মতঙ্গ মুনি ও শবরী – (রামায়নী প্রেমকথা) – সুধাংশরঞ্জন ঘোষ

›› পৌরাণিক কাহিনী  ›› সম্পুর্ণ গল্প  

পম্পাসরােবরের জলের মতাে তার গায়ের রং। ঋজুশীর্ষ শকীতরুর মতাে তার সবল সুগঠিত দেহ। ঘনকৃষ্ণ কালসর্পের মতাে অবিন্যস্ত তার কুটিল কেশকলাপ। সে কখন মতঙ্গ বনে এসেছে তা এখানকার কেউ ঠিক বলতে পারবেন না। তাকে যদি আশ্রমের কেউ জিজ্ঞাসা করে, কোথায় তার ঘর, কোথা হতে সে এসেছে, তাহলে মতঙ্গবনের ফাকে ফাকে দুরে যে ঋষ্যমুক পাহাড় দেখা যায় যায়, সেই পাহাড়ের দিকে হাত বাড়িয়ে কী দেখায়।

তারপর বলতে থাকে, ওই পাহাড়টার ওপারে যে একটা ঝর্ণা আছে তার দু’পাশে বিরাট চন্দন আর মহুয়ার বন। সেই বনের মধ্যে আমাদের বাস। আমার বাবা হচ্ছে ব্যাধ ; আমরা জাতিতে শবর। সকালে উঠেই আমার বাবা তীর ধনুক নিয়ে শিকার করতে যায়। আর আমার মা সারাদিন ধরে মহুয়ার মদ তৈরি করে। সন্ধ্যে হলেই আগুন জ্বালায়।

বাবা শিকার থেকে ফিরে এলেই শিকারের মাংসগুলাে সেই আগুনে ঝলসানাে হয়। তারপর সেই ঝলসানাে মাংস আর মহুয়ার মদ খেয়ে নেশায় বিভাের হয়ে আমার বাবা ও মা দু’জনেই নাচতে শুরু করে। নাচতে নাচতে রাত গভীর হয়ে পড়ে। 

আমার কিন্তু ওসব কিছুই ভালাে লাগে না। ভালাে লাগত না বলেই বাবা মাকে এড়িয়ে চলতাম আমি। খুব কম কথা বলতাম। সন্ধ্যে হলেই ওই পাহাড়টার একটা চূড়ার উপর একা একা বসে থাকতাম। ঝর্ণার গান শুনতে শুনতে একসময় ঘুমিয়ে পড়তাম আমি। আমার বাবা মা কোনাে খোঁজ করত না আমার। 

এমনি করে কোনাে এক চাঁদনী রাতে ওই পাহাড়ে উপর ঘুমিয়ে পড়লাম আমি। বাইরে তখন চাদের আলাে আর হাওয়ার হিল্লোলে মাতাল হয়ে উঠেছে পম্পার জল আর মহুয়ার বন। রাত পর্যন্ত নাচতে নাচতে ক্লান্ত হয়ে উঠেছে আমার বাবা মা। এমন সময় আমি সহসা ঘুমিয়ে পড়লাম। 

চাদের আলাে আমার কখনই ভালাে লাগে না। চাদের আলাে বড় চঞ্চল। কেমন যেন মত্ততা নিয়ে আসে মনের মধ্যে। মােহগ্রস্ত করে ফেলে সকল বস্তুকে। তার থেকে অন্ধকার ঢের ভালাে। বড় শান্ত ও মধুর হচ্ছে অন্ধকার। মনকে তা স্বাভাবিকভাবেই আত্মস্থ ও মৌন করে তােলে। 

চাদের আলাে আমার ভালাে লাগে না বলেই হয়তাে একটু তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম সে রাত্রিতে। ঘুমােতে ঘুমােতে মাঝরাতে এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলাম। এক মধুর আনন্দ উত্তেজনায় রােমাঞ্চিত হয়ে উঠল আমার সারা শরীর। আমার জীবনের একটি অতিগােপন ইচ্ছা মূর্ত হয়ে উঠল সে স্বপ্নের মধ্যে।

শুধু যে মদ খেয়ে আমার বাবা মা নাচত বলেই আমি তাদের দেখতে পারতাম না তা নয়। তাদের উপর আমার রাগের অন্য একটা কারণ ছিল। আমি ছােট থেকে পাখির গান শুনতে ও হরিণের খেলা দেখতে ভালবাসতাম। আমার বাবা পাখি আর হরিণ দেখতে পেলেই তাদের নির্মমভাবে হত্যা করত। আমি ফুলও খুব ভালবাসতাম। এত ভালবাসতাম যে, গাছ থেকে কোনাে ফুল ছিড়তাম না। আপনা হতে যে ফুল গাছ হতে ঝরে পড়ত শুধু তাই নিয়ে খেলা করতাম আমি। কিন্তু আমার মা বড় নিষ্ঠুর। শুধুমহুয়া নয়, গাছ থেকে সবরকমের টাটকা ফুলগলােকে ছিড়ে তাদের পিষে নিজেদের খাবার জন্য মদ তৈরি করত। আমি ভেবেই পেতাম না, এই সব সুন্দর সজীব জিনিসকে মানুষ কি করে তার ক্ষুধার খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। মনের নিভৃতে যা খুঁজছিলাম স্বপ্নের মধ্যে তাই পেয়ে গেলাম। 

স্বপ্নে দেখলাম, আমি ঘুরতে ঘুরতে এমন এক তপােবনে এসে পড়েছি যে তপােবনের শান্তি কখনাে কোনােভাবে ক্ষুন্ন হয় না। কোনাে হিংসা, বিরোেধ বা বিষমতা প্রবেশ করতে পারে না তার ত্রিসীমানার মধ্যে। যেখানে ফুল কখনাে শুকিয়ে ঝরে পড়ে না। পাখির গান যেখানে বন্ধ হয় না কখনাে। 

সেই তপােবনের মধ্যে ইতস্তত ঘুরতে ঘুরতে এক মহাতেজস্বী ঋষির দেখা পেলাম আমি। তাকে দেখেই ভয় পেলাম। কিন্তু তিনি আমার প্রতি সস্নেহ দৃষ্টিতে তাকিয়ে অভয় দান করলেন আমায়। 

এমনি করে সেই তপােবনের মধ্যে আমার জীবনের ঈপ্সিত আনন্দ খুঁজে পেলাম আমি। কিন্তু পরক্ষণেই স্বপ্নটা টুটে গেল আমার।

সে রাত্রিতে আর ঘুম হলাে না আমার। শুনেছি, ওই পাহাড়টা ব্রহ্মার তৈরি। ওই পাহাড়ের উপর ঘুমিয়ে কোনাে স্বপ্ন দেখলে সে স্বপ্ন সার্থক হয় অচিরে।

এজন্য সকাল হতেই আমার বাবা মাকে কিছু না বলেই আমার স্বপ্নে দেখা সেই তপােবনের খোঁজে বেরিয়ে পড়লাম। সেদিন হতে কত পাহাড়ে জঙ্গলে কত ঘুরে বেড়ালাম তার জন্য। অবশেষে এখানে এসে উঠলাম।

এখানে আসার পর থেকে মতঙ্গ মুনির শিষ্যরা তাকে ভয় দেখিয়েছিল। বলেছিল তুই অস্পৃশ্য। এখানকার কোন জিনিস তুই ছুঁবি না। কোনাে দৌরাত্ম্য করবি না। তাহলে মুনি রেগে গিয়ে তােকে শাপ দেবে।

ও বলত, মুনিকে দেখবার জন্যই এখানে এসেছি। ওরা জবাব দিল, মুনির সঙ্গে দেখা হবে না।

ঝর্ণার জলের মতাে খিল খিল শব্দে হেসে উঠেছিল শবরী। হাসতে হাসতে বলেছিল, তাহলে আমি এখান থেকে যাব না। মুনির সঙ্গে দেখা না করে আমি এ বন ছেড়ে কোনােদিন যাব না। 

শবরী আরও বলেছিল, আমি ব্যাধের মেয়ে। আমার গায়ে ভীষণ জোর। আমি তােমাদের এ আশ্রম লণ্ডভণ্ড করে দেব। 

শবরীকে ঠকাবার জন্য শিষ্যরা একদিন তাদের মধ্যে একজনকে মতঙ্গ মুনি বলে উপস্থাপিত করল তার কাছে। 

রাগে চীৎকার করে উঠল শবরী, না, না, ও সে মুনি নয়। তােমরা মিছে কথা বলছ। তােমাদের কথা আমি বিশ্বাস করি না। তােমাদের কাউকে চাই না। আমি নিজে গিয়েই দেখা করব তার সঙ্গে।

অবশেষে একদিন মনােবাঞ্ছা পূর্ণ হলাে শবরীর। দেখা হলাে মতঙ্গ মুনির সঙ্গে। তিনি তখন ছিলেন ধ্যানমৌন। তাঁকে দেখে মনে হচ্ছিল তিনি যেন অবৃষ্টিসংরদ্ধ মেঘের মতাে গম্ভীর, নিবাতনিষ্কম্প প্রদীপের মতাে স্থির, তরঙ্গসংঘাতবিহীন সমুদ্রের মতাে শান্ত।

আশ্চর্য হয়ে দেখতে লাগল শবরী। কেমন যেন ভয় হতে লাগল তার। ভাবল, এই সেই মতঙ্গ মুনি আগুন জ্বলে যার ক্রোধে। হাসিতে যার মুক্তা ঝরে। ফুল হয়ে ফুটে ওঠে যার মুক্তানিভ স্বেদবিন্দু। | ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকালেন মতঙ্গ মুনি। হয়তাে ধ্যানের মধ্যেই বুঝতে পেরেছিলেন শবরীর মনের কথা। তার অখণ্ড হৃদয়ের আকুতি।

মতঙ্গ মুনির পায়ের উপর ছুটে গিয়ে লুটিয়ে পড়ল শবরী। কাঁদতে কাঁদতে বলল, আমার অপরাধ নেবেন না ঠাকুর, সাধন ভজন কিছুই জানি না আমি। আমি শুধু একমাত্র আপনাকে জানি। স্বপ্নে আপনাকে দেখার পর হতে আপনাকেই প্রাণ মন সমর্পণ করেছি আমি। 

শবরীর উপর স্থির দৃষ্টি নিবদ্ধ করে চেয়ে রইলেন মতঙ্গ মুনি। তার সে দৃষ্টির অর্থ কিছু বুঝতে পারল না শবরী। | শবরী করুণ কণ্ঠে বলল, এখানকার সবাই বলছিল, আমি অস্পৃশ্য। বলছিল, আমার দ্বারা এ আশ্রমের কোনাে কাজ হবে না। বলছিল, আপনি নাকি আমায় কোনােদিন দেখা দেবেন না।

মতঙ্গ মুনির পা দুটোকে ধরে এবার নাড়া দিল শবরী। 

কিন্তু কেন? কি পাপ আমি করেছি? আমার বাবা যদি পাখি মারে, আমার মা যদি ফুল থেকে মদ তৈরি করে তবে সে দোষ কি আমার? আমার জ্ঞান হওয়ার পর থেকে আমি তাে কোনােদিন কারাে প্রাণে কষ্ট দিইনি। নিজের প্রাণকে যেমন ভালবাসি তেমনি সকল পশু পাখি, কীটপতঙ্গ, তরুলতা ও ফুল ফলকে ভালবেসে এসেছি আমি ছােট থেকে। যে ফুল আপনা হতে ঝরে পড়ে তাই নিয়ে খেলা করেছি, যে ফল পেকে নিজের থেকে ঝরে পড়েছে তাই খেয়েছি। যে জলধারা আপনা হতে বয়ে চলেছে সেই স্বতঃপ্রবাহিত জল পান করেছি।

তবে কেন আমি অস্পৃশ্য হলাম, আপনি আমায় বুঝিয়ে দিন ঠাকুর। যারা পাপ করে একমাত্র তাদেরই তাে অস্পৃশ্য বলা উচিত। কিন্তু আমি তাে কোনাে পাপ করিনি।

এতক্ষণে স্নেহতরল এক স্নিগ্ধতা স্পষ্ট ফুটে উঠল মতঙ্গ মুনির দৃষ্টিতে। তিনি শান্তকণ্ঠে বললেন তুমি কি চাও?

শবরী আশ্বস্ত হয়ে বলল, আমি শুধু তপােবনে থেকে আপনার সেবা করতে চাই। ধর্ম, ঈশ্বর, সাধন ভজন আমি কিছুই জানি না। আমি শুধু জানি আপনাকে। আপনি যা বলবেন আমি তাই করব। চোখ থাকতে আমি অন্ধ। আপনি হবেন আমার অন্ধের যষ্ঠি। আপনি স্বর্গে যেতে বললে স্বর্গে যাব, নরকে যেতে বললে তাই যাব। পাপ পুণ্য ভালাে মন্দ কিছুই বিচার করব না। 

মতঙ্গ মুনি স্নেহসিক্ত কণ্ঠে বললেন, তথাস্তু। তােমার মনােবাঞ্ছা পূর্ণ হবে শবরী। তুমি এই আশ্রমে থেকে আমরা যা করব তাই করবে। তুমি ভগবানকে না জানলেও তুমি ভগবানকে একদিন এইখানে থেকেই পাবে। তুমি সম্পূর্ণরূপে অপাপবিদ্ধা। আমাদের থেকেও পবিত্র তুমি অন্তরে। তুমিই প্রকৃত সত্যসাধিকা।

অপার আনন্দে চোখে জল এলাে শবরীর। মতঙ্গ মুনি বললেন, তােমাকে পেয়ে আমি ধন্য হয়েছি শবরী।

একজন প্রবীণ শিষ্য মৃদু প্রতিবাদ করে বলল, আপনি ওকে এখানে অবস্থানের অনুমতি দিলেন কেন মুনিবর? শবরীর মতাে যুবতী নারী সাধনা ও সমাধির পথে ঘাের প্রতিবন্ধক।

মতঙ্গ মুনি মৃদু হেসে বললেন, ভােগের বস্তু নিকটে উপস্থিত থাকলে যাদের চিত্ত বৈকল্য ঘটে, যারা হৃদয়কে সংযত রাখতে পারে না তারা কখনই প্রকৃত যােগী নয়। সংযম শিক্ষার

এক মহাপরীক্ষা হবে এই নারী।

মতঙ্গ মুনির কথামতাে মনের আনন্দে সপ্তসমুদ্রে স্নান করে এলাে শবরী।

মতঙ্গ বনের শেষপ্রান্তে বড় মনােরম একটি বিরাট জলাশয় হচ্ছে এই সপ্তসমুদ্র। সবাই বলে সত্যসত্যই সাতটি সমুদ্র হতে আনীত জল মিশ্রিত আছে এই জলাশয়ে। এই সপ্তসমুদ্রের জল বড় স্বচ্ছ, শীতল আর শান্ত। নিয়তবায়ুতাড়িত হয়েও কখনাে বিক্ষুব্ধ হয় না এর বক্ষস্থল। প্রখর সৌরতাপেও তপ্ত হয় না যার চিরশীতল অঙ্গ। 

এই সপ্তসমুদ্রে স্নান করে ত্রিতাপজ্বালা একেবারে জুড়িয়ে গেল শবরীর। স্নিগ্ধ হলাে তার তাপিত দেহ। নবজীবন লাভ করল সে।

ধীরে ধীরে তাপসীর বেশ ধারণ করল শবরী। তার যৌবনসুলভ সুললিত লাবণ্য লতিকায় এলাে ম্লান রুক্ষতা। শবরী নিজে কিন্তু কিছুতেই তপস্যায় বসে না। সে শুধু তাপসীর বেশে সেবা করে যায় মতঙ্গ মুনির।

পূজা ও অভিষেকের জন্য জল নিয়ে আসে সপ্তসমুদ্র হতে। ফুল ও পদ্মবীজ তুলে নিয়ে আসে মন্দাকিনীর জল হতে। যজ্ঞের কাষ্ঠ ও কুশাদি সংগ্রহ করে নিয়ে আসে বিভিন্ন স্থান হতে। আসন বেদি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে প্রতিদিন সকালে। অপরাহে বৃক্ষের আলবােলাগুলিতে ভৃঙ্গারক হাতে জল দেয়। সন্ধ্যা হলে সন্ধ্যা দীপ জ্বালে সমাধি কুটিরে।

কিন্তু যার জন্য এত কিছু করছে শবরী, যাকে ছাড়া আর কোনাে কিছু জানে না সে, তার কিন্তু সেদিকে কোনাে লক্ষ্য নেই। সম্পূর্ণ উদাসীন তিনি তার প্রতি। আপন মােক্ষের জন্য সতত ধ্যানমগ্ন তিনি।

অবশ্য শবরী কিছুই চায় না তার কাছে। সে শুধু দিয়ে যেতে চায়। দিয়েই খুশি। কোনদিন কিছুই পেতে চায় না তার কাছে। পাবার জন্য সে দেয় না। 

তাই ফুটকুসুমের সুবাসের মতাে জ্বলন্ত ধূপে সুগন্ধিতনু শিখার মতাে সে শুধু আপনাকে তিলে তিলে ক্ষয় করেই আনন্দ পায়। 

তাই সে অকাতরে দান করে যায় তার অক্লান্ত দেহের সমস্ত শ্রম, তার অখণ্ড অন্তরের অফুরন্ত ভক্তি। এমনি এক আত্মঘাতী অথচ আধ্যাত্মিক আনন্দে মাতােয়ারা হয়ে ওঠে শবরী। 

সারাদিন আশ্রমের কাজকর্ম নিয়েই থাকে শবরী। কিন্তু মাঝে মাঝে ফাক পেলেই ধানমগ্ন মতঙ্গ মুনির কাছে বসে একদৃষ্টে তার পানে চেয়ে থাকে। চেয়ে চেয়ে দেখে, কিভাবে তিনি প্রাণবায়ুকে প্রাণায়ামের মধ্যে ধারণ করে, কিভাবে তিনি যজ্ঞে আহুতি দান করেন। দেখে কেমন করে তিনি মাথার উপর সমস্ত রােদ বৃষ্টি সহ্য করেন। | আজকাল শবরীও মাথার উপর রােদবৃষ্টি সব সহ্য করে। কুটিরের মধ্যে আশ্রয় নেয় না। মতঙ্গ মুনির দেখাদেখি সেও বৃষ্টি এলে দাঁড়িয়ে ভেজে। প্রখর রৌদ্রে স্থির হয়ে বসে থেকে পুড়তে থাকে।

কিন্তু তার এই কৃসাধনের কোনাে আধ্যাত্মিক উদ্দেশ্য নেই। মােক্ষলাভের জন্য কোনাে তৃপশ্চর্যার অঙ্গ হিসাবে এসব করে না সে। মতঙ্গ মুনির প্রতি তার অন্তরের গভীর ভক্তি ও ভালবাসার তাড়নাতেই এত সব কষ্ট স্বীকার তার।

সমাধিকালে মতঙ্গ মুনির দেহে যে সব ক্লেশ অনুভূত হয় সে সব ক্লেশ অপনােদন করতে পারে না শবরী। পারে না বলেই নিজের দেহ দিয়ে সেই সব ক্লেশের তীব্রতাকে অনুভব করে দেখতে চায়।

হােমাগ্নির তাপে অথবা প্রখর সূর্যকিরণে মতঙ্গ মুনির সারা দেহ স্বোক্ত হয়ে ওঠে যখন শবরী তখন নিজের পরিধেয় বস্ত্রাঞ্চল দ্বারা সে স্বেদ মুছিয়ে দেয়। ব্যাকুল হয়ে ওঠে তাকে। কোনাে বৃক্ষপত্র দ্বারা ব্যজন করবার জন্য। যখন তীব্র শৈত্য পীড়িত বা প্রবল বৃষ্টিধারায় সিক্ত হয় মতঙ্গ মুনির শরীর তখন শবরীর মনে হয় কোনাে বস্তু দ্বারা আচ্ছাদিত করে রাখে তার মস্তক। কিন্তু এসব নিষিদ্ধ বলে করতে পারে না শবরী।

তাই দেখে মনে কষ্ট পায়। কষ্ট পেয়ে নিজেকে সান্ত্বনা দেয়। নিজেকে বােঝায়, তার ভক্তি ও ভালবাসার যিনি শ্রেষ্ঠ ধন তিনি যখন রৌদ্রে তাপিত হন, তখন সে নিজে কোনােমতে কোনাে স্নিগ্ধচ্ছায়া উপভােগ করতে পারে না। তিনি যখন বৃষ্টিসিক্ত হন তখন সে নিজে কখনাে শুষ্ক কুটিরের আরামঘন মুহূর্ত যাপন করতে পারে না।

সারাদিনের ক্লান্তির পর মতঙ্গ মুনি সারারাত্রি বেশ গভীর নিদ্রাসুখ উপভােগ করেন তার কুটির মধ্যে। তার শিষ্যরাও যথাস্থানে ঘুমিয়ে পড়ে সকলে।

এদিকে একা শুধু শবরীরই ঘুম আসে না চোখে।

এক একদিন গভীর রাত্রিতে কুটিরের পর্ণশয্যা ছেড়ে বাইরে এসে বসে শবরী। গাছের পাতার ফাকে ফাকে দূর আকাশের নক্ষত্রদলের দিকে তাকিয়ে থাকে। যখনি কোনাে ক্লান্তি আসে তখনি প্রকৃতি জীবনের কথা ভাবে। ভাবে, সারারাত্রির মধ্যে একটিবারের জন্যও তাে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ছে না প্রকৃতির কোনাে বস্তু, একটি মুহূর্তের জন্যও স্তিমিত হয়ে পড়ছে না।

ওই আকাশের নক্ষত্রদল। যেতে যেতে একবার ভুলেও থমকে দাঁড়াচ্ছে না নদীজলধারা। ফুল ফোটানাের যে নীরব প্রস্তুতি চলছে গাছে গাছে সে প্রস্তুতি বিরাম নিচ্ছে না একটি বারের জন্যও।

অথচ এরা তাে প্রতিদানে কিছুই চাইছে না। প্রতিদানে শবরীও কিছুই চায় না। তবু মাঝে মাঝে অভিমান জাগে শবরীর মনে।

তার সবচেয়ে বড় অভিমান, যার জন্য জীবনের সব সুখ ত্যাগ করেছে সে, তিনি তার অন্তরের আসল দুঃখটা কোথায় তা একবারও দেখলেন না। যার প্রতি সততনিবদ্ধ তার সযত্নসাধিত দৃষ্টি, তিনি একবার তার প্রতি ভালাে করে ফিরে তাকালেনও না। শবরীর মনে হলাে, মতঙ্গ মুনি শুধু তাকে আশ্রমের বাইরে বাইরে থেকে কাজ করবার অনুমতি দিয়েছেন, তার কুটিরের মধ্যে প্রবেশাধিকার দেননি। তার দেহ স্পর্শ করবার অনুমতি দেননি। তা যদি হবে কেন তবে রাত্রিতে তার কুটিরের মধ্যে থাকতে দেন না তাকে। এই সময় কাছে থাকলে সে তার পদসেবা করতে পারত, কোনাে তৈল দ্বারা গা মার্জনা করে দিতে পারত তাঁর। 

কিন্তু একদিন অনুমতি মিলল।

একদিন সন্ধ্যায় মতঙ্গ মুনির কুটিরে ডাক পড়ল শবরীর। যে দিনটির জন্য দিনের পর দিন ধৈর্য ধরে প্রতীক্ষা করে এসেছে সে, অবশেষে সেই বহুপ্রতীক্ষিত বহুমূল্য দিনটি আপনা হতে এলে তার জীবনে। আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠল শবরী।

সেদিন সহসা একটু অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন মতঙ্গ মুনি। শরীরের তাপমাত্রা অনেকখানি বেড়ে গিয়েছিল। ব্যথা অনুভব করেছিলেন সর্বাঙ্গে।

কম্পিত পায়ে কুটির মধ্যে প্রবেশ করল শবরী। মতঙ্গ মুনির নির্দেশমতাে কিছু বিন্দু ও শেফালিকাপত্রনিঃসৃত রস খাইয়ে দিল তাকে।

মতঙ্গ মুনি তাকে কাছে বসতে বললেন। ইতস্ততঃ করতে লাগল শবরী। সঙ্গে সঙ্গে অভিমানে ফুলে উঠতে লাগল শবরী মনে মনে। এ অধিকার তাকে আরও আগে দেওয়া হয়নি কেন?

কাছে গিয়ে প্রথমে প্রণাম করল মুনিকে। হাত তুলে নীরবে আশীর্বাদ করলেন মতঙ্গ মুনি।

শবরী প্রণাম করে দাঁড়িয়ে রইল স্থির হয়ে। মতঙ্গ মুনি আবার তাকে তার কাছে বসবার জন্য ইশারায় জানালেন।

এবার কাছে গিয়ে বসল শবরী। মতঙ্গ মুনিকে স্পর্শ করল না। শক্ত কাঠের মতাে হাত গুটিয়ে বসে রইল। মতঙ্গ মুনি এবার তার অঙ্গমর্দন করে দেবার জন্য স্পষ্ট অনুরােধ করলেন শবরীকে।

স্পষ্ট অভিমান ফুটে উঠল শবরীর কণ্ঠে, না না, আমি আপনাকে স্পর্শ করব না। শবরীর মনের কথা বুঝতে পেরে মৃদু হাসলেন মতঙ্গ মুনি। হাসিমুখেই বললেন, আমার সেবা করবার লােকের অভাব নেই। তবু আজ তােমায় কেন ডেকেছি তা জান শবরী?

শবরী লজ্জারক্ত কণ্ঠে উত্তর করল, আপনি আমাকে দয়া করেন তাই।

ব্যস্ত হয়ে মতঙ্গ মুনি বললেন, না শবরী তােমাকে দয়া করবার আমার কোনাে অধিকার নেই। আমি আশ্চর্য হয়ে গিয়েছি শবরী, আমার প্রতি তােমার ভক্তি ও নিষ্ঠা দেখে।

এই ভক্তি ও নিষ্ঠার দ্বারা মানুষ ভগবানকে লাভ করতে পারে।

মাথা নত করে শান্তকণ্ঠে বলল শবরী, আমি ভগবান কাকে বলে জানি না। আপনিই আমার কাছে ভগবান। ভক্তি ও ভালবাসাই হচ্ছে আমার একমাত্র সাধনা। 

মতঙ্গ মুনি বললেন, তােমার সেই ভক্তি ও ভালবাসা দিয়ে আমার হৃদয়ের যথাসর্বস্ব কেড়ে নিয়েছ শবরী। তােমাকে দেবার আর আমার কিছুই নেই। তুমি তােমার নিজের জোরেই সব কিছু নিয়ে নিয়েছ। 

মৃদু কান্নায় কণ্ঠ সহসা ঈষৎ বুদ্ধ হলাে শবরীর। বলল, না না, ওকথা বলবেন না। বিশ্বাস করুন, আমি আপনার কাছে থেকে কিছুই চাই না। আমি শুধু আপনার সেবা করে যেতে চাই। সেই সেবা করবার অধিকারও আমি সব সময় পাই না, তাই আমার দুঃখ। 

শবরীকে কাছে টেনে নিয়ে নিজের হাতে তার চোখের জল মুছিয়ে দিলেন। তারপর বললেন, এবার হতে তােমার আর সে দুঃখ থাকবে না শবরী। তুমি ইচ্ছামত যখন যা খুশি করবে। আজ হতে তােমার আমার দুজনের দেহ মনের মধ্যে কোন পার্থক্য রইল না। তুমি হলে আমার অর্ধাঙ্গিনী।

আনন্দের চাপে অশুর বেগ আরও বেড়ে গেল শবরীর। কোনাে কথা বলতে পারল না সে। 

মতঙ্গ মুনি বললেন, এবার হতে তুমি আমায় স্পর্শ করলে আর আমার সমাধি ভঙ্গ হবে না, ক্ষুন্ন বা ব্যাহত হবে না আমার ব্রহ্মচর্য সাধন। | কথা শেষ করে শবরীকে চুম্বন করলেন মতঙ্গ মুনি।

জীবনে প্রথম পুরুষস্পর্শ পেয়ে অধরােষ্ঠটা একটুখানি কেঁপে উঠল শবরীর। অবাক বিস্ময়ে সে কিছুক্ষণের জন্য তাকিয়ে রইল মতঙ্গ মুনির মুখপানে।

মতঙ্গ মুনির অঙ্গমর্দন ও পদসেবা করে তার কুটির হতে বেরিয়ে এলাে যখন শবরী, রাত্রি তখন গভীর। ঘন ঘাের অন্ধকারে একাকার হয়ে গেছে সপ্তসমুদ্রের জল ও মতবনের সমস্ত তরুলতা। 

শবরীর কিন্তু মনে হলাে জীবনে বা জগতে কোথাও কোনাে অন্ধকার বা জটিলতা নেই। মনে হলাে, নক্ষত্রখচিত এক বিরাট আকাশ নেমে এসেছে তার অন্তরে। অরণ্য, ভূধর ও নদীসমুদ্র-সমম্বিত এক মহাপৃথিবী এসে বাসা বেঁধেছে তার প্রসারিত বুকে। মনে হলাে, জীবনে যা চেয়েছিল তার থেকে অনেক বেশি পেয়েছে। এত তাে কোনাে দিন চায়নি। চাইবার স্পর্ধা হয়নি।

আপন কুটীরে গিয়ে প্রবেশ করল শবরী। আনন্দে চোখে একবারও ঘুম এলাে না শবরীর সারারাতের মধ্যে। 

এই মতবনে আসার পর থেকে কত বসন্ত চলে গেছে তার চোখের সামনে দিয়ে। কোনােদিন একবার ফিরে তাকায়নি শবরী। কিন্তু আজ সকাল হতেই বসন্তসজ্জিত বনপ্রকৃতির সমস্ত রুপসম্ভার খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বিহুল দৃষ্টিতে দেখতে লাগল। শুধু দেখল নয়, নিজেও সাজল। 

আশ্রমের প্রাতঃকালের কাজকর্ম সব সেরে তৈলদ্বারা অঙ্গরাগ করে সপ্তসমুদ্রে স্নান করে এলাে শবরী। তারপর আরক্ত বলবসন পরিধান করে নানারকমের ফুলের অলঙ্কার তৈরি করে তাই দিয়ে শােভিত করল সারা অঙ্গ। 

আজ আর তপস্যামগ্ন মতঙ্গ মুনির কাছে বসে রইল না শবরী। বনে মধ্যে চারিদিকে ঘুরে বেড়াল ইচ্ছামত।

সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হয়ে গেলে মতঙ্গ মুনি যথারীতি আহ্নিক ও সামগান শেষ হলে কুটিরে গিয়ে মুনিকে প্রণাম করল শবরী। প্রণামকালে মাথা নত করতেই ঘনকৃষ্ণ বিন্যস্ত কেশপাশ হতে পদ্মরাগমণিতুল্য অরুণ অশােক পুষ্পগুচ্ছ খসে পড়ল।

আজ বসন্তপুষ্পভরণা শবরীকে প্রথম এভাবে দেখে বিস্মিত হয়ে উঠলেন মতঙ্গ মুনি।

এদিকে তখন মতঙ্গবনের বাইরে অফুরান জ্যোৎস্নাধারায় প্লাবিত হয়ে উঠেছে সমগ্র পৃথিবী। ছায়াচ্ছন্ন তরুশ্রেণীর ফাকে ফাকে সেই জ্যোৎস্নার ছটা পড়েছে বনের ভিতর। দেখে মনে হচ্ছে, শুভ্রধবল অজস্র প্রস্ফুটিত সিন্ধুবার কুসুম ছড়িয়ে দিয়েছে কে যেন সারা বনভূমির উপর। 

মতঙ্গ মুনি ভাবলেন, বসন্তজ্যোৎস্নার এই মায়াময় প্রভাবে ও মারুত হিল্লোলের স্পর্শে কামাবিষ্ট হয়ে তার কাছে সঙ্গম প্রার্থনা করছে শবরী। কিন্তু স্পষ্ট করে মুখ ফুটে বলতে পারছে না তার কাছে। 

তাকে পরীক্ষা করবার জন্য মতঙ্গ মুনি বললেন, তােমার যৌবনকাল পূর্ণ হয়েছে। মাঝে মাঝে কোনাে পুরুষে সঙ্গলিপ্সা বা কোনাে সঙ্গম লালসা অনুভব কর না শবরী? 

প্রথমে মতঙ্গ মুনির কথাটা ভালাে বুঝতে না পেরে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে চেয়ে রইল তার মুখপানে।

তারপর ধীরে ধীরে উত্তর করল, এখানে আসবার আগে যখন ওই ঋষ্যমুক পাহাড়টার উপরে শুতাম, মাঝে মাঝে এক এক দিন আমার দেহের শিরায় শিরায় রক্তের মধ্যে একটা অসহ্য উত্তাপ অনুভব করতাম আমি। মনে হতাে, কোনাে বলিষ্ঠ পুরুষের নিবিড় স্পর্শ পেলে সে উত্তাপ যাবে আমার নিমেষে জুড়িয়ে। কিন্তু এখানে আসার পর থেকে সে উত্তাপ কোননা দিন কোনাে মুহূর্তে অনুভব করি না আমি। কোনােদিন কোনাে কামভাব জাগে না মনের মধ্যে।

মতঙ্গ মুনি তখন গম্ভীর হয়ে বললেন, তােমার কথা না হয় বুঝলাম। কিন্তু তুমি বুঝতে পারছ না শবরী, অযত্নসাধিত হলেও তােমার যৌবন সৌন্দর্য দিনে দিনে কেমনভাবে বেড়ে চলেছে এবং স্পর্শদোষশূন্য তােমার এই যৌবনসৌন্দর্য কতখানি কামবিমােহিত করেছে আমায়।

সহসা এক অর্থপূর্ণ কটাক্ষ বিচ্ছুরিত হলাে মতঙ্গ মুনির চোখের কোণ হতে। তিনি বললেন, যদি বলি শবরী তােমার এই যৌবন সুধা পান না করলে শান্ত হবে না আমার কামবিক্ষুব্ধ চিত্ত।

নিজেকে অপরাধীর মতাে মনে হলাে শবরীর। ব্যথাহত কণ্ঠে বলল, কিন্তু আপনি যে ব্রহ্মচারী ঋষি মুনিবর। কাম ক্রোধ প্রভৃতি রিপুকে প্রশ্রয় দিলে ব্যাহত হবে আপনার কৃচ্ছসাধিত এই ব্রহ্মচর্য। বিনষ্ট হবে আপনার তপস্যার সমস্ত ফল।

ভুল কথা। তুমি ঠিক জান না।

এক সােচ্চার প্রতিবাদে ফেটে পড়লেন মতঙ্গ মুনি। বললেন, যদি কোনাে উর্দ্ধরেতা পুরুষ কোনাে রেতঃপাত না ঘটিয়ে ধর্মপরায়ণ কোনাে নারীসঙ্গলাভের মধ্য দিয়ে মাঝে মাঝে কামপ্রবৃত্তি চরিতার্থ করে তাহলে তাতে তার ব্রহ্মচর্য সাধনায় কোনাে বিঘ্ন ঘটে না।

শবরীর একখানি হাত ধরে ঈষৎ একটু টান দিলেন মতঙ্গ মুনি।

শবরী বলল, এ ধরনের কোনাে চিন্তা বা ভােগবাসনা আমার মধ্যে জাগে না। আমি তাদের প্রশ্রয় দিতেও চাই না। তবে আপনাকে আমি ভক্তি করি ও ভালবাসি। আপনাকে খুশি করবার জন্য আমি যে কোনাে কাজ করতে পারি। আমি স্বেচ্ছায় বিষ ভক্ষণ করতে পারি, নরকে পর্যন্ত যেতে পারি। আমার এই তুচ্ছ মরণশীল দেহদ্বারা যদি ক্ষণিকের জন্যও তৃপ্তি দান করতে পারি, তাহলে চিরদিনের মতাে নিজেকে আমি ধন্য মনে করব মুনিবর।

মত্ত মাতঙ্গদ্বারা বিচ্ছিন্ন ব্রততীর মতাে মতঙ্গ মুনির পায়ের উপর লুটিয়ে পড়ল শবরী। কাঁদতে কাঁদতে বলল, আমি স্বর্গ নরক কিছুই জানি না, আপনি যেখানে বলবেন সেখানেই যাব। আমি পাপ পুণ্য জানি না, আপনি যা করতে বলবেন অকুণ্ঠভাবে তাই করব। 

শবরীর মাথায় হাত দিয়ে সস্নেহে বললেন মতঙ্গ মুনি, ওঠ আর লজ্জা দিওনা শবরী। আমায় ক্ষমা করাে। আজ আমি তােমার কাছে হেরে গিয়েছি।। 

ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল শবরী। তারপর মতঙ্গ মুনিকে প্রণাম করে নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল কুটির হতে।

কিন্তু বাইরে বেরিয়েই তার মনে হলাে, জ্যোৎস্নার প্লাবনে পৃথিবী ভাসছে না, বিষাদের গভীর অন্ধকারে ডুবে গেছে সারা পৃথিবী। শুভ্রধবল সিন্ধুবার কুসুমে যেমন কীট আছে তেমনি চাদের আলােয় আছে অনপনেয় কলঙ্কের কালিমা। পৃথিবীতে বিশুদ্ধভাবে সুন্দর বা মহৎ বলে কোনাে বস্তু নেই।

জিতেন্দ্রিয় যে আদর্শ পুরুষকে দেখে এতদিন সংযম শিক্ষা করে এসেছে শবরী, আজ তিনি এতবড় অসংযমের কথা কেমন করে বলতে পারলেন তাকে তা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারল না সে।

অবশেষে নিজের যৌবনকে ধিক্কার দিল শবরী। স্থির করল, তার যে যৌবন প্রলােভিত করেছে মতঙ্গ মুনির মনকে সে যৌবনকে বিনষ্ট করে দেবে সে। চিরতরে স্নান করে দেবে সে যৌবনের সকল সৌন্দর্য।

পরদিন বটগাছে আঠা আনিয়ে মাথায় জটা তৈরি করল শবরী। সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দিল কুসুম প্রসাধন ও অঙ্গরাগ। শুধু আপন সেবাকার্য করে যায় নীরবে। কারাে সঙ্গে কোনাে কথা বলে না। মতঙ্গমুনির সঙ্গেও না। অথচ ভক্তি বা ভালাবাসার কোনাে তুটি নেই।

এদিকে মতঙ্গ মুনিও কঠোর সাধনায় নিমগ্ন হলেন সেদিন হতে।

শবরী তার চোখ খুলে দিয়েছে। তার লক্ষ্যভ্রষ্ট মৃতকল্প সাধনাকে সজীব করে লক্ষ্যের দিকে অগ্রসর করে দিয়েছে অনেকখানি। শবরী সত্যসত্যই তাঁর প্রকৃত সহধর্মিণী।

অবশেষে একদিন সে সাধনায় সিদ্ধিলাভ করলেন মতঙ্গ মুনি। স্বৰ্গৰ্যাত্রার আগে বিদায় চাইলেন শবরীর কাছে।

কথাটা শুনেই অসহায় শিশুর মতাে কাঁদতে লাগল শবরী। বলল, আমি আমার বলতে কিছু না রেখে সব সঁপে দিয়েছি আপনাকে। আর আপনি আমাকে ফেলে রেখে একা স্বর্গে চলে যাচ্ছেন! এতদূর নিষ্ঠুর ও স্বার্থপর আপনি! 

শবরীকে সান্ত্বনা দিয়ে মতঙ্গ মুনি বললেন, দুঃখ করাে না শবরী, তােমার কাল এখনাে পূর্ণ হয়নি। সময় হলে তুমিও সেখানে গিয়ে আমার সঙ্গে মিলিত হবে একদিন। মানব অবতাররূপী রামচন্দ্র ঘটনাক্রমে এই বনে এসে উপস্থিত হবে যেদিন সেদিন তুমি সশরীরে স্বর্গে যাবে শবরী। এবার হতে সেই ভগবানের ধ্যান করাে অহর্নিশি।

শবরী কেঁদে বলল, আমি আগেই বলেছি, আপনি ছাড়া আর কাউকে জানি না আমি। আপনিই আমার ভগবান। আপনি চলে গেলে আপনার দেহনিঃসৃত স্বেদবিন্দুজাত ওই সব ফুলগুলি দেখে ও তাদের আঘ্রাণ নিয়ে কাল কাটাব আমি। নিশিদিন আপনার ধ্যানেই নিমগ্ন থাকব। 

শবরী ভাবল, একদিন সে মতঙ্গ মুনিকে দেহ দান করতে কুষ্ঠিত হয়েছিল। তাই তার উপর রাগ করে অকালে স্বৰ্গযাত্রা করছেন তিনি। তাই তাকে পেয়েও পেল না সে।

মতঙ্গ মুনির পায়ের উপর লুটিয়ে পড়ে করুণ কণ্ঠে শবরী বলল, আপনি আমায় ক্ষমা করুন ঠাকুর। আমি নিজের ভুল বুঝতে পেরেছি। বুঝতে পেরেছি, দেহ মন নিঃশেষে অকুণ্ঠভাবে সমর্পণ করতে না পারলে আরাধ্য দেবতাকে কখনাে পাওয়া যায় না। দেহের অভিমান একান্তভাবে অন্তরায় হয়ে ওঠে সে মিলনের পথে। 

মতঙ্গ মনি স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইলেন শবরীর পানে। মতঙ্গ মনির পা দুটো ধরে নাড়া দিয়ে বলল, আজ আমার দেহ মন মান অভিমান সব গ্রহণ করুন ঠাকুর। তার বিনিময়ে শুধু আপনার এই দুটি চরণে মাথা রাখবার একটুখানি স্থান দিন।

মতঙ্গ মুনি ব্যস্ত হয়ে বললেন, এইভাবে যদি আমায় বাধা দাও তাহলে আমার স্বর্গলাভ সার্থক হবে না শবরী। এইভাবে যদি আমাদের প্রেমকে সংকীর্ণ করে তােলাে তাহলে তােমার আমার দুজনেরই মােক্ষলাভের পথে বাধা হয়ে উঠবে সে প্রেম। কিন্তু মনে রেখাে মহৎ প্রেম কখনাে মানুষকে মুক্তির পথে বাধা দেয় না। তার মুক্তির পথ পরিষ্কার করে তাকে ঠেলে দেয় সে পথে। তাই মহৎ প্রেমসাধনার সঙ্গে কোনাে পার্থক্যই নেই মুক্তিসাধনার।

মতঙ্গ মুনির কথামতাে সপ্তসমুদ্রের জলে শুদ্ধভাবে স্নান করে এলাে শবরী। তারপর তার কানে এক বীজমন্ত্র দীক্ষা দিলেন মতঙ্গ মুনি। সেদিন হতে দিবারাত্রি একমনে সে মন্ত্র জপ করতে লাগল শবরী।

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *