সহস্র এক আরব্য রজনী – ১৩ (উমর অল-নুমান, তার পুত্র সারকান ও দু-অল মাকানের কিস্সা ২)

›› আরব্য রজনী  ›› ১৮+  

চুয়ান্নতম রজনীর দ্বিতীয় যামে আবার কাহিনী শুরু হয়।

বৃদ্ধের বিবির সেবা যত্নে মাকান বিছানায় উঠে বসে। হামাম থেকে ফিরে এসে বৃদ্ধ খুশি হয়ে বলে, বাঃ এই তো দিব্যি চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। আল্লা মেহেরবান, আমি তো ভেবেছিলাম তোমাকে আর বাঁচানো যাবে না।

আরও তিন দিন পরে মাকান মোটামুটি ভালো হয়ে ওঠে। বৃদ্ধ জিজ্ঞেস করে এখন কেমন মনে করছে, বাবা?

-একটু একটু গায়ে জোর পাচ্ছি।

বৃদ্ধ দু’হাত তুলে আল্লাহর উদ্দেশে প্রণাম জানায়।-সবই তাঁরই দয়ায়।

বাজারে গিয়ে গোটা দশেক মুরগীর ছানা নিয়ে আসে। বিবিকে বলে, রোজ সকাল বিকাল একটা করে মুরগীর ঝোল করে দেবে। বাছার আমার শরীরে কিছু নাই।

বৃদ্ধের বৌ নিজে হাতে মুরগী মেরে দু-বেলা ঝোল রোধে খাওয়াতে থাকে। এই ভাবে আরও কয়েকদিন পরে বৃদ্ধ মাকানকে জিজ্ঞেস করে, এখন কেমন লাগছে, বাবা?

মাকান বলে, বেশ ভালো। আমি তো প্রায় আগের মতোই সুস্থ হয়ে উঠেছি। এখন আর আমার জন্যে আলাদা খানাপিনার কি দরকার। আপনারা যা খান, এবার থেকে তা-ই খাবো।

—কেন বাবা, একথা বলছে? আমরা গরীব বলে? কথাটা ঠিকই। সারাদিন হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খেটে মাত্র পাঁচ দিরহাম রোজগার করি। চার দিরহাম খরচ করে রোজ একটা করে দিরহাম সঞ্চয় করেছি। সেই থেকে তোমার সেবা যত্ন চলছে। ভেবো না লোকের কাছে ধারকাজ করছি। তোমার জন্য খরচ করতে পেরে আমার সারা জীবনের সঞ্চয় করা আজ সার্থক হয়েছে, বাবা।

বৃদ্ধ তার বিবিকে বলে, এবার ছেলেটাকে ভালো করে গোসল করানো দরকার। আমি একটা গাধা ভাড়া করে নিয়ে আসছি। ওকে আজ সরকারী হামামে নিয়ে যাবো।

প্রায় মাসখানেক মাকানের সুস্নান হয়নি। গায়ে এক পর্যদা ময়লা জমে গিয়েছিলো। সাবান-ছোবড়া দিয়ে খুব ভালো করে ঘসে মেজে বৃদ্ধ মাকানের সর্বাঙ্গ পরিষ্কার করলো। কঁচা সোনার মতো গায়ের রঙ। বৃদ্ধ দেখে অবাক হয়। ভাবে, এমন হাত-পায়ের গড়ন, চাঁদপনা মুখের আদল, এই চাপার মতো রঙ এ পেলো কোথায়? স্নান শেষ হলে নতুন দামী পোশাক পর্যালো তাকে। দেখে মনে হতে লাগলো যেন কোন সুলতান বাদশাহর ছেলে।

মাকানকে বাড়িতে নিয়ে এসে প্রথমে গোলাপের সরবৎ খাওয়ালো। তারপর মুরগীর ঝোল দিয়ে রুটি, শাহী হালওয়া, আঙুর বেদোনা প্রভৃতি নানা পুষ্টিকর খানা সাজিয়ে দিলো। মাকান লজ্জিত হয়ে বলে, আপনাদের কাছে আমার ঋণের আর অন্ত রইলো না।

বৃদ্ধ বলে, ওসব কথা বলে আমাকে আঘাত দিও না, বাবা। তুমি বিদেশী মুসাফির। তায় অসুস্থ। আল্লাহর নির্দেশ মুসাফিরকে সাধ্যাতীত আদর যত্ন করবে। কিন্তু আমি আর কি করতে পারছি তোমার জন্যে। একটা কথা বাবা কয়েকদিন ধরেই ভাবছি, কিন্তু তোমাকে জিজ্ঞেস করতে ভরসা হচ্ছে না।

–কী কথা?

—তোমার আদবাকায়দা চেহারা চরিত্র দেখে মনে হয়, তুমি কোনো বড় ঘরের ছেলে। যদি তোমার আপত্তি না থাকে, তোমার পরিচয় জানতে ইচ্ছে করে।

মাকান বলে, সবই আপনাকে বলবো। তার আগে আপনি বলুন, কোথায় এবং কবে আমাকে পেয়েছেন?

বৃদ্ধ বলে, একটা হামামের কাঠগুদামের পাশে তোমাকে কে বা কারা ফেলে রেখে গিয়েছিলো। আমি সেই হামামে চাকরী করি। প্রথমে ভেবেছিলাম, তুমি বেঁচে নাই। পরে বুঝতে পারলাম, প্ৰাণটা তখনও ধিক ধিক করছে। তাই কাঁধে তুলেবাড়ি নিয়ে এলাম। তারপর আমার বিবির চেষ্টায় তুমি আবার সুস্থ হয়ে উঠেছে। সবই আল্লাহর দোয়ায়।

মাকান বলে, আল্লাহ। আপনাদের ভালো করবেন। আচ্ছা, এই জাগায়টার নাম কী?

–জেরুজালেম।

মাকান গম্ভীর হয়ে যায়। এই শহরেরই একটা সরাইখানায় তাকে অসুস্থ অবস্থায় ফেলে রেখে তার দিদি একদিন কাজের সন্ধানে বেরিয়েছিলো, আর ফিরে আসেনি। ভাবতে ভাবতে মাকানের চোখে জল আসে। সুলতান উমর অল-নুমান যে তার জন্মদাতা শুধু এইটুকু গোপন করে আর সব কাহিনীই সে বৃদ্ধর কাছে বলে।

বৃদ্ধ সান্ত্বনা দেয়। দুঃখ করো না বাবা। নসীবের লিখন। কেউ তা খণ্ডাতে পারে না।

মাকান জিজ্ঞেস করে, এখান থেকে দামাসকাস কতদূর।

—পুরো ছদিনের পথ। কিন্তু কেন, বাবা?

মাকান বলে, ঠিক করেছি। এখান থেকে দামাসকাসেই যাবো।

না, বাবা, না। তোমার এই শরীরে এক সেখানে যাওয়া হবে না। যদি যেতেই চাও, আমি সঙ্গে যাবো। হয়তো আমার বিবিও যেতে চাইবে। যাওয়ার পথটা বড় খারাপ কিন্তু শহরটা বড় সুন্দর। একপাশে কুলকুল করে নদী বয়ে চলেছে। আর সারা শহরটা ফল ফুলের গাছে ভরা-যেন একটা সুন্দর বাগিচা।

এমন সময় বৃদ্ধের বিবি ঘরে এলো।— ওগো চাচার মেয়ে, শুনেছো, ছেলে আমার দামাসকাস যেতে চায়। তা ওকে তো আর একা ছাড়তে পারি না। আমি সঙ্গে যাবো। তুমিও যাবে। নাকি আমাদের সঙ্গে?

শেখ-গৃহিণী বলে, ওমা, আমি যাবো না? না গেলে ছেলের দেখ-ভাল কে করবো? শুনেছি, ওখানকার চ্যাংড়া ছোড়াগুলো ভীষণ বজাত। ওদের সঙ্গদোষে পড়লে বাছার আমার সর্বনাশ হয়ে যাবে।

বৃদ্ধ বলে, নাও, তাহলে আর দেরি করে লাভ কী? জামাকাপড় বিছানাপত্ব সব গোছগাছ করে নাও। আর চাল ডাল অ্যাটা ময়দা যা নেবার সব বাধা-ছাঁদ করে ফেলো; আজকালই রওনা হয়ে যাবো। ছ’দিনের পথ।

বৃদ্ধের বিবি নৃত্যুনতম প্রয়োজনীয় সামগ্ৰী রেখে বাকী সব সামানপত্র পঞ্চশ দিরহামে বিক্ৰী করে দিলো। তার কিছু টাকায় বৃদ্ধ একটা গাধা কিনে আনলো। তারপর দিনক্ষণ দেখে আল্লাহর নাম নিয়ে পথে বেরিয়ে পড়লো। ওরা তিনজন।

দু-আল-মাকানকে গাধার পিঠে চাপিয়ে বৃদ্ধ আর তার বিবি পিছনে পিছনে হেঁটে চলে। চলতে চলতে যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ে, কোথাও থেমে একটু জিরিয়ে নেয়। এইভাবে কয়েকদিন চলার পর এক সন্ধ্যায় দামাসকাসে পৌঁছে গেলো তারা। একটা সরাইখানায় দু’জনকে বসিয়ে বৃদ্ধ বাজারে যায়, কিছু খানাপিনার সন্ধানে।

সেদিন রাতেই বৃদ্ধের বিবির কাঁপয়ে জ্বর আসে। প্রথমে মনে হয়েছিলো পথশ্রমের ক্লান্তি আর গায়ের ব্যথার জুর। কিন্তু পরে বোঝা গেলো, না, এ কালব্যাধি। পাঁচদিনের দিন ওদের দু’জনকে কান্নার সায়রে ভাসিয়ে সে আল্লাহর দরবারে চলে গেলো! মাকান শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়ে। এই সেবিকার সেবা-যত্নেই। সে তার প্রাণ ফিরে পেলো, কিন্তু তার প্রাণটা আর কেউ-ই ধরে রাখতে পারলো না। কিশোর মাকান বৃদ্ধকে সান্ত্বনা দেয়, মৃতের জন্য শোক করলে মৃত ফিরে আসে না। তার জন্যে চোখের জল ফেলে তার আত্মার অমঙ্গল কামনা করো না, বাবা। আমাদের সবাইকে একদিন সেখানেই যেতে হবে। কেউ দুদিন আগে, আর কেউ দুদিন পরে–এই যা তফাৎ।

তোমার এত জ্ঞান, বাবা। আল্লাহ তোমার সঙ্গে আছেন। আমরা একদিন সকল শোকতাপ ভুলে তার পায়ের তলায় আশ্রয় নেব। তুমি যা বললে তাই তো একমাত্র সত্য। আমাদের সবাইকে একদিন সেখানেই যেতে হবে। বাঃ, কি সুন্দর কথা। তোমার কথায় মনের দুঃখ অনেকটা হাল্কা হয়ে গেলো, বাবা। আল্লাহ যা করেন মঙ্গলের জন্যই করেন। আর শোক করবো না। চলো, শহরটা একটু ঘুরে দেখি। এই কটা দিন কি উদ্বেগেই কেটেছে! একভাবে ঘরের মধ্যে বন্দী হয়ে আছো। চলো, তোমাকে একটু বাইরে ঘুরিয়ে নিয়ে আসি।

বৃদ্ধের হাত ধরে শহরের পথে পথে ঘুরতে থাকে মাকান। এই কোতোয়ালীর সামনে এসে দেখে অনেক লোক জমায়েত হয়ে কি যেন দেখছে। কাছে আসতে চোখে পড়ে অনেকগুলো উট, গাধা, ঘোড়া খচ্চর-এর পিঠে বোঝাই করা বাক্স প্যাটরা, গালিচা এবং আর নানা রকম সওদাগরী সামান পত্র। এক জনকে জিজ্ঞেস করলো, এত জিনিসপত্র সব কার? কোথায় যাবে?

লোকটা জবাব দেয়, এখানকার কোতোয়াল বাগদাদে বাদশাহ উমর-আল-নুমানের কাছে বাৎসরিক ভেট পাঠাচ্ছেন।

মাকানের চোখে জল আসে। কান্না চাপতে পারে না। বৃদ্ধ সান্তুনা দেয়, নিজেকে শান্ত করো বাবা। সদ্য তুমি অত বড় কঠিন অসুখ থেকে উঠেছে! আবার শরীর খারাপ হতে পারে। আমি বুঝতে পারছি দেশের নাম শুনে তোমার মন বড় অস্থির হয়ে উঠেছে। শান্ত হও, ধৈর্য ধর। আল্লাহ একদিন তোমাকে সেখানে নিয়ে যাবেনই।

মাকান কাঁদতে কাঁদিতে বলে, না, আমি এদের সঙ্গেই বাগদাদে যাবো। দেশের জন্যে আমার ভীষণ মন খারাপ করছে। আর এক মুহূর্তও এখানে ভালো লাগছে না। আপনি আমাকে বিদায় দিন, বাবা। আমি এদের পিছনে পিছনে একদিন বাগদাদে পৌঁছে যাবো।

বৃদ্ধ বললো, তা হয় না, বাবা! তোমাকে আমি এক ছাড়তে পারি না। ঠিক আছে, আমার আর পিছনের কি টান, আমিও তোমার সঙ্গেই যাবো।

মাকান আনন্দে নেচে ওঠে। —খুব ভালো হবে। আপনি সঙ্গে থাকলে আমার আর কি চিন্তা।

মাকানকে গাধার পিঠে চাপিয়ে বৃদ্ধ পিছনে পিছনে হেঁটে চলে। মাকান আপত্তি করেছিলো, আমি তো এখন বেশ চাঙ্গা হয়ে উঠেছি। বরং আপনি, বুড়োমানুষ, গাধার পিঠে আপনি চাপুন, আমি হেঁটে যাবো।

কিন্তু তার সে আপত্তি টিকে নি। বৃদ্ধ বলেছিলো, পাগল ছেলের কথা শোনো। আমি বুড়ো হলে কি হবে, এখনও সাত জোয়ানের ঘাড় মটকাতে পারি। তুমি এখন চাপে। তারপর তোমার যখন ভালো লাগবে না, নেমে খানিকটা হেঁটে পায়ের জড় ভেঙে নিও। তখন না হয়। আমি খানিকক্ষণ চাপবো।

মাকান বলেছিলো, আপনি যা আমার জন্যে করছেন, কোন ভাই-এর জন্যে ভাই তা করে না।

এবার আমরা দু-আল-মাকানের দিদির কথা বলবো।

সুন্দরী কিশোরী নুজাৎ অসুস্থ ভাই মাকানকে সরাইখানায় রেখে কাজের সন্ধানে রাস্তায় বেরিয়ে আসে। কিন্তু কে তাকে কাজ দেবে, কোথায় যেতে হবে, কিছুই সে বুঝে উঠতে পারে না। উদ্দেশ্যবিহীনভাবে এদিক ওদিক ঘুরতে থাকে। এমন সময় সে এক বাদাবী সর্দারের নজরে পরে তার সঙ্গে ছিলো আরও পাঁচজন সাগরেদ।

তাদের একজনকে ফিসফিস করে সর্দারটা বলে, মনে হচ্ছে, নয়া চিড়িয়া।

সাগরেদটা বলে, হাঁ উস্তাদ, উমর বহুৎ কম, আর দেখতে ভী খুবসুরৎ মালুম হচ্ছে। এই তো দেখুন না, এই দিকেই আসছে। মনে হচ্ছে, কী যেন খুঁজছে। জিজ্ঞেস করুন না, উস্তাদ।

বাদাবীরা কুখ্যাত ডাকাত। মরুভূমির বাদাবী অঞ্চলে এদের বাস। চুরি-ডাকাতি রাহাজানি ছিনতাই এদের একমাত্র পেশা।

নুজাৎ কাছে আসতে সর্দার জিজ্ঞেস করে হ্যাঁ, ভালো মানুষের মেয়ে, তুমি কি কারো বাড়িতে বাধা না, যখন যেখানে পাও, ফুরনের কাজ করো?

অজানা অচেনা এক মেয়ের সঙ্গে এ ধরনের গায়ে পড়ে কথা বলতে আসায় নুজাৎ বিরক্ত হয়। পাশ কাটাবার জন্যে বলে, আমি বড় শোকে তাপে কাহিল হয়ে আছি, আপনারা আমাকে বিরক্ত করবেন না।

সর্দারটা গলায় মধু ঢেলে বলে, কিছু মনে ক’রো না, মা জননী। তোমার মতো আমার ছটা মেয়ে ছিলো। আল্লাহ পাঁচটাই কেড়ে নিয়েছেন। এখন মাত্র একটি। একেবারেই নাবালিকা, বাড়িতে এক একা থাকে। দেখাশোনার কোনও লোক নাই! তাই একটি ভালো বংশের আয়া খুঁজতে বেরিয়েছি। তা বাছা, তোমাকে দেখে মনে হলো, তুমি খানদানী ঘরের মেয়ে। হয়তো অভাবের তাগিদে পথে বেরুতে হয়েছে। তা মা, যদি কাজ কামের সন্ধানেই বেরিয়ে থাকে, আমি বলি কি, আমার মেয়েটাকে দেখা শোনার ভার নিয়ে আমাকে একটু নিশ্চিন্ত কর। পারিশ্রমিক যা চাও, দেব। যদি তুমি অন্য কোনও ঘরে কাজে না লেগে থাকে, আমার বাসায় চলো। মা-হারা মেয়েটা আমার বাঁচবে।

নুজাৎ দ্বিধাজডিত কণ্ঠে বলে, শেখসাহেব, আমি এখানে বিদেশী। আর তাছাড়া, ঘরে আমার একটি অসুস্থ ভাই আছে। আপনার কাজ আমি নিতে পারি, কিন্তু সন্ধ্যার আগে আমাকে ছেড়ে দিতে হবে। ভাইকে ছেড়ে রাতে কোথাও থাকতে পারবো না আমি।

সর্দার বলে, তাই হবে মা, সন্ধ্যার আগেই আমি ঘরে ফিরি। তখন তুমি চলে যেও। আর যদি তোমার আপত্তি না থাকে, তোমার ভাইকেও আমার বাড়িতে এনে রাখতে পারি।

নুজাৎ ভাবে, দুনিয়াতে এত সহৃদয় মানুষও আছে? এই বিপদের মুহুর্তে স্বয়ং আল্লাহই বুঝি ছদ্মবেশে তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন। নূজাৎ বলে, চলুন।

এইভাবে শিশু-প্ৰাণ নুজাৎ এক বাদামী দাসুর কবলিত হয়। এমন নিখুঁত অভিনয় করে সে তাকে ধাপ্পা দিলো বুঝতেও পারে না। তার ঘর, তার নাবালিকা মাতৃহারা কন্যা-সবই তার ধাপ্পা। নুজাৎকে উটের পিঠে চাপিয়ে নিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে চলে। পিছনে পিছনে আসে তার সাগরেদরা। এবার নুজাৎ বুঝতে পারে, লোকটা একটা ঠগ। চিৎকার করে কেঁদে ওঠে। যদি কেউ সাহায্য করতে ছুটে আসে। কিন্তু বাদাবী সর্দারের উট তখন শহরে ছাড়িয়ে নির্জন প্রান্তরে ছুটে চলেছে। সর্দার হুঙ্কার ছাড়ে, এই হারামজাদী চুপ কর-চুপ কর বলছি।

কিন্তু শাহজাদী নুজাৎ চুপ না করে আরও জোরে চিৎকার করতে থাকে, কে আছো, বাঁচাও, বাঁচাও। ডাকাত আমাকে ছেনতাই করে নিয়ে যাচ্ছে

অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে সর্দার। তোর ডাকে কেউ সাড়া দেবে না রে, শয়তানী। চুপ কর। ভালো চাসতো চুপ কর।

নুজাৎ ফুসে ওঠে। শয়তান আমি না তুমি? ভালো মানুষ পেয়ে আমাকে ধাপ্পা দিয়ে ভুলিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আল্লাহ তোমাকে দোজকে পুডিয়ে মারবেন।

—হা—হা-হা। আমাকে না হয় দোজকের আগুনে পুডিয়ে মারবে, কিন্তু তোকে রক্ষা করুক দেখি, তোর আল্লাহর কত ক্ষমতা। নেচুপ করবি তো কর। তা না হলে এই দেখছিস ছুরি, একবার চোঁচালে টেনে জিভটা কেটে নেব।

নুজাৎ ভয় পায়। কি চকচকে ধারালো ছুরি। লোকটার অসাধ্য কিছুই নাই। সত্যিই যদি তার জিভটা কেটে নেয়? আর তাছাড়া এই নিরালা নির্জন মাঠের মধ্যে কেই বা তাকে উদ্ধার করতে আসবে। চিৎকার করে লাভ হবে না ভেবে নুজাৎ চুপ করে যায়। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে।

একটু পরে লোকটা বলে, আমি যখন রেগে যাবো, তখন আমার কোনও কথায় না’ করো না। তা হলে রাগের মাথায় হয়তো তোমাকেই খুন করে ফেলবো। কিন্তু তাই বলে ভেবো না, মানুষটা আমি খুব খারাপ। তোমাকে ধোঁকা দিয়ে ভাগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি, ঠিক। কিন্তু কি করবো, এই আমাদের ব্যবসা। এইভাবেই নানা ছলে বলে কৌশলে মেয়েদের জোগাড় করে আনতে হয়। ভেবো না তোমাকে ভোগ করার জন্যে নিয়ে যাচ্ছি। ভোগ আমি করবো না, তবে করবে: একজন। এবং সে-জন বড় খানদানী আদমী। তোমাকে বহুৎ আদর যত্নে রাখবে। অনেক দাসী বাঁদী থাকবে তোমার। তার ঘরের বিবির মতোই তোমাকে হীরে জহরতে মুড়ে রাখবে। তবে বিবির ইজ্জত দেবে না। তার পেয়ারের রক্ষিতা হয়ে থাকবে। আর আমি? আমি কিছু নগদ বিদায় নিয়ে চলে যাবো। আবার কোনও নতুন মেয়ের সন্ধানে। দামাসকাসের বাঁদী হাটে তোমাকে নিলামে তুলবো। দেশ-বিদেশের সুলতান বাদশাহ আমির ওমরাহ সওদাগরের দালাল আসে। সেখানে। তারা তোমার দর হাঁকবে। যার দর চড়া হবে তার কাছেই তোমকে বেচে দেব, এই আমাদের কারবার। সুতরাং ভয় পাওয়ার মতো কিছুই নাই। তোমাকে জলেও ফেলে দেব না। শূলেও চাপবো না। এমনকি তোমার গায়ে কেউ হাতও ছোঁয়াবে না। সব শুনলে তো? এবার ভালো মানুষের মেয়ের মতো কান্না থামিয়ে চুপ কর। আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি, সুলতান উমর অল নুমানের দালালের কাছেই তোমাকে বেচে দেব। তুমি হবে বাগদাদের সুলতানের রক্ষিতা। এমন সৌভাগ্য কাটা মেয়ের হয়, বলে? শুধু তোমার রূপ আছে বলেই বলছি, সুলতানের অপছন্দ হবে না। আর যদি আমার কথা না শুনে নাকে কাদতেই থাক তবে একটা হাড়ে বজাৎ সওদাগরের হাতে তুলে দেব। সে আবার কোথায় চালান করে দেবে তোমাকে, আমি বলতে পারবো না।

নুজাৎ ভাবলো, লোকটা মহা শয়তান। রাগলে একেবারে চণ্ডাল হয়ে যায়। তখন ও সবকিছু করতে পারে। সুতরাং চুপ করে নিজের বিড়ম্বিত ভাগ্যের কথা ভাবতে লাগলো।

সর্দার বলে, খিদে পায়নি? এই নাও রুটি শব্জী খাও।

লোকটা দু’খানা যবের রুটি আর একটু শব্জী এগিয়ে দেয় নুজাতের দিকে। গতকাল থেকে কিছুই খাওয়া হয়নি। খিদেয় পেট চো চো করছিলো। হাত বাড়িয়ে রুটি দু:খানা গোগ্রাসে খেতে থাকলো।

সর্দার হাসে। খিদের বড় জ্বালা! বলে, আর একখানা নেবে?

নুজাৎ মাথা নাড়ে। না। আর সে নেবে না। ভাই মাকনের মুখখানা ভেসে ওঠে। খিদের জুলায় হয়তো আর সে বেঁচে থাকবে না। দু’চোেখ নেমে আসে জলের ধারা।

এক সময়ে সর্দার বলে, আমরা দামাসকাসে এসে গেছি।

দামাসকাসে পৌঁছে সর্দার নুজাৎকে নিয়ে গিয়ে তুললো এক সরকারী সরাইখানায়। মহামান্য সুলতান উমর-অল-নুমান বিদেশী মুসাফিরদের আশ্রমের জন্য বাব-অল মালিকে বানিয়ে দিয়েছে এই সরাইখানা। নুজাৎ আবার কান্নায় ভেঙে পড়ে। সর্দার ধমকায়। ফের যদি কঁদিস, মেরে মুখের আদল পালটে দেব। চুপ কর মাগী, চুপ কর। না হলে কিন্তু একটা বদমাইশ ইহুদীর কাছে বেচে দেব, বলছি।

নুজাৎকে সরাইখানার একটা খুপরীতে পুরে শিকল তুলে দিলো লোকটা। বাঁদীহাটে গিয়ে হাঁকিতে থাকলো, কই গো কে আছো, এদিকে এসো। জেরুজালেম থেকে একটা ডাগর ছুঁড়ি নিয়ে এসেছি। কে নেবে এসো।

দালাল, সওদাগররা এগিয়ে আসে, কী রকম মাল?

সর্দার বলে, দেখতে খুব-সুরৎ। কিন্তু একটা ঝামেলা আছে। জেরুজালেমে সে তার রুগী ভাইকে ছেড়ে এসেছে। যার কিনতে ইচ্ছে, আগে থেকে শর্ত দিচ্ছি, তার ভাই-এর দায়-দায়িত্বও নিতে হবে তাকে। যদি তোমরা কেউ এই শর্তে রাজি থাকে, আমি খুব সস্তায় ছেড়ে দেব।

একজন সওদাগর জিজ্ঞেস করে, উমর কত?

—একেবারে আনকোরা কুমারী। বিয়ের যুগ্য, ডাগর। বয়স খুব বেশি হলেও পনের। দেখছনা এর উন্নত বক্ষ কেমন কামিজ ফেটে বাইরে আসতে চাইছে? বিদ্যায় বুদ্ধিতে একেবারে চৌকস। দেখতে শুনতে যেমন খুবসুরৎ তেমনি তার খানদানী আদব-কায়দা। ভাইটার অসুখের চিন্তায় কেঁদে কেঁদে শরীরটা এখন কহিল হয়ে পড়েছে। কিন্তু বড়ঘরের আদর যত্ন পেলে আবার চেহারা খোলতাই হয়ে উঠবে।

সওদাগর বলে, চলো, দেখাও দেখি। যদি পছন্দ না হয় নেব না। কিন্তু। আর যদি তোমার কথামতো সব ঠিক ঠিক মিলে যায়, তবে ন্যায্য দাম পাবে। সুলতান উমর-আল-নুমানের জন্যে কিনবো। তার ছেলে শাহজাদা সারকান এখন এখানকার সুবাদার। আগে তাকে দেখাবো। তার পছন্দ হলে তার কাছ থেকে একটা চিঠি করে নিয়ে বাগদাদে যাবো সুলতানের কাছে। সুন্দরী কুমারী মেয়ের উপর সুলতানের ভরি লোভ। তার যদি মনে ধরে তা হলে ভালো ইনাম পাবে।

বাদাবী সর্দার বলে, ঠিক আছে, আপনার শর্তে আমি রাজি। চলুন, সরাইখানায় দেখবেন চলুন।

নুজাতের দরজার সামনে এসে শিকল খুলে সর্দার ডাকে, নুজায়া, ও নুজায়া?

নুজাতের নামটা বিকৃত করে উচ্চারণ করে সে। নুজাৎ কাঁদতে থাকে। কোনও জবাব দেয় না। সওদাগরকে বলে, বেটি রা কাড়ছে না। যান ভিতরে গিয়ে দেখুন। একটু ভুলিয়ে ভালিয়ে কথা বের করুন।

সওদাগর ভিতরে ঢুকে নুজাৎকে বলে, আল্লাহ তোমার ভালো করবেন, বাছা।

কোকিল-কণ্ঠী নুজাৎ ধীরে ধীরে বলে, আল্লাহ আমাদের মতো হতভগীদের দিকে মুখ ফিরে চায় না। আপনারাই তার কৃপা পেতে থাকুন।

নুজাতের জবাব শুনে সওদাগর মুগ্ধ হয়। বাঃ কি সুন্দর কথা। আর কি পরিশুদ্ধ মার্জিত উচ্চারণ!

নাকাবের জাফর দিয়ে নূজাৎ দেখে বৃদ্ধ সওদাগরকে। মনে হয়, অমায়িক সদাশয় মানুষ। তাকে, ডাকাতটার হাত থেকে রক্ষা পেতে হবে। তার বদলে যদি এই সওদাগরের বাদী হয়ে থাকতে হয় সে-ও অনেক ভালো। আমার রূপ যৌবন, আমার শিক্ষাদীক্ষা এর নিশ্চয়ই ভালো লাগবে।

সওদাগর জানতে চাইলো, তুমি কে? কি তোমার পরিচয়, মেয়ে?

নুজাৎ মৃদু কণ্ঠে উত্তর দেয়, আপনি জানতে চাইছেন, আমি কে? এইটুকু জেনে রাখুন, আমি আপনার শত্রু নই, কোনও ক্ষতি করবো না। বিধিলিপি অখণ্ডনীয়। আমার কপালে যা লিখে দিয়েছেন, হাজার চেষ্টা করলেও তা এড়াতে পারবো না। আমাকে তা মেনে নিতেই হবে। আপনি হয়তো ভাবতে পারেন, আপনি আমার ভাগ্য নিয়ন্তা। কিন্তু আমি মনে করি, আপনি উপলক্ষ্য মাত্র।

নুজাতের এই দার্শনিক তত্ত্বকথায় সওদাগর বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়। ভাবে তার চেহারা এখনও দেখিনি, কিন্তু মুখের কথা শুনেই আমি অনুমান করতে পারছি, বড়ঘরের মেয়ে সে। বাদশাহ উমর-আল-নুমান-এর সামনে হাজির করলে লুফে নেবেন তিনি। মোটা বকশিস মিলবে। বাদাবী সর্দারকে জিজ্ঞেস করলো, সর্দর সাহেব তোমার মেয়েটা বড় ভালো, কি সুন্দর তার কথাবার্তা, আর নম্র-ভদ্র ব্যবহার। তা কি দাম নেবে ভাই?

কী বললে? নম্র-ভদ্র? ওর মতো দজাল মেয়েছেলে তুমি আর দুটি পাবেনা, সওদাগর। ওর হাড়ে হাড়ে শয়তানী বুদ্ধি। ওকে কিনলে তোমার হাড়মাস জ্বলিয়ে শেষ করবে। বলছে কিনা নম্র-ভদ্র। যাও, আগে বাড়ো, তোমার সঙ্গে আমি সওদাই করবো না।

সওদাগর বুঝলো সর্দারটা ক্ষেপে বোম হয়ে আছে। মেয়েটির প্রশংসা সে আদৌ বরদাস্ত করবে না। বললো, ঠিক আছে, তোমার কথাই মেনে নিলাম, মেয়েটা ভীষণ বজ্জাৎ; মুখরা। আমি ওই বজাত মুখরা মেয়েটাকেই কিনতে চাই। এখন বলো, কি দাম নেবে?

বাদাবী সর্দার নিজে কোনও দাম বলে না। উল্টে জিজ্ঞেস করে, তুমিই বলো, কি দাম দেবে?

সওদাগর বলে, তোমার ছেলের তুমি নামকরণ করবে না করবে। পাড়াপাড়শী? তোমার মালের তুমি দাম বলবে। আমার পোষায় নেব, না পোষায় কেটে পড়ব। তোমার বিবেচনা যা হয় বলো, তারপর আমি যা পারবো বলবো।

কিন্তু বাদাবী-দস্যু দাম বলতে পারে না। আসলে দাম সম্বন্ধে তার কোনও ধারণাই নাই। বলবে কি করে? এ যাবৎকাল যত ছেলে মেয়ে সে চুরি করে এনে বেচেছে তাদের কেউই এমনটি ছিলো না। দেখতে মোটামুটি সুন্দর হলে নেহাৎ খারাপ দাম পাওয়া যায় না। কিন্তু এ মেয়ের মতো এমন বিদ্যাধরী তো একটাও সে কখনও চোখে দেখেনি। বাদী রক্ষিতার রূপ যৌবন দরকার এটা সে ভালো করেই জানে, কিন্তু লেখাপড়া কি কামে লাগে! আর তার কদরই বুঝবে কোন আমির সুলতান? সুতরাং ওগুলো তার গুণ না হয়ে, দোষ বলেও তো গণ্য হতে পারে!

সর্দারকে নিরুত্তর দেখে সওদাগর বলে, দু’শো দিনার দিতে পারি, দেবে?

সর্দার এবার অদ্ভুত হাসে, থাক থাক আর কইয়ো না, আমার উটাটা শুনলে হাসবো।

সওদাগর বিরক্ত হয়, হাসির কথা তো কিছু বলিনি সর্দার। তোমার কাছে দাম জিজ্ঞেস করলাম, বললে না। উল্টে আমার কাছে দাম জানতে চাইলে। তা আমার যা মনে হয়েছে, বললাম। এবার তোমার কথা বলো?

বাদাবী সর্দার বলে, না বাপু বিক্রি করে আমার কাজ নাই। তার চেয়ে দেশে নিয়ে গিয়ে ভুট্টার ক্ষেতে কাজে লাগাবো। আমার উট চর্যাবে। তাও অনেক সুরাহা হবে।

সওদাগর দেখলো, লোকটা গোয়ার। কোন যুক্তি তর্কের ধার ধারে না। বললো, আহা—আমন গোসা করছে কেন শেখ? হাটে যখন এনেছো, বেচাবে বলেই এনেছো। তা দরিদম না হলে কি কেনাবেচা হয়। তোমার মেয়ের গুণের কথা না হয় জেনেছি, কিন্তু মুখের সুরৎ তো এখনও দেখিনি। রূপ না হলে গুণ ধুয়ে জল খাবে নাকি লোকে?

সর্দার ক্ষেপে ওঠে, তা তোমাকে তার চেহারাটা দেখতে কে বারণ করছে। যাওনা, বোরখাটা খুলে দেখে এসো না। চাই কি সাধ হলে সাজ-পোশাক খুলে ন্যাংটো করেও উল্টেপাল্টে দেখতে পারো। আমার কিছুতেই আপত্তি নাই।

—শোভন আল্লাহ, একি কথার ছিরি। মেয়ে মানুষের কেনা বেচার কারবার করি ঠিক। কিন্তু তাই বলে, মান ইজ্জতও কি খুইয়ে বসবো নাকি!

সর্দার বলে, কেন দোষ কী? ময়রা কি সন্দেশ খায় না?

—তোবা তোবা, তোমার মুখের কোনও রাখ-ঢাক নাই, শেখ। একেবারে গোল্লায় গেছে। নাও চলো, আমি শুধু তার মুখের আদলটা দেখবো। বোরখাটা খুলবার দরকার নাই। মুখের নাকাবটা একবার সরালেই যথেষ্ট।

সওদাগর আবার ঘরের ভিতরে ঢুকে নুজাতের কাছে যায়। নুজাৎ মাথা নত করে স্বাগত জানায়। পাশের একটা কুর্শি দেখিয়ে বসতে অনুরোধ জানায়।

সওদাগর জিজ্ঞেস করে, তোমার নাম কি, বাছা?

নুজাৎ এক মুহূর্ত জবাব দেয় না। তারপর সলজ্জ কণ্ঠে বলে, আপনি কি আমার এখনকার নাম জানতে চাইছেন? না, আমার মা-বাবার দেওয়া নাম শুনবেন? তারা আমাকে নিয়নতারা’ বলে ডাকতেন। কিন্তু এখন আমি নিজেকে ‘চোখের বালী’ বলেই মনে করি।

নুজাতের কথায় সওদাগরের চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। মেয়েটির মনের প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে তার চোখের সামনে। নুজাৎও অশ্রু সংবরণ করতে পারে না। বলে, সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মেছিলাম। আজ সায়রে পেতেছি শয্যা।

বাদাবী সর্দার তেড়ে আসে, বলি, এতক্ষণ ধরে গুজগুজ ফুসফুস কি হচ্ছে? চাবুকের ঘায়ে পিঠের ছাল-চামড়া তুলে দেব।

নুজাৎ কাতরভাবে সওদাগরের দিকে তাকায়। —আপনি আমাকে এই পাপ থেকে উদ্ধার করুন, জনাব। আমি আর এই অত্যাচার সহ্য করতে পারছি না। আমার কথা যদি না শোনেন আজি রাতেই জীবনটা শেষ করে দেব।

সওদাগর বাদাবী সর্দারের দিকে ফিরে বলে, শেখসাহেব, তোমার ভয়ে মেয়েটা শিটকে যাচ্ছে। একটু ক্ষান্ত হও। বলো কি দাম চাও, দেব।

ডাকাতটা চিৎকার করে ওঠে, তোমাকে তো বলেছি, আমি দাম বলবো না। তোমার যা মনে হয় বলে। আমার ইচ্ছে হলে দেব, না হলে দেব না।

সওদাগর এক লাফে দর হাঁকে, পঞ্চশ হাজার দিনার।

কিন্তু শয়তান ডাকাতটা তাতেও রাজি হয় না। বলে, তামাশা করছে। আমার সঙ্গে।

–সত্তর হাজার দিনার।

সর্দার বলে, ওকে খাইয়ে পরিয়ে মানুষ করতে আমার খরচা হয়েছে নব্বই হাজার।

সওদাগর সর্দারের কথায় রেগে ফেটে পড়ে, ঝুটা বাৎ। তোমার চৌদ্দগুষ্টি মিলে একশো দিনার খেতে পারবে না, তা বলছো, ওর পিছনে খরচ হয়েছে নব্বই হাজার দিনার। যাই হোক, এক লাখ দেব, এই আমার শেষ কথা। রাজি থাকো দিয়ে দাও। না হলে আমি সরকারের দপ্তরে তোমার নামে মেয়ে চুরির নালিশ এবং তুমি তার উপর কি অমানুষিক অত্যাচার চালাচ্ছে, তারও সাক্ষী দেব। কোতোয়ালকে যদি তুমি টাকা দিয়ে হাত করার চেষ্টা করো, তবু রেহাই পাবে না। আমি শাহজাদা সারকগনের কাছে যাবো। দেখি তোমাকে কে রক্ষা করে।

ডাকাত সর্দার দেখলো, বেকায়দা-সওদাগরের কথায় রাজি হয়ে গেলো। বললো, ঠিক আছে টাকাটা দিয়ে দাও। আমাকে আবার জেরুজালেমে ফিরে যেতে হবে। না জানি ওর ভাইটার কি হলো।

পাওনাগণ্ডা বুঝে নিয়ে বাদাবী সর্দার ঊর্ধ্বশ্বাসে উট ছুটিয়ে দেয়। জেরুজালেমে যাবে সে। যার বোনকে বিক্রি করে এক লাখ দিনার পাওয়া গেলো তার ভাইকে পেলে না জানি কত পাওয়া যাবে। যে ভাবেই হোক, তাকে চুরি করতে হবে।

কিন্তু জেরুজালেমে পৌঁছে সে সরাইখানায় গিয়ে শুনলো, ছেলেটা ওখান থেকে চলে গেছে। সারা শহর চষে বেড়ালো, কিন্তু হদিস করতে পারলো না।

সওদাগর নুজাৎকে তার নিজের বাসায় নিয়ে যায়। বাজার থেকে বাদশাহী সাজপোশাক কিনে নিয়ে আসে। নুজাৎকে পরতে দিয়ে বলে, পরে দেখো দেখি, কেমন মানায়।

নুজাৎ বেশ পরিবর্তন করে আসে। দেখে সওদাগরের চোখ ঝলসে যায়। বললে, বাঃ, চমৎকার। এবার চলো বাজারে স্যাকরার দোকানে নিয়ে যাবো!

বাজারের সবচেয়ে সেরা জহুরীর দোকানে নিয়ে গিয়ে নুজাতের পছন্দসই গহনাপত্র কিনতে থাকে। কানের জন্য কিনলো এক জোড়া মুক্ত বসানো দুল। এক একখানা মুক্তোরই দাম হাজার দিনার। গলার জন্যে নিলো একটা সাতনরী হার আর মানতাসা। হারটা গলায় পরতে সারা বুক পর্যন্ত ঝলমল করে ওঠে। এইভাবে হাতের বাজুবন্ধ, কোমরের গোট, পায়ের মল, মাথার টিকলী টায়রা—সব আভরণ পরে সে যখন দাঁড়ালো, সওদাগরের মনে হতে লাগলো, যেন কোন এক শাহজাদী।

নুজাৎকে রত্নালঙ্কারে সাজিয়ে আবার নিয়ে এলো সওদাগর। বললো, তোমাকে একটা কথা মনে করিয়ে দিচ্ছি, বাছা, শাহজাদা সারকানকে কিন্তু বলে না, কত দাম দিয়ে তোমাকে কিনেছি। সে যাতে ওকালতী করে তার বাবা উমর-আল-নুমানের নামে একটা চিঠি লিখে দেয়। তার ব্যবস্থা তোমাকে করতে হবে। চিঠি আর তোমাকে নিয়ে বাগদাদে যাবো। ছেলের সুপারিশ থাকলে শাহেনশাহ না করতে পারবেন না। আর একবার যদি তিনি হ্যাঁ করেন, আমি মোটা টাকা মুনাফা পাবো।

নুজাৎ মুখ নিচু করে। দুগাল বেয়ে টস টস করে জল গড়িয়ে পড়ে। সওদাগর অবাক হয়। —বাগদাদের নাম শুনে অমন মন খারাপ হয়ে গেলো কেন, বাছা? তোমার কি কোন চেনা জানা আত্মীয় স্বজন কেউ ছিলো সেখানে? ওখানকার কোনও সওদাগরকে কি তুমি চেনো? বলে মা, আমার কাছে লজ্জা করো না, খুলে বলে। বাগদাদের সব বড় বড় সওদাগরই আমার খুব চেনা।

নুজাৎ ঘাড় নেড়ে বলে, না, একমাত্র সুলতান উমর-আল-নুমান ছাড়া আমি সেখানকার আর কাউকে চিনি না।

সওদাগর শঙ্কিত হয়।—তবে কি এর আগে কোনও সওদাগর তোমাকে সুলতানের কাছে পেশ করেছিলো?

—জী না। আমি সুলতানের কন্যার সঙ্গে এক সাথে মানুষ হয়েছি তার প্রাসাদে। এই সূত্রে তিনি আমাকে বড় স্নেহ করতেন। এবং যখনই যা চেয়েছি, নির্দ্বিধায় দিয়েছেন। যদি আপনি মনে করেন, তার কোনও অনুগ্রহ আপনার দরকার একটা কাগজ কলম দিন, আমি একটা চিঠি লিখে দিচ্ছি। চিঠিটা তার হাতে দিলে, আপনার মনস্কামনা পূর্ণ হবে। শুধু আমার চিঠিটা তার হাতে দিয়ে বলবেন, তার একান্ত অনুগত নুজাৎ দিয়ে পাঠিয়েছে আপনাকে। আর বলবেন, ভাগ্যের ফেরে সে আজ পথহারা পাখির মতো এখানে সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বহু জনের মনোরঞ্জন করতে করতে অবশেষে এখন সে দামাসকাসে তারই পুত্র শাহজাদ সারকানের আশ্রয়ে আছে। এই বলে তাকে আমার সালাম জানাবেন।

নুজাতের কথা শুনে সওদাগরের শ্রদ্ধা অনেক বেড়ে যায়। জিজ্ঞেস করে, আচ্ছ মা, প্রাসাদে থাকা কালে তুমি কোরান এর পাঠ শেখেনি।

-আলবৎ শিখেছি, জনাব। শুধু কোরানই নয়, অঙ্ক, বিজ্ঞান, দর্শন, সাহিত্য, ইতিহাস প্রভৃতি নানা বিদ্যা আহরণ করেছি। নানা বিষয়ে আমি অনেকগুলো গ্বন্থ রচনা করেছি। বিদগ্ধ ব্যক্তিরা তা পাঠ করে ভূয়সী প্রশংসাও করেছেন। আমার লেখা কাব্য গাথা আজ বাগদাদের মানুষের মুখে মুখে ফেরে।

সওদাগর অবাক বিস্ময়ে নুজাতের কথা শুনছিলেন। উঠে গিয়ে কাগজ কলম আর দোয়াত এনে রাখলে তার সামনে।

নুজাৎ একখানা চিঠি লিখে ভাঁজ করে সওদাগরের হাতে দেয়। চিঠিখানা কপালে ঠেকিয়ে সওদাগর তার কামিজের জেবে রেখে বলে, আল্লাহর কাছে প্রার্থনা জানাই, তোমাকে যেন তিনি আরও গুণবতী করে রাখেন।

তারপর শুনুন, জাঁহাপনা, নুজাতের পরিচয় জানার পর কিভাবে যে তাকে আদর করবে সওদাগর ভেবে পায় না।

—মা, চলো তোমাকে হামামে নিয়ে যাই। খুব ভালো করে ঘসে মেজে গোসল করে নাও। সারকানের দরবারে যেতে হবে। এমন সাজগোজ করে যাবে, যাতে এক নজরেই শাহজাদা বলে ওঠেন, বাঃ খাসা।

সওদাগরের কথায় নুজাৎ লজ্জা পায়। মুখ নামিয়ে মৃদু হাসে। খুশির ছোঁয়া লাগে ওর গালে। রক্তরাঙ্গা হয়ে ওঠে মুখ। ঘাড় নেড়ে বলে, চলুন।

আন্তর, সাবান, তোয়ালে, ছোবড়া, সাজপোশাক সঙ্গে নিয়ে সওদাগর নুজাৎকে নিয়ে এলো শহরের সবচেয়ে সেরা অভিজাত এক হামামে। একটা শরীর সাফা করার মেয়ে ভাড়া করলো।

–দেখো, মেয়ে, মালকিনকে, আচ্ছা করে ঘসে মেজে সাফা করে দেবে। আজ তাকে বাদশাহজাদা সারকগনের দরবারে নিয়ে যাবো।

মেয়েটা বলে, আপনি কিছু ভাববেন না জনাব। এক চিলতে ময়লা রাখবো না গায়ে। সাবান ছোবড়ায় ডলে ছাল চামড়া ছাড়া আর সবই তুলে দেব।

নুজাৎ হেসে ওঠে। সওদাগর বলে, না, শুনেছি মেয়েটা সাফাই করার ভালো কায়দা জানে। স্নান শেষ হলে একটা বিরাট তার্কিস তোয়ালে জড়িয়ে পাশের কামরায় এসে একটা সোফায় বসে। সামনে টেবিলে রাখা ছিলো, গোলাপের সরবৎ, আঙুর, আপেল, আনার আপেল। অনেক দিন পরে স্নান করে তার শরীরটা বেশ ঝরঝরে তাজা হয়ে ওঠে। সরবৎটা খেয়ে শরীরটা জুড়িয়ে যায়। মেয়েটা বলে, ফলগুলোও খেয়ে নাও, মালকিন, যা ডলাইমলাই হয়েছে খিদে পাওয়ার কথা। সত্যিই মেয়েটা গোসল করানোর কায়দা জানে ভালো। এমন ভাবে তেল মালিশ করেছে, এতদিনের পথের ক্লান্তি ব্যথা বেদনা সব নিমেষেই দূর হয়ে গেলো। নুজাৎ বললো, আমি এত ফল খেতে পারবো না। তুমিও নাও।

দু’জনেও খেয়ে শেষ করতে পারলো না। হামামের বুড়ি দ্বাররক্ষীটাকে অনেকগুলো দিয়ে দিলো। এরপর শুরু হলো প্রসাধনের পালা।

সওদাগর এসে গহনার বাক্স দিয়ে গেলো। একটুবাদে সাজ-পোশাক করে গহনাপত্র পরে যখন সে বেরিয়ে এলো সওদাগর দেখে একেবারে থা। জীবনে বহু মেয়ের বেচা কেনা সে করেছে, কিন্তু এমন রূপের জেল্লা কোনও মেয়ের সে দেখেনি। একটা খচ্চরের পিঠে চাপিয়ে শাহজাদা সারকানের দরবারের পথে রওনা হলো। এমন রূপবতী রমণী দেখার সৌভাগ্য রোজ রোজ আসে না।

দরবারে এসে আভূমি আনত হয়ে সওদাগর সারকানকে কুর্নিশ জানায়।

—আজ হুজুরের দরবারে এক অপূর্বসুন্দরীকে হাজির করছি। জাঁহাপনা স্বচক্ষে দেখে বিচার করুন। রূপে গুণে এমন অতুলনীয়া মেয়ে এর আগে কখনও দামাসকাসে আসেনি, জাঁহাপনা। দুনিয়ার সেরা সুন্দরীদের মধ্যে সবার সেরা।

–ঠিক আছে আনো, দেখতে দাও।

সওদাগর নুজাতের হাত ধরে সারকানের সামনে নিয়ে আসে। মুখের নাকাব সরিয়ে দেয়। সারকান এর আগে তার বোনকে চোখে দেখেনি। সুতরাং চিনতে পারার প্রশ্ন ওঠে না। নুজাৎকে দেখে শরীরে শিহরণ জাগে। এতরূপ এমন ঢলঢলে যৌবন। এর আগে কখনও সে দেখেনি।

সওদাগর গুণকীর্তন করতে থাকে, শুধু রূপটাই সব নয় জাঁহাপনা। গুণেরও অন্ত নাই। এমন কোনও বিদ্যা নাই যা তার অজানা। ইচ্ছে হয়, অঙ্ক, ইতিহাস জ্যোতিবিদ্যা—নানা বিষয়ে জ্ঞান তার অসাধারণ।

সারকান মনস্থির করতে এক মুহুৰ্তও সময় নিলো না। সওদাগরকে বললো, আমার খাজাঞ্চকে বলো, সে তোমার পাওনা গণ্ডা মিটিয়ে দেবে।

সওদাগর বুকে সাহস করে বলে, হুজুর আমি একে বাদশাহ উমর-আল-নুমানের জন্য এনেছিলাম। তা হুজুরের যদি নিজেরই পছন্দ হয়ে থাকে, আমি আরও খুশি হবো। আমি ভেবেছিলাম, হুজুরকে দেখিয়ে একটা চিঠি করে নেব। আপনার চিঠি পেলে বাদশাহ না’ করতে পারবেন না। তা এখন বুঝেছি তার আর দরকার হবে না। শুধু শাহজাদার কাছে আমার আর্জিঃ মেয়ে কেনাবেচাই আমার ব্যবসা। এর জন্য সুলতানকে যে কর দিতে হয়। সেই কর থেকে আমাকে রেহাই করে দিন।

সারকান বলে, ঠিক আছে, তাই হবে। এখন বলো, কি ইনাম দিতে হবে? কি দামে তুমি একে কিনেছো?

সওদাগর বলে, হুজুর একলক্ষ দিনারে কিনেছি, আর একলক্ষ দিনারের অলঙ্কার আর সাজ-পোশাকে সাজিয়ে এনেছি।

সারকান খাজান্ধীকে বললো, সওদাগরকে টাকাটা দিয়ে দাও। আর ওর দালালী বাবদ আরও বিশ হাজার, এবং বকশিস হিসাবে দামী দামী সাজ-পোশাক দিয়ে বিদায় করো। আর আমার খাজনা দপ্তরে বলে দাও, আজ থেকে সওদাগর যা বাণিজ্য করবে তার সব কর মুকুব করে দিলাম।

সারকানের নির্দেশে শহরের চারজন কাজী এসে হাজির হয়। সারকান বলে, আমি বাঁদীকে কিনেছি। তার সব দায় দেনা থেকে আমি রেহাই দিলাম। এখন আমার ইচ্ছা, ওকে শাদী করে। বেগম করবো। তোমরা তার সাক্ষী হবে। কাগজপত্র সব তৈরি করো।

কাজীরা তড়ি ঘড়ি শাদীর হলফনামা তৈরি করে দিলে। সারকান উপস্থিত সকলকে প্রচুর স্বর্ণমুদ্রা এবং মূল্যবান সাজ-পোশাক উপহার দিয়ে বিদায় করলো। শুধু রইলো চার কাজী আর সেই সওদাগর। সারকান বলছে, এই বাঁদী শুধু রূপে নয়, নানা বিদ্যায় বিদুষী। এবং অসাধারণ গুণবতী। তোমাদের সামনে সে তার গুণের পরীক্ষা দেবে। বিচার করে বলবে, সওদাগরের গুণকীর্তন কতখানি সত্যি।

একটা বিরাট কক্ষের মাঝখানে পর্দার আড়ালে নুজাৎকে বসানো হয়েছে। পর্দার এপাশে বসেছে শহরের সম্ভ্রান্ত ঘরের মেয়েরা। একটু পরে পর্দাটা একটু নিচে করে দেওয়া হলো। মেয়েদের মধ্যে গুঞ্জন উঠলো। নুজাতের রূপের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে ওঠে সকলে। কেউ বলে, বেহেস্তের ডানাকাটা হুরী। কেউ বলে, হুরীরাও কি এতো সুন্দর হয়! কেউ বা তামাশা করে টিপ্লনি কাটে, ঝাড়বাতিগুলোর আর কি দরকার, এমনিতেই ঘর আলো হয়ে গেছে।

তামাশা নয়, সত্যিই নুজতের রূপের জেল্লায় মেয়েদের চোখ ঝলসে যায়। নুজাৎ উঠে এসে সবাইকে মৃদু সম্ভাষণে স্বাগত জানায়। তার মধুর বাচনভঙ্গীতে মুগ্ধ হয় সকলে। মেয়েরা আদর করে বলে, তোমার রূপের আলোয় সুলতানের ঘর আলো হয়ে উঠবে।

পর্দার এপাশ থেকে সারকান বলে, সুন্দরী, তোমার জ্ঞান গরিমার কথা অনেক শুনেছি। এবার আমাদের কিছু নীতি কথা শোনাও।

নুজাৎ বলে, আপনার আদেশ শিরোধার্য, জাঁহাপনা। আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করবো। আমি প্রথমে বলছি, প্রাথমিক আচরণ বিধির কথা। একটি পরিপূর্ণ জীবনের অর্থ-ক্রম বিকশিত উৎসাহ-উদ্দীপনার ফলশ্রুতি। আর জীবনের প্রধান উৎসাহ আসে। কিন্তু দৃঢ় আত্মপ্রত্যয় থেকে। বাসনার অতৃপ্ত আগুনে না পুড়তে থাকলে উৎসাহ উদ্দীপনা আসতে পারে না। রাজনীতি, বাণিজ্য, সংসার ধর্ম এবং শিল্পকলা এই চারপ্রকার বিষয়ে মানুষ তার কুশলতা দেখাতে উৎসাহিত হয়ে থাকে।

রাজনীতি-অৰ্থাৎ যে নীতি দ্বারা দেশের শাসনব্যবস্থা মজবুত হয়। জনগণ সুখে সমৃদ্ধিতে বসবাস করতে পারে। দেশের প্রতিরক্ষা সুদৃঢ় থাকে। আভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃঙ্খলা এবং স্থিতি বজায় থাকে। সাধারণ মানুষ সরকারের প্রতি আস্থাবান থাকে।

পারস্যের তৃতীয় শাহ মহামান্য আরদাশির বলেছেন, ‘সরকার’ ‘আস্থা’ এরা যমজ বোন। আস্থা হচ্ছে সম্পদ আর সরকার হচ্ছে রক্ষক।

আমাদের পয়গম্বর বলেছেন, দুনিয়াতে দুটিমাত্র বস্তু সবচেয়ে ক্ষমতাবান। ন্যায়। আর অন্যায়। যখন সবাই ন্যায় ধর্ম মেনে চলে, তখন তামোম দুনিয়া সুন্দর হয়ে ওঠে। আর সবাই যখন অন্যায়ের পথ বেছে নেয়, তখন দুনিয়া কলুষিত হয়ে পড়ে।

জনৈক বিজ্ঞ ব্যক্তিত মতে—প্রত্যেক সুলতানের উচিত আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলা। তিনি অসি এবং মসির মধ্যে সমন্বয়সাধন করতে নির্দেশ করেছেন। তা না হলে, অসির যত বিক্রমই থাক মসির কাছে সে পরাজিত হতে বাধ্য। শুধু আসি বলে সিংহাসন রক্ষা করা অসম্ভব। বুদ্ধির কৌশলে সে সিংহাসনের পতন ঘটা বিচিত্র নয়।

বাদশাহ আরদাশির তার বিশাল সলতানিয়ৎকে চার ভাগে বিভক্ত করে শাসনকার্য চালাতেন। প্রতিটি সুবার নিদর্শন হিসাবে এক একটি মোহরাঙ্কিত আংটি ধারণ করতেন। এর ফলে চারটি সুবার শাসনকার্য সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হতো। একটি সুবার বিক্ষোভ অন্য সুবায় সংক্রামিত হতে পারতো না। তাঁর এই শাসননীতি ইসলামের শাসন কাল পর্যন্ত সব সুলতানরা মেনে চলেছিলো।

পারস্যাধিপতি মহামান্য শাহেনশাহ কাসরা, তার অন্যতম সেনাবাহিনীর অধিনায়ক পুত্রকে একবার লিখেছিলেন…

পত্রে তিনি লিখেছিলেন, ‘বাবা, একটা কথা মনে রেখো, অহেতুক কারো প্রতি করুণা প্রদর্শন করো না। এতে সরকার দুর্বল হয়ে পড়ে।’ আবার এও তিনি লিখেছিলেন, কিন্তু যেখানে মার্জনা প্রয়োজন সেখানে রূঢ় হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়। এতে তারা বিদ্রোহী হবে।’

এক আরবীয় দার্শনিক খলিফা আবুজাফর আবদাল্লাহ আল-মনসুর-এর দরবারে একবার বলেছিলেন, ‘আপনি যখন অনশন করবেন তখন আপনার কুকুরকেও নিশ্চয় না খাইয়ে আপনার অনুগত করে রাখতে চাইবেন। কিন্তু সাবধান, পথ চলতি মানুষ যেন না তাকে রুটির টুকরো ছুঁড়ে দিয়ে যায়।’ অল-মনসুর দার্শনিকের এ কথায় জীবনে বহুবার বহুভাবে উপকৃত হয়েছিলেন।

খলিফা আবদ-আল মানিক ইবন আল মারবান মিশরে তার সৈন্যবাহিনীর অধ্যক্ষ, ভ্ৰাতা আবদ অল আজিজকে একবার লিখেছিলেন, তোমার পরামর্শদাতারা তোমাকে কোনও শিক্ষাই দিতে পারেনি। শিক্ষা লাভ করেছে তোমার শত্রুর কাছ থেকে। কি করে নিজের সেনাবাহিনী আরও শক্তিশালী রাখতে হয় তারা তোমাকে সেই জ্ঞান দিয়েছে।

জ্ঞানবৃদ্ধ খলিফা উমর ইবন খাতাব তাঁর দরবারে যাদের উচ্চপদে বহাল করতেন তাদের প্রত্যেককে হলফনামা দিতে হতো-ভারাক্রান্ত পশুর পিঠে চাপবে না, শত্রুর সামান অপহরণ করবে না, কখনও সাহেবীয়ানা পোশাক পরবে না এবং নামাজ পাঠের সময় বিলম্ব করবে না। তিনি বলতেন জ্ঞানই প্রকৃত ঐশ্বর্য। বিচক্ষণতাই একমাত্র মন্ত্র এবং বিদ্যার্জনের গৌরব।

উমর আরও বলেছেন, তিন প্রকারের রমণী আছে। যে মুসলমান রমণী কেবলমাত্র পতিঅন্ত প্ৰাণ সে আদর্শ। যে মুসলমান রমণী কেবলমাত্র সন্তানের জন্য স্বামী সঙ্গ চায় সেও ভালো। কিন্তু যে নারী পরপুরুষের সঙ্গে মাতামতি করে সে অত্যন্ত খারাপ। তার সাহচর্য পরিহার করে চলবে।

উমর বলেছেন, তিন রকমের পুরুষও আছে সংসারে। বুদ্ধিমান ব্যক্তি বিচার বিবেচনা করে কাজে হাত দেয়। বিচক্ষণ ব্যক্তি প্রথমে নিজে বিচার বিবেচনা করে, এবং পরে অন্যের কাছে পরামর্শ নিয়ে কাজে হাত দেয়। আর নির্বোধিরা না করে চিন্তা, না নেয় উপদেশ।

দার্শনিক আলী-ইবন তালিব বলেছেন, নারীর ছলাকলা সম্পর্কে সতর্ক থাকবে। ভুলেও কখনও তাদের পরামর্শনিও না। কিন্তু সাবধান, তাদের কখনও অখুশি রেখো না, এর পরিণাম আরও খারাপ হয়। তারা জাহান্নামের পথে পা বাড়াতে পারে।

নুজাতের এবম্বিধ-জ্ঞানগর্ভ কথাবার্তা শুনে কাজীরা মুগ্ধ হয়ে বলে, ইয়া আল্লাহ, এমন উপদেশের বাণী আমরাও তো জানি না।

নুজাৎ বলে, মানবতার তিনটি দিক নিয়ে অন্য আর একদিন আলোচনা করবো। আজ আচরণবিধি ও বিচক্ষণতার দ্বিতীয় পর্যায় ব্যাখ্যা করে শোনাচ্ছি : দ্বিতীয় পর্যায়—অর্থাৎ পরিপূর্ণতা। এই পরিপূর্ণতার স্তরে কোনও সাধারণ মানুষ চেষ্টা করে পৌঁছতে পারে না। এখানে পৌঁছতে গেলে জন্মগত গুণের অধিকারী হওয়া দরকার। এখানে আমি শুধু দু-একটা উদাহরণ খাড়া করবো।

নুজাৎ বলে, একদিন খলিফা মুয়াবিয়াহ শহর পরিক্রমায় বেরিয়ে দেখলেন ল্যাংড়া রসিক আবু বাহর ইবন কাইস জনে জনে ভিক্ষা মাঙছে। খলিফা সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কিছু বাণীটানী ছাড়ো তো হে।

ল্যাংড়া বললো, ধর্মাবতার, প্রতিদিন আপনি মাথা কামাবেন, গোঁফ ছাঁটবেন, নখ বাড়ছে কিনা লক্ষ্য রাখবেন, আপনার দাঁত মুখ সাফা রাখবেন। কিন্তু সাবধান, ভুলেও কখনই জুম্মাবারে এসব করবেন না। উক্ত এই-ই ‘পবিত্র’ বিধান।

খলিফা বললেন, আচ্ছা আমাকে না হয় বাণী দিলে, এবার জিজ্ঞেস করি, তোমার নিজের সম্পর্কে কি কি বিধান মেনে চলো তুমি?

—আমি হুজুর, এক পা সামনে ফেলার আগে দুপা-ই ভালো করে দেখে নিই।

খলিফা প্রশ্ন করলো, তুমি তোমার জ্যেষ্ঠদের প্রতি কিরূপ আচার-আচরণ করে থাকো?

—আমি বাড়াবাড়ি না করে তাদের যথাযোগ্য সম্মান দেখাই এবং তারাও তাদের আশীর্বাদ জানাবে, এই প্রত্যাশা করি।

খলিফা, এবার রসের প্রশ্ন করেন, তুমি তোমার বিবির সঙ্গে কি রূপ আচরণ কর, ল্যাংড়াসাহেব??

আবু বাহর লজ্জিতভাবে মুখ নিচু করে। জাঁহাপনা, আমাকে মাফ করবেন, সে কথা আমি বলতে পারবো না।

—আরে বলই না, লজার কি আছে? ল্যাংড়া দেখলো নিরুপায়। স্বয়ং খলিফার শুনতে সাধ হয়েছে। বলতেই হবে।—শুনুন, জাঁহাপনা, আমার বিবি খুব দুবলা আর কুঁজো। চিৎ হয়ে শুতে পারে না।

সুলতান গভীরভাবে প্রশ্ন করে, তা হলে তো বিপদ।।

—কেন, বিপদ কেন, হুজুর?

—চিৎ হয়ে শুতে না পারলে শুয়ে শুয়ে কডিকাঠ-এ টিকটিকির খেলা দেখে কি করে?

ল্যাংড়া জবাব দিতে দেরি করে না।—জী হুজুর, বিবি আমার উপুর হয়ে শুয়ে নেংটি ইদুরের লুটোপুটি দেখতেই ভালোবাসে।

খলিফা ল্যাংড়ার বাক-চাতুর্যে মুগ্ধ হন। তারিফ জানিয়ে বলেন, সাবাস! তোমার কথায় খুব খুশি হয়েছি। বলো, কি চাও? আমি তোমার মনোবাঞ্ছা পূৰ্ণ করতে চাই।

ল্যাংড়া বলে, সত্যপথে থেকে প্রজােপালন করুন—এই আমার একমাত্র কামনা। আর কিছু চাই না।

এই বলে ল্যাংড়া আবু বাহর আর ক্ষণমাত্র অপেক্ষা না করে খলিফার কাছে বিদায় নিয়ে চলে গেলো।

খলিফা আনন্দিত হয়ে বললেন, সমগ্র ইরাকে যদি আর একজনও জ্ঞানী ব্যক্তি না থাকে তাতেও আমার দুঃখ নাই। আবু বাহর একাই একশো।

নুজাৎ বলে, খলিফা উমর ইবন আল-খাতাবের শাসনকালে কোষাগারের খাজাঞ্চী ছিলেন বৃদ্ধ মুয়াইকিব। তার মতো ধর্মপ্ৰাণ সৎব্যক্তি খুব কমই দেখা যায়। একদিন খলিফা উমরের ছোট ছেলেটি আয়ার হাত ধরে বেড়াতে বেড়াতে বৃদ্ধ মুয়াইকিবের কাছে এসেছিলো। বৃদ্ধ খাজাঞ্চী তাকে আদর করে একটা আনকোরা চকচকে রূপের দিরহাম হাতে দেয়। এর কয়েকদিন বাদে খলিফা খাজাঞ্চকে ডেকে বললেন, তোমার নামে এসব কি শুনছি। খাজাঞ্চী?

—কী শুনেছেন, জাঁহাপনা?

—কোষাগার থেকে তুমি অর্থ অপহরণ করেছে!

—ইয়া আল্লাহ, একি শোনালেন, হুজুর। সারা জীবনে আমি কারো একটা দিরহাম নিইনি।

–কিন্তু তা হলে আমার বাচ্চাটাকে একটা দিরহাম দিলে কোথা থেকে?

বৃদ্ধ আশ্বস্ত হন।–ও, এই কথা, একখানা খাতা এনে সুলতানের সামনে মেলে ধরে, এই দেখুন জাঁহাপনা, শাহজাদার নামে এক দিরহাম খরচ লিখে রেখেছি।

খলিফা। তবু সন্তুষ্ট হতে পারেন না।–কিন্তু কার পয়সা তাকে দিয়েছ? সমগ্র মুসলমান জাতের কাছে ঋণী করে রাখলে তাকে?

মুরাইকিব অবাক বিস্ময়ে খলিফার দিকে চেয়ে থাকে। সারা জীবনে সে নিজেকেই একমাত্র সৎ বলে মনে করে এসেছে। আজ মনে হলো, সুলতান উমরের কাছে তার সততা নিতান্তই নগণ্য।

একদিন অন্ধকার রাতে আসলাম আবু জাইদকে সঙ্গে নিয়ে খলিফা উমর শহর পরিক্রমায় বেরিয়ে অদূরে একটা আলোর শিখা দেখতে পেয়ে কাছে গেলেন। দেখলেন, এক রমণী রাস্তার একপাশে কাঠ জ্বলিয়ে একটা হাঁড়িতে জল গরম করছে। ছোট ছোট দুটি রুগ্ন শিশু তার পাশে বসে আছে। খলিফা জিজ্ঞেস করলেন, হ্যাঁ গা মেয়ে, এই অন্ধকার রাতে রাস্তার উপর বসে কি করছো?

—একটু পানি গরম করছি, বাবা। আমার বাচ্চা দু’টোর খাবার-দাবার কিছুই জোগাড় হয়নি। তাই একটু পানি গরম করে খাওয়াবো। আমার দুঃখের কথা আর কাকে বলবো, খোদাতালা দেখছেন। আমার দুধের বাছারা এক মুঠো দানা পায় না। খলিফাকে একদিন এর জন্যে আল্লার দরবারে জবাবদিহি করতে হবে।

খলিফা বলেন, ওগো ভালোমানুষের মেয়ে, তোমার কি ধারণা, তোমাদের এই দুঃখ কষ্ট জেনেও খলিফা চুপ করে বসে আছেন? এত বড় শহরে কে কোথায় না খেয়ে দিন কাটাচ্ছে, না বললে, তিনি জানবেন কি করে?

মেয়েটি এবার ঝাঁঝালো সুরে চটে ওঠে, প্রজাদের সুখ দুঃখের খবরই যদি তিনি না রাখতে পারেন তবে খলিফা হওয়ার অতি সাধ কেন?

খলিফা তার কোন জবাব দিতে পারেন না। আসলাম আবু জাইদিকে সঙ্গে নিয়ে প্রাসাদে ফিরে আসেন। ভাঁড়ার থেকে চটপট এক বস্তা আটা আর এক ঝারি চর্বি নিয়ে আসেন। আবু জাইদকে বলেন, ধরে তো জাইদ, আটার বস্তাটা আমার পিঠে তুলে দাও।

আবু জাইদ অবাক হয়।–সে কি জাঁহাপনা, আপনি পিঠে বয়ে নিয়ে যাবেন? কোনও চাকরকে ডাকছি, সে দিয়ে আসবে মেয়েটার কাছে।

–তা হয় না জাইদ।

–তা হলে, আমাকে দিন, আমি পিঠে বয়ে দিয়ে আসছি, জাঁহাপনা!

খলিফা বলেন, তা হতে পারে না জাইদ। আল্লাহর দরবারে শেষ বিচারের দিন, আমার পাপের বোঝা কি তুমি পিঠে বইবে?

খলিফা নিজেই বয়ে নিয়ে গেলেন। সেই আটার বস্তা আর চর্বির ঝারি। সেই গরীব মেয়েটির পাশে নামিয়ে নিজেই খানিকটা আটা মেখে পরটা বানাতে লাগলেন। অনেক কসরৎ করে সেই নিভু নিভু আগুনের আঁচে পরটাগুলো ভাজা করে বাচ্চা দুটো আর তার মাকে পেটপুরে খাওয়ালেন। ওদের খাওয়া শেষ হলে একখানা ঠাণ্ডা চিমসে পরটা নিয়ে খলিফা নিজেও খেলেন। অনেকক্ষণ আগের ভাজা, তখন আর গরম ছিলো না।

বাকী আটা চর্বি সব মেয়েটিকে দিয়ে খলিফা প্রাসাদের পথে রওনা হলেন। আসতে আসতে আবু জাইদকে বললেন, মেয়েটির কথায় আজ আমার চোখের পর্দা সরে গেছে, সব অন্ধকার কেটে গেছে। ও নিজেই একটা জ্বলন্ত আগুনের শিখা।

নুজাৎ নীতি কথা শোনাচ্ছে :

একদিন খলিফা উমর মাঠের পথ ধরে হেঁটে চলেছেন। দেখলেন, এক রাখাল কতকগুলো ছাগল চরাচ্ছে। খলিফা ছেলেটির কাছে গিয়ে বললেন, আমায় একটা ছাগল বিক্রি করবে?

রাখাল ছেলেটি অবাক হয়। বলে, ছাগলগুলোতে আমার নয়, জনাব। আপনি যদি কিনতে চান, আমার মালিকের সঙ্গে কথা বলুন। আমি তার কেনা গোলাম।

খলিফা মুগ্ধ হলেন। দুনিয়াতে অসৎ লোকের ভিড়ে এমন একটা সৎ ছেলের সন্ধান পেলে আনন্দ হওয়ারই কথা। খলিফা বললেন, তোমার মালিকের কাছে চলো। আমি তোমাকেই কিনতে চাই।

–কেন জনাব?

খলিফা বললেন, পথে বেরুলেই রোজ রোজ সৎ মানুষের দেখা মেলে না। আজ তোমাকে দেখে আমি ধন্য হয়েছি! তোমার মালিকের কাছ থেকে ছাড়িয়ে আমি তোমাকে মুক্তি দিতে চাই। আর কোনও ধরা বাঁধা নিয়মের মধ্যে তোমাকে দাসত্ব করতে হবে না। তোমার যেখানে খুশি যেতে পারবে। যা প্ৰাণ চায়, করতে পারবে।

একদিন হাফসা নামে খলিফার এক নিকট আত্মীয় এসে বলে, ধর্মাবতার, শুনলাম, আপনি অনেক ধনদৌলত নিয়ে দেশে ফিরছেন। তা আমি তো আপনার এক শরিক। আমার ভাগের অংশটুকু আমি নিতে এসেছি।

অবষ্ট বলে মনে করছ, সবই আমার মুসলমান প্রজাদের সম্পত্তি। তার একটি কানাকড়িও আমার নয়। তাছাড়া প্রজা হিসাবেও তোমাকে কিছু দিতে পারি না। তার কারণ তোমার বাবা আমার সহোদর ভাই। লোকে বলবে, স্বজন পোষণ করছি।

নুজাৎ শুনতে পায় পর্দার ওপর থেকে-বহুৎ খুব বহুৎ খুব আওয়াজ উঠছে। হাততালিতে সারা ঘর ফেটে পড়েছে। নুজাৎ একটুক্ষণ থেমে থাকে। করতালি থামলে আবার শুরু করে :

এবার আমি তৃতীয় পর্যায়ের কথা বলবো। পুণ্যবানরা এই স্তরে পৌঁছতে পারে।

হাসান অল বসরি বলেছেন, মানুষ তার অন্তিম সময়ে এই তিনটি কথা স্মরণ করে দুঃখ পায়। এক—হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলা। দুই—অপূৰ্ণ বাসনা। তিন—অতৃপ্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষা।

একদিন সুফিয়াকে একদল লোক জিজ্ঞেস করেছিলো, ধনীরা কি পুণ্যবান হতে পারে?

তিনি জবাব দিয়েছিলেন, পারে। যখন তারা তাদের ধনদৌলত খুইয়ে সর্বস্বাস্ত হয়, তখন পারে। আর পারে, যখন সে শ্রদ্ধার সঙ্গে দান করতে পারে। আপনি অনুগ্রহ করে আমার এই দান গ্রহণ করে আমাকে কৃতাৰ্থ করুন, এই কথা যে অন্তর থেকে বলে দান করতে পারে-সে পুণ্যাত্মা’।

আবদাল্লাহ ইবন সাদ্দাদ মৃত্যুকালে তার পুত্র মহম্মদকে ডেকে উপদেশ দিয়েছিলেন : ধর্মে মতি রেখো, সৎপথে চলো এবং আল্লাহর প্রতি ভক্তি যেন তোমার অটুট থাকে। আর একটা কথা খুব ভালো করে মনে রেখো, বাবা, সম্পদে সুখ হতে পারে, কিন্তু আনন্দ পাবে না। ভোগে কোনও আনন্দ নাই, ত্যাগেই ‘পরম পাওয়া’ পেতে পারো।

ধর্মাত্মা আবদ আল আজিজ যখন উমায়াদের অষ্টম খলিফা হয়ে সিংহাসনে বসেন, তখন তিনি একদিন শহরের বিত্তবানদের ডেকে বললেন, তোমাদের প্রয়োজনীয় বিষয়সম্পত্তি রেখে বাকী সব সরকারের তহবিলে জমা করে দাও।

খলিফার এই কথা শুনে তারা ক্ষুব্ধ হলো। খলিফার পিসি ফাতিমার কাছে গিয়ে নালিশ জানালো। ফাতিমাকে খলিফা বিশেষ শ্রদ্ধা করতেন। একদিন রাতে ফতিমা খলিফার শয়নকক্ষে এসে গালিচার একপাশে চুপ করে বসে রইলো।

খলিফা জিজ্ঞেস করেন, কি খবর পিসিমা, কি বলবে, বলো।

ফতিমা বলে, তুমি হচ্ছে ধর্মাবতার খলিফা। তোমার সামনে এসে আগে আমার কথা বলা সাজে না। যা প্রশ্ন করবে, আমি তার জবাব দেব, এইটাই রীতি। আর তোমার অজানা তো কিছুই থাকতে পারে না। কেন এসেছি, তাও তুমি জান।

খলিফা বললেন, আল্লাহ তার পয়গম্বরকে পাঠান, মানুষের মাঝে খুসবু ছড়াতে। এবং মানব ধর্মের উন্মেষ ঘটাতে। নদী যেমন তৃষ্ণার্তকে জল দান করতে করতে বয়ে যায় পয়গম্বর-এর পুণ্য-জীবনও ঠিক তেমনি। তিনি নিজে কিছুই গ্রহণ করেন না। দান করতে করতে চলে যান। তাকে অবলম্বন করে কত লোকে বৈতরণী পার হয়। আর আমার একমাত্র কাজ—এই স্রোতস্বিনী যাতে শুকিয়ে মরুভূমি না হয়ে যায়—তাই দেখা।

পর্দার ওপর থেকে নুজাৎ নীতি কথা বলে চলেছে! আর পর্দার এপাশে সারকান চার কাজী ও সওদাগরকে সঙ্গে নিয়ে গভীর আগ্রহে শুনছেন :

ফাতিমা বলে, তোমার সব কথাই আমি বুঝতে পেরেছি। বেটা। যে কথা জানতে এসেছিলাম তার জবাব আমি পেয়ে গেছি। আর কিছু বলার নাই।

ফাতিমা ফিরে গিয়ে বিত্তবানদের বললো, তোমাদের জন্মজন্মান্তরের ভাগ্য যে, খলিফা উমর ইবন আবিদ-অল-আজিজের মতো সুলতান পেয়েছ। সে যা বলে, মাথা পেতে নাও।

স্পষ্টবাদী উমর মৃত্যুকালে তার সন্তানদের উপদেশ দিয়ে গেছেন : দারিদ্র্য অভিপ্রেত নয়, কিন্তু দারিদ্র্যের সম্পর্শ শোকার প্রয়োজন অপরিহার্য। আল্লাহর সান্নিধ্য পেতে গেলে দারিদ্র্যের স্পর্শ অনুভব করতে হবে।

তার শয্যাপার্শ্বে মসলামাহ ইবন আবদ আল মালিক উপস্থিত ছিলেন। তিনি জানতে চাইলেন, লোকে বলছে আপনি আপনার সন্তানদের সম্পত্তির এক কপর্দকও দিয়ে গেলেন না। অথচ ইচ্ছা! করলেই বিত্তবান করে রেখে যেতে পারতেন।

খলিফা অবাক এবং উত্তেজিত হয়ে ওঠেন, তুমি কি বলতে চাও মসলামাহ, সারা জীবন ধরে ন্যায় পথে চলে, শেষে মৃত্যুকালে এই জঘন্য মিথ্যাচার করে যাবো! তাহলে সারা জীবন ধরে যেটুকু পুণ্য সঞ্চয় করেছি-এক ফুৎকারে উবে গিয়ে আমার জন্যে দোজকের দরজা খুলে যাবে যে? ছোটবেলায়, মনে আছে, আমার এক পূর্বসূরীর শবযাত্রায় সামিল হয়েছিলাম। তিনি তার জীবদ্দশায়, অন্যায় অনাচার, অবিচারের চূড়ান্ত করেছিলেন। ফলে তার মৃত্যুতে লোকে হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিলো। আল্লাহর কাছে নালিশ জানিয়েছিলো, তার যেন দোজক বাস হয়। সেইদিন থেকে আমি হলফ করেছিলাম, তার মতো অসৎ ব্যবহার আমি যেন মানুষের সঙ্গে না করি। আমি যদি খলিফা হই, আমার প্রজারা যেন বলতে না পারে, আমি কোনও অন্যায় অবিচার করেছি।

এই মসলামাহ আল মালিক একবার বলেছিলেন, একদিন এক ইচ্ছামৃত বৃদ্ধের শবদেহ সমাধিস্থ করে রাত্রে শুয়েছি—স্বপ্নে দেখলাম, সেই বৃদ্ধ আমার শিয়রে এসে দাঁড়িয়েছেন।–শোনো, মসলামাহ, জীবনে এমন কিছু কাজ করে যাবে যার জন্যে পুরস্কার আশা করতে পারো।

তিনি একটা কিসসাও বলেছিলেন : উমর ইবন আবদ আল-আজিজের শাসনকালে এক যুবক তার এক রাখাল বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলো। একপাল ছাগল ভেড়ার মাঝখানে ইয়া তাগড়াই এক জোড়া কুকুর দেখে অবাক হয়ে সে জিজ্ঞেস করে, আচ্ছা দোস্ত, তোমার এই ছাগল ভেড়ার মধ্যে ঐরকম জাঁদরেল কুকুর দু’টো রেখেছে কেন?

রাখাল বন্ধু জবাব দেয়, উন্থ, ওদুটো আসলে কুকুর না।

–তবে?

–পোষ মানানো নেকড়ে।

—কী করে পোষ মানালে? ওরা ছাগল ভেড়া খেয়ে ফেলে না?

–মারের ভয় দেখিয়ে। ওরা জানে থাবা বাড়ালে ঠ্যাং খোড়া করে দেব আমি। আসল কথা কি জান দোস্ত, কাল্লা শক্ত থাকলে ধড়েও তাগাদ থাকে।

একদিন খলিফা উমর ইবন আবিদ-আল-আজিজ মাটির তৈরি একটা সিংহাসনে বসে প্রজাদের উদ্দেশে বাণী দিলেন, আবদ আল মালিক মারা গেলেন, তারা বাবাও গত হয়েছেন। কিন্তু তাদের কি দুর্ভাগ্য, তারা কোনও সুনাম রেখে যেতে পারেননি। আমিও তো ঐভাবেই একদিন মরে হারিয়ে যাবো। তাই আজ বিনোদনের সব উপকরণ এখন থেকে আমি পরিহার করে চলবো।

–কিন্তু তাই বলে, মসলামাহ বললেন, মাটির আসনে বসা আপনার শোভা পায় না। একখানা কুশন পেতেও বসুন, জাঁহাপনা।

খলিফা চটে উঠলেন, ‘শেষ বিচারের দিন ঐ কুশন যখন শিকল বেঁধে ঝুলিয়ে দেবে আমার গলায়, তোমার খুব আনন্দ হবে, না?

নুজাৎ বলছে আর চার কাজী ও সওদাগর সহ সুলতান সারকান শুনছে ৪ খলিফা আবিদ-আল-আজিজ একদিন বলেছিলেন, আল্লাহ আমাকে চিরজীবী করে পাঠাননি। যে কোন ধর্মাত্মার কাছে মৃত্যুই তীর সবচেয়ে বড় আশীৰ্বাদ।

একদিন খলিফা হিসারাম এক তাঁবুতে তার পাত্বমিত্র পরিষদ পরিবৃত হয়ে বসেছিলেন। এমন সময় খলিদ ইবন সফবান এসে বললেন, ধর্মাবতার আল্লাহ। আপনার মঙ্গল করুন। আজ আপনাকে নীতিগৰ্ভ কাহিনী শুনিয়ে যাবো।

এক সুলতান একদিন তার পরিষদদের বলেছিলেন, আমার মতো মহান উদার দয়ালু এবং বিত্তশালী বাদশাহ কি তোমরা কখনও দেখেছে?

তখন এক প্রবীণ বিজ্ঞ ধর্মানুরাগী পারিষদ উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, জাঁহাপনা, আপনি খুব কঠিন প্রশ্ন করেছেন। যাই হোক, জবাব দেবার আগে সবিনয়ে আপনাকে একটি প্রশ্ন করতে চাই—আপনি কি মনে করেন আপনার এই অতুল বৈভব চিরস্থায়ী হবে?

সুলতান জবাব দিলেন, ধনদৌলত কখনও চিরস্থায়ী হয় না।

পারিষদ বললেন, তাহলে আপনি অত গর্ব করে এরকম প্রশ্ন করছেন কেন?

খলিফা বললেন, তা হলে আমার কি করা উচিত, বলো।

–নিজেকে নির্মল পবিত্র রাখুন। পাপ-চিন্তা করবেন না। অহঙ্কার পরিত্যাগ করুন। অনাড়ম্বর জীবনযাপন করুন। আল্লাহর পায়ে নিজেকে সঁপে দিন।

সেই দিন থেকে খলিফা মাথার মুকুট খুলে নামিয়ে রাখলেন। বাদশাহী সাজপোশাক ফেলে দিয়ে দীন দরিত্র যে পোশাক পরে সেই মোটা জামা কাপড় পরলেন। একটি মাত্র কম্বল সম্বল করে মক্কার পথে যাত্রা করলেন।

এই সময় পর্দার ওপর থেকে চার কাজী আর সওদাগর তারিফ জানিয়ে বললেন, আহা-হা, কি কথাই শুনলাম। অমৃত সমান। শুনে জীবন সার্থক হয়ে গেলো।

নুজাৎ বলে, এই পর্যায়ে আরও অনেক উৎকৃষ্ট উদাহরণ দিতে পারি। কিন্তু আজ এই আসরে সব শোনানো সম্ভব নয়। যদি সুযোগ হয়, আর একদিন শোনাবো।

এই বলে নুজাৎ চুপ করলো।

চার কাজী নুজাতের প্রশংসায় মুখর হয়ে ওঠে। এ রমণী যুগের আলো। দেশের গৌরব। আমাদের সুলতান পরম ভাগ্যবান। তার মতো রূপে গুণে অনন্যা আর একটিও আমাদের চোখ পড়েনি।

এই বলে তারা সকলে সারকানকে কুর্নিশ জানিয়ে বিদায় নিলো।

সারকান তার দাসদাসীদের ডেকে হুকুম দিলো, জলদি শাদীর আসর সাজাও। শাহী খানা পাকাও। আজ রাতে আমি শাদী করবো।

মুহুর্তের মধ্যে সারা প্রাসাদে সাজে। সাজে। রব পড়ে গেলো। সন্ধ্যা না হতেই আলার মালায় সাজানো হলো প্রাসাদ। দামাসকাসের বাহারী ফুল এলো, আতর টু, আিম গোলাপজল, সুগন্ধী আগরবাতি এলো, এলো দামী দামী সরাব, মাংস, মিঠাই মণ্ডা। উৎসবে মেতে উঠলো সবাই। আমীর ওমরাহদের বিবিরা-যারা এসেছিলো, সবাইকে শাদী দেখার নিমন্ত্রণ জানালো সারকান। উপস্থিত অভ্যাগতদের এলাহী খানাপিনার ব্যবস্থা করা ভঁঠু হলো। শহরের সম্ভ্রান্ত সওদাগর আমির ওমরাহরা এসে সারকানকে শুভেচ্ছা জানিয়ে গেলো।

হামাম থেকে গোসল সেরে শাদীর আসরে এসে বসলো শাহজাদা সারকান। মেয়েরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানালো। কুমারী মেয়েরা নুজাৎকে অপরূপ সাজে সাজিয়ে নিয়ে এসে বাসর কক্ষ প্রদক্ষিণ করিয়ে সারকানের সামনে দাঁড় করাতে লাগলো। প্রতিবার নতুন নতুন সাজে সজ্জিত করে পরপর সাতবার নুজাৎকে এইভাবে বাসর কক্ষ প্রদক্ষিণ করানো হলো। শাদীর এই চিরাচরিত প্রথা। সপ্তপদী শেষ হলে নুজাৎকে আবার তারা পাশের ঘরে নিয়ে যায়। এবার রীতি অনুযায়ী তাকে বিবস্ত্রা করা হয়। একজন বৃদ্ধ পরিচারিকা পাত্রীর সর্বাঙ্গ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখে। পাত্রীর দেহ পাত্রের সঙ্গে সহবাসের উপযুক্ত হয়েছে কিনা—পরীক্ষা করার একমাত্র উদ্দেশ্য তাই। বৃদ্ধা দেখলো পাত্রী একেবারে তৈরি। শুভেচ্ছা জানিয়ে সে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলো।

সারকান এবার নুজাতের পাশে বসে। ভাবতেও পারে না, পাত্রী তার নিজেরই বোন। শাদীর প্রথম রাতেই নুজাৎ অন্তঃসত্ত্বা হলো। মিলনের আনন্দে নুজাৎ সারকানের হৃদয় কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে।

সারকান তার একান্ত সচিবকে ডেকে বললো, বাগদাদে খলিফা উমর অল নুমানকে চিঠি পাঠাতে হবে।

সচিব কাগজ কলম নিয়ে এলো। সারকান চিঠির বয়ান বলে যায় : আমি এক পরমা সুন্দরী গুণবতী বাঁদীকে কিনে মুক্ত করে দিয়েছি। এবং পরে তাকে শাদী করে আমার বেগম করে নিয়েছি। প্রথম রাতেই আপনার পুত্রবধু গৰ্ভবতী হয়েছে। আপনার আশীর্বাদ নেবার জন্য অতি শীঘ্র তাকে বাগদাদে পাঠাবো। সে তার ননদ নুজাৎ এবং দেবর দু-আল-মাকানকেও দেখে আসবে।

একজন দ্রুতগামী অশ্বারোহীর হাতে চিঠিখানা পাঠানো হলো। আটদিন পরে সে জবাব নিয়ে ফিরে আসে।

সুলতান উমর অল নুমান-এর চিঠির বক্তব্য মোটামুটি এইরকম :

প্ৰাণাধিক পুত্র সারকানের প্রতি শোক দুঃখ জর্জরিত হতভাগ্য পিতা উমর-আল-নুমানের পত্র।

শোন বাবা, তুমি এখান থেকে যাওয়ার পরে নানাভাবে আমার ভাগ্য বিড়ম্বিত হয়েছে। আমি আজ শোকে তাপে জর্জরিত। আমার প্রিয় পুত্র দু-আল-মাকান এবং নয়নের মণি নুজাৎ আর প্রাসাদ নাই। কাজের তাগিদে বাগদাদ ছেড়ে যেতে হয়েছিলো আমাকে। মাসাধিককাল পরে অষ্টম ফিরে এসে শুনলাম, তোমার ভাই মাকান আর বোন নুজাৎ তীর্থযাত্রীদের দলে ভিড়ে মক্কায় চলে গেছে। মাকান আমার কাছে বায়না ধরেছিলো, সে মক্কা যাবে। কিন্তু তার এই নাবালক বয়স-এই বয়সে কি কেউ তীর্থধর্ম করতে যায়? আমি তাকে অনেক বোঝাবার চেষ্টা করেছিলাম। এও বলেছিলাম, সামনের বারে আমি তাকে সঙ্গে করে নিয়ে যাবো। কিন্তু সে-কথা তার মনঃপুত হয়নি। আমাকে লুকিয়ে তার দিদির সঙ্গে সে পালিয়ে চলে গেছে। সেই থেকে অনেক সন্ধান করেছি, মক্কায় লোক পাঠিয়েছি, কিন্তু কোন হদিস করতে পারিনি। শোকে দুঃখে। আমি বড় কাতর হয়ে পড়েছি। বিশেষ আর কি লিখি। আগামীতে তোমার কুশল জানাবে।

এর কিছুদিন পরে নুজাৎকে আসন্ন প্রসবা রেখেও সারকান বাগদাদে যেতে বাধ্য হয়। তার কারণ বাবার অসুস্থতা। বাবাকে দেখে সে যখন ফিরে আসে, নুজাৎ তার সাতদিন আগে একটি ফুটফুটে সুন্দর কন্যার জন্ম দিয়েছে।

নুজাৎ বললো, আজ সাতদিনের দিন মেয়ের নামকরণ করতে হয়।

সারকান মেয়েকে কোলে তুলে আদর করতে থাকে। মেয়ের গলার হারে একটা লকেটে তার চোখ আটকে যায়। একি। এতো সেই পাথর! সারকান চিৎকার করে ওঠে, তুমি এ পাথর পেলে কোথায়? এতো সেই তিন দৈব-পাথরের একখানা। হতভাগী ইরাবিজা বাবাকে দিয়েছিলো? শিগগির বল বাঁদী, কোথায় পেলি তুই এ পাথর?

সারকানের মুখে এই ‘বাঁদী’ ডাক শুনে নুজাৎ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে।–মুখ সামলে কথা বলে। আমি তোমার শাদী করা বেগম। বাদী বলতে লজ্জা করলো না? তুমি আমাকে সওদাগরের কাছ থেকে পয়সা দিয়ে কিনেছিলে বলেই ভেবেছো আমি নাম গোত্রহীন একটা বেজন্মা মেয়েমানুষ। তবে শোনো, তুমি যেমন শাহজাদা, আমিও তেমনি শাহজাদী। এতদিন গোপন করে রেখেছিলাম, কিন্তু আজ আমার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে। আমার বাবা বাগদাদের উমর অল-নুমান। আমার আসল নাম নুজাৎ-আল-জামান।

এক নিশ্বাসে এতগুলো কথা বলে নুজাৎ হাঁপাতে থাকে।

নুজাতের কথা শুনে সারকান নিশ্চল পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। একি নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাস। তার নিজের বোন তার অঙ্কশায়িনী বেগম। ছিছিছি!লজায় মাথা কাটা গেলো? হায় আল্লাহ, একি শাস্তি আমাকে দিলে! জীবনে এমন কি পাপ আমি করেছি!

অনুতাপ অনুশোচনায় দগ্ধ হতে লাগলো তার হৃদয়। সারকানের এখনও বিশ্বাস করতে ইচ্ছা! করে না, এই সেই নুজাৎ—উমর-আল-নুমানের কন্যা। সারকান ঠিক ঠিক শুনেছে তো?

নুজাৎও কাঁদতে  থাকে, হায় আল্লাহ, এ পাপের প্রায়শ্চিত্ত কি দিয়ে হবে?

সারকান বলে, না জেনে যা করেছি। তার জন্যে আমরা কেন দায়ী হবো। যাই হোক, এখন যখন জানতে পারলাম, তোমার আমার এ সম্পর্ক আর থাকা উচিৎ না। আজই আমি আমার দরবারের এক পদস্থ সচিবের সঙ্গে তোমার শাদীর ব্যবস্থা করছি। আমি বললে সে না’ করতে পারবে না। আমাদের মেয়েও তার কাছেই মানুষ হবে।

নুজাৎও সারকানের প্রস্তাবে সম্মতি জানায়। বলে, সেই ভালো, যত তাড়াতাডি হয় ব্যবস্থা কর।

সেইদিনই অনাড়ম্বরভাবে নুজাতের শাদী হয়ে গেলো এক উচ্চপদস্থ কর্মচারীর সঙ্গে। বাচ্চাটার দেখাশুনা করার জন্য সারকান আয় চাকরের ব্যবস্থা করে দিলো।

এর কয়েকদিন পরে বাগদাদ থেকে দূত এলো উমর-আল-নুমানের বার্তা নিয়ে। সুলতান উমর লিখেছে, এখনও নুজাৎ-মাকানের কোনও সন্ধান পাওয়া যায়নি। সন্তান শোকে সে মুহ্যমান। কনসন্তানতিনোপল থেকে এক বুড়ি এসেছে। সঙ্গে এনেছে পাঁচটি পরমাসুন্দরী যুবতী। বুড়ি বলেছে, শুধু রূপ নয় গুণেও নাকি তাদের জুড়ি মেলা ভার। নানা শাস্ত্ৰে সুপণ্ডিত, বিদূষী। মেয়ে পাঁচটি উমরের কাছে সে বিক্রি করতে এসেছে। কিন্তু দাম হিসাবে নগদ অর্থ সে চায় না। এখানকার বাহারী জিনিসপত্রে দাম মিটিয়ে দিলেই সে খুশি হবে। বাগদাদের নামজাদা জিনিসপত্র সব জোগাড় করা হয়েছে। এখন সারকান যেন দামাসকাসের নামজাদা সামানপত্ব পাঠিয়ে দেয় এখানে। সেই সঙ্গে তার সদ্য-বিবাহিত বিবিকেও পাঠাবার নির্দেশ দিয়েছে সে। উমর শুনেছিলো, সারকানের স্ত্রী বিদূষী। বুড়ির ঐ মেয়ে, পাঁচটিকে যাচাই করে নিতে গেলে পুত্রবধূকে নিতান্তই দরকার। তাই সারকান যেন আর বিলম্ব না করে জিনিসপত্রের সঙ্গে তাকেও সত্বর পাঠিয়ে দেয়।

উমর-আল-নুমানের চিঠিখানা পড়ে সারকান চিন্তিত হয়। কি করা উচিৎ কিছুই ঠিক করতে পারে না। নুজাৎকে ডেকে পাঠায়। সে লেখাপড়া জানা বুদ্ধিমতী মেয়ে। তার সঙ্গে একবার পরামর্শ করা দরকার।

নুজাৎ এসে সব শুনে বলে, আমি আর কি বলবো, তুমিই এ ব্যাপারে ভালো বুঝবে। তবে আমার মনে হয়, আমাকে বাগদাদে পাঠিয়ে দেওয়াই ভালো। গোড়া থেকে সব বৃত্তান্ত বাবাকে খুলে বলা দরকার। তুমি একটা চিঠিতে লিখে দাও, কিভাবে আমি বাদাবী সর্দারের হাতে গিয়ে পড়ি। তারপর সওদাগরের হাত ঘুরে তোমার হাতেই বা কি করে এলাম, সব লিখে দাও। তুমি আমাকে না জেনে শাদী করেছিলে, তাও লিখবো। শুধু লিখবে না, তুমি আমার সঙ্গে সহবাস করেছো। আমার পরিচয় জানার পর তুমি তোমার দরবারের এক পদস্থ কর্মচারীর সঙ্গে আমার আবার শাদী করিয়ে দিয়েছ।

নুজাতের পরামর্শ সারকানের খুব পছন্দ হয়। দামাসকাসের বাজার থেকে দামী দামী বাহারী বিলাস সামগ্ৰী সংগ্রহ করে উটের পিঠে বোঝাই করা হলো। নুজাতের সঙ্গে বাগদাদে পাঠাবে। প্রতি বছরই বাগদাদে ভেট পাঠানো হয়। এবারে তার বহরটা কিছু বেশি। তার কারণ, স্বয়ং সুলতান নিজে থেকে খৎ পাঠিয়েছে। বাছাই করা দামী দামী জিনিসপত্র পাঠাতে হবে। পাঁচটি গ্ৰীক সুন্দরীর মূল্য হিসাবে এই সব বিলাস সামগ্ৰী বুড়িকে দিতে হবে। একটা উটের পিঠে দোলা বাঁধা হলো। এই দোলায় চেপে যাবে নুজাৎ। আর বাকী উটগুলোর পিঠে বাঁধা-ছাঁদা হতে  লাগলো জিনিসপত্র। এই সব বাদশাহী ভেটের সামানপত্র দেখার জন্য শহরের কৌতূহলী মানুষ ভিড় করে এলো।

এই সময় দু-আল-মাকান আর তার সঙ্গী সেই বৃদ্ধ শহরের নানা পথ ঘুরতে ঘুরতে সেখানে এসে দাঁড়ায়। একজন কর্মচারীকে জিজ্ঞেস করে। মাকান জানতে পারে, এই সব লাট-বহর যাবে বাগদাদে। সুলতান উমর-আল-নুমানের ভেট। মাকান-এর চোখ জলে ভরে আসে। বৃদ্ধকে বলে, সে-ও যাবে। এদের সঙ্গে। কতদিন হলো বাগদাদ ছেড়ে এসেছে সে। এদের পিছনে পিছনে গেলে একদিন সে বাগদাদে পৌঁছে যাবে। এ সুযোগ সে হারাতে চায় না। বৃদ্ধ বলে, মাকানকে সে একা ছেড়ে দিতে পারে না। সে যদি একান্তই যেতে চায়, বৃদ্ধ তার সঙ্গে যাবে।

গাধাটার পিঠে মাকানকে চাপিয়ে সে বলে, চলতে চলতে তোমার যখন কোমর ধরে যাবে, তখন না হয়, নেমে একটু হেঁটে যেও। হাত পায়ের আড় ভাঙ্গবে। আমি সেই সময় গাধার পিঠে চাপবো।

তিন দিন চলার পর যাত্রীদল এক শহরের মুখে এসে থামে। এইখানে বিশ্রাম নেওয়া হবে। তিন দিন। পথের শ্রান্তি কাটিয়ে আবার তারা রওনা হবে। মাকানও গাধার পিঠ থেকে নামে। বৃদ্ধ গাধাকে দানাপানি খাওয়ায়। নিজেরাও খানাপিনা সারে। একটা সরাইখানায় শোবার জায়গা করে নেয়। চাঁদনী রাত। দক্ষিণা হাওয়া বইছে। দু-আল-মাকানের মন উদাস বাউল হয়ে ওঠে। গুণ গুণ করে গান ধরে। মাকানের গলা বড় মিষ্টি।

ওপাশে নুজাৎরা তাঁবু গেড়েছে। তার সদ্য-বিবাহিত স্বামী পাশে শুয়ে ঘুমুচ্ছে। অন্য তাঁবুগুলোতে সরকারী কর্মচারী, চাকর নফর দাস দাসীরাও ঘুমিয়ে পড়েছে। পথশ্রমে ক্লান্ত উট, ঘোড়া, গাধা, খচ্চরগুলোও জিরিয়ে নিচ্ছে। শুধু জেগে আছে প্রহরীরা। আর জেগে আছে নুজাৎ। তার চোখে ঘুম আসে না। কতকাল পরে দেশে ফিরছে—অথচ একা। প্রাসাদ থেকে তারা দুই ভাইবোন একসঙ্গে পথে বেরিয়েছিলো। তারপর পথের মধ্যেই ভাইকে সে হারালো। এখন বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়াবে কি করে? কি জবাবা-দিহি করবে। তার কাছে? কি সান্ত্বনা তাকে দেবে? এই নিদারুণ পুত্রশোক কি করে সহ্য করবেন। তিনি। নুজাতের দু’ গাল বেয়ে অশ্রুধারা নামে। হঠাৎ মিষ্টি একটা গানের কলি ভেসে আসে তার কানে। নির্জন নিশুতি রাত।

নুজাৎ পিছন হাতড়াতে থাকে। এই গান, এই সুর, এই গলা-এ সবই তো তার চেনা চেনা। মাকানের গলাও ঠিক এমনি মিষ্টি মধুর ছিলো। তার এই গানের সুর-হ্যাঁ হ্যাঁ, মনে পড়ে—এই সুরে এই গান সে প্রায়ই গাইতো। দ্বাররক্ষী খোজাকে ডেকে বলে, দেখ তো, কে গান গায়?

খোজা ভাবে, গানের চিৎকারে মালকিন ঘুমোতে পারছে না। একটা বেতের ছডি ঘোরাতে ঘোরাতে এগিয়ে যায়। এদিক ওদিক খুঁজতে থাকে। কিন্তু সরাইখানার সামনে সেই বৃদ্ধ ছাড়া আর কাউকেই চোখে পড়ে না। বৃদ্ধের কাছে এসে খোজা কড়া মেজাজে জিজ্ঞেস করে—একটু আগে এখানে গান গাইছিলো কে?

সুলতানের শমন। বৃদ্ধ শঙ্কিত হয়।–কই না, কেউ তো গায়নি বাবা।

খোজা চটে ওঠে, গায়নি মানে? আলবৎ গেয়েছে। আমি নিজে কানে শুনেছি। গায়নি। বললেই হলো? আর যদি কেউ না থাকে, তুমিই গেয়েছে।

বৃদ্ধ হাত জোড় করে।-বিশ্বাস করো বাবা, খোজা, আমি বুড়ো হাবড়া মানুষ। আল্লাহর নাম জপতপ করি। কিন্তু গলায় বোমা মারলেও সা বেরুবে না।

খোজা সন্দিগ্ধ চোখে বৃদ্ধের আপাদমস্তক দেখতে থাকে। হুম, লোকটা নেহাত মিথ্যে বলেনি। চেহারাচরিত্র দেখে অবশ্য মনে হয় না। গান-ফান জানে।

—যাই হোক শোনো, শেখ, আমাদের মালকিন-এর ঘুমের ব্যাঘাত হচ্ছে। যেই গ’ক, গান বন্ধ করো। তা না হলে খুব খারাপ হবে বলে দিচ্ছি।

ছডি ঘোরাতে ঘোরাতে খোজটা আবার তাঁবুতে ফিরে যায়।

বৃদ্ধ ভয়ে কাঁপতে কাঁিপতে মাকানের কাছে গিয়ে বলে, সব্বোনাশ হয়ে গেছে, বাবা।

মাকান ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসে।–কি সৰ্ব্বনাশ হলো, বাপ জান? চোর ডাকাত নাকি?

—আরে না। সুলতানের তাবু থেকে পেয়াদা এসেছিলো।

–কেন?

–তোমার গান শুনে আমিরের বিবি চটে গেছে। তার ঘুম নষ্ট হচ্ছে। তোমাকে পাকড়াও করতে এসেছিলো। তা আমি ভাগিয়ে দিয়েছি। বলেছি, এখানে কে গান গাইবে? শোনো, বাবা, তুমি আর গান টান করো না। না হলে আবার ব্যাটা তেড়ে আসবে।

—আসুক। দেখি কে কি করতে পারে! আমি আমার গান গাইবো। গান গাই না গাই আমার খুশি। আমিরের বিবির ভয়ে আমি গান বন্ধ করবো? কেন?

বৃদ্ধ বলে, বিদেশ বিভূঁই জায়গা। এই সময়ে একটা কিছু বিপদ আপদ ঘটলে কে রক্ষা করবে?

—কেন মাথা কেটে নেবে নাকি? আমার যত খুশি গাইবো। কারো মানা শুনবো না।

বৃদ্ধ কাঁদো কাঁদো হয়ে দরজার সামনে গিয়ে বসে পড়ে।

মাকান আবার গান ধরে

খোজা গিয়ে বলেছিলো, মালকিন, আশে পাশে কাউকেই দেখলাম না। মনে হচ্ছে পথচলতি কোন মানুষ গাইতে গাইতে চলে গেছে।

নুজাৎ ভেবেছিলো, হতেও পারে। তারই হয়তো মনের ভুল। মাকানের কথাই সে অহরহ চিন্তা করছে। তাই হয়তো অন্য কোনও লোকের গান শুনে মাকানের গলা বলে ভুল হয়েছে। কিন্তু একটু পরে যখন আবার শুনতে পেলো সেই একই গান, নুজাৎ খোজাকে ডেকে বললো, তুমি বোধ হয় ভালো করে তলাশ করে দেখনি। ওই শোনো, আবার গাইছে সেই গান—আর দেরি করো না। যাও দেখে এসো, কে গায়। নিয়ে এসো তাকে।

বৃদ্ধ দেখলো, খোজটা আবার হন হন করে ছুটে আসছে। মাকান তখন আবার গান থামিয়ে দিয়েছে। খোজটা কাছে এসে বাজখাই গলায় হুঙ্কার দেয়, এই না বললে, এখানে কেউ গাইছে না। এই তো একটু আগে আবার শুনলাম সেই গান।

–তুমি ভুল শুনেছো, পেয়াদা সাহেব। এই নিশুতি রাতে এখানে কে গান গাইবে!

খোজা ঝঙ্কার দিয়ে ওঠে, ভুল শুনেছি। ন্যাকামী পেয়েছে? চলো, তোমাকেই ধরে নিয়ে যাবে।

–রক্ষা কর বাবা খোজা সাহেব, আমি কেন আমার চৌদ্দ পুরুষ কেউ গান জানে না।

—তাহলে যে গাইছে তাকে দেখিয়ে দাও।

—কে গাইছে, কাকে দেখিয়ে দেব? আমার মনে হচ্ছে কি জান? মরুভূমির মায়া।

—মরুভূমির মায়া। বৃদ্ধ বলে, হ্যাঁ মরুভূমির মায়া। রাত্ৰিবেলায় মরুভূমিতে কত বিচিত্র কাণ্ডকারখানা ঘটে তা শোনোনি? কখনও মনে হয়, বাচ্চা ছেলে কাঁদছে। আবার কখনও শুনবে কেউ গান গাইছে। আবার অনেকে বলে এইরকম চাঁদনী রাতে নাকি মরুভূমির মাটিতে নেমে আসে হুরী পরীর দল।

খোজাটা অবাক হয়ে শোনে। —তাহলে তুমি বলছে, এ-ও সেইরকম কিছু?

–আমার তো তাই মনে হয়।

খোজা ফিরে গিয়ে নুজাৎকে বলে, ও কিছু না, মালকিন, রেতের বেলা মরুভূমিতে এরকম অনেক কিছুই শোনা যায়। আপনি ঘুমিয়ে পড়ুন।

কিন্তু নুজাতের ঘুম আর আসে না। বার বারা মাকানের মুখ ভেসে ওঠে।

একটুখানি তন্দ্ৰা লেগে এসেছিলো। আবার সেই সুর কানে বাজতেই উঠে বসে নুজাৎ। খোজাটাকে ডেকে বলে, তুমি আবার যাও। আমার বিশ্বাস, এ কোনও মায়া নয়। নিশ্চয়ই কোন মানুষই গাইছে। যেমন করে পারো তাকে নিয়ে এসো আমার কাছে। এমনিতে না আসলে-এই নিয়ে যাও এক হাজার মোহর। টাকার লোভ দেখালে সে নিশ্চয়ই আসবে।

খোজার ভুল ভাঙ্গে। সে ভেবেছিলো মালকিনের ঘুম নষ্ট হচ্ছে বলে তাকে ধরে বেঁধে আনতে বলেছিলো। কিন্তু তা তো না। কিছুই বুঝতে পারে না সে। ভাবে—বড়লোকের খেয়াল।

খোজা এবার আর বেতের লাঠিটা সঙ্গে নেয় না। বৃদ্ধের কাছে এগিয়ে গিয়ে বলে, ওগো, বুড়ো বাপজান, তোমার দু’টো পায়ে পড়ি, আমাকে বলে দাও, কে গান গাইছে। না হলে আমার নোকরী থাকবে না। মালকিন একবার শুধু তার সঙ্গে দু’টো কথা বলতে চায়, একটু চোখের দেখা দেখতে চায়। তার জন্যে যদি সে পয়সাকডি চায়, তাও দিতে পারি। কথা দিচ্ছি, কোন ভয় নাই। তার কোন ক্ষতি তিনি করবেন না।

বৃদ্ধ কিছুই বুঝতে পারে না। এ আবার কি নতুন চাল! এমন সময় মাকান উঠে আসে দরজার সামনে।

-কী? ব্যাপার কী?

খোজা মাকানের সুপুরুষ বলিষ্ঠ চেহারা দেখে সেলাম ঠুকে বলে, এখানে কে গান গাইছিলো, জনাব?

-কেন, আমি।

খোজা যেন হাতে স্বৰ্গ পায়।-মেহেরবানী করে আপনি যদি একবার তীবুতে আসেন— কোনও ভয় নাই আপনার। আমার মালকিন শুধু একটিবার আপনার সঙ্গে কথা বলতে চান!

মাকান চটে ওঠে, কে তোমার মালকিন? আমার সঙ্গে তার কি দরকার? আমি কি তার কেনা বান্দা, সে ডাকলেই যেতে হবে!

খোজা বলে, আপনি গোসা করবেন না, হুজুর। আপনি কেন তার গোলাম। হতে যাবেন। আমার ওপর হুকুম হয়েছে, যে গান গাইছে তাকে যেভাবে পারি তার কাছে নিয়ে যেতে হবে। তার জন্যে টাকা পয়সা দিতেও তিনি রাজি।

মাকানের অবাক লাগে। এমন আজগুবি কথাও তো সে শোনেনি কখনও।। তার গান শুনে পর্দানসীন আমিরের বিবি তার সঙ্গে আলাপ করতে চায়। আবার–বলে কিনা টাকািপয়সা চাইলেও দিয়ে নিয়ে আসবে। মনে মনে অপমানিত বোধ Tািব: করলেও মুখে প্রকাশ করে না। একটা অদম্য কৌতূহল মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। [লি দেখাই যাক না, কি ব্যাপার। বলে, চলে যাবো।

বৃদ্ধ শিউড়ে ওঠে।—সে কি বাবা! ওর কথা তুমি বিশ্বাস করলে? তোমাকে। ভুলিয়ে ভালিয়ে নিয়ে গিয়ে আটকে ফেলবে?

মাকান একটা ঝাঝের সঙ্গে বলে, কেন, আটকাবে কেন, আমি কি কারো পাকা ধানে মই দিয়েছি নাকি?

খোজাটা দু’হাত জোড় করে বলে, না, হুজুর, কোনও ভয় করবেন না। আমি আল্লাহর নামে কসম খেয়ে বলছি, আপনার কোনও ক্ষতি হবে না।

মাকান বলে, হয় হোক, আমি পরোয়া করি না। চলো, যাবো তোমার মালকিনের কাছে।

খোজা তীবুর ভিতরে ঢুকে নুজাৎকে জানায়, সে এসেছে।

নুজাৎ বলে, তাকে আবার সেই গানটা গাইতে বলে। আর তার নাম ধাম জিজ্ঞেস কর।

খোজা বাইরে এসে বলে, জনাব, আমার মালকিন আপনার গান শুনতে চাইছেন। আর জানতে চাইছেন, আপনার নাম কি, দেশ কোথায়?

মাকান বলে, গান শোনাচ্ছি। কিন্তু নাম ধাম বলতে চাই না। ভাগ্যের ফেরে আজ আমি পথে পথে ঘুরি। নাম ঠিকানা হারিয়ে ফেলেছি।

এই বলে মাকান আবার সেই গান ধরে :

গান শুনে নুজাৎ উন্মাদের মতো ছুটে বেরিয়ে আসে। এতো মাকান-তার প্রাণের ভাই ছাড়া আর কেউ নয়। মাকানকে দেখে চিৎকার করে ওঠে নুজাৎ, মাকান-মাকান।

আর কিছু বলতে পারে না। অচৈতন্য হয়ে লুটিয়ে পড়ে।

ছুটে তাবুর বাইরে এসে ভাইকে দেখে নুজাৎ, মাকান, মাকান বলে, চিৎকার করেই অজ্ঞান হয়ে লুটিয়ে পড়ে।

দু-আল-মাকান দেখে আমির-বিবি আর কেউ না।–তার দিদি নুজাৎ। ছুটে গিয়ে নুজাৎকে টেনে তোলে। আনন্দে উত্তেজনায় মাকানও আত্মহারা হয়ে পড়ে। দুই ভাইবোন-এর এই কান্নাকাটি দেখে খোজা ব্যাচারী ভাবাচেকা খেয়ে যায়। নুজাৎ মাকানের সারা শরীরে হাত বুলিয়ে আদর করতে থাকে।

সে রাতে তারা দুজনে কেউই ঘুমুলো না। মাকান বলে, দিদি, তোমার কাহিনী শোনাও। সেই যে আমাকে জেরুজালেমের সরাইখানায় রেখে তুমি কাজের ধান্দায় বেরুলে, তারপর থেকে তো আমি কিছু জানি না।

নুজাৎ বলে, আমিও তো তোমার কোন কিছু জানি না, ভাই। আগে আমার কাহিনী শোনো। তারপর তোমার কাহিনী শুনবো।

নুজাৎ আগাগোড়া সব বৃত্তান্ত খুলে বলে। মাকানও বললো। তার কাহিনী। বললো, ঐ মেহেরবান বৃদ্ধের দয়াতেই সে তার প্রাণ ফিরে পেয়েছে।

মাঝ রাতে নুজাতের স্বামীর ঘুম ভেঙে যায়। এই গভীর রাতে তার তাবুর মধ্যে এক অচেনা যুবককে নুজাতের পাশে দেখে অবাক হয়।

নুজাৎ হাসতে হাসতে বলে, কী? ভাবছো এই রাতে আমি আবার কার সঙ্গে বসে কথা বলছি? এ তো তোমার বড় কুটুম, গো। আমার সহোদর ভাই দু-আল-মাকান। সুলতান উমর-আল-নুমানের ছোট ছেলে।

এই প্রথম নুজাৎ তার স্বামীর কাছে আসল পরিচয় প্রকাশ করলো। স্বামী ব্যাচারী সুলতানের কর্মচারী। নুজাতের কথায় আকাশের চাঁদ হাতে পায়। আরব অধিপতি শাহেনশাহ উমর অল-নুমানের সে জামাতা। গর্বোবুক ভরে ওঠে। শ্বশুর নিশ্চয়ই কোন সুবাদার করে দেবে তাকে। চাকর নফরদের ডেকে হুকুম করলো, আর একটা তাঁবু খোটাও। আমার বড় কুটুমের আদর যত্নের যেন ত্রুটি না হয়।

নুজাৎ বলে, তার আর কি দরকার। আমরা কাল সকালেই তাবু উঠিয়ে বাগদাদে রওনা হয়ে যাবো। আজকের রাতটুকু ভাই আমার তাঁবুতেই থাক। এতকাল বাদে আমরা আবার মিলেছি, আজ সারা রাত দু’টো সুখ-দুঃখের কথা বলে কাটাবো।

নুজাতের স্বামী বলে, সেই ভালো, তোমরা ভাই বোন প্রাণের কথা বলো! আমি অন্য তাঁবুতে যাচ্ছি। আর মিঠাই মণ্ডা, ফলমূল, খানাপিনা পাঠিয়ে দিচ্ছি। ভাইকে আদর যত্ন করে খাওয়াও।

নুজাৎ তার স্বামীকে বললে, সকাল হলেই সেই বুদ্ধকে এখানে.নিয়ে আসবে। তার দয়াতেই ভাই আমার জানে বেঁচে আছে। তার জন্যে একটা ভালো দেখে ঘোড়া এনে দামী জীবন লাগাম দিয়ে সাজাও! বাকী পথ সে আর হেঁটে যাবে না।

নুজাতের স্বামীর হুকুমে তখনই খোজা আরও কয়েকজন নফর চাকর সঙ্গে নিয়ে বৃদ্ধের খোঁজে চলে গেলো। বৃদ্ধ তখন ভয়ে জড়সড় হয়ে গাধাটাকে নিয়ে একটা গাছের তলায় বসে থর থর করে কাঁপছে। খোজাকে দলবল নিয়ে আসতে দেখে তার আত্মারাম খাঁচাছাড়া হবার দাখিল। ভাবলো, এবার আর রক্ষা নাই। নিশ্চয়ই ধরে নিয়ে গিয়ে শূলে চড়াবে।

খোজাটা দলবল নিয়ে বৃদ্ধের সামনে এগিয়ে এসে কপট হুঙ্কার দেয়, ওহেমিথ্যের জাসু, তুমি না বলেছিলে, কে গাইছে জানো না? সে তো বললো, সে তোমার সঙ্গের লোক চলো, তোমাকে আর ছাড়া হবে না। মালকিনের হুকুম, তোমাকে বাগদাদে নিয়ে গিয়ে সমুচিত সাজা দেওয়া হবে। তোমার সঙ্গীর সঙ্গে তোমাকেও শূলে চাপানো হবে। বুঝেছে? এবার ওঠ, চলে আমাদের সঙ্গে। বৃদ্ধ ভাবলো, নিয়তি এড়ানো যায় না। এইভাবে মৃত্যু লেখা ছিলো নসীবে। মরতেই হবে। কাঁদতে কান্দতে খোজার সঙ্গে চললো।

নুজাতের স্বামী খোজাদের বললো, এই বৃদ্ধকে ঘোড়ায় চাপিয়ে বাগদাদে নিয়ে চলো। দেখবে তার যেন কোন অসুবিধে না হয়। সব সময় তোমরা তাকে ঘিরে থাকবে।

খোজা সেলাম ঠুকে বললে, যে হুকুম, জনাব।

চাকর নফররা বৃদ্ধিকে ঘিরে নিয়ে চলে। বৃদ্ধ ভাবে, বাগদাদে পৌঁছতে যে কটা দিন বাকী, তার পরেই তার জীবনটা শেষ হয়ে যাবে। খোজাকে উদ্দেশ করে বলে, শুনছো কাপ্তেন সাহেব, যে ছেলেটা গান গেয়েছিলো সে কিন্তু আমার কোন আত্মীয়স্বজন কিছু না। জেরুজালেমে আমি একটা পানি গরম করার চাকরী করতাম। একদিন দেখি আমার কাঠগুদামের পাশে ছেলেটিকে আধমরা অবস্থায় কে বা কারা ফেলে গেছে। আমি তাকে ঘরে নিয়ে গিয়ে আদর যত্ন করে বঁচিয়েছি। তারপর থেকে এই দেড়খানা বছর সে আমার কাছেই আছে। আমি যা খাই সে-ও তাই খায়। আমি যখন যেভাবে থাকি সে-ও সেইভাবে থাকে। এর বেশি তার সঙ্গে আমার কোনও সম্পর্ক নাই। তা তোমরা যদি তার সঙ্গে আমাকে দোষী সাব্যস্ত করতে চাও, কর। কি আর বলবো, বলো।

খোজা মজা করে বলে, ওসব কোনও অজুহাত শুনতে চাই না বুড়ো বাবা। তোমরা দুজনেই আমার মালকিনের ঘুম নষ্ট করেছ। সাজা দু’জনকে সমান পেতে হবে।

চলার পথে যখনই খানাপিনার জন্যে থামে খোজা ভালো ভালো খানাপিনা এনে দেয় বৃদ্ধকে। বলে, যে কাঁটা দিন বঁচো, প্ৰাণ ভরে ভালো মন্দ খেয়ে নাও। যা খেতে ইচ্ছে, বলে। এনে দিচ্ছি।

বৃদ্ধ বলে, সামনে খাড়া ঝুলিয়ে মিঠাই মণ্ডা দিচ্ছ? এসব কি আর গলা দিয়ে নামবে?

খোজা বলে কী আর হবে, অত ভেবে লাভ কি বলো? যতক্ষণ বেঁচে আছ, পিও, জীও।

কিন্তু এসব কোনও কথাই বৃদ্ধর ভালো লাগে না। নানারকম মনগড়া দুর্ভাবনায় মুষড়ে পড়ে সে।

এইভাবে বৃদ্ধের সঙ্গে মজা করতে করতে খোজারা পথে হাঁটার ক্লান্তি ভুলে যায়। চলতে চলতে একদিন তারা বাগদাদের কাছাকাছি এসে পৌঁছয়। সেখান থেকে বাগদাদ মাত্র আর একদিনের পথ। নুজাৎ-মাকান চঞ্চল হয়ে ওঠে। কতদিন পরে তারা আবার দেশের মাটিতে পা দেবে। মা বাবাকে দেখতে পাবে। আবার হাসি আনন্দে ভরে উঠবে প্রাসাদ।

কিন্তু এমন সময় কালো আঁধার হয়ে এলো সামনের পথ। অশ্বখুরের শব্দে চকিত হয়ে উঠলো। সকলে। নুজাতের স্বামী হুকুম জারি করলো, যে যেখানে আছো, দাঁড়িয়ে পড়। আর এক পাও এগোবে না।

কয়েক মুহূর্ত কাটার পর দেখা গেলো, এই বিশাল অশ্ববাহিনী তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। তাদের হাতে সুলতানের পতাকা। ক্রমশ আরও নিকটবর্তী হলো তারা। কাড়া নাকাড়ার শব্দে মুখরিত হতে থাকলো আকাশ বাতাস।

সেনাবাহিনীর পাঁচজন প্রধান এগিয়ে এসে বাজ কণ্ঠে প্রশ্ন করে, কে তোমরা? কোথা থেকে আসছো? কোথায় যাবে?

নুজাতের স্বামী এগিয়ে এসে বলে, আমি দামাসকাসের দরবারের সচিব। শাহজাদা সারকানের দূত হয়ে যাচ্ছি। তার বাবার কাছে—বাগদাদে। আমার সঙ্গে আছে। সুলতানের বাৎসরিক ভেট।

সেনাপতিরা দু’হাতে মুখ ঢেকে কাঁদতে থাকে। নুজাতের স্বামী বুঝতে পারে কোনও গভীর দুঃসংবাদ আছে। অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে।

সেনাপতিদের প্রধান এগিয়ে এসে বলে, সুলতান উমর-আল-নুমান আর এ জগতে নাই। বিষক্রিয়ায় তার মৃত্যু ঘটেছে। আপনি আমাদের সঙ্গে আসুন। উজির দানদান আমাদের সেনাবাহিনীর প্রধান। তিনি সঙ্গে এসেছেন। তার সঙ্গে কথা বলবেন, চলুন। তিনি আপনাকে বিস্তারিত সব বলবেন।

উজির দানদান গভীর দুঃখ প্রকাশ করে বললো, সুলতান বিষক্রিয়ায় মারা গেছেন। কিভাবে বিষক্রিয়া হলো, সেসব কাহিনী আপনাকে পরে বলবো। এখন আমাদের একমাত্র কর্তব্য বাগদাদের সুলতান নির্বাচন করা। আমি বাগদাদের চারজন কাজীর সঙ্গে পরামর্শ করেছি। তাদের মতে শাহজাদা সারকানকেই সিংহাসনে বসানো উচিৎ। তাই আমি দলবল নিয়ে চলেছি দামাসকাসে। তঁকে নিয়ে এসে সুলতান উমর-আল-নুমানের উত্তরাধিকারী হিসাবে বাগদাদের সিংহাসনে বসােনই এখন আমার একমাত্র কাজ। অবশ্য বাগদাদের বেশিরভাগ মানুষেরই ইচ্ছা—দু-আল-মাকানকে সিংহাসনে বসানো হোক। কিন্তু সমস্যা দাঁড়িয়েছে—আজ প্রায় দেড় বৎসর কাল দু-আল-মাকান তার ভগ্নি নুজাতের সঙ্গে মক্কায় চলে গেছে। সেই থেকে অনেক অনুসন্ধান করা হয়েছে। কিন্তু কোনই হদিশ করা যায়নি।

উজির দানদানের উক্তি শুনে, সুলতানের শোকসংবাদ শোনা সত্ত্বেও নুজাতের স্বামীর প্রাণ আনন্দে নেচে ওঠে। দেশের মানুষ যখন চায়, দু-আল-মাকানের সুলতান হতে কে আর আটকায়। আর মাকান যদি সুলতান হয় তারও বরাত খুলে যাবে।

নুজাতের স্বামী দানদানকে বলে, শ্বশুর মশায়ের মৃত্যু-সংবাদ বুকে শেলের মতো হেনেছে। কিন্তু এই নিদারুণ শোকের মধ্যেও একটি সুখবর আপনাকে শোনাচ্ছি। নুজাৎ-আল-জামান এবং দু-আল-মাকানের সন্ধান পাওয়া গেছে। তারা দু’জনেই আমার দলবলের সঙ্গে বাগদাদে চলেছে। নুজাৎ আজ আমার বেগম।

দানদান বিস্ময় বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে থাকে। বিশ্বাস করতে পারে না, মাকান, নুজাৎ ফিরে চলেছে বাগদাদে। নুজাতের স্বামী আদ্যোপোন্ত সব কাহিনী দানাদানকে বললো। কিভাবে তারা দুজনে মক্কা মদিনা দেখে জেরুজালেমে আসে। মাকানের অসুস্থত। অর্থাভাব। নুজাতের অর্থ ধান্দায় বেরুনো। বাদাবী ডাকাতের খপ্পরে পড়া। তারপর সওদাগরের হাত ঘুরে সারকানের হাতে আসা। তারপর শাদী। সব খুলে বললো সে। এদিকে মাকান কিভাবে এক বৃদ্ধের দয়ায় জীবনরক্ষা করতে পেরেছে সে কাহিনীও সবিস্তারে তাকে জানালো।

দানদান রুদ্ধশ্বাসে শুনলো সব। আনন্দে চিৎকার করে ডাকলো সেনাপতিদের।

–আল্লাহর দেয়ায় আমরা আবার সুলতানের হারানো ছেলেমেয়েদের ফিরে পেয়েছি। আপনারা আসুন। সবাই মিলে ঠিক করুন, সুলতান কে হবে।

সেই মাঠের মধ্যেই তাবু ফেলা হলো। দানদান সভা ডাকলো। সেনাবাহিনীর সেনাপতিরা ছাড়াও দরবারের বিশিষ্ট আমির ওমরাহরা তার সঙ্গে এসেছিলো। উদ্দেশ্য ছিলো, সারকানকে সুলতান পদে অভিষিক্ত করে বাগদাদে নিয়ে আসবে কিন্তু পালের হাওয়া ঘুরে গেছে। দু-আল-মাকান ফিরে এসেছে। এ অবস্থায় নতুন করে চিন্তা করা দরকার। নতুন করে আলোচনায় বসা দরকার। কাকে তারা সুলতান করতে চায়, আজকের সভায় তা ঠিক করতে হবে।

অনেক আলাপ আলোচনার পর আমির ওমরাহ সেনাপতি কাজী একমত হলো, সুলতানের ছোট ছেলে দু-আল-মাকানকেই তারা বাগদাদের সিংহাসনে বসাবে। ঠিক হলো, সুলতান বিহীন সালতানিয়ৎ চলতে পারে না। আর বিলম্ব না করে এই মাঠের মধ্যেই দু-আল-মাকনের অভিষেক হবে।

নুজাতের স্বামী ফিরে আসে তার স্ত্রী আর শ্যালক দু-আল-মাকানের কাছে। বাবার মৃত্যু ংবাদে নুজাৎ, মাকান হাউ মাউ করে কাঁদতে থাকে। সেই—দেশে তারা ফিরছে, অথচ বাবাকে দেখতে পাবে না। এ ব্যথা তারা কোথায় রাখবে?

নুজাতের স্বামী মাকানকে বললো, উজির আমির ওমরাহ কাজী সেনাপতি—সবাই মিলে একমত হয়েছে, তোমাকেই তারা বাগদাদের সিংহাসনে বসাবে। এ বিষয়ে তোমার কি অভিমত?

দু-আল-মাকান বলে, কিন্তু বড় ভাই থাকতে সেটা কি সঙ্গত হবে? তার মনে দুঃখ দিয়ে কিছু করতে চাই না।

ভগ্নিপতি পরামর্শ দেয়, এক কাজ কর। এখন যথারীতি অভিষেক হয়ে যাক। তুমিই সুলতান হও। তারপর সারকানকে ডেকে সলতানিয়ৎকে দু’টো ভাগে ভাগ করে একটা অংশ তুমি শাসন কর, আর একটা অংশ। সারকানকে ছেড়ে দাও। এতে, আমার মনে হয় ভায়ে ভায়ে সম্প্রীতি বজায় থাকবে।

দু-আল-মাকান বলে, ঠিক আছে, তাই হবে।

এরপর দু-আল-মাকানকে বাদশাহী সাজে সাজানো হলো। উজির দানদান এই অভিষেকের পোশাক-আশাক সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলো। মাকানকে সুলতান বেশে সাজিয়ে অভিষেক-তাঁবুতে নিয়ে যাওয়া হলো। সারা তাবুটা ফুলের মালায় সাজানো হয়েছিলো। সেনাবাহিনী জাতীয় সঙ্গীত বাজিয়ে চলেছে। একে একে আমির ওমরাহরা এসে তাঁবুর ভিতরে দরবার মহলে গিয়ে আসন গ্রহণ করলো। সব শেষে দু-আল-মাকানকে এনে বসানো হলো সিংহাসনে। উপস্থিত পরিষদরা উঠে দাঁড়িয়ে কুর্নিশ জানাতে থাকলো। দু-আল-মাকনের হাতে সোনার তলোয়ার-অভিষেকের সময় এই তলোয়ার বংশগত ভাবে উত্তরাধিকারীরা পেয়ে আসছে। আজ যেমন পেলে দু-আল-মাকান। তলোয়ারখানা মাথায় ঠেকিয়ে হলফনামা পড়তে হয়। দুষ্টের দমন আর শিষ্টের পালন—এই তার একমাত্র ন্যায় ধর্ম।

এরপর একে একে আমির ওমরাহরা সামনে এসে আভূমি আনত হয়ে কুর্নিশ জানিয়ে হলফ করলো, আজ থেকে আপনি আমাদের মহামান্য সুলতান। আপনার আদেশ শিরোধার্য করে নেবো।

এই সময়ে রাত্রি প্রভাত হয়ে আসে। শাহরাজাদ গল্প থামিয়ে চুপ করে বসে থাকে।

অভিষেক শেষে নুজাতের স্বামী এক ভোজসভার আয়োজন করলো। দামাসকাস থেকে যে সব খানাপিনা সঙ্গে এসেছিলো সেনাদের মধ্যে সব বিতরণ করে দেওয়া হলো।

সুলতান দু-আল-মাকান আমির ওমরাহদের সঙ্গে বসে খানাপিনা সারলো। উজির দানাদানকে নুজাৎ জিজ্ঞেস করে, কিভাবে আব্বাজানের মৃত্যু হলো, তার বিস্তারিত বিবরণ শুনতে ইচ্ছে করে।

উজির দানদান বলে, নিশ্চয়ই বলবো, মা। এই ভোজ সভাতেই সে কাহিনী শোনাবো সকলকে।

দানদান বলতে শুরু করে :

তোমরা চলে যাওয়ার পর অনেক খোঁজাখুঁজি করা হলো। মক্কা-মদিনী চষে বেড়ালাম। কিন্তু কেউই বলতে পারলো না, তোমরা কোন পথে গেছে। যাই হোক, তোমাদের শোকে তাপে সুলতান মুহ্যমান হয়ে প্রাসাদে থাকেন। কারো সঙ্গে বড় একটা দেখা-সাক্ষাৎ করেন না। নেহাৎ জরুরী কাজ না থাকলে দরবারেও নিয়মিত বসেন না। সুলতানের মনোবেদনা বুঝতে পেরে আমরাও তাকে ছোটখাটো কাজে বিব্রত করতাম না। এই সময় একদিন এক বৃদ্ধা রমণী এলো। সঙ্গে তার পাঁচটি অপরূপ সুন্দরী স্বাস্থ্যবতী তরুণী। সুলতানের দর্শনপ্রার্থী হয়ে আমাকে বললো, কনস্তানতিনোপল থেকে সে এসেছে। সুলতানের জন্যে এই পাঁচটি খুবসুরৎ মেয়ে নিয়ে এসেছে। শুধু রূপেই তারা দুনিয়ার সেরা নয়। তাদের তুল্য সর্বগুণান্বিতা মেয়ে তামামদুনিয়ার আর কোথাও পাওয়া যাবে না।

সুলতানকে জানালাম। তিনি বৃদ্ধাকে ডেকে পাঠালেন। মেয়ে পাঁচটিকে দেখলেন। সত্যি কথা বলতে কি, গুণ কতটা আছে তখনও আমরা জানি না, অমন রূপসী রমণী আমি কখনও দেখিনি। স্বয়ং সুলতানও তারিফ করলেন। হ্যাঁ, সুন্দরী বটে।

বৃদ্ধ বললেন, জাঁহাপনা, আপনি ওদের যাচাই করে দেখুন। দুনিয়াতে এমন কোনও বিদ্যা, এমন কোনও শাস্ত্ব নাই—যা তাদের অজানা। আচার আচরণ আদব কায়দায় দস্তুর মতো শাহী।

সুলতান সহাস্যে মেয়েদের দিকে তাকালেন, কি গো মেয়েরা, তোমাদের কত্রী যা বলছে সব ঠিক-?

মেয়েগুলো অভিবাদন জানিয়ে ঘাড় নাড়ে-সব ঠিক।

এখন সুলতান বললেন, ঠিক আছে, কি বিদ্যা শিখেছে, তার কিছু নমুনা দেখাও।

একটি মেয়ে এগিয়ে এসে বাদশাহী ঢং-এ কুর্নিশ জানিয়ে বলতে শুরু করে।

শুনুন, জাঁহাপনা মানুষ বেঁচে থাকে কেন? সে নিজের ওপর প্রভুত্ব দেখিয়ে যেতে চায়। এই বাসনা তার অন্তরে অঙ্কুরিত থাকে বলেই সে আল্লাহর দোয়ায় বেঁচে থাকতে চায়। বড় হতে চায়। নাম যশের অধিকারী হতে চায়।

আল্লাহ মানুষকে জীবন দান করে সংসারে পাঠান কেন? কারণ সে তার নিজেকে-সঙ্গে সঙ্গে অপরকেও সুন্দর করে গড়ে তুলবে—এই তার ইচ্ছা!

সুলতানই প্রথম পুরুষ। তার পুণ্যতেই প্রজারা পুণ্যবান হয়। তার সুখেই সুখী হয়। তাঁর দুঃখেই তারা দুঃখ পায়। সংস্কৃতিবান জ্ঞানী ব্যক্তিরা বিনয়ী, মিতভাষী এবং ন্যায়পরায়ণ হয়ে থাকেন। প্রকৃত বন্ধুকে চিনে নিতে পারেন। শক্ব সম্পর্কে সতর্ক থাকেন। বন্ধুর জন্য প্রাণ উৎসর্গ করতে দ্বিধা করেন না। কারণ তিনি জানেন, দুনিয়াতে সব কিছুই সুলভ। একমাত্র প্রকৃত বন্ধুত্ব পাওয়াই সঙ্গে বিবাহিত বিবির তুলনা চলে না। কারণ প্রয়োজন বোধে এক বিবি তালাক দিয়ে অন্য বিবি ঘরে আনা যায়। কিন্তু বন্ধুর সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটলে নতুন বন্ধু খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। বন্ধুত্বে একবার চিড় খেলে তার আর জোড়া দেওয়া যায় না।

পীর পয়গম্বরদের একটা বাণী শোনাচ্ছিঃ এক কাজী ধনী-দরিদ্র ভেদাভেদ করতেন না। তার চোখে সবাই সমান ছিলো। নিরপেক্ষ বিচার করে উচিত রায় দিতেন। তিনি সব সময়ই চেষ্টা করতেন। দুইপক্ষের সমঝোতা করিয়ে দিতে। এতে শান্তি অব্যাহত থাকে। যেখানে তা সম্ভব হতো না, নানা দৃষ্টিকোণ থেকে তার সমস্ত দিক পর্যালোচনা করে দেখতেন, নানা সাক্ষী প্রমাণে নিঃসন্দেহ হতেন, তারপর রায় দিতেন। কিন্তু মনের কোণে বিন্দুমাত্র দ্বিধা বা সন্দেহ থাকলে রায়দান স্থগিত রেখে পুনরায় তা খতিয়ে দেখতেন। ন্যায় বিচার মানুষের প্রথম এবং প্রধান কর্তব্য। অত্যাচার করে ভয় দেখিয়ে বা ক্ষুধার্ত রেখে কাউকে দিয়ে কিছু স্বীকার করিয়ে নেওয়া কোনও বিচারকের কর্তব্য নয়। এর দ্বারা সুবিচার সম্ভব হয় না। অনেক সময়ই মানুষ অত্যাচারের ভয়ে বা ক্ষুধার তাড়নায় মিথ্যাকেই সত্য বলে স্বীকার করতে বাধ্য হয়।

সম্রাট আলেকজান্দার দেশ বিজয়ের সময় তিনজনকে সব সময় সঙ্গে সঙ্গে রাখতেন। একজন বিচক্ষণ বিচারক, একজন ভালো পাচক আর একজন শিক্ষক। তিনি বলতেন, অপরাধী সেনার বিচারের দায়িত্ব তিনি নিজে নিতে চান না। কারণ ক্রোধের বশবর্তী হয়ে লঘু অপরাধে গুরু দণ্ড দিতে পারি। এর পরিণাম ভয়াবহ। সেই কারণে, নিরপেক্ষভাবে বিচার করার জন্য বিচক্ষণ বিচারক অপরিহার্য। আর ভালো পাচকের দরকার এই জন্য।-সে। আমার স্বাস্থ্যের প্রতি সতর্ক নজর রাখবে। আমার খাওয়াদাওয়ার দায়িত্ব আমার উপর থাকলে বেশিরভাগ দিন অনাহারেই কেটে যেত। শিক্ষকও নিতান্তই প্রয়োজনীয়। পুত্র কন্যার লেখাপড়া একটা প্রধান ব্যাপার। তার জন্যে চাই যোগ্য শিক্ষক। ভালো শিক্ষক ছাড়া ছেলেমেয়েকে উপযুক্ত করে মানুষ করা কঠিন। শিশুরাই আমাদের ভবিষ্যৎ। সেই ভবিষ্যতের বুনিয়াদ মজবুৎ করতে হলে চাই ভালো শিক্ষক।

এই বলে মেয়েটি নাকাবে মুখ ঢেকে কুর্নিশ জানিয়ে পিছনে সরে যায়। এর পর আর একটি মেয়ে এগিয়ে এসে যথারীতি অভিবাদন জানিয়ে বলতে থাকে :

শুনুন জাঁহাপনা, লুকমান নামে এক দার্শনিক বলেছেন, বিশ্ব সংসারে তিনটি প্রধান সত্য পরীক্ষা করার তিনটি চমৎকার কষ্ঠিপাথর আছে! (১) কোন মানুষ কতটা সৎ এবং মহৎ তার একমাত্র প্রমাণ পাওয়া যেতে পারে তার ক্রোধের সময়। ক্ৰোধ মানুষের প্রকৃত চেহারা খুলে ধরে। (২) মুখে যে বাঘ মারে তাকে বিশ্বাস করার প্রয়োজন নাই। প্রকৃত বীরের পরিচয় শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই মিলতে পারে। (৩) কে তোমার প্রকৃত বন্ধু কি করে তা বুঝবে? অত্যন্ত বিপদের দিনে যে পাশে এসে দাঁড়ায়-সেই একমাত্র বন্ধু।

স্তাবকদের স্তুতি ব্যঞ্জনা সত্ত্বেও উদ্ধত অত্যাচারী শাসক তার সমুচিত শিক্ষা পায়। এবং অত্যাচারিত একদিন তার সুবিচার পাবেই। যে যেমন কর্ম করে তাকে সেইরূপ ফল দান করাই সুশাসনের কর্তব্য। কে কি কাজে ফেসে গেলো। তাই দিয়ে তার বিচার করা উচিৎ নয়। তার প্রকৃত মতলবটো জানার চেষ্টা করা বিধেয়। মানুষের দেহে হৃদয় নামক বস্তুটাই সর্বশ্রেষ্ঠ অংশ। একটা মানুষ খারাপ—তার কারণ তার হৃদয়টা খারাপ। এবং এই কারণেই সে মনুষ্য পদবাচ্য হতে পারে না।

ইজরায়েলে এক পরিবারে দুই ভাই ছিলো। এক ভাই অন্য ভাইকে জিজ্ঞেস করেছিলো, আচ্ছা দাদা, এ যাবৎ যত কাজ তুমি করেছে বা দেখেছে তার মধ্যে সবচেয়ে কঠিন কাজ কি মনে হয়েছে?

দাদা জবাব দেয়, একদিন মুরগীর ঘরের কাছ দিয়ে যেতে একটা জাপটে ধরি। দেখলাম, তার মাথাটা বৌ করে এক পাক ঘুরিয়ে নিয়ে এসে আমার দিকে তাকালো। তারপর আবার সে উল্টো পাকে পাক ঘুরিয়ে মাথাটা সোজা করলো। আমি অবাক হলাম। একটা মুরগী অনায়াসে যা পারলো আমি মানুষ হয়ে শত চেষ্টা করেও তা করতে পারবো না। এবার বলে তোমার কাছে সব চেয়ে কঠিন কাজ কী মনে হয়েছে।

ছোট ভাই বললো, আমি একদিন ভাবলাম আল্লাহর কাছে কিছু চাইবো। নামাজের সময় আল্লাহকে ডাকলাম কিন্তু কিছুতেই আর কিছু চাইতে পারলাম না।

এই বলে দ্বিতীয় মেয়েটি বিদায় নিলে আর একটি মেয়ে এসে দাঁড়ালো।

আজ আমি সংক্ষেপে দুটি মাত্র নীতিকথার উল্লেখ করে বিদায় নেবো।–মানুষের আত্মা যদি পরিশুদ্ধ থাকে, তবে সে বেহেস্তের দরজায় পৌঁছতে পারে।

সুফিয়া বলেছেন : মানুষের মুখ তার অন্তরের আয়না।

এর পর চতুর্থ কন্যা আসে।

–শেখ ইব্রাহিম একটি গল্প বলেছিলেন, একদিন এক ভিখারী তার ভিক্ষে করে পাওয়া একটি তামার পয়সা রাস্তায় হারিয়ে ফেলে। আমি তাকে একটা রূপের টাকা দিতে পোব। গেলাম। কিন্তু সে নিলো না। বললো, তামার পয়সা হারিয়েছি, রূপের টাকা লগবা কি করবো আমি? পয়সাটা আমি নির্বিবাদে খরচা করে দিতে পারি। কিন্তু টাকা হাত ঈসে গেলে প্রাণে ধরে ভাঙ্গাতে পারবো না।

মনসুর ইবন উমর এই কাহিনীটা বলেছিলেন :

আমি একবার মক্কায় হজ করতে যাচ্ছিলাম। অন্ধকার রাত্রি। কুফা শহরের જે পথ দিয়ে হেঁটে চলেছি। এমন সময় কিছুটা দূরে একটি লোকের উচ্চকিত কণ্ঠ শুনতে পেলাম। সে বলছে, হে খোদা, আমি তোমার গোলাম। তোমার বাণী অগ্রাহ্য করবো—ক্ষমতা আমার নাই। কিন্তু কর্মদোষে আজ আমি পাপী। কিন্তু মনে প্রাণে এই পাপ আমি চাইনি। তোমার নির্দেশ আমি মাথা পেতে নেবো। তুমি আমাকে পাপমুক্ত করো।

এই প্রার্থনা জানাবার একটু পরে একটা প্রচণ্ড শব্দ করে কি যেন একটা নিচে পড়ে গেলো। অন্ধকার রাত। কিছুই ঠাওর করতে পারলাম না। আমি অনেক ডাকাডাকি করলাম। কিন্তু কেউ সাড়া দিলো না। আমি আমার ডেরায় চলে গেলাম। পরদিন সকালে দেখি একটা শবদেহ নিয়ে যাওয়া হচ্ছে গোরস্তানে। মিছিলে এক শোকাহত অশীতিপরা বৃদ্ধাকে দেখে জিজ্ঞেস করলাম, কে মারা গেছে? বৃদ্ধ বললো, গতকাল আমার ছেলে নামাজের পর উপস্থিত সবাইকে আল্লাহর বাণী পড়ে শুনিয়েছিলো। তার এক জায়গায় ছিলো, ‘শোনো, তোমরা যারা আমার কথা বিশ্বাস কর, মান, তাদের প্রতি আমার নির্দেশ নিজের নিজের হৃদয় উন্মুক্ত কর।’

পবিত্র গ্রন্থের এই বাণী শোনার সঙ্গে সঙ্গে একজন পথচারী নিজের বুকে ছুরি বসিয়ে দিয়ে কলিজাটা টেনে বের করে ফেললো।

এর পর শেষ মেয়েটি এসে দাঁড়ালো।

–এক দার্শনিক বলেছেন, যে মানুষ তার প্রতিবেশীর সুখ দুঃখের খবর রাখে না সে আল্লাহর করুণাও প্রত্যাশা করতে পারে না। একজন প্রতিবেশীর কাছে যত ঋণ জমা হয় নিজের ভাই-এর কাছেও তা হয় না।

একদিন ইবন আদহাম মক্কা থেকে ফেরার পথে তার এক বন্ধুকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আপনি কিরকম জীবনযাপন করতে ভালোবাসেন?

বন্ধুর জবাব, আমি স্বল্পাহারী মানুষ, যেদিন জোটে খাই। যেদিন না জোটে প্রত্যাশা করে বসে থাকি। যদি জোটে খাবো, না হলে খাবো না।

ইবন আদম ঠোঁটকোটা মানুষ। বলেছিলাম, বাখ-এর কুকুরগুলোও কিন্তু তাই করে। আমার কথা বলো, আল্লাহ যেদিন জুটিয়ে দেন। আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি। তাঁর গুণগানে পঞ্চমুখ হই। আর যেদিন তিনি বঞ্চিত করেন, সেদিন শুধু তাকে ধন্যবাদ জানাই।

এরপর সে বিদায় নিয়ে সরে যায়। এবার এগিয়ে আসে তাদের কত্রী-সেই বৃদ্ধা। সুলতানকে অভিবাদন জানিয়ে বলে, ইমাম আল সফি বলেছেন : একটা রাত্রিকে তিনটি ভাগে বিভক্ত করা যায়। প্রথম ভাগে অধ্যয়ন দ্বিতীয় ভাগে নিদ্রা এবং তৃতীয় ভাগে প্রার্থনার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। জীবনের সায়াহ্নে সারারাতই তিনি জেগে কাটাতেন।

ইমাম আর এক সময় বলেছেন, আমি বিগত দশ বছর নামমাত্র যবের রুটি খেয়ে জীবনধারণ করে আছি। অতিরিক্ত আহারে দেহ ভারাক্রান্ত হয়। বুদ্ধি ভোঁতা হয়ে আসে। ঘুমে এবং অবসাদে শরীর নেতিয়ে পড়ে। সব উৎসাহ উদ্দীপনা নিভে যায়।

ইবন ফুয়াদ বলেছিলেন, একদিন আমি নামাজের জন্য রুজু করবো বলে নদীর ধারে ছুটে চলেছি। এক সাদা দাড়িগোঁফ ওয়ালা বৃদ্ধ পিছন থেকে বলে উঠলেন, নিষ্ঠা নিয়ে রুজু কর বাপু, অত তাড়াহুড়া করছে কেন? নিষ্ঠাবান না হলে নামাজ পড়ে কোন ফল পাবে না।

দেখলাম বৃদ্ধ এসে জলে নামলেন। পরিপাটি করে হাত মুখ প্রক্ষালন করলেন। তারপর উঠে মসজিদের দিকে রওনা হলেন। আমি তাকে অনুসরণ করে চলতে থাকলাম। এক সময় তিনি পিছনে ফিরে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, কিছু বলবে?

আমি বলি, মেহেরবানী করে আমাকে যদি বাৎলে দেন, কিভাবে চললে, আল্লাহকে জানতে পারবো।

তিনি বললেন, আগে নিজেকে জানার চেষ্টা কর। যখন নিজেকে জানা সম্পূর্ণ হবে তখন আপন থেকেই তাকে জানতে পারবে।

খলিফা আবু জাফর অল মনসুর ঘোষণা করলেন, আবু হানিফকে তিনি বাৎসরিক দশ হাজার দিরহাম দক্ষিণা দিয়ে দেশের প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত করলেন। পরদিন সকালে সুলতানের দরবার থেকে অর্থসচিবকে পাঠানো হলো, আবু হানিফার গৃহে। অনাড়ম্বর সাদা মাঠ সাজপোশাকে সজ্জিত হানিফ বেরিয়ে এলেন। অর্থসচিব সবিনয়ে দশ হাজার দিরহামের তোড়াটা তার সামনে রেখে সুলতানের ফরমান জানালো, তিনি এই দশ হাজার দিরহাম আপনাকে এক বৎসরের বেতন হিসাবে অগ্রিম পাঠিয়েছেন। এবং বলে দিয়েছেন, এ অর্থ কোনও অসদুপায়ে অর্জিত নয়। হানিফ সাহেব যেন গ্রহণ করেন।

আবু হানিফা অর্থসচিবকে ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, তোমার সুলতানকে গিয়ে বলো, টাকাটা হয়তো সৎ উপায়ে অর্জিত-কিন্তু তোমার সুলতান নিজেই তো অসৎ, উদ্ধত, অত্যাচারী। এরকম লোকের দাসত্ব করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।

এরপর বৃদ্ধ বললো, আজ অনেক রাত হয়ে গেছে। এখনকার মতো বিদায় নিতে চাই। সুলতান যদি ইচ্ছা করেন, পরে আবার শোনাবো।

এই সময় একটুক্ষণের জন্য দানদান থামে। দু-আল-মাকান আর নুজাৎ অধীর আগ্রহেই শুনছিলো। মাকান জিজ্ঞেস করে, তারপর?

উজির আবার বলতে থাকে : বৃদ্ধ আর তার পঞ্চকন্যার গুণে মুগ্ধ হয়ে সুলতান উমর উচ্ছসিত প্রশংসা করলেন। এমন সারগর্ভ নীতি কথা তিনি বহুকাল শোনেননি। উজিরকে বললেন, প্রাসাদে যে মহলে ইরবিজা থাকতো সেখানে এদের থাকার ব্যবস্থা করো। দেখবে, যেন আদর যত্নে কোনও ত্রুটি না হয়।

সুলতান প্রতিদিন নিজে এসে বৃদ্ধ আর পঞ্চকন্যার খোঁজখবর নিতে থাকলেন। আদর আপ্যায়নের কোনও ত্রুটি হচ্ছে কিনা জানতে চাইলেন। আমরা অবশ্য তাদের কোনও অভাবই রাখিনি। আতিথেয়তার সব রকম বন্দোবস্তই নিখুঁতভাবে করা হয়েছিলো। বৃদ্ধ সারাদিন কোনও রকম আহার করতো না। শুধু রাত্ৰিবেলায় সামান্য একটু রুটি আর সরবৎ খেয়ে কাটিয়ে দিত। সারাদিন তার উপাসনার মধ্য দিয়ে কাটত। বৃদ্ধার এই কৃচ্ছসাধন দেখে সুলতান আরও মুগ্ধ হয়ে পড়েন। তার প্রাসাদ পবিত্র তীর্থক্ষেত্র হয়ে উঠছে-এই ভেবে তিনি পুলকিত হতে থাকেন। এইভাবে দশটা দিন কেটে গেলো। সুলতান আমাকে বললেন, এবার আসল কথাবার্তা হওয়া দরকার। বৃদ্ধাকে জিজ্ঞেস কর, কি দাম সে নেবে।

বৃদ্ধ বললো, সোনাদানা যাই দিতে চান, কিছু নেবে না। তা সে যদি এক দিকে মেয়ে আর দিকে হীরে জহরৎ দিয়েও ওজন করে দিতে চান–আমি নেবো না।

—আমি শুধু একটা শর্তেই আপনার কাছে বিক্রি করতে পারি।

–কী শর্ত?

বৃদ্ধা বললো, দীর্ঘ এক মাসকাল ধরে আপনি উপবাস করবেন। এই উপবাসকালে একমাত্র আল্লাহর উপাসনা ছাড়া মনে কোনও কামনা বাসনার প্রশ্রয় দেবেন না। এর ফলে আপনার দেহ মন কলুষমুক্ত পবিত্র হয়ে উঠবে। তারপর আপনি মেয়েদের গ্রহণ করবেন। তার আগে নয়। আমার এই শর্ত যদি পূরণ করতে পারেন, নগদ মূল্য হিসাবে কিছুই নেবো না। সে ক্ষেত্রে আপনার দেশের যা নাম করা জিনিস তার কিছু আমাকে উপহার দিতে পারেন।

বৃদ্ধার এই অভূতপূর্ব প্রস্তাব শুনে সুলতানের শ্রদ্ধা আরও বেড়ে যায়। তখুনি সম্মতি দেন, আমি রাজি।

বৃদ্ধ বললো, আমিও প্রার্থনাদি করে আপনার উপবাসের সুফল পেতে সাহায্য করবো। এখন তামার ঝারি করে এক ঝারি পানি আনতে বলুন।

সঙ্গে সঙ্গে একটা তামার ঝারি পূর্ণ করে জল নিয়ে আসা হলো। ঝারিটা হাতে নিয়ে বৃদ্ধ বিড় বিড় করে কি সব মন্ত্র পড়লো। তারপর এক টুকরো পাতলা কাপড় দিয়ে মুখটা বেঁধে দিয়ে বললো, উপবাসের দশদিন পরে এই পাত্রের জল পান করবেন। এতে আপনার শরীরের দুর্বলতা কেটে যাবে। ক্ষয় পূরণ হবে। আজ আমি বিদায় নিচ্ছি। ঠিক এগারো দিনের দিন আবার ফিরে আসবো।

এই বলে বৃদ্ধ কুর্নিশ করে বিদায় নিলে। জলের ঝারিটা সুলতান নিজে হাতে সিন্দুকে বন্ধ করে চাবিটা তার শেরওয়ানীর জেবে রেখে দিলেন।

সেই দিন থেকেই উপবাস শুরু হলো। তখন তার একটাই লক্ষ্য, বৃদ্ধার কথামতো দেহ-মন পবিত্র করতে হবে। তা হলেই সে ঐ পরমা সুন্দরী কুমারী তনয়াদের অঙ্কশায়িনী করার অধিকার পাবে।

এগারো দিনের দিন সকালবেলা পিপাসার্ত সুলতান এক নিঃশ্বাসে ঝারির জলটুকু সব পান করলেন। দশ দিনের অনাহারে দেহ নেতিয়ে পড়েছিলো। পিপাসায় ছাতি ফেটে যাচ্ছিলো। জলটুকু পেটে পড়ায় ক্ষুধার তীব্রতা স্বভাবতই একটু কমে আসে। অবসাদও খানিকটা কেটে যায়। সুলতান ভাবলেন বৃদ্ধার কথা তো অক্ষরে অক্ষরে ফলে গেলো। এই মন্ত্রপুত জলে নিশ্চয়ই সে এমন কোন দৈবশক্তি রেখে গেছে যার দৌলতে তিনি মুহূর্তেই অবসাদ কাটাতে পারলেন।

জল পান করা শেষ হওয়ার একটুক্ষণ পরে কড়ানাড়ার শব্দ শুনে সুলতান দরজা খুলে দেন। ঘরে ঢুকলো বৃদ্ধা। হাতে তার কলার পাতায় মোড়া একটা মোড়ক। বললো, আপনার উপবাসের একুশ দিনের দিন এই মোড়ক খুলবেন। এতে খানিকটা আচার আছে। সেই দিন আপনি খাবেন।

সুলতান বৃদ্ধাকে সাদরে বসালেন। সশ্রদ্ধভাবে কলাপাতার মোড়কটা নিয়ে সিন্দুকে চাবি দিয়ে রাখলেন।

একুশ দিনের দিন সুলতান আচারটুকু বের করে খেলেন। একটু পরে সেই বৃদ্ধ এসে কড়া নাড়লো। সুলতান রুদ্ধদ্বার খুলে স্বাগত জানালেন। বৃদ্ধ বললো, আমার ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। কি শর্তে আপনার হাতে তাদের কন্যাদের তুলে দেব—জানিয়েছি। এবং আপনি যে আমার শর্ত পূরণ করতে উপবাস করে চলেছেন, তাও বলেছি। শুনে তারা খুশি হয়েছেন। সুলতান যখন তাদের পাওয়ার জন্য দুরূহ কর্তব্যসাধনে ব্বতী হয়েছেন এতে স্পষ্টতই প্রমাণ হয়, তার আকাঙক্ষার মধ্যে কোন ফাকি নাই। তাদের ধারণা, মেয়েরা আপনার কাছে সুখে থাকবে। শুধু একটি কথা বলেছেন, চিরদিনের মতো ছেড়ে দেবার আগে একটিবার তারা তাদের চোখের দেখা দেখতে চান। আজ। আপনার উপবাসের একুশদিন চলছে। আমি আজ ওদের সঙ্গে করে নিয়ে যাবো। ফিরে আসবো তিরিশ দিনের দিন। সেই দিন। আপনার উপবাসের শেষ দিন। এই দশটা দিন তারা তাদের মা-বাবার কাছে থাকবে। ভালোমন্দ খানাপিনা করবে। তারপর আমি আবার সঙ্গে করে নিয়ে আসবো।

এ কথায় সুলতান সায় দিতে পারে না-সেকি করে হয়? যাদের পাবো বলে এত কৃচ্ছসাধন করছি, তারাই আমার কব্জার বাইরে চলে যাবে!

বৃদ্ধ হাসেন, এতদিন আমাকে দেখছেন, এখনও পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছেন না। আপনি তো জোর করে তাদের ধরে নিয়ে আসেননি। আমি নিজেই সোধে এসে প্রস্তাব দিয়েছি। সুতরাং এক্ষেত্রে আপনার আপত্তি হচ্ছে কেন? এটা তো বোঝেন, মা-বাপের সন্তান, চিরকালের মতো নাগালের বাইরে চলে যাবে। শেষবারের মতো একবার চোখের দেখার সাধ হয় না?

সুলতান ঘাড় নাড়লেন, তা ঠিক। বাবা-মাকে ছেড়ে সন্তান চলে গেলে কি যে ব্যথা বুকে বাজে তা আমি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। ঠিক আছে, ওদের নিয়ে যাও। তবে দেরি করো না। তিরিশ দিনের দিনই যেন তারা প্রাসাদে ফিরে আসে।

বৃদ্ধা বলে, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, জাঁহাপনা, আমার কথার কখনও নড়াচড় হয় না; আর আপনার মনে যদি কোনও দ্বিধা থাকে তা হলে এক কাজ করুন, আপনার সবচেয়ে বিশ্বস্ত কোনও মহিলাকেই আমাদের সঙ্গে দিন। তার তত্ত্বাবধানেই এ-কদিন থাকবে মেয়েরা। ওদের মা-বাবা যদি দেরি করতে চায়, বুঝিয়ে বলতে পারবে, —সুলতানের হুকুম, নির্দিষ্ট দিনেই ফিরতে হবে।

সুলতান বললেন, ঠিক বলেছো, বুড়িমা। আমার নিজের লোক একজন সঙ্গে থাকা দরকার। সে বুঝিয়ে বলতে পারবে। দেরি করলে সুলতান গোসা করবেন। আমার সবচেয়ে প্রিয়পাত্রী বাঁদী সফিয়া তোমাদের সঙ্গে যাবে। আমার দুটি সন্তানের সে জননী। তার বাবা কনসন্তান্তিনোপল-এর সম্রাট আফ্রিদুন। আচারে ব্যবহারে খুব ভদ্র, শিক্ষিত। তোমার ভাইদের সঙ্গে সে কথা বলতে পারবে। বোঝাতে পারবে। কিন্তু তা তো হলো, তিরিশদিনের দিন আমি কি আহার করবো, তার ব্যবস্থা করে যাবে না?

বৃদ্ধ বলে, আমার সবদিকে নজর আছে। কিছু বলতে হবে না। যাবার আগে আপনার জন্যে এক গেলাস সরবৎ দিয়ে যাবো। সযত্নে রেখে দেবেন। তিরিশ দিনের দিন সকালে উঠে। হামামে যাবেন! খুব ভালো করে গোসল করবেন। দেখবেন শরীরটা কেমন হাল্কা হয়ে গেছে। দেহের এবং মনের সব ক্লেশ কেটে গেছে। আল্লাহর নামাজ শেষ করে সরবৎটা খেয়ে একটু ঘুমিয়ে নেবেন। ঘুম থেকে উঠে দেখবেন আপনি সম্পূর্ণ সুস্থ তাজা মানুষ হয়ে গেছেন।

এই বলে সুলতানকে এক গেলাস সরবৎ দিয়ে, পাঁচটি মেয়ে আর সফিয়াকে সঙ্গে নিয়ে প্রাসাদ ছেড়ে বেরিয়ে গেলো সে। তিরিশদিনের দিন খুব ভোরবেলা তোমাদের বাবা সুলতান উমর-আল-নুমান হামামে গেলেন। গোসল সেরে এসে নামাজ পড়লেন। তারপর সিন্দুক খুলে ঢাকনা ঢাকা সরবতের গ্লাস বের করে দরজা বন্ধ করে দিতে দিতে বললেন, সরবৎ খেয়ে আমি বিশ্রাম করবো। তোমরা কেউ আমাকে ডাকবে না।

সারাটা দিন কেটে গেলো। আমরা সবাই সুলতানের কামরার সামনে ঠায় দাঁড়িয়ে আছি। কখন তার ঘুম ভাঙ্গবে। কখন তিনি কাকে তলব করবেন। কিন্তু না, বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে এলো। সন্ধ্যা পার হয়ে রাত্রি গম্ভীর হতে থাকে। কিন্তু সুলতানের ঘুম আর ভাঙ্গে না। তখন কি জানি, সে ঘুম আর ভাঙ্গাবার নয়। পরদিন দুপুরে অনেক ডাকাডাকির পর যখন কোনও সাড়া পাওয়া গেলো না, দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে দেখি সুলতানের মৃতদেহ পড়ে আছে শয্যায়।

দু’হাতে মুখ ঢেকে দানদান কাঁদতে থাকে। দু-আল-মাকান আর নুজাৎ কান্নায় ভেঙে পড়ে। কাঁদতে থাকে দরবারের সকলে। নুজাতের স্বামী মাকানের হাত ধরে টেনে তোলে, ওঠ, কেঁদে আর কি করবে, বল। নিয়তির লিখন এড়াতে পারে না কেউ। বাবা কারো চিরকাল বেঁচে থাকে না। এখন শোকতাপ ভুলে নিজেকে শক্ত কর।

চোখের জল মুছে দানদান বলতে থাকে, সরবতের গেলাসটা পরীক্ষা করে দেখলাম। তার তলায় কাগজের একটা টুকরো পাওয়া গেলো। তাতে লেখা ছিলো: শয়তানের জন্য শোক করো না। এ চিঠি তোমরা যারা পড়বে—জেনে রেখো, ব্যাভিচারের পরিণামে এই শাস্তিই পেতে হয়। একবার ভেবে দেখো, কত সম্রাটের আদরের দুলালীদের সর্বনাশ সে করেছে। তার নৃশংস অত্যাচারে কত সাম্রাজ্য ধ্বংস হয়ে গেছে। এই শয়তানটা তার ছেলে সারকানকে পাঠিয়েছিল। সিসারিয়ায়। ছলনায় সে ভুলিয়ে এনেছিলো সম্রাট হারদুবের প্রাণপ্রতিমা কন্যা ইরবিজাকে। তার সঙ্গে জানোয়ারের মতো আচরণ করেছিলো এই বদমাইশ সুলতান। তারপর এক নিগ্রোর হাতে তুলে দিয়েছিলো। নৃশংসভাবে তাকে সে হত্যা করে তার ধনরত্ন ছিনিয়ে নিয়ে উধাও হয়ে গেছে। সেই অত্যাচারী উদ্ধত সুলতান উমর অল-নুমানকে আজ আমি খতম করলাম। এজন্য ঈশ্বর আমাকে আশীর্বাদ করবেন। এবার আমার পরিচয় শোনো, আমি সেই হারদুবের দুর্গ কর্ত্রী-বাদী সরদারণী। সফিয়াকে আমি তার বাবা আফ্রিদুনের কাছে পৌঁছে দিয়েছি। তবে এইখানেই শেষ নয়, এরপর আমরা সৈন্যবাহিনী সাজিয়ে নিয়ে বাগদাদ আক্রমণ করতে আসছি। এই পাপপুরী প্রাসাদ আমরা ধুলোয় মিশিয়ে দেব। সুলতানের বংশ নির্বংশ করে দেব। দুনিয়াতে মুসলমান সাম্রাজ্য বলে আর কিছু থাকবে না। বাগদাদের আকাশে উড়তে থাকবে খ্ৰীষ্ট ধর্মের বিজয় নিশান।

এক মাস ধরে শোকপালন করা হলো। দেশের লোক বলতে লাগলো, এবার বাগদাদের সিংহাসনে যোগ্য উত্তরাধিকারী বসানো হোক। তখন আমি কাজীদের ডেকে পরামর্শ করলাম। তাদের অভিমত দামাসকাস থেকে সারকানকে এনে সুলতান করা যেতে পারে। জনগণের দাবী—দু-আল-মাকানকে সিংহাসনে বসাতে হবে। কিন্তু দু-আল-মাকানকে আমরা কোথায় পাবো। দেশে দেশে তাদের সন্ধান করা হয়েছে–কোনও খবর পাওয়া যায়নি। তাই কাজীদের উপদেশ মতো দামাসকাসেই যাচ্ছিলাম। শাহজাদা সারকানকে সুলতান পদে অভিষেক করে বাগদাদে নিয়ে আসবো—এই ছিলো উদ্দেশ্য। আল্লাহর অপার মহিমা—শাহজাদা দু-আল-মাকান আর শাহজাদী নুজাৎ দু’জনকে এক সঙ্গেই ফিরে পেলাম।

দু-আল-মাকান উজির দানাদানকে বললো, আপনি বয়সে এবং জ্ঞানে বৃদ্ধ, আমার বাবার পুরনো উজির। এখন থেকে আপনি আমারও উজির হলেন। এখন আমার প্রথম জ্ঞাতব্য বিষয় : আমার বাবা কি ধনদৌলত রেখে গেছেন তার একটা মোটামুটি হিসাব করা।

উজির দানদান একখানা লম্বা ফর্দ খুলে ধরলো, সুলতানের মৃত্যুর পর আমি তার বিষয় সম্পত্তির একটা খতিয়ান তৈরি করেছি।

মাকান বললো, আপনি এক কাজ করুন, দামাসকাস থেকে যে সব ধনরত্ন বাগদাদে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তার সবটাই আপনি সেনাবাহিনীর লোকদের মধ্যে বিলিয়ে দিন।

নুজাতের স্বামী বাক্সের তালা খুলে টাকা পয়সা সোনাদানা হীরে জহরৎ সব বের করলো। উজির দানদান সেনাবাহিনীর প্রত্যেকের পদমর্যাদা অনুসারে ভাগ বাটোয়ারা করে দিলো সব ধনরত্ন।

সৈন্য সামন্তরা ধন্য ধন্য করতে লাগলো। নতুন সুলতানের শতায় কামনা করতে থাকলো।

এরপর তাবু ওঠানো হলো। আর কোনও বিরতি নয়, সোজা বাগদাদ। শহরের প্রবেশ মুখে হাজার হাজার নরনারীর ভীড়। তাদের নতুন সুলতানকে বরণ করতে এসেছে তারা। সারা শহর আজ নতুন সাজে। সেজেছে। আনন্দের বন্যা বয়ে যাচ্ছে সর্বত্র।

প্রাসাদে ফিরে এসে দু-আল-মাকান-এর প্রথম কাজ হলো, বড়ভাই সারকানকে চিঠি লেখা। সে লিখলো, দাদা যত সত্ত্বর তোমার সাধ্যমতো সৈন্যবল নিয়ে বাগদাদে চলে এসো। সিসারিয়া সম্রাট হুমকি দিয়েছে, বাগদাদ আক্রমণ করবে।

চিঠিখানা ভাজ করে উজির দানদানের হাতে দিয়ে দু-আল-মাকান বললো, আপনি প্রাজ্ঞ ব্যক্তি। এই চিঠি আমি অন্য কারো হাতে পাঠাতে চাই না। আপনি যান। সমস্ত ঘটনা খুলে তাকে বলুন। সে যদি চায়, আমি বাগদাদের সিংহাসন ছেড়ে দিয়ে দামাসকাসের সুবাদার হয়ে থাকবো। কিন্তু আজ এই বিপদের দিনে, আমরা ভাই-ভাই বিরোধ করবো না। আগে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে। পরে নিজের স্বাৰ্থ চিন্তা করবো।

উজির খুশি হয়ে বললো, তুমি অতি বিচক্ষণ বিচারবুদ্ধির পরিচয় দিয়েছে, বাবা। বিপদের দিনে যে মাথা ঠাণ্ডা রেখে কাজ করতে পারে সে-ই বিচক্ষণ ব্যক্তি।

দানদান বিদায় নিলো। এবার দু-আল-মাকান জেরুজালেমের সেই বৃদ্ধ বন্ধুকে ডেকে পাঠালো। তার বসবাসের জন্যে একটা প্রাসাদ বন্দোবস্ত করে দিলে সে। দাসদাসী চাকরানফর পরিবৃত্ত হয়ে বৃদ্ধ সুখে দিন কাটাতে থাকলো।

কয়েক দিন বাদে দানাদান ফিরে এসে জানালো, সারকান অখুশি হয়নি। সে তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে রওনা হয়েছে। এখন আমরা আমাদের বাহিনী নিয়ে এগিয়ে যাবো। পথের মধ্যে তার সঙ্গে মিলিত হয়ে সিসারিয়া আক্রমণের উদ্যোগ করতে হবে। সারকগনের পরিকল্পনা এই রকম।

সঙ্গে সঙ্গে সারা শহরে সােজ সাজ রব পড়ে গেলো। হাজার হাজার সৈন্যসামন্ত নিয়ে দু-আলমাকান একদিনের পথ অতিক্রম করে তাবু গাড়লো। ওদিক থেকে সারকানও তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে হাজির হলো। এই প্রথম দুই ভাই-এর মিলন ঘটলো। দুজনে দুজনের বুকে মাথা রেখে বাবার শোকে চোখের জল ফেলতে থাকলো।

বড়ভাইকে সসম্মানে বাগদাদে নিয়ে আসে দু-আল-মাকান। শহরের আশে পাশে ছাউনি ফেলা হলো। শত্রুর আক্রমণ প্রতিরোধ করতে তখন দু-ভাই একাত্মা হয়ে পড়েছে।

দিন কয়েকের মধ্যেই দুই ভাই বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে সিসারিয়ার দিকে অগ্রসর হতে থাকে। আরবের অন্যান্য মুসলমান সুলতানরাও তাদের সৈন্যবাহিনী পাঠিয়ে বাগদাদ সুলতানকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে।

এক মাস চলার পর তারা শত্রু সীমান্তে পৌঁছয়। ভীত সন্ত্রস্ত কনসন্তান্তিনোপলবাসীরা সম্রাট আফ্রিদুনকে জানায়—বাগদাদ সৈন্য শিয়রে। আফ্রিদুন হারদুবের বাঁদী সর্দারণীকে খবর পাঠায়। সে আবার সিসারিয়ায় সম্রাট হারদুবকে জানায়।

হারদুব আর আফ্রিদুনের যুক্ত সৈন্যবাহিনী সীমান্ত ঘিরে রুখে দাঁড়ায়। একদিকে খ্ৰীষ্টান সৈন্য আর একদিকে মুসলমান বাহিনী। বাঁদীি সরদারণী:হারদুবকে অভয় দেয়, আপনি কিছু ভাববেন না, সম্রাট, আমি ওদের সমুচিত শিক্ষা দেব। এটা জানবেন স্বয়ং যীশু আমাদের সহায় আছেন, শয়তানরা আমাদের কোনও ক্ষতি করতে পারবে না।

–পঞ্চশ হাজার সৈন্য নৌকা বোঝাই করে পাহাড়ের নিচে পাঠিয়ে দিন। আর বাকী সৈন্যরা থাকবে এপারে। মুসলমানরা ছাউনি ফেলেছে পাহাড়ের পাদদেশে। সুতরাং তারা সামনেও এগোতে পারবে না। পিছনেও পালতে পারবে না।

আফ্রিদুন বললো, চমৎকার ফন্দী। বাছাধনরা কচু কাটা হবে।

সম্রাট আফ্রিদুন এবং সম্রাট হারদুব তাদের সেনাপতিদের ডেকে বললেন, কাল খুব ভোরে তোমরা দু’টো ভাগে বিভক্ত হয়ে দুদিক থেকে সাঁড়াশী অভিযান চালাবে। নৌকা করে পাহাড়ের নিচে পাঠিয়ে দাও পঞ্চশ হাজার সৈন্য। আর বাকী সৈন্য থাকবে পাহাড়ের ওপরে। পাহাড়ের নিচেই ওরা ছাউনি ফেলেছে। ব্যাটারা এতে চিড়ে-চ্যাপটা হয়ে যাবে। এ যুদ্ধে জয় আমাদের অবশ্যম্ভাবী। বুকে সাহস সঞ্চয় করে যীশুর নাম নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়। মুসলমানদের নিশ্চিহ্ন করে ফেলতে হবে-এই আমাদের একমাত্র পণ।

বাঁদী সরদারণী বললো, আমাদের এখন প্রধান লক্ষ্য হবে সারকান। সে এক মূর্তিমান শয়তান। তার বিক্রম অসাধারণ। একাই সে হাজার মানুষের সঙ্গে লড়তে পারে। এটা কোনও মানুষের পক্ষে সম্ভব না। শয়তান তাকে ভর করে আছে। কিন্তু তাতে ভয় পাওয়ার কিছু নাই। ঈশ্বরের হাতে শয়তান-এর মৃত্যু ঘটে। আমরা ধর্মযোদ্ধা। ঈশ্বরের নির্দেশে খ্ৰীষ্টান ধর্মবিশ্বাসীদের রক্ষার জন্যে ধর্মযুদ্ধে নামছি। ঈশ্বর আমাদের সহায় আছেন, শয়তানের পতন অনিবার্য। সুতরাং যৌন-তেন-প্রকারেণ। সারকানকে হত্যা করতে হবে। মুসলমানদের একমাত্র বলভরসা এই সারকান। সারকান নিহত—শোনামাত্র সমস্ত সৈন্যবাহিনী আতঙ্কগ্বস্ত হয়ে রণে ভঙ্গ দিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে পালাতে থাকবে। কিন্তু আমাদের হাত থেকে একজন মুসলমানও রেহাই পাবে না। সবগুলোকে কেটে কচু-কাঁটা করবো।

বাঁদী সর্দারণীর এই রক্ত গরম-করা বক্তৃতায় সেনাপতিরা উৎসাহিত হয়। প্রতিজ্ঞা করে, যেভাবেই হোক, মুসলমানদের পরাজিত করবোই।

খ্ৰীষ্টানদের প্রধান সেনাপতি লুকা। তার মতো দুর্ধর্ষ যোদ্ধা সেই সময়ে সারা ইউরোপে আর দুটি ছিলো না। দেখতে ছিলো ভালুকের মতো। গায়ের রং পোড়া কয়লার মতো কালো। তলোয়ার হাতে সে যখন দাঁড়াত দেখে মনে হতো-সাক্ষাৎ যমদূত। এ পর্যন্ত কোন যুদ্ধে সে পরাজয় স্বীকার করেনি। তার নাম শুনলে সেনাপতিদের বুক ধড়াস ধড়াস করতে থাকে। সে লোহার বর্ম শিরস্ত্ৰাণ পরে যখন ঘোড়ায় চাপলো, আফ্রিদুন তাকে আশীর্বাদ করে বললো, জয় তোমার সুনিশ্চিত। সারকানকে হত্যা করাই তোমার একমাত্র লক্ষ্য। যেভাবেই পারো, তাকে খতম করতেই হবে।

লুকা সম্রাটকে অভিবাদন জানিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে চললো। সোজা সারকানের ছাউনির সামনে। ঘোষক হাঁকিতে থাকে, কই কোথায় আছে সারকান, মরার যদি সাধ থাকে বেরিয়ে এসো। তোমার যম সেনাপতি লুকা তোমার সামনে দাঁড়িয়েছে। যদি সাহস থাকে, তলোয়ার ধরে।

সারকান ধীর পায়ে এগিয়ে আসে। হাতে উন্মুক্ত তলোয়ার। বিকট একটা চিৎকার তুলে লুকা কাঁপিয়ে পড়ে। সারকান শরীরটাকে একটু কান্ত করে পাশ কাটিয়ে দেয়। তারপর শুরু হয়। তলোয়ারের লড়াই। প্রথম প্রথম নির্বিকীরচিত্তে লুকার মারগুলো ঠেকিয়ে যেতে থাকে সে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সারকান বুঝতে পারে, যতগুলো প্যাঁচ জানা ছিলো সবই লুকা দেখিয়ে শেষ করে ফেলেছে। অথচ সারকানকে কাবু করতে পারছে না। তখন সে আবার সেই প্যাচগুলোই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে চালাতে থাকে। সারকান এবার নিশ্চিত হয়। বুঝতে পারে লুকার বিদ্যার দৌড়। এবার সারকান তার নিজের কৌশল প্রয়োগ করলো। এবং তা প্রতিরোধ করার ক্ষমতা লুকার ছিলো না। তলোয়ারের এক কোপেই ধড় থেকে মুণ্ডুটা আলাদা হয়ে ছিটকে পড়ে গেলো। এই দৃশ্য দেখে লুকার সঙ্গী সাথীরা প্ৰাণ ভয়ে চিৎকার করতে করতে ঊর্ধ্বশ্বাসে পালিয়ে গেলো।

আফ্রিদুন এবং হারদুব মাথায় হাত দিয়ে বসে। ভাবতে পারে না লুকা নাই। সমগ্র খ্ৰীষ্টান রাজ্যে লুকা একটি জীবন্ত প্রবাদ। কথায় কথায় লোকে লুকার শৌর্যবীর্যের উপমা দেয়। মা বাবা সদ্যজাত শিশুর নামকরণ করে লুকা। বড় হয়ে ছেলে লুকার মতো বীর হবে, এই আশা। সেই লুকা সারকগনের হাতে নিহত হলো? একথা আফ্রিদুন-হারদুব বিশ্বাস করলেও দেশের লোক বিশ্বাস করবে না। আফ্রিদুন বলে, আমার সাম্রাজ্যের আসল থামটাই ভেঙে পড়ে গেলো।

বাদী সর্দারনী অভয় দিয়ে বলে, বিপদের সময় অধীর হলে তো চলবে না, সম্রাট। বুঝতে পারছি শত্রুর সঙ্গে সম্মুখ-সমরে লড়াই করে আমরা জিততে পারবো না। কারণ লুকা যখন পারেনি তখন সমগ্র খ্রীষ্টান সাম্রাজ্যের কোন সেনাপতির পক্ষেই তাকে নিহত করা সম্ভব নয়। কিন্তু তাই বলে হাত গুটিয়ে বসে থাকলে তো চলবে না।

নিরাসক্ত ভাবে হারদুব বলে, কী করতে চাও? বাহুবলেই যদি হারাতে না পারো, হারাবে কিসে?

—হারাবো বুদ্ধি বলে। বুদ্ধির কাছে বাহুবল তুচ্ছ। আমি এমন ফাদ তৈরি করবো, সেখান থেকে সারকান বেরুতে পাবাবে না।

সম্রাট হারদুব প্রশ্ন করে, সেই ফাঁদটা কি, শুনি?

বাদী সর্দারনী বলে, আপনার সৈন্যদের মধ্যে গোটা পঞ্চাশেক সৈন্য বাছাই করে আমার সঙ্গে দিন। তারা সবাই ভালো আরবী বলতে পারবে, এবং আরবীয় আদব কায়দায় দস্তুর মতো শিক্ষিত হওয়া চাই।

হারদুব বললো, এ আর এমন শক্ত কি? আমার সেনাবাহিনীতে খাস আরবের লোকও অনেক আছে। তাদের মধ্য থেকে তোমার পছন্দমতো যে ক’জন দরকার বাছাই করে নাও। কিন্তু তাদের দিয়ে কি করাবে?

—সোজা পথে যখন কাজ হবে না, বাকী পথ ধরতেই হবে। আপনার ঐ পঞ্চাশজন সৈন্য এবং আমি আরব সওদাগরের ছদ্মবেশ ধরে তাদের সামনে হাজির হবো। এবং কান্নাকাটি করে বলবো, আমরা বহুকাল ধরে কনসন্তান্তিনোপল-এ ব্যবসা বাণিজ্য করি। আরব থেকে সওদা এনে খ্ৰীষ্টানদের কাছে বিক্রি করি। এখন খ্ৰীষ্টান আর মুসলমানদের মধ্যে যুদ্ধ বাধায় তারা আমাদের মারধোর করে দেশ থেকে তাডিয়ে দিয়েছে। টাকা পয়সা সামান পত্র যা ছিলো সব কেড়ে কুড়ে নিয়েছে। এখন আমাদের দেশে ফিরে যাবার সঙ্গতিটুকু সঙ্গে নাই। তাই আপনাদের সাহায্যপ্রার্থী হয়ে এসেছি। দেখবেন, সম্রাট, এই চালে আমি বাজি মাৎ করে দেব। মুসলমানরা ভীষণ স্বজাতি-প্রিয়। এইভাবে তাদের করুণার পাত্র হয়ে সারকানের দলে ঢুকে পড়া আমার পক্ষে খুব একটা শক্ত কাজ হবে না। তারপর কি করে সিসারিয়ার মরণ ফাদে এনে ফেলতে হয় একবার দেখবেন।

বাঁদী সর্দারণীর ফন্দীটা ভালোই। কিন্তু কতটা কাজে ফলবে, কে জানে। আফ্রিদুন এবং হারদুব সম্মতি জানালো।-ঠিক আছে, দেখা চেষ্টা করে।

সারকান আর মাকান দুই ভায়ে নিজের তাঁবুতে বসে কনসতান্তিনোপল আক্রমণের পরিকল্পনা রচনা করছে। এমন সময় দ্বাররক্ষী এসে খবর দিলো, একদল আরব সওদাগর আপনাদের দর্শনপ্রার্থী।

দু-ভাই বেরিয়ে এসে দেখে, প্রায় জনা পঞ্চাশেক আরব সওদাগর এবং তাদের সঙ্গে এক নিষ্ঠাবতী ধর্মপ্ৰাণা বৃদ্ধ এসে দাঁড়িয়েছে। তাদের পোশাক আশাক ছিন্নভিন্ন, দেহরক্তাক্ত, চোখে মুখে সস্ত্রাসের ভাব। সারকান প্রশ্ন করে, কে তোমরা?

পাক্কা মুসলমানী কেতায় কুর্নিশ জানিয়ে তারা আরও একটু এগিয়ে আসে। বুড়িটা হাতের মালা ঘুরাতে ঘুরাতে বলে, আমরা ইস্পাহানের বাসিন্দা। আজ বিশ বছর ধরে কনসন্তান্তিনোপল-এ বাণিজ্য করে আসছি। আরব থেকে সামান পত্ব এনে খ্রীষ্টানদের কাছে বিক্রি করাই একমাত্র কাজ। এতকাল কোনও অসুবিধে হয়নি। দিব্যি আরামে ব্যবসা বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছিলাম। ওদের দেশের পয়সা নিয়ে গিয়ে আমাদের বাল-বাচ্চাদের খাওয়াচ্ছিলাম। কিন্তু এখন তারা অন্যরূপ ধরেছে। তারা খ্ৰীষ্টান, আমরা মুসলমান। ওদের যত আক্রোশ আমাদের উপর। কারণ আমরা মুসলমান। মুসলমানরাই তাদের দেশ আক্রমণ করেছে। এই অজুহাতে আমাদের ধরে নানাভাবে অত্যাচার চালিয়েছে। এবং শেষে মেরে ধরে আমাদের টাকা পয়সা, সামান পত্র সব কেড়ে নিয়ে কনসন্তান্তিনোপল থেকে তাডিয়ে দিয়েছে। এখন আমাদের এমন কোন রেস্ত নাই যা নিয়ে দেশে ফিরতে পারি।

সারকান এবং মাকান ওদের কাহিনী শুনে ব্যথিত হয়। বলে, তোমরা আমার ছাউনিতে বিশ্রাম কর। আমি সব ব্যবস্থা করে দেব।

সারকানের নির্দেশে বিরাট তাঁবু খাটানো হলো। সওদাগরের ছদ্মবেশে সিসারিয়ার পঞ্চাশজন সৈন্যের একটা বাহিনী মুসলমান ছাউনির ভিতরে আস্তানা গাড়লো। তাদের খানাপিনা আদর যত্নের কোনও ত্রুটি রাখলে না। সারকান। মাঝে মাঝেই খোঁজ খবর নিতে থাকলো। সারাকনের কর্মচারীরা বললো, সওদাগররা সবাই খান পিনা করে চাঙ্গা হয়ে উঠেছে; কিন্তু বুড়িমা খানাপিনা কিছুই করেনি। দিন-রাত সে শুধু নামাজ আর কোরান পড়ছে।

এ-কথা শুনে সারকান নিজে দেখাশুনা করতে গেলো। স্যু ওদাগররা বললো বুড়িমা আল্লাহর কাছে দেয়া মাঙছেন, যাতে এ যুদ্ধে আমাদের জয় হয়। বুড়ি মা আমাদের ধর্মাত্মা সিদ্ধবাক। তার উপর আল্লাহর ‘ভর’ হয়। সেই সময় তাকে যা প্রশ্ন করবেন সব জবাব দেবেন। তিনি। সে-সবই আল্লাহর বাণী। তার মুখ দিয়ে উচ্চারিত হয় মাত্র।

শ্রদ্ধা ভক্তিতে মাথা নত হয়ে আসে। সারকান মাকনের। জিজ্ঞেস করে কবে মার উপর ‘ভর’ হবে।

সওদাগররা বলে, সে কিছুই বলা যায় না। হয়তো এখুনি হতে পারে। আবার দুদিন নাও হতে পারে। তবে যতক্ষণ ‘ভর’ না হবে তার এই মৌনভােব কাটবে না। কারো দিকে তাকবেন না, কারো সঙ্গে কথা বলবেন না।

সারকান জিজ্ঞেস করে। কিন্তু তিনি মৌনব্বতী হয়ে এই উপাসনায় বসলেন কেন?

—বাঃ, সে কি বলেন, জাঁহাপনা। এতবড় ধর্মযুদ্ধ। এর জয়-পরাজয়ে মুসলমান ধর্ম, জাতির বঁচামরা নির্ভর করছে। এ সময়ে উপাসনায় না। বসলে বসবেন কবে? নিজের ছেলে মেয়ের সৌভাগ্য ফিরবে কি করে, বা কিভাবে কোথায় বাণিজ্য করলে নিজের ধনদৌলত আরও ফুলে ফেঁপে উঠবে এই জন্যে তিনি উপাসনায় বসবেন? ককখনো না। নিজের স্বাৰ্থ চিন্তা তিনি কোনওদিনও করেন না। কি করে পরের উপকার হবে, দেশের দশের উপকার হবে সে-ই তার একমাত্র চিন্তা।

সারকান মাকান দুভাই অবাক হয়ে শোনে। মনে হয়, এই সংকটকালে আল্লাহই তাদের পাঠিয়েছেন।

পরদিন ভোরবেলা ‘ভর’ উঠলো। সারকান মাকান আভুমি আনত হয়ে সালাম করে জানতে চাইলো, এই ধর্মযুদ্ধে আমাদের জয় হবে, মা?

–অবশ্যই হবে বাবা। তবে শত্রুর গুপ্ত ঘাঁটির সন্ধান না পেলে তাদের ঘায়েল করা যায় না। আমার সঙ্গে যারা এসেছে তারা সেই সব ঘাঁটির সন্ধান জানে। তাদের কথামতো তোমরা অগ্রসর হও। শক্রকে নিধন করতে পারবে।

সারকান এবং মাকান সওদাগরদের দিকে তাকায়। ওদের একজন বলে, মা ঠিকই বলেছেন। আমরা আজ বিশ বৎসর যাবৎ কনসন্তান্তিনোপল আর সিসারিয়ার প্রতিটি প্রান্তে ঘুরেছি। সারা খ্ৰীষ্টান সাম্রাজ্যের পথ-ঘাট, আমাদের নখদর্পণে। কোথায় তাদের গুপ্ত ঘাঁটি। কোন পথে যাওয়া নিরাপদ হবে সব আমরা বলে দেব।

সারকান হাতে স্বৰ্গ পায়। এ যুদ্ধে তাদের জয় আর কেউ আটকাতে পারবে না। তামাম খ্ৰীষ্টান জাতটাকে সাবাড়ি করে দেবে।

ঠিক হলো, সৈন্যদের পঞ্চাশটাভাগে বিভক্ত করা হবে। এবং এই পঞ্চপ্রশজন সওদাগর-এর এক-একজন এক একটি, সৈন্যবাহিনী নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন পথ ধরে ঢুকে পড়বে। গুপ্ত পথের নিশানা দেখিয়ে দেবে সওদাগররা। এইভাবে খ্ৰীষ্টানদের পঞ্চাশটা গুপ্তঘাটি নিশ্চিহ্ন করে ফেলা সম্ভব হবে।

সারকান মাকানকে বললো, তুমি ছাউনিতেই থাক। উজিরও তোমার সঙ্গে থাকবেন। আমি যাবো স্বয়ং বুড়িমার সঙ্গে। তিনি আমাকে সিসারিয়ার দুর্গে নিয়ে যাবেন। এখন শত্রুসৈন্য দুর্গ ছেড়ে বেরিয়ে চলে এসেছে। এই সময় হারদুবের এই সুরক্ষিত দুর্গ প্রায় শূন্য। গুপ্ত পথ ধরে আমরা এগিয়ে যাবো। একবার দুর্গটা অধিকার করতে পারলে আর কোনও অসুবিধেই হবে না। এরপর আমরা সহজেই কনসন্তান্তিনোপল দখল করে নিতে পারবো।

দাদাকে আলিঙ্গন করে বিদায় জানালো দু-আল-মাকান। বললে, ফিরে এসো, তোমাকে আমি নিজে হাতে সুলতানের মুকুট পরিয়ে দেব।

কিন্তু মুকুট আর তার পরা হলো না। শয়তানী বাদী সর্দারণীর ফাঁদে পা দিয়ে প্ৰাণটা হারাতে হলো। সারকান তার সৈন্যবাহিনী সঙ্গে করে বুড়ির সঙ্গে সিসারিয়া দুর্গের ভিতরে ঢুকেছিলো। বুড়ি তাকে ধাপ্পা দিয়েছিলো, দুর্গ এখন শূন্য এই অবস্থায় অধিকার করে নাও। সারকান দুর্গমধ্যে প্রবেশ করে সত্যিই দেখলো, কোন জনপ্রাণী নাই। এ-ঘর ও-ঘর ঘুরে ঘুরে দেখছিলো, এমন সময় এক আততায়ী পিছন দিক থেকে সারকানের পিঠে ছুরি বসিয়ে দেয়। এই অতর্কিত আক্রমণের জন্যে প্রস্তুত ছিলো না সে। সারকান মাটিতে পড়ে গিয়ে তলোয়ার খুলে দাঁড়ায়। তখন তার সামনে প্রায় শ’খানেক খ্ৰীষ্টান সৈন্য। তলোয়ার উদ্যত করে বাঁপিয়ে পড়ে। কিন্তু সারকানের এক এক কোপে একাধিক শত্রু সৈন্য ধরাশায়ী হতে থাকে। এইভাবে সেই আহত অবস্থাতেও প্রবল বিক্রমে সবকটা সৈন্য নিধন করে খিড়কীর পথ দিয়ে বেরিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে ছাউনিতে ফিরে আসে। সারা দেহরক্তাক্ত। তখনো ছুরিটা পিঠেই গাথা ছিলো। মাকান ছুটে এসে ছুরিটা টেনে বার করে। ধরাধরি করে দাদাকে বিছানায় শুইয়ে দেয়। এইবার সারকানের দেহ নেতিয়ে পড়ে। অনেক চেষ্টা করেও রক্ত বন্ধ করা সম্ভব হয় না। সেইদিনই সন্ধ্যাবেলা সারকান দেহত্যাগ করে।

রাত্ৰি যত গম্ভীর হয় সব দিক থেকেই দুঃসংবাদ আসতে থাকে। শয়তানরা তাদের পুরো সেনাবাহিনীটাই ফাদে ফেলে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে।

উজির দানদান বললো, আর এখানে থাকা ঠিক নয়। এরপর শত্রুরা ছাউনি আক্রমণ করবে।

মাকানও ভাবলো, এবার ছাউনি গুটিয়ে বাগদাদের পথে রওনা হওয়াই শ্রেয়।

যে যুদ্ধে জয়ের সম্ভাবনাই ষোল আনা—সেই যুদ্ধে পরাজয় স্বীকার করে মাকানকে দেশে ফিরতে হলো। বাদশাহী মর্যাদায় সারকানের মৃতদেহ সমাহিত করে তার উপর এক শোক মঞ্জিল বানালো মাকান। তার গায়ে লেখা হলো সারকানের অপূর্ব বীরত্ব কাহিনী।

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *