মানভঞ্জন – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

›› সম্পুর্ণ গল্প  

    উৎস  : -পরকীয়া প্রেম – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়  সম্পাদিত

প্রথম পরিচ্ছেদ

রমানাথ শীলের ত্রিতল অট্টালিকার সর্বোচ্চ তলের ঘরে গােপীনাথ শীলের স্ত্রী গিরিবালা বাস করে। শয়নকক্ষের দক্ষিণম্বারের সম্মুখে ফুলের টবে গুটিকতক বেলফুল এবং গােলাপফুলের গাছ, ছাতটি উচ্চ প্রাচীর দিয়া ঘেরা-বহির্দৃশ্য দেখিবার জন্য প্রাচীরের মাঝে মাঝে একটি করিয়া ইট পাঁক দেওয়া আছে। শােঝার ঘরে নানা কেশ এবং বিবেশবিশিষ্ট বিলাতি নারীমুক্তির বাঁধানাে এগ্রেভিং টাঙ্গানাে রহিয়াছে, কিন্তু প্রবেশদ্বারের সম্মুখবর্তী বৃহৎ আয়নার উপরে ষোড়শী গৃহস্বামিনীর যে প্রতিবিম্বটি পড়ে তাহা দেওয়ালের কোনাে ছবি অপেক্ষা সৌন্দর্যে ন্যুন নহে।

গিরিবালার সৌন্দর্য অকস্মাৎ আলােকরশ্মির ন্যায়, বিস্ময়ের ন্যায়, নিদ্রাভঙ্গ চেতনার ন্যায়, একেবারে চকিতে আসিয়া আঘাত করে এবং এক আঘাতে অভিভূত করিয়া দিতে পারে। তাহাকে দেখিলে মনে হয়, ইহাকে দেখিবার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। চারিদিকে এবং চিরকাল যেরূপ দেখিয়া আসিতেছি এ একেবারে হঠাৎ তাহা হইতে অনেক স্বতন্ত্র।

গিরিবালাও আপন লাবণোচ্ছাসে আপনি আদ্যোপান্ত রঞ্জিত হইয়া উঠিয়াছে, মদের ফেনা যেমন পাত্র ছাপিয়া পড়িয়া যায়, নবযৌবন এবং নবীন সৌন্দর্য তাহার সর্বাঙ্গে তেমনি ছাপিয়া পড়িয়া যাইতেছে। তাহার বসনে ভূষণে গমনে, তাহার বাহুর বিক্ষেপে, তাহার গ্রীবার ভঙ্গিতে, তাহার চঞ্চল চরণের উদ্দাম ছন্দে, নুপুরনিক্কণ, কক্ষণের কিঙ্কিণীতে, তরল হাস্য, ক্ষিপ্র ভাষায়, উজ্জ্বল কটাক্ষে একেবারে উজ্জ্বলভাবে উদবেলিত হইয়া উঠিতেছে।

আপন সর্বাঙ্গের এই উচ্ছলিত মদির রসে গিরিবালার একটা নেশা লাগিয়াছে। প্রায় দেখা যাইত, একখানি কোমল রঙিন বস্ত্রে আপনার পরিপুর্ণ দেহখানি জড়াইয়া সে ছাদের উপরে অকারণে চঞ্চল হইয়া বেড়াইতেছে। যেন মনের ভিতরকার কোনাে এক অশ্রুত অব্যক্ত সংগীতের তালে তালে তাহার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নৃত্য করিতে চাহিতেছে। আপনার অঙ্গকে নানা ভঙ্গিতে উৎক্ষিপ্ত বিক্ষিপ্ত প্রক্ষিপ্ত করিয়া তাহার যেন বিশেষ কী এক অনিন্দ আছে, সে যেন আপন সৌন্দর্যের নানা দিকে নানা ঢেউ তুলিয়া দিয়া সর্বাঙ্গের উত্তপ্ত রক্তস্রাতে অপুর্ব পুলক সহকারে বিচিত্র আঘাত প্রতিঘাত অনুভব করিতে থাকে। সে হঠাৎ গাছ হইতে পাতা ছিড়িয়া দক্ষিণ বাহু আকাশে তুলিয়া সেটা বাতাসে উড়াইয়া দেয়—অমনি তাহার বালা বাজিয়া উঠে, তাহার অঞ্চল বিবস্ত্র হইয়া পড়ে, তাহার সুললিত বাহুর ভঙ্গিটি পিঞ্জরমুক্ত অদৃশ্য পাখির মতাে অনন্তু আকাশের মেঘরাজের অভিমুখে উড়িয়া চলিয়া যায়। হঠাৎ সে টব হইতে একটা মাটির ঢেলা তুলিয়া অকারনে ছুড়িয়া ফেলিয়া দেয়, চরণাঙ্গুলির উপর ভর দিয়া উচ্চ হইয়া দাঁড়াইয়া প্রাচীরের ছিদ্র দিয়া বৃহৎ বহির্জগৎটা একবার চট করিয়া দেখিয়া লয় আবার ঘুরিয়া আচল ঘুরাইয়া চলিয়া আসে, আঁচিলের চাবির গোছা ঝিন ঝিন করিয়া বাজিয়া উঠে। হয়তাে আয়নার সম্মুখে গিয়া খোঁপা খুলিয়া ফেলিয়া অসময়ে চুল বাঁধিতে বসে, চুল বাঁধিবার দড়ি দিয়া কেশমুল বেষ্টন করিয়া সেই দড়ি কুন্তদন্তপুংতিতে দংশন করিয়া ধরে, দুই বাহু উর্ধ্বে তুলিয়া মস্তুকের পশ্চাতে চুলগুলিকে দৃঢ় আকর্ষণে কুন্ডলায়িত করে চুল বাঁধা শেষ করিয়া যখন হাতের সমস্ত কাজ ফুরাইয়া যায়—তখন সে আলস্যভরে কোমল বিছানার উপরে আপনাকে পত্রান্তরালচুত্য একটি জ্যোৎস্নালেখার মতো বিস্তির্ণ করিয়া দেয়।

তাহার সন্তানাদি নাই, ধনীগৃহে তাহার কোনাে কাজকর্মও নাই—সে কেবল নির্জনে প্রতিদিন আপনার মধ্যে আপনি সঞ্চিত হইয়া শেষকালে আপনাকে আর ধারণ করিয়া রাখিতে পারিতেছে না। স্বামী আছে, কিন্তু স্বামী তাহার আয়ত্তের মধ্যে নাই। গিরিবালা বাল্যকাল হইতে যৌবনে এমন পুর্ণবিকশিত হইয়া উঠিয়াও কেমন করিয়া তাহার স্বামীর চক্ষু এড়াইয়া গেছে।

বরঞ্চ বাল্যকালে সে তার স্বামীর আদর পাইয়াছিল। স্বামী তখন ইস্কুল পালাইয়া তাহার সুপ্ত অভিভাবকদিগকে বঞ্চনা করিয়া নির্জন মধ্যাহ্নে তাহার বালিকা স্ত্রীর সহিত প্রণয়ালাপ করিতে আসিত। এক বাড়িতে থাকিয়াও শৌখিন চিঠির কাগজে স্ত্রীর সহিত চিঠিপত্র লেখালিখি করিত। ইস্কুলের বিশেষ বন্ধুদিগকে সেই সমস্ত চিঠি দেখাইয়া গর্ব অনুভব করিত। তুচ্ছ এবং কল্পিত কারণে স্ত্রীর সহিত মান-অভিমানেরও অসদ্ভাব ছিল না।

এমন সময়ে বাপের মৃত্যুতে গােপীনাথ স্বয়ং বাড়ির কর্তা হইয়া উঠিল। কাছা কাঠের তক্তায় শীঘ্ন পোকা ধরে-কাচা বয়সে গােপীনাথ যখন স্বাধীন হইয়া উঠিল তখন অনেকগুলি জীবজন্তু তাহার স্কন্ধে বাসা করিল। তখন ক্রমে অন্তঃপুরে তাহার গতিবিধি হ্রাস হইয়া অন্যত্র প্রসারিত হইতে লাগিল।

দলপতিত্তের একটা উত্তেজনা আছে, মানুষের কাছে মানুষের নেশাটা অত্যম্ভ বেশি। অসংখ্য মনুষ্যৰ্জীবন এবং সুবিস্তীর্ণ ইতিহাসের উপর আপন প্রভাব বিস্তার করিবার প্রতি নেপােলিয়নের যে একটা প্রবল আকর্ষণ ছিল—একটি ছােটো বৈঠকখানার ছােটো কর্তাটিরও নিজের ক্ষুদ্র দলের নেশা অল্পতর পরিমাণে সেই একজাতীয়। সামান্য ইয়ার্কিবন্ধনে আপনার চারিদিকে একটা লক্ষ্মীছাড়া ইয়ারমন্ডলি সৃজন করিয়া তুলিলে তাহাদের উপর আধিপত্য এবং তাহাদের নিকট হইতে বাহবা লাভ করা একটা প্রচণ্ড উত্তেজনার কারণ হইয়া পাড়ায় ; সেজন্য অনেক লােক বিষয়নাশ, ঋণ, কলঙ্ক সমস্তই স্বীকার করিতে প্রস্তুত হয়।

গােপীনাথ তাহার ইয়ার-সম্প্রদায়ের অধ্যক্ষ হইয়া ভারি মাতিয়া উঠিল। সে প্রতিদিন ইয়ার্কির নব নব কীর্তি, নব নব গৌরবলাভ করিতে লাগিল। তাহার দলের লােক বলিতে লাগিল শ্যালকবর্গের মধ্যে ইয়ার্কিতে অদ্বিতীয় খ্যাতিলাভ করিল গােপীনাথ। সেই গর্ভে, সেই উত্তেজনায় অন্যান্য সমস্ত সুখদুঃখকর্তব্যের প্রতি অন্ধ হইয়া হতভাগ্য ব্যক্তিটি রাত্রিদিন আবর্তের মতো পাক খাইয়া বেড়াইতে লাগিল।

এদিকে জগজ্জয়ী রূপ লইয়া আপন আক্তঃপুরের প্রজাহীন রাজ্যে, শয়নগৃহের শুন্য সিংহাসনে গিরিবালা অধিষ্ঠান করিতে লাগিল। সে নিজে জানিত, বিধাতা তাহার হস্তে রাজদণ্ড দিয়াছেন—সে জানিত প্রাচীরের ছিদ্র দিয়া যে বৃহৎ, জগৎত্মনি দেখা যাইতেছে সেই জগৎটিকে সে কটাক্ষে জয় করিয়া আসিতে পারে—অথচ বিশ্বসংসারের মধ্যে একটি মানুষকেও সে বন্দী করিতে পারে নাই।

গিরিবালার একটি সুরসিকা দাসী আছে, তাহার নাম সুধো, অর্থাৎ সুধামুখী, সে গান গাহিত, নাচিত, ছড়া কাটিত, প্রভুপত্নীর রূপের ব্যাখ্যা করিত এবং অরসিকের হস্তে এমন রূপ নিস্ফল হইল বলিয়া আক্ষেপ করিত। গিরিবালার যখন-তখন এই সুধোকে নাহলে চলিত না। উলটিয়া পালটিয়া সে নিজের মুখের শ্রী, দেহের গঠন, বর্ণের উজ্জ্বলতা সম্বন্ধে বিস্তৃত সমালােচনা শুনিত ; মাঝে মাঝে তাহারা প্রতিবাদ করিত এবং পরম পুলকিত চিত্তে সুধােকে মিথ্যাবাদিনী চাটুভাষিণী বলিয়া গঞ্জনা করিতে ছাড়িত না। সুধো তখন শত শত শপথ সহকারে নিজের মতের অকৃত্রিমতা প্রমাণ করিতে বসিত, গিরিবালার পক্ষে তাহা বিশ্বাস করা নিতান্তু কঠিন হইত না।

সুধো গিরিবালাকে গান শুনাইত—“দাসখত দিলাম লিখে শ্রীচরণে’, এই গানের মধ্যে গিরিবালা নিজের অলঙ্কাঙ্কিত ‘অনিন্দ্যসুন্দর চরণপল্লবের স্তুব শুনিতে পাইত এবং একটি পদলুন্ঠিত দাসের ছবি তাহার কল্পনায় উদিত হইত—কিন্তু হায়, দুটি শ্রীচরণ মলের শব্দে শুন্য ছাতের উপরে আপন জয়গান ঝংকৃত করিয়া বেড়ায়, তবু কোনাে স্বেচ্ছাবিক্রীত ভক্ত আসিয়া দাসখত লিখিয়া দিয়া যায় না।

গােপীনাথ যাহাকে দাসখত লিখিয়া দিয়াছে তাহার নাম লবঙ্গ—সে থিয়েটারে অভিনয় করে—সে স্টেজের উপর, চমৎকার মুর্ছা জাইতে পারে—সে যখন সানুনাসিক কৃত্রিম কঁদুনির স্বরে হাপাইয়া হাঁপাইয়া টানিয়া টানিয়া আধ-অধি উচ্চারণে প্রাণনাথ ‘প্রাণেশ্বর’ করিয়া ডাক ছাড়িতে থাকে তখন পাতলা ধুতির উপর ওয়েস্টকোট পরা, ফুলমােজামণ্ডিত দর্শকমণ্ডলী এক্সেলেন্ট’ করিয়া উচ্ছ্বসিত হইয়া উঠে।

এই অভিনেত্রী লবঙ্গের অত্যাশ্চর্য ক্ষমতার কথা গিরিবালা ইতিপূর্বে অনেকবার তাহার স্বামীর মুখেই শুনিয়াছে। তখনাে তাহার স্বামী সম্পূর্ণরূপে পলাতক হয় নাই। তখন সে তাহার স্বামীর মােহাবস্থা না জানিয়াও মনে মনে অসুয়া অনুভব করিত। আর-কোনাে নারীর এমন কোনাে মনােরঞ্জিনী বিদ্যা আছে যাহা তাহার নাই ইহা সে সহ্য করিতে পারিত না। সাসূয় কৌতূহলে সে অনেকবার থিয়েটার দেখিতে যাইবার ইচ্ছা প্রকাশ করিত, কিন্তু কিছুতেই স্বামীর মত করিতে পারিত না।

অবশেষে সে একদিন টাকা দিয়া সুধাকে থিয়েটার দেখিতে পাঠাইয়া দিল; সুধো আসিয়া নাসা কুঞ্চিত করিয়া রামনাম-উচ্চারণ-পুর্বক অভিনেত্রীদিগের ললাটদেশে সম্মার্জনীয় ব্যবস্থা করিল—এবং তাহাদের কদর্য মূর্তা ও কৃত্রিম ভঙ্গিতে যে-সমস্থ পুরুষের অদ্বিরুচি জন্মে তাহাদের সম্বন্ধেও সেই একই রূপ বিধান স্থির করিল। শুনিয়া গিরিবালা বিশেষ আশ্বস্ত হইল।

কিন্তু যখন তাহার স্বামী বন্ধন ছিন্ন করিয়া গেল তখন তাহার মনে সংশয় উপস্থিত হইল। সুধাের কথায় অবিশ্বাস প্রকাশ করিলে সুধো গিরির গা ধুইয়া বারংবার কহিল, বস্ত্রাবৃত দন্ধকাষ্ট্রের মতো তাহার নীরস এবং কুৎসিত চেহারা। গিরি তাহার আকর্ষণী শক্তির কোনো কারণ নির্ণয় করিতে পারিল না এবং নিজের অভিমানে সাংঘাতিক আঘাতপ্রাপ্ত হইয়া জ্বলিতে লাগিল।

অবশেষে একদিন সন্ধ্যাবেলায় সুধােকে লইয়া গােপনে থিয়েটার দেখিতে গেল। নিষিদ্ধ কাজের উত্তেজনা বেশি। তাহার হৃৎপিণ্ডের মধ্যে যে-এক মুদ কম্পন উপস্থিত হইয়াছিল সেই কম্পনাবেগে এই আলােকময় লোকময় বাদ্যসংগীতমুখরিত দৃশ্যপটশােভিত বঙ্গভূমি তাহার চক্ষে দ্বিগুণ অপরূপতা ধারণ করিল। ‘তাহার সেই প্রাচীরবেষ্টিত নির্জন নিরানন্দ অন্তঃপুর হইতে এ কোন এক সুসজ্জিত সুন্দর উৎসবলােকের প্রান্তে আসিয়া উপস্থিত হইল। সমস্ত স্বপ্ন বলিয়া বােধ হইতে লাগিল।

সেদিন ‘মানভঞ্চন” অপেরা অভিনয় হইতেছে। কখন ঘন্টা বাজিল, বাদ্য থামিয়া গেল, চঞ্চল দর্শকগণ মুহূর্তে স্থির নিস্তব্ধ হইয়া বসিল, রঙ্গমঞ্চের সম্মুখবর্তী। আলােকমালা উজ্জ্বলতর হইয়া উঠিল, পট উঠিয়া গেল, একদল সুসজ্জিত নটী ব্রজ্রাঙ্গনা সাজিয়া সংগীতসহযােগে নৃত্য করিতে লাগিল, দর্শকগণের করতালি ও প্রশংসাবাদে নাট্যশালা থাকিয়া থাকিয়া ধ্বনিত কম্পিত হইয়া উঠিল, তখন গিরিবালার তরুণ দেহের রক্তলহরী উন্মাদনায় আলােড়িত হইতে লাগিল। সেই সংগীতের তানে, আলােক ও আভরণের ছটায় এবং সম্মিলিত প্রশংসাবানিতে সে ক্ষণকালের জন্য সমাজ সংসার সমস্তই বিস্মৃত হইয়া গেল ; মনে কহিল, এমন এক জায়গায় আসিয়াছে যেখানে বন্ধনমুক্ত সৌন্দর্যপূর্ণ স্বাধীনতার কোনাে বাধামাত্র নাই।

সুধো মাঝে মাঝে আসিয়া ভীতস্বরে কানে কানে বলে, “বউঠাকরুন, এই বেলা বাড়ি ফিরিয়া চলো ; দাদাবাবু জানিতে পারিলে রক্ষা থাকিবে না। গিরিবালা সে কথায় কর্ণপাত করে না। তাহার মনে এখন আর কিছুমাত্র ভয় নাই।

অভিনয় অনেক দূর অগ্রসর হইল। রাধার দুর্জয় মান হইয়াছে ; সে মানসাগরে কৃষ্ণ আর কিছুতেই থই পাইতেছে না ; কত অনুনয়বিনয় সাধাসাধি কাদাকাদি, কিছুতেই কিছু হয় না। তখন পরে গিরিবালার বক্ষ ফুলিতে লাগিল। কৃষ্ণের এই লাঞ্ছনায় সে যেন মনে মনে রাধা হইয়া নিজের অসীম প্রতাপ নিজে অনুভব করিতে লাগিল। কেহ তাহাকে কখনাে এমন করিয়া সাধে নাই; সে অবহেলিত অবমানিত পরিত্যক্ত স্ত্রী, কিন্তু তবু সে এক অপূর্ব মােহে স্থির করিল যে, এমন করিয়া নিষ্ঠুরভাবে কাদাইবার ক্ষমতা তাহারও আছে। সৌন্দর্যের যে কেমন দোর্দণ্ড প্রতাপ তা সে কানে শুনিয়াছে, অনুমান করিয়াচ্ছে মাত্র—আজ দীপের আলোকে, গানের সুরে, সুদৃশ্য রঙ্গমঞ্চের উপরে তাহা সুস্পষ্টরূপে প্রত্যক্ষ করিল। নেশায় তাহার সমস্তু মস্তিষ্ক ভরিয়া উঠিল।

অবশেষে যবনিকাপতন হইল, গ্যাসের আলাে ম্লান হইয়া আসিল, দর্শকগণ প্রস্থানের উপক্ৰম করিল ; গিরিবালা মন্ত্রমুগ্ধের মতাে বসিয়া রহিল। এখান হইতে উঠিয়া যে বাড়ি যাইতে হইবে এ কথা তাহার মনে ছিল না। সে ভাবিতেছিল অভিনয় বুঝি ফুরাইবে না, যবনিকা আবার উঠিবে। রাধিকার নিকট শ্রীকৃষ্ণের পরাভব, জগতে ইহা ছাড়া আর কোনাে বিষয় উপস্থিত নাই। সুধো কহিল, “বউঠাকরুন, কারাে কী, ওঠো, এখনি সমস্তু আলাে নিবাইয়া দিবে।

গিরিবালা গভীর রাত্রে আপন শয়নকক্ষে ফিরিয়া আসিল। কোণে একটি দীপ মিটমিট করিতেছে—ঘরে একটি লােক নাই, শব্দ নাই—গৃহপ্রান্তে নির্জন শষ্যার উপরে একটি পুরাতন মশারি বাতাসে অল্প অল্প দুলিতেছে ; তাহার প্রতিদিনের জগৎ অত্যন্ত বিশ্রী বিরস এবং তুচ্ছ বলিয়া ঠেকাতে লাগল। কোথায় সেই সৌন্দর্যময় আলােকময় সংগীতময় রাজ্জ্য—যেখানে সে আপনার সমস্ত মহিমা বিকীর্ণ করিয়া দিয়া জগতের কেন্দ্রস্থলে বিরাজ করিতে পারে—যেখানে সে অজ্ঞাত অজ্ঞাত তুচ্ছ সাধারণ নারীমাত্র নহে।

এখন হইতে সে প্রতি সপ্তাহেই থিয়েটারে যাইতে আরম্ভ করিল। কালক্রমে, তাহার সেই প্রথম মােহ অনেকটা পরিমাণে হ্রাস হইয়া আসিল—এখন সে নটনটীদের মুখের রঙচং, সৌন্দর্যের অভাব, অভিনয়ের কৃত্রিমতা সমস্তু দেখিতে পাইল। কিন্তু তবু তাহার নেশা ছুটিল না। রণসংগীত শুনিলে যােদ্ধার হৃদয় যেমন নাচিয়া উঠে, রঙ্গমঞ্চের পট উঠিয়া গেলেই তাহার বক্ষের মধ্যে সেইরূপ আন্দোলন উপস্থিত হইত। ঐ যে সমস্তু সংসার হইতে স্বতন্ত্র সুদৃশ্য সমুচ্চ সুন্দর বেদিকা স্বর্ণলোয় অঙ্কিত, চিত্রপট সজ্জিত, কাব্য এবং সংগীতের ইন্দ্রজালে মায়ামণ্ডিত, অসংখ্য মুগ্ধদৃষ্টির দ্বারা আক্রান্ত নেপথ্যভূমির গােপনতার দ্বারা অপুর্বরহস্যপ্রাপ্ত, উজ্জ্বল আলােকমালায় সর্বসমক্ষে প্রকাশিত—বিশ্ববিজয়িনী সৌন্দর্যরাজীর পক্ষে এমন মায়াসিংহাসন আর কোথায় আছে।

প্রথম যেদিন সে তাহার স্বামীকে রঙ্গভূমিতে উপস্থিত দেখিল, এবং যখন গােপীনাথ কোনাে নটীর অভিনয়ে উন্মত্ত উচ্ছ্বাস প্রকাশ করিতে লাগিল, তখন স্বামীর প্রতি তাহার মনে প্রবল অবজ্ঞার উদয় হইল। সে জর্জরিত চিত্তে মনে করিল, যদি কখনাে এমন দিন আসে যে, তাহার স্বামী তাহার রূপে আকৃষ্ট হইয়া দগ্ধপক্ষ পতঙ্গের মতাে তাহার পদতলে আসিয়া পড়ে, এবং সে আপন চরনখরের প্রান্ত হইতে উপেক্ষা বিকীর্ণ করিয়া দিয়া অভিমানঘরে চলিয়া যাইতে পারে, তবেই তাহার এই ব্যর্থ রূপ ব্যর্থ যৌবন সার্থকতা লাভ করিবে।

কিন্তু সে শুভদিন আসিল কই। আজকাল গােপীনাথের দর্শন পাওয়া দূর্লভ হইয়াছে। সে আপন প্রমত্ততার ঝড়ের মুখে ধূলিধ্বজের মতাে একটা দল পাকাইয়া ঘুরিতে ঘুরিতে কোথায় চলিয়া গিয়াছে তাহার আর ঠিকানা নাই।

একদিন চৈত্রমাসের বাসন্তী পূর্ণিমায় গিরিবালা বাসীরঙের কাপড় পরিয়া দক্ষিণ বাতাসে অঞ্চল উড়াইয়া ছাদের উপর বসিয়াছিল। যদিও ঘরে স্বামী আসে না তবু গিরি উলটিয়া পালটিয়া প্রতিদিন বদল করিয়া নুতন নুতুন গহনায় আপনাকে সুসজ্জিত করিয়া তুলিত। হীরামুকুতার আভরণ তাহার অংগে প্রত্যঙ্গে একটি উন্মাদনা-সঞ্চার করিত—ঝলমল করিয়া, রুনুঝুনি বাজিয়া তাহার চারিদিকে একটি হিল্লোল তুলিতে থাকিত। আজ সে হাতে বাজুবন্ধ এবং গলায় একটি চুনি ও মুক্তার কষ্ঠী পরিয়াছে এবং বামহস্তের কনিষ্ঠ অঙ্গুলিতে একটি নীলার আংটি দিয়াছে। সুধো পায়ের কাছে বসিয়া মাঝে মাঝে তাহার নিটোল কোমল রক্তাৎপলপদপল্লবে হাত বুলাইতেছিল, এবং অকৃত্রিম উচ্ছাসের সহিত বলিতেছিল, ‘আহা বউঠাকরুন, আমি যদি পুরুষমানুষ হইতাম তাহা হইলে এই পা দুখানি বুকে লইয়া মরিতাম।’ গিরিবালা সম্পর্বে হাসিয়া উত্তর দিতেছিল, ‘বােধ করি বুকে না লইয়াই মরিতে হইত—তখন কি আর এমন করিয়া পা ছড়াইয়া দিতাম। আর বকিস নে। তুই সেই গানটা গা।

সুবাে সেই জ্যেত্নিাপ্লাবিত নির্জন ছাদের উপর গাহিতে লাগিল—

দাসখত দিলেম লিখে শ্রীচরণে,
সকলে সাক্ষী থাকুক বৃন্দাবনে।

তখন রাত্রি দশটা। বাড়ির আর সকলে আহারাদি সমাধা করিয়া ঘুমাইতে পিয়াছে। এমন সময় আতর মাখিয়া, উড়ালি উড়াইয়া হঠাৎ গােপীনাথ আসিয়া উপস্থিত হইল। সুধো অনেকখানি জিভ কাটিয়া সাত হাত ঘােমটা টানিয়া উর্ব্ধশ্বাসে পলায়ন করিল।

গিরিবালা ভাবিল, তাহার দিন আসিয়াছে। সে মুখ তুলিয়া চাহিল না। সে রাধিকার মতাে গুরুমানভরে অটল হইয়া বসিয়া রহিল। কিন্তু দৃশপট উঠিল না, শিখিপুচ্ছচুড়া পায়ের কাছে লুটাইল না। কেহু কাফি রাগিণীতে গাহিয়া উঠিল না  ‘কেন পূর্ণিমা আঁধার কর লুকায়ে বদনশশী’। সংগীতহীন নীরসকন্ঠে গােপীনাথ বলিল, “একবার চাবিটা দাও দেখি।’

এমন জ্যোৎস্নায়, এমন বসন্তে, এতদিনের বিচ্ছেদের পরে এই কি প্রথম সম্ভাষণ। কাব্যে নাটকে উপন্যাসে যাহা লেখে তাহার আগাগোড়ায়ই মিথ্যা কথা। অভিনয়মঞ্চেই প্রণয়ী গান গাহিয়া পায়ে আসিয়া লুটাইয়া পড়ে এবং তাহাই দেখিয়া যে দর্শকের চিত্ত বিগলিত হইয়া যায় সেই লোকটি বসন্তনিশীথে গৃহছাদে আসিয়া আপন অনুপমা যুবতী স্ত্রীকে বলে, “ওগে, একবার চাৰিটা দাও দেখি।’ তাহাতে না আছে রাগিণী, না আছে প্রীতি, তাহাতে কোনাে মোহ নাই, মাধুর্য নাই-—তাহা অত্যন্ত অকিঞ্চিৎক্ষর।

এমন সময়ে দক্ষিণে বাতাস জগতের সমস্ত অপমানিত কবিত্বের মর্মান্তিক দীর্ঘনিঃশ্বাসের মতাে হু হু করিয়া বহিয়া গেল-টব-ভরা ফুটন্ত বেলফুলের গন্ধ ছাদময় ছড়াইয়া দিয়া গেল—গিরিবালার চুর্ণ অলক চোখে মুখে আসিয়া পড়িল এবং তার বাসাম্ভীরঙের সুগন্ধি আঁচল অধীরভাবে যেখানে সেখানে উড়িতে লাগিল। গিরিবালা সমস্তু মান বিসর্জন দিয়া উঠিয়া পড়িল।

স্বামীর হাত ধরিয়া বলিল, “চাবি দিব এখন, তুমি ঘরে চলাে।’ আজ সে কঁদিবে কাদাইবে, তাহাতে সমস্ত নির্জন কল্পনাকে সার্থক করিবে, তাহার সমস্ত ব্ৰহ্মাস্ত্র বাহির করিয়া বিজয়ী হইবে, ইহা সে দৃঢ় সংকল্প করিয়াছে।

গােপীনাথ কহিল, “আমি বেশি দেরি করিতে পারিব না, তুমি চাবি দাও।”

গিরিবালা কহিল, ‘আমি চাবি দিব এবং চাবির মধ্যে যাহা-কিছু আছে সমস্তু দিব—কিন্তু আজ রাত্রে তুমি কোথাও যাইতে পারিবে না।’

গােপীনাথ বলিল, ‘সে হইবে না। আমার বিশেষ দরকার আছে। গিরিবালা বলিল, “তবে আমি চাবি দিব না।’

গােপী বলিল, ‘দিবে না বৈকি। কেমন না দাও দেখিব।’ বলিয়া সে গিরিবালার আঁচলে দেখিল, চাবি নাই। ঘরের মধ্যে ঢুকিয়া তাহার আয়নার বাক্সর দেরাজ খুলিয়া দেখিল, তাহার মধ্যেও চাবি নাই। তাহার চুল বাঁধিবার বাক্স জোর করিয়া ভাঙিয়া খুলিল—তাহাতে কাজললতা, সিদুরের কৌটা, চুলের দড়ি প্রভৃতি বিচিত্র উপকরণ আছে ; চাবি নাই। তখন সে বিছানা ঘাটিয়া, গদি উঠাইয়া, আলমারি ভাঙিয়া নাস্তানাবুদ করিয়া তুলিল। গিরিবালা প্রস্তুরমুর্তির মতাে শক্ত হইয়া, দরজা ধরিয়া, ছাদের দিকে চাহিয়া দাঁড়াইয়া রহিল। ব্যর্থমনােরথ গােপীনাথ রাগে গরগর করিতে করিতে আসিয়া বলিল, “চাবি দাও বলিতেছি, নহিলে ভালো হইবে না।’ গিরিবালা উত্তরমাত্ৰ দিল না। তখন গােপী তাহাকে চাপিয়া ধরিল এবং তাহার হাত হইতে বাজুবন্ধ গলা হইতে কষ্ঠী, অঙ্গুলি হইতে আংটি ছিনিয়া লইয়া তাহাকে লাথি মারিয়া চলিয়া গেল।

বাড়ির কাহারও নিদ্রাভঙ্গ হইল না, পল্লীর কেহ কিছুই জানিতে পারিল না, জ্যোৎস্নারাত্রি তেমনি নিস্তব্ধ হইয়া রহিল, সৰ্ব্বত্র যেন অখণ্ড শান্তি বিরাজ করিতেছে। কিন্তু অন্তুরের চীৎকারধ্বনি যদি বাহিরে শুনা যাইত, তবে সেই চৈত্রমাসের সুখসুপ্ত জ্যোৎস্লানিশীথিনী অকস্মাৎ তীব্রতম আর্তস্বরে দীর্ণ বিদীর্ণ হইয়া যাইত। এমন সম্পূর্ণ নিঃশব্দে এমন হৃদয়বিদারক ব্যাপার ঘটিয়া থাকে।

অথচ সে রাত্রিও কাটিয়া গেল। এমন পরাভব, এত অপমান গিরিবালা সুধাের কাছেও বলিতে পারিল না। মনে করিল, ‘আত্মহত্যা করিয়া এই অতুল রুপযৌবন নিজের হাতে খণ্ড খণ্ড করিয়া ভাঙিয়া ফেলিয়া, সে আপন অনাদরের প্রতিশোধ লইবে। কিন্তু তখনি মনে পড়িল, তাহাতে কাহারও কিছু আসিবে যাইবে না; পৃথিবীর যে কতখানি ক্ষতি হইবে তাহা কেহু অনুভব করিবে না। জীবনেও কোনাে সুখ নাই, মৃত্যুতেও কোনাে সান্ত্বনা নাই।

গিরিবালা বলিল, “আমি বাপের বাড়ি চলিলাম। তাহার বাপের বাড়ি কলিকাতা হইতে দূরে। সকলে নিষেধ করিল; কিন্তু বাড়ির কর্তা নিষেধও শুনিল না, কাহাকে সঙ্গেও লইল না। এ দিকে গােপীনাথও সদলবলে নৌকাবিহারে কতদিনের জন্য কোথায় চলিয়া গিয়াছে কে জানে না।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

গান্ধর্ব থিয়েটারে গােপীনাথ প্রায় প্রত্যেক অভিনয়েই উপস্থিত থাকিত। সেখানে মনােরমা’ নাটকে লবঙ্গ মনােরমা সাজিত এবং গােপীনাথ সদলে সম্মুখের সারে বসিয়া তাহাকে উচ্চঃস্বরে বাহবা দিত এবং স্টেজের উপর তােড়া ছুড়িয়া ফেলিত। মাঝে মাঝে এক-একদিন গােলমাল করিয়া দর্শকদের অত্যন্ত বিরক্তিভাজন হইত। তথাপি রঙ্গভূমির অধ্যক্ষগণ তাহাকে কখনাে নিষেধ করিতে সাহস করে নাই।

অবশেষে একদিন গােপীনাথ কিঞ্চিৎ মত্তাবস্থায় গ্রীন রুমের মধ্যে প্রবেশ করিয়া ভারি গােল বাধাইয়া দিল। কী এক সামান্য কাল্পনিক কারণে সে আপনাকে অপমানিত জ্ঞান করিয়া কোনাে নটীকে গুরুতর প্রহার করিল। তাহার চীৎকারে এবং গােপীনাথের গালিবর্ষণে সমস্ত নাট্যশালা চকিত হইয়া উঠিল। 

সেদিন অধ্যক্ষগণ আর সহ্য করিতে না পারিয়া গােপীনাথকে পুলিসের সাহায্যে বাহির করিয়া দেয়।

গােপীনাথ এই অপমানের প্রতিশােধ লইতে কৃতনিশ্চয় হইল। থিয়েটারওয়ালারা পুজার একমাস পুর্ব হইতে নুতন নাটক ‘মনােরমা’র অভিনয় খুব আড়ম্বর সহকারে ঘােষণা করিয়াছে। বিজ্ঞাপনের দ্বারা কলিকাতা শহরটাকে কাগজে মুড়িয়া ফেলিয়াছে ; রাজধানীকে যেন সেই বিখ্যাত গ্রন্থকারের নামাঙ্কিত নামাবলী পরাইয়া দিয়াছে।

এমন সময় গােপীনাথ তাহাদের প্রধান অভিনেত্রী লবঙ্গকে লইয়া বােটে চড়িয়া কোথায় অন্তর্ধান হইল তাহার আর সন্ধান পাওয়া গেল না।

থিয়েটারওয়ালারা হঠাৎ অকূলপাথারে পড়িয়া গেল। কিছুদিন লবঙ্গের জন্য অপেক্ষা করিয়া অবশেষে এক নূতন অভিনেত্রীকে মনােরমার অংশ অভ্যাস করাইয়া লইল ; তাহাতে তাহাদের অভিনয়ের সময় পিছাইয়া গেল। 

কিন্তু বিশেষ ক্ষতি হইল না। অভিনস্থলে দর্শক আর ধরে না। শত শত লােক দ্বার হইতে ফিরিয়া যায়। কাগজেও প্রশংসার সীমা নাই।।

সে প্রশংসা দূরদেশে গােপীনাথের কানে গেল। সে আর থাকিতে পারিল না। বিদ্বেষে এক কৌতুহলে পুর্ণ হইয়া সে অভিনয় দেখিতে আসিল।

প্রথম পট-উৎক্ষেপে অভিনয়ের আরম্বভাগে মনােরমা দীনহীনবেশে দাসীর মতাে তাহার শ্বশুরবাড়িতে থাকে—প্রচ্ছন্ন বিনম্র সংকুচিতভাবে সে আপনার কাজকর্ম করে—তাহার মুখে কথা নাই, এবং তাহার মুখ ভালাে করিয়া দেখাই যায় না।

অভিনয়ের শেষাংশে মনােরমাকে পিতৃগৃহে পাঠাইয়া তাহার স্বামী অর্থলােভে কোনাে এক লক্ষপতির একমাত্র কন্যাকে বিবাহ করিতে উদ্যত হইয়াছে। বিবাহের পর বাসরঘরে যখন স্বামী নিরীক্ষণ করিয়া দেখিল, তখন দেখিতে পাইল—এও সেই মনােরমা, কেবল সেই দাসীবেশ নই। আজ সে রাজকন্যা সাজিয়াছে ‘তাহার নিরুপম সৌন্দর্য আস্থরণে, ঐশ্বর্যে মণ্ডিত হইয়া দশ দিকে বিকীর্ণ হইয়া পড়িতেছে। শিশুকালে মনােরমা তাহার ধনী পিতৃগৃহ হইতে অপহৃত হইয়া দরিদ্রের গৃহে পালিত হইয়াছে। বহুকাল পরে সম্প্রতি তার পিতা সেই সন্ধান পাইয়া কন্যাকে ঘরে আনাইয়া তাহার স্বামীর সহিত পুনরায় নূতন সমারোহে বিবাহ দিয়াছে।

তাহার পরে বাসরঘরে মানভঞ্জনের পালা আরম্ভ হইল। কিন্তু ইতিমধ্যে দর্শকমণ্ডলীর মধ্যে ভারি এক গােলমাল বাধিয়া উঠিল। মনােরমা যতক্ষণ মলিন দাসীবেশে ঘোমটা টানিয়া ছিল ততক্ষণে গােপীনাথ নিস্তব্ধ হইয়া দেখিতেছিল। কিন্তু যখন সে আভরণে ঝলমল করিয়া, রক্তাম্বর পরিয়া, মাথার ঘােমটা ঘুচাইয়া, রূপের তরঙ্গ তুলিয়া বাসরঘরে দাঁড়াইল এবং এক অনির্বচনীয় গর্বে গৌরবে গ্রীবা বঙ্কিম করিয়া সমস্তু দর্শকমণ্ডলীর প্রতি এবং বিশেষ করিয়া সম্মুখবর্তী গােপীনাথের প্রতি চকিত বিদ্যুতের ন্যায় অবজ্ঞাবজ্রপূর্ণ তীক্ষ কটাক্ষ নিক্ষেপ করিল—যখন সমস্তু দর্শকমণ্ডলীর চিত্ত উদবেলিত হইয়া প্রশংসার করতালিতে নাট্যস্থলী সুদীর্ঘকাল কম্পাদিত করিয়া তুলিতে লাগিল–এখন গােপীনাথ সহসা উঠিয়া দাঁড়াইয়া গিরিবালা’ গিরিবালা করিয়া চীৎকার করিয়া উঠিল। ছুটিয়া স্টেজের উপর লাফ দিয়া উঠিবার চেষ্টা করিল বাদকগণ তাহাকে ধরিয়া ফেলিল।

এই অকস্মাৎ রসভঙ্গে মর্মান্তিক ক্রুদ্ধ হইয়া দর্শকগণ ইংরেজিতে বাংলায় ‘দুর করে দাও বের করে দাও” বলিয়া চীৎকার করিতে লাগিল।

গােপীনাথ পাগলের মতো ভগ্নকাষ্ঠে চীৎকার করিতে লাগিল, “আমি ওকে খুন করব, ওকে খুন করব।’

পুলিস আসিয়া গােপীনাথকে ধরিয়া টানিয়া বাহির করিয়া লইয়া গেল। সমস্ত কলিকাতা শহরের দর্শক দুই চক্ষু ভরিয়া গিরিবালার অভিনয় দেখিতে লাগিল, কেবল গােপীনাথ সেখানে স্থান পাইল না।

Please follow and like us:

One thought on “মানভঞ্জন – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *