভারতের তামিল সংস্করণে দেখা যায়, অর্জুন মোট সাতজন নারীর পতি। তাদের মধ্যে একজনের নাম হল অলি, তিনি ছিলেন যােদ্ধা। ইনি অর্জুনের বিবাহ-প্রস্তাব প্রাথমিক ভাবে প্রত্যাখান করেছিলেন। অজুনি তখন বাসুদেবের শরণাপন্ন হন। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে সর্প পরিণত করে দেন এবং অলির বিছানায় শুয়ে থাকতে বলেন। সর্পরূপী অর্জুন অলিকে স্ত্রী হিসাবে পাওয়ার জন্য ভয় দেখাতে থাকেন। অলি সর্পে রূপান্তরিত হয়ে অর্জুনের সঙ্গে কামক্রীয়ায় মেতে ওঠেন।………..

……..দ্রৌপদীর চতুর্থ পতি হলেন নকুল, তিনি মাদ্রীর পুত্র। নকুলের দ্বিতীয় পত্নীর নাম করণুমতী। ……

….ইন্দ্ৰ গৌতম মুনির স্ত্রী অহল্যাকে ধর্ষণ করেন। মনে করা হয়, ইন্দ্রই জগতে প্রথম ধর্ষণ-প্রথার সূত্রপাত করেন। স্ত্রী ধর্ষিত হয়েছেন জেনে গৌতম ইন্দ্রকে অভিশাপ দেন। কেউ কেউ বলেন, ইন্দ্রকে অহল্যা চিনতে পেরে সঙ্গমে সম্মত হন। সঙ্গমের পর তাকে দ্রুত পলায়ন করতে বলেন। স্নান সেরে গৌতম মুনি ফিরলে তিনি ইন্দ্রকে বৃষণ অর্থাৎ অণ্ডকোষহীন হওয়ার অভিশাপ দেন। গৌরম অহল্যাকে ইন্দ্রের কথা জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, ‘মার্কার চলে গিয়েছে। মার্ক্সার শব্দটি আর একটি অর্থ “নিষিদ্ধ প্রেমিক’ অহল্যা গৌতমের অভিশাপে পাথর হয়ে যান। ইন্দ্রের স্ত্রী হলেন ইন্দ্রাণী বা শচী তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণে কথিত আছে, ইন্দ্র যৌন আবেদনে আকৃষ্ট হয়ে ইন্দ্রাণীকে বিবাহ করেন। অন্যান্য গ্রন্থে এমন কথা পাওয়া যায় যে, তিনি ইন্দ্রাণীর সতীত্ব নষ্ট করেন এবং অভিশাপ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ইন্দ্রাণীর পিতা পুলােমাকে হত্যা করেন। আরুণির গর্ভের ই বালীর জন্ম দেন। শচী ও ইন্দ্রাণীকে কেউ কেউ অভিন্ন বলে মনে করেন। শচীদেবী জয়ন্ত, ঋষভ ও মিধু নামে তিনটি পুত্রের জন্মদাত্রী। অপ্সরা-শ্রেষ্ঠ উর্বশী ইন্দ্রর যৌনসঙ্গিনী ছিলেন। উর্বশী শাপগ্রস্ত হয়ে মর্তে রাজা পুরুরবার স্ত্রী হন। দিনে তিনবার ঊর্বশীকে সন্ত্রাগ করতেন তিনি। পরে তাদের বাৎসরিক কামক্রীড়ার ব্যবস্থা হয়। ঊর্বশী প্রতি বছরই পুরুরবাকে একটি সন্তান দিতেন। অর্জুন যখন দেবলােকে যান, তখন নৃত্যরতা উর্বশীর দিকে বার বার তাকালে পিতা ইন্দ্র তাঁর যৌনসঙ্গিনীকে পুত্র অর্জুনের কাছে পাঠালেন। কামাতুরা উর্বশীকে অবশ্য অর্জুন মাতা-জ্ঞানে প্রত্যাখ্যান করেন।

উদ্দেশ্য সিদ্ধ না হওয়ার জন্য ক্রোধে উর্বশী অর্জুনকে অভিশাপ দিলেন—তােমার পিতার নির্দেশে আমি স্বয়ং তােমার গৃহে এসেছি। যেহেতু কামার্ত আমাকে তুমি গ্রহন করলে না, সেই হেতু হে পার্থ, মানবর্জিত এবং আপুরুষরূপে খ্যাত হয়ে তুমি নর্তকরূপে স্ত্রীলােকের মধ্যে নপুংসকের ন্যায় বিচরণ করবে।…….বিরাট রাজা মহিলাদের দিয়ে অর্জুনের ক্লীত্ব পরীক্ষা করে তবেই তাকে অন্তঃপুরের কুমারীদের সঙ্গীত শিক্ষার ভার দিলেন। ……..

….নকুল ও অর্জুন দু’জনেই ইন্দ্রর পুত্র। …….অর্জুনের যেমন চার জন স্ত্রী, ইন্দ্রের অগণিত যৌনসঙ্গিনী, তেমনই নকুলের স্ত্রী-সংখ্যা দুই। মাত্র দুই। সংখ্যায় কম হলেও তাকেও বহুগামী বলতে হবে। ……….

……পুরুষের বহুবিবাহাকে সে ভাবে নিষিদ্ধ ঘােষণা করা হয়নি। সাধারণের জুন্য বহুবিবাহ বা বহুগামিতার পক্ষে জোরালাে যুক্তি না থাকলেও মহাভারতের নায়কদের ক্ষেত্রে বহুগামিতায় ছাড় ছিল। …… মহাভারতে যে ঋষি দীর্ঘতমা নারীর একপতিত্বর পক্ষে বিধান দিয়েছিলেন, তিনি নিজেই যত্রতত্র যার তার সঙ্গে প্রকাশ্য-মৈথুনে লিপ্ত হতেন। এই জন্য তাকে অন্যান্য মুনিঋষিরা পরিত্যাগ করেছিলেন। এমনকী তার স্ত্রী-পুত্ররাও তাকে ত্যাগ করেন এবং নদীতে ভাসিয়ে দেন। উদ্ধার পাওয়ার পরেও তার বহুগামিতা অটুট থাকে। বৃদ্ধ ও অন্ধ সেই মুনি দুই জন নারীর গর্ভে ষোলোটি পুত্র উৎপাদন করেন। এই নারী দুজনের একজন হলেন বলি রাজার স্ত্রী সুদেষ্ণা ও অনাৰ্জন সুদেষ্ণার ধাত্রীকন্যা।……

৭. বিবাহে আচার-অনুষ্ঠান

……………..

৮. বিবাহের বর্ণবিচার

…….ব্রাহ্মণ শূদ্রাকে নিজ শয্যায় তুললে অধােগতি প্রাপ্ত হন এবং শাস্ত্রের নিয়ম অনুসারে তাকে প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়। সেই শূদ্রার গর্ভে ব্রাহ্মণের ঔরসে সন্তান জন্মালে ওই ব্রাহ্মণের দ্বিগুণ পাপ ও দ্বিগুণ প্রায়শ্চিত্ত হয়। ব্রাহ্মণের ঔরসে ক্ষত্রিয়ার গর্ভে যে পুত্র জন্মায় সেও নিশ্চয় ব্রাহ্মণ কিন্তু তার মর্যাদা ব্রাহ্মণ-ব্রাহ্মণীর সন্তানের তুলনায় কম, কারণ ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়ার পুত্র সম্পত্তির ভাগ কম পায়।…..

……বিবাহের একটি তালিকা আছে

ব্রাহ্মণ + ব্রাহ্মণী = ব্রাহ্মণ

ব্রাহ্মণ + ক্ষত্রিয়া = মুর্ধাভিষিক্ত

ব্রাহ্মণ + বৈশ্যা – অম্বষ্ঠ

ব্রাহ্মণ + শুদ্রা – পারব

ক্ষত্রিয় + ক্ষত্রিয়া = ক্ষত্রিয়া

ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যা – মাহিষ্য

ক্ষত্রিয় – শুদ্ৰা = করুণ।

…………

৯. মানুষের সঙ্গে অন্যান্যদের বিবাহ

মানবের সঙ্গে মানবীর বিবাহ স্বাভাবিক বলে পরিগণিত। মরীচি, অত্রি, অগিরা, পুলস্ত, পুলহ, ক্রতু, বশিষ্ঠ, দক্ষ, ভূ ও নারদ—এই দশ সর্ষিকে প্রজাপতি বলা হয়। এদের প্রজা হল মানুষ। তবে, প্রজা সৃষ্টির নানা অজ্ঞাত ও অদ্ভুত উপায় আছে। সন্তান উৎপাদনকে বিবাহের প্রধান উদ্দেশা বলা হলেও মিলন আকাঙ্ক্ষাই মানুষকে অনানা প্রাণীর সঙ্গে বিবাহ বা যৌন মিলনে উদ্বুদ্ধ করেছে। মানুষ তার থেকে উন্নত প্রাণী কিংবা মনুষ্যেতর প্রাণীর সঙ্গে মিলনে প্রবৃত্ত হয়েছে। তবে, এই কামাচরণের ফলে কীভাবে সন্তান উৎপাদিত হয়, তা বােধগম্য নয়। আদিপর্বে দেখা যায়, কিমিস্পম মুনি একটি হরিণীর সঙ্গে সঙ্গমে লিপ্ত হয়েছেন। রাজশেখর বসু লিখেছেন, “একদিন পাণ্ডু অরণ্যে বিচরণ করতে করতে একটি হরিণমিথুনকে শরবিদ্ধ করলেন। আহত হরিণ ভুপতিত হয়ে বললে, কামক্রোধের বশবর্তী মুঢ় ও পাপাসক্ত লােকেও এমন নৃশংস কর্ম করে না। কোনও জ্ঞানবান পুরুষ মৈথুনে রত পদম্পতিকে বধ করে?” কিমিন্দম পাণ্ডুকে বলেছিলেন, মহারাজ ‘আমি পুত্ৰ উৎপাদন করব বলে মৈথুনে প্রবৃত্ত হয়েছিলাম। অত্যন্ত আনন্দে এই মৃগীর সঙ্গে কামক্রীড়া করছিলাম। আমি বনবাসী, ফলমূল খাই, শান্তিপরায়ণ ও নিরপরাধ, এমন এক মুনিকে আপনি বধ করলেন: কিমিন্দম মুনির মিথুনকে ঠিক কী বলা যেতে পারে তা নিয়ে তিনটি মত পাওয়া যায়। এক, তারা সত্যি হরিণ দম্পতির উন্মত্ত কামক্রীড়া দেখে ওই ভাবে যৌনমিলন সম্পন্ন করেছিলেন। বাৎস্যায়নের কামসূত্রে মৃগভঙ্গিতে সঙ্গমের বিবরণ আছে। ……….মানুষ ও মৎসীর সংযােগে সন্তান উৎপাদনের কথা মহাভারতে রয়েছে। পুরুবংশজাত উপরিচর বসু চেদি দেশের রাজা ছিলেন। একবার মৃগয়ায় গিয়ে স্ত্রী গিরিকাকে স্মরণ করে তার বীর্য স্বলিত হয়। সেই বীর্য এক শ্যেন পক্ষীকে দিয়ে তিনি বলেন, শীঘ্ন গিরিকা দিয়ে এসাে। পথে অন্য এক শােনের আক্রমণের ফলে ওই শুক্র যমুনার জলে পড়ে যায়। অদ্রিকা নামের এক অপ্সরা ব্রহ্মশাপে মংসী হয়ে সেখানে ছিল। এই মহসী শুক্র গ্রহণ করে গর্ভবতী হয়। দশম মাস সে ধীবরের জালে ধরা পড়ে। মৎসীর গর্ত থেকে একটি পুরুষ ও একটি স্ত্রী সন্তান পাওয়া যায়। সন্তান দুটি মানব-মানবী। অপ্সরা শাপমুক্ত হয়ে চলে গেলে সন্তান দুটিকে নিয়ে ধীবর রাজা উপরিচরের কাছে আসে। পুত্রটির নাম রাখা হয় মহসী, কন্যাটির নাম মৎস্যগন্ধা। ……..

মহাভিষ নামে ইক্ষাকু বংশের এক রাজা ছিলেন। একলা স্বর্গে থাকার সময় তিনি দেবতাদের সঙ্গে ব্রহ্মার সভায় উপস্থিত হলেন। সেখানে বায়ু দ্বারা গঙ্গার সুক্ষ্ম অঙ্গবস্ত্র অপসৃত হয়। দেবতারা মাথা নীচু করে থাকলেন, কিন্তু মহাভিষ গঙ্গার সৌন্দর্য উপভােগ করতে লাগলেন। তার এই অশিষ্ট আচারে ব্রহ্মা ক্রুদ্ধ হন। তিনি অভিশাপ দেন, মহাভিষ মর্ত্যলােকে জন্মগ্রহণ করবেন। স্বর্গচ্যুত হয়ে তিনি রাজা প্রতাপের পুত্র শান্তনু রূপে জন্মাবার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। ……….

……..মানুষের সঙ্গে অপ্সরার মিলন বা বিবাহ মহাভারত বিরল নয়। ব্রহ্মশাগ্রস্ত অদ্রিকা অপ্সরা দশ মাস গর্ভধারণ করলেও স্বর্গের অপ্সরা সাধারণত গৰ্ভধারণের বােঝা বইতেন না। গান্ধর্ব বিবাহ বা যেীনমিলনের অব্যবহিত পরেই তারা সন্তান প্রসব করতেন, সে সন্তানের লালনপালনের দায়িত্বও নিতেন না। সন্তানকে পরিত্যাগ করে চলে যাওয়াই ছিল তাদের নিয়ম। মহাভারতে দুয়টি শ্রেষ্ঠ অপ্সরা হলেন বিশ্বাটী, ঘৃতাচী, রম্ভা, তিলোত্তমা, মেনকা ও উর্বশী। ঘৃতাচীর সঙ্গে বহু ঋষি ও রাজার প্রণয় কাহিনির বর্ণনা পাওয়া যায়। চাকন ঋষির পুত্র প্রমতির সঙ্গে তার গন্ধর্ব মত বিবাহ হয়। প্রমতি ঘৃত্ৰাচীর গর্ভে রুরুকে উৎপন্ন করেন। আবার রাজা কুশুনা ঘৃতাচীর রূপে মুগ্ধ হয়ে তাঁর গর্ভে একশত পরমা সুন্দরী কন্যা উৎপন্ন করেন। ঘৃতাচীর রূপ-যৌবন দেখে ব্যাসবেদ এবং ভরদ্বাজ মুনির রেতঃপাত হয়েছিল। যার ফলে শুকদেব ও দ্রোণাচার্যের জন্ম। বিশ্বামিত্রের ঘােরতর তপস্যা দেখে দেবরাজ ইন্দ্র ভয় পেয়ে যান। অপ্সরা মেনকাকে পাঠানাে হয় বিশ্বামিত্রের তপস্যা ভঙ্গ করাতে। মেনকা বিশ্বামিত্রের কাছে এলে তাঁর পােশাক উন্মুক্ত হয়। বিবস্ত্রা মেনকাকে দেখে অসংযত বিশ্বামিত্র তাঁর গর্ভে শকুন্তলাকে জন্ম দেন। …….

…অর্জুনের জৈবিক পিতা ইন্দ্রের যৌনসঙ্গিনী উর্বশী অর্জুনের শয্যাসঙ্গী হতে চেয়েছিলেন। সেই ইচ্ছায় ইন্দ্রেরও সায় ছিল। কিন্তু অর্জুন উবর্শীকে মাতৃজ্ঞানে প্রত্যাখ্যান করেন। উর্বশী বলেছিলেন, অপরা বা স্বৰ্গবেশারা কোনও নিয়মের অধীন নয়, তাঁরা পিতা ও পুত্রের যৌনসঙ্গিনী হতে পারেন। অর্জুন সম্মত না হলে উর্বশী ক্রুদ্ধ হয়ে তাকে নপুংসক নর্তক হওয়ার অভিশাপ দেন। …….

১০. বিবাহের উদ্দেশ্য

…..

১. স্বয়ংজাত– বিবাহিতা পত্নীতে স্বয়ং যে পুত্র উৎপাদন করা হয়, তার নাম স্বয়ংজাত। এই পুত্র স্বাভাবিক। শানুর পুত্র ভীষ্মদেব স্বয়হজাত।

২. প্রণীত— বিবাহিতা পত্নীতে অপর উত্তম পুরুষ দ্বারা যে পুত্র লাভ করা হয় তার নাম প্রণীত। একে ক্ষেত্রজ পুত্রও বলা যােত পারে। ধৃতরাষ্ট্র ও পান্ডূ কিংবা পঞ্চপাণ্ডব এই পুত্রের উদাহরণ।

৩. পরিক্রীত— অপর পুরুষকে ধন দানে প্রলুব্দ করে আপন বিবাহিত পত্নীতে নিয়ােগের ফলে যে পুত্ৰ লাভ হয় তাকে পরিক্রীত বলে।

৪. পৌনর্বভ— অপরের বিবাহিত স্ত্রীকে পরে যদি অন্য কোনও পুরুষ দ্বিতীয়বার পত্নীরূপে গ্রহণ করে, তবে দ্বিতীয় পতির ঔরসে সেই স্ত্রীর গর্ভে যে পুত্রের উৎপত্তি হয় তাকে পৌনৰ্ভব বলে। পৌনৰ্ভব’ শব্দটির অর্থ হল পুনর্দু সম্বন্ধী বা পুনর্ভূতি। বিধবা বা পতি পরিত্যক্ত স্ত্রী স্বেচ্ছায় অন্যের ভার্যা হয়ে যে পুত্র উৎপাদন করে সেই পুত্রই পৌনব।

৫. কানীন— বিবাহের পূর্বে কুমারীর গর্ভে যে পুত্রের উৎপত্তি হয় তাকে কানীন বলে। অনুঢ়ার পুত্র সমাজে নিন্দনীয় হালও তাকে মহাভারতকার মেনে নিয়েছেন। মনুর মতে, কানীন পুত্র পরিণেতা এবং যাজ্ঞবল্কের মতে, কানীন পুত্র মাতামহের পুত্র। ব্যাসদেব ও কর্ণ হলেন কানীন পুত্র।

৬. স্বৈরিণীজ— বিবাহিতা স্বৈরিণী মহিলার গর্ভে পতি ব্যতীত অনা কোনও সমান জাতীয় বা উত্তম জাতীয় পুরুষ যে পুত্ৰ উৎপাদন করেন সেই পুত্রকে বলা হয় স্বৈরিণজি। ‘স্বৈরিণী’ শব্দের অর্থ হল স্বেচ্ছাচারিণী বা কুলটা। যে স্ত্রী পতি ত্যাগ করে স্বেচ্ছায় অন্য সবর্ণ পুরুষকে আশ্রয় করে সেই স্বৈরিণী। ….. প্রণীত, পরিক্ৰীত এবং স্বৈরিণীজ— এই তিন প্রকার পুত্ৰই ক্ষেত্রজ পুত্র। এই ছয় প্রকার পুত্রকে বলা হয় ব্যয়াদ বান্ধব। ….

দ্বাদশ প্রকার পুত্রের অবশিষ্ট হয় পুত্র হল আসায়াদ বান্ধব বা বন্ধু দায়দ।

৭. দক— পিতামাতা যে পুত্রকে অন্য অপুত্রক ব্যক্তির পুত্ররূপে দান করেন তার নাম দস্তক। দ’ শব্দের অর্থ হল ত্যক্ত, বিসৃষ্ট, সমর্পিত। দক্ষ পুত্র সম্পত্তির উত্তরাধিকারী নয়।

৮. ক্রীত— মুলাের বিনিময়ে যদি কারও পুত্র ক্রয় করে আনা হয়, তবে সেই পুত্রকে বলা হয় ক্রীত। ক্রীত পুত্ৰ গৌণপুত্র। মনু ও যাজ্ঞবল্ক্য এই মত পােষণ করেন।

৯. কৃত্রিম— যদি কোনও বালক স্বয়ং উপস্থিত হয়ে কাউকে পিতৃ সাম্বাধন করে তা হলে সেই পূত্রকে কৃত্রিম বলা যেতে পারে। এই পুত্রও সম্পত্তির উক্তরাধিকারী নয়। কেউ কেউ বলেছেন, কৃত্রিম পুত্র হল বস্ত্ৰকাষ্ঠশৃঙ্গাদি রচিত।

১০, সহীঢ়— যদি বিবাহের সময় পাত্রী গর্ভবতী থাকেন, তবে সেই গর্ভজাত সন্তানকে বলে সহােঢ়। 

১১, জাতিরতা— সহােদয় ভিন্ন অন্য জাতির পুত্রকে বলা হয় জাতিরতা।

১২. হীনযােনিধৃত— নিজ অপেক্ষা অধম জাতের স্ত্রীতে উৎপাদিত পুত্রকে বলা হয় হীনযােনিধৃত। অনুলোম বিবাহের ফলে এ জাতীয় পুত্রের জন্ম হয়।

অনুশাসনগর্বে যুধিষ্ঠির বলেছেন, সংকরজাত ও তদ্ভিন্ন যােনির মধ্যে যে যােনিতে পুত্র উৎপাদন করা উচিত নয়, বুদ্ধিমানের উচিত সেই সব যােনি পরিত্যাগ করা। ……….

১১. বিবাহে নিয়ােগ প্রথা

আগের অধ্যায়ে বিবাহের উদ্দেশ্য আলােচনাকালে ক্ষেত্রজ পুত্রের কথা বলা হয়েছে। পুরুষের অক্ষমতা জ্নিত কারণে নারীর গর্ভে অন্য পুরুষের দ্বারা উৎপাদিত সন্তান ক্ষেত্রজ বলে পরিচিত।……এমনকী নারীর এক পতিত্বের বিধান দিয়েছিলেন যে দীর্ঘতমা ঋষি তিনিও অন্যের স্ত্রীর গর্ভে পুত্র উৎপাদন করেছেন। ভীষ্মকে বিচিত্রবীর্যের দুই বিধবা স্ত্রীর গর্ভে পুত্র উৎপাদন করতে বললে তিনি সত্যবতীকে জানান, তিনি ত্রিলোকের সমস্তই ত্যাগ করতে পারেন, কিন্তু ব্রহ্মচর্যের যে প্রতিষ্ঠা করেছেন, তা ভঙ্গ করতে পারেন না। শান্তুনুর বংশ যাতে রক্ষা হয়, তার ক্ষারধর্মসম্মত উপায় তিনি বলছেন। | পুরাকালে পরশুরাম কর্তৃক পৃথিবী নিঃক্ষত্রিয় হয়ে গেলে ক্ষত্রিয় বিধবা নারীরা ব্রাহ্মণের সহবাসে সন্তান উৎপাদন করেছিলেন। কারণ, বেদে বলা আছে যে, ক্ষেত্রজ পূত্র বিবাহকারীর পুত্র হয়। উতথ্য ঋষি ও মমতার অন্ধ পুত্র দীর্ঘতমা ধার্মিক ও বেদজ্ঞ ছিলেন। কিন্তু তিনি পশুর ন্যায় যত্রতত্র সঙ্গম করে বেড়াতেন। তাই তাঁর স্ত্রী ও পুত্ররা তাঁকে ত্যাগ করেন। ……ধর্মাত্মা বলিরাজা তাঁকে দেখতে পেয়ে সন্তান উৎপাদনের জন্য নিয়ে যান। এবং তার স্ত্রী সুদেষ্ণার গর্তে পুত্ৰ উৎপাদন করতে বলেন। বলিরাজা যে সন্তান উৎপাদনে অক্ষম ছিলেন, এ কথা সঠিক নয়। বলির স্ত্রী সুদেষ্ণা, অন্ধ-বৃদ্ধ দীর্ঘতমার কাছে গেলেন না। পরিবর্তে স্ত্রীর ধাত্রী কন্যাকে পাঠালেন। দীর্ঘতমা সেই শুদ্রা কন্যার গর্ভে এগারােটি পুত্র উৎপাদন করেন। রাজা পুনরায় অনুরােধ করলে সুদেষ্ণা দীর্ঘতমার সঙ্গে রমণ করেন। তাঁর পাঁচটি তেজস্বী পুত্র জন্মলাভ করে। …..

ভীস্মদেব বিচিত্রবীর্যের পত্নীদের গর্ভে সন্তান উৎপাদনের জন্য গুনবান ব্রাহ্মণকে অর্থ দিয়ে নিয়ােগ করার কথা বললেন। সত্যবতী লজ্জিত ভাবে তার কানীন পুত্র ব্যাসবেদের কথা জানালেন এবং সেই পুত্রের দ্বারা বধুদের গর্ভে পুত্র উৎপাদন করার কথা প্রস্তাব করলেন। ভীষ্ম সমর্থন জানালে সত্যবতী ব্যাসকে স্মরণ করলেন। কিছুকালের মধ্যে ব্যাস আবির্ভূত হলেন। ব্যাসদেবকে সব জানানাে হলে তিনি বললেন, বধুদের মন তৈরি করতে এক বছর সময় লাগবে কিন্তু সত্যবর্তী অপেক্ষা না করে ব্যাসদেবকে নিয়ােগ করতে উদ্যোগী হলেন। ব্যাসদেব জানালেন, তার দেহের রূপ ও গন্ধ প্রভৃতি বিরূপ এই রাজবধুরা সহ্য করতে পারবেন না। তাদের অনিচ্ছায় সন্তান উৎপাদিত হলে তারা উৎকৃষ্ট হবে না। কিন্তু সত্যবতী যেন কিছুই শুনতে রাজি নন। তিনি বিচিত্রবীর্যের প্রথম পত্নী অম্বিকাকে বললেন, তােমার ভ্রাতা শয়নমন্দিরে আসবেন, তুমি সুন্দর বস্ত্র ও অলংকার পরে প্রতীক্ষা করাে। অম্বিকা মনে মনে ভীষ্মদেবকে ভাবতে লাগলেন। মহর্ষি ব্যাসের আগমনের পর, তার কুৎসিত চেহারা দেখে অম্বিকা ভীত হয়ে পড়লেন। তাই আতঙ্ক তিনি চোখ বন্ধ করে ফেললেন। অম্বিকাকে সম্ভোগ করে ব্যাসদেব ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। তারপর মাতা সত্যবর্তীকে জানালেন, অনিচ্ছুক অম্বিকা তাঁকে গ্রহণ করেননি। তিনি ভীতা ও মুদ্রিত চক্ষু ছিলেন। জননীর দােষে পুত্রটি জন্মান্ধ হবে। সত্যবতী বুঝলেন, ব্যাসদেবকে নিয়ােগ করে কোনও লাভ হল না, কারণ পুত্র অন্ধ হলে সে রাজা হতে পারবে না। এ বার ব্যাসদেবকে পাঠানাে হল অম্বালিকার ঘরে। তিনি ব্যাসকে দেখে এতটাই ভয় পেলেন যে, তাঁর তপ্ত কাঞ্চনবর্ণ দেহ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সেই ভীতা পাণ্ডুবর্ণা নারীর সঙ্গে রমণ করে বেরিয়ে এলেন কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস। মাকে জানালেন, তাঁদের সঙ্গমের খুঁটিনাটি। এ ক্ষেত্রেও জননীর দোষে অম্বালিকার পুত্র পাণ্ডুর বর্ণ হবে। সত্যবতী খুশি হলেন না। তিনি জোষ্ঠা বধু অম্বিকার কাছে ব্যাসদেবকে পুনরায় পাঠালেন। অম্বিকা এক দাসীকে সজ্জায় ভূষিত করে শয্যা গ্রহণ করতে বললেন। সেই দাসীর গর্ভে বসিদেবের তৃতীয় পুত্র উৎপন্ন হয়। তবে এই তিনটি পুত্ৰই বিচিত্রবীর্যের পুত্র বলে পরিগণিত, ব্যাসদেবের পুত্র বলে নয়। কারণ, ব্যাসবেদকে এখানে বিচিত্রবীর্যের ক্ষেত্রে নিয়ােগ করা হয়েছে।

অম্বালিকার পুত্র পাণ্ডু মৃত্যুর ভয়ে রমণ করতেন না। মুনির শাপে তিনি স্ত্রী-সঙ্গমে অসমর্থ, তাই তার দুই স্ত্রী কুন্তী ও মাদ্রীর গর্ভে অন্য পুরুষের দ্বারা সন্তান উৎপাদনে ইচ্ছুক হয়ে পড়লেন। নিয়ােগ প্রথার সমর্থনে তিনি কুম্ভীকে জানাচ্ছেন, প্রাচীনকালে নারীরা স্বাধীন ও স্বেচ্ছাচারী ছিল। তারা নিজের বাসনা অনুযায়ী যত্রতত্র বিহার করে বেড়াত। আবার বিয়ের পরেও স্বামীকে ছেড়ে নিজের ইচ্ছেমাত্র পরপুরুষের সঙ্গে বিচরণ করত, তাতে অধর্ম হত না। কারণ, সব প্রাণীরই এটা চিরন্তন স্বভাব। মানুষ ছাড়া অন্য প্রাণীরা আজও আসক্তি ও বিদ্বেষশুন্য হয়ে সেই প্রাচীন ও স্বাভাবিক ধর্মের অনুসরণ করে থাকে। রাজা সৌদাস তার স্ত্রীর গর্ভে পুত্র উৎপাদনের জন্য বশিষ্ঠাকে নিয়ােগ করেন। বেদব্যাস থেকে ধৃতরাষ্ট্র ও পাণ্ডু জম্মান। অতএব কুন্তীর উচিত এই নিয়ােগ প্রথাকে সমর্থন করা। 

কিন্তু নিয়ােগ করার জন্য উপযুক্ত পুরুষ কোথায় পাওয়া যাবে? কুন্তী তাঁর কুমারী অবস্থায় পাওয়া বরের কথা পাণ্ডুকে ব্যক্ত করলেন। কিন্তু মন্ত্রের শক্তি যে তার পরীক্ষিত সে কথা প্রকাশ করলেন না। দেবতাদের নিয়ােগ করে পুত্র উৎপাদনের জন্য কুন্তীকে অনুমতি দিলেন পাণ্ডু।

সুন্দরী নিতম্বা কুন্তীদেবী শরীরধারী ধর্মদেবের সঙ্গে সঙ্গম করলেন। জ্যেষ্ঠ পুত্র যুধিষ্ঠিরের জন্ম হল। এক বছর পর পাণ্ডুর অনুমতি নিয়ে কুন্তী পবনদেবকে ডাকলেন। এই নিয়ােগে খুশি হয়ে বলবান বায়ুদেব মৃগে আরােহণ করে কুন্তীর কাছে উপস্থিত হলেন। তাদের সঙ্গমে ভীমসেনের জন্ম। পুনরায় আর একটি পুত্রের জন্য পাণ্ডুর চিত্ত ব্যাকুল হয়ে পড়িল । কুন্তী স্বামীর অনুরােধে বুদ্ধিমান তপস্বী অমিতবিক্রম একটি পুত্র ইন্দ্রের সঙ্গম থেকে পাওয়ার জন্য সম্মত হলেন। এক বছর পর ইন্দ্রেরর নিয়ােগে কুন্তী সৰ্বগুণবান অর্জুনকে পুত্ররূপ লাভ করলেন। | তিনটি ক্ষেত্রজ পুত্রের মুখদর্শন কারেও পান্ডূ ক্ষান্ত হলেন না। তিনি পুনরায় কুন্তীকে নিয়ােগের কথা জানালেন। কুন্তী উত্তর দিলেন, চতুর্থ পরপুরুষ সংসর্গ করলে সেই স্ত্রী স্বৈরিণী বা কুলটা হয়। এবং পঞ্চম পুরুষের সঙ্গে যৌনসঙ্গম করলে সেই নারী বন্ধকী বা বেশ্যা বলে গণ্য হয়। অতএব ধর্মজ্ঞ পান্ডূর অনুরােধ করা উচিত নয়। পাণ্ডু জানতেন না কুমারী অবস্থায় কুন্তী সুর্যের ঔরসে একটি পুত্রসন্তান প্রসব করেন। সেই হিসাবে তিনি সূর্য, পান্ডূ, ধর্ম, পবন ও ইন্দ্র— এই পাঁচ পুরুষের অন্কশায়ীনি হয়েছেন। দুর্বাসাকে এই তালিকায় রাখা হল না। পাণ্ডুর অন্য পত্নী মাদ্রী, মাতৃত্বের তীব্র বাসনা তাকে ব্যাকুল করে তুলল। একদিন তিনি স্বামীকে একা পেয়ে বললেন, মহারাজ আপনার অসামর্থ্যের জন্য আমি মা হাতে পারিনি। গান্ধারী শত পুত্রের জননী হয়েছেন তাতে আমার দুঃখ নেই কিন্তু সপত্নী কুন্তীর পূত্রবর্তী হওয়াকে আমি মেনে নিতে পারছি না। আপনি আদেশ করলে নিয়ােগ প্রথায় আমারও সম্ভান হতে পারে। কিন্তু এই বিদেশ বিভুয়ে নিয়ােগ করার মতো গুণবান পুরুষ কোথায় পাওয়া। যাবে! পরপুরুষ আকৃষ্ট করার কৌশল বা মন্ত্র কী, কুন্তী যদি তাঁকে শিখিয়ে দেন, তবে তিনিও পুত্র উৎপাদন করতে পারেন। পাণ্ডুর অনুরােধে কুন্তী মাদ্রীকে মন্ত্রটি শিখিয়ে দিলেন। সেই মন্ত্রের জোরে অশ্বিনীকুমার নামক দু’জন দেবতাকে আহ্বান করে মাদ্রী তাদের সঙ্গে যৌন সংসর্গ করলেন। মাদ্রীর যমজ পুত্র জন্মলাভ করে। পাঁচ পুত্রের মুখ দর্শন করেও পাণ্ডুর পুত্ৰস্পৃহা দুর হয়নি। মাদ্রী মন্ত্র ভুলে গিয়েছেন, কুন্তীকে পুনরায় সেই মন্ত্র শিখিয়ে দেওয়ার অনুরােধ করলে কুন্তী পাণ্ডুর অনুরােধ প্রত্যাখ্যান করেন। দুই দেবতাকে আহ্বান করে মাদ্রী দুটি পুত্র একই সময় লাভ করায় কুন্তী ঈর্ষাকাতর হয়ে পড়েন। কুন্তী বলেন, মাদ্রী ধূর্ত স্ত্রীলােক। তিনি একই সময়ে দুই দেবতাকে পুত্র উৎপাদনের জন্য নিয়ােগ করেছেন। ফলে কুন্তী প্রতারিত হয়েছেন। …….

……এই প্রথায় শারদায়িনীর তিনটি পুত্র জন্মায়। শারদায়িনী হলেন এক বিধবা নারী। পাণ্ডু কুন্তীকে বলছেন, সারদায়িনী ছিলেন এক ক্ষত্রিয়ের বিধবা, যিনি রাতে ফুলের মালা হাতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতেন। উদ্দেশ্য, কোনও উত্তম পুরুষকে নিয়োগ করে নিজের গর্ভে সন্তান উৎপাদন করা। বেশভূষা ও অলংকারে সুসজ্জিত হয়ে একদিন তিনি এক সিদ্ধ ব্রাহ্মণের দেখা পান। তাকে নিয়ােগ করে শারদায়িনী দূর্জয় প্রভৃতি তিনটি পুত্রের জননী হন।

উদ্দালক নামের একজন আচার্য তাঁর পত্নীর গর্ভে সন্তান উৎপাদনের জন্য একজন শিষ্যকে নিয়ােগ করেন। সেই শিষ্যের ঔরসে শ্বেতকেতু জন্ম হয়। …..

১২. বিধবা বিবাহ

…….তবে বিধবার পতি গ্রহণের বিধান মহাভারতে রয়েছে। যদি বিধবার জন্য কোনও পতি না পাওয়া যায়, তা হলে দেবরকে পতিত্বে বরণ করার সমর্থনে বেশ কয়েকটি শ্লোক মহাভারতে পাওয়া যায়। ঋগবেদের দশম মণ্ডলেও বর্ণিত হয়েছে যে, বিধবা নারী দেবরকে তার দাম্পত্যসজ্জায় নিয়ে যাচ্ছে। মহাভারতের আদিপর্ব, অনুশাসনপর্ব ও শান্তিপর্বে বিধবার দেবরকে পতি হিসাবে গ্রহণের কথা বলা হয়েছে।….

…..বিধবাদের গর্ভে পুত্র উৎপাদনকে মহাকাব্যে বৈধতা দেয়া হয়েছে। তবে বিধবা যদি পতি প্রহণ না করে নিয়ােগ প্রথায় সন্তান উৎপাদন করেন, তা হলে সেই সন্তান মৃত স্বামীর ক্ষেত্রজ পুত্র হিসাবে বিবেচিত হাতেন। পরশুরাম একুশ বার পৃথিবীকে নিঃক্ষত্রিয় করেছিলেন। তখন ক্ষত্রিয় বিধবা নারীরা ব্রাহ্মণের ঔরসে গর্ভবতী হন। তাদের প্রসব করা সন্তানেরা ক্ষত্রিয় বলেই বিবেচিত হন। তবে আরও উদাহরণ আছে। ……..

………স্বামী চলে যাওয়ার পর থেকে উলুপীয় সমস্তু যৌনাকাঙ্ক্ষা অপূর্ণ রয়ে গিয়েছে। উলুপীর কাতর প্রার্থনায় অর্জুন তাকে সেই রাত্রে সম্ভোগ করেন। কামপীড়িতা নাগ-কন্যার সাঙ্গে ব্রহ্মচারী অর্জুন সর্বপ্রকার রমণ করলেন। …..

১৩. দাসী, রক্ষিতা ও গণিকা

মহাভারতের যুগে ধনী পরিবারে প্রচুর দাসদাসী থাকত। এদের মধ্যে যারা দাসী তারা প্রভুর সঙ্গে সব রকম সম্পর্কই বজায় রাখত। এমনকী সেই দাসীদের পতি থাকলেও প্রভুর সব মনােবাঞ্ছনা তারা পূর্ণ করত। দাসীদের এই মানসিক ও শারীরিক শিথিলতা সামাজিক ভাবে দুষণীয় ছিল না। উৎসব প্রভৃতিতে সুন্দরী দাসীদান আভিজাত্যের অঙ্গ বলে বিবেচিত হত। এমনকী বিবাহে যৌতুকস্বরূপ, শ্রাদ্ধে দান হিসাবে এবং সম্মানিত ব্যক্তির সম্বর্ধনায় উপহার হিসাবে সালংকারা স্ত্রীলােক দান করা হত। মহাভারতে এ রকম বহু দৃষ্টান্তু আছে। যুধিষ্ঠিরের রাজসূয যজ্ঞে ব্রাহ্মণদের স্ত্রীলােক দান করা হয়েছিল।

……… রাজা যযাতির স্ত্রী হলেন দেবযানী। অসুররাজ বৃষপর্বার কন্যা শর্মিষ্ঠা ছিলেন দেবযানীর দাসী। সেই দাসীর গর্ভে যযাতি পুত্র উৎপাদন করেছেন। শর্মিষ্ঠাই যযাতির কাছে এই অনুগ্রহ ভিক্ষা চেয়েছিলেন, অর্থাৎ সেইকালে প্রভুর নিকটে সন্তান কামনা করা দাসীর পক্ষে দোষের ছিল না।

একজন বৈশ্যা পরিচারিকা ধৃতরাষ্ট্রের সেবা করতেন। গান্ধারী তখন গর্ভবতী। এই সময় ধৃতরাষ্ট্রের ঔরসে ওই দাসীর গর্ভে যুযুৎসু জম্মলাভ করে। কেউ কেউ বলেছেন, যুযুৎসুর মাতা দাসী বা পরিচারিকা ছিলেন , তিনি ছিলেন ধৃতরাষ্ট্রের রক্ষিতা……….

যতিকন্যা মাধবীকে তার পিতা গালবের হাতে দান করেন এবং বলেন, অন্য রাজারা শুল্কস্বরূপ গলিবকে তার ঈস্পিত অশ্ব দান করবেন। …..অর্থাৎ মাধবীকে ভাড়া খাটিয়ে গালিব বিত্ত পাবেন। অযােধ্যার রাজা হ্যযর্শ, কাশীরাজ দিবােদাস ও ভােক্মরা উশীণর একে একে মূল্য দিয়ে মাধবীর গর্ভে সন্তান উৎপাদন করেন। চতুর্থ পুরুষ বিশ্বামিত্রও মাধবীর গর্ভে অষ্টক নামে এক পুত্র উৎপাদন করেন। বিশ্বামিত্র মাধবীকে বর্জন করলে গালব তাকে যযাতির কাছে ফেরত দিলেন। পঞ্চপুরুগামিনী নারী হবেন না বলে তিনি পিতার কথামতাে বিবাহ করলেন না। বনবাসে গিয়ে ধর্ম পালন করতে লাগলেন।……..

১৪. নারীর বহুবিবাহ

……….এক তপোবনে কোনও এক ঋষির কন্যা ছিল। কন্যার কটিদেশ পিপীলিকার মধ্যভাগের ন্যায় ক্ষীণ, নিতম্ব-যুগল ভ্রূ-যুগল মনােহর। সে সুন্দরী হয়েও পতি গ্রহণ করতে পারেনি। ভয়ংকর তপস্যায় মহাদেবকে সন্তুষ্ট করলে মহাদেব তাকে বর নিতে বলেন। কন্যা বলে, সর্বগুণসম্পন্ন পতি চাই। এই একটি বাক্য সে পাঁচ বার বলেছিল। মহাদেব জানালেন, ‘তার ‘ভরতবংশীয় পাঁচটি পতি হবে। কন্যা পড়ে গেল মহাসংকটে। সে মহাদেবকে বলল, প্রভু! অামাকে একটি পতি দান করুন। কিন্তু দৈবর বশে ‘পতি দান করুন কথাটিও সে পাঁচ বার উচ্চারণ করেন। মহাদেব বললেন, জন্মান্তরে তোমার পাঁচটি পতিই হবে। ব্যাসদেব পশুদের জানালেন, ওই কন্যা দ্রুপদের বশে জম্মেছে, সে তােমাদের পত্নী হবে। পাঞ্চাল গমন করে সেই নারী রাতুর পাণিগ্রহণ করে।…….

………

………….

…………

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *