ফাঁকা ঘরে সার সার বেঞ্চির মাঝে আধো অন্ধকারে পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে থাকা দুটো অবয়ব। আলো নেভা কালচে অন্ধকার ক্লাসরুমে জানলার একটা মাত্র খোলা পাল্লার গহ্বর দিয়ে বিকেল শুরুর রোদ আসছে। তাও সেটা ঠিক খোলা নয়, ছিটকিনি ভেঙে গেছে বলে আটকানো যায়নি ঠিক করে।
সদ্য কৈশোর প্রাপ্ত নরনারী। ওরা জাপটে আছে পরস্পরকে নিষিদ্ধ নীল ছবির মত। সাদা সালোয়ারের পিঠের চেন খোলা। কাঁধ থেকে নেমে আছে পেট পর্যন্ত। সেফটিপিন লাগানো ওড়না স্খলিত। কাঁধে ছড়িয়ে আছে তামাটে খরখরে রুক্ষ্ম চুলের গোছা। পিঠের উপর অন্তর্বাসের জং ধরা হুক খোলার জন্য ধস্তাচ্ছে দুটো কালচে শির ওঠা নির্লোম পুরুষ হাত। তার বুড়ো আঙুলে স্টিলের পেঁচিয়ে থাকা সাপের মত আংটি। ধাতব রিস্টলেট কব্জি ছুঁয়ে লেপ্টে আছে কালচে নারী শরীরে। এরকম আংটি বা রিস্টলেট স্কুলে পরা বারণ। ক্লাসটিচার ভ্রমণা ম্যাডামের চোখে পড়লে জমা হয়ে পড়ে থাকে ষ্টাফরুমের টেবিলে। তবু পরেছে।
শ্রমণা পাথরের মূর্তির মত দরজায় দাঁড়িয়ে। একদৃষ্টে দেখছে ফাঁকা ক্লাসরুমের ভেতরে সবে তারুণ্যের চৌকাঠে পা রাখা দুজন নরনারী পাগলের মত একে অন্যের ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দিচ্ছে। সবজেটে বিলের জলে যেমন করে ঠোঁট ডুবিয়ে দেয় বিকেলের রোদে নাওয়া পাতিহাস। আর কিছুই যেন ওদের দৃষ্টি আর ভাবনায় নেই। অপ্রয়োজনীয়
নির্মোকের মত খুলে পড়ে গেল বাদামী অন্তর্বাস। ঘামের আশ্লেষ মেশা দুটো বর্তুল নিরাবরণ গোলক দ্রুত নিঃশ্বাসের লয়ে কম্পিত হচ্ছে কিশোরটির শীর্ণ বুকের সাথে লেপ্টে থেকে। ইন্দ্রিয়সুখের শীৎকার বেঞ্চ আর ডেস্কে লেগে থাকা গুঁড়ো গুঁড়ো কৈশোরের সাথে বৈপরীত্যের ঝালায় বাজছে। পেছনে মস্ত ব্ল্যাকবোর্ডে চকে আঁকা অসমাপ্ত পৃথিবী। ঘেঁটে ঝাপসা হয়ে গেছে দেশগুলো।
শ্রমণা একদৃষ্টে তাকিয়ে দেখছে। তার ছাত্রছাত্রী, একাদশ শ্রেণী। সুদীপ আর রিমি। কী করা উচিত? এদের চুলের মুঠি ধরে ঝাকাতে ঝাঁকাতে মাটিতে আছড়ে ফেলে দুহাতে এলোপাথাড়ি থাপ্পড়। কিন্তু গলা দিয়ে আওয়াজ বের হচ্ছে না তো৷
রিস্টলেট পরা হাত এবার সরীসৃপের মত নেমে যাচ্ছে পেট বেয়ে, নাভির খানাখন্দ পেরিয়ে গভীরে…. আরো অতলে।
*******
ভ্ৰমণা আস্তে আস্তে অটো থেকে নেমে দাঁড়ালো। ভাড়া দেবার ফাঁকে চট করে সিটটা দেখে নিতে হবে আড় চোখে। নাহ, নিশ্চিন্ত। গত পরশু খুব অপ্রস্তুতে পড়তে হয়েছিল। কখন যে অনিয়মিত রজঃরক্ত পোশাক চুঁইয়ে আটার সিটকেও রাঙিয়ে দিয়েছে বুঝতেই পারেনি। ভাগ্যিস সেটা বাড়ি ফেরার পথে হয়েছিল। পরদিন ওই একই স্ট্যান্ড থেকে অটোয় উঠতে পারছিল না শ্রমণা সঙ্কোচে। অন্য রুটে গেছে। এরকম সমস্যা আরম্ভ হয়েছে এই মাস দুয়েক। সেই সঙ্গে হঠাৎ বামস্তন থেকে অনিয়মিত ক্ষরণ। বেশ ভয় পেয়ে গিয়েছিল শ্রমণা। ডাক্তার জিজ্ঞাসা করেছিল- “আর কিছু হয়? হট ফ্ল্যাশ?”
– “সেটা কি?”
– “কান মাথা হঠাৎ গরম হয়ে যায়?”
শ্রমণা মনে করতে পারেনি।
অনেক রকম হরমোনের টেস্ট করে ধরা পড়ল সবই রজোনিবৃত্তির পূর্ব লক্ষণ। উষরতা আসছে। ধানকাটা অসমান ফুটিফাটা অসার জমি হয়ে ওঠার পর্যায়। এত তাড়াতাড়ি৷ মাত্র পঁয়তাল্লিশেই। তারপর হরমোনের কিছু ওষুধ খেলে নাকি তেমন সমস্যা হবে না আর। কিন্তু কেন এর মধ্যেও প্রদীপের তেল ফুরিয়ে গেল৷
– “ছাড়ো, এবার আমায়।”
– “দাঁড়াও আরেকবার চেষ্টা করি”, বিতান থাই দুটো জোর করে ফাঁক করতে করতে বলেছিল, “একটু লুব্রিক্যান্ট তো লাগাতে পারো। ডাক্তার যখন…”
বিভানের হাত আর সিক্ততায় ভেসে যাবে না, শ্রমণা জানে। অনুর্বরতার সঙ্কেত মনকেই তো শুষ্ক করে তুলেছে, শরীরে স্রোত বইবে কীভাবে৷
কথায় কথায় মাথা জ্বলে যায় ইদানীং। তিতিরের ডিমটা অমলেট করে ঝোলে ফেলতে হয়। সেদিন ভুল করে গোটা ডিম দিয়ে ফেলেছিল শ্রমণা। তিতির খেতে বসে শুধু বলেছে, “এমা গোটা ডিমা
শ্রমণা গরমে ঘামে চোখের ওপর এসে পড়া আলগা চুলে বিরক্তির সপ্তমে ছিল। এমনিতেও এ মাসে টানা দশদিন রজঃস্রাব হয়েছে। দুর্বল হয়ে গেছে ভীষণ। ফুঁসে বলল, “এই যে করেছি, এই তোর ভাগ্য। খা। না রুচলে বাথরুমে গিয়ে ফেলে আয়।”
তিতির হাঁ করে তাকিয়ে ছিল। বিতানও।
বিতানের ওপরও তিক্ততা উগরে দেয় ছুতো নাতায়। সে এক কিলো আলুর মধ্যে চারটে পচা বেরোলেই হোক, বা বিছানায় ভিজে তোয়ালে রাখা নিয়েই হোক।
পুজো আচ্চায় কোনোদিন সেরকম সময় কাটাত না ভ্রমণা। ইদানীং যেন বাতিকে দাঁড়িয়ে গেছে। বেশ ভালো লাগে ঠাকুরের সামনে বসে দূর্বা বাছতে। মনে মনে ভগবানের চিন্তা যে করে তা নয়। বরং উসটুম ধুসটুম হাবিজাবি সারাদিন যা হয়েছে সেগুলোই ঘুরতে থাকে মাথায়। বিতান বিরক্ত হয়ে যায়। হাল ছেড়ে দেওয়া গলায় বলে, ” উফ তুমি এত ইরিটেটিং হয়ে উঠছ কেন বল তো?”
********
– “রিমি খাতাগুলো এই যে এখানেই রাখো। ” ভূগোলের টিচার পরমা স্টাফরুমে ঢুকে টেবিলের একটা জায়গায় বেশ কিছু খবরের কাগজ একদিকে সরিয়ে জায়গা করতে লাগল।
– “শ্রমণাদি, এখানেই থাক বলো, প্রজেক্টের খাতাগুলো।”
শ্রমণা পরমার ডাকে মুখ তুলতে গিয়ে থমকাল। রিমি খাতার গোছা হাতে দাঁড়িয়ে আছে। কীরকম একটা সঙ্কোচ ঘিরে ধরছে। সেদিনের ফাঁকা ক্লাসরুমের দরজা থেকে বিড়ালের মত নীরবে সরে যাবার সময় চোখে চোখ পড়েছিল একবার। শ্রমণা ফিরে তাকায়নি আর। ওদের মুখে চোখে কীরকম অনুভূতি বয়ে গিয়েছিল? ওরা হয়ত স্ট্যাচু হয়ে গিয়েছিল নিমেষে। কে জানে, হয়ত তা নয়, ওদের ঠোঁট হয়ত দুর্বোধ্য হাসিতে বেঁকে গিয়েছিল।
এখন ভাবলেশহীন মুখে দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটা। অথচ শ্রমণা লজ্জায় মাথা তুলতে পারছে না। দিদিমা একটা কথা বলত, “হাগুন্তির লাজ নেই দেখুন্তির বেশি লাজ।” হাসি পেয়ে গেল। সত্যিই তাই।
লজ্জা কাটিয়ে মুখ তুলে রিমির দিকে তাকিয়ে মুখ টিপে হাসল শ্রমণা। তাও মেয়েটার বিকার নেই। আচ্ছা বেহায়া মেয়ে তো। মুখের একটা রেখাও বদলালো না ।
– “হ্যাঁ, এখানেই থাক।”
চক ডাস্টার নিয়ে ক্লাসে যাবার জন্য উঠে দাঁড়াল শ্রমণা। মেয়েটা আসছে পেছনে। উঠছে সিঁড়ি দিয়ে।
ক্লাসে এসে সুদীপের দিকে চোখ গেল। ক্লাসের মাঝ বরাবর একটা বেঞ্চে। যথারীতি ভাবলেশহীন। শিশির আর মতিনের ঠিক মাঝে বসে আছে। সব কটা মহা শয়তান।
শ্রমণা খাতা খুলে মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের কারণের ওপর প্রশ্নের উত্তর লেখাতে শুরু করল। লিখছে সবাই মাথা নামিয়ে। দুসারি বেঞ্চের মাঝখান দিয়ে পায়চারি করছে রিমি। ঘরের শেষ পাখাটা বড্ড শব্দ করে ঘুরছে।
শ্রমণা রিমির পাশে দাঁড়াল, থার্ড বেঞ্চের ধারে। খাতার ওপর হাতের আঙুলগুলোর এক একটি নাথ একেক রঙের নেল পালিশ। মাঝের একটা নখের ওপর আবার সূক্ষ্মভাবে একটা কলকা আঁকা। ঝুঁকে লিখছে, জামার গলা নেমে গিয়ে বিভাজিকা স্পষ্ট।
– “বানানটা ভুল হয়েছে। বর্গীয় হবে।”
রিমি চমকে তাকিয়েছে।
– “অর্জন’ বানানটা ভুল হয়েছে।” শ্রমণা শান্ত গলায় বলল।
মাথার সামনের দিকের চুলগুলো ফাঁপিয়ে ক্লিপ মারা। চোখে হালকা কাজলের ছোঁয়া। ঠোঁটে লিপস্টিক লাগিয়ে মুছে ফেলা। এক্কেবারে গোল্লায় যাওয়া মেয়ে। হয়ত তিতিরের বয়সী, কি একটু বড়।
লেখাতে লেখাতে শ্রমণার মনে হল এই ঘটনাটা একটা পরীক্ষামূলক কেস স্টাডি হিসাবে নিলে কেমন হয়৷ ওই দিন ফাঁকা ক্লাসরুমে শালাগার ছবি বিবমিষা জাগিয়েছিল। কাউকে বলেনি অবশ্য। কিন্তু এই মেয়েটাকে বাঁচাতে হবে। এইসব চোয়াড়ে ছেলের সাথে মিশে জীবনের সাড়ে সর্বনাশ করে ফেলে এই বোকা মেয়েগুলো। তারপর রক্তহীন শরীরে ফোলা পেট নিয়ে পাঁচ বাড়ি খেটে পেট চালায়। একার তো নয়, গোটা গুষ্টির।
ক্লাস থেকে বেরোনোর আগে কী মনে করে শ্রমণা বলল, “এই রিমি শোনো, ফিফথ পিরিয়ডে একটু ষ্টাফরুমে এসো তো আমার কাছে।”
– “ইংরেজি ক্লাস আছে তখন।” রিমির গলার স্বর নিরুত্তাপ।
– “ইংরেজি? আলোক স্যারের তো? আমি কথা বলে নেব।”
– “আচ্ছা” এই প্রথম রিমির চোখে ছায়া পড়ল।
শ্রমণা আর দাঁড়াল না। সিঁড়ি দিয়ে নেমে এল।
********
– “বাড়িতে মা জানলে মেরে ফেলবে ম্যাম।”
– “যেটা করছ, সেটাতে লেখাপড়া তো যাবেই গোল্লায়, আর কী হতে পারে দেখেছ ভেবে? বাচ্চা তো নও, যথেষ্ট বড়
হয়েছ।”
দাঁড়িয়ে ফোঁস ফোঁস করে চোখ মুছছে মেয়েটা। নাকের পাটা লাল হয়ে ঘেমে উঠেছে।
“কী করব ম্যাম? সুদীপ আমায় এত জ্বালায়, বারণ করলেও শোনে না।”
এই গল্পটা শ্রমণার অচেনা লাগল না। এটাই তো হয়। এই সব অকালকুষ্মাণ্ড ছেলের জন্য নিরীহ মেয়েগুলো ফেঁসে
যায়। এরপর পেট বাঁধিয়ে কেলেঙ্কারি। বাড়ির লোকও তেমনি, দুম করে সব চাপিয়ে চুপিয়ে বিয়ে দিয়ে দেবে
ভিনরাজ্যে।
শুধু রিমি নয়, কথা বলতে হবে সুদীপের সাথেও।
সুদীপের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলতে গিয়ে হালকা বিড়ির গন্ধ পেল শ্রমণা। ঝাকড়া চুলের নীচে ব্রণয় অসমান
কপাল। মণির পাশে একটা বাদামি তিল। চোখ দুটো মুখের তুলনায় ভীষণ ছোট। শ্রমণা কড়া গলায় বলল, “তোমায়
কেন ডেকেছি জানো?
– “রিমির ব্যাপারে বলবেন তো?” বিনয়ের ধার দিয়েও গেল না ছেলে।
শ্রমণা থমকেছে মনে মনে। সাবধানে তাস ফেলতে হবে। নিজের সম্মানটাও তো রাখতে হবে।
– “কী বলব সেটাও জানো, তাই তো?”
“হ্যাঁ।”
– “রিমি কিন্তু বলে গেছে তুমি ওকে বিরক্ত করো। অতএব ওর এই বলাটা অভিযোগ ধরে যদি এগোই, তোমার স্কুলে
আসা কিন্তু বন্ধ হবে। সাসপেন্ড করা হবে ক্লাস থেকে।” বেশ কেটে কেটে বলল শ্রমণা।
– “বিরক্ত আমি করি?” চোখ লাল করে তাকিয়ে আছে সুদীপ ।
– “হ্যাঁ”, মাথা দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল শ্রমণার।
– “সবটা আগে জানুন তারপর বলবেন ম্যাম।” ছেলেটার কথা বলার তেরিয়ে ভঙ্গিতে ভ্রমণার কথা বন্ধ হয়ে গেল
রাগে ।
– “যাও বলছি সামনে থেকে। যা বললাম যেন অন্যথা না হয়। এর পর যেন কোনো বেচাল না হয়।” প্রায় চিৎকার করে বলল যমণা। রাগে দপদপ করছে মাথা ।
**********
গম্ভীর মুখে চাদর ঝাড়ছিল শ্রমণা বিতান আজ বেশ খোশমেজাজে। গুনগুন করে গান গাইছে। হেসে বলল, “কী
ব্যাপার? মুড অফ কেন?”
শ্রমণা চুপ করে রইল। বিতান বদ্ধ ঘরে বিড়ি ধরিয়েছে। কটু গন্ধ মিশে যাচ্ছে হাওয়ায়। ছোট্ট ছোট্ট কাশি গলায় জাম উঠছে ক্রমশ।
– “আহ নেভাও না।” ঝাঁঝালো গলায় বলল শ্রমণা ।
• “উফফ তোমার বকুনিতে দেওয়ালের রবি ঠাকুর অবধি ভয়ে হেলে গেল। রাতে শোবার আগে একটা বিড়ি, এ তো আমার কত বছরের অভ্যাস।” বিতান তরল গলায় বলে উঠল।
দেওয়ালে কাত হয়ে থাকা ছবিটা সমান করে শ্রমণা মনে মনে একটু লজ্জিত হল। বিতান এমনিতে বুঝদার স্বামী। নেয়াপাতি ভুঁড়ি আর তেলতেলে টাকে নিপাট গৃহস্থ। সহযোগিতার এমনিতে কোনো খামতি নেই। মাঝে মাঝে চারপাশটা তেতো আর কষাটে হয়ে যায় বড়। আটপৌরে ছোটখাটো ব্যাপারও বিরক্তির চরমে পৌঁছে দেয়। কেন যো৷ শ্রমণা একটা ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে ভাঁজ ভেঙে মশারি খুলল। তারপর অভ্যস্ত হুকে বেঁধে ফেলল। আলো নিভিয়ে ভেতরে এসে গুঁজে ফেলল ধারগুলো। ছোট্ট ছিদ্রগুলো হাওয়া আসার পক্ষেও ছোট। গরমে পিঠ ঘেমে উঠছে বিছানায়।
শ্রমণা চোখ বুজে বিতানের সাথে যৌবনের দিনগুলো ফিরে পেতে চাইল। অল্প উত্তাপ ছড়াচ্ছে শরীরে। মুমূর্ষু যৌবনের ভস্মতাপের মত। শরীর বেয়ে উঠে কান মাথা মুখের সব লোহিত কণিকা প্রচণ্ড গতিশীল হয়ে পড়েছে যেন। ঘুমন্ত বিতানকে জোর করে টেনে নিতে চাইল শ্রমণা। আজ হয়ত সেদিনের অসম্পূর্ণ মিলন সম্পূর্ণ হবে। একবার চেষ্টা করলে হয় তো। শ্রমণা নিজেকে উন্মুখ কল্পনা করে নিল।
ঘুমিয়ে আছে বিতান। মুখটা হাঁ করা।
– “আসবে? এই শুনছ?” বিতানের হাঁ করা মুখটা বন্ধ হল। চোখ অল্প খুলল। তারপর জড়ানো গলায় বলল, “উফফ শুয়ে পড় তো। পরে
হবেখন।”
শ্রমণা ছিটকে সরে গেল। শরীরটা অসাড় হয়ে গেছে যেন প্রত্যাখ্যানে। নব যুবতী হলে ফিরিয়ে দিতে পারত বিতান ৷
পাশে শুয়ে থাকা পুরুষটাকে ভীষণ কুৎসিত লাগছে এই মুহূর্তে। বিছানায় পড়ে ছটফট করছে শ্রমণা। চোখ দিয়ে উষ্ণ জল ফোটায় ফোঁটায় গড়িয়ে পড়ছে কান বেয়ে বালিশের ওপর।
সামনের মিহি অন্ধকারে একটা পুরুষালি হাত নামছে কালচে পিঠ বেয়ে। ঘামে ভেজা পিঠ চকচক করছে ঘামে। রিস্টলেট পরা পুরুষহাত সেই নগ্ন অনাবৃত পিঠটা পিষ্ট করে দিচ্ছে নরম মাটির মত।
– “তুমি তো হেব্বি কাজের ছেলে।” শ্রমণা বিস্ময়ে বলে ফেলল ।
ছেলেটা চোখ মুখের ভঙ্গি করে হাত নেড়ে বোঝাচ্ছে কীভাবে ও প্যান্ডেল বানায় বাঁশ বেঁধে। কীভাবে একটা করে বাঁশ
ছুঁড়ে দেয় অব্যর্থ নিশানায়, আরেকজন লুফে নেয়। একটুও এদিক ওদিক হয়না। তারপর কাতা দড়ি দিয়ে বেঁধে ক্রমশ আরো উঁচু হয়ে ওঠে বাঁশের কাঠামো। তার ওপর রঙিন কাপড় বাঁধা হয়। ক্রমশ তৈরি হয় চোখ ধাঁধানো প্যান্ডেল।
– “আর বছর শ্রীভূমিতে কাজ করেছি। এর আগে বাগবাজার, কুমারটুলি।” সুদীপ বড় বড় দাঁত বের করে হাসল।
– “এই, তুমি গুটখা খাও তাই না?” শ্রমণা গম্ভীর।
– “একটু আধটু”, আবার হাসল সুদীপ। ইলেভেনে পড়লেও বেশ পাকা বয়সের ছেলে। ভূগোলের অঞ্জনদা বলেন, “এসব ধাড়ি ছেলে। বিয়ে দিলে একঘর ছেলেপিলে হয়ে যেত আগের দিন হলে।” সত্যিই হয়ত তাই।
স্পোর্টস এর মাঠ প্রস্তুত হচ্ছে বাৎসরিক নিয়ম অনুযায়ী। দূরের মাঠে বস্তায় গুঁড়ো চুন নিয়ে ট্র্যাক আঁকছে ছাত্ররা।
স্কুল বাড়ির দিকে যে লম্বাটে ছায়া পড়েছে মাঠ বরাবর সেদিক ঘেঁষে বাঁশের অস্থায়ী ছাউনির নীচে শিক্ষিকাদের বসার জায়গা। সামনে প্লাস্টিকের গামলায় জড়ামড়ি করে একগাদা স্কিপিং দড়ি রাখা। ইতস্তত ঘুরছে ছাত্র ছাত্রীরা। শ্রমণা চেয়ারটা রোদে টেনে বসেছে। ছায়ার স্যাঁতসেঁতে ঠাণ্ডা ভালো লাগছিল না। সুদীপ সামনে ঘুরছিল বন্ধুদের সাথে। শ্রমণা হাত বাড়িয়ে ডেকেছে। এই কদিন ক্লাসেও বাড়তি মনোযোগ দিয়েছে ওর প্রতি। সেদিনের তেজী উত্তরের পর কেন যেন একটা বাড়তি মনোযোগ এসে পড়েছে শ্রমণার। তবে আর প্রশ্ন করে খোঁচায়নি। বরং ছেলেটার রুক্ষ্মতার মধ্যে একটা চ্যালেঞ্জ নেবার সাহস আছে। সেটাকে চ্যানেলাইজ করে যদি ভালো পথে আনা যায়…… শ্রমণা সেটাই ভেবেছে।
মাঠের ওপ্রান্তে রিমি বন্ধুদের সাথে হাঁটছে। চুলে এত চড়া রঙের ক্লিপ লাগিয়েছে যে এ প্রান্ত থেকেও দেখা যাচ্ছে।
– “রিমিকে আর বিরক্ত করছ না তো?” চলমান রিমির দিকে নজর স্থির করে বলল শ্রমণা। একটু আলগোছে বলতে
চাইল। কিন্তু প্রশ্নের সুরে কৌতূহলটা নিজের কানেও বেশ ধরা পড়ল।
– “ওই তো আসে ম্যাম।”
– “তাই”
– “মাক্কালী বলছি। আপনি জানেন ও বন্ধুদের সাথে বাজি রেখেছিল আমায় তুলবে। তুলতে পারলে দু প্যাকেট শেকড় খাওয়াবে।”
– “শেকড় কি?” শ্রমণা অবাক।
– “গুটখা জানেন, আর শেকড় জানেন না ম্যাম? প্যাকেটে থাকে। এই রকম ছোট্ট চৌকো প্যাকেট।”
শ্রমণা এবার বুঝল। কোনো একটা কোম্পানির পানমশলা। উফফ এরা পারেও।
– “ও আপনাকে আমার নামে চুকলি কেটেছে তো। ও যা লিখেছে না….
– “কী লিখেছে?” ভ্রমণার স্বরে এবার স্পষ্ট কৌতূহল।
সুদীপ চুপ।
শ্রমণা প্রবল কৌতূহল চেপে বলল, “আমায় দেখতে দিতে পারো বিশ্বাস করে। কেউ জানবে না।”
সুদীপ এগিয়ে গেল একদিকে পড়ে থাকা ব্যাগের দিকে। দুপায়ের ফাঁকে চেপে একটা ডায়েরী বের করে আনল। এগিয়ে আসছে। শ্রমণা খেয়াল করল সুদীপের জামার বুকের বোতাম বেশ কয়েকটা খোলা। রূপোর চেনের অল্প অংশ রোদে
ঝিকঝিক করছে। একটা বড় চাক্রর মত লকেট আন্দোলিত হচ্ছে হাঁটার তালে। শ্রমণা এই বুকটা একটা নগ্ন বুকে লেপ্টে থাকতে দেখেছে। কতখানি উত্তপ্ত ছিল তখন ওরা৷
শ্রমণার শরীর শিরশির করে উঠল।
********
….তোকে দেকলাম কলপারে চ্যান করছিলি। সেভেনের রীনাকে দেখে খুব নাল টপকায় তাই না? খুব রস?…”
শ্রমণা ফাঁকা ঘরে বসে। খাটের উপর ছড়িয়ে আছে একগাদা কোঁচকানো কাগজ। রিমির চিঠিগুলো পড়তে পড়তে
চমকে উঠছে। তার কিশোরীবেলা কেমন ছিল? এমন তো নয়। আজও সোনালীরও চালচিত্র গড়ে। আর এরা৷ গতকাল স্টাফরুমে বসেই চোখ বুলিয়েছে আলগোছে। সন্দীপা একটা গরম সিঙ্গাড়া দিতে ওই সময়েই একদম ঘাড়ের কাছে আসতেই তড়িঘড়ি ব্যাগে চালান করে প্লাষ্টিক হাসি ঝোলাতে হয়েছিল। তারপরও আবার গোপন নথির মত খুলে পড়েছিল কয়েকটা।
মাথা ঝিমঝিম করছিল পড়ে। প্রতিটি অক্ষরে বাসনার নগ্নতা। গনগনে মুখে ডেকে পাঠিয়েছিল রিমিকে।
– “এসব কী?”
রিমি চুপ।
আগের দিন নাকে কেঁদে ন্যাকা সেজেছিল এ মেয়ে। এক্কেবারে জাত অভিনেত্রী। বেশি কিছু বলতে রুচিতেও বাঁধচে।
-“আর যদি এমন হয়, কোনো বেচাল শুনি বা দেখি, এসব চিঠি জায়গা মত চলে যাবে।” কথার ঝাঁঝ একদম ভেতরকার ভাগ টেনে এনেছিল।
-“হবে না”, মিনমিন করে বলেছিল মেয়েটা ভিজে বেড়ালের মত।
বাড়িতে এসে পোশাক ছেড়েই আবার পড়তে বসেছে চিঠিগুলো। বাড়ি ফাঁকা। বিতান ফেরেনি এখনো। শ্রমণা আবার পড়তে শুরু করল। কী ভাষার ছিরি৷ তেমন বানান। কাগজে কলমের আঁচড়ে ফুটিয়ে তোলা নির্লজ্জতার কোলাজ। প্রত্যেকটা অক্ষর থেকে মোটা দাগের ভাষায় আর নোংরা শব্দে নগ্ন কাম ঝরে পড়ছে ফোঁটায় ফোঁটায় সাদা পর্দাগুলো জানলার দুদিকে কুঁচকে সরে আছে। খোলা জানলার ফ্রেমে পাশের বাড়ির ছাদের বাগানের টুকরো।
সাদা রঙ্গন ফুলের ছোট্ট ছোট্ট তারার মত মুখগুলো দুলছে গরম হাওয়ায়। ছোট্ট গোল কাঁটাওয়ালা ক্যাকটাস স্থির নির্বাক। শ্রমণা তাকিয়ে দেখল কমলা শ্যাওলাপড়া টবগুলোর নীচ দিয়ে শেকড় বেরিয়ে এসে ছাদের আলসের সিমেন্টকে আঁকড়ে ধরেছে। গভীরে চলে যাবার চেষ্টা করছে যেন ইমারত ফাটিয়ে। শ্রমণার হাতে এবার যে চিঠিটা উঠে এসেছে তার কোণে মস্ত একটা লালচে রঙের পানপাতা আঁকা। ওপরে লেখা আছে, “রক্ত দিয়ে আঁকলাম।” ঘষতেই লালচে বাদামি গুঁড়ো গুঁড়ো হাতে লেগে গেল। আরেকটু ঘষল শ্রমণা। উঠে আসছে গুঁড়ো। শ্রমণার যেন জেদ চেপে গেল। সে ঘষে যেতেই লাগল। উঠছে না পুরোপুরি। নখের আঁচড়ে ছিঁড়ে উঠে আসছে কাগজ। তাও পুরো লালচে ভাব উঠছে না কাগজ থেকে। শ্রমণা কাগজটা এবার দলা পাকিয়ে কুঁচি কুঁচি করে ছিঁড়ে ফেলল। সামনে অন্য চিঠিগুলো পাখার হাওয়ায় উড়ে বেড়াচ্ছে প্রজাপতি হয়ে।
শ্রমণা চোখ বুজে মনে মনে আধো অন্ধকার ক্লাসঘরে কিশোরীর শরীরে শঙ্খলাগা কিশোরের হাতটা ফিরিয়ে আনল।
ঘুরছে ফিরছে ফনা তুলে শরীর জুড়ে বিষ নিঃশ্বাস উগরে দিচ্ছে।
ভিজে যাচ্ছে শ্রমণা আবার। বাষ্প জমছে শরীরে। হাত চলে গেল গহনে। সিক্ততার ঘ্রাণ নিল প্রাণ ভরে। কল্পনা নয়,
এতদিনের বন্দি আগুন যেন জ্বালানি পেয়ে ধক ধক করে জ্বলে উঠছে। শিরায় শিরায় যেন আগুন বয়ে চলেছে। বিতানের মুখটা মনে করার চেষ্টা করল জোর করে। কিন্তু এগিয়ে আসছে একটা খোলা বুক, রুপোর চেনের ঝলক দেওয়া ত্রিভুজ নগ্ন বুক। হাঁটার তালে তালে নির্লোম বুকে আন্দোলিত হচ্ছে ধাতব চক্রের মোটিফ।
