হানড্রেড রোমান্টিক নাইটস্ – গিয়ােভানি বােকাসিও (প্রথম দিন)

›› অনুবাদ  ›› ১৮+  

গিয়ােভানি বােকাসিও-র ডেকামেরন টেলস এর বাংলা অনুবাদ।

 

প্রথম গল্প

সের চেপেরেলাে নামে একটি দুষ্ট লােক মৃত্যুর সময় জনৈক ধার্মিক সাধুর কাছে মিথ্যা স্বীকারােক্তি করলাে, তারপর সে মারা গেল। এই স্বীকারােক্তির ফলে তাকে পুত  চরিত্রের ব্যক্তি মনে করা হল এবং সে সাধু চিয়াঞ্জেলেত্তো নামে পরিচিত হয়ে রইলাে।

সুন্দরী মহিলাগণ, আমার ওপর প্রথম গল্পটি বলার যখন ভার পড়েছে তখন আমার কর্তব্য ঈশ্বরের নিয়ে, গল্পটি আরম্ভ করা। ঈশ্বরের দয়াও যেমন অপার, তেমনি তার লীলা বােঝাও ভার। তাকেই করে আমার গল্প আরম্ভ করছি।

মাশ্চিয়াত্তো ফ্রানজেসি নামে একজন ব্যক্তি ফ্রান্সে ব্যবসা করতেন। ব্যবসা করে সজ্জন ব্যক্তিরূপে তিনি যেমন খ্যাতি অর্জন করেছিলেন তেমনি প্রচুর অর্থ উপার্জন করেছিলেন। এই ব্যক্তি পােপ বনিফেসের বিশেষ অনুরােধে একবার টাসকানিতে এসেছিলেন।

তার সঙ্গে ফ্রান্সের রাজার ভাই লর্ড চার্লস স্টেটলেসও এসেছিলেন। ব্যবসায়ীদের কাজকারবার চারদিকে ছড়িয়ে থাকে। সকল কাজ একজনের দ্বারা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। কাজকারবার তদারক করবার জন্যে ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন মােকামে উপযুক্ত লােক নিযুক্ত করেন। মাশ্চিয়াত্তোও তার বিভিন্ন মােকামে লােক নিযুক্ত করেছিলেন যারা তার কাজকারবার তদারক করতাে এবং পাওনা টাকা আদায় করে তাঁর কাছে পাঠিয়ে দিত। কিন্তু বারগাণ্ডিতে তার কোনাে প্রতিনিধি ছিল না। এখানে তার বেশ কিছু টাকা আদায় হয়নি, দীর্ঘদিন বাকি পড়ে ছিল। বারগাণ্ডিতে কোনাে প্রতিনিধি না থাকায় টাকা ঠিকমত আদায় হয়নি এ কথা যেমন ঠিক, তেমনি এ কথাও ঠিক যে, বারগাণ্ডিতে মানুষদের বদনামও আছে। ঋণ তারা পরিশােধ করতে চায় না। বার বার তাগাদা দিতে হয়। কড়া মানুষ ব্যতীত তাদের কাছ থেকে পাওনা টাকা আদায় করা দুরূহ।

মাশ্চিয়াত্তো বারগাণ্ডি মােকামের জন্যে এমন একজন লােক খুঁজছিলেন যে বিশ্বাসী হবে অথচ বারগাণ্ডির দুষ্ট পাওনাদারদের মােকাবিলা করে পাওনা আদায় করতে পারবে। নীতিজ্ঞানহীন বারগাণ্ডির ক্রেতাগুলিকে নিয়ে তিনি ব্যতিব্যস্ত ও বিরক্ত। প্রচুর টাকা বাকি পড়ে গেছে। সেগুলি তাড়াতাড়ি আদায় । করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

কি করা যায় চিন্তা করতে করতে সের চেপেরেলোকে তাঁর মনে পড়ল। লােকটা প্যারিসে তার বাড়িতে মাঝে মাঝে আসতাে। যেমন চতুর, তেমনি ধড়িবাজ। মাথায় খাটো, নিজের পােশাক-আশাকের দিকে নজর আছে। প্রাতভা নামে একটা পাড়ায় সে থাকে।

ফরাসিরা চেপেরেলো শব্দের অর্থ জানতাে  না। তাদের ভাষায় কাছাকাছি একটি শব্দ আছে যার অর্থ মালা। তার সঠিক নামটাও ফরাসিরা জানতাে না। তারা তাকে চিয়াপ্পেলেত্তো বলে ডাকত।

বিশেষ কোনাে উকিলের সঙ্গে যুক্ত না থেকেও সে মুহুরির কাজ করতাে, দলিল লিখত, আইন সম্বন্ধে পরামর্শ দিত। তার লেখা সেইসব দলিল বা পরামর্শ কতদূর আইনানুগ তা বলতে পারবাে না; তবে কেউ যদি তার ত্রুটি ধরতে বা বলতাে সে যা লিখেছে বা বলছে তা বেআইনি, তাহলে সে ক্ষেপে যেত। অনেকের কাজ সে নিজে যেচে করে দিত, এমনকি বিনা পয়সাতেও। তবে যে যত বেশি পয়ল দিত তার কাজটা তত বেশি বেআইনি হত। নিজে জড়িত না থাকলেও লােকটি মামলা লড়িয়ে দিতে ছিল ওস্তাদ এবং দুই পক্ষে লড়াই বাধিয়ে দিয়ে সেই সুযােগে নিজেও দু পয়সা করে নিত। মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে তার জুড়ি কেউ ছিল না। এমন নিখুঁতভাবে সাক্ষ্য দিত যে, খুঁত বার করা যেত না এবং তার সাক্ষ্যের জোরে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বাদী বা প্রতিবাদী মামলায় জয়লাভ করতাে।

ভাইয়ে ভাইয়ে, বন্ধুতে বন্ধুতে লড়াই বাধিয়ে দিয়ে সে আনন্দ উপভােগ করতাে। এজন্যে রক্তপাত হলেও সে ভূক্ষেপ করতাে না। খুনােখুনি দেখতে তার খুব ভালাে লাগতাে, নিজেও সে তলােয়ার বা ছােরা চালিয়ে ঠাণ্ডা মাথায়, দু চারটে খুন করেনি তা কে বলতে পারে?

কথায় কথায় ভগবানের নাম নিত। ঈশ্বর ছাড়া সে যেন কিছুই জানে না, সবই তার কৃপা। কেউ খুন হলে মন্তব্য করতাে, তারই ইচ্ছা। অথচ তাকে কেউ কখনও গির্জায় যেতে দেখেনি বরঞ্চ পানশালায় যেতে সে বেশি ভালবাসতাে। শুধু পানশালা কেন? নিষিদ্ধপল্লীতেও তাকে দেখা যেত। অশ্লীল আলােচনা করতেও শােনা যেত। যে পরিমাণে সে নারীলােলুপ ছিল, সেই পরিমাণে সুরাপান করতাে, খেতাে সাধারণ মানুষের তিন গুণ। এমন লােক সে জুয়াে খেলবে না, পরকে ঠকাবে না, জোচ্চুরি করবে না। এমনকি হতে পারে? তার তুল্য মহাশয় ব্যক্তি ক্কচিৎ জন্মগ্রহণ করেছে।

লােকটি কয়েকবার বেশ বিপদেও পড়েছিল এবং মাশ্চিয়াত্তো তাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করেছে। মাশ্চিয়াত্তোর সঙ্গে তার পরিচয় থাকায় অনেকে তাকে খাতিরও করতাে।

মাশ্চিয়াত্তো অবশ্য লােকটিকে উত্তমরূপে চিনতেন তাই তিনি স্থির করলেন বারগাণ্ডির এই দুষ্ট মানুষগুলােকে জব্দ করতে চিয়াঞ্জেলেত্তোই পারবে। তিনি তাকে ডেকে পাঠালেন। প্রভুভক্ত কুকুরের মতাে চিয়াঞ্জেলেত্তো এসে হাজির, কারণ এই মওকায় পকেটে কিছু যেতেও পারে।

মাশ্চিয়াত্তোর বাসায় চিয়াঞ্জেলেত্তো এলাে। প্রাথমিক কথাবার্তা হল। মাশ্চিয়াত্তো বিচক্ষণ ব্যক্তি। তিনি বুঝলেন লােকটার কোনাে পরিবর্তন হয়নি, না দেহে না মনে। সে সেইরকম ধুরন্ধরই আছে। একে দিয়ে তার কাজ চলবে। মাশ্চিয়াত্তো তাকে বললেন, সের চিয়াঞ্জেলেত্তো শােন, আমি এখান থেকে চলে যাচ্ছি, কিন্তু বারগাণ্ডির কয়েকজন অসাধু ব্যবসায়ীর সঙ্গে আমার দেনাপাওনা মেটেনি।

তুমি তাে ওদের ভালাে করেই চেন এবং আমি জানি যে তুমি ওদের জব্দ করার কৌশল জান। খবর নিয়ে জেনেছি যে, তােমার হাতে এখন কোনাে কাজ নেই। তা তুমি আমার কাজগুলাে করে দাও। ব্যাটাদের কাছ থেকে আমার টাকাগুলাে আদায় করে দাও। আদালতে তােমার বিরুদ্ধে যদি কোনাে অভিযােগ থাকে সেগুলাে আমি দেখব। আর তুমি যে টাকা আদায় করবে তার একটা অংশও তুমি পাবে।

চিয়াঞ্জেলেত্তোর হাতে তখন সত্যিই কোনাে কাজ ছিল না। রােজগার প্রায় বন্ধই ছিল, টানাটানি চলছিল। তাছাড়া এই ব্যবসায়ী ভদ্রলােক তার অনেক উপকার করেছেন, ও করেন। অতত্রব এ সুযোেগ হাতছাড়া করা উচিত নয়। সে সানন্দে সঙ্গে সঙ্গে রাজি হল, বলল, এ কাজ আমি আনন্দের সঙ্গেই করব।

শর্তাদি স্থির হল। কথাবার্তা পাকা হল। মাশ্চিয়াত্তো তাকে তার হয়ে কাজ করবার ক্ষমতাপত্র লিখে দিলেন। এবং রাজার স্বাক্ষর করা পরিচয়পত্র দিয়ে কাজ বুঝিয়ে তিনি তার কর্মক্ষেত্রে ফিরে গেলেন।

চিয়াঞ্জেলেত্তো আর বিলম্ব করলাে না। সে অবিলম্বে বারগাণ্ডি যাত্রা করলাে। বাৱগাণ্ডিতে তার পরিচিত কোনাে ব্যক্তি ছিল না বললেই চলে। সেখানে পৌঁছে প্রথমে সে ভিজে বিড়ালটি সেজে যাদের কাছ থেকে তাকে কাজকারবার করতে হবে তাদের বিষয়ে খোঁজখবর নিল। বুঝল লােকগুলি এক একটি ঘুঘু, সােজা আঙুলে ঘি উঠবে না। নরমগরম হয়ে এবং ছলে-বলে-কৌশলে কাজ উদ্ধার করতে হবে। যাইহােক বেশিদিন অপেক্ষা না করে সে কাজ আরম্ভ করে দিল।

ফ্লোরেন্সের দুই ভাই বারগাণ্ডিতে মহাজনি ব্যবসা করতাে, চড়া সুদে টাকা ধার দিত। তারা মাশ্চিয়াত্তোর নাম শুনেছিল। জানতে তিনি একজন সম্মানিত ব্যক্তি। চিয়াঞ্জেলেঞ্জে এই দুই ভাইয়ের বাসার ঘর ভাড়া নিয়েছিল। তার পরিচয় জেনে দুই ভাই তাকে খাতির করেই আশ্রয় দিয়েছিল।

দুর্ভাগ্যের বিষয় যে চিয়াঞ্জেলেত্তো কঠিন রােগে পড়ল। দুই ভাইয়ের কাছে সে সম্মানিত অতিথি, তাই তারা বৈদ্য ডেকে তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করলাে। পরিচর্যার জন্যে লােকও নিযুক্ত করলাে। যাতে অতিথি শীঘ্র সুস্থ হয়ে ওঠে সেজন্যে তারা সবকিছুর ব্যবস্থা করলাে।

লােকটিকে সারিয়ে তােলবার জন্যে দুই ভাইয়ের চেষ্টা কিন্তু ব্যর্থ হতে চললাে। কারণ চিয়াঞ্জেলেত্তোর বয়স তাে হয়েছিলই উপরন্তু সে অনিয়মিত জীবন-যাপন করেছে। শরীরের ওপর প্রচুর অত্যাচার করেছে। তাই বাগে পেয়ে রােগ এবার তাকে ছাড়তে চাইল না। বৈদ্য বললেন, এ এক মারাত্মক রােগে ভুগছে। এবং এর অবস্থার দিন দিন অবনতি হচ্ছে। বাঁচার আশা নেই।

বৈদ্যর কথা শুনে দুই ভাই প্রমাদ গণল। কি করা যায়? যে ঘরে চিয়াঞ্জেলেত্তো ওয়েছিল তার। পাশের ঘরে দুই ভাই এই বিপদ নিয়ে আলােচনা আরম্ভ করলাে।

এক ভাই আর এক ভাইকে বলল, লােকটাকে নিয়ে আমরা এখন কি করবাে? আচ্ছা বিপদেই তাে পড়া গেল দেখছি! এই অবস্থায় আমরা তাে ওকে বিদেয় করে দিতেও পারি না। কারণ তাতে আমাদেরই বদনাম হবে। লােকটাকে আমরা আশ্রয় দিয়েছি। এখন সে মরণাপন্ন। এই অবস্থায় ওকে যদি আমরা বিদেয় করে দিই তাহলে কাজটা তাে অন্যায় হবেই, আর লােকেই বা বলবে কি? অথচ দেখ, আমরা তাে চেষ্টার ত্রুটি করছি না। এবং লােকটিও আমাদের কোন ক্ষতি করেনি।

অপর ভাই বলল, আমি খোজ নিয়ে জেনেছি লােকটা ভীষণ পাজি। মরবার আগে যেসব ধর্মানুষ্ঠান করতে হয় তাতে ও রাজি হবে না বলে মনে হয়। আর কোনাে ধর্মযাজকের সামনে ও কোনাে স্বীকারােক্তি করবেই না। লােকটা যদি মরেই যায় তাহলে তাে ওকে কোথাও কবর দেওয়াও যাবে না। মরা কুকুরের মতাে ওকে কোনাে খানাখন্দে ফেলে দিতে হবে। তাছাড়া আর-এক সমস্যা, লােকটা যদি মরবার আগে ধর্মযাজকের কাছে স্বীকারােক্তি করেও, তাহলেও ওর অপকর্ম এবং পাপের বােঝা এত ভারী যে কোনাে ধর্মযাজকই ওকে আশীর্বাদ করে পাপ থেকে ওকে মুক্তিদান করতে রাজি হবেন না। অতত্রব লােকটা মরলে ওর লাশটা কোথাও ফেলে দেওয়া ছাড়া আর কোনাে উপায় দেখছি না।

অপর ভাই তখন বলল, লাশ ফেলে না হয় দেওয়া গেল কিন্তু যদি লােক জানাজানি হয়ে যায় তাহলে আমাদের অবস্থাটা কি হবে একবার ভেবে দেখেছ? আমরা সুদের কারবার করি। তাতেই তাে আমাদের যথেষ্ট বদনাম আছে। তারপর তারা যদি শােনে আমরা এইরকম একটা অপকর্ম করেছি, তাহলে তাে আমাদের রাস্তায় বেরনোই দায় হবে। শুধু তাই নয়, আমাদের খাতকেরা হয়ত আমাদের বাড়ি চড়াও হয়ে গালাগাল দেবে। জিনিসপত্তর লুঠপাট করবে। সুদ দেওয়া বন্ধ করবে। চাই কি আমাদের হয়ত শহর থেকে কুকুরের মতাে তাড়িয়ে দেবে।

পাশের ঘরে শুয়ে চিয়াপ্পেলেত্তো কিন্তু দুই ভাইয়ের সব কথা শুনতে পাচ্ছিল। সে কানে ভালােই শুনতে পেত। তাছাড়া রােগীদের শ্রবণশক্তি বােধহয় প্রখর হয়। দুই ঘরের মাঝে কাঠের পার্টিশন থাকায় শােনার সুবিধে হচ্ছিল। সে দুই ভাইকে ডেকে বলল, আমি তােমাদের সমস্ত কথা শুনেছি। আমি চাই না যে আমার জন্যে তােমরা কোনাে বিপদে পড় বা তােমাদের কোনাে ক্ষতি হােক। আমার জন্যে তােমাদের কোনাে চিন্তা করতে হবে না। তােমরা যা বলেছ বা অনুমান করেছ সে সবই ঠিক। তবে তােমাদের কোনাে ভয় নেই। ঈশ্বরের কাছে আমি অনেক অন্যায় ও পাপ কাজ করেছি এবং মরবার আগে যদি কোনাে প্রতিকার না করি তাহলে তাে নরকেও আমার স্থান হবে না। তােমরা একজন সৎ, জ্ঞানী, নিস্পাপ এবং সাধু যাজককে ডেকে আন। তারপর যা করবার আমি করবাে। এবং তােমাদের কোনাে অনুযােগের কারণ থাকবে না। আশা করি তােমরা আমার অনুরােধ রক্ষা করবে এবং আমি যেমন চাইছি। সেইরকম একজন যাজক আনতে পারবে।

মৃত্যুপথযাত্রী ব্যক্তিটির কথা শুনে দুই ভাই খুব একটা ভরসা পেল না; তবুও তারা ধর্মযাজকদের এক মঠে গিয়ে সৎ জ্ঞানী ও অভিজ্ঞ একজন যাজকের সন্ধান করলাে। এরকম একজন যাজক অবশ্যই পাওয়া গেল। শহরে তিনি অত্যন্ত শ্রদ্ধেয়, ধীরস্থির ও বিচক্ষণ।

কি উদ্দেশ্যে তাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এ সবই দুই ভাই তাকে বলেছিল। সের চিয়াপ্পেলেত্তোর শয্যাপার্শ্বে বসে তিনি আগে তাকে সান্ত্বনা দিলেন। তারপর জিজ্ঞাসা করলেন, শেষবার বা কতদিন আগে সে স্বীকারােক্তি (কনফেশন) করেছে।

এই চিয়াঞ্জেলেত্তো—যে কখনই কোথাও কোনাে স্বীকারােক্তি করেনি, সে তার মৃত্যু আসন্ন জেনেও অম্লানবদনে বলে দিল, ফাদার আমি নিয়ম করে প্রতি সপ্তাহে কোনাে গির্জায় গিয়ে কনফেশন করি। সৎ বা অসৎ কাজ যা করেছি বলে আমি মনে করি, সে সবই আমি বিনা দ্বিধায় স্বীকার করেছি। শুধু এই অসুখে পড়ে আমি কোনাে গির্জায় যেতে পারিনি। বা কারও কাছে কনফেশন করতে পারিনি।

যাজক সন্তুষ্ট হয়ে বললেন, মাই সন্ তুমি খুব ভালাে কাজই করেছ। তােমার যে এমন অভ্যাস ছিল তা জেনে আমি সন্তুষ্ট হলুম। যেহেতু তুমি প্রতি সপ্তাহেই কনফেশন করতে সেহেতু আমার মনে হয় তােমার বেশি কিছু বলার নেই। এবং আমারও জিজ্ঞাস্য নেই।

সের চিয়াঞ্জেলেত্তো বলল, ফাদার এমন কথা বলবেন না। যদিও আমি ঘন ঘন ও নিয়মিতভাবে কনফেশন করেছি তথাপি আমি আমার শেষ সময়ে আমার জন্ম থেকে আজ পর্যন্ত যতদূর মনে করতে পারি সব পাপকর্মের সাধারণভাবে কনফেশন করতে চাই। ফাদার! তাই আমার অনুরােধ, যতরকম পাপ কাজ মানুষের পক্ষে সম্ভব সকল বিষয়ে আমাকে এমনভাবে প্রশ্ন করুন, যেন আমি কখনও কনফেশন করিনি। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে প্রশ্ন করবেন, আমাকে সহজে ছাড়বেন না। আমি যে অসুস্থ সেজন্য কোনােরকম দয়া করবেন না। আপনি জেরা করুন, আমি আমার আত্মার মুক্তির জন্য অকপটে সবই স্বীকার করবাে। ঈশ্বর মহান। আশা করি তিনি আমাকে ক্ষমা করবেন।

এই ধুরন্ধর লােকটিকে ফাদার তাে চেনেন না। তিনি তার মিষ্টি মিষ্টি কথা শুনে পরম প্রীত হলেন। ভাবলেন লােকটি খাটি খ্রীশ্চান। মানুষের মতাে মানুষ। তার আর বিশেষ কিছু প্রশ্ন করার নেই। তবুও লােকটি যখন বলছে তখন কিছু প্রশ্ন করা তাঁর কর্তব্য। তাই তিনি জিজ্ঞাসা করলেন যে, সে কখনও কোনাে পরনারীর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে কোনাে পাপ করেছে কিনা।

একটি দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে চিয়াঞ্জেলেত্তো বলল, ফাদার এ বিষয়ে আমি আপনাকে সত্যি কথাই বলবাে। তবে জানি না, আমার কথা আপনি বা কেউ বিশ্বাস করবেন কিনা। আমি কিন্তু যা ঘটেছে তাই বলবাে।

ফাদার বললেন, তােমার কোনাে ভয় নেই বাবা, যা ঘটেছে তুমি তা স্বীকার করে শান্তি পাবে।

আপনি আমাকে যখন আশ্বাস দিলেন ফাদার, তখন আমি বলি যে, আমি চিরকুমার এবং জন্মাবধি কোনাে নারীকে উপভােগ করা আমার দ্বারা সম্ভব হয়নি। সেদিক থেকে বিচার করলে আমি আজও শুদ্ধ আছি।

ফাদার বললেন, ঈশ্বরের কৃপা তােমার ওপর বর্ষিত হােক। কি মহান ও কঠোর ব্রহ্মচর্য ব্রত তুমি পালন করেছ। তােমার এই সংযম তুলনাহীন। কারণ ইচ্ছা করলে তুমি বিপরীত জীবনধারা বেছে নিতে পারতে। আমাদের ব্রহ্মচর্যব্রত অবশ্য পালনীয়, কিন্তু তােমার স্বাধীনতা ছিল।

এরপর ফাদার জিজ্ঞাসা করলেন যে, সে কখনও অতিভােজন দ্বারা ঈশ্বরকে অসন্তুষ্ট করেছে কিনা। দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে সের চিয়াপ্পেলেত্তো উত্তর দিল, তা সে বেশ কয়েকবার করেছে। ভক্তদের উপবাস করবার যে নিয়ম তা সে পালন করেছে। সপ্তাহে তিনদিন সে শুধু রুটি ও জল ব্যতীত তার কিছু যায়নি। কিন্তু মাতাল যেভাবে সুরাপান করে, সে সেইভাবে যথেচ্ছ জলপান করেছে। বিশেষ করে প্রার্থনার পর ক্লান্ত হয়ে অথবা তীর্থযাত্রার সময় পথশ্রমে ক্লান্ত হলে। তার আরও কিছু ক্রূটি রয়েছে। মেয়েরা গ্রামে গেলে যেমন শাকপাতার চচ্চড়ি খায়, সেটি তার খেতে প্রায়ই লোভ হয়েছে। এবং উপবাসের সময় কখনও কখনও তার উপবাস ভঙ্গ করবার ইচ্ছাও হয়েছে। অথচ সে জানে এমন চিন্তা অন্যায়।

ফাদার বললেন, বাপধন ওসব কিছু নয়, উপবাসের সময় এমন মনে হওয়া স্বাভাবিক। তবে একে কোনাে গুরুত্ব দিতে নেই। যত শুদ্ধচিত্তর মানুষই হােন না কেন, দীর্ঘ সময় উপবাস করলে উপবাস ভঙ্গ করার চিন্তা হতেই পারে। এবং ক্লান্তি অনুভব করলে জলপান করবারও ইচ্ছা হয়।

চিয়াঞ্জেলেত্তো একথা শুনে বলল, না বাবা, আমাকে আশ্বাস দেবার জন্যে এমন কথা বলবেন না। আমি জানি ঈশ্বরের সেবা করতে হলে তা পবিত্র মনেই করতে হয়। মনে যেন কোনাে চিন্তা প্রবেশ না করে! তাহলে উপবাসের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়।

এই কথা শুনে ফাদার খুব আনন্দিত হয়ে বললেন, তােমার মনােভাব জানতে পেরে আমি খুবই আনন্দিত হলুম। এ ব্যাপারে তুমি অবশ্যই দৃঢ়চিত্ত। খুব ভালাে, এবার তুমি আমাকে বলল, তােমার যা নেই এমন কিছু পাবার জন্যে তােমার লােভ হয়েছিল কিনা। অথবা যে ধন তােমার রাখা উচিত নয়, সেই ধন পাবার জন্যে তুমি আগ্রহী হয়েছিলে কিনা।

উত্তর যেন তৈরিই ছিল। চিয়াপ্পেলেত্তো বলল, বাবা আমি এই কুশীদজীবীদের বাসায় আছি বলে আপনি আমাকে খারাপ ভাববেন না। ওদের কাজকারবারের সঙ্গে আমার কোনাে সম্পর্ক নেই। বলতে কি, ওরা যে ঘৃণিত পন্থায় অর্থ উপার্জন করে সেই পন্থা ত্যাগ করতে ওদের আমি অনুরােধ করেছি। বলতে কি ওদের আমি ভৎসনাও করেছি। এদের কাছে আমার থাকাও এটিও অন্যতম উদ্দেশ্য। আমি যদি অসুখে না পড়তুম তাহলে হয়ত আমি কৃতকার্যও হতুম। হা ঈশ্বর! কেন তুমি আমাকে এই কালব্যধিতে ফেললে! যা হােক আপনাকে বলতে দ্বিধা নেই যে আমার পিতা আমাকে বিত্তশালী করেই ধরাধাম ত্যাগ করেছিলেন। কিন্তু আমি অধিকাংশ সম্পত্তি দান করে দিয়েছি। তবে আমাকেও তাে খেতে হবে। জীবনধারণ করতে হবে। এবং দরিদ্র খ্রীশ্চানদের জন্যে কিছু করতে হবে। এজন্যে আমি কিছু ব্যবসাবাণিজ্য করেছি। ব্যবসা করবার সময় অবশ্য কিছু লাভ রাখতে হয়েছে। তবে সেই লাভের অংশ আমি গরিবদের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছি। অর্ধেক নিজের জন্যে রেখেছি। অর্ধেক তাদের দিয়েছি। এ ব্যাপারে ঈশ্বর আমার এতদূর সহায় ছিলেন যে, আমি আমার কাজকারবার সুষ্ঠুভাবেই সম্পাদন করতে পেরেছি।

বেশ ভালােই করেছ, ফাদার বললেন। কিন্তু এবার বলাে তাে তুমি কি তােমার মেজাজ ঠিক রাখতে পারতে? নাকি রাগ করে অপরকে ক্লেশ দিতে?

উত্তরে চিয়াঞ্জেলেত্তো বললাে, স্বীকার করতে লজ্জা নেই, তা প্রায়ই আমার মাথা গরম হয়ে উঠত। কিন্তু বাবা, বলুন চারিদিকে অন্যায় ও অপরাধ দেখে এবং ঈশ্বরকে বা তার ইচ্ছা অবহেলিত হতে দেখে কে এমন মানুষ আছে, যে তার মেজাজ ঠিক রাখতে পারে? আপনিই বলুন, দিনের মধ্যে এইসব অবাধ্য ছােকরারা যদি গির্জায় যাওয়া দূরের কথা, অযথা মিথ্যা কথা বলে, মদ্যপান করে, গালাগালি দেয়, ঈশ্বর চিন্তা না করে অলস হয়ে বসে থাকে, তাহলে কি আপনারও রাগ হবে না?

ফাদার বললেন, বাপধন! তুমি ন্যায্য কথাই বলেছ। এজন্যে তােমাকে আমি অনুতাপ করতে বলি না। কিন্তু প্রশ্ন করি যে, তুমি কি কখনও ক্রোধে আত্মহারা হয়ে এমন কোনাে অন্যায় কাজ করেছ যার জন্যে খুনজখম পর্যন্ত হয়েছে বা অন্য কোনাে ক্ষতি হয়েছে?

চিয়াঞ্জেলেত্তো বলল, হা ঈশ্বর! আপনি স্বয়ং ঈশ্বরসেবী হয়ে আমাকে এ কথা কি করে বলতে পারলেন? আপনি যা উল্লেখ করলেন তার কণামাত্রও আমি যদি চিন্তা করতুম তাহলে কি ঈশ্বর আমার প্রতি এত উদার হতেন? ওসব কাজ হল গুণ্ডা বদমাইশদের। আমি যখনি এমন কোনাে বদ মানুষের সম্মুখীন হয়েছি তখনি আমি তাকে গারদে পাঠিয়েছি। তবে সেই সঙ্গে তার কল্যাণের জন্যে এবং ফাতে সে কুপথ ত্যাগ করে সেজন্যে প্রার্থনাও করেছি।

বৎস, ঈশ্বর তােমার কল্যাণ করুন, ফাদার বললেন। কিন্তু এবার বলাে, তুমি কখনও কোনাে ব্যক্তির বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছ? অথবা কারও বদনাম করে বেড়িয়েছে কিংবা অনুমতি না নিয়ে কারও কোনাে দ্রব্য নিয়েছ?

চিয়াঞ্জেলেত্তো বলল, না কখনও নয়। তবে একবার ব্যতিক্রম হয়েছিল। আমার একজন প্রতিবেশী ছিল। সে সামান্য ছলছুতােয় তার স্ত্রীকে প্রহার করতাে। এজন্য আমি তার স্ত্রীর আত্মীয়স্বজনদের কাছে লােকটির নিন্দা করেছিলুম। কারণ সেই হতভাগিনীর জন্যে আমি মনােকষ্ট ভােগ করতুম। লােকটা মাতাল হলেই এই দুষ্কর্ম করতাে। ভগবানই জানেন বদমাইশটা তার স্ত্রীকে কী নির্মমভাবেই না প্রহার করতাে!

এবার ফাদার বললেন, তুমি তাে বললে যে তুমি ব্যবসা করতে। তা ব্যবসাসূত্রে কোনাে লােককে কখনও ঠকিয়েছ কি?

তাহলে শুনুন ফাদার, কোনাে এক ব্যক্তিকে আমি একখণ্ড কাপড় বিক্রি করেছিলুম। সে যে দাম দিয়েছিল তা আমি না গুণে বাক্সয় রেখে দিয়েছিলুম। কিন্তু পরে হিসেব করবার সময় দেখলাম সে আমাকে চার পেনি বেশি দিয়ে গেছে। কিন্তু এক বছরের মধ্যে তাকে চার পেনি ফেরত দেওয়ার সুযােগ হয়নি। কারণ এই এক বছরের মধ্যে বা পরে তাকে আমি আর দেখতে পাইনি। তখন আমি সেই চার পেনি একজন ভিখারিকে দিয়ে দিয়েছিলুম।

ফাদার বললেন, এটা সামান্য ব্যাপার। তবে ভিখারিকে পেনিগুলাে দিয়ে ভালােই করেছ।

এরপর ফাদার তাকে আরও কয়েকটা প্রশ্ন করলেন এবং ধুরন্ধর ব্যক্তিটি একইরকম মােলায়েম ভাবে উত্তর দিতে লাগল। অতএব ফাদার তাকে আর কোনাে প্রশ্ন না করে মুমূর্ষ ব্যক্তির জন্যে যেসব ধর্মানুষ্ঠান করা উচিত সেগুলি সম্পন্ন করবার উদ্যোগ করতে লাগলেন। চিয়াঞ্জেলেত্তো বুঝি ফাদারকে ছাড়বার পাত্র নয়। সে বলল যে, তার আরও কয়েকটা পাপ স্বীকার করা উচিত।

ফাদার জিজ্ঞাসা করলেন, আর কি পাপ তুমি স্বীকার করবে?

সে বলল, আমি একবার পবিত্র স্যাবাথ দিবসের অবমাননা করেছি। আমার এক ভৃত্যকে দিয়ে আমি শনিবার ঘর ঝাট দিয়েছিলুম।

ফাদার বললেন, এটাও সামান্য ব্যাপার।

পিতা, এ কথা বলবেন না। সামান্য বলে উড়িয়ে দেবেন না। কারণ এই পবিত্র দিবসেই আমাদের সকলের মহান পিতা মৃত্যু থেকে উথিত হয়েছিলেন।

এ কথা শুনে ফাদার জিজ্ঞাসা করলেন, আর কি অন্যায় করেছ?

চিয়াঞ্জেলেত্তো বলল, হ্যা একবার আমি অন্যমনস্ক হয়ে গির্জা প্রাঙ্গণে থুতু ফেলেছিলুম।

ফাদার মৃদু হেসে বললেন, এজন্যে তােমাকে চিন্তা করতে হবে না, কারণ আমরাও গির্জায় প্রায়ই থুতু ফেলে থাকি।

সের চিয়াঞ্জেলেত্তো বলল, তাহলে আমি বলবাে আপনারা অন্যায় করেন। কারণ যেখানে আমরা ঈশ্বরের প্রার্থনা করি সেই পবিত্র স্থান পরিষ্কার রাখা উচিত।

সংক্ষেপ করে বলি সে ফাদারকে এই ধরনের আরও নানা কথা বলল। তারপর দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে সে কাঁদতে আরম্ভ করল। এমন কপট কান্নায় সে অভ্যস্ত।

ফাদার ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, কি ব্যাপার? কাদছ কেন?

সের চিয়াঞ্জেলেত্তো যেন অতি কষ্টে কান্না দমন করে বলল, হায় হায় ফাদার, একটা পাপ যে আমি স্বীকার করিনি আর সেই পাপকার্যের কথা মনে পড়লে লজ্জায় আমার মাথা হেট হয়ে যায়। আমি চোখের জল ফেলি। এই এখন যেমন দেখছেন। আমার মনে হয় এই ভীষণ অন্যায় কাজটির জন্য ঈশ্বর আমাকে কখনও ক্ষমা করবেন না।

ফাদার বললেন, আরে তুমি এ কি বলছ? পৃথিবীর যাবতীয় নরনারী আজ পর্যন্ত যত পাপ কাজ করেছে এবং ভবিষ্যতে করবে এবং সেই সকল পাপ কাজ যদি একটি মাত্র মানুষে নিহিত হয় এবং সেই মানুষ তার পাপ কাজগুলির জন্য সত্যিই অনুতপ্ত হয়, তাহলে ঈশ্বর এতই সদাশয় ও দয়াবান যে, তিনি সেই ঘাের পাপীকেও ক্ষমা করবেন। তার কাছে সেই পাপী অকুণ্ঠচিত্তে তার পাপস্বীকার করে তার করুণা লাভ করতে পারে। অতএব বৎস, তুমি অকুণ্ঠচিত্তে তােমার সেই পাপ প্রকাশ করতে পারাে।

ফাদারের কথা শুনে সেই হতভাগ্য যেন সান্ত্বনা লাভ করতে পারল না। সে সরবে কাঁদতে কাদতে বলতে লাগল, হায় ফাদার, আমার সেই পাপের বুঝি শেষ নেই। আমি এমন সাংঘাতিক একটা অন্যায় কাজ করেছি যে, আমার বিশ্বাস মহান ঈশ্বরও আমাকে ক্ষমা করবেন না যদি না আপনিও আমার হয়ে তার কাছে করুণা ভিক্ষা করেন।

ফাদার বললেন, তােমার কোন ভয় নেই। তুমি নিঃশঙ্কচিত্তে বল। আমি তােমার হয়ে তার কাছে করুণা ভিক্ষা করবাে।

ফাদারের কথা শুনেও যেন সের নিশ্চিন্ত হতে পারলাে না। সে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। যদিও ফাদার তাকে আশ্বাস দিতে থাকলেন তথাপি সে তার সেই পাপ প্রকাশ করতে ভরসা পাচ্ছে না। ফাদার যখন প্রায় নিরাশ হয়েছেন, সেইসময় লম্বা একটা নিঃশ্বাস ফেলে শয়তানটা বলল, ফাদার আপনি যখন আমাকে আশ্বাস দিয়েছেন যে আপনি আমার হয়ে তার কাছে করুণা ভিক্ষা করবেন, তখন আমি বলছি। আমার তখন বয়স অল্প, বালকমাত্র। সেই বয়সে আমি আমার মাকে অভিসম্পাত দিয়েছিলুম। আপনিই বলুন ফাদার, এই জঘন্য পাপের কি ক্ষমা আছে? কথা শেষ করতে না করতে সের আবার কাদতে আরম্ভ করলাে।

ফাদার বললেন, বৎস তুমি যা করেছ তা অন্যায় ঠিকই, কিন্তু তাকে কি তুমি মহা পাপ মনে করাে? লােকে তাে দিনের মধ্যে কতবারই ঈশ্বরের শাপ-শাপান্ত করছে। কিন্তু তারা অনুতপ্ত হলেই ঈশ্বর তাদের মার্জনা করছেন। তাহলে তুমি মনে করছাে কেন যে ঈশ্বর তােমাকে ক্ষমা করবেন না? কেঁদ না, সাহস সঞ্চয় করাে। দেখছ না, যে মানুষ তাকে ক্রুশে বিদ্ধ করেছে, সেই মানুষকেও তিনি ক্ষমা করেছেন। তিনি তােমাকে নিশ্চয়ই ক্ষমা করবেন।

সের ফুপিয়ে ফুপিয়ে বলতে লাগল, হায় ফাদার আপনি এমন কথা কি করে বলছেন? আমার প্রিয় ও নমস্য মা-যে আমাকে ন’মাস গর্ভে ধারণ করেছে এবং কত শতবার আমাকে কোলে করেছে। আর সেই মাকেই আমি গালি দিলুম, কটু কথা বললুম এবং অভিসম্পাত দিলুম? এর চেয়ে অন্যায় আর কি হতে পারে? ফাদার, আপনি যদি আমার হয়ে তার করুণা ভিক্ষা না করেন তাহলে তিনি আমাকে কখনই ক্ষমা করবেন না।

এইভাবে ধূর্ত চিয়াঞ্জেলেত্তো তার কনফেশন শেষ করলাে। মৃত্যু স্থির জেনে এবং মৃত্যুশয্যায় শয়ন করেও সে ঈশ্বরকেই ঠকাতে চাইছে। ফাদার তার অভিনয় ধরতেই পারেননি। তিনি ধরে নিলেন লােকটি অত্যন্ত সৎ ও সাধু প্রকৃতির। এবং তার আর কিছু স্বীকার করবার নেই। তখন তিনি ধর্মানুষ্ঠানগুলি একে একে পালন করলেন।

অনুষ্ঠান শেষ করে তিনি সের চিয়াঞ্জেলেতোকে বললেন, ঈশ্বরের দয়ায় তুমি শীঘ্রই আরােগ্য লাভ করবে তথাপি তিনি যদি তােমাকে তার কাছে ডেকে নেন, তাহলে স্থির জেনাে, তােমার আত্মা তার আশিস লাভ করবে। এবার তাহলে তুমি বলাে, ঈশ্বর যদি তােমাকে ডেকে নেন তাহলে কি আমাদের কনভেন্টে তােমাকে কবর দিতে পারি?

সের বলল, নিশ্চয়ই ফাদার, আমি আর কোথায় যেতে পারি? আপনি আমার জন্যে এত করলেন, আমার জন্যে তার কাছে প্রার্থনাও করবেন আর আমি আপনাকে ছেড়ে অন্যত্র সমাধিস্থ হবাে? এ হতে পারে না। তাছাড়া আমি তাে আপনাদের কনভেন্টের প্রতি অনুরক্ত! যদিও আমি আপনাদের কবরভূমিতে যাবার অযােগ্য, তথাপি আপনি দেখবেন আমার অভিলাষ যেন পূর্ণ হয়। যদিও আমি পাপী কিন্তু আপনার দয়ায় আমি যেন খ্রীস্টান রূপে মরতে পারি।

ফাদার বললেন তিনি সেরের কথা শুনে প্রীত হয়েছেন এবং তিনি তার সকল অনুরােধ রক্ষা করতে চেষ্টা করবেন।

সেই ভাই দু’জনের কিন্তু সন্দেহ ছিল যে যাজক ডাকতে বললেও এবং কনফেশন করতে চাইলেও লােকটা ধাপ্পা দেবে। তাই ওরা ঘরের কাঠের পার্টিশনের আড়ালে দাঁড়িয়ে সব কথা শুনছিল। সে যে হারে মিথ্যে কথা বলে চলেছিল এবং যেভাবে কপট অভিনয় করছিল তা শুনে দুই ভাইয়ের পক্ষে হাসি দমন করা মুশকিল হয়ে পড়ছিল। এক ভাই আর এক ভাইকে বলতে লাগল, কি চরিত্রের মানুষ রে বাবা, বুড়াে হয়েছে, অসুখে ভুগে মরতে বসেছে, এখনও ভয় নেই? দিব্যি কথা বলে চলেছে অথচ ভালাে করে জানে বেচারা ফাদারকে ফাঁকি দিতে পারলেও ঈশ্বরকে ফাঁকি দিতে পারবে না।

যাই হােক তারা ভাবল, আমাদের মাথা ঘামিয়ে কি দরকার বাপু! ও যা ইচ্ছে বলুক। আমাদের উদ্দেশ্য তাে সিদ্ধ হয়েছে! ওকে তাে এখন আমরা গির্জা অনুমােদিত যে কোনাে কবরখানায় কবর দিতে পারব! যেখানে সেখানে মরা কুকুর বেড়ালের মতাে ফেলে দিয়ে লােকনিন্দা সহ্য করতে হবে না।

অনেকক্ষণ কথা বলে মৃতপ্রায় সের চিয়াঞ্জেলেত্তো রীতিমত ক্লান্ত হয়ে পড়ল। ইতিমধ্যে ফাদার সবরকম অনুষ্ঠান করে মঠে ফিরে গিয়েছিলেন। সের চিয়াগেলেত্তোর স্বাসকষ্ট আরম্ভ হল এবং সেইদিনই সে মারা গেল।

মৃত্যুর পর দুই ভাই গির্জায় খবর দিল। ফাদার এসে খ্রীশ্চান ধর্মানুসারে যুথাকর্তব্য সম্পন্ন করে গেলেন। পরলােকে গিয়ে সের চিয়াঞ্জেলেত্তো কি জবাবদিহি করেছিল আমাদের জানা নেই তবে সৎ খ্রীশ্চানরূপে তার যে মৃত্যু হয়নি সেটা ঠিক। অবশ্য তার মৃত্যুর পর ইহলােকে কিছু হয়েছিল।

যে ফাদারের কাছে সের কনফেশন করেছিল তিনি খবর পেয়ে গির্জায় ঘণ্টাধ্বনি করতে বললেন এবং অন্যান্য ফাদার ও যাজকদের সমবেত করে সের চিয়াগেলেত্তোর অশেষ গুণগান করে পবিত্র আত্মার জন্য বিশেষ প্রার্থনা করলেন। তিনি বললেন এমন সৎ খ্রীশ্চান বিরল। একজন মহান পুরুষ ইহলােক ত্যাগ করে চলে গেলেন। দেবদূতরা এগিয়ে এসে তাকে যীশুর কাছে নিয়ে গেছেন।

কবর দেবার সময় সেই ফাদার অনুষ্ঠানের কোনাে ত্রুটি রাখেননি। সাড়ম্বরে তার কবর দেওয়া হয়েছিল। তিনি সকল যাজকদের তাে সমবেত করেছিলেনই এমনকি শহরের সকল নরনারীকেও জড়াে করেছিলেন। ফাদারের কাছে তার গুণগান শুনে সকল স্বীকার করলাে যে, সত্যই একজন সাধুব্যক্তিই মারা গেলেন।

ফাদারের ভাষণ শুনে সমবেত সকলে অভিভূত হয়ে পড়ল। সের চিয়াঞ্জেলেত্তোর পদচুম্বন করবার জন্যে হুড়ােহুড়ি পড়ে গেল। লােকটা মরে গিয়ে সাধু বনে গেল। সে রাতারাতি সেন্ট চিয়াঞ্জেলেত্তো বনে গেল এবং তাকে ঘিরে নানা গালগল্প লােকের মুখে মুখে ঘুরতে লাগল—সে নাকি স্বয়ং যীশুর মতাে। কতই না অলৌকিক ঘটনা ঘটিয়েছে! এ গল্প শেষ করে প্যানফিলাে বলল, কিন্তু আমরা জানি স্বর্গে তার স্থান হয়নি। স্বয়ং শয়তানের পাল্লায় পড়ে সে নরকযন্ত্রণা ভােগ করছে, যদি সেখানেও তার স্থান হয়ে থাকে। ঈশ্বরের অনুগ্রহ লাভ করতে হলে তার সঙ্গে বঞ্চনা করা উচিত নয়। এবং আমরা তা করবােও না।

 

দ্বিতীয় গল্প

আব্রাহাম নামে একজন ইহুদি ছিল। জিহানট ডি শেভিগনি নামে এক ব্যক্তি রােম ও রােমের যাজক সম্প্রদায় সম্বন্ধে তার এমনই কৌতুহল উদ্রেক করেন যে সে প্যারিস থেকে রােমে বেড়াতে যায়। রােমে এসে খ্রীশ্চান যাজকমণ্ডলীর চারিত্রিক অবনতি তাকে এতদুর প্রভাবিত করে যে, সে নিজ ধর্ম ত্যাগ করে খ্রীস্টান ধর্ম অবলম্বন করে।

প্যানফিলাের কাহিনীটি মহিলারা আন্তরিকভাবে উপভােগ করে। কিছু কিছু অংশ তাে তাদের কৌতূহল উদ্রেক করে। সকলে প্যানফিলাের গল্প অত্যন্ত মনােযােগ দিয়ে শুনছিল। প্যানফিলাের পাশে বসেছিল নেফাইল। কুইন প্যামপিনিয়া তাকে গল্প বলতে অনুরােধ করলাে। নেফাইল সানন্দে রাজি হয়ে হাসি মুখে বলতে আরম্ভ করলাে।

প্যানফিলাের গল্পটি শুনে আমরা বুঝতে পারলুম যে, আমরা পাপ করলেও ঈশ্বর আমাদের ক্ষমা করেন। তার লীলা বােঝা ভার। তিনিই তাে আমাদের সৎপথে বা কুপথে চালিত করছেন। কেন এমন করছেন তা তিনিই জানেন। হয়ত আমাদের পরীক্ষা করছেন। মানুষের মন বিভিন্ন দিকে ধাবিত হয়। সেই মন কি আমরা নিজেরা চালিত করি, নাকি ঈশ্বরই করান? কে বলতে পারে? দেখা যাক আমার গল্প থেকে কে কি শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে।

শুনুন সুন্দরীরা, প্যারিসে একজন স্বনামধন্য বস্ত্র ব্যবসায়ী বাস করতেন। তাঁর নাম ছিল জিহানট শেভিগনি। ব্যবসা থেকে তার প্রচুর আয় হতাে। ব্যবসায়ী হিসেবে তিনি সৎ ও ন্যায়পরায়ণ ছিলেন।

আব্রাহাম নামে অত্যন্ত ধনী এক ইহুদি তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। তার মতাে আৱাহাম ন্যায়পরায়ণ ব্যবসায়ী ছিলেন। আব্রাহামের কথা ভেবে জিহানট মনেপ্রাণে দুঃখ অনুভব করতেন যে, এমন সৎ ও ন্যায়নিষ্ঠ এক ব্যক্তি যে ধর্মে বিশ্বাস করে সেই ধর্ম তাকে ভুল পথে নিয়ে যাচ্ছে। ফলে মৃত্যুর পর তার নরকবাস অবধারিত।

তাই জিহানট ভালাে ভালাে শব্দ প্রয়ােগ করে মােলায়েম কষ্টে আব্রাহামকে বােঝালেন। আব্রাহাম, তুমি ভুল ধর্ম অবলম্বন করে ভুল পথে চলছ। তুমি তােমার ঐ ইহুদি ধর্ম ত্যাগ করে পবিত্র খ্রীস্টান ধর্ম গ্রহণ করে মনে-প্রাণে অপার শান্তি লাভ করাে। দেখ, খ্রীস্টান ধর্ম কত মহান। এই ধর্ম দিন দিন শক্তি সঞ্চয় করছে। এই ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে বহু ব্যক্তি। অথচ দেখ, তােমার ধর্মের অবনতি হচ্ছে। এই ধর্মের প্রতি মানুষ বিশ্বাস হারাচ্ছে। এই ইহুদি ধর্ম একদিন মুছে যাবে।

উত্তরে আব্রাহাম নিজ ধর্মের সমর্থনে বলল, আমার ধর্ম ব্যতীত এমন আর কোনাে ধর্ম নেই যা দৃঢ় ও মজবুত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আমি ধর্মে জন্মেছি এবং এই ধর্ম নিয়েই মরতে চাই। আমার ধর্মমত থেকে আমাকে কেউ বিচলিত করতে পারবে না।

আব্রাহামের এই স্পষ্ট উত্তরে জিহানট নিরুৎসাহ হল না। ব্যবসায়ীরা সাধারণত যে ঘরােয়া ভাষায় কথা বলে জিহানট কয়েকদিন পরে সেই ভাষায় তার বন্ধুকে বােঝালাে খ্রীস্টান ধর্ম ইহুদি ধর্ম অপেক্ষা শ্রেয়। এবং কেন মানুষ খ্রীস্টান ধর্ম অবলম্বন করছে তার সমর্থনে অনেক যুক্তি উপস্থিত করল। ইহুদি ধর্মবিশ্বাস ও মতবাদ সম্বন্ধে আব্রাহাম নিজে অনেক পড়াশােনা করেছিল। এবং এই ধর্ম সে আঁকড়ে ধরে আছে। তথাপি তার বন্ধুর যুক্তিগুলি সে অবহেলা বা তুচ্ছ জ্ঞান করেনি। জিহানটের কথাগুলি তার শুনতে ভালােই লাগত। কিন্তু নিজ ধর্মমতে তার বিশ্বাস অনড়। এবং নিজ ধর্ম ত্যাগ করে খ্রীস্টান ধর্ম গ্রহণ করবে না।

আব্রাহাম তার ধর্মকে যে পরিমাণ ধরে রাখতে চায় জিহানট তার চেয়ে আরও কঠোরভাবে বন্ধুর ধর্মকে আঘাত করতে থাকে। জিহানটের বার বার এই আঘাতে আব্রাহামের বিশ্বাসের প্রাচীর একদিন বুঝি ভেঙে পড়ে। সে জিহানটকে বলে—

শােনাে জিহানট, তুমি আমাকে খ্রীশ্চান করতে চাও! বেশ আমি রাজি আছি। কিন্তু এক শর্তে। প্রথমে আমি রােমে যাবে। এবং যাকে তুমি বলছ পৃথিবীতে ঈশ্বরের প্রতিনিধি, তার এবং তার সহকর্মী যাজকদের জীবনযাত্রা ও কার্যপ্রণালী আমি পর্যবেক্ষণ করবাে। তুমি খ্রীশ্চান ধর্মের সমর্থনে যে সকল উৎকৃষ্ট যুক্তি আমাকে শুনিয়েছ, তার সঙ্গে রােমে ঐ সকল ব্যক্তিদের জীবনধারা আমি তুলনা করে দেখব। দেখব তােমার যুক্তি কতদূর সত্যি এবং যদি বুঝি যে তােমার ধর্মই শ্রেষ্ঠ, তাহলে আমি আমার ধর্ম পরিবর্তন করবাে। নচেৎ নয়। আমি যেমন ইহুদি আছি, তেমনই থাকব।

বন্ধুর এই প্রস্তাব শুনে জিহানট রীতিমতাে ঘাবড়ে গেল। এবং মনে মনে বলল, আমি আমার বন্ধুকে যে পরিশ্রম করে এতদিন ধরে যা বােঝাবার চেষ্টা করলুম এবং শেষ পর্যন্ত তাকে রাজি করাতে সমর্থ হলুম। এখন দেখছি তা সবই ব্যর্থ হবে যদি আব্রাহাম সত্যিই রােমে যায়, কারণ সে যদি সত্যিই রােমে যায় তাহলে যাজক প্রভুদের পঙ্কিল জীবনযাত্রা দেখে সে তাে কখনই খ্রীশ্চান হবে না এবং যদিও বা হয় তাহলেও সে নিশ্চিত আবার ইহুদি ধর্মেই ফিরে আসবে। আমার এতদিনের সব চেষ্টা ব্যর্থ হবে। দেখা যাক, এখন কি করতে পারি। আব্রাহামকে সে বলল

আরে শােনাে শােননা, তুমি এত কষ্ট করে আর এত খরচ করে প্যারিস থেকে রােম পর্যন্ত এই দীর্ঘপথ পাড়ি দেবে? স্থলপথেই যাও আর জলপথেই যাও, তােমার মতাে ধনীর পক্ষে উভয় পথই বিপজ্জনক। দুর্ঘটনা ছাড়া পথে দস্যুর ভয় আছে! তুমি কি মনে করাে যে, তােমাকে ধর্মান্তর করার উপযুক্ত ব্যক্তি এখানে নেই? খ্রীস্টান ধর্মের সমর্থনে আমি সে সব যুক্তি দেখিয়েছি, বা তার ব্যাখ্যা করেছি, সেগুলিতে তােমার যদি কোনাে সন্দেহ থাকে, তাহলে সন্দেহ নিরসন করবার এবং তােমার আরও যদি কিছু প্রশ্ন থাকে তাহলে তার সদুত্তর দেবার উপযুক্ত ব্যাখ্যাতা তুমি প্যারিস ছাড়া আর কোথায় পাবে? তাই আমি বলছি কি, তােমার এই কষ্টসাধ্য যাত্রা নিষ্প্রয়ােজন।

জিহানট বলতে লাগল, তােমাকে আমি বলছি শােনাে। রােমে গিয়ে খ্রীশ্চান যাজকদের যে জীবনযাত্রা তুমি দেখবে সেজন্যে তােমাকে রােমে যেতে হবে না। তা তুমি প্যারিসেই দেখতে পাবে। রােমে যে পবিত্রভাবে তারা জীবনযাত্রা নির্বাহ করছেন, প্যারিসের যাজকেরাও সেই একইভাবে এবং নিষ্ঠার সঙ্গে ধর্মপথে দিন অতিবাহিত করছেন। এখানকার গির্জা ও মঠ পরিদর্শন করলে তুমি দেখতেই পাবে যে, খ্রীস্টান যাজকেরা যীশুর আরও নিকটে বিরাজ করছেন। তুমি যদি আমার পরামর্শ গ্রহণ করাে। তাহলে আমি এখন তােমাকে বিরত হতে বলবাে। বরঞ্চ ভবিষ্যতে যদি রােমে তীর্থযাত্রায় যাও, তখন আমিও না হয় তােমার সঙ্গী হবাে।

আব্রাহাম উত্তর দিল, বন্ধু তুমি যা বলছাে ঠিকই বলছাে। তথাপি আমি সংক্ষেপে বলতে চাই যে, তুমি যদি আমাকে সত্যই খ্রীশ্চান করতে চাও এবং এবিষয়ে তুমি যে গভীর আগ্রহ দেখিয়েছ তা। কার্যকরী করতে চাও, তাহলে আমি বলব, যে আমাকে রােমে যেতে দাও। নচেৎ আমি এই গেড়ে বসলুম। কিছুই করবাে না। এবং আমাকে আর খ্রশ্চান হতে বােললা না।

জিহানট বুঝল যে, আব্রাহাম খ্রীশ্চান হবে বলে মনস্থির করেছে। তাই সে আর টানাটানি না করে বলল, ঠিক আছে, তাহলে তুমি একাই যাও। আমি তােমার মঙ্গল কামনা করি। জিহানট কিন্তু ভালােভাবেই বুঝেছে যে, রােমে পৌঁছে যাজকদের কাণ্ডকারখানা দেখে আব্রাহাম কখনই খ্রশ্চান না হলে কিছু যখন যাবে আসবে না, তখন আর চাপাচাপি করে লাভ কি?

মনস্থির করে আব্রাহাম ঘােড়ার পিঠে চাপল। এবং যতদূর সম্ভব দ্রুতগতিতে চলল। রােমে পৌছবার পর সেখানকার ইহুদি বন্ধুরা তাকে সাদর অভ্যর্থনা জানাল।

রােমে সে গুছিয়ে বসল। কিন্তু কেন এই শহরে এসেছে সে কথা কাউকে বলল না। সে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মহামান্য পােপ, বিভিন্ন স্তরের যাজক, তাদের অধঃস্তন সহকর্মী, বিভিন্ন গির্জা ও আনুষঙ্গিক সবকিছু লক্ষ্য করতে লাগল।

যদিও আব্রাহাম রােমের খ্রীশ্চান জগৎ সম্বন্ধে বিভিন্ন লোেক মারফত তথ্য সংগ্রহ করছিল, তথাপি চক্ষুকর্ণের বিবাদ ভঞ্জন করবার জন্যে সে নিজেও সবকিছু খতিয়ে দেখছিল। এবং যা দেখল তাতে সে সুন্তিত। সে দেখল এইসকল মহামান্য ও মান্য ব্যক্তিরা নিজ পবিত্র ধর্ম ও কামলালসার মধ্যে কোনাে পার্থক্য দেখে না। নিম্নস্তরের যাজকদের তাে কথাই নেই! উচ্চস্তরের যাজকরাও যে কোনাে ঘৃণিত কাজ করতে দ্বিধা বােধ করে না। লালসার জগতে তাদের অবাধ গতি। আদিরসের প্রতি তাদের আকর্ষণ এত তার যে, অনেকেই সমকামী। ফলে বারবনিতাদের তাে কথাই নেই! এমন কি সুদর্শন যুবকেরাও যা কিছু দাবি করে তা তারা সহজে আদায় করে নিতে পারে। | আৱাহাম আরও লক্ষ্য করলাে যে, শুধু যে তারা কামলীলার পঙ্কিল পাপে ডুবে আছে তা নয়, তারা রাক্ষসের মতাে পেটুক, পিপে পিপে মদ্যপান করে। এদের পশু ছাড়া আর কিছু বলা যায় না।

খুব নিকট থেকে সে লক্ষ্য করে দেখেছে যে, ন্যায্য বা অন্যায়ভাবে অর্থপ্রাপ্তির গন্ধ পাওয়ামাত্র তারা ক্ষুধার্ত পশুর মতাে ঝাপিয়ে পড়ে যতদুর পারে লুটে নিতে চায়। এই অতিলােভীদের পাইয়ে দেবার জন্যে একদল দালাল সক্রিয়। দালালগুলি একেবারেই নীতিহীন। সততা কী তারা জানে না।

প্যারিসে কোথাও এমন কি সুতীবস্ত্রের বাজারেও এমন নীতিজ্ঞানবর্জিত দালাল দেখা যায় না। রােমের যাজক ও অন্যান্য খ্রীস্টানরা এতদূর বেপরােয়াভাবে তাদের পাপকার্য চালিয়ে যাচ্ছে যে, মনে হয় তারা ভাবে যে তাদের মাথার ওপরে ঈশ্বর নামে কেউ নেই। নাকি ঈশ্বরের অস্তিত্ব জেনেও এরা তাকে ঠকাবার চেষ্টা করছে? আব্রাহাম এসব কি দেখছে?

আব্রাহাম একজন বিচক্ষণ ও সৎ ইহুদি। যাজকদের এই সকল ও অন্যায় পাপকার্য তার মতাে ব্যক্তির পক্ষে সহ্য করা মুশকিল। তথাপি সে ভাবল, চুপ করে থাকাই শ্রেয়। সে যথেষ্ট দেখেছে। আর নয়। এবার প্যারিসে ফিরে যাওয়া যাক। বিলম্ব না করে সে নিজের শহরে ফিরে এলাে।

আব্রাহাম যে প্যারিসে ফিরে এসেছে এ খবর জিহানট পেয়েছে। তার স্থির বিশ্বাস যে, তার বন্ধু রােমে স্বচক্ষে যা দেখেছে, তাতে সে আর খ্রীশ্চান হতে পারে না। যাই হােক জিহানট আব্রাহামের সঙ্গে দেখা করতে এলাে। দু’জনেই নানাভাবে ব্যস্ত হয়ে উঠল। যেন ইতিমধ্যে সাংঘাতিক কিছু ঘটে গেছে!

তবে এদিন কোনাে ধর্ম আলােচনা হয়নি।

আব্রাহাম কয়েকদিন বিশ্রাম করবার পর জিহানট এবার তাকে সােজাসুজি জিজ্ঞাসা করলাে, কি দেখে ও শুনে এলে, হােলি ফাদার কার্ডিনাল এবং অন্যান্য খ্রীস্টান যাজক সম্বন্ধে তােমার কি ধারণা জন্মাল?

আব্রাহাম সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল, খারাপ, খুবই খারাপ। ঈশ্বর যেন নির্দয় হস্তে ওদের শাস্তি দেন। আমি সেখানে নিজের চোখে দেখেছি গির্জা বা খ্রীশ্চান মঠের সঙ্গে যে কেউ যেভাবেই জড়িত, সে-ই ঘাের পাপী। অত্যন্ত অসৎ। লােভী। অসচ্চরিত্র, লম্পট, দয়ামায়াহীন এবং আর কি বলবাে, আমার ভাষায় কুলােচ্ছে না। তারা জুয়াচোর এবং পশুরও অধম। আমি আর কি বলবাে? তােমাদের ঐ। মহামান্য পােপই খ্রীস্টান ধর্ম ডুবিয়ে দিচ্ছেন। খ্রীস্টান ধর্মকে তারা তুচ্ছজ্ঞান করছেন।

রােমের খ্রীশ্চান যাজকেরা নিজ ধর্মের উন্নতির জন্যে যখন কিছুই করছে না বরং তাকে অবনতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে, তখন অন্যদিকে এই খ্রীস্টান ধর্ম ক্রমশ জনপ্রিয়তা অর্জন করছে। এবং দিন দিন এর শ্রীবৃদ্ধি ঘটছে। আমি নিজে আমার ধর্মমতে গভীরভাবে বিশ্বাসী। এবং আমার ধর্মই এখনও সব থেকে সেরা। তথাপি আমি স্বীকার করবাে যে, খ্রীশ্চান ধর্মের মূলে অধিষ্ঠান করছেন ঈশ্বরের তৃতীয় বিভূতি, পবিত্রত্যু, হােলি ঘােস্ট এবং সেইজন্য আমি স্থির করেছি যে, আমি খ্রশ্চান ধর্ম অবলম্বন করবাে। কেউ আমাকে বাধা দিতে পারবে না। অতএব চলাে আমরা কোনাে গির্জায় যাই, যেখানে তােমাদের ধর্মের চিরাচরিত প্রথানুযায়ী তুমি আমাকে খ্রীস্টান ধর্মে বাপ্তাইজ করতে সাহায্য করবে।

জিহানই ভেবেছিল যে, তার বন্ধু খ্রীশ্চান হবে না কিন্তু তার মত পরিবর্তন হওয়ায় সে অত্যন্ত পুলকিত হল। সে আর বিলম্ব না করে আব্রাহামকে নােতারদাম দ্য প্যারিস গির্জায় নিয়ে গিয়ে যাজককে অনুরােধ করলাে তার বন্ধুকে বাপ্তাইজ করতে। আব্রাহামও বলল যে, সে খ্রীস্টান ধর্মে দীক্ষিত হতে চায় এবং জিহান, তার বন্ধু, এজন্য উদ্যোগী। তখন গির্জার ফাদার তাকে বাপ্তাইজ করে তার নাম দিলেন জন।

রাশান ধর্ম সম্বন্ধে সুপণ্ডিত নিযুক্ত করে আব্রাহাম ধর্মের সব কিছু জানবার জন্যে পাঠ নিতে লাগল এবং অচিরে সে খ্রীস্টান ধর্ম হৃদয়ে উপলব্ধি করে পবিত্র ও সৎ জীবন যাপন করতে লাগল।

 

তৃতীয় গল্প

সুলতান সালাদিন ইহুদি মেলচিজেডেককে ফাঁদে ফেলবার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ধূর্ত ইহুদি তিনটি আংটির গল্প বলে সুলতানের সেই চেষ্টা ব্যর্থ করে দিল।

নেফাইলের গল্পটি দলের সকলে কৌতুকের সঙ্গে উপভােগ করলাে। নেফাইলের পাশে বসেছিল ফিলােমেনা! কুইন পাশপিনিয়া তাকে ইশারা করতেই সে এমনভাবে কাহিনী আরম্ভ করলাে, যেন এবার তার পালা পড়বে এই মনে করে সে প্রস্তুত হচ্ছিল। এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গে তার গল্প আরম্ভ করলাে। গল্পটা ফিলােমেনা বােধহয় মনে মনে আওড়াচ্ছিল। ফিলােমেনা বলল, নেফাইলের গল্প শুনে আমার আর এক ইহুদির কথা মনে পড়েছে, যে দারুণ প্যাচে পড়েছিল। ঈশ্বরের মহিমা সম্বন্ধে আমরা খ্রীস্টানরা অল্পবিস্তর জানি। অতএব সেই পরিপ্রেক্ষিতে আমারও গল্পটা সকলের ভালাে লাগা উচিত। তাছাড়া আমার এই গল্প থেকে তােমরা কিছু শিক্ষাও গ্রহণ করতে পারবে। যদি কখনও আমার গল্পের ইহুদির মতাে সংকটে পড় তাহলে সেই সংকট থেকে মুক্তি পাবার পথ খুঁজে পাবে। তাহলে শােন ঃ

সালাদিনের নাম তােমরা সকলে নিশ্চয়ই জান। এবং সামান্য অবস্থা থেকে সে তার বুদ্ধি, বিচক্ষণতা ও সাহসের দ্বারা যে কীভাবে মিশরের সুলতান হয়েছিল এবং সারাসেন ও খ্রীশ্চান রাজাদের পরাজিত করেছিল, তাও তােমরা জান। ক্রমাগত যুদ্ধ ও দান করার ফলে তার বিপুল ধনরাজি ক্ষয় হতে থাকে। এবং একদা সে আবিষ্কার করলাে যে, তার ধনভাণ্ডার প্রায় শূন্য। অথচ সে এমন এক সংকটে পড়েছিল যে অবিলম্বে তার প্রচুর অর্থের প্রয়ােজন।

কোথায় সেই বিপুল পরিমাণ অর্থ পাওয়া যাবে? চিন্তা করতে করতে এক ধনী ইহুদির নাম মনে পড়ল। এই ধনী ইহুদির নাম মেলচিজেডেক। অ্যালেকজাভিয়ায় তার মহাজনি কারবার আছে। এককথায় সে ধনকুবের এবং ইচ্ছা করলে সুলতানের দরকারে বিপুল অর্থ বার করে দিতে পারে। তার প্রচুর অর্থ আছে, তবে তাকে রাজি করাতে হবে। কারণ ইহুদিরা সহজে অর্থ বার করে না। বাদশা বা সুলতানের জন্যও নয়।

সালাদিন শুনেছিল যে মেলচিজেডেক অতিশয় কৃপণ। তার ওপর চাপ না দিলে টাকা বার করা যাবে না। স্বেচ্ছায় সে সুলতানকেও ঋণ দেবে না। যদিও বা দেয় তা অত্যন্ত কঠোর শর্তে ও চড়া সুদে। অথচ সুলতান কোননারকম বলপ্রয়ােগ করে তার কাছ থেকে টাকা আদায় করতে চান না।

সুলতান তখন অনেক ভেবেচিন্তে মাথা ঘামিয়ে ঠিক করলেন, তিনি এমন একটা কৌশল অবলম্বন করবেন যার ফলে মেলচিজেডেক তাকে টাকা দিতে বাধ্য হবে। এবং তা সত্ত্বেও যদি সে টাকা দিতে নারাজ হয় তখন সুলতান বলপ্রয়ােগ করতেও পারেন।

মােটামুটি একটা পরিকল্পনা স্থির করে সুলতান সালাদিন ইহুদি মেলচিজেডেককে তার প্রাসাদে ডেকে পাঠালেন। মেলচিজেডেক এলে সুলতান তাকে সাদর আহ্বান জানিয়ে নিজের পাশে বসালেন।

মেলচিজেডেক অত্যন্ত ধূর্ত। সুলতানের এই অন্তরঙ্গ ব্যবহার তার কাছে বাড়াবাড়ি মনে হল। সুলতানের নিশ্চয়ই কোনাে মতলব আছে। সে মনে মনে সতর্ক হল।

শীতল সরবত পরিবেশিত হল। সুন্দরী ক্রীতদাসীরা কেউ বাতাস করতে লাগল, কেউ কোকিল কন্ঠে গান আরম্ভ করলাে। এইসব প্রাথমিক অনুষ্ঠান ও আলাপ সম্পূর্ণ হবার পর সুলতান সালাদিন ভনিতা শুরু করলেন :

বন্ধুবর, আমি শুনেছি তােমার ঈশ্বরভক্তি অত্যন্ত গভীর। তুমি অতিশয় ধার্মিক, ধর্মতত্ত্ব সম্বন্ধে তােমার জ্ঞানের ভাণ্ডারও অতুলনীয়। বর্তমানে আমি এক সংকটে পড়েছি। তুমি যদি অনুগ্রহ করে তার সমাধান করে দাও তাে আমি কৃতার্থ হই।

মেলচিজেডেক বিনীত কণ্ঠে প্রশ্ন করলাে, সুলতানের সংকট বা সমস্যা কি?

সালাদিন বললেন, বর্তমানে তিনটি ধর্ম প্রচলিত আছে সারাসেন, ইহুদি এবং খ্রশ্চান। এই তিন ধর্মের মধ্যে কোনটি তুমি শ্রেষ্ঠ মনে করাে?

মেলচিজেডেক জ্ঞানী হলেও অত্যন্ত শঠ ও ধূর্ত। সে বুঝল সম্রাট তাকে তর্কযুদ্ধে আহ্বান করতে চাইছেন। চাই কি বিবাদও করতে পারেন। তবে এসব তার ছল। পশ্চাতে সুলতানের কোন মতলব আছে। সুলতান চান তাকে তর্কযুদ্ধে জড়িয়ে বিবাদ পাকিয়ে কোনাে কাজ হাসিল করতে। কিন্তু তার কি দরকার। যেহেতু তিনি দেশের সর্বাধিনায়ক, সেহেতু তিনি তাে তাকে সরাসরি আদেশ করলেই পারেন। তবুও দেখা যাক সম্রাটের মতলবটাই বা কি এবং ধর্মতত্ত্বে তার পাণ্ডিত্যই বা কতটুকু। তারপর না হয় বিচার-বিবেচনা করা যাবে। সম্ভব হলে সুলতানের আদেশ। মান্য বা ইচ্ছাপূরণ করা যাবে।

ধূর্ত মেলচিজেডেক তখন বলল, শাহেনশা, আপনার প্রশ্ন অত্যন্ত সময়ােপযােগী এবং আলােচনার যােগ্য তাে বটেই। আপনি এ বিষয়ে আমার মতামত জানতে চেয়েছেন, তা আমি অবশ্যই জানাতে চেষ্টা করবাে। কিন্তু তার আগে আমি আপনাকে অনুরােধ করবাে, আমার একটি ছােট কাহিনী শুনতে। এই বলে সেই ধূর্ত ও প্রাজ্ঞ ইহুদি তার গল্প আরম্ভ করলো ?

এক ধনী ছিলেন। তার প্রচুর ধন ও স্বর্ণমুদ্রা তাে ছিলই উপরন্তু তার একটি মহামূল্যবান রত্নখচিত আংটি ছিল। এই আংটিটি সে পেয়েছিল তার পিতার কাছ থেকে। তার পিতাও এটি উত্তরাধিকার সূত্রে তার পিতার কাছ থেকে পেয়েছিল। এই ধনী ব্যক্তিও স্থির করেছিলেন যে, তিনিও এটি তার পুত্রকে দিয়ে যাবেন, যাতে বংশপরম্পরায় এটি পরিবারে সযত্নে রক্ষিত হয়।

তাঁর ছিল তিন পুত্র, সকলেই পিতার প্রতি অনুরক্ত এবং গুণী। পুত্ররা অত্যন্ত ধামিক ছিল, পিতার সকল আদেশ শােনামাত্র পালন করতাে। তিন ভ্রাতার মধ্যে কোনাে বিবাদ ছিল না। পিতাও তিনজনকে সমান ভালবাসতেন।

তিন পুত্রই ঐ আংটি সম্বন্ধে জানত এবং তিনজনেরই ইচ্ছা পারিবারিক এই সম্পদটি পিতা তাকেই দান করুন। এজন্যে তিনজনেই সচেষ্ট ছিল। এই উদ্দেশ্যে তিনজনেই পিতার সর্বপ্রকার সন্তাষ বিধানের চেষ্টা করতাে।

পিতা এখন বৃদ্ধ হয়েছেন। মৃত্যুর পূর্বে আংটিটি তিনি কোনাে এক ছেলেকে দিয়ে যেতে চান। পিতার সমস্যা হল তিনি তার তিনটি সন্তানকেই সমান ভালবাসেন, কাউকেই এক চুল বেশি বা কম নয়। তিনি মনস্থির করতে পারছেন না কাকে আংটি দেবেন।

অনেক ভেবে তিনি দেশের সর্বাপেক্ষা নিপুণ স্বর্ণকারকে গােপনে ডেকে পাঠিয়ে আসল আংটির অনুকরণে দুটি আংটি তৈরি করে দিতে বললেন। সেই কারিগর যথাসময়ে এমন দুটি আংটি তৈরি করে আনল যে মূলের সঙ্গে তাদের পার্থক্য ধরা যায় না। এমনকি মূল আংটি যে তৈরি করেছিল সেও তফাৎ ধরতে পারত না। তিনটি আংটিই এক মনে হত।

মৃত্যুর সময় আসন্ন হলে ধনী ব্যক্তি তিনটি ছেলেকে সেই তিনটি আংটি বিতরণ করে সযত্নে রক্ষা করতে বললেন।

পিতা তাে দেহত্যাগ করলেন। এবার সমস্যা দেখা দিল মৃত পিতার যাবতীয় স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ও মহাজনি কারবারের কে উত্তরাধিকারী হবে? কারণ তিনি কোনাে উইল করে যাননি বা কোনাে একটি সন্তানকেও তার উত্তরাধিকারী মনােনীত করে যাননি।

তিন ছেলেই সম্পত্তির একমাত্র উত্তরাধিকারী হতে চাইল। অপর দুই ভাইয়ের দাবি এক ভাই উপেক্ষা করতে লাগল। দাবি সম্বন্ধে একজন আংটি দেখিয়ে বলল, এই দেখ, বাবা আমাকেই আংটি দিয়ে গেছেন। আংটি যার সম্পত্তি তার।

সঙ্গে সঙ্গে আর দুই ভাইও আংটি দেখিয়ে বলল, এই তাে বাবা আমাকেই আংটি দিয়ে গেছেন। কোনাে এক ভাই বলল, সম্পত্তির লােভে তােমরা দু’জনে আংটি জাল করেছ। আমার আংটিটাই আসল।

দেখি দেখি তােমার আংটি দেখি, বলে এক ভাই অপর দুই ভাইয়ের আংটি দেখতে চাইল। আশ্চর্য। তিনটি আংটিই একই রকম, কোনটি আসল কিছুতেই ধরা গেল না। ফলে মৃত পিতার সম্পত্তির অধিকারী কে হবে তার আর মীমাংসা হল না। এবং আজও তার মীমাংসা হয়নি।

গল্প শেষ করে মেলচিজেডেক সুলতান সালাদিনকে বলল, আমাদের মহান প্রভু ঠিক এই কাজটাই করে গেছেন। আপনি আমাকে যে কঠিন প্রশ্ন করলেন এবার একটু ভেবে দেখুন যে কার উত্তর আমার এই আংটির কাহিনীর মধ্যে নিহিত আছে। এই তিন ছেলে প্রত্যেকেই ভাবছে সেই সম্পত্তির প্রকৃত মালিক। তিনজনেই তাদের পিতাকে সমান ভক্তি করে, আইনও মানে তিনজনে এবং তিনজনে ঈশ্বরের প্রতি সমান শ্রদ্ধাশীল। কিন্তু কার আংটি আসল তা আর স্থির করা গেল না।

সালাদিন বেশ বুঝতে পারলেন যে, ইহুদিকে তিনি যে প্রশ্ন করেছিলেন সে তার উত্তর না দিয়ে পাশ কাটিয়ে গেল। অতত্রব তার কাছ থেকে সােজাসুজি অর্থ না চেয়ে আর কোনাে উপায় রইলনা।

সুলতান এবার স্বীকার করলেন তিনি কি উদ্দেশ্যে তাকে তর্কে ফেলে বিবাদ বাধিয়ে অর্থ আদায় করবার মতলবে ছিলেন কিন্তু মেলচিজেডেক তার সেই কৌশল ধরে ফেলেছে। তখন সুলতান তার বিপদের কথা জানিয়ে অর্থের পরিমাণ জানালেন।

মেচিজেভেকের সঙ্গে সুলতানের আজীবন বন্ধুত্ব স্থাপিত হয়েছিল ও সুলতনের সভায় তার একটি স্থায়ী ও বিশিষ্ট আসনও ছিল।

 

চতুর্থ গল্প

একজন মঠবাসী কঠোর শাস্তিযােগ্য এক অপরাধ করে মঠাধ্যক্ষর কাছে ধরা পড়ে যায়। কিন্তু ঐ মঠবাসী কৌশলে ঐ মঠাধ্যক্ষকে অনুরূপ পাপকাজে লিপ্ত করে শাস্তি কিভাবে এড়াল তারই গল্প।

কিলােমেনার গল্প তাে শেষ হল। ফিলােমেনার পাশেই বসেছিল ডায়ােনিয়াে। সে বুঝতেই পারল এবার তার পালা। কুইন তাকেই গল্প বলতে বলবে, তাই সে কুইনের অনুমতি না নিয়ে বা কুইন তাকে অনুরােধ করবার আগেই সে তার গল্প আরম্ভ করলাে।

সুন্দরীরা তােমরা তাে বুঝতেই পারছ যে, সময় কাটানাের জন্যেই আমরা একে একে গল্প বলে বচ্ছি। অবশ্য সেটাই একমাত্র উদ্দেশ্য নয়। গল্পগুলি যেন মজার হয় এবং সকলের উপভােগ্য হয়। তাই আমরা এমন গল্প বেছে নেব, যা সকলের ভালাে লাগে। আগেকার গল্পগুলি তাে তােমাদের ভালােই লেগেছে, আমারও ভালাে লেগেছে। এবার আমার পালা। আমি এক চতুর মঠবাসীর গল্প বলবাে, সে কেমন করে কঠোর শাস্তি এড়িয়ে গেল এটি তারই গল্প।

লুনিজিয়ানার নাম তােমরা সকলে শুনেছ। আমরা যেখানে বসে আছি সেখান থেকে গ্রামটা বেশি দূরে নয়। তােমরা বােধহয় জান যে ওখানে একটা মঠ আছে। মঠটা এককালে বেশ বড় ছিল। অনেক মঠবাসী যাজক, পাদ্রী এরা সব বাস করতাে। বর্তমানে মঠটির দৈন্যদশা চলছে।

সে যাকগে। এই মঠে এক যুবক মঠবাসী থাকত। কিন্তু সে যে কী উদ্দেশ্যে যাজক হবার বাসনায় এই মঠে আড্ডা গেড়েছিল তা সেই জানে কারণ মঠের ধর্মীয় নিয়মকানুন মেনে চললেও ধর্মের প্রতি তার নিষ্ঠা বা আগ্রহ ছিল না। তার শরীরে যৌবনের তাপ ছিল প্রবল। চেষ্টা করে সে রিপু দমন করতে পারত না।

যে সময়ের কথা বলছি সে সময়ে মঠের আশেপাশে কোদো বাড়ি ছিল না। মঠটা বেশ নির্জন জায়গাতেই ছিল।

একদিন দুপুরে নিদাঘতাপে ক্লান্ত হয়ে সকলেই যখন ঘুমে অচেতন, সেইসময়ে আমাদের সেই মঠবাসী কিন্তু জেগে আছে। তার চোখে ঘুম নেই।

বাইরে মৃদু মন্দ বাতাস বইছিল। গাছের পাতা দোল খাচ্ছিল। ঘরের ভেতর গরম, বাতাসের কিছু অভাব। তাই সে মঠের বাইরে বেরিয়ে এসে গাছের ছায়ায় ছায়ায় পায়চারি করতে লাগল। চিত্ত অস্থির।

এমন সময় তার নজরে পড়ল যৌবনবতী ও অতীব সুন্দরী একটি নারী। বােধহয় স্থানীয় কোনাে কিষাণ কন্যা। শাকপাতা আহরণ করছে। মঠবাসী যুবকের চোখ চকচক করতে লাগল, হৃদয়ের স্পন্দন দ্রুত হল, প্রাণ-মন চঞ্চল হল। আহা! ঐ যুবতীকে যদি একবার বুকে চেপে ধরতে পারি!

সে যুবতীটির কাছে এগিয়ে গিয়ে তার সঙ্গে আলাপ করলাে। আহা সুন্দরী এই রােদে তােমার কত না কষ্ট হচ্ছে! রােদ আর একটু পড়লে তাে আসতে পারতে!

সুন্দরী বলল, তখন অন্য মেয়েরা এসে যে ভালাে শাকগুলাে তুলে নিয়ে যায়। তাছাড়া ঘরে ঘুম আসছিল না, কি আর করি ঝুড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লুম।

তা বেশ করেছ সুন্দরী। ভাগ্যিস এসেছিলে, তাই তাে তােমার মতাে সুন্দরীকে দেখতে পেলাম। এত রূপ তুমি কোথায় পেলে? তােমার চোখ, তােমার নাক, ওষ্ঠ, স্তন, নিতম্ব, জঙ্ঘা সবই অতুলনীয়।

যুবতী ফিক করে হেসে ফেলল। তারপর কপট ক্রোধ প্রকাশ করে বলল, মুখ আর হাত ছাড়া আমার সারা দেহটাই তাে ঢাকা, তবে তুমি কি করে বুঝলে আমার দেহ কেমন?

যুবক বলল, মুখ দেখলেই সব বােঝা যায়। মুখ তাে তােমাদের আয়না। তা বেশ তাে, আমার সঙ্গে আমার ঘরে চলাে না, যাচাই করে দেখব, যা বললুম তা সঠিক কিনা। বাইরে বড় বােদ। আমার ঘরে একটু ছায়ায় বসবে।

যুবতীও বােধহয় যৌবনজ্বালায় দগ্ধ হচ্ছিল। যুবকটিও বেশ স্বাস্থ্যবান ও সুপুরুষ। সে রাজি হয়ে যুবকের অনুসরণ করলাে। 

মঠের সকলেই তখন ঘুমে আচ্ছন্ন। বারান্দায় বা প্রাঙ্গণে কেউ নেই। যুবতীকে নিয়ে সাধুবাবা যখন নিজের কুঠুরিতে ঢুকলাে তখন কেউ তাদের দেখতে পায়নি।

সুন্দরী লাস্যময়ীকে ঘরে ঢুকিয়ে সাধুবাবা দরজা ভেজিয়ে দিল। সে হাতে পাকা ফল পেয়ে এতই উন্মত্ত যে দরজার খিল বা জানালার ছিটকিনি বন্ধ করতে ভুলে গেল।

অচিরে দু’জনে উদ্দাম রতিরঙ্গে মেতে উঠল। মেতে তাে উঠবেই! একজন ঘি অপরজন তাগুন। দু’জনেরই যৌবনের জোয়ার, কেউ কাউকে পরাজিত করতে পারছে না। কখনও দ্রুত নিশ্বাস পতনের শব্দ, ঘর্মাক্ত দেহের শব্দ অথবা খিলখিল হাসি।

এদিকে মঠাধ্যক্ষের ঘুম ভেঙে গেছে। তিনি শয্যা ত্যাগ করে মুখে চোখে জল দিয়ে ঘুমের জড়তা দূর করবার জন্যে বারান্দায় পায়চারি করতে লাগলেন।

পায়চারি করতে করতে সেই মঠবাসীর কুটিরের সামনে আসতেই ভেতরে নারীকণ্ঠের আওয়াজ শুনে চুপ করে দাঁড়িয়ে পড়লেন। রাত্রের অন্ধকারে এমন দু একটা ঘটনা আগে ঘটেছে কিন্তু দিনে দুপুরে? এদের সাহস তাে খুব। সমুচিত শাস্তি দিতে হবে।

মঠাধ্যক্ষ প্রথমে ভাবলেন দরজাটা সহসা খুলে দেন কিন্তু হয়ত তিনি মিথুন মূর্তি দেখবেন। সে দৃশ্য তিনি কি করে সহ্য করবেন! তাই তিনি নিজের ঘরে ফিরে গিয়ে দরজাটির ওপর নজর রাখলেন, যুবক সাধু বেরােলেই তাকে ধরবেন।

ওদিকে যুবক-যুবতী কামরণে এত মত্ত যে ওরা কিছু সন্দেহ করেনি। তাছাড়া এমন অবস্থায় নরনারী এতদূর উত্তেজিত থাকে যে পারিপার্শ্বিক কোনাে অবস্থাই তাদের বিচলিত করতে পারে না।

মঠাধ্যক্ষ যে সব জেনে ফেলেছেন তা তারা সন্দেহ করতে পারেনি।

কিছুক্ষণ অপেক্ষা করবার পর মঠাধ্যক্ষ দেখলেন ওরা এখনও দরজা খুলছে না। তখন তিনি ঘরের বাইরে এসে প্রায় ওদের দরজার সামনে অপেক্ষা করতে লাগলেন।

এদিকে যুবক-যুবতী উভয়েই কামরণে তৃপ্তি লাভ করে বিশ্রাম নিল। যুবতী এবার ঘরে ফিরতে চায়।

দেরি তাে হয়েই গেছে, আর দেরি হলে পিতামাতা তার খোঁজ করবে। সে বস্তু সংযত করে কেশগুচ্ছ বিন্যস্ত করে মুখ মুছে বাইরে বেরােবার জন্য প্রস্তুত।

তখন যুবক বলল, দাঁড়াও বাইরেটা একবার দেখে নিতে দাও। দরজা তাে ভেজানই ছিল কিন্তু দরজায় একটা ফুটো ছিল। যুবক সাধু সেই ফুটো দিয়ে বাইরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলাে। সর্বনাশ! অল্প দূরে মঠাধ্যক্ষ তারই কুঠুরির দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে অপেক্ষা করছেন।

এখন কি হবে? মঠাধ্যক্ষ নিশ্চয়ই সব জানতে পেরেছেন। মঠের ভেতরে কোনাে মেয়েকে আনাই তাে অন্যায়, তারপর সে মেয়েটিকে নিয়ে যা করেছে সে অপরাধের তাে কোনাে ক্ষমা নেই। তাকে কঠোর সাজা পেতেই হবে।

সে যে ভয় পেয়েছে তা মেয়েটিকে জানতেই দিল না। যুবক ভীষণ চতুর। মনে মনে একটা কর্মপথ ঠিক করে নিল। মঠাধ্যক্ষকে জব্দ করতে হবে।

সে মেয়েটিকে বলল, তুমি চুপচাপ আমার খাটিয়ায় শুয়ে থাক। আমি বাইরে বেরিয়ে একটু দেখে আসি তােমাকে কি করে লুকিয়ে বাইরে বার করে দেওয়া যায়।

ইতিমধ্যে মঠাধ্যক্ষ তার অফিসঘরে ফিরে গেছেন। যুবকসাধু ঘর থেকে বেরিয়ে দরজায় তালা লাগিয়ে নিয়মানুযায়ী চাবিটি মঠাধ্যক্ষের ঘরে জমা দিতে গেল। এমন ভাব দেখাল সে যেন কিছুই করেনি, কিছুই জানে না।

ঘরের চাবি মঠাধ্যক্ষের হাতে দিয়ে বলল, ফাদার আজ সকালে আমি আমার নির্ধারিত ওজন অনুযায়ী জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করতে পারিনি। চাবি রইল। আমি কাঠ আনতে যাচ্ছি।

মিথ্যা কথা বলবার সময় তার চোখের একটি পাতাও পড়ল না। মঠাধ্যক্ষ ভাবলেন তিনি যে যুবক সাধুর কুকীর্তি জেনে ফেলেছেন তা সে জানে না। কোনাে মেয়েকেও তার ঘর থেকে বেরােতে দেখা যায়নি। মেয়েটা তাহলে তার ঘরেই আছে। ছােকরা বেরিয়ে যাক তারপর দেখি কি করা যায়।

মঠাধ্যক্ষ ভাবলেন সকল সাধুবাবাকে ডেকে তাদের সামনে দরজা খুলবেন, নাকি ছুঁড়িটাকে জিজ্ঞাসা করবেন তুই এখানে কি করে এলি আর কি করেছিস?

তারপর ভাবলেন ছুড়িটা হয়ত সাধারণ গেরস্ত বা চাষার ঘরের মেয়ে নয়, হয়ত কোনাে উচ্চ বংশের মেয়ে, তাহলে তাে বেচারির লাঞ্ছনা, অবজ্ঞা ও অপমানের শেষ থাকবে না। সে বড় খারাপ কাজ হবে, তার চেয়ে একা ওর ঘরে ঢুকে আগে সবকিছু জেনে নেওয়া ভালাে। মনস্থির করে মঠাধ্যক্ষ ঘরের তালা খুলে চুপি চুপি ঘরে ঢুকে ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিলেন।

ঘরের ভেতর গরম তাই যুবতী তার সমস্ত পােশাক ছেড়ে যৎসামান্য অপােবাস দিয়ে কোমর ও বুক আবৃত করে রেখেছিল।

সহসা অপরিচিত মঠাধ্যক্ষকে ঘরের ভেতর প্রবেশ করতে ও দরজা বন্ধ করে দিতে দেখে স্বল্পবাস যুবতী ভীষণ ভয় পেল। সে কাপতে লাগল, গাল বেয়ে অশ্রুধারা গড়িয়ে পড়ল।

এদিকে এমন একটি নজরধরা সুপুষ্ট সুন্দরী যুবতীকে দেখে মঠাধ্যক্ষ মশাইয়ের অবস্থা কাহিল। তিনি যুবতীর ক্রন্দন গ্রাহ্য করলেন না। নিজেই মদনানন্দে এতদূর পুলকিত হয়ে উঠলেন যে, তার যুবক শিষ্যও সুন্দরীকে দেখে এতদূর কামপীড়িত হয়নি।

তিনি মনে মনে বলতে লাগলেন, সুযােগ যখন পাওয়াই গেছে তখন তার সদ্ব্যবহার করতে ক্ষতি কি? সামনে এমন পাকা ফল দেখে সেটিকে গাছ থেকে পেড়ে খেতে ক্ষতি কি? হুঁড়িটাকে দেখতে বেশ ভালােই, একেবারে যাকে বলে ছাপাছাপি। কেউ তাে জানেও না মেয়েটা এখানে রয়েছে? আমি যদি আমার কামজর শান্ত করবার জন্য মেয়েটাকে রাজি করাতে পারি তাতে ক্ষতি কি? আর আমি তা করবােই না কেন? কেউ তাে জানতেও পারবে না। একটা পাপ যদি গােপন করা যায়, তার অর্ধেক ভাগ ক্ষমার যােগ্য বলে লিখিত আছে।

মঠাধ্যক্ষ নিজেকে আর সামলে রাখতে পারছে না। পুরুষ কামাসক্ত হলে যে সব লক্ষণ দেহে পরিস্ফুট হয় তার সবই তখন প্রকাশিত। এমন সুযােগ কি আর পাওয়া যাবে? মূর্খরাই এমন সুযােগ নষ্ট করে। স্বয়ং ঈশ্বরই এমন সুযােগ জুটিয়ে দিয়েছেন।

মনস্থির করে সাধুমশাই তার পূর্ব সংকল্প ভুলে গিয়ে মেয়েটিকে সান্ত্বনা দিতে লাগলেন। বললেন কেঁদ না, তােমার কোনাে ভয় নেই। আমি তােমার কোনাে ক্ষতি করব না। এসাে না আমরা দু’জনে নিভৃতে কিছু প্রেমালাপ করি।।

মেয়েটি কান্না ভুলে ফিক করে হেসে ফেলল। সেও তাে আর লােহা বা পাথরের তৈরি নয়। মাখনের মতাে তার দেহ, অল্প তাপে নরম হয়। মন্দ কি? একটু মজা করাই যাক না। না হয় মানুষটার একটু বয়সই হয়েছে।

মঠাধ্যক্ষ নিজেকে আর সামলাতে পারলেন না। তিনি মেয়েটিকে দু হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে তাকে বেশ কয়েকবার চুম্বন করলেন। তারপর মেয়েটিকে শিষ্যর শয্যায় শুইয়ে দিলেন।

আহা! মেয়েটি কচি ও কোমল। সে কি তার দেহভার সহ্য করতে পারবে? বেচারি যদি আঘাত পায়! তিনি মেয়েটির পাশে শুয়ে তাকে নিজের বুকের ওপর তুলে নিলেন। মেয়েটি কৌতুক অনুভব করলাে। এইরকম বিপরীত ভাবেই উভয়ে বেশ কিছুক্ষণ ধরে অনঙ্গরঙ্গে মেতে রইল।

যুবকসাধু কিন্তু বারান্দায় এক জায়গায় লুকিয়ে ছিল। সে কাঠ কুড়ােতে বনে যায়নি। মিথ্যা কথা বলেছিল। সাধুবাবাকে হাতেনাতে ধরবার জন্যে সুযােগের অপেক্ষায় ছিল।

যখন সে দেখল সাধুবাবা তার ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করলাে এবং বেরিয়ে আসছে না তখন সে বুঝল একটা কাণ্ড ঘটছে। কি কাণ্ড ঘটছে তা অনুমান করা তার পক্ষে কঠিন হল না। সে যা ভেবেছিল । তাই ঘটছে।

যুবকসাধু বারান্দায় তার গুপ্তস্থান থেকে বেরিয়ে নিজের ঘরের দরজার সামনে এসে শব্দ না করে দরজা একটু ঠেলে দেখল দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। জানালায় ছােট একটা ফুটো ছিল। ফুটোয় একটা চোখ রেখে যা দেখল তাতে সে শিউরে উঠল। এতদূর সে আশা করেনি।

যুবকসাধু দরজায় ঘা দিল না বা মঠাধীশকে ডাকাডাকিও করলাে না। সে তার ঘরের সামনে থেকে অন্যত্র চলে গেল। সাধুবাবাও কাজ শেষ করে নিজে পরিষ্কার হয়ে নিজের অফিসঘরে ফিরে এলাে।

এতক্ষণে নিশ্চয়ই ছােকরা কাঠ কুড়িয়ে বন থেকে ফিরে এসেছে অনুমান করে মঠাধ্যক্ষ যুবককে ডেকে পাঠালেন, ছােকরাকে কড়া কথা শুনিয়ে দিতে হবে। তারপর তাকে কিছুদিন বন্দি ঘরে আটকে রাখা হবে আর সে সুযােগে মঠাধ্যক্ষমশাই নিজে যুবকসাধুর ঘরে মেয়েটিকে আনিয়ে মজা লুটবেন।

যুবককে ডেকে এনে তাে মঠাধ্যক্ষমশাই বকুনি আরম্ভ করলাে। যুবক চুপ করে সব শুনতে লাগল। সে যেন কিছু জানে না। মঠাধ্যক্ষ যখন তাকে শাস্তির কথা বলতে যাবে তখন যুবক সহসা মুখর হয়ে বলল, প্রভু আমি এই মঠে বেশিদিন আসিনি। সেন্ট বেনেডিক্ট ঘােষিত পবিত্র নীতিগুলি সম্বন্ধে আমি এখনও ওয়াকিবহাল হইনি এবং কিছুমাত্র আগে পর্যন্ত আমার জানা ছিল না যে, সাধু বেনেডিক্ট ঘােষিত পবিত্র নীতিগুলি আয়ত্ত করতে হলে রমণীরমণ করতে হয়। কিন্তু আপনি এইমাত্র যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে দেখালেন তা কি আমিও অনুসরণ করবাে নাকি আপনি আমাকে এমন লালসা থেকে বিরত হতে নিষেধ করবেন এবং আমি যদি ইতিমধ্যে কোনাে অন্যায় করে থাকি তা ক্ষমা করবেন।

যুবকের কথা শুনে মঠাধ্যক্ষের চোখ তাে কপালে উঠল। তিনি তাে সবই বুঝতে পারলেন। যুবক তাে সবই জানতে পেরেছে। যুবকও যে পাপ করেছে তিনিও সেই পাপই করেছেন। অস্বীকার করবার উপায় নেই, তাহলে সবই প্রকাশ হয়ে পড়বে। অতএব যা করেছেন তা চেপে যেতেই হবে। তিনি যুবককে ক্ষমা করলেন।

এক সময়ে যুবতীকে লুকিয়ে মঠ থেকে গােপনে বার করে দেওয়াও হল। কিন্তু মজা হল কি, যে এরপর থেকে শুরু-শিষ্য দুজনেই পালা করে যুবতীকে উপভােগ করতে লাগল।

 

পঞ্চম গল্প

মারচিয়েনেস অফ মতফেরাত ফ্রান্সের রাজাকে এক ভােজসভায় আমন্ত্রিত করতে বাধ্য হয়েছিলেন। রাজা যেচে নিমন্ত্রণ নিয়েছিলেন। খাদ্যতালিকায় মারচিয়ােনেস কেবলমাত্র চিকেনের নানারকম পদ পরিবেশন করেছিলেন এবং বাকচাতুর্যে রাজার দুরভিসন্ধি সুকৌশলে এড়িয়ে গিয়েছিলেন।

ডায়ােনিয়াে-র রসের গল্প শুনতে শুনতে কেউ কারও পিঠে মুখ লুকোচ্ছিল, কেউ আবার লজ্জায় হাত দিয়ে মুখ ঢাকা দিচ্ছিল। কেউ হয়ত খিল খিল করে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ছিল। গল্প শেষ করতে তারা কৃত্রিম রাগ প্রকাশ করে অভিযােগ করলাে, ডায়ােনিয়াে মেয়েদের সামনে এমন অশ্লীল গল্প বলতে তােমার লজ্জা করলাে না? বলা বাহুল্য ছেলেরা তাে বটেই, মেয়েরাও উপভােগ করেছিল গল্পটা।

ডায়ােনিয়াে-র পাশে বসেছিল ফিয়ামমেত্তা। সে শুধু কুইনের আদেশের অপেক্ষায় ছিল। রানী তখনও হাসছিল। হাসতে হাসতেই বলল, কিয়ামমেত্তা! দেরি কেন, আরম্ভ করাে।

ঘাস ছিড়তে ছিড়তে ফিয়ামমেত্তা বলল, বুদ্ধিমান পুরুষরা তাদের চেয়ে উচ্চ পর্যায়ের মেয়েদের সঙ্গে প্রেম করতে চায়। কিন্তু মেয়ে যদি খুতখুতে হয় তাহলে সে সেই পুরুষকে এড়িয়ে চলে। সমানে সমানে না হলে কি প্রেম জমে? এইরকমই একটি মজার গল্প বলবাে, কি করে এক অভিজাত মহিলা এক রাজার মতলব বুঝতে পেরে তাকে জব্দ করেছিলেন। ভূমিকা রেখে গল্পটা আরম্ভ করি। ফিয়ামমেত্তা, বলতে আরম্ভ করলাে :

ইটালির মতফেরাতের মারকুইস অসাধারণ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ছিলেন। পবিত্রভূমি হােলিল্যাণ্ড জেরুজালেম উদ্ধারের জন্য তখন খ্রীস্টানরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে আরবভূমিতে গিয়ে যুদ্ধ করছিল। মারকুইস খ্রীশ্চান গির্জার ধ্বজাধারী অর্থাৎ গােনফালােনিয়ার হয়ে ইতিহাসখ্যাত সেই ক্রুসেড যুদ্ধে। যােগ দেবার জন্যে আরবভূমির দিকে যাত্রা করলেন।

ফ্রান্সের কিং ফিলিপ না বাের্নও ক্রুসেড যুদ্ধে যাবার আয়ােজন করছিলেন। যাবার আগে একদিন তিনি সভায় বসে বয়স্য ও অন্যান্যদের সঙ্গে গল্পগুজব করছেন। অর্থাৎ কিনা আড্ডা মারছেন। এমন সময় একজন বয়স্য বললেন, শুনলুম ইটালির মারকুইস অফ মতফেরাত ক্রুসেডে যাচ্ছেন। কিন্তু তিনি তার স্ত্রী-রত্নটিকে কার কাছে রেখে যাচ্ছেন! আহা! রত্নই বটে! দুর্লভ! এমন অপূর্ব সুন্দরী দেখা যায় না। একবার চোখ পড়লে আটকে যায়। কি দেখব, ভুরু না ওষ্ঠ, চোখ না নাক! পদ্মকোরকের মতাে কুচযুগ। কলসপ্রতিম নিতম্ব? বাহুল্যতার কাছে আসল লতাও হার মানে।

বলাে কি, এত সুন্দরী নারীও আছে? আর আমি তাকে দেখিনি? রাজা মন্তব্য করলেন।

আমি একটুও বাড়িয়ে বলছি না। বলতে কি, আমি সেই অতুলনীয়া সুন্দরীর রূপের বর্ণনা করি এমন সাধ্য আমার নেই। অবশ্য মারকুইসও তার তুল্য রূপবান এবং বীর।

সেই ইটালীয় নারীরত্নের রূপবর্ণনা শুনে রাজা ফিলিপ অভিভূত। যাচাই করে দেখতে হচ্ছে তাে সত্যি কথা বলছে কিনা।

লােকটা যদি সত্যি কথা বলে থাকে তাহলে তাে এমন রূপসীকে হাতছাড়া করা যায় না। তাকে যদি একবার বাহুতে ধারণ করতে না পারি তাহলে তাে আমার জীবন বৃথা।

ক্রুসেড উদ্দেশ্যে রাজা হয়ত আর কয়েকদিন পরে যাত্রা করতেন কিন্তু তিনি যত শীঘ্র সম্ভব আয়ােজন সম্পূর্ণ করতে আদেশ দিলেন। এবং বললেন যে, তিনি ইটালির জেনােয়া বন্দর থেকে যাত্রা করবেন, যদিও ফ্রান্সের নিজস্ব বন্দর আছে।

আসল উদ্দেশ্য জেনােয়া যাবার পথে রূপবতীকে একবার দেখে যাবেন, এবং চাই কি মারকুইসের অনুপস্থিতিতে তাকে দখল করে নেবেন। | কিং ফিলিপ কিভাবে মারচিয়ােনেস-এর মন জয় করবেন এজন্যে তিনি মনে মনে নানা জল্পনাকল্পনা করতে লাগলেন। কত সুন্দরী নারীকে তিনি তার অঙ্কশায়িনী করেছেন আর মারচিয়ােনেসকে দখল করতে পারবেন না। চূড়ান্ত প্ল্যান ঠিক করে কিং ফিলিপ তার দলবল আগেই রওনা করে দিয়ে নিজে কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বয়স্যকে নিয়ে পরে যাত্রা করলেন। | ইটালিতে মারকুইসের জমিদারির কাছে পৌঁছে তিনি পূর্বদিন মারকুইস পত্নীকে জানিয়ে দিলেন যে, আগামীকাল ব্রেকফাস্ট টেবিলে তিনি মারচিয়ােনেসের সঙ্গে মিলিত হতে চান।

অকস্মাৎ এই লিপি পেয়ে মারচিয়ােনেস অবাক হলেন। মারকুইস এখন নেই। ক্রুসেডে গেছেন। এ খবর রাজা ফিলিপের অজানা নয়। তথাপি তিনি কেন তার সঙ্গে দেখা করতে চান? কি মতলব?

নারী, বিশেষ করে সে নারী যদি সুন্দরী হয়, তাহলে তার প্রতি রাজার বিশেষ দুর্বলতা আছে এই খবর মারচিয়ােনেসের কানে আগে পৌঁছেছিল। সুন্দরী বলে মারচিয়ােনেসের খ্যাতি আছে। এ সংবাদ তার জানা আছে।

স্বামী নেই বাড়িতে। অতএব এই সুযােগে কি ফিলিপ তার প্রণয়প্রার্থী হবেন? এছাড়া রাজার আর কি মতলব থাকতে পারে? স্বামীর অনুপস্থিতিতে তার পত্নীর সঙ্গে আলাপ করা কি শালীনতার পর্যায়ে পড়ে? রাজার মতলব তাে ভালাে নয়! রাজাকে উচিত শিক্ষা দিতে হবে।

মারচিয়ােনেস রাজাকে উত্তর দিলেন, রাজা তাঁর বাড়িতে আসবেন জানতে পেরে তিনি নিজেকে অত্যন্ত সম্মানিত বােধ করছেন। উপরন্তু দেশে এত যােগ্য মহিলা থাকতে তিনি গৌরব অনুভব। করছেন। রাজার যােগ্য অভ্যর্থনার জন্যে তিনি আয়ােজনের ত্রুটি রাখলেন না। তবে আহার্য তালিকা তিনি নিজে স্থির করে দিলেন। সময় বেশি নেই। তবুও সেই অল্প সময়ের মধ্যে যত পারলেন মােরগ বা চিকেন নয়, পুষ্ট মুরগি সংগ্রহ করলেন। এবং পরদিনের ব্রেকফাস্টের জন্যে কেবলমাত্র মুরগি মাংসের নানারকম ডিশ রান্না করালেন। আর কিছু নয়।

পরদিন ব্রেকফাস্টের কিছু আগে রাজা এলেন। মারচিয়ােনেস এবং তার সখীরা রাজাকে যথাযােগ্য সম্মান প্রদর্শন করে ব্যাংকোয়েট হলে নিয়ে এলেন। মারচিয়ােনেস আজ ইচ্ছে করেই সুন্দরী সাজে সেজেছেন। তবে বাড়াবাড়ি কিছু করেননি।

এই আশ্চর্য সুন্দরীকে দেখে রাজা বিস্ময়ে হতবাক। একজন নারী যে এতদূর সুন্দরী হতে পারে তা তিনি স্বচক্ষে না দেখলে বিশ্বাসই করতেন না। সুন্দরীর রূপের প্রশংসা করতে গিয়ে তিনি নির্বাক হয়ে গেলেন। শুধু বললেন, আজ তার জীবন ধন্য হল। তার তুল্য রূপসী তিনি আর দেখেননি।

রানী শুধু মৃদু হেসে তাকে বসতে বললেন। রাজার দৃষ্টি তার ভালাে লাগল না। সে দৃষ্টি লালসাপূর্ণ।

মারচিয়ােনেস রাজাকে নিয়ে রৌপ্যমণ্ডিত একটি টেবিলে বসলেন। সে টেবিলে আর কেউ ছিল না। অতিথিরা ভিন্ন ভিন্ন টেবিলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসেছিল।

মারচিয়ােনেসের বিপরীত দিকে রাজা আসন গ্রহণ করলেন। মূল্যবান সুরা এলাে, এলাে ডিশপূর্ণ নানারকম খাদ্য। ইটালিয়ানরা রন্ধন শিল্পী, একথা রাজা বললেন। প্রতিটি খাদ্যই অত্যন্ত সুস্বাদু তবে রাজা যত না আহার গ্রহণ করছিলেন, তার চেয়ে বেশি নিরীক্ষণ করছিলেন মারচিয়ােনেসকে।

এদিকে একটি ডিশ শেষ হতে না হতে আরও ডিশ আসছিল। রাজা সহসা লক্ষ্য করলেন প্রতিটি ডিশেই মুরগি।

রাজা কৌতুক করে মারচিয়ােনেসকে জিজ্ঞাসা করলেন, এ তাে বড় মজার ব্যাপার! সব খাদ্যেই দেখছি মুরগি, একটিও মােরগ নেই?

মারচিয়ােসনেস ভাবছিলেন, রাজা যদি বিস্ময় প্রকাশ করে এমন প্রশ্ন না করেন তাহলে তিনি তার বিশেষ উদ্দেশ্য সম্বন্ধে কি বললেন?

যাক! রাজাই প্রশ্নটা করলেন। উত্তরে মারচিয়েনেস বললেন, কি জানেন মহারাজ, আমার জেলার নারীরা বিভিন্ন স্তরের হলেও এবং তাদের বেশভূষায় পার্থক্য থাকলেও, তাদের মধ্যে কোনাে পার্থক্য নেই। তারা সবাই এক। এমনটি আপনি আর কোথাও পাবেন না। রূপে, গুণে, চালচলনে তারা এক।

উত্তরে শুনে রাজা লজ্জা পেলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, মারচিয়ােনেস বলতে চাইলেন যে সকল যুবতী একই—তা সে যে দেশের হােক না কেন। তবে পরদেশের পরস্ত্রীর প্রতি লােভ করার কি দরকার? এই বুদ্ধিমতী নারীর কাছে তিনি পরাজিত। কি আর করেন? মারচিয়ােনেসকে ধন্যবাদ জানিয়ে রাজা সেইদিনই বিদায় নিলেন।

 

ষষ্ঠ গল্প

একজন সৎ ব্যক্তি চতুর একটি মন্তব্য করে ভণ্ড ধার্মিকের মুখােশ খুলে দিল।

মারচিয়ােনেস তার বাকপটুতার দ্বারা রাজাকে মুখের মতাে যে জবাব দিলেন তাতে মেয়েরা তার খুব প্রশংসা করলাে, তারপর কুইনের ইচ্ছানুসারে এমিলিয়া তার গল্প আরম্ভ করলাে। সে বলল একজন অসৎ যাজক নিজেকে খুব চতুর ভেবে তার এলাকার মানুষদের ঠকাত। কিন্তু সে নিজেই একদিন নিজের ফাঁদে পড়ল। তারই মজার গল্প আমি বলবাে।

বেশিদিনের কথা নয়। আমাদের শহরে সেন্ট ফ্রান্সিস সম্প্রদায়ভুক্ত একজন যাজক ছিল। ধর্মগত অপরাধী খুঁজে বার করাও তার কাজ ছিল। তার এলাকার মানুষেরা ধর্মপথে চলছে কিনা সেদিকে সে নজর রাখত। সুযােগ পেলেই ধনী ও নিরীহ ব্যক্তিদের ধমক দিয়ে ও ভয় দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে টাকাপয়সা হাতিয়ে নিত।

শহরে রীতিমতাে বিত্তশালী একজন ব্যক্তি বাস করতেন। তিনি সত্যই ধর্মপ্রবণ ও সৎ ছিলেন। তার বিরুদ্ধে কারও কোনাে অভিযােগ ছিল না। এই লােকটিকে ঐ ফ্রানসিসকান যাজক কিছুতেই বাগে আনতে পারছিল না। কিন্তু এমন লােকও একদিন ফাঁদে পড়ে গেল।

আড্ডা দেবার সময়ে এক অসতর্ক মুহূর্তে সে বলে ফেলল যে, তার কাছে এমন উৎকৃষ্ট সুরা আছে। যা স্বয়ং প্রভু যীশুকে দিলেও তিনি প্রত্যাখ্যান করবেন না, সেই সুরা পান করবেন।

বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেবার সময়ে সেই ধনী ব্যক্তি সেদিন হয়ত একটু সুরা পান করে ফেলেছিল অথবা তার সুরা যে স্বাদে গন্ধে অতুলনীয় তা দাবি করবার জন্যে ঝোকের মাথায় উপরােক্ত মন্তব্য করেছিল, যদিও তা অন্যায়।

দুর্ভাগ্যের বিষয় যে, ধনী ব্যক্তির এই মন্তব্য সেই যাজকের কানে পৌঁছে গেল। শুনে সেও লাফিয়ে উঠল। সে তাে এইরকম কিছু একটা চাইছিল। শুনেই সে তাে সাজগােজ করে সঙ্গে একটা তলােয়ার, একগাছা মােটা ছড়ি নিয়ে সেই ধনীর বাড়ি হাজির হয়েই গলা চড়িয়ে বলল, এসব কী শুনছি? প্রভু যীশুর প্রতি তােমার এমন ইতর ধারণা? যাজকের আসল মতলব ছিল লােকটিকে নাস্তিক বলে ভয় দেখিয়ে গির্জার নামে বেশ কিছু অর্থ বাগিয়ে নেওয়া। অর্থ অবশ্য গির্জায় যাবে না, যাবে তার পকেটে।

যাজক ধমক দিয়ে জিজ্ঞাসা করল, যা শুনেছি তা কি সত্যি? লােকটি স্বীকার করলাে, হাঁ সত্যি। উপায় নেই কারণ তার বন্ধুরা সাক্ষী আছে এবং এইরকম কোনাে

বন্ধু ব্যাপারটা ফেনিয়ে ফাপিয়ে যাজকের কানে তুলে দিয়েছে।

যাজকের গির্জার নাম ছিল সেন্ট জন গােলডেন মাউথ। ধনী ব্যক্তিকে যাজক বলল, তােমার টাকাপয়সা আর জমিদারি আছে বলেই প্রভু যীশুর নামে তুমি যা ইচ্ছে তাই বলবে? তােমার তাে স্পর্ধা কম নয়! তুমি প্রভুকে বললা কিনা মাতাল। মাতাল হয়ে যারা রাস্তায় গড়াগড়ি যায় তুমি প্রভুকে তাদের। সমান মনে করাে? আমার গির্জার অধীনে তােমার মতাে ঘাের পাপীও আছে জেনে আমি মর্মাহত।

তােমার অপরাধের শেষ নেই। তােমার অনুতাপ হচ্ছে বলে তাে মনে হচ্ছে না।

চোর, খুনি বা ব্যাভিচারীকে আরক্ষা বিভাগের কর্মচারীরা যেভাবে গালি দেয় যাজক সেইভাবে ধনী ব্যক্তিকে ভৎর্সনা করতে লাগল। বলা বাহুল্য ধনী ব্যক্তি অত্যন্ত ভয় পেয়ে গেল এবং যাজককে শান্ত করবার উদ্দেশ্যে একটি প্রসাধন সামগ্রী পাঠিয়ে দিল, যা পুরুষত্বহীন যাজকেরা অর্থ অপেক্ষা কামনা করে।

ঐ প্রসাধন সামগ্রী মলম ব্যতীত আর কিছু নয়। সেটি পেয়ে যাজক পরম প্রীত। যাজক কিন্তু ভাব দেখালাে যে, সে উপহার পেয়ে খুশি হয়নি। মলম বা কোনাে প্রলেপে তার আগ্রহ নেই। ধনী বুঝতে পারল যাজক কি চায়। তখন সে কিছু অর্থ পাঠিয়ে দিল।

যাজক যেন আপাতত সন্তুষ্ট হয়ে ধনী ব্যক্তিকে বলল, সে যেন প্রতি রবিবার গির্জায় এসে যাজকের ভাষণ মন দিয়ে শশানে। তদনুসারে ধনী প্রতি রবিবার গির্জায় আসতে আরম্ভ করলাে।

দেখা হলেই যাজক ধনীকে জিজ্ঞাসা করতাে, সে গির্জায় নিয়মিত আসছে কিনা এবং আত্মিক উন্নতি কিছু হচ্ছে কিনা।

একদিন গির্জায় ভাষণ শােনাবার সময় একটি বাক্য ধনী ব্যক্তির মনে লাগল। বাক্যটি তার খুব পছন্দ হল। “তুমি একটি জিনিস দান করলে তা তুমি শতগুণে ফেরত পাবে ও অনন্ত জীবন লাভ করবে।”

পরে একদিন যাজকের সঙ্গে পুনরায় সাক্ষাৎ হল। ধনীকে যাজক জিজ্ঞাস করলাে, রবিবার প্রার্থনা সভায় যা শুনছ সব বুঝতে পারছ তাে? কোনাে দ্বিধা নেই তাে? যদি কিছু বুঝতে না পেরে থাক তাে আমাকে বলল, আমি বুঝিয়ে দেব।

ধন্যবাদ ফাদার, আপনি এত সহজ ভাষায় ভাষণ দেন যে, বুঝতে আমাদের কণামাত্র অসুবিধা হয় । আমার তাে বিশ্বাস ও আকর্ষণ প্রতিদিন বাড়ছে। কিন্তু একটা বাক্য শুনে আমি ধাঁধায় পড়েছি। এজন্যে আপনাদের জন্যে আমার দুঃখ হচ্ছে এবং আপনাদের পরিণতি ভেবে আমি শংকিত হচ্ছি।

বলাে কি হে? আমাদের জন্যে তােমার এত মাথাব্যথা? ব্যাপারটা তাহলে খুলেই বলাে। একের পরিবর্তে তুমি শতগুণ ফেরত পাবে বাক্যটি আমকে ধাঁধায় ফেলেছে। যাজক বলল, এতে ঘাবড়াবার কি আছে?

ধনী ব্যক্তি বলল, তাহলে খুলেই বলি। আমি প্রতি রবিবার যখন গির্জায় আসি তখন দেখি একদল অতি দরিদ্র ও অনাহারী মানুষ আপনাদের গির্জার প্রবেশপথে সমবেত হয়েছে। তাদের প্রত্যেককে বড় হাতার এক হাতা করে সজীর স্যুপ দেওয়া হয়। এই সুপ দরিদ্রদের জন্যে আপনারা তৈরি করেন না। গত কয়েকদিনের উদ্বৃত্ত পাতলা স্যুপ তাদের পরিবেশন করেন। তাহলে দেখুন আপনারা এক হাতা করে স্যপ বিতরণ করে পূণ্য সঞ্চয় করছেন এবং পরলােকে প্রতিদানও পাবেন। তাহলে আপনারা যে অনেক হাতা সূপ দিয়েছেন তার প্রতিটির জন্যে শত হাতা পেতে থাকলে আপনারা তাে ডুবে যাবেন। আপনাদের এই মর্মান্তিক পরিণতি আমাকে অত্যন্ত বেদনা দিচ্ছে। | সেখানে আরও যে দু’-একজন যাজক ছিল তারা তাে এই কথা শুনে হাসতে লাগল। কিন্তু আমাদের যাজক ভীষণ রেগে গিয়ে তাকে বলল, সে যেন তাদের গির্জায় আর না আসে। সে তার মুখ দেখতে চায় । ধনী ব্যক্তি বেঁচে গেল, কারণ প্রতি রবিবার গির্জায় আবসার সময় যাজকের জন্যে কিছু আনতে হতাে।

 

সপ্তম গল্প

কান গ্রাভি স্কালা অকস্মাৎ বিনা কারণে কৃপণ বা ব্যয়কুষ্ঠ হয়ে পড়তেন, তাই তাঁকে বার্গামিননা প্রাইমাস ও কুনিজ যাজকের কাহিনী বলে সমুচিত শিক্ষা দিলেন। বলা যায়, এই কাহিনীর মাধ্যমে স্কালাকে তিনি ভৎসনাই করলেন।

এমিলিয়ার সরস কাহিনী এবং তার বলার ভঙ্গি ও কৌশল সকলকে, এমনকি, কুইনকেও চমৎকৃত করলাে। ক্রুসেডার যেভাবে শাস্ত্রবচনের ব্যাখ্যা করলাে তা সকলেই উপভােগ করলাে। এক সময়ে আনন্দের উচ্ছলতায় ভাটা পড়ল। সকলে শান্ত হল। আবার একটি কাহিনী শােনবার জন্যে সকলে আগ্রহী হয়ে উঠল। এবার পালা ফিলােস্ট্রাটোর—অতএব সে গল্প বলতে আরম্ভ করলাে।

প্রিয় সখি ও সখারা, তাহলে শােনাে। একজন তীরন্দাজ একটা স্থির লক্ষ্যবস্তুকে সহজেই ভেদ করতে পারে। কিন্তু তার দক্ষতা ও কৃতিত্ব তখনই স্বীকৃত হয় যখন সে হঠাৎ সামনে-আসা কোনাে বস্তু বা আকাশে-উড়ন্ত একটা পাখিকে তীরবিদ্ধ করতে পারে। বর্তমানে যাজক সম্প্রদায় এতই দুর্নীতিপরায়ণ ও ভােগবিলাসী হয়ে পড়েছে যে স্থির লক্ষ্যবস্তুর মতােই ওরা অনড় হয়ে পড়েছে। ধর্মপথ থেকে ওরা বিচ্যুত এবং দয়াহীন। ভিখিরিদের তারা যে ভিক্ষা দেয় তা নিতান্ত শূকরের খাদ্য কিংবা নর্দমায় ফেলে দেওয়ার উপযুক্ত। আমার গল্পের তীরন্দাজ বা নায়ক ব্যয়কুণ্ঠ ও কোপনস্বভাব কান গাণ্ডি ডেলা স্কালাকে কিভাবে শিক্ষা দিয়েছিলেন আপনারা তাই শুনুন।

সম্রাট দ্বিতীয় ফ্রেডরিকের পর গ্রাণ্ডি ডেলা স্কালার তুল্য সম্পদ ও ঐশ্বর্যশালী নৃপতি আর ইটালিতে দেখা যায় নি। তিনি একবার ভেরােনাতে এক আড়ম্বরপূর্ণ বিরাট উৎসবের আয়ােজন করলেন। ঠিক হল এতে দেশের সব জায়গা থেকে লােক আসবে এবং এমন সব প্রমােদকারীদের আনা হবে যাদের ক্রিয়াকৌশল ও নৈপুণ্য দেখে সকলের চোখ ধাঁধিয়ে যাবে।

আয়ােজন যখন সম্পূর্ণ, তখন স্কালা সহসা ঘােষণা করলেন, সব বন্ধ করে দাও। উৎসব হবে না, আমােদ-আহ্লাদ এখন হবে না। সকলে তাে অবাক! বিশেষ করে যারা উৎসবে নাচতে গাইতে বা খেলা দেখাতে এসেছিল। কারণ তাদের বলে দেওয়া হল—তােমরা তােমাদের মালপত্তর গুটিয়ে কেটে পড। লােকগুলাে তাে নিরাশ হবেই। সাজসরঞ্জাম, লােকজন নিয়ে ঘােড়ায় চড়ে তারা অনেক দূর থেকে এসে শহরে সরাইখানায় উঠেছে, খরচ দিতে হয়েছে, এখন সবই লােকসান। কপালের ফের কাকে বলে!

কিন্তু স্কালা তাদের নিরাশ করলাে না। তাদের সমস্ত খরচ তাে দিলই উপরন্তু তাদের জন্যে যে সকল উপহার কিনে রেখেছিল সেগুলিও তাদের দিয়ে দিল। সকলে স্কালার জয়জয়কার করতে করতে সানন্দে যে যার ঘরে ফিরে গেল।

বাদ পড়ল শুধু একজন। সে একটা কানাকড়িও পেল না। তার নাম বার্গামিননা। সে ছিল বাপটু। কথায় তাকে হারানাে মুশকিল ছিল। কিন্তু আসলে সে ছিল ভেন্ট্রিলােকিস্ট। সে নিজ মুখ দিয়ে অপরের কণ্ঠস্বর নকল করে মজার মজার কথা বলে সকলকে হাসিয়ে ছাড়ত। তার তুল্য কৌতুক অভিনেতা তখন বিরল ছিল। আর তাকেই কিনা চরম অবহেলা! | সে কিন্তু হাল ছাড়ল না। সে সরাইখানাতেই রয়ে গেল—শেষ না দেখে যাবে না। দেখা যাক ডিউক অর্থাৎ স্কালা তার জন্যে কিছু করে কিনা।

স্কালার ধারণা ছিল বার্গামিনােক টাকা দেওয়াও যা আর জলে ফেলে দেওয়াও তাই। কিন্তু তিনি বার্গামিনােকে কিছু বললেন না এবং তাকে কোনাে খবরও পাঠালেন না, ফিরে যেতেও বললেন না।

বার্গামিননা বৃথাই অপেক্ষা করতে লাগল। ডিউকের ডাক আর আসে না। এ দিকে সরাইখানায় আর বসে থাকাও যাচ্ছে না। নিজে আছে, সহকারী আছে, ঘােড়া আছে, পরিচারক আছে—এদের খরচ আছে। পয়সাও ফুরিয়ে গেছে,। বেচারা দুর্ভাবনায় পড়ল। সরাইওয়ালাকে কোথা থেকে সে তার পাওনা মেটাবে? সরাইওয়ালা দিনের পর দিন তাকে বিনা পয়সায় থাকতে দেবে না।

বার্গামিননা তখন ভাবল, এক কাজ করা যাক। তার কাছে ছিল তিনটে দামী ভেলভেট ও মখমলের পােশাক। আসল সােনার জরির কাজ করা। আর তেমনি একটি টুপি। ধনী ব্যক্তিরা তার অদ্ভুত বাকপটুতায় সন্তুষ্ট হয়ে এইসব উপহার তাকে দিয়েছিল। সে এই পােশাক পরেই মঞ্চে অবতীর্ণ হতাে।

সরাইওয়ালা একদিন তার পাওনার তাগাদা দিল। বার্গামিনাে বিনা বাক্যব্যয়ে তার একটি পােশাক তাকে দিয়ে দিল। সরাইওয়ালা খুব খুশি। লােকটা যদি টাকা দিতে না পারে তাহলে এই পােশাক বেচে ভালাে দাম পাবে।

ওদিকে ডিউকের কাছ থেকেও কোনাে সাড়া নেই। এদিকে বার্গামিনাের দ্বিতীয় পােশাকটাও গেল। নইলে সে সরাই ছাড়তে বাধ্য হবে। এটা এলেবেলে সরাইখানা নয়। মানী ও ধনী মানুষেরা এখানে আহার করতে আসেন। একটা ইজ্জত আছে। বার্গামিনাে স্থির করলাে শেষ পােশাকটাও সে ত্যাগ করবে তারপর এখান থেকে চলে যাবে।

ক্রমে তৃতীয় পােশাকটিও ত্যাগ করবার সময় এসে গেল। আজকালের মধ্যেই হয়ত তার মায়া ত্যাগ করতে হবে।

ঠিক এমন সময়ে সে একদিন বিমর্ষ হয়ে ডাইনিং হলে ডাইনিং টেবিলের সামনে দু হাত বুকে গুটিয়ে দাড়িয়ে আছে। টেবিলে বসে যে স্বয়ং ডিউক স্কালা, ভােজন করছেন তা সে লক্ষ্য করে নি। কাউকে লক্ষ্য করার মতাে মেজাজও তার ছিল না।

বার্গামিনাের সঙ্গে একটু কৌতুক করবার লােভ ডিউক সামলাতে পারলেন না। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, কি হে বার্গামিননা, তােমার মুখ আষাঢ়ের মেঘের মতাে এমন কালাে কেন? তুমি এত কথা বলাে আর এখন একেবারে বােবা। কিছু বলল, আমরা শুনি।

আরে! মেঘ না চাইতেই জল। ঠিক আছে, মজা দেখাচ্ছি। বার্গামিনাে চকিতে মেজাজে ফিরে এলাে। সে বলল, শুনবেন মহামান্য ডিউক, তাহলে শুনুন। বলেই সে তার কণ্ঠে নানা স্বরের নানা সুর খেলিয়ে বলতে আরম্ভ করল

তাহলে আপনাকে প্রাইমাসের ঘটনাটাই শােনাই। প্রাইমাস ছিলেন মহাপণ্ডিত, বিনয়ী ও । নিরহংকারী। তার তুল্য বিরাট পণ্ডিত দেশে তখন একজনও ছিল না। এই সকল গুণের জন্য তাকে সকলে শ্রদ্ধা করতাে। তিনি ছিলেন প্রচারবিমুখ। খুব কম মানুষই তাঁকে সাক্ষাৎ দেখেছেন কিন্তু তার খ্যাতি ছিল পরিব্যাপ্ত। তাকে না দেখলেও তার নাম সকলে শুনেছিল।

একদা তিনি প্যারিসে বাস করছিলেন কিন্তু তখন তার সময় ভালাে যাচ্ছিল না। পেট ভরে দু’ বেলা আহার জুটতাে না অথচ একথা তিনি প্রকাশ করতেন না। বস্তুত তিনি দরিদ্রই ছিলেন। ধনীরা কখনই তার খোঁজ নিতেন না, সাহায্য করা তাে দূরের কথা।

এই সময়ে প্রাইমাস শুনলেন, কিছু দূরে কুনি নামে একজন অ্যাবট ছিলেন। নানা দিক থেকে তার প্রচুর আয়, তিনি রীতিমতাে ধনী। এমন কি স্বয়ং মাননীয় পােপ অপেক্ষাও।

প্রাইমাস শুনলেন কুনি ধনী হলেও উদার। তিনি দৈনিক যখন আহারে বসেন তখন যে-কেউ তার আতিথ্য গ্রহণ করলে তাকে তিনি খাদ্য ও পানীয় দ্বারা সন্তুষ্ট না করে ছাড়তেন না। সকলের জন্যে তার দ্বার অবারিত। অতত্রব প্রত্যহই তার বাড়িতে ভােজসভা বসতাে। রন্ধনশালা থাকত সদা ব্যস্ত।

এমন উদার মানুষের কথা তাে শােনা যায় না। প্রাইমাস তার কথা শুনলেন এবং স্থির করলেন এমন মানুষটি ও তাঁর কাণ্ডকারখানা একবার দেখে আসা যাক। তিনি স্বচক্ষে দেখে আসবেন মানুষটা কি রকম এবং অপর মানুষের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করেন।

প্রাইমাস শুনলেন, প্যারিস থেকে ছয় মাইল দূরে কুনি বাস করেন। তাই তিনি ভাবলেন যে যদি ভােরবেলায় যাত্রা করা যায় তাহলে কুনির প্রাতঃরাশের আগেই পৌঁছে যাবেন। কিন্তু তিনি রাস্তা চেনেন না। তবুও পথনির্দেশ জেনে নিলেন এবং নিজের ঢােলা জামার ভেতরে তিনখানা পাউরুটি নিয়ে নিলেন, যদি পথ ভুলে যান কিংবা দূরে চলে যান তাহলে খেতে তাে হবে। আর পানীয় জল তাে সর্বত্র পাওয়া যায়। তবে জল তিনি বেশি পান করেন না, না-হলেও চলে যায়। এ যাই হােক প্রাইমাস পথ ভুল করেন নি। অ্যাবট ক্লনির প্রাতঃরাশের আগেই সেখানে পৌঁছে গিয়েছিলেন।

কুনির বাড়ির ভেতরে তিনি ঢুকলেন এবং যা দেখলেন তাতে তার বিশ্বাস হল যে, তিনি বাড়াবাড়ি কিছুই শােনেন নি। লােকটি সত্যই মহৎ ও উদার।

ডাইনিং হলে অনেকগুলি বড় বড় টেবিল সাজানাে হয়েছে। রন্ধনশালায় দারুণ ব্যস্ততা। নানা রকমের প্রচুর খাদ্যের আয়ােজন করা হয়েছে। লােকজন ব্যস্ত হয়ে চারদিকে ছােটাছুটি করছে। বাঃ, এই তাে চাই, এমন মানুষ যত হয় ততই ভালাে।

বহু লােক সমবেত হয়ে অপেক্ষা করছিল। যার ওপর তদারকির ভার দেওয়া হয়েছিল সে সকলকে অনুরােধ করলাে হাত মুখ ধুয়ে আসন গ্রহণ করতে। এরা বােধহয় নিত্য আসে। তাই দৈনিক রুটিনের সঙ্গে এরা পরিচিত। কিন্তু প্রাইমাস তা জানে না বলে প্রথমেই ডাইনিং হলে ঢােকে নি। হলের বাইরে একটা দরজার সামনে সে বসেছিল। ঠিক এই দরজার ওপারে ডাইনিং হলের ভেতরে কুনির বসবার টেবিল। টেবিলে বসে খোলা দরজা দিয়ে বাইরে চাইলেই কুনি প্রাইমাসকে দেখতে পাবে। বলতে কি, ডাইনিং হলে ঢােকবার সময়ও প্রাইমাকে পথ থেকে দেখা যাবে।

অতিথিরা সকলে আসন গ্রহণ করেছে। কিন্তু কুনি ঘরে এসে যে পর্যন্ত না বসবেন সে পর্যন্ত খাদ্য পরিবেশন করা হবে না।

কুনি আসছেন এবং ঘরে ঢােকবার আগে দরজার সামনে উপবিষ্ট প্রাইমাসকে দেখতেও পেলেন। কিন্তু প্রাইমাসকে তিনি চেনেন না। ছেড়া ও মলিন ঢিলে জামা পরা একটা লােক বসে রয়েছে, তাকে তিনি গ্রাহ্য করলেন না। এ হেন ভিখিরির মতাে একটা লােককে দেখে কুনি বিরক্তই , হলেন। একে আগে তাে কখনও দেখেন নি। এরকম বাজে একটা লােককে তিনি তার টেবিলে। আমন্ত্রণ জানাতে বুঝি চাইলেন না।

ঘরে ঢুকে কুনি একজন পরিচারককে আদেশ করলেন, দরজাটা বন্ধ করে দাও তত হে।

দরজা বন্ধ হবার পর কুনি কয়েকজনকে লােকটার পরিচয় জিজ্ঞাসা করলেন, কিন্তু কেউ তার পরিচয় বলতে পারল না।

কিছু না খেয়ে প্রাইমাস সেই ভােরে বেরিয়েছিলেন, পথেও কিছু খান নি। এতখানি হেঁটেও এসেছেন। অতএব ক্ষিধেও পেয়েছে। ডাইনিং হলের সামনের দরজাটা সেই যে বন্ধ হয়েছে আর খুলছে না। ভেতর থেকে ডাকও পড়ছে না। প্রাইমাস তখন তার ঢিলে জামার ভেতর থেকে একখানা পাউরুটি বার করে ছিড়ে শুকনােই চিবােতে লাগলেন। সঙ্গে তাে আর কিছুই নেই।

এদিকে অ্যাবট ক্লনি তার এক পরিচারককে বললেন, দেখ তাে লােকটা বাইরে বসে কি করছে? আছে না চলে গেছে?

পরিচারক ফিরে এসে বলল, হুজুর লােকটা এখনও বসে আছে, আর বলবাে কি সে একটা শুকনাে পাউরুটি চিবােচ্ছে, হয়ত সঙ্গে এনেছিল।

ঠিক আছে, নিজের রুটি নিজে খাচ্ছে তাে আমাদের বলার কিছু নেই, আমাদের কিছু না। খেলেই হল। বললেন কুনি।

অ্যাবটের মনে মনে ইচ্ছে ছিল–এই বাজে লােকটা বসে কেন, চলে গেলেই তাে পারে। কেউ তাে তাকে ডেকে আনে নি। কিন্তু লােকটা যখন এসেই পড়েছে তখন তাকে চলে যেতে বলা অভদ্রতা হবে।

এদিকে প্রাইমাসের একটা রুটি খাওয়া শেষ হয়েছে। কিন্তু তাকে যে কেউ ভেতরে আহারের টেবিলে ডাকবে এমন কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। তখন দ্বিতীয় রুটিখানা বার করে খেতে লাগলেন। পরিচারক একবার উঁকি মেরে দেখে এই খবরটাও অ্যাবটকে জানিয়ে দিল।

দ্বিতীয় রুটি খাওয়াও শেষ হল, তবুও ডাইনিং হল থেকে কোনাে সাড়াশব্দ নেই। প্রাইমাস শেষ রুটিখানাও খেতে আরম্ভ করলেন। এ খবরও কানে পৌঁছল। লােকটা এখনও আছে এবং শুকনাে রুটি চিবােচ্ছে।

বার অ্যাবট ভাবতে আরম্ভ করলেন—আজ আমার হল কি? হঠাৎ আজ আমি এমন কৃপণ হয়ে গেলাম কি করে? অচেনা এই মানুষটাকে আমি অবহেলা করছি কেন? ধনী, দরিদ্র, মুটে, মজর, চাষী, চোর, জোচ্চোর বা যে কেউ হােক আমি কোনাে খোঁজ না নিয়ে বছরের পর বছর কত লােককে খাইয়ে চলেছি, আজও খাওয়াচ্ছি। এদের মধ্যে কত বদ লােকও তাে রয়েছে। কিন্তু কখনও তাে আমি কাউকে ফিরিয়ে দিই নি। তবে এই লােকটাকেই বা আমি অবহেলা করছি কেন? লােকটিও তাে কিছু বলে নি বা কিছু প্রার্থনাও করেনি। এমনকি আমাকে কিছু জিজ্ঞাসা করেনি। একটা কথাও বলে নি। এ তাে সাধারণ মানুষ নয়। না, আমি বােধহয় অন্যায় করছি। ওকে আপ্যায়ন করা আমার উচিত।

মনে মনে অ্যাবর্ট কুনি চিন্তা করতে লাগলেন, লােকটা কে হতে পারে? তিনি তাঁর কর্মচারীদের খােজ নিতে বললেন এবং পরে তাদের কাছ থেকে তিনি জানতে পারলেন যে লােকটি আর কেউ নয়, স্বয়ং প্রাইমাস। তিনি স্বচক্ষে যাচাই করতে এসেছেন যে অ্যাবট উদারতা ও মহানুভবতা সম্বন্ধে তিনি যা শুনেছেন সেসব সত্যি কিনা।

অ্যাবট এবার সত্যই লজ্জিত হলেন। তিনি না জেনে কি অন্যায়ই না করেছেন। যাক যা হবার তা তাে হয়ে গেছে। এখন তাে প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়। তাকে তার প্রাপ্য সম্মান দেওয়া দরকার, তখন তিনি স্বয়ং উঠে গিয়ে প্রাইমাসকে ভেতরে ডেকে এনে ভুরিভােজ করালেন। উত্তম নতুন পােশাক পরিয়ে দিলেন, অর্থ দিলেন এবং সাজসরঞ্জামে সজ্জিত একটি ঘােড়াও দিলেন।

প্রাইমাসও ক্ষমাশীল ব্যক্তি। তিনি খুব সন্তুষ্ট হলেন। পায়ে হেঁটে এসেছিলেন এবং অশ্বপৃষ্ঠে প্যারিসে ফিরলেন।

কান এ্যাণ্ডি বােকা মানুষ নয়। বার্গামিননা কি বলতে চাইছে তা তিনি বুঝতে পারলেন এবং সহাস্যে বললেন

বার্গামিননা, তুমি খুব চতুর ও রসিক ব্যক্তি। যা বলতে চাইছ তা আমি উপলব্ধি করতে পারছি। তুমি আমার চোখ খুলে দিয়েছ।

এরপর কান গাণ্ডি সরাইওয়ালার প্রাপ্য চুকিয়ে দিয়ে তার তিনটি প্রিয় পােশাকও ফিরিয়ে দিলেন। তাকে ইচ্ছামত ভােজনে তৃপ্ত করলেন, অর্থ ও সুসজ্জিত অশ্ব দিলেন। বললেন, বার্গামিননা, তুমি দেশে ফেরার আগে যতদিন ইচ্ছে আমার বাড়িতে থাকতে পারাে।

 

অষ্টম গল্প

গুইগ্নিয়েলমাে বরসিয়ার বেশ মিষ্টি মিষ্টি কথায় আরমিনাে দ্য গ্রিরালডির অর্থলালসাকে কেমন বিদ্রুপ করলাে এ তারই কাহিনী।

ফিলােস্ট্রাটোর পাশেই বসে ছিল লরেতা। গল্প শেষ হতেই সে বুঝতে পারল এবার তার পালা। হাততালি ও আনন্দ প্রকাশ শেষ হতেই কুইনের আদেশের অপেক্ষা না করেই লরেতা বলতে আরম্ভ করলাে, ভাই ও বােনেরা, ফিলােস্ট্রাটোর গল্পটা শুনে আমার বিশেষ একটা গল্প বলতে ইচ্ছে হচ্ছে। কান গ্র্যাণ্ডি ছিল ধনী, আমার গল্পের নায়কও ধনী; তবে যতদূর সম্ভব কৃপণ। একজন নবীন অতিথি সেই কৃপণ ব্যক্তির কি করে চোখ খুলে দিল তারই গল্প তােমাদের শােনাব। আশা করি তােমাদের ভালাে লাগবে।।

অনেকদিন আগে জেনােয়া শহরে আরমিনাে দ্য গ্রিমালডি নামে এক ভদ্রলােক বাস করতাে। শহরে তাকে সকলে এক ডাকেই চিনত। কারণ সে ছিল শহরের সর্বাপেক্ষা ধনী। বলতে কি, তার ধনসম্পদের পরিমাণের শেষ ছিল না। শুধু জেনােয়াতে কেন, সারা ইটালিতে তার তুল্য ধনী আর কেউ ছিল না। যে পরিমাণে সে ধনী ছিল সেই পরিমাণে ছিল কৃপণ। এবং রীতিমত লােভী।

একটা পােশাক যতদিন পর্যন্ত না ছিড়ে ও ময়লা হয়ে পরবার অযােগ্য হত, ততদিন পর্যন্ত সেই পােশাকটা ত্যাগ করতাে না। তার বাড়িতে কোনাে অতিথি এলে সে তাদের আপ্যায়ন করতে । যদিও বা করতে হতাে তাহলে যেটুকু না দিলে নয় তার বেশি নয়। তার এই কৃপণ স্বভাবের জন্যে লােকে তাকে আরমিনাে গ্রিমালডি না বলে আরমিনাে ‘স্কিনফ্রিন্ট’ বা ‘হাড়কিপ্টে আরমিনাে’ বলতাে।

এই হাড়কিপ্টে যখন একটিও পেনি খরচ না করে তার সিন্দুক ভারী করে চলেছে সেই সময়ে গুইগ্লিয়েলমাে বরসিয়ার নামে ভদ্র, বিনয়ী, রুচিশীল, বুদ্ধিদীপ্ত ও বাকপটু এক ব্যক্তি জেনােয়া শহরে এলেন। এই ভদ্রলােক আর পাঁচজন সাধারণ ব্যক্তি অপেক্ষা স্বতন্ত্র ছিল।

বর্তমানে আমরা যেসব নামী ব্যক্তিকে দেখি তার অধিকাংশই স্বার্থপর, পরশ্রীকাতর, চরিত্রহীন বা লােভী। কিন্তু বরসিয়ার ছিল সত্যিই একজন সৎ ব্যক্তি। সে-যুগেও যে আমাদের নেতারা সৎ ও পরােপকারী ছিল তা বলতে পারি না কারণ তারা নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত থাকত, প্রতিবেশীর বিপদে এগিয়ে আসত না। অতএব এই লােকটি ছিল ব্যতিক্রম।

যাই হােক পরনিন্দা ও পরচর্চা করে লাভ কি? যা বলছিলুম তাই বলি। শহরে আগত ন ব্যক্তিটিকে অনেকেই নিজেদের মধ্যে গ্রহণ করলেন, তাঁকে সাদর সম্ভাষণ জানালেন, যথাসম্ভব আপ্যায়িত করলেন।

বিভিন্ন পরিবারে যাওয়া-আসা ও ব্যক্তিদের সঙ্গে মেলামেশার ফলে স্বভাবতই গ্রিমালডির কথাও উঠত। ধনী অথচ কৃপণ এ হেন গ্রিমালডির কথা শুনে বরসিয়ারের ইচ্ছে হল, লােকটাকে তাে একবার দেখা উচিত। এ কেমন লােক যে টাকার পাহাড়ের ওপর বসে আছে। নিজে না হয় পেট ভরে না খেল কিন্তু অপরের জন্যেও কি দু-চারটে পয়সা খরচ করতে পারে না?

আরমিনাের কানেও কথাটা গিয়েছিল যে বরসিয়ার নামে অতি সজ্জন এক ব্যক্তি শহরে এসেছে। তার ভদ্র আচরণ, সৌজন্য ও সদালাপ সকলকে মুগ্ধ করেছে।

কৃপণতা সত্ত্বেও আরমিনাের হৃদয়ের কোণে কোথাও একটু সৌজন্যবােধ লুকিয়ে ছিল। তাই ব্রসিয়ার যখন অযাচিতভাবে তার গৃহে পদার্পণ করলাে তখন আরমিনাে তাকে নিতান্ত মৌখিকভাবে হাসিমুখে সাদর অভ্যর্থনা জানাল। তারপর তাকে বসিয়ে কথাবার্তা আরম্ভ করলাে।

বরসিয়াকে কিপ্টেটার ঘরে ঢুকতে দেখে কৌতূহলী হয়ে পল্লীর কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তিও তার বাড়িতে ঢুকে দু’জনের সঙ্গে কথা বলতে লাগল। | আরমিনাের বাড়িখানা একটা প্রাসাদ। আরমিনাে তার অতিথিকে তার প্রাসাদ ঘুরিয়ে দেখাতে আরম্ভ করলাে। বাড়ি দেখান শেষ হলে সকলে আবার বসবার ঘরে ফিরে এসে আসন গ্রহণ করলো।

কথা প্রসঙ্গে আরমিনাে বরসিয়ারকে বলল, মহাশয় আপনি তাে দেখছি বিদ্বান, বুদ্ধিমান এবং সুরুচিসম্পন্ন। বহু দেশও ঘুরেছেন, আপনার কাছে একটা পরামর্শ চাইছি।

বসিয়ার বলল, বলুন। আমি যথাসাধ্য সাহায্য করবে। আপনার মতাে ব্যক্তির সেবা করতে পারলে নিজেকে ধন্য মনে করব। বরসিয়ার তার স্বভাবসুলভ ভাষায় উত্তর দিল।

আরমিনাে বলল, ধন্যবাদ। সেবা করার কোন ব্যাপার নয়, আমি আমার এই গরিবখানার বড় ঘরে এমন বিষয়ে একটা ছবি আঁকাতে চাই যেমনটি কেউ দেখেনি বা শশানেনি।

বরসিয়ার বলল, আপনি তাে আমাকে বিপদে ফেললেন। কি বলবাে, পৃথিবীতে তাে বহু জিনিস দেখা যায় না বা শােনা যায় না—তার খবর আমরা কি করে পাব? তবে একটা পরামর্শ আপনাকে দিতে পারি।

—কি বলুন? সাগ্রহে জিজ্ঞাসা করে আরমিননা।

—এমন একটা বস্তুর নাম করতে পারি, বহুদর্শী ও অভিজ্ঞ হয়ে যা আপনিও দেখেন নি।

—তাহলে সেটা কি আপনি বলুন?

—সেটা হল উদারতা। মানব হৃদয়ের উদারতা, এইটেই আপনি আপনার বড় ঘরে শিল্পীকে আঁকতে বলুন।

উদারতা! মানবিক উদারতা? শব্দ দুটো শুনে আবমিনাে চমকে উঠল। আমিও দেখি নি? সত্যিই তাে! উনি তাে ঠিকই বলেছেন। আরমিনাে এই প্রথম লজ্জিত হল। লজ্জা কাকে বলে তা সে মর্মে মর্মে অনুভব করলাে। সে তার পুরনাে খােলস থেকে নতুন মানুষ হয়ে বেরিয়ে এসে বলল, মহাশয়, আমি তাই করবাে, উদারতা, মানবিক হৃদয়ের দরদ আমি শিল্পীকে দিয়ে শুধু আঁকাব না, আমি নিজেও তা দেখাব যাতে আর কেউ অনুযােগ করতে না পারে। সত্যিই আপনি আমাকে অত্যন্ত সুপরামর্শ দিয়েছেন, আমার চোখ খুলে দিয়েছেন। আপনাকে ধন্যবাদ।।

সেইদিন থেকে আরমিনাে সম্পূর্ণ বদলে গেল। তার বিনয়, সৌজন্য ও উদারতায় জেনােয়াবাসী মুগ্ধ হল। এতকাল সে ছিল জেনােয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ ধনী, এখন হল জেনােয়ার সেরা উদারহৃদয় ব্যক্তি। সে সকলের শ্রদ্ধা ও প্রশংসা অর্জন করতে পেরেছিল।

 

নবম গল্প

গ্যাসকনির এক মহিলার বাকপটুতায় সাইপ্রাসের রাজার মনে এমন আঘাত লাগল যে দুর্বলচিত্ত রাজা সম্পূর্ণ বদলে গেল।

এলিসা বুঝতে পেরেছিল যে এবার তার পালা। তাই সে কুইনের আদেশের জন্য আর অপেক্ষা করলাে । কুইন যেই তার দিকে চেয়ে একটু মৃদু হেসেছে অমনি সে ধীরে ধীরে তার কাহিনী আরম্ভ করলাে।

তাহলে শােন আমার তরুণী বান্ধবীরা, অনেক সময় বিচার বিবেচনা করে ভেবেচিন্তে অনেক কথা বললেও কোনাে কোনাে মানুষের মনে তা কোনাে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে না। এমন লােকও আছে যাকে কোনাে যুক্তিপূর্ণ বাক্য বা কটুক্তি স্পর্শ করতে পারে না, তাকে কিছু অনুরােধ করলেও তা সে উপেক্ষা করে। লরেটা প্রায় এইরকম একজনের গল্প বলল। গল্পটা ছােট কিন্তু সত্যি। মন দিয়ে শােন, কারণ এই গল্প থেকে তােমরা হয়ত অনেক কিছু শিখতে পারবে।

সাইপ্রাসের প্রথম রাজার সময়ের ঘটনা। বুলিয়নের গডফ্রে প্যালেস্টাইনে পবিত্রভূমি যাকে আমরা হােলিল্যাণ্ড বলি তা জয় করে নিয়েছে। পবিত্রভূমি জয়ের জন্য যারা শহীদ হয়েছিল সেখানে তাদের সমাধি দেওয়া হয়েছিল।

বহু ধর্মপ্রাণ পুরুষ ও মহিলা শ্রদ্ধা জানাতে সেই সমাধিভূমিতে যেত। গ্যাসকনির জনৈক মহিলাও সেই সমভূমিতে গিয়েছিলেন। কিন্তু ফেরবার পথে সাইপ্রাসে এলে তিনি একদল দুবৃত্ত কর্তৃক লাঞ্ছিত হন। তিনি কিছুতেই মানসিক শান্তি পাচ্ছিলেন না। তিনি স্থির করলেন যে রাজার কাছে গিয়ে অভিযােগ করবেন।

কিন্তু তাকে বলা হল যে, কোনাে মহিলা রাজার কাছে গেলে বৃথাই সময় নষ্ট হবে। রাজা দুর্বলচিত্ত, নপুংসক, জড়বুদ্ধি। আপনার কোনাে কাজই হবে না। কারও কোনাে আবেদন-নিবেদন, গালি বা প্রশংসা রাজাকে স্পর্শ করে না। দেশে কত দুষ্ট ব্যক্তি আইন ভঙ্গ করছে, রাজা সে-সব দেখেও দেখেন নি। কোনাে প্রতিকার হয় না। এ এক অরাজক রাজত্ব। বিচার না পেয়ে সকলে রাজাকে গালি দেয়। অপমান করে! রাজা নিষ্কর্মা ও নির্বাক।

এই সকল কথা শুনে মহিলা ভালােভাবেই বুঝলেন যে দোষীরা শাস্তি পাবে না। তার অভিযােগের বিচার হবে না। কিন্তু কিছু তাে একটা করা দরকার। দেশের মাথা যদি এমন হয় তাহলে সর্বনাশ হতে আর দেরি নেই। এখন লােককে জাগানাে দরকার। তিনি রাজার কাছে যাবেন এবং যদি সফল না হতে পারেন তাহলে রাজাকে চরম অপমান করে অন্তত নিজের ঝাল মেটাবেন।

রাজসমীপে গিয়ে ঘটনার বিবরণ জানিয়ে মহিলা বললেন, আমার প্রতি যে চরম অন্যায় করা হয়েছে আমি তার প্রতিকারের আশায় আপনার কাছে আসিনি। কিন্তু আমি শুধু জানতে চাই, আমি যেমন আঘাত পেয়েছি, লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়েছি আপনিও তাে সেইমত আঘাত পাচ্ছেন, অপমানিতও হচ্ছেন। কিন্তু আপনি এইসব অন্যায় সহ্য করবার শক্তি কোথায় পান জানতে পারলে আমি সান্ত্বনা লাভ করবাে। জানতে পারলে আমি যেমন লাভবান হবে তেমনি আপনিও উপকৃত হতে পারবেন।

নির্গুণ সেই রাজা, যাকে মানুষ বলা চলে না, মহিলার এইসব বাক্য শুনে সহসা চমকে উঠল। যেন তার গভীর ঘুম ভেঙে গেল। রাজা একেবারেই বদলে গেল। মহিলা কি বলতে চাইছে রাজা মর্মে মর্মে অনুভব করলেন এবং যে দুবৃত্তরা সেই নারীকে লাঞ্ছিত করেছিল তাদের গ্রেফতার করিয়ে এনে রাজা এই প্রথম বিচার আরম্ভ করলেন। এবার তিনি এমন কঠোর হলেন যে, রাজ্যের সমাজবিরােধী ও আইনভঙ্গকারীরা স্থবির হয়ে গেল। সে-রাজ্যে আর কেউ কোনাে অন্যায় করতে সাহস করতাে না।

 

দশম গল্প

বলােনার মাস্টার (কুমার) অ্যালবার্তো এক মহিলার প্রেমে পড়েন। মহিলা ও তার সখি অ্যালবার্তোকে বিদ্রুপ করলে তিনি সমুচিত উত্তর দিয়ে মহিলাদের লজ্জায় ফেলে দেন।

এলিসার এবং সকলের গল্প বলা শেষ হল। বাকি রইল কুইন। প্যামপিনিয়া বুঝল এবার তার পালা। তাই সে কোনাে ভূমিকা না করে বলতে আরম্ভ করলাে শূন্য আকাশের দিকে আমরা ততক্ষণ চেয়ে দেখি না যতক্ষণ না সেই শূন্য নীল আকাশের বুকে মেঘের ভেলা ভাসছে। অন্ধকার রাতে তাে আকাশের দিকে চাইবার কোনাে প্রশ্ন উঠত না যদি না সহস্র সহস্র তারকা আকাশের শােভা বর্ধন করতাে। তেমনি শূন্য প্রান্তরে যদি ফুলের বন্যা না বইত তবে কে সেদিকে চেয়ে দেখত?

এরকমই কোনাে সুন্দরী নারী যদি সালংকারাও হয় তথাপি সে পুরুষকে আকর্ষণ করতে পারে না যদি না সে রসিকা হয় বা রস অথবা কৌতুক উপলব্ধি করবার মন না থাকে। ঠাট্টা ও রসিকতা বুঝতে হবে, উপযুক্ত জবাব দিতে হবে তবে তাে সেই নারী পুরুষকে আকৃষ্ট করবে। ঠিক যেভাবে পালতােলা নৌকা বা তারকাখচিত আকাশ কিংবা ফুলে ফুলে রামধনু রঙের মাঠ সকলের নজর কেড়ে নেয়। এমন নারীর আরও একটি গুণ থাকা চাই, রসিকতার উত্তরে যেন তার কুরুচি প্রকাশ না পায়। মার্জিত ভাষাতেই উত্তর দিতে হবে। অনেক বকেছি, এবার তাহলে আজকের শেষ গল্পটা শােন।

বেশিদিনের কথা নয়, বলােনা শহরে একজন খ্যাতনামা চিকিৎসক ছিলেন। তার তুল্য চিকিৎসক সে সময় সে অঞ্চলে আর একজনও ছিল না। তাই দেশের সীমানা পেরিয়ে তার নাম বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। দূর অঞ্চল থেকেও তার কাছে রােগী আসত। তিনি মাস্টার অ্যালবার্তো নামে পরিচিত ছিলেন।

তার বয়স এখন সত্তর ছুঁই ছুঁই। এখনও জীবিত আছেন। বৃদ্ধ হলেও তিনি রূপবান। তবে রূপবান হলেও দেহ ও অঙ্গ শিথিল হয়েছে, যৌবন কবেই পিছনে ফেলে এসেছেন। তবে তার হৃদয় এখনও যৌনরসে রীতিমত সজীব, তরুণ হৃদয়ের মতাে তাজা। সুন্দরী নারী বা যুবতী এখনও তার কাছে উপেক্ষণীয় নয়। তবে বর্তমানে শক্তিহীন বলে মনে মনে রূপের প্রশংসা করেই নিবৃত্ত থাকেন। বাইরে কিছু প্রকাশ করেন না। মনে মনে তিনি এখনও প্রেমিক।

একদিন তিনি এক ভােজসভায় আমন্ত্রিত হয়েছেন। সেখানে একটি অসাধারণ রূপবতী মহিলাকে দেখে তিনি তার প্রতি আকৃষ্ট হলেন। মহিলা বিধবা। নাম শুনলেন ম্যালঘেরিদা দ্য জিসােলিয়েরি। মাস্টার অ্যালবার্তো সেই রূপসীর প্রতি এমনই আকৃষ্ট হলেন যে তিনি যেন আবার তার যৌবনে ফিরে গেলেন। দীপশিখার প্রতি পতঙ্গ যেভাবে আকৃষ্ট হয় তিনিও রূপসীর প্রতি সেইভাবে আকৃষ্ট হলেন।

বাড়ি ফিরেও সে মুখ তিনি ভুলতে পারলেন না। সে রাতে তার ঘুম হল না। বার বার রুপসীর মুখ দেখতে ইচ্ছে করতে লাগল।

মহিলা কোথায় থাকেন তা তিনি জেনে নিয়েছিলেন। তাই নিয়মিতভাবে কখনও ঘােড়ায় চড়ে, কখনও পায়ে হেঁটে মহিলার বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়া-আসা আরম্ভ করলেন। এবং চলতে চলতে একদৃষ্টে মহিলার দিকে চেয়ে থাকেন।

সেই মহিলা প্রায় সময়ে সখি পরিবৃত হয়ে বাড়ির বারান্দায় বা বাগানে বসে গল্পগুজব করতেন। অ্যালবার্তোর ব্যাপারটা মহিলা ও তার সখিদের নজর এড়াল না। তারা নিজেদের মধ্যে বলাবলি আরম্ভ করলাে, বুড়াের রস হয়েছে, ওকে দিনকতক খেলানাে যাক, তারপর একদিন ওকে নিয়ে মজা করা যাবে। এভাবে ব্যাপারটা নিয়ে মেয়েরা নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করলাে।

যেহেতু অ্যালবার্তো চিকিৎসক সেহেতু সকলে যেমন তাকে চিনত তেমনি চিকিৎসার সূত্রে তিনিও সকলকে চিনতেন—হয়ত সকলের নাম জানতেন না।

এক রবিবার বিকেলে সেই সুন্দরী মহিলা ও তার বান্ধবীরা বাড়ির বারান্দায় বসে আছেন। অ্যালবার্তো জানে এই সময়ে সুন্দরীর দর্শন পাওয়া যায়।

অ্যালবার্তোকে বাড়ির গেটের সামনে আসতেই একজন যুবতী হাত নেড়ে তাকে ভাল। অ্যালবার্তো কাছে আসতে তারা বললাে, রােজই তাে এই পথ দিয়ে যাওয়া আসা করেন, একদিনও তাে ভেতরে আসেন না। অথচ আমাদের অবহেলা করেন বলেও তাে মনে হয় না। বিশেষ করে আমাদের এই সখিটি আপনার নজর কেড়ে নিয়েছে। চলুন আমরা বাগানে বসে গল্পগুজব করি। কিছু গান ও যাবে, কিছু আহারও করা যাবে।

জলপাইয়ের উৎকৃষ্ট সরবৎ এবং সুখাদ্য পরিবেশিত হল। সকলে বেশ জমিয়ে গল্প আরম্ভ করলেন। পার্টি যখন বেশ জমে উঠেছে, অনেক রসের কথা বিনিময় হয়েছে, প্রচুর হাসাহাসি হয়েছে, মেয়েরা এ ওর গায়ে ঢলে পড়ছে—এমন সময় একজন যুবতী জিজ্ঞাসা করলাে, বদ্যিমশইর চেহারাট দর্শনীয় হলেও বুড়াে তাে হয়েছেন। কিন্তু বুড়াে হাড়ে এত রস সঞ্চারিত হয় কি করে! আমাদের সখিটিকে দেখে তাে আপনার মাথা ঘুরে গেছে বলে মনে হচ্ছে, ব্যাপারটা কি? আপনি কি ওর প্রেমে পড়ে গেলেন? কিন্তু প্রেমে পড়লে কি হবে, আমাদের সখিটি তাে শক্তসমর্থ যুবকদেরই প্রত্যাখ্যান করে। আপনার কি যুবকের মতাে আর শক্তি আছে? আপনার তাে সব অঙ্গই শিথিল হয়ে গেছে, আমাদের চাহিদা মেটানাে আপনার দ্বারা অসম্ভব।

ডাক্তার ওদের ঠাট্টা বুঝতে পারলেন। কিছুক্ষণ চুপ করে মৃদু হেসে বললেন, তােমরা ঠিকই বলেই তবে বুড়াে হলেও আমার চোখের জ্যোতি এখনও নিষ্প্রভ হয়নি। বাগানে সুন্দর গােলাপ আমি এখনও দেখতে পাই। ও দেখতে ভালবাসি। এই যেমন তােমরা একগুচ্ছ গােলাপ, গােলাপের মধ্যেও আবার সুন্দর ও অতিসুন্দর আছে—এই যেমন তােমাদের এই সখিটি। তা দিদিমণিরা আমি বয়সে বৃদ্ধ হলেও আমার হৃদয়টি কিন্তু এখনও তাজা আছে। মনও সজীব আছে। রূপের প্রশংসা করতে এখনও ভুলে যাই না। বা রূপসীর মুখ দেখলে নিস্পৃহভাবে দৃষ্টি সরিয়ে নিই না। যুবকদের দৃষ্টি ও মন চঞ্চল ও অগভীর। কিন্তু আমার তা নয়। অথচ কেবলমাত্র দেহসদ্যোগের জন্যে তােমরা তাদের পশ্চাতে ছুটতে থাক।

অ্যালবার্তো সরবতের গেলাসে চুমুক দিয়ে আবার বলতে লাগলেন, আমি লক্ষ্য করেছি যাবার টেবিলে তােমরা যখন লিক (পেঁয়াজ জাতীয় সবজী) খাও তখন লিকের যে অংশটা উপকারী, সেই কটাই তােমরা খাও না। তােমাদের কাছে লিকের পাতাগুলােই সুস্বাদু মনে হয়, যা শরীরের কোনও ভালাে কাজ করে না, স্বাদেও কন্দ অপেক্ষা নিকৃষ্ট। তাই দেখি তােমাদের প্রেমিকরাও হল ঐ লিকের পাতা। তাই নয় কি? আর আমরা হলুম লিকের কন্দ, তাই তাে তােমরা আমাদের বর্জন করে। তাই আমার ধারণা, তােমরা যদি নিষ্কাম প্রেম চাও তাহলে ছিবড়ে ফেলে লিকের কটাই পছন্দ করবে। কারণ তাতে তােমরা চিরন্তন তৃপ্তি পাবে।

মেয়েদের বিদ্রুপ, ব্যঙ্গ, হাসি থেমে গেল। তারা বৃদ্ধ বৈদ্যের বক্তব্যের সার উপলব্ধি করলাে।

আর সেই সুন্দরী বিধবা বললেন, মাস্টার অ্যালবার্তো, প্রেম যে কি, আপনি তার সুন্দর ব্যাখ্যা করেছেন। সত্যই প্রেমের বয়স নেই। আপনার প্রেম আমি বরণ করে নিচ্ছি। আপনি জ্ঞানী, গুণী ও অভিজ্ঞ ব্যক্তি। আপনার ধ্যান-ধারণা আমরা অগ্রাহ্য করতে পারি না। আপনি আমার সম্মান রক্ষা করে আসছেন। অশালীন কোনাে ব্যবহার আপনি আমার সঙ্গে করেন নি। আপনাকে আমার অদেয় কিছু। থাকতে পারে না। আপনার যা ইচ্ছা আপনি আমার কাছে তাই চাইতে পারেন। এবং মনে করবেন আমার যা কিছু আছে সবই আপনার।

এবার সকলের মুখে নির্মল হাসি ফুটে উঠল। মাস্টার অ্যালবার্তো উঠে দাঁড়ালেন। এবং সকলের। কাছ থেকে হাসিমুখে বিদায় নিলেন।

সেই বিধবা মহিলা ও তার সখিরা ভেবেছিল বুড়াের ওপর এক হাত নেবে। তারা এখন চুপ। প্যামপিনিয়া বললাে, তাই বলছি বান্ধবীরা, তােমরা যদি বুদ্ধিমতী হও তাহলে ঐ মহিলার উদাহরণ স্মরণে রাখবে।

সাতটি যুবতী ও তিনটি যুবকের দশটি গল্প বলা শেষ হল। সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে। দিনের তাপ কমে আসছে।

কুইন প্যামপিনিয়া বলল, আজ আমার রানীত্ব শেষ হল। শুধু একটি কাজ বাকি আছে, নতুন একজন রানী মনােনীত করা। কাল থেকে নতুন রানী সবকিছুর ভার নেবে, সব কিছুর ব্যবস্থা সে-ই করবে। ফিলােমেনাকে আমি আমার পরবর্তী রানী মনােনীত করলুম।

বিদায়ী রানী নিজের মাথার চুলের মুকুট খুলে ফিলােমেনার মাথায় পরিয়ে দিল। সকলে হাততালি দিয়ে আনন্দ প্রকাশ করলাে। এবং নতুন রাণীকে সকলে মেনে নেবে, তার আদেশ অনুসারে চলবে, এই প্রতিশ্রুতিও দিল। ফিলামেনার গণ্ড রক্তিমাভ হল। হাসিতে সারা মুখ উজ্জ্বল।

নতুন কুইনের কিছু বলা দরকার তাই ফিলােমেনা বললাে, প্যামপিনিয়া আমাদের সকলকেই ভালােবাসে কিন্তু আমার দিকেই বােধহয় ওর প্রথম চোখ পড়েছিল। তাই আমার মাথায় রানীর মুকুট পরিয়ে দিল। যাই হােক আমি প্যামপিনিয়ার পথেই চলব। সে যে নিয়ম চালু করেছে সেই সব নিয়মই। চলবে। তবে প্রয়ােজনবােধে কিছু নিয়ম অদলবদল হতে পারে কিংবা যদি কখনও কোনও কিছু একঘেয়ে লাগে তখন সকলের মত নিয়ে তার পরিবর্তন করা যেতে পারে। তবে আমার মনে হয় কিছুই বদলাবার দরকার হবে না, কারণ প্যামপিনিয়া যে রীতি-পদ্ধতি চালু করেছে তার পরিবর্তনের অবকাশ নেই।

ফিলােমেনা বলতে আরম্ভ করলাে, এখন তাে সবে বিকেল, একটু ঠাণ্ডাও হয়েছে, চলাে আমরা সকলে আশেপাশে কিছুক্ষণ বেড়িয়ে আসি। তারপর ফিরে এসে গােধূলির আলােয় বাগানেই যাওয়াদাওয়া করবাে। আর সন্ধ্যা হলে ঘরে ফিরে কিছুক্ষণ নাচগান করা হবে এবং তারপর? তারপর আর কি? যে যার ঘরে গিয়ে শয়ন।

কাল সকালে আমরা খুব ভােরে উঠবাে, যখন বেশ ঠাণ্ডা বাতাস বইবে। হাতমুখ ধুয়ে একটু বেরিয়ে আসবাে। ফিরে এসে ব্রেকফাস্ট। ব্রেকফাস্ট শেষ হলে উদ্যানে কিছুক্ষণ নৃত্য। নৃত্যের পর ক্লান্ত দেহ। শীতল করবার জন্যে স্নান ও তারপর ডিনার। ডিনারের পর অল্প কিছুক্ষণ নিদ্রা। নিদ্রার পর মুখচোখ ধুয়ে গল্পের আসর। গল্পের আসর সম্বন্ধে আমার একটি প্রস্তাব আছে। গল্পের বিষয়বস্তু সম্বন্ধে একটা নীতি স্থির করা হােক অর্থাৎ কাল ও পরে কি ধরনের গল্প বলা হবে। তাহলে সকলে আগে থেকে তার গল্পটা ভেবে রাখতে পারবে আর এজন্যে আমার মনে হয় দিনের পর দিন গল্পগুলাে একঘেয়ে লাগবে কারণ এক এক দিন ভিন্ন বিষয়ে গল্প বলা হবে।

আমি তাই প্রস্তাব করছি কাল যে গল্প বলা হবে তার বিষয় বা মূলসূত্র কি হবে। দীর্ঘদিন ধরে আমরা কত না কাহিনী শুনে আসছি তার মধ্যে এমন সব কাহিনী শুনেছি যে কত দরিদ্র ব্যক্তি সহসা প্রচুর রত্ন আবিষ্কার করলে অথবা কোনও নির্ধন ব্যক্তি পরিশ্রম করে প্রচুর ধনশালী হল। কাল আমরা এইরকম দশটি গল্প শুনতে চাই। কি, সকলে রাজি তাে?

যুবক ডায়ােনিয়াে বললাে, তােমার প্রস্তাব ভালাে কিন্তু আমি তাে ছাই আবার গুছিয়ে জমিয়ে কোনাে গল্প বলতে পারি না। সেটা হয়ে যায় নেহাতই জোলাে বা নীরস। তা ফিলােমেনা, তুমি যখন বলছো ঐরকম কোনও গল্প বলার চেষ্টা করব। হয়ত কিছু বিচ্যুতি ঘটতে পারে তবে আমাকে সকলের শেষে গল্প বলতে দিও। গল্পটা যদি উতরে যায় তােমাদের একটু অন্যরকম লাগবে, নতুন আস্বাদ পাবে, কি বলাে?

ডায়ােনিয়াে আমুদে ছােকরা। সে এমনভাবে তার আর্জি পেশ করলাে যে রাজি না হয়ে উপায় নেই। ফিলােমনা বললাে, তথাস্তু।

এরপর তারা সকলে মিলে বেড়াতে বেরলাে। কাছে একটা ঝর্ণা ছিল। ঝর্ণার জলে হাত পা ভিজালাে, জল ছোঁড়াছুঁড়ি করলাে। মাঠে নানারকম হলদে লাল বেগুনি ফুলের বন্যা। মেয়েরা কোমল পায়ে নরম ঘাস মাড়িয়ে বেড়াল, ছেলেরা বড় গাছ থেকে ফুল তুলে মেয়েদের উপহার দিল।

বাড়ি ফিরে এসে গােধূলি আলােয় উদ্যানে রাতের খাওয়া শেষ করে বাড়ির ভেতরে ঢুকলাে। কিছুক্ষণ বিশ্রাম।

লরেতা নাচতে ভালােবাসে। বাগানে কত সময় একা একাই নাচে। তাকে নাচতে বলা হলাে। সে যেন তৈরি হয়েই ছিল। সুন্দর নাচ, যেন কোনাে পরী নৃত্য করছে।

নাচ শেষ হলে গান। এমিলিয়া তার সুরেলা কণ্ঠে একটি প্রেমসঙ্গীত গাইল, সঙ্গে ডায়ােনিয়াে বাঁশি বাজাল। ক্ৰমে অনুষ্ঠান শেষ হল। সকলে যে যার ঘরে ফিরে গেল। এবার শয়ন ও নিদ্রা।

॥ ডেকামেরনের প্রথম দিন শেষ হল ॥

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *