পড়ার বইয়ের বাইরে পড়া – শ্রীপান্থ

›› বই এর অংশ / সংক্ষেপিত  

আল ওস্তাদ

“ওদের রীতির মধ্যে একটি হচ্ছে যে, ওরা শরীরের কোন কেশ ছেদন করে না। অত্যধিক গ্রীষ্মের জন্য ওরা এককালে উলঙ্গ থাকত, তখন কেশ দিয়ে সূর্যের তাপ থেকে মস্তক রক্ষা করত। গুল্ফের শােভা বর্ধনের জন্য ওরা তাতে তাও দেয়। জননেন্দ্রিয়ের লােম ওরা গরিষ্কার করে না; কারণ ওদের বিশ্বাস তা করলে যৌন উত্তেজনা ও সঙ্গমেচ্ছা প্রবল হয়। সুতরাং যারা সঙ্গমেচ্ছা প্রবলভাবে অনুভব করে তারা সে ইচ্ছা হ্রাস করার জন্য জননেন্দ্রিয়ের লােম কর্তন করে না। ওরা নখ বড় রাখে আর তার অব্যবহারে গর্ব বােধ করে। নখ দিয়ে ওরা কোন কাজ করে না। কেবল আলস্যভরে মস্তক কন্ডুয়ন করে, আর কেশের উকুন বাছে। ওরা প্রত্যেকে পৃথকভাবে গােয় লিপ্ত স্থানে বসে ভোজন করে; উচ্ছিষ্টের সদ্ব্যবহার করে না এবং ভােজন পাত্রগুলি মাটির হলে সেগুলিকে আহারের পর ফেলে দেয়। ভােজনের পর পান ও চুনের সাথে এক চর্বণ করে বলে ওদের দাত লাল। আহারের পূর্বে ওরা সুরা পান করে। হিন্দুরা গোমূত্র পান করে, কিন্তু গােমাংস খায় না। ওরা কাঠ দিয়ে করতাল বাজায়। পাগড়ীর বস্তুকে ওরা পাজামার মত ব্যবহার করে। যারা অল্প পরিচ্ছদে সস্তুষ্ট থাকে তারা দুই অঙ্গুলি পরিমাণ বস্ত্র দিয়ে শুধু তাদের লজ্জাস্থান আবৃত করে, আর যারা অধিক বস্ত্রের পক্ষপাতী তারা পাজামার (…) জন্য এত বস্ত্র ব্যবহার করে যে তা দিয়ে অনেকগুলি উত্তরীয় ও ঘােড়ার জিনের অন্তর্বাস তৈরি করা চলে। এ পাজামার কোন ছিদ্র (opening) থাকে না। এবং এগুলি এত দীর্ঘ যে পায়ের পাল দেখা যায় না। এর বন্ধনটি (ইজারল) পিছনে থাকে। উপরের জামাও পাজামার মত পিঠের দিকে কাপড়ের বুটির সঙ্গে সুতা দিয়ে আটকান থাকে। স্ত্রীলােকের জামার কুর্তক নীচের দিকে, দক্ষিণে ও বামে চেরা থাকে। পায়ের সঙ্গে আটসাট করে ওরা পাদুকা পরে এবং তার অগ্রভাগ উপরের দিকে ঈষৎ উল্টান থাকে। স্নান করার সময় ওরা প্রথমে পা ধােয়, পরে মুখ। স্ত্রী সহবাসের পূর্বে ওরা স্নান করে। দণ্ডায়মান অবস্থায় স্বাক্ষশাখার মত পরম্পরকে জড়াজড়ি করে ওরা সহবাস করে।…”

বাবরের আত্মজীবনীর কোনও খুজে পাওয়া নতুন পাতা কি? না কি একালের, একালেরই নতুন কোনও নর্দমা-পরিদর্শকের বিবরণী। স্বভাব-নিন্দুক কোনও পরদেশি, ওয়াকিয়ানবিশের ভারত-বৰ্ণনা বলেও সন্দেহ হতে পারে বইকী! কিন্তু যদি বলি এই বিবরণ শুরু করার আগে খুঁত-ধরা ওই দর্শক বন্ধু ভাবে বিস্তারিত ভুমিকাও রচনা করে নিয়েছিলেন, তা হলে হয়তাে থমকে দাড়াবেন অনেকেই। না দাড়িয়ে উপায় নেই। কারণ, পাঠকদের তিনি আগেই শুনিয়ে রেখেছিলেন তার বক্তব্য: একের চোখে যা অদ্ভুত ঠেকে অন্যের কাছে কিন্তু তা স্বাভাবিক। সুতরাং চমকিত হওয়ার কিছু নেই। কেননা, যা কদাচিৎ ঘটে, কিংবা যা দেখার সুযােগ অল্প দর্শকদের কাছে তাই অদ্ভুত। শুধু তাই নয়, এই প্রসঙ্গ শেষ করেছিলেন তিনি এমন কয়টি বাক্য দিয়ে নিন্দুক বা শত্রুর কাছ থেকে যা আশা করা যায় না। তিনি লিখছেন—এই সব বিকৃতির জন্য আমি অবশ্য হিন্দুদিগকে দোষ দিই না। আরবদেরও ওই রকম বহু কদাচার কুরীতি ছিল। তারা রজঃস্বলা ও গর্ভিণী স্ত্রীগমন করত, নিজ স্ত্রী বা কন্যার গর্ভে অন্যব্যক্তির বা অতিথির সন্তানকে তারা নিজ সন্তান বলে গ্রহণ করত। তাদের পূজা পদ্ধতিতে হাত ও মুখ দিয়ে শীষ দেওয়া, এবং নােংরা ও মৃত পশুর মাংস ভক্ষণ করার মতো কদর্যতার কথা না হয় বাদই দিলাম।…” সুতরাং, শেষ পর্যন্ত বুঝতে অসুবিধা হয় না, ভিন্ন পালকের পাখি বটে, তবু এ-চিড়িয়ার সুর অন্যরকম। কর্কশ তাে অবশ্যই নয়। কড়া হয়তো। তবে মিঠেকড়া।।
এখনও যারা অনুমান করতে পারেননি, তাঁদের অবগতির জন্য জানাই, এই ছত্রগুলাে আলবেরুণীর।

 

দেবদাসী

“আমাদের দেশের লােকদের ধারণা যে, বেশ্যাবৃত্তিকে হিন্দুরা অবৈধ মনে করে না। যেমন মুসলমানেরা কাবুল জয় করার পর সেখানকার ‘ইশ্পাহবাদ’ (…) ইসলাম গ্রহণ করে শর্ত করেছিল যে তাকে গােমাংস ভক্ষণ ও পুরুষ অভিগমন করতে যেন বাধ্য করা না হয়। হিন্দুদের সম্বন্ধে লােকদের এ ধারণা কিন্তু ভ্রান্ত। আসল ব্যাপার হচ্ছে যে, হিন্দুরা পরদারগমন বা যৌন ব্যভিচারের তেমন কঠিন শাস্তি দেয় না। প্রকৃ৩ দোষ কিন্তু হিন্দু জাতির নয়, তাদের রাজাদের। রাজাদের উৎসাহ না থাকলে ব্রাহ্মণ বা পুরােহিত কখনও কোনও নারীকে দেবালয়ে নৃত্য-গীত বা অভিনয় করার অনুমতি দিত না। কিন্তু রাজারা এইসব নারীকে তাদের নগরের আকর্ষণ হিসাবে প্রজাদের চিত্তবিনােদনের জন্য মন্দিরে স্থান দেয়। তাদের আসল উদ্দেশ’ অবশ্য রাজর্ষের অর্থ সংগ্রহ, এই সব বারাঙ্গণা পালন করে অর্থদণ্ড ও কর থেকে যা আয় হবে তা দিয়ে সৈন্যের ব্যয় নির্বাহ করা। বুয়ায়হিদ সুলতান আদুদওলা (Azuccluddoulah) ও তা-ই করেছিলেন তাঁর আর এক উদ্দেশ্যও ছিল: কামােন্মত্ত সৈন্যদের উৎপীড়ন থেকে গৃহস্থকে রক্ষা করা।”

 

নারীর স্তন: উত্থান ও পতন

“নারীর প্রাণের প্রেম মধুর কোমল,
বিকশিত যৌবনের বসন্তসমীরে
কুসুমিত হয়ে ওই ফুটিছে বাহিরে,
সৌরভুসুধায় করে পরান পাগল।
মরমের কোমলতা তরঙ্গ তরল।
উথলি উঠেছে যেন হৃদয়ের তীরে।
কী যেন বাঁশির ডাকে জগতের প্রেমে
বাহিরিয়া আসিতেছে সলাজ হৃদয়,
সহসা আলোতে এসে গেছে যেন থেমে-
শরমে মরিতে চায় অঞ্জল-আড়ালে।
প্রেমের সংগীত যেন বিকশিয়া রয়,
উঠিছে পড়িছে ধীরে হৃদয়ের তালে।
হেরাে গাে কমলাসন জননী লক্ষ্মীর-
হেরাে নারীহৃদয়ের পবিত্র মন্দির।..”

স্তন, কড়ি ও কোমল, রবীন্দ্রনাথ

রবীন্দ্রনাথ এই পবিত্ৰমন্দিরকে কবিতার্টিতে অন্য স্তরে উত্তীর্ণ করেছেন। মানবীর স্তনকে তিনি পবিত্ৰসুমেরু’, ‘দেবতাবিহারভূমি কনক-অচল’, ‘পবিত্র দুটি বিজন শিখর’ বলেই ক্ষান্ত হননি, বলেছেন এই স্তন ‘চিরস্নেহ-উৎসধারে অমৃত-নির্ঝরে/সিক্ত করি তুলিতেছে বিশ্বের আধর।’ শেষ দুটি ছত্রে তার স্তন-বন্দনা- ‘ধরণীর মাঝে থাকি স্বর্গ আছে। চুমি,/ দেবশিশু মানবের ওই জন্মভূমি।’ এই কবিতা অতএব শুধু বাসনাতাড়িত যৌবনের বন্দনা নয়, মাতৃত্বেরও জয়গান। কিন্তু আমাদের চার পাশে যে পৃথিবী, নিত্য আমরা সেখানে যে নারীকে দেখি তিনি কি এই কবিতার প্রতিমা? অবশ্যই নয়। তিনি লুব্ধ পুরুষের চোখে মূর্তিমান কামনা-বাসনা যেন! ভারতীয় পুরাণের রতির মতাে তিনি কামদীপিকা। তাঁর অন্য কোনও পরিচয় নেই, নিজের লজ্জাহীন দেহকে সর্বজনের সামনে তুলে ধরা ছাড়া অন্য কোনও ভূমিকা নেই। দিকে দিকে চলেছে তথাকথিত সৌন্দর্য প্রতিযােগিতা। অধুনা রূপের সঙ্গে নাকি বুদ্ধিও পরিমাপ করা হয়, কিন্তু লক্ষ করলেই বােঝা যায় এই রূপ অাসালে পরিমাপ করা হয় ফিতে দিয়ে, ইঞ্চি বা সেন্টিমিটারে। চলচ্চিত্রের নায়িকা, বিজ্ঞাপনের মডেল, আদর্শ নারীশরীর নির্মাণের জন্য বিভিন্ন জিমনাসিয়াম, বিউটি পার্লার থেকে শুরু করে অন্তর্বাস, প্রসাধনী, শল্যশাস্ত্র— নারীদেহ আজ সর্বত্র এক পর্ণবিশেষ। আর এই নব্য সৌন্দর্যতত্বে নারীর স্তন যেন এক যৌন-অলংকার, নারীত্বের সংজ্ঞায় এবং বিবৃতিতে শ্রেষ্ঠ ভূষণ। সূতরাং, সর্বত্র তার প্রকাশ এবং সমাদর।

দেখে দেখে মনে প্রশ্ন জাগে- নারীর স্তন কি এই বৈশ্যযুগে এখনও তার শরীরের অপরিহার্য অংশ, তাঁর নিজস্ব অঙ্গ। নারীর স্তন কি শিশুর নাকি কামকাতর পুরুষের সম্পত্তি? তা না হলে নারীর স্তন নিয়ে কেন এই নির্লজ্জ পুরুষালি খেলা? এমন অনেক পণ্যের বিজ্ঞাপনেই রূপসী নারীর ছবি দেখা যায় যার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরােক্ষভাবে নারীর কোনও সম্পর্ক নেই। আর সেই সব বিজ্ঞাপনে রূপবত’র উওমাঙ্গ প্রায় সর্বক্ষেত্রেই বিজ্ঞাপিত। স্তন কি তবে শিল্পী বা ভাস্করের ইচ্ছাধীন? কিংবা ফ্যাশন-বিধাতাদের? প্রশ্ন জাগে তবে কি স্তন নিয়ে কী করা হবে সেটা ধার্য করার অধিকার নীতিবাগীশ, ধর্মবেত্তা আর মোল্লা-পুরােহিতদের? অন্য নৈতিক প্রহরীর দলও রয়েছেন আসরে। তারা প্রয়ােজনে অশ্লীলতার কথা তুলে নারীর স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করেন। রয়েছেন শল্য চিকিৎসকদের দল, যারা পুরুষের নির্ধারিত নকশা-মাফিক নারীর স্তন পুননির্মাণ করেন, রয়েছেন পর্নোগ্রাফাররাও যাদের অন্যতম পশরা নারীর এই অঙ্গ। নানাভাবে তা তারা পরিবেশন করেন বইয়ে এবং পত্র-পত্রিকায়। বস্তুত আজকের দুনিয়ায় এই একবিংশ শতকে সংস্কৃত কবি যাকে বলেছেন হেমকুম্ভ, ধনতন্ত্রের এই সুবর্ণযুগে ঘটসদৃশ সেই নারীস্তন বােধহয় সর্বার্থেই পিতৃতন্ত্রের শাসন এবং অন্তহীন লালসার এক অনন্য নিদর্শন।

স্বভাবতই নারী-স্তন নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ বই প্রকাশিত হয়েছে শুনে প্রথমে দ্বিধাগ্রস্ত হয়েছিলাম। হয়তাে ইতিহাসের নামে আবার হাটে ছাড়া হচ্ছে এমন এক পশরা যা এ যুগের ওই বিশেষ পণ্য আরও বেশি খদ্দেরকে প্রলুব্ধ করবে অসহায় নারীকে উদ্দাম যৌনতার সঙ্গী করতে, তাকে, তার নিজস্ব শরীরকে আরও অপমানে জর্জরিত করতে। তবু কৌতূহল দমন করতে পারিনি, লেখকের নামটি জানার পর। মনে পড়ল এই ভদ্রমহিলা আমার পরিচিত। পরিচিত মানে মারিলিন ইয়ালুম-এর লেখা একটি বই আমি পড়েছি। তার বিষয় ছিল ফরাসি বিপ্লবে নারী। বইটির নাম ‘ব্লাড সিস্টারস’/‘দ্য ফ্রেঞ্চ রেভলিউশন ইন উইমেনস মেমরি’। ভদ্রমহিলা যদিও বিপ্লব সম্পর্কে উৎসাহী নন, কিন্তু বিপ্লবের সময়ে ফরাসি মেয়েরা যে অভিজ্ঞতার কথা তাদের জার্নালে, ডায়েরিতে, চিঠিপত্রে রেখে গেছে নিষ্ঠা এবং সহানুভূতির সঙ্গে তা ভাষান্তরিত করে পরিবেশন করেছিলেন। মনে পড়ে তার জন্য ফরাসি সরকার তাঁকে বিশেষভাবে সম্মানিতও করেছিলেন। আমেরিকার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ’-এ ‘সিনিয়ার ফেলাে’ নিশ্চয়ই ইতিহাসের নামে নারীর উন্মুক্ত উত্তমাঙ্গের কোনও প্রদর্শনী সাজাননি এই গবেষক। সুতরাং, শেষ পর্যন্ত সাগ্রহে সংগ্রহ করতে হয় বইটিকে। প্রায় সাড়ে তিনশাে পৃষ্ঠার এই বিশাল ও অসংখ্য দুষ্প্রাপ্য ছবিতে বােঝাই বইটি আদ্যোপান্ত পড়ার পর নিঃসংকোচে স্বীকার করব, কদাচিৎ এমন একটি বই পড়ার সুযােগ পাওয়া যায়। আফসােস একটাই, বইটি পশ্চিমি দুনিয়ার চৌহদ্দিতেই যুগযুগান্তর ধরে পরিক্রমা করেছে। আমাদের পূর্ব পৃথিবী সেখানে বলতে গেলে পুরােপুরি অস্তিত্বহীন, উহ্য। অথচ ভারতের ভাস্কর্য, চিত্রকলা, প্রাচীন ও মধ্যযুগের সাহিত্য, সর্বত্র নারীর স্তন কতভাবেই না বর্ণিত ও বন্দিত। মেঘদূত’-এ কালিদাসের নায়িকা বর্ণনার কথা মনে পড়ে,- ‘শ্রোণীভারাদলসগনা স্তোকনম্রা, স্তনভ্যাং/যা তএ স্যঃসযুবতি বিষয়ে দৃষ্টিরাদ্যেৰ ধাতুঃ।’ কুমারসম্ভব-এ আবার দেখি একই ভঙ্গিতে পার্বতীর রূপের বর্ণনা- ‘অন্যোন্য মুৎপীড়য় দুপেলাক্ষ্যঃ স্তনদ্বয়ং পাণ্ডু তথা বৃদ্ধম। মধ্যে যথা শ্যামমুখ্য তস্য/ মঙ্গলসূত্রাপ্তপলাভাম।’ অর্থাৎ, শৈলসুতার পাণ্ডুবর্ণ স্তনদ্বয় উপমদর্ন করে সেইভাবে প্রবৃদ্ধ হয়েছিল যে, তার মধ্যে মৃণালজাত সুক্ষ্মসুত্রও স্থান পেত না। সেই ঐতিহ্যর ধারাবাহিকতা পরবর্তী লেখক কবিদের কল্পনাও। মাইকেলের তিলােত্তমার উক্তমাঙ্গর বর্ণনা— ‘দাড়িম্ব কলম্বে হৈল বিষম বিবাদ,উভয়ে চাহিল আসি বাস করিবারে উরস-আনন্দ-বনে; সে বিবাদ দেখি/দেবশিল্পী গড়িলেন মেরু শৃঙ্গাকার। কুচযোগ। ‘… ‘উর্বশী’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ ‘তব স্তনহার হতে নভস্তলে খসি পড়ে তারা,অকস্মাৎ পুরুষের বক্ষমাঝে চিত্ত আত্মহারা;/ নাচে রক্তধারা।’ দৃষ্টান্ত আর বাড়ানাের প্রয়োজন নেই’ ভারতীয় সাহিত্য-শিল্পে অসংখ্য দৃষ্টান্ত এবং দৃষ্টিভঙ্গির বিভিন্নতার কথা ভাবলে মনে হয় না কি এমন একটি পূর্ণাঙ্গ ইতিবৃত্তে প্রাচ্য, বিশেষ করে ভারতের অনুপস্থিতি একধরনের বঞ্চনা?

তবু যা পাওয়া গেল সে অবশ্যই সামান্য প্রাপ্তি নয়। নারীর স্তনের পঁচিশ হাজার বছরের ইতিহাস, স্বভাবতই কাহিনী শুরু হচ্ছে প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে। প্রাচীন পৃথিবীতে নারী সামান্য মানবী নন, দেবী। বৃক্ষের মতােই তিনি প্রাকৃতিক এক অস্তিত্ব। তিনি রহস্যময়। তিনি সৃষ্টির আদি, মানবের ধাত্রী। তার বুকে জীবনদায়ী অমৃতধারার উৎস। স্বভাবতই তার স্তন পবিত্র এবং পূজ্য। নারী এক দিকে যেমন উর্বরতার প্রতীক, অন্য দিকে তেমনই মানবের ধাত্রী। সুতরাং প্রাচীন পৃথিবীর দেবীদের স্তন সম্ভ্রম ও শ্রদ্ধার উপলক্ষ। কৃষিকর্ম শুরু হওয়ার আগে ইউরােপের নানা অঞ্চলে আগে যে নারী-প্রতিমার সন্ধান মিলেছে, তাদের স্তন শুধু অনাবৃত নয়, আজকের দর্শকের চোখে হয়তোবা ভীতিপ্রদ। ওঁরা কোনও পুরুষ দেবতার স্ত্রী বা সহচরী নন, এঁরা নিজেরাই ঈশ্বরী। তাদের স্তন শক্তির প্রতীক। ফলে ফ্রান্সের পর্বতগুহার দেওয়ালে স্তন বন্দিত। দশ হাজার বছর পরে তুরস্কে দেখা যায় মৃন্ময়ী স্তন সশ্রদ্ধায় পূঞ্জিত। লৌহযুগে পবিত্র পানপাত্র গড়া হয়েছে স্তনের আদলে। (একালে অবশ্য হলিউডে এই বস্তু কখনও কখনও দেখা যায় যৌনতার প্রতীক হিসাবে, পুরুষের কামনার বার্তাবহ তৈজস হিসাবে।) শুধু দেবতা আইসিস নয়, প্রাচীন মিশরে নীলনদের দেবতা হাপিও নারীর মতো স্তনধর। আদিম পৃথিবীর অন্যত্রও স্তন নিয়ে কোনও লজ্জা বা সংস্কার নেই, স্তন দেবীর অন্তর্নিহিত শক্তি এবং অতুলনীয় ঐশ্বর্যের প্রকাশ। অতএব, খ্রিস্টপূর্ব ১৫.১৬ শতকে ক্রিটে যদিও এক ধরনের স্কার্ট ও স্তনাংশুক ছিল তবু দেবীমুর্তির উধ্বাঙ্গ অনাবৃত। প্রাচীন গ্রিসেও দেখা যায় আর্টেমিস বহুস্তনে অলংকৃত। সুতরাং, নমস্য।

পরিস্থিতিতে পরিবর্তন ঘটে নারীকে স্থানচ্যুত করে বেদিতে পুরুষ দেবতাদের অধিষ্ঠানের পর। নারীর এই ভাগপরিবর্তনের, পর্বটিকে লেখক বলেছেন—’রেইন অব দ্য ফ্যালস।’ অর্থাৎ, প্রকৃতির বদলে পুরুষের যৌনাঙ্গের রাজত্ব। মাউন্ট অলিম্পাসে প্রাচীন দেবী ওলিম্পিয়ার বদলে প্রতিষ্ঠিত হলেন জিউস। অতঃপর তিনিই দেবলােকে সর্বেসর্বা। তার স্ত্রী বা সঙ্গিনী হেরা যেন নর্মসহচরী মাত্র, একটি ভাস্কর্যে দেখা যায় তিনি হেরার স্তন ধরে আছেন। স্পষ্টতই স্তনমাহাত্ম্য বিলুপ্তির পথে। নারীর হাতে বর্শা, মাথায় শিরস্ত্রাণ, বুক আবৃত অলংকিত কঠিন বর্মে। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতক থেকে প্রেমের দেবী আফরােড়াইট বা ভেনাস নগ্নিকা মাত্র। তিনি যেন দেহসর্বস্ব। ধ্রুপদী সাহিত্যের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিল্পী তাকে গড়েছেন। তার বুক ‘আপেলের মতাে। ভেনাস যেন ক্রমে পরিণত একালে পশ্চিমে যাকে বলা হয় ‘পিনআপ’। কামদীপিকা ক্যালেন্ডার-সুন্দরী! খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে একটি ভেনাস প্রতিমূর্তিকে বলা হয় লজ্জাশীল ভেনাস’, তিনি এক হাতে তার একটি সুপুষ্ট স্তন ধরে আছেন, অন্য হাতে ঢেকে রেখেছেন তাঁর যৌনাঙ্গ। এথেন্স-এর নারী খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকের মধ্যেই পুরুষের বশ্যতা মেনে নিতে বাধ্য হন। তাদের শরীর আবৃত, মুখ ও মাথায় ঘােমটা বা চাদর। আর, তাদের স্তন পুরুষের কামনার উপলক্ষ। ট্রয়ের যুদ্ধের পর হেলেন যখন ঘরে ফেরেন তখন তিনি নাকি স্বামী মেনেলাউস এর মুখোমুখি হওয়া মাত্র তার ‘আপেলতুল্য স্তন’ সামনে মেলে ধরেছিলেন। ক্রুদ্ধ স্বামীর হাতের তলোয়ার খসে পড়েছিল মাটিতে। এই দৃশ্যের পর স্ত্রীকে হত্যা করতে পারেননি তিনি ক্ষমা করেছিলেন। নারীর স্তনের আরাধনা, সন্দেহ কী, অন্য মোড় নিয়েছে!

স্তনের প্রাচীন জাদুকরি মাহাত্ম্যর রেশ তবু যেন থেকেই যায়। দেবরাজ জিউসের এক পুত্র ছিল। সে কোনও দেবী নয়, মর্তে মানবীর সন্তান। এই শিশু একদিন ঘুমন্ত দেবরাজপত্নী হেরার স্তন্য পান করছিল। হেরা হঠাৎ জেগে উঠে সরোষে তাকে বুক থেকে সরিয়ে দেন। তার বুকের এবং শিশুর মুখের দুধ ছড়িয়ে পড়ে আকাশে, সেই বিন্দু বিন্দু পীযূষেই রচিত হয় মিল্কি ওয়ে’— তারাপথ!

প্রসঙ্গত, আমাজনদের কথাও উল্লেখযােগ্য। তারা বাস্তবে ছিলেন কি না প্রমাণ করা দুঃসাধ্য। খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম শতকে তাদের অস্তিত্বের কথা শােনা যায়। সন্তান (কন্যা সন্তান) লালনের জন্য তারা একটি স্তন রক্ষা করতেন, অন্যটি বাদ দিতেন পুরুষের সঙ্গে লড়াইয়ে স্বচ্ছন্দে ধনুর্বাণ ব্যবহারের জন্য। একজন আধুনিক গবেষক আটশো তথ্যসুত্র যাচাই করে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন– নারী-পুরুষের প্রাধানাের জন্য যে লড়াই ওঁরা তারই প্রতীক। ‘আর্কেটাইপ অব দা ব্যাটল অব সেক্সেস’। উল্লেখ্য, আমাজনদের হত্যা করা হত ‘বুকে আঘাত হেনে। খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম শতকে ধর্মবেত্তা ইজাকিয়েল পুরুষালি বিক্রমের জীবন্ত বিগ্রহ যেন তার চোখে জেরুজালেম আর সামারিয়া এই দুই নগরী লাস্যময়ী নারীর দুই স্তন। মিশরের উপভােগ্য বারবনিতা তারা! অথচ ইহুদিদের কাছেও আদিতে নারীর স্তন ছিল কিন্তু পবিত্র, তারা এমনকী দেবগণেরও ধাত্রী’।

রােমেও দেখি প্রাচীন ধারণার প্রতিধ্বনি। অন্য ধরনের স্তনমাহাত্ম্য। খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতকের কাহিনী। নিজের গর্ভধারিণী কারারুদ্ধ। তাঁর কাছে বাইরে থেকে খাদ্যদ্রব্য নিয়ে যাওয়া নিষিদ্ধ। প্রহরীরা প্রত্যেক দর্শনার্থীকে পরীক্ষা করে দেখতেন। কন্যাকেও স্বভাবতই বাদ দেওয়া হয়নি। মাকে দেখে কন্যা বিচলিত। খাদ্যাভাবে তিনি রুগণ। মায়ের ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্য কন্য তাকে স্তন্যদান করেন। সে-কাহিনী শেষ পর্যন্ত গােপন রইল না। এই অভুতপুর্ব কাণ্ড দেখে কর্তৃপক্ষ মারে মুক্তি দিলেন। শুধু তাই নয়, মা এবং মেয়ের সারা জীবনের দায়িত্ব গ্রহণ করে রাষ্ট্র। এই ‘রােমান দানশীলতা’ থেকেই, “ক্রিশ্চিয়ান চ্যারিটি’ বা খ্রিস্টানদের দানের মাহাত্ম্যের ধারণার জন্ম। এই কন্যার স্মরণে নাকি এক মন্দিরও গড়া হয়। পরবর্তীকালে অবশ্য মায়ের বদলে কারাগারে বসানাে হয়েছে বাবাকে। স্পষ্টতই পবিত্র ঘটনাটিকে অন্য, বিকৃত রূপ দেওয়ার বাসনায়। শুধু যৌনতা নয়, অতঃপর তার সঙ্গে যুক্ত করা হয় অজাচারের কলঙ্ক।

বাইবেলে দেখা মেলে দু’জন মেরির। একজন মেরিমাতা বা কুমারী মেরি, অনা জন মেরি ম্যাগডালেন। প্রথম জন পবিত্রতার প্রতিমূর্তি। তিনি পুরুষের সাহচর্য ছাড়াই সন্তানের জননী। স্বয়ং ঈশ্বরপুত্র তার সন্তান। অথচ তার দেহ কলুষিত নয়। খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতকে অতএব ‘নিউ টেস্টামেন্ট’-এর আহ্বান রক্তমাংসের দেহকে জয় করে। অন্য মেরির পক্ষে সে-ধরনের মাহাত্ম্য দাবি করা সম্ভব নয়। খ্রিস্টান সাধক-সাধিকাদের কাছে আদর্শ কুমারী মা মেরি। তারা দেহের দাবিকে দমন করতে বদ্ধপরিকর। সুতরাং প্রথম দিকের খ্রিস্টীয় ছবিতে দেখা যায় নারীর উত্তমাঙ্গ পুরুষের মতো। লেখক বলেছেন স্তনের প্রাচীন পবিত্রতা আর নেই, খ্রিস্টীয় চিত্রকলায় স্তনহীনতাই পবিত্রতার অভ্রান্ত লক্ষণ। একমাত্র পাপী মেয়েরাই স্তন প্রকাশ করেন। তার জন্য নরকে কী শাস্তি জুটত অনেক ছবিতে তা দেখানাে হয়েছে। (এ-ধরনের ছবি ছাপাখানার যুগে আমাদের দেশেও প্রচারিত হয়েছে।) দৈহিক কামনা-বাসনা ঘৃণ্য পাপ— আর তার অন্যতম নিবাস স্তন। সুতরাং পাপী মেয়ে বাধ্য হচ্ছে শলাকাসহযােগে নিজের স্তন ছিন্নভিন্ন করতে। অন্যদিকে শহিদ খ্রিস্টান সাধিকারা যখন অত্যাচারিত হয়েছেন, তখন ও মধাযুগের খ্রীস্টীয় চিত্রকলায় দেখানাে হয়েছে নৃশংসভাবে তাঁদের স্তন কেটে ফেলা হচ্ছে। এইসব সহিদ ক্যাথলিক ধর্মালম্বী মেয়েদের পূজ্য। তারা মায়ের পুষ্ট স্তনের জন্য আশীর্বাদ করেন। খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতক থেকে সপ্তদশ শতক পর্যন্ত বেশকিছু অত্যাচারিত শহিদ সন্ন্যাসিনী এভাবে সম্মানিত হয়েছেন। এইসব ছবি দেখে ফরাসি কবি পল ভ্যলেরি লিখেছিলেন—‘প্লেজার অব টর্চার’। অত্যাচারী ও অত্যাচারিতের আনন্দের অনুভূতি। লেখক মন্তব্য করেছেন এইসব ছবিতে শিল্পীরা নারীর স্তনকে পরিণত করেছেন নিজেদের ধর্যকাম প্রবৃত্তিতে!

দর্শক পুরুষের কাছে নারীস্তনের আবেদন অন্যভাবে স্বপ্রকাশ। সে আর-এক হেলেনের উপাখ্যান। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে গ্রিসে ফাইরিন নামে এক সুন্দরী গণিকা ছিলেন। তার প্রেমিকেরা তার বিরুদ্ধে দেব-নিন্দার অভিযােগ আনেন। রীতি অনুযায়ী মেয়েটি নিজের পক্ষে সওয়াল করার জন্য হাইপেরাইডস নামে এক বাগী বা উকিলকে নিয়োগ করেন। ফাইরিন যখন দেখলেন তার উকিল ঠিকমতাে যুক্তিতর্ক করতে পারছেন না, তখন তিনি তার উর্ধাঙ্গের আবরণ খুলে নিজেকে প্রকাশ করেন। বিচারকরা যুগপৎ স্তম্ভিত ও অভিভূত। তারা এই সুন্দরীকে বেকসুর মুক্তি দিয়ে দিলেন। তখন দেশে নতুন আইন তৈরি করা হয়, কোনও অভিযুক্ত, তিনি পুরুষ বা নারী যা-ই হন-না-কেন, আদালতে তাদের গােপন অঙ্গ প্রকাশ করতে পারবেন না।

এবার মা মেরির দিকে তাকানাে যাক। খ্রিস্টীয় ধর্মশাস্ত্র অনুসারে মানুষের আদি জননী ইভ। আবার তিনিই দায়ী মানুষের পতনের জন্য। কামনার তিনি আদি উৎস। যে নিষিদ্ধ ফলটি তিনি আদমের হাতে তুলে দিয়েছিলেন সেটি আসলে আপেল। আর ‘আপেলের সঙ্গে স্তনের সাদৃশ্য তাে স্বপ্রকাশ। সুতরাং, মেরির ক্ষেত্রে স্তন বন্দিত হলেও ‘ইভের বেলায় তা নিন্দিত, পাপ ও পতনের নিমিত্ত । সুতরাং, খ্রিস্টানি শিল্পে প্রথম দিকে মা মেরির স্তন ছিল অপ্রকাশ। মধ্যযুগে আঁকা সাফক-এর এক গির্জার দেওয়ালে যে মেরি-মূর্তি দেখা যায় তার উওমাঙ্গে আঁটোসাঁটো বডিস বা জামা। অন্যত্র দেখা যায় মেরিমাতার স্তন বিমুর্ত— চৌকো। কিন্তু ধীরে ধীরে দৃষ্টিভঙ্গি পালটাতে শুরু করে। খ্রিস্টীয় চতুর্দশ শতকে টাকানিতে আঁকা একটা ছবিতে দেখা যায় মা মেরি শিশু যিশুকে স্তন্যদান করছেন। হয়তাে শত শত বছর আগেও কোথাও-না-কোথাও আঁকা হয়েছে স্তন্যদায়িনী মেরির প্রতিমা, কিন্তু রেনেসাঁসের ইউরােপে তার চর্চা এমন বেড়ে যায় যে, ঐতিহাসিক তার পিছনে কার্য-করণ সম্পর্ক নির্ণয়ের চেষ্টা না করে পারেন না। এতকাল মেরি ছিলেন বাইজেনটাই সম্রাজ্ঞীর মতাে। তার মুখমণ্ডলে স্বর্ণের আভা, আলােয় উদ্ভাসিত পট। তাকে ঘিরে স্বর্গের সাধক আর দেবদুতদের নম্র আনন্দ আবির্ভাব। সেই স্বর্গীয় রমণী প্রতিমা কেন শেষ পর্যন্ত মর্ত্যের নারীর ভূমিকায়— প্রশ্ন সেটাই।

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে গবেষক দুটি প্রাসঙ্গিক তথ্য স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। প্রথমত, সেই মধ্যযুগেই ইউরােপে ছিলেন মায়ের মতো ধাই-মা বা তথাকথিত ‘ওয়েট নার্স ‘রা! গরিব মায়েরা হয়তো নিজেদের সন্তান লালন করেন গােরুর দুধে। আর তাদের বুকের দুধে লালিত হয় সম্পন্নের সন্তান। কারণ ততদিনে মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত এবং অভিজাতদের কাছে নারীর স্তন অন্য মর্যাদা লাভ করেছে, এই অঙ্গ যৌবন ও যৌনতার অভিজ্ঞান। দ্বাদশ শতকের ফ্রান্সে নারীর সৌন্দর্য বিলাসীদের মুখে অতএব অহরহ আপেলের উপমা। তা ছাড়া আমাদের সংস্কৃত বা বৈষ্ণসাহিত্যের মতাে নানা উপমার ছড়াছড়ি। দ্বিতীয়ত, মধ্যযুগের অপরাহ্ণেই পরিবর্তি হতে থাকে নারী ও পুরুষের পােশাক। আগে বলতে গেলে দুই তরফেরই পােশ ছিল পায়ের গােড়ালি পর্যন্ত লম্বা একটা টিউনিক বা আলখাল্লা। কিন্তু চতুর্দশ শতকের প্রথম দিকে দেখা যায় পুরুষের পােশাক খাটো হয়ে উঠে এসেছে হাঁটু বরাবর, আর মেয়েদের পােশাক উর্ধাঙ্গে শুধু যে নেমে এসেছে তাই নয়, ফুটিয়ে তুলছে দেহের গড়ন; যাজক, পুরােহিত এবং নীতিবাগীশরা যথারীতি নিন্দাবাদে মুখর হয়েছিলেন, কিন্তু কালের হাওয়ায় সে-সব সুভাষিতালি ভেসে যায়। এল নারীদেহ উন্মােচনের যুগ। শুরু চতুর্দশ শতকে, কিন্তু পরবর্তী চারশাে বছর ধরে ইতালিয়ান, ফরাসি, জার্মান, ডাচ ছবিতে ম্যাডোনার স্তন উন্মুক্ত। তার খােলা স্তনে শিশু যিশুর মুখ। কখনও শিশু নিরুত্তাপ, স্তনের সৌন্দর্য প্রদর্শনই মুখ্য। ছবিতে প্রতিফলিত কমলালেবু, আপেল, ডালিমের প্রতিরূপ। সাধারণ ইতালিয়ান কি এই মাতৃমূর্তি দেখে আহত, আতঙ্কে শিহরিত, না আবেগ উত্তেজনায় কম্পমান? ইনি কি স্বর্গীয় জননী, না চিরচেনা ধাই-মা? ১৩০০ সাল থেকে উচ্চকোটির মেয়েদের, মায়েদের স্তন যেন সংরক্ষিত পুরুষের আদর ও আমােদের জন্য। শিশুরা ধাই-মা নির্ভর। বলতে গেলে অনেক গরিবঘরের মায়েদের রােজগারের উপায় আপন স্তনের পীযুষ। যাজকেরা আধ্যাত্মিকতাকে প্রচার করতেন মনের পুষ্টি বলে। তবু সত্যকারের পুষ্টির জন্য মায়ের বুকের দুধের বিকল্প কোথায়? ভক্ত খ্রিস্টানদের কাছে খ্রিস্টের রক্ত যেমন পবিত্র তেমনই পবিত্র মাতৃদুগ্ধ। মধ্যযুগে অনেক গির্জায় সযত্নে সঞ্চিত থাকত মা মেরির বুকের দুধ! ভক্ত সেখান থেকে শ্রদ্ধাভরে হিন্দুর কাছে পবিত্র চরণামতের মতে দু’-চার ফোটা সংগ্রহ করে নিজেদের স্তনের দুধ বাড়াবার চেষ্টা করতেন। ষােড়শ শতকে এক প্রােটেস্ট্যান্ট যাজক প্রশ্ন তুলেছিলেন— কুমারী মাতা গাভীর মতাে এমন দুধ সরবরাহ করে চলেছেন কেমন করে? তিনি সারা জীবন ধরে পৃথিবীকে লালন করে থাকলেও আমাদের কাল পর্যন্ত সে-দুধের ভাণ্ডার গড়ে তােলা কি সম্ভব? কেমন করেই বা এতকাল ধরে সম্ভব হল তার সংরক্ষণ? এই বুজরুকি তবু চলেছিল অনেক কাল ধরে। সেইসঙ্গে চলেছিল আরও একটি অনুষ্ঠান। স্তন্যদায়িনী মেরিমূর্তির প্রতিমা এবং নানা ‘স্মারক’ ঘিরে পুজো ও প্রার্থনা। বুঝতে অসুবিধা নেই, উচ্চবর্গের স্তনের মতােই সাধারণ নারীর স্তন তৎকালে অতিশয় গুরুত্বপুর্ণ বলে বিবেচিত। প্রথম দলের কাছে স্তন যদি নারীর অঙ্গভূষণ, দ্বিতীয় দলের কাছে তবে তা রুজিরােজগারের উপকরণ। সেদিনের গরিব স্তন্যদায়িনীর একটি গান ইংরেজিতে তর্জমা করলে তার বক্তব্য: ‘উইথ লটস অব গুড ফাইন মিঙ্ক আওয়ার ব্রেস্টস আর ফুল।} টু অ্যাভয়েড অল সাসপিশান, লেট দ্য ডক্টরস সি ইট’ ইত্যাদি। এইসব স্তন্যদায়িনীর সঙ্গে নব্য মেরি, স্তন্যদায়িনী নগ্নিকা’ মেরির কি সম্পর্ক নেই? রেনেসাঁসের প্রথম একশাে বছর ধরে ফ্লোরেন্সের শিল্পীদের আঁকা ‘অসংখ্য মা-মেরির প্রতিমা দেখে গবেষকরা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন, তৎকালের চিত্রকর এবং ভাস্করেরা অধিকাংশই ছিলেন মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান। তারা মাতৃস্তন্য থেকে বঞ্চিত, লালিত ‘ওয়েট-নার্স বা ধাই-মাদের বুকের দুধে। এই স্তন্যদায়িনী মেরি তাদের স্বপ্নের ‘জননী, যাদের পরিপূর্ণ পীযুষভাণ্ড থেকে তাঁরা তাঁদের প্রাপ্য পাননি। এই মা তাদের পূর্ণ আকাঙ্খার প্রতিকৃতি, তাদের ‘ড্রিম মম’! তা ছাড়া চতুর্দশ শতকের ইটালির পরিবেশ-পরিস্থিতিও প্রভাবিত করেছে শিল্পীদের। ক্ষুধা, অপুষ্টি, মহামারির মধ্যে এই স্তনে আশ্বাস খুঁজেছিলেন হয়তাে সে-দিনের অসহায় মানুষ। তার ওপর নবাকালের নারীর নব-আঁটোসাঁটো পােশাক, জাগতিক অভিজ্ঞতা, শিল্পে বাস্তবতার উদবােধন সব মিলিয়েই এই নব মাতৃমূর্তি। মেরির এই রূপান্তরের তথানির্ভর বিস্তারিত আলোচনার পর লেখকের সিদ্ধান্ত— এই মেরি জন্মান্তরে প্রাগৈতিহাকি সেই মাতৃস্বরূপিণী দেবীরই নবা অবতার। পার্থক্য শুধু এই, তিনি স্তন্যদান করেন শুধু আপন সন্তান যিশুকে। সেই সন্তান শুধু যে পুরুষ তা-ই নয়, মায়ের চেয়েও শক্তিধর। খ্রিস্ট না থাকলে মেরি হতেন অপরিচিত এক রমণী। তার প্রতিষ্ঠা অতএব সম্পূর্ণ পুরুষনির্ভর।

সেই শুরু। ক্রমে স্তন্যদায়িনী জননী মেরি দেখতে দেখতে পরিণত হলেন স্তনগৌরবে গরবিনী সামান্য রমণীতে। এই উন্মােচনের উদ্যোক্তা রাজা, আমির-ওমরাহ ও অভিজাতবর্গ। ইতালিতে যখন মাতৃপ্রতিমা ম্যাডোনার ছড়াছড়ি, তার মােটামুটি একশাে বছর পরে ক্যানভাস আলাে করে আত্মপ্রকাশ, তথা আবরণহীন উত্তমাঙ্গ প্রকাশ করে আবির্ভূত হলেন অন্য ম্যাডোনা। তাঁর সামনে একটি শিশু আছে বটে, কিন্তু মাতৃদুগ্ধের জন্য তার কোনও ব্যাকুলতা নেই। নিঃস্পৃহ সেই শিশু স্বতন্ত্র একটি টুলে বসে আছে। নকল ম্যাডোনার একটি বুক সম্পূর্ণ অনাবৃত। ছবিটি আসলে ফ্রান্সের রাজা সপ্তম চার্লসের রক্ষিতার। এ-প্রতিকৃতি পনেরাে শতকের দ্বিতীয়ার্ধে আঁকা। লেখকের মন্তব্য পবিত্র স্তন পুননির্মাণ করছে সমাজ, নিউ সােশ্যাল কনস্ট্রাকশান অব দ্য ব্রেস্ট’। স্তনে তখন শিশুর অধিকার নেই, গির্জার খবরদারি থেকে মুক্ত নারীর উত্তমঙ্গ, নারীর স্তনের উপর প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে পুরুষের, বিশেষ করে ক্ষমতাবান পুরুষের আধিপত্য। নারীর এই অঙ্গ তাদের কাছে বিশেষভাবে কামােদ্দীপক। উল্লেখ করা প্রয়ােজন, মেয়েদের নতুন পােশাক, বুক-পিঠের অনেকখানি যাতে উন্মোচিত তা-ও দরকারি অবদান। রাজা সপ্তম চার্লসের মা নিজেই নাকি চালু করেছিলেন সেই ব্লাউজ। গির্জা অবশ্য আপত্তি তুলেছিল। যাজকরা এই অঙ্গাভরণকে আখ্যা দিয়েছিলেন- নরকের প্রবেশদ্বার ‘দ্য গেটস অব হেল’। আঁটোসাটো করসেট-এর ব্যবহারের বিরুদ্ধেও আপত্তি তুলেছিলেন তারা। তার ব্যবহারের ফলে যেভাবে বুক ঠেলে ফাঁপিয়ে তােলা হয় এবং বুককে দর্শনীয় করা হয় তাকে তারা বলেছেন- পাপের প্রেরণাস্বরূপ। যেন মেছুনি বাজারে তার পশরা ফিরি করতে বের হয়েছেন!

ফ্রান্সের রাজা সপ্তম চার্লসের সমসাময়িক ইংল্যান্ডের রাজা সপ্তম হেনরি তার দরবারে মেয়েদের এই পােশাক পরা নিষিদ্ধ করেছিলেন। তাকে সমর্থন করেছিলেন দেশের নীতিবাগীশরাও। বস্তুত নারী ও পুরুষের পােশাক নিয়ন্ত্রণের জনা আইনও চালু করা হয়েছিল। তবু ইউরােপের নব্য-ফ্যাশনের ঢেউ আটকানো যায়নি।

ইউরােপের নানা দেশে চিত্রকলার মতাে সাহিত্যেও শুরু হয় নারীর উন্মােচিত স্তনের বন্দনা। মধ্যযুগের অন্তকাল থেকে রেনেসাঁস পর্যন্ত নারী এক আদর্শ- ‘দে শুড় বি স্মল, হােয়াইট, রাউন্ড লাইক অ্যাপেলস, ফার্ম অ্যান্ড ওয়াইড অ্যাপার্ট। ‘সংস্কৃত সাহিত্যের রূপের মান যেভাবে নির্দিষ্ট হয়েছিল সেই ঢঙে নির্দিষ্ট হল আদর্শ রূপের সংজ্ঞা। শুধু স্তন নয়, নারীর সম্পূর্ণ দেহই পুরুষের চোখে পুনর্নির্মিত সেদিন। একজন ফরাসি কবি রূপবতীর কায়া-কল্পনা করে লিখেছিলেন— ‘দোজ সুইট লিটলশোল্ডারস, দোজ লং আর্মস অ্যান্ড নিম্বল হ্যান্ডস, লিটল ব্রেস্টস অ্যান্ড ফ্লেশলি হিপ ইতালিতে নারীদেহের অনুপুঙ্খ বর্ণনা। শুরু করেছিলেন কবি পেত্রার্ক, চতুর্দশ শতকের পর সে ধারা টেনে নিয়ে যান পরবর্তী কবি ও লেখকরা। রেনেসাঁসের ইউরোপে নারীর স্তন পরিণত হয় নব যৌন স্বাধীনতার বিজ্ঞপ্তি হিসাবে। শিল্পী-সাহিত্যিকদের প্রশস্তি প্রভাবিত করে মেয়েদেরও। তারাও অনেকে গ্রহণ করেন প্রদর্শিকার ভূমিকা। গণিকারা উত্তমাঙ্গের পােশাক খুলে প্রকাশ্যে বের হয়ে আসেন। প্রাসাদে এবং অভিজাতদের ঘরের দেওয়ালে রাজা-রানির প্রতিকৃতির পাশে ঠাই পেতে লাগে তাদের নগ্ন প্রতিকৃতি। তবে অন্য পরিচয়ে। কেউ ফ্লোরা, কেউ ভেনাস, কেউ ডায়না। ভাস্কর্য এবং চিত্রে গ্রিক রােমান দেবীর মতো নকল দেবী এইসব রূপােপঞ্জীবিনী। তারা যেন কামদেবী। পুরুষের বাসনার প্রতিচ্ছবি। রেনেসাঁসের নগ্নিকারী নারীর নতুন রূপের প্রতিবিম্ব। ওর স্তন মুখশ্রীরই অংশ, অতএব চোখ মেলে উপভোগ করতে কোনও দোষ নেই। বস্তুত ষােড়শ শতকের ফ্রান্সে ‘ব্লাঁজ’ (Blazon) নামে এক কাব্যধারাই সুচিত হয়। নারীর রূপ তথা পায়ের নখ থেকে মাথা পর্যন্ত অঙ্গের অনুপুঙ্খ বর্ণনা করে। একটি পদে স্তনের বর্ণনা থেকে কয়টি ছত্র: ‘আ লিটল বল অব আইভরি, ইন দা মিডল অব হুইচ সিটস আ স্ট্রবেরি অর চেরি!’ এই রূপ যে অন্যভাবে পুরুষনির্ভর তাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন এক কবি: ‘ফর এভরি রিজন, হাপি ইজ হি’হু উইল ফিল ইউ উইথ মিল্ক !

রেনেসাঁস যুগের দুইজন মহিলার কথাও উল্লেখ করেছেন গবেষক যারা নিজেদের বুক নিয়ে কবিতা লিখেছেন। তারা দুজনই ষােড়শ শতকে লিয়র মেয়ে। একজনের কাব্যে নব্য-প্লেটোনিক প্রেম। তিনি চান দেহের বাধাবম্বন থেকে আত্মার মুক্তি। কিন্তু শরীরকে, শরীরের দাবিকে দমন করতে চাইলেও তার অস্তিত্ব অস্বীকার করতে পারেননি। অন্যজনের কবিতায় নিষ্ঠুর প্রেমের পীড়নের কথা অবেগের সঙ্গে উচ্চারিত। —আই লিভ, আই ডাই, আই অ্যাম বার্নিং, আই অ্যাম ড্রাউনিং। তার বুক, তার স্তন, তার হৃদয় প্রেমের যন্ত্রণা অধীর, বিষাক্ত, প্রলিত, অত্যাচারিত। রেনেসাঁসের ইতালি ও ফ্রান্সে নারীর স্তন প্রতিষ্ঠিত হয় এলিট বা উচ্চবর্গের সংস্কৃতির নব্য যৌনতার কেন্দ্রে : নারীর এই অঙ্গ স্বয়ং কামদেবী যেন। অবশ্য তখনও ইউরােপের শতকরা নব্বই জন নারীই স্বাভাবিক জননী তথা স্তনাদায়িনী। রেনেসাঁস-পর্বেও ধাই-মা ছিলেন বটে, কিন্তু মেয়েদের মধ্যে গরিষ্ঠ অংশই উচ্চবর্গের সন্তানকে স্তন্য দেওয়ার পাশাপাশি নিজেদের সন্তানদের লালন করতেন। শতকরা দশ ভাগ মেয়ে ছিলেন প্রদর্শিকা। তাদের স্তন সযত্নে রক্ষিত, সন্তান নয়, স্বামী অথবা প্রেমিকের জন্য। সাধারণ মেয়েরা এই বিবিয়ানার বিশেষ উৎসাহী ছিলেন না। তারা শীত এবং লুব্ধ পুরুষের দৃষ্টি থেকে নিজেদের বাঁচাবার জন্য শরীর ঢেকে রাখতেন। তারা বুকের দুধ বিক্রি করতেন নিতান্তই আর্থিক প্রয়ােজনে।

উল্লেখ করা প্রয়ােজন এই রেনেসাঁস-পর্বেই দু’শাে থেকে তিনশাে বছরের মধ্যে ষাট হাজার থেকে দেড় লক্ষ মেয়েকে ডাইনি হিসাবে পুড়িয়ে মারা হয়েছে ইউরােপে। ডাইনি চিহ্নিত করার একটি প্রক্রিয়া ছিল তার স্তন পরীক্ষা করা। পিন ফোটালে সে কষ্ট পাবে না, বাধা দেবে না ইত্যাদি ইত্যাদি। আঘাতে আঘাতে তার বুক ক্ষতবিক্ষত করা হত বাড়তি স্তন-বৃন্ত সন্ধানের নামে চরম অসভ্যতা করা হত। এমনকী অষ্টম হেনরির দুর্ভাগা স্ত্রী আনি বােলেনের বিরুদ্ধে ব্যভিচার ছাড়াও অভিযােগ ছিল একটি বাড়তি স্তনাঙ্কুর। মার্গারেট কিং নামে একজন গবেষককে উদ্ধৃত করে লেখক বল্লো পুরুষের মতাে নবজাগরণের শরিক হননি রেনেসাসের নারী : নবচেতনা তাদের জন্য নয়। তাদের স্বাধীনতা সীমাবদ্ধ ছিল যৌনতায়। অন্য দিকে ডাইনি হিসাবে অসংখ্য নারীকে পুড়িয়ে মারার ঘটনা প্রমাণ করে এই নিগ্রহ ছিল নারীর বিরুদ্ধে তথাকথিমুক্ত পুরুষের যুদ্ধ’– ‘ট্যান্টামাউন্ট টু আ ওয়র ওয়েজভ বাই মেন আপন উইমেন’স।

রেনেসাঁসে স্তনের সৌন্দর্য ঘিরে যে যৌনতা তা মূলত নব্য স্বাধীনতা বােধেরই এক প্রকাশ। ইহুদি-খ্রিস্টান জগতে প্রথমবারে দেবতা নয়, মানুষই সব-কিছুর কেন্দ্রে। মানুষই সবকিছুর পরিমাপ। কোনও স্বর্গীয় অস্তিত্ব নয়, মানবসমাজ সেদিন অর্জন করে নতুন মর্যাদা। শারীরিক আনন্দানুভূতি, শরীরের দাবি বিশ্বমানবের অধিকার হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে এই অধিকার ছিল অবশ্য খণ্ডিত, নিতান্তই সীমাবদ্ধ। শুধু তা-ই নয়, সেদিনের অভিযাত্রী মানুষ, নব নব অঞ্চলের আবিষ্কারকদের কাছে নারীদেহ ছিল নব যুগের প্রতীক। লেখক প্রসঙ্গত ক্রিস্টোফার কলম্বাসের ডায়েরির উল্লেখ করেছেন। ১৪৯৮ সালে দক্ষিণ আমেরিকার তটরেখার দিকে তাকিয়ে তিনি লিখেছিলেন, যেন কোনও স্তনের বৃন্তু। কখনও বলেছেন তার চোখে ধরিত্রী পিয়ারশেপড মেয়েদের স্তনের মতো। লেখক মন্তব্য করেছেন— “রেনেসাঁস যুগে মেয়েরা সাক্ষাৎ প্রকৃতি। নতুন পৃথিবী, আমেরিকা তাদের কাছে কুমারী জমি, পুরুষের প্রতীক্ষায়। ‘ (স্মরণীয় ভারতে কৃষিক্ষেত্রের সঙ্গে নারীদেহের কল্পনা। লাঙ্গল থেকে লিঙ্গের ব্যবহার।) তাকে উন্মোচিত করতে হবে, কর্ষণ করতে হবে, মানুষের বিজয়াভিযান যেন সেই লক্ষ্যে।

লক্ষণীয়, রেনেসাঁস-পর্বে ইতালি এবং ফ্রান্সের শিল্পী ও লেখকরা যেভাবে নারীস্তনের বদনা করেছেন, নারীর উর্ধাঙ্গকে পরিণত করেছেন যৌনতার প্রতীক, ইংলিশ চ্যানেলের ওপারে প্রথম এলিজাবেথের আমলে (১৫৫৮-১৬০৩) কিন্তু সেই উন্মাদনা দেখা যায়নি। এলিজাবেথের বাবা অষ্টম হেনরির রাজত্বকালে যে যৌনতার বাড়াবাড়ি দেখা গেছে উচ্চবর্গের মধ্যে তার কন্যার শাসনকালে তা বহুলাংশে স্তিমিত। লেখক বলেছেন তার কারণ ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের ইহুদি-খ্রিস্টান ভাবধারার বদলে ইংল্যান্ডে তখন নর্ডিক-খ্রিস্টতন্ত্রের প্রভাব বেশি। ওই অঞ্চলের মানুষের কাছে দৈহিক ভােগবাদ ছিল নিন্দনীয়, সুতরাং ত্যাজ্য প্রােটেস্ট্যান্ট ধর্ম এবং পিউরিটানদের অনুশাসনে যৌনতা ছিল বলতে গেলে অবদমিত। এলিজাবেথ তাঁর রাজত্বের প্রথম পর্বেই চেষ্টা করেছেন কি পােশাকে, কি আচার-আচরণে সহজ সরল অনাড়ম্বর জীবনের আদর্শ জনমানসে প্রতিষ্ঠা করতে। অ্যানি বােলেনের কন্যা এলিজাবেথ সিংহাসনে বসেন পচিশ বছর বয়সে। এই কুমারী-রানি যেন না-পুরুষ, না নারী। নারীর কোমলতায় তার আগ্রহ নেই, আবার পুরুষের কঠোরতাও তার নেই। হাত আর মুখখানা ছাড়া তার সর্বাঙ্গ আবৃত। স্প্যানিশদের আদলে এক বর্মের মতাে পােশাক পরতেন তিনি। তৎকালের উচ্চবর্গের ইংরেজ মেয়েদের কাছে করসেট অজানা ছিল না। বডিসও ছিল। অবশ্য সেটিকে বলা হত ‘বডি’ বা ‘আ পেয়ার অব বডি। কিন্তু বর্মাবৃত রানিকে দেখলে মনে হয় বুঝি-বা তিনি এক লৌহমানবী, ‘আয়রন লেডি’।

সত্যি বলতে কী, অনেকের মধ্যে সেদিন দেখা গেছে নারীর স্তন সম্পর্কে এক নঞর্থক মনােভঙ্গি। এলিজাবেথের কালে অধিকাংশ ইংরেজ শিশুই লালিত হত মায়ের দুধে। এমন নয় যে, ইংল্যান্ড এবং স্কটল্যান্ডে ধাই-মা সম্পূর্ণ গরহাজির ছিলেন। কিন্তু তারা একমাত্র বড়মানুষের সন্তানকেই লালন করার দায়িত্ব পেতেন। সম্পন্নদের ঘরে তারা ছিলেন ‘স্টেটাস-সিম্বল’ বা নিজেদের অর্থকৌলীন্যের ঐ একটি স্মারক। কিন্তু সমাজের অন্য শ্রেণীর মধ্যে তাদের বিশেষ কদর ছিল না। যাজকেরা ধাই-মা নিয়ােগ না করতে পরামর্শ দিতেন। তারা বাইবেলের একাধিক মায়ে উদাহরণ তুলে ধরে প্রচার করতেন। ফলে এমন দৃশ্যও সে দেশে দেখা গেছে যে জর্জ প্রথম জেমসের (১৫৬৬-১৬২৫) রানি অ্যান ধাই-মাদের সঙ্গে এক পংক্তিতে দাড়িয়ে আছেন!

কিন্তু শেষরক্ষা হল কই? ষােড়শ শতকের শেষ দিকে দেশে ছাপাখানা চালু হওয়ার পর কবি-লেখকরা মহিলা-পাঠকদের কথাও মাথায় রেখে কলম ধরেন। এলিজাবেথের আমলে কবিরা নারীর স্তনকে বন্দনার বদলে কখনও কখনও আক্রমণও করেছেন। শেক্সপিয়ার পর্যন্ত তার নায়কদের দিয়ে আঘাত হেনেছেন নারীর স্তনে। কিন্তু ক্রমে শুরু হয় ইউরােপের অন্যান্য দেশের মতাে কুচ-যুগের বন্দনা, যদিও ইংল্যান্ডের চিত্রশিল্পে নগ্ন নারী সেদিন প্রায় অনুপস্থিত, কিন্তু সাহিত্যে তথা কাব্যে স্তনের কত না উপমা। এক কবি লিখেছেন- ‘হার পাপস আর সেন্টার অব ডিলাইটহার ব্রেস্ট আর অর্বস অব হেভেনলি ফ্রেম’। ইতালি-ফ্রান্সের হাওয়া শেষ পর্যন্ত পৌঁছে যায় ইংলিশ চ্যানেলের ওপারে। এলিজাবেথ নিজেও স্তন নিয়ে কবিতা লিখেছেন। কিন্তু সে উরসিজ জাগতিক কামনার বস্তু নয়, নারীর অন্তরস্থিত হৃদয়ের আবেগের প্রকাশ মাত্র। শুধু তা-ই নয়, একটি কবিতায় বেদনা ও অনুশােচনার আসন বুক। কিন্তু অন্য কবির, এমনকী কোনও কোনও মহিলা তাদের কবিতায় খােলাখুলিভাবে প্রকাশ করেছেন যৌনতা। বিশেষত সপ্তদশ শতকের দুজন কবি নায়ক-নায়িকার আলিঙ্গন বর্ণনা করতে গিয়ে একজন লিখেছেন— ‘হিজ প্যানটিং ব্রেস্ট, টু হার নাউ জয়েনড়”। (প্রতি অঙ্গ লাগি কঁাদে প্রতি অঙ্গ মাের।) আর-একজন লিখেছেন তার প্রেমিকের রূপ তঁার ‘হার্ট’ বা হৃদয়কে উত্তাল করে তােলে প্রেমের দেবতার কাছে তার প্রার্থনা—তার শীতল জমাট-বাঁধা বুককে আমার মতাে তপ্ত করে দাও।’

এই পরিবেশে জননী-প্রতিমা কিন্তু পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি সেদিনের ইংল্যান্ডে। লেখক জানাচ্ছেন সাসেক্স-এর একটি কবরখানায় রয়েছে একজন মহিলার সমাধি (১৬৫৮)। ছয়টি পুত্র এবং দুটি কন্যার জননী এই মহিলা ছিলেন আর্ল অব ম্যাঞ্চেস্টারের স্ত্রী। তার স্মারকলিপিতে অন্যান্য পরিচয়ের সঙ্গে তৎকালের বানানে লেখা রয়েছে এই বাক্য, ‘সি নার্সড উইথ হার ওন ব্রেস্টস’।

প্রসঙ্গত উল্লেখ করা প্রয়োজন তৎকালে নারীর মাতৃরূপের যে-প্ৰকাশ যােড়শ-সপ্তদশ শতকের হল্যান্ডে দেখা গেছে ইউরােপে তার তুলনা খুঁজে পাওয়া ভার। লেখক ডাচ মেয়েদের স্তন বিষয়ক আলােচনার অধ্যায়টির নাম দিয়েছেন— ‘দ্য ডােমেসিস্টক ব্রেস্ট, গার্হস্থ্য স্তন। ষােড়শ শতকের শেষ দিকে স্বতন্ত্র ডাচ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর সে-দেশের গির্জা তাে বটেই, চিকিৎসক, ভাবুক সকলেই মায়ের বুকের দুধে শিশুপালনের জন্য ব্যাপক প্রচার চালিয়েছেন। এমনকী মেয়েরা নিজেরাও। ফলে সমকালের ডাচ চিত্রকলায় স্তন্যদায়িনীর চিত্রের ছড়াছড়ি। নিজেদের ঘরে, গির্জায়, সর্বত্র তারা। এমনকী একজন ডাচেসও তার তিন সন্তানকে নিয়ে ছবি আঁকিয়েছেন শিল্পীকে দিয়ে। তার একটি স্তন খােলা। এ স্তন পবিত্র। পানশালা এবং আমেদকেন্দ্রে হয়তাে যৌনতাও দেখা যেত, কিন্তু অন্যত্র, সর্বত্র নারী কল্যাণী পুরুষের হাত যখন তার বুকে, তখনও কামনার বদলে সেখানে যেন স্নেহস্পর্শ। ডাচ্ চিত্রশিল্প, সন্দেহ কী, তৎকালের ইউরােপে উজ্জল ব্যাতিক্রম।

নারীর স্তন আবার রাজনৈতিক অভিজ্ঞানও বটে। অষ্টাদশ শতক থেকে তার সঙ্গে জাতীয়তার নিবিড় সম্পর্ক। অষ্টাদশ শতকে পঞ্চদশ লুইয়ের রাজত্বকালে (১৭১৫-৭৪) ফ্রান্স এবং ইংল্যান্ডে চালু হয় স্তনের যৌনতাকরণের প্রক্রিয়া হিসাবে করসেট। স্ফীত উত্তমাঙ্গ একই সঙ্গে হয়ে ওঠে দর্শনীয় ও কামােৰ্দীপক। এই ক্ষীণকটি-পীনপয়ােধর মূর্তির বাসনা ক্রমে সঞ্চারিত হয় অন্য শ্রেণীর মধ্যেও। সেইসঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়ে যায় ধাই মা’দের কদর। অনেকেই প্রচার করেছেন তার বিরুদ্ধে। অষ্টাদশ শতকের একজন সুইডিস বিজ্ঞানী প্রথম মানুষকে আখ্যা দেন মাম্মালিয়া। কেউ কেউ আপত্তি করেন। কারণ মেয়েদের মতাে পুরুষদের স্তন নেই। কিন্তু ম্যামাল’ বা ‘স্তন্যপায়ী শব্দটি শেষ পর্যন্ত থেকেই যায়। মাতৃদুগ্ধের পক্ষে বিশিষ্টদের সওয়াল অতএব পুরাে বিফলে যায়নি, মারি আঁতােয়াতে (Antoinett) নাকি মায়ের দুধকে উৎসাহিত করার জন্য বিশিষ্ট কারুশিল্পীদের নিয়ে স্তনের মতাে একজোড়া চিনামাটির পানপাত্র গড়িয়েছিলেন। কেউ কেউ বলেন- সেই পাত্র দুটি আসলে নিজের স্তনের প্রতিরূপ: (হেলেনের মতাে?)!

দরবারি রূপসীর স্তন নয়, ফরাসি বিপ্লবের সময়কার অনেক ছবিতে স্তন্যদায়িনীর যে প্রতিকৃতি, তা সাধারণ নারীর। অভিজাতদের স্তন ক্রূর, বিষভাণ্ড। সাধারণের স্তন পবিত্র, কারণ তা সন্তানকে লালন করে। এই স্তন সাধারণতন্ত্রের বার্তাবহ। লেখক বলছেন— নিজের সন্তানকে বুকের দুধে লালন বলতে গেলে একটি রাজনৈতিক ঘােষণা। পিতৃভুমিকে সেদিন কল্পনা করা হয় এমন এক জননীরূপে যিনি আপন সন্তানদের নিজের বুকের দুধে পুষ্টিদান করেন। এমনকী ফরাসি উপনিবেশের কৃষ্ণাঙ্গ মেয়েরা স্তনাদায়িনী শ্বেতাঙ্গ বােনদের মতাে সম্মানিত। বিপ্লবের ছবিতে নতুন প্রজাতন্ত্র কখনও কখনও এথেনার মতাে শিরস্ত্রাণে শােভিত, হাতে তার বর্শা, একটি স্তন উন্মুক্ত। অগণিত ছবিতে, ভাস্কর্যে, মেডেলে—স্তন পরিবর্তিত হয় জাতীয় বিগ্রহে। অথচ বিপ্লব মেয়েদের অধিকার মেনে নেয়নি। ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং ক্রীতদাসদেরও যে স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, দুঃখ, যন্ত্রণা এবং ত্যাগের বিনিময়েও ফরাসি মেয়েরা তা পাননি। তারা যার জন্য লড়াই করেছেন সেই সাম্য মৈত্রী স্বাধীনতার বৃত্তের বাইরে তাদের অবস্থান। কে জানে, ওই সব ছবি, মুর্তি, প্রতীক সান্ত্বনা পুরস্কার কি না!

ফ্রান্সে উনিশ, এমনকী বিশ শতকেও প্রজাতন্ত্রের প্রতীক হিসাবে দেখা গেছে বুক খােলা নারীপ্রতিমা। ডেলাক্রোয়ার (Delacroix) পতাকাধারী বিখ্যাত উন্মুক্তবক্ষ লিবার্টি’ নামক নাটকীয় নারীমূর্তিটি অনেকেরই দেখা। সেটা কিন্তু ১৭৮৯ সলের ফরাসি বিপ্লবের কোনও বীরাঙ্গনার ছবি নয়, এটি আসলে ১৮৩০ সালের রক্তাক্ত অভূত্থানের সময় আঁকা। এ-ছবিও, দর্শকরা জানেন, রাজনৈতিক, তাদের দৈহিক উত্তেজনা সৃষ্টির জন্য রচিত নয়। তারও একশাে বছর পরে, প্যারিসের মুক্তির পর জনপ্রিয় একজন ফরাসি গায়িকা হঠাৎ লাফিয়ে একটি গাড়িতে উঠে সেই ছবির নায়িকার মতাে তার বুক উন্মোচন করে গাইতে শুরু করেন ফ্রান্সের জাতীয় সংগীত। লেখকের বক্তব্য, লাইফ, টেকিং ইটস কিউ ফ্রম আর্ট, হ্যাভ নাে বেটার সিম্বল ফ্রম ফ্রিডম দ্যান দি অনফেটার ব্রেস্ট’। বাধাবন্ধহীন উন্মুক্ত স্তনের মতাে স্বাধীনতার প্রতীক আর কী হতে পারে!

১৮৫০ সাল নাগাদ ফরাসি প্রজাতন্ত্রের প্রতীক হন— ‘মারিয়ানি’ (Marianne)। যুবতীর মতাে মুখ তার, বুক খােলা, মাথায় টুপি। এই নারীর অসংখ্য ছবি আঁকা হয়, মূর্তি গড়া হয়। সৌন্দর্য, সাহস, শক্তি, চরিত্রবল ফরাসি চরিত্রের গরিমায় গরবিনী এই কন্যা। অন্য দেশেও জাতীয় চরিত্রের প্রতীক হয়েছেন নারী। ব্রিটেনে ব্রিটানিকা, জার্মানিতে — জার্মানিয়া, আমেরিকায় কলম্বিয়া। কিন্তু তাদের উওমাঙ্গ আবৃত, ফ্রান্সই একমাত্র দেশ যেখানে তাদের জাতীয় প্রতিমার স্তন খোলা।

ইতিমধ্যে ইউরােপে মেয়েদের পােশাকে রকমারি পরিবর্তন ঘটে গেছে। মা ও ধাই-মা’র দুধ নিয়ে বিতর্ক নব নব মােড় নিয়েছে। সে-প্রসঙ্গ বাদ দিচ্ছি। রাজনৈতিক স্তনের কাহিনীই বরং শােনা যাক। অবশ্য মাতৃস্তনেও রাজনীতি ছিল। প্রজা বৃদ্ধি, জাতির জন্য সুস্থ সন্তান, শ্রমশক্তির উৎপাদন, স্তনের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ভূমিকাও ছিল বটে। আপাতত যে স্তন সরাসরি জাতীয় রাজনীতির সেবায় নিযুক্ত তার কথা। প্রথম মহাযুদ্ধের ফরাসি পােস্টারে জাতীয়তার সেই প্রতীক ফরাসি রমণীমূর্তি মারিয়ানিকে দেখা গেল প্রুশিয়ান ঈগলকে প্রতিহত করতে নাগরিক যুদ্ধের ঋণপত্র কিনতে আবেদন করছেন। এর উওমাঙ্গ অনাবৃত। অন্যান্য যুদ্ধ-সংক্রান্ত পােস্টারে তিনি আরও খােলামেলা। ১৭৮৯-এর বিপ্লবের দিনগুলি বুঝি বা ফিরে এসেছিল সেদিন। জার্মানরা অবশ্য এইসব ছবিকে প্রচার করে ফরাসিদের সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ে দৃষ্টান্ত হিসাবে। তাদের যুদ্ধ-উদযােগে যুবতী মেয়েদের ছবির অভাব ছিল না। কিন্তু তারা নতদৃষ্টি, তাদের পুষ্ট দেহ আবৃত। আমেরিকানরা তাদের পােস্টারে জার্মাননের চিত্রিত করে বন্য গেরিলার মতাে, তার রােমশ পুরুষ হাতে একটি উলঙ্গপ্রায় মেয়ে! ছবির নিচে উচ্চকণ্ঠে আহ্বান ডেস্ট্রয় দিস ম্যাড় ব্রুট! বাইশ বছর পরে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় গােয়েবলস এই ছবিটিই পুনর্মুদ্রণ করে নাতসিদের রণবাদ্যকে আরও উচ্চকিত করেন। জার্মানদের স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয় আমেরিকানরা অতীতে কীভাবে এই গর্বিত জাতিকে অপমান করেছিল। নাে সেকেন্ড টাইম!!!’, তাঁর হুংকার। যুদ্ধে আমেরিকানরা তাদের ‘মিস লিবার্টি’কে বলতে গেলে নগ্নিকা হিসাবে চিত্রিত করেছিল।
বক্তব্য ছিল: “তােমরাই ভরসা, জাতির সম্মানকে রক্ষা করাে!’ ব্রিটেন, ইতালি, রাশিয়া, যুদ্ধকালে সকলেই নারী-প্রতিমা ব্যবহার করেছে। কিন্তু ব্রিটানিকা বর্মাবৃত। ইতালি পীনােত মেয়েদের এমনভাবে বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করেছে যেন তারা শক্তির মতো যৌনতারও বিজ্ঞাপন। রাশিয়ান মেয়েদের কথা অবশ্য স্বতন্ত্র। একমাত্র রুশ মেয়েরাই সেদিন অস্ত্রধারী। ১৯১৫ সালে জার্মান হানাদারদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তারা অংশ নিয়েছেন, উত্তর রণাঙ্গনে মেয়েদের একটি ব্যাটেলিয়ান পর্যন্ত সক্রিয় ছিল। নভেম্বর বিপ্লবের দিনগুলােতে বলশেভিকরা নিজেদের প্রচারে এই নতুন নারীর কথা সগর্বে বিশ্ব-মানুষের গােচরে এনেছেন। তারই মধ্যে কিন্তু কোনও কোনও কাগজে তাদের নিয়ে আদিরসাত্মক কার্টুন ছাপা হয়েছিল।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে আমেরিকায় যুদ্ধোদ্যোগে মেয়েদের নানাভাবে কাজে লাগানো হয়। সৈন্যদের সেবা থেকে আনন্দদান এবং আরও নানা ভূমিকায়। আর নগ্নতা? তা দেখা যায় বােমারু বিমানের মুখপাতের ছবিতে, যার তলায় সতর্কবাণী— ‘ফ্লাইটলি ডেনজারাস’! কিংবা মুক্তদেহী নারীকে বলা হয়েছে—‘মিস লেইড’! তা ছাড়া লক্ষ লক্ষ ‘পিন-আপ’ ঝকঝকে কাগজে ছাপিয়ে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে রণাঙ্গনে সৈন্যদের উৎসাহিত করার জন্য। নামী আলােকচিত্রীদের সহযােগিতায় অভিনেত্রীদের পীনপয়োধর এবং লাস্য ও হাস্যময় দেহবল্লরী ক্যামেরাবন্দি করে পাঠানাে হয়েছে ছেলের জন্য, ‘ফর আওয়ার বয়েজ’! ১৯৪১ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে শুধু এস্কোয়ামাগাজিন থেকে সুন্দরী পিন-আপ’দের যাট লক্ষ ছবি পুনর্মুদ্রণ করে দেশে দেশে বিলি করা হয়েছিল মার্কিন সৈন্যদের মধ্যে। লেখক বলেন- ‘আমেরিকানদের স্তন নিয়ে বাড়াবাড়ি, নারীর উর্বাঙ্গের প্রতি গভীর ও ব্যাপক আসক্তির একদিক থেকে সেদিনই এক যুদ্ধের পর ঘরে-ফেরা সৈন্যরা রুপােলি পর্দায় দেখা পেলেন যেমন মেরিলিন মনরাে, জিনা লােলেব্রিজিড়া, জেনি ম্যানসফিল্ড, আনিটা এবার্গের, তেমনই সঙ্গিনী হিসাবে পেতে চাইলেন তাঁদের মতাে নতুন নারীকে।

একসময় নানা সমাজে দেখা গেছে নারীদেহে আকর্ষণীয় ছিল নানা অঙ্গ। চিনে সুন্দরীর লক্ষণ খোঁজা হত পায়ে, জাপানে গ্রীবায়, আফ্রিকায় নিতম্বে। অনেক সমাজে গোপনীয়তাই ছিল বিশেষ আকর্ষণের হেতু; কিন্তু ইউরােপ-আমেরিকায় সুন্দরীদের উত্তমাঙ্গ যদি কখনও উত্তূঙ্গ, তবে কখনও বা সমতল। কিন্তু দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর বিশেষ করে আমেরিকায় যাকে বলে ‘ম্যামারি গ্ল্যান্ড তার স্ফীতি যেন ক্রমেই বর্ধমান। কেন, সে কি মেয়েরা নিজেদের আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে চেয়েছেন বলে? লেখক বলেন– ‘সেটা সম্পূর্ণ সত্য নয়। এই নির্মাণ আসলে পুরুষের কারিগরি মেয়েরা তার শিকার মাত্র। এই নব্য তিলােত্তমা পুরুষের উদযােগে তিল তিল করে রচিত। এই স্তন আসলে পণ্য’। সরকার, শ্রেষ্ঠীকুল, ধর্মীয় নেতা, স্বাস্থ্যের প্রহরী চিকিৎসকদল, সকলেরই কমবেশি অবদান রয়েছে এই সৃষ্টিতে। তারা কিন্তু বলতে গেলে সকলেই পুরুষ। এই স্তন নারীদেহে পিতৃতন্ত্রের অধিকারকে প্রতিষ্ঠা করার আর-এক উদযােগ।

এমন একটা সময় ছিল যখন মায়ের বিকল্প হিসাবে ধাই-মা নিয়ােগের বিরুদ্ধে ইউরােপের অনেক দেশে বিশিষ্ট প্রতিবাদীদের দেখা গেছে। অনেক স্বনামধন্য লেখক ও | চিন্তাবিদ মাতৃদুগ্ধের সপক্ষে সওয়াল করেছেন। এমনকী কখনও কখনও রাজরানিরাও সানন্দে স্বীকার করে নিয়েছেন সে দায়িত্ব। ইংল্যান্ডের এক রানির কথা আগে বলা হয়েছে।

ইংল্যান্ডে এমনও দেখা গেছে বাচ্ছাদের দুধ খাওয়াবার বােতল দেখতে কৌতুহলী সাধারণ মেয়েদের ভিড় জমে গেছে। রাশিয়ার সম্রাজ্ঞী, অস্ট্রিয়ার রানি— বড়ঘরের মেয়েরাও আদর্শ-জননী হিসাবে নিজেদের তুলে ধরেছেন। আমেরিকায় ধাই-মা, এমনকী শ্বেতাঙ্গ শিশুর জন্য কৃষ্ণাঙ্গ মেয়েও নিয়ােগ করেছেন কেউ কেউ। লুই পাস্তারের কৃতিত্বের ফলে ১৮৮০ সাল নাগাদ গোরুর দুধ বােতলে পুরে শিশুকে পান করাবার চিন্তুা অনেকের মাথায়। আসে। কিন্তু লেখক বলছেন— ১৯৩০ সাল পর্যন্ত আমেরিকায় ধাই-মা নিয়ােগ খুব জনপ্রিয় ছিল না। মায়েরা নিজেরাই সন্তানের পুষ্টির দায়িত্ব গ্রহণ করতে পছন্দ করতেন। কিন্তু ১৯৪০ থেকে ১৯৭০ সালের মধ্যে দেখা যায় স্তনদায়িনী মায়ের সংখ্যা অত্যন্ত কমে গেছে। কেননা, বিকল্প হিসাবে বােতলের দুধের মাহাত্ম্য এমনভাবে প্রচার করা হয়েছে যেন। বােতলই শিশুর প্রকৃত মা এর জন্য দায়ী শুধু মুনাফালােভী ব্যবসায়ীরা নন, তাদের সহযােগী চিকিৎসকরাও। এই বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত কোটি কোটি ডলারের প্রশ্ন। আর তার পিছনে চালিকাশক্তি মুনাফা! আর মুনাফা ।

স্তন নিয়ে বাণিজ্যের তথ্যবহুল আলােচনার আগে লেখক একটি মূল্যবান অধ্যায় ব্যয় করেছেন মনস্তাত্ত্বিকদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং প্ররােচনা নিয়ে। পরের অধ্যায়ের বিষয় চিকিৎসকদের ভূমিকা। নারীস্তনে ক্যান্সার নিয়ে কীসব কাণ্ড চলেছিল তার ব্যবচ্ছেদ করা হয়েছে ওই অধ্যায়টিতে। এখানে তা নিয়ে পর্যালােচনার সুযোগ নেই। মনস্তাত্ত্বিকদের মধ্যে কুলগুরু ফ্রয়েডের একটি উক্তি এখানে বিশেষ্ণু করে স্মরণীয়। তিনি বলেন- “স্তন্যপান শিশুর প্রথম একটি ‘ক্রিয়া, এবং তার প্রথম যৌন অভিজ্ঞতা।’ স্তনকে যৌনতার কেন্দ্রে স্থাপনের নব্য স্থাপত্যে এই সিদ্ধান্ত’-একভাব সহজেই অনুমান করা যায়।

স্তন যৌনাঙ্গ হিসাবে বিজ্ঞানে স্বৰ্ত হওয়ার পর, পুরুষ যেমন তা অধিকার এবং রক্ষায় তৎপর হন, মেয়েরাও অনেকেই নিজেদের সুরসুন্দরী হিসাবে গড়ে তুলতে আগ্রহী হবেন, সেটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।

উনিশ শতকে এমনকী ফ্রান্সেও করসেট ছাড়া অন্য কিছু ছিল না। ঘুমের সময়, হাটা চলা, ঘােড়া কিংবা সাইকেলে চড়া, স্নান করা, এমনকী গর্ভাবস্থায় মেয়েরা অন্তর্বাস হিসাবে করসেটই পরতেন। বিশ শতকের প্রথম দিকে (১৯০৭) ফ্রান্সে উদ্ভাবিত হল অন্য স্তনাবরণ— ব্রেসিয়ার। ১৯১৪ সালে আমেরিকায় এক ভদ্রমহিলা আকস্মিকভাবে ফ্রান্সের সেই নব-অন্তর্বাসের সঙ্গে তুলনীয় একটি নতুন পােশাক তৈরি করেন। পরবর্তীকালে তার বিনিময়ে তিনি পনেরাে লক্ষ ডলার সেলামি পান। ব্রোসিয়ার (Brassicrc) শব্দটি আমেরিকায় প্রথম ব্যবহার করা হয় ১৯০৭ সালে ‘ভােগ’ (Vogue) ম্যাগাজিনের পাতায়। অক্সফোর্ড ডিকশনারি তা গ্রহণ করে ১৯১২ সালে। ১৯২৬ সালে দু’জন আমেরিকান ভদ্রমহিলা স্তনের স্বাভাবিক গড়ন এবং স্বচ্ছন্দ আন্দোলন বজায় রাখার জন্য তৈরি করেন পরবর্তীকালে বহুবিদিত ‘মেইডেন ফর্ম। ১৯০০ সাল নাগাদ আবিষ্কৃত হয়েছিল কৃত্রিম তন্তু রেয়ন, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় উদ্ভাবিত হয়, নাইলন। ১৯৩০ সালেই ব্রেসিয়ার ‘ব্রা’ হয়ে গেছে। অতঃপর শুধু মহাযুদ্ধ শেষ হওয়ার অপেক্ষা। ১৯৪৯ সালে সওদাগররা শিল্পীর মতাে নারীদেহ গড়ে তুলতে যত্নবান হলেন সোৎসাহে। মেইডেন ফর্ম’ নির্মাতারা স্বপ্নবিক্রেতা হিসাবে শুরু করলেন তাদের ব্যাপক অভিযান। দীর্ঘ দুই দশক সেই তরঙ্গ ছিল বাধা-বন্ধনহীন। মেয়েরা তার তােড়ে ভেসে যেতে লাগলেন। বিশেষত পঞ্চাশের দশকে
টিভির ব্যাপক প্রচলনের পর। তা পর ‘ওয়ান্ডার-ব্রা’, ‘টর্পেডাে-ব্রা’, ‘বুলেট-ব্রা’, আরও কত কী। এমনকী কিশােরীদের জন্যও বাজারে ছাড়া হয়—’ট্রেনিং ব্রা’!

শুধু কি অন্তর্বাস? স্বপ্নের তিলােত্তমা হওয়ার বাসনা জাগিয়ে তােলার আগে ও পরে বাজারে আসে আদর্শ দেহবল্লরী গড়ে তােলার জন্য হাজার প্রসাধনী। মধ্যযুগে, হয়তাে প্রাচীন যুগেও স্তনের পুষ্টি সুস্থতা ও শিশুর প্রয়ােজনের কথা ভেবে মায়েরা রকমারি ভেষজ ও টোটকা ব্যবহার করতেন। কিন্তু এবার এল মনােলােভা আধারে, বর্ণাঢ্য লেবেল পরে, বিজ্ঞানের জয়গান গাইতে গাইতে। তা ছাড়া দেহ-ভাষ্কর্য গড়ার নামে যন্ত্রপাতি, শল্য চিকিৎসকদের সৌজন্যে খােদার উপর খােদকারি, প্লাস্টিক সার্জারি, এমনকী স্তন বৃদ্ধির জন্য ‘সিলিকন’ প্রয়ােগ। (এই বিপজ্জনক খেলা আইনবলে বন্ধ করা হয় ১৯৮৮ সালে।) নারীর উত্তমাঙ্গ পশ্চিমে পরিণত হয় বৃহৎ শিল্পে। মেয়েরা সেখানে যেমন তাে, তেমনই বিক্রেতাও বটে। ম্যাগাজিনের মলাটে এবং মলাটের ভেতরে পর্নোগ্রাফির পাতায়, মডেলের বেশে, পানশালায়, বিভিন্ন নিশিবাসরে, সিনেমা এবং সৌন্দর্য প্রতিযােগিতা, তারা অনেকে নিজেদের স্তনকে তুলে ধরেন অর্থের বিনিময়ে।
এই নবহুল্লড়ে ষাটের দশকে শােনা গেল অন্য এক শিহরনকারী সংবাদ ‘ব্রা-বার্নিং’। সেটা অবশ্য গুজবমাত্র। কিন্তু সেদিন যা ঘটছিল তা অন্তর্বাস-পােড়ানোর চেয়েও অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। ‘দ্য লিবারের্টেড ব্রেস্ট’ শীর্ষক অধ্যায়টি এই বইয়ে অত্যন্ত জরুরি-পাঠ্য। কারণ, ষাট এবং সত্তরের দশকের নারীবাদীদের ঐতিহাসিক আন্দোলনে শুধু সংক্ষিপ্ত অথচ সুস্পষ্ট পটভূমিই রচনা করেননি গবেষক বিশ্বময় নারীচেতনায় তার প্রভাব এবং পুরুষতন্ত্রের প্রতিক্রিয়ারও একটি বুদ্ধিদীপ্ত দলিল এটি। আমেরিকায় একটি সভায় মেয়েরা সেদিন নিজেদের ব্রা খুলে হলের এককোণে রাখা আবর্জনার বাক্সেই ছুড়ে দেননি, আরও অনেক কাণ্ডই করেছেন। শুধু আমেরিকায় নয়, ফ্রান্সে, জার্মানিতে, ইতালিতে, উন্মুক্ত উত্তমাঙ্গ নিয়ে মিছিল, নগ্ন হয়ে প্রতিবাদ জানানাে, বুক খুলে সমুদ্রসৈকতে রােদ পােহানো, অবিশ্বাস্য নানা কাণ্ড । এখানে সে-কাহিনী সবিস্তারে নতুন করে শোনাবার সুযােগ নেই। বোধহয় তার প্রয়ােজনও নেই। জগৎ-কাপানাে নারীবাদী আন্দোলনের কাহিনী কে না জানেন? লেখক তার বিবরণ দিতে গিয়ে সবিনয়ে জানিয়েছেন- তথাকথিত এই ‘ব্রা-বার্নিং’ ‘ব্রা’ পােড়ানাের এক লক্ষ্য ছিল— মেয়েদের যৌনতা নিয়ে পুরুষের বাড়াবাড়ি, তাদের হাজার সমস্যা এড়িয়ে স্তন নিয়ে মাতামাতির বিরুদ্ধে স্পষ্টভাষায় প্রতিবাদ জানানাে। এমন প্রতিবাদ যা সমাজকে শিহরিত করে, আহত করে, এবং ভাবিত হতে বাধ্য করে। ওঁরা নিজেদের শরীরের উপর নিজেদের অধিকার দাবি করতে যেমন সেদিন লড়াইয়ে অবতীর্ণ, তেমনই বৃহত্তর লক্ষ্যও ছিল তাদের সামনে। নারীর নানা দাবিকে সরবে উত্থাপন করেছিলেন ওঁরা সেদিন বধির শাসক এবং পুরুষতন্ত্রের অন্য ধ্বজাধারীদের সামনে। সে প্রশ্নের মধ্যে ছিল পর্নোগ্রাফি, যৌনতা (সেক্সইজম), মেয়েদের স্বাস্থ্য, রুজি-রােজগারের সমস্যা, নিরাপদ যৌনৰ্জীবনের প্রয়ােজনীয়তা অন্যভাবে বললে পুরুষের অধিকারের সমান অধিকার। সত্য ওঁদের এক উচ্চারণ ‘উই রিক্রেম আওয়ার ইনহেরেন্ট রাইট টু গভর্ন আওয়ার ওন বডিজ’ কিংবা অন্য আওয়াজ– আওয়ার ব্রেস্টস আর ফর দ্য নিউবর্ন, নট ফর মেন্স পর্নো’। কিন্তু আসল লড়াই— একই তুলাদণ্ডে নারী আর পুরুষের মূল্যায়ন। নরনারীর স্বীকৃতি।

ওঁদের আন্দোলন, বলাই বাহুল্য, বিফলে যায়নি। ইউরােপ-আমেরিকায় রাষ্ট্র ও সমাজপতিরা নতুনভাবে চিন্তা করতে বাধ্য হয়েছেন। কোনও কোনও ক্ষেত্রে অধিকারের স্বীকৃতিও দিতে হয়েছে। কিন্তু লেখক স্বীকার করেছেন আশির দশকে স্তনের মহিমা আবার প্রতিষ্ঠা খুঁজে পায় আমেরিকায়। সত্য, অনেক মেয়েই নিজেদের শরীর মন, এমনকী নিজেদের যৌনতার উপর সার্বভৌমত্ব ঘোষণা করতে সমর্থ নন। তারা আর কারও অঙ্গুলিহেলনে নিজেদের পছন্দের জীবনভঙ্গি বদলাতে সম্মত নন। বিবাহবন্ধনের বাইরে দাম্পত্য, সংসারে নারী-পুরুষের সদায়িত্ব ও মর্যাদা, সন্তান চাওয়া না-চাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, কর্মক্ষেত্রে সমান সুযােগ ও বেতন আদায় করা, প্রয়ােজনে এক সন্তানের দায়িত্ব গ্রহণ, এমনকী সমকামিতাকে স্বাভাবিক বলে প্রকাশ্যে স্বীকার করে নেওয়া— কী নয়? তা ছাড়া নতুন ভাষাও আয়ত্ত করেছেন ওঁরা। তারা নিজেদের কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধে খােলাখুলি নিজেদের যৌনতা নিয়ে আলােচনা করতে আর লজ্জিত বা দ্বিধাগ্রস্ত নন। বেশকিছু নারী নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছেন লেখক, চিত্রকর, ভাস্কর এবং আলােকচিত্রী হিসাবে। সৃজনশীলতার এই বিস্ফোরণও অবশ্যই বিরাট প্রাপ্তি।

তবু লেখক স্বীকার করেন ১৯৮৮ সালের ডিসেম্বরে ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ যখন সদর্পে ঘােষণা করে ব্রেস্টস আর ব্যাক ইন স্টাইল। তখন ওঁরা মিথ্যা বলেননি। আমেরিকা কিছুদিনের জন্য থমকে দাড়ালেও অবার যেন বাঁধা পড়ছে নারীর বুকের মায়ায়। এ কি ‘ব্যাকল্যাশ, বা ক্রিয়ার পর প্রতিক্রিয়া? প্রত্যাঘাত লেখক বলছেন— “তার পটভূমি রচনা করেছে আমেরিকায় সমকালের সনাতন দক্ষিণপন্থী রাজনীতি, নবলব্ধ পৌরুষের আস্ফালন, অর্থনৈতিক কার্যকারণ, বিশেষ করে শিবাণিজ্যে ধনতন্ত্রের নব অভিযান। তবে তিনি দৃশ্যাবলি দেখে নৈরাশ্য-পীড়িত ন আশা প্রকাশ করেছেন— এই শুনমাহাত্ম চিরস্থায়ী হবে না। কোনও ফ্যাশনই চিরজীবী নয়। তার প্রত্যাশা— হয়তাে আমাদের নাতনিরা ইচ্ছা করলে তাদের স্তন অনাবৃত রাখতে পারবে। তাদের তার জন্য নিন্দিত বা ধিকৃত হতে হবে না, আদালতের কাঠগড়ায় দাড়াতে হবে না, এই প্রদর্শনের জন্য কোনও কামার্ত পুরুষ তার দিকে হাত বাড়াতে সাহস পাবে না। হয়তো সেদিন স্তনের আবেদন অনেক কমে যাবে, তার বদলে আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে হাটু কিংবা উরু। তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন একদিন শুধু নারীর নয়, এমনকী টেবিলের পা পর্যন্ত ঢেকে রাখা হত। কোথায় গেল সেই কুসংস্কার? সুতরাং, স্তন নিয়ে এই পাগলামিও থাকবে না। যদি কেউ জিজ্ঞাসা করেন কবে সেই সুদিন আসবে, তবে এই চিন্তাশীল গবেষকের উত্তর একুশ শতকের প্রথম দিকে। কেননা, ইউরােপ-আমেরিকায় নারীস্তনের ইতিহাস পর্যালােচনা করে তিনি দেখেছেন কুচগিরি শান্ত সমতল উপত্যকায় পরিণত হয় মােটামুটি প্রতি চার দশক অন্তর। সুতরাং তিনি অপেক্ষায় আছেন।

ওঁর সঙ্গে পাঠকেরাও নিশ্চয় সম্মত হবেন প্রতীক্ষা করতে। কারণ, তথ্যের সঙ্গে তত্ত্ব, যুক্তির সঙ্গে আবেগের অপূর্ব সমন্বয়, এই ইতিহাসের পাঠকের পক্ষে সম্ভব নয় অন্য কিছু ভাবা।


ঔপনিবেশিক লালসার আগুনে

এখন আমি নিয়মিত দেশীয় নারীর সঙ্গে সহবাস করি। ওরা ভালবাসার সব কলাকৌশল জানে। জানে যে-কোনও রুচির মানুষকে তৃপ্ত করতে। তাদের মুখের ছাদ এবং শরীরের গঠন পৃথিবীর যে-কোনও নারীর চেয়ে সুন্দর। এই অপ্সরাদের বাহুবন্ধনে আমি যে আনন্দ উপভােগ করেছি তা বর্ণনা করা সম্ভব নয়।—এই জবানবন্দি এভেয়ার্ড সেলােন নামে একজন ব্রিটিশ অফিসারের। ১৮৪০ সালের কথা। সেলেন তখন ভারতীয় সৈন্যবাহিনীর একজন উচ্চপদস্থ সৈনিক। তিনি একজন বিশিষ্ট নৃতাত্ত্বিকও। ভারতীয় নারীর রূপ এবং যৌনতা তার অন্যতম চর্চার বিষয় উপভোগেরও।

—সাদা মানুষেরা নাকি কখনও মিথ্যে বলেন না। কিন্তু গােপন সম্পর্ককে তারা গােপন রাখতে পারে। খুব চেষ্টা করলেও কেউ সাদা পুরুষ মানুষদের গোপন জীবনের কথা জানতে পারবে না। তবে একবার তাদের বিশ্বাস অর্জন করতে পারলে হয়তো পারা যাবে। আমি এক সাহেবকুঠিতে আয়ার কাজ করতাম। বিবাহিত সাহেব। ঘরে বিবি-বাচ্চা আছে। বিবির চোখে ধুলো দিয়ে সাহেব গাড়িতে আমার সঙ্গে মিলিত হতেন। মালিকের সঙ্গে কাজের মেয়েদের হামেশাই এ ধরনের সংসর্গ ঘটে। হয়তো অন্য কোনও আয়া সাহেবের নজরে পড়েছে। তিনি আমাকে আড়ালে জিজ্ঞাসা করতেন, মেয়েটি কি ভাল? আমি বললাম, হ্যা। তখন তিনি বলবেন, তবে একটা ব্যবস্থা করো। আমিও রাজি হয়ে যেতাম।–এই স্বীকারােক্তি কেনিয়ার একজন কৃষ্ণাঙ্গ আয়ার। একজন না বলে দু’জন বলাই ঠিক। কারণ, মেয়ে সংগ্রহ করার দায়িত্বটি যে নিয়েছিল সে জন্য একটু আয়া।

টোনি ফ্রিথ ছিলেন সিয়ারালেন-এ বনবিভাগের একজন কর্মী। তিনি লিখছেন, মেয়েটি ছিল ইউরাে-আফ্রিকান সে ছবি আঁকত তার সঙ্গেই আমার প্রথম যৌন অভিজ্ঞতা। পশ্চিম আফ্রিকা যাওয়ার আগে তামার সে-অভিজ্ঞতা ছিল না। আমার বয়স তখন সবে একুশ বছর। তরুণী সােনিয়া ছিল পেশায় নার্স। আমি তখন ফ্রি টাউনে আছি। সােনিয়া তখন একটি স্থানীয় হাসপাতালে কাজ করে। একদিন সে আমার কুঠিতে এসে দরজায় টোকা দেয়। আমি ভেতরে আসতে বলি। সােনিয়ার প্রশ্ন, তোমার কোনও বান্ধবী নেই? আমি বলি, না। সে বলে, তবে আমিই তােমার মেয়েমানুষ। আমার জীবনে সেই প্রথম সুযােগ। সােনিয়া বলে, আমি একজন নার্স। সুতরাং আমাকে নিয়ে ভাবনার কিছু নেই। আমি জানি কী করতে হয়। আমি প্রতিবার ওকে এক পাউন্ড করে দিতাম।

এইসব কাহিনী ঔপনিবেশিক আমলের। সাম্রাজ্যের ইতিহাস শুধু দূর দূর দেশে নতুন নতুন জনগােষ্ঠী, তাদের সম্পদ ও সম্পত্তি, সভ্যতা ও সংস্কৃতির ওপর আধিপত্যের ইতিহাস নয়, সেই কাহিনী অনেকখানিই বিজেতা এবং বিজিত জাতির মধ্যে সম্পর্কের টানাপােড়েনের কাহিনী। আর তার আড়ালে রয়েছে নর-নারীর সম্পর্কের বিশেষ কাহিনী।

ইদানীংকালে সাম্রাজ্যের মতো এই সম্পর্কের ইতিহাসও আলােচ্যের তালিকায় ঠাই করে নিয়েছে। প্রায় এক যুগ আগে আমরা হাতে পেয়েছিলাম কেনেথ বালহ্যাচেট-এর বিস্ময়কর বই, ‘রেস, সেক্স অ্যান্ড ক্লাস আন্ডার দ্য রাজ’। তার পর আটলান্টিকের এপারে ম্যাঞ্চেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় এবং ওপারে ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এই দশকেই বেরিয়েছে দু’-দুটি বই। ঔপনিবেশিক আমলে উপনিবেশগুলােতে সাম্রাজ্যনির্মাতাদের যৌন জীবন নিয়ে বিস্তারিত আলােচনা করা হয়েছে এইসব বইয়ে : সর্বশেষ হাতে এল নতুন আর একটি বই, অ্যান্টন জিল-এর ‘রুলিং প্যাশনস’ বা সেক্স রেস অ্যাও এম্পায়ার। এই বইটি অবশ্য সেই অর্থে প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা-পুস্তক নয়। রুলিং পশনস’ আসলে রজার বণ্টন প্রােডাকশনস-এর একটি টিভি সিরিয়াল। চলতি বছরেও বিবিসি-তে দেখানাে হয়েছে সেটি। দৃশকাহিনীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতেই প্রায় দু’শো পৃষ্ঠার এই সচিত্রপাঠ্য। এমন খােলামেলা আলােচনা, বিশেষত প্রয়ােজনীদৃশ্য সহযােগে বােধহয় বিবিসি-র পক্ষেই সম্ভব। উল্লেখ্য, লেডি চ্যাটার্লিজ লাভর এর উপলক্ষে ও বেইলি থেকে ছাড়া পাওয়ার পর একদা নিষিদ্ধ চার অক্ষরের সেই শব্দটি এ-বইয়ের যত্রতত্র। সুতরাং বাংলা মতে বলতে গিয়ে কিছু রাখঢাক করতে হচ্ছে। তাতে অবশ্য মূল বক্তব্যের কোনও হেরফের ঘটার সম্ভাবনা নেই। লক্ষণীয় শুধু এটাই যে, ভিক্টোরীয় ইংল্যান্ডের রুচিশীলতা, শুচিবাইয়ের পর্যায়ে চলে গেলেও সেদিনের অনেক ইংরেজের জীবনে তাে বটেই, ডায়েরি, চিঠিপত্র, এমনকী গোপন লেখালিখিতেও অবিশ্বাস্য অকটপতা। ভিক্টোরীয় ইংল্যান্ডের প্রকাশ্য মুখাবয়ব-এর আড়ালে যে একটি মুখােশ ছিল, লিটন স্ক্র্যাচির বিখ্যাত ভিক্টোরিয়ানরাই যে সে-যুগে একমাত্র ভিক্টোরিয়ান ছিলেন না সে-কথা আজ আর গােপন নেই। জানা গেছে, সুরভিত প্রস্ফুটিত কুসুমে কীট ছিল। আন্টিন জিল-এর এই কাহিনী পর্দায় সরাসরি দেখিয়ে দিল কীট যেমন পেছনের বাগানে ছিল, তেমনি ছিল ঘরের বাইরেও দূর-দূরান্তে— নগরে, বন্দরে, ছাউনিতে, বাগিচায় এবং এখানে-সেখানে সর্বত্র। এমনকী, শীর্ষ শাসকদের অট্টালিকাগুলিতে পর্যন্ত। লর্ড ওয়েলেসলির মতাে জঁদরেল গভর্নর জেনারেলকেও যৌন ক্ষুধা মেটাতে হানা দিতে হয়েছে এই কলকাতায় আনন্দের হাটে ! ভাবা যায় !

ব্রিটিশ সাম্রাজ্য এক অত্যাশ্চর্য ঘটনা। পৃথিবীর বিস্তীর্ণ জমি ও সম্পদ সেদিন সামান্য এক দ্বীপপুঞ্জের অধিকারে। দরিয়ায়ও তাদেরই দাপট। সাম্রাজোর মধ্যাহ্নে ৩৭০০ লক্ষ মানুষ মানচিত্রে রক্তবর্ণে লাঞ্ছিত দেশগুলােতে বাস করেন। তার মধ্যে ৫০ লক্ষ মাত্র শ্বেতাঙ্গ। এই সাম্রাজ্যের সামগ্রিক উৎপাদন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অবশিষ্ট দুনিয়ার চেয়ে বেশি। সত্য, সেখানে নির্মম বলপ্রয়ােগ ছিল, নিষ্ঠুরতা ছিল, বর্ণবিদ্বেষ ছিল, অবিচার-অত্যাচার ছিল, সর্বোপরি ছিল লুণ্ঠন! তবু ইংরেজের কৃতিত্ব কোনও বিচারেই অস্বীকার করার উপায় নেই।

বিশাল ভারতীয় উপমহাদেশে শ্বেতাঙ্গ পুলিশবাহিনীতে যত মানুষ ছিলেন, বলতে গেলে তা ব্রিটেনের পুলিশবাহিনীর সমান। ব্রিটিশ বাহিনীতে শ্বেতাঙ্গের সংখ্যা কখনও নাকি এক লক্ষের বেশি ছিল না। তা সত্ত্বেও সাম্রাজ্যের রথ চলেছে মােটামুটি মসৃণভাবে। বিরােধ, বিদ্রোহ, বিস্ফোরণ— সবই ঘটেছে; তবু উনিশ শতকের অনেকখানি জুড়ে সাম্রাজ্য-নির্মাতা এবং সেবকে ছিলেন তৃপ্ত? কোথায় বা এই সাফলাের চাবিকাঠি! কেনই বা এমন প্রশান্তি। অ্যান্টন জিল লিখেছেন, ১৭৫০ থেকে ১৮৫০-এর মধ্যে যে ইংরেজ সন্তান তরুণ ছিলেন, যার সামান্য শিক্ষাদীক্ষা ছিল, তিনি রীতিমতাে ভাগ্যবান। সাত সমুদ্র তেরাে নদীর তরঙ্গকে শাসন করছে ব্রিটানিয়া, পাউন্ড স্টার্লিং শাসন করছে বিশ্বের অর্থনীতি। ব্রিটিশ তরুণের সামনে অ্যাডভেঞ্চারের অপূর্ব সুযােগ! শুধু আত্মিক উন্নতি নয়, অর্থ বিত্ত উপার্জনের জন্যও সামনে ছড়িয়ে রয়েছে বিন্তীর্ণ জগৎ। অধিকাংশ পশ্চিমি মানুষের কাছে দেশ ছেড়ে বেরিয়ে পড়ার তাড়না ছিল, এক দিকে অ্যাডভেঞ্চারের হাতছানি, অন্য দিকে ধনদৌলতের স্বপ্ন। স্বদেশের জীবনযাপন সহজ ছিল না। রুজি-রােজগারের পথে অসুবিধা ছিল; তা ছাড়া শ্রেণী-বিভক্ত ব্রিটিশ সমাজে সচলতার সুযােগও ছিল কম। তবে নতুন স্বপ্নের পথেও বাধাবিঘ্ন ছিল। প্রথমত, দূরত্ব। গন্তিকর দুর্গম সমুদ্রযাত্রা! নিরাপদে পৌঁছতে পারলে সেখানে অপেক্ষা করে আছে অচেনা পৃথিবীর বিপরীত পরিবেশ। অপরিচিত সমাজ এবং সংস্কৃতি। অপরিচিত মানুষজন, অজানা ভাষা, অচেন্নাদ্য, জল-হাওয়া, ব্যাধি, কীটপতঙ্গ। তবু সাম্রাজ্যের হাতছানি যেন অপ্রতিঞ্জে অ্যান্টন জিল বলছেন, বিপরীত পরিবেশ-পরিস্থিতিতেও অভিযাত্রী ব্রিটিশ গুণের সামনে সেদিন খােলা অজস্র সহস্রবিধ পথে চরিতার্থতার পথ। সে-পথে আরও অনেক কিছু প্রাপ্তির মতাে যৌনতারও মুক্তি। লেখক তন্য’ন্য কারণের মধ্যে এক স্থান নিতে চান গুরুত্বের সঙ্গে। তার ভাষায়, ‘অ্যানাদার ভেরি অবভিয়াস, ইভন সেন্ট্রাল অ্যাট্রাকশন ওয়াজ— সেক্স।

ভিক্টোরিয়ান ব্রিটেনে সবচেয়ে গুরুতর পাপ যেন যৌনতা। যৌনতাকে অবদমন করা বলতে গেলে সেদিন জাতীয় নেশা। যতভাবে পারা যায়, যেভাবে পারা যায়, ওই অপরিহার্য, অপ্রতিরােধ্য অথচ নীচ ও অশুদ্ধ প্রবণতাকে দমন করতে হবে। সর্বশক্তি দিয়ে করতে হবে গোপন। শুচিবায়ুগ্রস্ত ওই সমাজে তরুণ-তরুণীদের পক্ষে সুস্থ স্বাভাবিক জীবনযাপন করা বলতে গেলে প্রায় দুঃসাধ্য। বিদেশে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ অন্যরকম। সেখানে নৈতিকতার বিধিনিষেধ মানুষকে পঙ্গু করে রাখে না। সেখানে মুক্ত হাওয়া, অবাধ স্বাধীনতা। সুতরাং ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়া বাইরে!
ইংল্যান্ডের পরিবেশ-পরিস্থিতি কতখানি কঠোর ছিল, দু’-একটি তথ্য থেকেই তা বােঝা যায়। ১৮৭৫ সালে মেয়েদের বিয়ের বয়স যখন বারাে থেকে বাড়িয়ে তেরাে করা হয়, তখন দেশ জুড়ে প্রবল প্রতিবাদ। এই বয়স পনেরাে-য় টেনে নিতে সময় লেগেছিল দশ বছর। সেবারও তুমুল প্রতিবাদের ঝড় বয়ে যায়। ইউরােপের কোনও কোনও দেশে সমকামিতা তথন অনুমােদন লাভ করেছে। কিন্তু ইংল!ন্ডে শব্দটি উচ্চারণযােগ্য নয়। মেয়েদের মধ্যে বিশেষ সম্পর্ক তাে স্বপ্নেও চিন্তা করা চুড়ান্ত অনৈতিকতা। দিকে দিকে নিষেধের কুটি রকমারি ট্যাবু’। বাংলা পঞ্জিকার মতো কি সিদ্ধ কি অসিন্ধ, নীতিবাগীশদের মুখে সততার ফতােয়া। অন্য দিকে ভারত কি মুক্ত দুনিয়া নয়? সেখানে রয়েছে খাজুরাহো, কামসূত্র এবং তাম্রবর্ণ নর্তকীর দল—’নচগর্লস’। সেখানে বিয়ের বয়স নিয়ে যেমন কারও মাথাব্যথা নেই, তেমন কার ঘরে ক’টি বিবি তা নিয়েও কোনও গুঞ্জন নেই। ফলত, উনিশ শতকের অভিযাত্রী ইংরেজ যুবকের কাছে ভারত এক সব-পেয়েছির দেশ যেন।

উনিশ শতকের তুলনায় অষ্টাদশ শতকের ব্রিটেনের নৈতিকতা অবশ্য অন্যান্য ইউরােপীয় সাম্রাজ্যবাদী সমাজের মতােই অনেক ঢিলেঢালা ছিল। ওলন্দাজ, ফরাসি, পর্তুগিজ এমনকী জার্মানরা ছিলেন নর-নারীর সম্পর্ক বিষয়ে উপনিবেশগুলােতে বেশ উদার। ইংরেজের কাছেও তখনও কোম্পানির কর্মচারীদের নৈতিকতা বা ব্যক্তিগত চরিত্র নিয়ে বিশেষ দুর্ভাবনা ছিল না বলেই মনে হয়। পরিস্থিতি পালটে যায় উনিশ শতকে, ভিন দেশের মাটিতে সাম্রাজ্যের পতাকাদণ্ডটি ঠিকঠাক স্থাপন করার পর। অষ্টাদশ শতকের ভারতে একবার উকি দিলেই সেটা বোঝা যায়।

বলতে গেলে ভারতীয় সেই ‘বিবি’দের যুগ। সে যুগের কথা এর আগে মিলড্রেড আর্চার চিত্রসহযােগে কিছু আলােচনা করেছেন। আলােচনা করেছেন অন্যরাও। অ্যাণ্টন জিল তদুপরি কিছু নতুন সংবাদ দিয়েছেন। ডিউক অব ওয়েলিংটনের বড় ভাই রিচার্ড ওয়েলেসলি ভারতে গভর্নর জেনারেল ছিলেন ১৭৯৮ থেকে ১৮০৫ সাল পর্যন্ত। কলকাতার এই রাবন তার আমলেই গড়া। তার আমলেই বিশাল ভারতের তিন ভাগের দু’ ভাগ এলাকায় কোম্পানির আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। তাঁর প্রথম স্ত্রী ছিলেন ইংরেজ-কন্যা। বিয়ের আগেই ওয়েলেসলি তাকে পাঁচটি সন্তান উপহার দিয়েছিলেন। সে মহিলা স্বামীর সঙ্গে ভারতে আসতে রাজি হননি। সুতরাং কলকাতায় ওয়েলেসলির প্রথম দু বছর কাটে নিঃসঙ্গ অবস্থায়, রাজকার্যের ব্যস্ততায়। কিন্তু বরাবর নয়। ওয়েলেসলি নাকি শহরের লাল আলাের বৃত্তে ছায়ার মতো ঘুরে বেড়ান। তাঁর আরও একবার বিয়ে হয়েছিল বটে, রক্ষিতাও ছিল বেশ কয়েকজন। সফল তৃপ্ত জীবনের ছেদ পড়ে তিরাশি বছর বয়সে। ১৮১২ সালে ভারতীয় বিবি নিয়ে ঘর করেছেন, দিল্লিতে কোম্পানির রেসিডেন্ট সুশিক্ষিত চার্লস মেটকাফ। আট বছর ধরে এই ঘরকন্নার ফলে ভারতীয় জননীর গর্ভে তিনটি পুত্রসন্তান লাভ করেন তিনি। তাঁর উত্তরসুরি দিল্লির আর-এক রেসিডেন্ট উইলিয়াম ফ্রেজারও ছিলেন বিবিবিলাসী ইংরেজ। তার ছয়-সাতজন ভারতীয় বিবি ছিলেন। তিনি তাদের নিয়ে নবাব-বাদশার মতাে হারেম সাজিয়ে বসেছিলেন। একজন সমসাময়িক ইউরােপীয় পর্যটক তার ঘরকন্না দেখে লিখেছিলেন, পারস্যরাজের মতােই অগণিত সন্তান ছিল মেটকাফের।

এ-ধরনের আরও অনেক ইউরােপীয়ের কাহিনী রয়েছে ইতিহাসে, যারা অষ্টাদশ শতকে দেশীয় বিবি নিয়ে সানন্দে ঘর করে গেছেন। এবং প্রকাশ্যে লজ্জা ঘৃণা ভয় (অর্থাৎ, পাপ-ভয়) কিছুই ছিল না তাদের। আমরা কলকাতায় অ্যাটর্নি উইলিয়াম হিকির কাহিনী।জানি। তাঁর বন্ধু মুর্শিদাবাদে কোম্পানির রেসিডেন্ট বব পটও ছিলেন বিবিবিলাসী। মারাঠা দরবারে ইংরেজ প্রতিনিধি উইলিয়াম পামার, নিজাম দরবারে কর্নেল কাকপ্যাট্রিক, লখনউ-এ লা মার্টিন সাহেব ছাড়াও অ্যাস্টনি পােলিয়ের, শিল্পী টিলি কিটল এবং আরও অনেকেই ছিলেন তাম্রবর্ণা ভারতীয় সুন্দরীদের অনুরাগী। কিপলিংয়ের কবিতায় পরামর্শ ছিল, ‘অ্যা ম্যান শুড, হােয়াটএভার হ্যাপেনস, কিপ টু হিস ওন কাস্ট, রেস অ্যান্ড ব্রিড! লেট দ্য হােয়াইট, গাে টু দ্য হােয়াইট, অ্যান্ড দ্য ব্ল্যাক টু দ্য ব্ল্যাক। এ-সব উনিশ শতরে সাহেবি কানমন্ত্র। আগের শতকে সাহেবটোলায় স্লোগান-‘অ্যান্ড দ্যাট উই আর যার ফ্রম দ্য লিপস উই লাভ উই মেক লাভ টু পিপলস দ্যাট আর নিয়ার!

ধীরে ধীরে সেই বন্ধনহীন স্বাধীনতার দিন ফুরিয়ে এল। এক কারণ, পরদেশে আধিপত্য কায়েম হয়েছে। সাম্রাজ্যের ভিত মােটামুটি। শাসক এবং শাসিতের, বিজেতা এবং বিজিতের মধ্যে ভেদরেখা স্পষ্ট। এমন সময়ে রাজা আর প্রজার মধ্যে অবাধ মেলামেশা ক্ষতিকর। তাতে অহমিকাবােধ খর্ব হয়। প্রজাদের মধ্যে এই ধারণা সঞ্চারিত করা দরকার যে, ভিনদেশি শাসকেরা অন্য মানুষ। তাদের গায়ের রং আলাদা, ধর্ম আলাদা, ভাষা আলাদা, সভ্যতা-সংস্কৃতিও আলাদা। তাদের নৈতিকতা, মূল্যবােধ, দৈনন্দিন জীবনযাত্রাপ্রণালী সবই নেটিভদের থেকে স্বতন্ত্র। এই স্বাতন্ত্র্য এমনকী যৌন জীবনেও। সুয়েজ জাহাজ চলাচল শুরু হওয়ার পরে এই ধারণাটি বিশেষভাবে শাসক মহলে দানা বেঁধে ওঠে। খাল বেয়ে ইংরেজ মেয়েদের ভারত অভিযান শুরু হয়। সুয়েজ দিয়ে প্রথম জাহাজ চলতে শুরু করে ১৮৩০ সালে। অবশ্য ‘পি অ্যান্ড ও’-র জাহাজের আসা-যাওয়া শুরু হয় চার দশক পরে, ১৮৭০ সালে। এই জলপথে ঝক ঝক অবিবাহিত ইংরেজ মেয়ে পৌছয় ভারতের উপকুলে। তারা স্বপ্নের পৃথিবীতে সহল ইংরেজ যুবাদের বিয়ে করে সুখে সংসার করতে চান। পূর্ববঙ্গে কুলীন বরের সন্ধানে বেরিয়ে পড়া ব্রাহ্মণ কন্যাদের নাকি এসময়ে বলা হত ‘ভরার মেয়ে’। কনে-বোঝাই পশ্চিমি জাহাজগুলােকে তেমনই বলা হত ‘ফিশিং ফ্লিট’– জেলে ডিঙির বহর। স্বভাবতই নেলি মেয়েদের নিয়ে ঘরকন্না তখন খুবই অসামাজিক এবং অভব্য ব্যাপার। যারা পরিবর্তিতপরিস্থিতিতেও এদেশের মেয়েদের কাছে সমর্পিতপ্রাণ, তাদের বলা হত ওরা ‘নেটিভহয়ে গেছে, ‘গন-নেটিভ’। স্বভাবতই “স্লিপিং ডিকশেনারি’ বা দেশি বিবির আড়ালেল যেতে থায়েন, সাহেবের ঘর আলাে করতে পটের বিবি হয়ে বসেন ইংরেজ মেলেৰী।

কেমন মেয়ে তারা? ভিক্টোরিয়ান নৈতিকতায় লালিত পুরুষদের মতােই তারাও একই সমাজ-সংস্কৃতির অবদান। পুরুষেরা সযত্নে তাদের গড়ে তুলেছিলেন বিশুদ্ধতার প্রতীক হিসাবে! ইংরেজ মেয়ে মানে শুধু সদাচারী বােন, মা অথবা স্ত্রী। বিবাহিত মেয়েরা সন্তানের অভিভাবক, স্বামীর নৰ্মসহচরী। তিনি পবিত্রতার প্রতিমা। ইংরেজি গেলােপ’ও বলা চলে তাদের। সুতরাং বিপরীত জলহাওয়া থেকে যেমন করে হােক তাঁদের রং, রূপ, সৌরভ বাঁচাতে হবে। অসংখ্য দাসদাসী-পরিবৃত এই গোলাপের তবু সবসময়ে অমলিন রাখতে পারেননি নিজেদের। তাদের অনেকেই ছিলেন মানসিকভাবে স্বদেশ থেকে নির্বাসিত, বিচ্ছিন্ন, বিষ; নিঃস্পৃহ এবং উদাসীন; কেউ কেউ কুচুটে এবং খিটখিটে। অনেকেই বাড়ির কাজের লােকেদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন, অনেকেই উন্নাসিক, জাতিবিদ্বেষে ভরপুর এবং সংকীর্ণতার কবলে। তারই মধ্যে কোনও কোনও ইংরেজ নারী রীতিমতো সাহসী জীবনযাপন করেছেন অবশ্য। উপনিবেশের মানুষদের প্রতি তারা ছিলেন সহানুভূতিশীল। তাদের জীবন সম্পর্কে কৌতুহলী। স্থানীয় মানুষজনের ভালমন্দের সঙ্গেও জড়িয়ে গিয়েছিলেন কেউ কেউ। তবে বেশির ভাগ ইংরেজ মেয়েই মনের চার পাশে দেওয়াল তােলার চেষ্টা করেছেন। নিদেনপক্ষে বিচ্ছিন্নতার লাল পর্দা টেনে তার আড়ালে বাস করতে চাইতেন। সকলের নৈতিকতাও প্রশ্নাতীত ছিল না। | বায়রন লিখেছিলেন ‘হােয়ট ম্যান কল গ্যালানট্রি, অ্যান্ড গডস অ্যাড়ালটারি/ইজ মাচ মাের কমন হাের দ্য ক্লাইমেট ইজ সালট্রি উপনিবেশগুলিতেও স্বভাবতই পরকীয়া অজানা ছিল না। বড় ঘরের দুই বড় মানুষের কথাই ধরা যাক। একজন সুপরিচিত লর্ড কার্জন। তিনি ভারতের ভাইসরয় ছিলেন ১৮৯৯ থেকে ১৯০৫ সাল পর্যন্ত। দ্বিতীয়জন স্যার আলড়ে মিলনার। ১৮৯৭ থেকে ১৯০৫ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকা। ব্রিটিশ হাই কমিশনার। ওঁরা দু’জনই ইলিনর গ্লিন নামে এক রােম্যান্টির ঔপন্যাসিকের প্রেমে পড়েছিলেন। তাই নিয়ে সেদিন অজ্ঞাতনামা কবির ছড়া— ‘উড ইউ লাইক টু সিন অন আর টাইগার জিন/উইথ ইলিনর নি?? টু অর উইথ হার আপন সাম আদার কাইন্ড অব যার?’ পরবর্তীকালে মিলনার এক বিবাহিত মহিলার প্রেমে পড়েন। কে বিয়ে করার জন্য মিলনাকে দীর্ঘকাল অপেক্ষা করতে হয়েছিল। তিনি পরস্ত্রীকে নিজের ঘরে তােলেন ৬৭ বছর বয়সে; কার্জনকেও আর-একজনের প্রেমে পড়ার পর বিয়ের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছিল অন্তত পাঁচ বছর। অ্যাস্টন জিল বলছেন, “বােথ মেন হ্যাড অ, নাম্বার অব অ্যাফেয়ার্স, দো নট উইথ লে’কাল উইমেন।

উনিশ শতকে উপনিবেশগুলিতে সাহেবদের আর-এক চিন্তা ছিল কালাে মানুষদের হাত থেকে শেতাঙ্গ বিবিদের রক্ষা করা। আর-এক দুশ্চিন্তা শ্বেতাঙ্গদের হাত থেকে শ্বেতাঙ্গ বউদের রক্ষা করা। ভিক্টোরিয়ান যুগে শ্বেতাঙ্গ কিছু নৃতাত্ত্বিক রটিয়েছিলেন কৃষ্ণাঙ্গদের যৌনতা এবং ক্ষমতা দুই-ই বেশি। আফ্রিকার উত্তমদে বসনহীন কৃষ্ণাঙ্গ ভেনাসদের দেখে আকর্ষণ বােধ করার সঙ্গে সঙ্গে আতঙ্কে আঁতকে উঠছিলেন কেউ কেউ। কেননা, তাদের ধারণা, সুযােগ পেলে শ্বেতাঙ্গ মেয়েরও হয়তােক এভাবে উদ্দাম প্রকৃতির সন্তানে পরিণত হবেন ! আফ্রিকায় ধর্ষণ, এমনকী ধর্ষণের পর অভিযােগে কৃষ্ণাঙ্গদের জন্যে মৃত্যুদণ্ডের বিধান ছিল। ধর্ষণ শব্দটা পরাজয়সুচকনও মেমসাহেব বা তার রক্ষাকর্তা প্রকাশাে ‘তা স্বীকার করতে রাজি হবেন না সুলুক ধর্ষণের চেষ্টা ধর্ষণেরই শামিল। ঐতিহাসিক বলেন, না জানি কত নিরপরাধ কৃষ্ণাঙ্গকে এই অভিযােগে যুঠাসি দেওয়া হয়েছে! ভারতেও ইংরেজ মহিলালের ভাবমূর্তি অম্লান রাখার জনা সে কী প্রাণপণ চেষ্টা : ১৯২৬ সালেও দেখি একজন ইংরেজ বিশপ বছেন, ভারতে আমেরিকান চলচ্চিত্র দেখানাে উচিত নয়, তাতে চাঞ্চল্যকর গুন ছাড়াও রকমারি অপরাধ, প্রেম এবং বিবাহবিচ্ছেদ ইত্যাদি থাকে। ফলে, ভারতীয় দর্শকদের চোখে শ্বেতাঙ্গ নারীর ভাবমুর্তি বিনষ্ট হয়। তার দু’ বছর আগে লন্ডনের ‘দ্য টাইমস’ কাগজে একই বিষয়ে এক আলােচনা প্রকাশিত হয়েছিল। বলা হয় একজন শ্বেতাঙ্গ অফিসারের স্ত্রীকে নেটিভরা অপহরণ করে। সেটি আমেরিকান চলচ্চিত্র দেখারই ফল। তারও আগে একই বিষয়ে ‘ওয়েস্ট মিনিস্টার গেজেট’-এ তুমুল আলােচনা হয়ে গেছে। তাতেও জনৈক লেখক সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন, পশ্চিমের রীতিনীতি, নৈতিকতা, মেয়েদের পােশাক-আশাক, সর্বোপরি অবিশ্বস্ত স্ত্রী এবং নৈতিকতাবর্জিত স্বামীকে কাণ্ডকারখানা চলচ্চিত্রে দেখানাে হলে নেটিভরা কী ভাববে! বিশেষত, ওদের শরীর যত পুষ্টই হােক, মস্তিষ্ক যখন বিচারবুদ্ধিহীন। ১৯১০ সালে শরীরী নৃত্যে পটু মট অ্যালেন-এর ভারতে আগমন উপলক্ষে অতএব রীতিমতো কোলাহল! ‘তরুণ ভারতীয়রাও নিশ্চয় টিকিট কাটবে এই কাম-নৃত্য দেখার জন্য। শেষ পর্যন্ত নর্তকীর তার এদেশে আসা হয়নি।

করে স্থির দাড়িয়ে থাকতে পারেন। ভারতীয় রাজা-মহারাজ’রা হামেশাই ব্রিটেন থেকে রূপসী ইংরেজ দুহিতাকে নিয়ে ঘরে ফিরতেন। ১৮৯৩ সালে পাতিয়ালার মহারাজা যখন
একজন ইংরেজ মেয়েকে বিয়ে করেন, তখন লর্ড ল্যান্সডাউন সরাসরি জানিয়ে দেন আপনার মতাে একজন মহারাজার পক্ষে এ-মেয়ে অবশ্যই যােগ্য স্ত্রী নয়। তা ছাড়া ইউরােপিয়ানরা একটি ইংরেজ মেয়েকে একজন দেশীয় রাজার অনেক স্ত্রীর একজন হিসাবে দেখে নি খুশি হবেন না। কয়েক বছর পরে লর্ড কার্জন যখন শুনতে পেলেন যে, ঝিন্দের রাজ: একটি শ্বেতাঙ্গ মেয়েকে বিয়ে করেছেন, তখন তিনি রীতিমতাে আতঙ্কিত হয়ে ওঠেন। দেশীয় রাজা-রাজড়ারা ইংল্যান্ডে গেলে শ্বেতাঙ্গ সমাজে তাদের খাতির-যত্ন দেশে কার্জন বিপন্ন বােধ করতেন। তিনি ফতােয়া জারি করেন, ভারতীয় রাজা-রাজড়ারা শুধু বিশেষ কারণেই কালাপানি পার হতে পারবেন এবং দেখেশুনে বাছাই করে তাদের ছাড়পত্র দেওয়া হবে। কার্জন সেক্রেটারি অব স্টেট লর্ড হ্যামিলটনকে বলেন, এ বড়ই অদ্ভুত যে, শুধু বাড়ির কাজের মেয়েরাই নয়, এমনকী উচ্চবর্গীয় মেয়েরাও ভারতীয়দের কাছে নিজেদের সমর্পণ করছে। হয়তাে তাদের দীর্থ দেহ, ইউনিফর্ম ইত্যাদি দেখে তারা ভাবছে, এই সৈনিকের আছে; মুশকিল আমাদের তো মেয়েদের নিয়েই। অদ্ভুত ঘটনা এই, ‘দ্য তেজ অব হােয়াইট উওমেন রানিং আফটার ব্ল্যাক মেন!’ কখনও কখনও এই ছােটাছুটি কোনও বধাবন্ধই মানত না। এমনকী, উচ্চনীচ ভেদাভেদ পর্যন্ত লােপ পেয়ে যেত। জিল কলকাতার একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন। ঘটনাটি ঘটে ১৯৮৩ সালের মাঝামাঝি। চাঞ্চল্যকর ঘটনা। একজন সরকারি আইনজীবীর স্ত্রী মিসেজেমস হিউমকে তার বাড়ির ঝাড়ুদার হরাে মেটা (সম্ভবত হরি মেথর) ধর্ষণ করেছে স্বামী দুজনকে স্নানঘরে একসঙ্গে দেখতে পান। সঙ্গে সঙ্গে তিনি মেটার ওপর বঁ পড়ে প্রতিশােধ নেন। মেটা ভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচে যায়। আদালতে মামলা হয়। তো মহিলাকে ধর্ষণের চেষ্টার অভিযােগে লােকটির আট বছর সশ্রম কারাদণ্ড হয়। কি বেচারা আসলে ছিল নির্দোষ। মিসেস হিউমের সঙ্গে ছয় মাস ধরে তার গােপন সম্পর্ক চলছিল। নিজের সম্মান বাঁচাতেই হিউম মামলা দায়ের করেছিলেন। দু’ বছর পরে তিনি নিজেই লর্ড ডাফরিনের কাছে এই স্বীকারােক্তি করেন।

নেটিভদের কাছ থেকে তাে মেয়েদের ইজ্জত সব সময়ে রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। অনধিকারী শ্বেতাঙ্গদের শরনিক্ষেপও প্রতিহত করা সম্ভব ছিল না। বাবসায়ী, বাগিচামলিক, সরকারি কর্মচারী এবং অন্যান্য ইউরােপীয়রা তথ্যগতভাবে উপনিবেশগুলােতে বিয়ে করার অধিকারী ছিলেন। কিন্তু ক’জন আর বিয়ে করতে পারতেন? সাধারণভাবে সৈন্যবাহিনীতে নিয়ম ছিল সাব-অলটার্নরা বিয়ে করতে পারবেন না, ক্যাপ্টেনরা ইচ্ছে করলে বিয়ে করতে পারবেন। মেজরদের বিয়ে করা উচিত এবং কর্নেলদের অবশ্যই বিয়ে করতে হবে। কিন্তু বলাই বাহুল্য, অনেকেরই বিয়ের ফুল ফুটত না। ১৮৭১ সালে ব্রিটিশ অফিসারদের মধ্যে শতকরা ত্রিশজন মাত্র ছিলেন বিবাহিত। আর চব্বিশ বছরের নীচে যাঁদের বয়স তাদের মধ্যে শতরা মাত্র দুই ভাগের ঘরে ছিল বউ। সুতরাং এদিক-সেদিক উকি-ঝুকি দেওয়া ছাড়া গতি কী? নৈতিকতার মান ক্রমে সিঁড়ি ভেঙে নীচের দিকে যাচ্ছে দেখে কেউ কেউ পরামর্শ দিয়েছিলেন, শ্বেতাঙ্গদের সকলেরই বিয়ের ব্যবস্থা করা উচিত। সি ই ট্র্যাভেলিয়ন তাই শুনে মন্তব্য করেছিলেন। বাট হােয়ার ওয়ার ওয়াইস টু বি ফাউণ্ড ফর সাকসেসিভ রিলেস অব ৭০,০০০ মেন! স্বভাবতই ক্যান্টনমেন্টগুলিতে ব্যাচেলরই থাকতেন বেশি, বউ কম। আর সে-কারণেই শহরে বা ছাউনিতে সুদর্শনা শ্বেতাঙ্গিনীটি হয়ে দাড়াতেন সকলের চোখের মণি। জীবনে তাদের রােমাঞ্চ ছিল বইকী! ছিল কিঞ্চিৎ ঝুকিও। স্বামীরা নানাবিধ বিধিনিষেধ দিয়ে তাদের বেঁধে রাখতে চাইতেন, তবু মাঝেমধ্যেই অন্যরকম ঘটে যেত। ভারত জুড়েও সেদিন অনেক সেজো মেজো ছােট মাপের ইংরেজ যুবাও যেন এক-একজন লর্ড কার্জন কি আলফ্রেড মিনার। পাটি, ক্লাব, অ্যামেচার থিয়েটার এবং সামাজিকতার। নানা সূত্রে গোৱা বিবিরা অন্য পুরুষদের সঙ্গে মেলামেশার যে সুযােগটুকু পেতেন তার অন্যরকম সদব্যবহারও তারা কখনও-সখনও করতেন বইকী। এলাহাবাদের ‘দ্য পাইওনিয়ার’ কাগজ ১৮৮২ সালে লিখেছিল ভ’রতে ইংরেজ সাজ অনেক বেশি খােলামেলা। এখানে শ্বেতাঙ্গ নারীপুরু ব্রিটেনের তুলনায় অনেক বেশি একসঙ্গে মেলামেশার সুযােগ পান, ফলে এখানে প্রেমপ্রণয় তথা ফস্টিনষ্টি এক উপভােগ্য ক্রীড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবশ্য কখনও কখনও অন্যরকমও ঘটে। মেয়েটি যদি নির্বোধ হয়, এবং যুবক অনভিজ্ঞ, তবে পরিণাম যে খারাপ হবে, তাতে আর অবাক হওয়ার কী আছে? সিমলায় অনেক কাণ্ডই হত। স্বামীরা হয়তাে রােদে পুড়ে ঘেমে-নেয়ে দূরে সতলে কোথাও সাম্রাজ্য গড়ার কাজ করছেন, বউ তখন শীতের সিমলায় আনন্দ উপভােগ করছেন। দা ট্রাক টার্ট’! ‘বেটি-বেড আন-ব্রেকফাস্ট’ এ-সব নাকি কোনও কোনও হিল স্টেশনের বাের্ডিং হাউসের ডাকনাম। কলকাতার একজন যৌন ক্ষ্মীকে কে যেন প্রশ্ন করেছিলেন, তুমি সিমলায় গেলে না? তার সহাস্য উত্তর, ‘উই শুভ হাতনাে চান্স উইথ দা অ্যামেচার! | ওঁরা স্বজাতির মেয়ে। খাঁটি ইংরেজ কন্যা। ভারতের আংলাে-ইন্ডিয়ার তাে হলেও রক্তে খাটি ইংরেজা নয়। সুতরাং তাদের সঙ্কেমলামেশা মাখামাখি যতই চলুক, বিয়ের প্রশ্ন ওঠে না। যদি বা বিয়ে হয়, অধিকাংশ স্বাক্ষর সন্তানসন্ততিসহ তাদের ফেলে রেখে নিজের দেশে ফিরে যান। ঔপনিবেশিক যুসের নারীর সম্পর্কের ইতিহাসে অংলাে-ইণ্ডিয়ানসের কাহিনী বিশেষ করে করুণ। ওঁরা সর্ব দিয়েও বলতে গেলে কিছুই পাননি। সেকালে যদি বা পেয়েছেন, একালে কিছুই নয়। | মার্টিন শ’ খাটি ইংরেজ। এই শতকের প্রথম দিকে তিনি এদেশে এক বড় সওদাগরি অফিসে কাজ করতেন। অন্যান্য অফিসারদের সঙ্গে বাস করতেন বোম্বাইয়ের এক বাড়িতে। মাটিন শ’ একসময়ে সেখান থেকে উঠে এসে এক অংলাে ইন্ডিয়ান পরিবারে পেয়িং গেস্ট হিসাবে বাস করতে শুরু করেন। পলিন সে-বাড়ির রূপবতী অষ্টাদশী মেয়ে তার মাথায় সোনালি চুল। যদিও জন্ম তার ভারতে। সে লেখাপড়া শিখেছে ইংল্যান্ডে। তার বাবা টেলিফোন কোম্পানিতে কাজ করেন। মা ছিলেন আধা গ্রিক। মার্টিন শ’ দেশে ফেরার সময় পলিনের আঙুলে আংটি পরিয়ে দিয়ে যান। সে বাগদত্তা। কিন্তু আরও অনেক খাটি ইংরেজের মতাে মার্টিনের মনে প্রশ্ন—পলিন কি খাঁটি ইংরেজ? ভাবতে ভাবতে একসময়ে তিনি মরিয়া হয়ে ওঠেন। পলিনের বাবাকে প্রশ্ন করেন—আপনাদের মধ্যে কি ইউরােপিয়ান রও আছে? ভদ্রলােক প্রথমে চুপ করে থাকেন মার্টিন সাহেব ধরে নেন, অনিশ্চয়তার দিন শেষ। শেষ হয়ে গেল তার সুখের দিনও। পলিনের বাবা হঠাৎ ফেটে পড়লেন, আমার মধ্যে কালাে-সাদা-হলুদ পীত বা অন্য শেনও রক্ত আছে কি না আমি তা নিয়ে তােমার সঙ্গে কথা বলতে চাই না। তুমি এখান থেকে বেরিয়ে যাও। তিনি পলিনকে বললেন, আংটি ফিরিয়ে দিতে। হঠকারী মাটিন শ’ তার পরও পলিনকে প্রশ্ন করেন, তুমি কি খাটি শ্বেতাঙ্গ? সে কোনও উত্তর দেয় না। শুধু বলে তুমি আমাদের গোটা পরিবারকে অপমান করলে মাটিন দেশে ফিরে যান। সেখানেই তিনি বিয়ে করেন। ভারতে তার অভিজ্ঞতার প্রতিটি ঘটনা সবিস্তারে তিনি চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন দেশে তার মা-বাবাকে। কন্যার সূত্রে সেই পত্রাবলি আজ ঔপনিবেশিকতার ইতিহাসে দরকারি দলিল। কনা বলছেন, বাবার উচিত ছিল সেই মেয়েটিকে বিয়ে করে দেশে নিয়ে আসা। কিন্তু উচিত-অনুচিত নিয়ে ভাববার সময় কোথায় খাটি ইংরেজদের দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়কার স্মৃতিচারণ করেছেন একজন অ্যাংলাে-ইন্ডিয়ান মহিলা। তিনি তখন লখনউতে। বলছেন, হজরতগঞ্জে নাচের হলে ইংরেজ সৈন্যরা অ্যাংলাে-ইন্ডিয়ান মেয়েদের নিয়ে যা-তা করত। টানাহ্যাচড়া তাে বটেই, এমনকী শারীণিকভাবে নির্যাতন পর্যন্ত। যাকে বলে যৌন পীড়ন। এজন্য আমি ওদের ঘৃণা করতাম। শেষ পর্যন্ত ওরা যখন চলে যেত, তখন এই মেয়েরা বিশেষ করে বাচ্চা কোলে বউ কাদতে কাদতে তাদের বিদায় জানাতেন। বলতেন, বিল তুমি ফিরে এসাে, ফিরে এতাে কিন্তু। এবং সৈন্যরা উত্তর দিত— হঁ্যা, জেন, অমরা ফিরে আসব। কিন্তু কোনওদিন ওঁরা ফেরেননি।
“I naturally prefer to satisfy myself with a woman, a friend and a lady of my own class, but in the absence of the best I gladly take the next best available, down the scale from a lady for whom I do not care, to prosititutes of all classes and colours, men, boys and animals, melons, and masturbation – 3 tie 3 শতকের একজন ইংরেজ ঔপনিবেশিকের। সুতরাং শুধু খাঁটি ইংরেজি গােলাপ বা আংলাে-ইন্ডিয়ান সুন্দরীদের চার পাশে ঘুরপাক খেয়ে হয়রান হবেন কেন! সথায় থাক ভিক্টোরিয়ান নৈতিকতা। চুলােয় যাকুরেঅলাদের নীতিকথা। অ্যান্টন জিল বলছেন, উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আপত্তি সত্ত্বেও কউ কেউ নেটিভ মেয়েদের নিয়ে বসবাস করতেন। যথা— উত্তর রোডেশিয়’র ‘নেটিভ কমিশনার পাক্কা সাহেব জে ই চিরুপেলে স্টিভেনসন। তার একটি স্থানীয় ‘স্লিপিং-ডিকশেনারি’ বা বিবি ছিল। সরকারের তরফে প্রশ্ন তােলা হলে তিনি চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে নিজের মতাে করে থাকতে শুরু করেন। তিনি জীবনাচারে খাঁটি ইংরেজ ছিলেন। পােশাক-আশাক চাল-চলনে, সভ্যতা-সংস্কৃতিতে যাকে বলে যােলাে আনা অ্যাংলাে-স্যাক্সন। ব্যতিক্রম শুধু নারী-রুচিতে। তিনি নাকি বেশ কয়েকজন স্থানীয় কৃষ্ণাঙ্গ মেয়েকে বিয়ে করেন। আটজন কন্যাসন্তানের গর্বিত পিতা তিনি। কেনিয়ায় ক্যাপ্টেন ডবলিউ আ সি হিউজেস নামে এক ইংরেজের নামই হয়ে গিয়েছিল ব্ল্যাক হিউজেস’। তিনি প্রগশােই একটি কালাে মেয়েকে নিয়ে বাস করতেন। তার চেয়েও অবাক করা ঘটনা ঘটেছে আফ্রিকায়। কেমব্রিজে পড়া একটি ইংরেজ মেয়ে তার প্রেমিক স্বামীর সঙ্গে পাের্ট হে পেীছে শেষ পর্যন্ত বুঝতে পারেন ভালবাসার সম্পর্ক হলেও তার সঙ্গে ঘর করা যায় না। শিক্ষিত স্ত্রী যা-ই করতে চান, স্বামীর তা না-পছন্দ। এমনকী শােওয়ার ঘরেও তিনি যেন কালাে মেয়ে পেলেই খুশি হন বেশি। পরিস্থিতি দেখে অসহায় মেয়েটিকে একজন ওপরঅলা সাহেব কিছুদিনের জন্য দূরে সরিয়ে নিয়ে যান। মাস-দুই পারে আবার স্বামী-স্ত্রীর দেখা। স্বামী বলেন, স্থানীয় রীতি অনুযায়ী একটি আফ্রিকান মেয়েকে তিনি বিয়ে করেছেন এবং তাকে নিয়ে বেশ সুখেই আছেন। ১৯০৫ সালে কেনিয়ায় আরও একটি ঘটনা ঘটে। স্থানীয় একজুন পুলিশ অফিসারের স্ত্রীর সঙ্গে পরঅলার এক সাহেবের ভাবভালবাসা হয়। তাই দেখে আঃ-এক সাহেব কর্তৃপক্ষের কাছে নালিশ করেন। শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ পার্লামেন্টে
নেটিভ নারীর সঙ্গে শ্বেতাঙ্গ কর্তৃপক্ষের বিয়েশাদি নিয়ে জোর এক পশলা বিতর্ক হয়ে যায়। সেক্রেটারি অব স্টেটস লর্ড কেরু ১৯০৯ সালে উপনিবেশগুলিতে ব্রিটিশ নাগরিকদের নৈতিকতা রক্ষার লক্ষ্যে এক ফতােয়া জারি করেন। কী করা উচিত, কী নয়, নিয়ম ভঙ্গ করলে সাজা কী, সবই বলা হয়েছিল সেই সর্বজনীন হুকুমনামায়। কিন্তু কাজ খুব হয়েছিল বলে মনে হয় না। কেননা, তার পরেই দেখি ভারতের ঔরঙ্গাবাদে নিযুক্ত এক সাহেব রীতিমতো বড়াই করে বলছেন, ‘মহকুমা শহর সীতামারি চমৎকার জায়গা। আমি দিনভর সেখানে কাজ করেছি, রাতভর আমােদ।’ অান্টন জিল ভারতে আরও দুই সাহেবের বিবি-বিলাসের একটি কাহিনী শুনিয়েছেন। এ-ঘটনা উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ের। ক্যাপ্টেন ওয়াল্টারস এবং ডক্টর নেল দুই বন্ধু। ডা. লেন-এর একজন দিশি বিবি ছিল। ছুটিতে দেশে যাওয়ার সময়ে তাকে দেখাশোনার ভার তিনি দিয়ে যান ক্যাপ্টেন ওয়াল্টারসকে। এই বিবির সঙ্গে তারও পরিচয় ছিল। কিন্তু নেল-এর অনুপস্থিতিতে সে-পরিচয় অন্য মােড় নেয়। বিবি বলে, নেল তাকে মারধর করেন, সে আর তাঁর কাছে যাবে না। ফলে, নেল ফিরে আসার পর এক বিবিকে নিয়ে দুই বন্ধুর মধ্যে রীতিমতাে মারামারি। সাহেবপাড়ায় স্ক্যান্ডাল। শেষ পর্যন্ত দু’জনের জীবনই ওপরঅলাদের হস্তক্ষেপে কার্যত বরবাদ। অ্যান্টন লি ইচ্ছে করলে এ-ধরনের আরও কাহিনী শােনাতে পারতেন। মার্গারেট ম্যাকমিলান-এর লেখা “উওমেন অব দ্য জাজ’-এর কথা মনে পড়ছে। তিনি । লিখেছিলেন, সরকারি নির্দেশ যাই হােক, বিশ্বের্য চা-বাগানে শ্বেতাঙ্গরা তার খুব একটা তােয়াক্কা করতেন না। বুদ্ধিমতী ইউরােপিয়ান মেয়েরা এদেশে স্বামীর ঘর করতে এসে বিবির সন্ধান পেলে পেনশন দিয়ে তুলে বিদায় করতেন। একবার একটি মেয়ে এসে দেখেন তার পতিদেবতার ছয়-ছয়টি সন্তান রয়েছে বাগানের এক মেয়ের ঘরে। তিনি বিবাহবিচ্ছেদ ছাড়া এই নেশা কাটাবার আর কোনও পথ খুঁজে পাননি। আর-একটি মেয়ে নববধু হয়ে ভারতে স্বামীর এই পরিচয় পেয়ে লজ্জায়, অপমানে, ক্ষোভে, দুঃখে আত্মহত্যা করেন।

অষ্টাদশ শতকে ইংরেজ অভিযাত্রীর সঙ্গে উনিশ শতকের ভিক্টোরিয়ান ইংরেজ অভিযাত্রীর নৈতিকতার পার্থক্য বােঝাতে একজন ঐতিহাসিক লিখেছেন, অষ্টাদশ শতকে কোনও ইংরেজ সৈন্য ফরাসিদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে যাওয়ার সময়ে পাঠ্য হিসাবে অনায়াসে যোনি হিল’ সঙ্গে নিয়ে যেতেন। সেই বিখ্যাত বইটি, যাতে একজন ইংরেজ যৌন কর্মী সাধারণ আমােদিনী থেকে নিজেকে উন্নীত করেছিলেন সমাজের ওপরতলার এক নায়িকা হিসাবে। আর উনিশ শতকে সেই সৈনিকই বুয়র যুদ্ধে ‘ফেনি হিল’ সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবতে পারতেন না। তার থলিতে থাকত ‘থ্রি মেন ইন আ বােট। দেশপ্রেমের আদর্শবান ধর্মপ্রাণ কর্তব্যপরায়ণ ইংরেজ যুবকের কাছে উনিশ শতকে এমনটিই প্রত্যাশা করত তার স্বদেশ ও সমাজ। কিন্তু ভারত তথা বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্যের খােলা হাওয়ায় বিপুল বৈচিত্রে এবং রকমারি প্রলােভনের হাতছানিতে পড়ে সে যুবকের পক্ষে নিজের আদর্শ ভাবমূর্তিটি অটুট রাখা শক্ত ছিল বইশ। বিশেষত, ভারত এমন এক দেশ যেখানে কামনা-বাসনা নিন্দিত নয়, জীবনের পক্ষে বাঞ্ছিত বলে গণ্য। ধর্ম, অর্থ, কাম এবং মােক্ষ ভারতীয় হিন্দুর কাছে ধর্মতুল্য। সুতরাং ইংরেঞ্জ ৩রুণের পায়ের তলা থেকে মাটি ধীরে ধীরে সরে যেতে থাকে, সে বুঝি বা ডুবে যায় আনন্দ সাগরে। পদারে তার উৎসাহে ঘাটতি নেই, আপত্তি নেই অসবর্ণ। দেশি বিবি, অ্যাংলাে-ইণ্ডিয়ান বান্ধব৷ এবং দেশীয় প্রেমিকা যদি না জোটে তা হলে উবেগের কিছু নেই। উনিশ শতকের ইংরেজ অভিযাত্রীদের কাছে আয়া, দুধওয়ালি, ঘেসডে, জেলেনি, ফেরিওয়ালি, ঝাড়ুদারনি, তাঁতি কোনও মেয়েই অচ্ছুৎ নয়। কেউ কেউ তো ভারতীয় ঘেসুড়ে নারীর রূপ বর্ণনা করতে গিয়ে উচ্ছ্বসিত। সাহেবকুঠির আয় বা খিদমতগার বাবুর্চিরা সাহেবের পছন্দমতাে মেয়েদের সংগ্রহ করে আনত। সাম্রাজ্যের অন্যত্রও একই কাহিনী। কেনিয়’য় কেরুর সার্কুলারের পর গেভাঘ’ন নামে এক সাহেবের জবানব; একটি মেয়ের কথা সানন্দে আমি মনে রেখেছি। বেশ কয়েক বছর সম্পর্ক ছিল আমাদের। সে তার নিজের গ্রামে নিজের পরিবারের সঙ্গে বাস করত, ‘আমি আমার কুঠিতে। এটাই ছিল নিয়ম। বােঝাপড়া ছিল সে কখনও সরাসরি আমার বাড়িতে এসে হাজির হবে না। বিশেষ করে বাড়িতে কোনও পাটি থাকলে তাে নয়ই। এক দিনের কথা মনে পড়ে, আমরা দুজনে একসঙ্গে আনলে সময় কাটাচ্ছিলাম, তার পর আমি বলি, অত্যন্ত দুঃখিত, আমাকে বাড়ির বাইরে খেতে যেতে হৃবে। অন্য এক সাহেব-কুঠিতে নেমন্তন্ন আছে। সেখানে খেতে খেতে আমার হাসি পাচ্ছিল। অন্য অতিথিরা যনি জানতেন, আমি কাকে বাড়িতে রেখে এসেছি এবং কার কাছে ফিরে যেতে চাইছি, তবে তারা কী ভাবতেন? এই শ্বেতাঙ্গ ভদ্রলােকের সঙ্গে আফ্রিকায় আরও কিছু কৃষ্ণাঙ্গ মেয়ের ভাব ভালবাসা ছিল । অর-একটি মেয়ে সম্পর্কে তিনি লিখছেন, সে তরুণটি ছিল খুব লম্বা, রং ছিল তার ঘাের কালাে শরীরে লম্বা পোশাক, মাথায় সিল্কের গুঞ্জ। সে ‘অসত বাস্কেট’ ফিরি করতে।… তার সঙ্গ কী আনন্দদায়কই না ছিল! আমারূএখনও মনে আছে, তার হাসি, তার কথাবার্তা, গল্পগুজব, তার অন্তরঙ্গতার কথা। তার চুল তার অসাধারণ নজরকাড়া শরীর, এমনকী তার সামনের উচু দাঁতটি পর্যন্ত আমার মা আছে, যেন গতকালের কথা।

ওরা পেশাদার যৌন কর্মী নয়। বিশেষ পরিবেশে ক্ষমতাবানের হাতে অনেকেই ছিল সহায়তার শিকার। সাম্রাজ্য শুধু এদের দিয়ে লালনপালন করা যায় না। পৃথিবী জুড়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য। সেখানে সূর্য অস্ত যায় না। ব্যবস;য়ে-বাণিজ্যে, রকমারি নির্মাণ কাজে, বাগ-বাগিচায়, খনিতে শহরে বন্দরে, লড়াইয়ের মাঠে, প্রশাসনের অনাসেকানাচে সর্বত্র ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য ব্রিটিশ নাগরিক। এক ভারতেই নাকি ২০ নৃক্ষ ইংরেজ সমাধিস্থ। এই সাম্রাজ্য গড়ার কারিগরদের অধিকাংশই ছিলেন পরিবারইন নিঃসঙ্গ পুরুষ। স্বভাবতই টুকিটাকি আয়োজনে তাদের তৃপ্ত করা সম্ভব ছিল না। তাদের সঙ্গদানের জন্য সেদিন গড়ে উঠেছিল আন্তর্জাতিক স্তরে যৌনতার বাণিজ্য। বিশ্বরণ কথাটা ইদানীং খুব চালু হয়েছে। সারা পৃথিবীকে ৬া হচ্ছে অখণ্ড এক বাজার হিসাবে। ঠিক তেমনি সেদিন ঔপনিবেশিক পৃথিবীতেও মেয়েরা পরিণত হয় এক আন্তর্জাতিক বাজারের পণ্যে। হা, পশ্চিমের শ্বেতাঙ্গ মেয়েরাও। তৎকালীন বাজারের ভাষায় এ বাণিজ্যের নাম ‘হােয়াইট সেভ ট্রাফিক’। হাজার হাজার শ্বেতাঙ্গ মেয়ে যােগ দেন সেই নিঃশব্দ অস্পষ্ট, অথচ জমজমাট আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে। বাষ্পীয় পােত এবং রেলপথের দৌলতে এক দেশের নারী দ্রুত পণ্য হয়ে পৌছে যেতেন অন্য দেশে, উপনিবেশের আমােদের হাটে। কলকাতায়ও তাদের কথা শােনা গেছে। বার বার। উনিশ শতকের শেষ দিকে ফানি অ্যাবস্টেন নামে একটি শ্বেতাঙ্গ তরুণীর কাহিনী শুনিয়েছে অ্যান্টিন। লি । এই অষ্টাদশী তরুণী চৌত্রিশ বছরের আলেকজান্ডার কান নামে এক যুবকের সঙ্গে লন্ডন থেকে নিরুদ্দেশ হন। তার বাবা কোনও এক পতিতােদ্ধার সমিতির সহায়তায় মেয়েকে খুঁজে পান বােম্বাইয়ে। সেখানে তিনি অ্যানি গুড় নামে আর-একটি সমবয়স্ক শ্বেতাঙ্গ মেয়ের সঙ্গে বাস করছিলেন। তারা দু’জনে শহরে একটি সেলুন বার চালাচ্ছিলেন। পুলিশের কাছে মেয়েটি বলেন, বােম্বাই এসেছেন তিনি স্বেচ্ছায়, এবং তিনি দিব্যি সুখে আছেন। তবু কান-এর বিরুদ্ধে নাবালিকা হরণের মামলা দায়ের করা হয়। কিন্তু অভিযােগ প্রমাণ করা সম্ভব হয়নি। শুধু কলকাতা বা বােম্বাই নয়, যেখানে ঔপনিবেশিকদের অড়া সেখানেই সাদা, কালে’, বাদামি বা তাম্রবর্ণ মেয়েদের ভিড়। স্বভাবতই সাম্রাজ্যের অন্যান্য ক্ষুধার মতে এই বিশেষ ক্ষুধা মেটাবার দায় বহন করতে হয় উপনিবেশগুলােরই। সুতরাং মানচিত্রে রক্ত-লাঞ্ছিত দেশগুলাের মতােই ঔপনিবেশিক শহরগুলােতেও সেদিন ‘লালবাজার’। একালে ‘রেড লাইট ডিস্ট্রিক্ট’ বলে শহরের বিশেষ প্রমােদ এলাকাগুলিকে চিহ্নিত করার মতােই ভারতে ঔপনিবেশিক আমলে শহরে শহরে সেই পল্লীগুলোকে সাহেবরা বললেন, ‘লালবাজার। কর্তৃপক্ষ সাধারণ ইংরেজ যুবকদের মতােই সৈন্যদেরও নৈতিক মন যারপরনাই সু-উচ্চ রাখায় যত্নবান ছিলেন। তাদের বলা হত, নিয়মিত ব্যায়াম করবে, স্বাস্থ্যসচেতন থাকবে, পুষ্টিকর খাদ্য খাবে, ঠান্ডা জলে স্নান করবে ইত্যাদি ইত্যাদি। নিষেধের মধ্যে ছিল— ব্যারাকে নিজেদের মধ্যে মারামারি বা দাঙ্গাহাঙ্গামা না করা। হুকুম ছিল-স্থানীয় মেয়েদের ওপর হামলা করবে না। এমনই আরও কিছু উপদেশামৃত। কিন্তু তারা জানতেন, এই দূর দেশে সৈন্যদের পক্ষে এ-সুপরামর্শ মেনে চলা সম্ভব নাও হতে পারে। অথচ তাদের যদৃচ্ছ স্বাধীনতা দিলে যৌনকর্ধের কবলে পড়ার সম্ভাবনা। সুতরাং এই নিয়ন্ত্রিত আমােদশালা বা লালবাজারের বেস্ত। ভারতে যেখানেই সৈনা ছাউনি ছিল, সেখানেই গড়ে তােলা হত লালবাজার খাশােনার ভার থাকত বয়স্ক স্থানীয় মেয়েদের ওপর। বাহিনীর ক্যান্টিন থেকে তাই মাসে গড়ে পাঁচ টাকা বেতন দেওয়া হত। মিরাটে একবার নিয়মিত বেতন না পেয়ে এই মহিলারা চলে যান। ফলে তিন মাসের মধ্যে যৌনব্যাধির প্রকোপ নাকি বেড়ে যায়। রােগীর সংখ্যা চার থেকে বাইশে পৌঁছয়। এইসব প্রমােদশালা নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ ছিল না। পুলিশ কোনও অসুস্থ মেয়েকে শনাক্ত করলে সে ঘুষ দিয়ে দিব্যি থেকে যেত। তা ছাড়া লালবাজারের বাইরের মেয়েরাও এসে ইউরােপিয়ান ‘ ছাউনির আশপাশে আস্তানা গেড়ে বসে যেতেন। সৈনারা তাদের ঘরেও উকি দিত। কেননা, তুলনায় ওঁরা সন্ত’। তালিকাভুক্ত মেয়েরা পয়সা নেয় বেশি।

অতিঙ্কিত কর্তৃপক্ষ সৈন্যদের মারাত্বক যৌনব্যাধি থেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আরও একটি কৌশল চালু করেছিলেন। লালবাজারের মতােই তারা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘লক হসপিটাল’। অসুস্থ মেয়েদের ধরে এনে অক্ষরিক অর্থে তালা বন্ধ করে রেখে তাদের চিকিৎসা করা হত। এখনও ও-স খ্যাধির যথার্থ চিকিৎসা মানুষের করায়ত্ত নয়। ফলে তথাকথিত সুস্থ মেয়েরা আবার ফিরে এসে রােগ ছড়াতেন। ১৮৬৬ সালে ব্রিটেনেও এ ধরনের উদ্যােগ শুরু হয়েছিল। সে বছরই চালু হয় সংক্রামক ব্যাধি সংক্রান্ত আইন ! ভারতে এই আইন চালু হয় দু’বছর পরে, ১৮৬৮ সালে। এই ‘লক হাসপাতাল উপলক্ষে লন্ডনে বিস্তর হট্টগােল শোনা গেছে। কলকাতায়ও রীতিমতাে আন্দোলন। চিকিৎসার নামে অসহায় ভারতীয় মেয়েদের ধরে এনে অত্যাচার করা হচ্ছে। তাদের নানাভাবে অপমানি, এমনকী ধর্ষণ করা হচ্ছে, এই অভিযােগও ওঠে। বস্তুত তাই নিয়ে কাতায় রীতিমতাে উত্তেজনা। বটতলা থেকেও কয়েকখানা প্রহসন বের হয়েছিল এই
উপলক্ষে। যতদূর মনে পড়ে তার একটির নাম ছিল- ‘বাহবা চৌদ্দ আইন,
আন্দোলনের ফলে ইংল্যান্ডে শেষ পর্যন্ত এই আইন তুলে নিতে হয়। তুলে নেওয়া হয় ভারত থেকেও। তার পর উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে চালু করা হয় ‘মিলিটারি ক্যান্টনমেন্ট অ্যাক্ট’। তারও উদ্দেশ্য যৌনব্যাধির কবল থেকে ব্রিটিশ সৈন্যদের রক্ষা করা। লালবাজারের মতাে প্রমােদের স্বতন্ত্র এলাকা এই আইনে নির্দিষ্ট করা হয়নি। ইউরােপীয়দের জন্য বেশি খরচের কিছু বাড়ি সংরক্ষিত করা ছিল এই যা। অবশ্য সৈনাদের জন্য অন্যভাবেও প্রসােদকন্যা সংগ্রহ চলত। ১৮৮৬ সালে কাগজে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায়, আম্বালা ছাউনির প্যান্ডিং অফিসার তার রেজিমেন্টের জন্য ছয়জন সুন্দরী নারী সংগ্রহের জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। তার বাহিনীতে সৈন্যসংখ্যা চারশাে। হাতের কাছে মেয়ে রয়েছেন মাত্র ছয় দেন। তিনি আরও জনা-ছরেক মেয়ে চান। শেষ পর্যন্ত অবশ্য সব ধরনের প্রমমশালা থেকেই আইন তুলে নেওয়া হয়। ঐতিহাকিরা বলছেন, তাতে ব্রিটিশ বাহিনীর ক্ষতিই হয়েছিল। ফরাসি এবং জার্মানরা নিয়ন্ত্রিত আমােদশালার ব্যবস্থা রাখতেন। তাতে দেখা যায় ১৮৯৬ সালে ভারতে ব্রিটিশ সৈন্যদের মধ্যে যখন এক হাজার জনের মধ্যে ৫৫২ জনই ব্যাধিগ্রস্ত, জার্মান বাহিনীতে তখন তাদের অনুপাত মাত্র সাতাশ জন। ফরাসি বাহিনীতে পয়তাল্লিশ জন। আইন অবশ্য আবার পালটানাে হয়েছিল। কিন্তু বলা নিষ্প্রয়ােজন, পৃথিবীর আদিমতম পেশা যেমন ছিলু ছিমনই রয়ে গেল। আমরা ব্যাধিগ্রস্ত ইংরেজ সৈন্যদের পরিসংখ্যান জানি, কিন্তু তৎকা দুরারােগ্য ব্যাধিতে তিলে তিলে ভুগে মরেছেন যে মেয়েরা, তাদের কোনও পরিনই আমাদের জানা নেই। | বাইরে এক ভেতরে অন্য। ভিক্টোরিয়ান নৈতিকতা আজ উপকথা মাত্র। উপনিবেশগুলিতেও ওদের আসল সুখ ছিল মুখােশের আড়ালে। সমকামিতার নামে ভিক্টোরিয়ান ইংল্যান্ড কনে আঙুল দিত, তথ্য লন্ডনের ক্লিভল্যান্ড স্ট্রিটে ১৮৮৯ সালে সমকামীরা নাকি রীতিমতো গড়ে তােলেন বাজার। সেখানে অনেক গণ্যমান্য ইংরেজের আনাগােনা। অথচ এক দশক বা তার কাছাকাছি সময়ে অস্কার ওয়াইন্ডের বিচার হয়ে গেল। ‘লাভ দ্যাট ডেয়ার নট স্পিক ইটস নেম বা পুরুষে পুরুষে সম্পর্ক খাস ইংল্যান্ডে যদি থাকতে পারে, তবে উপনিবেশগুলােতে যে আরও প্রস্ফুটিত হয়ে উঠবে তাতে আর বিস্ময় কী? অবশ্য কেলেঙ্কারি জানাজানি হয়ে গেলে পতন ছিল তৎকালে অনিবার্য। স্যার হেক্টর ম্যাকডােনাল্ড উনপঞ্চাশ বছর বয়সে সিংহল তথা আজকের শ্রীলঙ্কার প্রধান সেনাপতি হয়েছিলেন। তিনি একজন বিশিষ্ট সৈনিক। দুটি যুদ্ধে লড়াই করে সম্মান পদক লাভ করেছেন, স্বদেশ স্কটল্যান্ডে বলতে গেলে তিনি জাতীয় বীর। একসময়ে বিয়েও করেছিলেন। পরে অবশ্য বিয়ে ভেঙে যায়। স্বদেশে তার অন্য কোনওরকম আসক্তির কথা শােনা যায়নি। কিন্তু কান্ডিতে এক রেল-কামরায় চারজন সিংহলি তরুণের সঙ্গে ভ্রমণকালে তার আচরণে একজন বাগিচা-মালিক অস্বাভাবিকতা লক্ষ করেন। অভিযােগ ওঠে। তিনি প্রথমে অভিযােগ অস্বীকার করেন, কিন্তু সে বছরই নিজ হাতে নিজের জীবন কেড়ে নেন। আর-একজন স্যার রজার কেসমেন্ট। তিনি ছিলেন দাসবিরােধী আন্দোলনের একজন নেতা। বেলজিয়াম কঙ্গো এবং পেরুতে দাসদের মুক্তির জন্য আন্দোলন করেছেন। ম্যাকডোনাল্ড যে বছরে মারা যান, সে বছরেই তার গােপন ডায়েরি লিখতে শুরু করেন। সেই ডায়েরি পরবর্তীকালে আবিষ্কৃত হয়েছে তাতে দেখা যায়, তিনিও সমকামী ছিলেন।

পাতার পর পাতা জুড়ে তিনি লিখে গেছেন তাঁর যৌনজীবনের কাহিনী। ১৯১৬ সালে ইংরেজরা তাকে গুলি করে মারে। কারণ, কেসমেন্ট আইরিশ বিপ্লবীদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। তিনি নাকি তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন। ওই গােপন ডায়েরিটি তখন কারও হাতে পড়লে হয়তাে তাকেও আত্মঘাতী হতে হত সেদিন!

এই আবহাওয়ার মধ্যে কিন্তু ইংরেজরা চেষ্টা করেছেন সাম্রাজ্যের কর্মীদের শুদ্ধ ও পবিত্র রাখতে। এমনকী দখল-করা দেশগুলােতেও কিছু কিছু সংস্কার আন্দোলন চালাতে। তা। করতে গিয়ে কখনও কখনও সংস্কারকরা জাতীয় আবেগকে জাগিয়ে তুলেছেন। কিন্তু কিছু কিছু অনিষ্টকর প্রথা তাদের চেষ্টায় অবশ্যই লােপ পেয়েছে। তবে সাধারণভাবে যৌনজীবনে সদাচার বা নৈতিক বিশুদ্ধতা যে তাদের পক্ষে রক্ষা করা সম্ভব হয়নি, সে কাহিনী আজ আর গােপন নেই। শাসকদের হাত ধরে উপনিবেশগুলােতে হানা দিয়েছিলেন পাদ্রিরা। শুধু বাণিজ্য নয়, মুনাফার সঙ্গে খ্রিস্টধর্ম প্রচার যােগ করা সম্ভব হলে এক ধরনের নৈতিকতা জন্মায়। তাতে অন্য দেশের উপর হামলাবাজি অন্তত কিছুটা এক ধরনের বৈধতা পায়। কিন্তু অ্যান্টন জি-এর ইতিহাস বলছে পাদ্রিরাও সব সময় উচ্চাদর্শ রক্ষা করতে পারেননি। বালহ্যাচেট রেভারেন্ড উইলিয়াম হান্তি এবং মারি পিগট-এর কাহিনী শুনিয়েছিলেন। অ্যান্টন জিলও কলকাতার সে-কাহিনীটি আবার শুনিয়েছেন। সেইসঙ্গে আরও কিছু খ্রিস্টান যাজকের কথাও। সেবার পপুয়া নিইগিনিতে অ্যাকান চার্চ গােলমালে পড়ে। জানা যায় একজন পাদ্রি পপুয়ান যুবকদের নিয়ে পড়েছেন। তিনি তাদের শারীরিক সৌন্দর্যের প্রশংসায় মুখর। তারা নাকি চরিত্রে সেন্টইন, চেহারায় অ্যাপােলাে। অরেঞ্জ ফ্রি-স্টেট থেকে উনিশ শতকের সত্তরের দশকে এলকর্ম যাজককে পালিয়ে যেতে হয় ইংল্যান্ডে। তাঁর। বিরুদ্ধে অভিযােগ ছিল সমকামিতার প্রায় একই সময়ে দহমিতে এক যাজক ছিলেন, তিনি নাকি দুই দশক ধরে তার মিশ-বাড়িটিকে রীতিমতাে প্রমােদােলা করে রেখেছিলেন। এই যাজক ছিলেন অলস এবং মদ্যপ। তিনি তেলের ব্যাবসা করতেন। নিজের বড় মেয়েকে নাকি নামিয়েছিলেন শরীরের ব্যবসায়ে। আর-একজন ইংরেজ যাজক সাতটি কৃষ্ণাঙ্গ মেয়ের সঙ্গে সহবাস করার গৌরবে রীতিমতো গৌরবান্বিত। তার কথা ছিল খ্রিস্টানের সঙ্গে সহবাস না করলে কৃষ্ণাঙ্গ মেয়েরা সত্যিকারের খ্রিস্টান হবে কেমন করে?

রোনাল্ড হায়াম, ‘এম্পায়ার অ্যান্ড সেলিটি”, ম্যানচেস্টার, ১৯৯২
‘স্যান্টন ফ্রিল, “কলিং প্যাশনসেক্স, রেস অ্যান্ড এমপায়ার’, বি. বি. সি. বুকস, লন্ডন, ১৯৯৫

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *