হানড্রেড রোমান্টিক নাইটস্ – গিয়ােভানি বােকাসিও (ষষ্ঠ দিন)

›› অনুবাদ  ›› ১৮+  

গিয়ােভানি বােকাসিও-র ডেকামেরন টেলস এর বাংলা অনুবাদ।

ষষ্ঠ দিবস আরম্ভ হল। নতুন রানী এলিসা। কোনাে মানুষ আর একজনকে জব্দ করার চেষ্টা করে নিজেই জব্দ হল বা তাকে কৌশলে জব্দ করা হল, কিংবা কেউ হয়ত চালাকি করতে গিয়ে দেখল যে, অপর ব্যক্তিও কম চালাক নয়। তাকে বিপদে ফেলে বা অপদস্থ করতে চেয়ে মানুষ নিজেই কি করে অপদস্থ ও বিদ্রুপের পাত্র হয় তাই নিয়েই আলােচনা হল।

চাঁদ যদিও তখন মধ্যগগনে কিন্তু তার মনকাড়া আলাে ক্রমশ ম্লান হয়ে আসছে কারণ পুব গগনে অরুণ এসে তারার বাতি নিবিয়ে দিয়েছে আর তারই প্রভাব চন্দ্রালােক ম্লান।

নতুন রানী এলিসা একে একে সকলকে তুলে দিল। চলাে চলাে বাগানে চলো, কি সুন্দর বাতাস বইছে, ফুল ফুটছে, প্রজাপতি উড়ছে, সবুজ ঘাস শিশিরে স্নান করছে।

সকলে উঠে বাগানে গিয়ে পায়চারি করতে করতে প্রকৃতির অপূর্ব শােভা উপভােগ করতে লাগল। কত কথা, হাসি, গান আর গল্প। যেসব গল্প বলা হয়েছে সেগুলি আবার মনে পড়ছে, তাই নিয়ে কখনও হরষ কখনও বিষাদ।

সূর্য আর একটু মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে সকলে ফিরে এসে স্নান করে বেশ পরিবর্তন করে ব্রেকফাস্ট টেবিলে জড়াে হল। টেবিল যথারীতি বাগানেই সাজানাে হয়েছিল একটা বড় গাছের ছায়ার নিচে। পাতার ফাক দিয়ে আলাের জাল টেবিল আর যুবক-যুবতীদের পায়ের ওপর নাচানাচি করছিল।

সকলে বেশ মেজাজে আছে। একজন প্রস্তাব করলাে, একটা গান হােক। ট্রেইলাস আর ক্রেসিডা অবলম্বনে সেই যে জনপ্রিয় গানটি রচিত হয়েছিল সেটি ডায়ােনিও আর লরেতাে সুমধুর কন্ঠে গাইতে আরম্ভ করলাে।

এদিকে সূর্যও আকাশে যথারীতি পাড়ি দিচ্ছে। আকাশ অতিক্রম করতে করতে সে যখন পশ্চিমে ঢলে পড়েছে, তখন ওরা অন্যদিনের মতাে আবার বাগানে ফিরে এসে ফোয়ারার ধারে বসে যখন প্রাত্যাহিক কাহিনী আরম্ভ করার উপক্রম করছে, ঠিক সেই সময়ে বাড়িতে রন্ধনশালা থেকে গােলমাল শােনা গেল। দাসদাসীদের উত্তেজিত কণ্ঠ শুনে সকলে বিস্মিত। এমন তাে হয় না। কি হল?

স্টুয়ার্ডকে ডেকে পাঠান হল। স্টুয়ার্ডকে জিজ্ঞাসা করা হল চেঁচামেচির কারণ কি? স্টুয়ার্ড বলল, সেও জানে না কারণ লিচিসচা এবং তিনদারাে ঝগড়া আরম্ভ করেছে। সে যখন তাদের থামাতে যাচ্ছিল ঠিক সেই তাকে ডেকে পাঠান হল।

বেশ, তাহলে ওদের দুজনকে ডাকো।

ওরা দু’জনে বাগানে এলাে। তিনদারাে যেই তার মুখ খুলতে যাচ্ছে অমনি লিচিসচা তাকে এক দাবড়ানি দিয়ে থামিয়ে দিয়ে বলল, ড্যাকরা মিনসে তাের তাে বড় সাহস দেখছি। দেখছিস আমি রয়েছি তুই চুপ কর, একটাও কথা নয়, যা বলবার আমি আগে বলবাে।

লিচিসচা তখন রানীকে বলতে আরম্ভ করলাে।

ওটা একটা হাঁদা, আকাটি মুখ, কিসসু জানে না। বলে কিনা সাইচোফানতির বৌকে আমার চেয়ে ভালাে করে চেনে, ধুস। আমি ওকে সেই কবে থেকে চিনি। কি আস্পর্ধা ? বলে কিনা প্রথম রাত্রে সাইচোফানতি তার বৌকে নিয়ে শুয়েছিল। আরও বলে কিনা জন টমাসকে নরহত্যা করে ভাস্ক ক্যাসেলে ঢুকতে হয়েছিল কিন্তু মােটেই তা নয়, ক্যাসেলের লােকেরাই জন টমাসকে ভেতরে ডেকে নিয়ে করেছিল। লােকটার মাথায় যে কিছু নেই তার প্রমাণ হল যে, ও বলে কিনা মেয়েরা বিয়ে করে যখন সে স্বামীর ঘরে যায় তখন তারা কুমারী। যীশুর দিব্যি বলছি এ একেবারে ভুল। আরে বাপু, বাপেরা যখন তাদের উদ্ভিন্নযৌবনা মেয়ের বিয়ের জন্যে পাত্র খােজে তখন সেই সময়টা মেয়েরা বৃথা নষ্ট হতে দেবে কেন? তারা ইচ্ছেমতাে সঙ্গী বেছে নিয়ে ফুর্তি করে। ঐসব মেয়েরা তাদের স্বামীকে যেভাবে ঠকায় তা ঐ মুখপােড়া মানুষটা কী করে জানবে? তােমরাই বলাে।

লিচিসচার কথা শুনতে শুনতে মেয়েরা তাে হেসে এ ওর গায়ে ঢলে পড়তে লাগল। এলিসা তখন ভিসিচাকে বলল, আচ্ছা তােমরা এখন যাও, কাজ করগে যাও, ডায়ােনিয়া গিয়ে তােমাদের মীমাংসা করে দেবে।

ডায়ােনিয়াে বলল, আমি আর কি মীমাংসা করবাে? লিচিসচা যা বলেছে ঠিকই বলেছে, তিনদারাে সত্যিই বােকা।

এই কথা শুনে লিচিসচা ফেটে পড়ল, শুনলি! হাঁদারাম কোথাকার? আমার সঙ্গে আর লাগতে আসিস না। একটা উকুনের যেটুকু বুদ্ধি আছে সেটুকু বুদ্ধিও তাের নেই।

এলিসা এবার ওদের ধমকে থামিয়ে দিল। লিচিসচাকে বলল, একদম চুপ, আর কথাটি নয়, যা, নিজের কাজ করগে যা যদি না আমার চাবুক খেতে চাস।

ওরা দু’জনে রান্নাঘরে ফিরে যাবার পর নতুন রানী ফিলােমেনাকে বলল, আজ তুমিই গল্প আরম্ভ করো। প্রথম গল্প বলার সুযােগ পেয়ে খুশি হয়ে ফিলােমেনা আরম্ভ করলাে।

প্রথম গল্প

 ম্যাডােনা অরেত্তা পায়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। একজন নাইট তাকে বলল, হেঁটে যেতে আপনি কেন কষ্ট ভােগ করছেন, আমার ঘােড়ায় উঠুন, আমি মজাদার গল্প বলবাে, আপনার শ্রম লাঘব হবে। কিন্তু নাইট এমন একঘেয়ে ভাবে গল্প বলতে আরম্ভ করলাে যে অরেত্তা মনে মনে বিরক্ত হয়ে বললেন, আমাকে বাপু নামিয়ে দাও।

কিলােমেনা আরম্ভ করলাে, তােমাদের আর নতুন করে কি বলবাে, তােমরা তাে জান মেঘশূন্য আকাশে ঝকঝকে তারার সার, পাহাড়ের গায়ে রঙিন ফুলের বন্যা বা নতুন গজিয়ে ওঠা সবুজ পাতা আর ঘাস যেমন মন কেড়ে নেয় তেমনি কথা বলার ফাকে ফাকে এক টুকরাে ঠাট্টা, চুটকি বা ঈষৎ রসিকতা আমাদের তেমনি ভাবে মাতিয়ে দেয়। আর এই রকম ঠাট্টা, তামাশা, চুটকি রসিকতা মেয়েদের মুখ থেকে শুনতে যত ভালাে লাগে পুরুষদের মুখ থেকে শুনতে তত ভালাে লাগে না কারণ পুরুষরা একটু বেশি বকে, ছােট জিনিসকে টেনে বৃথা বড় করার চেষ্টা করে ফলে রস মাটি হয়।

তবে এ কথাও ঠিক যে, চুটকি হােক আর দীর্ঘ হােক, ঠাট্টা বা রসিকতা করার বা তা দ্রুত উপলব্ধি পারার ক্ষমতা নারীর কিছু কম। কেন জানি না। আমাদের মগজে বােধহয় বুদ্ধি কিছু কম ধারালাে। তাই বুঝি রসিক নারীর সংখ্যা অল্প।

যাই হােক আমি তােমাদের যে গল্পটা বলবাে সেটা শুনে তােমরা নিজেদের সিদ্ধান্ত করে নিয়ো।

তােমরা বােধহয় আমাদের শহরের এক সম্ভ্রান্তবংশীয়া, সুরসিকা ও মিষ্টভাষী এক মহিলার নাম শুনেছ কারণ তিনি খুবই জনপ্রিয় ছিলেন।

মহিলার নাম ম্যাডােনা অরেত্তা। তার স্বামীর নামও তােমরা শুনেছ, জেরি স্পাইনা।

আমরা যেমন মাঝে মাঝে শহর ছেড়ে গ্রামের রাস্তা ধরে বেড়াতে যাই কিংবা ধরো এই আমরা যেমন শহর থেকে পায়ে হেঁটে এখানে এসেছি তেমনি আরও কয়েকজন মহিলা এবং নাইট সহ অরেত্তা গ্রামের পথে বেড়াতে বেরিয়ে ছিলেন।

বাড়ি থেকে যাত্রা করবার আগে অরেত্তা সকলকে নিজের বাড়িতে ভােজে আপ্যায়িত করেছিলেন।

সকলে ঠিক করেছিল এবার ওরা একটু বেশি দূর পর্যন্ত যাবে। রাস্তার দু’ধারে গাছ। গাছের ছায়ায় পাখির কলরব শুনতে শুনতে মেয়েরা অনেকে পায়ে হেঁটে আর নাইটেরা ঘােড়ায় চেপে চলেছে।

বেশ খানিকটা দূর অতিক্রম করার পর একজন নাইট অরেত্তাকে বলল, ম্যাডােনা অরেত্তা, আমি লক্ষ্য করছি আপনার চলতে বেশ কষ্ট হচ্ছে। অভ্যাস নেই তাে তাই আমি বলি কি আপনি হয় ঘােড়ায় উঠুন। আপনার কষ্টের লাঘব হবে আর সেই সঙ্গে আমি মজার গল্প বলবাে।

অরেত্তা খুব খুশি হয়। বলে তাহলে তাে বেশ ভালই হয়। নাইট মহিলাকে সাহায্য করে। মহিলা ঘোড়ার পিঠে উঠে বেশ বাগিয়ে বসলাে। ঘােড়ায় উঠে অরেত্তা নাইটকে ধন্যবাদ জানাল। মনে মনে বলল, যাক বাবা বাঁচা গেল, পায়ে ফোস্কা পড়ে গিয়েছি, ব্যথায় পা টনটন করছিল।

সেকালের নাইটরা অসিচালনায় দক্ষ ছিল। সাঁই সাঁই করে তলােয়ার চালাতে পারতাে। আমাদের এই নাইট নাকি আবার উত্তম গল্পও বলতে পারত। কিন্তু আমাদের এই নাইটের অসিচালনা ও তির চালনায় দক্ষতা ছিল কিনা সে বিষয়ে সংশয় আছে।

যাক নাইট তাে গল্প আরম্ভ করলাে, ঘােড়াও চলতে আরম্ভ করলাে। নাইটের তাে ধারণা সে ভালাে গল্প বলতে পারে। মেয়েরা তার গল্প উপভােগ করে। কিন্তু হায় বেচারা নিজের কৃতিত্ব সম্ভন্ধে অজ্ঞ ছিল।

প্ৰথমত গল্পটার কোনাে আকর্ষণ নেই, একেবারে টেনে নিয়ে যেতে পারছে না। তার ওপর গল্পবলিয়ের উচ্চারণ ভালাে নয়, তায় মাঝে মাঝে আটকে যাচ্ছে, নাম উলটোপালটা করে ফেলছে। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি করছে, তার ওপর মুদ্রাদোষ। বার বার জিজ্ঞাসা করছে, বুঝতে পারছেন তাে? কিংবা বুঝলেন ম্যাডােনা? ইত্যাদি।

অরেত্তা তখন নিজের মনে বলছে, আমি খুব বুঝেছি, তুমি নিজে বােঝাে তাে?

গল্পটা যে কি, তার বিষয়বস্তুই বা কি, কেই বা নায়ক আর কে নায়িকা এসব গােলমাল হয়ে যাচ্ছে এইভাবে মাইলখানেক চললাে। অরেস্তার তাে মাথা ধরে যাবার উপক্রম। তার মনে হচ্ছে রাস্তায় হাঁটবার সময় যে ব্যথা ভােগ করছিলেন এখন সে ব্যথা নয়, মাথায় রীতিমতাে যন্ত্রণা। ঘামে সারা দেহ ভিজে গেছে। অসহ্য। মাথা ঘুরে ঘােড়া থেকে পড়ে না যায়। গা গুলিয়ে উঠছে। আর সহ্য করতে হয় যাচ্ছে না।

কণ্ঠস্বর কোমল করে অরেত্তা নাইটকে বলল, তুমি আমার কষ্ট লাঘব করবার জন্যেই আমাকে ঘোড়ার পিঠে তুলে নিয়েছ ঠিকই কিন্তু তােমার ঘােড়ার চলার চাল এতই নটঘটে যে আমি আর সহ্য করতে পারছি না। তুমি বরঞ্চ আমাকে নামিয়ে দাও।

অরেত্তা যে কিসের ইঙ্গিত করছে তা বােঝবার মতাে বুদ্ধি নাইটের ছিল না কারণ তার ঘােড়া ঠিকই চলছিল। একটুও ঝাকুনি ছিল না।

নাইট তখন ঘােড়ার চলা লক্ষ্য করে কোনাে ত্রুটি ধরতে পারলাে না। তবে অরেত্তা যখন আবার তাকে নামিয়ে দেবার জন্যে অনুরােধ করলাে তখন নাইট নিজের বােকামি বুঝতে পেরে মহিলাকে সযত্নে ঘােড়া থেকে নামিয়ে দিল কিন্তু অন্য একটা গল্প আরম্ভ করলাে।

 

দ্বিতীয় গল্প

রুটিওয়ালা চিস্তি তার বাকপটুতার দ্বারা একটিমাত্র কথায় জেরি স্পাইনাকে বুঝিয়ে দিল যে, তিনি যুক্তি মানছেন না।

ম্যাডােনা অরেত্তার সময়ােচিত মন্তব্যটির সকলে প্রশংসা করলাে। প্যামপিনিয়াকে রানী এবার বলল, নাও তুমিও এইরকম একটা গল্প বলাে। প্যামপিনিয়া আর বিলম্ব না করে বললঃ দেখ ভাই আমি বুঝতে পারি না ভগবান কেন অনেক মহৎ ব্যক্তির আকৃতি সুন্দর করেন না। তাই শুধু খারাপ চেহারা দেখে অনেক ব্যক্তিকে বােঝা যায় না তার হৃদয় কত মহান। আমাদের শহরের একজন নাগরিক চিস্তির কথাই ধরাে না এবং আরও কারও। চিস্তি একজন মহৎ ব্যক্তি অথচ বেচারার দুর্ভাগ্য তাকে রুটিওয়ালা হতে হল।

আমি কিন্তু নিশ্চই একই সঙ্গে প্রকৃতি ও ভাগ্যকে দোষ দেব। অথচ দেখ প্রকৃতি সব দেখতে পায় আর ভাগ্যদেবীরও সহস্র চক্ষু আছে তবুও এরা অন্ধ। অন্তত আমাদের তাে তাই ধারণা। এরা দু’জনে মিলে মানুষকে নিয়ে কত খেলাই না খেলে। একজন নর বা নারীকে প্রকৃতি সুন্দর করে তৈরি করলাে কিন্তু ভাগ্যদেবী তার প্রতি বিরূপ। আবার প্রকৃতির প্রভাবে যে নাকি কুরূপ, ভাগ্যদেবী তার প্রতি অকৃপণ। আমি এই শেষােক্তটির বিষয় নিয়ে একটা কাহিনী বলবাে। দেখবে রুটিওয়ালা চিস্তি মােটেই সুদর্শন নয় কিন্তু তার অনেক গুণ এমনকি প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিকেও সে শিক্ষা দেবার ক্ষমতা রাখে, জেরি পাইনার চোখ খুলে দেয়। এই জেরি স্পাইনা হল ফিলােমেনা বর্ণিত গল্পের নায়িকা ম্যাডােনা অরেত্তার স্বামী।

মহামান্য পােপ বনিফেস এই জেরি স্পাইনাকে একজন বিশিষ্ট ও গণ্যমান্য ব্যক্তি বলে মনে করতেন এবং তাকে তার প্রাপ্য সম্মান দিতেন। গির্জার শাসনসংক্রান্ত ব্যাপারে পােপ তার কয়েকজন সভাসদকে প্রতিনিধি হিসেবে ফ্লোরেন্সে পাঠালেন। ফ্লোরেন্সে পৌঁছে এই প্রতিনিধিদল জেরি স্পাইনার ভবনে আতিথ্য গ্রহণ করলাে।

পােপের নির্দেশ এবং বিশেষ কার্যসূচি অনুসরণ করবার জন্যে জেরি ও ঐ প্রতিনিধিদলকে সান্টা মেরিয়া উঘি গির্জার সামনে দিয়ে প্রত্যহ যাওয়া আসা করতে হতাে আর এই গির্জার পাশেই বসে চিস্তির রুটি তৈরির কারখানা ও দোকান। এই দোকানে বসে চিস্তি রুটি বেচত।

যদিও রুটি বিনা মানুষের চলে না তথাপি ব্যবসা হিসেবে রুটি তৈরিটাকে উচ্চমান দেওয়া হয় না অথচ এই সাধারণ রুটিওয়ালার প্রতি ভাগ্যদেবী অত্যন্ত সুপ্রসন্ন যদিও প্রকৃতিদেবী নন। চিস্তি এই নিম্নমানের ব্যবসা করে প্রচুর উপার্জন করে এবং এই একটি ব্যবসা নিয়েই সে সন্তুষ্ট। অন্য কোনো ব্যবসায়ে সে মন দেয় নি, প্রয়ােজনও মনে করে নি। ধনসম্পদ তার প্রচুর, একজন ধনী ব্যক্তি রূপে সে পরিচিত। সে আরামে বিলাসবহুল জীবন যাপন করতাে।

নানারকম ভােগপণ্য ও সম্পদের মধ্যে তার সেলার বা সুরাভাণ্ডারটি ছিল উল্লেখযােগ্য। এমন একটি উৎকৃষ্ট সেলার ফ্লোরেন্সে দ্বিতীয়টি তাে ছিলই না। এমনকি ফ্লোরেন্সের কাছে কোথাও নয়। তার সেলারে রেড এবং হােয়াইট ওয়াইন ব্যতীত অতি সুন্দর, স্বাদু ও বিরল নানারকম সুরা সঞ্চিত ছিল। পুরাতন ও বিরল সুরার সন্ধান পেলেই চিস্তি সেটি সংগ্রহ করতাে।

দোকানে বসে চিস্তি লক্ষ্য করলাে যে, মহামান্য পােপের প্রতিনিধিদের নিয়ে জেরি স্পাইনা প্রতিদিন সকালে তার দোকানের সামনে দিয়ে যাওয়া আসা করে। চিস্তি মনে করলাে এখন তাে গ্রীষ্মকাল, লােকগুলি নিশ্চই তৃষ্ণার্ত হয়, তার ইচ্ছে করে সে জেরি ও এই লােকগুলিকে স্বাদু হােয়াইট ওয়াইন পান করিয়ে তাদের তৃষ্ণা দূর করে ও আপ্যায়িত করে।

কিন্তু জেরি স্পাইনা হল শহরের একজন ধনী ও বিশিষ্ট ব্যক্তি। সম্মানে তিনি রুটিওয়ালা চিস্তি অপেক্ষা অনেক ওপরে। তঁাকে আমন্ত্রণ জানানাে তার পক্ষে ধৃষ্টতা হবে। তাই সে এমন একটা মতলব ঠাওরাল যাতে জেরি স্পাইনা নিজেই তার দোকানে এসে সুরা পান করে যায়।

সে তার মতলব হাসিল করবার উদ্দেশ্যে প্রতিদিন সকালে একটা উৎকৃষ্ট পােশাক পরতাে আর তার ওপর পরতাে সাদা ধবধবে একটি এপ্রন যাতে তাকে রুটিওয়ালা অপেক্ষা কোনাে কারখানার মালিক বলে মনে হতাে। কাছে রাখতাে একটি চকচকে পাত্রভর্তি শীতল জল আর বলােনার তৈরি নতুন একটি জালা ভর্তি সেরা ও সুস্বাদু হােয়াইট ওয়াইন। পাশে থাকতাে ঝকঝকে দুটি ধাতুনির্মিত পানপাত্র যেন রূপাের তৈরি। এই সময়ে জেরি ও পােপের প্রতিনিধিরা এই পথ দিয়ে যাবেন।

জেরি ও তার দলকে এই পথে আসতে দেখলেই সে একটু গলা খাঁকারি দিয়ে এমন তৃপ্তি সহকারে নিজের সুরা পান আরম্ভ করতাে যা দেখলে মরা মানুষও জেগে উঠে জিভ দিয়ে ঠোট বােলাবে।

জেরি স্পাইনা পর পর দুদিন ব্যাপারটা লক্ষ্য করলেন কিন্তু তৃতীয় দিনে তিনি আর থাকতে না পেরে চিস্তিকে জিজ্ঞাসা করলেন, কি চিস্তি স্বাদটা কেমন? খুব ভালাে মনে হচ্ছে।

ঠিক ধরেছেন, অতি সুস্বাদু কিন্তু হুজুর আপনি নিজে চেখে না দেখলে তাে বুঝতেই পারবেন না আপনি কি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, সবিনয়ে চিস্তি নিবেদন করলাে।

দিনটা একটু বেশি গরম হওয়ার জন্যেই হােক বা পথশ্রমে ক্লান্ত হওয়ার জন্যেই হােক জেরি রীতিমতাে তৃষ্ণার্ত এবং চিস্তিকে পান করতে দেখে মনে মনে লােভ হল কিন্তু সােজাসুজি চিস্তিকে বলতেও পারছেন না। তাই মৃদু হেসে সহযাত্রীদের বললেনঃ

কি মশাইরা এই ভদ্রলােকের এই স্বাদু সুরা একবার চেখে দেখবেন নাকি? তাহলে আমিও একটু গলা ভিজিয়ে নিই। চিস্তি তাে বাজে কথা বলে না, সুরাটা নিশ্চয় সেরা, আমাদের অন্তত আফশােস করতে হবে না। আসুন।

জেরি ও আর সকলে যখন চিস্তির দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল, তখন চিস্তি তাদের সাদব অভ্যর্থনা জানিয়ে কারখানা থেকে বেঞ্চি আনিয়ে তাদের বসতে বলল। দলের সঙ্গে যে কয়েকজন ভৃত্য। ল তারাই পানপাত্রগুলি ধুয়ে ফেলল।

চিস্তি বলল, তােমরা ভাই গেলাস ধুলে কেন। তােমরা ছেড়ে দাও, এই দিকে বােসা, আমি রুটি তৈরি করতে যেমন ওস্তাদ সুরাও তেমনভাবে পরিবেশন করতে পারি। কিন্তু সকলে শুনুন আপনারা যদি মনে করে থাকেন যে, মাত্র দু’এক টোক চেখে দেখবেন তাহলে আপনারা নিরাশ হবেন।

তারপর সে নিজে চারটি সুদৃশ্য পানপাত্র ধুয়ে, তার একজন পরিচারককে আদেশ করলাে সেলার থেকে বিশেষ ছােট এক পিপে সুরা আনতে, তারপর অত্যন্ত যত্ন সহকারে জেরি স্পাইনা ও তার সঙ্গীদের সুরা পরিবেশন করলাে। আহা! কি চমৎকার স্বাদ, এমন সুরা তারা কয়েক বৎসরের মধ্যে পান করবার সুযােগ পায়নি। স্বয়ং জেরি বললেন, তুমি ঠিক বলেছ চিস্তি, সত্যিই এমন উৎকৃষ্ট সুরা আমিও সংগ্রহ করতে পারি নি। তুমি ভাগ্যবান। আমরা সকলেই তৃপ্ত। আমার এই বন্ধুরা যতদিন ফ্লোরেন্সে থাকবে আমরা প্রতিদিন সকালে আসবাে। তােমার নিজের যেমন খেয়ে সুখ তেমনি নিশ্চই অপরকে খাইয়েও সুখ।

পােপের প্রতিনিধিদের দৌত্যকাজ শেষ হল। এবার তারা ফিরে যাবে তাই তাদের বিদায় সম্বর্ধনা জানাবার জন্যে জেরি স্পাইনা এক বিরাট ভােজসভার আয়ােজন করলাে। চিস্তিকেও জেরি আমন্ত্রণ জানিয়ে তার এক পরিচারককে দিয়ে একটি ছােট পিপে পাঠিয়ে বলল চিস্তির কাছ থেকে পিপেটি সুরায় ভর্তি করে আনতে এবং আহারের প্রথম পদের সঙ্গে সেই সুরা অর্ধ গেলাস করে যেন অতিথিদের পরিবেশন করা হয়।

যে পরিচারক পিপেটি নিয়ে চিস্তির বাড়ি যাবে সে ঐ সুরা পান করবার সুযোেগ পায়নি তাই তার মনে ক্ষোভ ছিল। সে তার মনিবকে না জানিয়ে একটা বেশ বড় পিপে নিয়ে গেল।

অত বড় পাত্র দেখে পরিচারককে চিস্তি বলল, জেরি মহাশয় তাে তােমাকে আমার কাছে পাঠান নি।

পরিচারক বলল, কি বলছেন মশাই, আমার মনিব এই পিপেটি দিয়ে আপনার কাছে পাঠিয়েছেন। িচস্তি কিছুতেই তার কথা শুনল না।

পরিচারক তার মনিবের কাছে ফিরে গিয়ে বলল, চিস্তি সুরা না দিয়ে আমাকে ফিরিয়ে দিল।

তুই আবার চিস্তির কাছে গিয়ে বল, হ্যা, আমিই তােকে ওর কাছে পাঠিয়েছি। এবারও সে যদি তােকে ফেরত পাঠায় তখন তাকে জিজ্ঞাসা করবি তাহলে কে তােকে তার কাছে পাঠিয়েছে?

পরিচারক আবার চিস্তির কাছে ফিরে গিয়ে বলল, শােনাে চিস্তি ভালাে করে শােনাে, আমার মনিব আমাকে তােমার কাছেই পাঠিয়েছেন, আর কারও কাছে নয়, এ বিষয়ে কোনােই সন্দেহ নেই।

চিস্তিও বলল, তাহলে শােনাে ছােকরা, তুমি ভুল করছে। তােমার মনিব তােমাকে যে আমার কাছে পাঠান নি এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত।

পরিচারক এবার উষ্মা প্রকাশ করে বলল, ভালাে রে ভালাে, বেশ বাবা তাহলে বলো আমাকে কার কাছে পাঠিয়েছেন?

চিস্তি উত্তর দিল, আরনাের কাছে পাঠিয়েছেন।

পরিচারক ফিরে গিয়ে জেরিকে সব জানাল। আরননা? জেরি এবার ব্যাপারটা বুঝতে পারলেন এবং পরিচারককে বললেন, দেখি তুমি কোন্ পিপে নিয়ে গিয়েছিলে?

পরিচারক পাত্রটি নিয়ে এলাে। সেটি দেখে জেরি পরিচারককে খুব ভৎসনা করে বললেন, চিস্তি তােকে ফিরিয়ে দিয়ে ঠিক কাজই করেছে। অপেক্ষাকৃত একটা ছােট পিপে আনিয়ে পরিচারককে জেরি বললেন, এই পিপেটা নিয়ে যা।

এই পিপে দেখে চিস্তি বলল, হ্যা এবার বুঝতে পারলুম যে, তােমার মনিব তােমাকে আমার কাছেই পাঠিয়েছেন, বলে এবার পিপেটি সুরা দিয়ে সন্তুষ্টচিত্তে ভর্তি করে দিল।

সেইদিনই কিছুক্ষণ পরে চিস্তি একটি ছােট পাত্র ঐ একই পুরাতন সুরা দিয়ে ভর্তি করে জেরি স্পাইনার কাছে আগে পাঠিয়ে দিয়ে নিজে পরে গেল। জেরির সঙ্গে দেখা করে বলল, হুজুর একটি বড় সুরাপাত্র দেখে আমি ভয় পাই নি কিন্তু আপনি তাে আমার ভাণ্ডার দেখেছেন এবং এই সুরার পরিমাণ আমার কাছে কতটা আছে তাও জানেন। কিন্তু সেটা বড় কথা নয়। আসল কথা এই যে, এই সুরা দাসদাসীদের জন্যে নয়। আপনি যাতে এটা স্মরণ করতে পারেন এইজন্যে দুঃখের সঙ্গে আপনার প্রেরিত পরিচারককে দু’বার ফিরিয়ে দিয়েছিলুম। এই সুরা আমার যতটুকু ছিল তার শেষ ফোঁটাটি পর্যন্ত অমি আপনাকে নিবেদন করলুম, আপনি ইচ্ছামতাে ব্যয় করবেন।

একথা শুনে জেরি স্পাইনা তাকে অজস্র ধন্যবাদ জানিয়ে সুরা সযত্নে রাখবার ব্যবস্থা করলেন। সেইদিন থেকে তিনি চিস্তিকে যথাযোগ্য মর্যাদার আসনে বসালেন এবং চিরজীবনের জন্যে তাকে বন্ধুত্বে বরণ করে নিলেন।

 

তৃতীয় গল্প

মুখের মতাে জবাব দিয়ে মােন্না নােন্না দ্য পুলসি ফ্লোরেন্সের বিশপের ঠাট্টা মস্করা থামিয়ে দিলেন।

প্যামপিনিয়ার গল্প শেষ হতে সকলেই চিস্তির উত্তর ও তার বদান্যতার প্রশংসা করলাে। এবারে লরেতাকে ডেকে কুইন পরের গল্পটি বলতে বললেন।

লরেতা তার বান্ধবীদের সম্বােধন করে বলল প্যামপিনিয়া আর লরেতা যে গল্প দুটি বলল সে দুটির মধ্যে যেমন সত্যি আছে তেমনি রসও আছে অথচ আমরা সরস মন্তব্য যথাসময়ে প্রয়ােগ করতে পারি না, অনেকে মর্ম বুঝতে না পেরে উপভােগ করতেও পারে না। তবে দেখতে হবে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করবার জন্যে মন্তব্যটি যেন কুকুরের কামড়ের মতাে যন্ত্রণাদায়ক না হয়, বরঞ্চ মেষের কামড়ের মতাে সহনীয় হয়। ম্যাডােনা অরেস্তা এবং চিস্তির উত্তর ঐ মেষের কামড়ের মতােই সহনীয় অর্থাৎ উপভােগ্য হয়েছিল অথচ প্রতিপক্ষকে নিষ্ঠুরভাবে আঘাত করাও হয়নি।

একজনের মন্তব্য সরস হলেও কঠোর হতে পারে। তখন অপরপক্ষ হয়তাে প্রতিশােধ নেবার স্পৃহায় বা তাকে ধরাশাহী করবার মতলবে ঠাট্টাচ্ছলে এমন প্রত্যুত্তর দেয় যা অনেক সময়ে নির্মম হয় এবং প্রতিপক্ষ মানসিক আঘাত পায়। অতএব এমন ঠাট্টা বা পরিহাস না করাই ভালাে। জবাব হবে উচিত অথচ কেউ বেদনা বােধ করবে না, এমন হওয়াই তাে ঠিক।

আমি একজন যাজকের গল্প বলবাে, যে পরিহাস করতে গিয়ে সীমা অতিক্রম করেছিল ফলে তাকে তার মুখের মতাে জবাব শুনতে হয়েছিল যা তার পক্ষে মােটেই উপভােগ্য হয়নি।

ফ্লোরেন্সের যখন জ্ঞানী ও গুণী বলে পরিচিত অ্যান্টোনিও ডি’অরসাে নামে একজন যােগ্য বিশপ ছিলেন সেই সময়ে শহরে এলেন ক্যাটালােনিয়ার একজন নামী ব্যক্তি, নাম ডেগা ডেন্না রাত্তা। ইনি ছিলেন নেপলসের রাজা রবার্টের মার্শাল।

এই ডোে ডেল্লা রাত্তা সুপুরুষ ছিলেন কিন্তু মহিলাদের প্রতি বিশেষভাবে অনুরক্ত ছিলেন। ফ্লোরেন্সে এসে তিনি সম্রান্ত বংশের কয়েকটি সুন্দরীর সঙ্গে প্রেম জমাতে চেষ্টা করলেন। এই সকল মহিলাদের মধ্যে উক্ত বিশপের ভাইয়ের এবং তারও ভাইঝি ছিলেন, যিনি অসাধারণ ছিলেন। এই সুন্দরী মহিলার প্রতি আগন্তুক ডেগাে বিশেষভাবে আকৃষ্ট হলেন। মহিলা বিবাহিত।

ডেগাে খবর নিয়ে জানলাে যে, ঐ রূপসীর স্বামী লােভী এবং অসৎ ও ঘুষখাের। ডেগাে ঐ মহিলার স্বামীর সঙ্গে আলাপ করে প্রস্তাব করলাে যে, তার পত্নীর সঙ্গে একরাত্রি শুতে দিলে ডেগাে স্বামীকে পাঁচশাে সােনার ফ্লোরিন দেবে।

মহিলার অনিচ্ছাসত্ত্বেও ডেকো মহিলার সঙ্গে একটা রাত্রি যাপন করলাে এবং পরদিন তার স্বামীকে কথামতাে পাঁচশ ফ্লোরিন দিল; ফ্লোরিনগুলি আসলে রুপাের কিন্তু গিল্টি করা। এগুলি পপােলিনি নামে বাজারে চলতাে।

এই গােপন ঘটনা গুপ্ত রইল না, প্রকাশ হয়ে পড়ল। স্বামীটি তার বৌকে ভাড়া দিয়েছে এজন্যে সকলে তাে তাকে বিদ্রুপ করতে লাগলই উপরন্তু তাকে বিকল্প মুদ্রা দিয়ে ঠকিয়েছে, এজন্যেও তাকে সকলে ব্যঙ্গ করতে লাগল। আর ঐ স্বামীর ভাই বিশপ, বুদ্ধিমান। তিনি এমন ভান করতেন যেন এসব ব্যাপারে তিনি কিছুই জানেন না।

বিশপ আর ডেগােকে প্রায়ই একত্রে দেখা যেত। সেদিন সেন্ট জনের সেবা দিবস। যে রাস্তা দিয়ে ঘৌড়দৌড় হয়, সেই রাস্তা দিয়ে বিশপ ও মার্শাল ডেগাে ঘােড়ায় চড়ে পাশাপাশি যাচ্ছে কিন্তু দু’জনেরই নজর মেয়েদের দিকে। মােন্না নােন্না ডি পুলচি নামে একটি যুবতীর দিকে বিশপের নজর আকৃষ্ট হল। (আহা, বেচারী বর্তমান এই প্লেগ মহামারীতে মারা গেছে)। পরিচয় দিলে তােমরাও যুবতীকে চিনতে পারবে। মেয়েটি হল অ্যালেস রিনুচ্চির বােন, সহােদর নয়, সম্পর্কিত। যে সময়ের কথা বলছি তখন তার রূপ একটি তাজা ফোটা ফুলের মতাে, অতীব লাবণ্যময়ী। সবে বিয়ে হয়েছে, স্বামীকে নিয়ে পাের্টা স্যান পিয়েরাে পাড়ায় ঘরে বেঁধেছে।।

মেয়েটির প্রতি বিশপ ডেগাের দৃষ্টি আকর্ষণ করে নিজের ঘােড়া মেয়েটির পাশে নিয়ে গেল। ডেগােও সঙ্গে এসে হাজির। বিশপ তখন ডেগাের পিঠ চাপড়ে চোখ মটকালাে অর্থাৎ দেখাে একটা মজা করি।

তারপর বিশপ মেয়েটিকে বলল, নােন্না এই ছােকরাকে তােমার কেমন মনে হয়? ওকে তুমি ঘায়েল করতে পারাে?

বিশপের এই কথা শুনে মােন্না নােন্না অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হল। বিশপের কথাগুলি শালীনতাবর্জিত। আশেপাশের লােকেরা বিশপের কথা শুনে থাকলে ভাববে মেয়েটা বুঝি স্বৈরিণী। ছিঃ।

অপমানিত মােন্না নােন্না চিৎকার করে প্রতিবাদ করতে পারতাে কিন্তু তাতে হয়ত ভিড় জমে যেত। এবং নিজের সম্মান রক্ষা করা সম্ভব হতাে না। তাই শুধু বিশপ এবং ডেগােই শুধু শুনতে পায় এমন অনুচ্চ স্বরে সে বিশপকে বলল, প্রভু ঐ লােকটা আমাকে জয় করবে! অসম্ভব। যদি জয় করতে চায় তাহলে উপযুক্ত দাম দিতে হবে, বিনা পয়সায় হবে না।

জবাবটা যদিও নির্লজ্জের মতাে তবুও বিশপকে ঘা দিল কারণ নােন্না তার ভাইঝি, কন্যাস্বরূপা। বিশপ জানে মেয়েটি সুচরিতা কিন্তু এমন উত্তর শুনতে তিনিই তাে নােন্নাকে বাধ্য করলেন।

সমুচিত জবাব পেয়ে বিশপ আর অপেক্ষা করলাে না। ডেগােকে নিয়ে ঘােড়া ছুটিয়ে চলে গেল। লজ্জায় অধােবদন দু’জনেই। মেয়েটিকে ইট মেরে বিশপ গুরুজন হয়ে নিজেই পাটকেলটি খেলেন।

 

চতুর্থ গল্প

কুরাডাে জিয়ানফিগলিআজ্জির রাঁধুনির নাম চিচিবিয়াে। কুরাডাে একদিন চিচিবিয়াের ওপর ভীষণ রেগে গেলেন। তাকে মেরেই ফেলেন আর কি, কিন্তু উপস্থিত বুদ্ধির ফলে ধূর্ত চিচিবিয়াে মনিবের রােষ নিবিয়ে দিয়েছিল।

লরেতাের গল্প শেষ হল। মােন্না নােন্না উপযুক্ত জবাব দিয়েছিল, সকলে তার প্রশংসা করলাে। কুইন এবার নেফাইলকে গল্প বলতে অনুরােধ করলাে।

বান্ধবীদের সম্বােধন করে নেফাইল বলল, সবসময়ে সব মানুষের দরকারের সময় মুখের মতাে জবাব জোটে না বা আগে থেকে তারা পরিস্থিতির মােকাবিলা করবার জন্যে জবাব তৈরি করে রাখতেও পারে না কিন্তু সময় সময় ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে হতভাগ্যের মুখে উপযুক্ত উত্তর জুটিয়ে দিয়ে তাকে বিপদ থেকে মুক্ত করেন।

নেফাইল তার গল্প আরম্ভ করলাে। তােমরা তাে সকলে আমাদের শহরের পুরাভাে জিয়ানফিগলিআজ্জির নাম জানাে। শহরের নানা কাজে তিনি এগিয়ে আসেন, কাজও করেন। খাটি ভদ্রলােকের মতােই দিন যাপন করেন, তিনি উদার ও অতিথিবৎসল। অবসর সময়ে তিনি শিকারে যেতেন অথবা ঘরে বসে দাবা খেলে সময় কাটাতেন।

শহরের কাছে পেরেটোলাতে তিনি তাঁর বাজপাখির সাহায্যে একদিন একটা সারস শিকার করে আনলেন। সারসটি কচি ও মাংসল। তার রাধুনি ভেনিসের লােক, রন্ধনবিদ্যায় অতিশয় পটু যাকে বলে। পাকা রাঁধুনী। নাম চিচিবিয়ে। কুরাডাে তাকে ডেকে বললেন, বেশ ভালাে করে মসলা দিয়ে সারসটি রান্না করতে, রাত্রে তিনি এটি আহার করবেন।

রন্ধনবিদ্যায় পটু হলেও চিচিবিয়ে একটু এলােমেলাে ধরনের লােক ছিল। যাই হােক সারসটি পালক ছাড়িয়ে নাড়িভুড়ি বার করে পরিষ্কার করে খুব যত্ন নিয়ে রান্না করতে আরম্ভ করলাে। রান্না যখন প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, তখন জিভে জল আসা সুগন্ধে চারদিক আমােদিত।

সেই গন্ধে আকৃষ্ট হয়েই হােক বা ঘটনাচক্রেই হােক রান্নাঘরে হাজির পাড়ার একটি ফাজিল ছুড়ি নাম ব্রুনো। রসিকা, জেদী এবং চেহারাটিও বেশ নজরকাড়া।

গন্ধে তাে তার জিভে জল এসেছে। পাখিটাও কড়ায়। রান্না শেষ হয়ে এসেছে, এবার উনুন থেকে নামানাে হবে। চিচিবিয়ােকে বলল, এই আমাকে একটা ঠ্যাং দে।

চিচিবিয়ে জিভ কেটে বলল, আরে সর্বনাশ, মনিব তাহলে আমার গর্দান নেবে। ডােনা ব্রুনো তুই বরঞ্চ অন্য কিছু খা।

না আমি ঐ পাখির একটা ঠ্যাং খাবাে। আমাকে দিতেই হবে। তুই তাের মনিবকে যাই হােক ধাপ্পা দিস।

নারে, তা কি হয়? মনিব জিজ্ঞাসা করবেন আর একটা ঠ্যাং কি হল? তােকে বরঞ্চ একটু মাংস কেটে দিচ্ছি।

না, আমার ঐ একটা ঠ্যাং চাই। না দিলে তোর সঙ্গে আমার সম্পর্ক এখানেই শেষ, আমাকে ছুঁতে দেব না। ব্রুনেত্তো ভীষণ জেদ করতে লাগল। তার সঙ্গে চিচিবিয়ে পেরে উঠল না। বাধ্য হয়েই সে একটা ঠ্যাং কেটে তার প্রেয়সীকে দিল। ব্রুনো সেটি চেটেপুটে খেয়ে পরম তৃপ্তি লাভ করে বিদায় নিল।

রাত্রে মনিবের খাবার টেবিলে পাখিটি একটি বড় সুদৃশ্য পাত্রে সাজিয়ে দিল। মনিবের পাশে একজন অতিথিও ছিল। সুগন্ধে সকলে আকৃষ্ট হয়ে আর অপেক্ষা করতে পারল না, খাওয়া আরম্ভ কলাে। কুরাভাে সহসা চিৎকার করে উঠলেন, এই ব্যাটা চিচিবিয়ে পাখির আর একটা ঠ্যাং কই?

চিবিয়াে একেই তাে ভেনিসের লােক তায় একটু মিথ্যাবাদী। উত্তরটা বােধহয় আগেই তৈরি করে বেধেছিল তাই চট করে উত্তর দিলঃ

হুজুর সারসের তাে একটাই ঠ্যাং থাকে।

কি বললি? সারসের একটা ঠ্যাং? আমি কি কখনও সারস দেখি নি?

চিবিয়াে দমল না। একটু জোর দিয়ে বলল, হ্যা হুজুর সারসের একটাই ঠ্যাং থাকে। আপনি যদি হুকুম করেন তাে আপনাকে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে একঠেঙে সারস দেখিয়ে দিতে পারি।

তখন অতিথিরা ছিলেন তাই কুরাভাে আপাতত চুপ করে গেলেন। অতিথিরা বিব্রত বােধ করতে পরেন। শুধু বললেন, কিন্তু কখনও একঠেঙে সারস দেখি নি বা এমন কথা শুনিও নি। তা তুমি বলছাে তখন আমরা না হয় কাল সকালে তােমার সঙ্গে গিয়ে দেখে আসব একঠেঙে সারস কোথায় আছে। কিন্তু শােনাে যদি তুমি একঠেঙে সারস দেখাতে না পারাে, তাহলে আমি যীশুর দিব্যি বলছি তােমাকে এমন শাস্তি দেব যে তুমি জীবনে ভুলবে না।

সে রাত্রে একঠেঙে সারসের আলােচনা এখানেই শেষ। পরদিন সকাল হতেই কুরাডাে শয্যাত্যাগ করেই ঘােড়া প্রস্তুত করতে বললেন। রাত্রে সুনিদ্রা হলেও সারসের কথা তিনি ভােলেন নি, রাগেও কমে নি। চিচিবিয়ােকে ডেকে পাঠালেন। তাকেও একটা বুড়াে ঘোড়াতে চড়িয়ে তাকে নিয়ে চললেন নদীর ধারে যেখানে সারসদের সাধারণত ভােরবেলায় দেখা যায়।

যেতে যেতে কুরাডাে বললেন, শীঘ্রই দেখা যাবে কার কথা সত্যি আর কার কথা মিথ্যা, চক্ষুকর্ণের

বিবাদভঞ্জন তখনই হবে।

চিবিরাে বেশ বুঝতে পারলাে মনিবের রাগ এখনও পড়ে নি। সে খুব ভয় পেয়েছে। সত্যিই তাে সারসদের একটা মাত্র পা থাকে না। সে এখন কি-ই বা বলবে কি-ই বা করবে। কপালে শাস্তি আছে ভোগ করতেই হবে, যত নষ্টের গােড়া ঐ ফাজিল ছুঁড়ি ব্রুনো্ত্তা। এখন যদি সে পালাতে পারতাে তাে বেচে যেত কিন্তু সে উপায় নেই। সে কল্পনার চোখে দেখতে লাগল তার চারদিকে যেন সারস রয়েছে তার প্রত্যেকটা দুই পায়ের ওপর ভর দিয়ে দিব্যি দাঁড়িয়ে আছে।

যাই হােক নদীর ধারে পৌঁছে দেখল নদীর কিনারে অন্তত বারাে চোদ্দটা এক পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সারসরা যখন ঘুমােয় তখন একটা পা পেটের মধ্যে গুটিয়ে রাখে। চিচিবিয়ে যেন তার প্রাণ ফিরে পেল। সারসগুলাের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, দেখুন হুজুর, কাল রাত্রে আমি আপনাকে সত্যি কথাই বলেছিলুম, এখন আপনি নিজেই দেখুন সবকটা সারসের একটা করে পা।

কুরাডাে ভেংচি কেটে বললেন, একটা করে পা? দাঁড়া তােকে দেখাচ্ছি পাখিগুলাের কটা পা। কুরাডাে ঘােড়া এগিয়ে নিয়ে গিয়ে হাে হাে করে চিৎকার করে উঠলেন। সঙ্গে সঙ্গে পাখিগুলাে অপর পা নামিয়ে কয়েক পা হেঁটে গিয়ে উড়ে গেল।

দেখ ব্যাটা দেখ, ভালাে করে চেয়ে দেখ। মিথুক কোথাকার, দেখ সারসের ক’টা পা? এবার কি বলবি?

চিচিবিয়ে হতবুদ্ধি কিন্তু হঠাৎ তার বুদ্ধি গজিয়ে উঠল। সে চট করে উত্তর দিল, হুজুর আপনার কথাও যেমন ঠিক আমার কথাও তেমন ঠিক। কাল আপনি যখন পাখিটা শিকার করছিলেন, পাখিটা নিশ্চয় এক পায়ে দাঁড়িয়েছিল। আপনি তখন তাে হাে হাে করে চিৎকার করেন নি তাহলে পাখিটা তার অপর পা বার করতাে, এখন যেমন ওরা করলাে।

উত্তর শুনে করাডাে এতই খুশি হল যে, সব ভুলে হাে হাে করে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।

হাসি সামনে বললেন, ঠিক বলেছিস চিচিবিয়াে। আমার চিৎকার করা উচিত ছিল। সময়মতাে ঠিক জবাব দিয়ে চিচিবিয়ে বেঁচে গেল, মনিবকেও সন্তুষ্ট করলাে।

 

পঞ্চম গল্প

আইনজীবী ফরিস দ্য রাবাত্তা এবং শিল্পী জিয়েত্তো, মুগেল্লা থেকে ফেরবার পথে পরস্পরের কুরূপ লক্ষ্য করে ঠাট্টা করতে করতে একজন অপরজনকে এমন জবাব দিল যার জবাব নেই।

চিচিবিয়ের মাথায় ঠিক সময়ে উত্তরটা এসে গিয়েছিল তাে! আচ্ছা উত্তর দিয়ে মনিবকে ঠকিয়েছে। সকলে চিচিবিয়ের প্রশংসা করলাে। নেফাইল বেশ গল্প বলেছ তাে। বান্ধবীরা বলল গল্পটা আমাদের বেশ ভালাে লেগেছে। এবার কে গল্প বলবে? প্যানফিলাে? বলাে ভাই বলাে।

প্যানফিলাে আরম্ভ করলাে। তােমরা তাে সকলে শুনলে যে অতি সাধারণ ও অশিক্ষিত লােকেরও উপস্থিত বুদ্ধি থাকে এবং তারা রসিকও হতে পারে। আবার দেখ অনেক কুৎসিত দর্শন ও কুরূপ মানুষ আছে যাদের দিকে চোখ পড়লে মানুষ মুখ ফিরিয়ে নেয়। কিন্তু নিজের চেহারার জন্যে তারা তাে দায়ী নয়, ভগবান ওদের ঐভাবে সৃষ্টি করেছেন। ওদের দেখে মনে হবে ওরা বুদ্ধিহীন এবং মুখ কিন্তু তােমরা জেনে রাখাে এদের মধ্যে অনেক প্রতিভাধর ও রসিক ব্যক্তি আছেন, আমি এমন দু’জনের গল্প বলবাে।

আমাদের ফ্লোরেন্স শহরে দু’জন ভদ্রলােক ছিলেন আমি তাদের বিষয়েই বলবাে মানে তাদের নিয়েই গল্প বলবাে। একজনের নাম ফরিস দ্য রাবাত্তা। চেহারা মােটেই ভালো নয়, বেঁটে, বামন বললেই হয়। মস্ত বড় মাথা, চ্যাপ্টা নাক। পুরু ঠোট বড় বড় গােল চোখ যেন ঠেলে বেরিয়ে আসছে, কান দুটোও মাথার মতাে বড়। অনেকে তার চেহারাটা ব্যারােঞ্চির সঙ্গে তুলনা করে। একজন অতি কুদর্শন মানুষের নাম ব্যারােঞ্চি। এমন বিশ্রি চেহারা হলে কি হয় লোেকটি সুপণ্ডিত, বিশিষ্ট আইনজ্ঞ এবং এ বিষয়ে জানেন যে তিনি চলন্ত বিশ্বকোষ বলে পরিচিত। যারা তার পরিচয় জানে তারা তাকে শ্রদ্ধা করে।

অপর লােকটির নাম জিয়েন্তো। তারও চেহারা মােটেই ভালাে নয়। কোনাে মেয়ে তাে দূরের কথা, কোনাে পুরুষই তার দিকে চেয়ে দেখে না। চেহারা খারাপ হলে কি হয়, সে একজন প্রতিভাশালী শিল্পী। সে তার নিব ও তুলি দিয়ে যা আঁকে তা জীবন্ত বলে মনে হয়। তার আঁকা ফুলের তােড়া দেখে মনে হবে ওগুলি বুঝি আসল ফুলের গুচ্ছ। জিয়েন্তোর আঁকা ছবি দেখে অনেকেই ঠকত।

অনেকদিন ধরেই কোনাে বড় ও দক্ষ শিল্পী দেশে জন্মায় নি। ছবি সম্বন্ধে মানুষও উদাসীন হয়ে গিয়েছিল। নয়ন সার্থক করার মতাে ছবিরও অভাব হয়েছিল অথচ দেশে পূর্বে কত বড় বড় শিল্পী ও ভাস্করই না জন্মেছে। সেই শিল্পকলা দীর্ঘদিন পরে জিয়ােত্তো ফিরিয়ে আনলাে অথচ সে অত্যন্ত বিনয়ী ছিল, বলতাে এমন কি আর আমি আঁকি।

ফরিস আর জিয়ােত্তো দু’জনেই ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল আর দু’জনেরই মুগেলোতে বিষয়সম্পত্তি জমিজায়গা ছিল। গ্রীষ্মের ছুটির জন্যে আদালত যখন বন্ধ, ফরিস সেই সুযােগে তার সম্পত্তির তদারক করতে মুগেল্লো গেল। তদারক করে একটা বুড়াে ও রােগা ঘােড়ার পিঠে চেপে ফ্লোরেন্সে ফিরে আসছে। বলতে কি ঘােড়াটার চেহারাও তারই মততা, পিঠে বােঝা নিয়ে চলতেই পারছে না।

এমন সময় পথে দেখা হয়ে গেল তার বন্ধু জিয়ােত্তোর সঙ্গে। সেও মুগেলল্লাতে তার সম্পত্তি তদারক করে ফিরে আসছে। তারও ঘােড়াটা তার বন্ধুর ঘােড়ার মতাে, চলছেও অতি কষ্টে। দুই ঘােড়া মুখােমুখি হতেই চিহিহি করে নিজেদের ভাষায় বাক্য বিনিময় করে নিল।

দুই বন্ধু খুশি, পথের সঙ্গী পাওয়া গেল। কথা বলতে পারলে ঘােড়ার চড়ে যাওয়ার ক্লান্তি কিছু দূর হবে। কিছু দূর যেতে না যেতে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল। গ্রীষ্মকালে তাপ কমাবার জন্যে ঈশ্বর বুঝি এমন বৃষ্টি নামিয়ে দেন। দুই বন্ধুর শরীর হয়তাে কিছু শীতল হল কিন্তু তারা বেশ ভিজে যাচ্ছে। কোথাও আশ্রয় নেওয়া দরকার। ভাগ্যক্রমে কাছেই তাদের পরিচিত একজন চাষীর বাড়ি ছিল। তারা দু’জনে চাষীর বাড়ি আশ্রয় নিল।

বৃষ্টি কিন্তু থামবার লক্ষণ নেই, অঝােরধারায় বৃষ্টি পড়েই চলেছে। এদিকে ওরা সন্ধ্যার আগেই শহরে ফিরতে চায়। ওরা ঠিক করলাে বৃষ্টি মাথায় নিয়েই বেরিয়ে পড়বে। কিন্তু মাথায় কি দেবে। চাষী কোথা থেকে খুঁজে খুঁজে দুটো পুরনাে জীর্ণ উলের টুপি নিয়ে এলাে এবং তার চেয়েও পুরনাে ও জীর্ণ আরও দুটো টুপি আনল।

কি আর করা যাবে। ওরা সেই দুটো টুপি পরপর মাথায় চড়িয়ে দিল। একেই তাে ঐ চেহারা তার ওপর ঐ টুপি পরে ওদের রূপ যেন খুলে গেল। কন্দর্পকান্তি এই দুই পুরুষ তাদের ‘পক্ষিরাজ’ ঘােড়ায় চেপে বৃষ্টি মাথায় নিয়ে যাত্রা আরম্ভ করলাে।

বৃষ্টিতে তারা কাকভেজা হয়ে গেল। টুপি দুটিও তাদের চর্ম আরও সিক্ত করতে সাহায্য করলাে। বৃষ্টি একটু কমলেও ততক্ষণে তারা ভিজে ঢােল হয়ে গেছে। একেই তাে ঐ চেহারা তায় ঘােড়া কাদা ছিটোচ্ছে আর সেই কাদা ওদের পােশাক তাে কর্দমাক্ত করছেই, কিছু কাদা ময়লা ছিটকে ওদের সুন্দর মুখের শােভা বৃদ্ধি করছিল, যেন রান্নাঘরে ঝুল।

বৃষ্টি আরও একটু কমলাে। প্রথমে পরস্পরের চেহারা দেখে মিটিমিটি হাসতে লাগল। ফরিসের চেয়েও জিয়ােত্তো বাকপটু ছিল, বেশ মজার মজার গল্প বলছিল। ফরিস তেমন মজার গল্প হবে পেরে ভাবলাে জিয়েত্তোকে একটু জব্দ করা যাক।

সে নিজের চেহারার কথা ভুলে গিয়ে জিয়ােঙের আপাদমস্তক দেখে হো হো করে হেসে উঠল। তারপর বলল, ওহে জিয়ােত্তো, মনে করে একজন লােক যে জানে না যে তুমি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ চিত্রশিল্পী, সে কি এ কথা বিশ্বাস করবে?

জিয়ােত্তো সঙ্গে সঙ্গে বলল, হ্যা বিশ্বাস করবে। তােমাকে দেখে সে জানতে পারবে যে তুমি মুর্খ নও অন্তত এ বি সি হরফগুলাে চেন।

ফরিস তাে চুপ, বুঝতে পারলাে জিরােত্তোকে প্রশ্ন করে সে ভুল করেছে।

 

ষষ্ঠ গল্প

কয়েকজন যুবকের কাছে মিশেল স্কালজা প্রমাণ করে দিল যে, পৃথিবীর প্রাচীনতম এক সম্রান্ত ও অভিজাত মানুষ ব্যারােঞ্চি এবং একটি নৈশভােজ বাজি জিতল।

জিরােত্তো মুখের মতাে জবাব দিয়েছে। মহিলারা তার চাতুর্য ও উপস্থিত বুদ্ধির প্রশংসায় পচ্ছ ও খুব হাসাহাসি করলাে। রানী বললেন, এবার হাসি থামাও। কিয়ামমো এবার তুমি গল্প বলে বেশ বলছি, বলে ফিয়ামমেত্তা আরম্ভ করলাে, এই সবাই শােনাে, প্যানফিলাে যে ব্যারােঞ্চির নাম উহ করলাে তার বিষয়ে তােমরা বােধহয় বিশেষ কিছু জান না। তার নামটা শুনে তার অভিজাত কয়ে মহত্ত্ব ও অনেক কিছু আমার মনে পড়ছে। তবে আমাদের যে বিষয়ে গল্প বলতে বলা হয়েছে সেই বি স্মরণ রেখে একটি ছােট গল্প বলছি যার উপলক্ষ ঐ বংশ।

খুব বেশিদিনের কথা নয়। আমাদের এই শহরে মিশেল স্কালজা নামে একটি রসিক, মিশুকেও মজাদার যুবক বাস করতাে। সে চট করে মজার মজার চুটকি বলতে পারতাে যার উপলক হরে কোনাে মানুষ। শহরের অন্য যুবকেরা তার এই গুণের জন্যে তার সঙ্গে আড্ডা জমাতে ভালােবাসত।

একদিন মন্তখি পাড়ায় আড্ডা বেশ জমে উঠেছে। আড্ডায় যেমন হয় এক প্রসঙ্গ থেকে অন্য প্রতে তর্কবিতর্ক ইত্যাদি সেইরকমই চলছিল। সহসা কথা উঠল এই শহরে মানে ফ্লোরেন্সে সবচেয়ে সে এবং মহৎ বংশ কোনটি? কেউ বলল, কেন? উবাৰ্তিরা? সঙ্গে সঙ্গে অন্য একজন বলল, ২ ল্যামবারতিরা থাকতে উৰ্তিরা ওদের কাছে কিছু নয়। আরও কত নাম উঠল, কত বাদ-প্রতিবাদ, তর্ক বিতর্কের ঝড় উঠল।

মিশেল স্কালজা এতক্ষণ চুপ করে সব শুনছিল আর মুচকি মুচকি হাসছিল। ভাবখানা এমন যে সঠিক উত্তরটা যেন একমাত্র সেই জানে। সে এবার বলল, তােমরা কিসসু জান না। শুধু ফ্লোকেদে কে সারা ইটালিতে, তাই বা কেন, সারা পৃথিবীতে বোধহয় ব্যারােঞ্চিদের তুল্য প্রাচীন এবং বনেদী বংশ আর একটিও নেই। এ বিষয়ে সকল পণ্ডিতরা একমত এবং যারাই ব্যারােঞ্চিদের জানে তারাই আমার মত সমর্থন করবে। তােমরা হয়তাে ভাবছাে যে, ব্যারােঞ্চিরা সান্টা মারিয়া ম্যাজ্জিওর পাড়ায় বসে করে। তাদের কথা বলছি না, অন্য কোনাে ব্যারােঞ্চিদের কথা বলছি।

তার ইয়ার-বন্ধুরা ভেবেছিল স্কালজা হয়তাে সম্পূর্ণ নতুন কিছু বলবে। তা নয়, এই এদের কথা যাদের পরিবারের সকলেই কুৎসিত। কি বিশ্রী সব চেহারা রে বাবা! তাই স্কালজার কথা শুনে বন্ধুরা তাকে ঠাট্টা করতে আরম্ভ করলাে।

একজন বলল, তুমি যেমন ব্যারােঞ্চিদের জানাে আমিও তেমনি জানি। তুমি নিশ্চয় ঠাট্টা করছো। স্কালজা বলল, আরে না না। আমি ঠাট্টা করছি না। আমি ঠিক কথাই বলছি এবং খাটি সত্যি কথাই লছি। আমি প্রমাণ করে দেব এবং বাজি রাখতেও প্রস্তুত। বাজি আর কিছু নয়, আমি জিতলে আমাকে ও ড্রামার ছ’জন বন্ধুকে নৈশভােজে আপ্যায়িত করতে হবে। তােমরা একজনকে সালিশী মান, তিনি যে যায় দেবেন আমি তা মেনে নেব কিন্তু জিতলে, মনে থাকে যেন খাওয়াতে হবে।

খাওয়ানােটা আর কি, তুমি কিন্তু হেরে বসে আছ মিশেল। বেশ সালিশী হিসেবে আমি পিয়েরাে ডি ফিরেনটিনাের নাম প্রস্তাব করছি, বলল একজন আড্ডাধারী, যার নাম নেরি মানিনি। সকলে সমর্থন করলাে। বলতে গেলে ঐ পিয়েরাের বাড়িতেই তারা আড্ডা দিচ্ছিল কিন্তু পিয়েরাে তখন বাড়ি ছিল না।

তারা সকলে পিয়েরােকে খুঁজতে বেরােল। পথে যেতে যেতে স্কালজাকে বিদ্রুপ বাণে জর্জরিত করতে লাগলাে। বলতে লাগলাে বার বার, মিশেল তুমি হেরে বসে আছ কিন্তু দেখাে ভাই ফাকি দিয়াে না যেন, ভেজটা যেন ভালাে হয়।

স্কালজা কোনাে জবাব দিচ্ছে না, মিটিমিটি হাসছে। পিয়েরােকে খুঁজে পাওয়া গেল। সেও এক জয়গায় আড্ডা দিচ্ছিল। তাকে তার বাড়িতে এনে নেরি তাদের উদ্দেশ্যর কথা বলল। পিয়েরাে সব শুনে কালজাকে বলল, বেশ তুমি যা বলবার বলাে, দেখি তুমি তােমার বক্তব্য প্রমাণ করতে পারাে কিনা।

স্কালজা বলল, আমার বক্তব্য প্রমাণ করা অতি সহজ এবং আমি এমন নিচ্ছিদ্র প্রমাণ দেব যে, নেরি যে জোর গলায় আমাকে প্রতিবাদ করছে সে তাে বটেই এমনকি তােমরা সকলেই আমার কথা মেনে নেবে, তখন বলবে হ্যা মিশেল ঠিক বলেছে।

তাহলে শােনাে, তােমরা তাে সকলে স্বীকার করাে যে, যে পরিবার যত প্রাচীন হয় সেই পরিবারের ইত ও মহত্ত্ব তত বেশি। তাই না? আমার মতে যেহেতু ব্যারােঞ্চিরা সবচেয়ে প্রাচীন সেই হেতু ধরেই নেওয়া যায় যে তারা মহত্তম। তাহলে আমি যদি আমার বক্তব্য প্রমাণ করে দিতে পারি তাহলে আমি নিশ্চিতই বাজি জিতবাে তাে? এবং খাওয়াটাও জমবে ভালাে।

বন্ধুরা বলল, ঢের বলেছ মিশেল এবার আসল কথায় এসাে। তােমার বকবকানি শােনবার ধৈর্য আমাদের আর নেই।

মিশেল তখন বলল, বলছিরে বাবা বলছি। ঘটনাটা হল যে ঈশ্বর যখন ব্যায়ােঞ্চিদের তৈরি করেছিলেন তখন তিনি সবে মানুষ গড়তে শিখছেন, হাত তখনও পাকে নি অথচ পরে তাঁর হাত যত পেয়েছে তত তিনি ক্রমশ সুন্দর নরনারী তৈরি করতে পেরেছেন। আমার কথা যদি বিশ্বাস না হয় তাে ব্যারােল্কি পরিবারের মানুষদের দেখ। অন্য সব মানুষদের দৈহিক গঠনে যেমন একটা সামঞ্জস্য আছে ওদের তা নেই। কারও কান দুটো ছােট, নাকটা ইয়া লম্বা, ঠোট পর্যন্ত ঝুলে পড়েছে। কারও হাতজোড়া খুব ছােট, আঙুলগুলাে আবার লম্বা। বাড়ির কর্তা স্বয়ং ব্যারােঞ্চিকেই দেখ না, ওর মুখটা সামনে থেকে দেবতে একরকম, পাশ থেকে দেখতে আর-এক রকম। চোয়াল মাথার চেয়ে চওড়া, নাক ব্যাঙের মতাে। পারের চেয়ে হাত লম্বা, আর চোখ ? ইয়া বড় আর একেবারে গােল। ঠিক কিনা? কেউ কেউ সমর্থনে মাথা নাড়লাে।

মিশেল বলতে লাগল, ছােট ছেলেরা যখন ছবি আঁকে তখন তারা মানুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ চোখ কান নাক ঠিক মাপমতাে আঁকতে পারে না। ছােটবড় হয়ে যায়। তাই বলছিলুম ঈশ্বর যখন মানুষ তৈরি করতে আরম্ভ করেছিলেন তখনও তার হাত পাকে নি। ঐ শিশুর ছবি আঁকার মততা, আর সেই সময়ে তিনি ব্যারােঞ্চিদের তৈরি করেছিলেন। তাহলেই বিচার কর দেখ আমি যা বলছি তা ঠিক নি, ব্যারােঞ্চিরাই প্রাচীনতম এবং মহত্তম।

স্কালজার যুক্তি শুনে সকলে হেসে উঠলেও তার যুক্তি পিয়েরাে মেনে নিয়ে তার স্বপক্ষে রায় দিল। নেরিও হাসতে হাসতে বলল, বাহাদুর বটে মিশেল, একখানা মাথা বটে। ঠিক আছে ভাই তুমিও জিতলে। এবার তাহলে ভােজের আয়ােজন করি।

স্কালজাও বলল, তাহলে মেনে নিলে তাে শুধু ফ্লোরেন্স শহরে নয় সারা পৃথিবীতেই ব্যারােঞ্চিই সর্বাপেক্ষা প্রাচীন বংশ।

এইজন্যেই আগের গল্পে প্যানফিলাে ফরিসকে ব্যারােঞ্চির সঙ্গে তুলনা করেছিল।

 

সপ্তম গল্প

ম্যাডােনা ফিলিপ্পাকে তার স্বামী তার প্রেমিকের বাহুবন্ধনে ধরে ফেলে জেলাশাসকের কাছে নিয়ে গেল। ব্যাভিচারিনী পত্নীর শাস্তি মৃত্যুদণ্ড কিন্তু উপযুক্ত জবাব দিয়ে ম্যাডােনা নিজেকে তাে বাঁচালই এমনকি আইনেরও পরিবর্তন হল।

কিয়ামমেত্তার গল্প শেষ হতে মেয়ের দল যথারীতি খিলখিল করে হেসে উঠল। মিশেল তাে আচ্ছা যুক্তি দিয়ে বন্ধুদের মুখ বন্ধ করেছে। কুইন বলল, এবার একজন পুরুষ গল্প বলুক। কে বলবে? ফিলােস্ট্রাটো তুমিই তাহলে আরম্ভ করাে।

যথা আজ্ঞা, বলে ফিলােষ্ট্ৰাটো বান্ধবীদের দিকে চেয়ে বলল, ঠিক কথাটি বলতে পারার কৃতিত্ব নিশ্চয় খুব ভালাে। এমন উত্তর দিয়ে মানুষকে সন্তুষ্ট করা যায়, কাজ আদায় হয় কিন্তু বিপদে চরম মুহূর্তে উত্তর দিয়ে মুক্তি পাওয়া আরও কৃতিত্বের। উপস্থিত বুদ্ধি এবং সাহস দুই-ই থাকা চাই। আমি এমনই একজন মহিলার কথা বলব যে যথাসময়ে ঠিক উত্তরটি দিয়ে শ্রোতাদের হাসির খােরাক তাে জুটিয়ে ছিলই এমনকি নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকেও বাঁচাতে পেরেছিল।

প্ৰাটো শহরে একটা কড়া ও নিন্দনীয় আইন চালু ছিল। নিষ্ঠুর আইন। যদি কোনাে পত্নী ব্যাভিচারিনী হয় এবং তার স্বামী যদি জেলাশাসকের কাছে অভিযোেগ করে যে, তার পত্নী পরপুরুষের প্রতি আসক্ত বা দেহদান করে অর্থ রােজগার করছে তাহলে ঐ কড়া আইন অনুসারে পত্নীকে পুড়িয়ে মারা হবে।

সেই শহরের একজন মহিলা ঐ আইনের খপ্পরে পড়ে গেল। মহিলা সম্রান্ত বংশের, সুন্দরী তবে অত্যন্ত কামুক। তার নাম ম্যাডােনা ফিলিপ্পা।

একদিন ম্যাডােনা তার প্রেমিক ল্যাজারিনাে ডি গুয়াজ্জা গ্লিয়ােত্তিকে নিয়ে নিজের শয়নঘরে শুয়ে ছিল। ঠিক সেই সময়ে সে তার স্বামী রিনালডাে ডি পুগলিয়েসির কাছে ধরা পড়ে গেল। এই প্রেমিক-প্রেমিকা পরস্পরের প্রতি অত্যন্ত অনুরক্ত ছিল। কিন্তু স্বামী রিনালডাে তা মেনে নেবে কেন? সে দুঃখে ক্ষোভে ফেটে পড়ল এবং দু’জনকেই হত্যা করতে উদ্যত হল কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ভয়ও পেয়ে গেল। ত্যা করলে তাে নিজেকেও সাজা পেতে হবে।

অতি কষ্টে সে নিজেকে সংযত করলাে। বিশ্বাসঘাতিনী কুলটা বৌকে মারতে হবে অথচ খুন করতে পারছে না তাহলে চরমদণ্ড ভােগ করতে হবে। তাই সে সাক্ষীসাবুদ ও প্রমাণ সংগ্রহ করে পরদিনই সকালে জেলাশাসকের কাছে পত্নীর বিরুদ্ধে ব্যাভিচারের অভিযােগ করে তার নামে গ্রেপ্তারি পরােয়ানা জারী করালাে।

এখন কথা হল কি যে সব মেয়েরা পরপুরুষে আসক্ত হয় তারা অনেকেই বেপরােয়া হয়। ম্যাডােনা ফিলিপ্পা ব্যতিক্রম নয়। তার নামে যখন গ্রেপ্তারি পরােয়ানা এলাে, তখন তার বন্ধু বান্ধব ও আত্মীয়রা তাকে সতর্ক করে দিল, বলল তুমি আদালতে হাজির হয়াে না, পালিয়ে যাও।

কিন্তু ফিলিপ্পার সাহস আছে। সে বলল ভীরুর মতাে পালাবাে কেন? আমি শাসকের সামনে হাজির হবে। সব স্বীকার করবাে। শাসক আমাকে শাস্তি দিলে আমি সাহসের সঙ্গে মরবাে। আমি আমার প্রেমিকাকে ভালবাসি, তার ভালবাসার অপমান করে বিশ্বাসভঙ্গ করে আমি কেন পালিয়ে বেড়াব? পালিয়ে বেড়ানাে মানেই তাে অনিশ্চিত জীবন, এমন জীবন না রাখাই ভালাে।

ইটালিতে জেলাশাসক বা বিচারককে ‘পদেস্তা’ বলা হতাে। ম্যাডােনা আত্মসমর্পণ করতে পদেস্তার কাছে চললাে। তাকে উৎসাহ দিতে সঙ্গে পাড়া ভেঙে মেয়ে পুরুষের দলও চললাে। প্রায় সকলেই বলল, তুমি তােমার দোষ অস্বীকার করো। আবার কেউ বলল, যেমন কর্ম তেমন ফল, এখন মর গে যাও। আবার কেউ চললাে মজা দেখতে।

পদেস্তার সামনে হাজির হয়ে সােজা হয়ে দাঁড়িয়ে মাথা তুলে বুক ফুলিয়ে জিজ্ঞাসা করলাে, আমাকে আপনি কি বলতে চান? এমনভাবে কথাটা বলল যে পদেস্তাই যেন আসামী।

ম্যাডােনার পরিচয় পদেস্তা আগেই পেয়েছিলেন। সম্রান্ত ঘরের রূপবতী ও নির্ভীক এই যুবতীকে দেখে তার তেজোদীপ্ত কণ্ঠস্বর শুনে পদেস্তা তার প্রতি আকৃষ্ট হলেন। তার মনে মেয়েটির প্রতি দয়ার উদ্রেক হল। তিনি শংকিতও হলেন, মেয়েটি যদি তার অপরাধ স্বীকার করে তাহলে তাে তাকে মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে। কিন্তু আসামীকে প্রশ্ন করা ছাড়া পদেস্তার যখন উপায় নেই তখন তিনি বললেন, ম্যাডাম তোমার স্বামী রিনালডাে এই আদালতে হাজির হয়েছে। সে তােমার বিরুদ্ধে অভিযােগ করেছে যে তুমি অন্য পুরুষের সঙ্গে ব্যাভিচারে লিপ্ত। অভিযােগ গুরুতর এবং সেজন্য সে আমার কাছে আবেদন করেছে তোমাকে যেন আইনানুগ শাস্তি অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তবে একটা কথা আছে, তুমি যদি তােমার অপরাধ স্বীকার না করো তাহলে আমি তােমাকে শাস্তি দিতে পারি না। অতএব আমি তােমাকে সতর্ক পরে দিচ্ছি যে ভেবেচিন্তে বুঝেসুঝে উত্তর দেবে। এখন আমাকে বলাে তােমার স্বামীর অভিযােগ কি সত্যি?

পদেস্তা মনে মনে চাইছেন যে মেয়েটা অপরাধ অস্বীকার করুক। সতর্ক করে বা অন্য সাজা দিয়ে ছেড়ে দেবেন। আহা! এমন সুন্দরী একটা মেয়েকে পুড়িয়ে মারবার হুকুম দিতে হবে! রূপসীর কিন্তু চোখের পাতা একটুও কাপল না, কপাল ঘেমে উঠল না। নিষ্কম্প স্বরে সকলকে শুনিয়ে সে বলল, হুজুর এটা সত্যি যে, আমার স্বামী বিনালডাে গতকাল রাত্রে আমাকে আমার প্রেমিক ল্যাজারিনাের বাহবন্ধনে আবদ্ধ থাকতে দেখেছিল। যেহেতু আমি আমার প্রেমিককে ভালােবাসি সেহেতু শুধু কাল একবার নয় আমি অনেকবার তাকে নিয়ে শুয়েছি, একথা আমি অস্বীকার করবাে না। হুজুর আপনাকে আমি সামান্য নারী হয়ে কি আর বলবাে, আপনি বিচারক হয়েও নিশ্চই জানেন যে, আইনের চোখে সকলে সমান হওয়া উচিত। সে স্ত্রী হােক আর পুরুষ হােক এবং আইন প্রণয়ন করবার সময় যার সেই আইনের আওতায় আসবে, স্ত্রীপুরুষ নির্বিশেষে তাদের সকলের সম্মতি নেওয়া উচিত। কিন্তু বর্তমান এই আইনে তা করা হয়নি। পুরুষরা যেহেতু আমাদের চেয়েও শক্তিশালী এবং যখন ইচ্ছে আমাদের দুর্বলতার সুযােগ নিয়ে আমাদের দেহ উপভােগের সুযােগ নেয় সেহেতু তারা গায়ের জোরে এই একপেশে আইন আমাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছে। এই আইন চালু করবার সময় একটি মেয়েরও সম্মতি চাওয়া হয়নি, পরামর্শও করা হয়নি আর ব্যভিচার কি শুধু পত্নীরাই করে? স্বামীরা নয়? অতএব হুজুর যদি অনুমতি দেন তাে বলি এ আইন বদ আইন।

তথাপি হুজুর আমার দেহটা ছাই করে দেবার জন্যে যদি আপনার মন চায় তাহলে আমার আর কিছু বলার নেই, সেটা অবশ্যই আপনার নিজস্ব এক্তিয়ারভুক্ত। কিন্তু হুজুর আপনি আপনার রায় দেবার পূর্বে আমার একটা অনুরােধ রক্ষা করুন। আপনি দয়া করে আমার স্বামীকে জিজ্ঞাসা করুন যে, আমার এই স্বামী রিনালভাে যে আপনার সম্মুখে দণ্ডায়মান, সে আপনার প্রশ্নের উত্তরে বলুক যে যখনি সে আমার দেহ উপভােগ করতে চেয়েছে তখনি আমি আমার সারা দেহ ও মন তাকে সম্পূর্ণভাবে সমর্পণ করেছি কিনা এবং সেও পুরােপুরি উপভােগ করে তৃপ্ত হয়েছে কিনা এবং যতবার ইচ্ছা।

পদেস্তা তাকে প্রশ্ন করার আগেই রিনালডাে নিজেই উদ্যোগী হয়ে বলল, হুজুর ম্যাডােনা যথার্থই নির্ভেজাল সত্যি কথাই বলেছে। সে কখনই আমাকে ফিরিয়ে দেয় নি।

ম্যাডােনাও সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল, তাহলেই দেখুন হুজুর আমার স্বামীর আমাকে যখনই প্রয়ােজন হয়েছে তখনই আমার যতটুকু পেরেছেন নিংড়ে নিয়েছেন কিন্তু তারপরও আমার শরীরে যে রস সঞ্চিত হয় সেই রস নিয়ে আমি কি করবাে? বলুন হুজুর তা কি আমি রাস্তায় ফেলে দেব নাকি কোনাে ভদ্ৰব্যক্তি, যদি আমার প্রতি আকৃষ্ট তাকে পান করতে দিয়ে নিজেও তৃপ্ত হব? কিছু কি নষ্ট হতে দেওয়া উচিত?

ম্যাডােনা ফিলিপ্পা সম্রান্ত বংশের মেয়ে। চটুল ও রূপসী এবং সারা প্রাটো শহরে জনপ্রিয়। এ হেন সুন্দরীর বিরুদ্ধে তার স্বামী পরপুরুষের অবৈধ সম্পর্কের অভিযােগ এনেছে তাই মজা দেখতে আদালতে বেশ ভিড় হয়েছিল।

ম্যাডােনার প্রতি সহানুভূতি দেখাচ্ছিল কেউ বিদ্রুপও করছিল। কিন্তু সেই তুখােড় মেয়ে যখন মাথা উঁচু করে বুক ফুলিয়ে সব স্বীকার করে নিজেকে সমর্থন করবার জন্যে অকাট্য যুক্তি খাড়া করলাে তখন সকলে ম্যাডােনাকে অভিনন্দন জানাল। বলল ম্যাডােনা ফিলিপ্পা ঠিকই বলেছে। মেয়েরা বলল, আইন কি শুধু মেয়েদেরই শাস্তি দেবার জন্যে? পুরুষরা তাে কত মেয়ের সর্বনাশ করে দিব্যি বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়, তার বেলা? ম্যাডােনা ঠিকই বলেছে, আইনাের মুখােশ খুলে দিয়েছে।

পদেস্তারও সুন্দরী ম্যাডােনাকে দেখা ইস্তক শাস্তি দিতে ইচ্ছে ছিল না, এখন তাে তার জোরালাে যুক্তি শুনে তাকে মুক্তি দিলেন। আইনও বদলানাে হল। এবার থেকে যেসব বিবাহিত মহিলা পরপুরুষদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করবে কেবল তারাই শাস্তি পাবে।

রিনালডাে বেচারা হেরে গিয়ে মাথা নিচু করে আদালত থেকে বেরিয়ে গেল আর ম্যাডােনা ফিলিপ্পা বিজয়িনীর মতাে মাথা উঁচু করে ঘরে ফিরে গেল।

 

অষ্টম গল্প

ফ্রেস্কো তার ভাইঝিকে বলল যদি তুই কুরূপ মানুষ দেখলে ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিস তাহলে আয়নায় আর নিজের চেহারাটাও দেখিস না।

ফিলােস্ট্রাটোর গল্প শুনে মহিলারা অসােয়াস্তি বােধ করতে লাগল। লজ্জায় কারও গাল লাল ছােপ পড়ল। কে জানে সে নিজেই হয়তাে অপরাধী। তারা পরস্পরের দিকে অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে চাইতে লাগল। তারপর হঠাৎই এ ওর গায়ে ঢলে পড়ে হাসতে লাগলাে, যাকে বলে হাসির ফোয়ারা। কুইন নিজেও হাসছিল। তারপর সামলে নিয়ে এমিলিয়াকে বললেন, কী গাে সুন্দরী উসখুস করছ কেন? যদি ইচ্ছে হয়ে থাকে তাে আমাদের গল্প শােনাও। এমিলিয়া একটু অন্যমনস্ক ছিল, আগের গল্পটাই ওর মাথায় ঘুরছিল। কুইনের কথা শুনে সহসা যেন জেগে উঠে বলল, ও? গল্প? বেশ তাে, বলবাে বই কি। জানি তাে এবার আমার পালা তবে ফিলেস্ট্রাটোর গল্পর মেয়েটার তেজ আর সাহসের প্রশংসা করতে হয় যদিও ওর ব্যবহার সমর্থন করি না।।

মাথায় তাে অনেকগুলাে গল্প ভিড় করছিল কিন্তু সেগুলাে গুলিয়ে গেছে। এখন যেটা মনে পড়ছে। সেটা বলছি। মূখই বলো আর অহংকারীই বলাে, এক ভাইঝি ছিল। তাকে তার কাকা এমন একটা সরস উক্তি দিয়ে ধাক্কা দিল যে ভাইঝি জব্দ।

একসময় ফ্রেস্কো ডা চিলাটিচো নামে এক ভদ্রলােক ছিলেন। তার এক ন্যাকা ভাইঝি ছিল, ডাক নাম চেসকা। তার চেহারা ভালােই ছিল, সুগঠনা, মুখশ্রীও ভালাে ছিল তাই বলে তাকে সুন্দরী বা রূপসী বলা যায় না কিন্তু তার ধারণা তার মতাে সুন্দরী বুঝি আর কেউ নেই। তার বয়সী মেয়েদের তাে বটেই এমনকি যে কোনাে নারী বা পুরুষের চেহারা সে নিন্দা করতাে। অমুক যেন ঘােড়ামুখী, অমুকের কান দুটো গাধার মতাে, মেয়েটা হাঁটছে দেখ যেন সাঁতার কাটছে আর ঐ লােকটা যেন ব্যাঙ। এইরকম আর কি। তার চোখে সকলে কুরূপা বা কুরূপ। অথচ নিজেকে মােটামুটি দেখতে ভালাে হলেও চেহারার যে অনেক ত্রুটি ছিল সেদিকে তার মন ছিল না। আর অপরকে দেখে নাক সিটকাতে আর ঠোট বাঁকাতে বাঁকাতে তার নিজের মুখখানাও ক্রমশ বিকৃত হয়ে উঠেছিল।

চেসকার কথা বলার ধরনও ভালাে ছিল না। সবসময়ে পরনিন্দা, এজন্যে সকলে তাকে এড়িয়ে চলতাে। তবুও সামনে যাকে পেত তাকেই কারও না কারও বিষয়ে নিন্দা করতাে। আর যে মেয়েটিকে ধরে কথা বলছে একটু আগেই হয়তাে আর কারও কাছে তার নিন্দা করেছে। এককথায় চেসকার চোখে কেউ সুরূপ ছিল না।

একদিন পােড়া বেড়িয়ে কুটকচালি করে বাড়ি ফিরে দেখল তার কাকা বাড়িতে রয়েছে। সেদিন চেসকার মেজাজটাও ভালাে ছিল না কারণ কোনাে মেয়ে হয়তাে তাকে দুটো উচিত কথা শুনিয়ে দিয়েছিল।

কাকাকে দেখে তার পাশের চেয়ারটায় ধপ করে বসে ফুসতে লাগল। কাকা মনে মনে বুঝল আজ একটা কিছু হয়েছে। ভাইঝির আঁতে কেউ ঘা দিয়েছে।

ভাইঝিকে বলল, আজ একটা পার্বণের দিন না? তা তুমি যে এত তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরলে? কি

হল ?

চেসকা তাে ঝাজিয়ে উঠল, হবে আবার কি? আমার মাথা আর মুণ্ডু। একটাও কি ভালো লােক নেই, যেমন বচন তেমন দর্শন। একজনের যদি নাক-খাদা তাে ওরটা টিয়াপাখির মতাে। এনার রংটা আলকাতরার মতাে হলেও দুটো মিষ্টি কথা বলেন কিন্তু উনি? যেন কালকেউটে। কথা বলেছ কি না বলেছ অমনি ফোস করে ওঠে আর দেখতে কি কদাকার, সবসময়ে মুখ বেঁকিয়েই আছেন।

ফ্রেসকো মনে মনে বেশ কৌতুক অনুভব করে বলল, যা বলেছ চেসকা, তােমার তাে দেখছি অনেক গুণ আছে। লােকের মুখ দেখেই তার মনের ভেতরটাও দেখতে পাও বা একনজরে তার চেহারাটা ও মুখভঙ্গি দেখে ফেলতে পারাে। সত্যিই এ শহরে সুন্দর দূরের কথা মুখখানা অন্তত দেখতে ভালাে তেমন মানুষ একটাও নেই। কি আফশােস। তা চেসকা তুমি যখন রাস্তায় বেরিয়ে সুন্দর নর বা নারী দেখতেই পাও না তখন একটা কাজ কোরাে, রােজ বেরােবার আগে আয়নায় নিজের মুখখানা বেশ ভালাে করে খুঁটিয়ে দেখে বেড়িও মনে শান্তি পাবে। বুঝলে? তবে তার চেয়ে ভালাে হবে যদি আয়নায় নিজের মুখখানা একবার যাচাই করে নাও !

কিন্তু চেসকা নিজেকে সলােমনের তুল্য বুদ্ধিমতী ভাবলে কি হবে? মাথায় তাে কিছুই নেই তাই কাকার ইঙ্গিত বুঝতে পারলাে না। সে বলল, ঠিক বলেছ কাকা, তােমার কথামতাে বেরােবার আগে নিজের মুখখানা দেখে বেরােব তাহলে সেই তুলনায় অপরের মুখও বিচার করতে পারব।

অতত্রব চেসকার কোনাে পরিবর্তন হল না। সে যেমন ন্যাকা, বােকা আর আত্মম্ভরী ছিল তেমনি রইল।

 

নবম গল্প

গুইডাে কেভালকান্টি বেকায়দায় পড়েছে মনে করে ফ্লোরেন্সের কয়েকজন ভদ্ৰব্যক্তি তার প্রতি বিদ্রুপ করে কিন্তু গুইডাে তাদের উপযুক্ত জবাব দিয়ে চুপ করিয়ে দেয়।

এমিলিয়ার গল্প শেষ হয়ে গেল। কুইন সকলের মুখের দিকে চেয়ে দেখলাে গল্প বলতে বাকি আছে শুধু দু’জন। তখন কুইন বলল, এবার তাহলে আমাকেই গল্প বলতে হবে? বেশ বলছি কিন্তু যে দুটো গল্প আমি বলবাে ভেবেছিলুম তা তাে দেখছি তােমাদের মধ্যে দু’জন বলেই ফেলেছ। ঠিক আছে, আমি অন্য একটা ছােট গল্প বলছি। তােমরা দেখাে এই গল্পের শেষটা একটু অন্যরকম। তবে আজ শেষ গল্পটা যেন বড় হয়।

আমি প্রথমেই তােমাদের মনে করিয়ে দিতে চাই যে, আমাদের শহরে অনেক প্রশংসনীয় রীতিনীতি ও আচার ব্যবহার প্রচলিত ছিল যেজন্যে শহরটি খ্যাতি অর্জন করেছিল কিন্তু শহর যখন ক্রমশ সমৃদ্ধশালী হয়ে উঠতে লাগল, ধন ও ধনীর সংখ্যা বাড়তে লাগল, মানুষ ক্রমশ লােভী হয়ে উঠতে লাগলাে এবং যেসব সগুণের জন্যে শহর খ্যাতি অর্জন করেছিল সেইসব খ্যাতি অখ্যাতির পর্যায়ে নামতে লাগল।

শহরে একটা একদা রীতি প্রচলিত ছিল শহরের বিভিন্ন অঞ্চলের বিভিন্ন পাড়ায় কয়েকজন ভদ্রলােক কারও না কারও বাড়িতে নিয়মিতভাবে নির্দিষ্ট দিনে মিলিত হতাে। সঙ্গীত ও অন্যান্য আমােদ-প্রমােদের ব্যবস্থা থাকতাে এবং চর্বচোষ্য লেহ্যপেয় বিবিধ ভােজের বিপুল আয়ােজন করা হতো।

বলা বাহুল্য এমন আমােদ-প্রমােদ ও প্রচুর খানাপিনার আয়ােজন ধনী ব্যক্তিরাই করতে পারতেন, সেই জন্যে এই সীমিত কয়েকজন ব্যক্তির মধ্যেই আবদ্ধ ছিল এবং তারাই নিজ নিজ বাড়িতে পালাক্রমে এমন অনুষ্ঠানের আয়ােজন করতাে। তবে এরা একটা কাজ করতেন। প্রত্যেক অনুষ্ঠানে শহরের কোনাে বিশিষ্ট ও গুণী ব্যক্তিকেও আমন্ত্রণ জানাতেন।

এসব তাে হতােই, এছাড়া তাদের কয়েকটা বৈশিষ্ট্য ছিল যেমন বছরের একদিন অন্তত তারা সকলে একই রকম পােশাকে নিজেদের সজ্জিত করতাে। তারপর কোনাে স্মরণীয় তারিখে অর্থাৎ বিখ্যাত কোনাে যুদ্ধজয়ের তারিখে বা অন্য কোনাে উপলক্ষে তারা সকলে ঘােড়ায় চেপে শহরে শােভাযাত্রা বার করতাে। ব্যতিক্রমও ছিল যেমন কোনাে উল্লেখযােগ্য ঘটনা ঘটল বা বিশেষ কোনাে সুসংবাদ এলাে তখন তারা বাদ্যযন্ত্র সহযােগে অশ্বারােহীর শােভাযাত্রা বার করতাে এবং ভােজের আয়ােজন করা হতাে।

এই সব গন্যমান্য ব্যক্তিদের মধ্যে কোনাে এক পল্লীর আড্ডাধারী বেত্তো ব্ৰনেলেসচির দলে ভােলকান্টি ডি ভােলকান্টির ছেলে গুইডােকে আনা হল। সেও অন্যতম আড্ডাধারী হল আর কি। গুইডােরও সদ্গুণ ছিল, লেখাপড়া জানত, দর্শনশাস্ত্র উত্তমরূপে আয়ত্ত করেছিল যে, সে ভালাে তার্কিক রূপে পরিচিত ছিল। তার অন্যান্য পুরুষােচিত গুণও ছিল। কথাবার্তা, আচার-আচরণে তার খুত হল না। কিন্তু বেত্তো ও তার দলের অন্যান্যরা তার এই গুণের বিষয় অবগত থাকলেও এগুলির প্রতি গুরুত্ব আরােপ করতাে না।

গুইডাে রীতিমতাে ধনী ছিল এবং বন্ধুদের আপ্যায়িত করবার জন্যে গুরু ভােজনের আয়ােজন রতাে। তার আতিথ্যে সকলে মুগ্ধ হতাে।

সকলের সঙ্গে গুইডোের সদ্ভাব ছিল এবং অপরের সঙ্গে তার আচরণ মােটেই নিন্দনীয় ছিল না। তথাপি অনেক চেষ্টা করেও বেত্তো তার অন্তরঙ্গ বা ঘনিষ্ঠ হতে পারে নি। কারণ বােধহয় এই যে, ইডের কিছু নিজস্ব মতামত ছিল। দার্শনিক এপিকিউরিয়সের ভাবধারা গুইডােকে আকৃষ্ট করতাে। গুইডাে আমােদ-প্রমােদ ও পানভােজন সম্পর্কে অত্যন্ত সুরুচিসম্পন্ন ও বিলাসপ্রিয় ছিল। খাও দাও নৃত্য করে মনের আনন্দে, এইরকম ভাব আর কি। বেত্তো বােধহয় এতটা বাড়াবাড়ি পছন্দ করতাে না, তাই গুইতের সঙ্গে তার অন্তরঙ্গতা হয়নি তথাপি পরস্পরকে অবহেলা করতাে না। এছাড়া বেত্তোর ধারণা ছিল যে যারা দার্শনিক এপিকিউরিয়সের মতাবলম্বী তারা ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাসী নয় এইজন্যেই হতে যাকে বলে ঘনিষ্ঠতা সেটা এই দু’জনের মধ্যে গড়ে ওঠে নি।

একদিন গুইডাে অরসাম্মিশেল থেকে করসােদেগলি আদিমারির পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে স্যান গিওভানি পর্যন্ত পৌঁছে গেল। এই পথটা তার প্রিয়, প্রায়ই এধারে আসে। এই স্যান গিওভানি থেকে সান্টা রিপার্টা পর্যন্ত রাস্তার দু’ধারে অনেক কবরখানা তাছে। কবরখানাগুলি সুসজ্জিত। মারবেলের অনেক স্মৃতিচিহ্ন ও মূর্তি আছে। পুষ্পশােভিত বাগান তাে আছেই।

একটি কবরখানার ভেতর ঢুকে সে যখন মারবেলের মূর্তি ও স্তম্ভগুলির আশেপাশে বেড়াতে। সেগুলি দেখছে ঠিক সেইসময়ে বেত্তো তার সহচরদের সঙ্গে সেই পথ দিয়ে ঘােড়ায় চেপে ফিরছিল। গুইডােকে দেখতে পেয়ে বেত্তো ঘােড় থামাল।

বেত্তোর মাথায় দুষ্টবুদ্ধি এলাে। সে তার সঙ্গীদের বলল, চলাে তাে আমরা গুইডাের সঙ্গে একটা মজা করি।

ওরা ঘােড়া চালিয়ে গুইডাের কাছে গেল। বেত্তো বলল, কি ভায়া গুইডাে তুমি তাে ঈশ্বত্বে অস্তিত্বের বিশ্বাস করাে না, তা এই কবরখানায় কি ঈশ্বরের সঙ্গে দেখা করতে এসেছ নাকি ? ঈশ্বর তােমাকে কিছু বললেন নাকি?

গুইডাে এই প্রশ্নের সরাসরি জবাব না দিয়ে বলল, তােমরা ভাই তােমাদের বাড়িতে আমাকে যা ইচ্ছে বলতে পারাে।

তারপর গুইডাে একটা লম্বা স্মৃতিস্তম্ভের ওপর ভর দিয়ে ডিগবাজি খেয়ে কবরখানার রেলিং ভিঙিয়ে রাস্তায় এসে নিজের পথ ধরে চলতে লাগল। আপাতত সে বেত্তোদের এড়িয়ে চায় আর কি।

বেত্তো ও তার সঙ্গীরা পরস্পরের মুখ চাওয়াচায়ি করতে লাগল ও বলাবলি করতে লাগল গুইডাের বােধহয় এখন মাথা ঠিক নেই। গুইডাের মন্তব্যটা তারা ধরতেও পারে নি। এই কবরখানার জমির মালিক কেউ নয়, গুইডাে নয় বেত্তো বা কোনাে নাগরিক নয় অতএব এটা বেত্তোর বাড়ি বা তার ভূসম্পত্তি নয়, এখানে অন্য কিছু বলা উচিত নয়।

বেত্তো বুঝতে পেরেছিল। সে তার সহচরদের বললাে, গুইডাে যা বললাে তার অর্থ তােমরা বােঝে নি, তােমাদেরই মাথা ঠিক নেই। গুইডাে বলতে চেয়েছে যে এটা শুধু গােরস্থান নয়, এটা মৃত ব্যক্তিদের আবাসস্থান, তারা এখানে বসবাস করছে। এটা আমার বাড়ি নয় এই কথা বলে সে আমাকে ব্যঙ্গ করেই বলেছে যে পরের বাড়িতে কাউকে যা ইচ্ছে বলার অধিকার নেই।

সহচররা গুইডাের বাক্যর মর্মার্থ বুঝতে পেরে লজ্জিত হল এবং তারপর তারা গুইডােকে আর ঘাটাতে সাহস করে নি। তারা বুঝতে পেরেছিল গুইডাে তাদের চেয়েও জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান।

 

দশম গল্প

একজন যাজক ফ্রায়ার চিপােলা কয়েকজন গ্রাম্য ব্যক্তিকে শপথ নিয়ে বলল যে সে তাদের দেবদূত গেব্রিয়েলের ডানার পালক দেখাবে। কিন্তু যেখানে সেই পালক থাকবার কথা সেখানে কয়েক টুকরাে পােড়া কয়লা দেখতে পেয়ে বলল সেন্ট লরেন্সকে যে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল এগুলি হল তার দগ্ধাংশ।

নজন সঙ্গীর তাে গল্প বলা হয়ে গেল, বাকি রইল ডায়ােনিও। গল্প বলার জন্যে রানীকে তাকে আর আদেশ দিতে হল না। সে বুঝতেই পারল এবার তার পালা। তখনও গুইডাের উত্তর নিয়ে আলােচনা চলছিল। ডায়ােনিও তাদের বলল, এই তােমরা এবার চুপ করাে। আমি গল্প আরম্ভ করবে।

ডায়ােনিও আরম্ভ করলাে, বুঝলে কিনা আমার সুন্দরী বান্ধবীরা আর বন্ধুরা, আমি যদিও নানা বিষয়ে গল্প বলতে পারি তবুও রানীর নির্দেশ এবং যে মর্মে গল্পগুলি বলে এসেছে তা উপেক্ষা বা

৪০৬

তার বাইরে যেতে পারি না সেইজন্যে আমিও তােমাদের অনুরূপ একটি গল্প শােনাব। ভারী মজার গল্প। দু’জন যুবক সেন্ট অ্যান্টনির একজন যাজককে ফাঁদে ফেলবার চেষ্টা করেছিল, প্রায় সফলও হয়েছিল কিন্তু যাজকও কম ধূর্ত নয়। শুনেই দেখাে না। তবে সবিস্তারে বলতে গেলে মাথার ওপর সূর্য উঠে যাবে তাই ছােট করেইবলবাে যাতে আমাদের ধৈর্যচ্যুতি না হয় অথচ গল্পটাও শুনতে ভালাে লাগে। তােমাদের ভালাে লাগলে আমারও ভালাে লাগবে।

ফ্লোরেন্স জেলার অন্তর্গত ভ্যাল ডি’ এলসা মহকুমায় চেরটালডাে গ্রামের নাম তােমাদের অজানা হওয়ার কথা নয়। গ্রামটা ছােট কিন্তু গ্রামের মানুষদের অবস্থা একদা স্বচ্ছল ছিল। ঘরে ঘরে সারা বছরের যদিদ্রব্য মজুত থাকতাে। দারিদ্র কী তারা জানতাে না।

সেন্ট অ্যান্টনি সম্প্রদায়ের একজন যাজক প্রতি বছর এই গ্রামে চাঁদা তুলতে আসতাে কারণ সে জানতাে এই গ্রামের মানুষরা তাকে ফিরিয়ে দেয় না। সে তার ধর্মসম্প্রদায়ের নামে চাঁদা তুলতাে কিন্তু আসলে তা নিজের ভােগে লাগাতাে। গ্রামের সরল মানুষেরা এসব না বুঝে যাজককে কখনও ফিরিয়ে দিতাে না, তারা নিয়মিত চাঁদা দিয়ে যেত। গ্রামেরমানুষেরা যাজকের একটা ডাকনাম দিয়েছিল, ফাদার চিপােলা, বাংলা করলে পেঁয়াজি বাবা। ঐ অঞ্চলে এত পেঁয়াজ জন্মত যে, সারা টাসকানি বিভাগের লােক পেঁয়াজ খেয়ে শেষ করতে পারতাে না। গ্রামে এলেই ছেলেছােকরারা পেঁয়াজি বাবা এসেছে রে বলে তার আশেপাশে ভিড় করতাে। পেঁয়াজি বাবা বেশ জনপ্রিয় ছিল।

ছােটখাটো হাসিখুশি বেশ মিশুকে ছিল। বাবার মাথার চুল ছিল যা সেই গ্রামে আর কারও ছিল না। বাবার প্রতি কৌতূহলের এটা একটা কারণ। পেঁয়াজি বাবা লেখাপড়া জানত আর এমন চমৎকার কথা বলতে পারতাে যে, মানুষ সহজেই তার প্রতি সহজে আকৃষ্ট হতাে। বাবা কী জানত না! কবে জোয়ারভাটা হবে, কবে অমাবস্যা পূর্ণিমা, যীশু কাকে কি উপদেশ দিয়েছিলেন,দশ আজ্ঞা সবই বাবা জানত। এইটুকু মাথায় এতরকম জিনিস থাকে কী করে? বাবা নিশ্চই পণ্ডিত সিসেরাে বা কুইনটিলিয়ানের সমতুল্য। সারা জেলার মানুষ মনে করতে পেঁয়াজি বাবা তাদের শুভার্থী ও বন্ধু।

বৎসরান্তে অগস্ট মাসের এক রবিবারে পেঁয়াজি বাবা যথারীতি এসেছেন। রবিবার, তাই তিনি গির্জায় সারমন বা ধর্মোপদেশ দেবেন। সারমন শুনতে ব্রহ্মসঙ্গীতের মতাে একঘেয়ে লাগলেও গ্রামের লেক গির্জায় ভিড় জমাতাে। বছরে একবার বই তাে নয়।

ধর্মোপদেশ দিতে দিতে ফাদার চিপােলা একসময়ে গ্রামবাসীদের উদ্দেশ করে বলল, তােমরা তাে জান বছরে তােমাদের কাছে আমি কেন একবার আসি। আমাদের মাথার ওপর আছে প্রভু সেন্ট অ্যান্টনি, তিনি তােমাদের গবাদি পশু ও ফসল রক্ষা করেন তাই তাঁর সেবার জন্যে তােমরা তােমাদের সমার্থ অনুযায়ী যথাসাধ্য গম ও ওট দিয়ে আসছে। তােমাদের কাছ থেকে আমি এগুলি সংগ্রহ করে নিয়ে গিয়ে মাস্টার অ্যাবটের কাছে জমা দিই, বলতে কি তিনিই আমাকে তােমাদের কাছে পাঠান।

আজও দ্বিপ্রহরে গির্জার ঘণ্টাধ্বনি শুনে তােমরা গির্জা প্রাঙ্গণে সমবেত হবে কারণ আমি জানি তােমরা প্রভু সেন্ট আণ্টনির প্রতি নিবিড়ভাবে অনুরক্ত এবং তার সেবার জন্য যথাসাধ্য দান নিয়ে সংসৰে। তােমরা পবিত্র কুস চুম্বন করবে, আমি বাইবেল পাঠ করবাে এবং তােমাদের উদারতার প্রতিদানস্বরূপ তােমাদের আমি একটি অমূল্য জিনিস দেখাবাে যেটি আমি সাগর পার হয়ে পড়ি ভূমি থেকে এনেছি।

সকলে উৎসুক হয়ে প্রশ্ন করে জিনিসটি কি?

চিপপালাে বলে, ব্যস্ত হােয়াে না। তােমাদের দেখাব বলেই তাে সেটি এনেছি। পবিত্র নাজারে শহরে দেবদূত গেব্রিয়েল যেদিন মেরিমাতার গৃহে প্রবেশ করে তাকে সাধিকা ও সাধ্বী রমণী বলে ঘােষণা করে গেলেন সেইদিনই গেব্রিয়েল তার ডানার কয়েকটি পালক মেরিতার গৃহে ফেলে যান। আমি একটিমাত্র পালক সংগ্রহ করেছি এবং সেটি সযত্বে রক্ষা করে আসছি। আজ দ্বিপ্রহরে সমাবেশ সেটি আমি তােমাদের দেখাব। তােমরা ধন্য হবে।

সমবেত ভক্তবৃন্দ চিপােলােকে সাধুবাদ জানিয়ে প্রদত্ত ধর্মোপদেশের বাকি অংশ শুনতে লাগল।

এখন ঐ জনতার মধ্যে দু’জন ধূর্ত যুবক ছিল। একজনের নাম গিওভানি ডেল ব্রাগােনিয়ে আর অপরজনের নাম বিয়াজিয়াে পিজ্ঞিনি, সংক্ষেপে গিওভানি এবং বিয়াজিয়। এই দুই বন্ধুর সঙ্গে পেঁয়াজি বাবার সদ্ভাব ছিল। ওরা কিন্তু বাবার ঐ দেবদূতের ডানার পালকের কথা একবিন্দু বিশ্বাস করলাে না। দুই বন্ধুতে চুপিচুপি পরামর্শ করলাে চিগ্রোলাের সঙ্গে একটু মজা করা কে পালক নিয়ে ওকে জব্দ করতে হবে, ওর বুজরুকি ভাঙতে হবে।

এই দুই বন্ধু জানে যে তাদের বন্ধু চিপােলাে সকালে গির্জায় এই প্রার্থনাসভার পর এক ধনী বন্ধুর প্রাসাদে যাবে, সেখানে তার প্রাতরাশের নিমন্ত্রণ আছে। ওরা দুই বন্ধু গিভানি ও বিয়াজি পরামর্শ করলাে চিপােলাে যখন তার বন্ধুর সঙ্গে প্রাতরাশ সারবে ওরা দুই বন্ধু তখন চিপােলাে যাে সরাইখানায় বাসা নিয়েছে সেই সরাইখানায় ঢুকে ওর ব্যাগ থেকে পালকটা চুরি করবে। চিপেলো ভক্তদের বলেছে বিকেলের প্রার্থনাসভায় সে তাদের সেই দুর্লভ পালকটি দেখাবে।

চিপােলাে সঙ্গে একজন পরিচারক এনেছিল। দুই বন্ধু মতলব আঁটল বিয়াজিও পরিচারককে ঘর থেকে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে গিয়ে গল্প জমাবে আর সেই ফাকে গিওভানি চিপােলাের ব্যাগ হাতড়ে দেবদূত গেব্রিয়েলের পালক চুরি করবে। তারপর প্রার্থনাসভায় ওরা চিপােলাের অসহায় অবস্থাটা উপভােগ করবে, চিপপালাে কি ধাপ্পা দেয় তা শুনতে হবে।।

পেঁয়াজি বাবার পরিচারকটির নাম গুচ্চিও বলে না। আরও নাম আছে তার গুচ্চিও ইমব্রাত্তা, গুচ্চিও পােরচো? একটি চিজ বটে। যেমন চেহারা তেমন বুদ্ধি। কুরুচিপূর্ণ অশ্লীল গল্প বলতে ওস্তাদ যদিও সেসব গল্পের মাথামুণ্ডু খুঁজে পাওয়া যায় না। তখনকার ব্যঙ্গচিত্রকর লিপ্পো টোপােকেও সে হার মানায়। স্থূল রসিকতায় লিপ্পো ছিল অদ্বিতীয়, সাধারণ লােকে বলতে শুচ্চিওর কাছে লিপ্পো কিছু নয়।

আর স্বয়ং চিপােললা তার এই গােবরগণেশ পরিচাটি সম্বন্ধে কি বলতাে? বলতাে আমার এই গুচ্চিও এমন কতকগুলি গুণের অধিকারী যেসব গুণের কোনাে একটা পেলে সলােমন, অ্যারিস বা সেলেকার মতাে মহাজ্ঞানীরা বর্তে যেতাে, কথাটা চিপপালাে ব্যঙ্গ করেই বলতাে। তা সেই গুনের আধার গুচ্চিওর গুণগুলি কি? মিথ্যা বলতে তার জুড়ি নেই, কুঁড়াের বেহদ্দ অতএব যে কোনো কাজে অবহেলা করবেই। স্মরণশক্তি কাকে বলে সে জানে না, কিছুই সে মনে রাখতে পাবে না। অবাধ্য, কথা শােনে না। অমনােযােগী। মানুষের সঙ্গে ভদ্রভাবে আচরণ করতে বা কথা বলতে জানে না আর তার বুদ্ধি বা বিবেচনা? না বলাই ভালাে। একটি রত্নবিশেষ।

এখানেই শেষ নয়। তার চেহারার বর্ণনা দেবার সাধ্য আমার নেই। তার ধারণা বুঝি সে রূপবান যুবক, মেয়েরা তাকে দেখলেই তার প্রেমে পড়ে। কোনাে মেয়ে তাকে উপেক্ষা করে চলে গেলে এবং মেয়েরা প্রায়ই তাই করে, তখন গুচ্চিও দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে মেয়েটিকে পাগলের মতাে অনুসরণ করে কিন্তু এদিকে যে তার প্যান্ট খুলে যাচ্ছে সেদিকে খেয়াল থাকে না। তবু মায়া তার ত্যাগ করা ভার বড় পুরাতন ভৃত্য। তাকে কোনাে কথা বলে যদি সতর্ক করে দেওয়া হয় যে, খরার একথা কাউকে বলিস না, বলা বাহুল্য সে কথা অচিরেই প্রচার হয়ে যায়। তাই তাকে বিপরীতভাবেই বলতে হয় যে তােকে যা বললুম তা যেন সকলকে শুনিয়ে দিস।।

সরাইখানা থেকে গির্জায় যাবার আগে চিপােলা তার গুণধরকে বারবার বলে গেল আমার ঘরে কাউকে ঢুকতে দেবে না আর যদিও বা কেউ ঢুকে পড়ে তাে সাবধান, আমার ব্যাগে যেন হাত না দেয়। মনে থাকবে?

গুচ্চিও এক গাল হেসে বলে, কি যে বলেন কর্তা, এ আর মনে থাকবে না? প্রাণ যায় তবু ভালাে কিন্তু কাউকে আপনার ঘরের চৌকাট ডিঙোতে দেবাে না।

কিন্তু চিপােলা গির্জা থেকে বেরিয়ে দশ কদম গেছে কিনা গেছে গুচ্চিও গিয়ে হাজির হয়েছে সরাইখানার রান্নাঘরে। চিপােলা জেনেশুনেই কেমন একজন দায়িত্বশীল ভূত্যের ওপর তার দামী সমপত্তির ভার দিয়ে গেছে!

তা গুচ্চিও রান্নাঘরে গিয়ে হাজির হল কেন? পেটুক? কিছু খাবার লােভে? মােটেই তা নয়। রান্নাঘরে একটি মেয়েমানুষ কাজ করে। তার সঙ্গে ফস্টিনস্টি করবার মতলবে গুচ্চিও রান্নাঘরে হাজির হয়েছে। মেয়েটির যৌবন পার হয়েছে, একে বেঁটে তায় মােটা, স্তন দুটি লাউয়ের মতাে। রান্নাঘরের গরমে তার জামা সব সময়ে ঘামে ভেজা, দু’একটা দাঁতও বুঝি নেই, যে ক’টা আছে সে ক’টাও কালাে।

যেমন দেবা তেমনি দেবী। এ বলে আমায় দেখাে, তাে ও বলে আমায় দেখাে, একেবারে রাজঘােটক।

গুচ্চিও সেই রমণীরত্নর সঙ্গে ভাব জমিয়েছে। তাকে লােভ দেখায় তাকে সে শিগগির এই গরম আর ভ্যাপসা রান্নাঘর থেকে নিজের বাসায় নিয়ে যাবে, সে বাসা নাকি এই সরাইখানার তুলনায় স্বর্গ। তার থলে ভর্তি অনেক ফ্লোরিন আছে। তাকে সে রানীর হালে রাখবে। সেই রমণীর নাম নিউটা।

গিওভানি আর বিয়াজিয়ে সরাইখানায় গিয়ে দেখলাে চিপােলাের সেই নির্ভরযােগ্য ভৃত্য গুচ্চিও রন্ধনশালার পরিচারিকার সঙ্গে বেশ ভাব জমিয়েছে। দু’জনে গল্পেও মশগুল, কোনােদিকে ভ্ৰক্ষেপ নেই। দুই বন্ধু দেখলাে অর্ধেক কাজ তাে গুচ্চিও করেই রেখেছে। তখন ওরা দু’জন চিপােলাের ঘরে ঢুকলো। দরজা তাে খােলাই ছিল, গুচ্চিও চাবিতালা লাগানাে দূরের কথা, দরজাটা বন্ধ করে শেকলও তুলে দেয়নি।

তারা দুজনে ঘরে ঢুকে চিপােলাের ব্যাগ খুললাে, ব্যাগের জিনিসপত্তরের মধ্যে সিল্ক দিয়ে মোড় ছােট এক চামড়ার ব্যাগ ছিল। সেটা খুলতে দেখা গেল ভেতরে একটি পালক রয়েছে। এই বুঝি দেবদূত গেব্রিয়েলের ডানার পালক? ছাই! এটি সাধারণ একটি কাকাতুয়ার পালক। এই পালকটাকেই চিপােল গেব্রিয়েলের পালক বলে চালাবে। ইস্ আমাদের পেঁয়াজি বাবার কি মহিমা!

ভক্তরাও তাই বিশ্বাস করবে কারণ এই গ্রামের লােকগুলি সরল এবং অধিকাংশ দরিদ্র। তারা গ্রামের বাইরে যায় না, শহরের মানুষের খবর রাখে না। শহরের মানুষ যে কত ধূর্ত হতে পারে এ খবর তারা রাখে না।

চিপােলার ভণ্ডামি দেখে দুই বন্ধু তাে একচোট হাসলাে। তারপর ঠিক করলাে এমন মানুষকে জব্দ করাই উচিত। তারা পালকটিকে সরিয়ে তার জায়গায় কয়েক টুকরাে কাঠকয়লা রেখে দিল। ঘরের এক কোণে একটা ঝুড়িতে কিছু কাঠকয়লা মজুত ছিল।

গ্রামের মানুষগুলি তখনও পর্যন্ত কাকাতুয়া দেখে নি আর কাকাতুয়ার পালক কেমন দেখতে হয় তাও তারা জানে না। তবে পাখির পালক তারা চেনে। এমন চিপােলাে পালকের বদলে কাঠকয়লার অস্তিত্ব কি করে বােঝাবে অনুমান করে দুই বন্ধু আবার হাসাহাসি করতে লাগলাে।

সকালের চেয়ে বিকেলের প্রার্থনাসভায় বেশি ভিড় হয়েছে কারণ গ্রামের সকল লােকরাই ইতিমধ্যে শুনেছে যে তাদের প্রিয় পেঁয়াজিবাবা তাদের দেবদূতের পবিত্র পালক দেখাবে। সকলে এসেছে দেবদূতের পবিত্র পালক দেখতে। না জানি সে পালক কেমন, সােনার, রুপাের, রত্নখচিত? তার রং-ই বা কি রকম। নরনারীর মনে তীব্র কৌতূহল।

বন্ধুর প্রাসাদে ভােজন সেরে সরাইখানায় ফিরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে পেঁয়াজিবাবা তার ব্যাগটি নিয়ে বিকেলের দিকে গির্জার দিকে অগ্রসর হল। ব্যাগটা একবার খুলেও দেখলাে না। বিশ্বস্ত পরিচারকের হাতে মূল্যবান সম্পত্তির ভার দিয়ে গেছে। সব ঠিক আছে, খুলে দেখবার বা সন্দেহ করবার প্রশ্নই ওঠে না। নিশ্চিন্ত হয়ে ব্যাগ হাতে প্রার্থনাসভায় সে উপস্থিত হল।

কিছুক্ষণ ধর্মোপদেশ দিল। তারপর দেবদূত গেব্রিয়েলের মেরি মাতার গৃহে তার আসবাব কি কারণ ঘটেছিল সেসব কাহিনী বলে তার ব্যাগ খুলে ভেতর থেকে সিল্কে মােড়া ছােট ব্যাগটি বার করে সে এবার পবিত্র পালক দেখাবে।

জনগণের মধ্যে দারুণ কৌতূহল। সমস্ত সভা নিস্তব্ধ এমনকি অনেকে নিশ্বাস ফেলছে না। সকলে করজোড়ে অপেক্ষা করতে লাগলাে, কেউ বা মনে মনে প্রার্থনাও করছে। অনেকে বুকে ক্রুশ চিহ্ন আঁকছে। এইবার, এইবার তাদের নয়ন সার্থক হবে।

পেয়াজিবাবা চিপােলা ব্যাগ খুললেন। ভেতরে হাতও ঢােকালেন কিন্তু একি? পালক কোথায়? এ তাে কয়েক টুকরাে কাঠকয়লা।

চিপােলাে মুখচোখের ভাব আড়ষ্ট দেখে জনগণের মধ্যেও সন্দেহ জেগেছে। তবে কি পালক নেই? তারা অতি সরল। দেবদূত কি একসময়ে পালকটি আবার অজ্ঞাতসারে ফিরিয়ে নিয়ে গেছেন? নাকি অন্য কিছু? জনতার মধ্যে মৃদু গুঞ্জন।

চিপােলাে কিন্তু তার পরিচারক গুচ্চিওকে সন্দেহ করছে না কারণ সে জানে গুচ্চিও দায়িত্বজ্ঞানহীন, ফাকিবাজ কিন্তু পালক সরবার মতাে বুদ্ধি তার নেই। অবশ্য তারই অবহেলার জন্যে কাণ্ডটা ঘটেছে।

পেঁয়াজিবাবা ভীষণ ধূর্ত। সে তৎক্ষণাৎ নিজেকে সামলে নিয়ে আকাশের দিকে মুখ তুলে দুই হাত জোড় করে প্রার্থনার ভঙ্গিতে বলল, হে মহামহিম সর্বশক্তিমান ঈশ্বর তােমার উদ্দেশ্য ও শক্তি উপলব্ধি করবার ক্ষমতা আমার মতাে অতি ক্ষুদ্র মানুষের নেই। তােমার পদতলে আমরা শক্তিহীন।

তারপর থলেটি বন্ধ করে জনগণকে উদ্দেশ্য করে বলল, সমবেত ভদ্রমহােদয় ও শ্রদ্ধেয় মহিলাবৃন্দ, আমি যখন বালক ছিলুম তখন পাের্চেলানার সুযােগ নিতে আমার গুরুজনরা আমাকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন। তখন যাজকদের মধ্যে পাের্চেলানা অর্থাৎ সমকামিতা ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। কতদেশেই না গেলুম। ভেনিস থেকে যাত্রা করে গ্রীস দেশে ক্যালেণ্ডা তারপর অ্যালজেব্রা রাজ্য এবং বর্ভেলাে ও বেডলাম পার হয়ে আমি একদিন সারডিনটিনিয়াতে উপস্থিত হলুম। তখন আমি ভীষণ তৃষ্ণার্ত।

তৃষ্ণা নিবারণ করে বিশ্রাম নিয়ে আবার যাত্রা। কত শহর পার হলুম। পেনুরি প্রণালী পার হয়ে গেলুম ফানল্যাণ্ড ও লাফল্যাণ্ড। দু’টি শহরই জনবসতিপূর্ণ। অবশেষে যে শহরে থামলুম তার নাম লায়ারল্যাণ্ড। সেখানে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের যাজকদের মধ্যে আমার সম্প্রদায়ের যাজকদেরও দেখা পেলুম। এরা কেউই ঈশ্বরপ্রেমী বা ধর্মপ্রবণ নয়, সকলেই নিজ নিজ বিশ্বাস ও ইচ্ছামতাে জীবনযাপন করছে। আমার অনেক অভিজ্ঞতা সঞ্চয় হল, কত কি দেখলুম, শুনলুম ও বুঝলুম।

ওদেশ থেকে এলুম এক পাহাড়ী দেশে যার নাম আব্রুজ্জি। এদেশ থেকে বাস্ক নামে পাহাড়ের দেশে। তারপর সেখানে কিছুদিন কাটিয়ে গেলুম পার্সনিপিনডিয়াতে। আমি আমার ধর্মীয় পবিত্র পােশাক স্পর্শ করে শপথ করে বলছি যে এখানের আকাশে আমি যে কত রকমের পাখি উড়তে আর কত বিচিত্র বর্ণের পালক ভাসতে দেখলুম সে আর কি বলবাে। আমার কথা বিশ্বাস না হলে তােমার ওখানকার নামী ব্যবসায়ী মাসসা ডেল সাজ্জিওকে জিজ্ঞাসা করতে পারাে।

এই দেশের পর আমি আর অগ্রসর হতে পারিনি কারণ পায়ে হাঁটা পথ ফুরিয়েছে, এবার যেতে হলে জলপথে যেতে হবে তাই আমি পবিত্র তীর্থ জেরুজালেমে এলুম। মজা এই যে এখানে একখানা ঠাণ্ডা রুটির দাম চার পেন্স আর গরম রুটি কিনতে দাম লাগে না। এই তীর্থভূমিতে আমি রেভারেণ্ড ফাদার বেসসােনিডাস তােকুকরসেমেনাের দর্শন লাভ করলুম। তার তুল্য মহামান্য জেরুজালেম দ্বিতীয় কেউ নেই, আমি ধন্য হলুম।। আমার সঙ্গে সেণ্ট আণ্টনির রীতির অঙ্গাবরণ লক্ষ্য করে তিনি পরম প্রীত হলেন এবং অতীতের সাধুপুরুষদের যেসব স্মৃতিচিহ্ন তার সংগ্রহে ছিল সেগুলি আমাকে অত্যন্ত যত্নসহকারে দেখালেন। সেগুলি সংখ্যায় এত বেশি যে, তার সম্পূর্ণ তালিকা দেওয়া এখন সম্ভব নয়। তবে এসব বিষয়ে মহিলারা অত্যন্ত আগ্রহী। আমি তাদের নিরাশ করতে চাই না তাই তাদের কৌতূহল নিরসনের জন্যে মাত্র কয়েকটির নাম উল্লেখ করছি।

প্রথমে তিনি আমাকে দেখালেন হােলি ঘােস্টের পবিত্র একটি আঙুল। তারপর দেখালেন সেন্ট ফ্রান্সিসকে যে সেরাফ দর্শন দিয়েছিলেন তার মস্তকের কেশগুচ্ছ। দেবদূত বিশেষ চেরাবের নখ, একটি শিশিতে রক্ষিত সেন্ট মাইকেলের ঘর্ম; যখন সেন্ট মাইকেল শয়তানের সঙ্গে লড়াই করেছিলেন এবং তার দেহ থেকে যে ঘর্ম নির্গত এ সেই ঘর্ম, সেন্ট ল্যাজেরাসের কাছ থেকে প্রাপ্ত যমদূতের চোয়াল এবং আরও কতাে কি।

আমার মুখ থেকে কিছু স্তোত্র ও শ্লোক শুনে পরম প্রীত হয়ে তিনি আমাকেও কয়েকটি সামগ্রী উপহার দিলেন যথা হােলি ক্রসের একটি অংশ, একটি শিশিতে রক্ষিত সলােমনের মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি জনৈক পুণ্যাত্মার স্যাণ্ডাল এবং দেবদূত গেব্রিয়েলের যে পালকের কথা তােমাদের বলছিলুম সেই একটি পালক।

ঐ যে পুণ্যাত্মার স্যাণ্ডালের কথা বললুম সেটি আমি ফ্লোরেন্সের সাধু ঘেরাডাে ডি বােনসিকে উপহার দিয়েছিলুম। তিনি প্রীত হয়ে আমাকে কয়েক টুকরাে কাঠকয়লা দিয়েছিলেন। সেগুলি সাধারণ কাঠকয়লা নয়। সেন্ট লরেন্স শহীদ হয়েছিলেন, এ তাে তােমরা জান, তাকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল। যে কাঠ দিয়ে তাকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল এই কয়লা হল সেই কাঠের অঙ্গার। এইসবই আমি সর্বদা অত্যন্ত যত্নের সহিত বহন করি, সর্বদা সঙ্গে রাখি।

কিন্তু আমার গুরুর আদেশ ছিল যে, আমি যেন সেগুলি না দেখাই কারণ তিনি সেইসব স্মৃতিচিহ্নের যথার্থ্য নির্ণয় করেছিলেন এবং যখন তিনি নিশ্চিত হলেন যে এগুলি খাঁটি ও অকৃত্রিম তখনই তিনি সাধারণ্যে এগুলি প্রদর্শনের অনুমতি দিয়েছেন। এগুলি রক্ষা করার ভার আমি বিশ্বাস করে কাউকে অর্পণ করতে পারি নি, আমি নিজেই সেগুলি নিজের জিম্মায় রাখি। এগুলি এতই বিরল ও মূল্যবান যে আমি অপর কাউকে বিশ্বাস করতে পারি না।

এখন ঘটনা হয়েছে কি যে আমি দেবদূত গেব্রিয়েলের ডানার পালক এবং সেন্ট লরেন্সের পবিত্র অঙ্গার যে দুটি থলিতে রাখি এবং সিল্কের কাপড় দিয়ে মুড়ে রাখি সে দুটি এতই অভিন্ন যে আমি নিজেই তাদের পার্থক্য বুঝতে পারি না এবং খুলে না দেখলে কোনটিতে কি আছে তাও ধরতে পারি না। আর সেই ভুলই আজ আমার হয়েছে। আমি গেব্রিয়েলের থলি আনতে ভুলে সেন্ট লরেলের থলি নিয়ে এসেছি।

আমার মনে হচ্ছে ভুল করলেও ঈশ্বরের ইচ্ছায় ভুল হয়েছে কারণ সেই মহামহিম ঈশ্বরের ইচ্ছা যে তােমরা সাধু সেন্ট লরেন্সের পবিত্র অঙ্গারগুলি অবলােকন করে নয়ন সার্থক করাে। পবিত্র পালক দেখার সৌভাগ্য অনেকের হয়েছে কিন্তু এই পূত অঙ্গার দেখার সৌভাগ্য জনসাধারণের হয়নি। তােমরা ভাগ্যবান তােমরা সেগুলি দেখে পুণ্য সঞ্চয় করবে।

এই প্রসঙ্গে তােমাদের একটা কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। আমি যাদের পােশাকে ও অঙ্গাববণে এই অঙ্গার দিয়ে ক্রুস চিহ্ন একে দেবো আগামী এক বৎসরের মধ্যে আগুন তাদের স্পর্শ করতে পারবে না এবং দগ্ধ হওয়ারও সম্ভাবনা থাকবে না। অপরা মহিমা এই অঙ্গারের।

পেয়াজিবাবা তার দীর্ঘ ভাষণ শেষ করে সেন্ট লরেন্সের স্মরণে স্তোত্র পাঠ করে থলি খুলে অঙ্গারগুলি দেখালাে। সমবেত দর্শক ও শ্রোতামণ্ডলী সেন্ট লরেন্সের জয়ধ্বনি করে উঠলাে। তারপর সেই সরল গ্রামবাসীরা পেঁয়াজিবাবাকে অনুরােধ করলাে সেই অঙ্গার দ্বারা তাদের অঙ্গাবরণে ক্রুস চিহ্ন একে দিতে। তদনুসারে তারা সারিবদ্ধভাবে পেঁয়াজিবাবার কাছে আসতে লাগলাে আর পেয়াজিবাবা তাদের অঙ্গাবরণে ক্রুস চিহ্ন এঁকে দিতে দিতে বললাে, তােমরা মনে করছাে দাগ কাটতে কাটতে এই অঙ্গার ক্ষয় হচ্ছে? ঠিক, ক্ষয় হচ্ছে কিন্তু এগুলিকে এদের পাত্রে রেখে দিলে আবার নিজ নিজ আকার ফিরে পাবে। সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের কি মহিমা!

ইস পেঁয়াজিবাবা না ঘাবড়িয়ে কি ধোকাটাই না দিল! তার যে দু’জন বন্ধু তাকে ঠকাবার চেষ্টা করেছিল তারা নিজেরাই এখন ঠকে গেল। তারা বুঝলাে এই ধূর্ত লােকের সঙ্গে এটে ওঠা সম্ভব নয় কিন্তু পরে তারা চিপােলার কাছে সব স্বীকার করে খুব হাসাহাসি করেছিল এবং পালকটি তাকে ফেরত দিয়েছিল। চিপােলা পর বৎসর চেরটালডাে গ্রামে ফিরে এসে সেই পালক দেখিয়েছিল এবং সরল গ্রামবাসীরা বিশ্বাসও করেছিল যে এই পালক সত্যিই দেবদূত গেব্রিয়েলের ডানার পবিত্র পালক। তারা ধন্য।

ডায়ােনিওর গল্প শুনে সকলে বেশ মজা অনুভব করলাে, বাঃ বেশ গল্প, চিপােলাে সত্যিই পেয়াজিবাবা, কি পেঁয়াজিটাই না শেষ পর্যন্ত করলাে। দুই দোস্তকে বুড়বাক বানিয়ে দিল ইত্যাদি মন্তব্য করতে লাগলাে।

কুইন এলিসার দিন শেষ হল। দশজনের দশটা গল্প বলাও শেষ হল আর যষ্ঠ দিনও শেষ হল। কাল থেকে সপ্তম দিন, অন্য একজন রানী বা রাজা হবে। রানীরাই তাে সংখ্যায় বেশি, তা এবার একজন রাজা হােক।

এলিসার চোখ পড়ল ডায়ােনিওর ওপর। শেষ গল্পটা সে বেশ জমিয়ে বলেছে, ওকেই কালকের রাজা করা হােক। এলিসা তখন হেসে নিজের মাথা থেকে মুকুট খুলে ডায়ােনিওর মাথায় পরিয়ে দিয়ে বললাে, তােমার মাথায় মুকুট পরিয়ে দিলুম। দলে আমরা মেয়েরা ভারি, পাখির মতাে কিচিমিচি, দেখব তুমি কি করে রাজত্ব চালাবে। ঠিকঠাক চালাতে পারলে অবশ্যই তুমি আমাদের প্রশংসা পাবে, নেচে গেয়ে আমরা তােমাকে সম্বর্ধনা জানাবাে।

ডায়ােনিও এলিসা ও মেয়েদের ধন্যবাদ জানিয়ে বললাে, নিশ্চই, আমি তােমাদের উপযুক্ত সম্মান জানাবাে। আমার দায়িত্ব পালন করতে যথাসাধ্য চেষ্টা করবাে অবশ্য তােমরাও আমার সঙ্গে সহযােগিতা করবে।

এরপর নতুন রাজা পরদিনের কার্যক্রম স্থির করে দিয়ে বলল, আমি কালকের গল্পর এমন একটা বিষয় নির্বাচন করে দেব যে, গল্পগুলি যদি তােমরা জমিয়ে বলতে পারাে তাহলে দারুণ মজাদার হবে।

একজন মহিলা হেসে জিজ্ঞাসা করলাে, শুনি তুমি কি বিষয়ে গল্প বলতে বলবে? ডায়েনানিও বললাে, ফ্লোরেন্সে একটা কথা চালু আছে যে কোনাে মেয়ে বিয়ের রাত্রে তার স্বামীর কাছে যখন যায় সে তখন কুমারী নয়। তার কুমারীত্ব আগেই অপহৃত হয়েছে। মেয়ের দল রৈরৈ করে উঠলাে, এ তুমি কি বল ডায়ােনিও, না না এ আমরা মানতে রাজি নই, তুমি অন্য বিষয় ঠিক করো।

আহা তােমরা রাগ করছাে বা লজ্জা পাচ্ছ কেন? সব মেয়েই কি এমন না সব পুরুস খারাপ। বেশ তােমরা যদি লজ্জা পাও বা অপমানিত বােধ করাে তাহলে বিষয়টা আমি একটু বদলে দিচ্ছি। প্রেমের ব্যাপারে কোনাে বিবাহিতা নারী যদি অন্যায় করে, তার স্বামী যদি তাকে সন্দেহ করে বা ধরা পড়ে যায় তাহলে কি কৌশলে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করে সেই বিষয়েই গল্প বলো। বিবাহিত নরনারী বা অবিবাহিত প্রেমিক-প্রেমিকাদের নিয়েও গল্প বলতে পারো। এতে তােমাদের আপত্তি নেই তো?

কোনাে কোনাে মেয়ের গাল লাল হয়েছিল, তারা মৃদু আপত্তিও করেছিল কিন্তু ডায়োনিও তাদের বােঝাল যে এই প্রকার গল্প থেকে আমরা শিক্ষা গ্রহণ করতে পারবো এবং বেশির ভাগ যখন বিষয়টি সমর্থন করলাে তখন যারা আপত্তি করেছিল তারাও রাজি হয়ে গেল।

সকলে রাজি হতে ডায়োনিও বললাে, আমি তাে জানি সকলে রাজি হবে কারণ আমাদের মত যারা আছি সকলেই সম্রান্ত বংশের পুত্রকন্যা। কারও ব্যবহার অশালীন নয় এবং এখানে এসে পর্যন্ত এই কয়দিনের মধ্যে কেউ কারও বিরুদ্ধে কোনাে রকম অসদাচরণের অভিযােগ আনে নি। কেউ কেউ রাজি না হলে আমি মনে করতুম কারও মনে পাপ আছে। দিনটা আমরা উপভােগ্য গল্প শুনে যাতে হলে কাটতে পারি তাই তাে আমি এইরকম একটা বিষয় নির্বাচন করলুম। আমাদের নিজেদের অভিজ্ঞ এরকম কিছু ঘটেনি কিন্তু এরকম ছলনার কত ঘটনাই তাে ঘটে এবং আমরা সকলেই কিছু না কিছু শুনেছি, তাই নয় কি? যাই হােক খাবারের এখনও দেরি আছে ততক্ষণ যার যেমন ইচ্ছে সেইভাবেই সময়টা কাটাও।

ডায়ােনিও তার দুই বন্ধুকে নিয়ে পাশা খেলতে আরম্ভ করলাে। এলিসা তার বান্ধবদের বলে, চলাে কাছেই পাহাড় আর গাছের ছায়াঘেরা খুব সুন্দর একটা জায়গা আছে। আজ বড় গরম। চল সবাই সেখানে গিয়ে গাছের ছায়ায় বসে শীতল বাতাসে দেহ ঠাণ্ডা করে আসি।

এলিসা বললাে, জায়গাটা আমি দেখেছি, অত্যন্ত রমণীয় পরিবেশ। বলতে কি জায়গাটাকে সুন্দরীদের উপত্যকা বললে বাড়িয়ে বলা হবে না। চলাে ঘুরে আসি।

ছেলেদের কিছু না জানিয়ে ওরা একজন পরিচারিকাকে সঙ্গে নিয়ে সেই উপত্যকার দিকে চললল। ওখানে পৌছে ওরা দেখলাে জায়গাটার নিসর্গ সৌন্দর্য সত্যিই উপভােগ করবার মতাে। চারদিকে কত রকমের গাছ ও কত রঙিন ফুলের মেলা। মাঝখান দিয়ে একটা পাহাড়ী নদী কুল কুলু করে বয়ে চলেছে, স্বচ্ছ জল, নদীর তলদেশ পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। কত রকম ছােট ছােট মাছ নির্ভয়ে সাঁতার কাটছে। ডালে ডালে পাখির নাচ আর কলকাকলি, কত রঙের প্রজাপতি ফুলের মতাে উড়ে বেড়াচ্ছে। স্পর্শ করে দেখলাে জল শীতল।

নির্জন জায়গা। সাতটি মেয়ে ও তাদের পরিচারিকা ছাড়া আর কেউ নেই। তিনজন যুবক আছে। সেই বাগানে, তারা এখন পাশা খেলায় মত্ত। দিনটা গরম। নদীর এই শীতল জলে স্নান করলে কেমন হয়? একজন প্রস্তাব করতেই সকলে কলকল করে সায় দিল।

তখন এলিসা পরিচারিকাকে বললাে, তুই এই সরু পথের মাথায় গিয়ে পাহারা দে। আমরা আমাদের পােশাক খুলে রেখে নদীতে স্নান করবাে।

উন্মুক্ত প্রকৃতিতে উন্মুক্ত হয়ে স্নান করার আনন্দই আলাদা। বাড়িতে গােপালগন্ধ জলভর্তি বাথটবে মান করেও এমন আনন্দ পাওয়া যায় না। একেই বুঝি বলে স্নান বিলাস। স্নান করতে করতে তারা মাছ ধরে, ছেড়ে দেয়। এ এক খেলা।

একসময় ওদের স্নান শেষ হয়। জল থেকে ডাঙায় উঠে নগ্নদেহ শীতল হাওয়ায় শুকিয়ে নেয়। দেহও শীতল হয়, তারপর নিজ নিজ পােশাক পরে নিয়ে বাগানে ফিরে এসে দেখে তখনও যুবকেরা পাশা খেলছে।

প্যামপিনিয়া ওদের বলল, আজ তােমাদের আমরা হারিয়ে দিয়েছি। ডায়ােনিও বলল, কি? আমাদের সঙ্গে না খেলেই আমাদের হারিয়ে দিলে?

প্যামপিনিয়া বলল, না মশাই এ তােমাদের এই পাশা খেলার হারজিত নয়। আমরা এমন একটা সুন্দর জায়গায় গিয়ে স্নান করে দেহ শীতল করে এলুম যে তার কথা কি আর বলবাে। গেলে বুঝতে।

প্যামপিনিয়ার কাছে বিবরণ শুনে যুবকেরা বলল, আমাদেরও তাে লােভ লাগছে কিন্তু এখন যে ভীষণ ক্ষিধে পেয়েছে। তাহলে আগে খেয়ে নেওয়া যাক, তারপর আমরা তিনজন সেই নদীতে গিয়ে স্নান করে আসবাে।

ডায়ােনিও খাবার টেবিল সাজাতে বলল, সেদিন একটু অন্য ধরনের রান্না হয়েছিল, নতুন পদ, সকলে বেশ তৃপ্তি করে খেল।।

একটু বিশ্রাম নিয়ে ছেলেরা সেই উপত্যকায় গিয়ে স্নান করে ফিরে এসে বলল, অপূর্ব, লােভনীয়। এমন সুন্দর উপত্যকা কোথাও দেখিনি। ইচ্ছে করছে ঐখানে গিয়ে কুটির বেঁধে থাকি।

একজন যুবতী বলল, তাহলে আর দেখতে হবে না। একে একে কুটির বাঁধতে বাধতে জায়গাটা কুটিরেই ভরে যাবে। পাখির ঝাক পালাবে, নদীর জল ঘােলা হবে। ও যেমন কুমারী আছে তেমনি ওকে থাকতে দাও।

দুপুরে সকলে জায়গা বেছে নিয়ে কিছুক্ষণ নিদ্রা দিল। বিকেলে কিছু জলপানের পর কিছুক্ষণ নৃত্যগীত ও বাদ্যযন্ত্রের সুমধুর তান শােনা গেল।

সন্ধ্যার পর সুরা ও মিষ্টান্ন পরিবেশন করা হল। তারপর প্যানফিলাে একটা নাচ দেখাল। এরপর ডায়ােনিও এলিসাকে উদ্দেশ করে বলল, যে আজ আমার মাথায় রাজমুকুট পরিয়ে দিয়েছে তাকে আনি অনুরােধ করছি তার সুললিত কণ্ঠে আমাদের একটি গান শােনাতে। – একটু মৃদু হেসে এলিসা তার সুরেলা কণ্ঠে চমৎকার একটি প্রেমসঙ্গীত শােনাল। গানখানি কারও উদ্দেশ্যে গাওয়া কিন্তু কার উদ্দেশ্যে তা বােঝা গেল না। এরপর সমবেত কণ্ঠে কিছুক্ষণ গান ও কয়েকজনের বাদ্যযন্ত্র শােনার পর রাত্রের আহার ও পরে শয়ন।

॥ ডেকামেরনের ষষ্ঠ দিন সমাপ্ত হল ॥

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *