‘সমকামিতা’ বার বার এসেছে বাংলা সাহিত্যে। দেবর্ষি সারগির ‘সওদাগর’ উপন্যাসে এরকম কয়েকটি লাইন আছে, ‘এই সরল, সুখী, সাধারণ লোকগুলো পাহাড়টার চূড়ায় শুয়েবসে কত কী চিন্তা করে গেল, কল্পনা করে গেল, অনুভব করে গেল, সারারাত ধরে। কারও চোখ অকারণেই ভিজে উঠছিল। কেউ পাশে বসে থাকা সঙ্গীর হাতের আঙুল নিজের আঙুলে জড়িয়ে নিচ্ছিল…. সবকিছুই যেন একই সঙ্গে ভেসে চলেছে আশ্চর্য সুখ ও আচ্ছন্নতার ভেতর দিয়ে। পুরুষের সঙ্গে পুরুষের আঙুলে আঙুল জড়িয়ে যাওয়ার মধ্যে যে সুখ ও আচ্ছন্নতা, সমকামীদের ভেতর বসে থাকার মধ্যে যে অন্তর্লীন হতাশা ও প্রতিশ্রুতি, সমকামিতাকে কেন্দ্র করে অনুভবের সেই নানা দিগন্তকেই বারবার যেন ছুঁয়ে যেতে চেয়েছে বাংলা সাহিত্য !
অনন্য রায় একবার একটি কবিতায় লিখেছিলেন, ‘পৃথিবীর সব নীতিবোধ যেন অস্পৃশ্য ক্লীবের মতো শুয়ে আছে পচা নর্দমায় / গির্জার ভাঙা ঘণ্টার মতো বিস্মৃতির অলস কুয়াশা।’ কমলকুমারের কাছেও হয়তো এটাই সত্য। নয়তো সেই সব নীতিবোধকে ছুঁড়ে ফেলে কেন তিনি লিখতে গেলেন ‘পিঞ্জরে বসিয়া শুক’-এর মতো একটি বিস্ময়কর আখ্যান, যার মূল বিষয়ই সমকামিতা। প্রকৃতপক্ষে বাংলা সাহিত্যে এরকম মেধাদীপ্ত স্থাপত্য বোধহয় আর নেই, মেধার প্রশ্নে যদিও রবীন্দ্র-পরবর্তী সময়কালে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ও সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহের রচনাগুলি হতে পারে তুলনীয়। বাংলা সাহিত্যে কমলকুমারের যিনি ধ্রুপদী মূল্যায়ন করেছিলেন, সেই রফিক কায়সারের মতে, ‘তাঁর মনীষা, প্রজ্ঞা এবং প্রখর শিল্পবোধের বিপরীত মেরুতে রয়েছে আত্মক্ষয়ের প্রবণতা, উন্মাদনা এবং সমাজবিচ্ছিন্ন আত্ম-অস্তিত্বের এক অনিকেত বোধ। আত্মবিনাশী এই শিল্পী, তাঁর গল্প-উপন্যাসে ধ্বংসাত্মক গদ্যশৈলী সৃষ্টি করে, আপন রচনায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন আত্মবিনষ্টির এক অবিস্মরণীয় দৃষ্টান্ত ।… তাঁর উপন্যাসের চরিত্রগুলোর অস্তিত্ব বিপন্ন ট্যাবু ভাঙার যন্ত্রণায়, যেহেতু এদের সামাজিক, ব্যক্তিক বিকাশের প্রক্রিয়াকে বাধাপ্রাপ্ত করেছে বিভিন্ন ট্যাবু। নৈতিকতার ঊর্ধ্বে মানুষকে স্থান দিয়েছেন কমলকুমার। কমলকুমার ভারতীয় সভ্যতার মানবিক ব্যর্থতাকে অবলোকন করেছেন পিঞ্জরে বসিয়া শুক-এ। আদিম মানুষের প্যাগান জীবনের প্রতিরূপ সুঘরাই।”
কায়সার আরও লিখেছেন, এই উপন্যাস, ‘অবমানিত মানবাত্মার শৈল্পিক বহিঃপ্রকাশ। দেহের প্রতীক খাঁচা, আত্মার প্রতীক পাখি, বাউলতত্ত্বের গূঢ়তম প্রতীক। বাউলতত্ত্বে ব্রাত্যজনের মানবিক অধিকারকে আধ্যাত্মিকভাবে রক্ষা করা হয়েছে। বাউলতত্ত্ব মূলত ভারতীয় লোকধর্মের বঙ্গজ শাখা। এই উপন্যাসে সুঘরাই দেহ এবং আত্মার অস্তিত্ব পর্যন্ত বুঝতে পারে না। প্রেমহীন, অন্নহীন, জীবনযাত্রার একমাত্র প্রাপ্তি মৃত্যু। সুঘরাইদের মৃত্যুর উপলব্ধি ঘটে ধর্মে নয়, সমাজে, জীবনে এবং জীবিকার প্রাত্যহিকতায়। কমলকুমারের নায়কেরা প্রাত্যহিকতায় লালিত এবং বাস্তবতার সংঘাতে রক্তাক্ত। আদিম, অন্ত্যজ, অস্পৃশ্য জনগোষ্ঠীর জীবনধারা তাঁর উপন্যাসের মূল স্রোত। তাঁর উপন্যাসে লোকধর্মে আশ্রিত মানুষেরা বাঙালি জাতিসত্ত্বার প্রতিবিম্ব।’
এই কাহিনির সূত্রপাত সাঁওতাল পরগনার এক তীর্থস্থানে, ১৯৩৫ সালে, যেখানে মন্দির দেখতে গিয়ে এক মধ্যবিত্ত পরিবারের গৃহভৃত্য সুঘরাই হারিয়ে যায়। সুঘরাই জাতিতে হাড়িয়াল ডোম। সে নিজের শ্রেণি থেকে বিচ্ছিন্ন এক নিঃসঙ্গ বালক। তার প্রতি মনিব ও মনিব-পত্নীর রয়েছে স্রেফ অনুকম্পা। অন্ত্যজ ও ভদ্রশ্রেণির জীবনযাপনের সমান্তরাল ছবি এঁকেছেন কমলকুমার। রয়েছে রিখিয়া ও বৈদ্যনাথ ধামের অপরূপ প্রকৃতির বর্ণনা। ব্রাত্যজনের মন্দিরে প্রবেশাধিকার নেই, দেবী দর্শনে ব্যর্থ সুঘরাই তীর্থস্থানের বর্ণবৈষম্যে এবং ধর্মীয় অনুশাসনের পীড়নে ক্রুব্ধ হয়ে ওঠে। আর সমাজ তার প্রতি যে ঘৃণা বর্ষণ করে, তাকেই যেন সুঘরাই ফিরিয়ে দিতে চায় পাখিটির দিকে।
সুঘরাইয়ের সঙ্গে তিতির পাখিটির সম্পর্কই হয়ে ওঠে এই উপন্যাসের মূল রূপক। সমাজে সুঘরাই সকলেরই ঘৃণা ও করুণার পাত্র, আর সুঘরাইয়ের ঘৃণা ও করুণা করার মতো শুধু রয়েছে পাখিটি। তাই তাদের দু’জনের মধ্যে একটা অদ্ভুত সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যেখানে মিলেমিশে যায় প্রেম ও বেদনা। সুঘরাই পাখিটিকে যন্ত্রণা দিয়ে আত্মসুখ অনুভব করে। পাখিটি কষ্ট পেলে সুঘরাই আত্মমৈথুনের আনন্দ পায়। তার হীনমন্যতাই তাকে পাখিটিকে নিগ্রহ করতে প্রেরণা দেয়। অথচ তার নিঃসঙ্গতা পাখিটিকে তার জীবনে অনিবার্য করে তোলে। সে যে অসম্মানিত ও লাঞ্ছিত জীবন কাটায়, সেই নিঃসঙ্গতায় একমাত্র পাখিটিই হয়ে ওঠে তার যথার্থ সঙ্গী। আর কারও সঙ্গে সে আত্মীয়তার ঘনিষ্ঠতা অনুভব করে না। কায়সারের মতে, ‘সুঘরাইয়ের পাখিতে অলৌকিকত্ব আরোপ কৌম মানুষের টোটেম চেতনার পরিপূরক। পাখিটির প্রতি দেবত্ব আরোপ করে মোহিলী। উপন্যাসে মোহিলীর অতিপ্রাকৃত অহং আদিম যূথচারী সমাজের জাদুকর অথবা গুণীনের কথা স্মরণ করায়। অন্তজ শ্রেণির মানুষকে সে নিয়ন্ত্রণ করে অতিকথা ও অতিপ্রাকৃতিক কথকতা দিয়ে। কমলকুমারের কাহিনি নামহীন-গোত্রহীন মানুষদের। তাঁর কাহিনি নির্মাণের মধ্য দিয়ে তাঁর লেখকসত্তার শ্রেণিচ্যুতি ঘটেছে। গল্পগুচ্ছের রবীন্দ্রনাথের মতো তিনিও তাঁর রচনায় অপর শ্রেণির মানুষের কথাই বলেছেন।’
চারপাশের জগৎ থেকে সুঘরাই যত বেশি বিচ্ছিন্ন হতে থাকে, ততই তাকে ও খাঁচার ভেতরে থাকা তিতির পাখিটিকে নিয়ে গড়ে উঠতে থাকে এক ভিন্ন নিঃসঙ্গতার জগত। যেন একটা বড় ক্যানভাস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একটি টুকরো নিজেই হয়ে উঠতে চায় একটি ছবি, যে ছবির মধ্যে একাগ্র ও সংহত হয়ে উঠতে থাকে একটি আশ্চর্য রূপকের যাবতীয় অর্থময়তা। পাখি ও তার খাঁচা যেন ব্যঞ্জনায় ফুটিয়ে তোলে সমাজ ও সুঘরাইয়ের সম্পর্ককে। সমাজ যেভাবে আচার-সংস্কারে নিজেকে অলঙ্কৃত করে, সেভাবেই মন দিয়ে সুঘরাই খাঁচাটিকে সাজাতে চায়। এভাবেই পীড়ন-অনুশাসনের নির্মমতাকে ধর্ম-সমাজের নীতি-নৈতিকতার অলঙ্কারে সাজিয়ে পরিবেশন করা হয়। পীড়িত সুঘরাই নিজেই হয়ে ওঠে পীড়ক আর পাখিটি যেন হয়ে ওঠে তার নিজেরই প্রতিবিম্ব। সুঘরাই জানে, ‘ভীতি আমাদের সম্বল, আমরা ভীত, আমরা কাঁদিয়া থাকি।’ পাখিটিকেও যেন ভয় দেখিয়েই সে নিজের বশে রাখতে চায়। সুঘরাইয়ের যেমন নিজস্ব কোনও পরিচয় নেই, মনিবের পরিচয়েই তার পরিচয়, পাখিটির পরিচয়ও সেরকমই সুঘরাইয়ের পরিচয়ে, সেভাবেই লোকে তাকে জানে, কারণ, সুঘরাইয়ের মতো সেও পুরোপুরি তার স্বজাতি থেকে বিচ্ছিন্ন ও আশ্রিত।
সবাই ‘জংলি’ সুঘরাইকে অস্পৃশ্য বলে দূরে ঠেলে দিতে চায়। সুঘরাই যখন বিসরিয়ার বাপকে দেখে, কমলকুমার লেখেন, ‘সে, বালক, তাহার স্বজাতিকে দেখিয়াছে, সে উহাকে ছুইতে চাহিল, আহা কতকাল যে সে মানুষ স্পর্শ করে নাই, নিশ্চয়ই বহুকাল, বছকালই সে দল ছাড়া বিচ্ছিন্ন হওয়ত হারাইয়াছে।’ এইভাবে আরেকজন ডোমকে দেখে মানুষকে স্পর্শ করার স্পৃহা সুঘরাইয়ের মধ্যে তীব্র হয়ে ওঠে। পাখি ছাড়া আর কোনও প্রাণকেই স্পর্শ করার স্পৃহা সুঘরাইয়ের মধ্যে তীব্র হয়ে ওঠে। পাখি ছাড়া আর কোনও প্রাণকেই স্পর্শ করতে পারে না সুঘরাই। তাই মানুষকে স্পর্শ করার সম্ভাবনা তার নিজের কাছেও যেন অবিশ্বাস্য হয়ে ওঠে, সে প্রশ্ন করে, “আমি কি হারাইয়া আছি…. এই বিসরিয়ার বাপ কি সত্য! ‘ বিসরিয়ার বাপ কিন্তু সুঘরাইয়ের প্রতি কোনও ঘনিষ্ঠতা অনুভব করে না। কারণ সুঘরাই বেজায় ধনী লোকের বাড়ি কাজ করে, ভাত খেতে পায়, ডালিম-বেদানা দেখেছে। যদিও সুঘরাইকে তারা অবিশ্বাসও করে না, কারণ, ‘মনিব কত ধনী, সে কিরূপে খচ্চড় হইবে।’
মনিব ও মনিবপত্নীর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একা সুঘরাই ফেরার পথ খুঁজতে থাকে। আর তখনই তার সঙ্গে দেখা হয় সদ্য পিতৃহারা এক বালকের। লেখকের ভাষায়, ‘সুঘরাই অবাক চোখে পিতৃহারা বালককে দেখিল। বালকও সুঘরাইকে দেখে!” এই দুই বালক এক অপরের দিকে ‘অভিনিবিষ্টচিত্তে’ তাকিয়ে থাকে। কী এক সেতুবন্ধন ঘটে যায় তাদের মধ্যে ! কিন্তু সেই বালকটি তো উচ্চবর্ণের, তাই, ‘সেই দেশওয়ালী বালক সহসা অদ্ভুত সঙ্কুচিত হয়।’ এভাবেই দুই বালকের পারস্পরিক মুগ্ধতার মধ্যে ঢুকে পড়তে যায় ‘কাহারও সম্ভ্রান্ত কণ্ঠের ভর্ৎসনা।’ কখনও বা ঝোপের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসে, কোনও দেবী নন, এক কিশোর বনদেবতা। হ্যাঁ, এক কিশোরকেই দেখতে পায় সুঘরাই। কখনও বা কয়েকটি উলঙ্গ বালক সুঘরাইয়ের সামনে আসে, পাখিটিকে দেখে সেই নগ্ন অল্পবয়সিরা, “নিজেদের দেহের বিবিধ স্থানে হাত দিল, কেহ চুলকাইল।’
ক্রমে যেন আর সব কিছুকে ছাপিয়ে ক্রমে আরও বড় হয়ে উঠতে থাকে তিতির পাখিটিই। সুঘরাই পাখিটিকে আঘাত করে, কিন্তু প্রত্যাঘাত পায় না। একমাত্র পাখিটিই কখনও তাকে প্রত্যাঘাত করে না। আর এটাই সুঘরাইকে আরও খেপিয়ে তোলে এবং সে বারবার জানতে চায়, ‘আমারে তুই মার না কেন?’ ক্রমে সুঘরাই আর তিতিরটি যেন একাকার হয়ে যেতে থাকে। সুঘরাইয়ের ভাবভঙ্গি পাল্টে যেতে থাকে, হয়ে উঠতে থাকে তিতির পাখিটির মতো। একসময় সে নিজেই বুঝতে পারে, ‘তিতিরস্বভাব তাহাতে অনেকদূর প্রবেশ করিয়াছে।’ ক্রমে সুঘরাইয়ের উদ্ভাবনী শক্তি বিস্ময়কর মাত্রা পেতে থাকে, যা সে ব্যয় করে খাঁচা সাজানোর অভিনব কৌশলে। রাত্রে ঘুমের মধ্যে পাখিটিকে যেন সে কী বলতে থাকে, তখন তার মুখ থেকে অদ্ভূত সব ধ্বনি বেরোতে থাকে।
কারণ, ‘ধ্বনি তুলিতেই আমার কিছু কিছু প্রত্যক্ষ ঘটে, আমি খাঁচাটিরে সাজাইতে চাই।’ রাতের অন্ধকারে উলঙ্গ হয়ে খাঁচাটিকে সে বিয়ের মণ্ডপের মতোই সাজাতে চায় আর নিজেকে প্রস্তুত করতে থাকে এক অলৌকিক বিবাহ-যাত্রার জন্য। তখন তার কল্পনায় জেগে থাকে, ‘মনিব মহাশয়ের বিছানার মতো বিছানা।’ আর শেষ পর্যন্ত সে স্বীকারও করে নেয়, ‘আমি তাহারে ভালোবাসি যে!’ এই স্বীকারোক্তি যেন মনিবপত্নীর মনেও বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দেয়। থ্রিলারের মতোই আখ্যানটিকে এগিয়ে নিয়ে যান লেখক, আর অতি সন্তর্পণে গোপন রেখে যান এই কাহিনির মূল রহস্য, পাখিটির লিঙ্গ-পরিচয়। মনিব-পত্নী শেষপর্যন্ত অবশ্য পাখিটিকে গভীরভাবে নিরীক্ষণ করে আবিষ্কার করতে সমর্থন হন, “ইহা পুরুষ!’ আর তারপরই তিনি কৈফিয়তের সুরে জানতে চান, ‘এতদিন কেন বলিসনি।’ পাখিটির গায়ে সুঘরাইকে হাত বোলাতে দেখে মনিব-পত্নী আরও মন্তব্য করেন, “উনি বলেন ছোঁড়ার টেস্ট আছে। গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে এই সংবাদ, ‘হাড়িয়াল ডোমের শালার এক রূপবান পাখি আছে।’ আখ্যানকারের ভাষায়, ‘গত হাটের দিন, কোন পথচারীরা, তাহারা কাঁধের বাঁক লইয়া থামে, একে অন্যকে, তাহারই তিতির বিষয়ে, অনেক সাধুবাদের পর মধুর স্বরে কহিল, ইহা দারুণ মরদ, হাঁ হাঁ অদ্যও ইহারই স্মৃতি জাগরণ নিমিত্ত মেঘ হয় বৃষ্টি আইসে; ইহা দারুণ মরদ, যদি এখন বনাঞ্চলে যায় ইহারই চলনভঙ্গিতে বনস্থলীর মাদি কুক্কুট সকল অত্যাশ্চর্য সংকেত ভাষায় কণ্ঠ উন্নত করিয়া আমন্ত্রণ জানাইত পশ্চাদ্দেশ স্ফীত করত উঁচাইয়া মাটিতে বসিবে, ইহা দারুণ মরদ, ইহার প্রখবর সকাম চাহনিতে মনুষ্য সমাজের যুবতীজনের জঙ্ঘা ভারাক্রান্ত হয়। সুঘরাই প্রকাশ্যে জনসভায় স্বীকারোক্তি করে, “ইহা দারুণ মরদ!’ আর এই ঘোষণাই তার সঙ্গে পাখিটির সম্পর্ককে স্পষ্ট করে দেয়। তার সমকামিতা নিয়ে আর কোনও সন্দেহ থাকে না! আর এই আত্মপ্রকাশের পরই সুঘরাইয়ের মধ্যে দেখা দেয়, ‘রাবণিক ঔদ্ধত্য!’ লোকাপবাদের ভয়ে ও হাস্যকর হয়ে ওঠার দৃশ্যে পাখিটিকে সে একপ্রকার হত্যাই করে বসে।

উপন্যাসের শেষে সুঘরাই নিজেই স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করে, ‘সে নিজেই তিতির।’কায়সার লিখেছেন, ‘উপন্যাসের শেষ দৃশ্যে নিঃসঙ্গ সুঘরাই রিখিয়ার পাহাড়ের কাছে অসহায় এবং ভাগ্যহত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। পাখিটি মরে গেছে, খাঁচা ভেঙে ফেলেছে সে। খাঁচা যেন দেহ নয়, ব্রাহ্মণ্য-শাসনের প্রাচীর আর তিতির সুঘরাই স্বয়ং।’ এভাবেই যেন নিজের ভবিতব্যের মুখোমুখি হয় সুঘরাই, যেখানে মৃতুতেই আসতে পারে একমাত্র মুক্তি! আর এই কারণেই তার সমকামিতা সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। পুরুষের প্রতি তার এই অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণ, যে পুরুষ কখনও বালক, কখনও বনদেবতা, কখনও পাখি হয়ে তার কাছে আসে, সে পুরুষ কী সে নিজেই, গোটা আখ্যানই আসলে কী এক আত্ম ত্ম-অন্বেষণের, আত্মানুসন্ধানের কাহিনি? সুঘরাই সেই ‘আত্ম ত্ম’র মুখোমুখি হয় ঠিকই, কিন্তু তাকে সহ্য করার ক্ষমতা তার থাকে না, পাখিটিকে তখন তার মনে হয়, ‘যেন তাহার অপরিচিত, যেন তাহার কেহ নহে, কেমন ন্যাংটা’, বিকারগ্রস্তের মতো তাই সে মৃতপ্রায় পাখিটিকে আছাড় মারে ও হত্যা করে।
সুঘরাই যখন ভূতচালিতের মতো মৃত পাখিটির বু থেকে পালকগুলি টেনে ছিঁড়ে নিতে থাকে আর এইভাবে নিজের নগ্ন প্রতিবিম্বের মুখোমুখি হতে চায়, তখন আমাদের গ্রিক ট্র্যাজেডির কথা, রাজা ইদিপাসের কথা মনে পড়তে পারে। এভাবেই যেন লেখক ‘ক্যাথারসিস’ সৃষ্টি করতে চান। উপন্যাসের শেষে সুঘরাই যখন মৃত পাখিটিকে দূরে নিক্ষেপ করে উন্মত্তের মতো চিৎকার করতে থাকে, তখন সেই আর্তস্বরে ব্রাত্যজনের লাঞ্ছিত মানবত্মার সমস্ত গ্লানি ও হাহাকার যেন নিজের সমস্ত সংযম হারিয়ে আত্মপ্রকাশ করতে চায়। বলা বাহুল্য, এই উপন্যাসে কাহিনির দুটি গতিমুখ তৈরি হয়। প্রথম পর্যায়ে, সুঘরাই একটু একটু করে তিতির পাখিটির সঙ্গে একাকার হয়ে যেতে থাকে, তার মধ্যে ফুটে উঠতে থাকে পাখির ভাবভঙ্গি, সে পাখির মতোই অস্ফুট ধ্বনিতে কথা বলতে থাকে। কিন্তু যে মুহূর্তে পাখিটির শনাক্তকরণ হয়ে যায়, তখন থেকেই সে সুঘরাইয়ের চোখে অচেনা হয়ে উঠতে থাকে, তাদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতার সূত্রপাত হয়। এভাবেই ‘আত্ম ত্ম’কে শনাক্ত করার মধ্যেই অস্বস্তি ও ‘অপর’ পরিচয়ে বেঁচে থাকার মধ্যে যে নিরাপত্তা, তার সমীকরণটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই সমীকরণে যে অসঙ্গতি রয়েছে, উপন্যাসের শেষে তাই যেন সুঘরাইকে উন্মত্ত করে তোলে, নিজের মৃত প্রতিবিম্বের সামনে দাঁড়িয়ে, ‘আত্ম’র ভয়াবহতাকে প্রত্যক্ষ করে, এডওয়ার্ড মুঙ্কের সেই বিখ্যাত ছবির মতোই তার মুখ দিয়ে এক ভয়ার্ত, বিপন্ন চিৎকার বেরিয়ে আসে!
কমলকুমারের এই উপন্যাসে আরও রয়েছে ত্রিশ-চল্লিশ দশকের বাঙালি হিন্দু মধ্যবিত্ত বাবুসমাজের কথা, সাঁওতাল পরগনায় যারা স্থাপন করেছিল স্বাস্থ্য-উদ্ধারের উপনিবেশ। তাদের সংস্কৃতি, বিকৃতি, রুচি, অনাচার, সাহেবিপনা ও রক্ষণশীলতা নিয়ে কমলকুমার শ্লেষ-পরিহাস করতে ছাড়েননি। এরা নিজেদের মধ্যে যখন আলোচনা-প্রসঙ্গে বলে, ‘এই তিতিরের মাংসে অপূর্ব রান্না হয়’, তখন সেই মন্তব্য যেন সোজা গিয়ে বিদ্ধ করে সুঘরাইকে, তার আক্রান্ত ও রক্তাক্ত চেহারাটাই আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পুরুষ নতর্করা পায়ে ঘুঙুর বেধে নাচ করলে দাশ মশাই তা উপভোগ করেন। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে বিলির সমকামিতা। তাই তার, ‘সহচরীবৃন্দের মধ্যে যাহারা অস্নাতা, ঋতুমতী, তাহারা ওই বিলিকে সম্যক আঘ্রাণ করিল।’ অমলার স্তন্যদান করার সময় বিলি সেদিকে তাকিয়ে চোখ ফেরাতে পারে না। প্রমদা যেদিন প্রথম ক্লাসে শাড়ি পরে আসে, বিলি সেদিন তার দিকে অনিমেষনয়নে চেয়ে থাকে। ইনস্ট্রুম্যান্ট বক্সের ডিভাইডারের কাঁটা দিয়ে নিজের হাতে সে প্রমদার নামের আদ্যক্ষর ‘পি’ লেখে, অনেক রক্তপাত ঘটিয়ে। অনুপমার সঙ্গে সে মাখামাখি করতে শুরু করে এবং দুর্গা বিলির সঙ্গে কানে কানে অহরহ কথা বলে। এইভাবে বিলি একের পর এক নারীর সঙ্গে সমকামী সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। ব্রাত্য সুঘরাই এবং সম্ভ্রান্ত বিলি, এই দু’জনেই জীবনকে এঁকে যেতে চায় সমকামিতার সেই সার্বজনীন ভাষায়, যেখানে কোনও বৈষম্যই ধোপে টেকে না।
রফিক কায়সার যথার্থই বলেছেন, ‘চরিত্রের জটিলতা নির্ণয় নয়, উপন্যাসে গদ্যচিত্র নির্মাণই কমলকুমারের লক্ষ্য। এখানে গদ্যচিত্রের ধারাবাহিক বিকাশ আছে, কিন্তু চরিত্রের ধারাবাহিক বিকাশ নেই। চরিত্র অনেক। কোনও চরিত্রের যথাযথ বিকাশ নেই, পরিণতি নেই। এই সমাজ বিচ্ছিন্ন গদ্যশৈলী সৃষ্টির মূলে আছে একের পর এক অনন্যসাধারণ চিত্রকল্প। তিনি তাঁর কাহিনি আর চরিত্রগুলিকে ছবির পর ছবি দিয়ে সাজিয়ে তোলেন। তাই তাঁর রচনা বড় বেশি দৃষ্টিগ্রাহ্য। তিনি অফুরন্ত ছবি লিখেছেন। আর এই ছবি দিয়ে সাজিয়ে তোলেন। তাই তাঁর রচনা বড় বেশি দৃষ্টিগ্রাহ্য। তিনি অফুরন্ত ছবি লিখেছেন । আর এই ছবিগুলিতেই তিনি ধরতে চান আবহমান বাংলা ও বাঙালির জীবনচর্যা, তাঁর রচনায় ছবি হয়ে ফুটে ওঠে বাংলাদেশ। তাঁর চিত্রজগত নির্জন, নিঃসঙ্গ এবং ভয়ঙ্কর সুন্দরের তীব্রতায় পরিপূর্ণ। এই চিত্রময়ভার প্রধানতম ভাব বিস্ময় এবং ভক্তি। কিউবিস্ট রীতির প্রয়োগে কল্পনার ভাঙচুরকে তিনি করেছেন একত্রিত, যা বাংলা কথাসাহিত্যে শুধু নয়, বঙ্গীয় চিত্রকলায় পর্যন্ত বিরল। সৌন্দর্য আবিষ্কারে, মহৎ দৃশ্য নির্মাণে তাঁর দক্ষতা ও অন্তদৃষ্টি রেঁনেসার কোনও শিল্পীর সঙ্গে তুলনীয়।’ ভয়ঙ্কর সুন্দরের এই তীব্রতা, এই ধ্বংসাত্মক উন্মত্ততা না থাকলে বোধহয় ‘সমকামিতা’ নিয়ে বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে বিপজ্জনক, মহৎ ও ধ্রুপদী আখ্যানটির রচনা সম্ভব হত না!
