সহস্র এক আরব্য রজনী – ১৩ (উমর অল-নুমান, তার পুত্র সারকান ও দু-অল মাকানের কিস্সা ১)

›› আরব্য রজনী  ›› ১৮+  

শাহরাজাদ উমর অল-নুমান আর তার পুত্র দু-আল-মাকান-এর কাহিনী শুরু করে :

খলিফাদের রাজত্ব শেষে বাগদাদে শহরে এক সময়ে উমর অল-নুমান নামে এক বাদশাহ সিংহাসনে অধিরূঢ় ছিলো। যুদ্ধবিদ্যায় তার সমকক্ষ সে সময়ে আর দ্বিতীয় ছিলো না। তার বিক্রমের সামনে কোনও সুলতান বাদশাই মাথা তুলে দাঁড়াতে পারতো না। এমন কি সম্রাট সীজারকেও তার বশ্যতা স্বীকার করতে হয়েছিলো। সুদূর প্রাচ্যের সমস্ত ভূখণ্ড তার পদানত ছিলো। দুনিয়ার প্রায় সব রাজা বাদশাহর কাছ থেকে নানারকম উপহার উপটৌকন আসতো। কারণ তারা সদসর্বদা তার ভয়ে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে থাকতো।

উমর অল-নুমানের একমাত্র পুত্র, সারকান মাত্র বিশ বছর বয়সে তার বিস্ময়কর শৌর্যবীর্য দেখিয়ে দুনিয়ার সব সুলতান বাদশাহদের তাক লাগিয়ে দিয়েছিলো। উমর তাকে প্ৰাণাধিক ভালোবাসতো। তার মৃত্যুর পর পুত্র সারকানই সিংহাসনে বসবে এই ছিলো তার একান্ত বাসনা।

উমর-এর চারটি বেগম। তার মধ্যে তিন বেগমের কোন সন্তানাদি হয়নি। সারকানই একমাত্র সন্তান। এই চার বেগম ছাড়াও উমরের তিনশো যাটটি রক্ষিতা ছিলো। নানা দেশের, নানা জাতের নানা ধর্মের মেয়ে তারা। সবাই পরম সুন্দরী যুবতী। উমর প্রত্যেক রক্ষিতার জন্যে খোজা দাসী পরিবৃত আলাদা আলাদা সুসজ্জিত কক্ষের ব্যবস্থা করেছিলো। প্রাসাদের হারেমে তিনশো ষাটটি কক্ষে এই রক্ষিতাদের বসবাসের ব্যবস্থা হয়েছিলো। প্রতি দিন উমর এক একজন রক্ষিতার ঘরে রাত কাটাতো। তার হারেম বিভক্ত ছিলো বারোটি মহলে। প্রতি মহলে তিরিশটি রক্ষিতার ঘর। প্রতিটি রক্ষিতার ঘরে একটি মাত্র রাত্র অতিবাহিত করতেই এক মাস কাল সময় কেটে যেতো। এইভাবে সে পুরো এক বছরে সমগ্র হারেমের প্রতিটি মেয়ের সঙ্গে একবার মাত্র সহবাস করতো। কোন রক্ষিতাই এক বছরের আগে দ্বিতীয়বার উমরের দর্শন পেতো না। তার এই ন্যায় বিচারে সব রক্ষিতাই খুব খুশি। দেশের আপামর জনসাধারণ শাহেনশাহর এই অলৌকিক বীর্যবত্তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলো।

একদিন উমরের কাছে খবর এলো, তার অন্যতম রক্ষিতা সফিয়া অন্তঃসত্ত্বা হয়েছে। বাদশাহ তো আনন্দে আত্মহারা। বহুকাল বাদে তার আবার সন্তান হবে। উমর-এর দৃঢ় প্রত্যয়, পুত্র সন্তানই প্রসব করবে তার রক্ষিতা।

যথা সময়ে সফিয়া একটি কন্যা সন্তানের জন্ম দিলো। উমর অধীর আগ্রহে দরবার কক্ষে পায়চারি করছিলো। খোজা দূত এসে খবর দিলো, একটি কন্যা সন্তান হয়েছে। বাদশাহ ত্ৰিয়মাণ হয়ে পড়ে। কিন্তু উমরের পুত্র সারকান শুনে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে। যাক একটা মস্ত ফাঁড়া কাটলো। সে-ই একচ্ছত্র অধিপতি হতে পারবে। আর কাউকে ভাগ দিতে হবে না।

সারকান ভাবলো, যাক বাঁচা গেলো, সেই একচ্ছত্র অধিপতি হতে পারবে। আর কাউকে ভাগ দিতে হবে না। সারকান মনে মনে ঠিক করে রেখেছিলো, যদি পুত্র সন্তানও হয় তবু সে-ই অদ্বিতীয় শাহেনশাহ হবে। নব-জাতককে যেন তেন প্রকারেণ ধরাধাম থেকে সে সরিয়ে দেবেই।

কিছুক্ষণ বাদে আবার সেই খোজা দূত এসে সংবাদ দিলো, শাহেনশাহ, মালকিন আরও একটি সন্তান প্রসব করেছেন। এবারেরটি ছেলে।

উমর অল-নুমান আনন্দে লাফিয়ে উঠলো। আর ধৈর্য ধরতে পারলো না। খোজাকে সঙ্গে নিয়ে তখুনি সেই রক্ষিতার কক্ষে ছুটে এলো।

গ্ৰীক সম্রাট উমরকে উপহার হিসাবে পাঠিয়েছিলো এই বাঁদীটি। সুন্দর স্বাস্থ্যবতী সুঠামদেহী এই গ্ৰীক রমণী সফিয়া নাচে গানে শিক্ষায় দীক্ষায় বিশেষ পটিয়সী। আচার ব্যবহারে কথাবার্তায় একেবারে চৌকস। বছরে একটি মাত্র রাত্রি উমর তার সঙ্গে সহবাস করতো। সেই একটি রাতই সে এমন মধুময় করে তুলতো, যার পুরস্কার স্বরূপ আজ লাভ করেছে জোড়া সন্তান। উমর দেখলো, ছেলেটি দেখতে অবিকল তারই মতো হয়েছে। কিন্তু গায়ের রং রূপ হয়েছে তার মা-এর মতো।

প্রাসাদে আনন্দের হাট বসলো। খানাপিনা নাচ গান হৈ হল্লায় মেতে উঠলো সবাই। উমর নামকরণ করলো। মেয়ের নাম রাখা হলো, নুজাত-আল-জামান আর ছেলের নাম রাখলো দু-আল-মাকান। সকলে ধন্য ধন্য করতে লাগলো। গুলাব জল, আন্তর, আগরবাতি, মৃগনাভী কস্তুরীর সুবাসে ভরে উঠলো প্রাসাদ। জনে জনে মিষ্টি বিতরণ করা হলো। দীন দুঃখীদের পেট ভয়ে খাওয়ানো হলো। প্রত্যেককে উপহার দেওয়া হলো নতুন নতুন সাজ-পোশাক।

সমস্ত শহরটা আলোর মালায় সাজানো হলো। রাস্তার মোড়ে মোড়ে স্থাপন করা হলো তোরণা-দুর।

এর পর থেকে প্রতিদিন প্রতি ঘণ্টায় উমর খোজা দূতের মাধ্যমে সফিয়া আর তার সন্তানদের সংবাদে পেতে থাকে। উমর নিজে পছন্দ করে হিরে-জহরতের অলঙ্কার বানাতে দিতো। এবং প্রায়ই নিজে গিয়ে দিয়ে আসতো সফিয়ার হাতে। এইভাবে চারটি বছর কেটে গেলো। এবারে সে ছেলেমেয়েদের শিক্ষার ব্যবস্থা করতে উদ্যোগী হলো। তার পরম বিশ্বাসভাজন এক প্রাজ্ঞ শিক্ষককে নিযুক্ত করলে উমর।

সারকান কিন্তু এ সবের কিছুই জানতো না। বাবার এক রক্ষিতা গর্ভবতী শুনে সে প্রাসাদে অবস্থান করছিলো। তার মৎলব ছিলো খারাপ। যদি শোনে পুত্র হয়েছে, যে কোন উপায়ে তার প্ৰাণ সংহার করবে-এই ছিলো তার পণ। কিন্তু খোজা দূতের মুখে যখন দিয়েছে, তার তিলমাত্র অপেক্ষা না করে সৈন্যসামন্ত সমভিব্যাহারে পরদেশ আক্রমণে বেরিয়ে পড়েছিলো। দ্বিতীয়বার খোজা এসে যখন খবর দিলো, শুধু কন্যা নয়, সফিয়া আর একটি পুত্র সন্তানেরও জননী হয়েছে, তখন সারকানের অশ্বক্ষুরধ্বনি বাগদাদ ছাড়িয়ে অনেক—অনেক দূর দেশের মানুষের বুকে আতঙ্ক জাগিয়েছিলো। তারপর পুরো চারটি বছর ধরে সে বহু দেশ জয় করেছে। বহু সম্রাট তার পদানত হয়েছে। বশ্যতা স্বীকার করেছে। কিন্তু এদিকে যে তার আর এক অংশীদার গোকুলে বাড়ছে সে-কথা আর কানে পৌঁছলো না।

একদিন উমর অল-নুমান সিংহাসনে বসে আছে, এমন সময় একদল আমীর ওমরাহ এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ প্রবেশ করে যথাবিহিত কুর্নিশ জানালো।

শাহেনশাহ, আমরা আসছি রোমের সম্রাট আফ্রিদুন-এর দূত হয়ে। যদি আপনি বিরূপ হন, আমরা বিদায় নিয়ে চলে যাবো। আর যদি আপনার আজ্ঞা হয়, আমরা আসন গ্রহণ করতে পারি। আমাদের সম্রাট রোম, গ্রীস ও ইয়োনিয়ার অধিপতি। কনসাঁতানতিনোপোল শহরে তার প্রাসাদ। সেখানেই তিনি সিংহাসনে অধিষ্ঠিত আছেন। আমরা তার আজ্ঞা-বহা দাস মাত্র। তিনি আপনার কাছে আমাদের পাঠিয়েছেন। সিসারিয়ার দুর্ধর্ষ সম্রাট হারদুব-এর প্রচণ্ড আক্রমণে হাজার হাজার নিরীহ প্রজাবৃন্দ প্রাণ হারাচ্ছে।

উমর জানতে চাইলো, কেন, কি কারণে? ঝুট মুট সে আক্রমণই বা করবে কেন?

—কারণ যা তা হলো এই :

কিছুদিন আগে আমাদের এক আরব সেনাপতি মরুপ্রান্তর অতিক্রম করার সময় এক জায়গায় এক রত্নভাণ্ডারের সন্ধান পায়। সম্রাট আলেকজান্দার সারা পৃথিবী জয় করে সমস্ত ধনরত্ন এনে লুকিয়ে রেখেছিলো এই জায়গায়। সেই বিপুল বৈভব-এর পরিমাণ করা সম্ভব নয়। হীরা, জহরৎ, মণিমুক্তার পাহাড়। এর মধ্যে তিনটি গ্রহরত্ব ছিলো, যার অলৌকিক গুণে দুরারোগ্য ব্যাধি সারে। বিশেষ করে শিশুদের অসুখে ধন্বন্তরী। আমাদের সেই আরব সেনাপতি এইসব পাথরের গুণাগুণ সম্পর্কে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল ছিলো। সুলতানকে ভেট দেবার জন্যে দু’টো জাহাজ বোঝাই করে সে এই সব ধনরত্ন কনসাঁতানতিনোপোলে নিয়ে আসতে থাকে। কিন্তু এমনই বরাত, জাহাজ সৈন্যবাহিনী নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। আমাদের সেনাপতি হারদুবের প্রচণ্ড আক্রমণ প্রতিরোধ করতে পারে না। যাবতীয় ধনরত্ন লুণ্ঠপট করে নিয়ে যায়। সেই সঙ্গে ঐ তিনখানা অলৌকিক পাথরও তার হস্তগত হয়ে পড়ে। আমাদের সম্রাট আফ্রিদুন এক বিশাল সৈন্যবাহিনী পাঠালো। কিন্তু তাদের নিশ্চিহ্ন করে দিলো হারদুব। আরও এক জাহাজ সৈন্য পাঠানো হলো। তারাও ফিরে এলো না। পরে আরও এক জাহাজ সৈন্য তার দাপটের সামনে দাঁড়াতে না পেরে প্ৰাণ ভয়ে পশ্চাদপসরণ করে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছে।

আমাদের সুলতান দারুণ ক্রুদ্ধ। কিন্তু নিরুপায়। হারদুবের মতো প্রবল পরাক্রান্ত সম্রাটকে দমন করার মতো শক্তি তার নাই। এখন আপনার কাছে এসেছি। আমাদের প্রার্থনা-এই নিদারুণ সঙ্কটের দিনে আপনি আমাদের সম্রাটকে সাহায্য করুন। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, আপনার প্রবল পরাক্রম সে সহ্য করতে পারবে না। পরাজয় তাকে স্বীকার করতেই হবে। এই আমাদের সম্রাটের বাসনা। তিনি আপনাকে নানা উপটৌকন পাঠিয়েছেন। আপনার আদেশ পেলেই আমরা জাহাজ খালাস করার নির্দেশ দিতে পারি।

কনসতনতিনোপোলের সম্রাট আফ্রিদুনের প্রতিনিধিরা বললো, সম্রাট যে সব উপহার পাঠিয়েছেন তার মধ্যে আছে পঞ্চাশটি পরমা সুন্দরী গ্ৰীসের কুমারী কন্যা। আর পঞ্চাশটি গ্রীসের সুঠাম দেহী নওজোয়ান। সবাই রত্নালঙ্কারে এবং বাহারী সাজপোশাকে সুসজ্জিত।মণিমুক্তা ছাড়া তাদের স্বর্ণালঙ্কারের ওজনই হবে প্রায় এক হাজার কিলো। মেয়েরাও তদনুরূপ রত্নালঙ্কারে ভূষিতা হয়ে এসেছে। এই দুই প্রধান উপহার ছাড়াও আরও সহস্ববিধ সামগ্ৰী সঙ্গে পাঠিয়েছে। মূল্যায়ন করলে সে সবের দামও কিছু কম নয়।

উমর খুশি হলো। বললো, আমি আপনাদের সম্রাটের উপহার গ্রহণ করলাম।

তারপর উজিরকে নির্দেশ দিলো, এদের যথাযোগ্য আদর আপ্যায়নের ব্যবস্থা করো। তারপর আমার কাছে একবার এসো, তোমার সঙ্গে কিছু গোপন পরামর্শ আছে।

অভ্যাগত অতিথিদের সৎকারের ব্যবস্থা করে বৃদ্ধ উজির দানদান উমরের নিভৃত কক্ষে ফিরে এলে বাদশাহ বললো, কনসাঁতানতিনোপোলের সম্রাট আফ্রিদুন আমার সাহায্য চায়। এখন বলো, কি করা উচিত?

বৃদ্ধ উজির ধীর শান্তভাবে বলতে থাকে, কনসাঁতানতিনোপোলের সম্রাট বিধর্মী কাফের খ্ৰীষ্টান। তার প্রজারাও সবাই কাফের। অবশ্য তার শত্রুপক্ষ তারই স্বজাতি। সেও কাফের, বিধমী খ্ৰীষ্টান। সুতরাং সেদিক থেকে আমাদের আপত্তির কিছু নাই। এর ফলে ইসলাম ধর্মের প্রতি কোনও আঘাত আসবে না। আমার পরামর্শ, আপনি আপনার যোগ্য পুত্র সারকানকে পাঠান। সে যুদ্ধবিদ্যায় পরম বিক্রমশালী। তার হাতে সিসারিয়া সম্রাটের পরাজয় অবশ্যম্ভাবী। আর তাছাড়া আপনার মতো বিশ্ববিজেতা শাহেনশাহকে যদি, সামান্য এক সিসারিয়া সম্রাটকে পরাজিত করতে, বিরাট সৈন্যবাহিনী নিয়ে আক্রমণ করতে হয়, মোটেও তা গৌরবের হবে না। লোকে বলবে, মশা মারতে কামান দোগা। তবে সাহায্য আপনার পাঠানো দরকার। কারণ, তার প্রেরিত উপটৌকন আপনি গ্রহণ করেছেন। তার প্রতিনিধিদের শর্তই ছিলো, সব শুনে আপনি যদি সম্মত হন। তবেই তারা জাহাজ খালাস করে উপটৌকন নিয়ে আসবে। নচেৎ ফিরে যাবে।

উমর অল-নুমান, ঘাড় নাড়লো, ঠিক-ঠিক বলেছে উজির। একবার যখন তার অহঙ্কার। আজ থেকে তোমাকে আমি আমার সৈন্যবাহিনীর প্রধান নিযুক্ত করলাম। আমার পুত্র সারকানের কাছে দূত পাঠানো হলো। কয়েক দিনের মধ্যে পুত্র ফিরে এলে উমর জানালো, উজিরকে প্রধান হিসাবে সঙ্গে নিয়ে তুমি সিসারিয়া আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হও। আমার বাছাই করা দশ হাজার ফৌজ আর তাদের খানাপিনা, প্রয়োজনীয় লটব্যুহর নিয়ে যত শীঘ্র পারো বেরিয়ে পড়ো।

সারকান পিতার আদেশ শিরোধার্য করে বললো, আমাকে মাত্র তিন দিনের সময় দিন, শাহেনশাহ। আমি তার মধ্যে আমার সৈন্যবাহিনী প্রস্তুত করে নিচ্ছি।

তিনদিন পরে উমর অল-নুদান দশ হাজার কুর্নিশ গ্রহণ করে সৈন্যবাহিনী সহ পুত্র সারকান এবং বৃদ্ধ উজির দানাদানকে বিদায় জানালো।

সারকান বাছাই করা সমর সম্ভার নিয়ে রওনা হলো। বিশ দিনের পথ। সম্রাট আফ্রিদুন তার জন্যে এক বিরাট ছাউনি তৈরি করে রেখেছে। প্রথমে যেখানে গিয়ে ডেরা গাড়তে হবে। বিদায়কালে সুলতান উমর অল-নুদান সাতটা বাক্স ভর্তি মোহর সঙ্গে দিয়েছে। উজির দানাদানকে বলে দিয়েছে, এগুলো সে যেন তার নিজের হেপাজতে রাখে।

একুশ দিনের মাথায় সারকান তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে হাজির হলো এক সুরম্য উপত্যকায়। এখানেই তার জন্যে ছাউনি প্রস্তুত করে রেখেছে। সম্রাট আফ্রিদুন। সারকান তার অধীনস্থ সেনাপতিদের নির্দেশ দিলো, এই ছাউনিতে তিনদিন বিশ্রাম নিতে হবে।

এই ছাউনির অদূরেই সম্রাট হারদুবের অধিকৃত অঞ্চলের সীমানা। সারকান ঠিক করলো, গোপনে গোপনে সব পথঘাট আগে দেখে নিতে হবে। কোনদিক দিয়ে কিভাবে আক্রমণ চালাতে হবে তার জন্যেই এই গোপন অনুসন্ধান দরকার। নিজের দেহরক্ষীদের বিদায় দিয়ে একাই সেই দুৰ্ভেদ্য জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে পড়লো। যতদূর যায় শুধু গভীর জঙ্গল। কোন জনবসতির চিহ্ন নাই। এইভাবে রাত্রির প্রথম প্রহর অতিক্রান্ত হয়। সারকান-এর ক্লান্তি আসে। একটা বিশাল বৃক্ষের নিচে ঘোড়াটাকে দাঁড় করায়। গাছের গুড়িতে হেলান দিয়ে ঘোড়ার পিঠে চেপে থেকেই একটুক্ষণের জন্য সে ঘুমিয়ে নেয়। তারপর আবার এগোতে থাকে। চলতে চলতে এক জায়গায় এসে কান পেতে শোনে, অদূরে নারী কণ্ঠের কলহাস্য। এত রাতে এই গভীর জঙ্গলে নারী কণ্ঠ আসে কোথা থেকে। সারকান ভাবে, নিশ্চয়ই অদূরে কোথাও লোকালয় আছে। কিন্তু না, আশে পাশে কোথাও কোন ঘর বাড়ির সন্ধান পাওয়া গেলো না। এবার কিন্তু সেই হাসির শব্দ আরও উচ্চতর হতে থাকে। হোহো-হাহা—হিহি। এই ধরনের অট্টহাসিতে মুখর হয়ে ওঠে।

সারকান-এর ভয় হয়। নিশ্চয়ই কোন ভৌতিক ব্যাপার। এখন একমাত্র আল্লাহই ভরসা। ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে এসে সেই হাসির শব্দ অনুসরণ করে সারকান হাঁটতে থাকে। চলতে চলতে অবশেষে হাজির হয় এক নদীর ধারে। কুলকুল করে বয়ে চলেছে স্রোতধ্বনি। তার তীরে গাছের ডালে পাখীরা কুলায় ফিরে মিষ্টি মধুর আওয়াজ তুলে গান ধরেছে। যেদিকে তাকায়, দেখে নানা বিচিত্র রঙের ফুলের মেলা।

সারকান দেখলো নদীর ওপারে চাঁদ উঠেছে। সেই চাঁদের অস্পষ্ট আলোয় আবছা আবছা! দেখা গেলো বিরাট উচু মিনারওয়ালা এক প্রাসাদ। একেবারে নদীর তীরে। নদীর শান্ত জলে তার ছায়া পড়েছে। মনে হলো ঐ প্রাসাদে মানুষের বসতি আছে। এবং ঐ অট্টহাসির আওয়াজ ওখান থেকেই ছড়িয়ে পড়ছে।

ক্রমশ চাঁদের আলো আরও উজজুল হয়। এবার পরিষ্কার দেখা যায়, প্রাসাদের সামনে একখণ্ড সবুজ প্রাঙ্গণ। তার মাঝখানে একটি অনিন্দ সুন্দরী তরুণীকে ঘিরে বৃত্তাকারে কলহাস্যরত দশটি যুবতী। এই রূপসীর অট্টহাসিই সে দূর থেকে শুনতে পেয়েছিলো। এবারে তার কথাও শোনা গেলো। পরিষ্কার আরবীতে বলছেঃ তোদের দিয়ে কিছু হবে না। তোরা সব অপদার্থ। অমন ন্যাকাপনা করলে কুস্তি লড়া যায় না বুঝলি! কুস্তির জন্যে দেহে তাগাদ দরকার। নে আয়, আমাকে হারানো চাই।

একটা একটা করে মেয়ে এগিয়ে আসে। কিন্তু এক একটা প্যাচেই এক একজনকে কাত করে ফেলে দেয়। মেয়েগুলো মুখ থুবড়ে পড়ে যায়। শুধুইজের আর কাঁচুলী পরা সেই তরুণী কিন্তু ছাড়বার পাত্রী নয়। দু’হাতে নিজের জঙ্ঘা থ্যাবড়াতে থাবড়াতে আবার হুঙ্কার দিয়ে ওঠে, এই ওঠ–ওঠ শিগ্‌গির। আয় লড়বি আয়। কিন্তু কেউ আর সাহস করে না। তখন মেয়েটি ক্ষেপে যায়, কথা কানে যাচ্ছে না বুঝি। ওঠ বলছি, নইলে কিন্তু বেল্টেরবাড়ি দিয়ে পাছ ফাটিয়ে দেব। ভয়ে ভয়ে একটি মেয়ে উঠে আসে। কিন্তু পলকেই তাকে তুলে আছাড় দেয় সে। এইভাবে এক এক সব কটা মেয়েকেই অতি সহজেই কাবু করে ফেলে। এই সময় একটা ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে এক বয়স্ক রমণী।–মেয়েগুলোকে নিয়ে কি সব ছিনিমিনি খেলছো। ওরা কি কুস্তি জনে যে ওদের সঙ্গে কুস্তি লড়ছে? এই সব আনাড়ী মেয়েগুলোর ওপর তোমার কায়দা কসরৎ দেখিয়ে কি এমন মজা পাচ্ছে? তার চেয়ে যে কুস্তি জানে তার সঙ্গে লড়ে দেখাও তোমার হিম্মৎ, তবে বুঝি? সত্যিই তুমি যদি কুস্তিই লড়তে চাও এসো, আমার সঙ্গে লড়বে। আমি বুড়ো হয়েছি। তবু তোমাকে একটু শিক্ষা দিতে পারবো।

তরুণীটি মনে মনে বিরক্ত হয়। কিন্তু মুখে প্রকাশ করে না। বলে, বুড়িমা তামাশা করছে, না সত্যি সত্যিই লড়তে চাও আমার সঙ্গে?

-কেন, তামাশা করবো কেন? এসো, সত্যিই একবার দেখে নিই, কতখানি প্যাঁচ পয়জার তুমি শিখেছে।

তখন সেই তরুণী হুঙ্কার ছাড়ে, তবে এসো, কেমন করে তোমার ঘাড় মটকাই একবার দেখে যাও।

এই বলে রাগে। কাঁপতে কাঁপতে বয়স্কার সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

তখন বয়স্ক রমণীটি বলে, দাঁড়াও, কুস্তি লড়তে গেলে তো আর এই জবুথুবু সাজপোশাকে লড়া যাবে না। পোশাক আশাক আগে খুলে ফেলি। তারপর দেখবো, তোমার কত হিম্মৎ।

এই বলে সেই বিশাল বপুকুৎসিৎ রমণী তার সব সাজপোশাক খুলে ছুঁড়ে ফেলে। এমন কি ইজেরটা পর্যন্ত। তরুণীকে উদ্দেশ করে বলে, তুমিই বা কঁচুলী ইজের পরে রইলে কেন? ওটা ধরে টান দিলে তো এখুনি কুপোকাৎ হয়ে যাবে।

এক মুহূর্ত কি চিন্তা করলো মেয়েটি। সেও খুলে ফেললো তার কীচুলী আর ইজের। বিবস্ত্রা যুবতীটি সারকারের দিকে মুখ করে দাড়িয়ে। সারকান তার অনন্য রূপ-সৌন্দর্য আর যৌবনভরা দেহ, বড় বড় সুগঠিত স্তন, উরু আর যৌনকেশে ভরা উরুসন্ধিস্থলের দিকে বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে রইল। কোন মানবীর দেহে এমন সৌন্দর্য থাকতে পারে এ যেন তার কল্পনার অতীত। সেই চন্দ্রলোকে সারকান পরিষ্কার প্রত্যক্ষ করতে পারলো, শ্বেত পাথরে খোদাই করা এক অন্সরী মূর্তি। আর তার সামনে বীভৎস-দর্শন কালো কুৎসিত ভালুকীর মতো এক মধ্যবয়স্ক রমণী। দুই কুস্তিগীর তাক করে গুটি গুটি মুখোমুখি এগোতে থাকে। দুজনেই নিজের নিজের জঙ্ঘা থ্যাবড়াতে শুরু করে। সারকান আর হাসি রুখতে পারে না। মনে হয় সে বুঝি অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাবে!

প্রথম প্যাঁচ থেকে পিছলে বেরিয়ে আসে তরুণী। বয়স্কার ঘাড়টা বাঁ হাতে চেপে ধরে ডান হাতটা চালিয়ে দেয় তার দুই জঙ্ঘার মাঝখান দিয়ে। তারপর একটা ঝাকি দিয়ে ঐ বিশাল বপুটা মাথার উপরে তুলে ছুঁড়ে দেয় সাত হাত দূরে! বয়স্কটি কোনরকমে উঠে দাঁড়িয়ে তেড়ে আসে তরুণীর দিকে। আবার তাকে অতি সহজেই তুলে আর এক আছাড় দেয়। এবার আর সে উঠে দাঁড়াতে পারে না। তরুণী এগিয়ে আসে। তার পোশাক-আশাক এগিয়ে দিয়ে বলে, বুড়ি মা, আমার কিন্তু কোনও দোষ নাই। আমি চাইনি। কিন্তু তুমি আমাকে চটিয়ে দিলে, তাই তোমার সঙ্গে লড়তে নেমেছিলাম। যাই হোক, যীশুর দয়ায় তোমার তেমন কোন চোট-ফোট লাগেনি তো! নাও ওঠ।

বয়স্ক কোন কথা বললো না। সাজপোশাক নিয়ে বাগান ছেড়ে ওপাশে চলে গেলো।

সারকান দেখলো তরুণীটি একা পায়চারী করছে। তার দশটি বাদী সরাবের নেশায় বুদ হয়ে ঘাসের উপর পড়ে আছে। সারকান ঘোড়ার পিঠে চাবুক মেরে এক লাফে নদী পেরিয়ে প্রাসাদ প্রাঙ্গণের দিকে এগিয়ে যায়। মেয়েটি তখন আনমনে অস্তমিত চাঁদের দিকে চেয়ে কি যেন ভাবছিলো। সারকান পিছনে এসে দাঁড়ায়। আচমকা চিৎকার করে ওঠে, আল্লাহ সৰ্ব্ব-শক্তিমান।

তরুণীটি হতচকিত হয়ে ছিটকে সরে যায় খানিকটা। তারপর সারকানের দিকে নজর পড়তেই নদীর দিকে দৌড়ে পালায়। ঋক্ত নদীটি চওড়ায় মাত্র ছ সাত হাত। এক লাফে ওপারে গিয়ে দাঁড়ায়। সুললিত; কণ্ঠে প্রশ্ন করে, কে তুমি, আমাদের এই নিরালা নির্জন প্রাঙ্গণে এসে তলোয়ার উক্ত হাতে দাঁড়ালে? এমন ভাব করে এসেছো, যেন কোনও বীরপুরুষ, সৈন্যবাহিনী পুঁঠি-কেণ্ঠ আক্রমণ করতে এসেছে। তুমি আসছে। কোথা থেকে, আর যাবেই বা কোথায়? ইহঁত সাফ সাফ সত্যি কথা বলে। না হলে ভেবো না। এখান থেকে পালিয়ে রেহাই পাবে। আমার এক ডাকে চার হাজার খ্ৰীষ্টান সৈন্যসামন্ত বেরিয়ে আসবে। পদুম আমার নির্দেশেই তারা চলে। এখনও সত্যি করে বলো, তুমি কি চাও? যদি এই অরণ্যে পথ হারিয়ে এখানে এসে থাকে, আমি তোমাকে আবার পথের নিশানা বাৎলে দেব।

—আমি এক বিদেশী মুসলমান মুসাফির, সারকান বলে, না, আমি পথ হারিয়ে আসেনি এখানে। আজ রাতের সঙ্গী হিসাবে গোটা কয়েক তাগড়াই মেয়েছেলে খুঁজতেই বেরিয়েছি। তোমার এই দশটা বাদী আমাদের সে-ক্ষুধা মেটাতে পারবে, আশা করি। যদি তোমার অমত না থাকে। তবে আমার সঙ্গীসাথীদের আস্তানায় এদের নিয়ে যেতে পারি।

—তুমি একটা মিথ্যেবাদী ভণ্ড সৈনিক। তোমার এসব কথা আমি আদৌ বিশ্বাস করতে পারছি না। আমার ধারণা, তোমার অন্য কোনও বদ মৎলব আছে।

ওগো সুন্দরী, যে আল্লাহর কাছে মিজেকে সঁপে দিতে পারে সেই প্রকৃত সুখ পায়। আর কোনও সুখই সুখ নয়-যার সঙ্গে আল্লাহর নামগান জডিত থাকে না।

তরুণী তখন বলে, তোমার এসব ভণ্ডামী। আসল কথা চেপে যাচ্ছে। আমি কিন্তু আমার সৈন্যবাহিনী তলব করতে বাধ্য হবো। এখনও সত্যি কথা বলো। তুমি যদি প্রকৃত মুসাফির হও, আমার দ্বারা তোমার কোনও ক্ষতি হবে না। বিশেষ করে তুমি যখন দেখতে শুনতে সুন্দর সুপুরষ। তোমাদের রাত্রি সহবাসের জন্যে এই বাদীগুলোকে যদি প্রয়োজন হয়। স্বচ্ছন্দে দিতে পারি। কিন্তু একটা শর্ত আছে। ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে পড়ে। তোমার অস্ত্রশস্ত্র রেখে দাও। আমি যেমন খালি হাতে তেমনি খালি হাতে এগিয়ে এসো আমার কাছে। আমার সঙ্গে এক হাত লড়তে হবে। আমাকে যদি তোমার পিঠে তুলে নিতে পারো, এই সব বাদী তোমার হবে। আমাকেও যেখানে খুশি নিয়ে যেতে পারবে। কিন্তু যদি না পারো? লড়াইয়ে যদি আমার হাতে হেরে যাও? তাহলে তোমাকে আমার গোলাম হয়ে থাকতে হবে।

সারকান ভাবে, মেয়েটা পাগল? সে জানে না। কার সামনে দাঁড়িয়ে এই সব হাম বড়াই বাত ছাড়ছে। বললো, আমি রাজী। কোনও অস্ত্রশস্ত্ব নেবো না। শুধু হাতে তোমার সঙ্গে আজ কুস্তি লড়বো, এসো। যেভাবে চাও সেইভাবেই লড়বো। চলে এসো। আমি যদি হেরে যাই, তবে মুক্তি পণ হিসাবে যত টাকা চাও আমি দেব। আর তুমি যদি হারো তুমি হবে আমার সুলতানের উপহারের পাত্রী। আল্লাহর পয়গম্বরের নামে হলফ করে বলছি—আমার কথার নড়চড় হবে না।

মেয়েটি বললো, আবার পয়গম্বর কেন, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন, যাঁর দৌলতে বেঁচে আছো তার নামে কসম খেয়ে বলো, কথার কোনও এদিক ওদিক করবে না।

সারকান সেইভাবেই হলফ করলো।

তরুণীটি তখন এক লাফে আবার নদীটা পেরিয়ে আসে। উচ্চ হাসিতে ফেটে পড়ে। বলে, এখনও বলছি, ভালো মানুষের ছেলে, মানে মানে কেটে পড়ে। সকাল হতে আর বেশি দেরি নাই। এখনই আমার বাদীরা সব জেগে উঠবে। ওদের মধ্যে সবচেয়ে যে রোগা পটকা সে-ই তোমাকে তুলে আছাড় দেবে।

এই বলে সে সারকানকে পাশ কাটিয়ে বাগিচার অপর প্রান্তে চলে যায়। সারকান দেখে, মেয়েটি কুস্তির কথাটা বেমালুম চেপে যেতে চাইছে। একটু আগেই সে যে তাকে মল্লযুদ্ধে আহ্বান করেছিলো। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে। ও-সব তার বাহানা।

সারকান অবাক হয়ে প্রশ্ন করে, এই না, পঁয়তারা করলে তুমি আমার সঙ্গে কুস্তি লড়বে? কই, কি হলো? এখন সুড় সুড় করে কেটে পড়ছে। কেন?

মেয়েটি মুচকি হেসে বলে, তুমি কি চাও, আমার হাতে মান ইজ্জত খোয়াবো? ঠিক আছে, আমার কোনও আপত্তি নাই।

সারকান বলে তোমার দরবারে যখন এসেই পড়েছি, তোমাকে একটু সেবা যত্ন না করে। যাবো না। আমি তো তোমার দাসানুদাস।

—তা কথাটা নেহাৎ মিথ্যে বলেনি। আচ্ছা, ঘোড়া থেকে নামো। তুমি আমার মেহেমান।

সারকান পুলকিত হয়। ঘোড়া থেকে নেমে পড়ে। মেয়েটি তার ঘোড়াটাকে একটা বাঁদীর হাতে তুলে দিয়ে বলে, ভালো করে দানাপানি খাওয়াবার ব্যবস্থা কর।

সারকান বলে, সুন্দরী, তোমার রূপে যেমন মোহিত হয়েছি, তেমনি তোমার আদর আপ্যায়নও আমাকে মুগ্ধ করেছে। তোমার মতো সুন্দরী মেয়ে—এই বনবাদাড়ে পড়ে থেকে জীবনটাকে নষ্ট করছে কেন? চলো, আমাদের বাগদাদ শহরে নিয়ে যাবো তোমাকে! দেখবে কত মজা পাবে। কত সুন্দর শহর, চোখ জুড়িয়ে যাবে। আর দেখতে পাবে দুনিয়ার সেরা সব বীরপুরুষ। আর দেখবে, আমার কি খাতির। চলো সুন্দরী, একবার সেই মনভোলানো দেশ বাগদাদেই চলো আমার সঙ্গে।

—হা ঈশ্বর, আমি ভেবেছিলাম, তুমি একজন জ্ঞানীগুণী মানুষ। এখন বুঝলাম তোমার মাথার ইসকুরুপ কিছু নড়বড়ে আছে।

—কেন, কেন?

—তা না হলে অসভ্য বর্বরদের আস্তাবল বাগদাদে নিয়ে যেতে চাও আমাকে। ওখানে শুনেছি বাদশাহ উমর অল-নুমানের হারেমে তিনশো ষাটটি রক্ষিতা আছে। লোকটা নাকি প্রত্যেক রাতে একটা রক্ষিতাকে নিয়ে শোয়। আর সারা রাত ধরে মেয়েটার মাংস ছিঁড়ে ছিঁড়ে খায়। জানোয়ার কোথাকার। তুমি আমাকে সেই লোকটার থাবার মধ্যে ছুঁড়ে দিতে চাইছো? সারা বছরের মধ্যে একটা রাত সে আমার ঘরে আসবে। পশুর মতো অত্যাচার করে চলে যাবে। তারপর আবার একটা বছর ধরে তার পথ চেয়ে ভিখিরির মতো বসে থাকবো। ঈশ্বর রক্ষা করুন, মরে গেলেও ঐ শয়তানের খপ্পরে পড়তে রাজী নই। আর কখনো ওসব কথা বলে আমাকে লোভ দেখাবার চেষ্টা করো না। এমন কি তুমি যদি স্বয়ং সারকানও হও, তবু তোমার সঙ্গে যাবো না।

–সারকান কে, তুমি জানো?

—জানবো না কেন? বাগদাদের বাদশাহ উমর অল-নুমানের পুত্র। জাঁদরেল যোদ্ধা। তার দাপটে সবাই নাকি থর থর কম্পমান। দশ হাজার সৈন্য নিয়ে সে এসেছে। ছাউনি ফেলেছে আমাদের দেশের সীমান্তে। সম্রাট আফ্রিদুনের সঙ্গে হাত মিলিয়ে লড়াই করবে আমাদের সম্রাট হারদুবের বিরুদ্ধে। আমার ইচ্ছে হচ্ছে, একাই আমি চলে যাই ওর ছাউনিতে। শয়তানের বাচ্চার মুণ্ডুটা কেটে নিয়ে আসি। সে আমাদের পরম শত্রু। যাক, ওসব কথা, এখন এসো, আমার সঙ্গে এসো।

সারকান বুঝতে পারলো মেয়েটি তার এবং তার সৈন্যদলের ওপর কি রকমটা চটা। ভাগ্যে সে নিজের পরিচয় দিয়ে ফেলেনি। তা হলে তো এতক্ষণে তাকে সাবাড়ি করে দিতো। তরুণীর পিছনে পিছনে অনুসরণ করে চলে সারকান।

একটা বিরাট ফটকের সামনে এসে দাঁড়ায়। মেয়েটি বলে, চলো, ভেতরে চলো।

একটা সুসজ্জিত সুরম্য কক্ষে তারা প্রবেশ করে। মূল্যবান আসবাবপত্রে সাজানো গোছানো ঝকঝকে তকতকে। কডিকাঠ থেকে ঝুলছে অনেকগুলো ঝাড়বাতি। সারা ঘরময় মোমের মিষ্টি মধুর নরম আলো আতর আর আগরবাতির সুবাসে মন মেতে ওঠে। সারকান ভাবে সে এক স্বপ্ন পুরীতে এসে পড়েছে। ঘরের এক পাশে একটি বিশাল শয্যা।

মেয়েটি বলে, এখানে শুয়ে বিশ্রাম করো।

সারকান বিছানায় গা এলিয়ে দেয়। দাসী বাদীরা এসে তার চারপাশে বসে পড়ে। মেয়েটি অন্য ঘুরে চলে যায়।

অনেকক্ষণ এক একা শুয়ে থাকে। কিন্তু মেয়েটি আর ফিরে আসে না। সারকান বাদীদের জিজ্ঞেস করে, তোমাদের মালকিন কোথায় গেলো, আর আসবে না?

–না। তিনি ঘুমুতে গেলেন—

সারকান উঠে বসে। ভাবে, কি করা যায়। মেয়েটি তাকে একা ফেলে চলে গেলো?

দাসী বাদীরা নানারকম খানাপিনা নিয়ে এলো। সারা রাত কিছু খাওয়া হয়নি। সারকান অনুভব করে, দারুণ ক্ষিদে পেয়েছে তার।

বাঁদীরা সোনার থালায় খানা সাজিয়ে দিয়ে বলে, মেহেরবানী করে একটু কিছু খেয়ে নিন।

সারকান আর অপেক্ষা না করে গোগ্রাসে খেতে থাকে। অপূর্ব স্বাদ। এমন খানা সে বহুকাল খায়নি। বাদীরা গোলাপ জল দিয়ে তার হাত মুখ ধুইয়ে দেয়। কেউ তোয়ালে এনে মুছিয়ে দেয় মুখ।

সারকান এবার আবার সৈন্যদের কথা ভেবে চিন্তিত হয়। সেই পাহাড়ী উপত্যকায় ছাউনিতে তাদের ফেলে রেখে চলে এসেছে। নতুন জায়গা। বিদেশ বিভূঁই। যদি কোন অতর্কিত আক্রমণ হয়? তার বাবার সতর্কবাণী মনে পড়ে। নিজের সৈন্যসামন্ত ছেড়ে কোথাও যাবে না। তাদের সুখেই তোমার সুখ। তাদের দুঃখেই তোমার দুঃখ-এই তোমার একমাত্র ধ্যানজ্ঞান হবে। অথচ বাবার সে-নির্দেশ উপেক্ষা করে আজ সে বিলাসব্যসনের মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে দিয়েছে! ক্রমশই সে অধীর চঞ্চল হয়ে ওঠে। আরও খারাপ লাগে মেয়েটার এই রহস্যজনক অনুপস্থিতি। না বলে কয়ে তাকে এক ফেলে রেখে মেয়েটা এইভাবে হাওয়া হয়ে যাবে ভাবতে পারেনি। তাছাড়া মেয়েটার কোনও পরিচয়ই সে জানে না। আর এই সুরম্য-প্রাসাদই বা কোন সুলতান বাদশাহর তাও তার কাছে অজ্ঞাত। এ অবস্থায়, এখানে এইভাবে থাকা কি তার পক্ষে নিরাপদ? এই সব ভাবতে ভাবতে কখন এক সময় সে ঘুমিয়ে পড়ে।

সকালবেলা চোখ খুলতে দেখতে পায়, ঘরের ঠিক মাঝখানে গোটা কুড়ি দাসী বাঁদী পরিবেষ্টিত হয়ে সেই সুন্দরী। চোখ ধাঁধানো জমকালো সজে সজ্জিতা। তার সেই মনোমোহিনী রূপ দেখে সারকগনের সব কিছু ওলোট পালোট হয়ে যায়। ভুলে যায়, কোথায় তার সৈন্যসামন্ত কোথায় তার ছাউনি, কেনই বা এই দূর দেশে সে এসেছে। ভুলে যায় তার বাবার উপদেশ।

মেয়েটি নিতম্ব নাচিয়ে বক্ষ দুলিয়ে অপরূপ লাস্যময়ী ভঙ্গীতে তার পাশে এগিয়ে আসে।

—তুমিই সারকান? উমর অল-নুমানের পুত্র? তবে আমার কাছে চেপে গেছে কেন? কেন নিজের পরিচয় দাওনি? তুমি না প্রবল পরাক্রান্ত বাদশার ছেলে? তোমার পক্ষে এই ধরনের কাপুরুষের মতো আচরণ কি শোভা পায়?

সারকান বুঝতে পারে, আর লুকিয়ে লাভ নাই। মিথ্যা দিয়ে মিথ্যাকে ঢাকা যায় না। তাতে পরিণামে আরও খারাপ হবে।

—তুমি ঠিকই ধরেছে। সুন্দরী। আমি সারকান। উমর অল-নুমান আমার বাবা। আমার আর কিছু বলার নাই। এখন তোমার যা অভিরুচি করতে পারো। যদি কিছু সাজা দিতে চাও, মাথা পেতে নেবো।

মেয়েটি এক মুহূর্ত কোনও কথা বলতে পারে না। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। একটু পরে সারকানের চোখে চোখ রেখে বলে, তোমার ভয় পাওয়ার কিছু নাই। সারকান, আমি তোমার কোনও ক্ষতি করবো না। তুমি আমার মহামান্য মেহেমান। ঐ নুন আর রুটি সাক্ষী রেখে বলছি, আমি তোমার কোনও ক্ষতি তো করবোই না, বরং অন্য কেউ যদি তোমার অনিষ্ট করতে আসে, আমাকে না মেরে তা করতে পারবে না। তোমাকে রক্ষা করার সব দায়দায়িত্ব আমার।

মেয়েটি এসে সারকানের পাশে বসে। একটা গ্রীক বাদীকে উদ্দেশ করে কি যেন বলে। সারকান গ্ৰীক ভাষা জানে না। একটু পরে বাঁদীটা একটা বারকোষে সাজিয়ে নিয়ে আসে নানা ধরনের খানাপিনা। সারকনের সামনে রাখে। মেয়েটি বলে, নাও, নাস্তা করো।

কিন্তু সারকান ইতস্তত করে। কি জানি যদি কিছু বিষটিস খাইয়ে মারে। মেয়েটি বুঝতে পারে। হাসে। বলে, ভয় নাই, জহির খাওয়াবো না। মারলে তোমাকে অনেক আগেই খতম করতে পারতাম। আমার ডেরায় যখন এসে পড়েছে, তুমি যত বড় বীরপুরুষই হও, নিজেকে রক্ষণ করতে পারতে না। কিন্তু তা আমি করিনি, করবো না। কারণ তুমি আমার মেহেমান। একবার যখন সে-সম্মান তোমাকে দিয়েছি, নিশিচন্তে থাকতে পারো, এখানে তুমি নিরাপদ।

এই বলে প্রত্যেক রেকর্ণবী থেকে একটু একটু খাবার তুলে নিয়ে মেয়েটি মুখে পুরে।—এবার তো বিশ্বাস হচ্ছে, কোনও বিষ মিশিয়ে দিইনি?

সারকান লজিত হয়। সত্যিই তো সে ঐরকম সন্দেহই করেছিলো? এর পর আর কোনও দ্বিধা থাকে না। দু’জনে একসঙ্গে বসে আহরপর্ব শেষ করে! নাস্তা শেষে সোনার পেয়ালায় সরাব ঢালে সাকী। বলে, এবার মৌজ করে।

মেয়েটি প্রথমে মদের পেয়ালায় চুমুক দেয়। সারকান লজিত হয়। পেয়ালাটা তুলে নিয়ে এক চুমুকে টেনে নেয়। সুন্দরী বলে, জীবনটাকে জটিল করে না দেখে সহজ সরল করে দেখতে পারলে অনেক যন্ত্রণার হাত থেকে রেহাই পাওয়া যায় জানো, মুসলমান। বিশ্বাস করে ঠকা ভালো, কিন্তু অবিশ্বাসের আগুনে দগ্ধ হতে নাই।

সারকান আর সেই মৃগনয়না সুন্দরী মৌজ করতে করতে আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে আসে। একের পর এক পেয়ালা শূন্য হতে থাকে। নেশা বেশ জমে উঠেছে। একটি বঁর্দী উঠে পাশের ঘরে চলে যায়। একটু পরে চারটি মেয়েকে সঙ্গে করে ফিরে আসে। একজনের হাতে দামাসকাসের বাঁশী, একজনের হাতে পারসীয় বীণ আর একজনের হাতে তাতারের চিখারা এবং অন্য মেয়েটির হাতে ছিলো মিশরের গীটার। মৃগনয়না সুন্দরী বাঁশীটা নিজের হাতে নিয়ে মিষ্টি সুরে বাজাতে থাকে। তার সঙ্গে তাল রেখে অন্য মেয়েরা বাজিয়ে চলে বীণ, গীটার আর চিখারা। অপূর্ব এক সুরের ইন্দ্রজাল সৃষ্টি হয়। সারকান সব ভুলে যায়। ভেসে চলে অজানা অচেনা এক দেশে, যেখানে, আশা, আকাঙ্ক্ষা, লোভ, মোহ, হিংসা দ্বেষ, হানাহানি কাটাকাটি কিছু নাই। শুধু আছে অমৃত, আর আছে ভালোবাসা।

এক সময়ে বাঁশী থেমে যায়। সুরের রেশ কিছু লেগেই থাকে। সারকান চোখ বন্ধ করে পড়ে থাকে। এমন সুরের মুচ্ছনা। সে শোনেনি কখনও। মনটা কেমন উদাস বাউল হয়ে যায়।

এর পর একটি মেয়ে গ্ৰীক-সঙ্গীত গায়। গানের ভাষা সারকান বুঝতে পারে না। কিন্তু সুরের ভাষা বুঝতে অসুবিধা হয় না। ভিন্ন ভিন্ন দেশে মানুষের মুখের ভাষা আলাদা হলেও সুরের ভাষা সর্বত্রই এক।

এর পর মৃগনয়না গান ধরে। তার সুললিত কণ্ঠ সারকানের মনে বসন্ত জাগায়। পৃথিবীতে, এত সুন্দর সুন্দর ফুল আছে, গন্ধ আছে, রং আছে, রূপ আছে, পাখীর কাকলী আর ঝরনার কলতান আছে, এমন প্রাণ মাতানো গান আছে, এত সুর আছে তার এর আগে কখনও দুর্ধর্ষ যোদ্ধা সারকান চোখ মেলে দেখেনি, প্ৰাণ ভরে আত্মাণ করেনি, কান পেতে শোনেনি।

ষোড়শী গান থামিয়ে জিজ্ঞেস করে, কিছু বুঝলে?

সারকান বলে, গানের ভাষা জানি না, সুরের ভাষা বুঝেছি! আমার সমস্ত সত্ত্বা তোমার গানের মধ্যে হারিয়ে গেছে, সুন্দরী। এমন গান আগে কখনও শুনিনি।

মেয়েটি বললো, এবার আরবী ভাষায় গাইছি, শোনো।

সরাবের নেশা জমে উঠেছিলো বেশ।। গান শুনতে শুনতে এক সময় গভীর আবেশে ঘুমিয়ে পড়ে সারকান।

সারা দিন রাতে আর তার ঘুম ভাঙ্গে না। পরদিন সকালে জেগে দেখে চারপাশে দাসী বাদীরা বসে আছে কিন্তু সেই হরিণী সেখানে নাই। মতিয়া বললো, আপনার ঘুমে যাতে কোনও ব্যাঘাত না ঘটে। সেই জন্যে সারারাত আমরা বসে পাহারা দিয়েছি।

সারকান জিজ্ঞেস করে তোমাদের মালকিন কোথায়?

—তার শোবার ঘরে। তিনি বলেছেন, আপনার ঘুম ভাঙ্গলে তার ঘরে যেন আপনাকে নিয়ে যাই। যাবেন?

—চল যাই।

মতিয়া সারকানকে সঙ্গে নিয়ে মালকিনের ঘরে আসে। সোনার পালঙ্কে মখমলের শয্যায় শুয়ে ছিলো সে। সারকান যেতেই এগিয়ে এসে হাত ধরে নিয়ে গিয়ে বসায়। মতিয়া এনে দেয় কস্তুরী সরবৎ। মৃগনয়না গান ধরে। সারকান সবরৎ-এ চুমুক দেয়। তার পাগল করা গানের সুরে মনে রং ধরে। গানের পর বাজনা, বাজনার পর আবার গান, তারপর আবার বাজনা-নিরবচ্ছিন্ন সুরের লহরী চলতে থাকে।

এক সময়ে গান বাজনা শেষ হয়। ষোড়শী সুন্দরী কাছে সরে আসে।–কাল রাতটা কেমন কাটলো?

সারকান বলে, খানাপিনা তো খুব ভালেই হয়েছিলো। তারপরে তোমাদের অমন সুন্দর গানবাজনা। একেবারে বেহেস্তের দরজায় পৌঁছে গিয়েছিলাম। এক ঘুমে কোথা দিয়ে কি করে রাতটা কেটে গেছে, বুঝতে পারিনি।

সেদিনও খানাপিনা গান বাজনার এলাহী ব্যবস্থা হলো। সারকান সব ভুলে মেতে রইলো সেখানে। এর পর আরও একটা দিন কোথা দিয়ে কেটে যায় বুঝতে পারে না সে। মধুর মুহূর্তগুলো বড় তাড়াতাডি ফুরিয়ে যায়।

মৃগনয়না বলে, সারকান, তুমি তো যুদ্ধবাজ। তা নিশ্চয়ই দাবা খেলতে জানো?

সারকান বলে, খুব জানি!

দাবার ছক বিছানো হয়। কিন্তু সারকানের আনাড়ীচাল দেখে মেয়েটি হেসে ফেলে। এই বুদ্ধি নিয়ে তুমি লড়াই করো। যেখানে বড়ে চালতে হবে সেখানে চালাচ্ছে ঘোড়া। যেখানে দরকার মন্ত্রী সেখানে পাঠাচ্ছে সেনাপতি? এতে তো এক লহমাতেই মাৎ হয়ে যাবে, সাহেব?

সারকান লজ্জিত হয়। ভুল স্বীকার করে। অনেকদিন অভ্যাস নাই। তাছাড়া এই প্রথমবারআচ্ছা, এসো, এবারে তোমাকে হারাবো।

কিন্তু একবার দুবার না, পর পর পাঁচবার সারকানকে হারালো সে।

সারকান হাসে।–তোমার কাছে হেরে যে কি সুখ তুমি কি করে বুঝবে পিয়ারী।

–আহা, না পারলেই ওই বাহানা। এখন খাবে এসো।

টেবিলে খাবার সাজানো হয়েছে। সারকান আর সুন্দরী খেতে বসে। মেয়েরা কেউ বাঁশী, কেউ বীণ, কেউ গীটার আবার কেউবা চিখারা বাজিয়ে এক মনোরম পরিবেশ সৃষ্টি করে।

খানাপিনা শেষ করে মৃগনয়নাও গান ধরে। সরাবের পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে সারকান তন্ময় হয়ে শুনতে থাকে।

একটু বা তন্দ্ৰা এসেছিলো। এমন সময় একদল লোকের হুড়পাড় শব্দে সারকানের চৈতন্য ফিরে আসে। উন্মুক্ত তলোয়ার হাতে দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে এক বর্ম-শিরস্ত্ৰাণ পরা জাঁদরেল সেনাপতি। তার হুঙ্কারে সারাঘর কেঁপে ওঠে, সারকান! সারকানকে আমরা হাতের

মুঠোয় পেয়েছি। হা-হা-হা-

সারকান ভাবলো, শমন সম্মুখে, পালাবার পথ নাই। তবে কি মেয়েটা তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করলো? এই যে এত আদর যত্ন খাতির-সবই তার ছলনা? মেয়েটির দিকে তাকালে দেখলো, ভয়ে তার মুখ শুকিয়ে গেছে। নিজেকে সামলে নিয়ে প্রশ্ন করলো, কি চাও? কেন এসেছে। এখানে? কে তুমি?

সারকান বুঝতে পারে না, কোনও ষড়যন্ত্র নয়। টুক করে উঠে গিয়ে একটা থামের আড়ালে দাঁড়িয়ে পড়ে।

খ্ৰীষ্টান সেনাপতি জবাব দেয়, মহামান্য রাজকুমারী, ইরবিজ, আপনি কি এই যুবকের পরিচয় জানেন? ও হচ্ছে সারকান, বাগদাদের বাদশাহ উমর অল-নুমানের পুত্র। দুর্ধর্ষ যুদ্ধবাজ। ছদ্মবেশে নিজের নাম ভাঁডিয়ে সে আমাদের এই দুর্গে প্রবেশ করেছে। উদ্দেশ্য গোপন সংবাদ সংগ্রহ করা।

–কার কথা তুমি বলছে?

—আমি এই যুবকের কথাই বলছি, মহামান্য রাজকুমারী। ওর নাম সারকান।

–মিথ্যা কথা। ও একজন বিদেশী মুসাফির। আর তাছাড়া ছদ্মবেশে সে এখানে ঢোকেনি। আমি তাকে ডেকে নিয়েছি। সে আমার মাননীয় মেহেমান। কে তোমাকে বলেছে এসব বাজে কথা।

সেনাপতি সবিনয়ে বলতে থাকে, আপনি আমার ওপর রুষ্ট হবেন না, রাজকুমারী। আমি আপনার বাবার আজ্ঞাবহ দাস। তারই আদেশে সারকানকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যেতে এসেছি।

রাজকুমারী ইরবিজা প্রশ্ন করে, তাকে এই মিথ্যে খবরটা কে দিলো?

–আমাদের বাদী সর্দারণী।

–ওঃ, সেই ধুমসো বুড়ি বাঁদরোটা! বুঝেছি, কাল ওকে তুলে আছাড় মেরেছিলাম বলে আমার নামে লাগিয়েছে।

সেনাপতি বলে, না সে ভুল কথা বলেনি। ও যে সারকান তার প্রমাণও আমরা পেয়েছি। আপনি ওকে আমার হাতে তুলে দিন, এই আমার প্রার্থনা। আপনার বাবা হারদুবের হাতে তুলে দেব তাকে, এই আমার একমাত্র কর্তব্য। সারকানকে খতম করা মানেই আফ্রিদুনকে খতম করা। সম্রাট আফ্রিদুনের ক্ষমতা নাই, সম্রাট হারদুবের একগাছি চুল ছিঁড়তে পারে। তাই সে উমর অল-নুমানের কাছে হাঁটু গাড়তে বাধ্য হয়েছে। এখন সারকানই তার একমাত্র জোর। আমরা যদি সারকানকে শেষ করতে পারি, এ যুদ্ধে জয় আমাদের কেউ আটকাতে পারবে না। তাই আপনার কাছে আমার একমাত্র অনুরোধ, আপনি সরে দাঁড়ান। সারকানকে গ্রেপ্তার করতে দিন।

সিসারিয়া সম্রাট হারদুবের কন্যা ইরবিজার চোখ ক্ৰোধে রক্তবর্ণ হয়।—কি তোমার নাম আর পরিচয়?

—আমি আপনার আজ্ঞাবহ দাস, আমার নাম মাসুরা, আমার বাবার নাম মাউসুরা, তার বাবার নাম কাসিরদা! আমি আপনার বাবার পদাতিক সেনাবাহিনীর প্রধান।

ইরবিজা চিৎকার করে ওঠে, শোনো অবাধ্য মাসুরা, কে তোমাকে এখানে আসতে দিলো। আমার নিভৃত মহলে ঢোকার অধিকার কে দিলো তোমাকে? কেন ঢুকেছো? কার হুকুমে ঢুকেছো, জানতে চাই।

—আজ্ঞে, আমাকে তো কেউ প্রতিরোধ করেনি। কেউ বাধা দেয়নি। —বাধা দেয়নি বলেই তুমি আমার অন্দর মহলে ঢুকে পড়বে? এতবড় স্পর্ধা তোমার কি করে হলো? তুমি জান, এর পরিণাম কী?

মাসুরা বলে, জানি হয়তো আমার প্রাণদণ্ড হবে। তবু আমি সম্রাটের আজ্ঞাবহ দাস। তাঁর আদেশ পালন করাই আমার এখন একমাত্র লক্ষ্য। আপনি এই যুবককে আমার হাতে তুলে দিন, রাজকুমারী।

রাজকুমারী ইরবিজা টেবিলে একটা প্রচণ্ড ঘুষি মেরে বলে, ওই মিথ্যেবাদী শয়তানের জাসু হাড়ে হারামজাদী ধূমসো বুড়ি মাগীটার কথা তোমরা বিশ্বাস করলে? ওতো বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যে বলতে ওস্তাদ। একথা একশোবার সত্যি আমাদের এই দুর্গপ্রাকারে একজন অচেনা মানুষকে আমি আশ্রয় দিয়েছি। সে বিদেশী মুসাফির। সে আমার মেহেমান। তার সঙ্গে সারকগনের কি সম্পর্ক? আর যদি সারকানও হয় তবু সে এখন আমার মাননীয় অতিথি। অতিথির অবমাননা কিছুতেই আমি সহ্য করবো না। দুনিয়াতে এমন কোনও শক্তি নাই তাকে আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে যেতে পারে। আমার কথা যদি তোমরা না শোনো, তবে আগে আমাকে মেরে ওকে ছুঁতে পারবে, এই বলে দিলাম। এটা জেনে রেখো, ইরবিজা কখনও মেহেমানের অসম্মান বরদাস্ত করে না। যার সঙ্গে বসে নুন রুটি খেয়েছি, তার সঙ্গে আমি বিশ্বাসঘাতকতা করি না। ব্যস, এর বেশী আর আমার কিছু বলার নাই মাসুরা, এবার তুমি আমার বাবার কাছে গিয়ে যা খুশি নালিশ করতে পারো। তার জবাব আমি তাকেই দেব। দয়া করে এই কথাটা তাকে বলো, ঐ বুড়ি বাঁদী সর্দািরণীটা ডাহা মিথ্যে কথা বলেছে।

মাসুরা হাত জোড় করে প্রার্থনা জানায়, আপনি আমাকে ক্ষমা করবেন, রাজকুমারী। আমি খালি হাতে ফিরে যেতে পারবো না। আপনার বাবা সম্রাট হারদুবের হুকুম, সারকানকে নিয়ে যেতেই হবে।

—মাসুরা, তুমি তোমার অধিকারের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। তুমি আমার মাইনে করা চাকর। তোমাকে রাখা হয়েছে লড়াই করার জন্যে। যখন লড়াই করতে হুকুম করা হবে, তখন জািন কবুল করেও তোমাকে তা করতে হবে। কিন্তু এটা লড়াই-এর ক্ষেত্র নয়। এ-সব তর্কসাপেক্ষ ব্যাপারের মধ্যে তোমার নাক না গলানোই ভালো। আর আমার কথা যদি তোমার অমান্য করতেই সাধ হয়, তার ফলও হাতে হাতেই পাবে। আমার এই মহামান্য অতিথিকে যদি তোমার সারকান বলেই সন্দেহ হয়, এবং আমার নির্দেশ অগ্রাহ্য করে তাকে যদি বন্দী করতেই চাও, সম্পূর্ণ নিজের দায়িত্বেই করবে। এর পরিণতির জন্যে আমাকে দোষারোপ করবে না। আমি তার হাতে এই ঢাল তলোয়ার তুলে দিচ্ছি, তোমারা একে একে এসো, লড়াই করো, হিম্মৎ দেখাও, তারপর ক্ষমতা থাকে তাকে জ্যান্ত অথবা মৃত অবস্থায় সম্রাটের কাছে নিয়ে যাও—আমার কোন আপত্তি থাকবে। না। কিন্তু একটা কথা সাবধান করে দিচ্ছি। একসঙ্গে একজনের বেশী আসবে না। সেটা কোনও বীরের কাজ নয়। বীরত্ব যদি দেখাতেই চাও, যদি প্রমাণ করতে চাও তুমি আমার বাবা সম্রাট হারদুবের যোগ্য প্রধান সেনাপতি তবে দলবল না নিয়ে তার সঙ্গে দ্বন্দ্বযুদ্ধে এসো। দেখবো কার কতটা হিম্মৎ।

মাসুরা বিনীতভাবে বলে, একদিকে আপনার বাবা ক্রুদ্ধ হয়েছেন অন্যদিকে আপনিও ক্রোধান্বিত। এখন আমি উভয় সংকটে পড়েছি কাকে তুষ্ট করি। যাই হোক, আপনার প্রস্তাবই শিরোধার্য করে নিলাম। এক এক করেই হবে। আমাদের অসির লড়াই। আমি সেনাদলের প্রধান। আমিই প্রথম লড়বো।

মাসুরা বললো, আপনি উপযুক্ত কথাই বলেছেন, রাজকুমারী। বীর বীরের সঙ্গে সম্মুখ সমরে লড়বো। আমি সেনা দলের প্রধান, আমিই প্রথমে লড়তে চাই।

ইরবিজা সতর্ক করে দেয়, কিন্তু তোমার পিছনে ধারা আছে তাদের সবাইকে জানিয়ে দাও আমার শর্তের কথা। মনে রেখো, তোমাদের কেউ যদি এই শর্ত ভঙ্গ করে আমি আমার মেহেমানকে রক্ষা করার যথাযোগ্য ব্যবস্থা করবো।

মাসুরা বলে, আপনার শর্তে আমরা রাজি, রাজকুমারী।

ইরবিজা একটু হাসলো, বললো, তোমাদের লজ্জা হওয়া উচিত ছিলো, মাসুরা। এক নিরস্ত্ব যুবককে বন্দী করতে একশোজন-এর এক বাহিনী আনতে হয়েছে? ছিছি, কি লজ্জা।

ইরবিজা থামের পাশে গিয়ে সারকানকে তার প্রস্তাব জানালো। সারকান বললো, কিন্তু সুন্দরী, একজনের সঙ্গে লড়াই করা আমাদের রীতি বিরুদ্ধ। এক সাথে অন্তত জনাদশেক লডিয়ে না পেলে হাতের সুখ হয় না। যাইহোক, তুমি যখন প্রস্তাব দিয়েছে, তাই হবে।

এই বলে সে ঢাল তলোয়ার হাতে হারদুবের প্রধান সেনাপতির দিকে রুখে আসে। সারকানের প্রথম ঘা সে সামলে নিয়ে বসে পড়ে। মাথার উপর দিয়ে তলোয়ারখানা বেঁা করে ঘুরে আসে। এবার সারকান ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে।ক্ষিপ্রগতিতে আবার এক কোপ মারে। এবারে আর মাসুরা এড়াতে পারে না। ধড় আর মুণ্ডু আলাদা হয়ে যায়। প্রচণ্ড এক আর্তনাদ করে মাসুরার ধড়টা মেজের উপরে লুটিয়ে পড়ে।

ইরবিজা সারকানের এই বিক্রম দেখে মুগ্ধ হয়। লোক মুখে তার শৌর্য বীরত্বের অনেক গল্প গাথাই সে শুনেছিলো, মনে মনে যথেষ্ট শ্রদ্ধা করতো তাকে। কিন্তু আজ নিজের চোখে প্রত্যক্ষ করে সে-শ্রদ্ধা সহস্বগুণ বেড়ে গেলো। মনে মনে ভাবতে লাগলো, কি তার স্পর্ধা, এই মানুষটাকে কাল সে মল্লযুদ্ধে আহ্বান করেছিলো? এবার ইরবিজা চিৎকার করে ওঠে, কই আর কে আছো, এগিয়ে এসো।

মাসুরার এক ভাই আসে। দৈত্যের মতো চেহারা। দাঁত কড়মড় করতে থাকে। একমুহূর্ত। সাঁই করে চালিয়ে দেয় তলোয়ার। কিন্তু সারকানের এক স্বা, ঘায়ে তার হাতের বঁটি হাতেই ধরা রইলো দ্বিখণ্ডিত তলোয়ার-এর টুকরো নিচে পড়ে গেলো। সারকান–এক কোপেই শেষ করে দিতে পারতো। কিন্তু নিরস্তুকে আঘাত করা তার ধর্ম নয়। বললো, ওকে একখানা তলোয়ার দাও।

ইরবিজা অবাক হয়। দেওয়ালে টাঙানো একখানা তলোয়ার খুলে এনে মাসুরার ভাই-এর হাতে দেয়। কিন্তু তাক বুঝে একটা কোপ মারতে যায়। কিন্তু তার আগে সারকগনের তলোয়ার প্রচণ্ড বেগে গেঁথে যায়। তার তলপেটে।

এইভাবে একের পর এক আসে। আর সারকানের এক এক কোপে খতম হতে থাকে। এইভাবে জনা পঞ্চশ শেষ হয়ে গেলো। এবার আর কেউ শর্তের কথা মানলো না। সারকানকে খতম করতে এক সঙ্গে বাকী সবাই বাঁপিয়ে পড়ে। কিন্তু সারকানের বিক্রমের কাছে ইহা তুচ্ছ। সব কচুকাটা করে শেষ করে দিলো।

বাঁদীরা বললো, না, মালকিন আর কেউ নাই। সব শেষে গুণে দেখা গেলো মোট আশীটা লাশ। বাকী জনা কুড়ি আহত হয়ে চৌ-দৌড় দিয়ে পালিয়ে গেছে।

সারকান তলোয়ারের রক্ত পুছে নামিয়ে রাখলো। ইরবিজা এসে গভীর আলিঙ্গনে বেঁধে সারকানের অধরে ছোট্ট একটি চুম্বন একে দেয়। তারপর ওর হাত ধরে ঘরের মাঝখানে এনে দাঁড় করায়। নিজের গায়ের শালখানা খুলে বাদীর হাতে দেয়। সারকান দেখে অবাক হয়, ইরবিজ, রাণ-সাজে সজিতা। কোমরে ঝোলানো তরবারীখানা দেখিয়ে বলে, একেবারে খাঁটি ভারতীয় ইস্পাতে তৈরি। তুমি যখন লড়াই করছে, আমি পাশের ঘরে গিয়ে নিজেকে তৈরি করে এলাম। যদি তোমার কোন সাহায্য দরকার হয়। তা তুমি তো একাই একশো। তোমার আবার সাহায্য দরকার হবে কিসে!

এরপর দুর্গ প্রাকারের দ্বার-রক্ষীদের ডেকে ইরবিজা কৈফিয়ৎ তলব করে, আমার হুকুম ছাড়া অন্য লোককে ঢুকতে দিয়েছিলে কেন?

দ্বার-রক্ষীরা জবাব দেয়, সম্রাটের প্রধান সেনাপতিকে বাধা দেবার সাহস পাবো কি করে? সম্রাট যেখানে নিজে তাদের পাঠিয়েছেন, আমরা কি করতে পারি? আপনি আমাদের মালকিন ঠিক; কিন্তু আপনার ওপরে তো তিনি।

ইরবিজা দ্বার-রক্ষীদের এই উদ্ধত জবাবে ক্রুদ্ধ হয়ে বলে, কার ওপরে কে, আমি দেখাচ্ছি।

সারকানকে বললো, এই অবাধ্য প্রহরীদের কোনও প্রয়োজন নাই। ওদের তুমি খতম করো।

সারকগনের তলোয়ারের কোপে তারা ধরাশায়ী হয়।

ইরবিজা বলে, এবার তোমাকে আমার নিজের কথা শোনাবো। আমার নাম ইরবিজা সে তো তুমি শুনেছো। আমার বাবা সিসারিয়া সম্রাট হারদুব। আর ঐ যে ধূমসো বুড়িটা-ও হচ্ছে আমার বাবার পুরোনো বাঁদী। একসময় বাবার খুব অসুখ হয়েছিলো, সেই সময় ওর সেবাযত্নে বাবা সুস্থ হয়ে ওঠেন। সেই থেকে সে বাবার নেক-নজরে আসে। এই দুর্গের দেখাশুনার কর্তৃত্ব ছেড়ে দেওয়া হয় তার উপর। কিন্তু আমার সঙ্গে তার কোন দিনও বনিবনাও ছিলো না। আজকের এই ঘটনা সে বাবার কাছে চতুগুণ করে লাগাবে, আমি জানি। বাবার মনটা বিষিয়ে দেবার চেষ্টা করবে। হয়তো বলবে, আমি খ্ৰীষ্টান ধর্ম পরিত্যাগ করে মুসলমান হয়ে গেছি। এখন আমার একমাত্র রক্ষণ আমি যদি দেশের বাড়িতে চলে যাই। এ ব্যাপারে তোমাকে একটু সাহায্য করতে হবে।

সারকান ভাবে, এই মেয়েটির দৌলতেই আজ সে এতটা বিপদ কাটিয়ে উঠতে পেরেছে। তার নিজের বিপদ জেনেও তাকে বাঁচাবার জন্যে এগিয়ে এসেছে। এখন তার কর্তব্য তাকে রক্ষা করা। সারকান বলে, আমার ধড়ে যতক্ষণ প্ৰাণ আছে, তোমার কেউ ক্ষতি করতে পারবে না, ইরবিজা। কিন্তু তুমি কি তোমার বাবার সঙ্গে সব সম্পর্ক চুকিয়ে দিতে চাও?

ইরবিজা বলে, এখন তা ছাড়া আর কোনও পথ নাই, সারকান। কারণ এর পরিণাম যা ঘটতে পারে, আমি অনুমান করতে পারি। আমার বাবাকে আমি জানি, তার ক্ৰোধ বড় মারাত্মক। সেখানে সন্তান-স্নেহ তুচ্ছ। তোমাকে আমার একটা কথা বলার আছে, আশা করি আমার অবস্থা বিবেচনা করে কথাটা তুমি শুনবে।

সারকান বলে, কি কথা বলো, তোমার কথা না শোনার মতো স্পর্ধা আমার নাই, ইরবিজা।

–তুমি আমার কথা শোনো, তোমার সৈন্য-সামন্ত নিয়ে বাগদাদে ফিরে যাও।

—কিন্তু ইরবিজ, আমার বাবা উমর-আল-নুমান আমাকে পাঠিয়েছেন তোমার বাবার সঙ্গে যুদ্ধ করতে। কনসাঁতানতিনোপল-এর সম্রাট আফ্রিদুন আমার বাবার সাহায্য প্রার্থনা করেছিলেন। তোমার বাবা সম্রাট হারদুব তীর জাহাজ আক্রমণ করে সব লুঠপাঠ করে নিয়ে যান। সেই জাহাজে অনেক ধনরত্ন বোঝাই ছিলো। এবং তার মধ্যে ছিলো অলৌকিক দৈব-শক্তি সম্পন্ন তিনখানা পাথর।

ইরবিজা বাধা দিয়ে বলে, তাহলে আসল ব্যাপারটা খুলে বলি শোনো। তোমরা তো একতরফাই শুনেছো। এবার আমার কথা শুনলে, সব পরিষ্কার হয়ে যাবে।

প্রতি বছর বড়দিনের সময় আমাদের-খ্ৰীষ্টানদের বিরাট উৎসব হয়। আমরা এই দুর্গে ফি বছর বছরের শেষ সাতটা দিন খুব জাঁকজমক করে আনন্দ উৎসব পালন করে থাকি। নানা দেশের সম্রাটদের নিমন্ত্রণ করা হয়। সপরিবারে তঁরা আসেন। খুব হৈ-হল্লা, আমোদ প্রমোদ করে তারা আবার দেশে ফিরে যান। একবার এই উৎসবে সম্রাট আফ্রিদুন তার কন্যা সফিয়াকে উপহার স্বরূপ আমার বাবার হাতে সমর্পণ করে যান। তুমি নিশ্চয়ই জানো, সেই সফিয়া এখন তোমার বাবার অন্যতম রক্ষিতা হয়ে বাগদাদের প্রাসাদে রয়েছে। এবং সম্প্রতি সে একটি সন্তানের জননী হয়েছে।

আমার বাবার সঙ্গে তখন তোমার বাবার খুব সদ্ভাব ছিলো। তিনি সফিয়াসহ আর পাঁচটি সুন্দরী গ্ৰীক কুমারীকে উপহার হিসাবে পাঠিয়েছিলেন তোমার বাবার কাছে। সেই থেকে সে তোমার বাবার প্রাসাদেই আছে।

কিন্তু এদিকে বিপত্তি ঘটে। সম্রাট আফ্রিদুন ভাবলেন, আমার বাবার্তাকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্যে তার কন্যাকে অন্যত্র চালান করে দিয়েছেন। কিছুদিনের মধ্যেই দারুণ অপমান করে বাবাকে পত্র দিলেন তিনি। চিঠিখানার বয়ান মোটামুটি এই রকম :

বছর দুই আগে তোমার হাতে আমার কন্যা সফিয়াকে সমর্পণ করে এসেছিলাম। আমার আশা ছিলো, যথাযোগ্য রাজসিক মর্যাদায় সে তোমার কাছে থাকবে। কিন্তু সম্প্রতি খবর পেলাম, তুমি আমার উপহারের প্রতি অসৌজন্য প্রকাশ করেছে। এখন সে তোমার কাছে নাই। এক স্লেচ্ছ যবন সুলতানের হারেমে সে এখন নগণ্য বাঁদী। আমি মনে করি, এ তোমার ঔদ্ধত্য। এবং আমাকে অপমান করার কৌশল মাত্র। আমার পত্র পাওয়া মাত্র আমার কন্যা সফিয়াকে সসম্মানে আমার রাজধানীতে ফেরৎ দিয়ে যাবে। নচেৎ সমুচিত শাস্তি পেতে হবে। আমার এই পত্রের জবাব যদি না দাও, তার পরিণাম আরও খারাপ হবে।

চিঠি পড়ার পর বাবা চিন্তিত হলেন। অহেতুক যুদ্ধ-বিগ্রহ তিনি পছন্দ করেন না। কিন্তু তাই বলে, হত-বীৰ্য, কাপুরুষ তিনি নন। বাবা দেখলেন, এ ক্ষেত্রে আফ্রিদুনের সঙ্গে কলহ এড়ানো কঠিন। কারণ সফিয়াকে এখন ফেরৎ আনা সম্ভব নয়। সে সম্প্রতি উমর-আল-নুমানের সন্তানের জননী হয়েছে।

আমার বাবা বুঝলেন, ঝামেলা এড়ানো শক্ত। তবু শেষ চেষ্টা করলেন। আফ্রিদুনকে বুঝিয়ে সুজিয়ে চিঠি দিলেন। লিখলেন : সফিয়াকে তিনি ইচ্ছে করে সেখানে পাঠাননি। বাগদাদসুলতানকে উপহার পাঠানো হয়েছিলো, পাঁচটি সুন্দরী কুমারী কন্যা। তাদের মধ্যে সফিয়া ভুল করে চলে গেছে। এটা কোনও ইচ্ছাকৃত ব্যাপার নয়। তবুও তাকে ফেরৎ হয়তো আনা যেতো, কিন্তু এখন সে উমর-আল-নুমানের সস্তানের জননী হয়েছে, আর তা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে আফ্রিদুন যেন ব্যাপারটাকে অহেতুক জটিল না করে সহজ স্বাভাবিকভাবে মেনে নেন।

কিন্তু এর ফলে আফ্রিদুন শান্ত তো হলেনই না, বরং আরও ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন, কী, এত বড় স্পর্ধা, আমার মেয়ে মুসলমানের হারেমে তিনশো ষাটজনের একজন হয়ে পাশবিক অত্যাচারের শিকার হচ্ছে। আমার বাবার উপর প্রতিশোধ নেবার পায়তারা ভাজতে লাগলেন। কিন্তু নামে সম্রাট হলে হবে কি, তালপুকুরে ঘটি ডোবে না। না আছে ধনদৌলতের জোর, না আছে সেনা বল। অথচ ফুকো-আভিজাত্য আর দম্ভ আছে। ষোল আনা। যাদের ভেতরটা ফাঁপা, অথচ বড়ফট্টই বেশী তারা কিন্তু শয়তানের জাসু হয়। যত সব বন্দবুদ্ধির প্যাঁচ মাথায় ঘুরতে থাকে। আফ্রিদুন ফন্দী করলেন, কীটা দিয়ে কাঁটা তুলতে হবে। তাই তিনি নানারকম উপহার উপটৌকনের ঘুষ পাঠালেন। আপনার বাবার কাছে। আর সেই সঙ্গে বলে পাঠালেন এক আষাঢ়ে গল্প, তার তিনখানা ধনদৌলতে ঠাসা জাহাজ নাকি আমার বাবা লুঠপাঠ করে নিয়ে গেছেন। এবং তার হাজার হাজার সৈন্যসামন্ত মেরে শেষ করে ফেলেছেন। কিন্তু আফ্রিদুনের রাজত্বের হাল যাদের জানা আছে তারা একথা কি করে বিশ্বাস করবে। তার এমন কোনও ধনদৌলত নাই যা একটা জাহাজও বোঝাই হতে পারে। আর হাজার হাজার সৈন্য? সে তো তার স্বপ্ন লোকের কল্পনা। তার গোটা রাজ্যের সৈন্যসংখ্যা সাকুল্যে হাজারখানেক হবে কিনা সন্দেহ। তার মধ্যে হাজার সৈন্য যদি মারাই গিয়ে থাকে। তবে নিজের সুরক্ষা ঠিক রাখবে কি করে?

তোমার বাবা অত ঘোর প্যাচের মানুষ নন। তিনি আফ্রিদুনের এই চাল বুঝতে পারেননি। ভেবেছেন, বিপদের সময় সাহায্য চাইলে এগিয়ে যাওয়াই বীরের ধর্ম। কিন্তু বীরত্ব আর রাজনীতি তো এক বস্তু নয়, সারকান। তোমার বাবা বিশ্ববিজেতা যোদ্ধা। রাজ্য জয় করতে গেলে বীরত্ব বিক্রমই প্রধান, কিন্তু রাজ্য পরিচালনা করতে গেলে রাজনীতিজ্ঞ হতে হবে।

আফ্রিদুন তোমার দশ হাজার সৈন্য এনে ফেলেছে তার কোজায়। এমন ফাঁদে তোমাকে তিনি ফেলবেন, তুমি আর বেরুতে পারবে না। জানো তো বুদ্ধির বলের কাছে দেহের বল তুচ্ছ। আবার সে বুদ্ধি যদি শয়তানের বুদ্ধি হয়। কি ভাবে কেমন করে তোমার সব সৈন্য তিনি রাতারাতি খতম করে দেবেন, তুমি টেরও পাবে না।

তুমি বলছিলে না? তিনটি দৈব শক্তিসম্পন্ন গ্বহরত্ন ছিলো সেই জাহাজে? আসলে ঐ গ্বহরত্ন তিনটি তার কন্যা সফিয়ার কাছেই ছিলো। গ্ৰীসে যাওয়ার পর সেগুলো সে আমার বাবার হাতে তুলে দেয়। সত্যিই, অবাক হতে হয়, পাথর তিনটির অলৌকিক ক্ষমতা আছে। ধারণ করলে দুরারোগ্য ব্যাধি নিরাময় হতে পারে। বাবার অলক্ষ্যে আমি ঐ পাথরগুলো চুরি করে নিয়েছি। সময় মতো তোমাকে দেখাবো একদিন। সে যাকগে, তুমি আর এক মুহূর্ত দেরি করো না। ছাউনিতে ফিরে যাও। সৈন্যসামন্ত নিয়ে বাগদাদের পথে রওনা হয়ে পড়ে।

সারকান বলে, তুমি আমার চোখ খুলে দিলে, ইরবিজা। আমি আর কাল-বিলম্ব করতে চাই না। তোমার এই মূল্যবান উপদেশ না পেলে কী সর্বনাশই যে ঘটতো, ভাবতে শিউড়ে উঠছি। কিন্তু সুন্দরী, তোমাকে এখানে ফেলে রেখে কিছুতেই যাবো না আমি। আজ যা ঘটে গেছে তার পরিণতি বড়ই মারাত্মক। তোমাকে এখানে রেখে গেলে আর আস্ত রাখবে না তোমার বাবা। তুমিও আমার সঙ্গে চলো। আজই আমরা বাগদাদে রওনা হয়ে যাই।

ইরবিজা এক মুহূর্ত কি ভাবলো।–ঠিক আছে, তুমি তোমার ছাউনি গোটাতে থাকে। লোকলস্কর রওনা করে দাও। আমি তিনদিনের মধ্যেই তোমার কাছে যাচ্ছি। তারপর দু’জনে বাগদাদে রওনা হবে।

ইরবিজ, সারকানের বুকে মাথা রেখে কীদলো। সারকানের চোখেও জল আসে। বাদী ঘোড়া এনে দেয়। সারকানকে। বিদায় নিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায়।

কিছু দূরে যেতেই সারকান দেখে, তিনজন ঘোড়সওয়ার তার দিকে ছুটে আসছে। শত্রুর আক্বমণ আশঙ্কায় সে তলোয়ার খুলে বাগিয়ে ধরে। কিন্তু না, কাছে আসতে দেখা গেলো, তার উজির দানদান আর দুই বিশ্বস্ত আমীর। যথারীতি আদব কায়দা দেখিয়ে তারা কাছে এসে দাঁড়ালো। উজির দানাদান বললে, কী ব্যাপার। আজ তিনদিন ধরে তোমার কোনও খোঁজ খবর পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা তো দুশ্চিন্তায় ভেবে ভেবে সারা হচ্ছি। না জানি কী বিপদ হলো। সৈন্যদের মধ্যেও দারুণ আতঙ্ক। তারা বুঝতে পারছে না, তোমার কী হলো।

সারকান তখন আফ্রিদুনের ষড়যন্ত্রের কাহিনী বললো। আফ্রিদুন ফাদ পেতেছে। উদ্দেশ্য, তার সৈন্যবাহিনী সাবাড়ি করা। এই সময়ে ছাউনি ছেড়ে বেরিয়ে আসা ঠিক হয়নি। সারকান ঐটা বলে, আর দেরি নয়, এখুনি আমাদের ছাউনিতে পৌঁছতে হবে।

তীর বেগে ঘোড়া ছুটিয়ে তারা ছাউনিতে এসে পৌছয়। না, সব ঠিকই আছে। কোনও বিপদ আপদ ঘটেনি। সারকগনের হুকুমে তখুনি তাবু উঠানো হলো। উজির দানাদানকে বললে, আপনি এদের নিয়ে বাগদাদের পথে রওনা হয়ে পড়ুন। আমি এখানে আরও তিন দিন থাকবো। আমার সঙ্গে থাকবে শুধু একশোজন সেনাপতি। বাকী সব আপনি নিয়ে যান।

সৈন্যসামন্তরা খানাপিনা শেষ করে নিলো। ঘোড়া, উট, গাধা, খচ্চরদের দানাপানি খাওয়ানো হলো। তারপর মাত্র একশোজন সেনাপতি রেখে সমস্ত সেনাবাহিনী সঙ্গে নিয়ে দানদান রওনা হলো।

সারকান দাঁড়িয়ে দূরে পাহাড় শীর্ষে প্রত্যক্ষ করে শখানেক ঘোড়সওয়ার তার দিকেই ধাবমান। শত্রুশঙ্কায় সেও তার সেনাপতিদের সঙ্গে নিয়ে প্রস্তুত হয়ে রইলো। কাছে আসতে দেখা গেলো, সারকানের আশঙ্কা অমূলক নয়, সত্যিই একশো যোদ্ধার এক অশ্বারোহী বাহিনী। দূর থেকে হুঙ্কার ছাড়লো তারা, শোনো মুসলমানের ছেলেরা, শান্ত সুবোধ বালকের মতো তোমাদের অস্ত্রশস্ত্র ফেলে দিয়ে ঘোড়া থেকে নেমে পড়ে। না হলে, মেরী আর জোনের নাম বলছি, একেবারে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলবো।

সারকান অবাক বিস্ময়ে শোনে। ক্ৰোধে চোখ লাল হয়ে ওঠে। দাঁতে দাঁত চেপে। চোয়াল কঠিন হতে থাকে।-ওরে খ্ৰীষ্টানের বাচ্চা, কুকুর, তোদের এত বড় দুঃসাহস, আমারই এলাকায় এসে আমাকেই ধমকাচ্ছিস। ঘাড়ে কটা করে মাথা আছে রে? দাঁড়া এখুনি মজা টের পাইয়ে দিচ্ছি। এখনও ভালোয় ভালোয় বলছি ভালোয় ভালোয় মায়ের ছেলে মায়ের কাছে ফিরে যা। তা না হলে জন্মের সাধ মিটিয়ে দেব এখুনি।

তারপর সারকান তার সেনাপতিদের উদ্দেশ করে বলে, আল্লাহর নাম করে ঝাঁপিয়ে পড়ো। শয়তানগুলোকে সমুচিৎ শিক্ষা দিয়ে দাও।

নিমেষে দুই দলে প্রচণ্ড লড়াই বেঁধে গেলো। ঘোড়ার সঙ্গে ঘোড়ার, অসির সঙ্গে অসির, মানুষের সঙ্গে মানুষের আঘাত প্রত্যাঘাতে কেঁপে উঠলো সারা পাহাড় উপত্যকা। ধূলী বালীতে অন্ধকার হয়ে এলো চতুর্দিক। এইভাবে সন্ধ্যা নেমে আসে। অন্ধকার ছেয়ে যায়। হঠাৎ দেখা গেলো, হানাদাররা অন্তহিত হয়ে গেছে। সারকান শুনে খুশি হলো, তার দলের কেউই হতাহত হয়নি।

সারকান তার সেনাপতিদের উদ্দেশ করে বলে, বন্ধুগণ, আজ আমরা অতর্কিত আক্রান্ত হয়েছিলাম, যাক আল্লাহর দোয়ায় কারুরই তেমন কোন আঘাত লাগেনি। কিন্তু যারা এসেছিলো রাতের অন্ধকারে ফিরে গেলেও কাল সকালে যে আবার হানা দেবে না তার কোনও ভরসা নাই। সুতরাং সর্বদা প্রস্তুত থাকবে। তাঁবুর বাইরে পালা করে পাহারায় থাকে। বাকী সবাই রাতের মতো ঘুমিয়ে শরীরকে চাঙ্গা করে নাও। কাল সকালে আরও বীরবিক্রমে লড়াই করতে হবে। নিজেদের শক্তি সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল থাকা খুবই ভালো; কিন্তু তার চেয়ে আরও বেশি ভালো, শত্রুর শক্তি খাটো করে না দেখা। আমরা একশোজন, তারাও মাত্র একশোজনই ছিলো, তা সত্ত্বেও আমরা তাদের ঘায়েল করতে পারলাম না। সুতরাং মনে হচ্ছে, তারাও কিছু কম বাহাদুর নয়। যাই হোক, খানাপিনা সেরে রাতের মতো ঘুমিয়ে নাও।

এদিকে খ্ৰীষ্টান যোদ্ধারা তাদের সেনাপতিকে ঘিরে বলে, আজ তো আমরা কিছু করতে পারলাম না। মনে হচ্ছে অত সহজে ওদের কাবু করা যাবে না।

সেনাপতি বলে, ঠিক আছে, ঘাবড়াচ্ছে কেন? কাল সকালে আবার নতুন কায়দায় আক্রমণু চালাতে হবে। এখন আর ও নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকার নাই। ঘুমিয়ে পড়ো।

পরদিন সকালে সারকান সেনাপতিদের সঙ্গে নিয়ে সামনের পাহাড়ের পথে এগোতে থাকে।—মনে হচ্ছে, বাছাধনরা কাহিল হয়ে পড়েছে! তা না হলে এতটা বেলা হয়ে গেলো কারো পাত্তা নাই কেন?

একজন বলে, জানের মায়া তো সকলেরই আছে, হুজুর। জেনে শুনে কে আর মাথা এগিয়ে দিতে আসে। জানে তো আজ গেলে কচু কাটা হতে হবে। কাল ওরা হঠাৎ এসে হানা মেরেছিলো, আজ তো আর তা হচ্ছে না। আমরা রীতিমতো তৈরি। আসুক না, মাথা রেখে যেতে হবে।

—দাঁড়াও দাঁড়াও, তোমরা বড্ডো বেশী উৎফুল্ল হয়ে উঠেছে। কে জানে, হয়তো ওদের অন্য কোনও প্যাঁচ আছে। তোমরা এক কাজ করো, এক এক করে এগিয়ে যাও। পাহাড়টার ওপারেই মনে হচ্ছে ওরা ডেরা গেড়েছে। একা পেয়ে হয়তো তেড়ে আসতে পারে। তখন তো আমরা পিছনেই আছি। এইভাবে ওদের ফাদে এনে ফেলতে হবে।

সারকানের নির্দেশ মতো একজন ঘোড়া ছুটিয়ে পাহাড়ের পথে উঠে যায়। চিৎকার করতে থাকে, কই হে কে আছো, নেকড়ের বাচ্চারা, বেরিয়ে এসো। তোমাদের যম হাজির।

মুখের কথা মুখেই রয়ে গেলো, একটা দডির ফাঁস এসে এটে গেলো তার গলায়। সারকান সেনাপতি দেখলো, অদূরে ঘোড়ার পিঠে এক বর্ম শিরস্ত্ৰাণ পরিহিত এক সুদৰ্শন যোদ্ধা। ফাসের দডিটা তার হাতের মুঠোয় ধরা। এক ঝটিকায় নিয়ে ফেলে দিয়ে হিড়হিড় করে টানতে টানতে গুহার দিকে নিয়ে চললো।

এদিকে সারকান চিন্তিত হলো। আর একজনকে হুকুম করলো, যাও—দেখ, ওর কি হলো। তারও আসতে দেরি দেখে আরও একজন এগিয়ে যায়। এইভাবে সারাদিনে কুড়িজন সারকান সেনাপতি পাহাড়ের ওপারে গিয়ে আর ফিরে এলো না। সারকান অবাক হয়। কী ব্যাপার। তার সব দুর্ধর্ষ যোদ্ধা। একটার পর একটা গেলো-আর ফিরলো না। দিন শেষ হয়ে এলো। এখনই রাত্রির কালো ছায়া নামবে। এ অবস্থায় আর এগোনো ঠিক হবে না মনে করে তাঁবুতে ফিরে আসে। ক্ৰোধে সারা শরীর জ্বলতে থাকে। মনে মনে ঠিক করে, কাল সকালে সে এর উপযুক্ত জবাব দেবে। আর অন্য কাউকে নয় নিজেই যাবে পাহাড়ের ওপারে। দেখবে কত বড় লডিয়েরা সেখানে আছে। সেনাপতিদের উদ্দেশ করে বলে, তোমরা আজকের মতো বিশ্রাম করো। ঘাবড়াবার কিছু নাই, কাল আমি নিজে লড়বো ওদের সবার সঙ্গে, দেখি কত বড় বীরপুরুষ তারা। কৈফিয়ৎ চাইবো, কেন তারা আমাদের এলাকার মধ্যে ঢুকেছে। যদি ভালোয় ভালোয় মিটিয়ে নিতে চায় ভালো, না হলে, লড়াই করার শখ ঘুচিয়ে দেব জন্মের মতো।

পরদিন সকালে সারকান একই উঠে যায় পাহাড়ের পথে। ওপারে এক উপত্যকায় গিয়ে দাঁড়ায়। এদিক ওদিক তাকিয়ে শত্রু শিবিরের সন্ধান করতে থাকে। হঠাৎ বুঝতে পারলো প্রায় পঞ্চাশজনের এক পদাতিক বাহিনী তাকে ঘিরে ফেলেছে। প্রত্যেকেই বর্ম-শিরস্ত্ৰাণ পরিহিত। উদ্যত তরবারী হাতে নিয়ে তারা দাঁড়িয়ে পড়লো। দলের সামনে তাদের প্রধান। উন্মুক্ত তলোয়ার হাতে। ঘোড়ার লাগাম টেনে সেও দাঁড়ালো। হুঙ্কার দিয়ে পরিষ্কার আরবী ভাষায় বললো, যুদ্ধবাজ সারকান, এবার তোমার মৌৎ হাজির। লড়াই-এর জন্যে প্রস্তুত হও। আমরা দুজনেই দুই বাহিনীর প্রধান। সম্মুখ সমরে আমাদের মধ্যে যে জিতবে, সব সৈন্যসামন্ত তার বশ্যতা স্বীকার করবে। নাও, আর দেরি কেন, এসো।

সারকানের রক্ত টগবগ করে ফুটতে থাকে। সিংহের মতো গর্জে ওঠে। তলোয়ারে তলোয়ারে লড়াই শুরু হয়। ইস্পাতে ইস্পাতে ঘর্ষণে ক্ষণে ক্ষণেই আগুনের ফুলকী ঠিকরে বেরুতে থাকে। যাকে বলে সেয়ানে সেয়ানে লড়াই। কেউই কাউকে কাবু করতে পারে না। এইভাবে দিনের আলো ফুরিয়ে আসে। সে দিনের মতো রণে ভঙ্গ দিয়ে যে যার ডেরায় ফিরে যায়।

সারকান অবাক হয়ে ভাবতে থাকে। তার সমকক্ষ বীরপুরুষ তামাম দুনিয়ায় তো কেউ নাই। তবে কেন সে তাকে কাবু করতে পারলো না? তার যে-সব মোক্ষম মার ডাকসাইটে জাদরেল যুদ্ধবাজরাও এড়াতে পারে না, মনে হলো, অতি সহজে সেগুলো পাশ কাটিয়ে গেলো সে।

পরদিনও সারাদিন ধরে চললো তাদের দ্বন্দ্ব যুদ্ধ। কিন্তু না, সারকান পরাস্ত করতে পারে না। আক্রোশে, উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁিপতে তাঁবুতে ফিরে যায়। পরদিন আবার তারা রণক্ষেত্রে হাজির হয়। এইদিন খ্ৰীষ্টান সেনাপতি এক সময় ঘোড়ার পিঠ থেকে নিচে পড়ে যায়। সারকান তলোয়ার বাগিয়ে ধরে। কোপ মারতে যাবে, এমন সময় হাত তুলে সে থামতে বলে, থামো, তুমি না বিশ্ববিজেতা উমর অল-নুমানের পুত্র সারকান। তোমার মতো বিক্রম বীর নাকি সারা আরব দুনিয়ায় নাই। এই তোমার বীরত্ব! একটা অসহায় নিরস্ত্ব নারীর ওপর তলোয়ার চালাতে লজ্জা করে না তোমার।

সারকান হতভম্ব হয়ে পড়ে।

—ইরবিজা—তুমি? আমি তো চিনতেই পারিনি, সোনা?

–হ্যাঁ, আমি তোমাকে পরীক্ষা করতে এসেছিলাম। যার সঙ্গে আমি যাবো, চিরকাল যার কাছে থাকবো, তাকে একটু বাজিয়ে দেখে নেবো না? কতটা তার হিম্মৎ। এই যে আমার সৈন্যসামন্ত দেখছো, এরা সবাই নারী। এরাই তোমার বিশজন সেনাপতিকে বন্দী করে নিয়ে গিয়ে আমার হাত তুলে দিয়েছে। ভয় নাই। তাদের কোনও ক্ষতি করিনি। বেশ আদর যত্নেই আমার শিবিরে তারা রয়েছে।

সারকান ঘোড়া থেকে নেমে ইরবিজাকে জড়িয়ে ধরে। চুমু খায়।—এইভাবে আমার সঙ্গে লড়াই করলে? যদি আমার একটা মারও ঠেকাতে তোমার পলকমাত্র দেরি হতো, আমি ভাবতে পারছি না সোনা, কি অঘটনই না ঘটে যেতো। আল্লাহ মেহেরবান, তিনিই রক্ষা করেছেন।

ইরবিজা একজনকে নির্দেশ করলো, সারকানের বন্দীদের এখানে নিয়ে এসো। দেখবে, কোনও অসম্মান যেন না হয়।

এর পর তারা দুজনে দুশো সৈন্যসামস্তের বাহিনী নিয়ে বাগদাদের পথে রওনা হয়ে যায়।

সারকান ইরবিজার সহচরীদের বলে, তোমরা রণসাজ খুলে ফেলো। নিজের নিজের পোশাকে সেজে নাও।

সারকান তার কয়েকজন সেনাপতিকে বললো, তোমরা তীরগতিতে বাগদাদের পথে পাডি দাও। সুলতান উমর অল-নুমানকে সংবাদ দাও আমরা আসছি।

সে রাতটা তারা ওখানেই তাঁবুতে কাটালো। পরদিন সকালে উঠে গোসল এবং খানাপিনা। সেরে রওনা হলো।

বিশ দিনের পথ অতিক্রম করে অবশেষে তারা বাগদাদে এসে পৌছয়। উজির দানদান তাদের যথাযোগ্য অভ্যর্থনা করার জন্যে শহরের প্রবেশ মুখে এক হাজার অশ্বারোহীর এক বাহিনী দাঁড় করিয়েছিলো। সারা শহর আর তোরণদ্বার আলোর মালায় সাজানো হয়েছিলো।

দরবারে ঢুকেই যথাবিহিত কুর্নিশ জানায় সারকান। উমর অল-নুমান পুত্রকে পেয়ে খুশি হয়। ইরবিজার সঙ্গে সারকানের বিচিত্র অভিজ্ঞতার কথা জানায় তার বাবাকে। ইরবিজা সম্রাট হারদুবের কন্যা। তাকে বলতে গেলে, শয়তান আফ্রিদুনের ফাঁদ থেকে বঁচিয়েছে। তার নানা গুণের কথা বলতে বলতে সারকান-এর বুক গর্বে ফুলে ওঠে। ইরবিজার মতো সর্বগুণসম্পন্না মেয়ে তামাম দুনিয়াতে কোথাও নাই। সারকানকে সে যেমন নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেছে, তেমনি তার অসাধারণ রণকৌশল দেখেও সে বিস্মিত হয়েছে। দুনিয়াতে এমন কোন যোদ্ধা নাই যে তার অব্যৰ্থ অসির আঘাত প্রতিহত করতে পারে, কিন্তু ইরবিজা এমনই দক্ষ যে, সে সব মারের প্যাঁচ অতি সহজেই সে পাশ কাটিয়ে দিয়েছে।

উমর অল-নুমান-এর মনে পাশবিক প্রবৃত্তি জেগে ওঠে। অনেক দিন সে নতুন মেয়ের স্বাদ পায়নি। সারকানের মুখেইরবিজার অসাধারণ রূপ আর যৌবনের কথা শুনে ধৈর্য আর বাঁধ মানে

—তাকে একবার আমার কাছে নিয়ে এসো, আলাপ করতে চাই।

সারকান বাবার অভিপ্রায় আঁচ করতে পারে না। বললো, এখুনি তাকে পাঠিয়ে দিচ্ছি, জাঁহাপনা।

একটু পরে ইরবিজা এসে আভূমি আনত হয়ে উমরকে কুর্নিশ করে দাঁড়ালো। সুলতানের ইশারায় দরবার ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে গেলো সবাই। শুধু রইলো ইরবিজ, খোজা আর উমর অল-নুমান?

উমর প্রশ্ন করে, তোমার নাম কী?

–ইরবিজা।

–পরিষ্কার আরবী ভাষায় জবাব দিলো।

–তোমার বাবা?

—সিসারিয়া সম্রাট হারদুব।

—তা হলে তুমি তো খ্ৰীষ্টান!

—জী হুজুর। এখানে এসেছে কি অভিপ্ৰায়ে, সুন্দরী।

এই ‘সুন্দরী’ সম্বোধনে ইরবিজা বিস্মিত হয়।–আপনি আমাকে ইরবিজা বলেই ডাকবেন,

জাঁহাপনা!

–কেন সুন্দরীকে সুন্দরী বলা কি অন্যায়?

—আপনি মহানুভব শাহেনশাহ, আপনার ন্যায় অন্যায়ের বিচার কি আমি করতে পারি? তবে আমি আপনার মেয়ের তুল্য। তাই বলছিলাম—

উমর অল-নুমান-এর অট্টহাসিতে শূন্য দরবার মহল চকিত হয়ে ওঠে।—একই নারী কারো মা, কারো কন্যা, আবার কারো বা ভগ্নী হতে পারে। তা আমার তোমার সম্পর্কটা না হয় পরেই ঠিক করা যাবে। থাক ওসব কথা, শুনলাম আমার ছেলে সারকানকে তুমি খুব সাহায্য করেছে। তোমার বুদ্ধির জোরেই সে আফ্রিদুনের ফাদ থেকে কেটে বেরিয়ে আসতে পেরেছে। এবং এ-ও শুনলাম রণ-বিদ্যায় তুমি নাকি পারদর্শ? তা শিখলে কার কাছে?

–আমার বাবা-তিনিই আমাকে হাতে ধরে ধরে সব শিখিয়েছেন। বাবার আমি একমাত্র সন্তান। ছেলে নাই বলে তিনি আমাকে ছেলের মতো করেই মানুষ করেছেন।

উমর অল-নুমান ইরবিজাকে ডেকে পাশে বসিয়ে জিজ্ঞাসা করে, আফ্রিদুনের সেই অলৌকিক পাথর তিনখানা নাকি তোমার কাছেই আছে?

–হ্যাঁ হুজুর, আমি সঙ্গে করেই এনেছি।

—একবার দেখাবে?

—নিশ্চয়ই। ওগুলো তো আপনাকে উপহার দেব বলেই নিয়ে এসেছি। আমি এক্ষুণি এনে দিচ্ছি।

খোজাটাকে বললো, মতিয়াকে বলো, সে যেন আমার হাত বাক্সটা নিয়ে আসে।

মতিয়া একটা ছোট্ট রূপের বাক্স নিয়ে এসে ইরবিজার হাতে দেয়। বাক্সটা খুলে তার মধ্য থেকে আরও ছোট একটা সোনার বাক্স বের করলো ইরবিজা। এই বাক্সে রাখা ছিলো সেই দৈব-শক্তিসম্পন্ন পাথর তিনখানা। বাক্সটা সুদ্ধ সে উমর আঁল-নুমানের দিকে এগিয়ে দেয়।—জাঁহাপনা, এই আমার সেলামী–

উমর-এর চোখ নেচে ওঠে। এই মাণিক্যের কথা সে বহুকাল ধরে শুনে আসছে। আজ তার হাতের মুঠোয় এসে গেলো। বাক্সটা সুদ্ধ ইরবিজার হাতখানা সে চেপে ধরে। ইরবিজা অস্বস্তি বোধ করে। বাক্সটা হাতে তুলে দিয়ে প্রায় জোর করেই হাতটা ছিনিয়ে নেয়। উমরের মুখের হাসি মিলিয়ে যায়। কিন্তু সে মুহূর্ত মাত্র। নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, তলোয়ার-ধরা হলে কি হয়, হাতটা তোমার ফুলের কলির মতো নরম।

ইরবিজার এ-সব কথা ভালো লাগে না। উঠে পড়ে বলে, এবার যদি অনুমতি করেন। জাঁহাপনা, আমি তবে আসি?

উমর বলে, তোমার এবং তোমার সহচরী দাসীদের জন্যে আমি প্রাসাদের একটা মহল সাজাতে বলে দিয়েছি। আজ থেকে ওখানেই তুমি থাকবে।

ইরবিজা কুর্নিশ করে বলে, যো হুকুম, জাঁহাপনা।

খোজা এবং মতিয়াকে সঙ্গে করে সে দরবার ত্যাগ করে নিজের মহলে চলে যায়।

উমর অল-নুমান সারকানকে ডেকে পাঠায়। সারকান এসে কুর্নিশ জানায়। একখানা পাথর এগিয়ে দিয়ে উমর বলে, এটা তোমার কাছে রাখে।

সারকান বলে, আর দু’খানা কি হলো জাঁহাপনা?

উমর বলে, একখানা দেব তোমার বোন নুজাৎকে। আর একখানা রইলো তোমার ছোট ভাই দু-আল-মাকান-এর জন্যে।

–দু-আল-মাকান?

—হ্যাঁ, তোমার ছোট ভাই, নুজাতের সহোদর। তুমি জানো না?

সারকান বলে, জী না। আমি তো শুনেছিলাম, আমার একটা শুধু বোন হয়েছে।

উমর বললো, তুমি নুজাতের কথা শুনেই বাইরে চলে গেছে। কিন্তু তার পরেই সফিয়া আর একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দেয়। মাকান আর নুজাৎ যমজ ভাই বোন।

সারকানের মুখ কালো হয়ে যায়। এত বড় দুঃসংবাদ শুনবে, আশা করেনি। সারকানকে বিষণ্ণ দেখে উমর বলে, কিন্তু এতে তোমার মন খারাপ করার কি আছে, সারকান! আমি অনেক আগেই ফরমান জারি করে দিয়েছি, তুমিই হবে আমার সিংহাসনের উত্তরাধিকারী। সুতরাং তোমার তো মন খারাপ করার কোনও কারণ নাই।

সারকান নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, আল্লাহ ওদের সুখে রাখুন।

আবার কুর্নিশ জানিয়ে দরবার থেকে বেরিয়ে সে ইরবিজার কাছে যায়। সারকানকে চিন্তিত দেখে ইরবিজা জিজ্ঞেস করে, কী ব্যাপার, তোমার মুখ এত গভীর কেন, সারকান? কোনও খারাপ খবর আছে নাকি?

সারকান বলে, খারাপ কিনা জানিনা, তবে সুখবর নয়। এতদিন জানতাম আমার একটি ছোট বোন আছে! নুজাৎ। কনসন্তান্তিনোপোল-এর সম্রাট কন্যা সফিয়া তার মা। কিন্তু আজ শুনলাম সফিয়া একটি পুত্র সন্তানেরও জন্ম দিয়েছে। সে এখন এই প্রাসাদেই সফিয়ার কাছে মানুষ হচ্ছে। কিন্তু এ-ই আমার মন খারাপের একমাত্র কারণ নয়, ইরাবিজা। আসল কারণ-তোমাকে বোধহয় হারাবো আমি!

-কী? কি বলছো তুমি সারকান? সব ছেড়েছুঁড়ে শুধু তোমার জন্যেই এখানে এসেছি। সেই তোমাকেই যদি ছাড়তে হয়, তবে আর এখানে থাকবো কিসের জন্যে? কেন, কি হয়েছে?

সারকান ধীরে ধীরে বলে, তোমাকে দেখে বাবার লোভ হয়েছে।

ইরবিজা চমকে ওঠে। তাহলে তার আশঙ্কা মিথ্যা নয়। উমরের চোখে ইরবিজা দেখেছিলো লালসারই আগুন–কিন্তু সারকান, এও শুনে রাখো, আমি সম্রাট হারদুবের কন্যা। যতক্ষণ ধড়ে প্রাণ আছে সজ্ঞানে আমার দেহ স্পর্শ করতে পারবে না সে। আমার যুযুৎসুর প্যােচ তুমি দেখেছে, আমার তলোয়ারের মার তোমার অজানা নাই। প্রয়োজন হলে, সে তোমার বাবাই হোক আর যেই হোক, তার সদ্ব্যবহার করতে কসুর করবো না। ও নিয়ে তুমি কোনও দুর্ভাবনা করো না সারকান। নিজেকে রক্ষা করার মতো ক্ষমতা আমার আছে। আমি তোমার বাবার তিনশ একষট্টিতম রক্ষিতা হয়ে আমার জীবন বরবাদ করে দেব না, এ বিষয়ে নিশ্চিন্ত থেকে। তাকে খুশি করার তো মেয়ের অভাব নাই। তবু আমার দিকে তার এই লোভ কেন?

–নেশা। নতুন নারী-সম্ভোগের নেশা তার রক্তের কণায় কণায়, যাই হোক, তুমি একটু সাবধানে থেকে।

এর পর ইরাবিজা। আর সারকান খানাপিনা করলো। সারকান বললো, আমি দিন কয়েকের জন্যে বাইরে যাচ্ছি। ফিরে এসে আবার দেখা করবো।

সারকান প্রাসাদ ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার একটু পরেই উমর আসে। সফিয়ার কামরায়। সফিয়া তার দুই সন্তান নুজাৎ আর দু-আল-মাকানকে নিয়ে প্রাসাদের এই কক্ষে বাস করে। সুলতানকে এই অসময়ে তার কামরায় আসতে দেখে সফিয়া অবাক হয়। যেমন, খুশি হয় তার চেয়েও বেশী।

জাঁহাপনা এ-সময়ে বাদীকে মনে পড়লো।

উমর বলে, তুমি যে কনসতান্তিনোপল-এর সম্রাট আফ্রিদুনের কন্যা, সে কথা আমাকে আগে বলো নি কেন সফিয়া?

— কেন, তাতে কী?

তুমি সম্রাটের কন্যা। তোমার যোগ্য সম্মান আমি তোমাকে দিতে পারিনি। রক্ষিতা করে রেখে তোমার উপর অবিচার করেছি। বেগমের মর্যাদা তোমার প্রাপ্য ছিলো। কিন্তু তোমার পরিচয় আমি জানতে পারিনি, তাই বাঁদী করে রেখেছি।

—আপনি মহানুভব শাহেনশাহ। আমার তো কোনও অসম্মান অমর্যাদাই আপনি করেন নি। বেগম যেইজৎ পায় আপনি কি তার চেয়ে কিছু কমইজৎ করেছেন আমাকে? এই ফুলের মতো দু’টো সস্তান আমাকে উপহার দিয়েছেন। একটা মেয়ের পক্ষে এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কি হতে পারে? আপনি মনে কোন ক্ষোভ রাখবেন না, জাঁহাপনা। দুনিয়াতে আমার মতো সুখী, আমার মতো ভাগ্যবতী কজন আছে?

সফিয়ার কথায় উমর খুশি হয়। নুজাৎ আর দু-আল-মাকানকে কাছে টেনে আদর করে। সফিয়ার হাতে পাথর দু’খানা তুলে দিয়ে বলে, চিনতে পারছো?

পাথর দু’খানা হাতে নিয়ে সফিয়া বলে, হ্যাঁ, কিন্তু আর আধখানা কোথায়, জাঁহাপনা?

—সারকানকে দিয়েছি। এ দু’খানা নুজাৎ আর মাকান-এর গলায় পরিয়ে দাও।

সফিয়া খুশি হয়ে বলে, খুব ভালোই করেছেন। ও পাথর কাছে থাকলে কোন অসুখবিসুখ হয় না। এই পাথর তিনখানা আমার বাবা আমাকে যৌতুক দিয়েছিলেন। আমি সম্রাট হারদুবের হাতে তুলে দিয়েছিলাম। জানি না। আপনার হাতে কি করে এলো?

—তোমার কি ধারণা, সম্রাট হারদুব আমাকে উপহার পাঠিয়েছেন?

—অসম্ভব ছিলো না। কিন্তু শুনেছি, আমার বাবার সঙ্গে সম্রাট হারদুবের এখন শক্রভাব চলছে। আর জাঁহাপনা নাকি আমার বাবাকে সাহায্য করতে সারকগনের সঙ্গে দশ হাজার সৈন্যসামন্ত পাঠিয়েছিলেন। বুঝতে পারছি না, এই অবস্থায়, হারদুবের হাত থেকে পাথর তিনখানা আপনার হাতে এলো কি করে? তবে কি সম্রাট হারদুব পরাজিত।

উমর জবাব দেয়, না, যুদ্ধ তার সঙ্গে হয় নি।

সফিয়া অবাক হয়, তবে?

–সম্রাট হারদুবের কন্যা ইরবিজা এখন আমার হারেমে। এ পাথর তার কাছেই ছিলো। আমাকে সে উপহার দিয়েছে।

–ইরবিজা? সম্রাট হারদুবের একমাত্র সস্তান? সে আপনার হারেমের বাঁদী হয়েছে?

—একটু বাড়িয়ে বললে সফিয়া। সে আমার হারেমে অবস্থান করছে বটে, কিন্তু বাঁদী বা রক্ষিতা কিছুই সে এখনও হয়নি। হয়নি। তবে হবে। এ রকম সুরৎ আর যৌবনের সহাবস্থান এর  আগে আর আমার নজরে পড়েনি। এমন উন্নত আর বড় বড় বক্ষ খুম কম লেড়কিরই দেখা যায়। আর চলার সময় নিতম্ব যে ভাবে দোল খায় আহ্ দেখলেই কলিজা উথলিয়ে উঠে।

—জাঁহাপনা কি তাকে বেগম করে রাখবেন?

–তোমার আপত্তি আছে?

—না, আপত্তি কেন থাকবে! সে সম্রাট হারদুবের মেয়ে, বেগমের ইজৎই তার পাওনা।

–আর তোমার?

সফিয়া বলে, আমাকে আপনি বাঁদী করেই রাখুন। আর রক্ষিতা করেই রাখুন, আমি যে ইজ্জৎ পেয়েছি তাতে আর আমার কোন ক্ষোভ নাই।

উমর বলে, ইরাবিজাকে এখনও কোনও প্রস্তাব আমি দিইনি। হয়তো সে আমার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানও করতে পারে।

সফিয়া বিস্ফারিত চোখে তাকায়।-শাহেনশাহ উমর অল-নুমানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার দুঃসাহস তার হবে কি করে?

উমর বলে, তার মতো তেজস্বী মেয়ের পক্ষে কিছুই অসম্ভব নয়। কিন্তু সফিয়া, তাকে দেখা ইস্তক আমি অস্থির হয়ে উঠেছি। অমন রূপ হয়তো তোমাদের অনেকেরই আছে, কিন্তু ঐরকম উদাম যৌবন আমি কোনও মেয়ের মধ্যে দেখিনি। যেভাবেই হোক তার দেহ আমার চাই-ই। সে যাক, আজ আমি তোমার কাছে এসেছি অন্য একটা প্রস্তাব নিয়ে।

—হুকুম করুন জাঁহাপনা।

–হুকুম নয় নয়। সফিয়া, আদর আর ভালোবাসার উপহার স্বরূপ তোমার জন্যে নতুন এক প্রাসাদের ব্যবস্থা করেছি। এই রক্ষিতামহলে আর তুমি থাকবে না। তুমি আমার নুজাৎ আর মাকান-এর মা। এখন থেকে তুমি আমার বেগম-তোমার যোগ্য মর্যাদায় তুমি থাকবে তোমার নিজের প্রাসাদে! দেওয়ানকে আমি বলে দিয়েছি, তোমার ঘরদের মন মতো করে সাজিয়ে দেবে। দাসী বাদী খোজা যা দরকার সব চাওয়া মাত্র পাবে। তোমার জন্যে দশ হাজার দিনার মাসোহারা মঞ্জুর করেছি।

আনন্দে সফিয়ার চোখ নেচে ওঠে। গর্বে ভরে ওঠে বুক। মুখে বলে, আপনার ভালোবাসা যখন পেয়েছি, প্রাসাদের বিলাস বৈভবে। আর কি প্রয়োজন ছিলো জাঁহাপনা! কিন্তু আপনি দিচ্ছেন, আপনার ভালোবাসার দান আমি মাথা পেতে নেব।

সফিয়াকে প্রাসাদ থেকে অন্য প্রাসাদে সরাবার একটাই উদ্দেশ্য, ইরাবিজার সঙ্গে তার কি সম্পর্ক গড়ে উঠছে তা যাতে সফিয়া জানতে না পারে। প্রতিদিন সন্ধ্যা হতে না হতেই উমর এসে উপস্থিত হয় ইরবিজার ঘরে। নানা কথায় তাকে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করে। বেগম করে রাখবে। সাতমহলা প্ৰাসাদ বানিয়ে দেবে। হীরে জহরতে ভরে দেবে তাকে। কিন্তু ইরাবিজার মন গলাতে পারে না।

-আমি আপনার বেগম হতে আসিনি, জাঁহাপনা। আপনার পুত্র সারকানের সঙ্গী হয়ে থাকতে এসেছি। এতে যদি আপনার অমত থাকে, আমি ফিরে যাবো। আমার বাবার কাছে।

উমর বিমর্ষ হয়ে ফিরে যায়। কামনার আগুনে দগ্ধ হতে থাকে। শেষে একদিন উজির দানাদানকে বলে ইরবিজার এই প্রত্যাখ্যান আমি তো আর সইতে পারছি না উজির। কিভাবে তাকে পাওয়া যায়। তার একটা মতলব বাৎলে দাও।

উজির বলে, সম্রাট হারদুবের রক্ত আছে ওর শরীরে। সহজে সে বশ্যতা স্বীকার করবে, মনে হয় না।

উমর বলে, তবে? তবে কি উপায়?

দানদান ভারিক্কি চালে মাথা দোলায়, অধৈর্য হবেন না জাঁহাপনা। উপায় আমি বাৎলে দিচ্ছি। আজ সন্ধ্যায় যখন তার ঘরে যাবেন সঙ্গে নিয়ে যাবেন খানিকটা ঘুমের ওষুধ। কায়দা করে সরাবের সঙ্গে খাইয়ে দেবেন। তারপর একটু পরে সে যখন ঘুমে ঢলে পড়বে, আপনি ওর ইজ্জৎ নষ্ট করে দেবেন। তারপর পরদিন সকালে সে বুঝতে পারবে, তার কুমারীত্ব নষ্ট হয়ে গেছে। প্রথমে আপনার ওপর সে রুষ্ট হবে। কিন্তু দেখবেন, আস্তে আস্তে জড়তা কেটে যাবে। পরে সে নিজে থেকেই আপনাকে ডেকে পাঠাবে। কিন্তু একটা কথা, কাল থেকে আর তার ধারে কাছে ঘোষবেন না। অপেক্ষা করতে থাকবেন।-সে-ই আপনাকে ডাকবে।

—সাব-বা-স, উমর আনন্দে লাফিয়ে ওঠে, তোমার ফন্দী বেশ চমৎকার, উজির। আমার মনে হচ্ছে, এই চালেই বাজীমাৎ করে দেব।

সন্ধ্যেবেলা উমর এলো ইরবিজার ঘরে। ইরবিজা নিরাসক্তভাবে সুলতানকে স্বাগত জানায়। বলে, বসুন জাঁহাপনা।

উমর বলে, আমি কাল বাইরে যাবো ইরবিজ, তাই আজ তোমার ঘরে একটু বেশিক্ষণ কাটিয়ে যাবার সাধ।

–তা বেশ তো, থাকুন না, যতক্ষণ ইচ্ছে।

— শুধু শুধু আর কতক্ষণ কাটানো যায় বলো, একটু যদি খানাপিনার ব্যবস্থা কর, ভালো হয়।

–এ আর এমন বেশী কি কথা হুজুর। কি খাবেন বলুন, আমি সব ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।

উমর বলে, তোমার যা খুশি, ভালো একটু সরাব দাও, তা হলেই হবে।

সোনার পেয়ালায় দামী সরাব ঢেলে দেয়া ইরবিজা। কিন্তু উমর পেয়ালা হাতে নেয় না।–না, না, সে হয় না। আমি একা একা খাবো না। তুমি না খেলে মৌজ হবে কি করে?

ইরবিজা মৃদু আপত্তি জানায়, সরাব খাওয়া আমার তেমন অভ্যোস নেই।

—সে কি? সম্রাট হারদুবের কন্যা, তায় আবার খ্ৰীষ্টান, সরাব তোমার ভালো লাগে না?

–জী না, উৎসব অনুষ্ঠানে ছাড়া বড় একটা খাই না।

উমর বলে, তা মনে কর না কেন, আজ একটা বিশেষ উৎসবের দিন। কাল আমি বাইরে চলে যাবো। আজ আমাকে না হয় বিদায় সম্বর্ধনাই জানালে।

ইরাবিজা আর আপত্তি করে না।–বেশ, আপনি যখন বলছেন, আপনার সম্মানেই খাবো।

আরও একটা পেয়ালায় সরাব ঢেলে নেয় ইরবিজা। নানা কথার ফাঁকে ফাঁকে টুকটুক করে তিন পেয়ালা সরাব শেষ হয়ে যায়।ইরাবিজা বলে, আজ এই পর্যন্তই থাক জাঁহাপনা, আবার যখন ফিরে আসবেন, আবার একদিন আপনার সঙ্গে খাবো।

উমর বলে, কিন্তু মদের আমেজ তো এখনও লাগেনি ইরবিজা।

ইরবিজা বলে, দামী মদ, নেশা ধরতে একটু সময় লাগবে জাঁহাপনা, তা ছাড়া যত মন্দই খাই না। কেন, বেহেড মাতাল আমি কোনও দিনই হই না। এই তো ভালো হাল্কাগুলাবী নেশা-এতেই তো বেশি আনন্দ পাওয়া যায়।

ইরবিজা ভাবে, সুলতানের মাথায় শয়তানী বুদ্ধি খেলা করছে। সরাবের নেশায় তাকে বেহ্শ করে দিতে চায়। কিন্তু ইরবিজা হাঁদা-বোকা নয়। সবই বুঝতে পারে। এসব পুরোনো কায়দায় তাকে ঘায়েল করা যাবে না।

উমর আবদার ধরে, বেশ আর খাবে না। শুধু আমার অনুরোধে শেষবারের মতো আর এক পেয়ালা। তার অর্ধেকটা আমি খাবো। আর এ পেয়ালাটা আমি তুলে দেব তোমার মুখে। কেমন, রাজি?

অগত্যা ইরবিজা সম্মত হয়। সুলতানের সাধ, তাকে নিজে হাতে মদ ঢেলে মুখে তুলে দেবে।-ইরবিজা মনে মনে ভাবে, তুমি আমাকে যতই তোয়াজ কর, উমর, আমি তোমার খপ্পরে ধরা দিচ্ছি না। নিজে হাতে মদ ঢেলে, মুখে ধরে খাওয়াবো ভাবছো, আমি বুঝি তোমার সোহাগে গলে জল হয়ে যাবো। অত সহজে জল গলবে না, সুলতান। বৃথাই সময় নষ্ট করছো। আর মাদ! কত মদ তুমি খাওয়াতে চাও? সারারাত ধরে খেলেও আমার পাটি লড়বে না।

ঠিক আছে জাঁহাপনা, এই-ই শেষবার। আপনি নিজে হাতে ঢেলে দেবেন, শুধু সেই আনন্দেই না করতে পারলাম না।

সোনার ঝারি থেকে সোনার পেয়ালা পূর্ণ করে সরাব ঢাললো স্বয়ং সুলতান উমর অল-নুমান। নিজে আগে চুমুক দিয়ে খায় খানিকটা। শেরওয়ানীর পকেট থেকে ঘুমের বডিটা বের করে ইরবিজার অলক্ষ্যে টুক করে পেয়ালার মধ্যে ফেলে দেয়। তারপর পেয়ালাটা ইরবিজার ঠোঁটে ধরে বলে,

—নাও, চুমুক দিয়ে খেয়ে ফেলো।

ইরবিজা কোন আপত্তি করে না। উৎফুল্লও হয় না। নির্বিকার ভাবে এক চুমুকে নিঃশেষ করে দেয়।

সুলতান-এর চোখে শয়তানীর হাসি ঝিলিক দিয়ে ওঠে, বাঃ এই তো কেমন লক্ষী মেয়ে! নাও, চলো, এবার খানা সেরে নিই।

দু’জনে খাবার-এর টেবিলে গিয়ে বসে। নানা রকম শাহী খানায় সারা টেবিল জোড়া। মতিয়া এগিয়ে এসে রেকল্পবী পেতে দেয়। সুলতান হাতের ইশারায় তাকে বাইরে চলে যেতে বলে।, আজ আমি নিজে হাতে ইরবিজাকে পরিবেশন করবো। আরিরবিজা খানা সাজিয়ে দেবে আমার রেকবী ভরে। তোমরা সব বাইরে চলে যাও। কেউ থাকবে না ঘরে।

ইরবিজা দেখলো, সুলতান-এর কথা জড়িয়ে আসছে। মদের নেশা বেশ ধরেছে।–আপনি কিছু ভাববেন না, জাঁহাপনা, সবাইকে আমি বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছি। ঘরে আছি এখন শুধু আমি আর আপনি। আমি আপনাকে খাওয়াবো, আর আপনি আমাকে খাওয়াবেন। এর মধ্যে ওরা থাকবে কেন?

—তুমি ঠিক বলেছে, ইরবিজা। তোমার আমার মধ্যে ওরা থাকবে কেন?

ইরবিজা ভাবলো, মদের নেশায় তাকে বেহুঁস করতে এসে বাছাধন যে নিজেই নেশায় বুঁদ হয়ে পড়লো? কিন্তু নেশা হলে কি হবে, এখনও জ্ঞানের নাডি টনটনে। ঘর থেকে সবাইকে বিদেয় করে দিতে চায়। অর্থাৎ একঘরে উদ্দোম নেশায় আমি তাকে জড়িয়ে ধরে বিছানায় ঢলে পড়বো, এই তার বাসনা। ইরবিজার হাসি পায়। মাগীবাজ সুলতানের আশা কত? এক টুকরো মোরগমসাল্লাম ছিঁড়ে নিয়ে সুলতানের মুখে পুরে দেয় ইরবিজা।

—বাঃ বেড়ে, মজাদার পাকিয়েছে তো? তুমি খাও? এই নাও, খাও।

সুলতান নিজে হাতে একটু মাংস পুরে দেয় ইরবিজার মুখে। কিন্তু মাংসটা আর মুখে রাখতে পারে না। মাথাটা কেমন ঝিম ঝিম করে ওঠে। সুলতান দেখলো, বিষের ক্রিয়া শুরু হয়েছে। কয়েক মুহুর্তের মধ্যেই ইরবিজার মাথাটা সামনে ঝুলে পড়ে। এবার হয়তো কুর্শি থেকে নিচে গড়িয়ে পড়ে যেতে পারে। পাঁজাকোলা করে ইরবিজার দেহটা তুলে এনে শয্যায় শুইয়ে দেয় উমর।

খানিক পরে ঘর থেকে বেরিয়ে ঝড়ের বেগে প্রাসাদ ছেড়ে চলে যায় সুলতান। মতিয়া ঘরে ঢুকে দেখে, ইরবিজা বিবস্ত্ৰা। মড়ার মতো অসাড় নিস্পন্দ তার দেহটা এলোমেলো শয্যায় নেতিয়ে পড়ে আছে। ভীত সস্ত্বস্ত হয়ে কাছে আসে। বুকে হাত রেখে অনুভব করে—না, বুকের স্পন্দন ঠিকই আছে। তার কোনও হ্রস নাই। মুখ দিয়ে গ্যােজলা উঠছে। কি বিশ্ৰী ওষুধ খাইয়ে সর্বনাশ করে গেছে। গায়ের জামাকাপড় সংযত করে একখানা শাল চাপা দিয়ে দেয় মতিয়া।

সকালবেলা ঘুম ভেঙে গেলে ইরবিজা বুঝতে পারে, কাল রাতে কি যেন ঘটে গেছে। তলপেটটায় বেশ ব্যথা হয়েছে। মতিয়া কাছে আসে। ওর চোখে জল।

–কি রে, মতিয়া, কাঁদছিস কেন?

মতিয়া কথা বলে না। ইরাবিজাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে। ইরবিজা বুঝতে পারে না। অবাক হয়। উঠে বসে ওকে আরও কাছে টেনে নিয়ে জিজ্ঞেস করে, কি হয়েছে বলতো?

মতিয়া কথা বলতে পারে না। ইরবিজার ছিন্নভিন্ন সেমিজটা আঙুল দিয়ে দেখায়—রক্তের দাগ।

চমকে ওঠে ইরবিজা। দাঁতে দাঁত চেপে শুধু বলতে পারে, শয়তান—

তারপরই হাউমাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়ে। মতিয়া বলে, গতকাল রাতে আপনাকে সরাবের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে দিয়ে এই সর্বনাশ করে গেছে সুলতান।

ইরবিজা ক্ৰোধে ফেটে পড়ে। পালঙ্কের বাজুতে মুষ্ঠ্যাঘাত করে বলে, এর বদলা চাই।

কিন্তু কি করে বদলা আপনি নেবেন, মালকিনা! সে সুলতান। আর আপনি তারই হারেমে আশ্রিতা।

—আশ্রিতা, কিন্তু আমি তার বাদী রক্ষিতা নাই। সে ভেবেছে, অত সহজেই পার পেয়ে যাবে? আমার বাবা সম্রাট হারদুব। ওর সালতানিয়তে ঘুঘু চরিয়ে ছেড়ে দেবে সে।

মতিয়া শান্ত করার চেষ্টা করে।—আপনি চুপ করুন, রাজকুমারী। চারদিকে সুলতানের চর আছে। আমাদের কথা শুনতে পেলে বিপদ বাড়বে। তার চেয়ে আমি বলি কি, ঠাণ্ডা মাথায় মতলব আঁটুন। সুলতানকে কি করে এর সমুচিত শিক্ষা দেওয়া যায় তার উপায় ভাবুন।

ইরবিজা মাথা নাড়ে, তুই ঠিকই বলেছিস মতিয়া। মাথা গরম করলে সব ভেস্তে যাবে। ঠাণ্ডা মাথায় ভাবতে হবে। আচ্ছ এক কাজ কর, দরবারে খবর পাঠিয়ে দে আমার শরীর খুব খারাপ। এখন আমি কিছুদিন সুলতানের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ করবো না।

ইরবিজা এক এক নিজের ঘরে দিন কটায়। একমাত্র মতিয়া তার সঙ্গী। আর কারো সঙ্গে দেখা করে না। মাস দুই পরে ইরবিজা বুঝতে পারে, সে সন্তান-সম্ভবা। কান্নায় ভেঙে পড়ে। মতিয়াকে বলে, এখন কি হবে মতিয়া? সারকান শহরে নাই। এখন কি করি আমি।

মতিয়া পরামর্শ দেয়, যেভাবেই হোক, এখান থেকে পালাতে হবে, রাজকুমারী।

–কোথায় যাবো?

—আমরা আবার সিসারিয়াতেই ফিরে যাবো।

কিন্তু বাবা যদি আমার প্রতি বিরূপ থাকেন? তা হলে কি হবে?

মতিয়া বলে, তা থাকতে পারেন না। তিনি। আপনি তার একমাত্র সন্তান। মেয়ে বলতেও আপনি, ছেলে বলতেও আপনি। আপনাকে না দেখে তিনি কি সুখে দিন কাটাচ্ছেন, আপনার ধারণা? আর তা ছাড়া সুলতান উমর আপনার উপর বলাৎকার করেছে শুনলে তিনি বাবা হয়ে কখনও চুপ করে থাকতে পারেন? তার ক্ৰোধে মেদিনী কঁপে-আপনি কি জানেন না? এই শয়তানীর সমুচিৎ সাজা তিনি উমরকে দিতে কসুর করবেন না।

–তুই ঠিকই বলেছিস, মতিয়া। বাবার রাগ বড় চণ্ডালী? তার প্রতিজ্ঞা বড় মারাত্মক। তিনি যদি একবার পণ করেন, উমর-এর সর্বনাশ করবেন, তা তিনি করবেনই। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে—এই প্রাসাদপুরী থেকে পালাবো কি করে! কোনও পুরুষ মানুষের সাহায্য ছাড়া এতটা পথ যাবেই বা কি করে। লোকে সন্দেহ করবে না?

মতিয়া বলে, আপনি একটু ধৈর্য ধরুন রাজকুমারী, আমি ব্যবস্থা করছি। প্রাসাদের দ্বাররক্ষীদের একজন নিগ্রো। পয়সার উপর লোকটার খুব লোভ। ওকে যদি টোপ ফেলা যায় ও গিলবে। আর ও ব্যাটা যদি আমাদের সঙ্গে থাকে, তাহলে পথে ঘাটে কেউ ধারে কাছে ঘেঁসতে পারবে না।

ইরবিজা বলে ঠিক বলেছিস। নিগ্রো সঙ্গে থাকলে সাধারণ লোক সাত হাত দূরে দিয়ে চলবে। তুই ওকে ভজাবার চেষ্টা কর। বলবি নোকরীর জন্য কিছু ভেবো না। সারাজীবন সুলতানের প্রাসাদের দ্বাররক্ষী থেকে যা রোজগার করবে। তার দশগুণ টাকা তোমাকে একসঙ্গে দিয়ে দেব। শুধু তুমি সিসারিয়া পর্যন্ত পৌঁছে দেবে। তারপর তোমার পয়সা কডি নিয়ে দেশে গিয়ে বাস করবে। সুলতান উমর তোমার। একগাছি চুলও ছিঁড়তে পারবে না।

পরদিন মতিয়া এসে বলে, নিগ্রোটারাজি হয়েছে, রাজকুমারী। আগামী জুম্মাবার নামাজ শেষ করে সুলতান শিকারে যাবে। সেইদিন সন্ধ্যাবেলা আমরা দুজনে খিড়কীর দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাবো। নিগ্রোেটা ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকবে তিনটে খচ্চর নিয়ে। শুধু বলে দিয়েছে, তুমি খুব সাধারণ সাজ পোশাকে সাজবে লোকে দেখে যাতে মনে করে, একটা সাধারণ দাসী বাদী।

শুক্রবার দিন সন্ধ্যাবেল খিড়কীর দরজার পাশে তিনটি খচ্চর নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে নিগ্রোটা। ভাবে; ভালো একটা মওকা পাওয়া গেছে। সম্রাট হারদুবের মেয়ে, খুবসুরৎ লেড়কী। হীরে জহরৎও অনেক পাওয়া যাবে। ভালো করে দেহের ক্ষিদেটাও মিটিয়ে নিতে পারবো।

কিছুদিন ধরেই ইরবিজার শরীরটা একেবারে কাহিল হয়ে পড়েছে। কিছুই খেতে পারে না। যা খায় বমি হয়ে যায়। সারা শরীর গুলিয়ে যেতে থাকে। মতিয়া বলে, ওতে ভয়ের কিছু নাই। এ সময় ও রকম হয়। আবার কয়েকদিন বাদেই দেখবেন, সব ঠিক হয়ে গেছে।

–কিন্তু মতিয়া, শরীরে আমি কোনও জোর পাচ্ছি না রে। মনে হচ্ছে ছ’মাসের রুগী।

–এ কোনও অসুখ নয়, রাজকুমারী। পেটে বাচ্ছা এলে প্রথম প্রথম সব মেয়েরই এরকম হয়। নিন তৈরি হয়ে নিন, নিগ্রোটা বোধহয় এসে দাঁড়িয়ে আছে।

মতিয়া ওকে সাধারণ সাজ পোশাক পর্যায়। একটা মাঝারি গোছের অতি সাধারণ বাক্সে ভরে সব হীরে জহরতের গয়নাগাটি। সবারই অলক্ষে আস্তে আস্তে খিড়কীর দরজার কাছে চলে আসে। তিনটে খচ্চর নিয়ে দাঁড়িয়েছিলো নিগ্রোটা। বলে, বহুৎ দেরি করলেন, লিন, চটপট উঠে। পড়ুন।

কৃষ্ণপক্ষের মাঝামাঝি। আকাশে তখনও চাঁদ ওঠেনি। অন্ধকার পথ। গা ছমছম করে নিগ্রোটা বলে, কোন ভয় নাই, লাগামটা শক্ত করে চুপচাপ বসে থাকুন। কোনও শালা কাছে ঘেঁসিতে সাহস পাবে না। আর যদি কেউ হামলা করতে আসে, আমার এক এক কোপে সাবাড় করে দেব সব। মাঝরাত বরাবর আসমানে চাঁদ উঠবে। তখন আর পথ চলতে কষ্ট হবে না।

নিঝুম নিস্তব্ধ অন্ধকার রাত্রি। খচ্চর তিনটের পায়ের শব্দ ছাড়া আর বিশেষ কিছুই কানে আসে না। মাঝে মাঝে হয়তো বা কোনও রাত জাগা পাখির আওয়াজ, কিংবা শেয়ালের ডাক ভেসে আসছে। অনেক মাঠ ঘাট জঙ্গল পেরিয়ে চলতে থাকে ওরা। রাত্রি দ্বিতীয় প্রহরের সময় আকাশে ভাঙ্গা চাঁদ দেখা গেলো। ইরাবিজা বললো, মতিয়া, শরীরটা বড়ই খারাপ করছে রে, রাতের মতো কোথাও বিশ্রাম করলে হয় না?

নিগ্রোটা বললো, এই বাঁকটা পেরোলেই একটা বাগান পাওয়া যাবে। ওখানে গাছের তলায় রাতটা কাটিয়ে লিন। তারপর আবার ভোরবেলা রওনা হওয়া যাবে।

মতিয়া বললো, তাই করো।

একটু পরেই নিগ্রোটা বললো, এইখানে নেমে পড়ুন আপনারা।

ইরাবিজা আর মতিয়া নেমে পড়ে। একটা গাছের তলায় চাঁদর বিছিয়ে মতিয়া বলে, এখানে একটু শুয়ে ঘুমিয়ে নিন, রাজকুমারী। আমি জেগে আছি।

ইরবিজার শরীর এলিয়ে পড়েছিলো। আর দ্বিরুক্তি না করে শুয়ে পড়লো। মতিয়াও পাশে বসে ঝিমাতে লাগলো। হঠাৎ একটা বিদঘুটে আওয়াজে দুজনেরই তন্দ্ৰা ছুটে যায়। ধড়মড় করে উঠে বসে ইরবিজা। দেখে মতিয়া ভয়ে কাঁপছে।

সামনে দাঁড়িয়ে সেই নিগ্রোটা। দৈত্যের মতো চেহারা। একেবারে উলঙ্গ। মুখে তার শয়তানের হাসি। হাতে শাণিত তলোয়ার।

একা একা শুয়ে শুয়ে রাত কাটবে। তাতো হবে না রাজকুমারী! আজি আমি তোমার লাগব হবে। কেন, আমাকে দেখে কি পছন্দ লয়! নাকি সতীপনা করছে? তা বাবা সুলতান উমর তো তোমার সতীপনা খতম করে দিয়েছে।

—চোপ রাহ, বেয়াদপ!

ইরবিজা গর্জে ওঠে। নিগ্রোটা কিন্তু চুপ করে না। ভয়ও পায় না। বলে আ–হা, অত চট্টছে। কেন, মালকিন। চটে কোনও লাভ নাই। এখানে তোমার কোনও বাপ বাঁচাতে আসবে না। যা বলছি ভালো মেয়ের মতো শোনো। তা না হলে এই যে দেখছে—

ইরাবিজা রাগে থর থর করে বলে, শুয়ার কা বাচ্চা! ও দিয়ে আমাকে কন্তুজায় আনতে পারবি না।

ইরবিজা হাঁপাতে থাকে। একে অসুস্থ শরীর। তায় এই উত্তেজনা। মনে হয় এখুনি বুঝি টলে পড়ে যাবে সে। মতিয়া ওকে জাপটে ধরে। আপনি উত্তেজিত হবেন না, রাজকুমারী। শান্ত হোন। লোকটা যে এমন শয়তান তাতো ঘৃণাক্ষরেও বুঝতে পারিনি।

নিগ্রোটা আবার হুঙ্কার দিয়ে ওঠে, কই কি হলো? সোজা আঙ্গুলে ঘি উঠবে না দেখছি।

ইরবিজা উঠে দাঁড়ায়। সারা শরীর কাঁপতে থাকে। একটা পাথরের চাই পড়েছিলো পাশেই। তুলে নিয়ে ছুঁড়ে মারতে চেষ্টা করে।–শয়তান, ভেবেছিস, তলোয়ারের ভয় দেখিয়ে সর্বনাশ করবি। তা কিছুতেই হবে না।

যে হাতে একদিন গন্ধমাদন পর্বত উপড়ে ফেলার ক্ষমতা ছিলো, সেই হাতে আজ সে সামান্য পাথরের ঢেলা ছুড়তে পারলো না। ব্যর্থতার আক্রোশে দিশেহারা হয়ে ঘুষি বাগিয়ে সে নিগ্রোটার দিকে ছুটে যায়।-মেরেই ফেলবো, হারামজাদাকে।

কিন্তু মারা আর হলো না। নিগ্রোর তলোয়ারের ফলা আমূল বিদ্ধ হয়ে গেলো তার বুকে। সেই নিশুতি নিস্তব্ধ নির্জন রাতে ইরবিজার রক্তাক্ত দেহ ধুলায় লুটিয়ে পড়লো। এইভাবে কুড়িতেই বিনষ্ট হয়ে গেলো তার অমূল্য জীবন।

নৃশংস ভাবে নিহত হলো। এইভাবে অকালে বিনষ্ট হয়ে গেলো, ফুলের মতো সুন্দর একটা জীবন।

ইরবিজার যা কিছু ধনরত্ন ছিলো, সব নিয়ে নিগ্রোটা পাহাড়ের পথে উধাও হয়ে গেলো। মতিয়া বসে বসে কাঁদতে থাকে। এমন সময় দেখা গেলো, সারা আকাশবাতাস কাঁপিয়ে এক অশ্বারোহী বাহিনী ছুটে আসছে। আর একটু কাছে আসতেই মতিয়া সৈন্যবাহিনীর সাজ পোশাক দেখে বুঝতে পারলো, সিসারিয়া সম্ব্রাট হারদুনের বাহিনী। মনে কিছুটা ভরসা পায়। উঠে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে ইশারা করতে থাকে। হারদুব এসে থেমে পড়ে। ইরবিজার রক্তাপুত দেহ দেখে ঘোড়া থেকে লাফ দিয়ে নেমে আসে।-কে? কে করলে আমার এই সর্বনাশ?

বাগদাদের সুলতান উমর-ইল-নুমানের ক্রীতদাস এক নিগ্রোর হাতে কি ভাবে ইরবিজা নিহত হয়েছে এবং সুলতান উমর তাকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে কি জঘন্য উপায়ে তার উপর বলাৎকার করেছে, সব সবিস্তারে বললো মতিয়া।

সম্রাট হারদুব রাগে গর্জে ওঠে, হুম। এতো বড় স্পর্ধা, তোমার উমর! আমার মেয়েকে বাদী রক্ষিতা পেয়েছে? এর প্রতিদান তোমাকে পাই পাই করে করে মিটিয়ে দেব। কিন্তু তার আগে আমার আদরের দুলালীর শেষকৃত্য সমাধা করতে হবে।

সারকানের হাতে হারদুবের একশত সৈন্যসামন্ত নিহত হওয়ার পর বাঁদী সর্দারনী সে বুড়িটার মুখ থেকে যখন হারদুব শুনলো, বাগদাদের সুলতান-এর পুত্র সারকান ইরবিজাকে তুক তাক করে ভুলিয়ে তার দেশে নিয়ে গিয়ে উমরের বাঁদী করে রেখেছে, হারদুব তখন এই অপমানের প্রতিশোধ নেবার জন্য এক বিশাল অশ্ব বাহিনী নিয়ে বাগদাদের দিকে ধাবমান হচ্ছিলো। পথিমধ্যে এই অভাবনীয় দৃশ্য দেখে শোকে দুঃখে মুহ্যমান হয়ে পড়লো সিসারিয়ার সম্রাট হারদুব তার সেনাপতিদের নির্দেশ দিলো, আগে রাজকুমারীর মৃতদেহ যথাযোগ্য মর্যাদায় সমাহিত করতে হবে। তারপর শায়েস্তা করার ব্যবস্থা করা যাবে।

সুতরাং সম্রাট হারদুব আপাততঃ আক্রমণ স্থগিত রেখে কন্যার মৃতদেহ নিয়ে দুর্গে ফিরে এলো। বাদী সর্দারনী বুড়ি কেঁদে আকুল।—হায় হায়, আমার সোনার বাছার এই হাল কে করলো?

সম্রাট হারদুব বলে, কে আবার, সেই সাচ্চা মুসলমানের বাচ্চা-উমর। শয়তানটা আমার মেয়ের উপর বলাৎকার করেছে। আর তারই ক্রীতদাস দিয়ে হত্যা করিয়েছে। এও তোমাকে বলে রাখছি, সর্দারনী, এর প্রতিশোধ আমি নিজে হাতে নেবো। দেখবো, সুলতান উমর কত বড় শাহেনশাহ! বাদী সর্দারনী বলে, -সম্রাট আপনি অধৈর্য হবেন না। উত্তেজিত হয়ে প্রতিশোধ নিতে গেলে কার্যসিদ্ধি হবে না। প্রতিশোধ নিতে হয়। ঠাণ্ডা মাথায়। মুসলমানরা বলে, শত্রু যখন সব ভুলে নিজেকে অসতর্ক অরক্ষিত করে রাখবে সেই সুযোগে তাকে আক্রমণ করে কাজ হাসিল করো। দরকার হলে এই সুযোগের জন্য চল্লিশ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে। শয়তানটাকে কি করে সমুচিত শিক্ষা দিতে হয় আমি আপনাকে দেখিয়ে দেব। সারা পৃথিবীর লোক অবাক হয়ে তারিফ করবে, হ্যাঁ এর নাম বদলা। আমি ওকে সবংশে নিধন করবো। শুধু আমি যা বলি, ভালো করে শুনুন এবং আমাকে সাহায্য করুন। প্রথমে আপনার সারা সাম্রাজ্য খুঁজে গোটা পাঁচেক সুন্দরী কিশোরী সংগ্রহ করুন। তাদের শিক্ষা দীক্ষার জন্যে সবচেয়ে সেরা জনা কয়েক মুসলমান শিক্ষক দরকার। আপনার সাম্রাজ্যে তার অভাব নাই। এই শিক্ষকগুলোর কাজ হবে এই মেয়েগুলোকে তালিম দিয়ে পাক্কা মুসলমানী আদব কায়দায় গড়ে তোলা। আরব ইতিহাস তাদের নখদর্পনে থাকবে। খলিফাদের চৌদ্দ পুরুষের ঠিকুজি কুষ্ঠি মুখস্থ থাকবে। কথাবার্তা চালচলন আদিবাকায়দা নাচ-গান খানা-পিনা রীতি-নীতি আচার আচরণ সব এমন ভাবে তাদের রপ্ত করাতে হবে যাতে কেউ না সন্দেহ করতে পারে-তারা খানদানী মুসলমান ঘরের মেয়ে নয়। এই সব শিক্ষা-দীক্ষা দিতে যদি দশ বছরও সময় লাগে, লাগবে। তবু চুল-চেরা নিখুত নিখাদ হওয়া চাই। কারণ এই মেয়েগুলোই আমার প্রতিশোধ নেবার একমাত্র হাতিয়ার। আপনি বোধ হয় জানেন সম্রাট, ওই অসভ্য জংলী সুলতানটা দাসী বাঁদীদের সঙ্গে ব্যভিচার করে। শুনেছি, তার হারেমে নাকি বেগম ছাড়াও তিনশো ষাটটি রক্ষিতা আছে। সারা বছর ধরে প্রতি রাতে এই জানোয়ারটা এক একটি রক্ষিতার মাংস ছিঁড়ে ছিঁড়ে খায়। এখন আবার সোনায় সোহাগা হয়েছে আমাদের রাজকুমারী ইরবিজ, সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলো একশোটা কুমারী। এখন তারাও ভোগের সামগ্ৰী হয়ে দাঁড়িয়েছে। জানোয়ারটার ভোগলালসার চরম নিবৃত্তি কেমন করে মেটাতে হয় আপনি দেখবেন।

সম্রাট হারদুব-এর মনটা কিছু হাল্কা হয়। বাদী সর্দারনীকে সাবাস জানিয়ে বলে আজই তোমাকে পাঁচটা স্বাস্থ্যবতী সুন্দরী কিশোরী পাঠিয়ে দিচ্ছি। এমন মেয়ে পাঠাবো, কালে যাতে তারা রগরগে যুবতী হতে পারে।

সম্রাট হারদুব পাঁচটি সুন্দরী মেয়ে আর তাদের মুসলমানী কেতায় মানুষ করার জন্যে পাঁচজন চৌকস মৌলভী পাঠিয়ে দিলো। বাদী সর্দারনীর তত্ত্বাবধানে থেকে মেয়েগুলোর শিক্ষাদীক্ষার কাজ শুরু হলো।

এদিকে সুলতান উমর-আল-নুমান শিকার শেষে প্রাসাদে ফিরে শুনলো, ইরবিজা নাই। এতো কড়া পাহারা ফাঁকি দিয়ে সে কিভাবে পালাতে পারলো ভাবা যায় না। সুলতান উমর-এর হুঙ্কারে প্রাসাদ কেঁপে ওঠে, আমার প্রাসাদ থেকে সে পালিয়ে গেলো, আর তোমরা তা দেখতে পেলে না? আমি বাইরে বেরিয়ে যাওয়া মাত্র কি তোমরা সব নাকে তেল দিয়ে ঘুমিয়ে পড়! জবাব দাও। চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলে কারো রেহাই নাই। এক এক করে সবগুলোকে আমি কোতল করবো। কোনদিন হয়তো এসে দেখবো, আমার সিংহাসনটাই চুরি গেছে। আশ্চর্য।

দ্বার রক্ষীরা ঠকঠক করে কাঁপতে থাকে। এই বুঝি গর্দান নেবার হুকুম হয়। একজন সাহস করে এগিয়ে আসে, জাঁহাপনা, ইয়ে মানে—আমাদের গিয়ে-ইয়ে মানে-মানে।

-ওরে হতভাগা যা বলবি চটপট বল, ‘ইয়ে মানে-ইয়ে মানে’ করছিস কেন?

—না মানে হুজুর মানে–আমাদের মানে!

–থাম বেল্লিক, আর মানে মানে করে কাজ নাই! সোজা আরবী ভাষায় বল দিকিনি, কি বলতে চাস?

—মনে হুজুর নিগ্রো—

–কি বললি, আমি নিগ্রো?

–না মানে হুজুর ঐ নিগ্রোটা।

—কোন নিগ্রোটা?

—ওই যে হুজুর, দ্বাররক্ষী নিগ্রোটা—ওরই সঙ্গে সাট করে পালিয়েছেন উনি। মানে—গিয়ে সরষের মধ্যেই ভূত।

উমর-আল-নুমান বুঝলো, দ্বাররক্ষী নিগ্রোটার সঙ্গে যোগসাজস করে ইরবিজা পালিয়েছে।

সারকান শহরে ছিলো না। সে-ও ফিরে এসে শুনলো, ইরবিজা নিরুদ্দেশ হয়েছে। সুলতান তার উপর বলাৎকার করেছে। বাবার এই ব্যবহারে সারকান ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়। মেয়েদের নিয়ে তার এই ছিনিমিনি খেলা কিছুতেই সহ্য করতে পারে না। ইরবিজার জন্যে মনটা হু হু করতে থাকে। বেচারী মনের দুঃখে প্রাসাদ ছেড়ে কোথায় গেলো? তারই কথায় সে বাগদাদে এসেছিলো। উচিত ছিলো তাকে রক্ষা করা। কিন্তু পারেনি। নিজেকে বড় অপরাধী মনে হয়। ক্রমশই বাবার ওপর মনটা বিষিয়ে ওঠে। সারকান ঠিক করে, এখানে আর সে থাকবে না। এই প্রাসাদপুরী তার কাছে পাপপুরী বলে মনে হয়।

সুলতান উমর লক্ষ্য করে, সারকান আর সে-সারকান নাই। মুখের হাসি মিলিয়ে গেছে, কারো সঙ্গে ভালো করে কথাবার্তা বলে না। সব সময় কেমন মনমরা হয়ে থাকে। একদিন সারকানকে কাছে ডেকে উমর জিজ্ঞেস করে, আচ্ছা বেটা, তোমাকে এমন বিষণ্ণ দেখছি কেন? সারকান বলে, আব্বাজান, আমি আর এই প্রাসাদে থাকতে চাই না। আপনি আমাকে অন্য কোথাও পাঠাবার ব্যবস্থা করুন।

— কোথায় যেতে চাও?

—আপনার সালতানিয়তের যে-কোন একটা সুবায় আমাকে পাঠিয়ে দিন। আমি সেখানেই গিয়ে থাকবো।

সুলতান উমর বললেন, আমার সুবার মধ্যে সবচেয়ে সেরা দামাসকাস। নানাদিক থেকে দামাসকাসের গুরুত্ব অনেক বেশি। তোমার যদি পছন্দ হয়, ওখানকার সুবাদার হয়ে তুমি যেতে পারো।

সারকগনের তখন এমন মানসিক অবস্থা, বাগদাদ ছেড়ে পালাতে পারলে বেঁচে যায়। বললো, আমি রাজি, জাঁহাপনা। আপনি ব্যবস্থা করে দিন, আমি আর বিলম্ব করতে চাই না।

সুলতান উজির দানাদানকে নির্দেশ দিলো, সারকান দামাসকাসের সুবাদার হয়ে যাবে। তুমি তার যাত্রার আয়োজন কর।

সারকান দামাসকাসে পৌঁছলে বিপুল সম্বর্ধনা করে স্বাগত জানালো প্রজারা। শহরের বড় বড় রাস্তার মোড়ে তোরণদ্বার তৈরি করা হয়েছিলো। আলোর মালায় সাজানো হয়েছিলো সারা শহর। আনন্দ উৎসবে মুখর হয়ে উঠেছিলো দামাসকাস।

সারকান বিদায় নেবার পর উমর-আল-নুমান তার কন্যা নুজাৎ আর পুত্র দু-আল-মাকানের খোঁজ খবর নিয়ে জানিলো, তারা পড়াশুনা করে যথেষ্ট জ্ঞান সঞ্চয় করেছে। বৃদ্ধ মৌলভী সাহেব বললেন, জাঁহাপনা, আমার যা কিছু শেখাবার ছিলো, সবই তাদের শিখিয়ে দিয়েছি। ধর্ম সাহিত্য দর্শন বিজ্ঞানে তারা দুজনেই যথেষ্ট বুৎপত্তি লাভ করেছে। আমার বিবেচনায় পুঁথিগত বিদ্যার পাঠ তাদের শেষ হয়েছে।

সুলতান-উমর শুনে খুশি হয়ে মৌলভীকে মূল্যবান বস্ত্ৰাদি এবং প্রচুর অর্থ পুরস্কৃত করে বিদায় দিলো।

এই সময় নুজাৎ আর দু-আল-মাকান-এর বয়স চৌদ্দ বছর। তাদের বিদ্যাবুদ্ধির কথা বাগদাদ শহরে ছড়িয়ে পড়লো। বহু জ্ঞানী গুণী ব্যক্তি প্রশংসায় পঞ্চমুখ হতে লাগলো। গর্বে সুলতানের বুক ফুলে উঠলো।

একদিন কিশোর দু-আল-মাকান প্রত্যক্ষ করলো, একদল হজ যাত্রী বাগদাদ শহরের ভিতর দিয়ে মিছিল করে চলেছে। পাশ্বচরকে জিজ্ঞেস করতে সে জানলো, ওরা সব ইরাক থেকে আসছে। যাবে মক্কায়। প্রতি বছর মক্কায় যে হাজ মেলা হয়। সেই মেলায় গিয়ে আল্লাহর নাম গান করবে। তারপর ওরা যাবে মন্দিনায়-যেখানে পয়গম্বর মহম্মদের সমাধি ক্ষেত্র।

দু-আল-মাকানের নিষ্পাপ কিশোর চিত্ত উদ্বেলিত হয়ে ওঠে। সে বলে, আমিও যাবো।

পার্শ্বচর বোঝায়, আপনি তো এখনও নাবালক, হুজুর। সাধারণত, মানুষ সব ভোগ-লালসা বিসর্জন দিতে যায়। সেখানে। কিন্তু আপনার তো এখনও জীবনের শুরুই হয়নি। এখনই সেখানে যাবেন কেন?

দু-আল-মাকান কিন্তু সে কথায় ভুলতে চায় না।–না, আমি যাবো। পার্শ্বচর বলে, আপনি সুলতানকে জানান, তিনি যদি মত দেন, গিয়ে দেখে আসবেন।

কিন্তু সুলতান উমরও সেই কথাই বলে, দূর বোকা ছেলে, ওখানে তুই যাবি কেন? সংসারের সবকিছু দেখা শোনা শেষ হলে, সব কামনা বাসনার পূর্ণ হলে তবে মানুষ যায় মক্কায়। সেখানে গেলে সংসার-এর মায়া বন্ধন আর মানুষকে আকৰ্ষণ করে না।

দু-আল-মাকান তবু বায়না ধরে, না। আমি যাবো।

সুলতান দেখলো, ছেলেকে কিছুতেই ভোলানো যায় না। বললো, সেখানে তো তুমি এক একা যেতে পারবে না, বাবা। সামনের বছর আমি তোমাকে সঙ্গে নিয়ে যাবো।

মাকান আব্দার ধরে, না, আব্বাজান, তুমি এই বারেই চলো।

উমর-আল-নুমান ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বোঝাবার চেষ্টা করে, এখন আমার হাতে অনেক জরুরী কাজ বাবা। এ বছর যাওয়া হবে না। আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি, সামনের বার নিয়ে यi(दां।

–আল্লাহর উদ্দেশে যাওয়ার চেয়ে আবার অন্য কোনও জরুরী কাজ থাকতে পারে নাকি, আব্বাজান?

উমর-আল কি করে বোঝায়, পুঁথিতে যে-সব কথা লেখা থাকে তা-ই সব নয়। কিন্তু ছেলের কথার জুৎসই জবাবও দিতে পারে না। শুধু বলে, এখন তুমি মার কাছে যাও বাবা, আমি তোমাকে পরে নিয়ে যাবো।

কিশোর মাকান। কিন্তু শান্ত হয় না। তার মাথায় তখন এক চিন্তা। মক্কা যেতে হবে। আল্লাহর পয়গম্বর মহম্মদের পবিত্ব পদধূলি মিশে আছে মক্কার পথে ঘাটে। সেই মাটি মাথায় ধরণ করে সার্থক হবে সে। সারা রাত বিনিদ্র রজনী কাটে। যেভাবেই হোক-মক্কায় সে যাবেই। সকালে বোন নুজাৎকে বলে, আমার মন বড় চঞ্চল হয়েছে দিদি, আমি মক্কায় যাবো। কিন্তু কি করে যাবো রে!

নুজাৎ বলে, আমারও খুব যেতে ইচ্ছে ভাই। কিন্তু বাবা-মা কেউই রাজি হবে না।

মাকান বলে, চল, পালিয়ে যাই।

—পালিয়ে যাবো? কেমন করে?

মাকান বুদ্ধি বাৎলায়, তুই কিছু ভাবিস নি, দিদি। আমি তোকে নিয়ে যাবো। তুই বরং এক কাজ কর। মার বাক্স থেকে কিছু টাকা পয়সা আর কিছু সাজ-পোশাক হাতিয়ে নে। দেখিস কেউ যেন না টের পায়। দু’টো উট ভাড়া করে আমরা হজ-যাত্রীদের মিছিলে সামিল হয়ে যাবো। তাহলেই দেখবি একদিন মক্কায় পৌঁছে গেছি।

নুজাৎ বলে, কিন্তু আমি মেয়েছেলে, সবে আমার যৌবন আসছে। এই সময় পথে ঘাটে অনেক বিপদ-আপদ ঘটতে পারে।

মাকান বলে, তোর মাথায় কিছু বুদ্ধি নাই। তুই আমার সাজ-পোশাক পরে ছেলে সেজে নে। তাহলেই ল্যাঠা চুকে গেলো।

নুজাৎ বলে, ঠিক বলেছিস, ভাই। তোর বুদ্ধির তারিফ করতে হয়।

রাত্রে মাকান এসে নুজাৎকে জানায়, কালকের ভোরে আমরা চুপি চুপি বেরিয়ে যাবো শহরে। ওখানে দুটো উট ভাড়া করে রাখবে আমার নফর। আমি সব ব্যবস্থা করেছি। ইরাক থেকে যে-সব হজ যাত্রীর দল কাল বাগদাদে আসবে তাদের সঙ্গে মিশে যাবো আমরা। কেমন, ঠিক আছে?

নুজাৎ বলে, বিলকুল ঠিক আছে।

এইভাবে দুই কিশোর-কিশোরী একদিন মক্কায় এসে পৌছয়। পবিত্র আরাফৎ গিরিশৃঙ্গ এবং মদিনার পবিত্র সমাধি ক্ষেত্ব দৰ্শন করে ওদের মন আনন্দে ভরে যায়।

এবার ঘরে ফেরার পালা। তীর্থযাত্রীরা অনেকেই ফেরার পথে খ্ৰীষ্টানদের পবিত্র তীর্থক্ষেত্র, ষীশুর জন্মস্থান জেরুজালেম শহরটা দেখে যায়। মাকান বললো, দিদি চল, আমরাও জেরুজালেম দেখে তারপরে দেশে ফিরবো।

কিন্তু তীর্থযাত্রীদের অনেকেই বারণ করেছিলো।

–এই বয়সে এতো ধকল কি তোমাদের সহ্য হবে? পথ বড়ো খারাপ। মাকান বলে, খারাপ তো কি হয়েছে? কত বুড়ো হাবড়া যাচ্ছে, আর আমরা যেতে পারবো কিন্তু পথ চলতে চলতে মনে হতে লাগলো, না এলেই ভালো হতো। দুৰ্গমগিরি কান্তার মরু পেরিয়ে চলতে চলতে দু’জনেই অসুস্থ হয়ে পড়ে। জন্মাবধি কোন কষ্ট সহ্য করার অভ্যাস নাই। সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মেছে। ওরা কেন সইতে পারবে এই দুঃসহ খরতাপের জ্বালা? নুজাতের জ্বর পথের মধ্যেই সেরে গেলো। কিন্তু দু-আল-মাকান দিন দিন কাহিল হয়ে পড়তে থাকে। এইভাবে একদিন ওরা জেরুজালেমে এসে পৌছয়। মাকান তখন জুরে অচৈতন্য। প্রলাপ বকে চলেছে।

শহরের উপান্তে একটা সরাইখানায় আশ্রয় নেয়। তারা। নুজাৎ-এর মনে ভয় ধরে। এই বিদেশ বিভূঁই-এ অসুস্থ ভাইকে নিয়ে সে কিভাবে দেশে ফিরবে?

দিন যায় রাত্রি আসে। কিন্তু মাকান-এর জ্বর বাড়তেই থাকে। হাতে যা পয়সা কডি ছিলো ফুরিয়ে এলো। কিন্তু মাকান-এর জ্বর কমে না। নুজাৎ চিন্তায় পড়লো। সাজপোশাক যা ছিলো এক এক করে বিক্রি করতে লাগলো। কিন্তু তাতে আর কতদিন চলতে পারে? একদিন নুজাৎ দেখলো, বিক্রি করার মতো আর কোন সাজ-পোশাকও অবশিষ্ট নাই। নুজাতের কান্না পায়। হায় আল্লাহ, এ কি বিপদে ফেললো? এখন কি করি? কি করে আমার ভাই-এর মুখে ওষুধ পথ্য দিই? আর কি করেই বা দেশে ফিরবো?

আল্লাহ বোধহয় মুখ তুলে চাইলেন। মাকানের জ্ঞান হলো।–দিদি কঁদিস নি। আমার জ্বর সেরে যাবে। আমরা শিগ্‌গিরই দেশে ফিরে যাবো। বডড ক্ষিদে পেয়েছে রে। কিছু খাবার দে।

সুলতানের ছেলে আজন্ম ঐশ্বর্যের প্রাচুর্যে লালিত হয়েছে। সে কি করে বুঝবে, খেতে চাইলেই সবাই খেতে পায় না। খাবার কিনতে পয়সার প্রয়োজন হয়। নুজাৎ বলে, কিন্তু ভাই, আমার কাছে তো পয়সাকডি কিছু নাই। কি করে তোকে খেতে দেব? লোকের কাছে ভিক্ষে মাঙবো, তাও পারছি না। যাই হোক, আজকের রাতটা একটু কষ্ট করে থােক। কাল আমি কোনও আমির সওদাগর-কারোবাড়ি গিয়ে ঝি-এর কাজ করেও কিছু খাবার-দাবার নিয়ে আসবো। সারাটা দিন তোকে ছেড়ে থাকতে আমার মন চাইছে না। কিন্তু কি করবো, ভাই, আল্লাহর বোধহয় এ রকমই ইচ্ছে। জানি না, তিনি কবে আমাদের আবার বাগদাদে ফিরিয়ে নিয়ে যাবেন।

পরদিন সকালে নুজাৎ ভাই-এর কপালে চুমু দিয়ে পথে নেমে আসে। কিন্তু কোথায় যাবে, কার বাড়িতে কাজ পাবে কিছুই বুঝতে পারে না। উদ্দেশ্যবিহীনভাবে এদিক-ওদিক ঘুরতে থাকে।

দু-আল-মাকান সারাদিন অপেক্ষা করে থাকে। সন্ধ্যা হয়ে গেলো, কিন্তু নুজাৎ ফিরে আসে না। ক্ষিদের জ্বালায় পেটের নাডি জ্বলতে থাকে। সারাটা রাত ক্ষিদের দুশ্চিন্তায় বিনিদ্রভাবে কাটে। কিন্তু নুজাৎ ফিরে এলো না। তার পর দিনও সেই ভাবে কেটে যায়। তারও পরের দিন অতিক্রান্ত হয়। কিন্তু নুজাতের কোনও সন্ধান পাওয়া গেলো না। আজ পুরো দু’টো দিন-রাত্রি মাকান কিছু খায়নি। খিদের জ্বালায় চোখে অন্ধকার দেখছে। কোন রকমেছেচড়ে ছেচড়ে দরজার চৌকাঠ অবধি আসে। সরাইখানার একটা চাকরকে বলে, আমাকে একটু বাজারে নিয়ে যাবে, ভাই। আমি আজ দুদিন খাইনি। খিদের জ্বালা আর সইতে পারছি না।

চাকরটা বলে, কিন্তু সেখানে কে তোমাকে খেতে দেবে?

—যদি কারো দয়া হয়। না হলে এখানে থেকেই বা কি করবো।

চাকরাটা ওকে কাঁধে করে নিয়ে গিয়ে বাজারের এক পাশে একটা পোড়ো বাড়ির বারান্দায় শুইয়ে দিয়ে চলে আসে। মুখে আওয়াজ তুলে কারো কাছে ভিক্ষে চাইবে, মাকানের তখন সে অবস্থাও নাই। পথচারীদের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকে। মুখে কিছু বলতে পারে না। শুধু হাতের ইশারা করে জানায়, সে বড় ক্ষুধার্ত, একটু কিছু খেতে চায়।

মাকানেরই সমবয়সী কয়েকটি ছেলে ওর আবেদনে সাড়া দেয়। বাজারের দোকানীদের কাছ থেকে চাঁদা করে পয়সা তুলে মাটির থালা করে কিছু খাবার কিনে নিয়ে আসে। মাকানকে খাওয়ানোর চেষ্টা করে। কিন্তু ইচ্ছে থাকলেও পেটভরে খেতে পারে না সে। একটুখানি মুখে দিতেই বমি হয়ে যায়। আবার নেতিয়ে পড়ে। খাবার কেনার পর চাঁদর পয়সা তিরিশ দিরহাম বেঁচে ছিলো। অনেকেই বললো, একটা উট ভাড়া করে দামাসকাসের হাসপাতালে পৌঁছে দাও তোমরা। না হলে বাচ্চাটা মরে যাবে। সুলতান উমর-আল-নুমানের সরকারী হাসপাতালে ভালো চিকিৎসার বন্দোবস্ত আছে। গরীব দুঃখীদের কোনও পয়সা লাগে না।

সবাই জল্পনা কল্পনা করলো অনেক। কিন্তু কেউই শেষ পর্যন্ত এগিয়ে এলো না। দামাসকাস অনেক দূরের পথ। নিজের কাজকাম বন্ধ করে কে আর পরের উপকার করতে ছুটবে? শেষ পর্যন্ত এক এক করে সবাই কেটে পড়লো। শাহেনশাহ উমর অল-নুমানের পুত্র শাহজাদা দু-আল-মাকান সেই পোড়ো বাড়ির খোলা বারান্দার এক কোণে মরার মতো পড়ে থেকে রাত্রি কটালো। মাটির বাসনে একটু রুটি আর এক ভীড় জল রেখে গেলো। ওরা। কিন্তু মাকানের কোনও চৈতন্য নাই। কি করে সে খাবে?

পরদিন সকালে একটা লোক দোকানে দোকানে চাঁদা তুলতে লাগলো। সবাইকে বললো, একটা বাচ্চা, এখানে পড়ে থেকে বিনা চিকিৎসায় মারা যাবে—আপনারা যে যা পারেন সাহায্য করুন। আমি ওকে দামাসকাসের সরকারী হাসপাতালে নিয়ে যাবো।

দোকানীরা তো দিলোই। পথচলতি মানুষও দয়া পরবশ হয়ে যার যা সাধ্য সাহায্য করলো। লোকটার উদ্দেশ্য সাধু ছিলো না। একটা উট ভাড়া করে মাকানকে নিয়ে রওনা হলো। বাজার ছাড়িয়ে শহরের শেষ প্রান্তে এসে চাঁদর পয়সাগুলো বের করে গুণে দেখলো। প্রায় দশ দিনারের মতো হবে। শয়তান লোকটা মাকানকে একটা সরকারী হামাম-এর পাশে নামিয়ে দিয়ে স্বগতভাবে বলতে থাকে, এই মর্যাটাকে হাসপাতালে পৌঁছে দিয়ে আমার কি ফায়দা হবে। তার চেয়ে থাক, এখানেই মর। আল্লাহ, আমার কোনও দোষ নিও না। ছেলেটার যদি বাঁচার কোনও আশা থাকতো, তবে তোমার নামে কসম খেয়ে বলছি, ওকে আমি দামাসকাসের হাসপাতালে পৌঁছে দিতাম।

এই বলে বদমাইশটা অদৃশ্য হয়ে গেলো।

একটু পরে হামামের পাশে একটা লোক এসে দাঁড়ালো। বৃদ্ধ-দাড়ি গোঁফ সাদা হয়ে গেছে। এই হামামে সে চাকরী করে। যারা গোসল করতে আসে তাদের গরম জল জোগানই তার কাজ। একটা বিরাট চুল্পী আছে হামামের একপাশে। আর আছে একটা চেলাকাঠের গুদাম। সারাদিন ধরে সে শুধু গরম জল করে যায়। পথচারীরা আসে গোসল করতে। যার দরকার তাকে গরম জল দেয়। এর জন্যে সে সরকারের কাছে বেতন পায়। অবশ্য সে বেতন অতি সামান্য। স্বামী-স্ত্রীর কোন রকমে চলে যায়। কিন্তু বৃদ্ধ বড় সৎ। কোনো পথচারী স্নান সেরে খুশি হয়ে দু’পয়সা বকশিস করতে এলে নেয় না। বলে, আল্লাহর দোয়ায় আমার কোনও অভাব নাই, জনাব। আমি নিতে পারবো না।

বৃদ্ধ ভাবে, এই সকালবেলা দরজার সামনে একটা মড়া ফেলে গেলো কে?

কিন্তু কিছুক্ষণ বাদেই তার ভুল ভাঙ্গে। না, ছেলেটা তো মরেনি। হাত পা নাড়ছে যেন মনে হচ্ছে। কাছে গিয়ে নাডি ধরে দেখে বৃদ্ধ বুঝতে পারে, এখনও ছেলেটা বেঁচে আছে! কিন্তু এ অবস্থায় থাকলে আর বেশিক্ষণ বাঁচবে না হয় তো বা। বৃদ্ধ ভাবে, ছেলেটা বোধ হয় খারাপ দলে পড়ে বেশি মাত্রায় হাসিস খেয়েছে। কিন্তু ভালো করে দেখে বুঝতে পারলো, না, নেশা করে বেহেড হয়নি। অসুখে অসুখে দুর্বল হয়ে নেতিয়ে পড়েছে। বিশেষ করে না খেতে পেয়েই তার এই মরণাপন্ন দশা। কিন্তু অবাক লাগে তার, এমন ফুলের মতোটুকটুকে সুন্দর ছেলে তো কোনও সাধারণ ঘরের নয়। নিশ্চয়ই কোনও খানদানী পরিবারের ধনীর দুলাল। কিন্তু এ অবস্থায় কে তাকে এখানে ফেলে গেলো? যাই হোক, আগে ওকে সুস্থ করে তোলা দরকার। তারপর জানা যাবে, কেমন করে কোথা থেকে এলো!

মাকানকে বৃদ্ধ কাঁধে তুলে নিয়েবাড়ি আসে। বিবিকে বলে, দেখো, ছেলেটা বোধহয় না। খেতে পেয়ে নেতিয়ে পড়েছে। আগে একে খাইয়ে ধুইয়ে সুস্থ করে তোলো। মনে হচ্ছে খানদানী ঘরের ছেলে।

বিবি আঁৎকে ওঠে, আহা-হা, এমন সোনার চাঁদ বাছা। একে পেলে কোথায়?

হামামের পাশে চেলা কাঠের গুদামের পাশে কে বা কারা ওকে ফেলে গিয়েছিলো। আমি ভেবেছিলাম। মড়া। পরে দেখলাম, না, বেঁচে আছে। কিন্তু ভালো করে আদর যত্ন না করলে বাঁচানো যাবে না। তুমি ওকে দেখো, আমি কাজে চললাম।

বৃদ্ধের বিবি গরমজলি করে। মাকানের গা হাত পা মুছিয়ে দেয়। এক গেলাস গরম দুধ এনে মুখে ধরে। দুধ টুকু খেয়ে মাকান একটু সুস্থ বোধ করে। পরনের নোংরা সাজ-পোশাক খুলে ফেলে। বৃদ্ধের বৌ ওকে ধোয়া জামাকাপড় পর্যায়। গোলাপ জলের পিচকারী করে মুখটা ধুয়ে দেয়। যুঁই-এর আতর এনে ছিটিয়ে দেয় পোশাকে। মাকান ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠে। প্রফুল্প হয়ে ওঠে!

এই সময় রজনী অবসান হয়ে আসে। শাহরাজাদ গল্প থামিয়ে চুপ করে বসে থাকে।

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *