প্রদোষে প্রাকৃতজন – শওকত আলী

›› উপন্যাসের অংশ বিশেষ  

……….অদূরে মেয়ে দুটি উচ্চ আলপথের উপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। লীলাবতীর কেশভার বিপুল। নদীতীরের বাতাসে তার শিথিল কবরী বিস্রস্ত হওয়ায় বারবার তাকে দুহাত তুলে কবরী বন্ধন করতে হচ্ছিলাে। আর ঐ সময়ই শ্যামাঙ্গ লক্ষ্য করে লীলাবতীর দেহসৌষ্ঠব অনিন্দ্য। সে একটি অপরূপ যক্ষিণী মূর্তি দেখেছিলাে সােমপুর মহাবিহারে। লীলাকে দেখে কৃষ্ণপ্রস্তরে নির্মিত পীবরস্তনী, বিপুলজঘনা, সুকেশী যক্ষিণী মূর্তিটি বারবার তার মানস চক্ষে স্পষ্ট হয়ে উঠলাে। এবং নিজ বক্ষের অনেক গােপনে কোথায় যেন সে বারবার শিহরিত হতে লাগলাে।………

……..বসন্তদাসের বিরক্তি লাগে প্রথমে। তারপর, পদযুগলে স্ত্রীর কোমল বক্ষস্পর্শ, অশ্রুসজল নয়ন এবং বাহু দু’টির সজোর আকর্ষণ তাকে কিঞ্চিৎ বিহ্বল করে দেয়। স্ত্রীকে সে দু’হাতে তুলে এনে শয্যায় বসায়।…….

………দৃষ্টিতে দেখছেন রূপবতী বধূটিকে। আহা কপালখানি যেন নবচন্দ্রিকা। ওষ্ঠ দু’টির তাে তুলনা হয় না—যদি হতাে, তাহলে বলা যেতাে কামকুসুম-আর গ্রীবাটি দেখাে, কী মসৃণ, বাহু দুখানি কেমন সুগােল—আর বক্ষোদেশ? অমনকি দেখেছেন কোথাও? না, মনে পড়ে না। | অমন রূপবতী যুবতী যদি বাহুপাশে বাঁধতে পারে নিজ পুরুষকে, তাহলে ধিক সে যুবতীকে।………

…….বস্ত্র ব্যবসায়ী অরদাস একেবারেই বয়স্য স্বভাবের। তার কৌতুকাদিতে বারণ থাকে যতাে উদ্ভট প্রসঙ্গ তার আলাপে। একদা জানতে চাইলাে, সখা বসন্ত, এদেশে রমণীদের বক্ষ স্তনশূন্য কেন বলতে পারাে?

কি অদ্ভুত কথা! স্তনশূন্য বক্ষ যার সে রমণী হবে কি প্রকারে? বােঝে সে, পীতাঙ্গী পার্বত্যজাতীয় রমণীদের কথা বলছে অঙ্কুরদাস।

সে জানায়, অত্রুরদাস, একবস্ত্রা ঐ রমণীদের বক্ষদেশে স্তন দুর্লক্ষ্য হলেও তাদের নারীতে সন্দেহ পােষণ করাে না—বিপদে পড়বে—রমণ রণে কিন্তু তারাই প্রথম আক্রমণ করে এবং পুরুষকে নিঃশেষিত না করে ত্যাগ করে না।……….

…….সে এক অদ্ভুত জগৎ। কুটিরে দ্বারে দ্বারে বাররমণীরা। ওষ্ঠ রক্তিম, কপােলে শঙ্খচূর্ণ এবং তদুপরি কুঙ্কুম বিন্দু। কঞ্চলিগুলি এতােই স্ফীত যে সন্দেহ হয় ভিতরে গােলাকার প্রস্তরখণ্ড বাঁধা। সে এমন কখনও দেখেনি। নিজ গ্রামে হাটের প্রান্তে কয়েকটি ডােম এবং হড়ডি কুটিরের কথা সে জানে, যেখানে কয়েকটি শিথিলশাসনা রমণী বাস করতাে। তারা এমন সাজসজ্জা করতাে না। অন্য দশটি রমণীর মতােই ছিলাে তাদের বেশবাস। জনরব ছিলাে যে তারা অর্থের বিনিময়ে দেহােপভােগ করতে দিতাে। কিন্তু এ যে দেখছে, একেবারেই অন্য রূপে যেমন, তেমন আকার প্রকারেও।

মাদকসেবী নাগরেরা যথেচ্ছ ব্যবহার করছিলাে। কেউ নীবিবন্ধন ছিন্ন করার কপট ভঙ্গি করছিলাে, কেউ মুখ চুম্বন করছিলাে, কেউবা অহেতুক চিল্কার করছিলাে। অক্রুরদাস একটি কুটিরের দ্বারদেশে উপনীত হয়ে বললাে, সখা, এখানে দাঁড়াও। অতঃপর কুটিরের রুদ্ধদ্বারে করাঘাত করলে ভিতর থেকে চিৎকার শােনা গেলাে। রমণীকণ্ঠ চিৎকার করে বলছে, রে কুকুরীপুত্র, রজ্জ্ব দিয়ে বেঁধে রাখ নিজেকে, আমার কুটিরে এখন লােক আছে।…..

…..অরদাস আসব পান করেছিলাে। তার তখন ঈষৎ মত্তাবস্থা। বললাে, কেন সখা, তােমার কি যুবতী রমণী অভিপ্রেত নয়? যদি বলাে, তাহলে কিশােরী অথবা বালিকা সন্ধান করি।

বসন্তদাস কি বলবে ভেবে পায় না। তবু বলে, অরদাস, তােমার ঘৃণা হবে না? যে রমণীকে ক্ষণমাত্র পূর্বে অন্য লােকে ব্যবহার করেছে তার কাছে যেতে তােমার রুচি হবে?

কেন হবে না? অল্রদাস বিভ্রান্ত দৃষ্টিতে বসন্তদাসের মুখপানে চায়। ক্রমে যেন বােঝে কথাটি। শেষে হা হা রবে হেসে ওঠে। বলে, তুমি হাসালে সখা, অন্যের উপগমনের চিহ্ন কি ঐ স্থানে খােদিত হয়ে থাকবে? বারেক ধৌত করে নিলেই হলাে।…….

……একজন বললাে, ওহে বালিকাটি বােধ হয় সত্যই সুভগা ছিলাে। অপরজন বললাে, আর ঐ যুবতীটি! নিতম্ব দু’টি যেন পূর্ণকুম্ভ। অন্য আরেকজন জানতে চাইলাে, ওহে এতাে বাক্যব্যয় যে করছাে, অগ্রে বলাে, তােমরা ঐ বালিকা এবং যুবতীটিকে কি শয্যায় পেয়েছিলে?

সখা, পাইনি, শূকরপুত্র সৈনিকেরা এমত তাড়না করলাে যে আমাদের পলায়ন করে উপায় রইলাে না—আহা, বালিকাটি এতাে কোমল—যদি একবারের জন্যও পেতাম।

আরে মর্কট, অন্য আর একজন ধিক্কার দিয়ে উঠলাে, ধিক তােকে যে, যুবা পুরুষ হয়েও বালিকা বালিকা করছিস। বালিকা রমণে আর এমন কি সুখ! পারঙ্গমা যুবতী রমণরণে স্বেদাক্ত হলে কেমন দেখায়, দেখেছিস কখনও?………

……..যুবতীটির মুখপানে দৃষ্টিপাত করা যায় না। স্বর্সন্তদাসের দৃষ্টি বার বার নত হয়ে আসছিলাে। দৃষ্টি যে লগ্ন হয়ে থাকতে চায়দ্বেয়ে, গ্রীবাদেশে, বক্ষে।…….

……….আমি তােমাকে চাই, অকপটে দাবি করে শ্যামাঙ্গ। আমাকে চাও, অর্থ কি আমার এই দেহটিকে চাও। দেহ পেলেই তােমার চলবে?
শ্যামাঙ্গ প্রমাদ গণনা করে। কী বলতে চায় এই নারী বলে, লীলা, বিশ্বাস করাে, আমি তােমাকে ভালােবাসি।
উত্তম কথা, ভালােবাসাে বলেই তাে আমকে ও তুমি, তাই না? তােমার কথা আমার কাছে দুর্বোধ্য নয়। বলাে, আমার এইদহটি চাও? যদি অতীব প্রয়ােজনীয় মনে করাে, তাহলে নাও।
এই কথা বলে সে উধ্বাঙ্গের বজ্রসারিত করলাে। শ্যামাঙ্গ দেখলাে তার গ্রীবা, সুগােল স্কন্ধ দু’টি, উন্নত ও মহিমান্বিত স্তন যুগল, ক্ষীণ কটিদেশ বলাে, আরও দেখতে চাও তাহলে নিম্নাঙ্গের বস্ত্রও আমি অপসারিত করি।……..

……….আহা রমণী এতাে সুন্দর হয়! এমন তাে পূর্বে কখনও দেখিনি। ঐ মুহূর্তে রমণী-কণ্ঠের মাদকতা তার কর্ণে মধুবর্ষণ করছিলাে। চন্দ্রালােকেও রমণীদের দেহরেখা অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছিলাে। সূক্ষ্ম চীনাংশুকে উর্ধ্বাঙ্গ আবৃত হলেও সুগােল স্কন্ধ, বঙ্কিম গ্রীবা, পীবরােন্নত বক্ষ, ক্ষীণ কটি, গুরু নিতম্ব, নিতম্ববেষ্টিত রত্নখচিত মেখলায় বিম্বিত চন্দ্রালোেক—সমস্তই সে দেখতে পাচ্ছিলাে। তার মনে হচ্ছিলাে, এরা কি রাজপ্রাসাদের কন্যা ও বধূ? নাকি স্বয়ং রাণী আর তার দুই সহচরী? সে কিঞ্চিৎ আবিষ্টও হয়ে পড়েছিলাে।………….

……….অর্থাৎ এতক্ষণে দেবীর পূর্ণ প্রকাশ ঘটলাে। দীপাধারের ঘৃত প্রদীপগুলি জ্বালিয়ে | দেওয়া হলাে। এখন আর আলােছায়ার বিভ্রম নয়। উজ্জ্বল আলােক লক্ষ্মীর দেহত্বকে বিচ্ছুরিত হচ্ছে—পরিপূর্ণ উরুদেশ, ক্ষীণ কটি, বিপুল নিতম্ব ও প্রমত্ত জঘন মানবী দেহে বিন্যস্ত হয়ে ক্রমে যেন দর্শকদের চোখের সম্মুখে একটি স্পর্শাতীত বাসনার মূর্তি হয়ে উঠলাে। দর্শকরা বিভ্রান্ত।…….

……..তৈলদীপ কখন নির্বাপিত হয়েছে জানে না। গভীর রাত্রে অনুভব করলাে একখানি কোমল হাত তার কেশ বিলুলিত করছে। সে নিন্দ্রার ভান করে রইলাে। এক সময় অনুভব হলাে, হাত নয়, দুটি ওষ্ঠ তার কপাল চুম্বন করছে। এবং ঐ মুহূর্তে সে দু’বাহুতে গলদেশ বেষ্টন করে নিজের মুখখানি লীলাবতীর পরিপূর্ণ বক্ষে নিমজ্জিত করলাে।………..

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *