ফালি ফালি করে কাটা চাঁদ – হুমায়ুন আজাদ

›› উপন্যাসের অংশ বিশেষ  

…….এক চামচ পাতা আর আধ-চামচ চিনি ঢেলে, বসতাম বাথরুমে, বইয়ের পাতা উল্টোতে থকতাম, কখনাে আয়নাটির সামনে দাঁড়িয়ে দেখতাম নগ্ন নিজেকে, স্তন দুটির লাল বৃত্ত, নাভির গভীরতা, জঘনের কোমল ভাস্কর্য নিজেকে দেখতে আমার ভালাে লাগে, দেখতে দেখতে নিজেকে আমার আপন মনে হয়, নগ্ন শরীর শুকোতে থাকতো, ইচ্ছে হলে আরেকটুকু বেবি ওয়েল মাখতাম, চা খেতে থাকতাম, উল্টোতে থাকতাম বইয়ের পাতা, দেলােয়ার হয়তাে চিৎকার করতে থাকতাে, তােমার রান্ধুন হইলাে?……..

………ভদ্রলােক আমার বাঁ হাতটি নিয়ে খেলা করতে থাকেন, আঙুল দেখেন, নখ নাড়েন, হাতটি নিয়ে তার ঠোটে ছোঁয়ান, দু-হাতে ধরে রাখেন- বেশ খেলেন, তারপর তার দুটি হাত আমার মুখের দিকে উঠে আসে; দু-হাতের ভেতরে আমার মুখটি নিয়ে আমার দুই চোখের ভেতরে তাকান ভদ্রলােক।

মুখটি আমি চিনতে পারি না, মনে হয় না কখনাে এ-মুখ দেখেছি, দেখতেও চাই না, চেনা হােক ‘অচেনা হােক কিছুই এখন তাৎপর্যপূর্ণ নয় আমার কাছে। কী এসে যায় যদি কিছু ঘটে, ঘটুক, কী এসে যায় কিছু ঘটলে। আমি তার দিকে তাকিয়ে হাসি, তাকে আমি চিনতে পারি না; তখন তাঁর ওষ্ঠ এগিয়ে আসে আমার ওষ্ঠের দিকে।

ওষ্ঠ? এগিয়ে আসছে? আমার ওষ্ঠের দিকে? আসুক। কী এসে যায়। আমার ওষ্ঠে তার ওষ্ঠ? কী এসে যায়? থাকুক। আমার গ্রীবায় তার ওষ্ঠ? জিভ দিয়ে লেহন করছেন আমার গ্রীবা? কী এসে যায়? করুন। তাঁর হাত কাঁপছে আমাকে খুলতে? কাঁপতে থাকুক। তাঁর হাত মন্থন করছে আমাকে? করুক।

তার ওষ্ঠ লেহন করছে বৃন্ত? করুক। কী এসে যায়।। এক সময় তিনি বলেন, বাতি নিভিয়ে দিই? আমি কি শব্দের জগতে আছি? শব্দও আমার অচেনা মনে হয়। আমি কথা বলি না, আলাে আর অন্ধকার একই জিনিশ এখন আমার কাছে। আলাে কী? অন্ধকার কী? বাতি কী? আমি কি এতােক্ষণ আলােতে ছিলাম? তাহলে কেননা এতাে অন্ধকার লাগলাে? তিনি আলাে নিভিয়ে দেয়ার পর আমি কেননা আলাে দেখতে পাচ্ছি?

অন্ধকার না কি আলো, ও তিনি আমার পাশে, ওপরে, এপাশে, ওপাশে। তিনি যখন ঢুকতে থাকেন, আমার ভেতরে কে যেনাে জেগে ওঠে, কথা বলতে শুরু করে, আমি নিজেকে বলতে থাকি- এর পর জীবন আর আগের মতাে থাকতে পারে না। জীবন বদলে দিচ্ছি আমি, বদলে যাচ্ছে জীবন। তিনি পরিশ্রম করতে থাকেন, কঠোর পরিশ্রমী মানুষ তিনি, আমাকে ভেঙে ফেলে। আবার গড়ার চেষ্টা করতে থাকেন, আমাকে বাতাস জল আগুন মেঘ কুয়াশায় পরিণত করার সাধনা করতে থাকেন, আমি নিজেকে বলতে থাকি, এর পর জীবন আর আগের মতাে থাকতে পারে না, জীবনকে আমি আগের মতাে থাকতে দিতে পারি না। জীবন বদলে ফেলছি আমি? এইটুকুতেই জীবন বদলে ফেলতে হবে? এমন কী আর করছি? সূর্য গ্রহ নক্ষত্রপুঞ্জগুলােকে কি আমি আবর্জনাস্তুপে ফেলে দিচ্ছি? কমলগঞ্জে পল্লীসংযােগে এসে না হয় একটি পুরুষের সাথে ঘুমােচ্ছি, তাতে এমন কী হচ্ছে? কোথায় পচছে আমার শরীর? শরীরের কোথায় ঘা হচ্ছে? কুষ্ঠরােগ খসে খসে পড়ছে আমার কোন অঙ্গ? থকথকে হয়ে উঠছে। কি আমার স্তন? নর্দমার স্রোত কি বয়ে যাচ্ছে আমার দুই বাহু দিয়ে? আমার মুখ কি ভরে যাচ্ছে দুর্গন্ধে? না তাে। আমার মনে হয় এটি একটি ঘটনা, ঘটনামাত্র, তার বেশি কিছু নয়; আমি একটি ঘটনা ঘটাচ্ছি, ঘটাচ্ছি বিশুদ্ধভাবে; কোনাে আবেগে নয়, পরিকল্পনায় নয়। তিনি খেটে চলছেন, বুঝতে পারি তিনি খাটায় দক্ষ, আমার একতিল জমিও চাষবাসের বাইরে রাখবেন না; কিন্তু আমি শুধু মজা পাচ্ছিলাম, ভাঙতে ভাঙতে গড়ে উঠছিলাম, বলছিলাম, এর পর জীবন আর আগের মতাে থাকতে পারে না। আমি কি ফিরে গিয়ে আমার আগের শয্যায় ঘুমােতে পারি, বালিশে মাথা রাখতে পারি? ঘুমােতে আমার ঘেন্না লাগবে না? আমি কি আর দেলােয়ারের নিচে আগের মতাে পড়ে থাকতে পারি? পড়ে থাকতে আমার ঘেন্না লাগবে না? দ্রলােকের জন্যে আমার মনে আবেগ জন্মেছে? না, কোনাে আবেগ তাে দেখতে পাচ্ছি না, তাঁর মুখটিই মনে করতে পারছি না আমি, কেমন যেনাে দ্রলােকের মুখটি? মনে হচ্ছে আমি তাকে একটি সুযােগ দিয়েছি, তিনি তার সদ্ব্যবহার করে চলছেন, সদ্ব্যবহার করতে তিনি জানেন, এ-প্লাস প্লাস; মনে হচ্ছে আমি ক্ষুধার্ত একটি লােককে খাদ্য দিয়েছি, তিনি গােগ্রাসে খেয়ে চলছেন, পান করে চলছেন; তার বেশি কিছু নয় । আমি বদলে দিচ্ছি জীবন, দ্রলােককে দিয়ে বদলে দিচ্ছি জীবন; এর পর জীবন আর আগের মতাে থাকতে পারে না। জীবন বদলে যাওয়া কি খুব কঠিন হবে? হবে। হয়তাে; তাতে কী এসে যায়? ঠিক কি হলাে জীবন বদলে দেয়া? কেননা, অঠিক কোথায়? জীবনকে একভাবে থাকতে হবে কেননা, জীবন কি খুব আহামরি চিরন্তন ধ্যাপরি যে তাকে গােবর দিয়ে লেপেপুছে উঠোনের মতাে ঠিকঠাক ঝকঝকে রাখতে হবে? বদলাতে হলে ভেবেচিন্তে পরিকল্পনা করে বদলাতে হবে? কেননা? ভদ্রলােক ভেঙেচুরে পড়ে গেছেন আমার পাশে, খুব পরিশ্রম করেছেন, থাকুন তিনি ঘুমিয়ে আমার পাশে, নিশ্চয়ই খুব ক্লান্ত; হয়তাে জয়ী ভাবছেন নিজেকে, কমলগঞ্জে এসে এক সন্ধ্যায় তিনি একটা বিশাল জয় সম্পন্ন করে ফেলেছেন, হয়তাে সেটা ভেবে সুখ পাচ্ছেন, মনের ভেতরে খুঁড়ে খুঁড়ে তাকে অবিস্মরণীয় করে রাখছেন; আর আমি ভাবছি, এর পর জীবন আর আগের মতো থাকতে পারে না।

আমি কি একটু ঘুমােবাে? রাত কতাে বাকি? ইচ্ছে করলে ঘুমােতে পারি, ইচ্ছে করলে জেগে থাকতে পারি; আমি শুধু শুয়ে থাকি। শুয়ে থাকতে আমার খারাপ লাগে না, জীবনকে দেখে মনে মনে আমার হাসি পায়। আমি ভদ্রলােকের মুখটি মনে করার চেষ্টা করি, মনে পড়ে না; কারাে মুখই আমার মনে পড়ে না। আমি মনে মনে বলি, জীবনকে আমি বদলে দিয়েছি।

ভদ্রলােক আবার সক্রিয় হয়ে ওঠেন, তার ক্লান্তি কেটে গেছে, বা তিনি যে একটি সােনালি সুযােগ পেয়েছেন, সেটাকে সম্পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে চান; অন্ধকারকে তিনি ব্যর্থ হয়ে যেতে দিতে পারেন না, এমন সুযােগ আর নাও আসতে পারে জীবনে। না কি তিনি চাচ্ছেন আমাকে আরাে সুখী করতে? সুখে আমাকে ভরিয়ে দিতে, যাতে আমি রাতটিকে মনে রাখি। আমার কি ইচ্ছে হচ্ছে?

কি হচ্ছে না? আমি বুঝতে পারি না। আমি কি তাকে বাধা দেবাে? ঠেলে সরিয়ে দেবাে? তাহলে ভদ্রলােক কি আমাকে ধর্ষণ করবেন? ভয় পেয়ে চুপ করে পড়ে থাকবেন পাশে? হাঁটু গেড়ে কাতরভাবে প্রার্থনা করবেন?

আমি তাকে বাধা দিই না, তিনি কাজ করতে থাকেন। তিনি বলেন, ভালাে লাগছে? আমি কোনাে কথা বলি না।

তিনি হয়তাে আমার থেকে একটা প্রশংসাপত্র আশা করছেন, সেটি পেলে আরাে উদ্দীপ্ত হয়ে কাজ করতে পারবেন, কিন্তু এ-সময়ে আমি কথা বলতে পছন্দ করি না, কথা বলতেই পারি না, এ-সময়ে আমি প্রাচীন পাহাড়ের গভীরতম। গুহার স্তব্ধতা চাই।

ভদ্রলােক আবার খাটতে শুরু করেছেন, হয়তাে আমাকে আরাে অবিস্মরণীয় কিছু দেয়ার বাসনা জেগেছে তঁার মনে, তিনি আমার বাহুর ভেতর দিয়ে গ্রীবার পাশ দিয়ে নাভির নিচ দিয়ে গিরিপথ উপত্যকা গুহার ভেতরে সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দিয়ে কাজ করতে থাকেন, তার জিভ অধীরভাবে কাজ করতে থাকে গভীর গহ্বরে; তিনি হয়তাে ভাবছেন আমাকে জীবনের শ্রেষ্ঠ সুখটি দিচ্ছেন, যার কথা আমি কোনােদিন ভুলতে পারবাে না; কিন্তু আমি নিজেকে বলতে থাকি, এর পর জীবন আর আগের মতাে থাকতে পারে না। আমি আর আগের জীবনের। মুখােমুখি দাঁড়াতে পারবাে না, তার মুখােমুখি বসতে পারবাে না; আগের জীবনকে বলতে পারবাে না, এই শােননা। কেননা পারবাে না? আমি জানি না; শুধু মনে হয় পারবো না। আমি কি অপরাধ করছি? না, আমার তা মনে হয় না। অপরাধ কেননা? কার ক্ষতি করছি আমি? চুক্তিভঙ্গ করছি আমি? আমার হাসি পায়। আমি কি একবার একটি ঠাণ্ডা দীর্ঘশ্বাস ফেলবাে আমার জীবনের জন্যে? ভেতরে আমি কোনাে দীর্ঘশ্বাস টের পাই না। হাহাকার করে উঠবাে আমার জীবনের নাম ধ’রে? কোনাে হাহাকার আমি শুনতে পাই না। এবার ভদ্রলােক আরাে শক্তি সগ্রহ করে কাজে নেমেছেন, তাঁর শিল্পকলার বাক্স খুলে ফেলেছেন, একটির পর একটি শিল্প দেখাচ্ছেন, বেশ ভালাে শিল্পী দ্রলােক, প্রতিভাবান; তঁার ত্বক হয়তাে আমার ত্বকের সাথে খাপ খাইয়ে নিয়েছে, আগের বারের মতে তিনি আর উত্তেজিত চঞ্চল বিচলিত বিভ্রান্ত দ্বিধাগ্রস্ত নন, যেনাে নিজের জমিতে কাজ করছেন, মন দিয়ে ঠিকমতাে চাষ করছেন, লাঙল বিচলিত হয়ে ছুটছে না, ধীর শান্তভাবে চছেন, গাছের ছায়ায় মাঝেমাঝে বিশ্রাম নিচ্ছেন, আবার এসে লাঙল চালাচ্ছেন; আর আমি ভাবছি জীবনটাকে বদলে দিচ্ছি আমি, আমার খারাপ লাগে না ভালাে লাগে না, শুধু বুঝতে পারি জীবনকে আমি আর আগের মতাে থাকতে দিতে পারি না। ভদ্রলােকের জন্যে আমার করুণা হয়, তাঁর দিবে মনে মনে দুটো পয়সা ছুঁড়ে দিই; তিনি এতো পরিশ্রম করছেন আমাকে শ্রেষ্ঠত পুলকটি দেয়ার জন্যে, আর আমি তাকে ভাবছি একটি যন্ত্র, যা দিয়ে আমি বদ দিচ্ছি আমার জীবন।

বীজ বােনা হয়ে গেলে তিনি এলিয়ে পড়েন, কোনাে কথা বলেন না; হয়তে এখনই ঘুমিয়ে পড়ে নাক ডাকতে শুরু করবেন।

আমি বলি, এবার কি ঘরে যাবেন? তিনি তাড়াতাড়ি উঠে পােশাক পরে দরােজা খুলে বেরিয়ে যান।……

…..গতরাতে আমি বদলে দিয়েছি জীবন? একটি ঘটনা দিয়ে? এই দ্রলােককে দিয়ে? আজো? আজ তাে আর জীবন বদলে দেয়ার মতাে বড়াে কিছু ঘটবে না, ঘটবে তুচ্ছ পুনরাবৃত্তি। পুনরাবৃত্তি ঘটবে? ঘটুক। কী এসে যায়? দ্রলােক আলাে নিভিয়ে উঠে আসেন বিছানায়, প্রথম একটু দূরে গড়ান, তারপর আমাকে টেনে নিয়ে আদর করতে থাকেন। জীবন তো বদলে গেছে গতকালই, আজ আর এমন কী ঘটবে? দ্রলােক হয়তাে ভাবছেন তার ছোঁয়ায় আমি শিউরে উঠছি, একবার ইচ্ছে হয় শিউরে উঠি, পারি না। জীবনের জন্যে আমার কষ্ট হচ্ছে? কই, না তো। ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে আগের জীবনে? না তো। আমি ফিরে যেতে পারি? না তাের ফিরে গেলে আমার ভালাে লাগবে? না তাে। গতরাতে জীবন বদলে যাওয়ার কথা ভাবতে ভাবতেও আমার সুখ লাগছিলাে এক ধরনের, আমি একটি ঘটনা ঘটাচ্ছি, আজ তাও লাগছে না; মনে হচ্ছে রােববারের পর সােমবার, যা ঘটছে তা কোনাে ঘটনা নয়; ভদ্রলােক একা খেলছেন, ভালােই খেলেন তিনি, ভালােই খেলতে শিখেছেন, আমার মনে হয় ভদ্রলােকও নিঃসঙ্গ বােধ করতে শুরু করেছেন, যদিও তিনি পরিশ্রম করে চলছেন আমার শরীরটি নিয়ে। ভদ্রলােক সম্ভবত একটি বিশাল মাঠে একা খেলার নিঃসঙ্গতা বােধ। করছেন, তবু খেলে যাচ্ছেন। দ্রলােকের জন্যে আমার মায়া হয়, এখন ইট ভাঙতে খকিলেও তিনি এতােটা একলা বােধ করতেন না। কিন্তু তিনি অবসর নেন না; খাটতে থাকেন, তার হাতে মাত্র আধারাত্রি সময়, এ-সময়ে যতােটা পারেন তিনি তুলে নিতে চান। আমি হাসি। নিন, যতােটা পারুন নিন, আমার নিষেধ নেই। কী আর নিচ্ছেন এমন? আমার শরীরটাকে খেয়ে ফেলতে চাচ্ছেন, পারছেন না বলে আরাে বড়াে হা করছেন, আমাকে সারাজীবনের শ্রেষ্ঠ সুখটি দিতে চাচ্ছেন। আমি হাসি। জীবন বদলে যাওয়ার কথা আমি ভাবতে চাই, তাও আমার ভাবতে ইচ্ছে করে না; ওটা আর এমন কী যে রাতের পর রাত ভাবতে হবে? একটি পুরুষ আমার ওপরে নিচে খেটে চলছে, খাটতে দিচ্ছি আমি, ভদ্রলােক দক্ষ ক্রীতদাস হতে পারতেন কোনাে হেরেমে; তিনি এখন দৃঢ় হয়ে উঠেছেন, প্রবেশ করতে চান।

আমি সম্ভবত একটু গড়িয়ে সরে যাই, বলি, আজ থাক।……

………রেস্টহাউজে ফিরতে ফিরতে মনে পড়ে দেলােয়ারকে কথা দিয়েছি কাল দুপুরে এক রেস্তোরায় তার সাথে আমি খেতে যাবাে। খেতে কি যাবাে? যাওয়া ঠিক হবে? কী হবে খেয়ে? পাঁচ বছর আগে আমরা অনেক খেয়েছি রেস্তোরায়, খেতে খেতে এক ঘরে এক বিছানায় পরস্পরের শরীরে ঢুকে গেছি; তখন। খাওয়ার একটি লক্ষ্য ছিলাে, রেস্তোরায় খাওয়াটা ছিলাে বাসায় এক টেবিলে খাওয়া এক বিছানায় শােয়ার জন্যে নানা ছন্দে নাচ নানা সুরে গান।….

….আমার কি কোনাে পুরুষ লাগবে না? একান্ত নিজস্ব একটি পুরুষ? যার বাহু আছে ওষ্ঠ আছে দাত আছে অণ্ডকোষ লিঙ্গ আছে? হয়তাে লাগবে, পুরুষ ছাড়া আমি থাকতে পারবাে না- হয়তো, থাকতে ভালাে লাগবে না। হয়তাে; পুরুষ আমি পছন্দ করি, বেশ পছন্দ করি, এই জম্ভটির সঙ্গ আমি পছন্দ করি; …..

…..দেলােয়ার কি ফিরে গিয়ে কাজের মেয়েটির সাথে ঘুমােবে? সে কি ঘুমােনো শুরু করে দিয়েছে? মেয়েটিকে তাে সে পছন্দ করতাে, মেয়েটির থলথলে শরীরের দিকে তাকে আমি তাকিয়ে থাকতে দেখেছি, যেমন সে তাকায় হিন্দি। সিনেমার মেয়েগুলোর দিকে। স্কুল স্তন উরু পাছা তার পছন্দ। সে কি ঘুমােয়? ঘুমােক, আমার কী! ঘুমােবে না কেনাে? তার তাে ঘুমােননা দরকার । ঘুমােক, সেটা আমার ভাবার বিষয় নয়, সে ঘুমােক। কিন্তু সে ঘুমােয় কি ঘুমোয় না, এটা আমি ভাবছি কেননা; আমার মাথায় এটা ঘুরছে কেননা? এটা কি আমার ঠিক। হচ্ছে? সে যেখানে ইচ্ছে ঘুমেক।….

……..আমি হেসে একটি বই খুলে ধরি; এবং দেখতে পাই ভদ্রলােক এখনই ছুটে যাচ্ছেন বাসার দিকে, স্ত্রীকে রান্নাঘর থেকে টেনে এনে বিছানায় ফেলে তার ওপর চড়ছেন, ভদ্রমহিলা বিস্মিত হয়ে হাঁপাচ্ছেন।

দু-দিন ধরে ভাবছিলাম, আগে কখনাে ভাবতে হয় নি, এই প্রথম ভাবলাম । ঠিক তিরিশ দিনেই আমার ঘটনাটি ঘটে; তার তিন চার দিন আগে বোটা দুটো একটু মৃদু টনটন করে, কোমরে একটু কামড় লাগে, তলপেটে একরকম ঘণ্টাধ্বনি শুনি ওই অনুভূতিটিকে ঘন্টার ধ্বনির মতােই মনে হয়, যেনাে ঢংঢং করে বেজে চলছে, মনে মনে শুনতে ভালাে লাগে, তারপর দু-তিন সব কিছু। নিরাক পড়ার মতো স্তব্ধ; এবং তিরিশ দিনের দিন দেখা দেয়।

এবার টনটন নেই, কামড় নেই, ঘণ্টাধ্বনি নেই, স্তব্ধতা নেই।

বোটাদের জিজ্ঞেস করি, কি হে টনটন করছে না কেনাে? কোমরকে জিজ্ঞেস করি, কি হে দাঁতগুলাে গেলাে কই? কামড় দিচ্ছে না কেনাে? তলপেটকে আদর করতে করতে জিজ্ঞেস করি, ঘণ্টা বাজছে না কেনো, সময় কি হয় নি?…..

….কোথায় দূষিত আমি? আমার আঙুলগুলাে ঝলমল করছে, ওগুলাের দিকে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করছে, আমার হাতের তালু নিটোল, আমার ত্বক মসৃণ, কোনাে রেখা পড়ে নি; আমার তলপেটে কোনাে দাগ নেই, এটা ঝুলে পড়ে নি, একটি গভীর নাভির নিচে আমার তলপেট নিটোল, তারপর রেশমের মতাে সবুজ ঘাসের মতাে উর্পাজাল, বোটা সুন্দর, তাদের ঘিরে আছে লালাভ জ্যোতিশ্চক্র, আমার মুখে স্নিগ্ধতা।……

…………দেলােয়ার টেনে ছিড়তে থাকে আমার ব্লাউজ শাড়ি, ছিড়তে তার কষ্ট হয়, আমার শরীরে তীব্র চাপ পড়ে, চামড়া কেটে যাচ্ছে মনে হয়; আমি ব্রা পরি না, বহুদিন পর দেলােয়ার আমার স্তন দুটি দুলে উঠছে দেখে বিহবল হয়ে পড়ে, আমাকে টেনে নিয়ে মেঝের ওপর চিৎ করে ফেলে। আমি ৰাধা দিই না; ও আমাকে ধর্ষণ করতে চায়, করুক। সে তার ট্রাউজার আর শার্ট খুলে ফেলে নগ্ন হয়ে আমার ওপর গড়িয়ে পড়ে; এবং প’ড়েই চায় আমার ভেতর ঢুকতে, চুকে ‘আমাকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলবে, শেষ করে ফেলবে, আমার যে-প্রত্যঙ্গটি তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে ধ্বংস করে ফেলবে সেটিকে; সে খুব উত্তেজিত, কাপছে, সে বারবার চেষ্টা করতে থাকে, পেরে ওঠে না, কিছুতেই দৃঢ় হতে পারে না। আমি চিৎ হয়ে পড়ে থাকি, মনে করতে থাকি এ শরীরটা আমার নয়, এটা নিতান্তই একটি শরীরমাত্র, আমার নয় অন্য কারাে নয়, এটা একটি শরীর, দেলােয়ার সেটিকে ধর্ষণ করার চেষ্টা করছে, পেরে উঠছে না।

কিন্তু ধর্ষণ করতেই হবে তার, আমি মনে মনে বলি, করাে, এতে আমার কিছু যায় আসে না, যত পারাে করাে, অনন্তকাল ধরে করাে।

সে পেরে ওঠে না । কিন্তু তাকে পারতে হবে, ধর্ষণ করতে হবে আমাকে।

সে আমাকে চুমাে খেতে থাকে, আমি উত্তর মেরুর মতাে পড়ে থাকি, এতো ঠাণ্ডা আমি হতে পারি, তা আমি কখনাে ভাবতেও পারি নি, আগে যেমন সাড়া দিতাে আমার জিভ ঠোট চিবুক বাহু গ্রীবা পিঠ জংঘা সেগুলাে সাড়া দেয় না, আমার ভয় হচ্ছিলাে ওগুলাে হয়তাে সাড়া দিয়ে ফেলবে, কিন্তু ধর্ষণকারীর ছোঁয়ায় ওগুলো কেপে ওঠে না জ্বলে ওঠে না, ওগুলাে ধর্ষিত হতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে নি, সে আমার স্তন চুষতে তাকে, কামড় দিতে থাকে, আমাকে উল্টেপাল্টে চুমাে খেতে থাকে, দুমড়েমুচড়ে ফেলতে থাকে, বারবার চেষ্টা করতে থাকে ভেতরে ঢুকতে। সে তার প্রত্যঙ্গটিকে দৃঢ় করার চেষ্টা করতে থাকে, সে চাচ্ছে। ওটা একটা তলােয়ার হয়ে উঠুক, যা দিয়ে সে আমাকে টুকরাে টুকরাে করে ফেলবে, কিন্তু সে দৃঢ় হতে পারছে না, ওটি সাড়া দিচ্ছে না, একটা পচে যাওয়া মাংসের দলাকে সে ঠেলে ঠেলে আমার ভেতরে ঢুকোতে চেষ্টা করে, সেটি কিছুতেই ঢোকে না, ঘণ্টাখানেক ধরে সে আপ্রাণ পরিশ্রম করতে থাকে, আমি শীতলভাবে নিচে পড়ে থাকি।

এক সময় সে আমার পাশে গড়িয়ে পড়ে কাঁদতে থাকে, আমি পারছি না, আমি পারছি না।…….

…………কিন্তু আমার শরীরটা কোকাতে থাকে, ফুলের টোকাও কখনাে ওর গায়ে লাগে নি, আজ আমার প্রিয় শরীরটা দুমড়েমুচড়ে গেছে। আমার মাংসের প্রতিটি কণার ভেতর দিয়ে বিষের যন্ত্রণা বয়ে যাচ্ছে, কোষগুলাে ছিড়েছিড়ে যাচ্ছে, ফেটে পড়ছে রগগুলাে। একবার মনে হয় পাঁজরের মাঝখানের হাড়টি ভেঙে গেছে, ভয় পেয়ে আমি হাড়টি টিপেটিপে দেখি; না, ভাঙে নি, আমি স্বস্তির শ্বাস ফেলি; আবার মনে হয় নিচের হাড়টি ভেঙে গেছে, টিপে দেখি, না, ভাঙে নি, আমি গভীর ভয় থেকে ভেসে উঠি ; আবার মনে হয় উরু দুটো খসে পড়ে গেছে, ও দুটো আমার কোমরের সাথে নেই, আমি ভয় পেয়ে উঠে দেখি ও দুটো আমার শরীরের সাথেই আছে; মনে হয় আমার স্তন দুটো ছিড়ে পড়ে গেছে, ওখানে কোনাে স্তন নেই, আছে শুনা, আমি শিউরে উঠে ও দুটোকে জড়িয়ে ধরি। আমার স্তনে কামড়ের দগদগে দাগ, পেটে দাগ, বাহুতে দাগ; দাগগুলােতে আগুনের কুণ্ড জ্বলছে। যন্ত্রণা হচ্ছে অথচ আমার কোনাে দুঃখ লাগছে না; শরীর যন্ত্রণায় ভরে গেছে, কিন্তু আমার মনে কোনাে কষ্ট নেই। আমি শুয়ে থাকতে পারছি না, মাংসের কৃপেকূপে বিষ জমে গেছে। আমি উঠে পানি গরম করি, দুবালতি গরম পানি নিয়ে বসি বাথরুমে; গরম পানি ঢালতে থাকি শরীরে, টাওয়েল ভিজিয়ে এখানে সেখানে চেপে ধরতে থাকি, আমার শরীর ঝিলিক দিতে থাকে, আমি বলতে থাকি, কিছু নয়, সব ঠিক হয়ে যাবে।…………

………সে বলে, কী বলেছিলাে?

আমি বলি, বলেছিলেন আপনার দেহখানি সুন্দর, এতাে সুন্দর দেহ আমি দেখি নি।

সে বলে, আর কী বলেছিলাে?

আমি বলি, বলেছিলেন আপনার স্তন দুটি সুন্দর, এতাে সুন্দর স্তন আমি দেখি নি।

সে বলে, আর কী বলেছিলাে? আমি বলি, বলেছিলেন আপনার উরু সুন্দর। সে বলে, আর কী বলেছিলাে? আমি বলি, বলেছিলেন আপনার নাভি সুন্দর। সে বলে, আর কী বলেছিলাে? আমি বলি, বলেছিলেন আপনার বাগান সুন্দর । সে বলে, বাগান? আমি বলি, হ্যা।….

……সে বলে, লােকটা নিজে ন্যাকেড় হয়েছিলাে? আমি বলি, না। সে বলে, তাহলে? আমি বলি, আমি তাকে নগ্ন করেছিলাম। সে বলে, তুমি নগ্ন করেছিলে? আমি বলি, হা ।….

….সে বলে, কীভাবে করেছিলে? আমি বলি, তা তােমাকে বলবাে না। সে বলে, বলতে হবে। আমি বলি, সেভাবে তােমাকে কখনাে নগ্ন করি নি। সে বলে, তােমরা আলাে জ্বালিয়ে রেখেই ইন্টারকোর্স করেছিলে? আমি বলি, হঁ্যা। সে বলে, কেনাে আলাে জ্বালিয়ে রেখেছিলে? আমি বলি, তিনি আলাে নেভাতে চেয়েছিলেন

সে বলে, কেননা নেভালাে না? আমি বলি, আমি আলো নেভাতে নিষেধ করি। সে বলে, কেনাে? আমি বলি, আমি তখন তাকে দেখতে চেয়েছিলাম। দেলােয়ার আবার আমাকে চড় দেয়, আমি তাকে লাথি দিই, সে পড়ে যেতে যেতে আমার ওপর চেপে থাকে।

আমি বলি, ওঠো, তুমি কিছু পারবে না। সে বলে, লােকটা প্রত্যেকবারই পেরেছিলো? আমি বলি, হ্যা। সে বলে, প্রত্যেকবার? আমি বলি, হ্যা। সে বলে, অনেকক্ষণ ধরে? আমি বলি, হ্যা।

দেলােয়ার ভেঙে পড়ছে, কাঁপতেও পারছে না, তার শরীর শিথিল হয়ে এসেছে; আমার করুণা লাগে তার জন্যে, কিন্তু আমার কিছু করার নেই, আমি চাই অকরুণ হয়ে উঠতে।

সে বলে, তুমি লােকটাকে আদর করেছাে? আমি বলি, হ্যা।

সে বলে, তােমরা দিনেও ইন্টারকোর্স করাে?

আমি হঠাৎ আমার হাত টেনে নিয়ে তার মুখে একটা চড় দিই, চড়টা শক্তভাবেই লাগে; সে আমাকে আরাে জোরে চেপে ধরে।

সে বলে, বলাে তােমরা দিনেও করাে? আমি বলি, হ্যা। সে বলে, পুরাে ন্যাকেড হয়ে? আমি বলি, হ্যা। সে বলে, কোথায় করাে? আমি বলি, বিছানায়, মেঝেয়, বারান্দায়, বাথরুমে, কিচেনে।

সে বলে, লােকটা নিশ্চয়ই তােমার স্তনের প্রশংসা করে? আমি বলি, হ্যা, আমার স্তন তিনি খুব পছন্দ করেন। সে বলে, স্তন পছন্দ করে? আমি বলি, সে এ-দুটো নিয়ে খেলে। সে বলে, খেলে? আমি বলি, পান করে । সে বলে, আমি পান করতে চাই। আমি বলি, না।

দেলােয়ার থরথর করে কেঁপে ওঠে; আমি তার মুখের দিকে তাকিয়ে কষ্ট পাই, কিন্তু আমার কিছু করার নেই।

সে বলে, তােমার তলপেটের প্রশংসা করে? আমি বলি, হ্যা। সে বলে, তােমার উরুর প্রশংসা করে? আমি বলি, হ্যা। সে বলে, তােমার চুলের প্রশংসা করে? আমি বলি, হঁা। সে বলে, লােকটা সব সময় তােমাকে চুমাে খায়? আমি বলি, হ্যা। সে বলে, ঠোটে?

আমি বলি, ঠোটে গালে বুকে নাভিতে উরুতে পিঠে পায়ে জংঘায় নিতম্বে গ্রীবায় বাহুমূলে বাগানে।

সে বলে, সব জায়গায়? আমি বলি, হ্যা। সে বলে, আমি চুমাে খাবাে। আমি বলি, না। সে বলে, আমি তােমার স্তন দেখবাে । আমি বলি, না। সে বলে, আমি তােমাকে ন্যাকেড দেখবাে। আমি বলি, না।

সে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, তার কোনাে প্রত্যঙ্গ আর সজীব নেই, শিথিল হয়ে পড়েছে তার সব কিছু আমার মায়া হয়, কিন্তু মায়া করার কিছু আমার নেই।

সে বলে, আমি তােমাকে রেইপ করতে চাই। আমি বলি, পারবে না।। সে বলে, পারবাে, আমাকে পারতে হবে। আমি বলি, নপুংসকেরা পারে না। সে বলে, আমি তাে আগে পারতাম। আমি বলি, আমি পারতে দিতাম। সে বলে, এখনাে দাও। আমি বলি, আর কোনােদিন দেবাে না।

দেলােয়ার আবার শক্ত হওয়ার চেষ্টা করতে থাকে। সে আমাকে চুমাে খেতে চায়, আমি মুখ ফিরিয়ে নিই; সে আমার স্তনে চুমাে খেতে চায়, আমি উল্টে তার মুখের কাছের থেকে আমার স্তন সরিয়ে নিই; সে আমাকে নগ্ন করতে চায়, আমি দিই না, বাধা দিই, সে আমাকে নগ্ন করতে পারে না। | তার শক্ত হওয়া দরকার, সে নিজেকে ঘষতে থাকে আমার শরীরের সাথে, তার প্রত্যঙ্গটি সাড়া দেয় না, পচা মাংসের মতো পড়ে থাকে।

আমার মায়া হয়, এটিকে একদিন আমি দণ্ডের মতাে দৃঢ় আর স্বপ্নের মতাে কোমল করে তুলতাম, এটি মধ্যযুগের রাজার মতাে মুকুট পরে দেখা দিতাে, আজ ওটি ধ্বংসস্তুপ। যা একদিন আমার প্রেরণায় কবি হয়ে উঠতাে, তা এখন নর্দমার পচে যাওয়া শুয়ােরের লাশ। কিন্তু দেলােয়ার অদম্য, তাকে পারতে হবে, সে ঘষে ঘষে ক্লান্ত; হাত দিয়ে সে প্রত্যঙ্গটিকে জাগিয়ে তােলার চেষ্টা করে চলছে, প্রত্যঙ্গটি সাড়া দিচ্ছে না, বিকৃত হয়ে উঠছে তার মুখ, যন্ত্রণায় সে চিৎকার করে উঠছে থেকে থেকে।………..

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *