অনাসৃষ্টির আলিঙ্গন – অর্ণব সাহা

›› প্রবন্ধর অংশ বিশেষ  

……‘রসরাজ’-এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য রিপোর্টাজ ঈশ্বরগুপ্ত’র স্ত্রী বিন্দুবাসিনী এবং অন্যান্য অতৃপ্ত সঙ্গিনীদের লেসবিয়ান
যৌনতার বর্ণনা। বিন্দুবাসিনী প্যাসিভ, সক্রিয় ভূমিকা নিচ্ছেন ক্ষেত্রমোহনের স্ত্রী মণিমঞ্জরী ও তার শাশুড়ি। স্ত্রী-সমকামিতা বোঝাতে এখানে ‘চাক্তিমৈথুন’ কথাটি ব্যবহৃত হয়েছে (সম্বাদ রসরাজ, ২৪ আগস্ট ১৮৪৯)
‘ক্ষেত্রের স্ত্রী মণিমঞ্জরী আসিয়া কহিল ও সৈ বিন্দু… ওরা যদি পুরুষে পুরুষের করিতে করাইতে পারে তবে কি আমরা মেয়েয় ২ পরিনা, চল আমরা চাক্তিমৈথুন করি… বিন্দুবাসিনী যদিও দেবরগামিনী বা বহুপুরুষ বিলাসিনী হইয়াছে তথাপি চাক্তি মৈথুন জানে নাই, সে কহিলা সখি মণিমুঞ্জরি, চাক্তিমৈথুন কেমন, তাহাতে কি মেয়েদের হয়, যুবতী বিন্দুবাসিনীর এই কথার আভাস পাইয়া ক্ষেত্রের মাতা পুত্রবধূ মণিমুঞ্জরীকে পশ্চাতে রাখিয়া অগ্রে আসিয়া বিন্দুর মুখচুম্বন করিয়া কহিল, প্রাণ বিধুমুখী, চাক্তিমৈথুন জান না, এইখানে শোও, আগে শিখাই, এই কথা বলিয়া মাগী বিন্দুকে কর্ম্মের মতো ধরিয়া বসিল, মণিমুঞ্জরী বলে শাশুড়ি কর কী, আমি আগে করিব, মুক্তামণী, বিশ্বেশ্বরী, তারিণী প্রভৃতি সখীরাও যো পাইয়া উন্মত্তা হইয়া উঠিল।’—এখানে অন্দরমহলের মেয়েদের যৌনতৃপ্তির বিকল্প পথ খুঁজে নেওয়া যেন পুরুষ-নিয়ন্ত্রিত যৌনতার কাঠামোয় সরাসরি অন্তর্ঘাত।
সেই বঙ্কিম থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত, সমপ্রেম বা সমকাম সৌন্দর্যে মণ্ডিত হয়ে উঠেছে বাংলা সাহিত্যে। অন্তর্গত প্যাশনের বহিঃপ্রকাশ অথবা মানবিক সম্পর্কের বিচিত্র আলো-আঁধারি খেলা করে গেছে সেই মুহূর্তের বর্ণনায়। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘ইন্দিরা’ উপন্যাসের ত্রয়োদশ অধ্যায় ‘আমাকে একজামিন দিতে হইল।’ পুরুষকে বশ করার বিদ্যা সুভাষিণী শিখিয়েছিল ইন্দিরাকে :
‘সুভাষিণী তখন হাসিয়া বলিল ‘তবে আমার ব্রহ্মাস্ত্র শিখে নে।
এই বলিয়া মাগী আমার গলা বেড়িয়া হাত দিয়া আমার মুখখানা তুলিয়া ধরিয়া, আমার মুখচুম্বন করিল। এক ফোঁটা চোখের জল, আমার গালে পড়িল ।….
তখন সুভাষিণী আমার গলা ধরিল, আমি তার গলা ধরিলাম। গাঢ় আলিঙ্গনপূর্বক পরস্পরের মুখচুম্বন করিয়া, গলা ধরাধরি করিয়া, দুইজনে অনেকক্ষণ কাঁদিলাম । এমন ভালোবাসা কি আর হয়? সুভাষিণীর মতো আর কি কেহ ভালোবাসিতে জানে? মরিব, কিন্তু সুভাষিণীকে ভুলিব না।’ জগদীশ গুপ্ত’র‘অরূপের রাস’ গল্পটির কথা বলা যেতে পারে। প্রেম সত্ত্বেও ব্রাহ্মণ কানুর সঙ্গে শূদ্রাণী রাণুর বিয়ে হয়নি। কানুর স্ত্রী ইন্দিরার সঙ্গে রাত্রিবাস করল রাণু। সকালে ইন্দিরা স্বামীকে বলল গতরাতের ঘটনা
“ইন্দিরা বলিল—যেন স্বামী আর স্ত্রী, সে আর অমি। একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস চাপিয়া গেলাম ।
ইন্দিরার অঙ্গ হইতে আমার স্পর্শ মুছিয়া লইয়া সে ত্বক রক্তপূর্ণ করিয়া লইয়া গেছে।’
১৯৫১ সালে ‘চতুরঙ্গ’ পত্রিকায় বেরোয় কমলকুমার মজুমদারের গল্প ‘মল্লিকাবাহার।’ অভাবী মল্লিকা চাকরির চিঠি পেয়েছে। খবরটি দিতে সে একে একে তার পরিচিত
পুরুষবন্ধুদের কাছে গেছে, কেউ আমল দেয়নি। শেষে, পাড়ার শোভনাদির সঙ্গে দেখা, শোভনা তাকে ঘরে টেনে নিয়ে গেছে। তারপর
….শোভনা আপনার মধ্যে মল্লিকাকে এনেছে, সোহাগ করে মালা পরিয়ে দিয়েছে, সে মালা তার কণ্ঠে বিলম্বিত, চুম্বনে চুম্বনে শোক ভুলিয়ে দিয়েছে।
এবার শোভনা খাদের গলায় ‘কই তুমি তো আমায় খেলে না? তুমি আমায় ভালোবাসো না ? ”
‘বাসি।’
মল্লিকা শোভনাকে বিশেষ অপটুতার সঙ্গে গভীরভাবে চুম্বন করলে।
শোভনা জিজ্ঞাসা করল, ‘আগে কাউকে কখন এমনভাবে…
‘হ্যাঁ… আচ্ছা আপনি?’
‘আমায় তুমি বলো, আমি তোমার কে? বলো?’ হেসে বললে ‘আমি তোমার স্বামী। তুমি?”
‘বউ।’
শুনে শোভনা আবেগে চুম্বন করলে। শোভনার মুখসৃত লালা মল্লিকার গালে লাগাল।’
এর চার বছর বাদে, ১৯৫৫ সালে ‘চতুরঙ্গ’ পত্রিকাতেই বেরোয় জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীর গল্প ‘বুটকি – ছুটকি’। চরম দারিদ্রের সংসারে, একটাই পোশাক বদলে বদলে পরে দুই বোন বুটকি ও ছুটকি। রাতে বিছানায় শুয়ে নিভন্ত আলোয় তারা আবিষ্কার করে একে অপরের যৌবন। ‘কথা না কয়ে শুধু মাথা নাড়ে ছুটকি, গায়ে ছেঁড়া পাতলা জামাটা একটানে খুলে, তারপর আড়াআড়ি হয়ে বড় বোনের বুকের ওপর শুয়ে থেকে লম্বা লম্বা নিশ্বাস ফেলে। বুটকি আদর করে ওর পিঠে, গলায়, গালে আস্তে আস্তে চাপড় দেয়।’
সাম্প্রতিক বাংলা উপন্যাসেও বারবার এসেছে সমকামিতার প্রসঙ্গ। যেমন রবিশংকর বলের উপন্যাস ‘মধ্যরাত্রির জীবনী’। তারাপ্রসন্ন এবং সুরসন্দরী দু’জনেই দু’ভাবেই ব্যবহার করে নবকুমারের শরীরকে। গুরু তারাপ্রসন্নর কাছে মন্ত্র নেবে নবকুমার। তারাপ্রসন্নর যৌনক্রীড়ার অসহায় সঙ্গী হতে হয় তাকে। বাংলা মদের নেশা চড়লে সে নবকুমারকে জড়িয়ে ধরে চুমু খায়। ‘তারপর তাকে উপুড় করে ফেলে তার পায়ুদ্বারে তারাপ্রসন্ন ঢুকিয়ে দেবে আগুনের রড… তারাপ্রসন্নর শক্তিসাধনা।’
সমলিঙ্গের যৌন সম্পর্ক নিয়ে পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস লিখেছেন তিলোত্তমা মজুমদার—’চাঁদের গায়ে চাঁদ।’ উত্তর-মধ্য কলকাতার এক ছাত্রীনিবাসে দুটি মেয়ে শ্রেয়সী ও দেবরূপা ভালোবাসে একে অপরকে। দেবরূপা শ্রেয়সীর বিছানায় গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে বলে ‘তোর পাশে কোনও ছেলেকে আমি সহ্য করতে পারি না….. তোর কাছে কোনও মেয়ে এলেও আমার রাগ হয়। রুমমেট শ্রুতি তাদের দু’জনকে মিলিত হতে দেখে ‘বিস্ফোরণ। যেন বা দৃশ্যমান ভিসুভিয়াস … দুখানি গোল চাঁদ যেন’ বা যুক্ত আছে। এবং উপুড় করা ঘোলাটে সে চাঁদে পাঁচ পাঁচ দশখানি আঙুল যেন বা বাজাচ্ছে মৃদঙ্গম, নিজেকে ঘষে দিচ্ছে সেই দীর্ঘ পায়ে….
আর যখন একটি নারীর প্রতি অপর নারীর হৃদয়ে জেগে ওঠে সেই আবেগ, যাতে শরীর-মন ভেসে যায় এক অচেনা ..রোমাঞ্চে, বিমুগ্ধ সমরতির আশ্লেষ লিখিয়ে নেয় অসামান্য নির্ভার পঙক্তি। রমা ঘোষের কবিতা, ‘নিভাদির ছাদ’- …… নিভাদির ছাদে খোলা হাওয়া
এই মন্ত্র পড়ে দিয়ে আমাকে ডাকল নীতা
পৃথিবীর ছাদে!
আমার বাড়ির থেকে বহু দূর কোথায় নীতার বাড়ি
অন্য গ্রহে নাকি ওই কালকাসুন্দির
আধেক কুঁড়ির রন্ধ্রে বুঝতে পারি না……
–শৃঙ্গার রসের ঘোর ভেঙে ফেলে যাব আমি
নির্ভাদির ছাদে!
নির্ভাদির ছাদ জুড়ে ভূমধ্যসাগর! ভূমধ্যসাগরে আমি ঢেউ ভেঙে কবিতা লিখব নীতা যদি রাগ করে টুক করে ভ্রমর শরীরে….. অনন্ত তৃষ্ণার দুঃখে আরও মূর্খ হব।……..