খেয়াঘাটের রাত – কমলেশ রায়

›› গল্পের অংশ বিশেষ  

…এবার তাকালেন যুবতীর দিকে। পঁচিশ-ছাব্বিশ। ফরসা চেহারায় আগুনের লালচে আভা। শাড়ির আঁচল গায়ে টানা। হালকা নীল-সাদা শাড়ি। কাঠে ধুঁয়ো হচ্ছে, মহারাজ উঠে জানলার পাল্লা খুলে দিলেন। খোলা দরজার মুখে ছিটে বেড়ায় চাটাই টাঙিয়ে দিলেন। যদিও যথেষ্ট ফাঁকফোকর রইল।
যুবতী দেখল মহারাজকে। চল্লিশ-বিয়াল্লিশ হবেন। মেদহীন সুঠাম চেহারা। হলুদ যোগীয়ায় আগুন কাঁপছে। এককালে হয়তো গৌরবর্ণ ছিলেন, এখন তামাটে। ঝাঁকড়া চুল কাঁধ ছাপিয়ে। হাঁটু ঝুল যোগিয়ার নীচে একজোড়া ফরসা পা গলায় রুদ্রাক্ষের মালা বুক পর্যন্ত দুলছে। মহারাজ ফিরে এসে মুখোমুখি বসলেন।….

….কাঠকুঠো সব শেষ। ওদিকে তাকাতে চোখে পড়ল, অরুন্ধতীর গায়ে চাদর নেই। একদিকে সরে গেছে। তিনি চোখ ফিরিয়ে নিতে গিয়েও খানিকটা তাকিয়ে রইলেন। আবার সেই উষ্ণতা যেন ফিরে আসছে। তিনি উঠে পড়লেন। ওপাশে গিয়ে অরুন্ধতীর গায়ের চাদরটা ঢেকে দেওয়ার সময় ক’পলক তাকিয়ে রইলেন উত্তুঙ্গ বুকজোড়ার দিকে। তারপর চাদর টেনে দিলেন।
‘আমি জানতাম।’ হঠাৎ চোখ খুলল অরুন্ধতী। চাদরটা মুঠো করে ধরল। সন্ন্যাসী হাঁটুমুড়ে বসে আছেন তার পাশে। সামান্য ঝুঁকে বুকের দিকে। তাঁর গলায় রুদ্রাক্ষের মালা অরুন্ধতীর মুখের কাছে দুলছে। অথচ তিনি তার শরীর স্পর্শ করছেন না।…..

…..“বিশেষ কিছু জীবন ছিল না। দুর্গাপুরে কোকাভেনে মেকানিক ছিলাম। নিচু গ্রেডের। আমার সিনিয়র ছিল গৌরশংকর। বছর চারেকের সিনিয়র। আমার কোয়ার্টারে প্রায়ই আসা-যাওয়া করত। এক সময় আমার বউয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হল। কলোনিতে, দোকানে, ক্লাবে সেই নিয়ে কত কথা। রীতাকে ধমক দিয়েও কিছু হল না। সে নিজেকে বদলাল না। লোকের কাছে লজ্জা। অপমানে মাথা নিচু করে থাকতাম। সে ডিভোর্স চাইছিল। একদিন দুপুরে ঘরে ফিরে তাদের শারীরিক ঘনিষ্ঠতায় দেখে ফেলেছিলাম। সেদিন রাতেই ঘর ছাড়লাম। ঘুরতে ঘুরতে রানিখেত। ঋষি আশ্রমে জায়গা পেলাম। কেটে গেল পাঁচ বছর। গুরুদেব বললেন, এবার প্রব্রজায় যাও। মাধুকরী করবে। রাতে গৃহস্থের বাড়িতে থাকবে না। সেই থেকে ঘুরছি। বয়সও বেড়ে চলল। তিরিশে ঘর ছেড়েছিলাম। এখন তো চল্লিশ-বিয়াল্লিশ হয়ে গেল। এই তো জীবন।’ থামলেন মহারাজ। ‘আজকাল ক্লান্ত লাগে।’ কিছুক্ষণ নৈঃশব্দ। কোথায় কোন গাছে একটা নিশি পাখি ডানা ঝাপটিয়ে উঠল।
‘চলুন মহারাজ। উঠুন। খুব ঠান্ডা লাগছে।’ ‘কোথায় যাব?’
“জিরেনঘরে। আপনার মনের ইচ্ছাটা আমি জানি। কেন নিজেকে কষ্ট দিচ্ছেন?’
তাঁরা উঠে জিরেনঘরে এলেন। আঁধার ঘর। তবু যেন উষ্ণতা লেগে আছে, ঘরের উষ্ণতা।
‘আবার কি আগুন জ্বালতে হবে?”
‘জীবনে মানুষ কতবার আগুন জ্বালায়! আসুন।’ হাসল অরুন্ধতী, আগুন তো আগেই জ্বেলেছেন।’ …..