সহস্র এক আরব্য রজনী – ১৪ (আজিজ ও আজিজা আর তাজ অল-মূলক ও দুনিয়ার কিস্সা)

›› আরব্য রজনী  ›› ১৮+  

পারস্যের ইসপাহান পর্বতমালার পিছনে সবুজ শহর। এখানকার সুলতান সুলেমান শাহ। সারাটা জীবন সে ধর্মকর্ম নিয়েই কাটাতো। তার মতো সৎ প্রজাবৎসল উদার সুলতান বড় একটা দেখা যায় না। সারা সালতানিয়তের কোণে কোণে সে ঘুরে বেড়াতো। উদ্দেশ্য-তার প্রজারা কে কিভাবে দিন গুজরান করছে তাই দেখা। তার নিরপেক্ষ উদারনীতির জয়গান করতো সকলে। ধনী দরিদ্র ভেদাভেদ করতো না। তার চোখে সবাই সমান। সবাই প্রজা। এইভাবে প্রজাদের ভক্তি ভালোবাসা কুড়িয়ে তার জীবনের বেশীরভাগ সময়ই কেটে গেলো। শুধু একটা সাধই তার অপূর্ণ রয়ে গেলো। বেগম আর পুত্র কন্যা। যতই জীবনের সায়াহ্নকোল এগিয়ে আসে সুলতান ষ্ট সুলেমান ক্রমশই নিজেকে বড় একা—অসহায় মনে করতে থাকে। একদিন উজিরকে ডেকে বললো, দেখ, আমার স্বাস্থ্য দিন দিন ভেঙে পড়ছে। উৎসাহ উদ্দীপনা স্তিমিত হয়ে আসছে। শরীরে কোনও বল পাচ্ছি না। মনে হচ্ছে, দিন শেষ হয়ে এলো। এখন এই বয়সে বুঝতে পারছি, কোন মানুষের একা থাকা উচিত নয়। সঙ্গবিহীন জীবন মরুভূমির মতো। বিশেষ করে সুলতানের পক্ষে তো নয়ই। কারণ সিংহাসনের উত্তরাধিকার একটা বিরাট সমস্যা। তাছাড়া আমাদের পয়গম্বরও বলেছেন শাদী কর এবং সংখ্যা বাড়াও। এখন আমাকে সৎ পরামর্শ দাও, উজির–কি করা বিধেয়।

উজির চিন্তিতভাবে বলে, আপনি বড় কঠিন প্রশ্ন করেছেন হুজুর। এককথায় এর জবাব হয়। না। আমি আমার সাধ্যমতো উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করছি। জানি না। আপনাকে সস্তুষ্ট করতে পারবো কি না। এটাও অবশ্য অত্যন্ত দুঃখের হবে, যদি আপনি কোন অজ্ঞাতকুলশীল বাঁদীকে শাদী করেন। বাদীকে শাদী করায় আমার কেন আপত্তি নাই। কিন্তু কথা হচ্ছে, তার বংশ পরিচয় আমাদের অজ্ঞাত। হয়তো এমনও হতে পারে, যে বাদীকে আপনি শাদী করলেন তার বাবা একটা শয়তান বজাৎ বা চোর ডাকাত ছিলো। বাবার রক্ত মেয়ের ধমণীতে প্রবাহিত হয়। আবার সেই রক্ত নাতির দেহে সঞ্চারিত হবে এ আর বিচিত্র কি? আপনার পুত্র যদি বড় হয়ে আপনার সৎ গুণের অধিকারী না হয়ে তার দাদুর স্বৈরাচারের দোষে দুষ্ট হয়, তাহলে? এই কারণে হুজুরের প্রতি বান্দার আর্জি তিনি যেন আমাকে কোন বাঁদী কিনে আনতে না হুকুম করেন। তা সে মেয়ে যদি দুনিয়ার সেরা সুন্দরী হয় তাতেও আমার সায় নাই। সন্তান উৎপাদনই যদি আপনার একমাত্র কাম্য হয়, আমি পরামর্শ দেব, কোনো সুলতান বাদশাহর মেয়েকে বেগম করে আনুন। আপনি চাইলে শাহবংশের সেরা সুন্দরীর অভাব হবে না।

সুলতান বললো, তা যদি পাওয়া যায়, তাই নিয়ে এসো। শাদী করবো। শুধুমাত্র সন্তানের জন্য।

—পাত্রী আমার দেখাই আছে, জাঁহাপনা।

—তাই নাকি! কে, কার মেয়ে?

আমার বিবি বলেছে, সফেদ শহরের সুলতান জহর শাহর এক পরমা সুন্দরী কন্যা আছে। তার রূপের বর্ণনা দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তবে শুনেছি, ইদানীংকালে এমন রূপসী, নিখুঁত সুন্দরী মেয়ে সারা আরবে নাই।

আনন্দে উল্লাসে ফেটে পড়ে সুলতান, ইয়া আল্লাহ!

উজির বলে, আপনি আর বিলম্ব করবেন না হুজুর। দরবারের এক বিচক্ষণ আমিরকে পাঠিয়ে দিন। সুলতান জহর শাহকে সে শুধু এই সংবাদটা দেবে যে সবুজ শহরের সুলতান তার কন্যার পাণিপ্রার্থী। তারপর দেখবেন সুলতান জহর শাহ আপনার কাছে ছুটে আসবে। তার নাতি সবুজ শহরের সিংহাসনে বসবে-এ লোভ কি সে সম্বরণ করতে পারবে!

সুলতান বললো, কাকে পাঠানো যায় বলতে উজির। এমন লোককে পাঠাতে হব যে কায়দা করে সাজিয়ে গুছিয়ে বলতে পারবে। অথচ আমার মান ইজ্জতটাও খোয়া যাবে না।

উজির ভেবে পায় না। কাকে পাঠানো যায়। সুলতান বললো থাক, অত ভেবে কাজ নাই। এসব কাজ অন্য লোক দিয়ে হয় না। তুমি নিজেই যাও। তাড়াতাডি কাজ হাসিল করে ফিরে এসো। তুমি না ফেরা পর্যন্ত। খুব চিন্তায় থাকবো।

খুব তাড়াহুড়া করে দরবারের জরুরী কাজকর্ম সমাধা করে উজির সফেদ শহরের সুলতান সকাশে যাত্রার উদ্যোগ করতে লাগলো। উট আর খচ্চরের পিঠে বোঝাই করা হলো নানা উপঢৌকন-হীরে, জহরৎ, স্বৰ্ণালঙ্কার, রেশমের গালিচা, সূক্ষ্ম কারুকার্য করা শাল, সুগন্ধী আন্তর, গোলাপের নির্যাস এবং আরও ছোট ছোট বহু মূল্যবান বিলাসসামগ্ৰী।। তার সঙ্গে নিলো দশটি তাগড়াই আরবের ঘোড়া, একশোটি খোজা, একশোটি নিগ্রো ক্রীতদাস এবং একশোটি দাসী বাদী। লাটবিহার বোঝাই করে। উজির রওনা হওয়ার আগে সুলতানের কাছে বিদায় নিতে এলো। সুলতান বললো, খুব তাড়াতাডি ফিরবে। এবং খালি হাতে আসবে না। পাত্রীকে সঙ্গে করে নিয়ে আসবে।

উজির বললো। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন জাঁহাপনা, আমি যাবো। আর আসবো। ওখানে দেরি করার কিছু নাই। পাত্রীকে নিয়েই চলে আসবো।

উজির তার দলবল নিয়ে রওনা হয়ে পড়ে। দুৰ্গম গিরি পর্বত ডিঙিয়ে, দুস্তর মরুপ্রান্তর পেরিয়ে এবং বিস্তর খাল বিল নদী অতিক্রম করে একদিন সফেদ শহরের প্রায় কাছাকাছি এসে পৌঁছয়। দ্রুতগামী এক অশ্বারোহীকে দূত করে সুলতান জহর শাহর দরবারে পাঠিয়ে দেয় উজির।

বিকালে সুলতান জহর শাহ মুক্ত বায়ু সেবন করতে বাগানের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। দূরাগত এক অশ্বারোহীকে দেখতে পেয়ে উজিরকে জিজ্ঞেস করে, কে আসছে দেখতে উজির।

ইতিমধ্যে অশ্বারোহী আরও নিকটতর হলে বোঝা গেলো, কোনও বিদেশী দূত। একটু পরে সামনে এসে অভিবাদন জানিয়ে সে বললো, আমি সুলতান সুলেমান শাহর দূত। আপনার শহরের প্রান্ত সীমায় নদীর ওপারে আমাদের উজির তাবু গেড়েছেন।

সুলতান জহর। আনন্দিত হয়ে বললো। তুমি এখন বিশ্রাম করো, খানাপিনা সারো। তারপর সব শুনবো।

একজন আমিরকে বললো, একে খুব খাতির করে খাওয়াও। দেখো, যেন বদনাম না হয়।

নদীর ওপারে তাঁবু গেড়ে উজির প্রত্যাশা করে বসে থাকে। তার দূত কখন ফিরে আসবে, কি সংবাদ বহন করে আনবে সে চিন্তায় অধীর হয়ে পথের দিকে চেয়ে থাকে। ধীরে ধীরে রাত বাড়ে, দূত ফিরে আসে না। উজিরের চিন্তা ক্রমশ দুশ্চিন্তায় রূপান্তরিত হতে থাকে। এমন সময় দেখা গেলো, সুলতান জহর শাহর উজির আমির ওমরাহদের নিয়ে তার সামনে এসে হাজির হলো।

যথাযোগ্য বাদশাহী কেতায় পরস্পরের মধ্যে আলাপ পরিচয় পর্বশেষ হলো। সুলতান শাহর উজির করজোড়ে আমন্ত্রণ জানালো, আপনি যদি অনুগ্রহ করে আমাদের শহরে পায়ের ধুলো দেন, ধন্য হবো।

সুলতান সুলেমানের উজির বলে, চলুন, সুলতানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবো বলেই তো এসেছি।

বিরাট একটা দরবার কক্ষে প্রবেশ করলো তারা। দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে আমির ওমরাহরা উপবিষ্ট ও প্রান্তের ঠিক মাঝখানে এক শ্বেতপাথরের সিংহাসনে সুলতান জহর শাহ। পিছনে সুলতানের দেহরক্ষী এবং প্রধান সেনাপতি। সারা দরবার কক্ষ পারস্য-গালিচায় মোড়া। মাথার উপরে ঝুলন্ত ঝাড়বাতি।

সুলতান সুলেমানের উজিরকে সাদর অভ্যর্থনা করে বসানো হলো। সুলতান জহর শাহ উজিরের সম্মানে এক ভোজসভার আয়োজন করলো। নানারকম বাদশাহী খানাপিনীয় আপ্যায়িত করা হলো তাকে।

এর পর দরবার থেকে সবাই একে একে বিদায় নিয়ে চলে যায়। শুধু সুলতান, তার উজির এবং সুলতান সুলেমানের উজির বসে রইলো।

সুলেমানের উজির উঠে দাঁড়িয়ে কুর্নিশ জানিয়ে বললো, আপনি মহানুভব সুলতান। আপনার দরবারে আমার সুলতানের তরফ থেকে একটি আর্জি পেশ করছি। আমাদের সুলতান আপনার কন্যার পাণি প্রার্থী। আমি তার কাছ থেকে যে সব উপহার উপটৌকন নিয়ে এসেছি, আপনি গ্রহণ করে ধন্য করুন।

সুলতান জহর শাহ উঠে দাঁড়িয়ে কুর্নিশ জানালো। দরবারের সকলে অবাক! একি কাণ্ড, সুলতান স্বয়ং উঠে দাঁড়িয়ে কুর্নিশ জানালেন সামান্য এক উজিরকে। সুলতান দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই বললো, আপনি প্রবীণ প্রাজ্ঞ উজির। আপনার প্রস্তাব আমি সর্বান্তিঃকরণে গ্রহণ করলাম। আমার কন্যা আপনার সুলতানের কেনা বাদী হয়ে থাকবে। আমি নিজেও তীর একান্ত অনুগত প্রজাতুল্য। আমার কন্যার পাণি প্রার্থনা করে যে প্রস্তাব তিনি পাঠিয়েছেন সে জন্য আমি তার কাছে চিরঋণী। হয়ে রইলাম!

সুলতান কাজীদের ডেকে পাঠায়। কাজীরা এসে তার কন্যার সঙ্গে সুলতান সুলেমানের শাদীনামা তৈরি করে দিলো। সুলতান জহর কাগজখানা হাতে নিয়ে কপালে ঠেকিয়ে সম্মান জানালো।

সুলতান উপস্থিত সকলকে মূল্যবান পোশাক এবং প্রচুর ধনরত্ন উপহার দিয়ে খুশি করলো। কন্যার সহচরী হয়ে যাবে যারা, সেই সব দাসী-বাদী বাছাই করা হলো। দশটা খচ্চরের পিঠে উপহার সামগ্রী বোঝাই করে, পরদিন প্রত্যূষে সুলতান জহর শাসীর সাজে সাজিয়ে কন্যাকে নিয়ে রওনা হয়ে, তিন দিনের পথ অতিক্রম করার পর উজির এবং কন্যাকে বিদায় জানিয়ে আবার নিজের শহরে ফিরে এলো।

আরও তিনদিন চলার পর সবুজ শহরের এলাকায় পৌঁছে উজির এক অশ্বারোহীকে পাঠিয়ে সুলতান সুলেমানকে খবর পাঠালো : সংবাদ শুভ। পাত্রীকে সঙ্গে নিয়ে এসেছি।

সুলতান সুলেমান উত্তেজনায়, আনন্দে অধীর হয়ে নিজের গায়ের মহামূল্যবান শালখানাই দূতের হাতে তুলে দেয়।

সারা শহরে আনন্দের হিল্লোল জাগে। তাদের সুলতান শাদী করছেন। এবার সিংহাসনের নতুন উত্তরাধিকারীর সম্ভাবনা উজ্জ্বল হলো। শহরবাসীরা স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে নিজেরা এসে মনোহারী সাজে প্রাসাদ সাজাতে থাকে। আলোয় আলোয় ভরে ওঠে শহরের পথঘাট।

সেদিন রাতে সুলতান মধুযামিনী যাপন করে। প্রথম রাতেই বেগম অন্তঃসত্তা হয়। সুলতান নতুন জীবন ফিরে পায়! তার সিংহাসনের উত্তরাধিকারী আসবে। আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওঠে।

দশ মাস পরে বেগম এক পুত্র সন্তানের জন্ম দিলো। চাঁদের মতো ফুটফুটে সুন্দর ছেলে। আদর করে সুলতান তার নাম রাখে তাজ অল মুলুক।

ছেলের যখন সাত বছর বয়স সেই সময় থেকে তার লেখাপড়া শিক্ষা-দীক্ষার জন্য শহরের প্রাচীন জ্ঞানীগুণী শিক্ষক নিযুক্ত করা হয়। তাজ অল মুলুক লেখাপড়ায় বেশ মেধাবী। অল্পকালের মধ্যেই সে নানা বিষয়ে পারদর্শী হয়ে ওঠে। লেখাপড়ার সঙ্গে সঙ্গে চলতে থাকে দেহচর্চা। ঘোড়ায় চড়া এবং অস্ত্রবিদ্যা আয়ত্ত করে ফেলে।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দক্ষতাও বাড়তে থাকে। আঠারো বছর বয়সে তাজ অল মুলুক সর্বশাস্ত্ব বিশারদ এক পরিপূর্ণ যুবক হিসাবে খ্যাতিমান হয়ে ওঠে। সে যখন ঘোড়ায় চেপে শিকারে বেরুতে রাস্তার দু-ধারে আবালবৃদ্ধবনিতা জড়ো হয়ে তার রূপের প্রশংসায় উচ্ছসিত হয়ে উঠতো। শিকার তার বড় প্রিয় ছিলো। সঙ্গী সাখী নিয়ে মাঝে মাঝেই জঙ্গলে চলে যেত।

একদিন নদীর ধারে তাজ অল মুলুক পাখি শিকারে বেরিয়েছে। এমন সময় দেখলো একদল সওদাগর তাদের উট খচ্চরগুলোকে ছেড়ে দিয়ে নদীর ওপারে তাবু গেড়েছে। সওদাগররা নদীর জলে নেমে রুজু করছে। শাহজাদা তাজ অল মুলুক। একজন নফরকে পাঠিয়ে ওদের খবরাখবর জেনে আসতে বলে।

চাকরিটা এসে জিজ্ঞাসা করায় ওদের একজন বলে, আমরা বিদেশী বণিক। চলতে চলতে পরিশ্রান্ত হয়ে এই নদীর ধারে তাঁবু গেড়েছি। এখানে দু’একদিন বিশ্রাম করে আবার রওনা হবো। এখানকার শস্যশ্যামল প্রান্তর আমাদের বড় ভালো লেগেছে।

চাকরাটা প্রশ্ন করে, তোমরা যে এই অজানা অচেনা দেশে তাবু ফেলেছে, ভয় করে না? যদি চোর ডাকাত-এর উপদ্রব হয়?

ওরা বলে, আমরা জানি সুলতান সুলেমান শাহর দেশে চুরি রাহাজানি হয় না। এখানকার মানুষ সুলতানের মতোই সৎ এবং ধাৰ্মিক। সুলতান সুলেমান শাহর সত্যনিষ্ঠার খ্যাতি সর্বত্র। আর তা ছাড়া, আমরা শাহজাদা তাজ অল মুলুকের কাছে ভেট নিয়ে যাচ্ছি। আমাদের ভয় কী?

চাকরাটা ফিরে এসে তাজ অল মুলুককে এ কথা জানাতেই সে ওদের কাছে এগিয়ে যায়। তার কাছেই ওরা যাচ্ছে! সঙ্গে উপহার সামগ্ৰী।। তাজ অল মুলুক কিছুই বুঝতে পারে না।

শাহজাদাকে আসতে দেখে সওদাগররা এগিয়ে এসে সাদর অভ্যর্থনা করে তীবুর ভিতরে নিয়ে যায়। নানারকম বাহারী জিনিসের সে কি বিচিত্র মেলা। তাজ অল মুলুক যা দেখে তাই পছন্দ করে বসে। এক এক করে অনেকগুলো সৌখিন জিনিস তার পছন্দ হয়। সওদাগররা সেগুলো একত্র করে বাঁধাৰ্ছদা করে শাহজাদার হাতে তুলে দেয়। তাজ অলমুলুক জিজ্ঞেস করে, কত দাম? ‘

সওদাগররা নাক কান মলে জিভ কেটে বলে, ও কথা বলবেন না, হুজুর। আমরা আপনার গোলামের গোলাম। এই সামান্য কাঁটা জিনিস পছন্দ করে নিয়ে আমাদের ধন্য করেছেন। আমরা কি দাম নিতে পারি?

চাকরের হাতে জিনিসগুলো নিজের তাঁবুতে পাঠিয়ে দিয়ে সওদাগরদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ঘোড়ার পিঠে চাপতে যাবে, এমন সময় এক বিষাদ বিষণ্ণ যুবকের দিকে তাজ অল মুলুকের নজর পড়ে। ছেলেটি দেখতে বড় সুন্দর। কিন্তু কিসের যেন ব্যথা, কিসের যেন দুঃখ তাকে মুহ্যমান করে রেখেছে। তাজ অল মুলুক-এর আর চলে যাওয়া হয় না। ছেলেটির কাছে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করে, তোমার চোখে জল কেন ভাই, কি নাম তোমার?

ছেলেটি শান্ত গলায় জবাব দেয়, আমার নাম আজিজ।

আর কিছু বলতে পারে না। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে।

তাজ অল মুলুক সান্ত্বনা দিয়ে বলে, কেঁদ না, বন্ধু চুপ কর। দুঃখ সকলের জীবনেই আসে। তাই বলে তার কাছে নিজেকে বিকিয়ে দেওয়া ঠিক না। বলো, তোমার কি দুঃখ। আমি যদি কাটাতে পারি, কথা দিচ্ছি, প্ৰাণ দিয়েও তা করবো।

ছেলেটি শান্তভাবে বলে, সে কথা শুনে আপনার কি ফয়দা হবে? থাক।

তাজ রাগ করে, তোমার বিশ্বাস হচ্ছে না। আমাকে? কিন্তু সত্যি বলছি, তোমাকে দেখামাত্র আমার অন্তর কেঁদে উঠেছে। বলো বন্ধু, অসঙ্কোচে বলো, তোমার কাহিনী। তোমার দুঃখের কিছু ভাগ নিতে চাই।

ছেলেটি বলে, ঠিক আছে বলবো, চলুন আপনার তাঁবুতে গিয়েই বলবো। এখানে অনেক লোকের ভিডি।

ছেলেটিকে সঙ্গে নিয়ে তাজ তার তাঁবুতে ফিরে আসে। দুজনে মিলে খানাপিনা করে। তারপর ছেলেটি বলতে থাকে? আমি আমার বাবার একমাত্র সন্তান। ধনী সওদাগর হিসাবে বাবার বেশ নামডাক ছিলো। আমার কাক মারা যাওয়ার সময় তার একমাত্র মা-হারা মেয়েকে আমার বাবার হাতে তুলে দিয়ে যান। আমরা দুই ভাইবোন এক সঙ্গেই মানুষ হতে থাকি। ওঃ বলতে ভুলে গেছি, আমার নাম আজিজ আর আমার কাকার মেয়ের নাম আজিজা। আজিজার শাদির বয়স হলো। বাবা বললেন, ভাই মারা যাওয়ার সময় হাতে ধরে বলে গিয়েছিলো, আজিজের সঙ্গে আজিজার যেন শাদী দিই।

আজিজের মা বলে, তা তো বেশ ভালোই হবে। মানাবেও ভালো। তা ছাড়া ছোট থেকে ওরা এক সঙ্গে হেসে খেলে মানুষ হয়েছে, এখন মেয়েটা পরের ঘরে পাঠাবে নাকি?

একদিন রাতে খান খেতে বসে বাবা বললেন, তোমাকে শাদী করতে হবে।

আমি তো আশমান থেকে পড়ি। হঠাৎ বলা নাই কওয়া নাই শাদী করতে হবে? আর তা ছাড়া পাত্রীই বা কোথায়? কাকে শাদী করবো! ঘরেই যে পাত্রী বাড়ছে সে কথা কিন্তু একবারও আমার মনে হয়নি। কিন্তু তা বলে আজিজা আর আমার মধ্যে ভালোবাসা যে কিছু কম ছিলো তা নয়। দুজন দু’জনকে ছেড়ে একটা দিন কাটাতে পারতাম না। কোনও একটা ভালো জিনিস দেখলে সব আগে আজিজার কথাই আমার মনে পড়তো! তেমনি আজিজাও আমাকে প্ৰাণ দিয়ে ভালোবাসতো। কোথাও কোনও ভালো খাবারদাবার পেলে আমার জন্যে তুলে রাখতো। বলতো, খাও, তুমি খেলেই আমার খাওয়া হবে।

এহেন যে সম্পর্ক-ত যে একদিন স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসায় আবদ্ধ হয়ে যাবে তা কিন্তু আমি ভাবতেই পারিনি। বাবা একটু কৰ্কশভাবেই আবার বললেন, আগামী জুম্মাবার সন্ধ্যায় তোমাদের শাদীর দিন ঠিক করা হয়েছে। তোমার বন্ধুবান্ধবদের—যাদের ডাকতে চাও নিমন্ত্রণ করে এসো।

বাবার ওপরে কথা বলার সাহস আমার ছিলো না। মাথা গুজে খেয়ে দেয়ে উঠে পড়লাম।

শুক্রবার দিন নামাজ শেষ করেবাড়ি ফিরবো হঠাৎ মনে পড়লো, এক বন্ধুকে এখনও বলা হয়নি। ওর বাড়ির দিকে হেঁটে চললাম। দুপুরের বাঁঝা করা রোদ। একেবারে লু বইছে। চোখমুখ ঝলসে যাবার দাখিল। আমি আর চলতে পারি না। সামনেই একটা বাগিচা। ভিতরে ঢুকে পড়লাম। একটা গাছের ছায়ায় শান বাঁধানো চকুতরায় বসে একটু জিরিয়ে নেবো। তারপর রোদের ঝাঁঝাঁটা একটু কমলে আবার বেরিয়ে পড়বে—এইরকম ইচ্ছা!

ঝির ঝির করে হাওয়া দিচ্ছে। একটা রুমাল বিছিয়ে চাবুতরার উপরে শুয়ে পড়ি।

একটু বোধ হয় তন্দ্ৰা লেগেছিলো। হঠাৎ খট করে একটা শব্দ হতেই কেটে গেলো। চেয়ে দেখি একখানা লাল রঙের রুমালে কি যেন একটা বস্তু পড়ে আছে আমার কাছেই। তুলে নিয়ে খুলে দেখি, রুমালে বাঁধা এক টুকরো পাথর। এদিক ওদিক চাইলাম! দেখি, সামনের বাড়ির দোতলার একটি জানোলা খোলা। তার পাশে বসে এক পরমা সুন্দরী কন্যা। বুঝলাম রুমালখানা সে-ই ছুঁড়েছে।

সেই মুহুর্তে আমার মনের মধ্যে কি যে ঘটে গেলো বোঝাতে পারবো। না। মনে হলো, যাকে প্রণয় বলে, প্রেম বলে—তার প্রথম আস্বাদ পেলাম। নারী আমার শৈশবকালের সঙ্গী। কিন্তু এই উন্মাদনা সে আমার অন্তরে জাগাতে পারেনি।

রুমালখানার এক কোণে কয়েকটা কথা লেখা ছিলো : পথিক, তুমি কি পথ হারাতে চাও না? যে পথে চলেছে তার বাইরে তো আরও অনেক অচেনা অজানা দুৰ্গম পথ আছে। সেই পথে পাডি দেবার মজা কি পেয়েছে কখনও?

সেই মুহুর্তে ভালোবেসে ফেললাম সেই অজানা অচেনা সুন্দরীকে। আমার চিত্ত বিহ্বল হলো। ভুলে গেলাম সেই দিন সন্ধ্যায় আমার শাদী।

মেয়েটি আমাকে অনেক রকম ইশারা করে কি সব বোঝাতে চাইলো। প্রথমে তর্জনী ঠোঁটে রাখলো। পরে দু’হাত দিয়ে বুকটা চেপে ধরলো। কিন্তু আমি তার একবৰ্ণও বুঝতে পারলাম না। একটু পরে জানালা বন্ধ করে দিলো।

আমি তবু ঠাঁয় বসে থাকি। আশা, আবার যদি খোলে, আবার যদি কিছু বলে! আবার যদি তার দেখা পাই। সেই আশায় একদূদ্ষ্টে চেয়ে রইলাম সেই রুদ্ধ কপাট জানালার দিকে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়, বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে। সন্ধ্যাও কখন রাত্রির রূপ ধারণ করে। কিন্তু বসে থাকি সেই চবুতরায়। আশা, যদি আবার সে জানালা খোলে!

কিন্তু না, জানালা আর খুললো না, ব্যর্থ মনে ঘরে ফিরে চলি! বাবা ক্রুদ্ধ স্বরে বললেন, এই তোমার আক্কেল। আজ তোমার শাদী, আর তুমি কিনা দুপুর রাতেবাড়ি ফিরলে। এমন যার দায়িত্ব বোধ তার হাতে মেয়ে দেওয়া নিবুদ্ধিতা। এ শাদী হবে না। আমি বাতিল করে দিলাম।

মা কান্নাকাটি করলেন। কিন্তু তিনি বাবাকে ভালো করেই জানতেন। বাবার রাগ বড় চণ্ডাল। একবার না’ বললে, ‘হ্যা’ করানো শক্ত!

আজিজা এলো। আমার হাত দু’টো ধরে পাশে বসালে, কি হয়েছে বলতো ভাই। আমার কাছে লুকিয়ো না, খুলে বলো।

জীবনে কখনও কোনও কথা আজিজার কাছে আমি গোপন করিনি। আজও পারলাম না। সব বললাম।

-প্রথম দৰ্শনেই ভালোবাসা কাকে বলে আমি জানি না। আজিজ, কিন্তু আজ ঐ মেয়েটিকে দেখার পর থেকে সারা দেহমানে আমার ঝড় উঠেছে। কিছুতেই মন শান্ত করতে পারছি না। কিছুতেই তার মুখচ্ছবি মুছে ফেলতে পারছি না। তুমি বলতে পারো আজিজ, এমন কেন হলো! এর কি নাম?

আজিজা বলে, এরই নাম ভালোবাসা। তুমি ওকে ভালোবেসে ফেলেছে।

আমি বাধা দিয়ে বলি, না না, আজিজ, সে কি করে হয়? আমি তো তোমাকে ভালোবাসি।

–না। আজিজ। তোমার আমার সম্পর্ক যে ভালোবাসার, এ ভালোবাসা সে ভালোবাসা নয়। একে বলে প্ৰেম।

আমি চমকে উঠি। প্ৰেম!

আজিজা আমাকে সোহাগ জানিয়ে বলে, তুমি কিছু ভেবো না। আজিজ, আমি তোমাকে সাহায্য করবো। তুমি জীবনে সুখী হবে। তোমার মুখে হাসি দেখবো, এর চেয়ে বড় কিছু নেই আমার কাছে। তোমার জন্যে আমার বুকের কলিজাও ছিঁড়ে দিতে পারি। শুধু আমার একমাত্র কামনা তোমাকে খুশি করা। এখন বলো তো মেয়েটা তোমাকে কিছু বলেছে কিনা।

আমি বললাম, অত দূর থেকে কথা বলবে কি করে! এই রুমালখানা সে ছুঁড়ে দিয়েছে। আর হাতের ইশারা করে কি সব বোঝাতে চেয়েছে—আমি কিছুই বুঝতে পারিনি।

—কী ইশারা করেছে।

—প্রথমে হাতের একটা আঙুল ঠোঁটে রাখলো। পরে হাত দু’টো বুকে চেপে ধরলো।

আজিজ বলে, বুঝেছি, ও তোমাকে চুম্বন জানিয়েছে। আর তার হৃদয় তোমাকে সমর্পণ করতে চেয়েছে। তুমি নিশ্চিত থাক, আজিজ আমি তোমাদের দু’জনের মিলন ঘটিয়ে দেব। এখন দিন দুই তুমি বিশ্রাম করো। তারপর আবার তোমাকে আমি পাঠাবো সেখানে।

আজিজার কোলে মাথা রেখে আমি তার অনেক আদর সোহাগ খেলাম। নানাভাবে প্রবোধ দিয়ে সে আমাকে আশ্বস্ত করতে থাকলো। দুদিন পরে বিকেলে সে নিজে হাতে আমাকে সাজালো। দামী পোশাক পরলো। আন্তর ছড়ালো শরীরে।

বললো, যাও। কিন্তু তাড়াতাডি ফিরবে। আমি তোমার পথ চেয়ে বসে থাকবো।

বাগিচায় ঢুকে সেই চবুতরায় বসে অধীর আগ্রহে বন্ধ জানালার দিকে তাকিয়ে থাকি। এক এক মুহূর্ত মনে হয় এক এক যুগ। একটু পরে জানোলা খুলে যায়। সেই মৃগনয়না ষোড়শী। বুক ভরা যৌবন নিয়ে জানালার গরাদ ধরে দাড়ন। এক হাতে আয়না আর অন্য হাতে একখানা রুমাল। রুমালখানা তিনবার ভাঁজ করলো আবার খুললো। রুমাল সুদ্ধ হাতখানা একবার উপরে একবার নিচে উঠাতে নামাতে থাকে। আয়না দিয়ে তিনবার আমার মুখে আলো ফেলে। এর পর গায়ের জামাটার অস্তিন গুটাতে গুটাতে ধবধবে ফর্সা বাহুমূল পর্যন্ত উন্মুক্ত করে দেখায়। সব শেষে ডান হাতের পাঁচটা আঙুল প্রসারিত করে বুকের ওপর চেপে ধরে। এর পর জানালা বন্ধ করে দেয়।

আমি কিছুই বুঝতে পারি না। ছুটেবাড়ি আসি। আজিজকে সব ইশারাগুলো দেখাই।

আজিজা বললো, এর অর্থ হলো, পাঁচদিন পরে সে তোমাকে তার হৃদয়ের কথা বলবে। ওদের বাড়ির কাছাকাছি একটা কাপড় রং করার দোকান আছে, সেখানে তুমি অপেক্ষা করবে।

আমি আনন্দে লাফিয়ে উঠি, তুমি ঠিকই বলেছ। আজিজ। ওদের বাড়ির কাছেই একটা জহুরীর দোকান আছে। জামাকাপড় রং করে। কিন্তু আজিজ, পাঁচটা দিন তাকে না দেখে আমি বাঁচবো কি করে?

আজিজ বলে, ভালোবাসা বড় বিষম বস্তু। কোনও কোনও সময় বছরের পর বছর তার জন্যে অপেক্ষা করে বসে থাকতে হয়। তবে দেখা মেলে। তোমাকে মাত্র পাঁচটা দিন অপেক্ষা করতে হবে, পারবে না? মনটা একটু শক্ত কর, সোনা, অত অধৈর্য হলে কি চলে? ওঠ, একটু কিছু মুখে দাও। শরীরে বল পাবে।

কিন্তু আমার মুখে কিছু রুচে না। কিছুই খেতে পারি না। সারা রাত এক ফোটা ঘুমাতে পারি না। এই প্রথম অনুভব করতে থাকলাম ভালোবাসার কি বিষম জ্বালা।

এই পাঁচটা দিনের অসহনীয় প্রতিটি মুহূর্ত আমার পাশে পাশে থেকে আজিজা আমাকে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করেছে। সে ঋণ আমি কোনওদিন ভুলবো না।

পাঁচদিন পরে সে আমাকে গরম জল করে দিলো, আমি হামামে গিয়ে ভালো করে গোসল করলাম। নিজে হাতে আমাকে সুন্দর করে সাজিয়ে দিলো সে।

—যাও আর দেরি করো না। সে হয়তো এসে ফিরে যেতে পারে। তার চাঁদ মুখ দেখে নয়ন সার্থক করে এসো। রাতে ঘুমিয়ে তাকে স্বপ্ন দেখতে পারবে।

আমি হন হন করে হেঁটে চললাম। কিন্তু গিয়ে দেখি দোকানটা বন্ধ। খেয়াল হলো, আজ শনিবার-বন্ধের দিন। যাই হোক, বন্ধ দরজার সামনে রোয়াকের উপর বসে রইলাম। সন্ধ্যাবেলার নামাজের সময় হয়ে গেলো। কিন্তু তার দেখা নাই। একটু পরেই রাতের অন্ধকার নেমে আসবে। ভাবলাম, আর বিলম্ব করা সমীচীন হবে না। উঠে দাঁড়িয়ে মদ্যপ মাতালের মতো প্রায় টলতে টলতে ঘরে ফিরে আসি। আজিজকে কোনরকমে বলতে পারি, আসেনি। দেখা হয়নি।

তারপর আমার আর চৈতন্য ছিলো না। পরদিন সকালে চোখ মেলে দেখলাম, আজিজার কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছি। আমি জিজ্ঞেস করলাম, সারা রাত তুমি ঘুমাওনি?

—কি করে আর ঘুমাই বলো! তুমি যা ভুল বকেছো, আমার তো ভয়ই লেগে গিয়েছিলো। আমি বললাম, কিন্তু সে এলো না কেন আজিজা?

–এও ভালোবাসার একরকম পরীক্ষা। সত্যিই তুমি তাকে ভালোবাস কিনা এবং তার জন্যে কতটা ধৈর্য তোমার আছে সে পরীক্ষাও সে করে নিলো। যাই হোক, আজি বিকেলে আবার তুমি বাগিচায় গিয়ে বসে। দেখবে, নতুন কোনও ইশারা জানাবে।

বিকেলে যথারীতি আজিজা আমাকে সাজিয়ে গুছিয়ে রওনা করে দিলো। বাগিচার চবুতরায় এসে বসে রইলাম। একটু পরে জানালা খুলে গেলো। এবার দেখলাম তার এক হাতে একটা বঁটুয়া এবং একখানা আয়না অন্য হাতে একটা লণ্ঠন এবং একটা ফুলদানী।

প্রথমে আয়নাখানা বটুয়ায় ভরলো। বটুয়ার দডিটা এঁটে বন্ধ করে পিছনের দিকে ছুঁড়ে দিলো। তারপর মাথার চুলগুলো খুলে আলুথালু করে মুখটা ঢেকে ফেললো। এরপর সে ফুলগুলোর মধ্যে ঢুকিয়ে রাখলো লণ্ঠনটা। এর একটুক্ষণ পরেই জানালা বন্ধ করে দিলো।

আমি কিছুই বুঝলাম না। হাহাকার করা রিক্ত হৃদয় তুষানলে জ্বলতে থাকলো।বাড়ি ফিরে এসে আজিজকে বললাম।

আজিজ ব্যাখ্যা করে জানালো, আয়নাটা বটুয়ার মধ্যে ভরে পিছনে ফেলে দেওয়ার অর্থ—দিন শেষ হলে যখন রাত্রি নেমে আসবে। কালো চুলগুলো এলোমেলো করে ফর্স মুখটা ঢাকার অর্থও ঐ একই। সূর্যের আলো যখন অন্ধকারে ঢেকে যাবে। ফুল—অর্থাৎ ফুলবাগানে মানে ঐ বাগিচায় যাবে তুমি। আর লণ্ঠন দিয়ে বোঝাতে চেয়েছে, একটা আলো দেখতে পাবে। সেই আলো অনুসরণ করে গেলেই তুমি তোমার ভালোবাসার দেখা পাবে।

এবার আর আজিজার কথা আমার বিশ্বাস হয় না।–তোমার কথা মতো যাচ্ছি, কিন্তু দেখা তো হচ্ছে না।

আজিজ বললো, ধৈর্য ধরো, আবার যাও। দেখবে এবার তুমি ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসবে না।

সত্যিই সেদিন তার দেখা পাওয়া গেলো। সন্ধ্যার অন্ধকার সবে ঘনিয়ে এসেছে। বাহারী সাজে। সেজেগুজে বাগিচার সামনে আসতেই দেখি সদর ফটকটা খোলা। ভিতরে ঢুকলাম। অদূরে একটা ঝাপড়া গাছের নিচে একটা চিরাগ জুলছিলো। আলোটা লক্ষ্য করে চলতে থাকি। আলোটাও চলতে থাকে। এইভাবে এক সময় এসে ঢুকলাম এক বিশাল জলসাঘরে।

দরজা জানালায় দামী রেশমী পর্দাঁ। মেজেয় পারস্য গালিচা। উপর থেকে ঝুলছে বিরাট বিরাট ঝাড়বাতি। টেবিলে নানারকমের বাদশাহী খানাপিনী। একপাশে ফরাশের ওপর রাখা নানা দেশের নানা জাতের বাদ্যযন্ত্র। কিন্তু ঘরে কেউ নাই। একেবারে জনমানবশূন্য। ফাঁকা। শুধু আমি একা বসে রইলাম। ভাবছি, এই বুঝি সে আসবে, এই বুঝি তার পায়ের শব্দ শুনলাম। কিন্তু না। পুরো তিনঘণ্টা কেটে গেলো। খিদেয় পেট জুলছে। সামনে লোভনীয় খানাপিনা। আমার প্রিয় আঙুর। কিন্তু খাই কি করে। যার আমন্ত্রণে এসেছি, তারই দেখা নাই। কিন্তু কতক্ষণ আর অপেক্ষা করা যায়। পেটে ক্ষিদে আর সামনে খাবার রেখে বসে থাকার কোনও মানে হয় না। খান কয়েক পিস্তার বরফঁী তুলে নিয়ে খেতে থাকলাম। ওফ, কি অপূর্ব স্বাদ! এমন জিনিস তো আগে কখনও খাইনি। কতগুলো খেয়ে ফেলেছিলাম বলতে পারবো না। এক সময় দেখলাম রেকবীখানা খালি হয়ে গেছে। কিন্তু খিদে একটুও কমলো না। এর পর রসালো ‘বাককালাবাহ’ গুলো একে একে সব গলাধঃকরণ করে নিলাম। তখন আমাকে খাওয়ার নেশায় পেয়ে গেছে। সফেদ হালওয়ার রেকবীও শূন্য হয়ে গেলো। এর পর আমি মোরগ-মোসল্লাম-এর দিকে নজর দিলাম। এক এক করে চারটেই সাবাড় করে ফেললাম। সবগুলো খাবারই অপূর্ব স্বাদের। যেখানে যা ছিলো সব চেটেপুটে খেয়ে পেটটা বেশ ভরে গেলো। ঝারি থেকে পেয়ালা পেয়ালা সরাব ঢেলে নিয়ে এক এক চুমুকে নিঃশেষ করে দিতে থাকলাম। ধীরে ধীরে মাথাটা ভারি হয়ে আসতে থাকে। চোখের পাতা বন্ধ হয়ে আসে। জোর করে জেগে থাকার চেষ্টা করি। কিন্তু ঘুম আমাকে রেহাই দিলো ঈষত না। কার্পেটের উপর অঘোরে ঘুমিয়ে পড়লাম।

এর পর আর বলতে পারবো না, সারা রাতে কিছু ঘটেছে কি না। যখন ঘুম ভাঙ্গলো, দেখলাম জানোলা দিয়ে সোনালী রোদ এসে পড়েছে আমার মুখে। হঠাৎ অনুভব করলাম, আমি রিক্ত মেজের উপরে শুয়ে আছি। সারা মেজেয় নুন ছড়ানো। কীটার মতো বিধছে। কে যেন পেটের উপর রেখে গেছে এক রাশ কয়লায় গুড়ো। গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। এদিক ওদিক ভালো করে দেখলাম। নাঃ, কেউ কোথাও নাই। সারা শরীর রীরী করতে লাগলো। নিজের নিবুদ্ধিতার জন্যে নিজের হাত কামড়াতে লাগলাম।। প্রায় দৌড়তে দৌড়তেবাড়ি ফিরে এসে আজিজার কাছে আছাড় খেয়ে পড়ি।

আমার ঐ কিন্তুত কিমাকার চেহারা দেখে ভীতচকিত আজিজা আমাকে টেনে তোলে, কী সোনা, একি দশা হয়েছে তোমার! কেউ কী মারধোর করেছে?

–না।

–তবে?

—জানি না। আমি ঘুমিয়েছিলাম। সকালে উঠে দেখি কে বা কারা আমার সর্বাঙ্গে কয়লার গুড়ে ঢেলে দিয়ে গেছে।

আজিজা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, মেয়েটা বলতে পারলো না?

–মেয়েটার সঙ্গে আমার দেখা হয়নি।

—সে কি, তোমার ঘুম ভাঙ্গার আগেই কেটে পড়েছে?

আমি অধৈর্য হয়ে উঠি।—আসলে তো কেটে পড়বে। আদপেই সে আসেনি।

আজিজা আরও অবাক হয়। মেয়েটা এলো না। অথচ তুমি তার ঘরে গেলে কি করে?

আমি সব বললাম। আজিজা হতভম্ব হয়ে বসে রইলো কিছুক্ষণ। তারপর বললো, ভয়ে আমার আত্মা শুকিয়ে যাচ্ছে আজিজ। মেয়েটার হাতে তোমার অনেক দুঃখ আছে। নুনের অর্থ হলো—তোমার দেহের যৌবন অপুষ্ট। যে কারণে নারী সম্ভোগের কামনার চেয়ে আহার এবং নিদ্ৰাই তোমার কাছে প্রধান মনে হয়। আর কয়লার গুড়োর মানে হচ্ছে-তার চোখে তুমি অতি ঘূণ্য। মেয়েটার ধারণা, তুমি সেখানে শুধু খাওয়া আর ঘুমানোর জন্যেই যাও। তার দেহ যৌবন বা ভালোবাসা তোমার কাছে তেমন কোনও লোভনীয় ব্যাপার নয়। সেই কারণে আমার মনে হয়, তোমার সেখানে আর না যাওয়াই উচিৎ।

আজিজার কথা শুনে আমি বুক চাপড়াতে লাগলাম।–ইয়া আল্লাহ, সব দোষ তো আমার। বুকে যদি ভালোবাসার আগুন জ্বলতে থাকে। তবে কি আর নাওয়া খাওয়ার কথা মনে আসে। প্রেম এমনই বস্তু যা চোখের ঘুম কেড়ে নেয়। কিন্তু আমি তো সেই তুচ্ছ রসনা তৃপ্ত করতেই ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। এইভাবে প্রেমের অপমান করলে কোন প্রেমিকাই সহ্য করে না। সেদিক থেকে ওর তো কোনও দোষ দিতে পারি না। এখন আমার কী হবে। আজিজ, সে যদি আমাকে প্রত্যাখান করে আমি বাঁচবো না। একটা কিছু উপায় বাৎলে দাও, সোনা।

আমার দুঃখ দেখে আজিজও ব্যথিত হয়। এ জীবনে আমাকে ছাড়া আর কিছুই সে জানে না। আমিই তার ধ্যান জ্ঞান। আমার সুখেই তার সুখ। আমার দুঃখে সে কাতর হয়। আমাকে কী ভাবে হাসিখুশি রাখবে তার চিন্তাতেই সে পাগল। তা না হলে কোনও মেয়ে তার ভালোবাসার ধন অন্য মেয়ের হাতে তুলে দিতে পারে? আমি বুঝতে পারি, আজিজার অন্তরে তুষের আগুন জলছে। কিন্তু কী অসাধারণ চাপা মেয়ে, মুখে তার বিন্দুমাত্র প্রকাশ নাই।

—শোনো, আজিজ, আমার তরফে যতটা করা দরকার আমি করবো। কিন্তু তাতেই কী তুমি সুখী হবে? তাকে পাবে? তুমি তো জানি সোনা, তোমার বাবা আমার চাচা আমার শাদীর জন্যে চেষ্টা করছেন। শুনেছি পাত্বও নাকি ঠিক করে ফেলেছেন। তাই এখন আমাকে তারা ঘরের বাইরে বেরুতে দেবে না। তাছাড়া তোমাদের দু’জনের ভালোবাসার মধ্যে, আমি একটা ফালতু মেয়ে, আমার যাওয়াও ঠিক হবে না। আজ রাতে তুমি আবার যাও। কিন্তু সাবধান, ঘুমিয়ে পড়বে না। যদি খানাপিনার লোভ সামলাতে পারো তা হলে চোখের ঘুম ঠেকাতে পারবে। পেট ভরা থাকলে চোখে ঘুম আসেই। তাই বলছি, জিভ দিয়ে জল গড়ালেও খানাপিনা একদম ছোবে না। আল্লাহর উপর ভরসা রেখে যাও, আমার মনে হয়, আজ রাতে সে দেখা দেবে। সারাটা দিন ছটফট করে কাটালাম। সূর্য যখন পাটে বসলো আমি ততক্ষণে সেজেগুজে তৈরি। আমার পোশাকে আতর ছড়িয়ে দিতে দিতে আজিজা বললো, আমার কথা মনে আছে তো?

–কি কথা?

—বাঃ রে, তোমাকে বলেছিলাম না, যখন তোমার ‘ভালোবাসা’ তোমায় সোহাগ করবে, তখন একটা প্রেমের গান শোনাবে তাকে। আমার মনে পড়ে। আজিজা আমাকে একটা ভালোবাসার

আজিজা বলতো, গানের গলা নাকি আমার চমৎকার।

দেখলাম, ওরা দু’গাল বেয়ে জলের ধারা নেমেছে।

—আজিজ তুমি কাঁদছো।

–না না, কই না তো।

ওড়নার আঁচল দিয়ে চোখ দু’টো মুছে ফেলে বলে, ও কিছু না। চোখে একটা কুটো পড়েছে।

আমার তখন ভালোবাসার ভীমরতি ধরেছে। আজিজার অন্তরের ব্যথা তলিয়ে দেখার ফুরসৎ নাই।

আজিজ আমাকে বিদায় দিতে দিতে বলে, দেখে শুনে যেও। আর যা যা বলে দিয়েছি মনে থাকে যেন।

সেদিনও গিয়ে দেখি, সাজানো গোছানো আগের দিনের মতোই করা হয়েছে। কিন্তু কোথাও কোনও জন প্রাণী নাই। শূন্য ঘরে একা বসে রইলাম। প্রত্যাশা আজ সে আসবে। দেখা হবে। আমায় ভালোবাসায় ভরিয়ে দেবে। কিন্তু কেউ এলো না। অনেক রাত অবধি একা একা বসে রইলাম। খুব খিদে পেয়ে গেলো। আর থাকতে পারলাম না। ভাবলাম খেয়ে নিই। ঘুম যদি আসে জোর করে জেগে থাকবো। এক এক করে সব খানা পিনা চেটে পুটে খেলাম। আজ আমি খুব হাঁশিয়ার আছি ঘুম এড়াতেই হবে। চোখ দু’টো বুজে আসতে চায়। কিন্তু উঠে দাঁড়িয়ে, পায়চারী করে জেগে থাকার চেষ্টা করতে থাকলাম। কিন্তু বৃথাই চেষ্টা। কখন যে ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়লাম, বুঝতেই পারিনি। ঘুম ভাঙতে দেখি সকাল হয়ে গেছে। কিন্তু একি! আমি তো জলসাঘরে ছিলাম, এই ঘোড়ার আস্তাবলে এলাম কি করে? সারা শরীর কাদা-চোনায় মাখমাখি হয়ে গেছে। আমার পেটের ওপর কতকগুলো মাংসের হাড় আর একটা গোলাকৃতি বল। কিছু তরকারীর খোসা, কিছু শুকনো শুটি, দু’টো দিরহাম আর একখানা ছুরি। ঝেড়ে ঝুড়ে উঠে দাঁড়ালাম। শুধু ছুরিখানা হাতে নিয়ে বাড়ির পথে ছুটে চললাম।

আমার সেই উদ্রান্ত চেহারা দেখে আজিজা বুঝলো, আজও কোনও অঘটন ঘটে গেছে।

—তোমাকে পইপই করে বারণ করলাম, তবু ঘুমিয়ে পড়েছিলে?

আমি কান্নায় ভেঙে পড়ি। কোন জবাব দিতে পারি না। আজিজা আমাকে অনেক করেই বলেছিলো, খানাপিনার লোভ করলে ঘুম এড়াতে পারবে না। আমার নিজের সর্বনাশ। আমি নিজেই করছি। তার জন্যে কাকে দোষ দেব। আজিজা আমাকে ভালো পরামর্শই দিয়েছিলো। কিন্তু আমি তা মানিনি। তার অবশ্যম্ভাবী ফল যা হবার তা-ই হয়েছে।

আজিজা আমার কাছে এসে পাখা দিয়ে হাওয়া করতে থাকে। মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। বলে, তুমি ভীষণ বোকা। এখনও বুঝতে পারছে না মেয়েটা কি বোঝাতে চায়?

আজিজার প্রশ্নের জবাবে গতরাতের সবই খুলে বলতে হলো।

আজিজা শুনে কপাল চাপড়াতে থাকলো—তোমাকে তো আমি তোতাপাখির মতো পড়িয়ে দিলাম, সোনা, যত লোভই হোক, খানা খাবে না, মদ ছোবে না। তা আমার বারণ শুনলে না কেন?

আমি চিৎকার দিয়ে উঠি।-যা হবার তো হয়ে গেছে। এবার বলো, কি করবো? তাকে না। পেলে আমি মরে যাবো।

আজিজা বলে, ঐ গোল বলটার মানে হচ্ছে-তোমার ভেতরটা ফাঁপা বেলুনের মতো, অন্তঃসারশূন্য। শুধু হাওয়া ভরা। না আছে কোনও কামনা, না আছে কোন বাসনা। ঐ শব্জীর খোসাগুলো তোমার অপদার্থতার প্রতীক। আর ঐ শুকনো শুটিগুলো দিয়ে বোঝাতে চেয়েছে-তোমার প্রাণের সব রং রস শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। ভালোবাসার নাম গন্ধ নাই। আর ঐ মাংসের হাড়গুলো দেখে আমি ভয় পেয়েছি—বলতে আমার গা শিউড়ে উঠছে।

আমি অধৈর্য হয়ে চিৎকার করি, কিন্তু ঐ ছুরিটা। তার কথাতো বললে না? তাছাড়া ঐ দুটো দিরহামই বা কী?

আজিজা এক মুহূর্ত চুপ করে কি যেন ভাবে। তারপর বলে, শোনো, সোনা, ছুরিটার ইঙ্গিত বড় মারাত্মক। ঐ দু’টো রূপের দিরহাম তার দু’টো চোখের প্রতীক। ওটা দিয়ে বোঝাতে চেয়েছে, চোখের কসম খেয়ে সে বলছে ফের যদি তুমি ওখানে গিয়ে খানাপিনা করে নাক ডাকিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে তোমার গলা সে কেটে দেবে।

আজিজার কথা শুনে অঝোরে কাঁদতে থাকি। —আমার কোনও পথ নাই। কিন্তু তাকে না। পেলে আমি বাঁচবো কি করে?

আজিজা বললো, যা হয়ে গেছে তার তো আর চারা নাই। এবার নিজেকে একটু শক্ত করা। যা বলি মন দিয়ে শোনো। আজ সারাটা দুপুর তুমি ঘুমাও। তারপর বিকালে উঠে গোসল করে খানাপিনা করে নেবে পেট ভরে। আমি নিজে হাতে খানা পাকাচ্ছি। তুমি যা যা খেতে ভালোবাসে সেই সব খানা তৈরি করবো খেতে রুচি হবে। পেট ভরে খেয়ে গেলে খিদেও পাবে। না। আর পেটে খাবার না পড়লে ঘুম আসবে না। তাছাড়া দুপুরে যা ঘুমাবে। তারপর বড় একটা ঘুম পাবেও না।

আজিজার কথায় অনেকটা ভরসা হলো। বললাম, আমার মাথার কসম খেয়ে বলছি, এবার আর কোনও নড়াচড় হবে না। যা যা বলবে, দেখে নিও, অক্ষরে অক্ষরে মানবো।

সারাটা দুপুর খুব ঘুমালাম। আমার শিয়রে বসে আজিজা হাওয়া করতে থাকলো। মাথায় কপালে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। আমি আরামে ঘুমিয়ে পড়লাম।

বিকেলে ঘুম থেকে উঠে শরীরটা বেশ ঝরঝরে মনে হতে থাকে। হামামে গিয়ে গোসল করে নিই। আজিজ নতুন সাজ-পোশাক এনে দেয়। এই পোশাক পরে আজিজার সঙ্গে আমার শাদী হওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু ঘটনাচক্রে সে বিয়ে ভেঙে গেছে।

আমি বললাম, এ পোশাক কেন আনলে আজিজা? এতো আমার শাদীর পোশাক?

—কিন্তু শাদী তো আর হলো না!

–হ’লো না মানে—আর কি হবে না?

আজিজা মাথা নত করে মৃদু কণ্ঠে বলে, হবে না কেন? কিন্তু তখন কি আর এই পোশাকের দরকার হবে? শাহজাদীর সঙ্গে শাদী হবে, সাজপোশাকও বাদশাহী বাহারী হতে হবে।

আমি বলি, কেন তোমার সঙ্গে হবে না?

—আমার শাদী অন্য পাত্রের সঙ্গে ঠিক করছেন চাচা! তোমার সঙ্গেই তো একবার ঠিক হয়েছিলো। কিন্তু তুমি তো করছে না। চাচা আর কি করবেন। বাধ্য হয়েই অন্য পাত্রের সন্ধান করেছেন।

আমি আর কোনও জবাব দিতে পারি না। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকি। আজিজা আমাকে আদর করে বলে, তাতে কি হয়েছে আজিজ। শাদী যার সঙ্গেই হোক, আমি তোমারই ছিলাম, তোমারই আছি, তোমারই থাকবো। আর তুমিও যাকেই চাও আমার তাতে কিছু যায় আসে না। এ জীবনে তোমাকে না পেলেও শেষ বিচারের দিন মিলন আমাদের হবেই।

টস টস করে দু-ফোঁটা চোখের জল গড়িয়ে পড়ে। আজিজা বলতে থাকে, আজ তোমার পরম লগ্নের দিন। চোখের জল ফেলে তোমার অভিসারের পথ পিছল করে দেব না। যাও, আজ তোমার মনস্কামনা পূর্ণ হবে। প্রিয়ার আদর সোহাগে ভরে যাবে তোমার দেহ-মন। এতদিনের সাধ তোমার পূর্ণ হবে আজ। কিন্তু আজিজ সেই ভালোবাসার গানটা তাকে শোনাতে ভুলো না! তোমার মতো গানের গলা ক’জনের হয়। দেখবে, গানের সুরে মুগ্ধ হয়ে আরও কত আদর সোহাগ করবে তোমায়। আমি আল্লাহর কাছে দেয়া মাঙছি, সোনা তোমরা যেন ক্ৰৌঞ্চ মিথুন হয়ে সারাজীবন এক হয়ে থাকতে পোর।

আজিজার মতো প্রেমিক। এ সংসারে হয় না। নিজের ভালোবাসার পাত্রকে সাজিয়ে গুছিয়ে অন্য মেয়ের বাসরশয্যায় পাঠাতে পারে কাটা মেয়ে?

সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এসেছে। বাগিচার সদর ফটকের সামনে এসে দাঁড়াতেই চোখে পড়লো সেই আলো। নিশানা ধরে এগিয়ে যেতেই পৌঁছে গেলো। সেই সাজানো গোছানো জলসা ঘরে। সেই একই দৃশ্য। খান পিনা সব যথাযথ রাখা আছে। নাই শুধু কোন জনপ্রাণী। আজ আমি আটঘাট বেঁধে এসেছি। কিছুতেই খাবার-দাবার স্পর্শ করবো না। আর ঘুম আজ আমার ধারে কাছেও ঘেঁসিতে পারবে না।

সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত্রি গম্ভীর হতে থাকে। আমি ঠায় চুপচাপ বসে কডি কাঠ গুনছি। পাশের টেবিলে খানাপিনা সাজানো আছে। ভুলেও ওদিকে নজর দিচ্ছি না। যদিও আজ আমি খেয়েই এসেছি, পেট বেশ ভর্তিই আছে। তবু বলা যায় না, বাদশাহী খানাপিনা, লোভ যদি না সামলাতে পারি। ধীরে ধীরে চারদিক নিঝুম নিশুতি নিস্তব্ধ হয়ে আসে। আমি গুন গুন করে গান গাই। মাঝে মাঝে রাত জাগা পাখির কর্কশ আওয়াজে চমকে উঠি। বাগিচার কোথাও হয়তো কোনও জানোয়ার-এর পায়ের শব্দ কান পেতে শুনি।

এইভাবে রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরও কেটে যায়। এবার ধীরে ধীরে হতাশা গ্রাস করতে থাকে। না, সে বুঝি আর আসবে না। আমার এত তোড় জোড় এত আশা আকাঙ্ক্ষা সব বুঝি ভেস্তে গেলো। প্রিয়া আমার প্রতি বিরূপ হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।

এই সময়ে কিছু নারী কণ্ঠের কলহাস্যে চকিত হয়ে তাকিয়ে দেখি দশটি সুদর্শনা সখী পরিবৃতা হয়ে সে ঘরের ভিতরে এসে দাঁড়িয়েছে। মনে হলো, দশটি উজ্জ্বল তারার মাঝখানে সে এক আসমানের চাঁদ। গাঢ় নীল রঙের রেশমী শাড়ি পরেছে। সারা অঙ্গ তার জহরতের গহনায় মোড়া। আরো কাছে এসে সে মুচকি হেসে বললো, বাঃ, চমৎকার। কিন্তু আজ তোমার ঘুম গেলো কোথায়, সাহেব। দিব্যি তো জেগে আছো দেখছি।

তোমার আগমনের খবর পেয়ে সে পালিয়েছে, সুন্দরী।

সখীদের ইশারা করতেই তারা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলো। সে আমার পাশে এসে বসলো।

দু’হাতে আমাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরলো। গভীর আশ্লেষে চুম্বন করলাম তাকে। সেও প্রতিদান দিলো। তারপর কাপেটের উপর শুয়ে পড়লাম দুজনে। সারাটা রাত ধরে সে আমাকে আদর সোহাগ করতে থাকলো। আমিও তাকে আদর সোহাগ করলাম। তার পরিপুর্ণ যৌবনবতি দেহটাকে মনভরে উপভোগ করলাম। দুহাতে তার বড় বড় ডাসা ডাসা স্তনদুটোকে চটকালাম, তার সারা শরীর চেটে পুটে অস্থির করে দিলাম। আহ্ তার যোনিতে মুখ দিয়ে রাখলাম, কি অসাধারন তার স্বাধ। তাকে কত বার যে সঙ্গম করলাম মনে নেই। আমার এত দিনের কামনা বাসনা আজ চরিতার্থ হলো। দুজনে দু’জনকে জড়িয়ে ধরে সুখ নিদ্রায় ডুবে গেলাম।

সকালবেলা ঘুম ভাঙতেই চেয়ে দেখি, অনেক বেলা হয়ে গেছে। আমি বললাম, আজ চলি।

সে বললো, দাঁড়াও দু’টো কথা বলি। সারা রাত তো মত্ত হয়েই কেটেছে। কি আলাপ পরিচয় কিছুই হয়নি। তা সাহেবের নাম কি?

-আমার নাম আজিজ। তোমার?

—আমার নাম দুনিয়া। আমার বাবা কপূর আর প্রবাল দ্বীপের সুলতান। আজ তোমাকে একটা জিনিস উপহার দেব। ভালো করে রেখো। আমাদের প্রথম মিলনের স্মৃতি চিহ্ন। আমি যখন তোমার কাছে থাকবে না, এই রুমালখানা আমার কথা মনে করিয়ে দেবে তোমায়। সূক্ষ্ম কাজ করা আছে এক কোণায়। আমার নিজের হাতের কাজ।

এই বলে সে একখানা রেশমী রুমাল আমার হাতে তুলে দিলো।

আমি বাড়ি ফিরে এসে দেখি আজিজা কেঁদে কেঁদে চোখ ফুলিয়েছে। আমাকে দেখে সে হাসলো।

—একি তোমার চেহারা হয়েছে, আজিজ।

–ও কিছু নয়, আজিজ। আমি বেশ আছি। তোমার খবর কি বলো? গত রাতের সব ঘটনাই যথাযথ খুলে বললাম তাকে। রুমালখানা ওর হাতে দিয়ে বললাম, প্রথম মিলনের প্রীতি উপহার।

আজিজ। উৎফুল্ল হলো না। কোন উপদেশ দিলো না। শুধু বলতে পারলো, তুমি সুখী হয়েছ। আজিজ? তোমার মুখে হাসি দেখে যেতে পারলেই আমার অনেক পাওয়া হবে।

আমি উদ্বিগ্ন হয়ে প্রশ্ন করি, কোথায় যাবে, আজিজা?

–না মানে, চিরকালই তোমাদের এখানে থাকবো নাকি? বিয়ে শাদী করবো না? শ্বশুরঘর যাবো না?

–ওঃ, এই কথা।

–আমি হতাশ বলি, আমাকে ছেড়ে থাকতে তোমার কষ্ট হবে না, আজিজা?

—আমি যেখানে যাবো সেখানে কষ্ট বলে কিছু নাই।

আজিজার এই হেঁয়ালী ভরা কথার কোন অর্থ করতে পারলাম না। চেষ্টা করলাম না। কারণ তখন আমি সুখ, স্বপ্নে বিভোর।

আজিজ বললো, আমার সেই গানটা ওকে গেয়ে শুনিয়েছিলে?

—ও—ই-যাঃ! একদম ভুলে গেছি।

—ভুলে যাওয়াই স্বাভাবিক, আজিজ। যাক, আজ যদি মনে থাকে, গেয়ে শুনিও। ভালোবাসার মন্ত্র দিয়ে গড়া ঐ গানখানা। শুনলে, সে গুণী মেয়ে, নিশ্চয়ই তারিফ করবে।

বুঝলাম আমার এই ভুলে যাওয়ায় আজিজ আহত হয়েছে! স্বাভাবিক ভালোবাসার পাত্র যদি কোনও অনুরোধ রাখতে ভুলে যায় তা আমাৰ্জনীয় অপরাধ! আজিজার সঙ্গে আমার যা সম্পর্ক তা তো ভালোবাসা ছাড়া আর কোনও নামেই ব্যাখ্যা করা যায় না। আমি ওর হাত দুটো ধরে কাছে টেনে নিলাম। বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে আদর করে চুমু খেয়ে বললাম, আমাকে মাফ করো সোনা, আজই তাকে শোনাবো তোমার গান।

সেইদিন সন্ধ্যাবেলায় বাগিচায় ঢুকতেই দেখি দুনিয়া নিজে দাঁড়িয়ে আছে, আমার হাত ধরে জলসাঘরে নিয়ে গিয়ে বসালো। সেদিন রাতে আমরা একসঙ্গে বসে খানাপিনা করলাম। আদর সোহাগে আমার হৃদয় মন সে ভরিয়ে দিতে থাকলো। আমার জীবনে তখন যৌবনের ঢল নেমেছে। সেই অবিশ্রান্ত বর্ষণে সব ভেসে একাকার হয়ে গেলো। সে রাতে আর আমরা ঘুমালাম না। একে অন্যের দেহ আশ্রয় করে সারাটা রাত মধুর করে কাটিয়ে দিলাম।

ভোরবেলা বিদায়ের পালা। হঠাৎ আমার মনে পড়লো আজিজার সেই ছলছল চোখ। আমার গানটা তাকে শুনিও। আমি বললাম, বিদায় নেবার আগে তোমাকে একটা গান শোনাবো। এই আমার স্মৃতি উপহার। যদি কোনওদিন তোমার কাছে নাই থাকতে পারি, তবে কখনও বৃষ্টিঝরা দিনে বাতায়ন পাশে বসে আমার কথা ভেবো।–আর আমার এই গানখানি গুণগুণ করে গোঁও, প্রিয়তমা।

গান শেষ হতে না হতেই দুনিয়া চিৎকার করে ওঠে, থামো। এ গান তুমি কোথায় পেলে? কে শিখিয়েছে তোমাকে?

আমি হতবাক। নিছকই একটা প্রেম-সঙ্গীত। তা শুনে দুনিয়া কেন এত ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলো। বললাম, গানটা আমার চাচার মেয়ে আজিজা আমাকে শিখিয়েছে।

-সে তোমাকে ভালোবাসে?

আমি চুপ করে থাকি। কিন্তু সে আরও জোরে চিৎকার করে ওঠে, বলো, চুপ করে থেক না।

আমি ঘাড় নাড়লাম।-হ্যাঁ সে আমাকে প্ৰাণাধিক ভালোবাসে।

—তবে আমার সঙ্গে ঢং করতে এসেছে। কেন? একটা মেয়ের জীবন বরবাদ করে দিয়ে আর একটা মেয়েকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে এসেছো?

—আমি ছিনিমিনি খেলতে আসিনি সোনা, আমি তোমাকে প্ৰাণ দিয়ে ভালোবেসেছি।

–ছাই করেছো। সে-ও তোমাকে প্ৰাণ দিয়েই ভালোবাসে। তার জীবনটা নিয়েই বা এই রকম জুয়া খেললে কেন? বেচারী বোধ হয়। আর এতক্ষণে বেঁচে নাই।

আমি শিউড়ে উঠি, বেঁচে নাই? কে বলেছে তোমাকে?

—কে আবার বলবে। আমি লিখে দিতে পারি। সে আর জীবিত নাই! তুমি কি কিছুই বোঝা না, হাঁদা? গানটার মধ্যেই তো তা পরিষ্কার বলা আছে। যাও,বাড়ি যাও। দেখগে, সে আর এতক্ষণে এ জগতে নাই। ছিঃ ছিঃ আজিজ, একটা মেয়ের নিষ্পাপ ভালোবাসা পায়ে দলে কি করে পারলে তুমি আমার কাছে আসতে?

আমি মাথা নিচু করে বসে থাকি। তুমি প্রেমের অযোগ্য পাত্ব। তোমার সঙ্গে আর আমার কোনও সম্পর্ক নাই। তুমি নিজে হাতে তোমার প্ৰেমাস্পদকে খুন করেছে। প্রেমের যে মর্যাদা দিতে পারে না, তার কাছ থেকেই আমিই বা কি পাবো। তুমি যাও, বিদায় হও। তার কবরে একটা ফুলের তোড়া দিয়েও অন্তত তোমার পাপের প্রায়শ্চিত্ত কর গে।

আমি ধীর বিষণ্ণ পায়ে বাড়ি ফিরি। বাড়ির কাছাকাছি আসতেই চমকে উঠি। একটু করুণ কান্নার রোল উঠেছে। অনেক লোকজন জড় হয়েছে।

দুনিয়া ঠিকই বলেছিলো। আজিজা আর ইহজগতে নাই। আজ ভোরেই সে মারা গেছে। জহর খেয়েছিলো।

আমার সারা শরীর অবশ অসাড় হয়ে আসে। কান্নায় মুখ ঢেকে বসে পড়ি। একি করলাম আমি। সাব-সব আমার দোষী!

সারাটা বছর ধরে শুধু কাঁদলাম। সেই প্রথম অনুভব করলাম, আমিও আজিজাকে ভালোবাসতাম। সে-ভালোবাসার আগুনের শিখা কোনদিনই লেলিহান ছিলো না। মৃদু মিষ্টি মোমের আলোর মতো সে প্রেম ছিলো স্নিগ্ধ-সুরভিত। সে যতদিন ছিলো—তার অভাব অনুভব করতে পারিনি। আজ তার অভাবে বিশ্ব সংসার আমার কাছে বিষবৎ মনে হতে থাকে—জীবনের আর কোনও দাম নাই-বাঁচার আরও কোনও মানে নাই।

তবু বাঁচতে হয়। তাই আবার রোজগারের ধান্দায় বেরিয়ে পড়ি। দেশে দেশে ঘুরি। মন ভোলানো হরেক রকম বাহারী জিনিস ফিরি করে ফিরি। কিন্তু আমরা মন কিছুতে ভোলে না। অহরহ সেই এক চিন্তা-আজিজ। আমার নয়নের মণি-আমার কলিজা।

 

আজিজের কাহিনী শুনে তাজ অল মুলুক মুগ্ধ হয়ে বলে, দোস্ত আজিজ, দুনিয়াকে দেখার বড় বাসনা হচ্ছে। মেয়েটির রূপ যেমন বুদ্ধিও তেমনি অসাধারণ।

আজিজ বললো, তাতে কোনও সন্দেহ নাই।

তাজ তার অভিপ্ৰায় ব্যক্ত করলো। আমি ভাবছি, যাবো সেই কপূর প্রবাল দ্বীপ। দেখবো সেই সুন্দরীর রূপ। আঁজলা ভরে পান করবো তার সুধা।

আজিজ বলে, খুব ভালো কথা। কিন্তু সে মেয়ে কি সহজে বশে আসবে?

–দেখা যাক। কিন্তু তার আগে তোমার সঙ্গে আমার একটা কথা-তোমাকে আমি ছাড়বো না। আমার জিগরী দোস্ত। তোমার সঙ্গী সাখী সওদাগরদের বলে দাও, এখানেই তুমি আমার আশ্রয়ে থাকবে। ওরা যেন চলে যায়।

প্রাসাদে ফিরে এসে শাহজাদা তাজ অল মুলুক প্রথমে বন্ধু আজিজের বসবাসের জন্য একটি মনোরম প্রাসাদতুল্য ইমারতের বন্দোবস্ত করে দিলো। দরবারে তাকে একটা উঁচু পদে বহাল করে মোটা বেতনের ব্যবস্থা করলো। চাকর-নফর দাস-দাসী যা প্রয়োজন সব দেওয়া হলো তাকে।

এরপর তাজ এসে নিজের ঘরে দরজা বন্ধ করে দেয়। সারা প্রাসাদে হৈচৈ পড়ে যায়। শাহজাদার গোসা হয়েছে। কেন, কেউ বলতে পারে না। তবে এটা ঠিক, রাগ করে দরজা বন্ধ করেছেন তিনি। এক সময়ে সুলতান সুলেমানের কানে গেলো, শাহজাদা নাওয়া খাওয়া বন্ধ করেছেন।

সুলেমান উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে, কেন?

কি চায় সে? তাজ-এর ছোটবেলা থেকেই এই এক কায়দা। কোনও কিছু চাইতে হলে সোজাসুজি সে চাইবে না।

উজির বলে, সে জানিনা জাঁহাপনা, আপনি তো জানেন সে কারো সঙ্গে কোনও পরামর্শ করে না!

সুলতান বললো, ঠিক আছে, আমি নিজে তার সঙ্গে কথা বলবো।

সুলতান বুঝতে পারে পুত্র এক আদর্শন নারী প্রেমে আসক্ত হয়ে পড়েছে। তাকে আর কিছুতেই নিরস্ত করা যাবে না। তবু উজিরকে দিয়ে শেষ চেষ্টা করে দেখেন। উজির বলে, আমি শাহজাদাকে অনেক বোঝাবার চেষ্টা করেছি। সাত সমুদ্র তের নদী পারের দেশ কপুর—প্রবালদ্বীপ।

সুলতান প্রশ্ন করে, সে মেয়ের সন্ধান তাকে দিলো কে?

—এক বিদেশী সওদাগর। বয়সে সে নবীন, শাহজাদারই উমর হবে। সে তার মনে রং ধরিয়েছে। দুনিয়ার মতো সুন্দরী কন্যা নাকি দুনিয়ায় নাই। তার চোখ, তার নাক, মুখ-এর গড়ন নিখুঁত। দুধে-আলতা গায়ের রং।

সুলতান সুলেমান শাহ চিন্তিত হয়। —এমনি দূর দেশ থেকে পাত্রী না আনলে ছেলের পছন্দ হবে না? আমাদের আশেপাশের সুলতান বাদশাহের ঘরে কি পরমা সুন্দরী মেয়ে জন্মায় না?

—খুব জন্মায়, জাঁহাপনা। আপনি হুকুম করুন, এখুনি গাণ্ডখানেক এনে হাজির করছি। বাজিয়ে দেখে নেবেন। যদি কেউ খুঁত ধরতে পারে, নাকে খত দিয়ে চলে যাবো। কিন্তু ছেলের যদি দিল বাঁধা পড়ে থাকে অন্যখানে, তা সে যাকেই এনে দিন, মনে ধরবে না।

সুলতান তাজকে ডেকে বললো, মাথা ঠাণ্ডা করে ভেবে দেখ বাবা। মেয়ের কোনও অভাব নাই। যদি বলো, আমি পাঁচশো সুন্দরী বাঁদী এনে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছি। তার মধ্যে দুনিয়ার সেরা সুন্দরী মেয়ে অনেক পাবে। তাও যদি পছন্দ না হয় আশেপাশের সুলতানদের ঘরে অনেক সুন্দরী মেয়ে পাওয়া যাবে। তাদের কাউকে পছন্দ কর।

কিন্তু তাজের সেই এক গোঁ। দুনিয়া ছাড়া দ্বিতীয় মেয়ে সে দেখবে না।

সুলতান ভাবে, বেশি পিড়াপিড়ি করলে ছেলে বিগড়ে যেতে পারে। উজিরকে বললো, আর ঘাঁটিয়ে লাভ নাই। তুমি কপূর-প্রবাল দ্বীপে যাত্রা কর।

ছেলেকে বললো, তোমার আব্দার আমি কখনও অপূর্ণ রাখিনি, বাবা। তাই আজ আমার অনিচ্ছা সত্ত্বেও কপূর প্রবাল দ্বীপের সুলতানের কাছে প্রস্তাব পাঠাচ্ছি। সে যদি আমার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে, তা আমি সহ্য করবো না। তার সালতানিয়ৎ গুড়ো করে দেব।

তাজ-এর বন্ধু আজিজকে ডেকে সুলতান জিজ্ঞেস করলো, কপূর-প্রবাল দ্বীপে যাওয়ার পথ ঘাট তোমার জানা আছে?

আজিজ জানায়, সে সেখান থেকেই আসছে। পথ ঘাট সব তার নখ-দর্পণে।

সুলতান সুলেমান বললো, তাহলে তোমাকে বাবা, উজিরের সঙ্গে যেতে হবে।

আজিজ মাথা হোঁট করে সম্মতি জানায়, যে হুকুম, জাঁহাপনা।

সুলতান উজিরকে বলে, আর দেরি করে লাভ নাই, উজির। চটপট রওনা হয়ে পড়। কপূর-প্রবাল দ্বীপে পৌঁছাতেই অনেক দিন কেটে যাবে।

দু এক দিনের মধ্যে নানা সুন্দর সুন্দর মূল্যবান উপহার উপটৌকন সঙ্গে নিয়ে উজির রওনা হয়ে যায়। সঙ্গে চললো আজিজ। অনেক খাল বিল নদ-নদী মরুপ্রান্তর পার হয়ে অবশেষে একদিন কপূর-প্রবাল দ্বীপের সীমানায় এসে তাবু গাড়লো। অশ্বারোহী দূত গেলো সুলতানের ইষ্ট দূরবীরে। সুলতান সাদরে অভ্যর্থনা করে উজিরকে নিয়ে এলো প্রসাদে।

উজির সুলতান সুলেমান শাহর উপহার সামগ্ৰী তুলে দেয় সুলতানের হাত।—সুলতানের তরফ থেকে আমি আপনাকে সুক্ৰিয়া জানাচ্ছি, জাঁহাপনা। আপনি গ্রহণ করে কৃতার্থকরুন।

প্রচলিত রীতি অনুসারে শাহী মেহমানদের বিশ্রামের আয়োজন করা হলো। একটি বিলাস বহুল সুরম্য প্রাসাদে থাকার ব্যবস্থা হলো। খানা পিনা আদর আপ্যায়নের কোনও ত্রুটি রাখলে না। সুলতান। এইভাবে পাঁচ দিন বিশ্রাম নেবার পর আলাপ আলোচনা শুরু হয়। এই এখানকার নিয়ম।

ছয় দিনের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে উজির হামামে গিয়ে ভালো করে গোসল সারলো। তারপর বাদশাহী উজিরের সাজ পোশাক পরে দরবারে এসে নিজের পরিচয় পত্র পেশ করে সুলতানের দর্শনপ্রার্থী হয়ে অপেক্ষা করতে থাকলো। ক্ষণকাল মধ্যে সুলতানের উজির নিজে এসে অভ্যর্থনা করে দরবার কক্ষে নিয়ে গেলো!

উজির যথারীতি কুর্নিশ জানিয়ে সুলতান সমীপে তার সুলতান সুলেমান শাহর প্রস্তাব পেশ করলো।

সুলতান ক্ষণকাল মৌন থেকে চিন্তা করলো। চোখে মুখে অজানা আতঙ্কের রেখা ফুটে উঠলো। কি জবাব দেওয়া যায় কিছুই ভাবতে পারে না। সুলতান সুলেমান সবুজ শহরের মহাপ্রতাপান্বিত বাদশাহ। তাকে অখুশি করার মতো কোনও কথা বলতে গেলে ভাবতে হবে বৈকি! সে তার মেয়েকে খুব ভালো করেই জানে। এর আগেও কয়েকবার তার শাদীর উদ্যোগ করা হয়েছিলো। কিন্তু মেয়ের সেই এক গো, শাদী সে করবে না।

ভেবে কোনও কুল-কিনারা করতে পারে না। অবশেষে প্রধান খোজাকে ডেকে বললো, শাহজাদী দুনিয়াকে নিয়ে এসো।

খোজা কুর্নিশ জানিয়ে বেরিয়ে যায়। সুলতান বলে আমার কন্যা দুনিয়া বড় এক রোখা। তার জেদ কিছুতেই সে শাদী করবে না। আশে পাশের সুলতান বাদশাহের শাহজাদারা তার জন্যে পাগল। কিন্তু কিছুতেই তাকে রাজি করানো যাচ্ছে না। সে আসুক, আপনার সামনেই আমি মহামান্য সুলতানের প্রস্তাব জানাবো। দেখুন, কি জবাব দেয়।

খোজা সেই গেলো তো গোলই। আর ফেরে না। খোজাকে খোঁজার জন্য আর একজন খোজা পাঠানো হলো। প্রায় ঘণ্টাখানেক বাদে সে হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বললো, জাঁহাপনা, আমাকে তাড়া করেছেন।

সুলতান বুঝতে পারে না, তাড়া করেছে? কে তাড়া করেছে?

—জী হুজুর, শাহজাদী।

–দুনিয়া?

–জী হুজুর।

–কেন?

খোজা বলে, আমি তাকে গিয়ে বললাম, সুলতান আপনাকে ডেকেছেন। তা তিনি আসছিলেন। সাজ গোজ সব হয়েই গিয়েছিলো। আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, হ্যারে, কেন ডেকেছে জানিস?

আমি বললাম, হ্যাঁ। আপনার শাদীর লেগে সবুজ শহরের সুলতান উজির এসেছেন।

এই কথা শুনা মাত্র, কি বলবো, জাঁহাপনা, কোমর থেকে ইয়া বড় ছুরি বের করে আমাকে তেড়ে এলেন তিনি, বাদর আগে বলিসনি কেন? আমি তোর নাক কান সব কেটে নামিয়ে দেব। এই না শুনে, আমি চো দৌড় দিয়ে পালিয়েছি। শাহজাদী চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলতে থাকলেন, আব্বাজানকে গিয়ে বল, ফের যদি আমার শাদীর কথা তোলেন তিনি, আমি আত্মঘাতী হবো! আমার হুবু স্বামী আমার মুখের সুরৎ দেখতে পাবে না। আর তাতেও যদি বাধা দেন, পাহারা বসিয়ে রাখেন আমার চারপোশ, আমি বাসর ঘরে স্বামীকে খুন করবো। তারপর নিজের কলিজায় ছুরি বসাবো। বোরখা খুলে আমার চেহারা দেখার সুযোগ দেব না তাকে।

সুলতান উজিরের উদ্দেশে বললো, আপনি নিজের কানেই সব শুনলেন। এবার বলুন আমার কি কর্তব্য?

উজির এর কি পরামর্শ দেবে? সুলতান বললো, আপনি মহানুভব সুলতান সুলেমান শাহকে আমার অন্তরের শুভেচ্ছা জানিয়ে নিবেদন করুন, আমার কন্যার বড় এক রোখা স্বভাব। শাদীর কথা শুনলেই তার মাথায় খুন চেপে যায়। আমিও জোর জবরদস্তি করি না। আমার এক মাত্র সন্তান এই দুনিয়া। যে কোন কারণেই হোক, তাকে যদি হারাই, সে শোকতাপ আমি সহ্য করতে পারবো না। আল্লাহ। আপনাদের যাত্ৰাপথ নির্বিঘ্ন করুন, এই প্রার্থনা করি।

আর দেরি না করে আজিজকে নিয়ে উজির সবুজ শহরের পথে যাত্রা করলো।

সুলতান শুনে ক্ৰোধে কাঁপতে থাকে। এত বড় স্পর্ধা। আমার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান। দরবারের সব আমির ওমরাহদের জরুরী তলব পাঠানো হলো।

সুলতান হুকুম জারি করলো কপূর-প্রবালদ্বীপ আক্রমণ করতে হবে। আর তিলমাত্র দেরি না করে সেনাবাহিনী প্রস্তুত কর।

উজির উঠে দাঁড়িয়ে বললো, সুলতানের দরবারে-আমার একটা আর্জি আছে জাঁহাপনা, কপূর-প্রবাল দ্বীপের সুলতানের কোন দোেষই নাই। তিনি আমাদের আদর যত্নের কোন ত্রুটি রাখেননি। সুলতানের প্রস্তাবে তিনি নিজেকে ধন্য মনে করেছেন। কিন্তু বাধ সোধেছে তার অবাধ্য

সেই বরকেই সে খুন করবে, পরে নিজেও আত্মঘাতী হবে। তার বাবাও আপনার মতোই ক্রুদ্ধ হয়েছেন মেয়ের উপরে।

সুলতান সুলেমানের রাগ কিছুটা প্রশমিত হয়। হাঁ, উজির যথার্থই বলেছে। দুনিয়ার পিতার সালতানিয়ৎ আক্রমণ করা সঙ্গত হবে না। কারণ সুলতানের কোনও দোষ নাই। আর দুনিয়ার প্রতি প্রতিশোধ নেবার জন্য যদি আক্রমণ চালানো হয়, ফল শুভ হবে না। দুনিয়া আত্মঘাতী হলে তাজ বিরূপ হবে।

সুলতান পুত্র তাজ অল মুলুককে ডেকে সব বললো। তাজ বললো, আমি কিন্তু আশা ছাড়তে পারছি না জাঁহাপনা। আপনি আমার ওপর সব ব্যাপারটা ছেড়ে দিন। আমি তাকে রাজি করাবোই।

সুলতান আঁতকে ওঠে, সে কি। তুমি যাবে নাকি সেখানে? শুনেছি সে পুরুষ বিদ্বেষী। তোমাকে দেখামাত্র হত্যা করবে।

তাজ বলে, যায়। যদি প্ৰাণ যাবে তারই হাতে। সে মৃত্যুই আমার বেহেস্ত সমান। কিন্তু আমি বলছি, সেসব কিছুই হবে না।

সুলতান আতঙ্কিত হয়। তুমি আমার সবে ধন নীলমনি! তোমাকে হারালে আমি বাঁচবো কি

করে? আর এই বিশাল সালতানিয়তেরই বা কি হবে?

তাজ পিতাকে আশ্বাস্ত করে বলে, আপনি নিশিচন্ত থাকুন, জাঁহাপনা নিজেকে রক্ষা করার মতো অস্ত্ব বিদ্যা আমার রপ্ত করা আছে। আর তাছাড়া আমি তার কাছে শাহজাদার পরিচয় নিয়ে যাবো না।

সুলতান অবাক হয়ে বলে, তবে কি ভাবে যাবে?

–আমি এক সওদাগরের ছদ্মবেশ নেবো।

সুলতান বললো, যাই কর বাপু, উজির আর আজিজকে তুমি সঙ্গে নিয়ে যাও। বিদেশ বিভুই-একা একা তোমাকে ছেড়ে দিতে আমার মন চায় না।

তাজের ইচ্ছায় আর সুলতানের হুকুমে প্রায় লক্ষাধিক দিনারের দামী দামী মনোহারী বিলাস সামগ্ৰী সাজ পোশাক আর রেশমী কাপড় কেনা হলো। সুলতান খাজাঞ্চীখানা থেকে নগদ একলক্ষ সোনার মোহর অনেক হীরে জহরৎ সঙ্গে দিলো। দিনক্ষণ দেখে উট, খচ্চরের পিঠে সওদা পত্ব বোঝাই করে মার কাছে বিদায় নিতে যায়। মা আশীর্বাদ করে একলক্ষ স্বর্ণমুদ্র দিলো। প্রাসাদের আবালবৃদ্ধ বনিতা চোখের জলে ফেলতে থাকে। তাজ সুলতানকে কুর্নিশ জানিয়ে বিদায় নিলো।

উজির, আজিজ এবং তাজি অল মুলুক প্রায় একমাস চলার পর একদিন কপূর-প্রবাল দ্বীপে এসে পৌঁছয়। আজিজের কথা মতো একটা সরাইখানায় ওরা আশ্রয় নেয়। তাজ-এর হৃদয় আনন্দে দুলে ওঠে। এই সেই কপূর-প্রবাল দ্বীপ-তার মানস প্রিয়া-বাসভূমি। সেই রাতটা সরাইখানায় কাটাবার পর পরদিন একটা বিরাটবাড়ি ভাড়া করা হলো। তার পর কাপড় পট্টির দোকানে দোকানে ঘুরে দোকানীদের সঙ্গে আলাপ পরিচয় করতে থাকলো।

উজির বললো, দেখ বাপু, আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে।

দুজনে সমস্বরে প্রশ্ন করে কী?

–দোকানে দোকানো ঘরে সওদা না বেচে বরং এক কাজ কর। শহরের মাঝখানে এক চৌরাস্তার মোড়ে এক বিরাট দোকানের সামনে বসবে। খদের যারা আসবে তাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলবে। আর আজিজ থাকবে পিছনে। সে শুধু তোমার হুকুম মতো কাপড় চোপড় বের করে দেবে। আমার মনে হয়, তোমাদের দুজনের যা সুন্দর চেহারা, দু-একদিনের মধ্যে দোকানের পশার জমবে। শাহজাদা তাজ আর আজিজ দুজনেই তারিফ করে বলে, চমৎকার হবে।

তাজ আর আজিজ শহরের কাপড় পট্টির দোকানগুলো যখন ঘুরে দেখছিলো, সবাই ওদের দিকে হাঁ করে চেয়ে থাকে। এমন সুন্দর চেহারার যুবক তারা কমই দেখেছে। একজন দোকানদার স্বাগত জানিয়ে বলে, দয়া করে একটু পায়ের ধুলো দিন।

উজির বলে, আমরা আপনার খদ্দের হতে আসিনি শেখ!

—তাতে কি হয়েছে। আসুন ভিতরে আসুন। আপনাদের দেখে মনে হচ্ছে বিদেশী মুসাফির। উজির ঘাড় নেড়ে বলে, ঠিকই ধরেছেন। ছেলে দুটোর লেখাপড়া শেষ হয়েছে এখন ওদের একটা ব্যবসা বাণিজ্যে স্থিতি করে দেব বলে দেশ ভ্বমণে বেডিয়েছি। অনেক দেশের অনেক শহর ঘুরেছি। শেষে আপনাদের শহরে এসে আমার খুব ভালো লাগছে। ভাবছি যদি একটা মনমতো দোকান ঘর পাই, ভাড়া নিয়ে একটা কাপড়ের দোকান করে দেব। তা শেখ সাহেব, তেমন কোন দোকান ঘর এখানে মিলতে পারে? দিতে পারেন কোনও সন্ধান?

দোকানী বললো, সানন্দে। আপনারা বিদেশী। একটু সাহায্য না করলে যে মহাপাতক হবো। আপনারা আমার সঙ্গে আসুন, ঐ চৌমাথার মোড়ে একটা প্রকাণ্ড দোকান বিক্রি আছে। দোকানের মালিক বৃদ্ধ হয়েছেন। সন্তান বলতে একটি মাত্র কন্যা। তার শাদী হয়ে গেছে। জামাই খানদানী ঘরের ছেলে। দোকানে বসা তার ইজতে বাধে। তাই বৃদ্ধ ঠিক করেছেন দোকান পাট বিক্রি করে দিয়ে মক্কা চলে যাবেন।

চৌমাথার দোকান ঘরটা বেশ বড়সড়। এক রকম সাজানো–গোছোনই আছে। তার সামান পত্ব এনে তুললে একেবারে জমজমাট হয়ে উঠবে। সেই দিনই দরদাম ঠিক হয়ে গেলো। বৃদ্ধ আর দেরি করতে চায় না। উজিরের হাতে চাবি তুলে দিয়ে বললো, আজ থেকে এ দোকান আপনার। আপনার ছেলেরা, আল্লাহর দোয়ায়, দোকানের চেহারা চরিত্র পালটে দিতে পারবেন।

পরদিন থেকে দোকান সাজাবার পালা শুরু হলো। বাহারী বাহারী নানা রঙের সাজ পোশাক সামনে এনে ঝুলিয়ে দিলো। কয়েক দিনের মধ্যে নতুন নতুন খদ্দেরে জমজমাট হয়ে উঠলো।

অল্প দিনের মধ্যেই দোকানের খ্যাতি সারা শহরে ছড়িয়ে পড়ে। খানদানী ঘরের নারী পুরুষেরা এসে ভিড় জমাতে থাকে। দামী দামী বাহারী সাজ পোশাক কিনে নিয়ে যায়। কিন্তু যার জন্য দোকান খুলে বসা, -সেই দুনিয়া এক দিনও এলো না।

তাজ আল-মুলুক দিন দিন হতাশ হয়ে পড়ে। তবে কি এত উদ্যোগ আয়োজন সব ব্যর্থ হয়ে যাবে? রাতে শুয়ে ঘুমাতে পারে না। খানা পিনা কিছুই ভালো লাগে না।

এমনি ভাবে দিন যায়। দোকানে বসে আজিজের কাছে মনের দুঃখ জানায় তাজ। মাঝে মাঝে খদের আসে। আবার চুপ করে যায়।

একদিন দোকানে বসে, তখন খদের ছিলো না, দুই বন্ধু প্ৰাণের কথা বলে চলেছে। এমন সময় এক বৃদ্ধা মহিলা এসে ঢুকলেন। সাদর অভ্যর্থনা করে বসালো তাজ। বলুন, সাহেবা, আপনার জন্য কি করতে পারি?

বৃদ্ধ প্রশ্ন করে, আচ্ছা বেটা, তোমরা এদেশের মানুষ?

–জী না। আমরা বিদেশী। এর আগে কখনও এ দেশে আসিনি। এই প্রথম এসে, কিছুদিন হলো দোকান খুলেছি। ব্যবসা কুরাই বড় কথা নয়, আপনাদের দেশে এসে নতুন নতুন মানুষের সঙ্গে আলাপ পরিচয় করাই আসল উদ্দেশ্য।

বৃদ্ধা বলে, শুনে খুব খুশি হলাম বেটা। তা কি ধরনের সাজ পোশাক এনেছো।

সবই তো তোমাদের নিজের মুলুক থেকে আনা? আমাকে দু’চারটে বাহারী কাপড়-এর থান দেখাও তো।

—জী হাঁ। সবই বাহারী। এ দোকানে সাধারণ মানুষের জন্যে কোন সাজপোশাক আমরা রাখিনি। সবই বাদশাহ, সুলতান, আমির ওমরাহদের বিবি কন্যাদের জন্যে।

বৃদ্ধ বেশ একটু অহঙ্কার নিয়েই বলে, আমিও কিনতে এসেছি শাহজাদী দুনিয়ার জন্যে। তার কয়েকটা সেমিজ কামিজ বানাতে হবে।

তাজ নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারে না। বৃদ্ধা যেন কার নাম করলো? —কি বললেন? শাহজাদী দুনিয়া?

—হ্যাঁ গো বাছ, সুলতান শাহরিমানের কন্যা দুনিয়া।

তাজ আজিজকে বলে, সব চেয়ে সেরা কাপড়ের থানগুলো বের করে দাও।

সবুজ শহরের তাঁতীদের খ্যাতি অনেক কালের। তাদের হাতে বোনা রেশমী কাপড় দেশ বিদেশে চালান যায়। সূক্ষ্ম কারুকর্ম অসাধারণ। চোখে না দেখলে বলে বোঝান অসম্ভব।

তাজ অব মুলুক একটার পর একটা থান খুলে মেলে ধরে। বৃদ্ধার চোখ আনন্দে নেচে ওঠে। এমন বাহারী কাপড় অন্য কোন দোকানে সে দেখেনি।

বৃদ্ধ বলে, দেখে তো সবই নিতে ইচ্ছে করছে। সব গুলোই চমৎকার।

তাজ বলে, তা নিন না। যেটা যেটা পছন্দ, বলুন আমি বেঁধে দিচ্ছি।

—তাতো বুঝলাম বাছা, কোনটার কি দাম বলো, শুনি।

তাজ বলে, দামের জন্যে কেন চিন্তা করছেন। শাহজাদীর পছন্দ হয়। কিনা দেখুন। তিনি যদি মেহেরবানী করে গ্রহণ করেন, আমি নিজেকে ধন্য মনে করবো।

বৃদ্ধ বলে, পছন্দ না হওয়ার কিছু নাই বেটা। এমন রংদার বাহারী কাপড় সারা শহর খুঁজলে একটা মিলবে না। তাছাড়া আমি পছন্দ করে নিয়ে গেলে দুনিয়া না বলতে পারবে না। ওকে আমি কোলে পিঠে করে মানুষ করেছি।

তাজ বলে, দাম কিছু দিতে হবে না। দাদীমা, আপনি আমার দোকানে পায়ের ধুলো দিয়েছেন তাতেই সব পাওনা শোধ হয়ে গেছে।

—ওমা সে কি কথা গো। আমি বুড়ি থুডি মানুষ। কচি ডাগর ডাসা রূপসী সুন্দরী হলেও না হয় কথা ছিলো। এক কথায় এত দামের সওদা দিয়ে দেবে আমায়?

তাজ হাসে, আপনার কি ধারণা ডাগর ডাসা রূপসী মেয়ে দেখলেই আমরা ভুলে যাই।

—তা তোমাদের এই কঁচা বয়েস এখন, ডবকা মেয়েদের দিকেই তো নজর থাকা স্বাভাবিক।

—না দাদীমা, আমন ছোট নজর আমার নয়। পথ চলতি অল্প বয়েসী মেয়েছেলে দেখলেই জান খলখল করে উঠবে সে বান্দা আমি নই। মারি তো গণ্ডার লুটি তো ভাণ্ডার।

খুশিতে ডগমগ করে ওঠে বৃদ্ধ। —বেটা তোমার কি নাম?

—আমার নাম তাজ-আল-মুলুক।

বৃদ্ধা অবাক হয়। —এ রকম নাম তো সুলতান বাদশাহর ঘরে ছাড়া হয় না।

কি বলবে তাজ ভেবে পায় না। আজিজ এগিয়ে এসে বলে, মানে— বাপ-মায়ের খুব আদরের দুলাল তো, শখ করে ঐ ধরনের শাহজাদাদের নাম রেখেছিলো। কানা ছেলের নাম কি পদ্মলোচন হয় না? সেই রকম আর কি—

আহা অমন কথা বলো না, বাছা। ষাট ষাট কানা হতে যাবে কেন। সুলতান বাদশাহ ঘরে না জন্মালে কি হবে, সুরৎখানা কিন্তু শাহী। এমন বনেদী চেহারা কিন্তু হাল ফিল উঠতি বড়লোকদের ঘরে জন্মায় না, বাবা। রক্তে বংশের ধারা থাকা চাই।

বৃদ্ধার পছন্দ করা কাপড়গুলো আজিজ বাণ্ডিল বেঁধে খচ্চরের পিঠে তুলে দিলো। বৃদ্ধ অনেক ধন্যবাদ জানাতে জানাতে চলে গেলো। বলে, আবার আসবে।

বৃদ্ধার হাতে বাণ্ডিল দেখে দুনিয়া ছুটে আসে।–দেখি দেখি, দাদীমা, কি আনলে?

দাদীমা বলে, সে ভারি রংদার কাপড় এনেছি। তোমার কতকগুলো সেমিজ কামিজ বানাতে হবে।

কাপড়গুলো দেখে দুনিয়া আনন্দে লাফিয়ে ওঠে বৃদ্ধাকে জাপটে ধরে বলে, কোথায় পেলে দাদীমা? এ তো আমাদের দেশের কাপড় না!

—তুমি ঠিকই ধরেছে, বাছা। এ কাপড় বিদেশী সওদাগরের ছেলেরা নিয়ে এসেছে। বাজারের ভিতরে কি প্রকাণ্ড দোকান সাজিয়ে বসেছে। দেখলে তাক লেগে যায়।

দুনিয়া বলে, কত দাম বলেছে?

—দামের কথা জিজ্ঞেস করতেই বাছা আমায় তেড়ে এলো। বলে কি—শাহজাদী পরবেন, তার আবার দাম নেব কি? তিনি যদি মেহেরবানী করে পরেন, তাই আমার অনেক পাওয়া হবে। শাহজাদী আমার দোকানের খদ্দের শুনলে, আমির ওমরাহদের বাড়ির বিবি-মেয়েরা ভিড় করে আসবে।

দুনিয়া রাগ করে। সে হয় না। দাদীমা! তুমি তাকে সুলতানের সঙ্গে দেখা করতে বলো, আমি বলে দেব, আব্ববাজান তাকে ইনাম দিয়ে দেবে।

তা বাছা, মন্দ বলো নি, হিসেব করে দাম দিতে গেলে বেচারীকে ছোট করা হয়। সুলতান যদি ইনাম দেন নেবে না কেন? দেখে মনে হলো খানদানী ঘরের ছেলে। যেমন সুন্দর দেখতে তেমনি তার আদব কায়দা

দুনিয়া থামিয়ে দিয়ে বলে, থাক থাক, আর অতো ব্যাখা করে কাজ নাই। মুখে যে প্রশংসা ধরে না। কী ব্যাপার লোকটা গুণ করেছে নাকি তোমাকে?

তোমার মুখে কোন রাখ-ঢাক নাই বাছা। তিনকাল গিয়ে এককালে ঠেকেছে, বুড়ি হয়ে মরতে বসেছি, আমন চাঁদপনা নওজোওয়ান ছেলে আমাকে গুণ করতে যাবে কেন? তার রূপের জেল্লা দেখলে তোমাদের মতো কচি ডাসা মেয়েরাই তাকে ভোলাতে চাইবে।

—দাদীমা? তোমার কি মাথা টাথা বিগড়ে গেছে? কি সব আবোল-তাবোল বকছো?

–মাথা আমার ঠিকই আছে, বাছা তাকে একবার দেখলে তোমার মাথাই ঠিক থাকবে না।

দুনিয়া ঝঙ্কার দিয়ে ওঠে, ঠিক আছে, তুমি এখন যাও, লোকটাকে খবর দিয়ে এসো। সে যেন আব্বাজানের সঙ্গে দেখা করে ইনাম নিয়ে যায়।

—সে আর বলতে, বাছা। আমি এখুনি যাচ্ছি তাকে খবর দিতে।

তাজ দেখলো, বৃদ্ধা আবার এসেছে। আজিজকে বললো, ভালো দেখে শরবৎ আর মিঠাই-এর ব্যবস্থা কর। বুড়িটাকে জপাতে হবে।

বৃদ্ধাকে সাদর অভ্যর্থনা করে বসালো তাজ অল মুলুক। শরবৎ আর মিঠাই খেতে দিলো। বৃদ্ধ বলে, একটা সুখবর আছে, বেটা। শাহজাদী বলে পাঠিয়েছে, তুমি সুলতানের সঙ্গে দেখা করবে। সুলতান তোমাকে ইনাম দেবেন।

তাজ ভাবে, বড়শির চারে মাছ লেগেছে। বৃদ্ধাকে বললো, আমি আপনার শাহজাদীকে একখানা খৎ লিখে দিচ্ছি। দয়া করে ওকে পৌঁছে দেবেন?

–কেন দেব না বাছা।

আজিজ, কাগজ দোয়াত কলম এনে দেয়। তাজ লিখলো : আপনাকে চোখে দেখিনি। কিন্তু আপনার সুবাস আমি আত্মাণ করেছি। আপনার রূপের ছটায় আমার চোেখ ঝলসায়নি, তবে দিল-এ বিজলি হেনেছে। আপনি আমার কল্পলোকের মানসী। আপনাকে আমি কখনও চোখে দেখিনি। কিন্তু আপনার সঙ্গে আমার হাজার বছরের পরিচয়। আপনাকে দেখেছি আমি প্রস্ফুটিত পদ্মের কোরকে। লাল গুলাবের পাপড়িতে। দূর আশমানের সিতারায়। অশান্ত সমুদ্রের জলোচ্ছাসে। আর দেখেছি বসন্ত মর্মরে হিল্লোলিত দ্রাক্ষাকুঞ্জের লতায় পাতায়। রক্তবর্ণ সূর্যাস্তের বিলুপ্ত শোভায়–

আজ এই পর্যন্ত
আপনার বান্দা তাজ-আল-মুলুক।

ভাঁজ করে আঠা দিতে মুখ এঁটে বৃদ্ধার হাতে তুলে দিলো তাজ। সেই সঙ্গে এক হাজার দিনারের একটা থলে।

বৃদ্ধা বিস্ফারিত চোখে মোহরগুলো দেখে বলে, এ গুলো কি হবে বাবা?

–এ আপনার সেলামী।

বৃদ্ধা ফিরে আসতেই দুনিয়া জিজ্ঞেস করে, তোমার সওদাগর ছেলে কি বললো, গো দাদীমা? চিঠিখানা বাড়িয়ে দিয়ে বৃদ্ধ বলে, মুখে কিছু বলেনি। লিখে দিয়েছে। জানিনা কি লিখেছে, পড়ে দেখো।

ক্ষিপ্রহাতে ছোঁ মেরে চিঠিখানা তুলে নিয়ে দুনিয়া পড়তে থাকে। ধীরে ধীরে চোয়ালের হাড় ফুলে ওঠে, ভ্ব কুঞ্চিত হয়। ঠোঁটে দাঁতের কামড় বসিয়ে ফুসে ওঠে, এত বড় স্পর্ধা!

বৃদ্ধ ভয় পায়! —কেন কি হয়েছে, বাছা।

—কি হয়েছে? কি হয়নি। তাই বলো।

বৃদ্ধ জিজ্ঞেস করে, কেন খুব চড়া দাম হেঁকে বসেছে বুঝি?

দুনিয়া চিৎকার করে ওঠে, দামের জন্যে দুনিয়া থোড়াই পরোয়া করে। খায় তো কাপড় বেচে-ত বামন হয়ে চাদে হাত? তোমার গুণধর সওদাগর নন্দন আমাকে প্রেম পত্র লিখেছেন।

—এ্যাঁ! বলো কি? এত বড় আসাপরদ। এতো ভালো কথা নয় মা! তুমি খুব কড়া করে জবাব লিখে দাও। আমি গিয়ে তুড়ে দিয়ে আসবো।

দুনিয়া বলে, চিঠির জবাব দিলে আরো লাই পেয়ে যাবে না?

–না না, চিঠিই লিখে ওকে বুঝিয়ে দাও, এ বড় শক্ত ঘাঁটি। অত সহজে ডাল গলবে না।

দুনিয়া লিখতে বসে :

আহাম্মকরা নিজেকে পির পয়গম্বর ভাবে। মূর্খের অশেষ দোষ। তারা নিজের দাম কষতে জানে না। বান্দরের হাতে কলাই শোভা পায়। গলায় মুক্তোর মালা পরালেও বাঁদর বাঁদরামীই করে।

অসভ্য জানোরা লোককে কি করে শায়েস্তা করতে হয়, আমার খুব ভালো করে তালিম নেওয়া আছে। শুধু একটা কথা বলে রাখি, আশমানের সিতারা আসমানেই থাকে-থাকবে। মুদিখানায় নেমে আসবে না। আগুনে হাত দিলে হাতখানা যাবে। ক্রুশে বিদ্ধ করে যাদের মারা হয় তারা সবাই ষীশুর মতো নিষ্পাপ নয় এই কথাটা মনে রাখলে খুশি হবো।

চিঠিখানা নিয়ে বৃদ্ধ ছুটতে ছুটতে তাজ-এর দোকানে আসে। বলে, শাহজাদী জবাব gिशgछ्न्।

তাজের হৃদয় দুলে ওঠে। কিন্তু পড়তে পড়তে মুখের চেহারা পাল্টে যায়। বিষাদে ভরে ওঠে as

—আমাকে ধাঁতানী দিয়েছে। ক্রুশে গেঁথে মারবে বলে শাসিয়েছে। তা মারুক। মরতে আমি ভয় পাই না। এই দুর্বিষহ জীবন রাখার চেয়ে মরা অনেক ভালো। তাতে চিরকালের মতো শান্তি আসবে। এ চিঠিরও জবাব দেব আমি। তাতে যা নসীবে আছে-হবে।

বৃদ্ধ বলে, তুমি ঘাবড়াবে না, বাছা! আমি তোমার সঙ্গে আছি। তোমার যাতে না কোন ক্ষতি হয়, আমি দেখবো। লেখো, জবাব লিখে দাও।

আজিজকে ডেকে তাজ বলে, দাদীমাকে এক হাজার দিনারের একটা তোড়া দিয়ে দাও। আর আমাকে এনে দাও দোয়াত কলম। আমি জবাব লিখবো।

‘তুমি আমাকে মৃত্যুর ভয় দেখিয়েছে, সুন্দরী। কিন্তু ও ভয়ে আমার হৃদয় কঁপে না। তুমি ভোগ বিলাসিনী নারী। তোমার বেঁচে থাকা আর সুখ সম্ভোগ করাই বড় কথা। কিন্তু আমি উদাম, উচ্ছল। আমি নিৰ্ভয়। প্রেমিক। মৃত্যুকেও পরোয়া করি না। তুমি যদি আমাকে ক্রুশে গেথেই মারো, তাতেও আমার চিত্ত বিচলিত হবে না। আমি যীশুর খ্যাতি চাই না। আমি হাসি মুখে মরবো। ভাববো, প্রেম অনেকের জীবনে নতুন বসন্ত আনে, আমার কাছে সে না হয় মৃত্যুর রূপ ধরেই এলো।’

চিঠিখানা ভাঁজ করে বৃদ্ধার হাতে দিতে দিতে তাজ বলে, আমার জন্যে আপনি কেন এত কষ্ট করছেন? জানি আমার মৃত্যু অনিবার্য। তবু এর শেষ না দেখে আমি ছাড়বে না। মৃত্যু যদি আসে আসুক।

বৃদ্ধ সান্ত্বনা দিয়ে বলে, ওসব আজগুবি চিন্তা ছাড়ো তো। আমি আছি তোমার কোনও ভাবনা নাই, বেটা তোমার মতো ছেলে তার কি অপছন্দ হবে? চোখে দেখেনি। তাই আমন তডিবড় করছে। একবার দেখলে ভিরমি খেয়ে পড়ে যাবে। আমি আজ চলি। শিগ্‌গিরই আবার আসবো। এবার আশা করছি শুভ সংবাদই নিয়ে আসতে পারবো।

দুনিয়ার ঘরে ঢোকার আগে বৃদ্ধা তার মাথার চুলের ভাঁজের নিচে চিঠিখানা লুকিয়ে রাখলো। দুনিয়া বলে, কি গো দাদীমা, তোমার চাঁদপনা সওদাগর দুলালের খবর কি?

—কি জানি বাছা, আমার কি দরকার, তোমার চিঠি আমি তার হাতে ফেলে দিয়ে এসেছি। তারপর কিছু জানিনা। তোমাদের ব্যাপার তোমরা বোঝা গিয়ে।

দুনিয়া হাসতে থাকে। বাছাধনকে যা দাওয়াই দিয়েছি। তারপর আর রা কাড়তে হবে না।

বৃদ্ধ বলে, মাথায় বড় খুস্কি হয়েছে, বাছা। তোমার বাঁদীদের কাউকে ডাকো তো, মাথাটা একটু আঁচড়ে দিক।

বাঁদীর কি দরকার কি দাদীমা, আমিই দিচ্ছি, তুমি আমার চুল বেঁধে দিও।

দুনিয়া চিরুনী নিয়ে বৃদ্ধর চুল আঁচড়াতে বসে মাথায় চিরুনী দিতেই চিঠিখানা নিচে পড়ে যায়।

দুনিয়া চিঠিখানা তুলে নিতেই বৃদ্ধ হাঁ হাঁ করে ওঠে, ওটা আমাকে দিয়ে দাও বাছা! আমি যখন ছেলেটার দোকানে ঢুকেছিলাম তখন বোধহয় ওপর থেকে ওদের চিঠি আমার মাথায় ওপর এসে পড়ে থাকবে। পরের চিঠি খোলার দরকার নাই। দাও, ওদের জিনিস ওদের দিয়ে আসি।

কিন্তু কে কার কথা শোনে, দুনিয়া ততক্ষণে চিঠিখানা খুলে পড়তে শুরু করেছে।

—কি তোমার চালাবাজী দাদীমা। তুমি ভারি দুষ্টু। এই শয়তান সওদাগরটি কে? কোন দেশের বাসিন্দা? আমাকে কি রকম বিদ্রুপ করেছে দেখো। বলে কিনা-আমি ভোগ বিলাসিনী নারী। এত বড় সাহস তার। আমার দেশে এসে আমাকেই অপমান। আমি তো তোমাকে আগেই বলেছিলাম দাদীমা, জবাব দেওয়া ঠিক হবে না। লোকটা লাই পেয়ে যাবে। তা দেখলে তো।

বৃদ্ধ কপট ক্ৰোধে ফেটে পড়ে। —এত বড় শয়তান বেল্লিক। তা কি করে জানবো, বেটী। আমি ভেবেছিলাম তোমার জবাব পেয়ে তার আক্কেল হবে। যাই হোক, এবার তুমি ওর পিণ্ডি চটকিয়ে একটা কড়া করে জবাব লেখো। আমি এখুনি নিয়ে যাবো। এরপর যদি তোমার কাছে ক্ষমা না চায়, দেখাবো মজা।

‘শরতের ঝিকিমিকি রোদে দূর নীল গগনে এক ঝাক উজ্জ্বল পায়রা ওড়ে। তাদের সফেদ ডানা সূর্যের আলোয় রূপালী হয়। তারাও পাখি। আবার একটা ভাগাড়ে বুনো শেয়ালের পচা মৃতদেহ ঠুকরে ঠুকরে খায় যে শকুনগুলো—তারাও পাখি। সুতরাং মানুষের চামড়া গায়ে থাকলেই কি সব মানুষই সমান।’

চিঠিখানা বৃদ্ধর হাতে দিয়ে দুনিয়া বলে, যদি পেটে কিছু থাকে বুঝতে পারবে চিঠির মৰ্মকথা।

তাজ অল মুলুক চিঠির নির্মম নিষ্ঠুর ভাষায় ব্যথিত হয়। বুঝতে পারে, আর কোন আশা নাই। আজিজের দিকে চেয়ে বলে, এখন বলো, কি করা যায়। আমি আর জবাব দেবার উৎসাহ পাচ্ছি। না। সব আশা ভরসার ইতি হয়ে গেছে।

আজিজ বলে, ঠিক আছে, আপনার হয়ে আমি জবাব লিখছি।

তাজ বলে, যা ভালো বোঝা কর। ‘এখন আমার আল্লাহই একমাত্র ভরসা। তোমাকে যে ভাবে আকাঙ্ক্ষা করেছিলাম, সেই উদগ্র বাসনা নিয়ে যদি আল্লাহকে ডাকতাম, তিনি আমাকে কোলে তুলে নিতেন। কিন্তু তুমি সামান্য অবোধ নারী। তোমার কাছ থেকে আল্লাহ মহিমা কি করে আশা করতে পারি। একদিন, মা-বাবা আত্মীয় পরিজন, প্রিয় বাসভূমি ছেড়ে তোমার সন্ধানে এখানে এসেছিলাম। কিন্তু তুমি আমাকে প্রত্যাখ্যান করে ফিরিয়ে দিলে। এর পর আমি যেখানে যাবো, সেখানে তিনি আমাকে প্রত্যাখ্যান করে ফিরিয়ে দেবেন না। সেখানে সবাইকেই একদিন যেতে হয়, কাউকেই তিনি বাধা দিয়ে ফিরিয়ে দেন না। তার কোলে অনেক জায়গা। দিলাটা দরাজ।’

তাজ অল মুলুক পড়ে বাহবা দিলো, চমৎকার লিখেছে, দোস্ত!

দুনিয়া চিঠিখানা পড়ে বৃদ্ধার ওপর ক্ৰোধে ফেটে পড়ে। যত সব ফাজিল ফক্কর ডেপো ছোড়ার ন্যাকামী। তোমার জন্যেই, দাদীমা আমার জানটা কয়লা হয়ে গেলো। যত নষ্টের গোড়া তুমি। আমার সামনে থেকে দূর হও। আর তোমার মুখ দেখতে চাই নে আমি। তোমার যা বদ মতলব আমি বুঝতে পেরেছি, তাতে কুকুর দিয়ে খাওয়ানো উচিত তোমার লাশ।

শাহজাদী ক্ষিপ্ত হলে তার কোন কাণ্ডজ্ঞান থাকে না। তখন সে করতে পারে না এমন কোন কাজ নাই। রাগের মাথায় মানুষও খুন করতে পারে। বৃদ্ধা দৌড়ে পালায়। ছুটতে ছুটতে চলে আসে তাজ অল মুলুকের। দোকানে। তাজ তাকে আদর করে বসায়। জিজ্ঞেস করে, কি দাদীমা, কি হলো, অমন হাপাচ্ছেন কেন?

–তাড়া করেছে। বাবা, তাড়া করেছে।

–কে?

–কে আবার, ঐ দুনিয়া। বেটি একেবারে রণমূর্তি ধরেছে। ক্ষেপলে আর মানুষ থাকে না। তোমার চিঠিখানা দেওয়া মাত্র তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো। বলে কিনা—আমাকে কুকর দিয়ে খাওয়াবো।

তাজ প্রশ্ন করে, আসল ব্যাপারটা কি বলতো, দাদীমা? নিশ্চয়ই এর পিছনে কোনও কারণ আছে। এরকম পুরুষ বিদ্বেষী নারীর কথা তো শুনিনি কোথাও। এ এক ধরনের মানসিক রোগ।

–রোগ না আতঙ্ক।

–তা আতঙ্কই এলো কি করে। কোন পুরুষের কাছে চোট ফোঁট খেয়েছে এর আগে?

—না বাবা, সে সব কিছু না। স্বপ্ন!

— স্বপ্ন?

বৃদ্ধা বলে, হ্যাঁ একদিন রাতে স্বপ্ন দেখার পর থেকেই ও ওই রকম হয়ে গেছে। কোনও পুরুষের নাম গন্ধ সে সহ্য করতে পারে না।

তাজ কৌতূহলী হয়ে ওঠে, স্বপ্নটা কী? জানো? শুনেছো তার কাছে?

—আলবাৎ শুনেছি। তা হলে শোনো বলছি :

একদিন রাতে দুনিয়া স্বপ্ন দেখছে, এক শিকারী একটা বাগানে ঢুকে গাছের তলায় পাখি ধরা জাল বিছিয়ে তার ওপর কিছু যবের দানা ছড়িয়ে রেখে গাছের আড়ালে ওৎ পেত দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে থাকলো।

কিছুক্ষণের মধ্যে এক ঝাক পাখি উড়তে উড়তে এসে বসলো বাগানের গাছের ডালে। তার মধ্যে দুটি পায়রা নেমে আসে নিচে-জালের ওপর ছড়ানো যবের দানা খুঁটে খুঁটে খেতে থাকে।

পুরুষ পাখিগুলোর ঢং রং কেমন যেন বাচালের মতো। তিড়িং বিড়িং করে লাফিয়ে লাফিয়ে চলে। এক সময়ে জালের ফাসে পুরুষ পাখিটার একটা পা আটকে যায়। অনেক টানা হ্যাচড়া করেও আর ছাড়াতে পারে না। এ দিকে মেয়ে পাখিটা ছটফট করতে থাকে। কি করে তার সাথীকে ছাড়াবো? উন্মাদের মতো মাথা কুটতে থাকে। পুরুষ পাখিটার পাখার ঝাপটানির আওয়াজে গাছের অন্য পাখিরা চকিত হয়ে ওঠে। বুঝতে পারে শিকারীর ফাঁদে পুরুষ পায়রার পা আটকে গেছে। আর তিলমাত্র অপেক্ষা না করে তারা ঝাক বেঁধে আবার উড়ে পালিয়ে যায়। কিন্তু মেয়ে পাখিটা তার সঙ্গীকে ছেড়ে গেলো না। ঠোঁট দিয়ে ঠুকরে ঠুকরে জালের দড়ি কেটে ফেললো। ছাড়া পেয়ে শো করে উড়ে গিয়ে বসলো গাছের ডালে। এ দিকে মেয়ে পাখিটার পায়ে ততক্ষণে ফাঁস আটকে গেছে। ছাড়াবার জন্যে প্ৰাণপণে ডানা ঝাপটে পা ছুড়তে থাকে। কিন্তু আরও কষে এটে যায়। পুরুষ পাখিটা কিন্তু আর নেমে এসে তাকে ছাড়াবার চেষ্টা করে না। এ দিকে শিকারী দেখলো, একটা পালিয়েছে, এটাও যদি পালিয়ে যায়। ছুটে এসে পাখিটাকে ধরে খাঁচায় পুরে ফেললো। পুরুষ পাখিটা ততক্ষণে হাওয়া হয়ে গেছে।

শাহজাদী দুনিয়ার ঘুম ভেঙ্গে যায়। ঐ রাতেই আমাকে ডেকে সে স্বপ্নের কাহিনী শোনালো। বললো, কি সাংঘাতিক এই পুরুষ জাতটা। পশু পাখিদের মধ্যেই যদি এই রকম হয়, না জানি পুরুষ মানুষগুলো বা কেমন। তারা আরও খারাপ আরও স্বার্থপর হবে নিশ্চয়ই।

সেই থেকে মেয়ের এক আতঙ্ক ঢুকেছে মনে। পুরুষ মানুষের ছায়া মাড়াতে চায় না। শাদীর কথা শুনলে ক্ষেপে ওঠে। সে বলে, জ্ঞান থাকতে কোন পুরুষের খপ্পরে পড়তে চাই না আমি।

–কিন্তু দাদীমা, তাজ অল মুলুক বলে, সব পুরুষই এক রকম-খারাপ স্বার্থপর? আর সব মেয়েই কি ভালো—একেবারে পরের জন্যে প্ৰাণ উৎসর্গ করে। তাকে একবার বলো, না—দুনিয়াতে কটা পুরুষ মানুষ দেখেছো, ভালো পুরুষেরও অভাব নেই।

কিন্তু বাবা, দাদীমা বলে, সে বুঝতে চাইবে না, তাকে বোঝাবো কি করে? সে তার গরবেই বঁচে না।

তাজ বলে, যে ভাবেই হোক, একটি বার তার সঙ্গে দেখা করিয়ে দিন দাদীমা। আমার বিশ্বাস, আমি তার এই খারাপ ধারণা পালটে দিতে পারবো। আপনার বুদ্ধির চাতুর্য আছে, আপনিই পারবেন।

-শোন সোনা মনি, প্রাসাদের সামনে একটা বাগান আছে, সেই বাগানের এক পাশে একটা জলসাঘর আছে। দুনিয়া ফি মাসে একবার করে সেখানে যায়। প্রাসাদ থেকে ঐ জলসাঘরে যাবার একটা গুপ্ত দরজা আছে। আজ থেকে এক সপ্তাহ পরে তার যাওয়ার সময় হবে। তখন আমি তোমাকে সঙ্গে করে নিয়ে যাবো। সেখানে। তার সামনে হাজির করে দেব। তার পরের ব্যাপার তোমার। যদি তাকে ভোলাতে পারো সে তোমার হাতিযশ। তবে আমার কি মনে হয় জানো, বাবা তোমাকে একবার সামনা সামনি দেখলে তার সব ধারণাই পালটে যাবে।

তাজ-এর কিছুটা ভরসা হয়। বৃদ্ধাকে বলে, দাদীমা চলো, তোমাকে এক জায়গায় নিয়ে যাব।

দোকান-পাট বন্ধ করে তাজ বৃদ্ধাকে সঙ্গে নিয়ে তাজ আর আজিজ বাসায় আসে। উজির দানদান সব শুনে বলে ঠিক আছে, আমার মাথায় একটা মতলব এসেছে। চলো, আগে সেই বাগানে একবার যাই। আগে নিজের চোখে দেখা যাক তারপর কি করা যায় ভাবা যাবে।

বৃদ্ধাকে বাসায় রেখে ওরা তিনজন সুলতানের প্রাসাদ সংলগ্ন বাগানে গিয়ে হাজির হয়। বাগানের মালি পালিত-কেশ এক বৃদ্ধ। উজির তার হাতে একশো দিনারের একটা তোড়া গুজে দিয়ে বলে, আমরা বিদেশী মুসাফির। তোমার এই বাগানে পুকুরের ধারে বসে একটু বিশ্রাম করতে চাই, অনেক দূর দেশ থেকে আসছি, খানা পিনা হয়নি এখনও, ভাবছি। এই পুকুরের ধারে বসে সেরে নেবো।

বৃদ্ধ মালী তো গদ গদ। অতগুলো মোহর এসে গেছে হাতে। বললে, এ আর বেশি কথা কি জনাব। যতক্ষণ ইচ্ছে, বিশ্রাম করুন। খানা পিনা সারুন। যদি দরকার হয় বলুন দোকান থেকে খানা পিনা যা দরকার। আমি এনে দিচ্ছি।

–না, চাচা, তার দরকার হবে না। খানা আমরা সঙ্গেই এনেছি। শুধু একটু আরাম করে তার পরে খাবো। তা চাচা যে বাগানের ও পাশে একটাবাড়ি দেখছি, ওটা কার?

মালী বলে, জানেন না বুঝি, কত্তা, ও হলো আমাদের শাহজাদী দুনিয়ার বিলাসমহল। ওখানে উনি মাসে একবার মাত্র আসেন। খেয়াল খুশি মতো দুচার দিন থাকেন।

উজির অবাক হয়ে প্রশ্ন করে, শাহজাদীর বিলাস মহল বলছি, অথচ দেখছি আগাছা জঙ্গলে ভরে আছে সামনেটা! মনে হচ্ছে, কতকাল কলি ফিরানো হয়নি। চুন বালি খসে খসে পড়ছে, ব্যাপারটা কী?

মালী বললো, আমরা হুকুমের নফর, সাহেব। তিনি না বললে আমরা কি করতে পারি। অনেকবার বলেছি বিলাসমহলে মিস্ত্রি লাগানো দরকার। কিন্তু শাহজাদী সে কথায় কান দেন না। শুনেছি তিনি নাকি এখন অসুখে ভুগছেন। তাই মন মেজাজ ভালো নাই।

উজির বলে, তাই বলে শাহজাদীর বিলাস ভবন। এইভাবে নষ্ট হবে? চাচা, তুমি আর দেরি করো না মিস্ত্রিটিস্ত্রি যা দরকার এখুনি নিয়ে এসে কাজে লাগাও। এই নাও, একশো দিনার রাখো, দরকার হলে আরও দেব।

মালি অবাক হয়। এ কোন দেশের সওদাগর বাদশাহ। কথায় কথায় খোলামকুচির মতো মোহর বের করে দিচ্ছে। মোহরের তোড়াটা নিয়ে সে সাতবার সেলাম ঠুকে বলে, আমি এক্ষুণি শহরের সেরা মিস্ত্রি এনে কাজে লাগাচ্ছি, হুজুর।

উজির বলে, দেওয়াল যারা রং করবে। তারা যেন ভালো আঁকিয়ে লোক হয়। চাচা।

—কেমন আঁকিয়ে চান হুজুর, ঘরের দেওয়ালে এমন ছবি এঁকে দেবে, দেখে ভিরমি খেয়ে যাবেন।

উজির মজা পায়, কেন? ভিরমি খাবো কেন?

মালি বিচিত্র অঙ্গভঙ্গী করে বোঝাতে থাকে, মন সব বেহেস্তের পরীর মতো ডবকা ছুড়িদের ঠ্যাকারের ছবি এঁকে দেবে, দেখে জিভে জল এসে যাবে, কত্তা।

–আহা-হা-হা, ওরকম আঁকিয়ে আমার দরকার নাই, চাচা। ওসব বদখদ ছবি আঁকলে চলবে না। আমি চাই এমন আঁকিয়ে-যে আঁকতে পারবে, গাছপালা নদনদী সমুদ্র আকাশ লতাপাতা ফুল–

—হ, হ, বুঝেছি জনাব, প্রাকৃতিক দৃশ্য।

–ঠিক-ঠিক বুঝেছি, চাচা।

আপনি কিছু ভাববেন না। এমন ফুল বাগিচা একে দেব, ঘরে ঢুকলে ফুলের বাসে দিল মাতোয়ারা হয়ে যাবে, হুজুর।

—সাবাস। তোমাকে দিয়েই হবে, চাচা। তা তোমার সেই বিশ্বকর্মীদের একবার ডাকো। তাদের বলে যাই, কোথায় কি করতে হবে। কি ছবি আঁকতে হবে।

মালি বলে, আপনারা একটু জিরিয়ে নিতে থাকুন, হুজুর। এই আমি—ছুটে যাবো। আর দৌড়ে আসবো।

কোথায় কোথায় মেরামত করতে হবে, কোথায় কি রং করতে হবে–সব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে মিস্ত্রিদের বুঝিয়ে দিলো উজির। বললো, রংটং সব হয়ে যাবার পর ঘরের দুই দেওয়ালে বিরাট ছবি আঁকতে হবে। দুটো ছবিই প্রায় একই রকম হবে। একটু শুধু তফাৎ হবে? একটা বিরাট বাগান। বড় বড় সব গাছ। এক জায়গায় এক শিকারী পাখি ধরা জাল পেতে গাছের গুডির আড়ালে ঘাপটি মেরে দাঁড়িয়ে আছে। জালের ফাসে একটা মেয়ে পায়রার পা আটকে গেছে। সে শুধু ডানা ঝাপটাচ্ছে। আর পুরুষ পাখিটা তার চারপাশে বই বঁই করে পাক খাচ্ছে।

এই হবে এক দেওয়ালের ছবি। আর অন্য দেওয়ালের ছবিতে থাকবে :

পুরুষ পাখিটা ঠোঁট দিয়ে জালের দড়ি কেটে দিয়েছে। মেয়ে পাখিটা উড়ে পালাচ্ছে। আর পুরুষ পাখিটার পায়ে জালের ফাঁস আটকে গেছে। ছাড়াবার জন্যে সে আকুলি বিকুলি করছে। ডানা ঝাপটাচ্ছে, কিন্তু ছাড়াতে পারছে না। গাছের আড়াল থেকে শিকারী বেরিয়ে এসে পুরুষ পাখিটাকে ধরতে যাচ্ছে। মিস্ত্রি বললো, বহুত আচ্ছা সাহেব, খুব বঢ়িয়া করে এঁকে দেব। আপনি কাল এসে দেখবেন। দেখে আপনার কলিজা ফেটে যাবে।

উজির চমকে ওঠে, কলিজা ফেটে গেলে তো আর জানে বাঁচবো না, মিস্ত্রি। আর একটু নিরেন্স করে একো, বাবা।

বাসায় ফিরে দাদীমাকে সব বলা হলো। দাদীমা উজিরের বুদ্ধির তারিফ করে বলে, ভারি চমৎকার ফন্দী আঁটা হয়েছে। এবারে এই এক চালেই শাহজাদী দুনিয়া মাৎ হয়ে যাবে।

কিন্তু তাজ-এর প্রত্যয় হয় না। দেওয়ালে আঁকা দু’খানা ছবি দেখেই তার সব ধ্যান-ধারণা পলকে পালটে যাবে? যাইহোক, প্রত্যাশায় দিন গুণতে থাকলো। সাতদিন পরে শাহজাদী বাগিচা-বিহারে বেরুবে। সেই কটা দিন প্রতীক্ষায় বসে থাকতে হবে। আর এই ফিকিরও যদি কাজে না আসে, তা হলে কি উপায় হবে? তাজ রাখবে কি করে এ জীবন?

সাতদিন পরের ঘটনা।

দুনিয়া ছটফট করতে থাকে। সারা প্রাসাদ খুঁজে দেখতে বলে, দেখো, দাদীমা কোথায়। দাসী বাদীরা এসে বলে, প্রাসাদে নাই, অন্য কোথাও গিয়ে থাকবে।

শাহজাদী রেগে ওঠে, তাকে খুঁজে পেতে ডেকে আনতে বলেছি। কোথায় আছে না। আছে—সে ফিরিস্তি আমাকে শোনাচ্ছিস কেন?

খুঁজতে খুঁজতে বাজারে এসে তাজ-এর দোকানে বৃদ্ধাকে পাওয়া গেলো। দুনিয়া তলব করেছে শুনে বৃদ্ধার হাসি আর ধরে না। ওই—ডাক পড়েছে। এবার বাগিচা বিহারে বেরুবে শাহজাদী। তা আমাকে সঙ্গে না নিয়ে এক পা কোথাও যাবে না। আমাকে না বলে কোনও একটা কাজ করবে না। আবার রেগে গেলে আমাকেই মারতে তাড়া করবে। একেবারে জ্ঞানগম্য থাকে না—পাগল।

তাজ বলে, আপনাকে খুব ভালোবাসে কিনা।–তাই।

–ভালোবাসে না ছাই। ভালোই যদি বাসবে বাছা, তবে এতদিন ধরে তোতাপাখির মতো পড়াচ্ছি, তা আমার কথা আমলাই দিচ্ছে না। আবার কি বলে শাসায়—ফের যদি তোমার নাম উচ্চারণ করি, গলা আমার কেটে দেবে।

তাজ বললো, ও নিয়ে আপনি মন খারাপ করবেন না, দাদীমা। মা মরা মেয়ে, কোলে পিঠে করে মানুষ করেছেন। তাই রাগ, অভিমান, ভালোবাসা, আক্রোশ সবই আপনাকে ঘিরে।

—তা যা বলেছ, বাবা। আমি ছাড়া আর একদণ্ড চলে না। অথচ একটু এদিক হলে খাড়া নিয়ে তাড়া করবে। আমি যাচ্ছি। যা বলে গেলাম, মনে থাকে যেন। আজ বিকেলে সূর্য ডোবালো আগে বাগানে গিয়ে গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকবে। তারপর আমি যেমন ইশারা করবো, তেমনি তেমনি করবে। খুব বাহারী রংদার সাজে। সেজে যাবে। চেহারাখানা তো শাহজাদার মতো আছেই, তারপর সেজে গুজে গেলে আর দেখতে হবে না।

তাজ-আল-মুলুক বাদশাহী সাজ পোশাকে সেজে যখন বাগানের ফটকে পৌঁছলো তখন বিকেলের পড়ন্ত রোদের তেজ ঝিমিয়ে এসেছে। মৃদু-মন্দ দখিনা বাতাসে বসন্তের আমেজ।

বৃদ্ধ মালি এসে দরজা খুলে সেলাম করে দাঁড়ালো, আসুন জনাব ভিতরে আসুন। এ আপনার নিজের বাগিচা বলে মনে করবেন। যখন ইচ্ছে হয় এসে যতক্ষণ থাকতে চান থাকবেন।

কিন্তু বৃদ্ধ জানে না, গুপ্ত দরজা দিয়ে ততক্ষণে শাহজাদী দুনিয়া বাগানের ভিতরে এসে গেছে। দাদীমা বলে গিয়েছিলো, বাগানের একাধারে একটা কেয়া গাছের ঝোপ আছে। সেই ঝোপের আড়ালে তাকে সে দাঁড়াতে বলেছে।

তাজ মালিকে বলে, আমি একটু এদিকটায় আছি। তুমি তোমার নিজের কাজে যাও চাচা। দরকার হলে ডাকবো।

মালি বলে, হুকুম করলেই বান্দা হাজির হবে হুজুর।

মালি তার নিজের কাজে চলে গেলো। তাজ অপেক্ষা করতে থাকে। একটুক্ষণের মধ্যে দাসীবাদী পরিবৃত হয়ে শাহজাদী দুনিয়া ফুল বাগিচার মাঝখানে এসে দাঁড়ায়। সঙ্গে সেই বৃদ্ধা দাদীমা।

—বেটি, বৃদ্ধ বলে, তোমাকে দু-একটা কথা বলতে চাই—

দুনিয়া বলে, বলে না, কি বলবে?

—আগে তোমার দাসীবাদীদের বিদায় কর। তারপর বলবো।

দুনিয়ার ইশরায় সবাই চলে যায়। বৃদ্ধ দুনিয়াকে নিয়ে কেয়াঝোপের দিকে এগোতে থাকে। তাজ এবার দুনিয়াকে পরিষ্কার দেখতে পায়। এমন রূপের জৌলুস এমন নিখুঁত চেহারা আগে সে কখনও দেখেনি। বুকের মধ্যে ধড়াস ধড়াস করতে থাকে। বৃদ্ধ আর দুনিয়া কিন্তু দাঁড়ায় না। ধীর পায়ে চলতে চলতে বিলাস মহলের দরজার দিকে চলে যায়।

দুনিয়া খুশিতে উপছে পড়ে, বাঃ, বাহারী রং করেছে তো মালিটা। আমাকে অবশ্য আগে কয়েকবার বলেছিলো, কিন্তু আমি তেমন গা করিনি। কি হবে এসবে? আমি তো কোনও নাগর নিয়ে রাসকলি করতে আসবো না। এখানে!

বৃদ্ধ বলে, তাই বলে ইমারৎটা ভূতুড়েবাড়ি হয়ে থাকবে? সুলতান বাদশাহ বলে কথা-অমনচুনবালি খসাইটের দাঁত-বের করা ছিরি দেখলে লোকে বলে কি!

দুজনে জলসাঘরের ভিতরে গিয়ে দাঁড়ায়। অনেকদিন বাদে এখানে এলো দুনিয়া। সেই স্বপ্ন দেখার পর থেকে সে বড় আত্মকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। নিজের মহল ছাড়া অন্য কোথাও বড় একটা যায়-ই না। আগে বাজার করার ভীষণ শখ ছিলো; কারণে অকারণে দাদীমাকে নিয়ে দোকানে দোকানে ঘুরে বেড়াতো। সাজ পোশাক, শৌখিন জিনিসপত্র সবই সে নিজে দেখেশুনে পছন্দ করতো। কিন্তু ইদানিং হাটবাজারের নাম শুনতে পারে না। ওরেকবাস, ওখানে তো শুধু পুরুষ মানুষ কিলবিল করে। কোনও পুরুষের ছায়া মাড়াবো না আমি।

এই জলসাঘরেও সেই কারণে সে আসে না। এখানে তো আর মেয়েতে মেয়েতে মাইফেল জমে না। পুরুষ আর নারীর কামনা বাসনা মেটাবার জায়গা এই জলসাঘর। কিন্তু দুনিয়ার জীবন থেকে সে পাট বিদায় নিয়েছে।

দু-পাশের দেয়ালে চোখ পড়তেই দুনিয়া আঁৎকে ওঠে, দাদীমা—

বৃদ্ধা অলক্ষ্যে হাসে!—কি হলো, বেটা। ভয় পেলে কিসে?

–-একি দেখছি, দাদীমা? এ ছবি এখানে এলো কোথা থেকে, এ তো আমার সেই স্বপ্নের দৃশ্য। হুবহু। কিন্তু এখানে দেখছি পুরুষ পাখিটার পা ফাসে আটকে গেছে আর মেয়ে-পাখিটাই উড়ে পালাচ্ছে। আমার স্বপ্নে তো তা ছিলো না–

-–তুমি ভুল করেছিলে, মা। স্বপ্নে যা দেখেছিলে, ঘুম ভাঙ্গার পর তা গুলিয়ে গিয়েছিলো। মেয়েকে পুরুষ আর পুরুষকে মেয়ে ভেবে নিয়েছিলে। ওরকম ভুল হামেশাই হয়। সবারই হয়।

দুনিয়া গুম মেরে দাঁড়িয়ে থাকে। স্মৃতি হাতড়াবার চেষ্টা করে। চোখ বন্ধ করে সেই স্বপ্নের দৃশ্যটি আর একবার দেখতে চায়। কিন্তু কেমন যেন সব ঝাপস মনে হয়। সবটা ভালো করে মনে করতেও পারে না। ভাবে, দাদীমা বোধহয় ঠিক কথাই বলছে। স্বপ্নের সবকিছু হুবহু মনে রাখা যায় না। হঠাৎ সে বৃদ্ধাকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে, দাদীমা, তুমি কি সুন্দর—তুমি ঠিক বলেছি, আমি স্বপ্নে যা দেখেছিলাম ঘুম ভাঙ্গার পরে মনে তার উল্টো ছোপই পড়েছিলো। আসলে পুরুষ পাখিটাই ফাঁদে আটকে পড়েছিলো; আর মেয়ে পাখিটা পালিয়েছিলো।

একটুক্ষণ থেমে আবার বলতে থাকে, এখন আমার কি উপায় হবে দাদীমা? আমি তো কত সুলতান বাদশাহের ছেলেকে ভাগিয়ে দিয়েছি। কোন মুখে আবার আব্বাজনকে বলবো, একটা নওজোয়ান পুরুষ না হলে আমার আর চলছে না।

বৃদ্ধা বলে, আহা আত অধৈর্য হলে চলে? আপসে সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে।

—কিন্তু দাদীমা, এখন ছেলেরাই বা রাজি হবে কেন? আর আমাকে বিশ্বাসই বা করবে। কি করে? সবাইকে ঢাক পিটিয়ে বলা হয়েছে, কোনও ছেলের সঙ্গে আমার শাদী দিলে, আগে পাত্রের গলা কাটবো, তারপর নিজের বুকে ছুরি বসিয়ে দেব। এখন যদি চাউর করেও দেওয়া হয়, শাহজাদী আবার শাদী করতে রাজি হয়েছে, জানের ভয়ে কেউ এগিয়ে আসবে না। ভাববে। এ আবার নতুন কোনও ফন্দী।

বৃদ্ধা দুনিয়ার মাথায় হাত রাখে, তুমি কিছু ভেবো না বাছা, সব ঠিক হয়ে যাবে। চলো, বাগিচায় চলো, ফুলের বাহার দেখলে মনটা খানিক হালকা হবে।

কেয়া ঝোপের আড়াল থেকে তাজ বৃদ্ধার চোখের দিকে তাকায়। বৃদ্ধ ইশারা করে, তাদের সামনে দিয়ে সে যেন নির্বিকার চিত্তে হেঁটে বাগিচার বাইরে বেরিয়ে চলে যায়।

তাজ আল-মুলুক স্বচ্ছন্দ ভাবে সোজা সদর ফটকের দিকে এগিয়ে চলে। এদিকে সে শাহজাদী তার দিকে আপলক চোখে তাকিয়ে দেখছে, সেদিকে সে লক্ষ্যই করে না। এমনভাব-বাগিচায় অন্য কেউ আছে তা যেন সে দেখেইনি।

দুনিয়া হাঁ করে চেয়ে থাকে। তাজ-এর প্রিয়দর্শন চেহারা তাকে মুগ্ধ করে।–দাদীমা, দেখছো?

-হুঁ। ভারি অন্যায়। মালিটার কি কোন কাণ্ডজ্ঞান নাই। শাহজাদী বিহারে এসেছে, আর সে ব্যাটা নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছে! তুমি ওকে শূলে চাপাও, শাহজাদী। তবে ব্যাটার চৈতন্য হবে।

দুনিয়া বলে, আহা-হা আমি মালির কথা বলিনি, দাদীমা? বলি, দেখছো, কি সুন্দর নওজোয়ান।

বৃদ্ধা কপট ক্ৰোধে ফেটে পড়ে, সেই জন্যেই তো বলছি, মালিটাকে শূলে চাপাও। বাগানের দরজা হাট করে খুলে রাখে। আর সেইজন্যেই যখন তখন উটকো লোক ঢুকে পড়ছে।

দুনিয়া বলে, আহা, আস্তে বলো, সাহেব শুনতে পেলে কি ভাববে বলতো?

—ভাববে। আবার কী? এতে ভাবাভাবি কি আছে। তুমি আসি। যখন তখন শাহজাদীর বাগানে ঢোকার মজা আমি বুঝিয়ে দিয়ে আসছি।

দুনিয়া বাধা দিয়ে বলে, না, দাদীমা অমন করো না, দেখছো না কি খুবসুরৎ—মনে হয় কোনও শাহজাদা।

—শাহজাদা না হাতী! আজিকালিকার ফচকে ছোঁড়াগুলো বাপের ঘাড় ভেঙে কেতাদুরস্ত সাজ-পোশাক পরে নবাবী চালে রাস্তায় নামে-মেয়ে শিকার করতে।

দুনিয়ার সে কথা বিশ্বাস হয় না।—এ তুমি বাড়াবাড়ি করছ দাদীমা। আমি কি ওর সাজ-পোশাক দেখে ভুলে গেলাম-ভেবেছোঁ। পয়সা খরচ করলে বাদশাহী সাজ-পোশাক না। হয় জোগাড় করা যায়। কিন্তু রূপ যৌবন? তাও কি বাজারে কিনতে পাওয়া যায়? দেখছো, না, সুন্দর রূপবান পুরুষ। সারা শহর খুঁজলেও আর একটা যোগাড় করতে পারবে?

–বুঝেছি বাছা, বুঝেছি! পিরিতে মজিলে মন কিবা হাড়ি কিবা ডোম—

—এ তোমার ভারি অন্যায় দাদীমা। হাড়ি মুচির সঙ্গে তুলনা করলে তার?

বৃদ্ধা বিচিত্র মুখের ভঙ্গি করে বলে, আহা-হা, চুক চুক। আমি কি জানি, বাছা, পয়লা নজরেই প্রেমে পড়ে গেছ তার? তা বলো কি করতে হবে।

দুনিয়া বলে, ছুটে যাও। ফটক দিয়ে রাস্তায় নেমে গেলে আর ধরতে পারবে না। যেভাবেই হোক, ওকে একবার আমার সঙ্গে দেখা করতে বলো। এমনিতে রাজি না হলে বলবে, অনেক টাকা দেবী। যত চায়। ওকে না পেলে আমি আত্মহত্যা করবো।

—না না, বাছা, অমন কাজটি করো না। আমি এখুনি যাচ্ছি। যেভাবে পারি তাকে রাজি করাবোই। আত্মহত্যা করলে যে প্ৰাণে বাঁচবে না মা! তুমি মাথা ঠাণ্ডা করে তোমার মহলে যাও। আমি দেখছি ছেলেটা কতদূর গেলো।

বৃদ্ধ আর দাঁড়ায় না। হন হন করে ফটকের বাইরে বেরিয়ে এলো। তাজ তার জন্যেই অপেক্ষা করছিলো। বৃদ্ধ বললো, কেল্লা ফতে—তোমার সুরৎ দেখে শাহজাদী কাত। কাল তোমার বাসায় যাবো। কখন যাবো বলতে পারছি না। তবে তুমি তৈরি হয়ে থাকবে। আমি সঙ্গে করে নিয়ে আসবো।

বৃদ্ধ আর অপেক্ষা করলো না। হন হন করে আবার প্রাসাদের দিকে চলে গেলো।

শাহজাদী অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলো। বৃদ্ধ ঘরে ঢুকে বলে, দেখা পেয়েছি। কিন্তু রাজি হলো না, বাছা।

–রাজি হলো না? আমার কথা বলেছিলে?

–খুব বলেছি। সে বলেকি—আমার অনেক কাজ। মেয়ে মানুষের সঙ্গে দেখা করার ফুরসৎ নাই।

শাহজাদী একেবারে নিভে যায়, তবে? তবে কি হবে দাদীমা। আমি তো আর এ জীবন রাখবো না। আমাকে খানিক জহর। এনে দাও।

বৃদ্ধ বলে, ঘাবড়াও মাৎ বেটি, আমি সব বন্দোবস্ত করে দেব। আজকালকার ছোকরাগুলোর আর কিছু থাক না থাক, ডাঁট আর ফন্টটা ষোলআনা আছে। তা আমার কাছে অত ডাট দেখিয়ে পার পাবে না বাছাধন। যে রোগের যা ওষুধ তা আমার ভালো করেই জানা আছে।

দুনিয়া ভেবে পায় না, বৃদ্ধ কি ভাবে তাকে রাজি করাতে পারবে। বলে, সে যদি না আসে তাকে তুমি কি পাকড়াও করে আনবে!

—দরকার হলে তাই করবো। তুমি কিছু চিন্তা করো না। ওসবের দরকার হবে না। যখন শুনবে তুমি সুলতান সারিমানের মেয়ে—কাপড়ে-চোপড়ে হয়ে যাবে না? আমি তার বাড়ির ঠিকানা নিয়ে এসেছি। কল সকালে যাবো। আজকের রাতটা কোনও রকমে কাটাও বাছা, কাল তোমার প্রেম-নাগরকে এনে মালা করে গলায় ঝুলিয়ে দেব। আর তা যদি না পারি। তবে তাকে কড়ি কাঠে ঝুলাবো।-এও বলে রাখলাম।

–না, দাদীমা, আর যাই কর, তাকে প্ৰাণে মেরো না। সে যদি না আসতে চায় নাই আসুক। আমার বুকের জ্বলায় আমি জ্বলে পুড়ে থাক হবো। কিন্তু ওর যেন কোনও অনিষ্ট না হয়।

—হেই শোনো মেয়ের কথা। আমি কি তাকে সত্যি সত্যিই কডিকাঠে ঝুলাবো নাকি? কামড়াবো না, তা বলে কি ফোস করতেও মানা—!

পরদিন সকালে তাজ-এর বাসায় গিয়ে হাজির হলো বৃদ্ধা। হাতে তার শালোয়ার কামিজ আর বোরখার একটা মোড়ক। তাজকে বলে, নাও চটপট এগুলো পরে ফেলো। জেনানা সাজিয়ে নিয়ে যাবো তোমাকে। তা না হলে প্রাসাদে ঢোকা যাবে না। বেটা খোজা কাফুর পাহারায় বসে আছে। ওকে এড়ানো বড় শক্ত।

তাজ-আল-মুলুক মেয়ে সাজলো। বৃদ্ধা দেখে অবাক হয়। তাজের যা রূপ-চাদপোনা সুরৎ, মেয়ের সাজেও সুন্দর দেখায়। বৃদ্ধা বলে, মেয়ে মানুষ হয়ে জন্মালে ছোড়াগুলো তোমাকে আর আস্তা রাখতো না। নাও, এই চটিটা পর। পথে যখন চলবে, দেখে যেন কেউ সন্দেহ না করে। মেয়েছেলের মতো কোমর দুলিয়ে দুলিয়ে হাঁটবে। ঠিক এই রকম–

বৃদ্ধ বিচিত্র ভঙ্গী করে কয়েক পা হেঁটে দেখিয়ে দিলো। তাজ আর হাসি চাপতে পারে না, ঠিক আছে দাদীমা, একেবারে নিখুঁত করে হাঁটবো, দেখে নিও।

প্রাসাদের অন্দরমহলে ঢোকার মুখেই বসেছিলো খোজার সর্দার। এই-রোখে।

বৃদ্ধা হুঙ্কার দিয়ে ওঠে, কেন, ‘রোখো’ কেন?

খোজা বললো, আমি পরীক্ষা করে দেখবো, তারপর ঢুকবে। সুলতানের কড়া হুকুম আছে নতুন লোক হলে-সে যেই হোক, তল্লাসি না করে ভিতরে ঢুকতে দেবে না।

–তা কি তল্লাসি করবে শুনি, খানদানি ঘরের জেনানা। গায়ে হাত দেবে নাকি।

—দরকার হলে, তাও দিতে পারি।

–ওরে আমার কে রে, গায়ে হাত দেবে! হাত ভেঙ্গে দেব না।

–সে যাই বলো, দাদীমা না দেখে ছাড়তে পারবো না।

–তাই বলে আমিরের ঘরের লেড়কী। তোমার সামনে বেহায়ার মতো বোরখা খুলে দাঁড়াবে? মান ইজ্জৎ বলে কি আর কিছু নাই।

খোজা বলে, বোরখানা খুললে হাত চালাবো। আমাকে তো বুঝতে হবে, আসলি মেয়েছেলে কিনা।

—আসলি না তো কি নকলি নাকি খোজা সর্দার। আচ্ছা তুমি কী? সারাটা জীবন আমার এই প্রাসাদে কেটে গেলো। মাথার চুল সব সফেদ হয়ে গেছে। এই বয়সে তোমার কাছে মিথ্যে বলে দোজকে যাবো?

খোজা জিজ্ঞেস করে, যাবে কোথা?

বৃদ্ধ কপালে হাত রাখে, ইয়া আল্লাহ, তাও জানো না। এক আমিরের বিবি খুব ভালো সূচের কাজ জানে শুনে সুলতান তাকে বলেছিলো, তার বিবি যেন মাঝে মাঝে এসে শাহজাদী দুনিয়াকে শিখিয়ে যায়। তাই তো আমি তাকে নিয়ে।\, আসতে গিয়েছিলাম। নাও, পথ ছাড়া। এমনিতেই দেরি হয়ে গেছে। শাহজাদী বোধহয় এতক্ষণে ক্ষেপে বোম হয়ে আছে। তুমি কিছু মনে করো না মা, সর্দার আমার সঙ্গে একটু মাসকরা করছে। এসো, আমার সঙ্গে এসো।

খোজা পথ ছেড়ে দেয়। বৃদ্ধ তাজকে নিয়ে হলঘরের ভিতরে ঢুকে যায়। অদ্ভুত কায়দায় তাজ পাছা দোলাতে থাকে। সদরের যত খোজা সবাই লোলুপ নয়নে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে। এমহল ওমহল পার হতে হতে এক সময়। শাহজাদীর মহলের সামনে এসে হাজির হয়। বৃদ্ধ বলে, এই যে লাল রেশমী পর্দা দেওয়া দরজা দেখছো, এই রকম ছ’খানা দরজা পার হওয়ার পর যে দরজাটা পাবে, খেয়াল রেখো, সেই দরজাই দুনিয়ার। আমি এখানে দাঁড়ালাম। তুমি দরজাগুলো গুণতে গুণতে চলে যাও। দুনিয়ার ঘরে ঢুকে দেখবে সে এখনও ঘুম থেকে ওঠেনি। তার পরের ব্যাপার যা করার তুমি করবে—আমি আর বলে দেব না।

তাজ গুণে গুণে ছ’খানা দরজা ছেড়ে দিয়ে পরে দরজার পর্দা তুলে দেখলো, পালঙ্কে মখমলের শয্যায় শাহজাদী ঘুমে বিভোর। কামিজের সব কটি বোতাম খোলা, পায়ের ওপরে উঠে এসেছে শালোয়ার। নিটোল স্তনদুটো ঘাসের ফাঁক দিয়ে উকি দেয়া আধ-ফোঁটা পদ্মের কুঁড়ির মত অংশ বিশেষ বেরিয়ে রয়েছে। এলোমেলো চুলের খুচরো দু’এক গাছি এসে পড়েছে চিবুকের পাশে। তাজ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবতে থাকে। জাগাবে কি জাগাবে না—ঠিক করতে পারে না। একবার হাত দিয়ে মুখের চুলগুলো সরিয়ে দিতে যায় আবার কি ভেবে হাতখানা সরিয়ে নেয়। আস্তে আস্তে ওর পাশে এসে বসে। চাঁদের শোভা দেখতে থাকে। অপলক নয়নে। আপনা থেকেই মুখটা আনত হয়ে আসে। কি সুন্দর পাকা আঙুরের মতো ঠোট। তাজ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ধরে। আপনা থেকে হাত দু’খানা উঠে আসে ওর দেহে।

শাহজাদীর ঘুম ছুটে যায়। কিছুই বুঝতে পারে না–স্বপ্ন না। সত্যি। ঝটিকা মেরে উঠ পড়তে চায়। কিন্তু তাজের বজমুঠিতে বাঁধা আছে তার দেহ। দুনিয়া চিৎকার করতে চায়। কিন্তু ওর ঠোঁট চাপা আছে আর এক ঠোঁটে। তার পৌরুষের কাছে হার মানতে হয় তাকে। হার মানতে হয় সব নারীকেই।

দুনিয়া এতক্ষণে বুঝতে পারে। ওর চোখ হেসে কথা বলে, তুমি-তুমি এসেছে। আমি তো সারাটা রাত তোমার কথাই ভেবেছি প্রিয়। তোমার স্বপ্নেই এতক্ষণ আচ্ছন্ন ছিলাম। তুমি কখন এলে?

তাজও চোখেই কথা বলে, তুমি শুধু সারাটা রাত আমার কথা ভেবেছো? স্বপ্ন দেখেছ? আর আমি সারাটা বছর তোমার কথা ভেবে ভেবে সারা হয়েছি, প্রিয়া। তোমাকে পাবো বলে পাহাড় নদী প্রান্তর ডিঙিয়ে এসেছি। এখানে।

দুনিয়া দু’হাত বাড়িয়ে তাজকে জড়িয়ে ধরে। বুকের যৌবনচিহ্ন দুটোকে নিজের বুকে চেপে ধরে পিস্ট করতে থাকে। খোলা কামিজের ভিতর হাত ঢুকিয়ে স্তনগুলোর উপর পরম মমতায় প্রথমে হাত বুলাতে থাকে, তারপর আস্তে আস্তে মুঠোকরে চাপতে চাপতে পরে আটা ধলার মতো দলতে থাকল। একসময় সকল পোশাক খুলে যৌবনপুস্ট দেহের প্রতিটি লোমকোষ, অঙ্গে চুম্বন, চোষন, পেষন করে সম্ভোগ করতে থাকে। বাকি বর্ননা না হয় নাই বা দিলাম।

পুরো একটা মাস দুনিয়ার ঘরে তাজ রয়ে গেলো। সারাদিন ধরে খায় দায়, নাচ-গান হৈ-হল্লা করে কাটায়। তাজ-এর হৃদয় কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে। দুনিয়াও নিজেকে নিঃশেষ করে বিলিয়ে দেয়। তাজ-আর দুনিয়া-দুই-এ মিলে এক সুখের নীড় রচনা করতে থাকলো।

এদিকে উজির আর আজিজ। সারাটা রাত উদগ্রীব হয়ে বসে থাকে। কিন্তু তাজ আর ফেরে না। একদিন দুদিন করে এক সপ্তাহ কেটে যায়। কিন্তু তাজ-এর কোন সন্ধান নাই। সেই বৃদ্ধাও আর আসে না। উজির ভাবলো, নিশ্চয়ই সে ধরা পড়েছে। এবং সুলতান তাকে কোতল করে ফেলেছে। ভাবতেও গা শিউড়ে ওঠে।

আজিজ বললো, একমাস বাদে আবার বিলাস মহলের ফটক খুলবে। শাহজাদী বিহারে আসবে। ততদিন পর্যন্ত কি অপেক্ষা করবেন?

অগত্যা তাই করতে হবে। না হলে এই অবস্থায় কি সংবাদ নিয়ে যাবো সবুজ শহরে কি বলবো সুলতান সুলেমানকে?

একটি মাস পুরো হয়ে গেলো একদিন। কিন্তু বিলাস ভবন-এর দরজা খুললো না। এবার উজির শঙ্কিত হলো। আর তো এখানে অপেক্ষা করা চলে না; আজিজকে বললো, চলো আজিজ, দেশে ফিরতে হবে। আর অপেক্ষা করে লাভ নাই। সুলতানের কাছে সব খুলে বলা ছাড়া গতি নাই।

আর দেরি না করে পরদিনই তারা যাত্রা করলো। কয়েক দিন পরে সবুজ শহরে পৌঁছে কাঁদতেকাঁদতে  জানালো, তাজ অল মুলুক কপূর প্রবাল সুলতানের প্রাসাদে বন্দী হয়ে আছে। আজ প্রায় দু মাস তার কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি।

সুলতান আর্তনাদ করে ওঠে। মনে হয় তার পায়ের তলার মাটি সরে গেছে। দু’হাতে মুখ ঢেকে শিশুর মতো কাঁদতে থাকে।

কিন্তু বসে বসে কাঁদলে তো ছেলেকে ফেরৎ পাওয়া যাবে না। একটা ব্যবস্থা করতে হবে। কপূর দ্বীপের সুলতান ভেবেছে কি? আমার হুঙ্কারে ইস্পাহান পাহাড় কেঁপে ওঠে। আর ওই সামান্য কপুর-সুলতান? ওকে আমি রেণু রেণু করে গুড়িয়ে দেব।

উজির বললো, এখনি ব্যবস্থা কর। সেনাপতিদের খবর পাঠাও। কপূর দ্বীপ আক্রমণ করতে হবে। সারা শহরে সােজ সাজ রাব পড়ে গেলো! ঢাল তরোয়াল, বর্শা, সড়কী নিয়ে বেরিয়ে এলো হাজার হাজার সৈন্য। আল্লাহ আকবর, আল্লাহ আকবর ধ্বনি করতে করতে এগিয়ে চললো।

এদিকে দুনিয়া আর তাজ সুখের সায়রে ভাসছে। একদিন তাজ দুনিয়াকে আদর করতে করতে বললে, সোনা, তুমি আমাকে অনেক দিয়েছ, আমিও দিয়েছি সাধ্যমতো। কিন্তু একটা জায়গায় একটু খুঁত রয়ে গেছে। সেই জন্যেই স্বস্তি পাচ্ছি না।

—কি সোনা? তুমি যাচাও যেভাবে আমাকে পেতে চাও আমি কি সেভাবে দিতে পারছি না। তাজ ওকে বুকে টেনে নেয়। না, সোনা, ওসব কিছু না। ওদিক থেকে আমার কোন কিছুর অভাব নাই। তুমি আমাকে দু’হাত ভরে উজাড় করে দিয়েছে। আমিই তোমার কাছে খানিকটা চেপে গেছি।

দুনিয়া অবাক হয়, সে কী?

আমি আমার আসল পরিচয় তোমাকে দিইনি।

–মানে?

আমি শাহেনশাহ সুলেমান শাহর পুত্র তাজ-আল মুলুক। সবুজ শহর এবং ইস্পাহান পর্বতমালার অধিপতি আমার বাবা। তোমার কাছে সওদাগরের ছদ্মবেশে এসেছি। অনেকদিন ধরেই তোমাকে বলবো বলবো ভাবি, কিন্তু বলা আর হয় না।

দুনিয়ার চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়। তুমি সুলতান সুলেমানের ছেলে। তোমার উজিরই না আমার বাবার কাছে এসেছিলো শাদীরা

মুখের কথা কেড়ে নিয়ে তাজ বলে, শাদীর প্রস্তাব নিয়ে উজিরই এসেছিলো তোমার বাবার কাছে। তোমার বাবা দারুন খাতির যত্ন করেছিলেন, কিন্তু তুমিই বেঁকে দাঁড়িয়েছিলে। মনে আছে খোজকে খাড়া নিয়ে তাড়া করেছিলে!

—হুঁ! খুব মনে আছে। তখন আমার মাথায় শয়তান ভর করেছিলো। পুরুষ মানুষের নাম শুনলে খুন চেপে যেত।

তাজ বললো, আজ কামাস হয়ে গেলো, উজির কোন খবর না পেয়ে কি যে ভাবছে, কি যে করছে কিছুই বুঝতে পারছি না। আমিও এমন নেশায় মত্ত হয়েছিলাম ওদের কথা মনেই ছিলো না। কিন্তু এত দিনে কি আর তারা এখানে আছে?

—নেই। আমি দাদীমার কাছে খবর পেয়েছি। দাদীমা গিয়েছিলো। তোমাদের দোকানও আর খোলা হয় না। বাড়িও তালা বন্ধ! বাড়িওলার কাছে খোঁজ নিয়ে জেনেছি, আজ মাস-দুই তারা দেশে গেছে।বাড়ি ছাড়েনি। এক বছরের অগ্রিম ভাড়া জমা দিয়ে গেছে।

তাজ বলে, সর্বনাশ হয়েছে।

–কেন?

—যুদ্ধ অনিবার্য। উজির নিশ্চয়ই ভেবেছে তোমার বাবা আমাকে বন্দী করেছে অথবা মেরে ফেলেছে। সে দেশে গিয়ে বাবাকে বলা মানেই যুদ্ধ। আমাদের হাজার হাজার সৈন্য সামন্তের কাছে তোমার বাবা কি দাঁড়াতে পারবেন? একেবারে ছাতু ছাতু হয়ে যাবে সারা শহর।

দুনিয়া আঁৎকে ওঠে, তা হলে কি হবে?

তাজ বলে, আর দেরী নয়, সোনা, চলে আমরা সবুজ-শহরের পথে রওনা হই। আমাকে চোখে না দেখা পর্যন্ত বাবাকে কেউ থামাতে পারবে না। রাগলে সে আর মানুষ থাকে না।

এই সব কথা বলতে বলতে রাত প্রায় শেষ হয়ে আসে। দুনিয়া বলে, এখন একটু ঘুমিয়ে নাও। কালই আমরা রওনা হয়ে যাবো।

দু’জনে দুজনকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়ে। এই ভাবে অনেক বেলা পর্যন্ত তারা সুখনিদ্রায় বিভোর হয়ে থাকে।

সেই দিন সকালে সুলতান সারিমানের দরবারে এক জহুরী এসে কুর্নিশ জানালো। জহুরীর হাতে একটা গহনার বাক্স। সুলতানের হাতে তুলে দিয়ে বলে, পারস্য থেকে এক সওদাগর নিয়ে এসেছে, জাঁহাপনার যদি প্রয়োজনে লাগে এই ভেবে নিয়ে এসেছি।

সুলতান সারিমান দেখলো, মূল্যবান জড়োয়া গহনা। নানা রকম হীরা চুনী মুক্তো পান্না বসানো বাহারী কাজ করা। লক্ষাধিক মোহর দাম হতে পারে। সুলতান ভাবে, দুনিয়ার যদি পছন্দ হয় রেখে দেবে। খোজা সর্দারকে ডেকে বলে কাফুর, অন্দরমহলে শাহজাদীকে গহনাগুলো দেখিয়ে আয়, তার যা পছন্দ-সে যেন রেখে দেয়।

গহনার বাক্সটা হাতে নিয়ে কাফুর শাহজাদীর মহলে চলে আসে। বৃদ্ধ দাদীমা দুনিয়ার সামনে একটা গালিচা পেতে শুয়ে ঘুমাচ্ছিল। কাফুর তাকে ডিঙিয়ে দরজা ঠেলে ভিতরে ঢোকে। সঙ্গে সঙ্গে কাফুরের চোখের সামনে সারা ঘরটা যেন দুলতে থাকে। মাথাটা ঝিমাঝিম করে ওঠে। চোখ দুটো হাত দিয়ে ডলে আবার দেখে, নাঃ, সে তো স্বপ্ন দেখছে না। সত্যি সত্যিই শাহজাদী উলঙ্গ হয়ে একটি ছোকরাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমে অচেতন।

এতক্ষণে কাফুরের সামনে সব খোলসা হয়ে যায়। এই জন্যেই শাহজাদী শাদীর নাম শুনলে ক্ষেপে যেত। এই জন্যেই তাকে সে একদিন ছোরা নিয়ে তাড়া করেছিলো। ইম, এতদিনে বোঝা গেলো, রহস্যটা কোথায়। কাফুরের মনে প্রতিশোধ প্রবৃত্তি মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। আমাকে ছুরি নিয়ে তেড়ে এসেছিলে? দাঁড়াও মজা দেখাচ্ছি।

বাক্সটা হাতে নিয়ে, ঘর থেকে পা টিপে টিপে বেরিয়ে, উর্ধ্বশ্বাসে ছুটে আসে কাফুর। সুলতান জিজ্ঞেস করে, কি খবর কাফুর?

—এই নিন জাঁহাপনা, আপনার বাক্স।

–কী ব্যাপার, একটাও পছন্দ হলো না শাহজাদীর?

—আমাকে মাফ করবেন জাঁহাপনা, এত লোকের সামনে ঘরের কথা বলতে পারবো না।

সুলতানের ইশারায় দরবার ফাঁকা হয়ে গেলো। কাফুর গলা খাটো করে বললো, শাহজাদীর ঘরে ঢুকে দেখি একটা খুবসুরৎ নওজোয়ানকে নিয়ে শুয়ে আছে। এর বেশি আর জিজ্ঞেস করবেন না, হুজুর।

সুলতান হুঙ্কার ছাড়ে, কী? কার ঘাড়ে কটা মাথা আছে আমার অন্দরমহলে ঢোকে। তোরাই বা সব কি করিস। বাইরের পুরুষ মানুষ অন্দরে ঢুকলো কি করে? তুই ঠিক দেখেছিস তো কাফুর?

—হুজুর, প্রথমে আমার চোখকে বিশ্বাস করতে পারিনি। ভাবলাম বুঝি খোয়াব দেখছি। তারপর আবার ভালো করে দেখলাম, শাহজাদির শরীরে কোনও বস্ত্রই নাই, জাঁহাপনা!

—থাম, সুলতান আর সহ্য করতে পারে না, একটা নিগ্রোকে ডাক। ওদের দুজনকেই ধরে বেঁধে যেমন করে পারে আমার সামনে হাজির করুক। আমি নিজে চোখে দেখতে চাই বেতমিজ বদমাইশটাকে।

তাজ আর দুনিয়াকে এনে দাঁড় করানো হলো সুলতানের সামনে। সুলতান চিৎকার করে উঠলো, তা হলে কাফুরের কথা মিথ্যে নয়। তরে রে শয়তান—

এই বলে সুলতান নিজে হাতেই একখানা বর্শা ছুঁড়ে মারে। কিন্তু ক্ষিপ্রগতিতে দুনিয়া তাজকে টেনে নিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে বলে, মারতে যদি হয় দু’জনকে এক সঙ্গেই মারুন জাঁহাপনা। দোষ তো ওর কিছু নাই। আমি একে আমার ঘরে না আনলে আসতে পারে কখনও?

সুলতান কৈফিয়ৎ তলব করে, কে তুমি, কি তোমার পরিচয়?

তাজ বিনীতভাবে বলে, আমার নাম তাজ আল-মুলুক। আমার বাবার নাম সুলতান সুলেমান শাহ-সবুজ শহর আর ইস্পাহান পর্বতমালার অধিপতি। আপনার যদি ইচ্ছা হয় আমাকে হত্যা করতে পারেন। মৃত্যুকে আমি ভয় পাই না। কিন্তু আপনার পরিণাম কি হবে একবার চিন্তা করে দেখুন। আমার বাবার বিক্রম আপনার অজানা নাই। এই কপূর দ্বীপ কপূরের মতোই উড়িয়ে দেবেন। তিনি। সুতরাং আমাকে খতম করার আগে আপনার নিজের বাঁচার পথটা ঠিক করে রাখুন।

তাজের কথায় দিশাহারা হয়ে পড়ে সুলতান! কি করা উচিৎ কিছুই বুঝে উঠতে পারে না। উজিরকে জিজ্ঞেস করে, কি করা যায় বলতো। ছেলেটা যা বলছে তা যদি ঠিক হয় তাহলে তো সমূহ বিপদ।।

উজির বলে, লোকটা একেবারে ফেরেববাজ। ওর কথা বিলকুল বিশ্বাস করবেন না, হুজুর। ধাপ্পাবাজির আর জায়গা পায়নি। সুলতান সুলেমানের পুত্র। তার ছেলে এই রকম বেলেল্লাপনা করতে আসবে? আপনি ওরা ওসব ভাওতায় ভুলবেন না, জাঁহাপনা, কোতল করে ফেলুন। শত্রুকে বেশিক্ষণ জিইয়ে রাখতে নাই।

—তুমি ঠিক বলেছ উজির, সুলতান সুলেমানের পুত্র এই রকম বেলেল্লা হতে পারে না। এই কুকুরের বাচ্চাটার মৃত্যুই একমাত্র সাজা।

সুলতান যখন বললো, এই কুকুরের বাচ্চাটার মৃত্যুই একমাত্র সাজা, ঠিক সেই সময় প্রহরী এসে খবর দিলো, সবুজ শহরের সুলতানের প্রতিনিধি এসেছেন সুলতানের সঙ্গে দেখা করতে।

সুলতান উজিরকে বললো, ওদের সসম্মানে নিয়ে এসো।

উজির এবং আজিজ এসে কুর্নিশ জানিয় দাঁড়াতেই তাজ অল মুলুককে দেখে আনন্দে লাফিয়ে ওঠে, শাহজাদা—

তাজ-আল-মুলুক বলে, কে বললে আমি শাহজাদা। আমি তো একটা ধাপ্লাবাজ মিথ্যেবাদী, শয়তান।

সুলতান স্বয়ং সিংহাসন থেকে নেমে এসে তাজকে বুকে জড়িয়ে ধরে–আমি উজিরের কথায় তোমার উপর অবিচার করেছি। বাবা। অনেক কটু কথা বলেছি। তুমি কিছু মনে করো না। আমি ঐ উজিরটাকে শূলে চাপবো। মাথা মোটা একটা হাঁদা কোথাকার! সারিমান ভাবে ভাগ্যে জল্লাদকে সে হুকুম দিতে দেরি করেছিলো। আর এক দণ্ড পরে যদি এঁরা আসতেন তা হলে তাজ-এর কাটা মুণ্ডু এতক্ষণে মাটিতে পড়ে থাকতো। উফ ভাবতেও শরীর শিউরে ওঠে সারিমানের। উজির জানায়, সুলতান সুলেমানের সেনাবাহিনী জোর কদমে এগিয়ে আসছে কপূর দ্বীপের দিকে। ওদের খবর পাঠাতে হবে। নইলে শহরের ভিতর ঢুকে সব ধুলোয় মিশিয়ে দেবে-এই রকম হুকুমই তাদের দেওয়া আছে। সুতরাং আমি আর অপেক্ষা করতে পারছি না। সেনাপতিদের সঙ্গে দেখা করে সেনাবাহিনী ফিরিয়ে নিতে হবে।

ভয়ে সুলতান সারিমানের হাত পা কাঁপতে থাকে। উজির বলে, আপনি আশ্বস্ত হোন জাঁহাপনা, আমি সব ব্যবস্থা করছি। আর আপনি আপনার বৃদ্ধ উজিরকে এর জন্যে কোন তই শাস্তি দেবেন না। এই আমার আর্জি। কারণ সে নিজের স্বার্থের জন্য কিছু করতে চায়নি। যা কিছু করেছে সুলতানের মঙ্গল চিন্তা করেই করেছে। হয়তো তার বিচারে ভুল হতে পারে। এর জন্য প্রাণদণ্ড হয় না।

আমিও সেই কথাই বলি, জাঁহাপনা, ওকে আপনি এযাত্রা রেহাই দিন। ভুল মানুষ মাত্রেরই হয়।

সুলতান সারিমান বলে, ঐ ব্যাটা খোজা কাফুর, সব নষ্টের গোড়া সে। ওকে আমি ক্রুশে গেঁথে মারবো।

তাজ বলে, সে আপনার ইচ্ছা। এ ব্যাপারে আমি কিছু বলতে চাই না। তবে লোকটার জন্যেই যে আমার গর্দান যেতে বসেছিলো, এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নাই।

উজির এবং আজিজ দুজনেই এগিয়ে এসে বলে, শুভকোজ সামনে। এখন আর নরহত্যা না হয় নাই করা হলো। এ যাত্রা ওকে ক্ষমাঘেন্না করে না হয় ছেড়েই দিলেন।

সুলতান সারিমান বললো, এ ব্যাপারে আপনারা যা বলবেন আমি তাই করবো। খোজাকে শূলে চাপাতে বলেন শূলে চাপাবো। ছেড়ে দিতে বলেন ছেড়ে দেব।

তাজ বলে, ঠিক আছে, এবারের মতা ওর বেয়াদপি মাফ করেই দিন।

সুলতান সারিমান বলে, আর বাবা, আমার গুনাহর কে বিচার করবে?

তাজ বলে, ও কথা বলে লজ্জা দেবেন না জাঁহাপনা। এখন থেকে আপনি আমার দ্বিতীয় পিতা। পিতাপুত্রের সম্পর্ক তো বিচার-বিবেচনার সম্পদ নয়, জাঁহাপনা।

সারিমান তাজকে বুকে জড়িয়ে ধরে। উজির আর আজিজ সেনাপতিতদের সঙ্গে দেখা করতে চলে যায়। আমির ওমরাহ এবং দরবারের সচিবরা তাজকে নিয়ে যায় হামামে। এদিকে কাজীদের খবর পাঠানো হয়। সারাপ্রাসাদে হৈচৈ পড়ে যায়। শাহজাদী দুনিয়ার শাদী।

সুলতান সারিমান এবার কন্যা দুনিয়ার ঘরে আসে। মেয়ে হয়তো মনে আঘাত পেয়েছে। দরবারে ডেকে উজিরের সামনে তাদের এইভাবে হেনস্থ করা হয়েছে। অভিমানী মেয়ের মনে চোট লাগা স্বাভাবিক।

ঘরে ঢুকতেই চমকে ওঠে। শাহজাদী দুনিয়া একখানা ছুরি হাতে বাগিয়ে ধরেছে। আর এক মুহূর্ত দেরি হলে নিজের বুকে বসিয়ে দিত। সুলতান ক্ষিপ্রহাতে ছুরিখানা ছিনিয়ে নিয়ে বলে, এ কি করছিলে, মা।

দুনিয়া কেঁদে ওঠে, এ জীবন আমি আর রাখবো না বাবা।

সুলতান সারিমান আকুল হয়ে বলে, ও কথা মুখে আনতে নাই মা। তুমি আমার একমাত্র সন্তান। তুমি না থাকলে আমি বাঁচবো কি নিয়ে?

দুনিয়া বলে, তাজ ছাড়া আমার জীবনের কোনও মূল্য নাই। সে আমার জীবনের একমাত্র ভরসা ছিলো। তুমি তাকে হত্যা করেছ। আমি কি নিয়ে থাকবো?

—না মা, না। সে এখনও বেঁচে আছে। আমি ভুল করে তাকে সাজা দিতে গিয়েছিলাম। কিন্তু আল্লাহ বাঁচিয়েছেন। সবুজ শহর থেকে সুলতান সুলেমানের উজির এসেছেন। তার কাছেই জানলাম, তাজ কোনও ধাপ্পা দেয়নি। ওঠা মা, ওঠা। আমি তোমাদের মিলন ঘটিয়ে দিচ্ছি।

তাজ-আল-মুলুক হামাম থেকে ফিরে আসে। সুলতান নিজে হাতে ধরে তাজকে নিয়ে এলো দুনিয়ার ঘরে।–এই দেখো, মা। তাজ বেঁচে আছে।

দুনিয়া ছুটে এসে তাজ-এর হাত ধরে, আনন্দে তার দু’চোখ বেয়ে নেমে আসে অশ্রুধারা। সুলতান ঘরে ছেড়ে বেরিয়ে যায়।

তাজ দুনিয়াকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে।-ওরা আমাকে মারতে চেয়েছিলো, সোনা। কিন্তু আমাদের ভালোবাসা আমাকে রক্ষা করেছে। চলো, আর দেরি করবো না। বাবা বড় দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন। আজই আমরা সবুজ শহরের পথে রওনা হবে।

সেই দিনই তাজ, দুনিয়া, উজির, আজিজ এবং সুলতান সারিমান সবুজ শহরের পথে যাত্রা করে। কিছুদিন বাদে যখন তারা এসে পৌঁছয় সারা সবুজ শহর তখন আনন্দের বন্যায় ভেসে চলেছে। দূত এসে আগেই সুলতান সুলেমানকে খবর দিয়েছিলো, শাহজাদা তাজ-আল-মুলুক পাত্রী শাহজাদী দুনিয়াকে সঙ্গে নিয়ে ফিরে আসছেন।

শহরের প্রবেশ মুখে বিরাট তোরণদ্বার তৈরি করা হয়েছিলো। হাজার হাজার নরনারী এসে সমবেত হয়েছে। তাদের ভাবী সুলতান আর তার ভাবী বেগমকে সাদর অভ্যর্থনা জানাতে সবুজ শহর। আজ ভেঙে পড়েছে। কাঁড়ানাকাড়া বাজিয়ে চলেছে সেনাবাহিনী। রাস্তার দুপাশে

ফুলের মালায় সাজানো হয়েছে প্রাসাদ। সুলতানের হুকুমে জনে জনে দান করা হচ্ছে নতুন পোশাক, খানাপিনা, ফল ফুল, আতর, গোলাপজল।

তাজ প্রাসাদে ঢুকেই প্রথমে সুলতান সুলেমানকে জড়িয়ে ধরে।—আব্বাজান, আমার জন্যে বড় দুশ্চিন্তায় দিন কেটেছে আপনার। অনেক কষ্ট পেয়েছেন। আমাকে ক্ষমা করুন।

ছেলেকে বুকে জড়িয়ে সুলতান বলে, আল্লাহ যখন যাকে যে ভাবে রাখেন। তাই থাকতে হয় বাবা। ও নিয়ে আমার কোনও দুঃখ নাই। আজ যে আবার তোমাকে ফিরে পেয়েছি। এজন্যেই তাকে আমার হাজার হাজার সালাম জানাই।

দুই সুলতান এবং তাজ একসঙ্গে বসে খানাপিনা করলো। কাজীরা এসে শাদীনামা তৈরি করে দি নানারকম সাজপোশাক এবং নগদ অর্থ উপহার নিয়ে বিদায় নিলো। সেনাবাহিনীর মধ্যে দু’হাতে ধনদৌলত বিতরণ করা হতে থাকলো। নাচ গান বাজনা হৈ-হল্লায় মেতে উঠলো। শহরবাসী। চল্লিশ দিনব্যাপী চলতে থাকলো এই আনন্দ উৎসব। দুনিয়া আর তাজ ভালোবাসার সায়রে গা ভাসিয়ে দিয়ে স্বৰ্গ-সুধা পান করতে লাগলো।

তাজ কিন্তু আজিজকে ভোলেনি। দামী দামী সাজপোশাক, মূল্যবান গালিচা পর্দা, খটপালঙ্ক নানা রকম শৌখিন বিলাস সামগ্ৰী এবং প্রচুর ধনরত্ন সহ দাসদাসী নফরবাদী উট খচ্চর গাধা। ঘোড়া সঙ্গে দিয়ে আজিজকে তার মার কাছে পাঠিয়ে দিলো। আজ কতকাল তার মা ছেলেকে চোখে দেখেনি। হয়তো সে বেচারী কেঁদে কেঁদে অন্ধ হয়ে গেছে।

সুলতান সুলেমানের মৃত্যুর পর তাজ-আল-মুলুক সুলতান হলো। আজিজকে করলো তার উজির। আর সেই বাগানের বৃদ্ধ মালির কথাও ভোলেনি তাজ। সবুজ শহরে এক বিরাট রেশমী কাপড়ের দোকান করে দিলো তাকে।

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *