রাবণ ও রম্ভা – (রামায়নী প্রেমকথা) – সুধাংশরঞ্জন ঘোষ

›› পৌরাণিক কাহিনী  ›› সম্পুর্ণ গল্প  

কৈলাস পর্বতের অমল ধবল তুষারের উপর কুন্দাভ কৌমুদীজাল ছড়িয়ে পড়েছে। দেখে মনে হচ্ছে যেন শুভ্র বিগলিত রজত প্রবাহ আকাশ হতে ঝরে পড়ে তরঙ্গায়িত হয়ে প্লাবিত করছে। সমগ্র পর্বতদেশকে। পর্বতগাত্র বন্ধুর বলে জ্যোৎস্নারাশি কোথাও শ্বেতােজ্জল, কোথাও ঘাের কৃষ্ণবর্ণ, আবার কোথাও বা ঈষৎ পিঙ্গলাভ। চন্দ্রকিরণসিক্ত পৰ্বাস্থিত একটি চন্দ্রকান্ত শিলার উপর বসে বিশ্রাম গ্রহণ করেছিলেন রাবণ।

স্বর্গ ও মর্ত্যের মধ্যস্থল এই কৈলাস পর্বত। একে একে মর্ত্য ও পাতাল প্রদেশ জয় করে এসে এই কৈলাস পর্বতে কিছুদিনের জন্য বিশ্রাম করছেন রণক্লান্ত রাবণ। এখান হতে এবার স্বর্গাভিমুখে রওনা হবেন তিনি। জয় করবেন একে একে স্বর্গের সকল দেবতাকে।

ত্রিভুবন জয়ের নেশায় এমনই মাতাল হয়ে ছিল রাবণের মন যার জন্য প্রকৃতির কোনাে শােভা নিরীক্ষণ করবার কোন অবকাশই পাননি এতদিন। আজ পূর্ণিমা রজনী একথা ভুলেই গিয়েছিলেন তিনি।

আজ পূর্ণিমা! পূর্ণচন্দ্রের প্রভায় উদ্ভাসিত সমগ্ৰ আকাশমণ্ডল। কিন্তু রাবণ লক্ষ্য করলেন পূর্ণচন্দ্রের সেই অমল আলােকমালা ঠিক তির্যকভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে না পর্বতগাত্রে। চারিদিকের কল্পতরু ও পুন্নাগ বৃক্ষে প্রতিহত হচ্ছে তার গতি। বৃক্ষপত্ৰজর্জর ছায়াক্লিষ্ট চালােকের অর্ধতিমিরাবৃত রহস্যময়তায় চারিদিকের শােভা দেখতে দেখতে নিবিষ্ট হয়ে পড়ল রাবণের মন।

শুধু আজ নয়। বহুবার বহু জ্যোৎস্নাললাকিত রাত্রির শােভা দেখছেন রাবণ। কিন্তু চাঁদের আলাের মধ্যে এতখানি উজ্জ্বলতা কখনাে দেখেননি তিনি। চাদের আলাের এমন মাদকতা অনুভব করেননি কোনদিন। চাঁদের ওই মাদকতাময় আলাের প্রভাবেই তরুস্কন্ধে নিদ্রিত হয়ে পড়েছে ময়ুরকুল। তরুতলে তন্দ্রাহত হয়ে পড়েছে রতিক্লান্ত কোনাে এক মৃগদম্পতি।

সহসা রাবণও এক তীব্র মাদকতার জ্বালা অনুভব করলেন সারা অঙ্গে। আজ সন্ধ্যা হতে এখনাে এক বিন্দু কোনাে মাধুকীবারি পান করেননি রাবণ। তবু কেন এই মাদকতা কিছুই বুঝতে পারলেন না তিনি।

ক্রমে সেই মাদকতা পরিণত হলাে এক স্পষ্ট কামচেতনায়। এক জারজ উন্মাদনার ঢেউ ফুলে ফুলে উঠতে লাগল তার প্রতিটি শিরায়। শােণিতকণিকারা মাতাল হয়ে নাচতে নাচতে গা ভাসিয়ে দিল সেই ঢেউএর উপর। এক উগ্র নারীসঙ্গলিপ্সা অস্বাভাবিক রকমের অশান্ত করে তুলল তাকে।

যাঁর রমণাকাঙ্ক্ষাকে প্রীত করবার জন্য দশ সহস্র রমণী লঙ্কার প্রাসাদ অন্তঃপুরে সতত প্রস্তুত, তিনি আজ স্বেচ্ছায় মাসাধিককাল কোনাে রমণীসঙ্গ লাভ করেননি। একে একে যুদ্ধের মধ্য দিয়ে অতুলনীয় বীরত্ব প্রকাশ করে ত্রিভুবন জয় করতে চান তিনি। তার এই জয়ের পথে নারীসঙ্গ প্রতিকূলতার সৃষ্টি করতে পারে বলেই কোনাে নারীকে তিনি সঙ্গে নেননি তার জয়যাত্রার পথে।

জয়ের নেশায় তিনি এতদিন এমনই উন্মত্ত হয়েছিলেন যে নারীসঙ্গের কোনাে অভাব কোনাে মুহূর্তে অনুভব করেননি। জয়ের চিন্তায় মন তার এমনই নিবিষ্ট ছিল যে কোনাে নারীর কথা ভাববার কোনাে অবকাশই পাননি তিনি।

উচ্ছঙ্খল ভােগবৃত্তির সঙ্গে সঙ্গে আত্মসংযমের এক অসাধারণ শক্তি লুকিয়ে আছে তার মধ্যে, একথা জীবনে প্রথম এবার উপলব্ধি করলেন রাবণ। রাজপ্রাসাদের বিশাল রতিমন্দিরে অফুরন্ত সুরাপানে মত্ত ও সহস্র রমণী পরিবেষ্টিত হয়ে আরামশয্যায় রাত্রিযাপনে যিনি অভ্যস্ত, আজকাল সামান্য শিবিরে নিঃসঙ্গ রাত্রিযাপন করেও কোনাে ক্লেশ বা কোনাে জৈব অস্বস্তি অনুভব করেন না তিনি।

কিন্তু আজ প্রথম নৈশ নিঃসঙ্গতাটাকে দুর্বিষহ মনে হলাে রাবণের। ললিতকান্তা কোনাে নারীর স্পর্শসখ উপভােগ করবার জন্য এক অপরিসীম লালসায় উগ্র হয়ে উঠল তার সারা অঙ্গ। ক্রমে যত নিবিড় হতে লাগল তার নারীচিন্তা, ততই তার দৃষ্টি হয়ে উঠল লালসাতুর, অধরােষ্ঠ হয়ে উঠল অধীর, ব্যগ্র হয়ে উঠল হাত দুটি।

উপরের দিকে মুখ তুলে ঊর্ধ্বে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলেন রাবণ। হয়ত কামনার এই অসহ্য পীড়ন হতে মনকে মুক্ত করতে চাইলেন তিনি। স্বর্গচিন্তায় তন্ময় করতে চাইলেন নিজেকে।

উপরে শুধুনীল আকাশ আর চাঁদের আলাে ছাড়া আর কিছুই দেখতে পেলেন না রাবণ। কিন্তু স্বর্গলােক সন্দর্শনের জন্য সহসা ব্যাকুল হয়ে উঠলেন রাবণ। তিনি ক্ষণিকের জন্য একবার দেখতে চাইলেন, ওই নীল আকাশের ওপারে কোথায় শুভ্র সুগন্ধি পারিজাতবিভূষিত চিরবসন্তময় সেই স্বর্গোদ্যান যেখানে চিরহরিৎ তৃণসমাচ্ছন্ন ভূমির উপর পুষ্পধনু হাতে কামদেবতারা ইতস্ততঃ ঘুরে বেড়ায় আর কামগন্ধা অপ্সরারা অঙ্গের সুবাস ছড়িয়ে চলে নৃত্যের তালে তালে, দিব্যকান্তি দেবগণের অনন্ত যৌবনবিভুতিতে নিয়ত উজ্জ্বল থাকে যেখানকার দশদিক।

তিনি আরও দেখতে চাইলেন কোথায় সেই মণিমাণিক্যখচিত স্বর্ণসিংহাসনােপরি উপবিষ্ট দেবরাজ ইন্দ্র যাঁর হস্তধৃত অগ্নিগর্ভ বজ্রের গর্জনে ত্রিভুবন কম্পিত হয়। | একে একে চন্দ্র সূর্যকে পরাভূত করে রাবণ জয় করবেন সেই সিংহাসন। চূর্ণ করবেন দেবরাজ ইন্দ্রের সকল দম্ভ। কিন্তু কিছুই দেখতে পেলেন না রাবণ। ক্রমে অস্বচ্ছ হয়ে আসতে লাগল তার দৃষ্টি।

সহসা তার দৃষ্টিপথে এক নারীমূর্তি আবির্ভূত হলাে। বিস্মিত হয়ে ভাবলেন, হয়ত ভুল দেখছেন তিনি। চন্দ্রালােকের মদির মায়াজালে বিভ্রান্ত হয়ে উঠেছে তার দৃষ্টি। অথবা হয়ত কামচঞ্চল চিত্তের বিকার এক মােহিনী রূপ পরিগ্রহ করেছে ওই মূর্তির মধ্যে। | তবু একবার ভালভাবে নিরীক্ষণ করবার জন্য উঠে দাঁড়ালেন রাবণ। তিনি দেখলেন, ক্রমশঃ স্পষ্ট হতে স্পষ্টতর হয়ে উঠেছে সেই নারীমূর্তি। তখন সেই নারীমূর্তিকে আকর্ষণ করবার জন্য উধ্বে উৎক্ষিপ্ত করলেন তার বিশাল একটি বাহু।

এত রূপ কোনাে নারীর মধ্যে এর আগে দেখেননি রাবণ। মানবী বা দানবী তাে দূরের কথা, কোনাে সুরকন্যা বা গন্ধর্বকন্যাদের মধ্যেও খুঁজে পাওয়া যায় না এমন রূপরম্যা বরতনু।

বিস্ময়াহত হয়ে রাবণ জিজ্ঞাসা করলেন, কে তুমি নারী, এই নির্জন নিশীথে একাকী আকাশ পথে বিচরণ করছিলে?

নারীমূর্তি উত্তর করলেন, আমার নাম রম্ভা। আগে অপ্সরা ছিলাম। বর্তমানে আমি নল কুবেরের স্ত্রী। আমি তারই কাছে যাচ্ছি। কিন্তু আপনি কে? কেনই বা অকারণে আমার গতিরােধ করলেন?

রাবণ বললেন, আমি হচ্ছি লঙ্কার রাজা রাবণ।

রম্ভা বললেন, তাহলে আপনি কুবেরের ভ্রাতা। রাবণ গম্ভীরভাবে বললেন, তার সঙ্গে আমার বর্তমানে কোনাে সম্পর্ক নেই।

রম্ভা বললেন, কিন্তু লঙ্কার রাজপ্রাসাদ ছেড়ে কেন আপনি একা একা এই নির্জন পর্বতে বাস করছেন?

রাবণ বললেন, মাসাধিককাল হলাে ত্রিভুবন জয়ে বার হয়েছি আমি। মর্ত্য ও পাতালের রাজাদের একে একে জয় করে কিছুদিনের জন্য আমি বিশ্রাম করছি স্বর্গ ও মর্ত্যের মধ্যস্থল এই কৈলাস পর্বতে। এবার এখান হতে স্বর্গলােক অভিযান করব। অমৃতগর্বী দেবতাদের সকল গর্ব আমি চূর্ণ করে আমার বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করব তাদের। তােমার স্বামী দেবতাদের কোষাধ্যক্ষ কুবেরও বাদ যাবেন না আমার কবল হতে।

কাতরকণ্ঠে অনুনয় করে রম্ভা বললেন, কিন্তু আমাকে আপনি ছেড়ে দিন। আমি সামান্যা নারী। আমি তাে আপনার সমযােদ্ধা কোনাে শত্রু বা জয়ের বস্তু নই। তবে কেন অকারণে আমার পথরােধ করলেন আপনি?

সশব্দে হেসে উঠলেন রাবণ, দশানন রাবণের মতাে রাজার অকারণে কোনাে কাজ করবার মতাে সময় বা শিশুসুলভ কোনাে প্রবৃত্তি নেই সুন্দরি।

তবে কি কারণে মহারাজ?

রাবণ বললেন, কারণটা খুবই সহজ সুন্দরি। মাসাধিক কাল আমি যুদ্ধ-বিগ্রহে ব্যস্ত আছি বলে কোনাে নারীসঙ্গ লাভ করতে পারিনি। নানাস্থানে পরিভ্রমণ করতে হয় বলে কোনাে নারীকে সঙ্গেও আনিনি। ত্রিভুবন জয়ের জন্য কর্ম ও চিন্তায় আমার সমগ্র দেহমন এমনই প্রবৃত্ত থাকে যে এসব কথা আমার মনে উদয়ই হয় না। আজ সন্ধ্যায় উপত্যকা প্রদেশের ওই শিলাখণ্ডের উপর একাকী বসেছিলাম। কিন্তু চন্দ্রালােকের মধ্যে কি মায়ামদিরতা আছে জানি ন, সহসা আমার চিত্ত কামচঞ্চল হয়ে উঠল প্রবলভাবে। নিজের মনে তখন ভাবতে লাগলাম, হরপার্বতী-অধ্যুষিত এই ভয়ঙ্কর কৈলাসপর্বতে যার ত্রিসীমানাতে কোনাে দানব বা কিন্নর। পর্যন্ত আসে না ভয়ে, কোথায় পাব সেই নারী যে আমার এই দুর্দমনীয় প্রবৃত্তিকে পরিতৃপ্ত করবে। এমন সময় আমার দৃষ্টিপথে পতিত হলে তুমি অপ্রত্যাশিতভাবে।

কথা শেষ করে আবার তেমনি জোরে হাসতে লাগলেন রাবণ। তার বিকট অট্টহাসির শব্দে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠতে লাগল দুপাশের তুষারধবল স্তব্ধ দুটি গিরিশৃঙ্গ। স্খলিত হয়ে যেতে লাগল রম্ভার ভীতিবিহুল বক্ষের প্রতিটি পঞ্জর।

রাবণ বললেন, মনে হচ্ছে স্বয়ং ভাগ্যলক্ষ্মীও আমায় ভয় করেন সুন্দরি। তাই আমায় তৃপ্ত ও তুষ্ট করবার জন্য তিনিই তােমায় পাঠিয়ে দিয়েছেন আমার কাছে। আমার মনে হচ্ছে সুদূর স্বর্গ হতে স্বয়ং কামদেবতা এই চন্দ্রালােকিত রাত্রিতে আমায় ফুলশর হেনে কামজৰ্জর করেই পরমুহূর্তে ভয়ে কৌশলে তােমায় পাঠিয়ে দিয়েছেন আমার সেই কামজ্বালা নিবারিত করবার জন্য।

ভয়ে কাঁপতে লাগলেন রম্ভা।

রম্ভা আবার কাতরকণ্ঠে বললেন, দয়া করে আমায় ছেড়ে দিন। আমার স্বামী আমার জন্য পথ চেয়ে আছে। আমি গিয়ে তার অঙ্কশায়িনী না হলে নিদ্রাসুখ উপভােগ করতে পারবেন্ নাতিনি। আমি গিয়ে তার অঙ্গ স্পর্শ না করলে চক্ষুপল্লব মুদ্রিত হবে না তার।

রাবণ বললেন, আমার কামনাকে অতৃপ্ত রেখে কিছুতেই তােমার স্বামীর অঙ্কশায়িনী হতে দেব না তােমায়। তােমার মতাে নারীকে একবার কাছে পেয়ে ছেড়ে দিয়ে কেমন করে এই উতল রাত্রি যাপন করব সুন্দরি!

রম্ভা বুঝলেন, তার আর পরিত্রাণ নেই। তিনি বুঝলেন দশ সহস্র রমণীর অশ্রু যার কঠিন হৃদয়কে দ্রবীভূত করতে পারেনি সেই নিষ্ঠুর নিষ্করুণ রাবণের কাছে অনুনয়-বিনয় করা বৃথা।।

নীরবে তাই অশ্রুবিসর্জন করতে লাগলেন রম্ভা।

রম্ভাকে বাহুদ্বারা আবদ্ধ করে কাছে টেনে নিলেন রাবণ। বললেন, সুন্দরী নারী আমি অনেক দেখেছি, কিন্তু তােমার মতাে স্বাস্থ্যবতী নারী আমি খুব কম দেখেছি রম্ভা। তােমার মতাে সুন্দরী ও স্বাস্থ্যবতী ললনাকে কখনাে কুবেরের পাশে মানায় না। আমার মতাে বীর পুরুষই তােমার একমাত্র যােগ্য পাত্র।

রম্ভা কোনাে কথা বললেন না। ক্রোধে কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে রইল তার।

রাবণ বললেন, সত্যিই তুমি অবিকল্প সুন্দরী রম্ভা। রক্তকোকনদের পাপড়ি অপেক্ষা কোমল ও রক্তাভ তােমার অঙ্গ। তােমার আকর্ণবিশ্রান্ত অক্ষিযুগল হরিণচক্ষু অপেক্ষা উদার ও আয়ত। চন্দ্রালােকপ্রতিবিম্বিত কৈলাসের শুচিশুভ্র পাষাণফলকের মতাে অমল ও উজ্জ্বল তােমার গণ্ডভিত্তি।

রম্ভার সেই অমল গণ্ডভিত্তির উপর দৃঢ় চুম্বনের এক অনপনেয় কলঙ্করেখা টেনে দিলেন রাবণ। সঙ্কোচে ও শঙ্কায় হতবাক হয়ে বসে রইলেন রম্ভা।

রাবণের কোনাে কাজের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবার মতাে শক্তি বা সাহস কিছুই নেই তার। তাই নিজেরই অন্তর্নিহিত অফুরন্ত ঘৃণার গরলে নিজেই জর্জরিত হতে লাগলেন তিনি। নিষ্ফল ক্রোধের আগুনে নিজেই জ্বলতে লাগলেন মনে মনে।

রম্ভার আলুলায়িত ঘনকৃষ্ণ কেশগুচ্ছের উপর মৃদু হস্ত সঞ্চালন করে রাবণ বললেন, অমন সন্নতাঙ্গী হয়ে নীরবে বসে আছ কেন সুন্দরি ? অত সঙ্কোচ ও দুঃখের কারণ কি। এ তাে উল্লসিত হবার কথা। সারা ত্রিভুবনের শ্রেষ্ঠ নরপতি ও বীর আজ নতজানু হয়ে তােমার কাছে ভিক্ষা চাইছে, এ কি কম গৌরবের কথা তােমার পক্ষে! স্বর্ণময় সুমেরু পর্বতের হিরন্ময় শৃঙ্গ অপেক্ষা গৌরবময় ও সমুন্নত তার রাজমুকুট তােমার পদতলে আজ লুণ্ঠিত।

সত্যসত্যই রম্ভার সামনে নতজানু হলেন রাবণ।

রাবণ বললেন, মানিনী ওঠ। আর মান করাে না। উঠে ভালাে করে আমার পানে চেয়ে দেখাে, স্বর্গ ও মর্তের মধ্যে এত বড় শক্তিশালী বীর জীবনে কখনাে দেখেনি। সেই অতুলনীয় বীরের সংস্পর্শে তােমার জীবনকে ধন্য করাে, সার্থক করাে। আমার অফুরন্ত শক্তির মাধুর্যকে তােমার দেহের মধ্য দিয়ে উপভােগ করাে।

তবু মুখ তুলে একবার চাইলেন না রম্ভা রাবণের পানে!

রাবণ বললেন, একথা কেন ভুলে যাচ্ছ মানিনী, বসুন্ধরার মতাে নারীও বীরভােগ্যা। স্থাবর জঙ্গমাত্মক এই বিশাল বসুন্ধরা একমাত্র তারই পদানত হতে চায় যে তার শৌর্য বীর্য দ্বারা আর সকলকে পরাজিত করে অপরাজেয় হয়ে উঠেছে নিজে।

সুন্দরি, মুখ তুলে একবার দেখাে, আমি সেই অপরাজেয় পুরুষ।

রাবণ একটু থেমে রম্ভাকে একবার চকিতে দেখে নিয়ে আবার বলতে লাগলেন, বসুন্ধরার মতাে সকল নারীই একমাত্র বীরপুরুষের কাছে দেহমন সমর্পণ করতে চায়। এই সমর্পণের মধ্য দিয়েই তারা পায় জীবনের চরম আনন্দ আর চুড়ান্ত সার্থকতা। আয়তাক্ষী, একবার চোখ মেলে দেখাে, আমি সেই বীর।

তবু মুখ তুলে একবার চাইলেন না রম্ভা। রম্ভার চিবুকে হাত দিয়ে তার মুখখানিকে কিছুটা তুলে ধরলেন রাবণ। তারপর বললেন, কি অনিন্দ্যসুন্দর এই মুখমণ্ডল! প্রস্ফুটিত পদ্মের চেয়েও সুন্দর। পৃথিবীর কোনাে সুন্দর বস্তুর সঙ্গে উপমিত হতে পারে না এ মুখ। এই মুখই হচ্ছে পৃথিবীর সকল সুন্দর বস্তুর উপমাস্থল।

তারপর রম্ভার বক্ষঃস্থল হতে বনাঞ্চলটিকে অপসারিত করে তার শােভা দেখতে লাগলেন রাবণ।

রাবণ বললেন, তােমার পীনােত বক্ষের শােভা বড় চমৎকার। দুটি সুবর্ণ পর্বতশৃঙ্গের মতােই উত্তুঙ্গ তােমার স্তনদ্বয়। তােমার কটিদেশ যেমন ক্ষীণ তেমনি জঙঘাদ্বয় বিপুল ও সুবর্তুল। উরুভাগ কদলী তরুর ন্যায় কোমল ও স্নিগ্ধ। তােমার জ্বলতার বিলাসমাধুর্য কন্দর্পের ফুলধনু অপেক্ষা বকুটিল ও মাদকতাময়।

রম্ভার নাভিদেশের বসনগ্রন্থির উপর রাবণ হস্তস্থাপন করতেই রম্ভা সরােষে তা ঠেলে দেবার চেষ্টা করলেন।

সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে আপনার মনে বলে চললেন রাবণ, বর্ষারম্ভে নব মেঘমালার গভীর মধ্বনিতে পর্বত কন্দর হতে বিচ্ছুরিত যে উজ্জ্বল রত্নশলাকার দ্বারা চারিদিক উদ্ভাসিত হয় তার থেকেও শতগুণে উজ্জ্বল তােমার অঙ্গলতিকা।

রাবণের প্রতি অপরিসীম ঘৃণা অনুভব করছিলেন রম্ভা। তবু রাবণের কথাগুলাে শুনতে তার ভালাে লাগছিল। অদ্ভুত রকমের এক নিগুঢ় পুলক অনুভব করছিলেন অন্তরের নিভৃতে। এর আগে অপ্সরা থাকা কালে অনেকে উপভােগ করেছে তার দেহটাকে। তারপর তার স্বামী প্রেমদ্বারা প্রীত ও অলঙ্কত করেছেন তার মনটাকে। কিন্তু কেউ কখনাে রাবণের মতাে অকুণ্ঠ প্রশংসাবাক্য দ্বারা তার দেহের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে গৌরবান্বিত করেনি এমন করে।

তবু তার সেই নিগৃঢ় পুলককে বাইরে প্রকাশ করলেন না রম্ভা। রম্ভা যথাসাধ্য কঠোরতার সঙ্গে বললেন, মৃণাললােলুপা মরালী যেমন মরুস্থলীয় কোননা বস্তুর প্রতি আকৃষ্ট হয় না, আমিও তেমনি আমার স্বামী ছাড়া অন্য কোনাে পুরুষে আসক্ত হতে পারব না।

কিন্তু আমি তাে যে-সে পুরুষ নয়। বিচিত্র রত্নখচিত ইন্দ্রের যে বিপুল ইন্দ্রধনুর দ্বারা বৃত্রাসুর নিহত হয়, যার কোদণ্ডটঙ্কারে ত্রিভুবন কম্পিত হয়, আমার ক্রোধস্ফুরিত কুটি সেই ইন্দ্রধনু অপেক্ষা ঢের বেশি ভয়ঙ্কর।

ভয়ে ভয়ে রম্ভা বললেন, আপনি বড় দেহবাদী মহারাজ। এই মাটির দেহ আর মাটির পৃথিবী ছাড়া আপনি আর কিছুই জানেন না। আপনি জানেন না যে, মাটির এই মর্ত্যভূমির উর্ধ্বে আছে অমৃতময় এক অমর অবিনশ্বর আত্মা।

রাবণ হাসলেন। হেসে উড়িয়ে দিতে চাইলেন রম্ভার কথাটাকে।

রম্ভা তবু বললেন, আপনি শুধু দেহের শক্তি আর দেহের সৌন্দর্যটাকেই বড় করে দেখেন। তাই বুঝতে পারেন না, আপনারই অফুরন্ত দেহের শক্তির অপরিসীম চাপে আপনার আত্মা পিষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

রাবণ আবার হাসলেন, আমি আত্মা ও দৈব শক্তিতে বিশ্বাস করি না। রম্ভা বললেন, আপনি দেহের শক্তিতে হয়তাে দেবতাদের থেকে বড় হতে পারেন, কিন্তু তারা যে অষ্টগুণে ও যােগৈশ্বর্যে ভূষিত আপনার তা নেই। তাদের আত্মিক সুষমা ও আধ্যাত্মিক মহিমা আপনি কোনােদিনই লাভ করতে পারবেন না।

রম্ভার দেহটাকে নিজের দেহের কাছে সবলে আকর্ষণ করে রাবণ বললেন, এই দেহই জীবনে একমাত্র সত্য সুন্দরি। দেহকেই জীবনে সবচেয়ে বড় বলে মনে করি বলেই দেহের এই অফুরন্ত শক্তি ও সম্পদ লাভ করেছি আমি।

রাবণ সহসা গম্ভীর হয়ে বললেন, স্বর্গে মতে পাতালে যেখানে যাবে দেখবে এই দেহই সত্য। জীবনের যত কিছু রঙিন উচ্ছ্বাস তা শুধু এই দেহের পাত্রকে অবলম্বন করেই। তাই জীবনে যতদিন বাঁচতে চাই এই দেহটা অবলম্বন করেই বাঁচতে চাই। এই দেহ যদি এতই তুচ্ছ ও মূল্যহীন তাহলে কেন তােমার দেবতারা দেহ ধারণ করেন? কেন তারা দেহের পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের দ্বাৰা ভােগ করেন জীবনকে? অপ্সরাদের নিয়ে নৃত্যগীত সহ আনন্দ উৎসবেই বা উন্মত্ত হয়ে ওঠেন কেন এমনভাবে?

তাছাড়া তুমি আত্মার শক্তিতে এতই যদি বিশ্বাসী হও তাহলে আমার এই দেহের শক্তিকে এই মুহুর্তে খণ্ডন করে কেন মুক্ত করতে পারছ না নিজেকে ?

রম্ভাকে নির্মমভাবে আলিঙ্গন করে এক অদ্ভুত শৃঙ্গার আসনে বসলেন রাবণ। শৃঙ্গারকলাবিশারদ রাবণের শৃঙ্গারচাতুর্যে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন রম্ভা।

রাবণ বললেন, শুধু তুমি নও, দুদিন পরে তােমার দেবতারাও আমার কবল থেকে মুক্ত করতে পারবে না নিজেদের। একে একে ব্যর্থ হবে তাদের আত্মার সমস্ত সুষমা। ভূলুণ্ঠিত হবে তাদের আধ্যাত্মিক মহিমা।

রম্ভা বললেন, আপনি অন্যায়ভাবে পরনারীকে ধর্ষণ করছেন। এই পাপকর্মের জন্য আপনাকে একদিন প্রতিফল পেতেই হবে।

রাবণ বললেন, পাপ-পুণ্যে বিশ্বাস করি না আমি। কিছুদিন আগে নরকে গিয়ে আমি নিজের হাতে সমস্ত পাপীদের মুক্ত করেছি। আমি বাহুবলে জয় করেছি তােমাদের ধর্মরাজকে।

রাত্রি যত গভীর হতে লাগল, কৈলাসের তুহিনশীতল পাষাণফলক শীতলতর হয়ে উঠতে লাগল তত অবিরাম শিশিরপাতে! প্রথম প্রথম শৈত্য অনুভব করছিলেন রম্ভা তার সারা দেহে। কিন্তু রাবণের দেহের শিরায় শিরায় উষ্ণ রক্তের যে ঢেউ বয়ে যাচ্ছিল তার তাপে রম্ভার দেহটাও তপ্ত হয়ে উঠছিল ক্রমশঃ।

রম্ভার স্পষ্ট মনে হলাে, ধীরে ধীরে কোথায় যেন বিলীন হয়ে যাচ্ছে তার সমস্ত শৈত্যানুভূতি। চোখে দেখতে না পেলেও সারাটি রাত ধরে রম্ভা শুধু রাবণের দেহের উষ্ণচঞ্চল রক্তস্রোতের অজস্র লীলালহরীকে অনুভব করতে লাগলেন নিজের দেহের মধ্যে।

শেষরাত্রির দিকে স্তিমিত হয়ে আসতে লাগল চাদের আলোে৷ হিমশীতল জড়তায় কেমন যেন জমাট বেঁধে উঠতে লাগল সারা পৃথিবী। দূর আকাশের চাঁদের দিকে নিমেষহারা দৃষ্টিতে চেয়েছিলেন রম্ভা। একটু পরেই ঐ চাদ অস্ত যাবে। | রম্ভা ভাবলেন, চঁাদের মধ্যে কলঙ্ক আছে বলেই হয়ত চাদ তার স্নিগ্ধনিবিড় এক রহস্যময় কিরণজালের দ্বারা সবার সব কলঙ্ককে আচ্ছন্ন করে রাখে সারারাত। কিন্তু যখন এই চাদ আর কিরণ দান করবে না আকাশে, স্পষ্ট দিবালােকে উজ্জ্বল হয়ে উঠবে যখন দশদিক তখন এই কলঙ্ককে কেমন করে কোথায় লুকিয়ে রাখবেন, কিছুই ঠিক করতে পারলেন না রম্ভা। জগতের সব প্রচ্ছন্ন বস্তুকে নির্মমভাবে প্রকাশিত করে তােলে যে সৌরালােক, সে আলােক কি তার দেহের এই অনপনেয় কলঙ্ককেও উদঘাটিত করে তুলবে না সকলের কাছে?

অশুভারাক্রান্ত হল রম্ভার আঁখি উৎপল। রাবণ বললেন, চাঁদের দিকে অমন করে একদৃষ্টে চেয়ে আছ কেন সুন্দরি? আমি তাে কই একটিবারও চাঁদকে দেখছি না। আমার কাছে তুমি চাঁদের থেকে অনেক বেশি সুন্দর। তাছাড়া আমি দুদিন পরেই চন্দ্র ও সূর্যকে জয় করব একে একে। চূর্ণ করব তাদের সমস্ত দম্ভ।

রম্ভা কোনাে উত্তর দিলেন না।

রাবণ বললেন, তার চেয়ে আমাকে ভালাে করে চেয়ে দেখ। সমস্ত অভিমান ও আশঙ্কা মন হতে ঝেড়ে ফেলে দেহ দিয়ে দৃষ্টি দিয়ে উপভােগ করাে আমার দেহের এই অতুলনীয় ঐশ্বর্যকে। 

আমি মনে করি জগতে শক্তিই একমাত্র নীতি, শক্তিই প্রকৃত সত্য, শক্তিই প্রকৃত সৌন্দর্য। ভালাে করে নিরীক্ষণ করলে দেখবেচাদের সৌন্দর্য অপেক্ষা আমার দেহের শক্তি অনেক বেশি সত্য ও সুন্দর। শক্তিই ধর্ম কারণ এই শক্তির উপরেই নির্ভর করছে সকল জীবের জীবন। পৃথিবীতে যার শক্তি বেশি আছে সেই বেঁচে থাকবে। চারি পাশের ছােট ছােট গুল্ম ও গাছগুলিকে বঞ্চিত করে বেশিমাত্রায় রস শােষণ করেই এতখানি বিরাট হয়ে বেড়ে উঠেছে ঐ সব বনস্পতির দল। অধিকতর বলবান প্রাণীরা দুর্বল প্রাণীদের দ্বারা উদর পূরণ করেই বেঁচে থাকে। সমুদ্র হচ্ছে মর্ত্যের সম্পদ। কিন্তু মর্ত্যের সকল মানব ও দানবকে বঞ্চিত করে সেই সমুদ্র হতে উথিত অমৃত ভােগ করে অমর হয়ে উঠেছে অষ্টবিধ গুণে ভূষিত তােমার প্রিয় দেবতারা।

সৃষ্টির পর হতে এই বিশ্বের যদি ইতিহাস লেখা হয় তাহলে দেখবে সে ইতিহাস হচ্ছে শশাষণ ও শক্তির একাধিপত্যের ইতিহাস।

রম্ভা দেখলেন ভাের হয়ে আসছে। ভােরের স্বচ্ছ আলাে উকি মারছে কল্পতরু শাখার ফাকে ফাকে।

রম্ভা করুণ কণ্ঠে বললেন, এবার উষাকাল সমাগত। আপনি আমায় মুক্তি দিন মহারাজ।

রাবণ বললেন, না, যে উদ্দেশ্যে তােমায় আবদ্ধ করেছি আমি, সে উদ্দেশ্য আমার এখনাে সার্থক হয়নি। তােমার দ্বারা যে প্রবৃত্তিকে আমার চরিতার্থ করতে চাই, তা এখনাে তৃপ্ত হয়নি।

রম্ভা বললেন, যে পবিত্র কৈলাস পর্বত দেবাদিদেব মহাদেবের নিবাস-ভূমি তারই একটি অংশে এমন ভাবে পরনারী ধর্ষণ করে আর কলঙ্কিত করবেন না সে পর্বতের পবিত্রতাকে।

তাচ্ছিল্যভরে হাসলেন রাবণ। হাসতে হাসতে বললেন, তার পবিত্রতা বহু আগেই বিনষ্ট হয়েছে সুন্দরি।

কথাটা বুঝতে না পেরে বিস্মিত হয়ে রাবণের পানে চেয়ে রইলেন রম্ভা।

রাবণ বললেন, এই কৈলাস পর্বতেই একদিন মহাযােগী মহাদেবের কামােন্মাদনা জেগেছিল অনিন্দ্যসুন্দরী পার্বতীর প্রতি। পরে এই উন্মত্ততায় অন্ধ হয়ে তিনি তাকে বিবাহ করে একশত বৎসর ধরে তার সঙ্গে শৃঙ্গার করেছিলেন এই পর্বতে।।

রম্ভা বললেন, কিন্তু তিনি বিবাহের পর বিধিমত ধর্মপত্নীর সঙ্গেই সহবাস করেছিলেন। রাবণ মৃদু হেসে বললেন, আমি স্বীকার করি তিনি বিবাহ করেছিলেন, কিন্তু বিবাহের আগেই তিনি কামাবিষ্ট হয়েছিলেন পার্বতীর প্রতি। সে বিবাহ ধর্মভাবের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল না, প্রতিষ্ঠিত ছিল কামভাবের উপর।

সুন্দরি যদি ইচ্ছা করাে, তাহলে আজ আমিও তােমায় বিবাহ করতে পারি। এক মিথ্যা ধর্মভাবের প্রলেপ দিয়ে পরিশুদ্ধ করে তুলতে পারি আমার প্রবৃত্তিটাকে। শিউরে উঠলেন রম্ভা। তা দেখে বিজয় গর্বে হাসলেন রাবণ।

হেসে বললেন, অবনতাঙ্গি, তুমি শুধু দেবচরিত্রের একটা দিকই দেখছ। তাই তাদের সম্বন্ধে পক্ষপাতিত্বমূলক মনােভাব পােষণ করছ। কিন্তু তুমি তাদের চরিত্রের আর একটি দিকের কথা জান না, একদিন সৃষ্টিকর্তা পিতামহ ব্রহ্মার মধ্যে চিত্তবিকার ঘটেছিল। আপন কন্যা অমলধবলকান্তি সরস্বতীর প্রতি কামার্ত হয়ে দৃষ্টিপাত করেছিলেন। দেবরাজ ইন্দ্র একদিন কেমন করে গৌতমপত্নী অহল্যাকে ধর্ষণ করেছিলেন সে কথা নিশ্চয়ই অবিদিত নেই তােমার।

রম্ভা বললেন, একটা কথা ভুলে যাচ্ছেন, কামদেব কন্দর্পের পঞ্চবাণে জর্জরিত হয়েই ব্রহ্মা অমনভাবে কামার্ত হয়ে উঠেছিলেন সহসা। আর কঠোর তপস্যার দ্বারা গৌতম দেবতােক অধিকার করবেন এই ভয়ে দেবতারা দেবরাজ ইন্দ্রকে মর্ত্যে পাঠিয়েছিলেন গৌতমের মধ্যে ক্রোধ সঞ্চার করে তার তপস্যার ফল বিনষ্ট করতে। 

তাচ্ছিল্যভরে আবার বিকট শব্দে হেসে উঠলেন রাবণ। বললেন, তুমি আমায় হাসালে সুন্দরি। দেবতারা চিরকাল এমনি চতুর। তারা তাদের উচ্ছঙ্খল কামপ্রবৃত্তিকে ঢাকা দিয়ে সাধু সাজবার জন্য চিরকালই এমনি করে কামদেবের উপর সব দোষ চাপিয়ে দিয়ে আসেন। তাদেরি দুর্মর নির্লজ্জ কামপ্রবৃত্তির এক মনগড়া প্রতীক ছাড়া কামদেব আর কেউ নয়।

দেবরাজ সম্বন্ধে তুমি যে কথা বললে সে কথাও সত্য নয় সুন্দরি। তুমি যে কারণ দেখালে তা যদি সত্য হতাে তাহলে আমি বলব তার স্ত্রীকে ধর্ষণ না করেও দেবরাজ অন্য কোনােভাবে ক্রোধ সঞ্জাত করতে পারতেন গৌতমের মধ্যে।

আর কোনাে কথা বললেন না রম্ভা। রাবণ চুপকরে রইলেন। বেলা প্রথম প্রহর অতীত হলে রম্ভাকে কিছুক্ষণের জন্য মুক্তি দিলেন রাবণ।

রম্ভাকে মুক্তি দিয়ে আকাশগঙ্গা মন্দাকিনীর জলে স্নান করতে গেলেন রাবণ। গিয়ে। দেখলেন, বড় মধুর ঝঙ্কারে নৃত্য করতে করতে ছুটে চলেছে খরস্রোতা মন্দাকিনী। দুই তীর হতে মন্দার কুসুম ঝরে পড়ছে তার জলে। চারিদিকে মধুগন্ধী ফুলের প্রাণমাতানাে সৌগন্ধে মাতােয়ারা হয়ে উঠেছে বসন্তের মদিনরাজ্জ্বল বাতাস। 

মন্দাকিনী জলে স্নান করে তীরে উঠে অগ্নিদেবের পূজা করলেন রাবণ। পূজা শেষে প্রজ্বলিত অগ্নিকে ঘিরে নৃত্য করতে লাগলেন আপন মনে।

অদূরে একটি শিলাখণ্ডের উপর বসে মন্ত্রমুগ্ধবৎ একদৃষ্টিতে সব কিছু দেখতে লাগলেন রম্ভা। যতক্ষণ পর্যন্ত না রাবণ তাকে যাবার অনুমতি দেবেন ততক্ষণ কোথাও যেতে পারবেন না তিনি। রাবণের বিরুদ্ধে কাজ করবার কোনাে শক্তিই নেই তার।

তাই নীরবে নিতান্ত অসহায়ভাবে বসে রইলেন রম্ভা। কিন্তু সকল দেবতাকে বাদ দিয়ে কেবলমাত্র অগ্নিদেবের কেন পূজা করছেন রাবণ কিছুই বুঝতে পারলেন না।

জিজ্ঞাসা করতে রাবণ বললেন, আমি একমাত্র অগ্নির উপাসক। এই অগ্নিই হচ্ছে জীবন, অগ্নিই পৌরুষ। অগ্নি যে তেজ উৎপন্ন করে সেই তেজের দ্বারাই জীবন ধারণ করি আমরা। অগ্নির অভাবই মৃত্যুর কারণ।

রম্ভা তবু বুঝতে পারলেন না রাবণের কথাটা।

রাবণ বললেন, সকল মানব দেহের মধ্যেই অগ্নির একটি বিশেষ স্থান আছে। কিন্তু নারীদের মধ্যে অগ্নি অধিকতর প্রবলভাবে বিরাজমান। তাই নিবিড় নারীসঙ্গের মধ্য দিয়ে আমার পৌরুষের উত্তাপ ও প্রাণশক্তির তেজকে বাড়িয়ে নিই মাঝে মাঝে। রাবণের কথা শুনে আশ্চর্য হয়ে গেলেন রম্ভা।

রাবণ আরও বললেন, সকলেই বলে, রাবণের মতাে নারীদেহ লােলুপ আর কেউ কোথাও নেই। কিন্তু তারা আমার জীবনের প্রকৃত রহস্য জানে না। তারা জানে না, নারীদেহের মধ্য দিয়ে এমনি করে আমার এক দেহাতীত প্রয়ােজনকে সিদ্ধ করি আমি। শুধু দেহগত তৃপ্তিই নারীসঙ্গলাভের একমাত্র উদ্দেশ্য নয় আমার। এর বাইরেও আরও একটা বড় উদ্দেশ্য আছে। | নারীধর্ষণের আমার আর একটি উদ্দেশ্য হলাে শত্রুর উপর প্রতিশােধ। তাদের সবচেয়ে প্রিয়বস্তুকে জোরপূর্বক অধিকার ও ভােগ করে তাদের উপর অদ্ভুত রকমের এক প্রতিশােধ গ্রহণ করি আমি। তাই শত্রনারী ধর্ষণ করে শত্রুকে জয় অথবা বধ করার চেয়ে বেশি আনন্দ পাই। শত্রনারীধর্ষণের মধ্য দিয়ে ঘােষিত হয় আমার এক অভিনব বিজয় গৌরব।

রম্ভা নীরব হয়ে বসে রইলেন।

বেলা দ্বিপ্রহর হতে রম্ভাকে নিয়ে আবার শৃঙ্গার আসনে বসলেন রাবণ।

এখন মধ্যাহ্নকাল। কারণ এখন সূর্য ঠিক মধ্য আকাশে অতুলনীয় উজ্জ্বলতায় বিরাজ করছে। জ্বলন্ত অগ্নি যেমন বর্ণহীন, এখন সূর্যও তেমনি বর্ণহীন। এখনকার মতাে রৌদ্র আর কখনাে প্রখর হয় না। রৌদ্র যেমন প্রখর হয়ে ওঠে এখন, তেমনি বৃক্ষছায়াও হয়ে ওঠে স্নিগ্ধ ও ঘনশ্যাম। বায়ুস্তর ক্লান্ত ও নিস্তরঙ্গ থাকে এই সময়।

রাবণ বললেন, মধ্যরাত্রির মতাে শান্ত স্তব্ধ এই দ্বিপ্রহরও এক মহালগ্ন। শৃঙ্গার কার্যের জন্য এই সময় সবচেয়ে প্রশস্ত।

লজ্জারক্ত মুখমণ্ডলের উপর আপন বস্ত্রাঞ্চলখানিকে চেপে ধরলেন রম্ভা। কোনাে কথা বললেন না।

রাবণ বললেন, আমি বৈদিক যােগশাস্ত্র পাঠ করে দেখেছি। তুমি হয়তাে শুনে আশ্চর্য হয়ে যাবে, আমার মতে শৃঙ্গারও এক প্রকারের যােগ। সমস্ত যােগক্রিয়ার লক্ষ্য হলাে, বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করে সমাধির স্তরে উন্নিত হওয়া। এই সমাধি হলাে এমন এক উচ্চতম সাধারণ উপলব্ধির স্তর যেখানে যােগী তার আরাধ্য বস্তুর সঙ্গে এক গুণগত মিলন লাভ করে।

রম্ভার বিস্ময়কে আরও বাড়িয়ে দিয়ে রাবণ বললেন, সার্থক শৃঙ্গারও হচ্ছে ঠিক তাই। এতে দুটি দেহ বস্তুগত ভিন্নতা সত্ত্বেও এক গুণগত মিলন লাভ করে। দুটি দেহের শিরায় শিরায় বইতে থাকে তখন একই উষ্ণ রক্তের প্রবাহ। একই অনুভূতির মধুর শিহরণে রােমাঞ্চিত হতে থাকে দুটি মন। তখন আমার আনন্দ হবে তােমার আনন্দ। তােমার বেদনা হবে আমার বেদনা।

প্রথম প্রথম রাবণের কথাটা বুঝতে না পেরে সত্যিই বিস্ময় অনুভব করছিলেন রম্ভা। | তারপর সেই বিস্ময়ের ভাবটা আপনা হতে কেটে যেতে তিনি স্পষ্ট বুঝতে পারলেন, প্রেমহীন আত্মাহীন রাবণের বিপুল দেহের জড় অস্তিত্বভার তার দেহের সব চেতনা ও অনুভূতিকে গ্রাস করে ফেলছে।

রাবণ তাঁর অপ্রতিরােধ্য গায়ের জোরে তার দেহের প্রতিটি অনুভূতি সঞ্চারিত করে দিতে লাগলেন যেন রম্ভার দেহের মধ্যে। রম্ভার নিজস্ব অনুভূতি বলতে যেন এখন আর কিছুই রইল না

রম্ভা চোখ মেলে চেয়ে দেখলেন, সম্ভোগজনিত এক অদ্ভুত পুলকচিহ্ন ফুটে উঠেছে রাবণের সারা মুখমণ্ডলে। সেই পুলকেরই দুরন্ত শিহরণে চঞ্চল হয়ে উঠেছে তার প্রতিটি অঙ্গ -প্রতঙ্গ।

এবার স্পষ্ট অনুভব করলেন রম্ভা, তারও প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের অস্থিমজ্জার গভীরে অদ্ভুত রকমের এক পুলকোদগম হতে শুরু করেছে। অনাস্বাদিতপূর্ব সেই পুলকের রহস্যকে কে যেন সঞ্চারিত করে দিচ্ছে তার দেহের প্রতিটি শিরায়। এ পুলক এ রহস্য জীবনে এর আগে কখনাে কোনােদিন অনুভব করেননি রম্ভা। | রম্ভার মনে হলাে, এ রহস্যের বর্ণ আছে। এ পুলকে মাধুর্য আছে। এ রহস্যের রঙিন স্পর্শে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছে তার দেহের রক্তস্রোত। আর সেই স্রোতের নির্মম আঘাতে ক্রমশঃ শিথিল হয়ে পড়েছে তার সমস্ত নীতিচেতনা।

রাবণের প্রতি ঘৃণা ভাবটা ক্রমশঃ ক্ষীণ হয়ে গেল রম্ভার।

নিজের মুখখানা নিজে দেখতে না পেলেও রম্ভার মনে হলাে, বসন্তের নবমঞ্জরী-সমুল্লসিত রক্তালশাকতরুর মতাে রঙে রসে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে সে মুখমণ্ডল। ফুল্লকুসুমিত কুঞ্জলতার মতাে সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে তার অঙ্গলতিকা।

রাবণের দেহের সঙ্গে নিজের দেহের সাযুজ্য লাভ করার সঙ্গে সঙ্গে রাবণের মনটাকে জানতে ইচ্ছা হল রম্ভার। মনে হতে লাগল, আত্মা যাক, মন বলে কি কোন জিনিস নেই রাবণের? কঠোর পৌরুষদৃপ্ত এই বিপুল স্থূল দেহভারের অন্তরালে এতটুকুও কি নেই কোনাে সূক্ষ্মসুন্দর মনের মাধুরী!

ভাবতে গিয়ে আশ্চর্য হয়ে গেলেন রম্ভা। কি করে এমন হয়! এত বিশাল যাঁর দেহসম্পদ, এমন অপরিসীম যাঁর দেহৈশ্বর্য, মনের দিকে হতে এতখানি কাঙাল তিনি কেমন করে হলেন! রাবণের প্রতি এক গােপন মমতা অনুভব করলেন মনে মনে।। | সহসা কি মনে হলাে একবার জিজ্ঞাসা করে ফেললেন রম্ভা। আচ্ছা মহারাজ, আপনি কি জীবনে কাউকে কখনাে ভালবাসেননি? অন্য কেউও কি ভালবাসেননি আপনাকে?

রাবণ হাসলেন, সদর্পে বললেন, ভালবাসায় বিশ্বাস করি না আমি। আমি কখনই বিশ্বাস করব না, কেউ কাউকে সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাবে ভালবাসতে পারে। আমরা শুধু নিরন্তর নিজেকে খুঁজে চলেছি অপরের মনের মধ্যে। যখনি যার কর্ম ও চিন্তার সঙ্গে আমাদের কর্ম ও চিন্তার কোনােরূপ সাদৃশ্য খুঁজে পাই,তখনি তাকে আমরা প্রেমাস্পদ বলে গ্রহণ করি। আমরা অপরের মধ্যে নিজেকেই ভালবাসি অন্যরূপে। তাছাড়া মানবজগতের কথা ছেড়ে প্রকৃতি জগতের দিকে চেয়ে দেখ, সেখানেও কেবল শক্তিরই প্রাধান্য। প্রেম ভালবাসার কোন স্থান নেই। বৃক্ষ কাউকে ভালবেসে ফল দান করে না; তার কাছে গিয়ে তার শাখাবাহু থেকে জোর করে তা ছিড়ে নিতে হয়।নদী কখনাে নিজে থেকে জলদান করে না ; তার বুকে গিয়ে ঝাপিয়ে পড়ে তুলে আনতে হয় সে জল। বসুন্ধরা তার বুকের গভীরে যে ফসল রাখে ত কর্ষণ করে জোর করে বার করতে হয়। অন্ধকার রাত্রিতে শত কাদলেও চন্দ্র বা সূর্য এক ফোটা কিরণ দান করে না কোনাে আর্ত পথিককে। |

সুন্দরি, আমি শক্তির উপাসক। শক্তি দিয়ে সব কিছুকে জয় করে নিতে চাই। প্রেম দ্বারা বশীভূত করে নয়। শত ভালবাসার বিনিময়েও কোনাে নারী কখনাে তার দেহের সমস্ত সুষমা নিঃশেষে উজাড় করে দেয় না কোনাে পুরুষকে। একমাত্র কোনাে ধর্ষকাম পুরুষই তার বিপুল দেহশক্তির দ্বারা নির্দয়ভাবে উপভােগ করতে পারে সে সুষমাকে। বহু সুন্দরী নারীকে নতজানু হয়ে কাতরভাবে অনুনয় বিনয় করে দেখেছি কোনাে ফল হয়নি! জোর করে তা আদায় করে নিতে হয় তাদের কাছ থেকে।

সন্ধ্যা হয়ে এলাে। তবু আজ পূর্ণিমার পরদিন বলে চাঁদ উঠল না। একটু পরে উঠবে। তাই তরল অন্ধকার তত ঘন হয়ে ওঠেনি।

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে রাবণ বললেন, কারাে কাছ থেকে আমি কোনাে ভালবাসা না চাইলেও আমার মনে হয় একজন আমায় ভালবাসে। সে হচ্ছে আমার প্রধানা মহিষী মন্দোদরী। সকলেই আমার শক্তিকে ভয় করে। আমার কর্মকে ঘৃণা করে। একমাত্র মন্দোদরী আমার সমস্ত ত্রুটি-বিচ্যুতি সত্ত্বেও আমায় ভালবাসে। মঙ্গল কামনা করে আমার কায়মনােবাক্যে। আমার মৃত্যুতে সকলেই স্বস্তির নিশ্বাস ফেলবে। শুধু একজনের বুক ফেটে বেরিয়ে আসবে একটি সকরুণ দীর্ঘশ্বাস। আমার মৃত্যুতে ভারমুক্ত হবে ত্রিভুবন; কিন্তু তাতে শুধু অন্তহীন ব্যথাভারে ভারাক্রান্ত হয়ে উঠবে একটি হৃদয়।

রম্ভার এতক্ষণে মনে হলাে, রাবণের মনের সন্ধান পেয়েছেন যেন তিনি সহসা। কথায় কথায় রাবণের মনের অনেক কাছে এসে পড়েছেন যেন।

সাহসে ভর করে রম্ভা বললেন, কিন্তু আপনি কেন সকলকে ভালবেসে যেতে পারেন না। মহারাজ? অন্যের সঙ্কীর্ণতায় আপনি কেন অনুদার হয়ে ওঠেন। আপনার জানা উচিত যে যত বেশি ক্ষুদ্র ও সংকীর্ণ সে তত বেশি স্বার্থপর।

রাবণকে চুপ করে থাকতে দেখে রম্ভা বললেন, আমি বুঝতে পারি না মহারাজ, আপনার দেহের মতাে মনটাও কেন বলিষ্ঠ হয়ে ওঠেনা। আপনার ওই বিস্তৃত বক্ষপটের মতাে প্রসারিত কেন হয় না আপনার আত্মা। আপনার অফুরন্ত শক্তির মতাে প্রেমও কেন অফুরন্ত হয়ে ওঠে আপনার অন্তরে।

শক্তি দিয়ে নয়, প্রেম দিয়ে সব কিছুকে জয় করে চলুন মহারাজ। এমন অফুরন্ত হয়ে উঠুক আপনার প্রেমের উৎস যাতে সকলকে অকাতরে দিয়েও তা ফুরিয়ে যাবে না কখননা। এতদিন ত্রিভুবন শুধু দেহের ঐশ্বর্য দেখে ভীত হয়ে এসেছে মহারাজ রাবণের। এবার তারা তার অন্তরের ঐশ্বর্য দেখে মুগ্ধ হয়ে যাক। তা যদি করেন তাহলে আপনার মৃত্যুতে শুধুমন্দোদরী নয়, সমগ্র ত্রিভুবন অশ্রু বিসর্জন করবে শশাকে।

মুক্তানি স্বেদবিন্দু দেখা যাচ্ছিল রতিক্লান্ত রম্ভার ললাটে। রম্ভার সেই স্বেদাঙ্কুরচিত্রিত ললাটে একটি মৃদু চুম্বন করে রাবণ বললেন, তুমি যতই চেষ্টা করাে না কেন কুটিলাক্ষি, তুমি আমায় ধর্মান্তরিত করতে পারবে না। কিছুতেই আমার মত বা পথের কোনাে পরিবর্তন হবে না। সে বিজয় অভিযানে আমি বার হয়েছি তা সম্পন্ন করবই। 

কৃত্রিম রােষস্ফুরিত কণ্ঠে রম্ভা বললেন, শক্তির ধ্বজা উড়িয়ে যতই আপনি সব কিছুকে জয় করে বেড়ান, একটা কথা সব সময় মনে রাখবেন, আসলে কিন্তু কেউ আপনাকে ভয় করে । আপনিই ত্রিভুবনের সকলকে ভয় করেন। এই ভয়ই আপনার অদম্য জিগীষার কারণ।

জগতের যে-কোনাে বস্তু বা ব্যক্তি সহসা প্রবল হয়ে আপনার প্রভুত্বকে খর্ব করে ফেলবে এই ভয়েই আপনি আপনার শক্তির পরীক্ষা দিয়ে চলেছেন সকলের কাছে।

পরদিন সকালে আবার মন্দাকিনীর জলে স্নান করতে গেলেন রাবণ।

রম্ভা কিন্তু আজ আর যাবার কথা বললেন না। সারাদিন রাবণের সঙ্গে প্রণয়কলাপে মত্ত হয়ে যাপন করলেন। 

একবার দুজনে সেই তুষারশৃঙ্গপরিবৃত উপত্যকা প্রদেশ ছেড়ে পর্বতের সানুদেশে এক গভীর অরণ্যে প্রবেশ করলেন।

রম্ভা কেবল বারবার বসন্তপ্রকৃতির বিভিন্ন শােভার প্রতি রাবণের দৃষ্টি আকর্ষণ করবার চেষ্টা করতে লাগলেন।

রম্ভা একবার বললেন, ওই দেখুন মহারাজ, অচিরােগত তাম্রাভ নবপল্লবগুচ্ছে ঈষদানত সহকারতরু লজ্জাবতী যুবতীর মতাে বায়ু-ভরে কেমন কাঁপছে। কিংশুক ও কর্ণিকার কুসুমের বর্ণসমারােহে কেমন উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে সমস্ত বনভূমি। সুগন্ধি শিলাজতুসৌরভে আমােদিত হয়ে উঠেছে কেমন সানুদেশের শিলাপটনিচয়।

রাবণ সে সব কিন্তু কিছুই দেখলেন না। তিনি কেবল অনুরাগান্ধ হৃদয়ে সুরতােৎসবে মত্ত হয়ে রম্ভাকে আলিঙ্গন করলেন।

রম্ভা বললেন, ছিঃ মহারাজ, আপনি কি চিত্তকে একবারও নিষ্কাম করে তুলতে পারেন না?

য়ে একবার চারিদিকের সুন্দর দৃশ্যাবলীর দিকে চেয়ে থাকন । নিবিড় সৌন্দর্যেপলব্ধি ধীরে ধীরে প্রসারিত করে তুলবে আপনার মনকে। আপনার মনের সমস্ত কালিমা ও সংকীর্ণতা দূর হয়ে যাবে একে একে।

রাবণ বললেন, তুমি যা বললে, আমার ক্ষেত্রে কিন্তু ঠিক তার উল্টো হয় সুযৌবনা। নিবিড় সৌন্দর্যোপলব্ধি শুধু আমার ভােগলালসাকে বাড়িয়ে তােলে। তােমার মুখচ্ছবিবিশিষ্ট, রূপ রস বর্ণ গন্ধ সমন্বিত ওই সব কুসুমরাজি ও মধুমত্ত ভ্রমরের কলমধুর গুঞ্জরণ আমার কামচেতনাকে ক্রমশই অদম্য ও অশান্ত করে তুলছে সুন্দরী।

সন্ধ্যার প্রাক্কালে আবার সেই উপত্যকাপ্রদেশে ফিরে এলেন দুজনে।

রাবণ বললেন, আগামীকাল সন্ধ্যায় তিন দিন তিন রাত্রি পূর্ণ হবে। যদিও তােমার সঙ্গলিঙ্গাকে কোনােমতে প্রশমিত করতে পারছিনা অন্তরে তথাপি ঐ সময় মুক্তি দেব তােমায়। আমিও তারপর স্বর্গাভিমখে অভিযান করব।

একটি শিলার উপর বসেছিলেন রম্ভা। চলে যেতে হবে ভেবে অন্তরের নিভৃতে সূক্ষ্মনিবিড় একটা ব্যথা অনুভব করছিলেন কোথায় যেন।

এদিকে একমনে রসাল চুতমঞ্জরীনির্মিত একরকমের মদ্য পান করছিলেন রাবণ। তার মধ্যে কোনাে ভাবান্তর লক্ষ্যগােচর হলাে না রম্ভার। | রম্ভা বললেন, একবার চেয়ে দেখুন মহারাজ, কেমন নিঃশব্দ নিশ্ৰুপ পদক্ষেপে অন্ধকার নেমে আসছে পৃথিবীতে। এখন অন্ধকার যেমন তরল ও অগভীর, বাতাস স্থির ও অচঞ্চল। আবার উন্নত ঋজুশীর্ষ দ্রুমশ্রেণীও তেমনি প্রশান্ত গম্ভীর।

রাবণ বললেন, প্রকৃতির মধ্যে সবকিছুকেই তুমি শান্ত ও সুন্দর দেখছ সবসময়। কিন্তু আমার হৃদয় কেন শান্ত হচ্ছে না সুন্দরি? আমি তােমায় ঠিক দেখাতে পারছিনা, আমার বুকের ভিতর কেমন এক দানবিক ঝড় বয়ে যাচ্ছে যেন সব সময়।

শাস্তকণ্ঠে রম্ভা বললেন, ও ঝড় আপনার অদম্য ভােগলালসার ঝড় মহারাজ। ভােগের মধ্য দিয়ে কখনাে ভােগ বাসনাকে নিবৃত্ত করতে পারা যায় না; তাতে আরও তা বেড়েই যায়। একমাত্র ত্যাগ ও সংযমের দ্বারাই ও ঝড়কে আপনি শান্ত করতে পারেন।

রম্ভার কোনাে কথা শুনলেন না রাবণ। কোনাে বাধা-নিষেধ বা সদুপদেশ প্রতিনিবৃত্ত করতে। পারল না দুরন্ত রাবণকে।

রম্ভাকে নিয়ে আবার শৃঙ্গারে মত্ত হয়ে উঠলেন রাবণ। তার এই অস্বাভাবিক মত্ততা দর্শনে বিস্মিত হয়ে পড়লেন রম্ভা।

রাবণ বললেন, আসন্ন বিচ্ছেদ আমায় কোনরূপ ব্যথাতুর না করে কেবল আমার ভােগ বাসনাকে প্রবল করে তুলছে সুন্দরি। যখনি ভাবছি, কাল তােমায় ত্যাগ করতে হবে, তখনি তােমার দেহ সম্ভোগের জন্য এক অসহ্য উন্মাদনা অনুভব করছি।

রম্ভা বললেন, ইচ্ছা করলে আমাকে আপনি মুক্তি নাও দিতে পারেন মহারাজ। ত্রিজগতের দশসহস্র রমণীকে যেমন বলপূর্বক বন্দী করে রেখেছেন আপনার রাজ-অন্তঃপুরে তেমনি আমাকেও রেখে দিতে পারেন।

রম্ভার কণ্ঠে কোথায় ক্ষোভ ছিল তা বুঝতে পারলেন রাবণ। বললেন, না সুন্দরি, তাদের হতে তুমি স্বতন্ত্র। তাদের সঙ্গে তােমার তুলনা করা চলে না। তাদের মতাে তােমাকে কিছুতেই বন্দী করে নিয়ে যেতে পারব না আমি। বিচ্ছেদের পরও জীবনে তােমার কথা কোনদিন ভুলব না আমি। বিস্ময়স্ফুরিত কণ্ঠে রম্ভা বললেন, কিন্তু কেন, কোনদিক থেকে তাদের হতে স্বতন্ত্র আমি মহারাজ?

রাবণ বললেন, কার্যকারিতার মধ্য দিয়েই সকল বস্তুর মূল্যকে আমি বিচার করি। আমার কাছে কোনাে বস্তুততখানি সত্য ও সুন্দর যতখানি তা আমার কোনােনা-কোনাে প্রয়ােজন সিদ্ধ করতে পারে। যুদ্ধকালে আমি এই সব বৃক্ষশাখা ও পর্বত শৃঙ্গ উৎপাটিত করে অস্ত্ররূপে ব্যবহার করি বলেই এরা আমার কাছে সত্য। যে নারীর সৌন্দর্যকে আমি আমার পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে নিঃশেষে ভােগ করতে পারি একমাত্র সেই নারীই আমার কাছে সুন্দর। যেফুল হতে উত্তম পুষ্পসার মদ্য প্রস্তুত হয় একমাত্র সেই ফুলের সুষমাকেই স্বীকার করি আমি। অন্য সব নারী থেকে তুমি সর্বপেক্ষা বেশি আনন্দ আমায় দান করেছ বলেই অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে তুমি আমার মনে।

তীব্র ঘৃণায় নাসিকাটি কুঞ্চিত হয়ে উঠল রম্ভার। ক্ষুন্নকণ্ঠে বললেন, আপনি এত নীচ! আপনি কি কখনাে আপনার সংকীর্ণ প্রয়ােজনচেতনার উর্ধ্বে উঠতে পারেন না? | রাবণ কোনাে কথা বললেন না। রম্ভা আবার বললেন, আপনি বিধাতার এক অদ্ভুত সৃষ্টি। আত্মা, আদর্শ, নীতি, ধর্ম প্রভৃতি মানবসভ্যতার যা কিছু শ্রেষ্ঠ দান আপনি তাদের শ্রেষ্ঠত্বে কোনােদিন বিশ্বাস করবেন না। শুধু অন্ধ বর্বর জৈবশক্তির দ্বারা প্রবলভাবে স্পন্দিত এক বিপুল জড়শক্তি ছাড়া আপনি আর কিছুই নন।

নিতান্ত উদাসীনভাবে রাবণ বললেন, হয়তাে তাই।

পরদিন রম্ভাকে সত্যসত্যই মুক্তি দিলেন রাবণ। কিন্তু নির্দয়ােপভুক্তা রম্ভাকে দেখে চেনাই যাচ্ছিল না। দশনাঘাত আলেখিত ক্লান্ত মুখমণ্ডলের চারিদিকে ইতস্ততঃ ছড়িয়ে পড়েছে করবীবন্ধনবিমুক্ত আলুলায়িত অলক-লতা। নিষ্ঠুর বিমর্দনে সব শােভা হারিয়ে ম্লান হয়ে উঠেছে তার কুঙ্কুমাক্ত স্তনট। হেমসূত্রগ্রথিত রত্নময় যে রশনাদামে বিভূষিত ছিল তার নিতম্ববিম্ব তা এখন শশাচনীয়ভাবে ছিন্নভিন্ন।

মন্দাকিনীজলে দেহ প্রক্ষালন করে আবার কমনীয়কান্তি হয়ে উঠলেন রম্ভা। তারপর নতমুখে বিদায় চাইলেন রাবণের কাছে।

রাবণ বললেন, আকাশ যেমন অত্রিমুনির তেজ ধারণ করেছিল, মন্দাকিনী যেমন ধারণ করেছিল মহাদেবের অনলনিহিত রৌদ্র তেজ, তেমনি তুমিও আমার অশেষ শক্তিসম্পন্ন তেজ ধারণ করতে সক্ষম হয়েছ তােমার গর্ভে। কিন্তু তাতে তােমার কোনাে সশ্রদ্ধ ইচ্ছা ছিল না বলে কোনাে সন্তান উৎপন্ন হবে না তার থেকে।

রম্ভা তেমনি চুপ করে নীরবে দাঁড়িয়ে রইলেন। তিনি বিষন্ন না উৎফুল্ল তা বােঝা গেল না তাকে দেখে।

রাবণ বললেন, আমি বহু নারীসংসর্গ করি বলে আমার তেজ অমােঘ নয়। তা না হােক। আমি সন্তান চাই না। আমি চাই শুধু আমার দেহতৃপ্তি। তুমি আমার দেহকে আনন্দ দান করেছ। এতে আমি বিশেষ সন্তুষ্ট হয়েছি তােমার প্রতি। দেহই আমার কাছে সব। এই দেহ ধারণের আগে বা পরে জীবন হচ্ছে এক মিথ্যা শূন্যতা। আত্মা ও অমরত্বে আমি বিশ্বাস করি না।

লােকে বলে দেহের মৃত্যুর পর আত্মা অমর হয়ে বেঁচে থাকে। কিন্তু কোথায় সেই আত্মা। আকাশে বাতাসে কোনাে মৃতব্যক্তির একটি আত্মার অস্তিত্বকেও তাে আমি দেখতে পাচ্ছি না। কই, কেউ তাে তারা আমাদের মতাে সুখ দুঃখ ভােগ করছে না। ভালাে করে চেয়ে দেখ, দেখবে উজ্জ্বল সৌরকিরণচ্ছলে কোনাে অমর আত্মা হাসছেনা। তৃণাগ্রসংলগ্ন শিশিরবিন্দুচ্ছলে রােদন করছে না কোন আত্মা। অনিলবিকম্পিত বনমর্মরে কেউ কখনাে দীর্ঘশ্বাস ফেলছে না।

মৃত্যুর পর তােমার এই দেহের সৌন্দর্য থাকবে না। মৃত্যুর পর আমার এই দেহের শক্তি থাকবে ন। তবু যতদিন তুমি বাঁচবে আমার এই দেহের শক্তির কথা মনে রাখবে। তবু যতদিন আমি বাঁচব তােমার এই দেহসৌন্দর্যের কথা মনে রাখব।

বসন্তের কিংশুক দেখে মনে পড়বে তােমার রক্তিম অধরােষ্ঠ। কুরুবক মঞ্জরীতে দেখব তােমার দশনপঙক্তি। তুষারধবল কুলেন্দু দর্শনে মনে পড়বে তোমার অপরূপ অঙ্গলাবণ্য। মসৃণ পর্বতপাত্র মনে পড়িয়ে দেবে তােমার পৃথু জঘনভার।

রম্ভা যখন বিদায় নিলেন তখন কৈলাসের তুষারশুভ্র শৃঙ্গমালার চারিদিকে অন্ধকার ঘন হয়ে উঠতে শুরু করেছে। যেন সতত সােহাগপিয়াসী কৃষ্ণবর্ণা কোনাে নায়িকা তার ধবলকান্তি প্রিয়বল্লভের কণ্ঠদেশকে নিবিড় প্রেমমাল্লাসে দু বাহু দিয়ে জড়িয়ে ধরেছে।

পথে যেতে যেতে রম্ভার কিন্তু কেবলি মনে হতে লাগল, দেহটা তার রাবণের বাহুপাশ হতে মুক্ত হলেও মনটা তার মুক্ত হতে পারেনি এখনাে। মনে হতে লাগল, সমগ্র বিশ্বটাই যেন রাবণ। বিরাট আকাশ তার মস্তক। সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্র তার চক্ষু। অরণ্যভূধরবিধৃত এই মহাজড়প্রকৃতি তার দেহ। মনে হলাে, রাবণ শুধু দশানন নন, রাবণের সহস্র আনন তার নিপীতসর্বস্ব ব্রণবিধুর অধরােষ্ঠকে চুম্বন করবার জন্য চারিদিক হতে ছুটে আসছে। তার ভীত ক্লান্ত দেহটাকে চারিদিকে হতে জড়িয়ে ধরবার জন্য উদ্যত হয়ে উঠেছে তার অজস্র বাহু।

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *