খাজুরাহ সুন্দরী – হিমাদ্রিকিশাের দাশগুপ্ত

›› উপন্যাসের অংশ বিশেষ  

…..মাহবা বলছিল মন্দিরগাত্রের ওই শূন্য খােপ-তাকগুলাে নাকি ভরাট করা হবে সুরসুন্দরী আর মিথুনমূর্তি দিয়ে। মন্দির বা স্থাপত্যে মিথুনমূর্তি থাকলে নাকি বজ্রপাত হয় না। তাই স্থাপন করা হবে মিথুনমূর্তি। যাতে হাজার বছর পরও প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা পায় চান্দেলরাজদের মন্দিরময় রাজধানী খর্জুরবাহকের এই মহাদেব মন্দির।….

……যাদের আনা হয়েছে তাদের বয়স, পােশাক, গাত্রবর্ণের ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও তাদের দেখে রাহিলসহ উপস্থিত সবাই একটা ব্যাপার স্পষ্ট উপলব্ধি করল, এই নারীরা তাদের অঙ্গসৌষ্ঠব বা মুখমণ্ডলের দিক থেকে প্রত্যেকেই আসামান্যা রূপসি। হাজারও মলিনতা, বিষণ্ণতা সত্ত্বেও সৌন্দর্য যেন চুইয়ে পড়ছে তাদের দেহ বেয়ে। সবাই বেশ কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল তাদের দিকে। এরা কি মানবী, নাকি শাপভ্রষ্টা অপ্সরা আকাশ থেকে খসে পড়েছে ধূলা-মলিন পৃথিবীতে।…..

….বিকর্না প্রথমে সেই অষ্টাদশী যুবতীর কাছে গিয়ে পােশাকের ওপর দিয়ে তার বুকে, নিতম্বে, পেটে, উরুতে হাত দিয়ে টিপে টিপে কী যেন পরীক্ষা করল। তারপর একইভাবে পরীক্ষা শুরু করল অন্য নারীদেরও করল, এদের এখানে আনা হল কেন? দেবদাসী বানাবার জন্য,

চলতে চলতে প্রধান ভাস্কর জবাব দিলেন, না, দেবদাসী নয়, এ দেখে সুরসুন্দরীদের মূর্তি রচনা করবেন ভাস্কররা। বিশ্বফলের মতাে ক্ষীণ কটি, গভীর নাভিকুণ্ডু, ভারী বীণার মতাে নিতম্বযুক্ত এইসব নারীদের বাছাই করে আনা হয়েছে মগধ, উজ্জয়িনী, কামরূপ, কনৌজ, ত্রিপুরীর দাসবাজার থেকে। এদের কাউকে কাউকে মিথুন ভাস্কর্য বা যৌন ভাস্কর্য নির্মাণের কাজেও ব্যবহার করা হবে। তবে চূড়ান্ত নির্বাচন পর্ব এখন হয়নি। সে পর্বে এদের মধ্যে যারা নির্বাচিত হবে তারাই সুরসুন্দরী হবে। বাকিরা দাসী হবে, সুরসুন্দরীদের পরিচর্যা করবে, প্রয়ােজনে ভাস্করদের মনােরঞ্জন করবে। কাশ্মীর, উৎকল, ত্রিগর্ভ, চালুক, গন্ডরাজ্য, পশ্চিম উপকূলের বহু জাতির নারী আছে এই দলে।….

….চিত্রবান এরপর প্রথম প্রশ্নর জবাবে বললেন, ‘সুরসুন্দরীদের মূর্তি নির্মাণের ক্ষেত্রে বক্ষসৌন্দর্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সেই সৌন্দর্যই পরীক্ষা করা হবে এবার।…..বিকর্না প্রথমে এক নারীকে এনে দাঁড় করাল বৃত্তর ঠিক মাঝখানে। তারপর কোমর থেকে ছুরি বার করল। তা দেখেই থরথর করে কাঁপতে শুরু করল মেয়েটা। বিকর্না ছুরি দিয়ে চিরে ফেলল তার উর্ধ্বাঙ্গের পােশাক, খসিয়ে ফেলল তার বক্ষ আবরণী। এতজন পুরুষের চোখের সামনে উন্মুক্ত হয়ে গেল তার ঊর্ধ্বাঙ্গ।

শঙ্খের মতাে তার স্তন চেয়ে আছে আকাশের দিকে, ক্ষীন কটিদেশে নাভিকূপ এত গভীর যে সূর্যালােক সেখানে প্রবেশ করতে পারছে না। এত সৌন্দর্য কোনও নারীর হতে পারে! মেয়েটা একবার চেষ্টা করল দু-হাত দিয়ে তার স্তনযুগলকে আড়াল করার জন্য। কিন্তু বিকর্না এক ঝটকায় তার মৃণালবাহুদুটোকে দু-পাশে নামিয়ে দিল। তারপর ভঙ্গি করে দেখাল কীভাবে বুক চিতিয়ে স্থিরভাবে দাঁড়াতে হবে আকাশের দিকে মুখ তুলে। চোখ বন্ধ করে আকাশের দিকে মুখ করে সেভাবেই দাঁড়াল সেই যুবতী। শুধু লজ্জা, অপমানে তার চোখের কোণ বেয়ে পাথুরে মাটিতে গড়িয়ে পড়ল কয়েক ফোটা অশ্রুবিন্দু। উপস্থিত সবাই তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখতে লাগল তাকে। তার উন্মুক্ত অঙ্গের প্রতিটা খাজ, প্রতিটা বাঁক ছুঁয়ে যেতে লাগল ভাস্করদের চোখ।

রাহিলের কিন্তু বেশ অস্বস্তি হল এই দৃশ্য দেখে। উন্মুক্ত বক্ষ অনেক দেখেছে রাহিল।…..

……বেশ কিছুক্ষণ সেই অপরূপাকে পর্যবেক্ষণ করার পর প্রধান ভাস্কর তার পােশাকের ভিতর থেকে একটা ক্ষুদ্র গােলক বার করলেন। আকারে সেটা কবুতরের ডিমের মতাে হবে। তবে নিটোল গােলক। সম্ভবত হীরক গােলক হবে। সূর্যালােকে ঝলমল করছে সেটা। বৃত্তের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা যুবতীর দিকে কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে তাকালেন তিনি। তারপর অদ্ভুতভাবে গােলকটা নিক্ষেপ করলেন নির্দিষ্ট লক্ষ্যে।  গােলকটা ঠিক গিয়ে পড়ল যুবতীর উন্মুক্ত দুই বক্ষের ঠিক মাঝখানে। তারপর আটকে গেল সেখানেই। তা দেখে ধীরে ধীরে হাসি ফুটে উঠল প্রধান ভাস্করের ঠোটের কোণে। হাসি ফুটে উঠল অন্যদের ঠোটেও। রাহিল অনুমান করল সম্ভবত নির্বাচিত করা হল এই রমণীকে। বিকর্না তার বক্ষ থেকে সেই হীরক-গােলক তুলে নিয়ে প্রধান ভাস্করের দিকে তাকাল। তিনি ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ তুলে ধরলেন উপর দিকে। বিকর্না সেই গােলক ভাস্করের হাতে সমর্পণ করে পরীক্ষিত সেই নারীকে বৃত্তের বাইরে একপাশে দাঁড় করাল। তারপর নিয়ে এল আর এক নারীকে। তারও ঊর্ধ্বাঙ্গ উন্মােচন করে ছুড়ে দেওয়া হল গােলক। সে-ও বক্ষে ধারণ করল সেই গােলক।

পরীক্ষা পর্ব চলতে লাগল। মাথার ওপরের সূর্যও পশ্চিমে এগােতে শুরু করল। মাঝে একজন রমনীর দুই বক্ষর মাঝ দিয়ে গােলক গিয়ে পড়ল নীচে। সঙ্গে সঙ্গে চিত্রবান বৃদ্ধাঙ্গুল নীচের দিকে প্রদর্শন করতে তাকে অন্যপাশে দাঁড় করানাে হল।

পরীক্ষাপদ্ধতিটা বােধগম্য হল রাহিলের। যে নারীর দুই স্তন ঘন সন্নিবিষ্ট, যাদের মধ্যে দিয়ে গােলক গড়িয়ে নীচে পড়ছে না তাদের নির্বাচন করা হচ্ছে সুরসুন্দরী রূপে। আর যাদের স্তন বিশ্বের ন্যায় বর্তুলাকার বা শঙ্খের ন্যায়- উদ্ভিন্ন হলেও স্তনযুগল ঘন সন্নিবিষ্ট নয় তাদের নির্বাচিত করা হচ্ছে দাসী হিসাবে। সত্যি অদ্ভুত এই বক্ষসৌন্দর্য পরিমাপের কৌশল!

অধিকাংশ নারীরাই নির্বাচিত হচ্ছে পরীক্ষায়। ক্রমশ চওড়া হচ্ছে। চিত্রবানের ঠোটের কোণে হাসি।…..

….নবাগতাদের প্রাথমিক শঙ্কা, মৃত্যুভয় সম্ভবত কিছুটা কেটে গেল ভবিতব্যকেও মেনে নিয়েছে তারা। বিকর্নার ইশারায় একে একে দাঁড়াচ্ছে বৃত্তের মাঝখানে। উন্মােচিত করছে তার বক্ষবন্ধনী। আত্মসমর্পন করছে পুরুষের দৃষ্টির কাছে। সেই শুভ্রবর্ণা অপরূপাও এগিয়ে গেল বৃত্তের দিকে। বৃত্তের ভিতর প্রবেশ করেই সে ঘুরে দাঁড়াল প্রধান ভাস্করের দিকে। তারপর মাথা ঝুকিয়ে সম্ভাষণ জানাল চিত্রবান ও অনুদেবকে উদ্দেশ্য করে। এ কাজ ইতিপূর্বে অন্য কোনও নারী করেনি। তাকে দেখে চিত্রবানদের মনে হল এতক্ষণ যাদের তাঁরা দেখেছেন তাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা সুন্দরী এই নারী। মাথায় একরাশ কুঞ্চিত ঘন কৃষ্ণবর্ণের কেশদাম, গাত্রবর্ণ রক্তাভ শঙ্খের ন্যায় উজ্জ্বল, টিকালাে নাসা, ফুলের পাপড়ির মতাে ওষ্ঠাধার, বক্ষাবরণী যেন ধরে রাখতে পারছে না তার যৌবনকে।

ঘন সন্নিবিষ্ট স্তনযুগলের উপরিভাগে গিরি-খাদের মতাে বিভাজিকার দুর্নিবার হাতছানি, ক্ষীণ কটিদেশে আবৃত স্বচ্ছ রেশমবস্ত্রকে অতিক্রম করে দৃশ্যমান হচ্ছে গভীর নাভিকূপ। মৃদঙ্গর মতাে নিতম্ব, মৃণালবাহু, কদলিবৃক্ষর মতাে উরুসম্মিলিত সেই নারীর দিকে চেয়ে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন। চিত্রবান আর প্রধান পুরােহিত। এ কি মানবী নাকি স্বর্গের অপ্সরা নেমে আসছে মন্দির-প্রাঙ্গণে ! কোনও উপমাতেই তার সৌন্দর্য বিশ্লেষণ করা যায় না! তাদের বিমােহিত দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে যেন হাসি ফুটে উঠল সেই নারীর দীঘল হরিণী চোখে।…….

……চান্দেল মহারাজ চন্দ্রবর্মনের এখানে এই নগরী প্রতিষ্ঠানের পিছনে পৌরাণিক আখ্যান আছে। সৈনিক রাহিলও শুনেছে সে গল্প—প্রাচীনকালে বারাণসীর গাহিরওয়াড়রাজ ইন্দ্রজিতের গৃহদেবতার পূজারি ছিলেন হেমরাজ নামে এক ব্রাহ্মণ। তার কন্যা হেমবতী ছিলেন বালবিধবা। তাঁর সঙ্গে দেহমিলনের আগেই মৃত্যু হয় তার স্বামীর। উদ্ভিন্ন যৌবনের অধিকারী হেমবতী বঞ্চিত ছিলেন পুরুষ-স্পর্শ থেকে।

এক রাতে পদ্ম সরােবরে স্নান করতে নেমেছেন হেমবতী। মাথার ওপর চন্দ্রদেব তখন বেরিয়েছেন নৈশ অভিসারে। তিনি হঠাৎ ওপর থেকে কমল সরােবরে দেখতে পেলেন সেই নগ্নিকাকে। কে এই রূপসি নারী? যাঁর যৌবনের কাছে ম্লান হয়ে যাচ্ছে চন্দ্রালােকে প্রস্ফুটিত সেই পদ্মও ? অপরূপার শুভ্র শঙ্খের মতাে স্তনযুগল যেন তাকিয়ে আছে আকাশের দিকেই। তার রূপে মুগ্ধ হয়ে চন্দ্রদেব নেমে এলেন মাটিতে। নগ্নিকা তখন জানু পর্যন্ত জলে ডুবিয়ে আপন খেয়ালে জলক্রীড়ায় মেতে আছেন সেই সরােবরে। এমন সময় চন্দ্রদেব গিয়ে আলিঙ্গন করলেন তাকে।

পুরুষের প্রথম স্পর্শে জেগে উঠল নারী শরীর। হেমবতী তাঁর মৃণালবাহু দিয়ে চন্দ্রদেবের গলা আলিঙ্গন করলেন। মিলিত হল দুজনের ওষ্ঠ-শরীর। সারা রাত ধরে চলল সেই রতিক্রীড়া। একসময় চন্দ্রদেবের ফিরে যাবার সময় হল, সূর্যদেব উদিত হবেন কিছুক্ষণের মধ্যেই। | চন্দ্রদেবের আলিঙ্গন-মুক্ত হতেই হেমবতীর স্মরণ হল তিনি বাল-বিধবা। চন্দ্রদেবের সঙ্গে মিলনের ফলে যে সন্তান জন্ম নেবে তার পরিচয় তিনি কী দেবেন? সমাজ তাে তাকে ধর্মনাশিনী ব্যভিচারিণী বলবে? তিনি চন্দ্রদেবকে বললেন তাকে তার সঙ্গে নিয়ে যেতে। | চন্দ্রদেব এবার তাঁর ভুল বুঝতে পারলেন। তিনি তাকে বললেন, ‘তােমাকে আমার সঙ্গে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তুমি এ নগরী ছেড়ে দরে চলে যাও। এখান থেকে অনেক দূরে বিন্ধ্যপর্বতের পাদদেশে নদীঘেরা বৎসদেশে অনেক খর্জুরকুঞ্জ দেখতে পাবে। সেখানে গিয়ে এক পুত্রসন্তানের জন্ম দেবে তুমি। আমি তােমাকে বর দিচ্ছি, অসীম তেজশালী হবে তােমার পুত্র। সে একদিন ওই খজুরবাহক অঞ্চলে সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করবে। রাজা হবে তােমার পুত্র। এই বলে চন্দ্রদেব আকাশে মিলিয়ে গেলেন।….

…..টহল দিতে দিতে একসময় আবার তাদের দেখতে পেল রাহিল। গতকাল যেসব নারীদের এখানে আনা হয়েছিল তাদেরকে। তবে সবাইকে নয় যাদের সুরাকন্যা হিসাবে নির্বাচিত করা হয়েছিল তাদের। তাদের পােশাকের ভিন্নতা আজ আর নেই। তাদের সবার পরনেই নীলবর্ণের মেখলা, শুভ্র বক্ষাবরণী উন্মুক্ত পিঠে সুতাে দিয়ে বাঁধা। কারুকাজ করা স্তম্ভর মাথার ওপর একটা ছাদের নীচে তাদের নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বিকর্না। সে কী সব নির্দেশ দিচ্ছে তাদেরকে। সম্ভবত তাদের স্নান করিয়ে নতুন পােশাক পরিয়ে মন্দির চত্বরে আনা হয়েছে তালিম দেবার জন্য। এখনও জল ঝরছে তাদের চুল বেয়ে।

সূর্যালােক চিকচিক করছে নাভিকূপে, বক্ষ বিভাজিকায় জমে থাকা জলবিন্দু। কারও কারও মুখে মৃদু বিষন্নতা থাকলেও আতঙ্কর ভাবটা যেন। অনেকটাই কেটে গেছে। দু-একজনের ঠোটের কোণে যেন আবছা হাসিও ফুটে আছে। তাদের দেখে রাহিলের মনে হল একঝাক প্রজাপতি যেন। সমবেত হয়েছে সেই ছাদের নীচে।…..

…রাহিল একটু ইতস্তত করে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল শলাকার সামনে। সেই নারী অপর দিক থেকে এগিয়ে এল তার কাছে। তার ওষ্ঠ, বক্ষবিভাজিকা হাত বাড়ালেই স্পর্শ করতে পারবে রাহিল। শলাকা ধরে দাঁড়াল যুবতী। ফিসফিস করে সে কী যেন বলতে শুরু করল।….

…..বিকর্না ইতিমধ্যে তাদের বেশ কিছু তালিম দিয়েছে। একদিন তাদের লজ্জাবােধ ভাঙানাের জন্য উন্মুক্ত বক্ষে শিল্পী-মজুরদের চোখের সামনে দিয়ে দ্বিপ্রহরে মন্দির প্রদক্ষিণ করানােও হল। মজুর-ভাস্করের দল যে যার কাজ থামিয়ে কয়েক মুহূর্তের জন্য চোখ তুলে দেখল তাদের। তবে সে দৃষ্টিতে যৌনতা বা কামলালসা ছিল না, বরং তাদের দেখে কারও কারও চোখে ফুটে উঠেছিল স্পষ্ট বিষন্নতা। হয়তাে এই নারীদের দেখে তাদের মনে পড়ে গেল বহু দিন আগে ফেলে আসা স্ত্রী, প্রেয়সী অথবা কন্যার কথাও।….

….ফুলপাতার অলঙ্করণ আঁকা স্তম্ভর মাথায় পাথরের ছাদঅলা মণ্ডপ। সেখানে উপস্থিত হয়ে রাহিল দেখতে পেল তাদের। মণ্ডপের নীচে কিছুটা তফাতে তফাতে পাথরের মূর্তির মতাে নৃত্যের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। তিনজন নারী। সম্পূর্ণ নিরাবরণ তাদের দেহ। কোথাও একটা সুতাে পর্যন্ত লেগে নেই। সূর্যালােক কেড়ে নিয়েছে তাদের দেহের প্রতিটা খাঁজের গােপনীয়তা। না হলে তা ভাস্করের চোখে দৃশ্যমান হবে কীভাবে? কেমন করে সে কঠিন পাথরে ছেনির আঁচড়ে পাথরের ওপর ফুটিয়ে তুলবে সুন্দরীদের জীবন্ত প্রতিমূর্তি? নিরাবরণ দেহ হলেও রাহিল খেয়াল করে দেখল সেই নগ্নিকাদের হাতে কঙ্কণ ও পায়ে মল পড়ানাে হয়েছে হয়তাে বা তা মূর্তির সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য। তাদের কিছুটা তফাতে তিনটে বড় পাথরখণ্ড। তাদের আকার এমন যে তা দিয়ে পূর্ণাবয়ব মূর্তি রচনা করা যাবে সুরসুন্দরীদের। সেই পাথরের গায়ে কাঠকয়লা দিয়ে সামনে দণ্ডায়মান নগ্নিকাদের ছবি আঁকায় মগ্ন তিনজন প্রবীণ ভাস্কর।

ধীরে ধীরে পাথরের গায়ে ফুটে উঠছে নারীদেহের ছবি। মুখমণ্ডল, গ্রীবা, স্তন… সুরসুন্দরীদের মাঝের জন বিম্ববতী। বিম্ভফলের মতাে স্তন তার। দু-পাশে দুজন শঙ্খিনী। ঘন সন্নিবিষ্ট শঙ্খর মতাে স্তনযুগল। আঁকার কাজ নিপুণভাবে সম্পন্ন হলেই পাথর কাটার কাজ শুরু হবে। কিন্তু সেই পাথরের মূর্তি তৈরির কাজ শুরু হবার আগেই যেন পাথরের মূর্তিতে নিজেরাই রূপান্তরিত হয়েছে এই তিন নারী। তাদের তিনজনের দৃষ্টিই মাটির দিকে নিবদ্ধ। চোখের পলকও পড়ছে না। কোনও লজ্জাবােধই যেন আর কোনওদিন স্পর্শ করবে না সেই দৃষ্টিকে। নিজেদের লজ্জাবােধ খসিয়ে তারা শুধু যুগ যুগ ধরে যৌনতা জাগাবে অন্যের চোখে। নগ্ন। করবে কামােদ্দীপক পুরুষের লালসাকে। মহাকাল যেন এ দায়িত্ব সঁপে দিয়েছে তাদের ওপর। তাই নগ্নিকা হয়েও পুরুষের সামনে তারা এত স্থির-অচঞ্চল।….

…..বিশেষত সংস্কৃত সাহিত্যের বেশ কিছু স্থানে নারী-পুরুষের অঙ্গসৌষ্ঠবের বা সৌন্দর্যের বর্ণনা আছে। বিশেষত ঋষি বাৎসায়নের রচনাতে তাে বহুবিধ যৌনক্রীড়ারও নিখুঁত বর্ণনা আছে। সে জন্য মূর্তি রচনার স্বার্থে বাৎসায়ন, কালিদাস সহ আরও কয়েকজনের রচনা আমাদের পাঠ করতে হয়েছিল। বহু প্রাচীন পাঠ। কিন্তু তার কিয়দংশ আমার এখনও মনে আছে। তবে পুনর্বার বাৎসায়ন পাঠে মনােনিবেশ করেছি আমি। এই কান্ডারীয় মন্দির হয়ে অনন্ত যৌবনের প্রতীক। এই মন্দিরে শুধু থাকবে যৌবনের উচ্ছাস। তার প্রধান অনুসঙ্গ হিসাবে মন্দিরগাত্রে চিত্রিত হবে মিথুন মূর্তি, নগ্নিকাদের মূর্তি। শিশুক্রোড়ে মাতৃমূর্তি বা ও-ধরনের কোনও নারীমূর্তি স্থান পাবে না এখানে। ওইসব মিথুন-মূর্তি রচনার জন্য বাৎসায়ন পাঠ প্রয়ােজন। এখানের কিছু প্রবীণ ভাস্কর এবং বিকর্নাও এ-পাঠে অত্যন্ত দক্ষ। এখন নগ্নিকা মূর্তি রচিত হচ্ছে, এরপর রচিত হবে মিথুনমূর্তি।….

…..অস্পষ্ট আলােতে দেওয়ালগাত্রে ফুটে আছে মিথুন-ভাস্কর্য। মানব-মানবীর মিথুন নয়। ইতর প্রাণীর সঙ্গে মানবীর মিথুন-ভাস্কর্য। এ ভাস্কর্য মন্দিরগাত্রে আরও বেশ কিছু জায়গাতে খােদিত আছে খেয়াল করেছে রাহিল। মানবীর সঙ্গে বানরের মিথুন, এমনকী অশ্ব, ষণ্ড, ব্যাঘের সঙ্গেও মানবীর মিথুন-দৃশ্য খােদিত আছে কোথাও কোথাও। রাহিলের সামনে আঁধাে-অন্ধকারে দেওয়ালগাত্রে খােদিত আছে বানরের সঙ্গে এক রমণীর মিথুন-দৃশ্য। রাহিল সেদিকে তাকাতেই চিত্রবান বললেন, অন্যান্য ইতরপ্ৰাণী শুকর, যণ্ড, অশ্ব ইত্যাদির সঙ্গে যে মিথুন-দৃশ্য আছে সেগুলাে কল্পিত হলেও এ দৃশ্য কিন্তু কল্পিত নয়। ওই পর্বতমালার পাদদেশের অরণ্যে এই বৃহৎ কৃষ্ণবানর পাওয়া যায় যার স্বভাব, দেহের গঠন অনেকটাই মানুষের মতাে। লক্ষ করে দেখুন চিত্রের বানরের গোঁফ-দাড়িও অনেকটা মানুষের মতাে। কেউ কেউ বলেন এ জাতীয় বানরেরা নাকি আমাদের আদি পূর্বপুরুষ। এই পুরুষবানররা যৌন সম্ভোগের জন্য মানবীকেও আক্রমণ করে। সেই জঙ্গলপ্রদেশে একা কোনও নারীকে পেলে পুরুষ বানরেরা দল বেঁধে তার ওপর ঝাপিয়ে পড়ে। নারী যদি বাধা না দেয় তাহলে হয়তাে তার প্রাণরক্ষা হয়। আর বাধা পেলে বানরের দল আঁচড়ে কামড়ে শেষ করে দেয় তাকে। ভাস্কর্যের প্রয়ােজনে এ মন্দিরেও তেমন কিছু বানর আছে। মজুরদের থাকার জায়গাতে একস্থানে। তাদের বন্দি রাখা আছে। তিনটি পুরুষবানর। দীর্ঘদিন ধরে মিথুন-স্বাদ থেকে বঞ্চিত তারা। ভূগর্ভে যে নারী বন্দিনী ছিল তাকে মৃত্যুভয় দেখিয়েও যখন কাজ হল না তখন অনুদেবের পরামর্শমতাে ওই নারীকে হাজির করা হল এই চিত্রের সামনে। অনুদেব তাকে এই চিত্রের ব্যাপারে ব্যাখ্যা করে বললেন, সে যখন নগ্নিকা হতে রাজি নয় তখন তাকে মুক্তি দেওয়া হবে। কিন্তু তার আগে ওই তিন কৃষ্ণবানরকে ছেড়ে দেওয়া হবে তার কক্ষে। আর এতেই কাজ হল, সুরসুন্দরী হতে রাজি হল ওই নারী।

….ভাস্করের দল প্রাণ সঞ্চার করছে কঠিন পাথরে। গড়ে উঠছে সুরসুন্দরীদের নগ্নিকামূর্তি। মিথুনমূর্তি নির্মাণের কাজও শুরু হয়েছে। মাহবাসহ আরও কয়েকজন প্রবীণ ভাস্কর সুরসুন্দরীদের মূর্তি নির্মাণের সঙ্গে সঙ্গে সেকাজেও নিযুক্ত। সাধারণত মিথুনমূর্তিগুলাে রচিত হচ্ছে সুর্যোদয়ের পর কিছুসময় তারপর সূর্যাস্তের আগে। মিথুনমুদ্রায় নরনারীদের দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব নয়। একদণ্ড সময় তারা একটানা মিলিতভাবে থাকতে পারে। সকাল সন্ধ্যা মিলে দু-দণ্ড সময়। ওই সময়টুকু ভাস্কররা শুধু তাদের মূর্তি নির্মাণ করে। বাকি সময় তারা ব্যস্ত থাকে অন্য মূর্তি নির্মাণে।

মাঝে মাঝে মিথুনমূর্তিগুলাে যেখানে নির্মিত হচ্ছে সেখানে গিয়ে উপস্থিত হয় রাহিল। ভাস্করদের কাজ দেখে। সূর্যোদয়ের সময় মন্দিরপূর্বভাগে, সূর্যাস্তের সময় পশ্চিম প্রান্তের চত্বরে মিথুনমূর্তি নির্মাণের কাজ হয়। যাতে সূর্যালোেক ভালােভাবে এসে পড়ে মিথুনরত নরনারীর ওপর। সে জায়গা দুটো পশুচর্ম দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে।

যে ভাস্কররা সেখানে কাজ করছেন তারা, চিত্রবান, অনুদেব, বিকর্না ও সৈনাধ্যক্ষ রাহিল ছাড়া অন্যদের প্রবেশ নিষেধ ওই মিথুনমূর্তি জায়গাতে। যাতে ভাস্করদের মনােসংযােগ নষ্ট না হয়, অথবা মিথনরত যুগল কোনও অস্বস্তি বােধ না করে সে জন্যই এই ব্যবস্থা। তা আরও একটা কারণ আছে ওই জায়গাকে আবৃত করে রাখার। শ্রমিক মজুরের দল কামােদ্দীপক হয়ে উঠতে পারে ওই মিথুন-দৃশ্য দেখে। যা ভবিষ্যতে অন্য কোনও দুর্ঘটনার জন্ম দিতে পারে।

সেদিন বিকালে রাহিল মন্দির-চত্বর পরিভ্রমণ করতে করতে প্রথমে উপস্থিত হল পশ্চিম প্রাঙ্গণের সেই পশুচর্ম-ঘেরা জায়গার ভিতর। তিন জোড়া নরনারী সেখানে মিথুনরত ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে আছে। প্রথম যুগল দণ্ডায়মান ব্যায়ত সন্মুখ’ মিথুন ভঙ্গিমায়, দ্বিতীয় যুগল ‘জানু কপূরা’ মিথুনরত অবস্থায় তার তৃতীয় জোড়ের পুরুষ একটা থামকে আশ্রয় করে নারীর সঙ্গে সঙ্গমরত ‘অবিলম্বতক আসনে।

তিনজন বৃদ্ধ ভাস্কর তাদের সামনে রাখা প্রস্তরখণ্ডে ফুটিয়ে তুলছেন মিথুন মূর্তি। আরও একজন সেখানে উপস্থিত, সে বিকর্না। একটা থামের গায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে।

দিনশেষের শেষ উজ্জ্বল আলাে এসে পড়েছে তিন জোড়া মিথুনরত নরনারীর গায়ে। সােনালি-মায়াবী আলাে গায়ে মেখে সঙ্গমরত নারীপুরুষরা দাঁড়িয়ে আছে। অঙ্গসৌষ্ঠবের দিক থেকে তিনজন নগ্ন পুরুষও কম সুন্দর নয়। তাদের পেশিবহুল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বেয়ে চুইয়ে পড়ছে ঘর্মাবলু আর সূর্যালোেক। এই পুরুষরাও আসলে তার সঙ্গিনীদের মতাে ক্রীতদাস। শ্রমিক-মজুরদের কাজের জায়গাতেই তারা থাকে। সুরকন্যাদের সঙ্গে তাদের পার্থক্য শুধু একটাই, মাঝে মাঝে মন্দির-রক্ষীবাহিনীর তত্ত্বাবধানে চত্বরের বাইরে যাবার অনুমতি মেলে।

মিথুনরত নারী-পুরুষের মূর্তিগুলােকে হঠাৎ দেখলে কারাে পা মূর্তি বলে ভ্রম হতে পারে। পাথরের বুকে খােদিত হবার আগে ” নিজেরাই যেন পাথর বনে গেছে। রাহিলের খুব বিস্ময়বােধ হয় ওদের দেখলে। কীভাবে এক দণ্ড সময় অমন নিশ্চলভাবে দাঁড়িয়ে থাকে ওম। অনেক সময় দণ্ডায়মান অবস্থাতেই নারী অথবা পরুষকে অপরের ~ ভার বহন করতে হয়। ওই তাে রাহিলের চোখের সামনে যে পুরুষ অবলম্বিতক আসন ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে সেই তাে তার সঙ্গিনীর নিতম্ব বেষ্টন করে তার শরীরের সম্পূর্ণ ভার গ্রহণ করেছে নিজের বাহুযুগলের ওপর। অথচ সে কত স্থির, অচঞ্চল। শুধু তার বাহু চুইয়ে মাঝে মাঝে সােনালি ঘর্মবিন্দু নিঃশব্দে ঝরে পড়ছে মাটিতে। রাহিল ঠিক বুঝতে পারে না এইসব মিথুনযুগল পরস্পরের স্পর্শে এই দণ্ডায়মান অবস্থায় কোনও রােমাঞ্চ অনুভব করে কিনা? এভাবে এতগুলাে মানুষের চোখের সামনে মিলিত অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকলেও কি তাদের রক্তে কামনার আগুন প্রবাহিত হয়? নাকি তাদের শরীর রক্ত পাথরের মতােই শীতল থাকে, কোনও উত্তেজনা প্রবাহিত হয় না তাদের শরীরে? আর তাদের দিকে তাকিয়ে থাকলেও ভাস্করদের চোখগুলােও কেমন যেন স্থির। তাঁদের চোখগুলাে মিথুনরত নারী-পুরুষের সৌন্দর্য শুষে নিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তাতে কোনও কামনার আগুন নেই। কাম যেন তাদের স্পর্শ করতে পারে না। পাথরের গায়ে শলাকা-হাতুড়ি দিয়ে কাজ করে চলেছেন তাঁরা।…..

…..অবশেষে ভালাে দাম পেয়ে অন্যদের সঙ্গে সে আমাকে এখানে এনে অনুদেবের কাছে বেচে দিল। সে জানে আমি অক্ষত যােনি। দাস-ব্যবসায়ী তাকে বলেছে সে কথা। আমার মূর্তি তাই নাকি অন্য সুরাকন্যাদের সঙ্গে স্থান পাবে না মন্দিরগাত্রে, স্থান পাবে মন্দিরের গর্ভগৃহর প্রবেশমুখে।….

….মন্দিরের নির্মাণকার্য শেষ হলে এরপর কোথায় যাবে মিত্রাবৃন্দা? অক্ষত যােনির এই নারী হয়তাে বহুভােগ্যা নারী হবে। তারপর একদিন যৌবন চলে যাবে তার।….

…..ভূষণসজ্জিত মিত্রাবৃন্দা। মাথায় তার খোঁপা বাঁধা। সেখানে আলগােছে গোঁজা এ পদ্মকুঁড়ি। সিঁথিতে চূড়ামণি, কর্ণে কর্ণফুল, কণ্ঠে মুক্তাহার, চ অঙ্গদ, বাহুতে কঙ্কন, কটিদেশে কটিকিঙ্কিনী, পায়ে নূপুর, পরনে স রেশমবস্ত্রে সজ্জিতা মিত্রাবৃন্দা। তবে রাহিল তার দিকে ভালাে করে তাকিয়ে বুঝতে পারল সেই সূক্ষ্ম কাঁচুলি-শাড়ি মিত্রাবৃন্দার দেহকে আড়াল করার জন্য পরানাে হয়নি বরং তার দেহসৌষ্ঠবকে যেন আরও সুপ্রকট করার জন্য পরানাে হয়েছে সেই স্বচ্ছ রেশমবস্ত্র। নগ্নিকা অপেক্ষা অনেক কামােদ্দীপক লাগছে এই নারীশরীরকে। কারণ মিত্রাবৃন্দার শরীর প্রায় দৃশ্যমান হলেও তার মধ্যে জেগে আছে অজানার হাতছানি। যা আকৃষ্ট করে পুরুষের কামভাবনাকে।

অমলিন রেশমখণ্ড ভেদ করে পরিস্ফুট তার বিশ্বস্তনের চন্দ্র অবয়ব। গভীর নাভি সহ উদর অনাচ্ছাদিত তার। ওই অমলিন কাপড়ের ঘাগড়ার আড়ালেই প্রকটিত তার কলস নিতম্ব, কামভাবে পূর্ণ উরু জঙঘা। এত সুন্দর নারীদেহ কোনওদিন দেখেনি রাহিল। এমনকী পুরােহিত অনুদেবও মন্ত্রমুগ্ধর মতাে চেয়ে আছেন সেই নারীদেহের দিকে। রাহিল নিশ্চিত হল। সুরকন্যাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ সুন্দরী এই নারী।…..

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *