মনটা কোনও সময়েই চৌকাঠবন্দি হয়ে থাকতে চায় না। সকল সময়েই সে যেন ঘরের বাইরে পা বাড়িয়েই আছে। অথচ এই আটপৌরে ঘরখানি ও আমার বড়ো প্রিয়, তবুও কে যেন পাঁজরের গোপন অন্ধকারে দূর দিগন্তের বাতাসের চামর বুলিয়ে দেয়। তখন আর থাকতে নারি প্রিয় গৃহকোণে! মন তখন যেন চিকন আকাশে উড়ন্ত ঘুড়ি। রইল পড়ে পলেস্তরা খসা চৌখুপি গৃহকোণের আরামপ্রদ আলিঙ্গন। তখন আমি উধাও, উষাও আকাশের পিঠ ছুঁয়ে ভাসমান সাদা মেঘের ভেলার মতো। এইরকম অনুভূতি আমার প্রায়ই হয়। শুধু অনুভূতিই হয় না, তা আমাকে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে। ঘরের কোণে একনাগাড়ে থিতু হতে দেয় না। বন্ধুজনেরা বলেন, তোর পায়ের তলায় সরষে আছে। হয়তো তাই কিছুদিন হল, একটা ধারাবাহিক লেখা সদ্য শেষ করেছি। শরীর জুড়ে যেন একরাশ ক্লান্তির ফল্গুস্রোত। সহজেই অনুমেয়, খানিক বিশ্রামের প্রয়োজন। কিন্তু ওই যে নাছোড় মন, সে তো আমাকে আলিশান হয়ে গৃহ্যাপন করতে দেবে না। তার মতিগতি, আমাকে ছুটিয়ে নিয়ে বেড়ানো। অতএব চলো। পথের ধুলোয় পা ডুবিয়ে মনটাকে নিরস্ত করি গে।
ক’দিন যাবৎই একটা চেনা ছবি দৃষ্টিপথের আগল খুলে বারবার দৃশ্যমান হচ্ছে। শুধু তাই নয়। হাতছানি দিয়ে ডাকছে। বলছে, এসো। অনেকদিন তো এদিক পানে আসোনি। একবারটি অন্তত এসো। …না এই ডাক উপেক্ষা করার সাধ্য আমার নেই। হৃৎপিণ্ডের অলিন্দ জুড়ে যেন দূরমনস্ক পাখির অফুরান আহবান। স্বগত সংলাপে অদৃশ্যমান কাউকে যেন জানিয়ে দিই, আমি আসছি। একটু প্রতীক্ষা কর। অন্তত একটা দিন।
…চোখের ইজেল ছুঁয়ে সেই পরিচিত প্রেক্ষিত। সেই চেনা জায়গা। প্রায় একইরকম তার ভঙ্গি। যদিও পরিবর্তনের বেমানান আর্চড় তার সর্বাঙ্গে প্রায় দগদগে ঘায়ের মতন দৃশ্যমান। অন্তত আমার চোখে। ধান মাঠ এখানে কথা বলতো। অনন্ত নীলিমার অন্ধকারে এখনও কি বলে? কে জানে! হয়তো সে এখন মূক কিংবা বধির কিংবা সাবলীলও হতে পারে।…. আমার মধ্য যৌবনের বেশ কিছু প্রহর এখানে অতিবাহিত হয়েছে। আজ আমি প্রবীণ। বয়সের বেলা। বেশ বেড়ে গিয়েছে। তবুও এখানে পা রাখার পর শরীরের ছিলায় যেন যৌবনের টান অনুভব করি। মনের গোপন প্রাঙ্গণে যেন একরাশ কৃষ্ণচূড়া তার নিজস্ব লালিমায় উকি দিয়ে যায়। পায়ে পায়ে কখন যে প্রণবেন্দুদের বাড়ির চৌকাঠে পা রেখেছি, ঠিক টের পাইনি। এই প্রণবেন্দুর সঙ্গেই আমার বন্ধুত্বটা এমন একটা পর্যায়ের স্তরে, যা বোধ করি কোনওদিন বিলীন হবে না। একমাত্র এরই সঙ্গে আমার যোগাযোগ অম্লান। সেই কবে চলে এসেছি, তবু আজও এই বন্ধুর সূত্রেই এই জায়গার সঙ্গে আমার বন্ধন নিটুট। কলিংবেলের সুইচে আঙুলের আলতো চাপ দিই। দরজা হাট করে খুলে যায়। -প্রদীপদা, ভাবতেই পারিনি তুমি আবার আসবে। তোমার ফোন পেয়ে অবধি….
প্রণবেন্দু তার সমস্ত হৃদয় দিয়ে আমাকে অমলিন সখ্যতায় জড়িয়ে ধরে। সত্যি এমন বন্ধু কোটিতে গোটাকতক মেলে কী না সন্দেহ।
-তা হঠাৎ কী মনে করে তোমার এই আগমন? কতবার যে তোমাকে আসার জন্য বলেছি।
-না, সেরকম কিছু নয়। তবে মনটা ক’দিনই খুব উদ্বেল হয়ে উঠেছিল এই জায়গাটার জন্যে।
– যাক, তবু ভালো।
কথায় কথায় বিকেল গড়িয়ে সন্ধের আঁধার নেমে আসে। কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর দুইবন্ধু পায়ে পায়ে বেরিয়ে পড়ি।… পরিবর্তনের হাজারো আঁচড়েও আমার এই প্রেক্ষিতভূমি যেন কোনও এক ক্ষেত্রপটে একইরকম আছে। সেখানে কোনও তথাকথিত আধুনিকতার আঁচড় পড়েনি। সেই খড়ি নদী এখনও বিপিনপুর শ্মশানের গা ছুঁয়ে প্রবহমান। দিগন্তবিসারি মাঠে ধানের সবুজ ঢেউ। অধুনা ঝা চকচকে বিউটি পার্লারের পাশে কেউনার সেই অবিকল খোঁড়োচালের আন্তরিক চায়ের দোকান। অবিশ্যি কেষ্টদা আজ বৃদ্ধ। মুখের চামড়ায় এখন তার অজস্র আঁকিবুকি। অথচ ঠোঁটের কোনায় আজও সেই স্নিগ্ধ হাসি। … সত্যি কেষ্টদা, তোমাদের আমি ভুলে যায়নি। দিনের কত প্রহর যে তোমার দোকানের ঠেকনা দেওয়া বেঞ্চিতে বসে যাপন করেছি। তার হিসেব নেই। আমাদের কত দৌরাত্ম্য যে তুমি হাসিমুখে সহ্য করেছ, তার তো প্রমাণ আমি নিজেই। তোমাকে তাই কুর্ণিশ। কুর্ণিশ গোপন হৃদয়ের। জি.টি. রোড ধরে এলোমেলো পায়ে এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াছি। সাঁজের আকাশে অজস্র তারার ভিড়। অনেক অনেকদিন পর নিজেকে বেশ নির্ভার লাগছে। স্মৃতির তটে ঘটে যাওয়া নানান ঘটনার সিম্ফনি তার সুরেলা মূর্ছনায় বারবার বেজে উঠছে। …ওই তো সেই বুক কর্নার, সাংস্কৃতিক আড্ডার আর একটি ঠেক। হৃৎপিণ্ডের ভিতর থেকে একটা প্রশ্ন পাঁজরের সিঁড়ি ভেঙে ঠোঁটের ডগায় এসে আলটপকা ঝরে পড়ে।
-এখনও কি ওখানে জমাটি আড্ডা হয়?
-না।
-সে কি? তার ধারাবাহিকতা
আর ধারাবাহিকতা! রতন যতদিন ছিল…..
রতন এখন কোথায়?
জামসেদপুরে। একটা চাকরি জুটিয়ে প্রায় বছর তিনেক আগে চলে গিয়েছে। তাছাড়া দোকানের মালিকানাও
-তাও বদল হয়ে গিয়েছে?
-হ্যাঁ।
মনটা বড়ো বিষণ্ণ হয়ে গেল। রতনের মুখটা যেন চোখের সামনে দুলছে। বুক কর্নারের কর্মচারী, এই ছিল তার পরিচয়। কিন্তু আদতে সে ছিল সাংস্কৃতিক মনোভাবাপন্ন এক যুবক। তারই দৌলতে আমাদের জমায়েত বা আড্ডা ওখানে ফুল স্যুইংয়ে চলত। আজ আর সেখানে কোনও ফুল ফোটে না। প্রবাহিত হয় না কোনও উন্মনা বাতাস। তবে চলতিপথে নানান নতুন পরিকাঠামোর পাশাপাশি চোখে পড়ে সেই দোতলা বিডিও অফিস, সেটেলমেন্ট অফিসের একফালি বারান্দা, আর গ্রামীণ ব্যাঙ্কের উল্টোদিকে সদ্য সাদা রঙের প্রলেপ দেওয়া জয়া সিনেমা হল। যাক তবুও তো কিছু অবশিষ্ট আছে। নতুন যুগ, নতুন সময় সবকিছুকে গ্রাস করতে পারেনি। সারা শরীরে কে যেন শান্তিজল ছিটিয়ে দেয়।
ফেরার পথে প্রণবেন্দুকে অস্ফুটে বলি, প্রণব, আমার একটা অনুরোধ রাখবে?
-বলো।
-আমি একবার কাজলের কাছে যেতে চাই। নিয়ে যাবে?
-কাজলের কাছে? প্রণবেন্দুর চোখে মুখে বিস্ময়ের বিদ্যুৎ ঝলক।
ওর কারণেই আমার এখানেই আসা।
-ঠিক আছে, তবে কাল গেলে হয় না? এখন তো ওদের পিক আওয়ারস। -না, না। আজই। তবে তোমার যদি অসুবিধে থাকে….
-নো অসুবিধে। আমিই যাব।
যথাসময়ে খাওয়াদাওয়ার পাট চুকিয়ে আমরা দুই বন্ধু বেরিয়ে পড়ি! কিন্তু তথাকথিত সংসারের চৌকাঠ ডিঙিয়ে কি অসময়ে বার হওয়া অত সহজ!
তাই পাশের গ্রাম পারাজের যাত্রানুষ্ঠানের কথা বলে চৌকাঠ ডিঙোতে হয়। ….সেই খাপরার চালে ছাওয়া সারিবদ্ধ ঘর। মাঝে চৌকোনা উঠোনের কেন্দ্রবিন্দুতে সেই পুরোনো ইদীরা। নোতুন সংযোজন একটা শুধু ডিপ টিউবওয়েল। বেশ কিছু ঘরের দরজা বন্ধ। তবে কয়েকটি ঘরের দুয়ারে উগ্রসাজে কয়েকজন মেয়ে দাঁড়িয়ে। আমি চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিই। প্রায় সবই একরকম। এমন কী সেই বাড়ালো বটগাছটা সরকারি পাটখেতের উত্তর পূর্ব কোণে একই রাজকীয় মহিমায় দাঁড়িয়ে। … আকাশে অবিশ্যি আজ নবমীর টালমাটাল চাঁদ তার হিম জ্যোৎস্না নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই অনুপস্থিত। কারণ আজ তো নবমী তিথি নয়। কিন্তু সংসারের প্রান্তসীমায় নিঃসঙ্গভাবে দাঁড়িয়ে থাকা বারাঙ্গনাদের এই পল্লিতে আজ হাজির হয়ে সেই কবেকার নবমী নিশির কথা আমার হৃদয় দোল খেয়েই চলেছে। সেই মেঠো সানাই, নাল, ক্ষয়াটে চেহারার হারমোনিয়াম আর ঢোল সহযোগে ‘সোহাগ চাঁদ বদনী ধ্বনি’র মাতাল সুরে কাজলের শরীরী নাচ, শিউলির প্রাণোচ্ছল রসিকতা আজ যেন কতদূরে। অথচ মনে হয়, এই তো সেদিন। মনে পড়ে, তরল পানীয় সেবনের পর আমিও কেমন অপট ছন্দে কাজলের সঙ্গে নৃত্যে সামিল হয়েছিলাম। ইতিমধ্যে কখন যে কাজল এসে আমার পাশে এক সমুদ্র-উচ্ছ্বাস নিয়ে দাঁড়িয়েছে, খেয়াল করিনি। ঘোর ভাঙলো তার কণ্ঠস্বরে।
কী লিপিড়িবাবু, এতোদিনে আমাকে মনে পড়লো?
– না কাজল এতোদিনে মনে পড়েনি। তুমি আমার মনের মধ্যেই আছো। -তা এতোদিন দেখা মেলেনি কেন?
সময় হয়নি তাই।
-মিছে কথা বাবু। এ তোমার একেবারে মিছে কথা।
কী করে বোঝাই আমার মিথুন প্রতিমাকে। আমার যে নিজস্ব সময় বলে কিছু নেই। যেটুকু অবসর পাই, ক্লান্ত হয়ে পড়ি। কিংবা পরবর্তী লেখার প্রস্তুতি নিতে হয়। ছা-পোষা লেখকদের খুড়ি কলমচিদের এমনই অবস্থা। তারা না হোমে না যজ্ঞে। অথচ পাতা ভরানোর বেলায় তারাই ছাই খেলতে ভাঙা কুলো।
-তা ঘরে চলো।
পা বাড়াই কাজলের ঘরের দিকে। অবশ্য কাজলের সেই ঘর এখন অন্যের দখলে। ওর ঘর এখন উঠোনের একেবারে শেষপ্রান্তে। ব্যবসাপত্তর থেকে নিজেকে অনেকদিনই সরিয়ে নিয়েছে সে। এখন শুধু এখানে দায়িত্ববোধের ফ্রেমবন্দি হয়ে দিন গুজরান করা। অথচ এইসব পল্লির মাসি বলতে যে ছবি সচরাচর আমাদের চোখে সামনে ভেসে ওঠে তার কণামাত্র ওর মধ্যে নেই। কবেকার সেই দেখা সহজ এবং সরলতার এখনও সে যেন প্রতিভূ। প্রণবেন্দু তার স্বভাবমতো কোন ফাঁকে কখন যে নিজেকে এখান থেকে সরিয়ে নিয়েছে, টের পায়নি।
এত অল্প সময়ের মধ্যে আপ্যায়নের এতটুকু ত্রুটি রাখেনি কাজল। আমি অবাক মানি ওদের আতিথেয়তার বহরে। অগত্যা রামপাখির কয়েক টুকরো মাংস আর তিনপেগ রাম সেবনে ওরা ধন্য হয়। ঘর ক্রমশ ফাঁকা হয়ে আসে। মুখোমুখি শুধু আমি আর কাজল। নদীর বহতা স্রোতের মতো সহজ ছন্দেই প্রশ্ন আলটপকা ভেসে আসে, কেমন আছো কাজল ?
– আর আছি! প্রাণপাখি কবে যে পিঁজরা থেকে বার হবে?
-কেন, তোমার আর বাঁচতে ইচ্ছে করে না? -না বাবু, অনেক কাল তো হল। আর বাঁচার ইচ্ছে নেই। আমি কাজলের দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাই। সেই চোখ, সেই ঠোঁট, দেহের সেই অপার চপল ভঙ্গিমা। অথচ কোথায় যেন একটা ভাঙন। ভাঙনের ঠুনকো রেখা। আমি কাজলকে আশ্লেষে আলিঙ্গন করি। ওর অধরোষ্ঠ ডুবিয়ে দিই। আমার ঠোঁট। স্বগত সংলাপে উচ্চারণ করি, কাজল তুমি আমার মিথুন প্রতিমা। যৌনতার সাবলীল পাঠ তুমি আমাকে প্রথম দিয়েছ। তোমায় ভুলি কেমনে।
পুরগামী একটি ট্রেনের শব্দে আমার ঘোর কেটে যায়। চোখ মেলে দেখি, কাজলের চোখে জল। জলের নীরব রেখা। বিদায়বেলায় কথা দিই, আমি আবার আসব কাজল। আবার। তুমি অন্তত… আর কথা সরে না। জিভটা যেন হঠাৎ বোবা হয়ে যায়। একগলা বাষ্প গলার অন্ধকারে কখন যে আটকে গিয়েছে, খেয়াল করিনি।
