কনক স্নান ভালোবাসে। আর ভালোবাসে জল। বাঁধাধরা মাপ ছাড়া জল। সেই সাতসকালে যখন চটা ওঠা টিনের বালতিটা টেনে টেনে দু কামরার ভাড়ার ঘর দুটো মোছে, সেই তখন থেকে মাথায় ইকির মিকির করে টলটলে জল, বড়ো কাঁঠাল গাছটার ছায়া পড়ে ঠান্ডা কালো গভীর জল!
ইকির মিকির তো শুধু একরকম না, তার ঘরে ঘটা না থাক ল্যাঠা আছে ঢের। উনুনে আঁচ পড়বে, ছোটো দরমা দিয়ে দাওয়ার একপাশ ঘিরে ওই কাজ চালানো রান্নাঘর তার। স্টিলের ছোটো পেটমোটা গ্লাসে আগুন গরম গুড়ের চা আঁচলে জড়িয়ে নিয়ে গিয়ে সাধনকে ডাকতে লাগে। চোখ দুটো গিয়ে মেজাজ তার তিরিক্ষে হয়েই থাকে। তারপর এক এক করে তার প্রাকৃতিক কাজকর্ম সারা, সাফ সুতরো….
চারদিক টিন দিয়ে ঘিরে মাথাটা খোলা। অল্প জায়গা প্রাকৃতিক কাজ কর্ম সারবার। স্নানের আলাদা ঘর নেই, তবে একটা পাতকুয়ো আছে। তার জলও মন্দ না, সেই জলই খায় তারা। সেটা অবশ্য ঠিক কনকের আকর্ষণের জায়গা নয়! ঝপ ঝপ করে দু তিন বালতি জল তুলে সাধনের স্নানের জোগাড় করে দিয়ে কনকের হাত একটু খালি হয়। কিন্তু ততক্ষণে রোদের তাপ ওঠে বেড়ে। ঘাড়ে, গলায়, বগলতলিতে এসে জমে বিন্দু বিন্দু ঘাম। কনকের ঠান্ডা জল মনে হলেই শরীরে একটা মৃদু ঝাঁকুনি লাগে, তার স্নান চাই, স্নান…
টালির ছাদের এই ঘরটার চারপাশে গাছপালা বিস্তর। সরসর করে গিরগিটি সরে যায়, গাব গাছটার কাছে কাঠপিঁপড়ের বাসা। তার তোলা উনুনের কাছে উঠোনে রাজ্যের ঝরা পাতা এসে জমে। তাতে শুকনো দুপুরের হাওয়া পাক খেয়ে ছোটো ছোটো ঘূর্ণি ওঠে। এসবে অবশ্য কনক কিছু মনে করে না। ভাত ফোটে গবগব করে, সে হাঁড়ির ঢাকনা সরিয়ে একটা ভাত টিপে দেখে আবার হাঁড়িতে ফেলে দেয় আনমনে। কাঠকুটোর আঁচে তার শ্যামলা মুখে লালের ছোপ এসে লাগে। কখনো ফুটন্ত ভাতে ফেলে দেয় দুটো আলু কি ঘরের হাঁসের ডিম। আর এইসময় করে জেলে বউ রোজই একবার হাঁক পাড়ে…
বলতে নেই কনক স্নানের মত মাছও ভালোবাসে। সধবা মানুষ সে, মাছ ছাড়া তার চলে না। সাধনের কেমিকাল কারখানায় কাজ করতে ওরা থাকতো শহরতলীতে। সে বেশ জমজমাট! তা অম্বিকা কেমিকালে কাজ করতে করতে দুর্ঘটনায় চোখ দুটো গেলেও লাভ মোটমাট কিছু হয়নি। মালিক অল্প কিছু টাকা আর ঢের খানিক মিষ্টি কথা ধরিয়ে মানে মানে জবাব দিয়েছিল।
এই জায়গাটা বেশ গাঁ গঞ্জ মত, বাড়িটা তো প্রায় পাওয়া গিয়েছে জলের দরে। বুড়ো বাপ মনে করে জমি থেকে সম্বৎসরের কিছু ধান আলু পিঁয়াজ যোগায় এখনও কিছু কাঁচা টাকা! বরাত পেলে কিছু বড়ি, আচার যোগান দেয় সে নিজেও। অল্প কটা হাঁস মুরগি পালছে আজকাল জেলে বউয়ের বুদ্ধিতে। একটা ছাগল পোষার ইচ্ছে। টাকা জমাচ্ছে টুকটুক করে। তা চলে যাচ্ছে দিন এরকম করে, মন্দ কী!
শাকের আঁটি থেকে কিছু শুকনো ডাল বেছে ফেলে দিল, কিছু খামখেয়ালি নিঃশ্বাস। একবার করে আনমনা লাগছে, জেলে বউ আসেনি আজ। আসবে না হয়ত। ওর মরদ মাঝে সাঝে ধেনো পচাই খেয়ে এসে হল্লা করে, দেয় দু ঘা বসিয়ে নেশার ঘোরে। তার পরদিন আসেনা জেলে বউ, তারও পরের দিন ট্যাংরা কি পুঁটি কোঁচড়ে করে এনে ফিঁচফিচ করে কাঁদে, পিঠের কাপড় সরিয়ে কালসিটে দেখায়। আবার তারও দিন দুই পর নতুন লাল শাঁখা বা একজোড়া ঝুটো
কানের গয়না কি কালো সবুজ কাঁচের চুড়ি দেখিয়ে হেসে গড়িয়ে পড়ে তার দাওয়ায়৷
আচ্ছা সে কি মন্দ আছে? হ্যাঁ শহরতলী থাকতে টিরেনে চেপে শহর দেখেছে সে। ফিলিমও কি দু চারটে দেখেনি? সাধনের সেরা পছন্দ ছিলো শ্রীদেবী৷ কি ফিট ফর্সা মেয়েমানুষ গো৷ তখন রাতে সাধন তার লাল খড়কে ডুরে শাড়ির আঁচল সরাতে সরাতে বলত,
“একদিন ওরম ফিকে সবুজ শাড়ী পরিস দিকিনি, আর মাথা ঘষবি জানছিস, আর নতুন যে গন্ধটা কিনে দিনু মাখবি, দেখিস কাঁচের শিশি ভেঙে ফেলিস না, বেজায় দাম ওগুলোর আহ্ চুপ কর, কবুতরের মত ছটফটাস কেন দেখতে দে৷ বেশি লজ্জা দেখাস না ছুঁড়ি, জ্বলুক আলোটা চুপ…” আলোর সাথে লোকটার চোখটাও ধকধক করে জ্বলত যেন। তারপর তাকে পুতুলের মত ওঠাত, বসাত, এক ধাক্কায় চিৎ করে শুইয়ে দিত মানুষটা। একসময় দ্রুত ফুরিয়ে আসতে আসতে চোখ বুজে তার কাঁধ বিছানায় পিষে দিয়ে ফিসফিস করে বলত- “ওহ শীদেবি৷ শীদেবী রো” উসখুস করে ওঠে কনক, কী যে ছাতার মাথা ভাবনা। থেকে থেকে নারকেল গাছটার মাথায় রাজকৌড়ী ডাকছে একটা। নিজের মনেই মাথা নাড়ে, হেসে ফেলে। সাধন হাঁক পাড়ছে, ওর আজকাল দেরী সয় না। খিদে খিদে … ডিমের ঝোল ফুটছে। নামলেই খেতে দেবে। তাও একানাগাড়ে চিৎকার করবে লোকটা৷ সে চেঁচাক গে। এখন সাড়া দেবে না । বরং এই আবোল তাবোল ভাবনা হাঁটুতে থুতনি দিয়ে ভাবতে ভালো লাগে ওর। তো যা ভাবছিল। সেকি মন্দ আছে? না বোধহয়। ফাঁকা এই জঙ্গলে জায়গা, ইলেকটিরি নেই, পাকা কলঘর নেই, তা ওই বাড়িরটাও তো পাঁচভুতের সাথে ভাগেরই ছিল। মাপা সময়, মাপা জল। তার থেকে এই বেশ, সে বেশ একলা মালিক এখানে। আর সবথেকে বড় কথা স্নান, অত জল, ঠান্ডা, কালো, যতখুশি জলে যতখুশি সময় নিয়ে স্নান। নাহ্ সে ভালই আছে …
একটা সিদ্ধান্তে আসতে পেরে অকারণেই মনটা খুশি হয়ে ওঠো তার এমন হয়। এই ধরো কান্না পেল, তখন হয়ত হাতে মেলা কাজ। আবার একটা টুনটুনি দেখেও হেসে গড়িয়ে পড়তে পারে সে। মাসের সেসব লাল বিচ্ছিরি দিনগুলোতে প্রতিবার কান্না পায়। হে মা বনবিবি এবারেও দিলি না… কি একটা যে অবুঝ অভিমান কার ওপর সে জানে না । চোখ গিয়ে লোকটার খালি সন্দ আর সন্দা নিজের মনে কুয়োপাড়ে এঁটো থালাটা নামাতে নামাতে গজগজ করে কনক। “নেয়ে এলি৷ জল তোলবার শব্দ পেলাম না তো রোজ রোজ পুকুর পাড়ে যাবার দরকার কি তোর বউ মানুষ, লাজ হায়া নেই!”
“না নেই৷৷ নেই৷” মনে মনে একটা অশ্রাব্য গাল দেয় কনক। ভাত দেবার কেউ না এদিকে হারামী…
তবু অপেক্ষা করে। গরম ভাত পেটে পড়তে সাধনের একটা আবুলি মত আসে। আর সে তেলের বাটি, লাল গামছা কাঁধে ফেলে বাড়ির পিছনের পুকুরে স্নান করতে যায়। কাগজে মোড়ানো একটুকরো সাবানও নিতে ভোলে না। পুকুরটা একটোর, ঘাট বলেও তেমন কিছু আর নেই। দু চারটে ইঁট বের হওয়া ক্ষয়ে আসা সিঁড়ি। সাবধানে পিছল সামলে নেমে জলে কোমর ডুবিয়ে বাস। জল একদম পরিষ্কার তাও না। তবে ঠান্ডা। কাঁঠাল গাছটার মাথায় ঘুঘু ডাকে। সে চুলের গোছ খুলে দেয়, একরাশ ঘামে ভেজা চুল এলিয়ে পড়ে কাঁধে বুকে। দু আঙুলে তেল নিয়ে চুলের গোড়ায় ডলে ডাল ঘষে, কী শান্তি৷ তার চোখ বুজে আসে। একটা একটা করে যে কটা: , ওই পায়ের রুপোর চুটকি, গলার রুপোর গোট, গোলাপী পাথর বসানো লকেট। বিয়ের পর পর সাধন এনে দিয়েছিল সোহাগ করে, এখন তোল কালিতে রুপোয় কলঙ্ক লেগেছে, খুলে রাখে। হাতের শাঁখা কি নাকের চিড়িতন ওসব খোলে না, সধবার খুলতে নেই৷ এই সময় সে গায়ে জামা রাখে না। আরও একটু জলে নেবে দুহাত দিয়ে জল ছেটায়, গলা পর্যন্ত জলে ডুবে চোখ বুজে নেয়। আবার পাগলের মত জল ছিটিয়ে খিলখিল করে নিজের মনেই হেসে ওঠে। পায়ে কখনও কখনও লাগে নরম শ্যাওলা, ঝাঁঝি। ছোটো ছোটো ঢেউ ওঠে, মিলিয়ে যায়। বেশ কিছুটা জল খেলা সেরে আবার পাড়ের দিকে উঠে আসে। কাগজে জড়ানো ফিকে গোলাপী সাবানটা বের করে খুব যত্নে মাথে। এই সাবানে ক্ষার বেশি, ফেনা ওঠেনা তেমন। গাঁ এর ছোটো মুদিখানার দোকানে মেলে। আগে শহর ঘেঁসে থাকতে যেমন সাদা ফেনা তোলা সুগন্ধি সাবান মিলত তেমনটা না। ভরাট শ্যামলা পায়ের গোছে টুকরো টাকরা রোদ এসে পড়ে পায়ের মিহিন রোমে জল লেগে লেপ্টে থাকে। নিজেকে বড়ো ভালো লাগে এইসময় কনকের যত্ন করে শাড়ির প্রান্ত কিছু তুলে পায়ের গোছে, উরুতে সাবান মাখে। শাড়ির গিঁট আলগা করে নিজেকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখে। চিবুকের খাঁজ পেরিয়ে গলা, গলার নিচে অল্প জোগ থাকা কণ্ঠার হাড় পেরিয়ে ঢেউ খেলে গেছে নিচের দিকে। নাহ্ এখনও তার কোথাও ক্ষয় লাগেনি, তেমনি রক্তাভ, তেমনি উন্মুখ। সে আলতো করে হাত রাখে নাভিতে, আধখানা চাঁদের মত গভীর, তার নিচে নেমে গেছে নরম রোমের সিঁথি। কনকের একটা ঝাঁকি লাগে, কি একটা সুখে বা অসুখে কেঁপে ওঠে আমূল। আর এই সময় খেয়াল করলে দেখা যায় পুকুরের উল্টোদিকের ছোটো ছোটো বাঁশঝাড় আর শিয়ালকাঁটার ঝোপের ভিতর জ্বলজ্বল করছে একজোড়া চোখ। তাকিয়ে আছে একদৃষ্টে। কনক সেভাবে না তাকিয়েও টের পায়। তার মনে নাগিনীর মত ফণা তোলে একটা অবুঝ খুশি। সে আবার জলে ডুব দেয়, ওঠে। আবার ডুব দেয়, একরাশ চুল ভেসে থাকে জলে শ্যাওলার মত ঝোপের দিকে আরও নজর করলে চোখে পড়ে একটা সাইকেল, গ্রামের পেরাইমারির মাষ্টার, মহিতোষের সাইকেল। এ গাঁয়ে বেশিদিন আসেনি, একা মানুষ এখনও বিয়ে থা করেনি। অবশ্য ইস্কুল থেকে তার ডেরায় ফিরতে এই রাস্তার কোনো দরকার পড়ে না হিসাবমতে৷
কনক ধীরে সুস্থে স্নান সারে, পাড়ে উঠে চুল ঝাড়ে। আলতো করে চুল গামছায় জড়িয়ে নিতে গিয়েও কি ভেবে গামছাটা কাঁধে ফেলে ফেরার পথ ধরে। খোলা চুল আর শিরদাঁড়া চুঁইয়ে পড়া জলে সরু দাগ বসে যায় শুকনো মাটিতে।
কনককে যদি জিজ্ঞাসা করা হয় কনক বলবে এই সময়টা গোটা দিনে তার একদম একার। ভেজা শাড়ি গামছা মেলে হালকা কমলা বা চুনে হলুদ রং নরম শাড়ি পরে সে ডগডগ সিঁদুর দেয় সিঁথিতে। তর্জনীর মাথা দিয়ে গোল করে টিপ। পারা বেরিয়ে যাওয়া পুরনো একটা হাত আয়নায় দেখে এতেই বেশ হেসে উঠেছে মুখখানা। কি ভেবে আঙুলে লেগে থাকা সিঁদুরটুকু ঘসে নেয় ঠোঁটে। তারপর দাওয়ায় হাঁটু মুড়ে বাস ভাত খায় এককাঁসি। আজ জেলে বউ আসেনি তো কি৷ কাল রাতের রান্না মৌরলার টক আছে পাথরের বাটিতে চাপা দিয়ে রাখলে বেশ থাকে৷ তারপর দরজায় ঠেস দিয়ে বাস একটুকরো আমসী চুষতে চুষতে এটা সেটা ভাবে। সাধন তখনও ঘরে ঘুমোচ্ছে, এই যে পাখিগুলো কিচমিচ করছে বাড়ি ফিরছে, হাঁসগুলোকেও তাড়িয়ে তুলতে হবে ঘরে। সাধনেরও ওঠার সময়। আর উঠলেই তার হাজার একটা ফরমাস
সন্ধ্যে গড়ালে গোটা চত্বরটায় একটা ধোঁয়া ধোঁয়া ঘোলাটে অন্ধকার। আশ্বিনের শেষ। রাতশেষের দিকে হিম পড়ে। হাঁড়িহেসেল সামলে, হাঁসের ঘরের শিকলি এঁটে ঘরে আসতে আসতে রাত বাড়ে। সাধন একটু অধৈর্য গলায় বলে, “কী করিস সারাদিন৷ ৰস তো এখানে৷”
সে গড়িমসি করে,বিনুনি জড়িয়ে খোঁপা করে, অকারণে লন্ঠনটার আগুন বাড়ায় কমায়। তারপর আসে… বাচ্চা ছেলে যেমন কাদামাটির তাল নিয়ে থাবড়ে খাবলে এলোপাথাড়ি ছুঁয়ে ছেনে খেলা করে, সাধন তেমন তার শাড়ি জামা মাংস নিয়ে টানাটানি করে। আন্দাজে আন্দাজে হাত বোলায়, পিষে দেয়। বিকৃত স্বরে বলে, “নেকামি করে ঘরে জামা রেখেছিস কেন গায়ে মাগী, খোল, খুলে ফেল৷ গা খুলে কুয়োপাড়ে, পুকুরধারে যেতে তোমার বাধে না, ঘরে তুমি সতী বেটি৷ আমি কিছু বুঝিনা ভাবিস……
কনকের ইচ্ছে করে না৷ চোখ নেই, একটু তাকিয়ে থাকা নেই, নেশা জমে ওঠে না পুরুষ চোখে, শুধু হাতড়ে বেড়ায় পাঁচ পাঁচ দশ আঙ্গুল। ঠোঁট খুঁজতে গিয়ে কামড় বসায় থুতনিতে যদিও রা কাড়ে না সে। সাধনের অন্ধ চোখের মত এসব সময় মনে হয় কলকও বুঝি বোবা। কিছু আন্দাজে কিছু আক্রোশে তাকে খানিকটা ধামসে সেই রাতের মত সাধন নাক ডাকে পাশ ফিরে। খানিকক্ষণ চুপ করে শুয়ে থাকে কনক। সাধনের ক্ষয়াটে ময়লা জমা ধারালো নখের আঁচড়ে গলা পিঠ বুকের খাঁজে খাঁজে জ্বালা করে। আনমনে ভাবে কাল নরুনটা নিয়ে বসে কেটে দেবে নখগুলো অবসরে। আস্তে আস্তে উঠে এলোমেলো ভাবে জড়িয়ে নেয় শুধু শাড়ীটা গায়ে। পায়ে পায়ে গিয়ে জানলাটা খুলে চুপ করে বসে, জানলার ওপর রাখে লণ্ঠনটা। একটু বাড়িয়ে দেয় আগুনটা।লালচে কমলা আলো একটু একটু ছড়িয়ে পরে কনকের ওপর। খোঁপা খুলে চুলগুলো ছড়িয়ে থাকে। শাড়ির আঁচল এলোমেলো হয়ে তাকে প্রায় দেখায় নগ্নিকা। ও ভ্রুক্ষেপ করে না। গায়ে জড়িয়ে নেয় না আঁচল। একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে বাইরের গাছ ঘেরা অন্ধকারে। জানে কোথাও না কোথাও লুকিয়ে আছে একটা নীলচে আলো, ব্যাটারীর আলো। এমন আলো এই তল্লাটে একজনের সাইকেলেই আছে। এই আলোটা জ্বলবে, জ্বলবে এবং কখন অজান্তে টুপ করে নিভে যাবে।
একটা মৃদু খসখস আওয়াজ যেন। কনক কান পেতে শোনে। হাঁসের গন্ধ পেয়ে কদিন একটা বনবিড়াল বা খটাস আসছে। খটাসের গায়ের গন্ধ পেয়েছে ও। সরসর একটু আওয়াজ, দরমার বেড়ার দরজায় শব্দ হলো কি? নাহ্ আবার সব চুপ। কোত্থাও কিচ্ছু আওয়াজ নেই, সাধনের নাক ডাকার ঘড়ঘড় আওয়াজ ছাড়া। শেষরাতের একটা দীর্ঘশ্বাসের মত হিম হাওয়াতে কেঁপে ওঠে ওর শরীরটা, আর হঠাৎই ঝেপে কান্না পায়। একধাক্কায় জানলাটা বন্ধ করে আঁচলটা ভালো করে গায়ে জড়িয়ে নেয়। বুড়ো আঙুলের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখের কোলটা সামান্য মুছে নিয়ে দাঁতে দাঁত ঘষে নিজের মনেই গজগজ করে ওঠে৷
লোভ৷ লোভ৷ গন্ধে গন্ধে আসবে, পরের দরজায় লালা ঝরাবে, মাটি শুঁকে শুঁকে ঘুরবে আর সাতপুরোনো বেড়ার দরজা ঠেলতেই যত… ছি ছি। কাপুরুষ যত৷ ঘেন্না৷ রক্ত না সব বরফ, সব বরফ, নর্দমার পাঁক… সাধনের পাশে রাখা সিকদানিতে থু করে একদলা থুথু ফেলে একেবারে শান্ত হয়ে যায় কনক। একদম চুপ করে শুয়ে পড়ে সাধনের পাশে তক্তাপোষের বাকি খালি জায়গাটায়। লক্ষ্মীর পটের আড়ালে থাকা টিকটিকিটা কালো পুঁতির মত চোখ মেলে তাকিয়ে অবাক হয়ে ভাবে কনক রোজ রোজ কাকে গাল দেয় কে জানে৷ বনবিড়ালটাকেই নির্ঘাত …..
