কৃষ্ণা কুন্তী এবং কৌন্তেয় – নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী

›› পৌরাণিক কাহিনী  ›› বই এর অংশ / সংক্ষেপিত  

……দুবাসার বব, বড় অদ্ভুত বর। পৃথিবীতে যৌবনবতী কুমারীর প্রাপ্য ছিল আরও কত কিছু, কিন্তু সব ছেড়ে কেন যে দুর্বাসা এই দেব সঙ্গমের বর দিলেন কুন্তীকে-“তা ভেবে পাই না। একটা কথা অবশ্য মনে হয়, যা একেবারেই ব্যক্তিগত। মানে হয়—কুন্তীর রূপ ছিল অলােকসামান্য। তার ওপরে তিনি এখন সদ্য যৌবনবতী। দিনের পর দিন একান্তে এই রূপের সংস্পর্শ ঋষি দুর্বাসাকে হয়তাে বা যুগপৎ বিপন্ন এবং বিস্মিত করে তুলত, হয়তাে বা তাঁর মনে জাগিয়ে তুলত কোনও অকারণ বিহুলত, যাতে কবে কাকে তিনি স্পর্শও করতে পারতেন না, আবার ফেলেও দিতে পারতেন না—এরে পরতে গেলে লাগে, এবে ছিড়তে গেলে বাজে ।…..

……এমন একজনকে তিনি বর দিচ্ছেন যিনি রূপে অতুলনীয়া—ততস্তাম অনবদ্যাং গ্রাহয়ামাস স দ্বিজঃ। দেবলােকের বিভুতি দিয়ে দুবাসা কুন্তীকে দেবভােগ্যা করে রাখলেন। কুন্তীর রূপ-মাধুর্য সম্বন্ধে একেবারে নিজস্ব কোনও সচেতনতা না। থাকলে এক নবযুবতীব প্রতি দেব-সঙ্গমের এই প্রসঙ্গ উত্থাপন এবং বরদান একজন বিরাগী ঋষির দিক থেকে কতখানি যুক্তিযুক্ত ?……

……নবীন যৌবনবতী কুন্তীর কানে দেব-সঙ্গমের রহস্য-মন্ত্র উচ্চারণ করে দুর্বাসা যেই চলে গেলেন, আর অমনই কুন্তীর কুমারী-হৃদয়ে শুরু হল নতুন এক অনুভূতি। তাঁর হৃদযন্ত্র কথা কইতে শুরু করল পুরুষ-গ্রহণের স্বাধীনতায়। সামান্যতম সংশয় শুধু মন্ত্রের বলাবল নিয়ে—পাব তাে, যাঁকে চাই, তাঁকেই কি পাব ? এ কেমন মন্ত্র যাতে ইচ্ছামাত্র বশীভূত করা যায় যে কোনও অভীতি পুরুষকে ! আমি পরীক্ষা করব মন্ত্রের শক্তি, দেখব—যাকে চাই সে আমার ডাক শুনতে পায় কি না ? কুমারী হৃদয়ে এই নবসঙ্গমের ভাবনায় তাঁর ঋতুভাব ত্বরান্বিত হল। ঋতুর এই অস্বাভাবিকতা বৈদ্যশাস্ত্রে মােটেই অস্বাভাবিক নয়, কারণ কুন্তী মন্ত্র পরীক্ষার জন্য সব সময় পুরুষের আসঙ্গ ভাবনায় আকুল ছিলেন—এবং সঞ্চিস্তয়ন্তী সা দদর্শর্ল্ডং যদৃচ্ছয়া ।
তারপর একদিন। সেদিন অন্তঃপুরের অট্টালিকায় একলা ঘরে পুষ্পের বিছানায় শুয়েছিলেন পুষ্পবতী কুন্তী। ভােরের সূর্য তাঁর কিরণকরের স্পর্শে নবযুবতীর গালখানিও যেন লাল করে দিল। কী ভাল যে লাগছিল কুন্তীর ! পূর্ব দিগন্তে আকাশের বুক চিরে বেরিয়ে আসছে রক্তিম সূর্য-তাঁর সুমধুর নান্দনিক পরাক্রমে মুগ্ধা কুন্তীর, মন এবং দৃষ্টি—দুইই নিবদ্ধ হল সূর্যের দিকে । রাত্রি-দিনের সন্ধিলগের এই দেবতাটিকে এক দৃষ্টিতে দেখতে দেখতে কুন্তী তাঁর মধ্যে দিব্যদর্শন এক পুরুষের সন্ধান পেলেন । দেখতে পেলেন তাঁর কানে সােনার কুণ্ডল, বুক-পিঠ জুড়ে সােনার বর্ম–আমুক্তকবচং দেবং কুণ্ডলভ্যাং বিভুষিতম্।……

……অতএব এই অনুরাগের প্রত্যুত্তরের মতাে সুন্দর ভাষায় সূর্য বললেন—ভদ্রে। প্রথম আলাপে স্ত্রী-লােককে ‘ভদ্রা’ সম্বােধনটি অনেকটা ফরাসিদের মাদামের মতাে। এই সম্বােধনের মধ্যে প্রথম আলাপের দূরত্বটুকু বজায় রেখেই সুর্য বললেন–ভদ্রে ! আমি এসেছি তােমার মন্ত্রের শক্তিতে আকৃষ্ট হয়ে। এখন আমি সম্পূর্ণ তােমার বশীভূত বল আমি কী করব-কিং করােমি বশশা রাজ্ঞি ? অনুরাগবতী কুন্তীর বুঝি এইবার আপন কুমারীত্বের কথা স্মরণ হল । কুন্তী বললেন—আপনি যেখান থেকে এসেছেন সেখানেই ফিরে যান। আমি কৌতুকবশে অথাৎ এমনি মজা দেখার জন্য আপনাকে ডেকেছি, অতএব আপনি এখন ফিরে যান—কৌতুহলাৎ সমাহুতঃ প্রসীদ ভগবন্নিতি। সংস্কৃতে আছে—প্রসীদ-প্রসন্ন হােন, ফিরে যান ; ইংরেজিতে এই প্রসীদ হল–প্লিজ। | যৌবনবতী কুন্তী সানুরাগে দেব-পুরুষকে ডেকেছেন মজা দেখার জন্য-কৌতূহলাৎ সমাহুত,তিনি জানেন না একক পুরুষকে সানুরাগে ঘরে ডাকঙ্গে সে আর প্রসন্ন হয়ে ফিরে যায় না ; প্রথম ভদ্র সম্বােধনের পরেই তার নজর পড়ে অনুরাগবতীর শরীরে। উচ্চাবচ প্রেক্ষণের পর যথাসম্ভব ভদ্র সম্বােধনে সে বলে-কৃশকটি সুন্দরী আমার! যাব, নিশ্চয় যাব, কিন্তু আমাকে সাদরে ডেকে এনে নিজের ইচ্ছে বৃথা করে এমন করে পাঠিয়ে দেবে আমাকে তু দেবং সমাহুয় ন্যায্যং প্রেষয়িতুং বৃথা ? সূর্য পরিষ্কার বললেন-“আমি তােমার ইচ্ছেটুকু জানি। তুমি চাও—সােনার বর্ম-পরা সােনার কুণ্ডল-পরা আমার একটি পুত্র হােক তােমার গর্ভে। কিন্তু তার জন্য যে তােমার শরীরের মূল্যটুকু দিতেই হবে। তুমি নিজেকে আমার কাছে ছেড়ে দাও—স মাত্মপ্রদানং বৈ কুরুষ গজগামিনি। তুমি যেমন ভেবেছ তেমন পুত্ৰই হবে তােমার এবং আমিও যাব তােমার সঙ্গে মিলন সম্পূর্ণ করে—অথ গচ্ছাম্যহং ভদ্রে ত্বয়া সঙ্গম সুস্মিতে।
সুর্যের প্রণয়-সম্বােধনের মধ্যে এখন রমণীর অলসগামিতা অথবা মধুর হাসিটিও উল্লিখিত হচ্ছে। অবশ্য এই সপ্রণয় ভাষণের মধ্যে পুরুষের ভয় দেখানােও ছিল। কথা না শুনলে অভিশাপ দিয়ে তােমার বাবা আর সেই ব্রাহ্মণ ঋষিটিকে ধ্বংস করব—এর থেকেও বড় দায় চাপানাে হয়েছিল কুন্তীর নিজের চরিত্রের ওপরই। সূর্য বলেছিলেন—তুমি যে আমার মতাে একজন দেবপুরুষকে ঘরে ডেকে এনেছ—এই অন্যায় কাজ তােমার বাবা জানেন না। কিন্তু তােমার অপরাধে আমি ধ্বংস করব তাঁকে এবং তাঁর পরিজনকে। এবারে সূর্য কুন্তীর স্বভাব নিয়েই বড় গালাগালি দিয়ে ফেললেন। সূর্য বলতে চাইলেন—বােকা হলেন সেই মুনি যিনি তােমাকে এই মন্ত্র দিয়েছেন। পুরুষের সম্বন্ধে যে রমণীর সংযমটুকু নেই, সেই রমণীকে এই মন্ত্র দেওয়াটাই একটা বাতুলতা। তা সেই ব্রাহ্মণকে গুরুতর দণ্ড দেব আমি, যিনি তােমার স্বভাব-চরিত্র না জেনেই এই পুরুষ-আহ্বানের মন্ত্র তােমায় শিখিয়েছেন শীলবৃত্তমবিজ্ঞায়…যাে’সৌ মন্ত্রমদাত্তব।…..

…..তবে দেবপুরুষ কুন্তীকে যে গালাগালি দিচ্ছিলেন, সে কুন্তীর স্বভাব-চরিত্রের জন্য যতখানি, তার চেয়ে অনেক বেশি নিজের সম্মানের জন্য। সুন্দরী রমণীর কাছে সাদর আমন্ত্রণ লাভ করে কোন পুরুষেরই বা প্রত্যাখ্যাত হতে ভাল লাগে, নিজের বন্ধু বান্ধব বা সমাজের কাছেই বা তার মুখ থাকে কতটুকু? সুর্যের আসল কথাটা এবার বেরিয়ে এল। তিনি বললেন–তুমি যে আমাকে অনুরাগ দেখিয়ে এখন বঞ্চিত করছ—এসব আকাশ থেকে আমার বন্ধু দেবতারা দেখছেন আর হাসছেন—পুরন্দরমুখা দিবি। ত্বয়া প্রলং পশ্যন্তি শয়ন্ত ইব ভাবিনি। তােমার তাে দিব্যদৃষ্টি আছে, একবার তাকিয়ে দেখাে আকাশপানে। কুন্তী সূর্যের কথা শুনে আকাশের দিকে চাইলেন, দেখলেন অন্য দেবতাদের।
কুন্তী নিজের বােকামিতে সত্যিই লজ্জা পেলেন। কৌতুক-লিন্দু কুমারী এক মুহূর্তে যেন বড় হয়ে গেলেন। বললেন—তবু আপনি চলে যান সূর্যদেব। আমার পিতা-মাতা আমাকে এই শরীর দিয়েছেন, মেয়েদের কাছে এই শরীর-রক্ষার মূল্যই যে সবচেয়ে বেশি, কারণ দ্বিতীয় একটি কুমারীর শরীর তাে আমি তৈরি করতে পারব না, অতএব আমার এই কুমারীশরীরটাই আমাকে রক্ষা করতে হবে—স্বীণাং বৃত্তং পূজ্যতে দেহরক্ষা। কুন্তী এবার অনুনয়ের সুরে বললেন—বিশ্বাস করুন, আমি আমার অল্প বয়সের চঞ্চলতায় শুধু কৌতুকের বশে মন্ত্রশক্তি জানার জন্য আপনাকে ডেকেছি। এটা ছেলেমানুষি ভেবেই আপনি ক্ষমা করে দিন।
সূর্য বললেন—বয়স তােমার অল্প বলে আমিও তােমাকে এত সেধে সেধে বলছি। অন্য কেউ কি আমার এত অনুনয় পাওয়ার যােগ্য ? তুমি নিজেকে ছেড়ে দাও আমার কাছে তাতেই তােমার শাস্তি হবে–আত্মপ্রদানং কুরু কুন্তি কন্যে শাস্তিস্তবৈবং হি ভবে ভীরু। সুর্য শুধু একটা কথাই ভাবছেন। ভাবছেন—যে রমণী প্রথম যৌবনের চঞ্চলতায় সাদরে দেবপুরুষকে কাছে ডেকেছে, উপভােগের দ্বারাই তার শাস্তি হবে। হয়তাে এটাই ঠিককুন্তীর প্রথম আত্মানটুকু মিথ্যে ছিল না, কিন্তু ডাকার পর পুরুষের একান্ত দুরবগ্রহ একমুখী প্রয়াস দেখে এখন তিনি চিন্তিত, ব্যথিত। যে কোনও ভাবেই হােক, সূর্য কুন্তীর শরীর-সম্ভোগ ব্যতিরেকে ফিরে যেতে চান না। স্বর্গের দেবতা হওয়া সত্বেও মনুষ্য রমণীর আহ্বানে তিনি মানুষের শরীরে নেমে এসেছেন জুয়ে। এখন এই সামান্যা মানবী তাঁকে প্রত্যাখ্যান করবে, এ তিনি সহ্য করতে পারছেন না। কুন্তীর কাছে বারংবার দেবসমাজে তাঁর ভাবী অপমানের কথা তিনি বলেছেন, কারণ সেটাই তাঁর প্রধান লজ্জা—গমিষ্যামনবদ্যালি লােকে সমহাস্যতাম।
কুন্তী অনেক চিন্তা করলেন। সূর্য সতেজে তাঁর হাত ধরেই রয়েছেন। তবু মুখখানি নিচু করে তিনি কত কিছুই ভেবে নিলেন। বুঝলেন—তাঁর প্রত্যাখ্যানে নিরপরাধ কুন্তিভােজ এবং স্বয়ং দুবাসার বিপদ নেমে আসতে পারে। অন্যদিকে স্বর্গের দেবতা উপযাচক হয়ে তাঁর কাছে প্রসাদ ভিক্ষা করছেন, তাঁর হাতখানিও ধরে আছেন নিজের হাতে—এই বিচিত্র অনুভূতি তাঁর মােহও জন্মাচ্ছে বারে বারে । একদিকে তিনি ‘শাপ-পরিত্ৰস্তা অন্যদিকে মােহেনাভিপরীতাঙ্গী—এই ভয় এবং মােহের মাঝখানে দাঁড়িয়ে কুন্তী এবার তাঁর ভয় এবং মােহ দুই-ই প্রকাশ করলেন সুর্যের কাছে। | ভয়ার্বিষ্টা কুন্তী বললেন আমার বাবা, মা, ভাই, আত্মীয়-স্বজন কী বলবে আমাকে? তাঁরা এখনও বেঁচে আছেন, আর আমি সমাজের নিয়ম ভেঙে নিজেকে হারিয়ে ফেলব ? যদি সব নিয়ম ভেঙে এমনি করে হারিয়ে ফেলি নিজেকে—ত্বয়া তু সঙ্গমাে দেব যদি স্যান্ বিধিবর্জিতঃ তা হলে আমার বংশের মান-ময়দা সব যাবে।।
মােহাবিষ্টা কুন্ত্রী বললেন–আর এত কথা শুনেও যদি মনে হয়, আপনি যা বলছেন তাই ধর্ম, তবে আমি আত্মীয়-স্বজনের দুশ্চিন্তা বাদ দিয়ে আপনার ইচ্ছে পুরণ করব-ঋতে প্রদানা বন্ধুভ্য স্তব কামং করােম্যহম্। কিন্তু আমার একটাই কথা আমার এই শরীর দিয়েও আমি সতী থাকতে চাই। কুন্তী এই মুহূর্তে সুর্যকে সম্বােধন করলেন ‘দুর্ধর্ষ বলে—আত্মপ্রদানং দুর্ধর্ষ তব কৃত্বা সতী ত্বহ। ইঙ্গিতটা স্পষ্ট।
মনস্তত্ত্ববিদেরা বলেন–অধিকাংশ ধর্ষণের ক্ষেত্রে রমণীর দিক থেকে প্রাথমিক বাধাদানের ব্যাপার থাকলেও পরবর্তী সময়ে কিছু আত্মসমর্পণের ইচ্ছাও থেকে যায়। কিন্তু কি রমণী, কি পুরুষ, তিন ভুবনের সার কথাটা কুন্তীর মুখ দিয়েই বেরিয়েছে শরীর দিয়েও আমি সতী থাকতে চাই। প্রথম যৌবনের হাজারাে চঞ্চলতার মধ্যেও রমণীর পক্ষে বিধিবহির্ভুত মিলনের এই হাহাকারটুকু বড়ই স্বাভাবিক—আমি আপনাকে শরীর দিয়েও সতী থাকতে চাই–আত্মপ্রদানং দুর্ধর্ষ তব কৃত্ব সতী ত্বহম্।
সুর্য সব বােঝেন। কুন্তীকে সামান্য উন্মুখ দেখা মাত্রই তিনি কথা আরম্ভ করলেন একেবারে কামুক পুরুষের স্বার্থপরতায়। বললেনবরারােহে। বরাােেহা মানে জানেন কী ? A good mount for a distinguished personality. সূর্য বললেন–বরারােহে। তােমার বাবা-মা বা অন্য কোনও গুরুজন—কেউ তােমার প্রভু নন অথাৎ জীবনের এই বিশেষ মুহূর্তে তাঁদের ইচ্ছামতাে চলার কথা নয় তােমার। যাতে তােমার ভাল হবে, সেই কথাই বরং আমার কাছে শোেননা। সুর্য এবার পণ্ডিত-জনের পাণ্ডিত্য দেখিয়ে বললেন ‘কম্ ধাতুর অর্থ কামনা করা । কন্যা শব্দটাই এসেছে এই ধাতু থেকে, অতএব ক্যাজন মাত্রই সব পুরুষকেই কামনা করতে পারে, সে স্বতন্ত্রাসবান্ কাময়তে যস্মাৎ কমেধাতাে ভাবিনি। তস্মাৎ কন্যেহ সুশ্রোণি স্বতন্ত্রী বরবণিনি।
সূর্য কন্যা-শব্দের মধ্যেই কামনার উৎস প্রমাণ করে দিয়ে কুন্তীর মনের আশঙ্কা দূর করতে চাইলেন। বােঝাতে চাইলেন সুর্যের প্রতি তাঁর অনুরাগবতী হওয়াটাই যথার্থ হয়েছে। কামনার চূড়ান্ত পর্যায়ে কুন্তীর কাছে সুর্যের যুক্তি হল-স্ত্রী এবং পুরুষ পরস্পরকে কামনা করবে, এইটাই স্বাভাবিক, এবং অন্যটাই বিকার—স্বভাব এষ লােকানাং বিকারা’ন্য ইতি মৃতঃ। সুর্য জানেন—এত যুক্তি, এত স্বভাব-বােধনের পরেও কুমারী কুন্তীর মনে সামাজিকের সেই ভূকুটি কুটিল জিজ্ঞাসাটুকু থেকেই যাবে। অতএব প্রথম যৌবনবতী রমণীর রিরংসা এবং দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা কুন্তীকে আশ্বাস দিয়ে সূর্য বললেন—আমাদের মিলনের পর তুমি আবারও তােমার কুমারীত্ব ফিরে পাবে–সা ময়া সহ সঙ্গম পুনঃ কন্যা ভবিষ্যসি—আর তােমার ছেলেও হবে অনন্ত খ্যাতির আধার এক মহাবীর।
সূর্যের এই আশ্বাসের সঙ্গে সঙ্গে কুন্তী তাঁকে সম্বােধন করেছেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচার ভঙ্গীতে-হে আমার আঁধার-দুর করা আলাে—সর্বতমােনুদ। এই মুহূর্তে কুন্তী জানেন—যে ছেলে জন্ম নেবে সূর্যের ঔরসে, সেই ছেলের সঙ্গে তাঁর থাকা হবে না, তাকে লালন-পালন করার সামাজিক সাহস তাঁর নেই। থাকলে কুমারীত্বের জন্য লালায়িত হতেন না তিনি। কিন্তু দুর্ধর্ষ এই তেজোনায়ক ফিরে যাবেন না অসঙ্গমের অসন্তোষ নিয়ে। অতএব সেই ভবিষ্যৎ সন্তানের জন্মলগ্নেই তার স্বয়ম্ভরতার নিরাপত্তা চান তিনি। কুন্তী বললেন—আপনার ঔরসে আমার যে পুত্র হবে সে যেন আপনার অক্ষয় কবচ এবং কুণ্ডল নিয়েই জন্মায়। সুর্য বললেন তাই হবে ভদ্রে ! এই কবচ এবং কুণ্ডল অমৃতময়। তােমার সেই পুত্র অমৃতময় বর্ম এবং কুণ্ডল নিয়েই জন্মাবে।
কুন্তী বললেন—যদি তাই হয়, যদি আমার পুত্রের কুণ্ডল এবং বর্ম দুটিই অমৃতময় হয় অর্থাৎ জীবনে বেঁচে থাকার নিরাপত্তা যদি তার স্বায়ত্তই থাকে, তবে তােক আপনার ঈপ্সিত সঙ্গম, যেমনটি আপনি বলেছেন আমি তাতেই রাক্তি অস্ত্র মে সঙ্গমাে দেব যথােক্তং ভগবংস্তুয়া। মনে করি—আমার পুত্র আপনারই মতাে শক্তি, রূপ, অধ্যবসায়, তেজ এবং ধর্মের দীপ্তি নিয়ে জন্মাবে।।
কুন্তী দেখেছেন—সুর্যের হাত থেকে যখন নিস্তার নেই-ই, সেক্ষেত্রে তাঁর কন্যাসন্তা এবং ভাবী পুত্রের নিরাপত্তা—দুটিই তাঁর একান্ত প্রয়ােজন—একটি বাস্তব কারণে, অন্যটি মানবিক। প্রথম যৌবনের কৌতুহলে তিনি যা বােকার মতাে করে ফেলেছিলেন, তাকে তিনি শুধরে নিয়েছেন মনস্বিনীর মতাে অতি দ্রুত, সূর্যের দ্বারা প্রায় অলিঙ্গিত অবস্থায়। ভবিষ্যৎ জীবনের পরিণত মাতৃত্বের ব্যাপ্তি প্রথম যৌবনের মাদকতার মধ্যে আশা করা যায় না বলেই, অন্তত পুত্রের নিরাপত্তার ভাবনাই যে তাঁকে এই মুহূর্তে স্বতন্ত্র নারীর মহিমা দিয়েছে, তাতে সন্দেহ কী ? ভবিষ্যতে কর্ণের শত অভিমানের উত্তরে সূর্যের দুরাগ্রহ এবং তাঁর অসহায়তার জবাবদিহি সম্ভব ছিল না বলেই অন্তত এই নিরাপত্তার চিন্তাও আমার কাছে কুন্তীর বাস্তববােধের পরিচয়।
কুমারীত্ব এবং কুমারীপুত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত হতেই কুন্তী তাঁর প্রথম মিলনের কৌতুক যেন আবারও ফিরে পেয়েছেন অন্তত দেখাচ্ছেন সেইরকম। সুর্যের কথায় সায় দিয়ে তিনি বলেছেন—হােক সেই পরমেতি মিলন—সঙ্গমিয্যে ত্বয়া সহ—যেমনটি তুমি চাও। আর প্রার্থিতা রমণীর সােচ্চার আত্মসমর্পণের সঙ্গে সঙ্গে সূর্য একাধিক প্রিয় সম্বােধনে ভরিয়ে তুলেছেন কুন্তীকে—আমার রানি, যৌবন শােভার আধার, বামােরু। সুর্য আলিঙ্গন করলেন কুন্তীকে, হাত দিয়ে স্পর্শ করলেন কুন্তীর নাভিদেশ। দেবভাব থাকা সত্ত্বেও মানুষের শরীরে সুর্যের করস্পর্শের এই ইঙ্গিত পণ্ডিত হরিদাস সিদ্ধান্তবাগীশ ফুটিয়ে তুলতে দ্বিধা করেননি। বলেছেন বসনমােচনায় ইত্যাশয়ঃ ।

নবীন যৌবনবতী কুন্তী যেদিন সূর্যকে দেখে সকৌতুকে পুরুষ বশীকরণের মন্ত্র উচ্চারণ করেছিলেন, সেদিন তিনি ভেবেছিলেন—দেখি তাে পুরুষকে কাছে ডাকলে কেমন হয়। দেখি তাে পুরুষ ভােলালে কেমন হয় ! এই কৌতুক আর কৌতুক রইল না, কঠিন বাস্তব আর সুর্যের ‘দুর্ধর্ষতায় সে কৌতুক এক মুহূর্তে কুন্তীকে প্রৌঢ়া করে তুলল। আর এখন সেই অভীতি সঙ্গম-কৌতুকের মুহূর্তে পুরুষের ধর্ষণ-মুখরতায় কুন্তী অচেতন হয়ে গেলেন। মহাভারতের কবি দেবতা পুরুষকে বাঁচানাের জন্য লিখেছেন–কুন্তী সূর্যের তেজে বিহুল হলেন, বিছানায় পড়ে গেলেন অচেতনের মতাে–পুপাত চাথ সা দেবী শয়নে মৃঢ়চেতনা-মােবিষ্টা, ছিন্ন লতার মতাে—ভজ্যুমানা লতে। আমরা জানি ইচ্ছার বিরুদ্ধে সঙ্গমে প্রবৃত্ত হয়ে কুন্তী সংজ্ঞা হারিয়েছেন আর দুর্ধর্ষ সূর্য তাঁর সঙ্গম সম্পন্ন করেছেন কুন্তীর অচেতন অবস্থাতেই, কারণ আমরা দেখেছি, ব্যাসদেবকে অধ্যায় শেষ করতে হয়েছে—একাকী সূর্যের সঙ্গম-সন্তোষের পর কুন্তীর চেতনা ফিরিয়ে দিয়ে—সংজ্ঞাং লেভে ভূয় এবাথ বালা। ব্যাসের শব্দ প্রয়ােগও খেয়াল করবেন—‘বালিকা আবারও চেতনা ফিরিয়া পাইল’। এই বালা বা বালিকা শব্দের মধ্যেই কুন্তীর অজ্ঞতা, চঞ্চলতা, কৌতুকপ্রিয়তা ইত্যাদি নিদোষ গুণগুলি নিহিত করে মহাভারতের কবি তাঁকে সমস্ত দোষ থেকে মুক্তি দিয়েছেন।……

……ভােজগৃহের অন্যতর পরিবেশে বালিকা নিজেকে খাপ খাওয়াতে খাওয়াতে যেদিন যৌবনবতী হয়ে উঠলেন, সেই যৌবনের মধ্যে বিকার এনে দিল দুর্বাসার মন্ত্র। যৌবনের প্রথম শিহরণে কুমারীর দূরত্বে থেকে পুরুষকে একটু দেখা, একটু ছোঁয়া, আধেক পাওয়া, আধেক -পাওয়ার রহস্য উপভােগ করা তাঁর হল না। তিনি পুরুষ বশীকরণের কাম-মন্ত্র শিখে হঠাৎই দেব-পুরুষকে ডেকে বসলেন সদ্যোযুবতীর কৌতুকে; কিন্তু সেই কৌতুকের শাস্তি হল প্রৌঢ়া রমণীর স্থূলতায়, ভাষায়, সঙ্গমে।…..

…….আমরা একবারের জন্য পিছন ফিরে তাকাব হস্তিনাপুরের রাজবাড়ির সেই ঘরটির মধ্যে যেখানে ‘অশেষ-যােগ-সংসিদ্ধ কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস মায়ের আদেশ মেনে নিয়ে বিচিত্রবীর্যের দুই পত্নীর ক্ষেত্রে পূত্র উৎপাদন করছিলেন। আপনারা জানেন—রাজবধুর বিদগ্ধ রুচিতে অম্বিকা এবং অম্বালিকা—কেউই ব্যাসের সঙ্গে মিলনের ঘটনাটা পছন্দ করেননি। কিন্তু তাঁরা ছিলেন নিরুপায়, কারণ সে যুগে এই নিয়ােগ প্রথা ছিল সমাজ-সচল। তার মধ্যে রাজমাতা সত্যবর্তী নিজেই হস্তিনাপুরের অরাজক সিংহাসনের উত্তরাধিকারীর জন্য দুই বধুকে ব্যাসের সঙ্গে মিলিত হতে উপরােধ করেছিলেন।
সত্যবতীর ইচ্ছায় এই দুই রাজবধুর কোনও সম্মতি ছিল না। কিন্তু তাঁদের জন্য কুরুবংশের লােপ হয়ে যাবে—শুধু এই কারণে তাঁদের কোনওমতে রাজি করাতে পেরেছিলেন সত্যবতী। সত্যবতী বলেছিলেন—কিছুই নয়, তােমাদের ভাশুর আসবেন নিশীথ রাতে, তােমরা দুয়াের খুলে অপেক্ষা কোরাে। কিন্তু রাজবধুর বিদগ্ধ-রুচিতে এই নিশীথ-মিলন পরাণ-সখার সঙ্গে অভিসারে পর্যবসিত। হয়নি। এ মিলন বস্তুত তাঁদের কাছে ছিল ধর্ষণের মতাে।
স্বয়ং ব্যাসও এটা জানতেন। সত্যবতীকেও তিনি বারবার সাবধান করেছেন। বলেছেন আমার বিকৃত রূপ তাঁদের সহ্য করতে হবে-সেকথা মনে রেখাে—বিরূপতা মে সহতাং তয়ােরেত পরং ব্ৰতম্। কিন্তু বলে কয়েও কোনও শরীর মিলনে কি রুচি নির্মাণ করা যায় ? শত-শত প্রজ্জ্বলিত দীপের আলােয় ব্যাসকে দেখেই অম্বিকা তিক্ত ঔষধ সেবনের মানসিকতায় সেই যে চোখ বুজেছিলেন, আর চোখ খােলেননি। তাঁর পুত্র শত হস্তীর শক্তি সত্ত্বেও অন্ধ হবে-ব্যাসই সে ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। এই দুর্ঘটনার ফলে দ্বিতীয়া রানি অম্বালিকার দায়িত্ব আরও বেড়ে গেল, কারণ অন্ধ ব্যক্তি কুরুবংশের রাজা হতে পারে না, অতএব তাঁর চক্ষু মুদে থাকা চলবে না।
চক্ষু মুদে যে অনীতি সঙ্গমে বড় রানি কোনও রকমে পাড়ি দিতে চেয়েছিলেন, অম্বালিকাকে সেই সঙ্গম চোখ খুলে দেখতে হল বলেই তাঁর কাছে এই সঙ্গম সম্পূর্ণ ধর্ষণের বিকারে ধরা দিল। মহর্ষির লালচে কটা দাড়ি, মাথাভর্তি জটা, তপােদীপ্ত চক্ষু এবং গায়ের উৎকট গন্ধ—সব কিছু টান টান চোখে দেখে দ্বিতীয়া রানির শরীর ভয়ে ফ্যাকাসে-হলুদ হয়ে গেল। সত্যবতী পুনরায় জিজ্ঞাসা করলে ব্যাস বললেন—এই রানির ছেলে পাবর্ণ হবে।
ওপরের কথা এইটুকুই। কোনও ছেলের গায়ের রঙ যদি ফ্যাকাসে-হলুদ হয়, তাতে এমন কিছু আসে যায় না। বরঞ্চ এই গাত্রবর্ণে পাণ্ডকে যে যথেষ্ট সুন্দর লাগত—তার বর্ণনা আমরা মহাভারতে বহু জায়গায় পেয়েছি। কালিদাসের যক্ষবধুর মুখে এই পাতা ছিল বলে আমরা তাঁকে বেশি পছন্দ করেছি। কিন্তু সঙ্গম-লগ্নে রাজরানির এই পাতার আড়ালে আরও কিছু ছিল, যা ব্যাস স্বকণ্ঠে সােচ্চারে বলেননি। বৈদ্যশাস্ত্রের নিয়মমতাে রমণীর কাছে পুরুষের সঙ্গম যদি ধর্ষণের বিকারে ধরা দেয়, তবে সেটা এতই শকিং’ হতে পারে যাতে বিকৃতাঙ্গ সন্তানের জন্ম দিতে পারে। এর ফলেই ধৃতরাষ্ট্র অন্ধ, আর অম্বালিকাকে যেহেতু জোর করে এই ধর্ষণ চোখ মেলে সহ্য করতে হয়েছিল, তাই পাণ্ডু পুত্রোৎপত্তির অক্ষমতা নিয়েই জন্মেছিলেন। নইলে গাত্রবর্ণের পাণ্ডুত্ব এমন কোনও রােগ নয় যে, সত্যবর্তী পুনরায় ব্যাসকে আরও একটি সন্তানের জন্য উপরােধ করবেন।
সত্যবতী এই ইঙ্গিত বুঝেছিলেন হয়তাে সেই কারণেই আরও একটি পুত্রও তিনি প্রার্থনা করে থাকবেন। কিন্তু কুরুবংশের পরবর্তী বৃদ্ধির জন্য আর বেশি কিছু তাঁর বলার ছিল না, কেননা মহর্ষি রানিদের গর্ভাধান করার সঙ্গে সঙ্গেই বলে দিয়েছিলেন ধৃতরাষ্ট্র শত পুত্রের পিতা হবেন এবং পাণ্ডুও পাঁচ সন্তানের পিতা হবেন। কেমন করে হবে, কীভাবে হবে—সেকথা তখন অপ্রাসঙ্গিক ছিল।……

……দু-দুটি নববধুকে বাড়িতে রেখে বিবাহেল এক মাসের মধ্যে পাণ্ড রাজধানী থেকে দিগ্বিজয় করতে বেরিয়েছেন। এই এক মাস কুন্তী এবং মাদ্রীর সঙ্গে তিনি বিহার করেছেন যখন তাঁর ইচ্ছা হয়েছে অথবা যখন মনে হয়েছে বিহারে তাঁর সুখ হবে–যথাকাম যথাসুখম্। ভাষাটা খেয়াল করার মতাে।
বুঝলাম, এটাও না হয় বুঝলাম। কিন্তু প্রসিদ্ধ ভরত বংশের কোন প্রসিদ্ধ রাজা বিয়ের এক মাসের মধ্যে দিগ্বিজয়ে বেরিয়েছেন ? ‘ভবতবংশে রাজকার্য বা প্রজার কার্য বােঝার মতাে রাজা কম ছিলেন না। সম্বরণ, শান্তনুর মতাে প্রেমিক অথবা পাণ্ডুর পিতৃপ্রতিম বিচিত্রবীর্যের মতাে ভােগী রাজ্ঞার কথা না হয় ছেড়েই দিলাম, দুষ্মও, ভরত, কুরু এমনকী পরবর্তীকালে যুধিষ্ঠির-অর্জুনও যে বিয়ের এক মাসের মধ্যে কোথাও নড়েননি! পা কি এতই বড় রাজা ? ভােগের ইচ্ছে যে তাঁর কম ছিল না— সে-কথাও পরে জানাব।
আসলে স্ত্রীদের কাছে আপন অক্ষমতা লুকিয়ে রাখার জন্য, অথবা ক্ষমতার ধ্বজাটুকু জিইয়ে রাখার জন্যই পাণ্ডকে দিগিজ বেরতে হল—বিয়ের পর তিরিশ রাত্তিরের অক্ষম বিহার সেরেই–বিহৃতা ত্রিদশা নিশাঃ। অন্তঃপুরের অন্দবমহলে পড়ে রইলেন কুন্তী –পাণ্ডুকে বরণ করার সময়ে যাঁৰ অতুল দৈহিক দীপ্তিতে মনে হয়েছিল যেন সূর্যের দীপ্তিতে ম্লান হয়ে গেছে অন্য রাজাদের মুখমণ্ডল—আদিত্যমিব সর্বেষাং রাজ্জং প্রচ্ছদ্য বৈ প্রভাঃ। যাকে দেখে কুন্তী তাঁর হৃদয়ের ভাব গােপন রাখতে পারেননি, শরীরে জেগেছিল রােমাঞ্চ, সেই পাণ্ডু তিরিশটি বিহার-নিশি দুই রমণীর মধ্যে তাঁরই ইচ্ছামতাে ভাগ কবে দিয়ে এখন রাজা জয় করতে বেরলেন।…..

……পাণ্ডু ঋষিকুমারের সঙ্গে নিজের সপক্ষে মৃগবধের কারণ উপস্থিত করে অনেক তর্ক করলেন বটে, কিন্তু মৈথুনরত অবস্থায় প্রাণিবধ মৃগয়ার বিধিতেও সত্যিই লেখে না। পুরাণ ইতিহাসে এমন গল্পও আছে যাতে দেখা যাচ্ছে—মৈথুন-চর পশু পক্ষীকে রাজপুরুষেরা ছেড়ে দিচ্ছেন। রামায়ণের মতাে মহাকাব্যে যেখানে ক্রেঞ্চ-মিথুনের একরের মৃত্যুতে কবির শােক শ্লোকে পরিণত হয়েছিল, সেখানে মৈথুনরত প্রাণীকে হত্যা করার মধ্যে পাণ্ডুর যে অন্য কোনও আক্রোশ ছিল তা আমরা হলফ করে বলতে পারি। বস্তুত স্ত্রী-পুরুষের মিলনের মধ্যে পুত্রলাভের যে সুখ সম্ভাবনা থেকে যায় সেই সম্ভাবনা তাঁর বারংবার প্রতিহত হচ্ছিল বলেই তিনি তাঁর অন্তরে আক্রোশ মিটিয়েছেন মৈথুনরত একটি মৃগকে হত্যা করে, নইলে মুনি যেমন বলেছেন—সম্ভোগ সুখের মর্মও তিনি জানতেন, শাস্ত্র। এবং ধর্মের মর্মকথাও তিনি জানতেন—স্ত্রীভােগানাং বিশেষজ্ঞঃ শাস্ত্ৰধমথিতত্ত্ববি।
যাই হােক মুনি শাপ দিলেন-মৈথুনে প্রবৃত্ত হলেই পাণ্ডু মারা যাবেন এবং আমাদের কাছে পার। পুত্রোৎপতির অক্ষমতা এই মুহূর্তে থেকে যতই সকারণ হয়ে উঠুক, আমরা বেশ জানি—মনস্বিনী কুন্তী তাঁর শত দুঃখ সত্বেও তাঁকে এই বিষয়ে কোনও প্রশ্ন কবেননি। কবি লিখেছেন–ঋষির অভিশাপ শুনে পাণ্ডুর মনে এত আঘাত লেগেছিল যে, দুই স্ত্রীকে ছেড়ে তিনি কঠোর ব্রত নিয়ম আশ্রয় করে তপস্যা করবেন বলেই ঠিক করলেন। আমরা জানি—এও সেই আক্রোশ। বাবংবার পুত্রলাভের সম্ভাবনা ব্যাহত হওয়ায় নিজের ওপরে তাঁর যে আক্রোশ হয়েছিল, সেই আক্রোশই তিনি চরিতার্থ করতে চেয়েছিলেন গৃহস্থধর্মের ওপরে রাগ করে। এই অবস্থায় কুন্তা এবং মাদ্রা—দুজনেই তাঁকে অন্তত পত্নত্যাগে বিরত করতে পেরেছিলেন। তাঁরা বরঞ্চ নিজেরাও স্বামীর অনুধর্মে কঠোর নিয়ম-আচার পালন করতে রাজি হয়েছিলেন।…..

……এইভাবেই দিন কাটছিল । দিনরাত যজ্ঞ-হােম, তপঃ-স্বাধ্যায়, ঋষিদের সঙ্গ আর ফলমূল আহার—দুই স্ত্রীর সঙ্গে সহধর্মচারী পাণ্ডুর দিন কাটছিল এইভাবেই। কিন্তু গভীর ক্ষত মিলিয়ে গেলেও যেমন তার দাগ থাকে, তেমনই এই শত ব্রত-নিয়ম-আচারের মধ্যেও পুত্রহীনতার যন্ত্রণা তাঁকে পীড়া দিতে লাগল। প্রাথমিকভাবে পাণ্ড নিয়ােগপ্রথারও পক্ষপাতী ছিলেন না। তিনি স্বয়ং বিচিত্রবীর্যের পুত্র নন, তাঁর স্ত্রীর গর্ভে তিনি ব্যাসের ঔরসে জন্মেছিলেন। নিজের জন্ম-প্রক্রিয়ার এই অকৌলীন্যে হয়তো প্রাথমিকভাবে তিনি নিয়ােগের বিরােধী ছিলেন। কারণটা পরিষ্কার। বাবা বিচিত্রবীর্য বেঁচে ছিলেন না, তাঁর অনধিকৃত ক্ষেত্রে কেউ সন্তান দান করলেন—সে এক কথা। আর। পা বেঁচে আছেন, অথচ তাঁর চোখের সামনে বা আড়ালে অন্য কেউ তাঁরই প্রিয়া পত্নীতে উপগত হবে—এমন একটা অনধিকারচর্চা তাঁকে হয়তাে ঈষাকাতর করে তুলেছিল।……

…..পাণ্ডু একটা গল্প বললেন কুন্তীকে ! বললেন—কেমন করে এক বীর রমণী স্বামীর আদেশ মতাে এক যােগসিদ্ধ ব্রাহ্মণকে আশ্রয় করে পুত্রলাভ করেছিলেন। গল্প বলার শেষে পাণ্ডুর অনুরােধ-কুন্তী ! আমি মত দিচ্ছি। তুমি কোনও বিশিষ্ট ব্রাহ্মণের ঔরসে পুত্রলাভের চেষ্টা করাে।…..

…..পাণ্ডু গল্প বলেছিলেন। তার উত্তরে কুন্তীও এবার গল্প বললেন পাকে। বললেন পাপুরই ঊর্ধ্বতন এক বিরাট পুরুষ ঝুষিতশ্বের গল্প। ব্যুষিতা বহুতর যজ্ঞ এবং ধর্মকার্য করে দেবতাদের তুষ্ট করেছিলেন বটে, তবে নিজের স্ত্রী ভদ্রার প্রতি তাঁর অতিরিক্ত আসক্তি এবং সদ্যোগের ফলে তাঁর শরীর হল ক্ষীণ এবং তিনি অপুত্রক অবস্থাতেই মারা গেলেন। মারা যাবার পর মৃত স্বামীকে জড়িয়ে ধরে অশেষে-বিশেষে বিলাপ করলেন ভদ্রা। সেই বিলাপের সুরকুন্তী যেমন শুনিয়েছেন–সে সুর কালিদাসের রতি-বিলাপ সঙ্গীতের প্রায় পূর্বকল্প বলা যেতে পারে। যাই হােক বিলাপে অস্থির ব্যুষিতাষের প্রেতাত্মা অন্তরীক্ষ-লােক থেকেই জবাব দিল–তুমি ওঠো, সরে যাও, চতুর্দশী আর অষ্টমী তিথিতে তােমার শয্যায় ফিরে আসব আমি। আমারই সন্তান হবে তােমার
গর্ভে-জনয়িষ্যাম্যপত্যানি ত্ব্যহং চারুহাসিনি।……

……কুন্তী পাণ্ডকে বললেন—যদি শব-শরীর থেকে তাঁর পুত্র হতে পারে-সা তেন সুষুবে দেবী শবেন ভরতভ—কা-হলে মহারাজ! তােমার তাে যােগ-তপস্যার শক্তি কিছু কম নয়, তুমিই আমাকে পুত্র দেবে- শক্তো জনয়িতুং পুত্রা। পাও এসব কথার ধার দিয়েও গেলেন না। নিজের যােগশক্তি বা তপস্যার শক্তিতেও খুব যে একটা আস্থা দেখালেন তাও নয়। বরঞ্চ পুরাণে ইতিহাসে কবে কে নিয়ােগ-প্রথায় আপন স্ত্রীর গর্ভে অন্যের ঔরসে পুত্র লাভ করেছে, সেই সব উদাহরণ একটা একটা করে কুন্তীকে শােনাতে লাগলেন। পাণ্ডু মানসিকভাবে কুন্তীকে অন্য একটি পুরুষের ক্ষণিক-মিলনের জন্য প্রস্তুত করতে চাইছেন। শেষ কথায় পাণ্ডু বললেন-আমাদের জস্মও যে এই নিয়ােগের ফলেই সম্ভব হয়েছে, তাও তাে তুমি জান—অস্মাকমপি তে জন্ম বিদিতং কমলেক্ষণে।…..

……কুন্তীর জীবনে স্বামীর ভালবাসার এই বুঝি চরম মুহূর্ত। পাণ্ডুর আবেগ-মধুর অনুনয়ে কুন্তী বিগলিত হলেন। আস্তে আস্তে শােনাতে আরম্ভ করলেন কুন্তিভােজের বাড়িতে সেই অতিথি-পরিচর্যার কাহিনী। বললেন তাঁর পরম তৃষ্টির কথা এবং অবশ্যই বশীকরণ মন্ত্রের কথা। এই বিষন্ন গম্ভীর মুহূর্তে, যখন তিনি স্বামী থাকতেও স্বামীর ইচ্ছাতেই অন্য পুরুষের শয্যাসঙ্গিনী হতে চলেছেন, এই মুহূর্তে তাঁর পক্ষে সেই কৌতুক-সঙ্গমের কথা উল্লেখ করা সম্ভব হল না।…..

…..কুন্তী বললেন—তুমি অনুমতি দাও। দেবতা, ব্রাহ্মণকে তুমি বলবে–যং ত্বং বক্ষ্যসি ধর্মজ্ঞ দেবং ব্রাহ্মণেব চ—তাঁকে আমি ডাকতে পারি । তবে কোন দেবতাকে ডাকব, কখন ডাক-এই সমস্ত ব্যাপারে আমি তােমার আদেশের অপেক্ষা করব, আমি কিছু জানি না। তােমার ঈশিত কর্মে তােমারই আদেশ নেমে আসুক আমার ওপর ত্বত্ত আজ্ঞা প্রতীক্ষপ্তীং বিদ্ধ্যস্মিন্ কর্মণীলিতে।…..

…..কিন্তু পাণ্ডু কী করলেন ? কন্যাবস্থায় কুন্তীর কৌতুক-সঙ্গম যেমন হঠাৎই হয়ে গিয়েছিল, তেমনই এখনও কোনও মানসিক প্রস্তুতির সময় দেননি পাণ্ডু। কুন্তীর প্রস্তাবের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি কেবল একবার—আমি ধন্য হলাম, অনুগৃহীত হলাম, তুমি আমার বংশের ধারা রক্ষা করে বাঁচালে আমাকে—কেবল এই একবার কৃতজ্ঞতা জানিয়ে সঙ্গে সঙ্গে বলে বসেছেন—আজই, আর দেরি নয়, আজই তুমি আহ্বান করাে ধর্মরাজকে।…..

……কুন্তী সংযত চিত্তে ধর্মের পূজা করে দুবাসার মন্ত্রে ধর্মকে আহ্বান জানালেন মিলনের জন্য। ধর্ম এলেন। জিজ্ঞাসা করলেন–কী চাই তােমার কুন্তী। কুন্তী বললেন—পুত্র চাই। পুত্ৰ দিন। তারপর শতশ পর্বতের বনের ভিতর একাস্তে ধর্মের সঙ্গে মিলন হল কুন্তীর শয্যাং জগ্রাহ সুশ্রোণী। সহ ধর্মিণ সূতা ।।
জ্যেষ্ঠ মাসের এক পূর্ণিমা তিথিতে কুন্তীর প্রথম ছেলের জন্ম হল। নাম হল যুধিষ্ঠির। প্রথম পাণ্ডব। ধর্মের দান প্রথম পুত্রটি লাভ করেই পাণ্ডুর এবার ক্ষত্রিয় জাতির শৌর্যবীর্যের কথা স্মরণ হল। কুন্তীকে বললো—লােকে বলে ক্ষত্রিয় জাতির শক্তি বলই হল সব। তুমি মহাশক্তিধর একটি পুত্রের কথা চিন্তা করাে। পাণ্ডুর ইচ্ছা জেনে কুন্তী নিজেই এবার বায়ুদেবতাকে স্মরণ করলেন। কাবণ দেবতার মধ্যে তিনি মহাশক্তিধব । বায়ু এলেন। কুন্তীর দ্বিতীয় পুত্র লাভ হল—ভীমসেন।…..

……এমন একটি পুত্র চান যাঁর মধ্যে দেব-মুখ্য ইন্দ্রের তেজ থাকবে। থাকবে দেরাজের সর্বদমন শক্তি এবং উৎসাহ । এমন একটি বীরপুত্রের জন্য তিনি নিজে তপস্যায় বসলেন আর ঋষি-মুনির পরামর্শে কুন্তীকে নিযুক্ত করলেন সাংবৎসরিক ব্রতে। স্বামী-স্ত্রীর যুগল-তপস্যায় সন্তুষ্ট হলেন দেবরাজ । স্বীকার করলেন-কুন্তীর গর্ভে অলােকামান্য পুত্রের জন্ম দেবেন তিনি। পাণ্ডুর ইচ্ছায় কুন্তী এবার দেবাজকে স্মরণ করলেন সঙ্গম-শয্যায়। জন্মালেন মহাবীব অর্জুন।…..

……আসলে এও এক বিকার। প্রজননশক্তিহীন অবস্থায় পাণ্ডুর এক ধরনের বিকার ছিল। কিন্তু অন্য পুরুষের সংসর্গে নিজের তিনটি পুত্র লাভ করেও পাণ্ডু যে এখনও পুনরায় স্ত্রীকে পুরুষান্তরে নিয়ােগ করতে চাইছেন-এর মধ্যে বােধ হয় আরও বড় কোনও বিকার আছে। জানি না, মনস্তাত্ত্বিকেরা এ বিষয়ে কী ভাববেন, তবে পাণ্ডুর অবদমিত শৃঙ্গারবৃত্তিই যে তাঁর কুলবধুকে এক রকম দুর্গতির দিকে ঠেলে দিয়েছে, সেকথা স্বীকার না করে উপায় নেই।
কুন্তী মাত্ৰীকে মন্ত্র দিলেন বটে, কিন্তু সাবধান করে বললেন—একবার, শুধু একবারের জন্য যে কোনও দেবতাকে ডাকতে পারাে তুমি । মাত্র একবারে যমজ দেবতা অশ্বিনীকুমারদ্বয়কে আহ্বান করে কুন্তীর বুদ্ধির ওপর টেক্কা দিলেন।…..

…..মৃগ-মৈথুনের মধ্যে কোনও ইন্দ্রিয়পীড়ন অনুভব না করলে পাণ্ডু নিজের সম্বন্ধে এই কথাটা বলতেন না। এই মুহূর্তে স্মরণে আনতেন না পিতা বিচিত্রবীর্যের কথা, যিনি অতিরিক্ত স্ত্রীসদ্যোগে শরীরে যক্ষ্মা ধরিয়ে ফেলেছিলেন। পাণ্ডুর অবস্থাও প্রায় একই রকম। তবে তাঁর এই সম্ভোগ-প্রবৃত্তির ইন্ধন হিসেবে কুন্তীকে ব্যবহার করাটা পাণ্ডুর পক্ষে কঠিন ছিল। কারণ সেই সংযম, সেই ব্যক্তিত্ব। কিন্তু মদ্ররাজকন্যা এ বিষয়ে পাণ্ডুর মনােমত ছিলেন এবং তাঁর অনিয়ত শৃঙ্গারবৃত্তিতে প্রধান ইন্ধন ছিলেন তিনিই। যথেষ্ট শৃঙ্গারে সাহায্য করার কারণেই স্বামীর প্রণয় ছিল তাঁর বাড়তি পাওনা। বস্তুত কুন্তী এর কোনওটাই পছন্দ করতে পারেননি। স্বামীর প্রণয়ের জন্য অসংযত রুচিহীনতাকে তিনি প্রশ্রয় দিতে পারেননি, নিজেকেও বল্গাহীন ভাবে ভােগ ভাসিয়ে দিতে পারেননি।
মৃগ-মুনির অভিশাপের পর পাণু যে হঠাৎ বড় ধার্মিক হয়ে উঠলেন জপ-যজ্ঞ-হােমে দিন কাটাতে লাগলেন—তার পিছনে তাঁর ধর্মীয় সংযম যত বড় কারণ, শাপের ভয় তার চেয়ে অনেক বড় কারণ। মৃগ মুনির অভিশাপ ছিল—মৈথুনে প্রবৃত্ত হলেই তােমার মরণ ঘটবে।…..

……তিনি দুটি বালকের হাত ধরে রাজার সঙ্গে যেতে পারতেন, কিন্তু তিনি তা করেননি। মহাভারতের কবি পর্যন্ত তাঁর এই ভঙ্গি নাপছন্দ করে লিখেছেন—মাদ্রী তাঁর পিছন পিছন গেছেন একা–তং মাদ্রী অনুজগামৈকা। তাও যদি বা তিনি সাবগুণ্ঠনে জননীর প্রৌঢ়তায় অনুগমন করতেন স্বামীর। না, তিনি তা করেননি। একটি শাড়ি পরেছেন যেমন সুন্দর তেমনই সুক্ষ্ম। তাও পুরাে পরেননি অর্ধেকটাই কোমরে জড়ানাে। সূক্ষ্ম শাড়ির অবগুণ্ঠনে গায়ের অনেক অংশই বড় চোখে পড়ছিল। মাদ্রীকে তরুণীর মতাে দেখাচ্ছিল। পাণ্ড দেখছিলেন, কেবলই দেখছিলেন—সমীক্ষমাণঃ সতু তাং বয়স্থাং তনুবাসস।
পাণ্ডুর হৃদয়ে দাবানল ছড়িয়ে পড়ল। তিনি জড়িয়ে ধরলেন মাদ্রীকে। মাত্ৰী শুধু স্বামীর মৃত্যু-ভয়ে তাঁকে খানিক বাধা দিলেন বটে, কিন্তু সুক্ষ্ম বস্ত্রের পরিধানে আগুন লাগিয়ে দিয়ে নিজেকে রক্ষা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। মৈথুন-লিঙ্গায় পাণ্ডুর তখন এমন অবস্থা যে, অত বড় একটা অভিশাপের কথাও তার মনে ছিল না। যদিবা মাদ্রীর কথায় তার মনে হয়েও থাকে তখুর শাপশাপজং ভয়মুৎসুজ্য–এইরকম একটা ভঙ্গিতে তিনি মৃত্যুর জন্যই যেন কামনার অধীন হলেন—জীবিতাস্তায় কৌরব্যো মন্মথস্য বংশগতঃ। সঙ্গম-মুহুর্তেই পাণ্ডু মারা গেলেন। মাদ্রীর উচ্চকিত আর্তনাদ শােনা গেল। …..

…..আমি বলি-ওরে ! সেকালে নিয়ােগ প্রথা সমাজ-সচল প্রথা ছিল। পাণ্ডুর ছেলে ছিল না বলে কবি যেখানে ধর্ম, ইন্দ্র বা বায়ুকে কুন্তীর সঙ্গে শোয়াতে লজ্জা পাননি, সেখানে দুবাসার সঙ্গে শেয়াতেও কবির লজ্জা হত না—যদি আদতে ঘটনাটা তাই হত।…..

…..জ্যেষ্ঠের পরম্পরায় দ্রৌপদী প্রত্যেক স্বামীর ঘর আলাে করবেন এক বৎসর ধরে—একৈকস্য গৃহে কৃষ্ণা বসেবকল্মষা—এই ঠিক ছিল পাঁচ স্বামীর মধ্যে। অত্যন্ত প্রত্যাশিতভাবে যুধিষ্ঠিরই প্রথম সুযােগ পান দ্রৌপদীর সঙ্গসুখ উপভােগ করার। এই বিদগ্ধা রমণীর সঙ্গ লাভ করে যুধিষ্ঠিরের মন কতটা রঞ্জিত হল, নববধুর লজ্জিত বাসরশয্যায় যুধিষ্ঠিরের কানে কানে কী কথা বলেছিলেন দ্রোপদী—সে সব খবর মহাভারতের কবি দেননি।
শুধু একদিন যখন সেই ব্রাহ্মণের গরু চুরি হয়ে গেল, আর অর্জুন অস্ত্র-সংগ্রহের জন্য ঢুকলেন যুধিষ্ঠিরের ঘরে—হয়তাে তখন একদন্ত জ্যেষ্ঠস্বামীর সঙ্গে বসেছিলেন দ্রৌপদী। বাস্ । এইটুকুই।…..

…..কালাে হলে কী হবে, সেকালে দ্রৌপদীর মতাে সুন্দরী সারা ভারতবর্ষ খুঁজলেও মিলত না। অবশ্য দ্রৌপদীর রূপ যে শুধুমাত্র শরীরকেন্দ্রিক ছিল না, তাঁর রূপ যে দেহের সীমা অতিক্রম করেছিল, সেকথা বােঝা যাবে স্বয়ং ব্যাসের বর্ণনায় । মহাভারতকার দ্রৌপদীর শারীরিক রূপ বর্ণনায় বেশি শব্দ খরচ করেননি। সুকেশী সুস্তনী শ্যামা পীনশ্রোণীপয়ােধরা’ –দ্রৌপদীর এই বর্ণনা মহাকাব্যের সুন্দরীদের তুলনায় আলাপমাত্র। লক্ষণীয় বিষয় হল-নায়িকার রূপ বর্ণনার ক্ষেত্রে মহাকাব্যকারের যেখানে অনুপম শব্দরাশির বন্যা বইয়ে দেন, সেখানে দ্রৌপদীর রূপবর্ণনায় মহাভারতকার যেন একেবারে আধুনিক মানসিকতায় গ্ল্যামারের দিকে মন দিয়েছেন। দ্রৌপদী যে মােটেই বেঁটে ছিলেন না, আবার ঢ্যাঙা লম্বাও ছিলেন নানাতি ন মহতী—সেকেলে কবির কাছে এই বর্ণনা, এই বাস্তব দৃষ্টিটুকু অভাবনীয়। তাও একবার নয়, দুবার এই কথা ব্যাসকে লিখতে হয়েছে, যদিও অন্যত্র হলে নারীদেহের প্রত্যঙ্গ বর্ণনার ঝড় উঠে যেত তাঁরই হাতে। ব্যাস জানতেন দ্রৌপদীর রূপ তাঁর কুঞ্চিত কেশরাশি কিংবা স্তন-জঘনে নয়, তাঁর রূপ সেই দৃপ্ত ভঙ্গিতে—বিভ্রাজমানা পুষা—সেই বিদগ্ধতায়, যার সঙ্গে তুলনা চলে শুধু নীলাভ বৈদুর্যমণির—বৈদুর্যমণিসন্নিভা।….

…….. কুমারিল মহাভারতের প্রমাণে জানিয়েছেন যে, সুমধ্যমা দ্রৌপদী প্রত্যেক পতিসঙ্গমের পরই আবার কুমারী হয়ে যেতেন—মহানুভবা কিল সা সুমধ্যমা বভূব কন্যব গতে গতে’হনি। পাঠক! আবার আপনি দ্রৌপদীর বৃদ্ধা দিদিশাশুড়ি সত্যবতীর সঙ্গে দ্রৌপদীর মিল খুঁজে পেলেন। মহর্ষি পরাশরের সঙ্গে সঙ্গম হওয়ার পর সত্যবতী আবার তাঁর কুমারীত্ব লাভ করেছিলেন এবং তা পরাশরের বরে। দ্রৌপদীর কাহিনী কিন্তু আরও সাংঘাতিক, তিনি প্রতি সঙ্গমের পরেই কুমারীত্ব ফিরে পেতেন। আগেই যে শ্লোকটি উদ্ধার করেছি সেটি কিন্তু ভট্ট কুমারিলের লেখা । …..

…..ভগবান শংকর বলেছেন—তুমি পাঁচবার যেহেতু একই কথা বলেছ, অতএব তােমার স্বামী হবে পাঁচটি। কিন্তু যিনি পরজন্মে পঞ্চপতির মনােহারিণী হবেন, তাঁর বিদগ্ধতা, তাঁর বাস্তব-বােধই কি কম হবে। পূর্বজন্মের ঋষিকন্যা দ্রৌপদী বললেন—হােক আমার পাঁচটা বর, তাতে আপত্তি নেই, কিন্তু তা হলে এই বরও দিতে হবে যে, প্রত্যেক স্বামী-সহবাসের পরই কুমারীত্ব লাভ করব আমি কৌমারমেব তৎ সর্বং সঙ্গমে সঙ্গমে ভবেৎ। বারংবার এই কুমারীত্বলাভের মধ্যেই দ্রৌপদীর দৈবসত্তার সন্ধান পেয়েছেন দার্শনিক কুমারিল।…..

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *