রাত্রিপালা – গৌতম ঘোষদস্তিদার

›› কবিতা / কাব্য  

রাত্রির আড়ালে একে-একে লুপ্ত হল তোমার সব ছদ্মবেশ
ঘোর অমানিশাদুটি সরে যেতেই প্রকাশিত হল কড়ি ও কোমল
আর তখনই তুমি ফুঁ দিয়ে প্রদীপ নিবিয়ে দিলে অক্লেশে….

ভেবে দ্যাখো, তখনও আমাদের সঙ্গ ছাড়েনি
ওই দিকচিহ্নহীন নদী ও তার বাঁক ও আবর্ত;
ওই নদী পেরিয়ে আমরা মেলায় গিয়েছি খেলায় নেমেছি
কত-শত গান কুড়িয়েছি দিনভর যে যার আঁজলায়,
ফেরার পথে, আপাতত খানিক নদীতীরে বসি,
আরও আরও গান ভেসে আসে জল পেরিয়ে, শুনি;
আদিগন্ত বালিয়াড়িতে ওই-যে একটি অলীক চা-দোকান
চলো, ওইখানে মাচার পরে বসি, গান ভাগাভাগি করি…..

দোকানি স্বাগত করে মাচার ধুলো ঝেড়ে দেয়।
ভালবেসে চা দেয়, চিনি দেয় অধিকন্তু, ভাসায় ঘন-সর
তাতে উড়ন্ত বালি এসে পড়ে অসচরাচর;
আমরা সকলই অকাতরে গলাধঃকরণ করি ওই ভালোবেসেই…..
দেখি, দোকান করে বটে, আসলে গায়ক, ভাবে চোখ ঢুলুঢুলু,
গেলাসে চামচ ঠুকে গুন-গুন গান ভাজে মথুরা-নগরীর,
আর, বিশেষত, তোমাকে রমণ করে চোখে-চোখে;
তার সান্ধ্যগান, কষ্ণকায়, রসকলি, কণ্ঠমালা তোমারও
অভূতপূর্ব লাগে, যেন, এখনই তার সঙ্গে মাধুকরী যাবে;
দেখে আমি আলাভোলা চুপচাপ সিগারেট টানি…

আমার কেবলই মনে পড়ে কবে কোন পারাপারের মাঝি
আমাকে বেশ বুঝিয়েছিল, সব ছলাচ্ছলই নাকি
পূর্ব-নির্ধারিত হয়ে আছে কালের গহনে নিরবধি
কোন ঢেউ কারে নেবে কোন ঢেউ কে দেবে কাকে
তা আগে থেকে যথার্থ বোঝা যায় না বলেই যে
ঢেউ আর স্রোত এমন রহস্যময়, তা নয় আদপেই…

আমি তখন তোমাকে মনে-মনে কেবল এ-কথাই বোঝাতে চাই,
যখন তুমি যার সঙ্গে গান বেঁধেছ, ওগো ব্রজবালা, তখন
সে-ই তোমার যথাসর্বস্ব, প্রাণের কানাই…..
এক-গানে, এক-প্রাণে বাঁধা কেন তুমি হবে, মহীয়সি,
তোমার স্মৃতি যদি কলঘর থেকে ফিরেই লোপ পায়,
তাহলে অন্যের অত ভাবনার কী আছে, বল গো রাধারানি…..

এইসব আনকথা ভাবতে না ভাবতেই কাহিনির বাঁক
ঘুরে যায় অন্যদিকে, কোনদিকে ঠাওর হয় না সর্ব;
তখনই নদীর উপর মেঘ ফুলে ওঠে, ঝড় আসে, তুমুল বর্ষণ
আর, ভাবের দোকানি গান ভাজতে ভাজতেই অকারণে
আমাদের খুলে দেয় নদীপারের গোপন কুঠুরি বিনা বাক্যব্যয়ে …

আমরা কোনওরকমে কেবল চুম্বন সম্বল করে নিমেষে
সেই ঘরে ঢুকে দরজা দিলাম জানলা দিলাম
ঝড় আর বৃষ্টিকে রাখলাম ঘরের বাইরে
ঝড় আর বৃষ্টিকে নিলাম ঘরের ভিতরে
তুমি ফুঁ দিয়ে প্রদীপ নিভিয়ে দিলে
আর, অন্ধকারে চকিতে জ্বলে উঠলে সমারোহে
অচিরেই রাত্রি উঠে এল বুকে, জিভে ও বৈভবে;
আর, সেই ভাবের অনুচর ভবের ঘাটে বসে রাতভর
আমাদের পাহারা দিল, পালা লিখল, প্রহর গুনল গানে…..

ঝড় থামার আগে, রাত্রিশেষে, তুমি আরও, আরও
বলে মূর্ছা গেলে, আর আমারও পরাভব হল শেষে…..
ভোরের আলোয় দুঃস্বপ্নের বাইরে এসে আমরা দেখলাম,
সমুদ্র ফিরিয়ে দিয়ে গেছে গায়কের শব, রাতের কীর্তন!