হানড্রেড রোমান্টিক নাইটস্ – গিয়ােভানি বােকাসিও (চতুর্থ দিন)

›› অনুবাদ  ›› ১৮+  

গিয়ােভানি বােকাসিও-র ডেকামেরন টেলস এর বাংলা অনুবাদ।

চতুর্থ দিবস আরম্ভ হল। কিং ফিলােস্ট্রাটোর শাসন আরম্ভ হল। সে সকল যুবক-যুবতীর প্রেম শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হল তাদের গল্প আজ বলা হবে।

নতুন কিং সকলকে সম্বােধন করে মানুষের জীবনসংগ্রাম, সুখ দুঃখ ও মানুষের প্রেম সম্বন্ধে এক দীর্ঘ বিবৃতি দিয়ে বলল, এবার আমি একটা গল্প বলি, তারপর যদি কারও কোনাে জিজ্ঞাসা থাকে বা আলােচনার কিছু থাকে তখন দেখা যাবে।

আমাদের এই শহরে ফিলিপপে বালভূচি নামে সমৃদ্ধিশালী ও উত্তম লেখাপড়া জানা এক ব্যক্তি বাস করতাে। হয়তাে তার বংশপরিচয় নিয়ে গর্ব করার মতাে কিছু ছিল না, কিন্তু নানা গুণের আধার এই ব্যক্তিটি সকলের শ্রদ্ধা আকর্ষণ করেছিল।

ফিলিপপাে নিজের স্ত্রীকে গভীরভাবে ভালবাসত এবং স্ত্রীও সমানভাবেই স্বামীকে ভালবাসত। সুখী দম্পতি। কিন্তু আফসােস ও গভীর দুঃখের ব্যাপার যে মহিলা মারা গেলেন, স্মৃতি হিসেবে রেখে গেলেন দু’বছর বয়সের একটি ছেলে। শােকাহত ফিলিপপাে ভীষণ মুষড়ে পড়ল, মনে হল তার জীবন এখন মরুভূমি তুল্য।

স্ত্রী যদি চলে গেল তাহলে তার আর রইল কি? ফিলিপপাে স্থির করলাে মানবসমাজে সে আর বাস করবে না। অন্য কোথাও গিয়ে নির্জনে ঈশ্বর আরাধনায় জীবন কাটিয়ে দেবে, ছেলেকেও সঙ্গে নিয়ে যাবে। তার যা কিছু ছিল সবই সে বিলিয়ে দিয়ে ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে মাউন্ট অ্যাসিনাইয়ােতে চলে গেল। পাহাড়ের গায়ে ছোট ও পরিষ্কার একটা গুহা তার পছন্দ হল। ছেলেকে নিয়ে এখানে সে বাস করবে। ভিক্ষা করে যা পাবে তাতেই সে নিজের ও ছেলের ক্ষুন্নিবৃত্তি করবে। মাঝে মাঝে ব্রত হিসেবে উপবাস দেবে আর ঈশ্বরের আরাধনা তাে আছেই, তিনিই সব দেখবেন।

ছেলেকে সর্বদা ঈশ্বরের মাহাত্ম শােনাত, ঈশ্বরের গুণগান করতাে, শােনাত তার গৌরবগাথা। সাংসারিক কোনাে বিষয়বস্তুর নামই শােনাত না, তাদের যেন অস্তিত্বই নেই। সাধুসন্তদের কথা শুনিয়ে ছেলেকে প্রার্থনা করতে বললাে। সবসময় কড়া নজর রাখত ছেলে যেন গুহার বাইরে না যায়, কোনাে মানুষের মুখ না দেখে, তাই ছেলে শুধু বাপের মুখই দেখত।

এই সৎ মানুষটি মাঝে মাঝে ফ্লোরেন্সে আসতাে। দয়ালু মানুষরা তার প্রয়ােজনীয় কিছু সামগ্র তাকে দান করতাে। সেগুলি গুছিয়ে নিয়ে আবার তার গুহায় ফিরে যেত।

গুহার মধ্যে এইভাবে দীর্ঘ ষোলো বছর কেটে গেল। ছেলের বয়স এখন আঠারাে। সে একদিন তার বাবাকে জিজ্ঞাসা করলাে, তুমি কোথায় যাও? বাবা বলল, সে ফ্লোরেন্সে যায়। তা শুনে ছেলে বলল :

বাবা তােমার এখন অনেক বয়স হয়েছে, বুড়াে হয়েছ, শরীরের শক্তি কমে আসছে। তুমি আমাকে একদিন ফ্লোরেন্সে নিয়ে চলাে, যেসব দয়াবান ও ভক্ত ব্যক্তিরা তােমাকে সাহায্য করেন তাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দাও। আমি এখন যুবক, দেহে শক্তি আছে, দরকার হলে ভবিষ্যতে আমি ফ্লোরেন্সে গিয়ে ঐ সকল ভদ্ৰব্যক্তির কাছ থেকে আমাদের দরকারী সামগ্রীগুলি নিয়ে আসতে পারবাে, তুমি এখানেই থাকবে।

ফিলিপপাে ভাবল তার ছেলে সত্যিই এখন বড় হয়েছে। ভালমন্দ বিচার করার বুদ্ধি হয়েছে এবং ভগবান ও ধর্মে এতদূর বিশ্বাসী করা হয়েছে যে জাগতিক কোনাে কিছু ওকে আর আকর্ষণ করতে পারবে না। ছেলে উপযুক্ত কথাই বলেছে। তাই এবার ফ্লোরেন্স যাবার সময় ছেলেকে সঙ্গে নিল।

শহরে পৌছে প্রাসাদ, বাড়ি, গির্জা, অশ্বারােহী ব্যক্তি, গাছপালা ইত্যাদি যাবতীয় সবকিছু দেখে সে বিস্মিত। এসব দেখা দূরের কথা সে কোনােদিন নাম শােনে নি। যা কিছু তার সামনে পড়ে সবই চোখ বড় বড় করে দেখে। এ জগৎ তার কাছে অজানা ছিল। বাবাকে সে প্রশ্ন করতেই থাকে। চলতে চলতে প্রশ্নোত্তরের পালাও চলতে থাকে। এমন সময় দেখা গেল এক দল সুসজ্জিত তরুণী, যুবতী ও মহিলা কোনাে বিবাহােৎসব থেকে আসছে। ছেলে কোনদিন নারী দেখা দূরের কথা নারীর অস্তিত্বই জানত না।

মেয়ের দলকে দেখে ছেলে মুগ্ধ হয়ে বাবাকে জিজ্ঞাসা করলাে, এরা কারা? বাবা উত্তর দিল, ওদের দিকে চেয়াে না, চোখ নিচু করে মাটির দিকে চেয়ে চলাে। ওরা অসৎ, ওদের দিকে চাইলে তােমার ক্ষতি হতে পারে।

ছেলে তবুও প্রশ্ন করে। কিন্তু ওদের কি বলে বাবা?

মেয়েদের প্রতি ছেলের যাতে কৌতূহল বা আকর্ষণ না জাগে সেজন্যে ফিলিপপাে সঠিক উত্তর এড়িয়ে যেয়ে বলল, ওরা হল ক্ষুদে হাঁস। কিন্তু ছেলে বয়সের ধর্ম অনুসারে ততক্ষণে তরুণীদের প্রতি এতদূর আকৃষ্ট হল যে, তার আর প্রাসাদ, বাড়ি, বাগান, গরু, ঘােড়া, গাধা প্রভৃতি দেখতে – ভালাে লাগল না। এমন কি অর্থের প্রতিও তার বৈরাগ্য দেখা গেল। সে তখনি তার বাবাকে বলল, বাবা আমাকে এইরকম একটা ক্ষুদে হাঁস দাও।

বিরক্ত হয়ে, ফিলিপপাে বলল চুপ, বললুম না ওরা খারাপ, অমঙ্গল করে। ছেলে বলল, তুমি কি তাহলে বলতে চাও যে খারাপ বা অমঙ্গলের চেহারা এইরকম?

হ্যা, ফিলিপপাে সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল।

ছেলে ছাড়াবার পাত্র নয়। সে বলল, বাবা তুমি এদের খারাপ বলতে বলতে পারাে, কিন্তু আমি তাে এদের মধ্যে খারাপ কিছু দেখতে পাচ্ছি না। বরঞ্চ আমার জীবনে আমি এমন সুন্দর আর কিছু দেখি নি। তুমি আমাকে দেবদূতদের যে সব রঙিন ছবি দেখিয়েছ এদের তাে তার চেয়ে সুন্দর ও আকর্ষণীয় মনে হচ্ছে। বাবা তুমি যদি আমার মঙ্গল চাও তাে একটা ক্ষুদে হাঁস সঙ্গে নিয়ে চলাে। আমি ওদের নিয়ে খেলা করবাে, খাওয়াবাে।

ফিলিপপাে অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে বলল, আরে না না, ওদের ঠোট হাঁসের মতাে, তুমি খাওয়াতেই পারবে না আর তাছাড়া ওরা যা খায় তা আমরা যােগাড় করতেই পারবাে না।

ফিলিপপাে মর্মে মর্মে বুঝল প্রকৃতি তার কাজ করে যাচ্ছে। ছেলেকে সঙ্গে আনাই ভুল হয়েছে।

ফিলােস্টাটো বলল, গল্প আমি আর বাড়াতে চাই না, পরিণতি সকলে বুঝতেই পারছ।

প্রকৃতি তার কাজ করে যায়। বলছি কি পুরুষ হিসেবে আমি তােমাদের মেয়েদের ভালবাসি, তাই তােমাদের মনােরঞ্জনের চেষ্টা করে থাকি ও করব। যাই হােক আমি আর কিছু বলবাে না। গল্প আরম্ভ করার সময় হয়ে গেছে, আজকের প্রথম গল্প ফিয়ারমেত্তা তুমিই বলাে।

প্রথম গল্প

স্যালেরনাে-র প্রিন্স ট্যানক্রেডি তার কন্যার প্রেমিককে হত্যা করে তার হৃদপিণ্ডটি একটি সােনার আধারে করে কন্যার কাছে পাঠিয়ে দিল। হৃদপিণ্ডটি কন্যা বিষাক্ত পানীয় দ্বারা ভিজিয়ে সেই পানীয় পান করে মৃত্যু বরণ করলাে।

আমার মতাে আজকের গল্প বলার জন্য যে বিষয় নির্বাচন করা হয়েছে তাে আমি মেনে নিলেও প্রীতিপ্রদ নয়। আমরা এখানে এসেছি আনন্দ করতে, চোখের জল ফেলতে নয়। তবুও দুঃখ না পেলে সুখের মর্ম অনুভব করা যায় না। তাই আমি কিং-এর নির্দেশ মেনে একটি অত্যন্ত দুঃখের কাহিনী বলছি কথা কয়েকটি বলে ফিয়ামমেত্তা তার গল্প আরম্ভ করলাে।

স্যালেরনাে-র প্রিন্স ট্যানক্রেডি অত্যন্ত সদাশয় ও পরােপকারী রাজা ছিলেন কিন্তু এমন রাজা বৃদ্ধ বয়সে রােষে ক্ষিপ্ত হয়ে রক্তে হাত রঞ্জিত করলাে। বয়স অনেক হয়ে গেলেও তার বেশি সন্তান হয়নি, মাত্র একটি কন্যা নিয়ে তাকে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিল। কিন্তু তার কোনাে সন্তান না থাকলেই ভালাে ছিল।

যে কোনাে পিতা অপেক্ষা তিনি তাঁর কন্যাকে একটু বেশিই ভালবাসতেন এবং কন্যার বিচ্ছেদ সহ্য করতে পারবেন না অনুমান করে তার বিবাহই দেন নি অথচ মেয়ের বিবাহের বয়স কবেই পার হয়ে গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত তিনি কাপুয়ার ডিউকের এক পুত্রের সঙ্গে মেয়ের বিবাহ দিলেন। মেয়ের দুর্ভাগ্য, বিবাহের অল্প দিন পরেই মেয়ে বিধবা হয়ে বাবার কাছে ফিরে এলাে।

মেয়েটি ছিল অত্যন্ত সুন্দরী, হাসিখুশি ও প্রাণচঞ্চল এবং অসাধারণ বুদ্ধিমতী। স্নেহান্ধ পিতার সংসারে সেই ছিল গৃহকত্রী কারণ তার মা ছিল না। দাসদাসী বেষ্টিত সংসারে আরাম ও বিলাসের অভাব ছিল না।

একটি সমস্যা দেখা দিল। মেয়ে যুবতী, অন্য মেয়ের মতাে রক্তমাংসের শরীর, তারও কামনা বসনা আছে। কিন্তু তার বাবা আর একবার বিয়ের চেষ্টা করছেন না, সেও লজ্জায় বাবাকে বলতে পারছে না যে, বাবা আমার আবার বিয়ে দাও। তখন সে ঠিক করলাে যে, সে গােপনে একজন প্রেমিক নেবে।

প্রাসাদে অভিজাত ও রাজকীয় বংশের সুদর্শন ও যােগ্য অনেক যুবকের যাওয়া-আসা আছে কেউ আবার বিদেশ থেকে এসে কিছুদিন থেকেও যায়। এদের মধ্যে অনেকে নানা বিদ্যায় পারদর্শী, এদের মধ্যে কারও সঙ্গে তার বিবাহ দিলে সে অখুশি হতাে না। তবে রাজা বা অভিজাত বংশের সন্তানদের সবসময়ে বিশ্বাস করাও যায় না। বিয়ের পর অনেকে নিজ মুর্তি ধারন করে তখন আর তারা একে গ্রাহ্য করে না। বাবা যখন বিয়ে দেবেন না তখন একজন প্রেমিক নিয়েই তাকে জীবন কাটাতে হবে।

ট্যানক্রেডি-কন্যা ঐসব যুবককে কিছু দিন ধরে লক্ষ্য করলাে কিন্তু কাউকে ওর মনঃপূত হল না। অবশেষে অনেক বিচার-বিবেচনা করে একজনকে মনােনীত করলাে। যাকে মনােনীত করলে তার অনেক গুণ থাকলেও সে কিন্তু উচ্চবংশের নয়, উচ্চ কোনাে পদে নিযুক্তও নয়। এমন লােককে অবশ্য নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।

যুবকটির নাম জিসকারডাে। ট্যানক্রেডির ব্যক্তিগত ভ্যালেট; কাজেকর্মে চটপটে, বুদ্ধিমান, চেহারাটিও বেশ ভালাে। কন্যা বেশ কিছু দিন ধরে তাকে লক্ষ্য করলাে। প্রায়ই তাকে দেখবার সুযােগ হয়, কথা বলারও। রাজপরিবারে কাজ করে সে বড় ঘরের সন্তানদের মতাে অনেক গুণ ও শিষ্টাচার আয়ত্ত করেছে।

কন্যা জিসকারডােকে ভালবেসে ফেলল। কিছুদিন লক্ষ্য করবার পর জিসকারডােও বুঝল যে কন্যা তার প্রেমে পড়েছে। সেও কন্যার প্রেমে পড়ল কিন্তু প্রকাশ করল না। তবে দু’জনে দুজনের মন বুঝতে পেরেছে।

আর অপেক্ষা করা যায় না, জিসকারডােকে একা পাবার জন্যে কন্যা অত্যন্ত ব্যগ্র হয়ে পড়ল। অনেক ভেবে সে একখানা চিঠি লিখল। আগামীকাল কোথায়, কিভাবে দেখা হবে তা চিঠিতে লিখল। তারপর চিঠিখানা পাকিয়ে ফাপা শরের নলের মধ্যে ভরে সেটা জিসকারডাকে দিয়ে বলল, নলটা সাবধানে বাড়ি নিয়ে যাও। এই নলে ফুঁ দিয়ে তােমার বাড়ির কাজের উনুন ধরাতে পারবে। কথাগুলাে সে মজা করে হাসতে হাসতে বলল।

জিসকারডাে নলটি সযত্নে এক জায়গায় রেখে দিল। সে ভাবল তার মনিবকন্যা ভালাে করেই জানেন প্রত্যেক বাড়িতেই উনুন ধরাবার জন্যে আরও মােটা নল থাকে, তার বাড়িতেও আছে। মনে হচ্ছে শরের এই ফাপা নলটি দেওয়ার বিশেষ কোনাে উদ্দেশ্য আছে। জিসকারডাে বাড়িতে গিয়ে নলটি উত্তমরূপে পরীক্ষা করে দেখল ভেতরে যেন কিছু রয়েছে। তখন সে নলটি সাবধানে ফাটিয়ে ফেলতেই ভেতর থেকে চিঠি বেরিয়ে পড়ল।

চিঠিখানা সে ভালাে করে পড়ল। তাকে কি করলে তার প্রেমিকার সঙ্গে দেখা হবে জানতে পেরে সে খুবই আনন্দিত হল। তার মনে হল তার চেয়ে সুখী মানুষ পৃথিবীতে আর বুঝি দ্বিতীয় নেই। তারপর দেখা করার জন্যে কি করতে হবে সেই নির্দেশ অনুসারে সে কাজ আরম্ভ করলাে।

প্রিন্সের প্রাসাদটি ছিল একটি পাহাড়ের গায়ে আর পাহাড়ে একটি গুহা ছিল। গুহার প্রবেশপথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল কিন্তু যাতে গুহার ভেতরে আলাে আসে সেজন্যে গুহার মাথার দিকে একটি গর্ত করে দেওয়া হয়েছিল এবং সেই গর্ত দিয়ে গুহার ভেতরে নামাবার জন্যে ধাপ কেটে সিড়ি তৈরি করা হয়েছিল।

আরও একটা ব্যাপার ছিল। মেয়ে যে মহলে থাকত তারই একটা ঘর দিয়ে সরাসরি গুহায় যাবার একটা গুপ্তপথ ছিল আর সেই গুপ্তপথে প্রবেশ করার মুখে একটা দরজা সেই ঘরে ছিল। দরজায় নির্মাণ কৌশল এমন ছিল যে, দরজার অস্তিত্ব টের পাওয়া যেত না। উপরন্তু দরজার সামনে একটা পর্দা ফেলা থাকত। হয়ত পলায়নের জন্যে অথবা কিছুদিন লুকিয়ে থাকবার জন্য এই গুপ্তপথ তৈরি করা হয়েছিল।

গুহার মাথার দিকে যে প্রবেশপথ ছিল তার মুখে গাছপালা জন্মে মুখটা প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। জিসকারােকে বলা হয়েছিল যে, সে যেন এক সময়ে গুহা মুখটা পরিষ্কার করে গুহার ভেতরে নেমে গুহাটাও পরিষ্কার করে রাখে।

জিসকারডাে গিয়ে দেখল যে গুহার খােলা মাথায় একটা মজবুত তক্তা পাতা রয়েছে এবং তার ওপর কয়েকটা পাথর চাপা রয়েছে। সেগুলি সে সরিয়ে দেখল গাছপালা জন্মায় নি। পাথর ও কাঠের তক্তা সরিয়ে নিচে নেমে দেখল গুহা মােটামুটি পরিষ্কার আছে তবে কিন্তু পােকামাকড় বসা করেছে। এমন আশংকা করে সে কিছু গন্ধক নিয়ে গিয়েছিল। কাঠকুটোর সঙ্গে গন্ধক জ্বালাতে পােকামাকড় মরে গেল বা পালিয়ে গেল। তারপর সে গুহাটা পরিষ্কার করে ও বসবার উপযােগী করে ফিরে গেল।

ওদিকে মেয়ের ঘরে যে দরজা ছিল সেই দরজাটি অনেকদিন খােলা হয়নি। প্রেমের কাছে সামান্য দরজা তুচ্ছ। তেল ও ছােট শাবলের সাহায্যে ঘণ্টা দুয়েক পরিশ্রম করে মেয়ে দরজা খুলে ফেলল।

রাত্রে নির্দিষ্ট একটা সময়ে মেয়ে জিসকারডােকে গুহার মধ্যে অপেক্ষা করতে লিখেছিল। তার ঘরে একজন দাসী রােজ রাত্রে থাকে। মেয়ে তাকে বিদায় করে দিয়ে ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে গুহায় গিয়ে দেখল তার প্রেমিক তার জন্যে অপেক্ষা করছে।

তাকে দেখে মেয়ে তাে প্রথমে আনন্দে কেঁদে ফেলল, তারপর তার হাত ধরে নিজের ঘরে নিয়ে এলাে। সে যে কি আনন্দ তা প্রেমিক-প্রেমিকা ছাড়া কে বলবে। সে রাত্রি এবং এর পরও অনেক রাত্রি উভয়ে পরমানন্দে অতিবাহিত করলাে।

ভাগ্যদেবী বেশ কিছু রাত্রি তাদের সাহায্য করলাে কিন্তু একদিন তিনি মুচকি হেসে তাদের জন্যে বিপদ ডেকে আনলেন। তবে জিসকারডাে ও মেয়েও কিছু বাড়াবাড়ি করে ফেলেছিল। তারা মাঝে মাঝে দিনের বেলাতেও মিলিত হতাে। দিনের বেলায় জিসকারডােকে গুহার ভেতর দিয়ে আসতে হতাে না। কাজের ফাকে কোনাে এক সময়ে সে লুকিয়ে তার প্রেমিকার শয়নকক্ষে সােজা চলে আসত। তারপর কিছুক্ষণ কাটিয়ে নিজের কাজে ফিরে যেত।

প্রিন্স ট্যানক্রেডি মাঝে মাঝে সকালে বিকালে মেয়ের ঘরে আসত। মেয়ের সঙ্গে কিছু সময় কথা বলে আবার নিজের কাজে ফিরে যেত। একদিন সকালে ব্রেকফাস্টের পরে ট্যানক্রেডি মেয়ের ঘরে এলাে। ঘরে ঢােকার সময় তাকে কেউ দেখে নি। প্রিন্স একা ঘরে এসেছিল। ঘরে ঢুকল ঘর ফাকা, মেয়ে ঘরে নেই। মেয়ে তখন বাগানে তার সহচরীদের সঙ্গে বেড়াতে যায়।

এতক্ষণ পরে মেয়ের নামটা জানা গেল। তার নাম গিসমন্দা। প্রিন্স মেয়েকে আদর করে সংক্ষেপে মন্দা বলে ডাকত। বাগানে বেড়াচ্ছে বা খেলা করছে তাই প্রিন্স মন্দাকে ডেকে পাঠাল না, জানত মন্দা কিছু পরেই ঘরে ফিরে আসবে, ততক্ষণ না হয় একটু অপেক্ষা করা যাক। এই মনে করে প্রিন্স ট্যানক্রেডি খাটের ওপাশে একটা টুলে বসলাে। খাটে মশারির খানিক ফেলা ছিল আর খানিক তােলা ছিল। প্রিন্স ইচ্ছে করেই যেদিকে মশারি ফেলা ছিল সেদিকেই বসেছিল। সেদিকের জানালাটাও বন্ধ ছিল। কেউ ঘরে ঢুকলে প্রিন্সকে দেখতে পাবে না, তার অস্তিত্বও টের পাবে না। খাটের ধারে মাথা রেখে প্রিন্স ঘুমিয়েই পড়ল।

সেই সকালে কোনাে এক ফাকে গিসমন্দা তার প্রণয়ীকে শোবার ঘরে আসতে বলেছিল। বাগান থেকে জিসকারডাকে তার ঘরের দিকে যেতে দেখে সখীদের ছেড়ে গিসমন্দা তার ঘরে দ্রুত ফিরে এলাে। জিসকারডাে ততক্ষণে তার ঘরে ঢুকে পড়েছে। গিসমন্দাও ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল এবং দু’জনে খাটে উঠে আলিঙ্গনাবদ্ধ হয়ে ফিসফাস করে প্রেমালাপ আরম্ভ করে দিল, মাঝে মাঝে চুম্বন। ঘরে তৃতীয় ব্যক্তির অস্তিত্ব তারা টের পায় নি।

ঘুম গভীর হয়নি। ট্যানক্রেডির ঘুম ভেঙে গেল। শব্দের উৎস আবিষ্কার করতে গিয়ে যে দৃশ্য তার চোখে পড়ল তা দেখে প্রিন্স অত্যন্ত ব্যথিত হল, অপমানে চোখে জল এসে গেল কিন্তু তৎক্ষণাৎ রােষে ক্ষিপ্ত হয়ে হঠাৎ কিছু একটা করে বসলাে না। নিজের ভ্যালেটের সঙ্গে নিজ কন্যার প্রেম প্রিন্সে পক্ষে হজম করা শক্ত। তবে প্রিন্স কি করবে তা মনে মনে তখনি স্থির করে ফেলল। আপাতত প্রিন্স যথাস্থানে চুপ করে বসে রইল।

প্রেমিকযুগলের প্রেমলীলা শেষ হতে আরও কিছুক্ষণ সময় লাগল। তারপর তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে শয্যাত্যাগ করে দু’জনেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। প্রিন্স ট্যানক্রেডি ঘরের দরজা দিয়ে না বেরিয়ে একটা খোলা জানালা দিয়ে বেরিয়ে বাগানের দিকে চলে গেল। কিন্তু সে ক্রোধে, ক্ষোভে লজ্জায় ও অপমানে নিজেকে ধরে রাখতে পারছিল না। নিজের ঘরে ফিরে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল। শান্ত হতে বেশ কয়েক ঘণ্টা সময় লাগল। তবে প্রিন্স কি করবে এরই মধ্যে মনঃস্থির করে ফেলল। গিসমন্দার ঘর থেকে গুহা পর্যন্ত গুপ্তপথের খবর প্রিন্সের জানা ছিল। পাহাড়ে রক্ষী মােতায়েন রাখা হয়েছিল। প্রিন্স অনুমান করেছিল এই পথেই জিসকারডাে তার কন্যার শয়নকক্ষে প্রবেশ করে তাই রক্ষীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যে, জিসকারডাে যখন গুহা থেকে বেরিয়ে আসবে তখন যেন তাকে গ্রেফতার করা হয়।

সেদিন রাত্রেই জিসকারভড়াকে গ্রেফতার করে মনিবের সামনে আনা হল। প্রিন্স ট্যানফ্রেডি তাকে ভৎসনা করলাে, বলল, বেতনভুক্ ভৃত্যের কাছ থেকে এমন বিশ্বাসঘাতকতা, বেইমানী আশা করা যায় নি। জিসকারডাে উত্তরে বলেছিল প্রেমের তীব্র আকর্ষণ মানুষের পক্ষে উপেক্ষা করা অসম্ভব। তাকে বন্দী করে রাখা হল।

গিসমন্দা এসব জানতে পারল না। পরদিন ব্রেকফাস্টের পর প্রিন্স ট্যানক্রেডি কন্যার ঘরে গিয়ে তাকে বলল, খুবই অন্যায় করেছ গিসমন্দা, তােমার নৈতিক চরিত্রের ওপর আমার গভীর বিশ্বাস ছিল কিন্তু তুমি তা ভঙ্গ করে আমাকে, গভীর আঘাত দিয়েছ। তােমার স্বামী নয় অথচ নিম্নস্তরের ও নিচুবংশের আমার এক ভৃত্যের সঙ্গে তুমি প্রেমে লিপ্ত, এ আমি চোখে না দেখলেই কখনই বিশ্ব করতুম না। এ তুমি কি করলে? আমার এই বৃদ্ধবয়সে তুমি আমাকে এমন চরম আঘাত দিলে? তাের এই অসম ও অবৈধ প্রণয় কি তােমাকেও অপমানিত করলাে না! তুমি তাে উচ্চবংশের অভিজাত কাউকে বেছে নিতে পারতে? কিন্তু জিসকারভাে? আমার ভৃত্য! আমি ভাবতেই পারছি না। আমি এখন তােমাকে নিয়ে কি করবাে তাও বুঝতে পারছি না, তােমাকে নির্বাসন দেব নাকি বন্দী করে রাখব। অথচ তুমি আমার একমাত্র কন্যা, পরম স্নেহের পাত্রী, তােমাকে কোনােরকম শাস্তি দেওয়াও আমার পক্ষে অসম্ভব। জিসকারডােকে বন্দী করা হয়েছে কিন্তু তুমি একি করলে! এমন ভুল কেন করলে? পিতার মন চায় না তােমাকে শাস্তি দিতে অথচ আমার ঘৃণামিশ্রিত ক্রোধ তােমার শাস্তি দাবি করে। তােমার বক্তৰ না শুনে আমি কিছু করতে পারছি না।

ধরা পড়ে বা পিতার ভৎসনা শুনে গিসমন্দা মােটেই লজ্জিত হল না। জিসকারডাে বন্দী হয়ে তাও সে শুনল কিন্তু লজ্জায় মাথা নত করলাে না বা একবিন্দুও চোখের জল ফেলল না। সাপিনির মতাে ফণা তুলে সে বলল, বাবা আমি কিছু অস্বীকার করবাে না, প্রতিবাদও করবাে না, তােমার ক্ষমা চাইব না, দয়া ভিক্ষা করবােই না। যা করেছি তার জন্যে অনুশােচনাও করবাে না। আমি স্বীকার করছি যে, আমি জিসকারডডাকে ভালবেসেছি এবং এখনও ভালবাসি ও বাসব যতদিন আমি বেঁচে থাকব। অবশ্য আমাকে মৃত্যুর জন্যে আর বেশিদিন অপেক্ষা করতে হবে না এবং মরণের পরও আমাদের প্রেমবন্ধন অটুট থাকবে।

কিন্তু বাবা, তােমার ভালাে না লাগলেও আমি যা করেছি তার জন্যে তুমিই এবং একমাত্র তুমি সম্পূর্ণ দায়ী। আমি রক্তমাংসের মানুষ, আমারও কামনা বাসনা আছে। আমার একবার বিবাহ হয়েছিল। বিবাহিত জীবনের দৈহিক সুখ আমি পেয়েছি এবং সে সুখ থেকে আমার মত যুবতীর বঞ্চিত থাকা সম্ভব নয়। তুমি আবার আমার বিয়ে দাও নি কেন? আমি যদি কোনাে যুবকের প্রেমে পড়ি থাকি তাহলে সে তাে আমি বয়সের ধর্ম ও দাবি অনুসারে করেছি।

আমি যখন-তখন যার-তার সঙ্গে প্রেম করি নি। এমন একজনকে বেছে নিয়েছি যার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক গােপন থাকবে। তােমার কথা শুনে মনে হচ্ছে জিসকারডােকে মনােনীত করে আমি ভুল করেছি কিন্তু আমি অভিজাত পরিবারের কাউকে বেছে নিয়ে এইরকম অবৈধ প্রেম করলে তােমার আপত্তি হতাে না। মানুষ কি শুধু তার বংশমর্যাদার জন্যে বড় হয়? তার গুণ কি তাকে বড় করে না? এই জিসকারডাের প্রশংসায় তুমি পঞ্চমুখ ছিলে। আর আমার জন্যে চিন্তা কোরাে না, আমাকে তুমি তােমার মন থেকে বাদ দিয়ে দাও। আমার প্রতি তুমি নিষ্ঠুর হলে আমি কিছুই বলবাে না। তােমার যা ইচ্ছে আমাকে শাস্তি দিতে পার এবং আমার জন্যে তােমাকে চোখের জল ফেলতে হবে না।

ট্যানক্রেডি নিরুত্তর। আস্তে আস্তে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। যাবার সময় শুনতে পেল গিসমন্দা বলছে, তুমি আমাদের দু’জনকে একসঙ্গে হত্যা করলে আমরা খুশি হবাে।

ট্যানক্রেডি জানত তার মেয়ের মনের জোর অসাধারণ তবুও তার সন্দেহ ছিল মেয়ে হঠাৎ কিছু করে বসবে না। আত্মহত্যা? না। অতদূর যাবে না। তবে মেয়েকে যদিও ক্ষমা করি, জিসকারডােকে কিছুতেই ক্ষমা করব না। মন্দা এক সময়ে সব ভুলে যাবে।

যে দুজন রক্ষী জিসকারডােকে পাহারা দিচ্ছিল, প্রিন্স তাদের আদেশ দিল আজই রাত্রে নিঃশব্দে কারডােকে গলায় ফাঁস লাগিয়ে তাকে মেরে ফেলল। তারপর তার হৃদপিণ্ডটা বার করে আমার কাছে এনে দাও। রক্ষী দু’জন রাজার আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করলাে, তারা মৃত জিসকারভাের হৃদপিণ্ডটা রাজার হাতে তুলে দিল।

পরদিন প্রিন্স সােনার একটা পাত্র আনাল। সেই পাত্রে জিসকারভাের হৃদপিণ্ডটা রেখে একজন বিশ্বস্ত ভৃত্য মারফত সেটি গিসমন্দার কাছে পাঠিয়ে দিল। ভৃত্য পাত্রটি গিসমন্দার হাতে তুলে দিয়ে প্রিন্সের আদেশ অনুসারে বলল, তােমার প্রিয়জনকে হারিয়ে তুমি গভীর দুঃখ পেয়েছ তাই তুমি যাতে সান্তনা পাও সেজন্যে তােমার পিতা তােমাকে এই উপহার পাঠিয়েছেন।

গিসমন্দা সৰই বুঝল। সে কিছু বনজ লতাপাতা আনিয়ে নির্যাস তৈরি করলাে। সেই নির্যাস তৈরি করে তা থেকে তীব্র বিষ তৈরি করে রাখল। সেই ভৃত্য জিসকারডাের হৃদপিণ্ডটি গিসমন্দার হাতে দিয়ে যাবার পর গিসমন্দা আধারের ঢাকা তুলে যা দেখল তা সে বিশ্বাস করতে পারে নি। সে ভেবেছিল অন্য কিছু আছে কিন্তু এখন বুঝল এই হৃদপিণ্ড কার? বড় কড়া ধাতের মেয়ে এই গিসমন্দা। হৃদপিণ্ড দেখে সে চিৎকার করে মূচ্ছা গেল না। ভৃত্যকে সে বলল, সুন্দর মানুষের জন্যে সােনার উপযুক্ত আধার! বাবা উপযুক্ত মর্যাদাই দিয়েছেন।

তারপর গিসমন্দা পাত্রটি চুম্বন করে ভৃত্যকে বলল, আমি সারা জীবন যে জীবন শেষ হয়ে আসছে—আমি তার পিতার স্নেহ পেয়ে এসেছি, তার কাছ থেকে আমি অনেক স্নেহােপহার পেয়েছি। কিন্তু এখন যা পেলুম এর তুল্য কোনাে অমূল্য উপহার আমি আজ পর্যন্ত পাই নি। বাবাকে আমার ধন্যবাদ জানিয়ে বােলাে আমি কৃতজ্ঞ। ভৃত্য বিদায় নিল।

তারপর হৃদপিণ্ড সমেত স্বর্ণাধারটি ধরে গিসমন্দা সেটি চুম্বন করে শােক প্রকাশ করতে লাগল, সেই সঙ্গে অবিরল অশ্রুধারায় হৃদপিণ্ডটি সিক্ত হতে থাকল।

গিসমন্দার হৃদয় চিরে শােকাচ্ছাস বেরিয়ে আসতে লাগল। সে বলল, প্রিয়তম তােমাকে হয়ত ঠিকভাবে কবর দেওয়া হয়নি, শেষকৃত্য ও প্রার্থনাও বােধহয় কেউ করে নি কিন্তু আমার চোখের জল সেই সকল শূন্য পূরণ করে দিচ্ছে। তােমার আত্মা শান্তি লাভ করুক। দুঃখ কোরাে না, আমার আত্মা তােমার আত্মার সঙ্গে খুব শীঘ্রই মিলিত হবে, হয়ত আজই। আমি অনুভব করছি তােমার আত্মা আমার চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বেশিক্ষণ তােমাকে অপেক্ষা করতে হবে না প্রিয়তম।

গিসমন্দা স্বর্ণাধারটি বার বার চুম্বন করতে লাগল আর সেই সঙ্গে অবিরল অশ্রুধারায় সেটি সিক্ত হতে থাকল। তার কয়েকজন সহচরী সঙ্গে ছিল। কি ঘটে গেছে, গিসমন্দা কেন কাদছে, স্বর্ণাধারের ভেতরে কি আছে তা তারা জানে না। রাজকন্যার কান্না দেখে তারাও কাদছে এবং বৃথাই তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে। তারা বার বার জানতে চাইল রাজকন্যা কাদছে কেন কিন্তু বৃথা প্রশ্ন, রাজকন্যা কোনাে উত্তর দিল না।

আরও কিছুক্ষণ কাঁদাবার পর রাজকন্যা গিসমন্দা স্বর্ণাধারের ওপর থেকে মাথা তুলে নিজের মনে বলল, আমার কর্তব্য এখনও শেষ হয়নি হৃদয়েশ্বর। এখন একটা কর্তব্য বাকি আছে, আমার হৃদয় তােমার হৃদয়ের সঙ্গে মিলিত করা।

এরপর সে যে বিষের নির্যাস তৈরি করে রেখেছিল সেইটি একজন সখীকে আনতে বলল। তারপর শিশি থেকে সমস্ত তরল পদার্থটি অশ্রুজলে সিক্ত হৃদপিণ্ডের ওপর ঢেলে দিল। তারপর কোনােরকম শােক প্রকাশ না করে হৃদপিণ্ডে ওষ্ঠ স্পর্শ করে তরল পদার্থটুকু পান করলাে যেন মিষ্ট সরবত পান করছে। কোনােরকম চিত্তচাঞ্চল্য নয়, মুখের বিকৃতি নয়।

বিষপান শেষ করে গিসমন্দা স্বর্ণাধারটি নিয়ে পালংকে নিজের শয্যায় শয়ন করে স্বর্ণাধারটি বুকের কাছে রেখে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে লাগল।

সহচরীরা জানত না রাজকন্যা কি পান করেছেন, কিন্তু তারা সভয়ে লক্ষ্য করলাে রাজকন্যার দেহ অবশ হয়ে আসছে, কথা জড়িয়ে যাচ্ছে। তারা ভয় পেয়ে গেল। একজন ছুটে গিয়ে প্রিন্স ট্যাক্রেডিকে খবর দিল।

তাহলে বােধহয় বিপদ ঘটে গেল। শঙ্কিত ট্যানক্রেডি মেয়ের ঘরে ছুটে এসে মেয়ের শেষ অবস্থা হয়ে কেঁদে ফেলল। ভালাে ভালাে কথা বলে মেয়েকে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করলাে কিন্তু বৃথা।

গিসমন্দার তখন জ্ঞান ছিল, কথাও বন্ধ হয়নি। কথা বলতে নিশ্চয় তার কষ্ট হচ্ছিল তবুও থেমে সে বলল, বাবা আমার চেয়ে কম হতভাগিনী আর কারও জন্যে তােমার চোখের জল বাঁচিয়ে রাখ। কারন তােমার অশ্রুজলের আমার দরকার নেই। কে শুনেছে যে নিজ অভীষ্ট সিদ্ধ করে মানুষ কাদে?

ও আমার জন্যে তােমার কণামাত্র স্নেহ যদি অবশিষ্ট থাকে তাহলে শেষবারের মতো আমার অনুরােধ রক্ষা কোরাে। যদিও তুমি জিসকারডােকে ঘৃণাভরে হত্যা করিয়েছ, তবুও আমি বলছি আমাদের দু’জনের দেহ প্রকাশ্যে পাশাপাশি একত্রে কবর দিয়ে।

কথা শেষ করে গিসমন্দা স্বর্ণাধারটি বুকে চেপে ধরলাে, তারপর অতি কষ্টে অস্ফুটভাবে উচ্চারণ হলাে, ঈশ্বর তােমাদের সহায় হােন, বিদায়। তারপর সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল।

গিসমন্দা আর জিসকারভাের প্রেমের পরিণতি করুণভাবে সমাপ্তি লাভ করলাে। ট্যানক্রেডির অনুতাপ ও অশ্রু বিসর্জন বৃথাই হল। তবে সে তার কন্যার শেষ ইচ্ছা পূরণ করেছিল। স্যালেরনেডে প্রকাশ্য স্থানে শােকাভিভূত জনতার সামনে উভয়কে একই কবরে পাশাপাশি শুইয়ে দিয়েছিল।

দ্বিতীয় গল্প

ফ্রাযার অ্যালবারতাে একজন সরল মহিলাকে বােঝালাে যে দেবদূত গেব্রিয়েল তার প্রেমে পড়েছে এবং দেবদূত তার সঙ্গে শয়ন করতে চায়, কিন্তু আসলে অ্যালবারতােই দেবদূতের বেশ ধারণ করে। তারপর একদিন মহিলার আত্মীয়দের ভয়ে জানালা দিয়ে পালিয়ে গিয়ে এক ভিখারির বাসায় আশ্রয় নিল। ভিখারি তাকে অসভ্য মানুষের ছদ্মবেশ পরিয়ে পরদিন শহুরে চকবাজারে নিয়ে গেল যেখানে অন্যান্য ফ্রায়াররা তাকে চিনতে পেরে চিরদিনের জন্যে জেলখানায় বন্দী রাখার ব্যবস্থা করলাে।

ফিয়ারমেত্তার গল্পটি শুনে মেয়েরা কেউই অশ্রু সম্বরণ করতে পারল না কিন্তু কিং-এর মনে কোনাে প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। কোনাে ভাবান্তরও নয় কারণ তার মতে জাতের নিয়মই এই। কত লােক দিনে হাজার বার মরছে বাঁচছে কিন্তু প্রতিদানে কতটুকু পাচ্ছে? কিং এবার প্যামপিনিয়াকে গল্প বলতে আহ্বান

কিং কে ধন্যবাদ জানিয়ে প্যামপিনিয়া বলল, অনেক ভণ্ড মানুষ ও তপস্বী আছে যারা এমন সৎ ও সেজে থাকে। এমন সব ভালাে ভালাে কথা বলে যে আমরা ভাবি এরা কাউকে ঠকায় না, বঞ্চনা ওরে না কিন্তু তারা সাধু বেশে অতিশয় চোর। সুযােগ পেলেই পরকে ঠাকায়। গিসমন্দার করুণ কাহিনী শুনে আমরা  ব্যথা পেয়েছি। আমরা আশা করছি আমার এই গল্পটি তােমাদের আনন্দ না দিতে পারলেও কস্ট লাঘব করবে। একজন প্রবঞ্চক যদি ধরা পড়ে সাজা পায় তাহলে আমরা স্বভাবতই পুলক অনুভব করি। তাহলে বৃথা সময় নষ্ট করে লাভ নেই, গল্প আরম্ভ করা যাক।

ইমেলা শহরে বারতাে দেলা মামা নামে অসৎ চরিত্রের একজন দুষ্ট লােক বাস করতাে। শহরবাসীরা ও বদলােকটিকে এমনভাবে চিনে ফেলেছিল যে, সে শপথ করে সত্যি কথা বললেও কেউ তার কথা বিশ্বাস করতাে না, বসন্ত রােগের মতাে এমন খ্যাতি সে অর্জন করেছিল। বারতাে বুঝল ইমেলা শহরের সকলে তাকে চিনে ফেলেছে, এখানে সে টিকে থাকতে পারবে না, প্রাসাচ্ছদনের জন্যে রোজগার করতে পারবে না, শহরের কেউ তাকে চাকরি দেবে না।

সে ভেনিস শহরে চলে গেল। এখানে কেউ না হলেও শহরের পাক তাকে অবহেলা করবে না। এ শহরে লােক ঠকাবার জন্যে নতুন কোনাে কৌশল অবলম্বন করবে। অন্য শহরে সে যেসব পদ্ধতি লােক ঠকিয়ে এসেছে এই শহরে তার কোনােটারই সে পুনরাবৃত্তি করবে না। তাই ভেনিসে এসে সে একজন অতি বিনীত ভদ্ৰব্যক্তির ভূমিকায় অবতীর্ণ হল। আহা! যেন বিনয়ের অবতার। সে যে ক্যাথলিক সম্প্রদায়ভুক্ত খৃস্টান সাধু ফ্রানসিস এর মতানুগামী একজন একনিষ্ঠ সন্ন্যাসী। নতুন নাম কি ফ্রায়ার অ্যালবারতাে। সন্ন্যাসীর বেশ ধারণ করলাে, মিতহারী, মিতব্যয়ী। ব্রত, উপবাস পালনে কখনও অবহেলা করে না। ধর্মই তার ধ্যান জ্ঞান।

লােকটা যে ভণ্ড, চোর, জোচ্চোর, ঠকবাজ, খুনী এমন সন্দেহ কেউ করলাে না। এখন তার যে কোনাে মানসিক পরিবর্তন হয়নি এই বা কে জানবে? প্রার্থনাসভায় যীশুর স্মরণে তার অশ্রুবর্ষণ ভক্তদের মুগ্ধ করে। আহা! এমন ফাদার হয় না। লােকটা কিন্তু গােপনে মতলব আঁটছে কোথায় সুচ হয়ে ঢুকবে যাই হােক সে আপাতত ভেনিসবাসীদের মধ্যে নিজেকে সৎ লােক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সমর্থ হল।

বহু লােক তাকে বিশ্বাস করে তাদের টাকা-পয়সা গচ্ছিত রাখতে লাগল, নানাবিষয়ে গােপন পরামর্শ করতে লাগল, নারী ও পুরুষ নানা জটিল সমস্যা সমাধানের পরামর্শ করতে এলাে। সে যেন নেকড়ে থেকে মেঘ হয়ে গেল, বলতে কি সেন্ট ফ্রানসিস স্বয়ং বােধহয়, এত ভক্তি ও সম্মান অর্জন করতে পাড়েনি।

একটা ভালাে শিকার জুটে গেল। শহরে একজন ধনী ব্যবসায়ী ছিল। ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে ব্যবসায় নিজ জাহাজে ফ্লাণ্ডার্স গমন করেছিলেন। তার পত্নীর নাম মােনা লিসেতা কুইরিনাে। মহিলা প্রগলভ, অবুদ্ধি এবং কিছু পরিমাণ পুরুষপ্রেমী। এই মােনা লিসেতা একদিন আরও কয়েকজন মহিলাসহ আমাদের সাধুবাবার কাছে পাপ স্বীকার করতে এলাে।

মহিলার স্বীকারােক্তি শেষ হবার আগেই ফ্রায়ার অ্যালবারতাে প্রশ্ন করলাে, তােমার কোনাে প্রেমিক আছে?

ফ্রায়ার অ্যালবারালতার দিকে কটাক্ষ করে মহিলা বলল, কি বলছেন মাস্টার ফ্রায়ার? আমার রূপ যৌবন ও আকর্ষণী শক্তি আছে বলেই কি যে কোনাে ব্যক্তিকে তা বিলাতে হবে? আমি জানি আমি যদি স্বর্গে যাই তাহলে সেখানে দেবতাদের মধ্যে আমাকে নিয়ে কাড়াকাড়ি পড়ে যাবে। কিন্তু আমার প্রবৃতি সেরকম নয়। অবশ্য আমি চাইলেই একজন প্রেমিক জুটিয়ে নিতে পারি। আমার মতাে সুন্দরীর পক্ষে একজন কেন, ইশারা করলেই অনেকে ঝাপিয়ে পড়বে। আমি ঠিক বলছি কিনা?

মহিলা সহজে থামল না। নিজের রূপ যৌবন সম্বন্ধে বাগাড়ম্বর করতে লাগল। পৃথিবীতে সেই যেন একমাত্র সুন্দরী এবং কত রূপবান ও ধনী পুরুষকে সে কিভাবে তুচ্ছ জ্ঞান করে অবহেলা করেছে তার গল্প বলতে লাগল।

ফ্রায়ার অ্যালবারতাে ভীষণ ধূর্ত। সে ধরে ফেলল মহিলার মাথা মােটা। সহজে বশ করা যাবে বলতে কি শিকার নিজেই ধরা দিয়েছে। পরস্ত্রী হলেও মেয়েটিকে তার ভাবী পছন্দ হল, তবে এখন তো আর প্রেম নিবেদন করা যায় না, উপযুক্ত সময়ও নয়।

মহিলা যে সত্যিই রূপবতী ও ভক্তিমতী—সে প্রশংসা করতে ভুলল না। তবে উপদেশ দিল যে নিজ রুপের গর্ব করা নারীর পক্ষে উচিত নয়। যাই হােক ফ্রায়ার অ্যালবারতাে মােনা লিসেতার স্বীকারােক্তির বাকি অংশ শুনে তাকে বিদায় দিল।

কয়েক দিন পরে ফ্রায়ার অ্যালবারতাে একজন বিশ্বাসী সঙ্গী নিয়ে মােনা লিসেতার বাড়ি গিয়ে হাজির। প্রারম্ভিক কিছু কথা বলে সে মহিলাকে একা নিয়ে অন্য একটা ঘরে ঢুকলাে। এই ঘরে তাদের কেউ দেখতে পাবে না, তাদের কথাও কেউ শুনতে পাবে না। সেই ঘরে গিয়ে মহিলার সামনে নতজানু হয়ে অ্যালবারতাে বলল, আমাকে ক্ষমা করাে ম্যাডাম, গত রবিবার তুমি তােমার রূপের গর্ব করেছিলে কিন্তু আমি মূর্যের মতাে তােমাকে ভৎসনা করে খুব অন্যায় করেছিলুম। তবে আমিও উচিত শিক্ষা পেয়েছি। আমার এই উদ্ধত ব্যবহারের জন্য আমি সেই রাত্রেই প্রচণ্ড শান্তি পেয়েছি, সারারাত্রি আমি ঘুমােতে পারি নি। আপনাকে কে শাস্তি দিল?

বলছি শোেন। সেই রাত্রে আমি যখন ঘরে প্রার্থনা করছিলুম তখন ঘর হঠাৎ আলােয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। আমি তাে ভয় পেয়ে গেলুম, এত আলাে কোথা থেকে আসছে? আলােয় চোখ ধাঁধিয়ে গিয়েছিল। চোখ আলাে সহ্য হতে চোখ খুলে দেখলুম আমার সামনে আশ্চর্য সুন্দর এক যুবক দাড়িয়ে আছে। তার হাতে একটি লাঠি কিন্তু লাঠি অপেক্ষা তার রােষক্যায়িত দৃষ্টি দেখে আমি ভয় পেয়ে গেলুম।

আমি কিছু বলার বা করার আগেই সে আমার ঘাড় ধরে ঝুলে তার পায়ের কাছে ফেলে আমাকে প্রচণ্ড প্রহার করতে লাগল। সে যে কী ভীষণ প্রহার তা তােমাকে কী বলব? আমার সারা দেহ কালসিটে পড়ে গেছে, ছড়ে গেছে কত জায়গায়, ভীষণ ব্যথা।

প্রহার থামলে, আমি কাদতে কাদতে জিজ্ঞাসা করলুম, আপনি আমাকে প্রহার করলেন কেন। কি অপরাধ করেছি?

তিনি বললেন, জান না? আবার ন্যাকামি হচ্ছে? আজ তুমি কি করেছ? তােমার এত সাহস যে, আমার এক প্রিয়পাত্রী মােনা লিসেতা যার রূপের তুলনা নেই, যার রূপ স্বর্গীয় সুষমামণ্ডিত, ঈশ্বর ব্যতীত যাকে আমি সর্বাধিক ভালবাসি তাকে কিনা তুমি গর্বিতা বলেছ?

আমার অজ্ঞাতে অপরাধ করে ফেলেছি, বলার কিছু নেই। ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করলুম, আপনি কে? তিনি উত্তর বললেন আমি দেবদূত গেব্রিয়েল। নাম শুনেই আমি তার পদপ্রান্তে লুটিয়ে পড়ে বারবার ক্ষমা চাইতে লাগলুম।

তিনি বললেন, আমি তােমাকে ক্ষমা করতে পারি যদি তুমি তােমার প্রথম সুযােগেই আমার সেই প্রিয়পাত্রীর কাছে গিয়ে তুমি তাকে যা বলেছ তার জন্যে অনুতাপ করাে ও ক্ষমা চাও। সে যদি তােমাকে ক্ষমা না করে তাহলে আমি আবার ফিরে আসব। এবার তাে তােমার হাড়গােড় ভাঙে নি কিন্তু যে প্রহর দেব তাতে তােমার হাত, পা, পাঁজর ভাঙবে, মাথা ফাটবে, দাঁত ভাঙবে, নাক দিয়ে গলগল করে রক্ত বেরােবে, সে মার তুমি জীবনে ভুলবে না।

এরপর গেব্রিয়েল আমাকে আরও কিছু বলে বিদায় নিলেন। তবে আমি নিশ্চিত হতে পারলুম না কারণ আমি জানি না তুমি আমাকে ক্ষমা করবে কিনা, তাই আমি তােমার কাছে ক্ষমা চাইতে প্রথম সুযােগেই ছুটে এসেছি। গেব্রিয়েল তােমাকে কিছু বলতে বলেছেন কিন্তু তুমি আমাকে ক্ষমা না করলে তার সেই ব্যক্তিগত কথা আমি তােমাকে বলতে পারছি না।

কথা শেষ করে ফ্রায়ার অ্যালবারতাে উন্মুখ হয়ে তার দিকে চেয়ে রইল।

মােনা লিসেতা তখন আহ্লাদে আটখানা। প্রহারের জন্যে সহানুভূতি না জানিয়ে বলল, দেখলে তাে ফ্রায়ার অ্যালবারতাে? আমার রূপের খবর স্বর্গেও পৌঁছে গেছে, আমি বৃথা গর্ব করি নি। যাই হােক তুমি বােকার মতাে মার খেলে সেজন্যে আমি দুঃখিত। এখন বলাে তাে দেবদূত গেব্রিয়েল আমাকে কি বলতে বলেছেন? তা না শুনে আমি তােমাকে ক্ষমা করবাে না।

ফ্রায়ৰ অ্যালবারতাে বলল, তাহলে আমি ধরে নিচ্ছি তুমি আমাকে ক্ষমা করেছ। যাই হােক দেবদূত গেব্রিয়েল তােমাকে যা বলতে বলেছেন তা আনন্দের সংবাদ তবে তৃতীয় ব্যক্তি দূরের কথা কাকপক্ষীও যেন টের না পায় কারণ এ কথা প্রকাশ পেলে তােমার সর্বনাশ তুমিই ডেকে আনবে এবং প্রকাশ না পেলে জানবে তােমার তুল্য ভাগ্যবতী আর কেউ নেই।

মােনা লিসেতা বলল, অত ভূমিকা করতে হবে না, তিনি যা বলতে বলেছেন তাই আমাকে তাড়াতাড়ি বলাে, আমি ধৈর্য ধরতে পারছি না।

তাহলে শােনাে সুন্দরী, দেবদূত গেব্রিয়েল তােমাকে বলতে বলেছেন, তােমার প্রতি তিনি এতদূর আকৃষ্ট হয়েছেন যে তিনি তােমার সঙ্গে একই শয্যায় কয়েকটি সুখরজনী আরামে ও আনন্দে কাটাতে চান। তুমি যদি ভয় পাও তাই তিনি সেদিন আসেন নি। এখন এই খবরটাই তিনি আমাকে বলেছেন তোমাকে বলতে। তুমি রাজি হলে আমি তাকে জানিয়ে দেব কিন্তু একটা ব্যাপার আছে। তিনি দেবদূত, স্ববেশে আসতে পারবেন না, তাকে আসতে হবে মানুষের বেশে। আমার মারফত তিনি জানতে চান তিনি কবে আসবেন এবং কি বেশে। তুমি যেমন বলবে তেমন হবে। তাহলেই দেখ তােমার চেয়ে ভাগ্যবতী আর কে আছে?

মােনা লিসেতা বুঝি আনন্দে ফেটে পড়বে। দেবদূত গেব্রিয়েল তার প্রেমে পড়েছে, তার সঙ্গে এক শয্যায় শুয়ে রমণ করবে, এর চেয়ে সুখবর আর কি হতে পারে? মজা এই যে মােনা গেব্রিয়েলের অনুরক্ত। তার ঘরে গেব্রিয়েলের একটা ছবি আছে, সুযােগ পেলেই সে ছবির সামনে একটা মােমবাতি জ্বেলে দেয়। এই সব কথা সে অ্যালবারতােকে বলল।

মােনা বলল, তিনি গেব্রিয়েল, তিনি দেবদূত, তিনি ভার্জিন মেরির ভক্ত, তাকে আমি কি বলবাে? আমার সৌভাগ্য যে তিনি আমাকে তার শয্যাসঙ্গিনী করবেন। এর বেশি আমি কি আশা করতে পারি? তিনি কি বেশে আসবেন? সে আমি কি বলব? তার যে বেশ ইচ্ছে তিনি সেই বেশ ধারণ করতে পারেন। আমার অনুরােধ তিনি যেন আমাকে পরেও স্মরণে রাখেন। যাই হােক তাকে বােলাে আমি তােমাকে ক্ষমা করেছি।

অ্যালবারতাে বলল, তুমি চমৎকার বলেছ ম্যাডাম, বাঃ এই তাে চাই। তােমার রূপের যেমন তুলনা নেই। তােমার সব কথা আমি তাঁকে বলবাে। এই সঙ্গে আমি তাকে তােমার হয়ে বলবাে যে, উপযুক্ত বিবেচনা করলে তিনি আমার দেহ ব্যবহার করতে পারেন, আমার আত্মা দেহ থেকে মুক্ত করে কোথাও গচ্ছিত রেখে তিনি আমার দেহে প্রবেশ করে তােমার কাছে অনায়াসে আসতে পারেন। এতে তােমার নিশ্চয় আপত্তি হবে না কারণ এই দেহটাকে তুমি চেন।

মােনা এক গাল হেসে বলল, তােমার বুদ্ধির প্রশংসা করতে হয়। উত্তম প্রস্তাব, আমার আপত্তি নাই।

আলবারতাে বলল, তাহলে আমাকে বিদায় দাও, আমি আসি। আজই রাত্রে তিনি এলে তােমার বার্তা আমি তাকে পৌঁছে দেব। আর শােন, তােমার দরজা খুলে রেখ, কারণ তিনি তাে মানুষের বেশে আসবেন, দরজা বন্ধ থাকলে ভেতরে ঢুকতে পারবেন না।

তুমি চিন্তা কোরাে না ফ্রায়ার। আমি দরজা খুলে রাখব, অন্য সব ব্যবস্থা করে রাখব। আমি তার জন্য পথ চেয়ে বসে থাকব।

মােনা লিসেতার গর্বে বুঝি পা পড়ে না। কোনাে নারীর এত সৌভাগ্য হয় যে দেবদূত স্বয়ং যেচে নারীর কাছে আসে? কখন তিনি আসবেন? আমার যে সময় কাটে না।

ওদিকে ভণ্ড তপস্বী ফ্রায়ার অ্যালবারতােরও সময় কাটে না। রাত্রি কখন আসবে? কখন সে মােনার খাটে উঠবে, মােনা তাকে কি করে বুকে তুলে নেবে—এইসব ভাবতে ভাবতে সে ছটফট করতে লাগল। আলবারতাে যদি কোনাে গুণ থাকে তাহলে সেটা তার অর্জিত কোনাে গুণ নয়। তার চেহারাটা ভালাে দর্শনীয়, সাজগােজ করলে ভালােই মানায়। সেদিন সে কিছু ভালাে খাবার খেল, সুগন্ধী জলে স্নান করল, চার্চ থেকে ছুটি নিয়ে সন্ধ্যাবেলায় একজন বিশ্বস্ত সঙ্গীকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরল। প্রথমে গিয়ে উঠল তার এক মহিলা-বান্ধবীর বাড়ি। ক্ষেত্রে বীজ বুনতে যাবার আগে সে এই মহিলা-বান্ধবীর বাড়ি হয়ে যায়। এখানে সে মােটামুটি কিছু ছদ্মবেশ ধারণ করলাে। এমন বেশ যাতে রাস্তায় কেউ তাকে দেখলে চিনতে না পারে। তারপর উপযুক্ত সময় বুঝে বাড়ি থেকে যাত্রা করলাে। মােনা লিসেতার বাড়ি পৌঁছে তার ঘরে ঢােকার আগে দেবদূতের উপযুক্ত একটা সাদা পােশাক পরে নিল। তারপর সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে মােনার ঘরে ঢুকলাে। দরজা তাে খােলাই ছিল।

একটি শ্বেতবস্ত্র পরিহিত শুভ্র মূর্তিকে ঘরে ঢুকতে দেখে মােনা বিস্মিত ও পুলকিত। তারপর সত্যিই দেবদূত গেব্রিয়েল মনে করে হাঁটু গেড়ে বসল। দেবদূত’ তাকে আশীবাদ করে হাত ধরে তুলে দাঁড় করিয়ে দিল। দেবদূতদের সময় সীমিত তাই সে দেরি করতে পারে না। হাত ধরে মােনাকে বিছানায় নিয়ে শুইয়ে দিল। মােন তাে অনেকক্ষণ থেকেই প্রস্তুত। তারও বিলম্ব সইছিল না, সে পালংকে শুয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেবদূতও তার পাশে শুয়ে পড়ল।

নােনার স্বামীর তুলনায় অ্যালবারতাের দেহ মজবুত এবং কামরণেও নিপুণ অথচ মােনার ব্যবসায়ী স্বামীর এই দুয়েরই অভাব। স্বামী-স্ত্রীর সহবাস ক্রিয়া সে কোনােরকমে সম্পন্ন করে ঘুমিয়ে পড়ে। প্রস্তুতি ও পরিণতি সম্বন্ধে সে উদাসীন। কিন্তু সেদিন অ্যালবারতাে মােনা লিসেতাকে অভূতপূর্ব স্বাদে আপ্লুত করল। মােনা ভাবল এমন তৃপ্তি বুঝি দেবদূতরাই দিতে পারে। স্বামী ব্যতীত সে আর কোনাে পুরুষের সঙ্গে সহবাস করে নি। বিরতির সময়ে কামকলার অন্ধিসন্ধি বােঝাতে বােঝাতে অ্যালবারতাে মেরি মাতারও গুণকীর্তন করছিল।

দেবদূতের সঙ্গে যৌনমিলনে পাপ নেই এই মনে করে মােনা অ্যালবারতােকে কয়েকবার বুকের ওপর তুলে নিয়েছিল কিন্তু রাত্রি শেষ হয়ে আসছে। পুব আকাশ সাদা হওয়ার আগেই দেবদূতকে যেতেই হবে। তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও অ্যালবারতােকে বিদায় দিতে হল। অ্যালবারতােও তার জীবনে এমন সুন্দরী ও রমণেচ্ছুক মেয়ে আর পায় নি। কে জানে আর সুযােগ পাবে কিনা তাই প্রথম রজনী শেষ রজনী মনে করে সেও মােনাকে সহজে ছাড়তে চায় নি। আবার আসবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে অ্যালবারতাে বিদায় নিল।

পরদিন সকালে ব্রেকফাস্ট সেরে মােনা লিসেতা একজন সহচরী সঙ্গে নিয়ে ফ্রায়ার অ্যালবারতাের বাসায় গিয়ে হাজির। সহচরীকে বাইরে রেখে সে একা ফ্রায়ারের ঘরে ঢুকে প্রথমে তার কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলল, তারই দয়ায় দেবদূত গেব্রিয়েল সদয় হয়ে তার প্রতি দয়া করেছেন। স্বামীর সঙ্গে সহবাসে সে এমন তৃপ্তি কখনও পায় নি। সে যে কী আনন্দ তা তার পক্ষে বর্ণনা করা অসম্ভব। তবুও সে সত্যি মিথ্যা মিশিয়ে রসালাে করে কিছু বলতে বাকি রাখল না। দেবদূতের সঙ্গে মিলন তাে গর্ব করে বলার মতাে। সে যে কী গৌরবে গৌরবান্বিত তা তার সখীদের ডেকে ডেকে বলতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু দেবদূত নিষেধ করে গেছেন। নচেৎ সে বিনা দ্বিধায় সকলকে গর্বের সঙ্গে বলে বেড়াত।

সঙ্গে সঙ্গে জিভ কেটে অ্যালবারতাে বলল, খবরদার এসব কথা কাউকে বােলাে না। তাহলে গেব্রিয়েল কুপিত হবেন, তােমার সর্বনাশ হবে।

মােনা বলল, ফ্রায়ার রাত্রি বড় ছােট, দেবদূত কি রাত্রিটা আরও একটু বড় করতে পারেন না? সূর্যোদয় আর একটু বিলম্বিত করতে পারেন না?

ফ্রায়ার বলল, সবই দেবদূতের ইচ্ছা। যাই হােক তুমি দেবদূতের সঙ্গে কাল রাত্রে কি করেছ, না করেছ তা তাে আমার জানার কথা নয়, জানিও না। আমি তােমার বার্তা তাকে পৌঁছে দিয়েছি মাত্র। তােমার কাছে আসবার আগে তিনি আমার আত্মাটি তুলে নিয়ে বুঝি গােলাপ ফুল ভর্তি আধারে রেখে দিয়েছিলেন এবং ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত আমি তাে আমার বাসায় ঐ খাটে চেতনাহীন মৃতবৎ পড়েছিলুম। তারপর উনি আমার আত্মাকে যথাস্থানে ফিরিয়ে দেবার পর আমি আবার আমার জীবন পেয়ে উঠে বসেছি। কিন্তু আমি বােধহয় ভুল বললুম, উনি বােধহয় আমার দেহটা নিয়ে গিয়েছিলেন।

হাঁ, তাই তাে ফ্রায়ার। তিনি তােমার দেহে প্রবেশ করে আমাতে উপগত হয়েছিলেন। সে এক অপূর্ব জ্যোতির্ময় মূর্তি। তােমার দেহ জড়িয়ে ধরে আমি সারারাত কাটিয়েছি অবশ্য ভেতরে দেবদূই ছিলেন। কি? তােমার বিশ্বাস হচ্ছে না? দেখ, তােমার বুকে একজায়গায় আমি চুম্বন করবার সময় আমার দাঁত বসিয়ে দিয়েছি; সে দাগ নিশ্চয় আছে।

ফ্রায়ার বলল, চিহ্ন আমি পরে দেখব। এখন আমার সময় নেই।

এরপর সেই গােলা মেয়ে আরও কিছুক্ষণ বকবক করে এবং গেব্রিয়েলকে আবার পাঠাবার জন্যে বারবার অনুরােধ করে বিদায় নিল। বলা বাহুল্য যে ছদ্মবেশী ফ্রায়ার অ্যালবারতাে মােনা লিসেতার বাড়ি নিয়মিত যেতে আরম্ভ করলাে।

কয়েকটা রাত্রি ও দিন নিরাপদে কাটল। মােনাকে বােকা পেয়ে তাকে ধোঁকা দিয়ে ভণ্ড সাধু তার কামলীলা দুর্বার গতিতে চালাতে লাগল। কিন্তু তাই কি চলে? মেয়েদের পেটে কি কথা থাকে?

একদিন মােনা লিসে তার এক প্রতিবেশী বান্ধবীর সঙ্গে গল্প করছে। গল্প করতে করতে তার প্রসঙ্গ আরম্ভ হল নারীর রূপ নিয়ে। মােনা লিসেতা বলল তার মতাে রূপসী এ তল্লাটে তাে নেই-ই, পৃথিবীতেই নেই এবং তা প্রমাণ করবার জন্যে তার জেদ চেপে গেল। সে বলল, আমার কথা যে সত্যি তার আমি প্রমাণ দিতে পারি, যদি তার নাম করি কে আমার প্রেমে উথাল পাথাল। নাম শুনলেই তুমি বিশ্বাস করতে বাধ্য হবে যে আমার রূপের তুলনা নেই। | বান্ধবীর কৌতূহল বেড়ে গেল। সে জানে কার সঙ্গে কথা বলছে, তার বুদ্ধির দৌড় কতদুর তাও তার জানা আছে, তাই তাকে উসকে দিয়ে পেটের কথা বার করবার জন্যে বলল, তা তাে বটেই, সত্যিই তুমি সুন্দরী। তােমার পাশে দাড়াতে আমাদের লজ্জা করে কিন্তু তুমি যে বিশ্বসুন্দরী এটা আমি বিশাস করতে পারছি না। যতক্ষণ না আমি তােমার সেই প্রেমিকের নাম শুনছি। লােকটি কে? এই দেশের রাজা।

আরে রেখে দাও তােমার রাজা। রাজা মহারাজা সম্রাট তার কাছে কিছু নয়। তােমার কাছে বলছি কিন্তু খবরদার ভাই তুমি নামটা আর কাউকে বােলাে না। তিনি হলেন স্বর্গের দেবদূত গেব্রিয়েল, তিনি আমাকে তার প্রাণ অপেক্ষা ভালবাসেন। তিনি আমাকে বলেছেন যে আমি পৃথিবীর সেরা সুন্দরী। তাই তিনি আমার প্রেমে পড়ে গেছেন।

একথা শুনে মহিলা বুঝি হাসিতে ফেটে পড়বেন কিন্তু আসল ব্যাপারটা কি জানবার উদ্দেশে মহিলা মােনাকে একটু সুড়সুড়ি দিলেন, বললেন, ঈশ্বর মঙ্গলময়! বলাে কি বােন? স্বয়ং গেব্রিয়েল, তাহলে তাে আমার অবিশ্বাস করার কোনাে কারণ নেই। কিন্তু ভাই দেবদূতরা মানুষের সঙ্গে এসব করেন নাকি?

হায় হায় দিদি তুমি কিছুই জান না। এই আমি তােমার গা ছুঁয়ে বলছি, এই দেখ আমি যেমন তােমাকে জড়িয়ে ধরলুম, তােমার বুকে হাত দিলুম, তােমার গালে, ঘাড়ে চুমুকুড়ি দিলুম, তিনিও এখন প্রতিরাত্রে এসে রক্তমাংসের মানুষের মতাে আমার বুকে ওঠেন এবং তারপর তুমি বুঝে নাও। সে ভাই অপূর্ব পুলক, এমন পুলকের কণামাত্রও আমি আমার স্বামীর কাছ থেকে পাই নি। তিনি আমাকে বলেছেন স্বর্গেও এ কাজ তারা করেন। তিনি আমার প্রেমে কি করে পড়লেন? তিনি বললেন স্বর্গে আমার তুল্য সুন্দরী নেই আর এই জন্যেই তাে তিনি রােজ রাত্রে আসেন। বুঝলে ভাই এই হল ব্যাপার। সত্যি কথাটা বললুম তুমি যেন ভাই ঢাক পিটিয়াে না, তাহলে আমি লজ্জায় মুখ দেখাতে পারব না। তােমাকে বলেই বললুম।

মােনা লিসেতার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সেই বান্ধবী আর অপেক্ষা করে? এমন একটা মুখরােচক খবর কাউকে শােনাতে না পারলে কি চলে? পেটের খাবার হজমই হবে না। সেইদিনই এক পার্টিতে তিনি তার কয়েকজন বান্ধবীর কাছে সমস্ত ব্যাপারটাই বেশ রসিয়ে ফাস করে দিলেন এবং সেই কয়েকজনের কাছ থেকে আরও কয়েকজনের কাছে এবং তাদের মারফত তাদের স্বামীর কাছে এবং আটচল্লিশ ঘণ্টায় সারা ভেনিস শহরে প্রচার হয়ে গেল যে, অমুক ব্যবসায়ীর স্ত্রীর বিছানায় নাকি স্বয়ং দেবদূত গেব্রিয়েল আসেন সঙ্গম করতে।

কথাটা মােনা লিসেতার স্বামীর ভায়েদের কানেও উঠল। তারা ঠিক করলাে তাহলে তাে এই দেবদূতের সঙ্গে দেখা করে জানা দরকার সত্যিই তিনি বায়ু তথা আকাশে সঞ্চরণ করতে পারেন কিনা।

অ্যালবারতাের কানেও কথাটা পৌঁছেছিল কিন্তু সে তেমন গুরুত্ব দেয় নি। ভেবেছিল নাম তাে প্রকাশ পায়নি। কোন্ ব্যবসায়ীর বৌ-এর কাছে ‘দেবদূত’ আসে সে খবর এখনও কি সবাই জানে? তাছাড়া মােনার তীব্র আকর্ষণ কি উপেক্ষা করা যায়?

তবুও দু’চার দিন হাওয়া দেখে অ্যালবারতাে এক রাত্রে মােনার ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিয়ে সজ্জা সব পরিত্যাগ করে খাটে উঠেছে কি ওঠে নি এমন সময় দরজায় ধাক্কা। মােনার ভাসুর ও দেওররা বাড়ির ওপর নজর রাখছিল, তারা দেবদূতকে ভায়ের ঘরে ঢুকতে দেখে ছুটে এসে দরজায় ধাক্কা দিতে আরম্ভ করেছে।

অ্যালবারতাে দেখল ভীষণ বিপদ। দরজা বােধহয় ভেঙেই ফেলবে অথচ ঘরের মধ্যে লুকোবার জায়গা নেই। সমূহ বিপদ, সময়ও নেই। দেবদূত না হয় উড়তে পারে না কিন্তু লাফাতে তাে পারে! তাই সে একটা জানালা খুলে উলঙ্গ অবস্থাতেই লাফ মারল। ভাগ্যে বাড়ির পাশে ভেনিসের বিখ্যাত খাল থ্যাও ক্যানেল ছিল তাইতেই ঝাপ মারল। খালে জল গভীর তাই সে কোনাে আঘাত পেল না, সাঁতার কেটে ওপারে উঠল। রাতের অন্ধকারে তাকে কেউ দেখতে পেল না। সামনে একটা বাড়ি দেখে বন্ধ দরজায় ধাক্কা দিল।

সেই বাড়ির একটা ঘরে একজন ভিখারি ভাড়া থাকত। সে দরজা খুলতে অ্যালবারতাে তাকে কিছু বানিয়ে বলল, খুব বিপদ পড়েছি, ভগবানের দোহাই বাঁচাও, তা নইলে এই অবস্থায় আসি?

লােকটি সৎ, দয়া করে দরজা খুলে অ্যালবারতােকে নিজের খাটে শুইয়ে দিয়ে তার কি একটা কাজে বেরােল। অ্যালবারতােকে বলে গেল সে ফিরে না আসা পর্যন্ত অ্যালবারতাে যেন ঘরের দরজা না খুলে।

ওদিকে মােনার স্বামীর ভায়েরা মােনার শয়নঘরে ঢুকে দেখল দেবদূত মহারাজ তার সমস্ত সাজপােশাক এমন কি ডানা ফেলেই উড়ে গেছেন। দেবদূতকে ধরতে না পেরে হতাশ হয়ে পরিত্যক্ত পােশাকগুলাে নিয়ে তারা চলে গেল কিন্তু যাবার আগে মােনাকে যাচ্ছেতাই করে গালাগালি দিয়ে গেল, তাকে শুধু মারতেই বাকি রাখল।

এদিকে সেই সৎ ভিখারি শহরের রিয়ালটো পাড়ায় গেছে। তখন বেশ সকাল হয়েছে। লােকজন নিজ নিজ কাজে বেরিয়েছে, দোকানপাট খুলছে, বেচাকেনা আরম্ভ হচ্ছে। সৎ লােকটি শুনল যে ‘দেবদূত গেব্রিয়েল’ গতকাল রাত্রে শহরের নামী ব্যবসায়ীর পত্নী মােনা লিসেতার ঘরে ঢুকেছিল নিশিযাপন করতে। মহিলার স্বামীর ভায়েদের তাড়া খেয়ে খালের জলে লাফিয়ে পড়েছে। তারপর সে কোথায় পালিয়েছে তার সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। সৎ লােকটি বুঝল এ তার সেই গত রাত্রের উলঙ্গ অতিথি।

সৎ লােকটি তার বাসায় ফিরে সরাসরি প্রশ্ন করলাে, তুমি তাহলে ছদ্মবেশী দেবদূত গেব্রিয়েল? অ্যালবারতাে প্রথমে আজেবাজে কথা বলে ধাপ্পা দেবার চেষ্টা করলাে কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে স্বীকার হতেই হল যে, হ্যা আমি সেই লােক। সৎ লােক তখন ধূর্ত লােক হয়ে বলল যে, তাকে পঞ্চাশ ডুকাট না দিলে সে তার অস্তিত্ব ফাঁস করে দেবে, সে.এখনি গিয়ে ব্যবসায়ীর ভায়েদের খবর দেবে।

কিন্তু অ্যালবারতাে তাকে ডুকাট দেবে কি করে? ডুকাট দিতে হলে তাকে তাে এখান থেকে বেরােতে হবে এবং ছদ্মবেশ ছাড়া সে বেরােবে কি করে?

তখন সেই সৎ ভিখারি বলল, আমি পথ বাতলে দিচ্ছি। আজ শহরে রােমান ক্যাথলিকদের একটা মেলা আছে। সেই মেলায় অনেকে নানা বেশ ধরে যাবে। তুমি যদি ভালুক সাজ তাহলে আমি জংলি সেজে তােমাকে মেলায় নিয়ে যেতে পারি। তারপর মেলা থেকে এক সুযােগে তুমি তােমার বাড়ি ফিরতে পারবে এবং আমাকে টাকা দিতেও পারবে। অ্যালবারতাে রাজি হল কারণ এ ছাড়া আর অন্য পথ নেই। তাকে খুঁজে বার করবার জন্যে অনেকে রাস্তায় নজর রাখছে।

এইরকম বিজাতীয় ছদ্মবেশ ধারণ করে বাইরে বেরােবার ইচ্ছে অ্যালবারততার মােটেই ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু এছাড়া উপায়ই-বা কি? যদি ধরা পড়ে তাহলে তাে পিঠের ছালচামড়া উঠিয়ে নেবে, আরও কি হবে কে জানে। অতএব সে নিমরাজি হল।

তখন সেই সৎ ভিখারি তার সারা দেহে বেশ করে মধু লাগিয়ে দিল আর মধুর ওপর নানারকম পলক বসিয়ে দিল আর মুখে পরিয়ে দিল ভালুকের একটা মুখােশ; এক হাতে ধরিয়ে দিল একটা মুগুর তার অপর হাতে শেকলে বাঁধা দুটো বড় কুকুর। দেখতে হল না ভালুক না বনমানুষ, এক কিস্তুত জীব। তাকে চেনা গেল না।

ইতিমধ্যে সেই সৎ ভিখারি একটি অসৎ কাজ করলাে। সে রিয়ালটো পাড়ায় সেন্ট মার্ক স্কোয়ারে যেখানে মেলা হচ্ছিল সেখানে খবর পাঠিয়ে দিল যারা ‘দেবদূত গেব্রিয়েলকে দেখতে চাও তারা যেন ঐ স্কোয়ারে জমায়েত হয়। তাহলে দেখ ভেনেসীয়দের কতদূর বিশ্বাস করা যায়।

তারপর সেই সৎ ভিখারি অ্যালবারতাে কোমরে শেকল বেঁধে তাকে মেলায় নিয়ে চলল। ভালুক চলল আগে আর ভিখারি শেকল ধরে পিছনে। মেলায় যাবার পথে অনেকে জিজ্ঞাসা করতে লাগল আসলে এই জীবটি কে? কিন্তু ভিখারি তাদের সঠিক উত্তর দিল না।

মেলায় পৌঁছে ভিখারি ভালুককে একটা উঁচু জায়গায় একটা থামের সঙ্গে বেঁধে রাখল। এদিকে ভালুকের গায়ে মধু থাকায় পিপড়ের পাল ও নানারকম পােকামাকড় তাকে ছেকে ধরল। সে ছটফট করতে লাগল।

মেলা বলে কথা। বেশ ভিড় হয়েছে। দেবদূত গেব্রিয়েলকে দেখবার জন্যেও অনেক লােক অপেক্ষা করছে, বিচিত্ৰবেশী ভালুককেও অনেকে দেখছে, নানারকম মন্তব্যও করছে। রােমান ক্যাথলিক গির্জার অনেক সাধুসন্ন্যাসীও এসেছে।

সৎ ভিখারি দেখল উপযুক্ত সময় উপস্থিত। এবার মজা জমবে ভালাে। সে তখন ভালুকের কাছে এসে তার মুখােশটা খুলে দিয়ে হাত নেড়ে চিৎকার করে বলতে লাগল, ওগাে তােমরা কে দেবদূত গেব্রিয়েলকে দেখতে চাও তারা এদিকে এসাে, এই যে ভালাে করে দেখ এই সেই সাক্ষাৎ মূর্তিমান। ইনি স্বর্গ থেকে মর্ত্যধামে ভেনিসে এসেছিলেন নারীদের মনােরঞ্জন করতে।

বেশি বলতে হলাে না। মুখােশ খােলার সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই তাকে চিনতে পেরে ঠাট্টা বিদ্রুপ তাে করতেই লাগল, ছােট ছেলেরা ফলের খােসা ঢিল ইত্যাদি ছুঁড়ে মারতে লাগল। গির্জা থেকে যেসব সাধুসন্ন্যাসীরা এসেছিল তারাই তাকে আপাতত, উদ্ধার করে গির্জায় নিয়ে গিয়ে একটা ঘরে তালা লাগিয়ে বন্দী করে রাখল। শােনা যায় সেই ঘর থেকে সে আর কোনােদিন মুক্তি পায়নি।

মানুষ দেবদূত সাজতে গিয়ে উপযুক্ত শাস্তিই পেল।

তৃতীয় গল্প

তিন যুবক তিন বােনের প্রেমে তাদের নিয়ে ক্রিট দ্বীপে পালিয়ে গেল। বড় বােন হিংসার বশবর্তী হয়ে তার প্রণয়ীকে খুন করলাে। মেজ বােন ক্রিটের ডিউকের আশ্রয়ে গিয়ে দিদির জীবন বাঁচালাে বটে কিন্তু তার পূর্ব প্রণয়ী তাকে খুন করলাে আর সেই প্রণয়ী বড় বােনকে নিয়ে পালাল। খুনের দায়ে ধরা পড়ল ছােট বােন ও তার প্রণয়ী। তাদের কাছ থেকে জোর করে স্বীকারােক্তি আদায় করা হল। বন্দী অবস্থায় তারা আশংকা করলাে তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে। তখন তারা তাদের রক্ষীকে দিয়ে পলায়ন করলাে। তারা পৌছল রােডস-এ কর্পদশূন্য এবং চরম দারিদ্র্যের মধ্যে তাদের মৃত্যু হল।

প্যামপিনিয়ার গল্প শেষ হল। কিং ফিলােস্ট্রাটো বলল, তােমার গল্প শেষ অপেক্ষা প্রথম অংশ অনেক বেশি উপভােগ্য। মােটমাট গল্পটা আমাদের ভালােই লেগেছে। ভণ্ড তপস্বী তার উপযুক্ত সাজাই পেয়েছে কিন্তু তার প্রণয়নীও অবৈধ প্রেম করতে গিয়ে প্রেমিকের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন তাে হলই, চরম নিন্দাও তাকে সহ্য করতে হয়েছিল যদিও মেয়েটার শেষ পরিণতি জানা গেল না। তার স্বামী ফিরে এসে হয়ত তাকে নির্বাসন দিয়েছিল। যদি দিয়ে থাকে তাে ভালােই করেছে।

তারপর কিং ফিলােস্ট্রাটো লরেতাকে বলল, মাদাম তুমি আমাদের আরও ভালাে, মানে জমাটি গল্প বলো।

লরেতা বলল, তুমি বাপু প্রেমিক-প্রেমিকাদের প্রতি বিরূপ। তুমি চাও তারা সবাই প্রেমে ব্যর্থ হােক এবং দণ্ড ভােগ করুক। বেশ তুমি যখন তাই চাও, আমি তাহলে সেই একটা গল্পই বলছি।

তােমাদের কাছে মার্সাই বন্দরের নতুন করে পরিচয় দিতে হবে না। শহরটি রীতিমত জমজমাট কিন্তু অতীতে আরও সমৃদ্ধিশালী ছিল। তখন আরও অনেক ধনী ব্যবসায়ী ঐ বন্দর শহরে বসবাস করতাে, কত দূর দেশে তাদের জাহাজ যেত।

ঐ সময়ে ঐ শহরে ন’ আরনাল্ড সিভাড়া নামে এক ব্যবসায়ী ছিল। দরিদ্র অবস্থা থেকে সে ব্যবসা করে অতিশয় ধনী ও প্রচুর সম্পদশালী হয়েছিল। অর্থ, রত্নখচিত স্বর্ণালংকার, রূপাের তৈজসপত্র, জায়গা ও ভােগ্যপণ্যের তার কোনাে অভাব ছিল না। শহরের সকলে, একডাকে তাকে চিনত।

তার স্ত্রী তাকে অনেকগুলি সন্তান উপহার দিয়েছিল তাদের মধ্যে প্রথম তিনটি ছিল কন্যা আর বাকিগুলি সব পুত্র। দুটি কন্যা ছিল যমজ, তাদের বয়স পনেরাে আর তৃতীয়টি চতুর্দশী। তিন বােনেরই বিবাহ ঠিক করা হয়েছিল। তাদের বাবা জাহাজভর্তি পণ্য নিয়ে ব্যবসা করতে স্পেনে গিয়েছেন, এলেই তিন কন্যার বিয়ে হবে। প্রথম দুই কন্যার নাম হল নিনেতা এবং মাদালেনা আর তৃতীয়টির বারলাে ।

রেস্তানন নামে একটি যুবক নিনেতাকে প্রাণভরে ভালবাসত। বেচারা অর্থশালী নয় কিন্তু উচ্চবংশের সন্তান। নিনেতাও যুবককে ভীষণ ভালবাসত এবং দু’জনে গােপনে প্রেমলীলায় মগ্ন হতাে। দুই ধনী বন্ধু ফোলচো এবং উগেতাে বাকি দুই বােন মাদালেনা এবং বারতেলার প্রেমে পড়েছিল। এই দুই বন্ধুরই বাবা প্রচুর অর্থ রেখে মারা গিয়েছিল।

ননেতা তার প্রেমিক রেস্তাননকে দুই বােনের খবর দিয়ে বলল, ওদের প্রেমিক দু’জন রীতিমতাে বিত্তশালী। নিনেতা বলল আমরা ঐ যুবকদের মেলামেশা করে আমাদের অবস্থা ফেরাতে পারি অর্থাৎ রেস্তানন উদ্যোগী হলে ঐ দুই ধনী বন্ধুর সহায়তায় অর্থ উপার্জন করতে পারে। ভালাে পরামর্শ। রেস্তানন দুই বন্ধুর সঙ্গে আলাপ করলাে তারপর দু’জন মাঝে মাঝে কোথাও একত্রে মিলিত হতাে। এভাবে তিন যুবকের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা হল।

রেস্তানন একদিন দুই বন্ধু ফোলচো এবং উগেতাকে তার বাড়িতে ডেকে সুরাপান করতে করতে বলল, ভাই আমরা তিন বন্ধু তিন বােনের সঙ্গে রীতিমতাে জড়িয়ে পড়েছি এবং ওরাও আমাদের ছাড়া কাউকে জানে না, অর্থাৎ আমরা দু’জনে অচ্ছেদ্য বন্ধনে বাঁধা পড়েছি। এদিকে তিন বােনের তাে বিয়ে ঠিক হয়ে আছে, সেসব বর ওদের পছন্দ নয়। ওদের বাবা ফিরলেই ওদের বিয়ে হবে এবং ওরা আমাদের হাতছাড়া হয়ে যাবে এবং ওরা আমাদের হাতছাড়া করতে চায় না। আমি বলি কি চলাে, তিনজন তিন বােনকে নিয়ে কেটে পড়ি অবশ্য তােমাদের যদি সময় থাকে। রেস্তানন বলতে লাগল, ব্যক্তিগতভাবে আমার একটু অসুবিধে আছে, আমি ধনী নই। তােমরা যদি সে ভার নাও তাহলে আমি শুধু তিন বােনকে বুঝিয়ে বাগিয়ে আনতে তাে পারবােই উপরন্তু ওরা যাতে সঙ্গে বেশি কিছু টাকাপয়সা আর গয়না আনতে পারে সে ব্যবস্থাও আমি করবাে। এখন বলাে তোমরা রাজি কিনা বা কোথায় যেতে চাও। নতুন জায়গায় গিয়ে আমরা তিন বন্ধু মিলে তিন ভাইয়ের মতো সংসার পেতে মনমত পত্নী নিয়ে সুখে দিন কাটাতে পারব।

ফোলচো আর উগেতাে, মাদালেনা আর বারতেলাকে এতই ভালবাসে যে ওদের ছাড়া জগৎ কল্পনা করতে পারে না রেস্তাননের প্রস্তাব শুনে ওরা সঙ্গে সঙ্গে লাফিয়ে উঠল, বলল ওরা ওদের সােনামণিদের পরের কাছে যেতে দিতে পারবে না, তার চেয়ে বরঞ্চ আত্মহত্যা করবে। ঠিক আছে রেস্তানন, তুমি লেগে যাও, আমরা তােমার পিছনে আছি, টাকার চিন্তা কোরাে না।

কয়েকদিন পরে রেস্তানন মিনেতাকে বলল, দেখ তাে এখানে আমাদের কত দিক সামলে কত ক সহ্য করে বিপদ এড়িয়ে দেখাশােনা করতে হয়। ধরা পড়লে তােমার বাবা তাে আমার গর্দান নেকে তার চেয়ে চলাে না আমরা সবাই মানে আমরা তিন বন্ধু আর তােমরা তিন বােন একসঙ্গে কোথাও গিয়ে ঘর বাঁধি। স্বাধীনভাবে থাকব, যখন ইচ্ছে প্রেম করবাে, যা ইচ্ছে খাব, বেড়াব, ঘুমবাে। কেমন হবে বল তাে? দুই বন্ধুর সঙ্গে যে সব কথাবার্তা হয়েছে সে সবই রেস্তানন বিস্তারিতভাবে নিনেততে বলল।

নিনেতা সব শুনে তার প্রেমিককে বলল, তােমরা তাহলে সব ব্যবস্থা করাে। আমার দুই বােনকে আমি রাজি করাবাে। ওরা একটুও আপত্তি করবে না।

নিনেতার সঙ্গে চূড়ান্তভাবে পরামর্শ করে রেস্তানন তার দুই বন্ধুর কাছে গিয়ে বলল, সহজেই সব ঠিক হয়ে গেছে, তিন বােন রাজি তাে বটেই, শুনে পর্যন্ত তারা লাফাচ্ছে। তাদের আর ধৈর্য ধরছে না।

আর কোনাে বাধা নেই, বাধা দেবার কোনাে লােকও নেই। তখন তিন বন্ধু মিলে তিন বােনকে নিয়ে পালাবার সব পরিকল্পনা স্থির করে ফেলল। ধনী দুই বন্ধুর নগদ টাকা তাে ছিল প্রচুর তাছাড়া তারা তাদের মজুত মালও বিক্রি করে যত পারল টাকা সংগ্রহ করলাে। তারপর তারা গােপনে একটা জাহাজ কিনে সেটাও গােপনে বন্দরে লুকিয়ে রাখল।

তিন বােনও প্রস্তুত। বাবার একটা সিন্দুক খুলে প্রচুর টাকা ও রত্নালংকার থলে ভর্তি করে সঙ্গে নিল। তারপর নির্দিষ্ট তারিখে নির্দিষ্ট সময়ে সংকেত পেয়ে তিন বন্ধু তিন প্রেমিকার সঙ্গে মিলিত হয়ে জাহাজে এসে উঠল। কেউ জানতেও পারল না। অনুকূল বায়ু পেয়ে জাহাজ ছেড়ে দিল। কোথাও না থেমে পরদিন সন্ধ্যায় জাহাজ জেনােয়া বন্দরে এসে নােঙর ফেলল।

জেনােয় পৌঁছে ওদের কি ফুর্তি! এই প্রথম ওরা নির্ভয়ে নাচানাচি শুরু করলাে, পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে সে কি উদ্দাম উল্লাস!

এখানে ওরা আহার্য দ্রব্য ও শাকসবজি যত পারল জাহাজে ভর্তি করে নিল তারপর জাহাজ ছেড়ে দিল। ওরা যেন প্রমােদ ভ্রমণে বেরিয়েছে এইভাবে জাহাজ কখনও থামে আবার চলে। শেষপর্যন্ত ওদের গন্তব্য ক্রিট দ্বীপে জাহাজ ভিড়ল। ওরা আগেই ঠিক করে রেখেছিল এই দ্বীপে বাসা বাঁধবে।

ক্যাণ্ডিয়া থেকে কিছু দূরে ওরা মস্ত বাগান ঘেরা একটা প্রাসাদ কিনল। চাকরবাকর, পাখির ঝাক, কুকুরের দল, ঘােড়া এসব তাে থাকলই, গার্ডেন পার্টি, ড্যান্স পার্টি, ঢালাও পানভােজন ইত্যাদির মধ্যে ওরা মহানন্দে দিন কাটাতে লাগল, যাকে বলে রাজার হালে। ওরা ভুলে গেল অতিভােজনের ফলে বদহজম হয়, অম্বলে ভুগতে হয়, সবসময়ে পরিণতি ভালাে হয় না।

বিশেষ কোনাে বস্তু মানুষ যতক্ষণ পর্যন্ত না পায় ততক্ষণ পর্যন্ত সেটা পাবার জন্যে সে যথেষ্ট চেষ্টা করে। তীব্র আকর্ষণ অনুভব কবে। তারপর বস্তুটি হস্তগত হলে তার আকর্ষণ কমে যায়, গুরুত্ব কমে যায়, এবং একদিন সেটিকে হয়ত অবহেলাও করে। এই বুঝি জগতের নিয়ম।

রেস্তানন একদা ভাবত নিনেতা ব্যতীত তার জীবন বৃথা, নিনেতাকে না পেলে সে মরেই যাবে। কিন্তু নিনেতা তার করায়ত্ত হয়ে পর্যন্ত এবং ক্রিট দ্বীপে এসে দেখল যুবতী তার কথায় ওঠে বসে, তাকে ছেড়ে যেতে পারবে না তখন থেকেই নিনেতার প্রতি রেস্তাননের আকর্ষণ কমতে লাগল। কমবার একটা কারণ হল প্রতিবেশী এক ললনা যার সঙ্গে ওদেরই বাড়িতে এক ভােজসভায় আলাপ। রেস্তানন ললনাকে নিয়ে মজে গেল। প্রেমের পর্দায় এই ললনার ছবি ক্রমশ স্পষ্ট হতে লাগল আর নিনেতার ছবি ক্রমশ আবছা হতে লাগল।

নিনেতার টের পেতে দেরি হয়নি। সে হিংসায় জ্বলে পুড়ে মরতে লাগল। দু’জনের মধ্যে খটাখটি আরম্ভ হল। তারপর রীতিমতাে কলহ। দু’জনের জীবনই দুঃসহ হয়ে উঠল। একজন বলে বেশ করবাে, অপরজন বলে দেখে নেব।

নিনেতা যত বেশি রােষ করে, নবীন ললনার প্রতি রেস্তাননের আকর্ষণ তত বাড়ে আর নিনেতা ঈর্ষা ও ঘৃণা তীব্র থেকে তীব্রতর হয়। নিনেতা তখন স্থির করে যে, রেস্তাননকে মেরেই ফেলবে।

নিনেতা খবর পেয়ে এক গ্রীক রমণীর দ্বারস্থ হয়। ঐ রমণী নানারকম জড়িবুটি, মাদবদ্রব্য পাতের ওষুধ তৈরি করতে জানত। নিনেতা জিজ্ঞাসা করল মানুষ মারবার বিষ সে দিতে পারে না। পয়সা পেলেই সে সব পারে, এমন ওষুধও তৈরি করে দিতে পারে যা খেলে মানুষের স্মৃতিবিভ্রম। হবে। একজন মানুষ নিজেকে অন্য মানুষ মনে করবে এমন ওষুধও সে তৈরি করে দিতে পারে। নিনেতা মণীকে উৎকোচ দিয়ে বিষ সংগ্রহ করে। পানীয়ের সঙ্গে মিশিয়ে দিলে বেমালুম মিশে যাবে ও রঙের পরিবর্তন হবে না। অতি উত্তম। নিনেতা খুশিমনে বিষ নিয়ে আসে। বিষটুকু সে সযত্নে লুকিয়ে রাখে এবং সুযােগের অপেক্ষা করে।

সেদিন বেশ গরম। সন্ধ্যায় তৃষ্ণার্ত রেস্তানন নিনেতাকে বলল এক গেলাস পানীয় তৈরি করে দিতে। নিনেতা সরবত তৈরি করে তার সঙ্গে বিষটুকু মিশিয়ে দিল। নিনেতার সঙ্গে ঝগড়া হতে থাকলেও রেস্তানন কখনও সন্দেহ করে নি যে নিনেতা তাকে বিষ খাইয়ে হত্যা করতে পারে। কোনাে সন্দেহ না করে রেস্তানন সব সরবতটুকু পান করে ফেলল। আরাম করেই চুমুক দিয়ে পান করলাে এবং একটু পরেই ঘুমিয়ে পড়ল। সে ঘুম আর ভাঙল না। ভাের হবার আগেই সে মরে গেল।

নিনেতা সমেত সকলেই শােক প্রকাশ করলাে, কান্নাকাটি করলাে। ফোলচো এবং উগেতাে স্থির করল রেস্তানন কে উপযুক্ত কবর দেবে। তারা কোনাে ত্রুটি রাখল না, উপযুক্ত মর্যাদার সঙ্গে বন্ধুর কবর দিল।

ঐ গ্রীক রমণী যে নিনেতাকে বিষ সরবরাহ করেছিল সে অন্য কয়েকটা অপরাধে ধরা পড়ল। কারাগারে প্রহারের ভয়ে সে অনেক কিছু স্বীকার করলাে, নিনেতাকে বিষ সরবরাহ করেছে সেকথাও বলল। ফলাফলও বলল, তার কাছ থেকে বিষ বা মাদকদ্রব্য বা অন্য ওষুধ নিয়ে কার কি হয়েছে তার বিস্তারিত বিবরণ জানাল।

ঘটনাগুলির রিপাের্ট আরক্ষা বিভাগে ক্রিটের ডিউকের কাছে পেশ করলাে। দ্বীপে সদ্য আগত তিন বন্ধু ও তাদের তিন বান্ধবীর সঙ্গে ডিউকের পরিচয় হয়েছিল। ডিউক আবার মাদালেনার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। তাই তিনি নিজে নিনেতার কেসটি হাতে রেখে বাকিগুলির অনুসন্ধানের ভার আর বিভাগকেই দিলেন।

নিনেতার ব্যাপারটা ডিউক গােপন রাখলেন। একদিন রাত্রে ডিউক ফোলচোদের প্রাসাদ ঘেরাও করালেন এবং নিনেতাকে গ্রেফতার করে নিজের প্রাসাদে নিয়ে এলেন। কেউ কোনাে বাধা দিল না, নিনেতাও শান্তভাবে ডিউকের সঙ্গে তার প্রাসাদে চলে এলাে।

ডিউক ভেবেছিল স্বীকারােক্তি আদায়ের জন্যে বােধহয় নিনেতার ওপর নিপীড়ন চালাতে হবে কিন্তু কিছুই করতে হল না। ডিউক প্রশ্ন করা মাত্র নিনেতা বিস্তারিতভাবে সব কিছুই বলল, কিছু গােপন রাখল না।

নিনেতাকে কেন গ্রেফতার করা হয়েছে এ খবর ডিউক ফোলচো এবং উগেতােকে গােপনে জানিয়ে দিলেন। দুই বন্ধু আবার খবরটি তাদের দুই প্রেমিকা অর্থাৎ দুই বােনকে জানিয়ে দিল। চারজনে তাে খবর শুনে প্রথমে স্তম্ভিত, পরে নিনেতার জন্যে চোখের জল ফেলতে লাগল। কারণ নিনেতা যে অপরাধ করেছে তার জন্যে দেশের আইনানুসারে তাকে কাঠের স্তম্ভে পিছমােড়া করে বেঁধে পুড়িয়ে মারা হবে। নিনেতাকে কি করে বাঁচানাে যায়, চারজনেই এ নিয়ে চিন্তা করতে লাগল।

ডিউক স্থির করে বসে আছেন যে এ বিষয়ে তিনি হস্তক্ষেপ করবেন না, বিচার তার পথ নেবে। বিচারক যে রায় দেবেন তাই তিনি চূড়ান্ত বলে মেনে নেবেন।

মাদালেনার রূপের প্রতি ডিউক আকৃষ্ট এ খবর মাদালেনা জানে। ডিউক আভাসে ইঙ্গিতে তার সঙ্গ কামনা করেছে কিন্তু মাদালেনা এড়িয়ে গেছে। নিনেতার তখন বিপদ, জীবন সংশয়। নিনেতা শুধু তার বেন নয়, যমজ বােন, দু’জনে একই সঙ্গে মাতৃজঠরে বর্ধিত হয়েছে। দুই বােন অভিন্ন হৃদয়। বােন ভীষণ বিপদে পড়েছে, তাকে রক্ষা করবার চেষ্টা করতেই হবে, নিশ্চেষ্ট হয়ে বসে থাকলে চলবে না। কিছু করতে হবে। কিছু করা মানে তাকে উপযাচিকা হয়ে ডিউকের কাছে যেতে হবে।

মাদালেনা তার এক বিশ্বাসী ও অনুগত দূত মারফত ডিউকের কাছে বার্তা পাঠাল ডিউকের প্রস্তাবে সে রাজি আছে কিন্তু তার দুটি শর্ত আছে। তার বােনকে অক্ষত অবস্থায় নিঃশর্তে মুক্তি দিতে হবে এবং তার সঙ্গে ডিউকের ঘনিষ্ঠতা গােপন রাখতে হবে।

মাদালেনার বার্তা পেয়ে ডিউক আনন্দিত। সব ব্যাপারটা তিনি খতিয়ে দেখলেন, কী করবেন তা স্থির করেন। প্রথমে মাদালেনাকে খবর পাঠালেন যে তিনি তার শর্তে রাজি। তারপর তিনি মাদালেনার সম্মুতি নিয়ে ফোলচে ও উগেতােকে গ্রেফতার করলেন কারণ নিনেতার ব্যাপারে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে। এটা অবশ্য একটা ছুতাে নইলে মাদালেনাকে একান্তে পাওয়া যাবে না। যাই হােক দুই বন্ধু কারাগারে, ডিউক তখন মাদালেনাকে নিয়ে সুখশয্যায় রজনী অতিবাহিত করছেন। মাদালেনা নিজের দেহদান করে বােনের মুক্তি আদায় করলাে।

মালেনার কাছে যাবার সময় ডিউক নিনেতাকে একটা বড় থলের মধ্যে পুরে নিয়ে গিয়েছিলেন। যেন তাকে সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হবে কিন্তু শর্ত অনুসারে ডিউক নিনেতাকে মাদালেনার জিম্মা করে দিল এবং মাদালেনার সঙ্গে সারারাত্রি কাটিয়ে পরদিন ভােরে বিদায় নেবার সময় মাদালেনাকে বলে এলো যে, নিনেতাকে যেন এখনই দূরে কোথাও গােপনে সরিয়ে দেওয়া হয় কারণ এখানে তাকে দেখা গেলে আবার গ্রেফতার করতেই হবে, বিচার করে চরম দণ্ডও দিতে হবে। এর যেন অন্যথা না হয়। আর একটা কথা প্রাণেশ্বরী, আজকের এই রাত্রি যেন শেষ রাত্রি না হয়। আমরা যেন আবার মিলিত হতে পারি।

প্রাসাদে ফিরে ডিউক ফোলচো ও উগেতােকে মুক্তি দিয়ে বললেন, কিছু করা গেল না। নিজ প্রেমিককে হত্যার জন্যে নিনেতাকে চরম দণ্ড দিতে হয়েছে। তার হাত পা বেঁধে থলের মধ্যে ভরে তাকে গভীর সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয়েছে।

ডিউকের কথা বিশ্বাস করে দুই ভাই বাড়ি ফিরতে ফিরতে ভাবল তারা এই দুসংবাদ দুই বোনকে কি করে জানাবে এবং কি সান্ত্বনাই দেবে।

দুই ভাইকে বাড়ি ফিরে আসতে দেখে মাদালােনা মনে মনে শঙ্কিত হয়ে নিনেতাকে লুকিয়ে রাখবার চেষ্টা করলাে কিন্তু দুর্ভাগ্য। ফোলচো নিনেতাকে দেখে ফেলল এবং বিস্মিত হল। নিনেতা কি করে বেঁচে আছে এবং বাড়ি ফিরল। ডিউক তাহলে মিথ্যা কথা বলেছে! এ কি করে সম্ভব হল!

ফোলচোর সঙ্গে সঙ্গে সন্দেহ হল। সে শুনেছিল মাদালেনার প্রতি ডিউক আকৃষ্ট। তখন ফোলচে মাদালেনাকে চেপে ধরলাে, বলাে কি করে নিনেতা মুক্তি পেল?

মাদালেনা মিথ্যার আশ্রয় নিল। সে নানারকম গালগল্প আরম্ভ করলাে কিন্তু ফোলচো ভীষণ ধূর্ত। সে মাদালেনার মুখ থেকে সত্যি কথা আদায় করে নিল।

বােনের মুক্তির জন্যে হলেও পরপুরুষের সঙ্গে মাদালেনা রাত্রি কাটিয়েছে জানতে পেরে ফোলচে ক্ষিপ্ত ও জ্ঞানহারা হয়ে তলােয়ার বার করলাে। মাদালেনার অনুনয় বিনয় প্রাণভিক্ষার কর্ণপাত করলাে না, তাকে হত্যা করল।

হত্যা করে প্রথমে অনুতাপ, পরে ভয়। ডিউক জানতে পারলে তাকে এখনি গ্রেফতার করবে এক মাদালেনা যে পথে গেছে সেই পথেই পাঠাবে। তখন কি হবে?

মাদালেনার লাশ ফেলে রেখে ফোলচো যত পারল টাকাপয়সা আগে হাতিয়ে নিল তারপর অন্ধকার ঘরে লুকিয়ে রাখা নিনেতাকে বলল, চলাে, তােমার বােনের সঙ্গে পরামর্শ অনুযায়ী তােমাকে দূরে কোথাও রেখে আসি, কারণ এখানে থাকলে তুমি মরবে।।

ভীত নিনেতাও পালাতে ব্যগ্র। ফোলচোর কথায় সে তখন রাজি হয়ে তৈরি হয়ে নিল কিন্তু বােনেদের কাছ থেকে বিদায় নেবার সুযােগ ফোলচো তাকে দিল না। তখন অবশ্য রাত্রিও হয়ে গিয়েছিল। রাত্রির অন্ধকারে তারা সমুদ্রতীরে গেল এবং সেখান থেকে বিদেশগামী এক জাহাজে চেপে কোথায় গেল সে খবর কেউ জানে না। তাদের বিষয়ে কিছু জানাও যায় নি।

পরদিন সকালে মাদালেনার লাশ পড়ে থাকতে দেখা গেল। কে তাকে খুন করেছে কে জানে! হত্যার খবর ডিউকের কানে উঠল। ডিউক উগেতােকে কোনাে কারণে পছন্দ করতেন না, ঘৃনা করতেন।

তাঁর নবীনতম নৈশসঙ্গিনী নিহত হয়েছে খবর পেয়ে ডিউক ঘােড়া ছুটিয়ে দৌড়ে এলেন এবং মাদালেনাকে হত্যার অপরাধে উগেতাে ও বারতেলাকে গ্রেফতার করলেন। কিন্তু এরা দুজন তখনও জানে না যে মাদালেন খুন হয়েছে অথচ ডিউক তাদের ধরে নিয়ে কারাগারে বন্দী করে জোর স্বীকাররােক্তি আদায় করলেন যে, তারাই তার প্রেয়সী মাদালেনাকে হত্যা করেছে। ফোলচোও এই হত্যার সঙ্গে জড়িত, সে কোথাও লুকিয়ে আছে, তাকেও খুঁজে বার করে শাস্তি দিতে হবে।

বাধ্য হয়ে স্বীকারােক্তি করে পর্যন্ত উগেতাে ও বারতেলা ভয়েই মরে আছে। নিশ্চই তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে। শেষ পর্যন্ত ওরা ওদের রক্ষীর সঙ্গে আলাপ করে তাকে উৎকোচ দেবার লােভ দেখাল, রক্ষী রাজি হল। সেই রক্ষীই ওদের গােপনে বাড়িতে নিয়ে এলাে। জরুরী প্রয়ােজন মেটাবার জন্যে ওরা বাড়িতে কিছু নগদ টাকা রাখত। সেই টাকা থেকে ওরা রক্ষীকে মােটা উৎকোচ দিল। সব কিছু ফেলে রেখে সামান্য কিছু অর্থ সঙ্গে নিয়ে রাত্রির অন্ধকারে ওরা রক্ষীর সঙ্গে জাহাজে উঠল। ওরা রােডস-এ গিয়ে নামল। শেষ জীবন ওদের মােটেই সুখে কাটে নি। চরম দারিদ্র্যে ওদের জীবন কেটেছিল। রেস্তানন উদ্দাম প্রেম আর নিনেতার রােষ কতজনের সর্বনাশ ডেকে আনল।

চতুর্থ গল্প

কিং উইলিয়ম তার নাতি জারবিনোকে একটি অঙ্গীকার করতে বলেছিলেন কিন্তু জারবিনাে তা ভঙ্গ করে টিউনিসের রাজার জাহাজ আক্রমণ করে, উদ্দেশ্য ঐ রাজার কন্যাকে অপহরণ করা। যারা জাহাজে ছিল তারা কন্যাকে হত্যা করে। জারবিনো হত্যাকারীদের হত্যা করে কিছু পরে তারই মুণ্ডচ্ছেদ হল।

লরেতা গল্প শেষ করে চুপ করে বসে রইল কিন্তু আর সকলে তার গল্প নিয়ে আলােচনা করতে লাগল। কেউ দোষ দিল রেস্তাননকে, কেউ দোষ দিল নিনেতাকে। কেউ প্রশ্ন করলাে ফোলচো কেন মাদালেনাকে হত্যা করলাে তবে সকলে একমত যে রেস্তাননের দোষ সবচেয়ে বেশি; কারণ সর্বনাশ সেই প্রথমে আরম্ভ করেছিল, নিনেতার প্রতি কেন সে বিশ্বাসভঙ্গ করলাে।

কিং বলল তর্কের শেষ নেই, যত তর্ক করবে ততই বেড়ে যাবে এদিকে আমাদের সময় চলে যাচ্ছে। আর দেরি নয়, পরের গল্প এলিসা তুমি বলবে নাকি?

এলিসা বলল, কেন বলবাে না? নিশ্চয় বলবাে। প্রেমের গল্প ও প্রেমে হতাশ ও সর্বনাশ এইরকম একটা কিছু গল্প বলবাে। প্রেম সম্বন্ধে নানা জনের নানা মত। কেউ বলে প্রথম দৃষ্টিতে বা পলকে প্ৰণয় কখনও স্থায়ী হয় না, কেউ বলে তার বিপরীত, সেই প্রেম নাকি গভীর হয়। খোঁজখবর নিয়ে বা দীর্ঘদিন অপেক্ষা করে প্রেম করলে হয়ত বেশির ভাগ ক্ষেত্রে স্থায়ী হয় আবার নাও হতে পারে। মানুষের মন কখন কি করে বসে কে বলতে পারে? আবার এমনও হয় একজন অপরজনকে দেখল না অথচ বিবরণ শুনেই পরস্পরের প্রেমে পড়ে গেল এবং তার পরিণতি কতদূর করুণ হতে পারে সেইরকম একটা গল্প আমি তােমাদের শােনাব?

সিসিলি দ্বীপের ইতিহাস পড়ে জানা যায় যে, রাজা দ্বিতীয় উইলিয়াসের রুজ্জিয়েরি নামে এক পুত্র ছিল আর গােস্তাগ্রা নামে এক কন্যা ছিল। জারবিনো নামে একটি পুত্র রেখে পিতার আগেই রুজ্জিয়েরির মৃত্যু হয়।

জারবিনাে নামে এই নাতিটিকে তার দাদু রাজা দ্বিতীয় উইলিয়ম সযত্নে লালন করেন। কালক্রমে এই নাতি অত্যন্ত সুদর্শন তাে হলই, সমরবিদ্যা সমেত নানা বিদ্যায় পারদর্শী হল। তার সাহস ও বিনয়ের বুঝি তুলনা নেই। তার খ্যাতি সিসিলির সীমানা ছাড়িয়ে দেশে দেশান্তরে ছড়িয়ে পড়ল বিশেষ করে বারবারিতে তাকে নিয়ে খুব আলােচনা হতাে। বারবারি তখন সিসিলির এক করদ রাজ্য ছিল।

জারবিনাের এই খ্যাতি টিউনিসের রাজকন্যার কানে উঠল। টিউনিসবাসী ও আশপাশ রাজ্যের জনসাধারণের মতে এমন সুন্দরী, গুণবতী ও লাবণ্যময়ী কন্যা আর নাকি জন্মায় নি। কন্যাকে যে একবার চকিতের জন্যেও দেখেছে, সে নাকি অমন, মুখ আর ভুলতে পারবে না। গােলাপ ফুল তার শ্রীমুখের কাছে হার মানে এমনই অসাধারণ রূপশ্রী।

সাহসী পুরুষদের মেয়েরা পছন্দ করে, তার ওপর শক্তিমান ও রূপবান হলে তাে কথাই নেই। এ সমস্ত গুণই জারবিনাের আছে। জারবিনাের নানা সাহসিক কাহিনী টিউনিসকেও রাজকন্যার কানে পৌঁছত এবং তার নানা কৃতিত্বের ও বীরত্বকাহিনী শুনে টিউনিস-দুহিতা জারবিনাে সম্বন্ধে একটা অতি উচ্চ ধারণা পােষণ করতাে। জারবিনাের কথা শুনতে সে খুব ভালবাসত এবং শেষ পর্যন্ত রাজকন্যা অদেখা রাজপুত্রের প্রেমেই পড়ে গেল।

টিউনিসের রাজকন্যার অসাধারণ রূপ, কমনীয়তা ও অন্যান্য গুণের কথা টিউনিস ছাড়িয়ে সিসিলিতেও পৌঁছেছিল এবং জারবিনােও অনেক কিছু শুনে রাজকন্যার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল। শুনতে শুনতে এমন হল যে জারবিনােরও রাজকন্যার কথা শুনতে ভালাে লাগত। ভালাে লাগতে লাগতে জারবিনােও সেই অদেখা রাজকন্যার প্রেমে পড়ে গেল।

সেই আশ্চর্য রূপসী রাজকন্যাকে দেখবার জন্য জারবিনাে ব্যাকুল হল। তাহলে টিউনিস যেতে হবে। টিউনিস যাবার এমন কোনাে উপলক্ষ নেই যা সে তার দাদুকে বলতে পারে। বিশেষ দরকার না থাকলে দাদু যেতে দেবেন না। তখন যে সব বন্ধুরা ব্যবসা বা কোনাে কাজে টিউনিস যায় তাদের জারবিনো অনুরােধ করতাে সম্ভবত হলে রাজকন্যার সঙ্গে দেখা করে তার প্রেমের বার্তা পৌঁছে দিতে।

এক বন্ধু রত্ন ও অলংকার ব্যবসায়ী সেজে রাজকন্যার সঙ্গে দেখা করে জারবিনাের বার্তা তার কানে পৌঁছে দিয়ে বলল, জারবিনো নিজেকে এবং তার যা কিছু আছে সবই সে রাজকন্যাকে নিবেদন করে বসে আছে।

একথা শুনে রাজকন্যা যারপরনাই উৎফুন্ন হল। তার হৃদয় নেচে উঠল, গায়ে কাঁটা দিল। আশাতীত এই খবর শােনবার আশা তার ছিল না তাই সে যে তার আনন্দ কোথায় রাখবে তা ভেবে পেল না।।

বড় ব্যবসায়ীকে রাজকন্যা জারবিনাে সম্বন্ধে নানা কথা খুঁটিয়ে জিজ্ঞাসা করতে লাগল। রাজকন্যা পুরুষের ব্যবহারের উপযােগী অত্যন্ত দামী একটি রত্নখচিত অলংকার সেই ব্যবসায়ী বন্ধু মারফত জারবিনােকে পাঠাল। সেই উপহার পেয়ে জারবিনো এত খুশি হল যে, আকাশের চাই কেউ তার হাতে তুলে দিলে সে বােধহয় অত খুশি হতাে না।

এরপর থেকে জারবিনো রাজকন্যাকে প্রেমপত্র ও নানা উপহার পাঠতে লাগল। সুযােগ পেলেই তারা দেখা করবে কিন্তু কবে সেই সুযােগ আসবে? দু’জনেই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকে, কবে সেই সুদিন আসবে। দু’জনে দু’জায়গায় বসে ছটফট করছে, একজন সিসিলিতে আর একজন টিউনিসে।

এমন সময়ে টিউনিসের রাজা ঘােষণা করলেন, গ্রানাডার রাজার সঙ্গে তিনি মেয়ের বিয়ে দেবেন। খবর শুনে রাজকন্যা মুষড়ে পড়ল। যাকে সে কোনােদিন ভুলতে পারবে না তাকে ছেড়ে দূরে চলে যেতে হবে, কোনাে যােগাযােগও সম্ভব হবে না। তার ইচ্ছে হল যে করে হােক সে জারবিনোর কাছে ছুটে যাবে।

জারবিনোও তার প্রেয়সীর বিবাহের খবর শুনে প্রথমে হতাশ হয়ে গেল কিন্তু সে সাহসী, বীর প্রেয়সীকে উদ্ধার করতেই হবে। সে স্থির করলাে কনে যখন জাহাজে চেপে বিয়ে করতে

বরের বাড়ি যাবে সেই সময় সে জাহাজ আক্রমণ করে তার প্রেয়সীকে উদ্ধার করবে।

যে ভাবে হােক খবরটা টিউনিসের রাজার কানেও উঠল। তিনি তার কন্যা ও সিসিলির রাজা দ্ব উইলিয়মের নাতি জারবিনাের প্রেমের কাহিনী শুনলেন। তিনি আরও শুনলেন যে তাঁর কন্যা

দুহাজে চেপে থ্যানাডার রাজাকে বিয়ে করতে যাবে সেই সময়ে জারবিনো নাকি জাহাজ আক্রমণ পুরে। ছােকরার সাহস ও শৌর্যের কথা তিনি শুনেছিলেন তাই তিনি চিন্তিত হলেন।

মেয়ের যাত্রার দিন এগিয়ে আসছে তাই তিনি ব্যস্ত হয়ে রাজা উইলিয়মকে তার আশংকার কথা নঃ অনুরােধ করলেন জারবিনাে বা তার কোনাে সঙ্গী যাতে তার কন্যার জাহাজ আক্রমণ না করে তাকে তার ব্যবস্থা করতে হবে। তার কাছ থেকে আশ্বাস পেলে তিনি অর্থাৎ টিউনিসরাজ মেয়েকে জাহাজে তুলে দেবেন।

বয়স ভারে অবনত রাজা উইলিয়ম নাতির প্রেমের কোনাে খবর রাখতেন না। নাতির অনেক  গুণগান তিনি শুনেছেন এবং জানতেন নাতি তার বাধ্য কিন্তু নাতি যে প্রেমে পড়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছে এ খবর তিনি জানতেন না। তবুও তিনি ভাবলেন, টিউনিসরাজকে কোনাে পাকা কথা দিলে সে অঙ্গীকার তার নাতি নিশ্চয়ই নতশিরে মেনে নেবে।

তাই রাজা উইলিয়ম টিউনিসরাজকে কথা দিলেন যে, আপনার কোনাে ভয় নেই। আমার নাতি জারবিনাে বা কেউ আপনার কন্যার জাহাজ আক্রমণ করবে না। আপনি নিশ্চিত থাকুন। তিনি তার অঙ্গীকারের প্রমাণস্বরূপ হাতের দস্তানা পাঠিয়ে দিলেন।

রাজা উইলিয়মের পাকা কথা পেয়ে টিউনিসরাজ নিশ্চিত হয়ে কন্যার যাত্রার আয়ােজন সম্পূর্ণ করলেন। একটা বড় জাহাজ তিনি কার্থেজ বন্দরে আনালেন। মেয়ের ও সহযাত্রীদের যাতে কোনাে অসুবিধা না হয় এজন্য যতদূর সম্ভব আরামের তিনি ব্যবস্থা করে দিলেন। তারপর রাজা অনুকূল আবহাওয়া ও বাতাসের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন।

কন্যা তাে সবই জানতে পারছে, শীঘ্রই তাকে দেশ ত্যাগ করে গ্রানাডা যেতে হবে। কন্যা তখন তার বিশ্বস্ত সেবককে পালেরমাে পাঠাল। সেবক জারবিনের সঙ্গে দেখা করে যেন সবকিছু জানায়। গ্রানাডা যাত্রার দিন ঘনিয়ে আসছে। জারবিনো যদি তাকে উদ্ধার করতে না পারে তাহলে সে জানবে জারবিনের শৌর্যবীর্যের যে কথা শুনে এসেছে সে সবই বৃথা এবং তার প্রতি জারবিনাের ভালবাসাও সাময়িক বিলাস মাত্র। সবই ফাকা।

সেই সেবক জারবিনোর কাছে বার্তা পৌঁছে দিয়ে টিউনিসে ফিরে গেল কিন্তু জারবিনো কি করতে পারবে তা কন্যা জানতে পারলাে না। অতএব সে দুশ্চিন্তায় কাল কাটাতে লাগল।

এদিকে জারবিনাে পড়ল উভয়সংকটে। দাদু বলে নয়, এক দেশের রাজাকে পাকা কথা দিয়েছেন। যে আপনার কোনাে বিপদ ঘটবে না আর অপরদিকে তার প্রেম। দাদুর কথা রাখবে না, না প্রেমিকার কাছে ভীরু প্রমাণিত হবে? তার রক্ত চঞ্চল হয়ে উঠল। প্রেমই বড়। রাজারা অমন অনেক অঙ্গীকার করে থাকেন এবং তা ভঙ্গ করতেও বিলম্ব হয় না।

জারবিনো মেসিনাে যাত্রা করলাে। সেখানে পৌঁছে দু’খানা হালকা একতলা পালতােলা রণতরী যােগাড় করলাে। সে দুটিকে যুদ্ধোপযােগী করলাে এবং দুই জাহাজে সাহসী ও যুদ্ধবাজ নাবিক তুলে নিল, যারা বেপরােয়া, নিষ্ঠুর, বিপদকে তারা তুচ্ছ জ্ঞান করে। তারপর জাহাজ দু’খানি নিয়ে সে সারডিনিয়ার দিকে যাত্রা করলাে কারণ এই পথেই তার প্রেয়সীর জাহাজ যাবে।

তার অনুমান ভুল হয়নি। সারডিনিয়া সমুদ্রে পৌঁছবার কয়েক দিনের মধ্যেই তার প্রেয়সীকে বহন করে গ্রানাডাগামী জাহাজ ধীরগতিতে আসতে দেখা গেল।

জাহাজ দেখতে পেয়ে জারবিনো তার নিজের জাহাজ দুটিকে যতদূর সম্ভব টিউনিসের জাহাজটির কাছে নিয়ে গেল। তারপর তার যুদ্ধবাজ নাবিকদের সম্বােধন করে বলল, তােমরা যে সকলে অত্যন্ত সাহসী তা আমি জানি এবং সেই সঙ্গে আমি জানি যে, তােমরা প্রত্যেকে কোনাে না কোনাে সময়ে প্রেমে পড়েছিল। অতএব প্রেমের মর্যাদা তােমরা জান আর এও জান যে প্রেমের জন্যে মানুষ কি না করতে পারে। প্রেমের আকর্ষণ তীব্র। প্রেমের কথা বলার কারণ এই যে, আমার নিজের প্রেমই আমাকে এই দুঃসাহসী অভিযানে টেনে এনেছে। সামনের ঐ জাহাজে আমার প্রেমিকা আছে। আমি তাকে উদ্ধার করতে এসেছি। তােমরা প্রেমিকরা আমার মর্মবেদনা বুঝবে। আমি তােমাদের এক সৎকাজে আহ্বান করছি। চলাে আমরা ঐ জাহাজে ঝাপিয়ে পড়ি। আমার প্রেমিকাকে উদ্ধার করতে সাহায্য করাে।

তোমরা যেমন আমার উপকার করবে তেমনি তােমরাও উপকৃত হবে কারন ঐ জাহাজে প্রচুর মূলবান সামগ্রী, নগদ অর্থ ও রত্নালংকার, আসবাব ও রৌপ্যনির্মিত তৈজসপত্রাদি ও বস্ত্রসম্ভার আছে। আমার সংকেত পেলে তােমরা ঐ জাহাজ আক্রমণ করবে।

জাহাজের নাবিকদের মধ্যে কোনাে প্রেমিক আছে কিনা তা বলা শক্ত কারণ নাবিকরা সাধারণত শুধ্য প্রেম অপেক্ষা লালসা ও নারীমাংসের প্রতিই আকৃষ্ট এবং জাহাজ লুঠ করার প্রতিই তাদের আগ্রহ বেশি। বিশেষ করে যখন তারা জানতে পারলাে যে জাহাজে প্রচুর মূল্যবান সামগ্রী আছে। জারবিনাের বক্তব্য শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা উল্লাসে চিৎকার করে উঠল।

জারবিনো বলল, ঐ দেখ ঈশ্বর আমাদের সহায়, ভাগ্য আমাদের সহায়, বাতাস বন্ধ হয়ে গেছে, জাহাজটি নিশ্চল হয়ে গেছে। ওর পালে একটুও বাতাস নেই। আমাদের সুযোেগ উপস্থিত।

গ্রানাডাগামী টিউনিসের জাহাজটি পালে বাতাসের অভাবে থেমে গিয়েছিল। জাহাজের নাবিকেরা তখন দেখল দু’খানা জাহাজ তাদের আক্রমণ করতে আসছে তারাও আক্রমণ প্রতিরােধ করবার জন্যে প্রস্তুত হল।

ঐ জাহাজের প্রায় গায়ে নিজের জাহাজ দুটি লাগিয়ে জারবিনো ওদের আহ্বান করে বলল, তােমরা যদি যুদ্ধ ও প্রাণহানি না চাও তাহলে অফিসারেরা আমাদের জাহাজে চলে এসাে।

তখন টিউনিসের জাহাজ নিজেদের পরিচয় জানিয়ে বলল, তােমরা আমাদের অন্যায়ভাবে বাধা দিছ্ছ কারণ সিসিলির রাজা উইলিয়ম আমাদের কথা দিয়েছেন যে, কেউ আমাদের বাধা দেবে না। এই যে তার দস্তানা। তারা আরও বলল, যা হয় হবে, তারা মরবে তবুও আত্মসমর্পণ করবে না, তারা লড়াই করবে।

ইতিমধ্যে টিউনিস-দুহিতা বাইরে বেরিয়ে এসেছে। জারবিনো তাকে দেখে মুগ্ধ। সে যা কল্পনা ছিল প্রেয়সী তার চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর যেন স্বর্গের পরী। তার রক্ত চঞ্চল হল। প্রেয়সীকে উদ্ধার

করবার জন্যে তার দেহমনে নতুন উদ্দীপনা সঞ্চারিত হল। এখন সে বােধহয় বিনা অস্ত্রে বাঘের এ লড়াই করতে পারে।

জারবিনো তাদের নতুন প্রস্তাব দিল। রাজকন্যাকে আমাকে দিয়ে দাও, তােমাদের বিনা বাধায় যেতে দেব নচেৎ যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু অপরপক্ষে এই প্রস্তাবেও সম্মত নয় অতএব দু’পক্ষে তীর বর্ষণ আরম্ভ হয়ে গেল। দু’পক্ষেই হতাহতের সংখ্যা বাড়তে লাগল। জারবিনো একটা ছােট নৌকোয় আগুন ধরিয়ে টিউনিসের জাহাজের গা ঘেঁষিয়ে সেটা জলে নামিয়ে দিল।

টিউনিসের জাহজের নাবিকরা দেখল তাদের তাে পুড়ে মরতে হবে। যখন তারা রাজকন্যাকে জাহাজের মাথায় এনে দাড় করিয়ে দিল, রাজকন্যার চোখ দিয়ে তখন অঝােরে জল ঝরছে। জাহজের নাবিকরা বলল, জারবিনো এবার দেখ আমরা কি কাণ্ড করি। রাজকন্যা তার সংকট বুঝতে পেরে চিৎকার করছে, দয়া ভিক্ষা করছে কিন্তু নাবিকরা তার কথায় কান না দিয়ে তাকে জারবিনাের সামনেই হত্যা করে তার মৃতদেহ জলে ফেলে দিয়ে বলল, তােমার বিশ্বাসঘাতকতার পুরস্কার দিলুম। তুমি যা চাইছিলে তাই দিলুম, জল থেকে তুলে নাও।

এই নিষ্ঠুর দৃশ্য দেখে জারবিনো যত না শােকাহত হল তার চেয়ে বেশি ক্ষিপ্ত হল। সে বেপোরোয়া। যা হয় হবে। ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে হাতে একটা তলােয়ার নিয়ে সে অপর জাহাজে ঝাপিয়ে পড়ে তলােয়ার ঘােরাতে লাগল। অনেকে কাটা পড়ল। তার সঙ্গে তার নাবিকরাও জাহাজে নেমে লুটপাট আরম্ভ করে দিয়েছে। নৌকোর আগুন জাহাজে ছড়িয়ে নাবিকরা লুটের মাল নিয়ে ফিরে এল আর জারবিনো তার প্রেমিকার মৃতদেহ সযত্নে জল থেকে তুলে কাদতে কাদতে নিজের জাহাজে ফিরে এলাে। সিসিলিতে ফিরে ত্রাপানির বিপরীতে ছােট্ট দ্বীপ উস্তিচাতে প্রেমিকার দেহ সসম্মানে কবর দিল। এরপর তার মুখে কেউ হাসি দেখে নি, কালক্রমে হয়ত সে তার প্রেমিকাকে ভুলত কিন্তু সে সময় সে পেল না।

এই শােচনীয় পরিণতির খবর টিউনিসের রাজার কানে পৌঁছল। ঘটনার বিবরণ জানবার জন্যে শশাকের চিহ্নস্বরূপ কালাে পােশাক পরিহিত কয়েকজন দূত রাজা উইলিয়মের দরবারে পাঠালেন। টিউনিসরাজের অভিযােগ সিসিলিরাজ তার অঙ্গীকার রক্ষা করতে পারেন নি। তার জাহাজ জারবিনে আক্রমণ করেছিল, তার নাবিকেরা জাহাজ লুঠ করে জ্বালিয়ে দিয়েছে, কন্যা নিহত।

টিউনিসের দূত মারফত এই দুঃসংবাদ শুনে রাজা উইলিয়ম মর্মাহত হলেন। যার ওপর তার বিশ্বাস ছিল সেই তার প্রদত্ত অঙ্গীকার ভঙ্গ করলাে? তিনি ন্যায়নিষ্ঠ রাজা। তার চোখে উচ্চনীচ ভেদাভেদ নেই।

তিনি একজনকে পাকা কথা দিয়েছিলেন। সে কথা যে ভঙ্গ করেছে তাকে তিনি উপযুক্ত শাস্তি দেবেনই। লই বা সে তার একমাত্র নাতি বা উত্তরাধিকারী। রাজা উইলিয়ম জারবিনােকে গ্রেফতারের আদেশ দিলেন। বিচারে তাকে মৃত্যুদণ্ড দিলেন এবং তার সমক্ষে মুণ্ডচ্ছেদ করা হল। তার সভাসদরা জারবিনোর প্রাণভিক্ষা চেয়েছিল কিন্তু তিনি তাদের আবেদন অগ্রাহ্য করেছিলেন।

এই কি প্রেমের পরিণতি। মিলিত হবার কোনাে সুযােগই তারা পেল না।

পঞ্চম গল্প

লিসাবেতার ভাইয়েরা তার প্রেমিককে হত্যা করলাে। মৃত প্রেমিক লিসাবেতাকে স্বপ্নে দেখা দিয়ে বলল কোথায় তাকে পুতে দেওয়া হয়েছে। লিসাবেতা সেই স্থানে গিয়ে প্রেমিকের মৃতদেহ থেকে মুণ্ডটি ছেদন করে বাড়িতে এনে একটি টবে রেখে দিল। প্রতিদিন সে সেই মুণ্ডের ওপর অশ্রুপাত করতাে। তার ভায়েরা জানতে পেরে মুণ্ডসহ টবটি কেড়ে নিয়ে গেল। শোকে লিসাবেতা মারা গেল।

এলিসার গল্প শুনে কিং তার প্রশংসা করে ফিলােমেনাকে গল্প বলতে বললেন। জারবিনো ও তার প্রেমিকার করুণ পরিণতিতে সে শােকাভিভূত। কিং-এর আদেশ মানতে হবে তাই সে শােক সম্বরণ করে বলল, এলিসা যাদের গল্প বলল তারা উচ্চস্তরের মানুষ। আমার গল্পের পাত্রপাত্রীরা সাধারণ স্তরের মানুষ, তাহলেও এই কাহিনী কিছু কম মর্মস্পর্শী নয়। তাছাড়া এলিসার গল্পে মেসিনার নাম শুনে আমার এই গল্পটা মনে পড়ল, কারণ গল্পের ঘটনাস্থল মেসিনা। তাহলে এবার সকলে শােনাে :

একদা মেসিনায় তিন ভাই বাস করতাে। তারা তিনজনেই বণিক ছিল। তাদের পিতার মৃত্যু হয়েছে। ছেলেদের জন্যে তিনি প্রচুর অর্থ ও সম্পদ রেখে গিয়েছিলেন। পিতা আসলে ছিলেন স্যান জেমিনাের অধিবাসী। তিন ভায়ের এক বােন ছিল, নাম লিসাবেতা। বােনটি সুন্দরী ছিল, তার চোখ দুটি বুঝি তুলনা ছিল না। তাকে দেখলেই ভালাে লাগতাে। বিবাহের বয়স অতিক্রান্ত কিন্তু যে কোনাে কারণের জন্যে তােক ভায়েরা তার বিবাহ দিতে পারে নি।

মেসিনা শহরে ভায়েদের কয়েকটি আড়ত ছিল। তার কোন একটিতে লােরেঞ্জো নামে পিসার একটি যুবক চাকরি করতাে। লােরেঞ্জো কাজের ছেলে ছিল, সে সকল কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন তাে করতােই এমনকি ব্যবসা সম্বন্ধে ভায়েদের অনেক সুপরামর্শ দিত। এছাড়া তার চেহারা ছিল পেশীবহুল ও পুরুষােচিত, ফলে সে প্রায়ই লিসাবেতার দৃষ্টি আকর্ষণ করতাে।

লােরেঞ্জো একদিন সঠিকভাবে বুঝতে পারলাে লিসাবেতা তার প্রতি আকৃষ্ট। মেয়েটির চোখে কি জাদু আছে কে জানে সেও তার প্রতি আকৃষ্ট হল। তার কয়েকজন বান্ধবী ছিল, তাদের লােরেগ্রো বাতিল করে দিল। পরস্পরের প্রতি শুধু আকর্ষণ নয়, হৃদয় বিনিময়ও হল, উভয়ে গভীরভাবে পরস্পরের প্রেমে পড়ল। দু’জনে গােপনে মিলিত হতে লাগল এবং প্রেমও গভীর থেকে গভীরতর হতে লাগল।

তারা তাদের প্রেম ও মিলন অভিসার গােপন রেখেছিল কিন্তু একদিন রাত্রে লিসাবেতা যখন লােরেজোর শয়নঘরের দিকে যাচ্ছিল সেই সময়ে তার ভাই তাকে দেখে ফেললাে কিন্তু লিসাবেতা টের পেল না।

বােনের এমন আচরণ তার ভালাে লাগল না। বােন তাদের কর্মীর সঙ্গে প্রেম করবে এটা তার পছন্দ নয়। যাই হােক সে বুদ্ধিমান তাই হঠাৎ কিছু করে বসলাে না। বােনকেও কিছু বলল না, সারারাত্রি ধরে চিন্তা করতে লাগল কি করা যায়।

পরদিন সকালে বড় ভাই অপর দুই ভাইকে লিসেবেতার কথা বলল। বাকি দুই ভাইও লিসাবেতার এই আচরণ পছন্দ করলাে না। বােনকে নিয়ে কি করা যেতে পারে এই নিয়ে তারা দীর্ঘক্ষণ ধরে আলােচনা করলাে। দেখতে হবে তাদের এবং তাদের বােনের নামে যেন কুৎসা রটনা না হয়, ব্যাপারটা যেন গােপন থাকে, কেউ যেন এ নিয়ে আলােচনা করার সুযােগ না পায়। ব্যাপারটা আর বেশিদূর এগােতে দেওয়া উচিত হবে না। যতদিন পর্যন্ত না কিছু করা যায় ততদিন পর্যন্ত ওরা বােনের এই কেলেংকারির আভাস পর্যন্ত কাউকে এমনকি লিসাবেতা ও লােরেঞ্জোকেও জানতে দেবে না।

ওরা লােরেঞ্জোর সঙ্গে যেমন ব্যবহার করতাে, যেমনভাবে কথাবার্তা বলতাে, হাসিঠাট্টা করতাে তার কোনাে ব্যতিক্রম হল না। ইতিমধ্যে তিন ভাই একটা সিদ্ধান্ত স্থির করে ফেলেছে। তিন ভাই একদিন বলল তারা একদিন গ্রামাঞ্চলে প্রমােদভ্রমণে যাবে, লােরেঞ্জোকেও সঙ্গে নেবে।

নির্দিষ্ট দিনে ওরা বেরিয়ে পড়ল। সঙ্গে লােরেঞ্জোকে চলল। ওরা নির্জন অঞ্চল বেছে নিয়েছিল। সেখানে ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ লােরেঞ্জোকে আক্রমণ করে বসলাে এবং তাকে খুন করলাে। কেউ সাক্ষী রইল না। বাড়ি ফিরে তারা রটিয়ে দিল যে তারা একটা জরুরি কাজে লােরেঞ্জোকে মেসিনার বাইরে পাঠিয়েছে। সন্দেহ বা অবিশ্বাস করার কিছু নেই কারণ লােরেঞ্জোকে মাঝে মাঝে এমন বাইরে পাঠান হতো।

এদিকে লােরেঞ্জোর জন্যে লিসাবেতার চিন্তা হচ্ছে। অনেকদিন হয়ে গেল সে এখনও ফিরছে না কেন? আগেও তাে অনেকবার বাইরে গেছে এত দেরি তাে কখনও হয়নি। সে লক্ষ্য করে দেখল যে, তার ভায়েদের কোনাে চিন্তা নেই অথচ তার ফেরার তারিখ পার হয়ে গেছে। তার কোনাে বিপদ ঘটল তাে? দুশ্চিন্তায় লিসাবেতার ঘুম হয় না।

লিসাবেতা ভায়েদের প্রায়ই জিজ্ঞাসা করে, লােরেঞ্জোকে তােমরা কোথায় পাঠিয়েছ? সে এখনও ফিরছে না কেন? গােড়ার দিকে ওরা দায়সারা উত্তর দিত কিন্তু ক্রমশ তারা বিরক্ত হয়ে উঠল। একদিন তারা লিসাবেতাকে ধমল দিল, বলল, লোরেঞ্জোকে নিয়ে তাের কি দরকার? সে আমাদের একজন সামান্য কর্মচারী। তাকে আমরা যেখানে ইচ্ছে পাঠাই না কেন তাের নাক গলাবার কি দরকার? যে যদি তুই লােরেঞ্জোর নাম মুখে আনবি তাে তােকে উচিত শিক্ষা দেব। খবরদার ওর কথা আমাদের আর জিজ্ঞাসা করবি না।

ভায়েদের আরও একটা ভয় ছিল। বােনের দেখাদেখি অন্য লােকেদেরও লােরেঞ্জো সম্বন্ধে কৌতূহল জাগতে পারে এবং কথাটা ক্রমশ আরক্ষা বিভাগের কানে উঠতে পারে। তখন বিপদ ঘটতে কতক্ষণ?

এরপর লিসাকেতা ভায়েদের আর কোনাে প্রশ্ন করে নি কিন্তু বেচারী লােৱেশ্লোর বিরহে দক্ষিন মানসিক কষ্ট ভােগ করতে লাগলাে। কাজেকর্মে, খাওয়াদাওয়া, পােশাকআশাক কোনােদিকে তার মন। নেই। তার রাত্রে ঘুম হয় না, চোখের কোলে কালি পড়েছে, চেহারা ম্লান হয়ে গেছে। অমন সুন্দর চোখ নিস্প্রভ।

মনে তার নানারকম শংকা। রাত্রে কাদে, মাঝে মাঝে তার নাম ধরে চিৎকার করে ওঠে। তাকে এর আসতে বলে, লােরেঞ্জো যখন ফেরে না তখন সে আরও কাদতে থাকে। তাকে সান্তনা দেবার বা শান্ত করবার কেউ নেই। এরকম চলতে থাকলে সে বুঝি পাগল হয়ে যাবে।

একদিন রাত্রে লিসাবেতা কাদতে কাদতে ঘুমিয়ে পড়ল। এমন সময়ে লােরেঞ্জো তাকে স্বপ্নে দেখা লি। কিন্তু এ কি চেহারা হয়েছে তার। পরণে ছিন্নভিন্ন বেশ, মুখভাগ যেন মৃত মানুষের মতাে, এ যেন লােরেঞ্জোর ছায়া। সেই ছায়ামূর্তি লিসাবেতাকে ফিসফিস করে বলল, লিসাবেতা তুমি আমার জন্যে বৃথা শােক করছাে, আমাকে ভৎসনাও করছে কিন্তু আমার আর ফেরার উপায় নেই কারণ তােমার ভাইরা আমাকে খুন করে মাটির তলায় পুঁতে দিয়েছে। আমি আর ফিরব না। আমাকে ভুলে যাও। আমি চলে যাচ্ছি। যাবার আগে লােরেঞ্জো বলে গেল কোথায় কোন গাছের গােড়ায় তাকে পুঁতে রাখা হয়েছে।

লিসাবেতার ঘুম ভেঙে গেল। সে ধড়মড় করে উঠে বসল, তার গায়ে তখন কাটা দিয়ে উঠেছে। সে কি স্বপ্ন দেখল! লােরেঞ্জোকে হত্যা না করে তাকে হত্যা করলাে না কেন? সে এই শােক কি করে সহ্য করবে?

সূর্য না ওঠা পর্যন্ত সে বসে বসে কাঁদতেই থাকল। কিছুতেই কান্না থামাতে পারছে না। সে ঠিক হলাে তার প্রিয় সখিতুল্য দাসীকে নিয়ে সেই জায়গায় যাবে যার ঠিকানা লােরেঞ্জোর প্রেতাত্মা তাকে নিয়ে গেছে। সে যাবেই যাবে, যাচাই করে দেখবে সত্যিই তার প্রেমাস্পদ সেই গাছতলায় শুয়ে আছে কিনা।

অতি কষ্টে কান্না থামিয়ে চোখ মুখ পরিষ্কার করে যতদূর সম্ভব স্বাভাবিক হয়ে সে ভায়েদের বলল, তার বড়ই মন খারাপ হয়েছে, সে গ্রামে একটু বেড়িয়ে আসতে চায়। লােরেঞ্জোর বিষয়ে কোনাে কথা এবং তার প্রেতাত্মার কথাও সে তার ভায়েদের কাছে ভুলেও উল্লেখ করেনি। ভায়েরা তাকে অনুমতি দিতে সে তার সখিকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।

লিসাবেতা ও তার সখি খুঁজে খুঁজে সেই গাছতলায় এলাে। গাছের নিচে অনেক শুকনাে পাতা জড়াে হয়েছে বা জড়াে করা হয়েছে। ওরা দু’জনে সব পাতা সরাতে কাঁচা মাটি বেরিয়ে পড়ল এবং একটু মাটি খুঁড়তেই লাশ দেখা গেল। যে কোনাে কারণেই হােক মৃতদেহে তখনও পচন ধরেনি তবে কিছু বিকৃত হয়েছে ও শুকিয়ে গেছে। প্রিয়তমের এ হেন দুর্দশা দেখে লিসাবেতার মনে হল সেও বুঝি এখনই মারা যাবে। সে তার সখিকে জড়িয়ে ধরে অঝাের ধারায় কাঁদতে লাগল। সখিও লিসাবেতাকে জড়িয়ে কাদতে লাগল। লিসাবেতাকে তার সখি অনেক সান্ত্বনা দেবার পর লিসাবে তার মন শক্ত করে বলল সে লিরেঞ্জের মৃতদেহ নিয়ে যাবে। সখি বলল, তা কি করে সম্ভব? লিসাবেতাও বুঝল তা সম্ভব নয় আর নিয়ে গেলেও তারা লােরেগ্লোকে রাখবে কোথায়? আপাতত দু’জনে মিলে মৃতদেহ সেখানে থেকে তুলে আরও একটা ভালাে জায়গায় আরও ভালাে করে কবর দেবার ব্যবস্থা করলাে। তার আগে লিসাবেতা দেহ থেকে মুণ্ড বিচ্ছিন্ন করে তােয়ালেতে জড়িয়ে নিয়ে সখির হাতে তুলে দিয়ে প্রিয়তমের দেহ উত্তম রুপে মাটি চাপা দিয়ে বাড়ি ফেরার পথ ধরলাে। ধারে কাছে কোনাে লােক ছিল না, তারা কি আলা তা কেউ দেখতে পেল না। লােরেঞ্জোর মস্তকটি নিয়ে লিসাবেতা নিজের ঘরে ঢুকে সেটি কোলে নিয়ে এতই অশ্রু বিসর্জন করলাে যে মস্তকটি ভিজে গেল। অশ্রুপাতের সঙ্গে সঙ্গে সে প্রিয়তমের মস্তকটি নিরন্তন চুম্বক করতে লাগল। চোখের জল আর চুম্বনের বিরতি নেই। একসময়ে চুম্বন ও অশ্রুমােচন থামিয়ে মস্তকটি মুছে মসলিনে জড়িয়ে সুন্দর একটি শ্বেতপাথরের টবে সযত্নে রাখলাে তারপর তার ওপর ঝুরঝুরে হালকা মাটি দিয়ে ভালাে জাতের কয়েকটা পুদিনা গাছের চারা বসিয়ে দিল। চারাগুলিতে সে কখনই জল দিত না, হয় গােলাপ ফুল বা কমলালেবু ফুলের নির্যাস এবং নিজের চোখের জল তাে আছেই।

সেই টবই হল লিসাবেতার ধ্যানজ্ঞান, সে মনপ্রাণ সমর্পণ করে নিরন্তর সেই টব নিয়ে বসে থাকে আর কাঁদে। তার চোখের জলেই টব ভিজে যায়।

ওদিকে টবের ভেতরে মস্তকটির পচনক্রিয়া শুরু হওয়ায় মাটি সরল ও সারবান হয়েছে ফলে পুদিনা গাছগুলি মাথা ঝাকড়ে ঘন হয়ে টব উপচে পড়ছে। সুগন্ধে ঘর ভর্তি হয়ে গেছে।

এদিকে লিসাবেতাও দিন দিন শীর্ণ হচ্ছে, কেঁদে কেঁদে চোখ সর্বদা লাল, জ্যোতিহীন। যৌবন চাঞ্চল্যও নেই। সে কদাচিৎ ঘরের বাইরে আসে। ভায়েরা বা কেউ কেউ দেখে টবের সামনে লিসাবেতা সেই একইভাবে দিনের পর দিন কাটাচ্ছে। আহারেও তার আগ্রহ নেই। যেটুকু খায় তা তার সেই দাসীর পীড়াপীড়িতে খায়।

ভায়েরা তাকে কয়েকবার বকাবকি করলাে, কিন্তু পরিবর্তন নেই। লিসাবেতা সেই একইভাবে দিন কাটাতে লাগল। ভায়েরা তক্কে তক্কে ছিল। লিসাবেতা একদিন ঘর থেকে বেরােবার পরই ওরা টবটা সরিয়ে ফেললাে। ঘরে এসে টব না দেখতে পেয়ে সে তার ভায়েদের অনুরােধ করলাে টব ফিরিয়ে দিতে। কিন্তু ভায়েরা তার কথা গ্রাহ্য করলাে না। লিসাবেতার মনের অবস্থা শােচনীয়। সে হতাশ হয়ে ক্রমাগত কাদতেই থাকল এবং কাদতে কাদতে শয্যাশায়ী হয়ে পড়ল। কঠিন রােগে সে আক্রান্ত। কোনাে কথা বলে না, শুধু বলে টব ফিরিয়ে দাও।

ভায়েদের কৌতুহল হল টবের ভেতর কি আছে দেখতে হবে। টবের মাটি তুলে ফেলতেই লরেঞ্জোর মাথা বেরিয়ে পড়ল। মাথার কোঁকড়ানাে চুল দেখে চেনা গেল মাথাটা কার। ঘটনা প্রকাশ হয় যাবার ভয়ে ভায়েরা মাথাটা মাটিতে পুঁতে ফেলল; তারপর মেসিনার পাট তুলে দিয়ে নেপলসে চলে গেল।

লিসাবেতা বারবার অনুরােধ করেও টব ফেরত পেল না। এরপর লিসাবেতা আর বেশিদিন বাঁচল না। তার শারীরিক ও মানসিক অবস্থার এতদূর অবনতি হয়েছিল যে টব থাকলেও সে আর বেশিদিন বাচতো না।

অনেকদিন পর্যন্ত তার করুণ কাহিনী অজ্ঞাত ছিল। তার মৃত্যুর অনেক পরে তার কাহিনী যখন জানা গেল তখন কত কবি তার স্মরণে কবিতা লিখল, গান লিখল। একটা গান ফিলােমেনা গেয়ে শনাল। গানখানি ওদের মধ্যে কয়েকজনের জানা ছিল, তারাও গলা মেলালাে তবে এই গানের উৎস তাদের জানা ছিল না।

ষষ্ঠ গল্প

অ্যানড্রিউওলা ভালবাসত গ্যাবরিওত্তোকে। অ্যানড্রিউওলা কি স্বপ্ন দেখেছিল, সেই গল্প গাবরিওত্তোকে বলল। গ্যাবরিওত্তো স্বপ্নে দেখা পাল্টা এক গল্প অ্যানড্রিউওলাকে বলল। গাবরিওত্তো সহসা তার বাহুবন্ধনে মারা গেল। অ্যানড্রিউওলা ও তার এক পরিচারিকা যখন গাবরিওত্তোর মৃতদেহ তারই বাড়ির দিকে নিয়ে যাচ্ছিল তখন তারা আরক্ষা বাহিনী দ্বারা গ্রেফতার হল। প্রকৃত ঘটনা যা ঘটেছিল অ্যানড্রিউওলা তা খুলে বলল। আরক্ষা বাহিনীর কর্তা অ্যানড্রিউওলাকে ধর্ষণ করবার চেষ্টা করে বিফল হল। অ্যানড্রিউলার বাবাকে জানানাে হল। অ্যানড্রিউওলা নির্দোষ প্রমাণিত হল। পিতা কন্যাকে মুক্ত করে নিয়ে গেলেন। হনড্রিউওলা স্থির করলাে সে আর মনুষ্য সংসারে বাস করবে না। সে এক কনভেন্টে গিয়ে মন ব্রত গ্রহণ করল।

ফিলামেনার গল্পটি সকলে, বিশেষ করে মেয়েরা খুব পছন্দ করলাে, ঐ গানটাই প্রধান কারণ। ঐ গান তারা অনেককে গাইতে শুনেছে, নিজেরাও গাইত কিন্তু এই গান কেন লেখা হয়েছিল তার উত্তর তারা পায় নি। এখন উত্তর পেয়ে ওদের গল্পটি অত্যন্ত করুণ হলেও ভালাে লেগেছিল। এবার প্যানফিলাের গত বলার পালা। কিং তাকে বলল, আর দেরি করছাে কেন প্যানফিলাে, আরম্ভ করাে।

প্যানফিলাে বলল, আমাদের প্রিয় বান্ধবী ফিলােমেনা যে গল্প বলল তাতে একটি স্বপ্নের উল্লেখ ছিল। আমিও যে গল্প বলবাে তাতে দুটি স্বপ্নের উল্লেখ থাকবে, দুটি স্বপ্নর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। স্বপ্ন দুটি ই স্বপ্ন নয়, সত্যি বলে প্রমাণিত হয়েছিল। স্বপ্নে আমরা কত কি দেখি, অলীক হলেও যখন স্বপ্নটি নেমে তখন সেটি আসল ঘটনা বলেই মনে হয়। তারপর সেই স্বপ্ন নিয়ে কতরকম বিচার করি, ভাবি স্বপ্ন নে সত্যি হয় না কিংবা যেটা দেখলাম সেটা সত্যি হতেও তাে পারে এবং অনেক সময়ে আংশিক বা পুরোপুরি সত্যি হয়। যাই হােক আর ভূমিকা না বাড়িয়ে, তােমাদের ধৈর্যচ্যুতি না ঘটিয়ে আমি গল্প আর করি। তােমাদের ভালাে না লাগলেও যেন বলাে ভালাে লেগেছে, বলে মৃদু হেসে প্যানফিলাে গল্প

বলতে আরম্ভ করলাে :

ব্রেসচিয়া শহরে নেগরাে দা পােনাটিকারারা নামে একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি বাস করতেন। কয়েকটি সন্তান ছিল যাদের মধ্যে অ্যানড্রিউওলা নামে একটি কন্যাও ছিল। মেয়েটির রূপের প্রশংস চারদিকে ছড়িয়ে পড়লেও তার এখনও বিবাহ হয়নি। গ্যাবরিওত্তো নামে এক প্রতিবেশী যুবক অ্যানড্রিউওলা ভালােবাসত। তার বংশপরিচয় উল্লেখযােগ্য না হলেও যুবকটির নানা গুণ ছিল, সে নীন বিদ্যায় পারদর্শী ছিল। নিজের পরিচারিকার সহায়তায় অ্যানড্রিউওলা তার প্রেমিকের সঙ্গে যােগায়েশ রক্ষা করতাে এবং মাঝে মাঝে তার পিতার একটি বাগানে দু’জনে গােপনে মিলিত হতাে। ঈশ্বরকে সাক্ষী করে তারা বিবাহ করেছিল এবং তারা পরস্পরকে গভীরভাবে ভালােবেসে সর্বদা প্রার্থনা তাে তাদের যেন বিচ্ছেদ না ঘটে। তারা বড়ই আনন্দে ও সুখে দিন কাটাচ্ছিল। তবে তারা শুধু চুম্বন ও আলিঙ্গনে সন্তুষ্ট ছিল না, তারা আরও এগিয়েছিল, তবে সবই গােপনে।

অ্যানড্রিউওলা একদিন স্বপ্ন দেখল যে, বাগানে সে ও গ্যাবরিওত্তো যেন রমণ করছে। স্বপ্নেই সে এত বেশি সুখ অনুভব করছিল যে তার মনে হচ্ছিল সে বুঝি তার প্রেমিককে নিজের বুকে তুলে নিয়েছে ও দু’জনে সংযােগ স্থাপন করেছে কিন্তু অ্যানড্রিউওলা সহসা সভয়ে লক্ষ্য করলাে যে গ্যাবরিওত্তোর দেহ থেকে ভীষণ দর্শন একটা মূর্তি বেরিয়ে এলাে। সে মূর্তির আকার কি রকম তা সে বুঝতে পারল না তবে সে ভীষণ ভয় পেল। সেই মূর্তি তার দৃঢ় আলিঙ্গন থেকে ও তার বাধা তুচ্ছ করে গ্যাবরিওজেকে বিচ্ছিন্ন করে মাটির ভেতরে নিয়ে গেল। তাদের আর দেখা গেল না।

তার ঘুম ভেঙে গেল, ঘামে তার দেহ ভিজে গেছে, ভীষণ ভীত। তবে ঘুম ভাঙতে সে নিশ্চিত হলেও তার ভয় দূর হল না। স্বপ্ন নাকি অনেক সময়ে সত্যি হয়। তাহলে সে কি করবে? সেইদিন সহ্য গ্যাবরিওত্তোর বাগানে আসার কথা আছে কিন্তু অ্যানড্রিউওলা এড়িয়ে গেল। তবে পরদিন রাত্রে আর পারলাে না। বাগানে যথাস্থানে গ্যাবরিওজে এলাে।

বাগানে প্রচুর গােলাপ ফুল ফুটেছিল। অ্যানড্রিউওলা, লাল, হলদে ও অনেক সাদা গােলাপ তুলে আনল, তারপর দুজনে একটা ফোয়ারার পাশে পাশাপাশি বসলাে।

একটু পরে দু’জনে প্রেমলীলায় মত্ত হল। এরই মধ্যে গ্যাবরিওত্তো জিজ্ঞাসা করলাে আগের দিন তাকে আসতে অ্যানড্রিউওলা নিষেধ করেছিল কেন? তখন অ্যানড্রিউওলা তার স্বপ্নর কথা বলল। পায়ে স্বপ্ন ফলে যায় এই আশংকায় অ্যানড্রিউওলা তাকে আসতে নিষেধ করেছিল।

প্রেয়সীর কথা শুনে প্রেমিক তাে হ হহা করে হেসে উঠল। পরে হাসি থামিয়ে বলল, তােমার মাথা খারাপ, স্বপ্ন আবার কখনও সত্যি হয় নাকি? বদহজম হলে বা পেট খালি থাকলে মানুষ স্বর দেখে বুঝলে প্রিয়তমা? আমি যদি স্বপ্ন বিশ্বাস করতুম তাহলে আমিই তাে আজ তােমার কাছে আসতুম না।

অ্যানড্রিউওলা উদগ্রীব হয়ে জিজ্ঞাসা করে, কেন কি হয়েছে? তুমিও বুঝি খারাপ স্বপ্ন দেখেছ?

হ্যা দেখেছি তাে? তাতে কি হয়েছে? যদিও এটা তােমারই মতাে এক উদ্ভট স্বপ্ন। আমি খুব সুন্দর একটা বনে শিকার করতে গেছি। বন যদি চমৎকার হয় তাহলে সে বনের হরিণও সুন্দর হবে। আমি একটা হরিণ ধরলুম, তুষারের মতাে সাদা, আর কী রূপ! হরিণটা আমার পােষ মেনে গেল, আমি যেখানে যাই হরিণও সেখানে যায়। আমি তার গলায় সােনার বগলস লাগিয়ে দিলাম আর বগলসে সঙ্গে সােনার চেন। যদি পথ ভুলে কোথাও চলে যায় তাই মাঝে মাঝ বেধে রাকতুম।

একদিন হরিণ আমার বুকে মাথা রেখে ঘুমােচ্ছে এমন সময় কোথা থেকে কালাে কুচকুচে ও বীভৎস শন একটা গ্ৰেহাউণ্ড কুকুর দৌড়ে এসে আমাকে আক্রমণ করলাে। আমি তাকে বাধা দিতে পারলুম না, । হাত পা আমার অবশ। কুকুরটা আমার বাঁ দিকের বুক চিরে আমার হৃৎপিণ্ডটা কামড়ে বার করে নিয়ে অন্ধকারে কোথায় মিলিয়ে গেল। সে কি তীব্র যন্ত্রণা। আমার ঘুম ভেঙে গেল। তখন আমার হাত পা কাঁপছে, সারা গা ঘামে ভিজে গেছে। যদিও বুঝলুম এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছিলুম তবুও আমি প্রথমেই আমার বুকে হাত দিয়ে দেখলুম আমার হৃৎপিণ্ড ধুকধুক করছে কিনা। কি বুদ্ধি দেখ আমার, আরে আমার হৃৎপিণ্ড যদি নাই থাকবে তাহলে আমি বেঁচে আছি কি করে? তুমি ওসব স্বপ্নটপ্নর কথা ভুলে যাও তাে, রাত্রিটা মাটি কোরাে না, এসাে আমার কাছে এসাে।

অ্যানড্রিউওলা বেচারী তাে নিজে যে স্বপ্ন দেখেছিল তারই জের এখনও কাটেনি, এখনও সে শংকিত হর ওপর এখন গ্যাবরিওত্তোর স্বপ্নর কথা শুনে সে আরও ভয় পেয়ে গেল কিন্তু ভয়ের কথা প্রকাশ কালাে না। তারা চুম্বন বিনিময় করতে লাগলাে কিন্তু মেয়ে যেন মন থেকে সাড়া পাচ্ছে না। মাঝে মাঝে সে গ্যাবরিওস্তোর মুখের দিকে চেয়ে কি যেন অনুসন্ধান করছে, মাঝে মাঝে অন্ধকার বাগানের দিকে চেয়ে দেখছে। যদিও তার নায়ক তার বুকে মাথা রেখে শুয়ে আছে তবুও তার গা ছমছম করছে।

গ্যাবরিওত্তো হঠাৎ একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে অ্যানড্রিউওলাকে জড়িয়ে ধরে বলল, আমাকে একটু আদর করাে প্রিয়তমা, আমি মরে যাচ্ছি। এই কথা বলতে বলতে তার হাত আলগা হয়ে গেল, সে অ্যানড্রিউওলার বুক থেকে পিছলে জমির ওপর পড়ে গেল ও নিশ্চল হয়ে পড়ে রইল।।

কি হল, কি হল? বলে অতি কষ্টে কান্না রােধ করে অ্যানড্রিউওলা গ্যাবরিওত্তোকে জড়িয়ে ধরলে, বলল, স্বামী তােমার কি কষ্ট হচ্ছে?

গ্যাবরিওত্তো কোনাে জবাব দিতে পারল না। তার তখন শ্বাসকষ্ট আরম্ভ হয়েছে, সারা গা ঘরে ভিজে গেছে। কে উত্তর দেবে? গ্যাবরিওত্তো তখন উত্তরের বাইরে চলে গেছে।

অ্যানড্রিউওলা বার বার ডেকে সাড়া না পেয়ে বুঝল তার স্বপ্ন সত্যি হল। অদৃশ্য সেই ভূত এসে তার প্রাণেশ্বরকে তার বুক থেকে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। তার মনের অবস্থা তখন শােচনীয়। হিমশীতল দেহটা আঁকড়ে ধরে অনেকক্ষণ অমােচন করলাে।

কিছুক্ষণ পরে অ্যানড্রিউওলার যেন চেতনা ফিরে এলাে। প্রিয়তমের মৃতদেহ নিয়ে সে এখন কি করবে? চোখমুখ মুছে পরিচারিকাকে ডেকে আনল। একমাত্র এই পরিচারিকাই তার গােপন প্রণয়ের কথা জানতাে। দু’জনে আবার কিছুক্ষণ কাঁদল তারপর তারপর অ্যানড্রিউওলা পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে বলল, ঈশ্বরের অসীম দয়া তাই এমন একজন মহান পুরুষ আমাকে দিয়েছিলেন কিন্তু আমার হয়ত কিছু পাপ আছে তাই তাকে ধরে রাখতে পারলুম না, তাঁর দান ফিরিয়ে নিলেন। কিন্তু আমাদের প্রেম তাে কেউ জানে না। ও চলে গেল, আমিও আর বেশিদিন বাঁচব না কিন্তু আমার নাম তাে শুদ্ধ রাখতে হবে, নিন্দা যেন না রটে। তাছাড়া আমি আমার স্বামীর তাে যেখানে সেখানে যেমন তেমন কবর দিতে পারি না।

পরিচারিকা বলল, তুমি মরবার কথা বলছাে কেন? আত্মহত্যা করবে? তাহলে তাে তােমার স্বামীর সঙ্গে তােমার মিলন হবে না কারণ তুমি আত্মহত্যা করলে তােমার স্থান হবে নরকে আর তােমার বই গুণান্বিত স্বামী এতক্ষণে স্বর্গে চলে গেছেন। তবে তার দেহ উপযুক্ত সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে সমাধিস্থ করতে হবে। আমি বলি এই বিরাট বাগানের এক অংশে আমরা এখনি ওকে কবরস্থ করি না কেন? এই বাগানে ও আসততা কেউ তা জানে না, আর এই বাগান ছিল তােমাদের মিলনক্ষেত্ৰ অতএব এখানে ওকে ভূমিতলে শুইয়ে রাখলে তােমার প্রেম উপযুক্ত মর্যাদা পাবে। আর আমার এই প্রস্তাব তােমার যদি মনঃপূত না হয় তাহলে চলাে আমরা মৃতদেহ বাইরের কোনাে উপযুক্ত জায়গায় শুইয়ে রেখে আসি, সকাল হলে ওকে চিনতে পেরে লােকজন নিশ্চয় ওর বাড়িতে খবর দেবে। বাড়ির লােক এসে ওকে। উপযুক্তভাবে কবরস্থ করার ব্যবস্থা করবে?

অ্যানড্রিউওলা বলল, তােমার প্রথম প্রস্তাব আমি মেনে নিতে পারছি না। এই বাগানে ওকে সমাহিত করা যাবে না কারণ ওর জন্যে আমি অনেক চোখের জল ফেলেছি। ওর আত্মীয়রাও কি ওর জন্যে চোখের জল ফেলবে না অথচ ওকে একটা মৃত কুকুরের মতাে রাস্তায় শুইয়ে রেখে আসতেও আমার মন চাইছে না। তুমি এক কাজ করাে, আমার ঘরে যাও, বাক্সয় বেশ বড় একটা সিল্কের চাদর আছে সেইটে নিয়ে এসাে, তাড়াতাড়ি যাও।

পরিচালিকা সিল্কের চাদরটা নিয়ে এলে অ্যানড্রিউওলা সেখানি ঘাসের ওপর বিছিয়ে গ্যাবরিওরে দে তার ওপর ধীরে ধীরে শুইয়ে দিল, মাথার নিচে একটা বালিশও দিল। তারপর গােলাপ বাগান

থেকে প্রচুর গােলাপ ফুল তুলে এনে লাল গােলাপের একটি মালা গেথে স্বামীর গলায় পরিয়ে দিল আর বাকি গােলাপ তার দেহের ওপর ও দু’পাশে ছড়িয়ে দিল।

এই কাজ শেষ হলে আবার কাঁদতে আরম্ভ করলাে। তারপর কাঁদতে কাঁদতেই বলল, এবার চলে ওকে নিয়ে আমরা ওর বাড়িতে যাই, বাড়ির দরজায় ওকে এইভাবে শুইয়ে রাখবাে। সকাল হলে বাড়ির লােক ওকে দেখতে পেয়ে নিশ্চয়ই ভেতরে নিয়ে যাবে। মৃত সন্তানকে দেখে বাড়ির লোেক নিশ্চয় সুখী হবেন না কিন্তু আমি মনে মনে একটু সান্ত্বনা পাবাে।

কথা শেষ করে গ্যাবরিওত্তোর বুকে মাথা রেখে আবার কঁদতে আরম্ভ করলাে। এবার কান্না বুঝি থামবে না।

এদিকে পরিচারিকা শংকিত। সে বলল, রাত শেষ হতে আর দেরি নেই, ঐ দেখ পুবদিক ফর্সা হচ্ছে। তবুও যখন ওঠে না তখন পরিচারিকা ওর হাত ধরে টেনে তুললাে। অ্যানড্রিউওলা মুখ তুলে দেখল সত্যিই পুবদিক ফর্সা হয়ে গেছে। তখন সে গ্যাববিওত্তোর পাশে হাঁটু গেড়ে বসে করজোড়ে বলল, প্রিয় পতি তােমার আত্মা আমার অশ্রু দেখে থাকে এবং তােমার আত্মা দেহ ত্যাগ করার পর যদি

তােমার ফেলে যাওয়া দেহে কিছুমাত্র স্পর্শানুভূতি থাকে তাহলে তুমি প্রেমের স্পর্শ দিয়ে তােমার  প্রিয়তম নারীর এই শেষ উপহারটি গ্রহণ করাে। এটি ক্ষুদ্র হলেও এর আকর্ষণ আমাদের উভয়ের কাছে ছিল অপরিসীম, এই বলে সে নিজের আঙুল থেকে সেই সােনার আংটিটি, যেটি গ্যাবরিওত্তো ওর আঙুলে পরিয়ে ওকে বিবাহ করেছিল সেটি ওর আঙুলে সযত্নে পরিয়ে দিয়ে প্রিয়তমের বুকে পড়ে গিয়ে মূর্ছা গেল।

পরিচারিকার পরিচর্যায় মূর্ছা ভাঙতে বিলম্ব হল না। অ্যানড্রিউওলা তখন উঠে দাঁড়াল এবং পরিচারিকার সহায়তায় গ্যাবরিওত্তোর লাশ তুলে নিয়ে বাগান থেকে বেরিয়ে রাস্তা দিয়ে গ্যাবরিওত্তের বাড়ির দিকে চললাে।

ওরা যখন রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে তখন আরক্ষা বাহিনীর লােকেরা কোনাে অপরাধীর মােকাবিলা করে ফিরছিল। অতি কষ্টে হলেও দু’জন নারী কেন একটি মৃতদেহ বহন করে নিয়ে যাচ্ছে? সন্দেহজনক ব্যাপার। আরক্ষাবাহিনীর কর্তা তাদের থামতে বলল।

কি ব্যাপার? তােমরা এই লাশ নিয়ে এই রাত্রে কোথায় যাচ্ছ। তােমাদের মতলব কি? ইত্যাদি প্রশ্ন

তে লাগলাে।

অ্যানড্রিউওলার মনের অবস্থা তখন শশাচনীয়। সে তাে মরবার জন্যে প্রস্তুত হয়ে আছে। এখন যে যাই বলুক তাতে তার কিছু যায় আসে না। আরক্ষা বাহিনীর কর্তাকে সে বলল : আমি জানি তােমরা কে এবং এও জানি ধরা যখন পড়েছি তখন পলায়ন করার চেষ্টাও বৃথা, তবে তােমরা যদি আমাকে তোমাদের বড় কর্তার কাছে নিয়ে যাও তাহলে আমি সবকিছু স্পষ্ট করে বলতে পারি। তবে তােমরা যদি তােমাদের আঙুল দিয়েও আমাদের স্পর্শ করার চেষ্টা করাে বা এই মৃত ব্যক্তির দেহ থেকে কিছু। অপসরণ করার চেষ্টা করাে তাহলে তােমাদের আমি সমুচিত শিক্ষা দেবাে।

আরক্ষা বাহিনীর কর্তা আর কিছু না বলে মৃতদেহ সমেত ওদের সকলকে বড়কর্তার বাড়ি নিয়ে গেল। বড়কর্তাকে ঘুম থেকে তােলা হল। তিনি ঘুম থেকে উঠে বৈঠকখানায় এসে অ্যানড্রিউওলাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ঘটনা কি?

বড়কর্তা একজন চিকিৎসককে ডেকে পাঠিয়ে মৃতদেহ পরীক্ষা করে বলতে বললেন যে, মতে অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে কিনা অর্থাৎ শ্বাসরােধ করে অথবা বিষ প্রয়ােগ করে তার মৃত্যু ঘটানাে হয়েছে কিনা দেখুন।

চিকিৎসক পরীক্ষা করে বললেন যে, মৃত ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়নি, তার স্বাভাবিক মৃত্যুই হয়েছ। হৃদপিণ্ডের গায়ে বিরাট একটি ফোড়া হয়েছিল। হৃৎপিণ্ডের ওপর চাপ পড়ে মৃতের শ্বাসকষ্ট হয়েছি তারই ফলে তার মৃত্যু হয়েছে।

বড়কর্তা সব শুনলেন। মহিলা সম্পূর্ণ দোষমুক্ত নয়। তার উচিত ছিল আগে আরক্ষা বিভাগে খবর দেওয়া কিন্তু তা সে করে নি। এই অপরাধে তাকে অভিযুক্ত করা যায়। আরক্ষা বিভাগের বড়কর্তা এবং স্থানীয় বিচারক হলেও লােকটি সচ্চরিত্র ছিল না। অ্যানড্রিউওলাকে দেখা মাত্র তার মনে ধরেছে তখন সে স্থির করেছে এ মেয়েকে ছলে বলে কৌশলে যে ভাবে হােক আয়ত্ত করতে হবে। তাই রীতিমতাে গম্ভীর হয়ে বলল : সবই তাে শুনলুম ও বুঝলুম, যুবকটির মৃত্যু কিছুটা অস্বাভাবিক। তোমার পরােক্ষ বা প্রত্যক্ষ হাত থাকতেও পারে তাছাড়া তুমি অপরাধও করেছো। তােমার উদ্দেশ্য যাই হোক তােমার উচিত ছিল আমাদের আগে খবর দেওয়া, আমরাও হয়ত ব্যাপারটা গােপন রাখতুম কিন্তু যা হয়েছে এতে তােমাকে দণ্ড দেওয়া যায়। তবে তুমি যদি আমার কাছে আত্মসমর্পণ করাে, আমার হাতে ধরা দাও, তাহলে আমি মুক্তি দেবাে।

বিচারকের প্রস্তাব শুনে অ্যানড্রিউওলা হতবাক, স্তম্ভিত। বিচারকের মুখে সে এ কি শুনছে? এই কি বিচারকের চরিত্র! হায় ভগবান সে কোথায় এলাে?

অ্যানড্রিউওলাকে নিরুত্তর দেখে বড়কর্তা সকল রীতিনীতি ও শালীনতা ভঙ্গ করে তাকে আলিঙ্গন করতে এলাে। অ্যানড্রিউওলা তখন বেপরােয়া, তার মাথায় আগুন জ্বলছে। সে বড়কর্তাকে তীব্র ভাষায় ভৎসনা করতে করতে তার সর্বশক্তি নিয়ােগ করে প্রবলভাবে বাধা দিল এবং ধাক্কা দিয়ে তাকে সরিয়ে দিল। বিফল হয়ে বড়কর্তা নিজ আসনে ফিরে গিয়ে চুপ করে বসে ভাবতে লাগল সে ভুল করেছে, সব মেয়ে সমান নয়।

ইতিমধ্যে সকাল হয়েছে। অ্যানড্রিউওলার পিতা নেগরাে দ্য পনটিকারারাকে খবর দেওয়া হয়েছে। তিনি নিজে একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি তবুও তিনি আরও কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে আরক্ষা বিভাগের বড় কর্তার বাড়িতে ছুটে এলেন। বড়কর্তার মুখে সব শুনে তিনি ঘাের প্রতিবাদ জানিয়ে বললেন, তাকে আগেই কেন খবর দেওয়া হয়নি, তাছাড়া তাঁর কন্যা কোনাে দণ্ডযােগ্য অপরাধ করেনি। মৃতদেহ যথাস্থানে রেখে সে আপনাদের খবর দিত। মেয়েকে এখনই মুক্তি দেওয়া হােক।

বড়কর্তা নিজেই তাে তখন অপরাধী। সে যা করেছে এখনি তা মহিলাটি প্রকাশ করে দেবে এবং যেখানে এতগুলি প্রভাবশালী ব্যক্তির সমাবেশ তখন তাকেই হয়ত দণ্ড পেতে হবে। তার চেয়ে আগেই মেয়েটিকে মুক্তি দিয়ে নিজের দোষ স্বীকার করা ভালাে।

তাই বড়কর্তা অ্যানড্রিউওলাকে মুক্তি দিয়ে তার চরিত্রের প্রশংসা করে বলল, মেসার নেগরাে, আপনার কন্যার অসাধারণ রূপ দেখে প্রথম দৃষ্টিতেই আমি তার প্রেমে পড়ে যাই এবং সে কথা বলতে হপনার কন্যা আমাকে ভর্ৎসনা করেছে। মহিলা উচিত কাজই করেছে তথাপি আমি আপনার কাছে প্রস্তাব করছি যে, যদিও আপনার কন্যার পূর্বে একবার বিবাহ হয়েছিল এবং যেহেতু ওঁর স্বামী সম্রান্ত করে সন্তান ছিল না তথাপি আপনি সম্মতি দিলে এবং আপনার কন্যা রাজি হলে আমি ওঁকে বিবাহ মুতে প্রস্তুত আছি।

যখন এইসব কথাবার্তা চলছে তখন সেই ঘরে অ্যানডিউওলা প্রবেশ করে পিতাকে দেখেই কান্নায় ভেঙে পড়ে তার পদতলে লুটিয়ে পড়ে বলল, বাবা আপনি নিশ্চয়ই ইতিমধ্যে সবই শুনেছেন। আমি অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করে যে কাজ করে দুঃখ ভােগ করছি তাও আপনি শুনেছেন, এখন আমি অত্যন্ত বিনীতভাবে অনুরােধ করছি আমাকে ক্ষমা করুন। যদিও আপনাকে না জানিয়ে আমার প্রিয়তম বেং আমার বিচারে এক সুপাত্রে আমার মনপ্রাণ সমর্পণ করে স্বামীত্বে বরণ করেছিলম, সেটা আমার উচিত হয়নি তা আমি তখন বুঝতে পারি নি। তথাপি আমি বলছি যে, আপনি আমাকে যদি ক্ষমা নও করেন এবং আমার মৃত্যুদণ্ডও না হয়, তাহলে আমি আপনার কন্যারূপে মৃত্যুবরণ করতে চাই, কেপে নয়। কথা শেষ করে অ্যানড্রিউওলা আবার অঝোরে কাঁদতে লাগলাে।

কন্যার একরকম বাঁধভাঙা কান্না দেখে পিতা নেগরােও কাঁদতে আরম্ভ করলেন। তিনি উদার হৃদয় হেপ্রবণ ছিলেন। তাছাড়া বৃদ্ধ হওয়ায় হৃদয়ের কঠিন বৃত্তিগুলি কোমল হয়েছে। তিনি কন্যাকে তুলে বসিয়ে আদর করে বললেন, মা তুমি খুব ভুল করেছাে। তুমি তাে জানাে আমার চিরদিনের ইচ্ছা যে, তোমার যােগ্য এক যুবককে স্বামীত্বে বরণ করে। তা তুমি যাকে বরণ করেছিলে তাকে যদি তুমি তোমার উপযুক্ত মনে করেছিলে তাহলে আমার আর বলার কি ছিল? আমার এই দুঃখ রয়ে গেল যে, তোয়ার সিদ্ধান্তের কথা তুমি আমাকে বিশ্বাস করে বলো নি। তুমি যুবকটির বিষয়ে আমাকে কিছু বললে হয়ত তার মৃত্যু হতাে না। তুমি তাে জান আমি উদার ও স্নেহপ্রবণ, তুমি যাকে পতিত্বে বরণ করেছিলে সেই যুবক যদি এখন জীবিত থাকতাে তাহলে আমি তােমার জন্যে তাকে স্বীকার করে নিতুম। তথাপি মৃত যুবককে আমার জামাতারূপে স্বীকৃতি দিচ্ছি। এরপর তিনি তার পুত্র ও আত্মীয়স্বজনদের নির্দেশ দিলেন যে, মৃত যুবক গ্যাবরিওত্তোকে যেন যথােপযুক্ত সম্মানের সঙ্গে সমাহিত করা হয়, কোনাে ত্রুটি যেন না থাকে।

ইতিমধ্যে গ্যাবরিওত্তোর বাড়িতেও এই দুঃসংবাদ পৌঁছে গেছে। সােকতপ্ত পরিবারের সকলে বলতে কি শহরের সকল নরনারী ঘটনাস্থলে চলে এসেছেন। সকলের চোখই অশ্রুসিক্ত। মৃতকে শেষবারের মতাে দেখা ও তার প্রতি সম্মান জানাবার জন্যে একটি প্রকাশ্য স্থানে অ্যানড্রিউওলার সেই সিল্কের চাদরের ওপর এবং তারই গােলাপফুল দ্বারা সজ্জিত দেহটি রাখা হল। যেহেতু তার বুকে কোনাে খ্যাতি নেই, এখন আর সেসব প্রশ্ন উঠলাে না, বলতে কি শহরের অনেক বিশিষ্ট ও অভিজাত ব্যক্তি শবাধারে কাঁধ দিয়েছিলেন। যথােপযুক্ত সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে মৃতদেহ সমাহিত করা হল।

অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সমাপ্ত হবার পর আরক্ষা বাহিনীর সেই বড়কর্তা এবং নেগরাে স্বয়ং কন্যার কাছে বিবাহের প্রস্তাব রাখলেন কিন্তু অ্যানড্রিউওলা বলল, তার আর বিবাহ করার ইচ্ছা নেই। পিতা তার কন্যার মনােবাসনা দুঃখের সঙ্গে মেনে নিলেন এমনকি কন্যা যখন বলল সে কোনাে কনভেন্টে গিয়ে নান হবে তখনও তিনি বাধা দিলেন না।

কয়েকদিন পরে অ্যানড্রিউওলা একটি সুপ্রসিদ্ধ কনভেন্টে গেল, সঙ্গে তার সেই পরিচারিকাও গেল। দু’জনেই নান ব্রত গ্রহণ করে শুদ্ধাচারী নারীর জীবন বেছে নিল। মানবসেবায় ও দেবতা ভজনায় তার তাদের জীবন অতিবাহিত করার প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করলাে।

সপ্তম গল্প

সিমােনা প্যাসকিনােকে ভালবাসে। তারা দুজনে একটি বাগানে প্রেমালাপ করবার সময় প্যাসকিনো সেজ নামে একটি গাছের পাতা দাঁতে ঘসতে ঘসতে মারা গেল। সিনেমাকে গ্রেফতার করা হল। প্যাসকিনাের কিভাবে মৃত্যু হল জানাবার জন্যে সিমােনাও ঐ সেজ গাছের পাতা দাঁতে ঘষে দেখবার সময় মারা গেল।

প্যানফিলাের গল্পটি শেষ হল। অ্যানড্রিউওলার জন্যে কিং কোনাে সহানুভূতি প্রকাশ করলাে না। কিং তখনি এমিলিয়াকে বলল, যে গল্পটি শেষ হল তারই পরিপূরক হিসেবে একটি গল্প বলতে। এমিলিয়া যেন কিং-এর ইচ্ছানুরূপ একটি গল্প বলার জন্যে তৈরি হয়েই ছিল। সে আরম্ভ করলাে :

প্যানফিলাের গল্পটি তােমরা শুনলে। অ্যানড্রিউওলা একটি বাগানে তার প্রিয়তমকে অকস্মাৎ হারাল। আমার গল্পের নায়িকার কপালেও ঠিক তেমনটি ঘটেছিল। অ্যানড্রিউওলার মতাে সেও গ্রেফতার হয়েছিল কিন্তু আইনকে সে ফাকি দিল। তার চরিত্রের শুদ্ধতা বা শারীরিক বলপ্রয়ােগে নয়। অসময়ে অকস্মাৎ মৃত্যুই তাকে মুক্তি দিল। প্রেম শুধু ধনীর প্রাসাদে নয়, দরিদ্রের কুটিরেও তার প্রভাব বিস্তার করে।

খুব বেশিদিনের কথা নয়, এই ফোরেন্স শহরে সিমােনা নামে একটি যুবতী ছিল। দরিদ্রের ঘরে জন্ম এবং সমাজের উচ্চস্তরে খ্যাতি না থাকলেও যুবতী ছিল অনিন্দ্যসুন্দরী। জীবনযাপন করতে ও নিজে আহার জোটাতে যুবতীকে কঠোর পরিশ্রম করতে হতাে। পশম থেকে চরকায় সুতাে কেটে সে জীবিকা নির্বাহ করত।

একে যুবতী তায় সুন্দরী তাই বুঝি প্রেমের দেবতা কিউপিগ সিমােনাকে মুক্তি দিতে মােটেই ইচ্ছুক নয়। এমন যুবতীকে বধ করতেই হবে তাই কিউপিড সিমােনাকে প্রেমের শরাঘাত করতে থাকলেন। যে যুবকটির প্রতি সিমােনা আকৃষ্ট হল তাকে সে মুখ ফুটে কিছু বলতে পারছে না আর যুবকও আকৃষ্ট কিন্তু সেও মুখ ফুটে কিছু বলতে পারছে না।

যুবক যে আকৃষ্ট তা বােঝা যাচ্ছে তার কাজ দেখে। সে এক পশম ব্যবসায়ীর কর্মচারী। তার কাজ অভাবী মহিলাদের পশম দিয়ে যাওয়া, যারা সেই পশম থেকে সুতাে কেটে দেবে। তা সেই যুবক সিমােনাকে বাছা পশম দিয়ে যেতাে। আর সিমােনাও মন দিয়ে সেরা সুতােটাই তাকে কেটে দিত। ভালাে সুতাে পেয়ে মালিক খুব খুশি হতাে, যুবকের প্রশংসা করতাে। যুবকও মালিককে বলে সিমােনার মজুরির হ’র বাড়িয়ে দিয়েছিল। পরস্পরের মধ্যে এই পশম ও সুতাে বিনিময়ের মাধ্যমে প্রেমের সঞ্চার | হয়েছিল। যুবক যখনি আসতাে তখনি সিমােনার দুই গাল লাল হতাে আর যুবক যার নাম প্যাসকিনাে | তার হৃৎপিণ্ডের গতি দ্রুত হতাে। নানারকম ছলে যুবক প্যাসকিনাে সহজে যেমন সিমােনাকে ছেড়ে | যেতে চাইত না তেমনি যুবতী সিমােনাও কিছু ছলে তাকে আটকে রাখতাে।। | একদিন বাঁধ ভেঙে গেল। দু’জনে এমনভাবে হেসে ফেলল যাতে তারা পরস্পরের কাছে ধরা পড়ে | গেল। কিন্তু জায়গাটা এমন যেখানে প্রেমালাপ করা যায় না। তাই প্যাসকিননা সিমােনাকে একটা বাগানের নাম উল্লেখ করে বলল সেখানে সে যেতে রাজি কিনা, তাহলে দু’জনে একত্রে বসে প্রেমগুঞ্জন করা যাবে। সিমােনা বলল সে তার কর্মক্ষেত্র থেকে ছুটি নিয়ে নিশ্চয়ই যাবে।

এক রবিবারে মধ্যাহ্নের আহারের পর সিমােনা তার বাবাকে বলল, সে স্যান গ্যালাে যাচ্ছে মেলা দেখতে। পার্ডনিং ফেস্টিভ্যালের মেলায় অনেক লােক আসে, বেশ জমজমাট মেলা হয়। সিমােনা অবশ্যই মেলায় গেল না, লজিনা নামে তার এক বান্ধবীকে সঙ্গে নিয়ে সে সেই উদ্যানে গেল, যেখানে তার প্রেমিক প্যাসকিনাে তার জন্যে অপেক্ষা করছে।

সিমােনা যেমন তার সঙ্গে একজন বান্ধবী নিয়ে গেছে, প্যাসকিনােও তেমনি তার এক বন্ধুকে নিয়ে গেছে যার নাম পুচ্চিননা, তবে সে তার ডাক নামেই বেশি পরিচিত যেটি হল স্ট্রাম্বা। উদ্যানে পেয়ে চারজনের যখন মিলন হল তখন কালক্ষেপ না করে পুচ্চিননা বলল, আমি আমার এই নতুন বান্ধবী লজিনাকে নিয়ে বাগানের ঐ দিকে যাচ্ছি, তােমরা এখানে এই সেজ গাছের ঝােপের আড়ালে দিবি প্রেমালাপ বা যা ইচ্ছে করাে, কেউ দেখবে না। আমরাও সুবিধেমতাে একটা জায়গা বেছে নেবাে তৰে বেশিদূরে যাবাে না।

সিমােনা ও প্যাসকিননা আজ দু’জনেই যে কি আনন্দিত তা বলার অপেক্ষা রাখে না। দুজনে কিছুক্ষণ ধরে এলােমেলাে গল্প করলাে, পরস্পরের খোঁজ নিল, কয়েকটা চুম্বন বিনিময়ও হল। প্যাসকিনাে বলল, এই উদ্যানের একাংশে একটা বনভােজন হচ্ছে, সেখানে সিমােনাকে নিয়ে সে যাবে। কথা বলতে বলতে প্যাসকিননা সেজ গাছ থেকে একটা পাতা ছিড়ে চিবিয়ে সেটা দাঁতে ঘষতে লাগল। এতে নাকি দাঁত পরিষ্কার হয়।

কিন্তু সাংঘাতিক এক দুর্ঘটনা ঘটে গেল। সেই পাতা চিবােতে চিবােতে প্যাসকিননা হঠাৎ ফ্যাকাসে হয়ে গেল, দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে গেল, তার হাত পা অবশ হয়ে কাপতে লাগলাে, সে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাে না, ঘাসের ওপর শুয়ে পড়লাে, কথা বন্ধ হয়ে গেল এবং অল্পক্ষণের মধ্যে সে মরে গেল। অকস্মাৎ এই অভাবনীয় কাণ্ড দেখে সিমােনা স্তম্ভিত। সে কেঁদে ফেলল এবং চিৎকারে করে লজিনা ও পুচিনােকে ডাকতে লাগল।

পুচিনাে ও লজিনা তাে সঙ্গে সঙ্গে ছুটে এলাে। প্যাসকিননা তাে মরে গেছেই উপরন্তু তার দেহের নানা জায়গা টিবি ঢিবি হয়ে ফুলে গেছে ও লাল লাল ছাপ পড়েছে। বন্ধুর এই শােচনীয় মৃত্যু ও তার বিকৃত দেহ দেখে পুচ্চিননা ক্ষেপে গেল। তীব্র ভাষায় সে সিমােনাকে আক্রমণ করল, বলল, শয়তানী, বেজ, তুই আমার বন্ধুকে বিষ খাইয়ে মেরেছিস।

পুষ্টিনাে চেঁচামেচি করে এমন হট্টগােল করতে লাগলাে যে, আশপাশ থেকে লােকজন ছুটে এলাে। তারা এসে দেখল একজন যুবক মরে পড়ে আছে, দেহ বিকৃত। আর একজন যুবক চিৎকার করে এক যুবতীকে গালাগাল দিচ্ছে। সেই যুবতী নিরুত্তর, মাথা নিচু করে কাঁদছে। তারা মনে করলাে ঐ যুবতীই দোষী, ঐ বিষ খাইয়েছে তা নইলে মেয়েটা কিছু বলছে না কেন? মেয়েটা যে এই ব্যাপারে সদ্যপ্রাপ্ত প্রেমিককে হারিয়ে শােকে মুহ্যমান হয়েছে তা তারা বুঝলাে না।

তখন কয়েকজন সিমােনাকে ধরে বিচারকের আদালতে নিয়ে চললাে। সিমােনার দুই চোখ থেকে গাল বেয়ে অঝোরধারায় জল ঝরে পড়ছে। ইতিমধ্যে পুচ্চিনাের সঙ্গে প্যাসকিনাের আর দুই বন্ধু আত্তিচিয়াত্তো এবং মালজিভােল যােগ দিয়েছে। এরা তিনজন আদালতে পৌঁছে বিচারকের সামনে হল্লা আরম্ভ করে দিল, যা ঘটে নি তা-ও রং চড়িয়ে বলল।

বিচারক সিমােনাকে জেরা করতে আরম্ভ করলেন কিন্তু পুচ্চিনাের অভিযােগ যদি সত্যি হয় তা খুব স্পষ্ট নয় এবং হতভম্ব সিমােনা যে বিবরণ দিচ্ছে তা বিচারক ঠিক বুঝতে পারছেন না; তাই তিনি বললেন যে, তিনি স্বয়ং ঘটনাস্থলে গিয়ে সরেজমিনে তদন্ত করবেন।

সিমােনাকে নিয়ে বিচারক সেই উদ্যানের ঘটনাস্থলে এসে দেখলেন প্যাসকিনাের লাশ পড়ে রয়েছে, সেটি রীতিমতো ফুলে উঠেছে। লাশটি বিস্মিত হয়ে দেখে সিমােনাকে জিজ্ঞাসা করলেন প্যাসকিনাে কি ভাবে মারা গেল।

পূর্বানুবৃত্তি দিয়ে সিমােনা বলল, আমরা এইখানে বসে গল্প করছিলাম তারপর প্যাসকিননা সেজ গাছের একটা পাতা ছিড়ে চিবােতে লাগলাে, বলে, সিমােনা নিজেই গাছের একটা পাতা ছিড়ে চিবিয়ে বস বার করে দাঁতে ঘষতে লাগল।

এতক্ষণ সমবেত লােকজন সিমােনাকে বিদ্রুপ করছিল, তার চরিত্রেও কটাক্ষপাত করছিল। কিন্তু সিমােনা যখন দাত ঘসছিল তখন তারা সভয়ে লক্ষ্য করলাে সিমােনার বিবরণ অনুসারে প্যাসকিনাে যেভাবে মারা গিয়েছিল সিমােনা নিজেও ঠিক সেইভাবে মারা গেল। এইভাবে সিমােনা মরে প্রমাণ করলাে যে, সে সম্পূর্ণ নির্দোষ এবং পুচ্চিনাে ও তার স্যাঙাতদের অভিযােগ মিথ্যা।

বিচারক যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না কারণ তিনি এবং সকলে জানেন যে সেজ গাছের পাতা নির্বিষ, ঐ গাছের পাতা চিবালে কারও মৃত্যু হয় না। অথচ এটি যে সেজ গাছ সে বিষয়ে কোনাে সন্দেহ নেই এবং এই বিশেষ গাছটির পাতা যে বিষাক্ত সে বিষয়েও সন্দেহ নেই। তিনি সাব্যস্ত করলেন গাছটি কেটে তাে ফেলা হবেই এবং পুড়িয়ে দেওয়া হবে।

গাছ কাটবার জন্যে বাগানের মালিক ডাকা হল। গাছের গুড়িটা কুড়ুল দিয়ে কাটা হল। গাছটা পড়ে গেল এবং সঙ্গে সঙ্গে দু’টি নির্দোষ যুবক-যুবতীর মৃত্যুর কারণ জানা গেল। গাছের গােড়ায় বেশ বড় আকারের ব্যাঙ বাসা বেঁধেছে। এই ব্যাঙের নিঃশ্বাস বিষাক্ত। সেই বিষ-নিঃশ্বাস গাছের সব পাতা বিষাক্ত করে দিয়েছে, সেই পাতা চিবিয়েই প্যাসকিনাে ও সিমােনা মারা গেল।

গাছের গােড়া কাটবার জন্যে কেউ কাছে যেতে রাজি হল না। তখন সমস্ত গাছ ঘিরে শুকনাে কাঠ ছড়িয়ে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হল। দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠল। জীবন্ত ব্যাঙ সমেত গাছটাও পুড়ে ছাই হয়ে গেল।

এইভাবে বিচারকের তদন্ত শেষ হল। পুচ্চিননা ও তার দু’জন বন্ধু মিলে সেন্ট পল গির্জা প্রাঙ্গণে প্যাসকিনাে ও সিমোেনাকে পাশাপাশি সমাহিত করলাে। পরজন্মে কি তারা মিলিত হতে পেরেছিল? কে জানে?

অষ্টম গল্প

জিরালামাে ভালােবাসে স্যালভেস্ট্রাকে। জিরালামাের মা তাকে প্যারিস পাঠিয়ে দিল। জিরালামাে প্যারিস থেকে ফিরে দেখল স্যালভেষ্ট্রার বিয়ে হয়ে গেছে। জিরালামাে গােপনে স্যালভোর ঘরে ঢুকে তার পাশে শুয়ে মরে গেল। তার মৃতদেহ গির্জায় নিয়ে যাওয়া হল। স্যালভেস্ত্রাও গির্জায় গিয়ে জিরালামাের পাশে শুয়ে মারা গেল।

কিং-এর ধৈর্য বােধহয় কম। এমিলিয়ার গল্প শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সে নেফাইলকে গল্প আরম্ভ করতে রেল। নেফাইল বলল :

অনেক মানুষ আছে যারা নিজেদের সবজান্তা মনে করে অথচ তারা যা দাবি করে সে বিষয়ে তার সব কেন হয়তাে কিছুই জানে না। যেটুকুও বা জানে তা অপরের ঘাড়ে চাপাতে গিয়ে বিপর্যয় সৃষ্টি করে, কাজ পণ্ড হয়। প্রেমের বন্ধন বড়ই দৃঢ়, অজ্ঞ ব্যক্তি সেই বন্ধন ছিন্ন করতে চেয়েও পারে না। সে ভাবে তার বিচারই সমস্যার সমাধান করবে কিন্তু তা কি হয়? শেষ পর্যন্ত প্রেম ও প্রাণ দুই-ই বিনষ্ট হয়।

বৃদ্ধদের কাছে শুনেছি যে, আমাদের এই শহরে অতীতে একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী ও নী ব্যবসায়ী বাস করতেন। তার নাম ছিল লেওনার্ডো সাইএরি। তার জিরালামাে নামে একটি পুত্র ছিল। তবে পুত্রের জন্মের পর পত্নীর হাতে সংসার ও একমাত্র পুত্রটির ভার দিয়ে তিনি মারা গেলেন। মারা যাবার আগে তিনি তার ব্যবসা ও সংসার পরিচালনার উত্তম ব্যবস্থা করে গিয়েছিলেন।

পুত্রটিকে দেখাশােনা করার জন্যে কয়েকজন দক্ষ অভিভাবক নিযুক্ত ছিল। অভিভাবকরা ছেলের মায়ের সঙ্গে পরামর্শ করে তার তদারক করতাে। লেখাপড়া, খেলাধুলা সবদিকে অভিভাবকদের কর নজর ছিল। এই অভিভাবকগণ ও জিরালামাের মা মনে করতেন তারা যা করছেন তা বালক মেনে নিচ্ছে কারণ তারা সর্ব বিষয়ে পারদর্শী এবং ছেলের মঙ্গলের জন্যেই করছেন। ছেলে প্রতিবেশীদের ছেলেমেয়ের সঙ্গে খেলাধূলা করে, মেলামেশা করে এবং তাদের সঙ্গে বড় হতে থাকে।

পাড়ার ছেলেমেয়েদের সঙ্গে মেলামেশা করতে করতে জিরালামাে সমবয়সী এক দর্জিকন্যার প্রতি আকৃষ্ট হল। ওরা দুজনে একসঙ্গে খেলতে বা বেড়াতে ভালােবাসে। একদিন তারা বুঝল তার পরস্পরকে ভালােবাসে। তাদের আকর্ষণ এত তীব্র যে পরস্পরের অদর্শন সহ্য করতে পারে না।

ব্যাপারটা মায়ের চোখ এড়াল না। ছেলেকে প্রথমে বকুনি, তারপর অল্পস্বল্প শাস্তি এবং পরে প্রহার। কিছুতেই কিছু হল না। ছেলেকে বশে আনা গেলাে না। মা তখন অভিভাবকদের সঙ্গে পরামর্শ করতে লাগলেন। মা ভাবলেন, তার যখন টাকার অভাব নেই তখন তিনি যা ইচ্ছে করতে পারেন, তিনি যা ঠিক করে দেবেন ছেলে তাই মেনে নেবে।

অভিভাবকদের মা বললেন, আমার ছেলে এই চৌদ্দবছরে পা দিয়েছে। সে পাড়ার এক দর্জির মেয়ে স্যালভেষ্ট্রর প্রেমে এমন ভাবে পড়েছে যে, ওদের দুজনকে কিছুতেই শাসন রাখা যাচ্ছে না। আমরা যদি জিরালামােকে এখনই কোথাও সরিয়ে না দিই তাহলে হয়তাে ওরা কোনােদিন গােপনে বিয়ে করে ফেলবে যা আমার পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। উপরন্তু আমি দারুণ মানসিক কষ্ট ভােগ করবাে। আবার জিরালামাে যদি দেখে স্যালভেষ্ট্রার সঙ্গে আর কারও বিয়ে দেওয়া হয়েছে তাহলে সেও বােধহয় তা সহ্য করতে পারবে না এবং কি করতে কি করে ফেলবে কে বলতে পারে? আমি মনে করি ব্যাপারটা গােড়ায় উচ্ছেদ করাই ভালাে। সারা পৃথিবী ছড়িয়ে আমাদের অনেক দফতর আছে। কাজ শেখবার অছিলায় আমরা যদি ওকে দূরে কোথাও পাঠিয়ে দিই তাহলে জিরালামাে মেয়েটাকে দেখতে না পেয়ে ওকে ক্রমশ ভুলে যাবে। তখন ওকে আমরা ফিরিয়ে এনে কোন সম্রান্ত বংশের পছন্দমতাে মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দিতে পারবাে। আপনারা কি বলেন? | অভিভাবকরা আর কি বলবে? তারা তাে মহিলার বেতনভুক এবং নিজেদের সর্ববিষয়ে বােঝদার মনে করে। তারা মহিলার মতে মত দিয়ে বলল, এ অতি উত্তম প্রস্তাব এবং আমরা তা ফলপ্রসূ করবার জন্য যথাসাধ্য করবাে। | এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হবার পর অভিভাবকদের মধ্যে যিনি বেশ নরম গলায় গুছিয়ে কথা বলতে পারেন তিনি জিরালামােকে কাছে ডেকে আদর করে বসিয়ে বললেন, জিরালামাে তুমি তাে দেখতে দেখতে বেশ বড়সড়টি হয়ে উঠেছ, লেখাপড়াও অনেক শিখেছ। আমরা লক্ষ্য করছি তােমার বুদ্ধিও বেশ প্রখর। এখন কথা হচ্ছে যে তােমাদের তাে অনেক ব্যবসা আছে, তােমার বাবা পরলােকগমন করেছেন, তাঁর ব্যবসা ও বিষয় সম্পত্তি তােমাকেই বুঝে নিতে হবে ও এত বড় প্রতিষ্ঠানের হাল তােমাকেই ধরতে হবে। তাই আমরা বলছি কি তুমি এখন কাজকর্ম শিখতে আরম্ভ করে। প্যারিস অতি উত্তম জায়গা, কবের মধ্যে সারা ইউরােপের রানী। সেখানে তােমাদের একটা দফতর আছে, তুমি সেখানে যাও, এক বছর থাকবে। প্যারিসে থাকলে যেমন তােমার কাজ শেখাও হবে তেমনি বড় বড় ব্যবসাদার লােক, রাজা ও অভিজাত পরিবারের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে মেলামেশার ফলে তুমি অনেক কিছু শিখবে, খুব হংকার হবে। তাহলে কবে যাবে বলে আমরা ব্যবস্থা করি।

উত্তর জিলামাে বলল, আপনাদের সব কথা আমি শুনলুম এবং আমার উত্তর হচ্ছে আমি কোথাও যাবাে না, ফ্লোরেন্সেই থাকব। এই আমার শেষ কথা।

অভিভাবকরা আরও ভালাে করে, আরও মিষ্টি করে, মাঝে মাঝে নরম-গরম করে কত বােঝালেন কন্তু ছেলের সেই একই উত্তর। আমি ফ্লোরেন্স থেকে এক পা নড়ব না।

অভিভাবকরা তখন হতাশ হয়ে তার মাকে সব বললেন। মা প্রথমে অত্যন্ত রেগে গিয়ে ছেলেকে খুব কলেন, শাস্তি দেবার ভয় দেখালেন তবে শেষ পর্যন্ত নিজেকে সংযত করে ছেলেকে এমন সব যুক্তি দিয়ে বােঝালেন যে ছেলে প্যারিস যেতে রাজি হল কিন্তু বারাে মাসের বেশি সে কিছুতেই থাকবে

প্যারিস চলে যাচ্ছে বলে স্যালভেষ্ট্রার প্রতি তার ভালবাসা যে কমছে তা মােটেই নয়, ভালবাসা কে বিন্দুও কমেনি তবুও তাকে যেতে হল। নানারকম ছলছুতাে করে তাকে আরও বারাে মাস আটকে মা হল। প্যারিস থেকে সে ফ্লোরেন্সে ফিরল ঠিক দু’বছর পরে। এই দু’বছর বিচ্ছেদের ফলে ভোর প্রতি অনুরাগ আরও তীব্র হয়েছে, কিন্তু বাড়ি ফিরে যখন শুনল তার ভালবাসার সঙ্গিনীর বিয়ে হয়ে গেছে তখন সে শুধু হতাশ নয়, এতদূর মুষড়ে পড়ল যে তার মনে হল তার জীবনটাই বৃথা হয়ে গেল।

যে ছেলেটির সঙ্গে স্যালভেস্ট্রার বিয়ে হয়েছিল ছেলেটি অবশ্য উপযুক্ত। তাদের তাবু তৈরির ব্যবসা হছে, তাহলেও তাে স্যালভেস্ট্রা এখন পরস্ত্রী। জিরালামাের কিছু ভালাে লাগে না, মুখ শুকিয়ে পাত্রী কর্তৃক বিতাড়িত বিচ্ছেদপীড়িত যুবকের মতাে প্রণয়িনীকে একবার দেখার আশায় তার বাড়ির নে বার বার যাওয়া আসা করে কিন্তু তাকে একবারও দেখতে পায় না।

স্যালভো তাকে হয়ত দেখতে পায় কিন্তু তাকে এমন শিক্ষা দেওয়া হয়েছে যে, বিয়ের পর স্বামী ব্যতিত অন্য পুরুষের দিকে চাইতে নেই, সেজন্যে সে জিরালামােকে দেখা দেয় না। জিরালামাে কিন্তু ভাবে যে সে যেমন স্যালভেস্ট্রাকে ভুলতে পারেনি তেমনি স্যালভেস্টা তাকে ভুলতে পারে না। সলভেস্টা টের পেয়েছে যে জিরালামাে শহরে ফিরে এসেছে কিন্তু সে নিজেকে আগলে রাখে এবং মনে হয় জিরালামের প্রতি তার ভালবাসা হ্রাস পেয়েছে। কিছুতেই প্রণয়িনীর দেখা না পেয়ে জিরালায়মা হ লাে যে গােপনে একবার তার সঙ্গে দেখা করে কথা বলবে এবং বিবাহ করলেও তার প্রতি যে লাসা অটুট আছে সেটা স্বীকারও করিয়ে নেবে।

স্যালভেস্ট্রার শ্বশুরবাড়ি চিনলেও সে বাড়িতে কখনও ঢােকে নি তাই সে কাছাকাছি বাড়ির একজনের কাছ থেকে বাড়ির নকশা জেনে নিল, বিশেষ করে স্যালভোর ঘর কোথায় এবং সেখানে কি করে যাব।

তারপর একদিন রাত্রে স্যালভেস্ট্রার স্বামী যখন বাড়ির বাইরে কয়েকজন ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলছিল, সেই সময়ে বাড়ির পিছনদিক দিয়ে ভেতরে ঢুকে স্যালভেস্ট্রার ঘরে প্রবেশ করে এক কোলে পর্দা দেখে আড়ালে লুকিয়ে রইল। অনেকক্ষণ পরে ওরা দুজনে ঘরে ঢুকল তারপর বেশ পরিবর্তন করে যে যার খাটে শুয়ে পড়ল। যখন সে বুঝতে পারল স্যালভেষ্ট্রার স্বামী ঘুমিয়ে পড়েছে, তখন সে তার গুপ্তস্থান থেকে পা টিপে টিপে নিজেকে আড়াল করে বেরিয়ে এসে স্যালভেষ্ট্রার খাটের পাশে গিয়ে তার একটি বুকে হাত রেখে ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করলাে, প্রিয়তমা তুমি কি ঘুমিয়ে পড়েছ?

প্রিয়তমা তখনও ঘুমােয় নি। বুকে অকস্মাৎ হাতের স্পর্শে সে ভয় পেয়ে চিৎকার করতে যাচ্ছিল। জিরালামাে বুঝতে পেরে খুব আস্তে, প্রায় তার কানে ঠোট ঠেকিয়ে বলল, ভয় পেয়াে না, আমি তােমারই জিরালামাে।

জিরালামাে? এত রাত্রে আমার শয়নঘরে? একদা যার সে প্রেয়সী ছিল, যার সঙ্গ সে সর্বদা কামনা করতাে, যে তাকে জড়িয়ে ধরলেও ভয় পেত না, এখন তাকে ঘরে দেখে সে ভয়ে কাঁপতে লাগল। সে বলল, ঈশ্বরের দোহাই জিরালামাে তুমি এখনি চলে যাও। আমরা এখন আর বালক-বালিকা নই। এখন আমি বিবাহিতা। তােমার কাছে প্রেম নিবেদন করতে পারি না। স্বামীর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতাও অন্যার হবে। স্বামী আমাকে ভালবাসে, আমিও তাকে অবহেলা করি না। আমরা সুখে ও শান্তিতে আছি। আমার স্বামী টের পেলে আর কিছু না হােক অশান্তির সৃষ্টি হবে।

স্যালভেস্ট্রার মুখ থেকে এই ধরনের কথা শুনে জিরালামাে মর্মাহত হল। তার আর কোনাে অশ নেই। তবুও পুরনাে স্মৃতির কিছু ঘনিষ্ঠ মুহূর্ত মনে করিয়ে দিল কিন্তু স্যালভেস্ট্রা কোনােই উৎসাহ দেখান না।

জিরালামাে বুঝল তার আর আশা নেই। এখন তার মরে যাওয়াই ভালাে। তখন সে বলল যে, প্রণয়িনীকে সে এক মুহূর্তের জন্যেও ভুলতে পারে নি। তার জীবন এখন তুচ্ছ, তার বেঁচে থেকে আর লাভ নেই। এখন সে কিছু চায় না, তার দেহ শীতল হয়ে গেছে, দেহ কিছু গরম করবার জন্যে সে স্যালভেস্ট্রাকে স্পর্শ না করে তার পাশে কিছুক্ষণ শুয়ে থাকবে, দেহ গরম হলেই সে উঠে চলে যাবে, আর আসবে না।

এবার স্যালভেস্ট্রা দুঃখ করলাে, নরম হয়ে তাকে শুতে অনুমতি দিল কিন্তু সে যেন তার প্রতিজ্ঞা রক্ষা করে। জিরালামাে তখন তাকে স্পর্শ না করে তার পাশে শুয়ে অতীতের গভীর প্রেম বর্তমানের উপেক্ষা এইসব চিন্তা করতে করতে সে তার হাত মুঠো করে নিঃশ্বাস বন্ধ করে এক মনে মত্যুকামনা করতে লাগল এবং শেষ পর্যন্ত সত্যিই তার মৃত্যু হল।

কিছুক্ষণ কোনাে সাড়াশব্দ না পেয়ে স্যালভেস্ট্রা ভাবল ও কি ঘুমিয়ে পড়ল? তার ভয় হল স্বামী যদি এখন জেগে ওঠে তাহলে কেলেংকারির একশেষ হবে। তাই সে মৃদুস্বরে ডাকলাে, জিরালােমা ওঠে, এবার তুমি যাও।

কোনাে সাড়া না পেয়ে ও ভাবল জিরালামাে নিশ্চয়ই ঘুমিয়ে পড়েছে তাই ওকে কয়েকবার বা দিল। ধাক্কা দেবার সময় লক্ষ্য করলাে ওর দেহ বলতে গেলে হিমশীতল তাই সে আরও জোরে ধাক্কা দিতে লাগল কিন্তু তবুও কোনাে সাড়া নেই। আরও কয়েকবার নাড়া দিয়ে যখন একটুও সাড়া পেল না তখন স্যালভো বুঝল জিরালামাে মরে গেছে। কি সর্বনাশ! এখন ও কি করবে?

শেষ পর্যন্ত ঠিক করতে না পেরে সে স্থির করলাে কারও নাম উল্লেখ না করে স্বামীকে জিজ্ঞাসা করবে এমন ক্ষেত্রে তাদের কি করা উচিত। লােকটা কে, কোথা থেকে এলাে, কখন তার বিছানায় শুল ও মরে গেল অথবা কেউ তার অজ্ঞাতে মৃতদেহ তার খাটে রেখে গেল কিনা এসব সে বলবে না। মনে মনে এই রকম স্থির করে সে তার স্বামীকে ডেকে ঘুম থেকে তুলে মােটামুটি একটা বিবরণী দিয়ে জিজ্ঞাসা করলাে এখন তারা কি করবে।

স্বামী বলল, এমন ক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তিকে তার বাড়ি পৌঁছে দেওয়া উচিত যদি অবশ্য তাকে আমি চিনতে পারি। এখনও রাত্রি শেষ হতে অনেক দেরি আছে অতএব কাজটা আমাদের পক্ষে কঠিন হবে

স্যালভো তখন তার স্বামীর হাত ধরে তার খাটের কাছে এনে মৃতদেহের ওপর হাতটা দিতে

বলল। স্বামী দেহ স্পর্শ করেই চমকে উঠল। কি ঠাণ্ডা দেহ! এ তাে মরেই গেছে।

তারপর পত্নীর সঙ্গে আর কোনাে কথা না বলে লাশটাকে সে নিজের পােশাক পরাল, তারপর একটা আলাে জ্বালল। স্বামী বােধহয় জিরালামােকে চিনত। নিজে প্রস্তুত হয়ে দ্বিতীয় কথাটি না বলে জিরালামাের লাশ নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে জিরালামাের বাড়ির দরজার সামনে এনে রেখে এলাে।

পরদিন সকালে যখন জিরালােমাের লাশ বাড়ির সামনে পড়ে থাকতে দেখা গেল তখন দারুণ হৈচৈ সৃষ্টি হল। তার মা তাে শােকে বিহ্বল হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লেন।

লাশ উত্তমরূপে পরীক্ষা করা হল। কোথাও কোনাে আঘাতের চিহ্ন বা ক্ষত দেখা গেল না। চিৎিসক বললেন তার অনুমান মানসিক কোনাে দুঃখে আঘাত পেয়ে যুবকের মৃত্যু হয়েছে এবং কারণটা সত্যিই তাই।

আর কিছু করার নেই। দেহ সমাহিত করবার জন্যে গির্জায় নিয়ে যাওয়া হল। সঙ্গে তার মা ও আত্মীয়স্বজনরাও গেল এবং দেহ ঘিরে সকলে শােক প্রকাশ করে কাদতে লাগল।

ওদিকে সেই সময়ে স্যালভেস্ট্রাকে তার স্বামী বলছে, তুমি তােমার মাথা কিছু দিয়ে আচ্ছাদিত করে গির্জায় একবার যাও, মানে যে গির্জায় জিরালামােকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেখানে মেয়েদের মধ্যে মিশে তুমি বােঝবার চেষ্টা করাে আমাদের বা আমাদের বাড়ির নামে কেউ কিছু বলছে কিনা। আমিও গির্জায় গিয়ে পুরুষদের সঙ্গে মিশে অনুরূপ চেষ্টা করবাে। স্যালভেস্ট্রা সঙ্গে সঙ্গে রাজি হল। এখন সে তার প্রাক্তন প্রেমিক জিরালামাের জন্যে গভীর দুঃখ অনুভব করছে। আহা বেচারা একটি মাত্র চুম্বন ভিক্ষা করেছিল সেটি দিলে তার এমন কি ক্ষতি হতাে? এখন তাে সে সবকিছুরই বাইরে। যতদূর সম্ভব শীঘ্র সে গির্জায় গিয়ে হাজির হল।

“প্রেমের মহিমা কি অসীম, এর বন্ধন কি দৃঢ়। গির্জায় গিয়ে জিরালামাের মৃতদেহ দেখে তার প্রতি তার গভীর প্রেম আবার উথলে উঠল। সে আকুলিবিকুলি করতে লাগলাে। জিরালামাের প্রতি তার প্রেমের আগুন আবার দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল। যথাসম্ভব মুখ আবৃত করে ভিড় সরিয়ে মৃতদেহের পাশে এসে সে আর নিজেকে সামলে রাখতে পারলাে না। জিরালামাের মৃতদেহের ওপর ঝাপিয়ে পল। আশ্চর্যের বিষয় এক ফোটা চোখের জল পড়বার আগে সে মরে গেল ঠিক যেমনভাবে জিরালামাে তার পাশে শুয়ে মারা গিয়েছিল।

সমবেত মহিলারা তখনও জানে না যে মেয়েটি মারা গেছে। অনড় অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে কোনাে কোনাে মহিলা প্রথমে ডাকাডাকি করলাে। উত্তর না পেয়ে তাকে নাড়া দিল, সাড়া না পেয়ে তাকে তুলতে গিয়ে দেখা গেল সে মারা গেছে। মুখের কাপড় সরাতে সকলে তাকে চিনতেও পারল। এ তাদের স্যালভো। তখন তার শশাকেও মহিলারা আবার কান্নার রােল তুললাে।

খবরটা-গির্জার বাইরে অপেক্ষমান পুরুষদের মধ্যে পৌঁছল। তাদের মধ্যে স্যালভেস্ট্রার স্বামীও ছিল। পত্নীর মৃত্যুসংবাদ শুনে সে কেঁদে ফেলল। কেউ কেউ তাকে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করলাে, কেউ প্রশ্ন করতে লাগলাে এত বিহুল হবার কারণ। তখন সে গতরাত্রের ঘটনা বলে জিরালামাের আকস্মিক মৃত্যুর কথাও বলল। তখন সমবেত সকল পুরুষ ও নারী শােক প্রকাশ করতে লাগলাে।

স্যালভেস্ট্রাকে উত্তমরূপে সাজিয়ে দেওয়া হল এবং যথারীতি অনুষ্ঠানের পর উভয়কে পাশাপাশি সমাহিত করা হল। জীবনে তারা মিলিত হতে পারে নি, মরণে তারা মিলিত হল।

নবম গল্প

জিলন দ্যা সিলন তার পত্নীর প্রণয়ী জিলন দ্যা ক্যাবেসাহকে গােপনে হত্যা করে তার হৃৎপিণ্ড রান্না করে পত্নীকে খাইয়ে দিল। পত্নী পরে জানতে পেরে উঁচু বাড়ির জানালা গলে ঝাপ দিল। মৃত্যুর পর তাকে তার ঐ প্রণয়ীর সঙ্গে সমাহিত করা হল।

নেফাইলের গল্প শেষ হল। ছেলেদের মধ্যে তেমন প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেল না কিন্তু মেয়েদের মধ্যে প্রায় সকলে দীর্ঘশ্বাস মােচন করে দুঃখ প্রকাশ করলাে। যাই হােক এবার গল্প বলার পালা একজন পুরুষের। তার নাম ডায়ােনিও। কিং তার দিকে ইঙ্গিত করলেন। সে আর সময় নষ্ট না করে মেয়েদের উদ্দেশ্য করে বলল:

তােমরা নারী, তােমাদের হৃদয় কোমল, সহজেই অভিভূত হও। আমি যে গল্পটি বলবাে তা তােমাদের রীতিমতাে নাড়া দেবে কিন্তু কি আর করা যাবে। কুইনের আদেশ তাে মানতেই হবে। এ গল্পটিও সমাজের উচ্চস্তরের মানুষ নিয়ে যার পরিণতি অতিশয় করুণ।

একদা প্রভেন্স-এ দু’জন জবরদস্ত নাইট বাস করতাে। দু’জনেরই বেশ কয়েকটা ক্যাসেল আর গবাদিপশুর পাল ছিল আর ছিল বেশ কিছু পােয্য। একজনের নাম জিলন দ্য রুসিলন এবং

পরজনের নাম জিলন দ্য ক্যাবেসান্থ। দু’জনেই অশ্বারােহণ, শিকার, বর্শাযুদ্ধ ইত্যাদিতে অত্যন্ত গারদর্শী ছিল তাই বুঝি দু’জনের গভীর বন্ধুত্ব ছিল। দু’জনে একত্রে অনেক প্রতিযােগিতায় যােগ দিয়ে বিজয়ী হয়ে উল্লাস করতে করতে নিজ নিজ ক্যাসেলে ফিরে আসতাে।

যদিও দু’জনের ক্যাসেলের মধ্যে দশ মাইলের তফাৎ ছিল এবং দু’জনের ঘন ঘন দেখাসাক্ষাৎ হতাে না তথাপি কবে কোন সময়ে জিলন দ্য ক্যাবেসান্থ তার বন্ধু জিলন দ্য রুসিলনের পত্নীকে দেখে ফেলেছিল এবং সেইদিন থেকে তার প্রেমে আকণ্ঠ নিমজ্জিত। তবে সেই মহিলা ছিল অতুলনীয়া রুপবতী।

দু’জনে অতি ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং নাইট, একটা ভ্রাতৃত্বের সম্পর্কও আছে তথাপি অঘটন ঘটে গেছে। বন্ধুত্তের সূত্র ধরে ক্যাবেসান্থ আসতাে রুসিলনের ক্যাসেলে এবং সুযােগ পেলেই ম্যাডামের কাছে প্রেম নবেদন করতাে। ম্যাডামও ক্যাবেসাস্থের প্রতি আকৃষ্ট। পুরুষ যদি সাহসী আর শৌর্যবীর্যশালী হয় তবে নারী তাকে পছন্দ করে। এক্ষেত্রে রূপ ও সাহসের প্রতি আর সাহস রূপের প্রতি আকৃষ্ট হল আঠার মতো।

বিরাট ক্যাসেল, বিরাট তার উদ্যান, কোথায় বসে কোন্ পুরুষ কোনাে নারীকে চুম্বন করেছে, কোনাে ককে কোন যুবতী বুকের ওপর তুলে নিয়েছে তা কি সকলের চোখে পড়ে? কোনােদিন হয়ত ক্যাবেসান্থ দিনের অগােচরে তার ক্যাসেলে প্রবেশ করে ক্যাসেলের নির্দিষ্ট কোনাে প্রকোষ্ঠে বা লতাকুঞ্জে তার পত্নীকে গভীরভাবে আলিঙ্গন ও চুম্বন করেছিল আর রুসিলন কোনাে প্রয়ােজনে সেখানে গিয়ে হাজির হল, এক অভাবনীয় ও অবিশ্বাস্য মিথুন মূর্তি দেখে ফেললাে, ফলে বন্ধুর প্রতি পর্বততুল্য বিশ্বাস তলস্পর্শী ঘৃণায় পরিণত হল।

রুসিলন তখনি স্থির করলাে এর প্রতিশােধ নেবে এবং পত্নীকে উচিত শিক্ষা দেবে কিন্তু সে কিছুই প্রকাশ করলো না, আচার-আচরণেও কিছু ধরা পড়লাে না। প্রেমিকযুগলও কিছু টের পেল না, তাদের লীলা অবাধে চলতে লাগল।

রুসিলন খবর পেল যে ফ্রান্সে নাইটদের এক বিরাট টুর্নামেন্ট হবে। নাইটরা মিলিত হয়ে অস্বারােহণের কৌশল, বর্শাযুদ্ধ ইত্যাদি দুঃসাহসিক ক্রীড়াকৌশল দেখাবে। টুর্নামেন্টের খবরটা রুসিলন ক্যাবেসান্থকে জানিয়ে দিয়ে তাকে আসতে বলল। তারা এই টুর্নামেন্টে যােগ দেবে কিনা, যােগ দিলে কি করবে এইসব নিয়ে আলােচনা করবে এবং সেখানে কোন্ পথ দিয়ে কি ভাবে যাবে।

ক্যাবেসান্থ এই খবর পেয়ে আনন্দিত হয়ে জবাব দিল যে, সে এই টুর্নামেন্টে নিশ্চয়ই যাবে এবং এই হয়ে আলােচনা করার জন্যে সে আগামীকাল নিশ্চয়ই যাবে ও রাতের ভােজনও বন্ধুর বাড়িতেই করবে।

ক্যাবেসান্থের উত্তর পেয়ে রুসিলন স্থির করলে তাকে খতম করার এই উত্তম সুযােগ। পরদিন অস্ত্রসজ্জিত হয়ে ও কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে রুসিলন ক্যাবেসাস্থের ক্যাসেলের দিকে যাত্রা করলাে এক ক্যাবেসান্থের ক্যাসেল থেকে মাইলখানেক দূরে এক অরণ্যমধ্যে লুকিয়ে রইল।

অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পর দেখা গেল ঘােড়ায় চড়ে ক্যাবেসান্থ আসছে, দু’জন অশ্বারােহী তাকে অনুসরণ করছে। কারও সঙ্গে অস্ত্র নেই কারণ তারা জানে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা নেই, এখানে তাদের শত্রু নেই।

ক্যাবেসান্থ কাছে আসতেই রুসিলন “বিশ্বাসঘাতক, আমি তাের যম, আমার হাতে তুই মরবি” বলতে বলতে বর্শা উঁচিয়ে তার দিকে ঘােড়া ছুটিয়ে গেল এবং সােজা তার বুকে সজোরে বর্শা বিধিয়ে দিল।

নিরস্ত্র কাবেসান্থ আত্মরক্ষার কোনাে সুযােগই পেল না। বর্শার জোর আঘাতে ক্যাবেসান্থ মাটিতে লুটিয়ে পড়ল এবং মুহূর্ত মধ্যে মৃত্যু। যে দু’জন অনুচর আসছিল তারা ক্ষণিক অপেক্ষা করল না রে তাদের মনিবকে আঘাত করলাে দেখবার জন্য। তারা ঘােড়ার মুখ ফিরিয়ে নিজেদের ক্যাসেল অভিমুখে পালিয়ে গেল।

রুসিলন ঘােড়া থেকে নেমে একটা বড় ধারাল ছােরা বার করলাে। সেই ছােরা দিয়ে ক্যাবেসাস্থের কুক কেটে নিজের হাতে তার হৃৎপিণ্ড বার করে নিয়ে একটা বস্ত্রখণ্ডে মুড়ে একজন অনুচরের জিম্মা করে না সকলকে বিশেষভাবে সর্তক করে দিল যে, যা ঘটল তার বিন্দুবিসর্গও প্রকাশ হলে সকলেই মরতে হবে। তারপর সিলন সদলে নিজ ক্যাসেলের দিকে যাত্রা করলাে। তখন অন্ধকার নেমে আসছে।

রুসিলন-পত্নী শুনেছে সে-রাত্রে ক্যাবেসান্থ তার বাড়িতে ভােজন করবে। এজন্যে ম্যাডাম নানারক সুস্বাদু খাবারের আয়ােজন করে তার জন্যে অপেক্ষা করছে। কিন্তু স্বামীকে একা ফিরতে দেখে বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলাে, স্বামী তােমার সঙ্গে ক্যাবেসান্থ এলাে না?

স্বামী উত্তর দিল, সে খবর পাঠিয়েছে আজ আসতে পারবে না, কাল আসবে।

রুসিলন ঘােড়া থেকে নামল, দেখল তার স্ত্রী তখনও দাঁড়িয়ে আছে, মনে মনে একটু বিচলিত হন। তারপর সে স্থান ত্যাগ করে যার কাছে হৃৎপিণ্ডটি জমা রেখেছিল তাকে ও পাচককে ডেকে বলল, ওই কাছে শূকরের একটা হৃৎপিণ্ড আছে, এটি অতি উত্তমরূপে রান্না করে আমার খাবার সময়ে রূপাের পত্র করে টেবিলে দেবে, রান্নার যেন কোনাে ত্রুটি না হয়।

পাচক হৃৎপিণ্ডটি নিয়ে পরিষ্কার করে কেটেকুটে বিবিধ মসলা দিয়ে অত্যন্ত মুখরােচক করের কম করে একটি সুন্দর রৌপ্য পাত্রে যথাসময়ে পরিবেশন করলাে। পাত্রটির কারুকার্য এতই মনােলােভা যে তাতে করে যে কোনাে সাধারণ খাদ্য পরিবেশন করলেও খাদ্যটি বিশেষ এক মর্যাদা পাবে এবং বন্ধ ভালাে না হলেও খাবার পর মনে হবে খুব চমৎকার একটা খাবার খাওয়া গেল।

রাত্রের আহারের সময় হল। যথারীতি বেশবাস করে রুসিলন ও তার পত্নী টেবিলে বসলো। ক্যাসােহু আসবার কথা ছিল উৎকৃষ্ট কয়েকটি পদ এবং বিশেষভাবে হৃৎপিণ্ডটি রান্না করা হয়েছিল।

দু’জনে খাওয়া আরম্ভ করলাে। রুসিলন বিশেষ কিছু খাচ্ছে না কারণ সে সেদিন নরহত্যা করেছে এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে। মনের ভেতর তীব্র আলােড়ন চলছে তাই ক্ষিদে নেই অছিলা করছে। নাগর না আসা ম্যাডাম তৃপ্তি করে খেতে পারছে না তবুও কিছু খাচ্ছে। রূপার পাত্রে বিশেষ পদটি তারই সামনে দেয়া হয়েছে। রুসিলন বলল, ওটা খেয়ে দেখ দারুণ রান্না হয়েছে। দেখেছ কেমন সুগন্ধ বেরিয়েছে।

স্বামীর কথায় ‘ম্যাডাম চেখে দেখবার জন্যে প্রথমে অল্প একটু খেল।

একটু করে খেতে খেতে সবটাই তৃপ্তি করে খেয়ে ফেললাে এবং অনুভব করলাে এমন উৎকৃষ্ট ও সুস্বাদু মাংস কচিৎ খেয়েছে।

ম্যাডাম যখন চেটেপুটে সাফ করে সব খেয়ে ফেলেছে তখন রুসিলন জিজ্ঞাসা করলাে, কেমন খেলে

ম্যাডাম উত্তর দিল, দারুণ, এমন আমি খাই নি। নাইট বলল, হা ভগবান, আমি জানতুম জীবিত এই বস্তুটিকেই তুমি বেশি ভালােবাসতে, মৃতকেও যে এত ভালােবাসবে তা আমি জানতুম না।

ম্যাডাম তার স্বামীর কথার অর্থ বােঝবার চেষ্টা করলাে। কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাে। বুঝতে না পেরে জিজ্ঞাসা করলাে, কি বললে আমি বুঝলুম না। আমাকে তুমি কি খাওয়ালে?

কি খাওয়ালুম? ওটি হল জিলন দ্য ক্যাবেসাস্থের হৃৎপিণ্ড, অবিশ্বাসিনী নারী যাকে তুমি তােমার হৃদয়ের করেছিলে। আজই আমি তাকে হত্যা করে আমার এই হাত দিয়ে তার হৃৎপিণ্ডটি বার করে নিয়েছিলুম। পরে সেটি রান্না করিয়ে তােমাকে খাওয়ালুম এবং তুমি সেটি তৃপ্তি করে খেয়েছ দেখে আমি খুব খুশি হয়েছি।

এই সব কথা শুনে এবং ক্যাবেসান্থ নিহত শুনে মহিলার মনের অবস্থা যে কতদূর শােচনীয় হতে পারে তা সহজেই অনুমান করা যেতে পারে। ক্যাবেসান্থকে যে সে সত্যিই তার প্রাণ অপেক্ষা ভালবাসত তার প্রমাণ একটু পরেই পাওয়া গেল। মহিলার চোখে জল এসে গিয়েছিল তবুও সে কেঁদে ওঠেনি। মুখ সাদা হয়ে গিয়েছিল তবুও সে কেঁদে ওঠেনি। মুখ সাদা হয়ে গিয়েছিল, হাত কাপছিল তবুও নিজেকে সংযত করে বলল, কোনাে বিশ্বাসঘাতক এবং শয়তানতুল্য নাইট দ্বারা এমন ঘৃণ্য কাজ করা কি সম্ভব? আমি যদি তােমার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করে তাকে ভালবেসে থাকি তাহলে তাকে শাস্তি না দিয়ে বা হত্যা না করে আমাকেই তােমার শাস্তি দেওয়া উচিত ছিল। আমি এইমাত্র জিলন দ্য ক্যাবেসান্থ নামে এক ভদ্র ও সাহসী নাইটের হৃৎপিণ্ড ভক্ষণ করেছি এবং এরপর আমি আর কিছুই ভক্ষণ করতে পারি না, এই আমার শেষ খাওয়া।

কথা শেষ করে মহিলা চেয়ার থেকে উঠে জানালার দিকে চলে গেল। জানালা খুলে নিচে ঝাপিয়ে পড়ল। জানালাটির ক্যাসেলের এক উচ্চতলে অবস্থিত। সেখান থেকে পড়ে মহিলার তৎক্ষণাৎ মৃত্যু তাে হলই উপরন্তু তার দেহ বিকৃত হয়ে গেল। পত্নী অকস্মাৎ আত্মহত্যা করায় রুসিলন ঘাবড়ে গেল। উভয়কে হয়তাে অন্যভাবে সাজা দেওয়া যেতাে কিন্তু হঠকারিতার ফলে দুটো জীবন নষ্ট হল এজন্য এখন তার অনুশােচনা হতে লাগলাে। এছাড়া তার ভয়ও হল। খবর প্রকাশ পাওয়ার পর প্রভিন্সের কাউণ্ট এবং স্থানীয় লােকজন তার ওপর ক্ষিপ্ত হতে পারে এই আশংকায় রুসিলন সেই রাত্রেই তার ঘােড়ায় চড়ে প্রভিন্স ত্যাগ করে অনির্দিষ্ট পথে যাত্রা করলাে।

পরদিন সকালে ক্যাসেল প্রাঙ্গণে মহিলার মৃতদেহ আবিষ্কৃত হল। এক নাইট নিরুদ্দেশ, অপর নাইট নিহত, এই সব খবর প্রকাশ হয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সারা জেলায় উত্তেজনা ও নানারকম তর্কবিতর্ক জনাকল্পনা আরম্ভ হল।

জনসাধারণ জিলন দ্য ক্যাবেসাস্থের মৃতদেহ নিয়ে এলাে এবং মহিলার মৃতদেহ একত্র করে মহিলার ক্যাসেলের পারিবারিক গােরস্থানে দু’জনকে সমাহিত করা হল। কবরের ওপর একটি প্রস্তরখণ্ডে উভয়ের নাম ও মৃত্যুর কারণ লিখে দেওয়া হল।

দশম গল্প

জনৈক চিকিৎসক-পত্নীর প্রেমিক ভুলক্রমে আফিমজাত মাদকমিশ্রিত নিদ্রাকর্ষক জল খেয়ে অঘােরে ঘুমিয়ে পড়ে। উক্ত পত্নী তাকে মৃত মনে করে একটি বাক্সয় ভরে ফেলে। মানুষভর্তি সেই বাক্সটি দুজন কুসীদজীবী তাদের বাড়িতে বয়ে নিয়ে গিয়েছিল। বাক্সর মধ্যে বন্দী লােকটির জ্ঞান ফিরে আসার পর তাকে চোর মনে করে গ্রেফতার করা হয় কিন্তু উক্ত মহিলার পরিচারিকা বিচারকের কাছে স্বীকার করে যে ব্যক্তিটিকে সে বাক্সর মধ্যে বন্দী করেছিল। লােকটি তখন মুক্তি পায় নচেৎ তার ফাঁসি হতাে কিন্তু। কুসীদজীবীগণকে বাক্স নিয়ে পলায়নের অভিযােগে জরিমানা দিতে হয়।

সেদিন গল্প বলতে আর বাকি রইল ডায়ােনিও। কিং-এর আদেশ পেয়ে সে বলতে আরম্ভ করলাে।

এতক্ষণ পর পর কয়েকটি দুঃখজনক কাহিনী শুনে আমাদের সকলের মন ভারাক্রান্ত অথচ কিং-এর নির্দেশে আমাদের এই রকম কাহিনী যার প্রতিটির পরিণতি করুণ, আমাদের শােনাতে হয়েছে। পৃথিবীতে বাস করতে হলে ভালমন্দ শােকদুঃখ হাসিকান্না সবই গ্রাহ্য করতে হয়। তাই যেমন মিলনাত্মক কাহিনী। শুনতে হয় তেমনি বিয়ােগান্তক কাহিনীও শুনতে হয়। যাই হােক কিং-এর আদেশ স্মরণ রেখে আমি

এমন একটি কাহিনী শােনাবার চেষ্টা করবাে যা তােমাদের মন কিছু হালকা করতে পারে।

সালেরনােতে মাৎসিও ডেলা মন্টানা নামে এক বিখ্যাত চিকিৎসক বাস করতেন। ভেষজ ও অস্ত্রোপচার বিদ্যায় তিনি পারদর্শী ছিলেন। বৃদ্ধ বয়সে তিনি ঐ শহরেরই সম্ভ্রান্ত বংশের সুন্দরী এক মহিলাকে বিবাহ করেছিলেন। পত্নীর জন্য মাৎসিও যতদূর সম্ভব অর্থব্যয় করতেন। সেই সময়ে প্রচলিত কাশনের পােশাক পরিচ্ছদ ও অলঙ্কার, প্রসাধনী এবং অন্যান্য সামগ্রী তিনি পত্নীকে কিনে দিতেন। পত্নীর জন্য তখন স্যালেরনােতে তার মতাে আর কেউ এত ব্যয়ও করতাে না, যত্নও নিত না। তথাপি বৃদ্ধ পতি নিয়ে কোন্ যুবতী সুখী হতে পারে? বৃদ্ধ পতি উত্তম শয্যাসঙ্গী হতে পারে না।

তােমাদের মনে থাকতে পারে আমি এক রিচিয়ারডাে ডি চিনজিচা নামে একজন লােকের কথা বলেছিলুম। বিভিন্ন সাধুসন্তদের স্মরণে কবে ও কিভাবে উপবাস পালন করতে হয়, রিচিয়ারডাে তার স্ত্রীকে আনুষ্ঠানিক সেইসব নিয়মকানুন শেখাত। এই বৃদ্ধ চিকিৎসক যুবতী পত্নীকে শেখাতে স্ত্রীসঙ্গম করে কতদিন এবং কিভাবে বিশ্রাম ও বিরতি পালন করতে হয়। এইসঙ্গে নানা উপদেশ দিত। শিথিলাঙ্গ বৃদ্ধ তাকে তৃপ্তি দিতে পারতাে না তার ওপর এইসব উপদেশ যুবতী পত্নীর বিরক্তি উৎপাদন করতাে।

মহিলা ছিল তেজী ও বুদ্ধিমতী। বুদ্ধিমতী এই জন্যে বলা যায় যে বৃদ্ধ পতির সহবাসে সে জীৱন নষ্ট করতে চায় না, সে তার যৌবন উপভােগ করতে চায়। বােঝার মতাে কামনা-বাসনা চেপে রাখতে চায় না। জীবন তাে একটাই, কবে আছি কবে নেই তাই হেসে নাও দু’দিন বই তাে নয়।

একজন মনের মতাে পুরুষ শিকার করতে হবে তাই সে পুরুষের নজরকাড়া সাজগােজ করে রাস্তায় বেরােয়। কয়েকজন যুবকও চোখে পড়ল তাদের মধ্যে একজনকে সে বেছে নিল, একে পেলে ও সুখী হবে। সেই যুবকও বুঝতে পারল যুবতী তার প্রতি আকৃষ্ট। যদি কোনাে যুবতী নিজেই ধরা দেয় তাতে আপত্তি কি? যুবতী যদি ধনী হয় তাহলে তাে যক দিয়ে মালকড়ি আদায় করে নেওয়া যায়।

যুবকের নাম রুজ্জিয়েরি ডি আইরােলি। যদিও তার বড় ঘরে জন্ম তাকে চরিত্রবান বা ভদ্র বলা চলে না। আর বন্ধুরা কেউ ছিল বেজন্মা, কেউ চোর বা ঠগ, কেউ মাতাল, আর ছােকরা নিজে ছিল নারী-আসক্ত। চেহারাটা বেশ ভালাে ছিল, সাজগােজে পটু ছিল আর নারীদের সঙ্গে ভাব জমিয়ে মজা করতে পরতাে। তাদের সঙ্গে রঙ্গ-রসিকতা করতাে এবং তাদের শয়ন-গৃহে সুবিধে পেলেই রাত কাটাতাে। কৃজ্জিয়েরিকে স্যালেরনাের সকলে চিনতাে, সৎ লােকেরা তার সঙ্গ এড়িয়ে চলতাে। গৃহস্থরা তাকে দেখলে সাবধান হতাে, তার কিছু চুরিচামারি করার দোষও ছিল আর মায়েরা তাে তাদের মেয়েকে আগলাতেই। – চিকিৎসক-পত্নী তার এইসব মহান গুণের বিষয় কিছু কিছু শুনে থাকবে কিন্তু এসব সে গ্রাহ্য করে নি, উপরন্তু এগুলি সে তার গুণ বলে ধরে নিয়েছিল।

অনেক মহিলার মতাে এই চিকিৎসক-পত্নীরও একটি বিশ্বাসী পরিচারিকা ছিল। সেই পরিচারিকা মারফত যুবতী সেই নটবর যুবকের সঙ্গে যােগাযােগ করলাে। চিকিৎসকের অনুপস্থিতিতে নিজের বাড়িতে বা গােপনে অন্যত্র তারা মিলিত হতাে এবং যতদূর সম্ভব কামবাসনা চরিতার্থ করতাে। যুবতী যুবককে সৎপথে ফিরিয়ে আনবার চেষ্টা করতাে। বলতাে, তুমি তােমার সখ মেটাবার জন্যে চুরি করে তো বেশ, আমি তােমার সখ মেটাবার জন্যে টাকা দেব। আমার মুখ চেয়ে তুমি আর চুরি কোরাে না উপর আর একটি অনুরােধ, তুমি বড় ঘরের ছেলে, এখন থেকে ভদ্র হয়ে থাক, দাগী বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা ছেড়ে দিয়ে ভদ্রমানুষদের সঙ্গে মিশে ভদ্র হও।

তাদের এই গােপন লীলাখেলা দিব্যি চলতে লাগলাে। এই সময়ে চিকিৎসকের কাছে একজন রোগী এলাে। তার পায়ে পুরনাে ঘা, কিছুতেই সারছে না, পচন ধরেছে। একটা হাড় কেটে বাদ দিতে হবে, ত বাদ দিলে যদি না সারে তাহলে পা কেটে বাদ দিতে হবে নচেৎ রােগী মারা যেতে পারে। চিকিৎসক গত আত্মীয়দের বললেন বাঁচা-মরার কথা আমি বলতে পারছি না। যা ভালাে বুঝবেন করবেন, বলে আত্মীয়রা চিকিৎসকের দায়িত্বে রােগীকে রেখে গেল।

সেইদিন সন্ধ্যায় অস্ত্রোপচার করা হবে। অস্ত্রোপচারের যন্ত্রণা রােগীর সহ্য করা সম্ভব হবে না। সেজন্য চিকিৎসকমশাই কিছু মাদক জলের সঙ্গে মিশিয়ে চোলাই করে চেতনানাশক একটা ওষধ তৈরি করতে নির্দেশ দিলেন যেটা রােগীকে খাওয়ালে অস্ত্রোপচারের যন্ত্রণা এবং যন্ত্রণা না কমা পর্যন্ত রােগীর চেতনা হবে না। এই চেতনানাশক ওষুধটি বাইরে থেকে তৈরি হয়ে এলাে। ডাক্তারবাবু ওষুধ ভর্তি বােলটি জানালার তাকে রেখে দিলেন। ওষুধটি দেখতে পরিষ্কার জলের মতাে। ওষুধটি কি বা কাকে খাওয়ানাে হবে সে কথা ডাক্তারবাবু কাউকে বললেন না।

সেইদিন সন্ধ্যায় ডাক্তারবাবু সেই রােগীর ওপর অস্ত্রোপচারের জন্যে তৈরি হচ্ছেন, সেই সময়ে

আমালফির এক ঘনিষ্ট বন্ধুর কাছে এক দূত এসে বলল, সমস্ত কাজ ফেলে ডাক্তারবাবুকে সঙ্গে যেতে হবে কারণ আমালফি দ্বীপে দু’দল লােকে মারামারির ফলে অনেকে গুরুতর আহত হয়েছে, কয়েকজনের অবস্থা সংকটজনক। দূত ডাক্তারবাবুকে সঙ্গে না নিয়ে ফিরবে না। তাকে এইরকম নির্দেশ দিয়ে পাঠান হয়েছে।

পরদিন সকাল পর্যন্ত অস্রোপচার স্থগিত রেখে ডাক্তারবাব তখনি বেরিয়ে পড়ে নৌকায় উঠলেন। ডাক্তারবাবুর পত্নী বুঝল আজ রাতের মতাে নিশ্চিন্ত, ডাক্তার কাল সকালের আগে ফিরছে না। তাই মহিলা তার পরিচারিকা মারফত খবর পাঠিয়ে প্রেমিককে গােপনে তার শয়নঘরে আনিয়ে লুকিয়ে রাখলাে। বাড়ির লােকেরা কাজ সেরে নিজ নিজ ঘরে ঢুকলে তখন প্রেমিককে নিয়ে পড়া যাবে। ভাের হওয়ার আগে তাকে ছাড়া হবে না, ভীষণ মজা হবে। এ সারাদিন কঠোর পরিশ্রমের ফলে তােক বা লবণযুক্ত আহার বেশি পরিমাণ খাওয়ার ফলে হােক অথবা তার শারীরিক গঠনে বিশেষ কোনাে কারণের জন্যে হােক রুজ্জিয়েরির ভীষণ জল পিপাসা পেল। জানালার তাকে চেতনানাশক সেই ওষুধের বােতলটি দেখে সে জল মনে করে বােতল খালি করে সমস্ত ওষুধটাই খেয়ে ফেললাে এবং কিছুক্ষণ পরেই সে ঘুমে ঢুলতে ঢুলতে একেবারে গভীর ভাবে ঘুমিয়ে পড়লাে। যে ওষুধ মাত্র সিকি ভাগ খেলেই মানুষ নিদ্রায় অচেতন হয়ে যায় সেই ওষুধ এক বােতল খাওয়ার ফলে সে ঘুমিয়ে কাঠ।

যথাসময়ে মহিলা শয়নঘরে এসে দেখলেন রুজ্জিয়েরি অপেক্ষা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছে। মহিলা প্রথমে তাকে ফিসফিস করে ডাকলাে। সাড়া না পেয়ে ধাক্কা দিল। তবুও যখন কোনাে সাড়া নেই তখন বিরক্ত হয়ে বলল, কুঁডের ধাড়ী এতই যদি ঘুম পেয়েছিল তাহলে নিজের বাড়িতে শুয়ে থাকলেই পারতে।

এবার এমন জোরে ধাক্কা দিল যে রুজ্জিয়েরি খাট থেকে পড়ে গেল। তবুও তার ঘুম ভাঙ্গল না যেন একটা লাশ পড়ে গেল। এ কি রে বাবা।

একটা বাড়ি ভাড়া নিয়েছিল। তারা পেশায় ছিল কুসীদজীবী, টাকা ধার দিত, সুদ আদায় করতাে। যে। পরিমাণ সুদ আদায় হতাে তাতেই ওদের বেশ চলে যেতাে। ওদের এখন কিছু আসবারের বিশেষ করে একটা সিন্দুকের খুব দরকার ছিল। ওরা ছুতােরের কারখনার সামনে রাস্তার ধারে সিন্দুকটা পড়ে থাকতে দেখে সাব্যস্ত করেছিল ওটার কেউ দাবিদার ইে তাই ওরা ঠিক করেছিল রাত্রে অন্ধকারে ওরা ওটা তুলে আনবে।

মহিলা ও পরিচারিকা চলে যাবার কিছুক্ষণ পরেই যুবক দু’জন রাস্তা ফাকা দেখে ছুতােরের। বানার সামনে এসে দেখলাে সিন্দুকটা সেখানেই পড়ে আছে। সিন্দুকটা যদিও একটু ভারি মনে হল ও ওরা ঢাকা তুলে দেখল না ভেতরে কি আছে। দেরি হয়ে গেলে যদি ওরা ধরা পড়ে যায় সেজন্যে ও দু’জনে সিন্দুকটা মাথায় তুলে নিয়ে নিজেদের বাড়িতে একটা ঘরে নামিয়ে রাখল। পাশের ঘরে বতি মেয়েরা শুয়েছিল। যাক কেউ দেখে নি। ওরা নিশ্চিন্ত হয়ে নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ল।

ওদিকে ওষুধের ক্রিয়া ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে আর রুজ্জিয়েরিরও ঘুম আস্তে আস্তে ভাঙছে। তখন ভোর হয়ে আসছে। একসময়ে ঘুম ভাঙল তবে ঘুমের জড়তা ভাঙতে একটু সময়ে লাগল। যখন ঘুমের। ঘোর ও জড়তা সম্পূর্ণ কেটে গেল, ও তখন চোখ খুলে বুঝতে পারলাে না হাত-পা মুড়ে ও কোথায় পড়ে আছে। বাক্সর ভেতর তাে অন্ধকার, কিছু দেখা বা বােঝা যাচ্ছে না।

কিন্তু ছােকরা তাে ধুরন্ধর। হাত-পা যথাসম্ভব নেড়েচেড়ে বুঝল ও কাঠের সিন্দুকের মধ্যে বন্দী হয়ে আছে। ওর মাথা ঝিমঝিম করছে, স্পষ্টভাবে চিন্তা করার শক্তি তখনও ফিরে আসে নি। তবুও ভাবতে লাগলাে ও এখানে এই বাক্সর মধ্যে কি করে এলাে? বাক্সটা আছেই বা কোথায়? ভাবতে ভাবতে মনে পড়লাে ও তাে তার প্রণয়িনীর বাড়িতে ছিল, তার শয়নকক্ষে খাটে শুয়েছিল তাহলে বাক্সর মধ্যে কি করে এলাে? আবার কিছুক্ষণ ভাবল। হয়েছে। ডাক্তার বােধহয় হঠাৎ বাড়ি ফিরেছিল, তার নায়িকা তাকে তাড়াতাড়ি বাক্সর মধ্যে লুকিয়ে রেখেছে, নাকি ডাক্তার তার কিছু করেছে? বাক্সয় যে তাকে ঢােকানাে হল তা সে জানতে পারলাে না কেন? এ তাে বড় রহস্য।

কিন্তু বাক্সর ভেতর তাে আর বেশিক্ষণ থাকা যাবে না। হাত পা আড়ষ্ট হয়ে গেছে, নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। বাক্স থেকে বেরােতে হবে। সে কান পেতে শােনবার চেষ্টা করলাে কোনাে কথাবার্তা বা আওয়াজ শােনা যায় কিনা। না, কোনাে আওয়াজ শােনা যাচ্ছে না। দিন না রাত্রি তাও বােঝা যাচ্ছে না। মােট কথা বাক্সর ভেতর আর থাকা যাচ্ছে না। আর কিছুক্ষণ থাকলে দমবন্ধ হয়ে মরতে হবে।

বাক্সটা বােধহয় একটা চৌকির ওপর রাখা হয়েছিল। অন্ধকারে যুবক দু’জনও কোনােরকমে সিন্দুকটা বসিয়ে দিয়েছিল। কারণ বন্দী একটু নড়াচড়ার সঙ্গে সঙ্গে সিন্দুকটা নড়ছিল। সিন্দুকটার ঢাকাটাও বেশ মজবুত করে বন্ধ করা হয়নি।

সিন্দুকের ভেতরে রুজ্জিয়েরি প্রথমে হাত দিয়ে ঢাকাটা ঠেলে তােলবার চেষ্টা করলাে কিন্তু হাত তার অসাড় হয়ে গেছে, জোর নেই তাই তখন সে উপুড় হয়ে পিঠ দিয়ে ঠেলা দিতে লাগল। সিন্দুকটা বেশ নড়ে উঠল কিন্তু রুজ্জিয়েরি গ্রাহ্য করলাে না। সে আরও জোর দিতে লাগলাে। ফলে সিন্দুকটা আরও জোরে নড়ে উঠল স্থানচ্যুত হয়ে মেয়েতে সশব্দে পড়ে গেল ও সেই সঙ্গে ঢাকাটা ভেঙে পড়লাে।

পাশের ঘরে ঘুমােচ্ছিল মেয়েরা। সেই শব্দে তাদের ঘুম ভেঙে গেল কিন্তু তারা এত ভয় পেয়েছিল যে চিৎকার করতেও সাহস পায় নি। তারা ভেবেছিল পাশের ঘরে চোর বা ডাকাত এসেছে, চুপ করে থাকাই নিরাপদ।

বাক্সটা মেঝেতে পড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রুজ্জিয়েরিও ভয় পেয়েছিল। কোথায় পড়লুম রে বাবা? এত আওয়াজ হল, আবার কি বিপদ ঘটে কে জানে? কিন্তু ঢাকাটা খুলে যাওয়ায় সে বেরিয়ে আসতে পারলাে। সে কোথায় এসেছে অন্ধকারে বুঝতে পারলাে না। যেখানেই এসে থাকুক যতদূর সম্ভব শীঘ্র স্থানত্যাগ করা মঙ্গল মনে করে সে দরজা, জানালা বা সিঁড়ির সন্ধানে হাতড়াতে লাগল।

পাশের ঘরে মেয়েরা ঘুটুর ঘুটুর আওয়াজ পাচ্ছে। তাদের সাহস কিছু ফিরে এসেছে। তারা এবার চিৎকার করতে লাগলাে, কে? কে? ও ঘরে কে?

কৃজিয়েরি দেখল এ কণ্ঠস্বর তার প্রণয়িনীর তাে নয়ই, তার কোনাে পরিচিত নারীরও নয়। সে কোন উত্তর দিল না, চুপ করে থাকাই শ্রেয় মনে করলাে। ওদিকে সেই যুবক দু’জন অনেক রাত্রে শুয়েছে পরিশ্রমও হয়েছে, তারা ঘুমে অচেতন, কোনাে আওয়াজ বা ডাকাডাকি শুনতে পায়নি।

মেয়েরা কোনাে সাড়া না পেয়ে শংকিত হল। পাশের ঘরে যে আওয়াজ করছে সে নিশ্চয়ই বাড়ির লােক নয়, বাড়ির লােক হলে সাড়া দিত। তখন তারা নিজেদের ঘরের জানালা খুলে মুখ বাড়িয়ে ‘চোর চোর’ বলে চিৎকার করতে লাগল। হাঁকাহাঁকি শুনে আশপাশ থেকে অনেক প্রতিবেশী ছুটে এলাে। যুবক দু’জনেরও ঘুম ভেঙে গেল, তারাও উঠে এলাে।

এখন পালানাে অসম্ভব। রুজ্জিয়েরি ধরা পড়ে গেল। যে সব লােক জমায়েত হয়েছিল তাদের মধ্যে স্থানীয় শাসকও ছিল। তাকে ধরে সেই শাসকের কাছে নিয়ে যাওয়া হল। ইতিমধ্যে কেউ আলাে এনেছিল। আলােয় মুখ দেখে সকলে রুজ্জিয়েরিকে চিনতে পারলাে। তার তাে বদনাম ছিলই, অপরাধের জন্যে দু’ চার বার ধরাও পড়েছিল। শাসকমশাই তাকে কয়েকখানায় নিয়ে গেল। সেখানে তাকে এমন মার দেওয়া হল মারের চোটে সে বলল যে আর মেরাে না বাবা, আমি চুরির মতলবেই ঐ দুই মহাজনের বাড়িতে ঢুকেছিলুম। আর যায় কোথায় শাসকমশাই সঙ্গে সঙ্গে রায় দিলেন বদমাশটাকে ফাসিকাঠে ঝুলিয়ে দেওয়া হবে।

সকাল হতেই সারা স্যালেরনােতে খবর রটে গেল যে, পাকা চোর রুজ্জিয়েরি মহাজনদের বাড়ি চুরি করতে ঢুকে হাতেনাতে ধরা পড়ে গেছে। তাকে শিগগির ফাঁসি দেওয়া হবে।

এই দুঃসংবাদ ডাক্তার-পত্নী ও তার পরিচারিকার কানেও উঠল। দু’জনেরই উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলাে বিশেষ করে মহিলা। একে তাে রুজ্জিয়েরি তার প্রেমিক তায় বিনা দোষে লােকটার ফাসি হবে। কি। করবে ভেবে না পেয়ে মহিলা কাঁদতে লাগল। | বেশ বেলায় সেই চিকিৎসক আমালফি থেকে ফিরে এসে কিছু আহার ও বিশ্রাম করে স্থির করলেন এবার সেই রােগীর পায়ে অস্ত্রোপচার করতে হবে, দেরি হয়ে গেছে। তাকে অজ্ঞান করবার জন্যে চিকিৎসক মশাই যে ওষুধ তৈরি করে রেখে গিয়েছিল এখন দেখলাে বােতল শূন্য। সে তাে চেচামেচি শুরু করে দিল। কে ওষুধের বােতলে হাত দিয়েছে? নিজের বাড়িতেও কিছু রাখা যাবে না, এ কেমন কথা?

চিকিৎসক-পত্নীর মেজাজ তাে এমনিতে খারাপ হয়েছিলই তারপর সে বুঝতে পারলাে যে, ডাক্তার তাকে উদ্দেশ্য করেই চেঁচামেচি করছে তখন সেও গলা চড়িয়ে বলল, হয়েছেটা কি? এক বােতল জল পড়ে গেছে তাে কি হয়েছে? বাড়িতে কি জলের অভাব আছে?

জল? ডাক্তার বলল, কে তােমাকে বলল যে বােতলে জল ছিল? জলের মতাে দেখতে বটে কিন্তু আসলে ওটা ঘুম পাড়াবার ওষুধ। কি জন্যে ও কার জন্যে ওষুধটা তৈরি করা হয়েছিল ডাক্তার সে কথাও বলল।

মহিলা এবার অবাক। বােতলে ঘুমের ওষুধ ছিল? তাই তৃষ্ণার্ত রুজ্জিয়েরি জল ভেবে সেই ওষুধ পান করে ঘুমিয়ে পড়েছিল আর আমরা ভাবছিলুম সে তাে মরে গিয়েছিল আবার বেঁচে উঠলাে কি করে? এ কথা তাে ডাক্তারকে বলা যায় না তাই বলল, আমরা কিছু জানি না, তুমি না হয় আর এক বােতল ওষুধ তৈরি করে নাও।

ডাক্তার কি আর করে? আর একবার ওষুধ তৈরি করে দেবার নির্দেশ পাঠালাে।

ইতিমধ্যে মহিলা তার পরিচারিকাকে বাইরে পাঠিয়েছিল তার প্রেমিক সম্বন্ধে খবর সংগ্রহ করে আনতে। পরিচারিকা ফিসে এসে বলল : কি আর বলবাে, রুজ্জিয়েরিকে সকলে গাল দিচ্ছে, যা ইচ্ছে তাই বলছে। তাকে বাঁচাবার চেষ্টায় তার কোনাে বন্ধু বা বাড়ির লোেক কেউ শাসকমশাইয়ের বাড়ি যায় নি। সকলে বলছে কাল নাকি ওর ফাসি হবেই হবে। এদিকে বাড়ি ফেরার পথে আমি আর একটা ঘটনা দেখলুম। সেই ছুতাের মিস্ত্রি যার কারখানার সামনে পড়ে থাকা সিন্দুকে আমরা রুজ্জিয়েরিকে ভরে দিয়েছিলুম, সেই ছুতাের মিস্ত্রির সঙ্গে একজন লােক ঝগড়া করছে। বলছে, আমার সিন্দুক তুমি দুই মহাজনকে বেচে দিয়েছ, কারণ আজ সকালে আমি সিন্দুকটা তাদের বাড়িতে দেখেছি। ছুতাের মিস্ত্রি বলছে যে সে সিন্দুক বেচে নি। মহাজনরা নিশ্চয়ই চুরি করে নিয়ে গেছে। আমার সঙ্গে মহাজনদের বাড়ি চলাে, তাদের জিজ্ঞাসা করবাে তারা কি করে সিন্দুক পেলাে? ওরা দু’জন মহাজনদের বাড়ির দিকে গেল, আমি ফিরে এলুম কিন্তু মরা রুজ্জিয়েরি কি করে বেঁচে উঠলাে আমি তাে ভেবে পাচ্ছি না।

মহিলা বলল, রুজ্জিয়েরি আসলে মরে নি, সে ভুলে আমারই বাড়িতে জল ভেবে ঘুমের ওষুধ পান করেছিল। সে যাই হােক, তুমি যখন সব জানাে তখন তুমি রুজ্জিয়েরিকে বাঁচাবার চেষ্টা করাে আর আমার সম্মান যাতে বাঁচে সেদিকেও বিশেষ নজর রেখ।

পরিচারিকা বলল, বেশ তাহলে বলাে আমাকে কি করতে হব আমি তা করতে পিছপা হবাে না, আনন্দের সঙ্গেই করবাে।

হাতে বেশি সময় নেই। মহিলা ও পরিচারিকা মিলে একটা মতলব ঠিক করলাে। সেই অনুসারে পরিচারিকা ডাক্তারের সামনে গিয়ে অভিনেত্রীর মতাে চোখে জল এনে বলল, মালিক আমি খুব অন্যায় একটা কাজ করেছি, সেজন্যে আমি আপনার কাছে ক্ষমা চাইছি, বলতে বলতে পরিচারিকা ডাক্তারের পায়ে পড়লাে।

ডাক্তার বলল, কি অন্যায় করেছ সেটা আগে শুনি, তারপর বলবাে ক্ষমা করবাে কিনা।

পরিচারিকা কতই না অনুতপ্ত, পাকা অভিনেত্রীর মতাে কাদতে কাঁদতে বলল, মালিক আপনি তাে ঐ পাজি রুজ্জিয়েরিটাকে চেনেন, পাজিটা আমাকে জ্বালিয়ে খাচ্ছিল, ভয় দেখাচ্ছিল তাই শেষ পর্যন্ত আমাকে ওর রক্ষিতা হতে বাধ্য হতে হয়। মাস দুই কোনাে ঝামেলা হয়নি কিন্তু শয়তানটা কাল কি করে খােজ পেয়েছে আপনি নৌকো চেপে আফালমি গেছেন, রাত্রে বাড়ি ফিরবেন না। পাজিটা রাত্রে ঠিক ঘরে এসে হাজির হয়েছে। প্রথমে বলল, আমার খুব তেষ্টা, খাবার জল দাও। এখন জল আনতে গেলে আমি ম্যাডামের নজরে পড়েন যাব কিন্তু দেখেছিলুম আপনার ঘরের জানালায় এক বােতল জল আছে। আমি সেই বােতলটাই ওকে এনে দিলুম। ওর খাওয়া শেষ হলে আমি বােতলটা যথাস্থানে রেখে এলুম। পরে শুনলম ঐ বােতল নিয়ে আপনি খুব ঝামেলা করেছেন। আমি এজন্যে খুবই দুঃখ অনুভব করছি, আপনার জন্যে তাে বটেই এমন কি বেচারা রুজ্জিয়েরির জন্যেও কারণ তার প্রাণ সংশয়। আমি আবারও আপনার কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করে প্রার্থনা করছি যে, বেচারা রুজ্জিয়েরিকে বাঁচাবার জন্যে আমাকে সাহায্য করুন।

এসব কথা শুনে ডাক্তার তাে ভীষণ চটে গেল, পরিচারিকাকে বকলাে কিন্তু মনে মনে ডাক্তার তার ও রুজ্জিয়েরির জন্যে অনুকম্পা বােধ করলাে। পরিচারিকার কান্না থামে না। তখন ডাক্তার বলল, ঢিল তাে ছুঁড়ে ফেলেছ তা আর ফিরিয়ে নেওয়া যাবে না। খুবই অন্যায় করেছে, আমি বলে কিছু বললুম না, এখন যাও তােমার প্রাণের মানুষটিকে বাঁচাবার চেষ্টা করাে। ছােকরা যদি বেঁচে ফিরে আসে তাহলে, খবরদার ওকে আমাদের বাড়িতে আর ঢােকাবে না, মনে থাকে যেন, তাহলে তােমাকে এমন শিক্ষা দেবাে যে জীবনে ভুলবে না।

পরিচারিকা বুঝল কর্তার মন ভিজেছে, প্রথম দফায় সে জিতেছে। সে আর দেরি করলাে না। ডাক্তারকে অনেক ধন্যবাদ দিয়ে ও এমন অন্যায় আর কখনও করবে না এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে কারাগারের দিকে ছুটল যেখানে রুজ্জিয়েরিকে আটক রাখা হয়েছে। সেখানে গিয়ে শাসকমশাইকে ঘুম থেকে ডেকে তুললাে। অসময়ে ঘুম ভাঙায় শাসকমশাই বিরক্ত হয়েছিলেন কিন্তু একটি ফুরফুরে সূবদনী যুবতীকে নেয় মন ভিডল। শাসক পরিচারিকাকে ডেকে রসিকতা করলাে, গায়ে দু’চারবার হাতও দিল, তারপর জিঙ্ক করলাে, ব্যাপারটা কি হয়েছে?

কতই না অন্যায় করেছে এমন ভাব দেখিয়ে পরিচারিকা ডাক্তারকে যা বলছিল তার ওপর আর একটু রং চড়িয়ে সব বলল। শাসকমশাই সব শুনে আর এক দফা রসিকতা করবার লােভ সম্বৰণ কত পারলেন না। খুঁটিয়ে কয়েকটা প্রশ্ন করে আর চটুল উত্তর শুনে শাসক তাে হাসিতে ফেটে পড়ল। দ্বিমত পরিচারিকা বুঝল সে জিতে গেছে। শাসকমশাইকে তার বুকে দু’চার বার হাত দিতে দিয়ে তার জয় সুনিশ্চিত হয়েছে।

শাসকমশাই ইচ্ছে করলে আসামীকে তখনি ছেড়ে দিতে পারতেন তবুও নিয়মরক্ষা করতে হবে তে, তাই নিয়মরক্ষা করবার জন্যে তিনি ছুতাের মিস্ত্রি, মহাজন দু’জন এবং ডাক্তারকেও ডেকে জেরা করলেন। তাদের সামনে পরিচারিকাকেও প্রশ্ন করলেন। সবশেষে রুজ্জিয়েরিকে ডেকে জেরা করলেন।

রুজ্জিয়েরি বলল যে, সে ডাক্তারের অনুপস্থিতিতে তার বাড়িতে গিয়েছিল। খুব তেষ্টা পেয়েছিল। বােতলে কি আছে পরীক্ষা না করেই সে বােতলে যা ছিল সবটাই পান করেছে এবং তারপর কি হয়েছে তার মনে নেই। জ্ঞান হতে দেখল সে মহাজনদের বাড়িতে বাক্সবন্দী। বিচারক প্রত্যেকের কাহিনী শুনে একবার জেরা করে সন্তুষ্ট হলেন যে, রুজ্জিয়েরি নির্দোষ কিন্তু ঐ মহাজন দুটো চোর, ওরা ছুতাের মিষ্টি বাক্স চুরি করেছে। শাসকমশাইকে রুজ্জিয়েরিকে মুক্তি দিয়ে মহাজন দু’জনকে দশ স্বর্ণ ফ্লোরিন কার জরিমানা করলেন।

সব ভালাে যার শেষ ভালাে। সবচেয়ে আনন্দিত হল ডাক্তারের বৌ। ঝামেলা মিটে যাবার পর মহিলা রুজ্জিয়েরি ও পরিচারিকাকে নিয়ে পর পর কয়েকদিন দারুণ ফুর্তি করলাে, সবই অবশ্য ভান্ডারের অলক্ষে। এরপর ডাক্তার-পত্নী রুজ্জিয়েরির প্রেমে ছেদ পড়েনি, যতদিন পেরেছিল তারা আনন্দ-সাগরে ভেসেছিল।

 

আগেকার গল্পগুলি শুনে মহিলাদের হৃদয় ব্যথিত হয়েছিল কিন্তু ডায়ােনিওর এই গল্পটি তারা খুবই উপভােগ করলাে এবং তাদের মন অনেকটা হালকা হল।

এদিকে বেলা পড়ে আসছে, হাতে বেশি সময় নেই, কিং অরুচিকর একটি বিষয় নির্বাচন করার জন্যে মহিলাদের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিলেন। আশা করলেন নতুন কুইন মনের মতাে বিষয় নির্বাচন করে দেবেন। এরপরও আরও কিছু মন্তব্য করে কিং ফিলােস্ট্রা তার দায়িত্বের সমাপ্তি ঘােষণা করে নিজের মাথা থেকে মুকুট খুলে স্বর্ণকেশী ফিয়ামমেত্তার মাথায় মুকুট পরিয়ে দিল। পরদিনের কুইন হল ফিয়ামমেত্ত।

ফিয়ামেত্তার চুল সােনালি, টানা টানা ভুরু, ডাগর চোখ, গােল ঢলঢলে মুখ, হাসিখুশি, সকলেরই ঘনিষ্ঠ বন্ধু। বলল, কুইন হয়ে অবশ্যই আমার খুব ভালাে লাগছে তবে যাতে তােমরা তােমাদের গল্পের জন্যে প্রস্তুত হতে পারে সেজন্যে বিষয়টা আগেই জানিয়ে দিই। বিষয় হলাে : অনেক বিপদ ঝড়ঝঞ্জা তুচ্ছ করে প্রেমিক-প্রেমিকার সুখের মিলন।

সেদিন সভা ভঙ্গ হবার পর সকলে যথারীতি বাগানে ঘুরে বেড়ালাে ইচ্ছামতাে; নাচ গানও হল এবং শেষে উত্তম খাদ্য ও পানীয় শেষ করে যে যার নিজ শয্যায় সেদিনের মতাে শয়ন করলাে। চতুর্থ দিন ভালােয় ভালােয় শেষ হল।

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *