অজ ও ইন্দুমতী – (রামায়নী প্রেমকথা) – সুধাংশরঞ্জন ঘোষ

›› পৌরাণিক কাহিনী  ›› সম্পুর্ণ গল্প  

মৈত্রমুহূর্তে অর্থাৎ উদয়মুহূর্ত থেকে তৃতীয়মুহূর্তর মধ্যে উত্তরফাল্গুনী নক্ষত্র যখন তাদের সঙ্গে মিলিত হয় সেই শুভলগ্নে আয়তীমতী জীবৎপুত্রিকা পুরকামিনীরা হরিদ্রা ও কালেয় নামক গন্ধদ্রব্য দ্বারা অঙ্গরাগ করে স্নান করালেন ইন্দুমতীকে। তারপর হরিদবর্ণের মধুদ্রুম কুসুমের মালা দিয়ে বিন্যস্ত করে দিলেন তার ঘনকৃষ্ণ কুঞ্চিত কেশপাশ। সিথিতে শ্বেতসর্বপযুক্ত দুর্বাঙ্গুর দিয়ে নীলকান্তমণিসমন্বিত স্বর্ণমেখলা ও কৌশেয় বসনে আবৃত করে দিলেন তাঁর ত্রিবলী বেঙ্কিত নধর নাভিদেশ।

লােধ্র কুসুমের শ্বেতপরাগ বিলেপনে চর্চিত হলাে ইন্দুমতীর রক্তাভ কপােলতল। অঞ্জনে শােভিত হলাে তার নীলকঞ্জপ্ৰভ নয়নদ্বয়। অলক্তরাগে রঞ্জিত হলাে তার পদ্মকোষতুল্য পদযুগল।

তারপর ক্ষত্রিয় বালিকার বিবাহকালােচিত একটি বাণ দেওয়া হলাে তার হাতে। এমনি করে শতগুণে বেড়ে গেল সর্বাঙ্গসুন্দরী ইন্দুমতীর দেহ সৌন্দর্য।

সখীরা পরিহাস করে বললেন, এই অপ্রতিম অনিন্দ্যসুন্দর রূপ কার ভাগ্যে লাভ হবে কে জানে! এক কৃত্রিম ও সলাজ ক্রোধভরে হাতের ফুলহার দিয়ে সখীদের প্রহার করলেন ইন্দুমতী।

এদিকে তখন বিদর্ভ রাজদরবারে স্বয়ংবর সভা বসে গেছে। বিভিন্ন রাজ্য হতে অসংখ্য রাজা ও যুবরাজ এসেছেন অসামান্য রূপসী রাজকন্যা ইন্দুমতীর পাণিপ্রার্থী হয়ে। বিশেষভাবে নিমন্ত্রিত হয়ে এসেছেন স্বর্গের দেবতারা।

এতক্ষণ যে গুঞ্জনে মুখরিত হয়েছিল সভাস্থল, ইন্দুমতী প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে সে গুঞ্জন স্তব্ধ হয়ে গেল মুহূর্তে।

সুমধুর নূপুরনিক্কণে পথের প্রতিটি ধুলিকণাকে ধন্য ও অনুরণিত করে স্বর্ণবেত্র-ধারিণী অভিজ্ঞা দ্বারপালিকার পশ্চাদ্বর্তিনী হয়ে মরাল গমনে বরমাল্য হাতে প্রবেশ করলেন ইন্দুমতী। স্তম্বিত রাজন্যবর্গের সমবেত লালসার দৃষ্টির দ্বারা লাঞ্ছিত হলাে তার অঙ্গলতিকা। তাকে দেখে মনে হলাে, মেঘলাঞ্ছিত পূর্ণচন্দ্র অথবা দুরন্তু ভ্রমরদলবেষ্টিত কোনাে নবােদ্ভিন্ন কুসুমকলি।

এক একজন রাজপুরুষের সামনে কিছুক্ষণের জন্য দাঁড়িয়ে প্রতিহারী তার বিস্তৃত পরিচয় দান করতে লাগলেন এবং সম্ভ্রমানত মস্তুকে এক অটল ও মর্যাদামণ্ডিত গাম্ভীর্যে স্থির হয়ে তাই শুনতে লাগলেন ইন্দুমতী। কিন্তু কারাে পানে একটিবারের জন্যও মুখ তুলে চাইলেন না।

অবশেষে একজন রাজার পানে মুখ তুলে চাইলেন। মধুরভাষিণী অন্তঃপুর পালিকা তার পরিচয় দিলেন, ইনি হচ্ছেন কোশলাধিপতি ইক্ষাকু-কুলমণিমহারাজ রঘুর আত্মজ অজ। দেবরাজ ইন্দ্ৰতুল্য যাঁর বিক্রম, কন্দর্পতুল্য যাঁর রূপ। তােমার সর্বাংশে অনুরূপ।

সুনন্দার কথা শেষ হতে না হতেই পেলব চম্পককলিতুল্য অঙ্গুলি দ্বারা বিচিত্রা পুষ্পসংযুক্ত কাঞ্চনবর্ণরঞ্জিত ও মণিমুক্তাশােভিত বরমালাখানি তুলে ধরলেন ইন্দুমতী এবং অনিন্দ্যসুন্দর অজের কণ্ঠে পরিয়ে দিলেন। তার রােমাঞ্চিত অঙ্গলতিকায় প্রতিফলিত হয়ে উঠল হৃদয়নিহিত গুঢ় অনুরাগ।

এদিকে ইন্দুমতীর মনের অভিপ্রায় বুঝতে পেরে আসন ত্যাগ করে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লেন মহারাজ অজ। প্রেমবিমােহিত দৃষ্টির বৈদ্যুতী প্রবাহে মুহুর্তে হ্রদয় বিনিময় হলাে উভয়ের।

অনন্তকালীন প্রেমের চিরচঞ্চল রহস্য যেন মূর্ত হয়ে ধরা দিল ক্ষণকালের এই পরিচয়ের মধ্যে। অনুরাগরঞ্জিত হ্রদয়ের অব্যক্ত আকুল এক আসক্তি ব্যত্ময় হয়ে উঠল দুজনের নীরব চোখের নিগুঢ় ভাষাময়তায়।
এক চাপা অসন্তোষ ও ঈর্ষার গুঞ্জন উঠল সভামধ্যে। এদিকে বিদর্ভরাজ ব্যস্তু হয়ে দ্রুত গিয়ে বরণ করে নিলেন প্রার্থিত বরকে।

শুভপরিণয়ােৎসব শেষ হয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে বাসর ঘরে নিয়ে যাওয়া হলাে বরকন্যাকে।
রাত্রি গভীর হলে এবং পুরকামিনীরা একে একে সকলে চলে গেলে ঘরের মধ্যস্থিত কাঞ্চন প্রদীপটিকে ইন্দুমতীর মুখের কাছে নিয়ে কি একবার দেখে নিলেন মহারাজ অজ। তারপর আলােক শিখাটিকে ক্ষীণ করে দিয়ে মুক্ত বাতায়ন পাশে চলে গেলেন।

বাইরে চঁাদের আলাের মধ্যে দৃষ্টি ছড়িয়ে দিলেন অজ। দেখলেন দীপাবলী শােভিত মহানগরীর প্রান্তে শুক্লপক্ষের শঙ্খধবল জ্যোৎস্নার তরলিত প্রবাহে নিঃশেষে ভেসে যাচ্ছে যেন সপ্তপর্ণ বনের সমস্ত সবুজ আর নিবিড়নীল নিলয়ের রেখা। জ্যোৎস্নায় সেই মদির তরলতায় রতিক্রান্ত কোন এক শ্বেত পারাবতদম্পতির চোখে এসেছে তখন এক নেশা।

মহারাজ অজ ভাবলেন, পল্লবঘন সপ্তপর্ণ বনের ঐ সবুজ ছায়াঘেরা পথ দিয়ে আজ দিনের বেলায় যখন তিনি স্বয়ংবর সভায় আসছিলেন তখন ভাবতেই পারেননি এত রাজার মধ্যে তারই গলে বরমাল্য দেবেন ইন্দুমতী এবং যাবার সময় তিনি বিজয়গৌরবে সঙ্গে নিয়ে যাবেন ইন্দুমতীকে ঐ পথ নিয়ে।

কতবার কত কামপ্রমন্ত মুহুর্তে নারীদেহের প্রতি একটা জৈবিক আসক্তি অনুভব করেছেন অজ তার অস্তিত্বের প্রতিটি অণু-পরমাণুতে। কিন্তু প্রেম কাকে বলে তা কোন দিন বােঝেননি অথবা বুঝতে চেষ্টা করেননি। একথা আজও ঠিক বুঝে উঠতে পারলেন না মহারাজা অজ, সে কোন দৃষ্টি যা নিয়ে মানুষ অজস্রের মধ্যে একজনকে আপন বলে চিনে নেয়, সে কোন হৃদয়ের দুর্বার বিদ্যুৎ, যা এক মধুর অথচ অপ্রতিরােধ্য আকর্ষণে কাছে টেনে নেয় তার অন্তরতমকে।

ক্ষীণ দীপালোকে ইন্দুমতীর মুখখানিকে তুলে ধরলেন অজ। ইন্দুমতী কিন্তু কোনাে উত্তর দিতে পারলেন না তার কথার।

ক্ষীণ দীপালােকটিকে আবার ক্ষীণতম করে দিলেন মহারাজ অজ। তারপর আবার চলে গেলেন সেই বাতায়ন পাশে। জীবনে এ এক বিরাট রহস্য ও পরম বিস্ময়। তার মনে হলাে, প্রেম হচ্ছে ছায়াচ্ছন্ন বনজ্যোৎস্নার মতােই কুহেলিকাময় যার মধুরতা শুধু মৃদু রােমাঞ্চ গায় দেহমনের প্রতিটি লোমকুপে, কিন্তু যা কখনাে দিবালােকের মতো স্বচ্ছ নয়, যার স্বপ্নছায়ামদির মােহকে অনুভূতির নিবিড়তা দিয়ে উপভোগ করতে হয়; কিন্তু বুদ্ধির প্রখরতা দিয়ে উপলব্ধি করা যায় না যার স্বরূপকে।

জীবনে অনেক রাজ্য জয় করেছেন মহারাজ অজ। কিন্তু আজ একটি মানুষের অন্তররাজ্য জয় করে তার প্রেমের সিংহাসনে নিজেকে অধিষ্ঠিত করা সমগ্র পৃথিবী জয় করার থেকে শতগুণে কঠিন বলে মনে হলাে তার।
পরদিন বেলা প্রথম প্রহর শেষ না হতেই বরকন্যাকে আশীর্বাদ করে বিদায় দিলেন বিদর্ভরাজ।

রথ সঙ্গে এনেছিলেন মহারাজ অজ। মণিমুক্তাখচিত সেই উচ্ছল স্যন্দন-সহযােগে ইন্দুমতীকে নিয়ে রওনা হয়ে পড়লেন অযােধ্যার পথে।

কিন্তু নগর প্রান্তের সেই বিশাল সপ্তপর্ণ বনের কাছে যেতেই ব্যাহত হলাে তার গতি। যে সব রাজার স্বয়ংবর সভায় যােগদান করতে এসেছিলেন, বিফলমনােরথ সেই সব রাজাৱা একযােগে আক্রমণ করলেন মহারাজ অজকে। ইন্দুমতীর রূপে উন্মত্ত তারা সকলে। যে অমুল্য রূপসৌন্দর্য লাভে বঞ্চিত হলেন তারা চিরতরে সে সৌন্দর্য তারা ভােগ করতে দেবেন না অন্য কাউকে। তাই মহারাজ অজকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিয়ে অকালবৈধব্যের এক নিদারুণ যন্ত্রণায় স্বয়ংবরা ইন্দুমতীর সারা জীবনকে ব্যর্থ করে নিতে চান তাঁরা।

প্রথমটায় বিমূঢ় ও বিহ্বল হয়ে পড়লেন মহারাজ অজ। আক্রমণােদ্যত অসংখ্য রাজাকে দেখে সমস্ত ব্যাপারটা মুহর্তে বুঝতে পারলেও কর্তব্য ঠিক করে উঠতে পারলেন না নিজে।

আজ কালরাত্রি। কালরাত্রির দিন কোনে বিবাহিতা নারীকে স্পর্শ করলে সে চিরদুর্ভাগিনী হয়। সে নিষেধ উপেক্ষা করে নিবিড় আলিঙ্গনে ইন্দুমতীকে বুকে টেনে নিয়ে অসংখ্য চুম্বনে তার রক্তাভ কপােলফলককে চিত্রিত করে বললেন, আমি রথ থেকে নেমে একা যুদ্ধ করব শেষ পর্যন্ত। তুমি এই রথ নিয়ে রাজধানীতে ফিরে যাও ইন্দুমতী। যুদ্ধে আমি না বাঁচলেও তােমার মনে আমি চিরদিন বেঁচে থাকব। ওরা আমাকে হত্যা করলেও তােমার মন থেকে সন্নাতে পারবে না কোনােদিন।

সমস্ত লজ্জা ও সংকোচ ঝেড়ে ফেলে দৃঢ় হয়ে উঠলেন ইন্দুমতী। বললেন, আমি ক্ষত্রিয় রমণী, আমার প্রেম ও পত্নীত্বের মর্যাদা কেমন করে রক্ষা করতে হয় তা আমি জানি মহারাজ। আমি শেষ পর্যন্ত আমার সমস্ত শক্তি দিয়ে সাহায্য করব আপনাকে।
তারপর মরতে হয় একসঙ্গে দুজনে মরব। কিন্তু তার আর প্রয়ােজন হলাে না। অজের কাছে যে গন্ধর্ব বাণ ছিল, ধনুতে সেই বাণ যােজনা করতেই তার থেকে তিন কোটি গন্ধর্ব বার হয়ে নিঃশেষে ধ্বংস করে ফেলল সমস্ত রাজাদের।

ইন্দুমতীকে নিয়ে বিজয় গৌরবে আবার এগিয়ে যেতে লাগলেন রণদীপ্ত বীরশ্রেষ্ঠ অজ।

সরযু নদী পার হয়ে নগরপ্রান্তে শালবনে রথ প্রবেশ করতেই অযােধ্যায় অসংখ্য শঙ্খ বেজে উঠল একসঙ্গে।

কালরাত্রির পরদিন এলাে ফুলশয্যা। এমনি করে রক্তরঙীন অস্তুরাগৱেখার মতাে ইন্দুমতীর পূর্বরাগের আবেগ শুভ পরিণয়ের মধ্য দিয়ে লাভ করল এক গভীর পরিণতি।

আরও মহিষী ছিল মহারাজ অজের। কিন্তু এবার থেকে ইন্দুমতী হয়ে উঠলেন তার যথাসর্বস্ব।

এ নিয়ে একদিন অজের কাছে মৃদু অনুযােগ করলেন ইন্দুমতী। শান্ত অথচ বেশ দৃঢ়কণ্ঠে বললেন, আমার প্রতি আপনি অতিমাত্রায় আসক্ত বলে মনে হচ্ছে মহারাজ। কিন্তু আপনার আরও যে সব মহিষী আছেন, তাদের প্রতিও আপনার একটা কর্তব্য আছে। আমার ভয় হচ্ছে আপনি সে কর্তব্য ক্রমশঃ বিস্মৃত হয়ে পড়ছেন।

মহারাজ অজ স্বীকার করে নিলেন এ অনুযােগকে। বললেন, তােমার এ অনুযােগ সত্য ইন্দুমতী। আজ আমার একটা কথা প্রায়ই মনে পড়ে, পরিণয়ের মধ্য নিয়ে প্রেম প্রগাঢ়তা লাভ করে সত্য, কিন্তু পরিণয় কখনাে প্রেমের জন্ম দিতে পারে না। তাদের সঙ্গে আমি পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হয়েছি সত্য, কিন্তু আজও কোনাে বিশুদ্ধ প্রেম-সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি আমার ও তাদের মধ্যে। তাদের অভিভাবকদের অনুরােধে আমি তাদের পত্নীরূপে গ্রহণ করে ঘরে এনেছি। কিন্তু তাদের কেউ তােমার মতাে অজস্রের মধ্যে তার একমাত্র প্রেমাস্পদরূপে বেছে নিতে পারেনি আমায়। তাই বােধহয় আমি তােমার প্রতি এত বেশি আসক্ত ইন্দুমতী।

ইন্দুমতী বললেন, তা হলেও তাদের প্রতি আপনার একটা কর্তব্য আছে মহারাজ। আমাকে আপনি ভালবাসেন বুঝলাম। কিন্তু আমার প্রতি প্রেমাতিশযাবশতঃ কর্তব্য কর্মে অবহেলা করা আপনার উচিত নয়।

তখন সকরুণ নয়নে ইন্দুমতীর পানে চাইলেন মহারাজ অজ। কাতরকণ্ঠ বললেন, তুমি আমায় কি বলতে চাইছ ইন্দুমতী, আমি বুঝতে পারছি না। আমার কেবলি ভয় হচ্ছে, হয়ত তুমি আমায় কঠিন কিছু বলবে।

তাই যদি বলি তবে ক্ষতি কি মহারাজ। কঠিনের আঘাত পেয়ে আমাদের প্রেম সমস্ত দুর্বলতা হতে মুক্ত ও পরিশুদ্ধ হয়ে উঠুক—এটাই কি আমাদের কাম্য নয়?

নীরবে মাথা নত করে রইলেন মহারাজ অজ। ইন্দুমতীর মুখ থেকে কোনাে এক নিষ্ঠুর কথা শােনবার জন্য দুঃসহ, প্রতীক্ষায় স্তব্ধ হয়ে রইলেন।

ইন্দুমতী বললেন, একটি বৎসরের জন্য ব্রহ্মচর্য পালন করব আমি। আমার অন্তপুরের মধ্যে নির্জনবাসে থাকব আমি নিষ্ঠার সঙ্গে। এই একটি বৎসরের মধ্যে আমাদের কোনােদিন দেখা হবে না। আমার অন্তঃপুরের মধ্যে প্রবেশ করতে দেব না আপনাকে।

বজ্ৰহতের মতো বিমূঢ় ও হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন মহারাজ অজ। ইন্দুমতীর এই নিষ্ঠুর আদেশবাক্যকে অবাধে মেনে নেবার যেমন প্রবৃত্তি নেই তেমনি তাকে খণ্ডন করে তার সম্যক বিরােধিতা করারও কোনাে শক্তি নেই তার।
তাই নীরবে নিশঃচুপে দাঁড়িয়ে রইলেন অজ।

তখন সূর্য সবেমাত্র অস্ত গেছে। সূর্যাস্তবিধুর গােধূলির ধুসর ছায়া নেমে এসেছে বিশাল রাজোদ্যানের শীতঃ শাখার উপরে, মুমু বীচিবিক্ষুব্ধ সরােবরের বুকে। ইন্দুমতী বললেন, অবাধ মিলনাতিশয্য হতে বহু দুর্বলতা ও আবিলতার সৃষ্টি হয় প্রেমের মধ্যে। বিরহের তাপে বিশুদ্ধ ও বিদুরিত হবে সে সব আবিলতা; পরিশুদ্ধ হয়ে উঠবে আমাদের প্রেম।

ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন অজ। তার মনে হলাে, পা দুটো কাপছে। দাড়িয়ে থাকতে পারছেন না তিনি। সমগ্র সসাগরা পৃথিবী হতে মূল্যবান ইন্দুমতীর অন্তরের যে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন একদিন, সে সিংহাসন আজ বিপন্ন ও বিকল্পিত এবং সেখান থেকে নির্মমভাবে নির্বাসিত হচ্ছেন তিনি।

ইন্দুমতী বললেন, এই একটি বৎসর আপনি যথাযথভাবে সঙ্গ দান করবেন অন্যান্য মহিষীদের। সকলের প্রতি সমান কর্তব্য পালন করবেন। আমি দেখিয়ে দিতে চাই, আমার প্রেম সংকীর্ণ আবর্তের মধ্যে আবদ্ধ করে রেখে দেয় না তার প্রেমাস্পদকে । তাকে বৃহতের মধ্যে মুক্তি দেয়। প্রসারিত করে আত্মাকে যাতে সে তার সেই প্রসারিত আত্মার আলােকে নূতন করে দেখতে পারে জগতের সব মানুষকে।
ইন্দুমতী কথা শেষ করে থামলেন। যাবার জন্য প্রস্তুত হলেন অজ।
নীরবে তার ডান হাতটি স্বামীর দিকে প্রসারিত করে দিলেন ইন্দুমতী।

সেটিকে টেনে নিয়ে বাবার চুম্বন করলেন অজ। সেই হাতের চম্পক কলিকাতুল্য আঙুলগুলিকে তার অবারিত অশ্রুধারাকে রােধ করবার জন্য চেপে ধরলেন দুচোখের উপর।

একটুখানি ক্ষীণ হাসি হাসলেন ইন্দুমতী। বললেন,’অবােধ শিশুর মতাে অকারণ ব্যথাভারে নিজেকে ভারাক্রান্ত করে তুলবেন না মহারাজ। বিরহ কখনাে দুঃখের নয়। মিলনের মতােই মানবজীবনে বিরহ এক সহজ সত্য। তাকে সহজ ভাবেই মেনে নিতে হবে।
প্রকৃতিজগতে একবার চেয়ে দেখুন, প্রভাতে মধুর সৌরকরস্পর্শে প্রস্ফুটিত হয়েছিল যে কমল, এখন সুর্যের বিরহে সে তার নয়নপণব মুদ্রিত করছে। ঐ দেখুন চুম্বনরত চ কমিথুন। অন্ধকার আসন্ন দেখে দুঃসহ বেদনায় কাতর হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।

মিলনের আনন্দের মতাে বিরহের এ বেদনাকে সহ্য করতেই হবে। প্রকৃতি জগতে যেমন রৌদ্ৰবৃষ্টি, নিবরাত্রি ও আলাে-অন্ধকার, মানব জীবনে তেমনি এই বিরহমিলন এক অমােঘ চক্ষাবর্তনে আবর্তিত হয়ে ভারসাম্য বজায় রাখছে মানুষের মনের। বিরহ না থাকলে একমুখ। ও একদেশদর্শী হয়ে জীবনধর্ম থেকে বিচ্যুত হবে মানুষের মন।

তাছাড়া সকল বিরহই হচ্ছে মৃত্যুর এক ক্ষুদ্রতর রূপ। ধীরে ধীরে বিরহ যন্ত্রণা সহ্য করার মধ্য দিয়ে মৃত্যুজনিত অনন্ত বিচ্ছেবেদনাকে সহ্য করবার তিল তিল শক্তি সংগ্রহ করি আমরা।

না না, আমি তা কিছুতেই পারব না ইন্দুমতী। তোমার মৃত্যুশােক কোনােদিন সহ্য করতে পারব না আমি।
শুরুদ্ধ কণ্ঠে বললেন মহারাজ অজ।

কিন্তু অন্ধকারে তার মুখখানাকে ঠিক মতাে দেখতে পেলেন না ইন্দুমতী। উদগতি কন্দনে ভেঙে পড়া মহারাজ অজকে সেই ঘনায়মান অন্ধকারে একা ফেলে রেখে অন্তঃপুরে চলে গেলেন ইন্দুমতী। গিয়ে তাপসীর বেশ ধারণ করলেন।

তাপসীর বেশ কিছুমাত্র ক্ষয় হলাে না অনিন্দ্যসুন্দরী ইন্দুমতীর অসাধারণ রূপলাবণ্য। একদিন ইন্দুমতীর কণ্ঠের চন্দ্রহার তার চন্দনচর্চিত বক্ষের উপর লহরে লহয়ে গড়িয়ে পড়ে স্তনদ্বয়ের স্থুল ও সমুন্নত পার্শদেশকে শােভিত করত। এখন সে চন্দ্রহার ত্যাগ করে। সূর্যতাপবিশুদ্ধ ভ্রমরকৃষ্ণ পদ্মবীজ দিয়ে শাঁথা জপমালা পরলেন কণ্ঠে।

এর আগে অপরাহু হতেই দাসীরা গন্ধদ্রব্য দ্বারা কেশবিন্যাস করে দিত ইন্দুমতীর। আর সঙ্গে সঙ্গে ইন্দুমতী তখন লাক্ষারাগে অধরােষ্ঠ ও কুণ্কুম দিয়ে স্তনদেশ রঞ্জিত করতেন। একদিন তার যে নিতম্ব মণিময় রশনায় শােভিত ও উজ্জ্বল হয়ে থাকতাে, আজ তা মুঞ্জরচিত মেখলার কঠিন বন্ধনে পিষ্ট ও ম্লান হয়ে উঠল। একদিন যে রাজনন্দিনী ও রাজবধু ইন্দুমতী অমূল্য দুগ্ধফেননিভ শয্যায় শয়নকালে সামান্য কবরীলিত একটি ফুলের আঘাতেও ব্যথা অনুভব করতেন, আজ ভূমিতলে হীন পল্লবশয্যায় আপন ভূজলতায় মাথা রেখে শুয়ে পড়েন তিনি।

ইন্দুমতীর এই স্বেচ্ছাকৃত তপশ্চর্যায় আশ্চর্য হয়ে গেলেন রাজ-অন্তঃপুরের সকলে। কিন্তু প্রতিবাদ করার সাহস পেলেন না কেউ। সংযতবাক ও গম্ভীর ইন্দুমতী কঠিনতর গাম্ভীর্যে স্তব্ধ হয়ে উঠলেন ক্রমশঃ।

এদিকে মহারাজ অজ কিন্তু কিছুতেই মনকে শান্ত ও সংযত করতে পারলেন না ইন্দুমতীর বিরহে। নিজেকে কেন্দ্রীভূত করতে পারলেন না কোনাে কাজে। তার কাছে শুন্য ও অন্ধকার বলে মনে হলাে সমযস্ত জগতসংসার।

ইন্দুমতীর কথামত এক একজন মহিষীর কাছে একটি করে ঋতু যাপন করতে লাগলেন মহারাজ অজ। বাঞ্ছিত বল্লভসংলাভে এক অপরিসীম উল্লাসে আত্মহারা হয়ে উঠলেন মহিষীরা।

দিনের প্রথম দিকে রাজকার্য পরিচালনা করার পর কোনাে এক নির্দিষ্ট মহিষীর অন্তঃপুরে চলে যান অজ। সেখানকার কৃত্রিম জলাশয়ে ক্রেীঞ্চ ও সারস পাখি খেলা করে। প্রতিটি সুরম্য ও প্রশস্ত প্রকোষ্ঠে বারুণীসেবনে মত্ত বরনারীরা নৃত্যগীত করে প্রীত করবার চেষ্টা করে মহারাজ অজকে।

মালব রাগ যেমন বিস্বাদ জাগায় মনে, কৌশিক রাগ তেমনি অনুরাগ বৃদ্ধি করে। তাই তারা কৌশিক রাগে গান করে। মধুর অথচ নিলাজ চটুল নর্তনে ফেটে পড়ে।

মহারাজ অজ কিন্তু মালব রাগ গাইবার আদেশ দেন তাদের। যে বিষাদ প্রিয়জনের বিরহ বেদনাকে সযত্নে লালিত করে। ললিত করুন মালব রাগের প্রতিটি সুরমূর্ধনায় মূর্ত হয়ে ওঠে সে বিষাদ। তাই মালব রাগ শুনতে ভাল লাগে তার।

এভাবে আর বেশিদিন কাটাতে পারলেন না অজ। ইন্দুমতীর বিরহ ক্রমে অসহনীয় হয়ে উঠল তাঁর কাছে। তাই তিনি স্থির করলেন অমাত্যদের হাতে রাজাভার অর্পণ করে মৃগয়া উপলক্ষে দুর বনে গিয়ে কাটিয়ে দেবেন বৎসরের বাকি দিনগুলাে।
কিন্তু তার আগে ইন্দুমতীর সঙ্গে একবার দেখা করার প্রয়ােজন বােধ করলেন।

দৌত্যকার্যে সুপটু কোনাে দাসীর হাতে মনের কথা জানিয়ে একখানি লিপি পাঠালেন অজ। তারপর ইন্দুমতীর অন্তঃপুরের ঘরদেশে প্রতীক্ষা করতে লাগলেন।

কিছুক্ষণ পর দার্সী ফিরে এসে ইন্দুমতীর উত্তর-সম্বলিত এক প্রতিলিপি দান করল তার হাতে।
হতাশ হয়ে বসে পড়লেন মহারাজ অজ। ইন্দুমতী জানিয়েছেন, সংকীর্ণ প্রেমাসক্তি হতে যে কর্তব্যবােধকে বড় করে তুলে ধরবার জন্য তার প্রতি এই নিষ্ঠুর আদেশ দান করেছিলেন, সেই কর্তব্যে ফাকি দিয়ে মহারাজ হীন প্রেমমােহের কাছেই আত্মসমর্পণ করলেন। মিথ্যা ও সংকীণ প্রেমাসক্তি হতে প্রকৃত প্রেম কত বড়, কত মহৎ তা বােঝাতে চেয়েছিলেন তিনি। প্রেমের এই মহত্ত্বর উপলব্ধির জন্যই কাছাকাছি থেকেও অনেক দূরে সরে যেতে বলেছিলেন তিনি মহারাজকে৷ কিন্তু অজ দূরে চলে যাচ্ছেন শুধু ইন্দুমতীর অনেক কাছে সরে আসবার জন্য।

ইন্দুমতী লিখেছেন আমার সমস্ত উদ্দেশ্যকে আপনি ব্যর্থ করে দিলেন মহারাজ। আমার ব্রত সাধনার সমস্ত একাগ্রতা, আমার তপস্যার সম তিতিক্ষার কোনাে সুইহি রইল না আর। যদিও আপনি মৃগয়ার নামে বনে যাচ্ছেন তথাপি আপনার মন অনুক্ষণ আমার কাছেই পড়ে থাকবে। সেখানে গিয়ে সব কিছুর মধ্যে কেবলি আমাকেই দেখবেন, কেবলি আমার কথা ভাববেন। এমনি করে বিশ্বজগতের মাটি ও মানুষের সকল সম্পর্ক হতে নিজেকে নির্মমভাবে ছিনিয়ে নিয়ে আমার চিন্তার মধ্যে সমস্ত প্রাণ মনকে কেন্দ্রীভূত করে এতখানি ছােট করে তুলবেন আপনি নিজেকে, এ আমি কল্পনাতেও আনতে পারি নি। একথা ভাবতে গিয়ে লজ্জায় ও দুঃখে ম্রিয়মাণ হয়ে পড়ি মহারাজ।

একটি বছরের মধ্যে মাত্র আর ছয় মাস বাকি আছে। এই ছয় মাসের বিরহ যদি সহ্য করতে
পারেন, তাহলে আমার মৃত্যু হলে আমার অনন্ত বিরহকে কেমন করে সহ্য করবেন মহারাজ। আপনার প্রেমে পরিমাণগত বিশালতা ও গভীরতা আছে, একথা মুক্ত কণ্ঠে স্বীকার করি । কিন্তু তাতে গুণগত মহত্ত্ব নেই এক বিন্দু, একথা ভেবে দুঃখ অনুভব করি।

একান্তই যদি রাজপ্রাসাদে থাকতে না পারেন তাহলে যেখানে ইচ্ছা যেতে পারেন এই ক মাসের জন্য। কিন্তু যারই হাতে রাজাভার দিয়ে যান, রাজকার্যে এতটুকু যদি ক্রটি খটে কোনােদিন তাহলে আপনাকে আমি ক্ষমা করতে পারব না।

আরও একটা কথা। ইন্দুমতী লিপিখানি শেষ করতে গিয়ে পরিশেষে লিখেছেন, বনে গিয়ে আমাকে চারিদিকে বনপ্রকৃতির সঙ্গে এক করে দেবেন। তাহলে কোনাে অশান্তিই থাকবে না। অরণ্যের ছায়াঘন স্নিগ্ধতায় বনস্পতির সবুজ বিস্তারে ও বিটপীলতার মৌন কমনীয়তার সঙ্গে আমার রূপগুণকে
যুক্ত করে এ আমাকে বড় করে দেবেন। কিন্তু তা না করে চারিদিকে প্রকৃতি থেকে আমাকে ও আমার প্রেমকে যদি পৃথক করে দেখেন, তাহলে আপনি এবং আমি দুজনেই ছোট হয়ে যাব। আমাকে আপনি যত খুশি ভালবাসতে পারেন, কিন্তু তাই বলে আমাকে এমনভাবে খণ্ড করে ও ছোট করে দেখার কোনাে অধিকার নেই আপনার। আমার বিনীত প্রার্থনা আমাকে যেন কোনােক্রমেই ভুল বুঝবেন না।

লিপিখানি পাঠ করে দাসীকে কাতরকণ্ঠে মিনতি জানালেন অজ, একবার কি এখন দেখা হবে না তার সঙ্গে।

মাথা নত করে সসম্রমে উত্তর করল দাসী, এখন সায়ংকাল উপস্থিত। দিবারাত্রির এই সন্ধিক্ষণে শান্ত ও সমাহিত অবস্থায় পদ্মাসনে বসে সন্ধ্যাক্কি করেন মহারাণী। দেখা করে কোনাে ফল হবে না মহারাজ।

দাসীর কথা শেষ হতেই ক্ষোভে ও রাগে সহসা গর্জন করে উঠলেন মহারাজ অজ। সন্ধ্যার ঘন অন্ধকারে চোখ দুটো আগুনের মতো জলজল করতে লাগলাে তার।

গম্ভীর গর্জনে চীৎকার করে বললেন অজ, তোমার রাণীমাকে বলো, তার সঙ্গে আমার আর কোনােদিন দেখা হবে না। হয় আমি মৃগয়া থেকে আর ফিরব না, না হয়তো ফিরলেও তার সঙ্গে দেখা করব না। তার এই ধৃষ্টতাকে কোনােদিন ক্ষমা করব না আমি।

দুটি অঙ্গুল নিয়ে দুটি কর্ণকুহর চেপে ধরল দাসী।

অজ বললেন, আরাে বলবে তার এই সব জপ তপ, ব্রত ও ব্রহ্মচর্যে বিস করি না আমি। তার ভণ্ডামি আমি এখন বুঝতে পেরেছি। আসলে আমাকে কোনাে কারণে বরমাল্য দান করলেও মন দিয়ে রেখেছে অন্য কোনাে পুরুষকে। আজ আমি তার কাছে অবাঞ্ছিত। আজ তার এই তাপসীর বেশধারণ অবাঞ্ছিতকে এড়াবার এক হীন অপকৌশলেরই নামান্তর। তার এই তপশ্চারণা আমার প্রতি এক ঘৃণ্য প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়।

সভয়ে চীৎকার করে উঠল দাসী, একথা কানে শােনাও মহাপাপ মহারাজ।

পরদিন সকাল হতেই রথ প্রস্তুত করবার আদেশ দিলেন অজ।

বাইরে ঘােষণা করলেন দুর বনে মৃগয়া করতে যাচ্ছেন। কিন্তু কোথায় কোন বনে কতদিনের জন্য, সে কথা কেউ জানল না। তিনি নিজেও জানেন না তা। যে প্রেম মানুষকে ঘরে বাধে, সেই প্রেম অনির্দিষ্ট অন্তহীন পথে ঠেলে দিয়েছে তাকে। জীবনে কোনাে আগ্রহই নেই তার।

ক্রোধে অন্ধ হয়ে গিয়ে ইন্দুমতীর চরিত্রে সন্দেহ প্রকাশ করছেন তিনি। ইন্দুমতী কোনােদিন ক্ষমা করবেন না তাকে। ইন্দুমতীর প্রেমকে হারিয়ে কিছুতেই বাচতে পারবেন না তিনি।

বনে গিয়ে কিন্তু মনের মধ্যে এক অদ্ভুত পরিবর্তন অনুভব করলেন মহারাজ অজ। যা ভয় করেছিলেন তা আর হলাে না।

নর্মদা নদীর তীরে ঘা বনে বহু কৃষ্ণসার মৃগ পাওয়া যায়। কিন্তু নিজের হাতে একটি মৃগ শিকার করলেন না অজ। কেবল আপন মনে ঘুরে বেড়িয়ে প্রকৃতির শােভা দেখতে লাগলেন চারিদিকে।

সেখান থেকে মলয়পর্বরে নিম্নদেশে চন্দন ও লবঙ্গ বনতলে কিছুকাল বাস করলেন অজ। দিনে দিনে ইন্দুমতীকে অনেকটা ভুলে গেলেন। চারিদিকের নিসর্গসৌন্দর্যের সুনিবিড় সংস্পর্শে মনের পরিধিটা যতই প্রসারিত হতে লাগল, ইন্দুমতীর স্মৃতিটা ক্ষীণ হতে ক্ষীণতর হয়ে উঠতে লাগল তত। বিরাট বিশ্বপ্রকৃতির সৌন্দর্যেপলব্ধির অপরিমেয় গভীরতায় বিলীন হয়ে যেতে লাগল সমস্ত বিরহ বেদনা।

অজ দেখলেন, প্রকৃতির প্রতিটি বস্ত স্বাধীন ও স্বয়ংসিদ্ধ। কারোরই জীবনের আনন্দ কোনাে বস্তুর উপর নির্ভর করছে না। ধজুশীর্ষ প্রতিটি বনম্পতি তার শাশ্ববল্লরী আন্দোলিত কার বনমর্মরে গান করছে মনের আনন্দে। উক্ত পর্বতশৃঙ্গ অটল অনমনীয় গাম্ভির্যে নিয়ত মাথা উচু করে দাঁড়িয়ে আছে। শুভ্র ফেনপুঞ্জ বিহসিত সমুদ্র আপন সত্তার স্বাধীনতা ঘােষণা করছে। নিপুণা নটির মতাে শিঞ্জিত নুরে আপন মনে নেচে চলেছে প্রতিটি নদী। কোনাে মধুরের অপেক্ষা না করেই প্রতিটি প্রস্ফুটিত ফুল হাসছে।

এরা কেউ কারাে পথ চেয়ে বসে নেই। তিনি আর ইন্দুমতীর কথা ভাববেন না। জীবনে বাঁচার আনন্দের জন্য ইন্দুমতীর উপর নির্ভর করবেন না। আর একটা জিনিস উপলব্ধি করলেন অজ। প্রেম জীবনকে পূর্ণতা দান করে একথা সত্য। কিন্তু জীবন প্রেম হতে অনেক বড়। সৌন্দর্য ও প্রেমের আস্বাদনের দ্বারা আমরা জীনেকেই নুতনরূপে সম্ভোগ করি। কিন্তু প্রেম ও সৌন্দর্য সব কিছুর থেকে বড় হচ্ছে জীবন!

জ্যোৎতাবিধৌত চন্দন বনে যখন মলয় বাতাস খেলা করতে থাকে, ওদিকে বায়ুতাড়িত লবঙ্গ গাছ হতে কেশর ঝরে পড়ে, তখন অজের মনে হয় তিনি যেন জ্যোৎস্নার মতোই পৃথিবীব্যাপী এক বিরাট বিমল হাসিতে ফেটে পড়েন। তখন ভাবতে থাকেন, সৌন্দর্য শুধু মানুষের দেহেই নেই, প্রেম শুধু মানুষের মনে নেই। বিশ্ব প্রকৃতির যে-কোনাে বস্তুর মধ্যেই সৌন্দর্য আছে। যে-কোনাে বস্তুকেই মানুষ ভালবাসতে পারে।

ফিরবার পথে বহু গ্রাম ও জনপন পেলেন অজ। গ্রামবাসীরা কত দরিদ্র । কিন্তু সরল অনাড়ম্বর তাদের জীবন সমস্ত রকমের জটিল চেতনা হতে মুক্ত। কাছে যা কিছু ছিল সর্বস্ব দান করলেন অজ।

এর আগে রাজসভায় বসেও বহু দরিদ্রকে অনেক কিছু দান করেছেন অজ। কিন্তু সে দানের মধ্যে দয়ার ছদ্যবেশে এক মানসিক ভাববিলাস ছিল লুকিয়ে ; সত্যিকারের কোনাে সমবেদনার লেশমাত্র ছিল না। সম্পূর্ণরুপে নিঃস্বার্থভাবে জনজীবনের সুখ-দুঃখের সঙ্গে নিজেকে এমন নিবিড়ভাবে যুক্ত করে দেবার কোনাে সকরুণ প্রবণতা ছিল না সে দানের মধ্যে।
আজ সত্যি সত্যিই জীবন ও জগৎকে নতুনরূপে দেখতে শিখলেন অজ।

আজ প্রশান্ত আত্মোপলব্ধির সুগভীর স্বচ্ছতায় জীবনের যে সমরূপ দেখতে পেলেন অজ তার কাছে নিজেকে অত্যন্ত ছোট মনে হলাে তার। তার মনে হলাে, জীবনের এই অখণ্ড ও মন্ডলাকার রূপের কথা ভুলে গিয়ে তার শুধু একটা খন্ড অংশকেই সত্য বলে আঁকড়ে ধরতে গিয়েছিলেন তিনি।

ইন্দুমতীর কথা একেবারে ভুলেই গিয়েছিলেন অজ। কখন বসন্ত এসে দিকে দিকে ফেটে পড়েছে কিংশুক ও কৃষ্ণচূড়ার উচ্ছ্বসিত হাসিতে, মলময়ী আশ্র-মুকুলের গন্ধে আর নবােদ্ভিন্ন আরক্ত পল্লবনিয়ে, সেদিকে এতদিন কোনাে খেয়ালই করেননি।

সত্যই কিন্তু আশ্চর্য হয়ে গেলেন মহারাজ। রাজপ্রাসাদের তােরণদ্বারে তাকে বরণ করে নেবার জন্য নিজে দাঁড়িয়ে থাকবেন ইন্দুমতী একথা তিনি স্বপ্নেও ভাবতে পানেনি। ভাবতেই পারেননি এতদিনের বিরহ বেদনার মত কিছু সন্তাপ এই স্বয়ংগ্রহাশ্লেষ সুখের স্নিগ্ধ সমাগমে বিলীন হয়ে যাবে নিঃশেষে।

দেহে মনে কোথাও এতটুকু উচ্ছলতা নেই মহারাজ অজের। প্রশান্তগস্ত্রীর মুখমণ্ডলে স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে সমাহিত সংযত চিত্তের ভাবাবস্থা।

উত্তম বস্ত্রালংকারে ভূষিতা ইন্দুমতী বললেন, আমার ব্রতসাধনা এতনিনে সার্থক হয়েছে মহারাজ।

অজ বললেন, আজ আমি নিজের ভুল বুঝতে পেড়েছি। তুমি আমায় ক্ষমা কর ইন্দুমতী। তােমাকে তখন বুঝতে পারিনি; তোমার প্রেম সত্যিই মহৎ। তোমার সেই মহৎ প্রেমের স্পর্শে আমি আমার আত্মাকে উপলব্ধি করতে পেরেছি, আর সেই আত্মাপলব্ধির আলােকে দেখতে পেয়েছি জীবনের প্রকৃত রূপ।
সঙ্গে করে স্বামীকে তার অন্তপুরে নিয়ে গেলেন ইন্দুমতী।

অজ বললেন, যে প্রেম বিরহের দ্বারা প্রতিহত হয় না এমনি করে, সংযমের দ্বারা শাসিত হয় না, সে প্রকৃত প্রেম নয়।

অপরাহ্নের দিকে একটি বছর পর প্রাসাদ উদ্যানের সেই সরােবরের সােপানশ্রেণীতে গিয়ে বসলেন দুজনে। দীর্ঘদিন পর বিধিনিষেধের সমস্ত অলি আজ মুক্ত, সংযমেযর সমস্তু বাধ আজ অপসারিত। আজকের এই দিনটি বড় মধুর বলে মনে হলাে দুজনের কাছে।

এক নিবিড়তম মিলনােহ্বাসে কথায় কথায় হাসিতে ফেটে পড়তে লাগলেন দুজনে। ইন্দুমতীর কী একটি কথায় সােনার শতদল নিয়ে অজ তাকে মৃদু প্রহার করলেন ও তার দেহকে বাহুপাশে আবদ্ধ করে এক নিষ্ঠুর চুম্বনের দ্বারা পিষ্ট করে নিলেন তার অধরােষ্ঠকে।

ইন্দুমতী চটে গিয়ে ঝাপিয়ে পড়লেন সরােবরের জলে। অজও তাকে ধরবার জন্য জলে ঝাপ দিলেন। তাদের উচ্ছল কলহাসিতে রোমাঞ্চিত হয়ে উঠল ক্রৌঞ্চমুখরিত পদ্মপরাগগন্ধী সরোবরে জলায়িত জলরাশি। জলকেলির পর উঠে দুজনেই কল্পতরুপ্রসূত রক্তাক্ত সুরা পান করলেন।

সুরাপানে দেহে মনে বিকার দেখা দিতে লাগল প্রথমে ইন্দুমতীর। ক্রমে অঙ্গ যখন অবশ হয়ে উঠল, ঘুর্নিত হতে লাগল তার নেত্র, বিজড়িত হয়ে এল বাকস্ফুরণ, অজ তখন শিথিল ইন্দুমতীকে ধরে মণিময় প্রস্তরনির্মিত রতিমন্দিরে প্রবেশ করলেন। শরতের শুভ্র মেঘশয়ায় চন্দ্র যেমন রােহিণীকে নিয়ে শয়ন করেন, তেমনি স্বর্ণপলঙ্কের উপর সুদৃশ্য দুর্গনেনি শয্যায় ইন্দুমতীর পাশে শয়ন করলেন অজ।

দশ মাস দশ দিন পর একটি পুত্রসন্তান প্রসব করলেন ইন্দুমতী। অজ তার নাম রাখলেন দশরথ। বিপুল আনন্দে নৃত্যগীতসহকারে এই রাজতনয়ের জনমহােৎসব পালন করল রাজ্যের প্রজারা। বাদ্যমান দুন্দুভির সঙ্গে মিশ্রিত হলাে গভীর শনি, স্বলংঘন্ত্রের সঙ্গে সুমধুর বীণানি। সন্তানক কুসুমের মালা দ্বারা শােভিত হলাে স্বর্ণতােরণ। পুত্রগর্বে গরবিনী ইন্দুমতী মদির এক্ষণায় উপেক্ষা করতে লাগলেন মহারাজ অজকে।

মহারাজ অজ ভাবলেন, দিনে দিনে ইন্দুমতী যেন দূরে সরে যাচ্ছেন তার কাছ হতে। আজ তার জীবনে সন্তানই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড়। যৌবনবতী সুন্দরী ইন্দুমতীর মদমত্ত রক্তের সমস্ত রঞ্জীন উচ্ছাস তার স্তনদ্বয়ের মাতৃদুগ্ধের মধ্যে লাভ করেছে যেন এক শুচি-শুভ্র প্রগাঢ়তা।

ইন্দুমতী বললেন, আমাদের নিবিড়তম মিলনমুহুর্তের চরমতম তৃপ্তি এক দুর্লভ রক্তপত্র হয়ে ফুটে উঠেছে এই সন্তানের মধ্যে। এই সন্তান হচ্ছে আমাদের মিলিত সত্ত্বা। এর জীবনপদ্ম আপনার কাছ থেকে সংগ্রহ করেছে প্রনালীর বীজ, আমার রক্তমাংস হতে নিয়েছে দেহের জৈবিক ধাতু। এর মধ্যে দিয়ে আপনি আমাকে পাবেন নুতন রুপে। নূতন রূপে আমি পাব আপনাকে।

এমনি করে দেখতে দেখতে একটি বছর কেটে গেল। কখনাে খলিত কম্পিতলীলাগতি দ্বারা, কখনাে নির্মল হাস্যছটায়, কখনাে বা অর্থশূন্য অসং শব্দদূরণে পিতামাতাকে প্রীত করতে লাগলেন সেই শিশু।

একদিন জ্যোৎলােকিত একটি বসন্ত সন্ধ্যায় প্রাসাদ উদ্যানে বসে থাকতে থাকতে অজ ও ইন্দুমতী দুজনেই কামবিমােহিত হয়ে উঠলেন সহসা। পূর্ণচন্দ্র প্রতিবিম্বিত মারুহিন্দোলবিকশিত পাপরাগগন্ধী সেই সরােবরের জলে দুজনেই গিয়ে ঝাপিয়ে পড়ে মরালদম্পতির মতাে কেলি করতে লাগলেন একমনে।

সেই মুহুর্তে সূর্যসমপ্রত দেবর্ষি নারদ দক্ষিণ সমুদ্রের বেলাতটবর্তী কোনাে এক স্থানে দেবাদিদেব মহাদেবকে বীনাপুসংযোগে আরাধনা করবার জন্য সেই সরোবরের উপর দিয়ে আকাশপথে গমন করছিলেন। সেই বীণার শীর্ষদেশে ছিল স্বর্গীয় পারিজাত কুসুমপ্রথিত এছাড়া সুরভি মালা। সহসা মধুগন্ধা সেই দিব্যমালিকা বায়ুভরে স্থানচ্যুত হয়ে উড়ে এসে পড়ল জলকেলিরতা ইন্দুমতীর বিশাল স্তনাগ্রভাগে। নিমেষের মধ্যে ব্রাহগ্রস্থ চন্দ্রের মতাে অসার ও মলিন হয়ে পড়লেন ইন্দুমতী। আশ্চর্য বিকার দেখা গেল তার দেহে।

এদিকে ইন্দুমতীর এই অকিস্মিক ভাবান্তর বিস্মিত হয়ে মহারাজ আর তার কাছে গেলেন। ইন্দুমতীর অঙ্গ তখন অবশ হয়ে উঠেছে। হাতের মুঠোয় সেই মালাটি কোনোরকমে ধরে বললেন, নারদঋষির বীণাচ্যুত এই পারিজাত মালা। অশুচি অবস্থায় কোনাে মানুষ স্পর্শ করলেই তার মৃত্যু ঘটবে। আমি স্বর্গে চলে যাচ্ছি। আমার সময় হয়েছে। আপনি এখন রাজকার্য পরিচালনা করুন। জীবনাবসানের পর স্বর্গে মিলিত হবাে আমরা।

করুণ কান্নায় ভেঙে পড়লেন অজ। ইন্দুমতীর দেহের উপর আছাড় খেয়ে পড়ে তার শিথিল হাতের মুঠো হতে মালাছড়াটি কেড়ে নিয়ে নিজের কণ্ঠে পরলেন অজ। নীরবে অজকে বুকে টেনে নিলেন ইন্দুমতী। খবর পেয়ে মহামুনি বশিষ্ঠ ছুটে এলেন। মৃত্যুঞ্জয়ী প্রেমের স্মরণীয় দুটি প্রতিমূর্তিরূপী আলিঙ্গনাবদ্ধ সেই রাজদম্পতিকে দেখে অশ্রুরােধ করতে পারলেন না বশিষ্ঠ।

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *