…. একটু আদর করে নিল কাননবালা। শঙ্করী চলে যাবার সময় রাধারানিকে বলে গেল, আছরমে থাকবি খাবি, গোবিন্দসেবার জন্য নিজেরে তৈরি করবি, আজ থেকে কাননই তোর শুরু মা। পবনখ্যাপার কাছে গান শিখবি তুই।
সেই থেকে রাধারানি এই আশ্রমে রয়ে গেল। সেদিনের ছোট্ট মেয়েটা চোখের সামনে ডাগরটি হয়ে উঠল। বাউলতত্ত্বে সন্তানের জন্ম নিষিদ্ধ । ঊর্ধ্বচেতা যোগ। মিলন নেই তাই পিতৃবন্ধু মিলন হয় না। কাননবালা ভাই সন্তানের মা হতে পারেনি। অজান্তে রাধারানির উপর তিলতিল করে বাৎসল্যবোধ জমে উঠেছে। পবনবাউলের শয্যাসঙ্গিনী অনেকগুলোর বছর পবনের লালসার সঙ্গী হয়েছে। অনেক তত্ত্বকথা শিখেছে। গান বেঁধেছে তত্ত্ব দিয়ে। জীবনের অভিজ্ঞতার কাছে কোনও তত্ত্বকথা শিখেছে। গান বেঁধেছে তত্ত্ব দিয়ে। জীবনের অভিজ্ঞতার কাছে কোনও তত্ত্বকেই কাননবালা মেলাতে পাচ্ছে না। বাচ্চা মেয়েটা কাল থেকে পানের বিছানা দখল নেবে। কাননবালার জয়গা হবে আশ্রমের বারান্দায়। এটা ভাবতেই কাননের অন্তরাত্মা হাহাকার করে উঠছে। মাতৃরজার মিলন হয়।
বাউলের সঙ্গিনীর অভাব হয় না। এই বাংলার গরীব ঘরের অনেক কুমারী শিশুরা ছোটবেলা থেকেই মনেপ্রাণে গোঁসাঞি সেবার জন্য তৈরি হয়। পঞ্চাশ ষাট সত্তর বছরের গুরুবাদী বাউল গোঁসাঞিরা আট না শ বছরের শিশু মেয়েদের সংগ্রহ করে। পারিবারিক অভাব আর চলে আসা সাধনতত্ত্ব নামক ধর্মীয় সংস্কারের শিকার হয় এরা। প্রথম রজঃসলা হবার পর থেকেই গোসাঞিরা ধর্মের মোহমুদ্গর চালিয়ে অবাধে ব্যবহার করে। গরীব খেতমজুর ঘরের শিশু মেয়েদের বাপ-মা ধর্মীয় প্রবৃত্তি বোধে আশ্রমে পাঠিয়ে দেয়। কোনও কোনও বাউলগুরু গোসাঞিরা রসালো প্রেমতত্ত্বের মাখন মাখিয়ে ধর্মের নামে ব্যভিচার করে।
কাননবালার প্রথম কুমারী জীবন কেটেছে এরকম এক গোসাঞির তত্ত্বাবধানে। মন থেকে মুছে গেছে প্রকৃত মা-বাবার স্মৃতি। শুধু মনে পড়ে, ভুবনডাঙার আশ্রমে এক গাঁজাখোর সত্তরোর্ধ্ব ব্যভিচারি গোসাঞির কাছে মা এসে রেখে গিয়েছিল। সেই বৃদ্ধ বাউল সাধনতত্ত্বের নামে তাকে রাতের পর রাত অমানুষিক সাধনপ্রক্রিয়া চালিয়েছিল। সেই জনাই সে রাধারানিকে বুকের মধ্যে আগলে রেখেছিল। পবনবাউলের দৃষ্টি থেকে মেয়েটাকে রক্ষা করার জন্য কমবয়সি একটা। গোঁসাক্রির খোঁজ নিচ্ছিল। বিধি বিদ্রুপ করেছে। গত দু’মাস কাননবালার ছারাব বন্ধ হয়ে গেছে, পবনবাউল সেই সুযোগই কাজে লাগাল। বাউল সাধনায় নারী চাই। যে নারীর ছারাব বন্ধ বাউলের সাধনতত্ত্বে সে বিধবা। বাউল বিধবা রমণ করে না, কাননবালার দায়িত্ব গোসাঞিকে দ্বিতীয় কুমারী মেয়ের মেয়ে জোগাড় করার। ভোগের বিস্তর জোগাড় করেছে গ্রামবাসীরা। অনেকেই আশ্রমে এসে ভিড় জমিয়েছে মালাচন্দন অনুষ্ঠানটি দেখার জন্য। পবন খালি গায়ে সমস্ত কিছুর তারকি করছে। কেননা আশ্রমের প্রধান খেপি রাগে অভিমানে দায়িত্ব থেকে হাত গুটিয়ে রেখেছে। এটা ওটা হ্যাক ব্যাপারগুলো সামলাতে হচ্ছে। পরনের বয়সের গাছপাথর নেই। গাঁজা-টানা মেদবহুল একটা থলথলে চেহারা। সাল-চুললড়ি গোঁফের জঙ্গলে চোখগুলো ধানসেও উনুনের মতো জ্বলছে। ঘুরে ফিরে বারবার রাধারানির আশপাশ দিয়ে ঘুরঘুর করছে । করছে। গতমাসে রাধারানি রজঃসলা হয়েছে। গুরুমা বলেছে, ইবারে তুউ ওসাইবের অধিকার পেলি বটে। এই আনন্দের নেশায় রাধারানি মশগুল। শিশুমন দিয়ে আড়চোখে বারবার গোসাঞিকে দেখছে। চোখের রঙে মনটাও মেতে উঠেছে। পার্বতি আর মালতি বাইরের উঠোনে খে শিগল্পে মেতে উঠেছে। উনুনে চ্যালাকাঠ গুঁজতে গুঁজতে আড়চোখে গোঁসাঞিকে দেখছিল মালতি।
এই বুড়ো মানুষটার সঙ্গে বাচ্চা মেয়েটার কন্ঠি বদল হবে মন থেকে মেনে নিতে পারছে না। পার্বতিকে জিজ্ঞেস করল, ই গুসাইটোর বয়াস কী রকম হবাক বটে বুদি? পাৰ্বতি অনুমানে বলল, ষাট পারায়ে দেছেন ওসাই কবে গ। মালতির দ্বিতীয় কৌতূহল, বুড়ো গুসাই ছুট মেয়েটারে নিয়ে সাধনা করবে কী বলছ ?
—শুন গুসাই ঝেত বুড়া হবাক বটে তাতই দড় হব্যান গম চিনি পার্বতি রসালো উত্তর দিল। মালতি বালবিধবা। অনেক কিছুই জানে না। পার্বতি গল্পের ফাঁকে মজা করে বলে, শুনঅ ননদিনি, । মাইরেই মিছরি হয়েন বটে। চিনি জলেটো দিলে ত জল। সেই জলটোই মাইরে মাইরে মিছরির দানা হব্যান বটে। বুড়ো ওসাই হলো গে মিছরির দানার মত গ। সাধনভজনে দড় বটে। মালতি পার্বতির জানার বহরে অবাক হয়ে যায়। তুউ অনেক কিছু জানিস বুটে র্যা বউ। ইটা বুলতো মাসের ওই তিন দিনক টাতে বাউলগুসাইরা সাধনা করবে কেনে? পার্বতি জাত বৈষ্ণব ঘরের বউ। মন্ত্রশিক্ষা এবং দীক্ষা দুটোই পয়েছে। তাছাড়া বাউল বৈষ্ণব দুই সম্প্রদায়ই দেহতত্ত্বে এক। স্বামীর সহবাসের বাসের অভিজ্ঞতা আর গোঁসাঞিদের কাছে শোনা গুরুবাক্য মিশিয়ে বিধবা ননদিনিকে বলে, সময়টোতে সাধনার ফল পাওয়া যায়। সাধকের যেটা করতে হবেক উ ক’দিনেই। গিরহিদের জন্য আলাদা দিন। গ। সপ্তমী, অষ্টমী,নবমী গুসাইদের সাধনার দিন বটে। বলেই মালতির কানের কাছে মুখ নিয়ে ছড়া কাটে – প্রথম দিন গত হইলে দ্বিতীয় দিবসে / সম্ভোগ করিবে নায়ক মনের হরষে / ঋতুমতি বিলাস সতী দুই । দুই এক হবে / তাহলে নায়করতি ঊর্ধ্বে চালাইবে ।
এসব কথা কাননবালাও জানে। ভুবনডাঙার আশ্রমে কাননবালা প্রথম নারী হয়েছিল।
এই পর্যন্ত কাননবালা গুরুদেবকে মেনে নিয়েছে। মানতে পারছে না রাধারানির সুকুমার বৃত্তির উপর পাথর চাপিয়ে সাধনায় বসবেন তারই সাধনসঙ্গী গুরুদেব। সেই প্রতিবাদটাই করেছিল গতকাল রাত্তিরে। রাতের সেবার পর আশ্রমের অন্য সবাই যে যার জায়গায় শুয়ে পরেছে। । রাধারানি বাইরের বারান্দায় ঘুমিয়ে আছে। একা গুরুদেবকে পেয়েছিল পলক তখন রাধারানির গুরু কাননবালার ভাবে বিভোর। পুরোনোকে ছুড়ে ফেলে দিতে ব্যস্ত। ভয়ঙ্কর আক্রোশে গুরুদেবের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, রাধারানিরে মালাচন্দন করা চলবেনি গুসাই। আচমকা আক্রমণে পবন কিছুটা অগোছালো ভাবে জবাব দিল, রাগের বশে তুউ ধর্মের বিধানটো ভুলে যাচ্ছিস বটে কানন। কানন ছাড়ার জন্য মুখোমুখি দাঁড়ায়নি। বলল, বাউলতত্ত্বে এ তো আছে গুসাই আমাদের বন্ধ হলে উটা- বিশেষভাবে দেহ মিলনে জাগান যায় বটে। আপনি সাধক বটে। আত্মাকে জাগান আপনি। —কানন বাউল ধর্মে কুনঅ বিধবা রমণ হয় না। তুই ইখন বিধবা বটে। আমার এত বছরের সাধনা নষ্ট নাই করতে পারব বটে। কানন গর্জে
উঠল, গুরু ওসাইরা কয়ে গেছেন কেনে অকালবোধন হয়। তারা গান বেঁধেছে বটে, অন্ধকারে চাঁদের উদয় কে দেখবি আয়। আপনি বুলেন উ সব মিথ্যা। আপনারা গুসাইরা কেন বলেন রজঃ ধারণে রজকিনি চন্দ্র ধারনে চণ্ডীদাস।
আপনার এত বছরের সাধনা দে আমারে সধবা করে দিতে হবে বটেক। ছাড়ব নাই। পবনবাউল ভয়ঙ্করভাবে গর্জন করে উঠল। কাননবালাও ক্রোধান্ধ । আগুন নিক্ষিপ্ত করল কথায়। আপনি গুসাই নন কামুক ভণ্ড বটে। শুনেই কাননের চুলের মুঠি ধরে কয়েক ঘা বসিয়ে দিল পবন। চুলের মুঠি ধরে হ্যাঁচড়াতে হ্যাঁচড়াতে ঘর থেকে উঠোনে বের করে দিয়ে বলল, ই আছরমে ভুউর কুনঅ জায়গা নাই বটে। যা, যেখানে খুশি চড়ে খা বটেক। কানন উঠোন থেকে চিৎকার করে বলল, রাধারানিরে আপনি ছোঁবেন নাই বটেক। উকে আমি নষ্ট করতে নাই দিব।
চিৎকার চেঁচামেচিতে আশ্রমের সবাই জেগে উঠেছিল। । আধো তন্দ্রা আধো ঘুমের চটকা ভেঙে রাধারানির কানে শেষ কথাটা তিরের ফলার মতো বেঁধেছিল, রাধারানিরে আমি ছুঁতে নাই দিব। উকে আমি নষ্ট হতে নাই দিব বটে।…..
…..এখন গোধূলি সন্ধ্যা । ধূপদীপ সংকীর্তনে আখরা মুখর। ধর্মের মজাদার খোরাকের আনন্দ আস্বাদনে ব ভক্তরূপী কৌতূহলী। দু’চারজন মানুষ আশ্রমে ভিড় করেছে। রাধারানিকে এনে বসানো হয়েছে রাধাকৃষ্ণের ছবির সামনে তালপাতার আসনে। গলায় তার সাদা ফুলের মালা । এক এক করে অনেকগুলো জমা হয়েছে। নাকের উপর রসকলি শুকিয়ে জমাট বেঁধে আছে পরানো হয়েছে সাদাফুলের চূড়া।
পবন পরেছে গেরুয়া ডোর কৌপিন। মাথার চুড়ো করে ধস্মিন্ন বেঁধেছে। হাতে নিয়েছে একতারা আর গুপীযন্ত্র। চোখদুটেজা দীপের আলোতে ধক ধক করে জ্বলছে। রাধারানির পাশের আসনে এসে বসেছে। অন্য আশ্রম থেকে গোঁসাকি এসেছে মালাচন্দন করাবার জন্য। কানাইয়ের গাঁথা নি বা নিখুঁত তুলসির মালাদুটো একটি নারকেলের মালার মধ্যে রাখা হয়েছে। এবার শুভ অনুষ্ঠান শুরু হবে। আগুনের হলকার মতো ঘরে ঢুকল কাননবালা। চুলগুলো মুখের সাথের উপর ছড়িয়ে
একেবারে রণচণ্ডী রূপ। রাধারানির চুলের মুঠি ধরে ছিঁড়ে ফেলল গলার মালা, মাথার চূড়া। টেনে হিঁচড়ে আসন থেকে তুলে নিতে নিতে বলল, তৃউর মালাচন্দন করার খুব সাধ হয়েছে বটে। আয় ভুউকে যমের সঙ্গে মালাচন্দন করায়ে দিব। হতচ্ছাড়ি আবাগি। গুসাই সেবা এটাকে আমি জন্মের মতো করায়ে দিব বটেক। বলতে বলতে ঘর থেকে টেনে নিয়ে চলল উঠোনে। উঠোন থেকে টানতে টানতে রাস্তায়। কাননবালার হঠাৎ বস্ত্র আঘাতে সকলেই হতবাক। কী করা উচিত চ এই বোধটাই লোপ পেয়ে গেছে। পবন বাউল ঘটনার আকস্মিকতায় স্থানুর মতো নিজের আসনেই বসে রইল। …..
