লীলারহস্য – চিত্ররঞ্জন মাইতি

›› পৌরাণিক কাহিনী  ›› সম্পুর্ণ গল্প  

নীলাঞ্জন ঘন মেঘে সংবৃত হয়ে আছে পূর্ব দিগন্ত। সহসা আর্দ্র বাতাসে ভেসে এল সিক্ত যুথির গন্ধ।

দিগন্তের দিকে স্বপ্নভরা দুটি চোখ মেলে চেয়েছিল এক আশ্রমকন্যা। বয়ে এল একঝলক দুরন্ত হাওয়া। কন্যার কপাল ছেয়ে গেল চুর্ণ কুন্তলে। দু’বাহু তুলে চাপার কলির মতাে আঙুল চালিয়ে সে সরাতে লাগল তার অবিন্যস্ত কেশগুচ্ছ।

অদুরে বয়ে চলেছে বঙ্কিমগতিতে আশ্রম-তটিনী। সেই শীর্ণ স্রোতস্বিনীর কুলে আশ্রম। সীমানার কেতকীবীথি। কেতকীর সুরভিত পরাগও উড়ে আসছিল হাওয়ায়।

আশ্রমের ছায়াতরুর তলায় বাঁধানাে বেদির ওপর বিচিত্র কলাপ বিস্তার করে দাড়িয়ে ছিল আশ্রম-বলিভূক্ কেকা। অপরূপ নৃত্য ভঙ্গিমায় তরঙ্গিত হচ্ছিল তার পেখম।

সহসা মেঘলােকে শােনা গেল ডমরুর ধ্বনি। অশ্বের গতিতে বয়ে আসছিল উন্মাদ পবন। মেঘে মেঘে অশ্ববাহিত রথচক্রের ঘর্ঘরধ্বনি। উড় ওরেখায় ক্ষণে ক্ষণে ঝলসে উঠছিল বিদ্যুৎ পতাকা।

অষ্টাদশী আশ্রমকন্যার কানে কানে কে যেন বলে গেল—সে আসে, সে আসে।

বর্ষার ধারাপাতের সঙ্গে সঙ্গে শােনা গেল তার চরণধ্বনি। ফিরে দাঁড়াল আশ্রমকন্যাটি। বিস্ময়ে হতবাক সে। কে এই কান্তিমান সুদর্শন তরুণ, অনাবৃত উর্ধ অঙ্গ। বক্ষলগ্ন শুভ্র উপবীত। ঠিক যেন আশ্রম-প্রান্তরে প্রবাহিত শুভ্র জলধারাটির মতাে। | মাথা-ভরা কুঞ্চিত কৃষ্ণ কেশদাম। দিগন্ত পারের ঘনকৃষ্ণ মেঘের জটাজালের মতাে। চাহনিতে বিদ্যুতের দীপ্তি, কিন্তু দাহ নেই সে দীপ্তিতে। সমস্ত অবয়বে সজল বর্যার স্নিগ্ধ স্পর্শ। বিস্ময়মিশ্রিত অর্ধস্ফুটস্বরে আশ্রমকন্যা জানতে চাইল আগন্তুকের পরিচয়। আমি এক বিদ্যার্থী। শুরু শুক্রাচার্যের পদপ্রান্তে বসে বিদ্যাশিক্ষা করার অভিলাষ। আবার প্রশ্ন, নিবাস? দেবলােক। সহসা বেড়ে গেল বৃষ্টির বেগ। আশ্ৰমকন্যা ‘আগন্তুককে বৃষ্টির হাত থেকে রক্ষা করার জন্য বলে উঠল, আমাকে দ্রুতপায়ে অনুসরণ করুন। প্রথমেই পড়ল অতিথিনিবাসের পর্ণকুটির। আপনি এখানে অপেক্ষা করুন, আমি অচিরে পিতার কাছ থেকে আপনার আশ্রয়ের অনুমতি প্রার্থনা করে আসছি।

অতিথিশালায় তরুণ তাপসকে রেখে পিতার কাছে ছুটে চলে গেল আশ্রমকন্যা দেবযানী। হন্তে ধৃত মৃতপূর্ণ দৰি। সম্মুখে প্রজ্জ্বলিত হােমকুণ্ড। কয়েকজন আশ্রমবালক মন্ত্রোচ্চারণ করছিল। প্রলম্বিত জটাজাল দানবগুরু উগ্রতাপস শুক্রাচার্য হােমকুণ্ডে আহুতি দেবার জন্য প্রস্তুত।

পিতার কাছে গিয়ে প্রথম বর্ষায় অর্ধস্নাত দেবযানী নতজানু হয়ে বসল। শুক্রাচার্য হােমকুণ্ডে ঘৃতাহুতি দিয়ে কন্যার দিকে ফিরে তাকালেন।

কেবলমাত্র পিতার শ্রবণগােচর হয় এমন অর্ধস্ফুটস্বরে দেবযানী বলল, পিতা, আশ্রমে এক তরুণ অতিথির আগমন হয়েছে। তাকে আমি অতিথিনিবাসে অপেক্ষা করতে বলে চলে এসেছি আপনার কাছে। আপনার অনুমতি পেলে অতিথিসৎকারের সমস্ত ব্যবস্থাদি করা হবে।

শুক্রাচার্য উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন, বৃষ্টিতে অতিথি বিপর্যয়ের মধ্যে পড়তে পারেন, তুমি অচিরে গিয়ে আশ্রমনিবাসের দ্বার নবাগত অতিথির জন্য উন্মুক্ত করে দাও, আমি হােম সমাপ্ত করে অতিথির সঙ্গে মিলিত হব।

ব্রহ্মচারীদের মন্ত্রোচ্চারণ স্তিমিত হয়ে এসেছিল, দেবযানী চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা আবার প্রবল উচ্ছাসের সঙ্গে উচ্চারিত হতে লাগল।

আশ্রমকুটির থেকে পাদ্যঅর্ঘ্য নিয়ে গিয়েছিল দেবযানী নবীন অতিথির জন্য। সেখানে আশ্রমকন্যাটির দ্বারা বিশেষভাবে সংবর্ধিত হল বৃহস্পতিপুত্র তরুণ তাপস কচ।

দেবযানী আশ্রমকুটিরে ফিরে যাবার আগে বলল, আপনি এখানে বিশ্রাম করুন। হােম সমাপ্ত করে পিতা এখানেই আসবেন। তার কাছে জানাবেন আপনার মনােবাসনা।

প্রথমদিন দীর্ঘায়িত হল না পরিচয়। দেবযানী অস্তপায়ে ফিরে গেল আশ্রমকুটিরে। কিছু পরেই সমাপ্ত হল প্রভাতি হােম। মেঘের কিনার কেটে গিয়ে বেরিয়ে পড়ল সূর্যের জ্যোতিলেখা। থেমে গেল ধারাপাত। পিতাকে সঙ্গে নিয়ে অতিথিনিবাসে পুনরাবির্ভাব দেবযানীর।

উন্মুক্ত গৃহদ্বারে দুটি হাত প্রসারিত করে দেবযানীর গমনপথের দিকে চেয়ে ছিল তরুণ তাপস কচ। তারপর দৃষ্টি-সীমানা থেকে মুছে গিয়েছিল দৈত্যগুরু শুক্রাচার্যের কন্যা দেবযানী। আবার দৃষ্টির সম্মুখে ভেসে উঠল পরম রমণীয় কন্যাটি-পশ্চাতে আশ্রমগুরু শুক্রাচার্য স্বয়ং।

কয়েক পদ অগ্রসর হয়ে কচ প্রণতি নিবেদন করল দৈত্যগুরুর চরণে। কান্তিমান, বুদ্ধিদীপ্ত তরুণ বিদ্যার্থী প্রথম দর্শনেই হরণ করল গুরুর হৃদয়।

শুক্রাচার্য অতিথিনিবাসে উঠে এসে অতিথিকে সম্মুখে উপবেশন করতে বলে তার বিপরীত দিকে স্বয়ং আসন গ্রহণ করলেন।

কোথা থেকে আগমন কল্যাণীয়? তােমার পিতৃপরিচয় জানতে সবিশেষ উৎসুক আমি। করজোড়ে অত্যন্ত সুবিনীতকষ্ঠে তরুণ বলল, দেবগুরু বৃহস্পতি আমার পিতা। তার অনুমতি নিয়ে আমি আপনার কাছে এসেছি ব্রহ্মচর্যে দীক্ষা গ্রহণের জন্য। এ অধীনের নাম কচ। মহর্ষি অগিরা আমার পিতামহ। | তােমার পিতা এবং পিতামহ ঋষিকুলতিলক। তারা আমার মতাে সকল তপস্বীরই নমস্য। তুমি সেই পত্রি গৌরবান্বিত বংশে জন্মগ্রহণ করে আমার কাছে কেনই বা এসেছ ব্রহ্মচর্য দীক্ষা গ্রহণ করতে?

আমি আবাল্য আপনার শক্তির প্রতি অনুরক্ত। আপনি বিপুল শক্তিমান না হলে প্রবল পরাক্রান্ত দানবরাজ বৃষপর্ব আপনাকে গুরুরূপে বরণ করতেন না। আমার দৃষ্টিতে আপনি ঋষিশ্রেষ্ঠ। শ্রীচরণে আশ্রয় দিয়ে আমাকে দীক্ষিত করুন ব্রহ্মচর্যে।

তথাস্তু। তুমি তপােবনপ্রান্তের সাধন-কুটিরে আজ থেকে অবস্থান করবে। সেখানে শয্যা সুকোমল নয়, সেটাই ব্রহ্মচারীর উপযুক্ত বিশ্রামস্থল। প্রতিদিন প্রভাত, সন্ধ্যায় আশ্রমকুটিরে এসে তুমি হােমানুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করবে। পরে অধ্যয়নগৃহে যােগদান করবে সমস্ত ব্রহ্মচারীর সঙ্গে। তােমার আহার্যের ব্যবস্থা আশ্রম থেকেই নিষ্পন্ন হবে। এই আশ্রমের আয়তন বিশাল। এখানে যেমন ফলকর বৃক্ষ সমুদয় রয়েছে তেমনই প্রস্তুত হয়ে আছে যব-গমাদির ক্ষেত্র। আশ্রমবালকেরা যেমন তরুশাখা থেকে ফল সংগ্রহ করে তেমনই শস্যক্ষেত্রে হলকর্ষণ আর বীজবপন করে ফসল ফলায়। আমাদের উৎপাদিত ফসল এবং সংগৃহীত ফলে সমস্ত আশ্রমবাসীরই ক্ষুধার নিবৃত্তি হয়ে থাকে।

কচ বলল, ভগবান আমি সানন্দে আশ্রমের সর্বপ্রকার কর্মে নিযুক্ত থাকল। শুক্রাচার্য নবীন ব্রহ্মচারীর মাথায় হাত রেখে বললেন, তােমার মনস্কামনা পূর্ণ হােক বৎস।

সেই থেকে দৈত্যগুরু শুক্রাচার্যের আশ্রমে দেবশুরু বৃহস্পতির পুত্র কচ ব্রহ্মচারীরূপে অবস্থান করতে লাগল।

যেহেতু দেবলােক থেকে এসে তার প্রতিদ্বন্দী বৃহস্পতির পুত্র স্বেচ্ছায় তার কাছ থেকে দীক্ষাগ্রহণ করেছে সেজন্য কচ হল তার বিশেষ স্নেহের পাত্র। এক্ষেত্রে অন্যান্য ব্রহ্মচারীর থেকে কড়কে স্বতন্ত্র মর্যাদা দান করা হল।

শুক্রাচার্য দেখলেন বৃহস্পতিপুত্র সত্যই মেধাবী। বিদ্যাচর্চায় অনন্যমনা। সর্ববিষয়ে অন্যান্য ব্রহ্মচারীদের অতিক্রম করে যাবার ক্ষমতা রাখে সে।

সেই বৎসর ফলভারে অবনত হল তরুশাখা। দ্বিগুণ শস্যে পূর্ণ হল খেতগুলি। মহর্ষি ভাবলেন, এ সকল এই তরুণ ব্রহ্মচারীর শুভাগমনের ফল। অন্যদিকে নিঃশব্দ পদসঞ্চারে শুরু হল অন্য এক লীলা। বর্ষার ধারাপাতে ঘন ঘন সিক্ত হতে লাগল এক অভিসারিকার গেীরতবল্লরী। সিক্তবসনে সহসা তরুণ তাপসের সম্মুখে উপস্থিত হতে সংকোচ হল না অভিসারিকা। আশ্রমকন্যার। তার উপস্থিতি তরুশ-হৃদয়কে আলােড়িত করত, কিন্তু কখনও বাধাহীন হত না সংযমের

আলাপচারিতা ছিল উপভােগ্য। দীর্ঘক্ষণ অধ্যয়নের পর দেবযানীর আগমন বর্ষার একটি স্নিগ্ধ হাওয়া বয়ে আনত।

কচ বলত, তােমার আবির্ভাবের পূর্বে আমার কাছে বর্ষার দূত জানিয়ে যায় তােমার আগমনের বার্তা।

কৌতুহলী দেবযানী জানতে চায়, সে কী রকম?

পুব হাওয়াতে ভেসে আসে সিক্ত মল্লিকার সুবাস। তােমার কবরীর ওই মল্লিকা মালা থেকে গন্ধ হরণ করে গন্ধবহু জানিয়ে যায় তােমার আগাম উপস্থিতি। | উল্লসিত দেবযানী বলে, দেখাে দেখাে সখা, তােমার অপরূপ কথা শুনে কদম্ববন কেমন রােমাঞ্চিত হয়েছে।

সঙ্গে সঙ্গে কচ উঠে গিয়ে দু’টি পাতাসহ একটি ফুল্ল কদম্ব তুলে এনে দেবযানীর হাতে দিল। সেই কদপুষ্পটিকে বক্ষ এবং মস্তকে ছুইয়ে ফিরিয়ে দিল ব্রহ্মচারী কচের হাতে। আহত কড় বলল, অকিঞ্চিৎকর বলে কি তুমি আমায় উপহার ফিরিয়ে দিলে দেবযানী।

সঙ্গে সঙ্গে দেবযানী বলল, তােমার উপহারকে আমার হৃদয়ের স্পর্শ মাখিয়ে ফিরিয়ে নিলাম প্রিয় সখা।

অভিভূত কড় বলল, আমি কৃতার্থ হলাম দেবযানী।

অপরাহ্নের সুর্য ঘন মেঘের আড়ালে সন্ধ্যার সূচনা করে। বনদেবীর ছায়াঞ্চলে আবৃত হয়ে যায় সমস্ত দিগ্‌দেশ। দুটি ছায়ামূর্তির দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে ওঠে বর্ষার বাতাস। না-বলা কথারা হৃদয়ের মধ্যে গুঞ্জন করে ফেরে।

হঠাৎ বিদ্যুতের চমকে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে দুটি মন। নিবিড় আকাক্ষা প্রেমের দেবতা মদনের মূর্তি ধরে দুটি মিলন সমুৎসুক হৃদয়ের মাঝখানে এসে দাঁড়ায়।

মুহূর্তমাত্ৰ-পরক্ষণেই দীপ-নির্বাণ। উঠে দাঁড়ায় দেবযানী। তুমি পশ্চাতে এসাে, আমি গৃহে গিয়ে সান্ধ্য-হােমের আয়ােজন করি। সকরুণ শােনায় দেবযানীর কণ্ঠস্বর। ঝড়ে আহত কোনও বিহঙ্গ যেন উড়ে চলে গেল তার। নীড়ের আশ্রয়ে।

সন্ধ্যায় সেই অগ্নিবন্দনা আর হব্যের আহুতি।

ব্রহ্মচারী কচের কষ্ঠে মন্ত্রোচ্চারণে সময় উদাত্ত, স্বরিত আর অনুদানের উত্থান-পতন এক আশ্চর্য স্বরধ্বনি সৃষ্টি করে।

শুরু শুক্রাচার্য মনে মনে সপ্রশংস দৃষ্টিতে তাকালেন তরুণ ব্রহ্মচারীটির দিকে। কুটিরের বাতায়নে চোখ পেতে দেবযানী দেখত শুদ্ধ বসনে পরিশােভিত এক অনিন্দ্যসুন্দর তাপসকে দিব্য মহিমায়।।

তরুণীর সমস্ত অন্তরজুড়ে একটি আকাক্ষা কায়ামূর্তি ধারণ করত। সে ধীর পদসঞ্চারে সবার অলক্ষ্যে এগিয়ে যেত ওই তরুণ তাপসের দিকে। হাতে তার বকুল আর কেতকীর পাপড়িতে গাঁথা একটি সুরভিত মালা।

তাপসকে পরাতে গিয়েও সে থমকে দাঁড়াত। মনে হত, এই তরুশ সম্পূর্ণ ভিন্ন এক মানুষ। সে সেই মুহূর্তে বিশ্ব ভুলে নিজের তপস্যাতেই মগ্ন।

আহত আকাক্ষা দীর্ঘশ্বাস ফেলতে ফেলতে ফিরে আসত দেবযানীরই অন্তর্লোকে। এই সাধনার কালগুলিতে সাধককে যে লক্ষ্যভ্রষ্ট হতে নেই তা জানত দেবগুরু বৃহস্পতির পুত্র ব্রহ্মচারীশ্রেষ্ঠ কচ।

রাত্রে আহারান্তে কচ ফিরে যেত তার তপােবনপ্রান্তের বিশাম কুটিরে। আশ্রমের মূলগৃহের সন্নিকটে ছিল ব্রহ্মচারী নিবাস। তারা সদলবলে মুহূর্তকাল অপেক্ষা না করে ভােজনগৃহ থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে চলে যেত বিশ্রাম নিবাসে। বৃষ্টি তাদের যাত্রায় কোনওদিনই বিশেষ বিঘ্ন ঘটাতে পারত না। কিন্তু যেদিন প্রবল বর্ষাধারায় সিক্ত হত বনপথ, আশ্রম তরুর পত্রে পত্রে ধ্বনিত হত ধারাপতনের সংগত, তখন সবার অলক্ষ্যে ছত্রের মতাে দেবযানী এগিয়ে দিত একটি পয়পত্র একান্ত অন্তরঙ্গজনের দিকে।

কৃতার্থ হত তরুণ ব্রহ্মচারী। কৃতজ্ঞতায় পূর্ণ অন্তর নিয়ে বিদ্যুৎ চমকে পথ চিনে চিনে সে চলে যেত তার বিশ্রাম কুটিরের দিকে।

বর্ষাকাল প্রেমিকজনের কাছে যেন এক দীর্ঘশ্বাস বয়ে আনে। যাকে চাই তাকে না-পাওয়ার ধ্বনি ঘুরে ঘুরে বাজতে থাকে। দুঃসহ এক বেদনা গুমরে গুমরে উঠতে থাকে মেঘের চাপা গার্জনের মতাে। বিষাদ-বিষন্নতার ভারে ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে মন। একটি মধুর স্মৃতিকে স্বপ্নে ধারণ করে নিশিযাপন করে দেবযানী। কিন্তু সব চাওয়াই না পাওয়ার বিশ্বাদে ধুসর ছায়াময় হয়ে যায়। | কোনও কোনও রাত্রে স্বপ্নে অভিসার-যাত্রা করে ঋষিকন্যা দেবযানী। প্রিয়মিলনের উৎসুক দীপটি জ্বলতে থাকে অন্তরে। সে দীপের শিখা বিদ্যুৎ চমকে ছড়িয়ে পড়ে পথে-প্রান্তরে। উৎকণ্ঠিত অভিসারিকা অশঙ্কিতচিত্তে মেঘগর্জনকে তুচ্ছ করে, শাল, তাল, তমাল, পিয়ালের আন্দোলনকে উপেক্ষা করে অগ্রসর হয় প্রিয়তমের মিলনকুঞ্জ অভিমুখে। তর্জিত তটিনী, গর্জিত মেঘ তার গমনপথে সৃষ্টি করতে পারে না কোনও বিষ্ম।

কিন্তু হায়, কচের রুদ্ধদ্বারে এসে থেমে যায় তার সকল উদ্যম। ঘরে করাঘাত হানতে গিয়েও শিথিল হয়ে যায় অঙ্গুলিগুলি। একটা অদৃশ্য নিষেধ লক্ষ্মণরেখা টেনে স্তব্ধ করে দেয় তার গতি। অভিমান খরস্রোতা নদীর আবর্তের মতাে ঘুরতে থাকে আশাহত অন্তরের গভীরে। | ক্লান্ত, বিষয় অবসাদে তপ্তদেহ ঢলে দেয় সে শয্যায়। একসময় নিদ্রা এসে জননীর স্নেহহস্ত বুলিয়ে দেয় তার সর্বাঙ্গে। আবার দিনের সূচনা, আবার দিনার থেকে দিনান্ত পর্যন্ত কর্মচক্রের আবর্তন।

কোনও বিরহীজন বলেছে, বর্ষাঋতু প্রেমের কাল। কিন্তু এ কাল প্রেমের হলেও মিলনের নয়। এ ঋতু শুধু অশ্রুতে প্লাবিত করে দেয় প্রেমিক-প্রেমিকার অন্তর। বসন্তের মিলন-লগের জন্য প্রতীক্ষা করতে হয় দুটি মিলন-উৎকণ্ঠিত হৃদয়কে।

ডাহুকের ডাকে যে বিরহ, তার অবসান ঘটে বসন্ত কোকিলের কুহুফনিতে।

বিদীর্ণ শ্যামকান্তি বৈদুর্যমণির মতাে নবতৃণদলে আচ্ছাদিত হল আশ্রমপ্রান্তর। কখনও বা ধারাপাতকে ধারণ করল সে বিন্দু বিন্দু শিশিরকণার ছন্দিত গ্রহনে। আবার কখনও আঁকাবাঁকা জলস্রোত নবীন তৃণদলকে স্পর্শ করে ছুটে চলল কোনও নিম্নগামী নদীর অভিমুখে। এ যেন। শ্যামল সজলে হঠাৎ স্পর্শের আনন্দ-শিহরন।

একসময় বেজে উঠল শরতের সােনার বাঁশি। তাকে অভিনন্দন জানাল আন্দোলিত শুভ্র কাশগুচ্ছ। নীলকান্তমণির মতাে নীলাকাশ দিনের সূর্য এবং রাতের নক্ষত্রখচিত চন্দ্রকে প্রদীপ্ত করে তুলল। জয়ের ধ্বনি তুলে বাতাসে দুটি চিত্রিত ডানা ভাসিয়ে নীলাকাশের দিকে উড়ে চলে গেল নীলকন্ঠ পাখি।

শেফালিকা ঝরে পড়ল তরুতলে। দেখা গেল আশ্রমকন্যা দেবযানী আপনমনে শিউলিফুলের মালা গাঁথছে সঙ্গোপনে, দয়িতের কষ্ঠে পরাবে বলে।

প্রভাতী হােমের অন্তে আশ্রম সরােবরে স্নান সমাপন হল ব্রহ্মচারী কচের। সেই অবকাশে শেফালিমাল্য হাতে করে নিরালা কুটিরে উপস্থিত হয়েছিল গুরুকন্যা দেবযানী। | সপ্তপর্ণীর আড়ালে আত্মগােপন করে দাঁড়িয়ে ছিল সে কচের প্রতীক্ষায়। সিক্তবসনে অপাপবিদ্ধ কচ প্রবেশ করল তার কুটিরে। ক্ষণকাল পরে শুদ্ধ বসন পরিধান করে দেহলিতে এসে দাঁড়াল সে। সেই মুহূর্তে নীলাকাশে পাখা মেলে মানস সরােবরের দিকে ভেসে যাছিল হংসমিথুন। নির্নিমেষ সেদিকে তাকিয়ে রইল রূপীকচ। পত্রান্তরাল থেকে প্রভাত সূর্যের স্বর্ণ কিরণবিন্দু এসে পড়ল তার ললাটে। মনে হল দেবলােক থেকে শুরু বৃহস্পতি পুত্রের ললাটে একে দিলেন সর্ববিঘ্ননাশী জয়তিলক। আর ঠিক সেই মুহূর্তে ধীর পদসঞ্চারে এসে অনুরাগের সুতােয় গাঁথা শেফালিকার মালাটি দুই হাতে তুলে ধরল দেবযানী।

মুহূর্তে কচ শির নত করে গ্রহণ করল সেই শারদলক্ষ্মীর আশীর্বাদধন্য শেফালিকার মালা।

আশ্রম সন্নিকটে সৈন্য সমাবেশ করেছেন দৈত্যরাজ বৃষপর্ব। আশ্রমের বিরাট যজ্ঞস্থলিতে প্রজ্জ্বলিত অগ্নিকে ঘিরে বসে রয়েছেন রাজা ও অমাত্যবর্গ। ব্রহ্মচারীরা উচ্চৈস্বরে উচ্চারণ করছে দেবনিধন মন্ত্র। মাঝে মাঝে যজ্ঞকুণ্ডে ঘৃতাহুতি দিচ্ছেন অসুর-গুরু শুক্রাচার্য।

লেলিহান হয়ে উঠেছে অগি। লকলক করে উঠছে মহাকালের রসনা। গুরু শুক্রাচার্যের অবয়ব ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। ধধ করছে দুই নয়ন, হােমধুমে আবৃত পিঙ্গল জটাজাল। তিনি যেন মন্ত্রোচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যক্ষ করছেন দেবাসুরের সংগ্রাম।

একসময় যজ্ঞ সমাপ্ত হল। অসুররাজ বৃষপর্বার ললাটে রক্তবর্ণ তিলক এঁকে দিলেন শুরু শুক্রাচার্য। মুখে বললেন, ‘বিজয়ী ভব’।

শুরুর পদবন্দনা করলেন দৈত্যরাজ বৃষপর্ব। সমবেত অমাত্যদের জয়তিলক পরাতে লাগল ব্রহ্মচারীবৃন্দ। তপােবন প্রান্তে সৈন্যশিবিরে গিয়ে সবার ললাটে একে দেওয়া হল বিজয়চিহ্ন। এই বিজয়যাত্রা অনুষ্ঠানে অনুপস্থিত ছিল ব্রহ্মচারী কচ। অনুষ্ঠানের পূর্বদিন সায়াহ্নে কথা হচ্ছিল পিতাপুত্রীর।

দেবযানী—পিতা, আগামীকালের মঙ্গলপ্রভাতে মহাযজ্ঞে কি সমস্ত আশ্রমিকের উপস্থিত থাকা বাধ্যতামূলক?

অবশই। কিন্তু এ প্রশ্ন কেন পুত্রী?

দেবতাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে যাতে অসুরপতি বিজয়ী হন সেই অভিলাষেই তাে এই যন্ত্র। ‘তা হলে এই যজ্ঞে আপনার শিষ্য দেবগুরু বৃহস্পতিপুত্র কচের যােগদান কি সমীচীন হবে?

এ প্রশ্ন তাে আমার মনে জাগেনি পুত্রী। সমস্ত ব্রহ্মচারীর মতাে তারও এই যজ্ঞে যােগদান করার কথা।

আমার মনে হয় পিতা আপনার শিষ্যত্ব গ্রহণ করলেও সর্বান্তঃকরণে কত দেবনিধন যন্ত্রে স্পষ্টকষ্ঠে মারণ-মন্ত্র উচ্চারণ করতে পারবে না। তাতে আপনার যজ্ঞে সামান্য হলেও বিঘ্ন ঘটবে। একটি বৃহৎ জলপূর্ণ কুম্ভে যদি সামান্যতম ছিদ্র থাকে তা হলে বিশাল কুণ্ড তার জল ধরে রাখতে পারে না। তখন কুটির উপযােগিতাই নষ্ট হয়ে যায়।

যুক্তিযুক্ত তােমার বাক্য। আমি ওকে এই যজ্ঞে অংশগ্রহণ করতে নিষেধ করে দেব।

দেবযানী সঙ্গে সঙ্গে বলল, পিতা আপনি এই সামান্য বিষয় নিয়ে বিচলিত হবেন না। যতই হােক আপনি কচকে শিষ্যত্বে বরণ করেছেন, সেক্ষেত্রে ওকে বারণ করলে ও আহত হতে পারে। গুরু হিসেবেও আপনি পক্ষপাতদুষ্ট হবেন। এই পরিস্থিতিতে সমাধানের ভার আপনি আমার ওপরেই ছেড়ে দিন। তথা পুত্রী। পরদিনের যন্ত্রের জন্য ভীষণভাবে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন গুরু শুক্রাচার্য। রাত গভীর হল। আকাশে ক্ষীণ শশাঙ্ক লেখা।

লীলারহস্য/২৩৩ মােহিনী মুক্তিতে সজ্জিত হল ঋষিকন্যা দেবযানী। একসময় তাকে সােনার নুপুর উপহার দিয়েছিল অসুররাজ বৃষপর্বার কন্যা শর্মিষ্ঠা। রাজপুত্রী ছিল দেবযানীর সখী। সেইসূত্রে দেবযানীর যাতায়াত রাজপ্রাসাদে। সেখানে সখী শর্মিষ্ঠার সঙ্গে নানাধরনের কলাবিদ্যা শিক্ষা করেছিল সে। নৃত্যগীতে তার স্বাভাবিক দক্ষতা রাজগৃহেই ক্ষুপ্তি লাভ করেছিল। কিন্তু আশ্রমে সেই বিদ্যা প্রদর্শনের কোনও সুযোেগই ছিল না।

আজ দুই চরণে সেই সােনার নুপুর বেঁধে নিল দেবযানী। শারদ পুষ্পে সুশােভিত হল তার সর্বাঙ্গ।

সবার অগােচরে নিঃশব্দে সে যাত্রা করল করে বিশ্রাম নিকেতনে। শান্ত-সমাহিত পরিবেশে ছায়াতরু-বেষ্টিত বেদির ওপর পদ্মাসনে বসেছিল ধ্যানমগ্ন কচ।

বাতাসে ভেসে আসছিল কিন্নর-কণ্ঠ নিঃসৃত সংগীত। অসাধারণ সেই সুরের ইন্দ্রজাল। সাধকের চতুর্দিকে আবর্ত সৃষ্টি করছিল সেই সংগীতের মূৰ্ছনা।

ধীরে ধীরে ধ্যানভঙ্গ হল তরুণ তাপসের। তার দৃষ্টি পতিত হল বনপথের ওপর। যদিও পথ ছায়ায় সংবৃত ছিল, তবুও কচ তীক্ষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সেদিকে।

গান থেমে গেছে। এখন কানে এসে বাজল নূপূরের ধ্বনি। সাধনবেদির দিকে এগিয়ে আসছিল সেই ঝংকৃত মঞ্জীর।

কচের মনে হল যেন স্বয়ং শারদলক্ষ্মীর চরণধ্বনি সে শুনতে পাচ্ছে।

ক্ষীণ চন্দ্র তারকার অস্পষ্ট আলােকে তার সামনে এসে যে পাড়াল তাকে চিনে নিতে কোনও অসুবিধা হল না ব্রহ্মচারী কচের। | তার প্রশ্নে জড়ানাে ছিল বিস্ময়—এমন নিশীথ অভিসারিকার ভূমিকায় তােমাকে দেখতে পাব তা ভাবতে পারিনি দেবযানী।

প্রিয়জনের কাছে প্রতিটি আগমনই অভিসার—তাই না কচ? কিন্তু এই নিশীথ অভিসারই আমার কাছে বিস্ময়ের বিষয় হয়ে উঠেছে আচার্যপুত্রী।

দেবযানী বলল, আমি তােমার গুরুকন্যা ঠিক কিন্তু তার চেয়েও বড় একটা পরিচয় আমার আছে—আমি তােমার সখী, একান্ত প্রিয়সুখভাগিনী।।

এই বেদির ওপর উপবেশন করে দেবযানী, মনে হচ্ছে আজ আমার উৎসবের রাত। কচের অদূরে প্রস্তর বেদির একপ্রান্তে উপবেশন করল দেবযানী। কাল প্রভাতেই যজ্ঞ, একথা আশা করি তুমি বিস্মৃত হওনি। সপ্রতিভ কচ বলল, অবশ্যই তা আমার স্মরণে আছে।

সে কারণেই এমন রাত্রির অবগুণ্ঠনে নিজেকে আবৃত করে তােমার কাছে এসেছি । তােমাকে চিন্তামুক্ত তে।।

বিস্মিত কচ বলল, আমাকে চিন্তামুক্ত করতে! তুমি কি আমার চিন্তার কারণ জানাে? অনুমান করতে পারি। তুমি কি আগামীকালের যন্ত্রের কথা চিন্তা ছিলে? আশ্চর্য তােমার অনুমান! দেবযানী বলল, স্বজন-নিধন যজ্ঞে কোনও বিবেকবান পুরুষই বা আহতি দিতে পারে কচ। বিষন্নকণ্ঠে ক বলল, সেটাই আমাকে বিষাদগ্রস্ত আর চিন্তিত করে রেখেছে। চিন্তা আমার স্বজনের জন্য, আর বিষাদ—শুরুর এই যজ্ঞে আমার যােগ দেওয়া হবে না বলে।

পিতা তােমাকে এ বিষয়ে কিছু বলেছেন? গুরু আমাকে যঞ্জে যযাগদানের ব্যাপারে কোনও রকম আদেশ করেননি। দেবযানী বলল, তা হলে আর তােমার ভাবনা কী—তুমি তাে নিষ্কৃতিই পেয়ে গেছ।

ওখানেই আমার দ্বিধা-দ্বন্দ্ব দেবযানী। গুরু যদি যজ্ঞে অংশগ্রহণের জন্য আদেশ করতেন তা হলে আমি গুরুবাক্য শিরােধার্য করে অবশ্যই যজ্ঞস্থলে উপস্থিত হতাম। কিন্তু তিনি এ বিষয়ে নির্বাক থেকে সমস্ত বিচারের ভার আমার ওপরই ছেড়ে দিয়েছেন। এ আমার এক পরীক্ষা দেবযানী। এতক্ষণ ধ্যানস্থ হয়ে আমি সেই সমস্যারই সমাধানের পথ খুঁজছিলাম। তােমার আকস্মিক উপস্থিতি আমাকে অনেকখানি আশ্বস্ত করেছে।

আমার ওপর সামান্যতম নির্ভরতার জন্য আমি নিজেকে বিশেষভাবে গর্বিত মনে করছি প্রিয় বন্ধু।

কচ এবার মুক্তকণ্ঠে বলল, তােমার সমাধান-সূত্রই আমি সম্পূর্ণরূপে মেনে নেব দেবযানী। নিদ্বিধায় আমি বলতে পারি, তােমার স্থানে আমি থাকলে কোনও ভাবেই যজ্ঞে যােগ দেবার কথা ভাবতাম না। আমার শিষ্যত্ব হারাতে হলেও নয়। আমি এতক্ষণে চিন্তামুক্ত হলাম প্রিয়সখী। তবে একটা সংশয় আমার থেকে যাবে। কী সে সংশয় প্রিয়সখা?

শুরু এজন্য আমার ওপর কোনও রকম দোষারােপ না করলেও আমার সতীর্থরা আমাকে সন্দেহের চোখে দেখবে। | দেবযানী বলল, প্রথম থেকেই দৈত্যসন্তানেরা তােমার ওপর প্রসন্ন নয়। তাদের তীব্র সন্দেহের অগ্নিদহের ভেতর দিয়ে তােমাকে সম্পন্ন করতে হবে তােমার ব্রত। পিতার প্রসন্নতার বিষয়টা আমার ওপর ছেড়ে দাও।

সামান্য সময় নীরব রইল দু’জনে। একসময় গাত্রোখান করল দেবযানী। মৃদুহাস্য সহকারে বলল, আজ এখানেই সমাপ্ত হােক নিশাভিসার। | কচ বেদির নীচে নেমে বলল, চলাে বরবর্ণিনী, কিছু পথ তােমাকে সঙ্গদান করে নিজে ধন্য। হই।

ক্রমে আশ্রমকুটিরগুলি দৃষ্টিপথে স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। ক থমকে দাড়াল।

দেবযানী তার দিকে ফিরে বলল, তােমার সাহস এতদূর নিয়ে এসে এখানেই তােমার জন্য লক্ষ্মণরেখা টেনে দিল কচ।

কচ বলল, আমার স্পর্ধাকে তুমি আর প্রশ্রয় দেবে না আশা করি।

দেবযানী কুটিরের অভিমুখে বাম চরণ উত্তোলন করে বলল, এই প্রথম নিশাভিসার আমার কাছে স্মরণীয় হয়ে রইল সখা। আশা করি এই অভিসারের লগ্ন আগামী যামিনীগুলিতে দীর্ঘায়িত হবে।

আর তাই হবে আমার পরমতৃপ্তি, বলল কচ। এবার উভয়েই বিপরীতমুখে দ্রুত পদসঞ্চারে অন্তর্হিত হল।

শেষ প্রহরের বেশ কিছু আগে পিতার কুটিরে এল দেবযানী। ভেজানাে দ্বারের বাইরে দাঁড়িয়ে মৃদু ঘন্টাধ্বনি করল। শয্যাত্যাগ করলেন দৈত্যগুরু। তার জাগরণের ভার ছিল কন্যার ওপরেই সমর্পিত।

দ্বার উন্মােচিত হল। পূর্বাকাশে ঝলমল করছিল স্নিগ্ধ শুকতারা। বয়ে আসছিল শরতের শীতল উপভােগ্য প্রভাত সমীরণ।

যজ্ঞস্থলিতে শিষ্যদের কলরব শােনা যাচ্ছিল। যজ্ঞক্ষেত্ৰ পরিমার্জনা করছিল তারা। মিলিত সম্মানী সঞ্চালনের শব্দ ভেসে আসছিল। পিতার প্রভাতি আচমনাদির ব্যবস্থা করে দিল প্রিয়কন্যা দেবযানী। আজ মহাযজ্ঞ। নীরব গাম্ভীর্যে শুরু করে যাচ্ছিলেন তার কৃত্যগুলি। পিতাকে নানাভাবে সাহায্য করে যজ্ঞস্থলির উদ্দেশে যাত্রার জন্য প্রস্তুত করে দিল দেবযানী। তপােবনের তরুশাখায় বিহঙ্গের কলধ্বনিতে সূচনা হল অরুণােদয়ের পূর্বমুহূর্ত।

মহাযজ্ঞের ঋত্বিক স্থির পদবিক্ষেপে এসে দাঁড়ালেন যজ্ঞস্থলিতে। চতুর্দিকে একবার অবলােকন করলেন। দণ্ডায়মান অবস্থায় কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেন যারম্ভের লগের জন্য। যজ্ঞকুণ্ড ঘিরে করজোড়ে অর্ধমণ্ডলে দণ্ডায়মান শিষ্যকুল।

যজমান দৈত্যরাজ বৃষপর্ব ঋত্বিককে সশ্রদ্ধ আমন্ত্রণ জানালেন হরকর্ম আরম্ভ করার জন্য।

যজ্ঞের নানাবিধ কর্ম সম্পাদনের জন্য উপযুক্ত পুরােহিতমণ্ডলী মূল ঋত্বিক দৈত্যগুরু শুক্রাচার্যের দুইদিক অলঙ্কৃত করে বসে রইলেন।

মহা সমারােহে শুরু হল যজ্ঞ। প্রজ্বলিত সমিধ বারবার ঘৃতাহুতি পড়তে লাগল। প্রদীপ্ত হল অগ্নি।

দেব-নিধন মন্ত্র উচ্চারিত হতে লাগল মূল ঋত্বিকবরের কণ্ঠে। যজ্ঞ সমাপ্ত হতে অতিক্রান্ত হল অপরাহ্নকাল।

অগ্নির আভার মতাে প্রদীপ্ত হয়ে উঠেছে শুরু শুক্রাচার্যের শুভ্র মুখমণ্ডল। ললাটে সুস্পষ্ট বলিরেখা। দৃষ্টিতে খেলা করছে বিশ্বধ্বংসকারী অগ্নি।

পরদিবস নির্দিষ্ট হয়েছে দৈত্য সৈনিকদের যুদ্ধযাত্রা। যজ্ঞভস্ম ললাটে দুইয়ে গুরুর চরণবন্দনান্তে যুদ্ধযাত্রা করলেন সসৈন্যে দৈত্যরাজ বৃষপর্ব।

দশজন সেনাপতি দশ অক্ষৌহিণী দানব-সৈন্য নিয়ে বিপুল বিক্রমে অগ্রসর হতে লাগল দশদিক মহন করে।

তুহুণ্ড, একচক্র, নিকুম্ভ, বীর, দনায়ু, কুপট, গগন, মূর্ধা, মুচি, অশ্বগ্রীব, অসিলােমা।

এই দশজন প্রবল পরাক্রান্ত সেনাপতি রথারূঢ়। বীর্যবান দানব সেনাপতিদের মধ্যভাগে পরমাকষণীয় রথে উপবেশন করেছেন দৈত্যরাজ বৃষপর্ব।

রথারােহী, গজারােহী, অশ্বারােহী, পদাতিক বিভিন্ন পদাধিকারী সৈন্যরা বীরদর্পে অগ্রসর হতে লাগল।

ঘন ঘন শঙ্খধ্বনিতে কম্পিত হতে লাগল গগনমণ্ডল। শ্রবণ বিদীর্ণ করল কোদণ্ড-টংকার। মুদগর, তােমর, কুঠার, তরবারি উর্ধ্বে তুলে হুংকার পাড়তে পাড়তে ঝাড়িত বিদ্যুচকিত মেঘের মতাে সংহারমূর্তিতে ছুটে চলল দৈত্য সৈন্যরা।

ওদিকে দেবলােকে সমাপ্ত যুদ্ধের আয়ােজন। ঘন ঘন সিংহনাদ শােনা যেতে লাগল। গর্জন করে উঠল সুরপতি ইন্দ্রের বজ্র। বরুশ ছুটে আসতে লাগল পাশ-অস্ত্র উড়িয়ে।

তেত্রিশ কোটি দেবকলের হুংকারে প্রকম্পিত হতে লাগল ত্রিভুবন।

স্মরণাতীত কালে যে সংগ্রাম শুরু হয়েছিল দেব ও দানবে, মহাকালের পথ বেয়ে সেই সংগ্রামের অগ্নি প্রদীপ্ত হয়ে উঠেছে বারে বারে। তখনও দেবতারা লাভ করতে পারেননি অমরত্ব। তাদেরও মৃত্যুবরণ করতে হত স্বাভাবিক নিয়মে।

কেবল দৈত্যগুরু অসীম তপস্যাবলে লাভ করেছিলেন মৃতসঞ্জীবনী বিদ্যা। সেসময় এই মহাবলে বলীয়ান ছিল দৈত্যকুল। শুরু শুক্রাচার্যই ছিলেন তাদের ত্রাণকর্তা।

যুদ্ধে নিহত দানব সৈন্যদের বহন করে শুরুর সমীপে আনতে লাগল বাহক সৈনিকেরা। গুরু শুক্রাচার্য তার কমণ্ডলুর জলসিঞ্চনে প্রাণসঞ্চার করতে লাগলেন শবদেহে।

ধীরে ধীরে যেন সুপ্তোথিত হতে লাগল নিহত সৈনিকের দল। আবার বিপুলবিক্রমে যুদ্ধক্ষেত্রে অগ্রসর হল তারা। তাদের তুষ্টনিতে কম্পিত হল প্রতিপক্ষের হৃদয়।

এদিকে দেবসৈনের সংখ্যা হ্রাস পেতে লাগল ধীরে ধীরে।

দেবরাজ ইন্দ্র পার্ষদদের সকাতরে বলতে লাগলেন, যতদিন না মৃতসঞ্জীবনী বিদ্যা শিক্ষা করে গুরুপুত্র কচের প্রত্যাবর্তন হচ্ছে ততদিন দেবকুলের বিনাশ অবশ্যম্ভাবী।

বেশ কিছুকাল যুদ্ধ চলার পর ক্লান্ত অবসন্ন হয়ে পড়ল দেব-দানব উভয়পক্ষের সৈনিকেরা।

আবার বেশ কিছুকালের জন্য উভয় সম্প্রদায়ই নীরব। যে যার সাম্রাজ্যে নিজ নিজ স্বাভাবিক কর্মে নিযুক্ত রইল ‘তারা। | যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয় না সত্য কিন্তু স্বল্পস্থায়ী সংগ্রামে লাভবান হয় দৈত্যকুল। তাদের সংখ্যা হ্রাস পায় না কখনও, অন্যদিকে দেবপক্ষে সৈন্য সংখ্যা উল্লেখযােগ্যভাবে হ্রাসপ্রাপ্ত হয়। তা। ছাড়া প্রজাবৃদ্ধির হার রাক্ষসপক্ষেই প্রবল, কিন্তু দেবপক্ষ প্রজাবৃদ্ধির ক্ষেত্রে সংযত।

এবার যুদ্ধের অন্তে পারিষদ-পরিবৃত হয়ে সিংহাসনে বসে ছিলেন সুরপতি। ক্লান্ত অবসন্ন দেহ-মন। যুদ্ধে পরাভবের কথাই ভাবছিলেন তিনি। | গুরু বৃহস্পতি এসে উপস্থিত হলেন রাজসভায়। ইন্দ্র সিংহাসন থেকে অবতরণ করে শুরুর পাসবন্দনা করলেন। উপস্থিত দেবতারা নত হয়ে নমস্কার নিবেদন করলেন শুরর উদ্দেশে। সুরপতি সালরে গুরুকে এনে বসালেন তার উপযুক্ত আসনে।।

শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর চিন্তাকুল বৃহস্পতি বললেন, যতদিন না সঞ্জীবনী বিন্যা আয়ত্ত করে পুত্ৰ কচ দেবলােকে ফিরে আসছে ততদিন লােকক্ষয় আর দুশ্চিন্তার হাত থেকে আমাদের নিষ্কৃতি নেই।

জলাধিপতি বরুণ জানতে চাইলেন, কচের কোনও সংবাদ ইতিমধ্যে দেবলােকে এসেছে

সকলেই প্রায় নিরুত্তরে বসে রইলেন। সহসা উঠে দাঁড়ালেন দেব দিবাকর। তিনি বললেন, গুরুপুত্রের সঙ্গে আমার বাক্য বিনিময় হলেও আমি তাকে দৈত্যগুরু শুক্রের বনস্থলীতে পরিশ্রমশ করতে দেখেছি।

অমনি চন্দ্রদেব উঠে বললেন, আমি এক পুর্ণিমা-নিশীথে পরম রমণীয়া এক তরুণী রমণীর সঙ্গে তাকে লীলাভরে বিচরণ করতে দেখেছি।

লীলারহস্য/২৩৭ সুরপতি বললেন, ওই পরম রমণীয়া কন্যাটি আচার্য শুক্রের দুহিতা দেবযানী। আমাদের গুরুপুত্র কচ যদি তার অনুগ্রহ লাভ করেন তা হলে সহজ হবে তঁার সঞ্জীবনী বিদ্যাটি আয়ত্ত

কথাগুলি শুনে নেবসভায় একটা উল্লাসের ঢেউ বয়ে গেল।

আচার্য বৃহস্পতি বললেন, আমার পুত্র কচ জিতেন্দ্রিয় বলেই আমি জানি। নারীর সান্নিধ্যে এলেও পদস্খলনের সম্ভাবনা তার নেই।

সুরপতি সঙ্গে সঙ্গে বললেন, এ বিষয়ে আমরা সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত গুরুদেব। অসুরলােকে তার যা কিছু লীলা সবই দেবলােকের মঙ্গলের কথা চিন্তা করেই।

শুরু বৃহস্পতি বললেন, এখন শুধু কাচের প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় বিশেষ আগ্রহ নিয়ে বসে থাতে হবে আমাদের।

কচ এবং দেবযানী যখন তপােবন তরুচ্ছায়ায় মুখােমুখি আলাপনে ব্যস্ত থাকে তখন উরুণ হয়ে থাকে একটি শ্রবণ। যখন তারা লীলাভরে নবদূর্বাদল আচ্ছাদিত বৃত কুসুমাকীর্ণ পথে বিচরণ করে তখন দুটি অদৃশ্য চক্ষুর দৃষ্টি তাদের অনুসরণ করতে থাকে। | সেই কর্ণ সেই দৃষ্টি এক তরুণ ব্রহ্মচারীর। যার জন্ম দৈত্যকুলে। সম্রাট বৃষপর্বার প্রধান। সৈন্যাধ্যক্ষ অসিলােমর পুত্র সে।

তরুণ তাপস রুহ আচার্য শুক্রের ব্রহ্মচর্য আশ্রমে দীক্ষা গ্রহণ করেছিল একটি বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে।

সেনাপতি অসিলােমা চেয়েছিলেন পুত্রকে বাল্যকাল থেকেই নিপুণ যােদ্ধরূপে গড়ে তুলতে, কিন্তু হু মনেপ্রাণে চায়নি যােদ্ধার কষ্টসাধ্য বৃত্তি।

তাই সে চলে এসেছিল গুরুদেবের আশ্রমে। বসন্ত সমাগমে নবীন তরুশাখায় যেমন রঙিন মঞ্জরী দেখা দেয় ঠিক তেমনই তারুণ্যের স্পর্শে মুকুলিত হয়ে উঠেছিল হের যৌবন-বাসনা। সে তার প্রথম ভালবাসার পুস্পিত ঘ্রাতা কোনও কুমারীর হস্তে। আর সে কুমারীকে সে আবিষ্কার করেছিল গুরু শুক্রাচার্যের তপােবনে পুষ্পচয়নকারিণী দেবযানীর মধ্যে।

তার সংগুপ্ত বাসনাকে সে কোনওদিন তার মানসীর কাছে প্রকাশ করতে পারেনি। কিন্তু ওই রুদ্ধ যন্ত্রণা তাকে দগ্ধ করছিল দিবানিশি।

যেদিন তার গােচরে এল, কচ পুষ্পগুচ্ছ চয়ন করে দেবযানীর কবরীতে পরিয়ে দিচ্ছে, সেদিন অব্যক ব্যথায় তার হৃদয়ে অবিরত রক্তক্ষরণ হয়েছিল। কিন্তু বাকালীন এই দৃশ্য দেখে-যাওয়া ছাড়া তার আর অন্য কোনও উপায় ছিল না। সে জানে দেবযানী অত্যন্ত আত্মসচেতন। তার ব্যক্তিত্বের কাছে কোনও কিছু সহজে প্রকাশ করা প্রায় অসম্ভবই ছিল। দেবযানী চিরদিনই পাতা, আর সবাই গ্রহীতা। গুরুকন্যার কৃপার ধারা কার ওপর কখন বর্ষিত হবে সে একমাত্র স্থানে দেবগনী স্বয়ং।

ঈর্ষা হত তার দেলােক থেকে আগত কচ নামের ওই তরুশ তাপসটির ওপর। সে যেন তার নীরব প্রেমের লীলায় একমাত্র প্রতিরক্ষ্মী।

যজাের পূর্বকালে যখন দেবযানী মঞ্জীরে ঝংকার তুলে কচের কুটিরের উদ্দেশে যাত্রা করেছিল তখন বৃক্ষের অন্তরাল থেকে সে দেখেছিল তার মানসপ্রিয়ার অভিসার-যাত্রা। একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এসেছিল তার বুক ঠেলে। মনে হয়েছিল, কচের এমন কী গুণ আছে, রূপের এমন কী বৈভব আছে যার আকর্ষণে বাঁধা পড়ে গেছে দেবযানী? চন্দ্রের আকর্ষণের মতাে জোয়ার-ভাটায় উত্তাল হয়ে উঠেছে প্রেমের বারিধি।

মনের ভেতর থেকে প্রশ্ন উঠে আসে কিন্তু পথ খুঁজে পায় না সহজ সমাধানের, যন্ত্রণা আরও বর্ধিত হয়।

এবার দেবনিধন যজ্ঞ সমাপ্ত হবার পর সে হাতে খুজে পের একটা অস্ত্র, যে অস্ত্রে সে আঘাত হানবে তার প্রবল প্রতিদ্বঘীকে।

সে তার ব্রহ্মচারী বন্ধুদের কচের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী করে তুলল। দেখাে ভাইসব, আমরা সকলেই রাক্ষসকুলােব। এখানে একমাত্র বিদ্যার্থী দেবগুরু বৃহস্পতি পুত্র কচ দেবকুলসত। আমরা সকলেই জানি দেব-দানব চিরকাল পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী, মহাশত্রু। কিন্তু করে এখানে আগমন এবং অধ্যয়নের ইচ্ছা কি একেবারেই উদ্দেশ্যহীন?

কেউ কেউ বলে উঠল, এতদিন যা আমাদের দৃষ্টি-বহির্ভূত ছিল আজ তাকে তুমি বিশ্বাসযােগ্যভাবে দৃষ্টিগােচর করে তুললে।

সমর্থন লাভ করে দ্রুহ বলল, তােমরা কি ভেবে দেখেছ, আমরা সকলেই বিদ্যার্থীদের জন্য নির্দিষ্ট কুটিরে অবস্থান করছি। কিন্তু কচের জন্য সম্পূর্ণ নির্জনে একটি কুটির নির্দিষ্ট হয়েছে তপােবনের প্রতি তরুশ্রেণির নীচে বহমান স্রোতস্বিনীর তীরে। একজন বলল, সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা তােমার দ্রুহ। অন্যেরা বলল, নিশ্চয় এ ব্যাপারে গুরুদেবের কোনও উদ্দেশ্য আছে। দ্রু বলল, আমার তেমন কিছু মনে হয় না। দেবগুরু বৃহস্পতি পুত্র নিজের পিতার কাছ থেকে ব্রহ্মচর্য গ্রহণ না করে শুরুদেবের কাছে এসেছে, এই গবেই গুরুদেব মনে হয় শত্রুপক্ষের এই তরুণটির জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করে রেখেছেন।

অভ্রান্ত বলে মনে হচ্ছে তোমার অনুমান।

রুহের মুখ দেখে মনে হল সে তার বন্ধুদের কচের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী করতে পেরে মনে মনে বেশ গর্ব অনুভব করছে।

আবার একটি প্রসঙ্গের উত্থাপন করল , তােমরা কি লক্ষ করেছ দেব-নিধন যজ্ঞে আশ্চর্যভাবে অনুপস্থিত ছিল কচ? আমরা সকলেই তা লক্ষ করেছি।

হ বলল, তােমরা এটাও নিশ্চয় লক্ষ করেছ, গুরুদেব সেজন্যে কচের প্রতি কোনরূপ বিরূপতা প্রকাশ করেন না।

জনৈক বিদ্যার্থী বলল, অন্ধ এক ভালবাসা সম্ভবত গুরুদেবকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। সবাই বলল, আমাদেরও তাই মনে হয়। তবে এ বিষয়ে অধিক দূর অগ্রসর হওয়ার কোনও অধিকার নেই আমাদের।

শেষে দ্রুহ বলল, ঘটনার শ্রোতই কেবল আমরা লক্ষ করে যেতে পারি, তার নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা আমাদের হাতে নেই।

লীলারহস্য/২৩৯ ধূমায়িত একটা সন্দেহের অগ্নি ধিকধিক করে জ্বলতে লাগল প্রতিটি ব্রহ্মচারীর অন্তরে।

মনের সুতীব্র ক্ষত নিয়ে পাঠাভ্যাসের মাঝে মাঝে দ্রুহ লক্ষ করতে লাগল দেবযানী আর কচের গােপন লীলাবিলাস।

নববিকশিত কাশরাশির ও উড়িয়ে, প্রফুল্ল নীলাকাশের মতো নেত্রপাত করে, কুমদের ন্যায় মনােহর-কান্তি যে শারদলক্ষ্মী এসেছিলেন তিনি অন্তর্হিত হলেন প্রকৃতির দৃশ্যপট থেকে।

ধীরে ধীরে শারদলক্ষ্মীর পরিত্যক্ত মঞ্চে এসে দাঁড়ালেন শস্যের নবােগ পল্লবের দ্বারা রমণীয়, লােপ্ৰকুসুম এবং পরিপক্ক শালিধান্যের দ্বারা পরিশােভিত হেমলক্ষ্মী। কিন্তু হিমপাতে নিমীলিত হল পন্যের দলগুলি।

বিলাসিনীদের অঙ্গে আর শােভা পাচ্ছে না সূক্ষ্ম রেশমীস্ত্র। কামিনীকুল মুখপদ্মে অঙ্কন করছেন পত্রলেখা। মস্তকের কেশরাজি সুরভিত হচ্ছে কালাগুরুর ধূপে। | রাশিকৃত শালিধান্য সঞ্চিত হয়েছে তপােবনের খেত-প্রান্তে। আশ্রম মৃগ এবং পক্ষীকুল অবাধে অকুতােভয়ে সেই শালিধান্য ভক্ষণ করছে। আশ্রম সরােবরে ধুসরবর্ণের যাযাবর হংসকুল পক্ষবিধুননে সংক্ষুব্ধ করছে জলরাশি। বিন্দু বিন্দু মুক্তা ছড়িয়ে পড়ছে চতুর্দিকে।

শিশির-সিক্ত বায়ুর দ্বারা সর্বদা কম্পিত হচ্ছে প্রিয়ংগুলতিকা। প্রিয় বিরহিণী নারীর ন্যায় দিনে দিনে পাণ্ডুবর্ণ ধারণ করছে সে।

হেমন্তের কুয়াশায় দুটি ছায়ামূর্তিকে মাঝে মাঝে কখনও স্পষ্ট, কখনও বা অস্পষ্ট হয়ে মিলিয়ে যেতে দেখা যাচ্ছে।

হের দৃষ্টিকে ওই দুটি ছায়ামূর্তি ফঁকি দিতে পারছে না। মূর্তি দুটি অস্পষ্ট হয়ে যাওয়ামাত্র হের চক্ষু আরও তীক্ষ্ম হয়ে তাদের সন্ধান করে ফিরছে। সে জানে এই যুগলমূর্তির পরিচয়, তাই তীব্রতর হচ্ছে তার যন্ত্রণা। কিন্তু সে বেদনা সে প্রকাশ করতে পারছে না কারও কাছে। | আবির্ভূত হল শীত ঋতু। উশুরবায়ু তীক্ষ্ণশরে বিদ্ধ করতে লাগল অনাবৃত অঙ্গ। স্থলব, সূর্যকিরণ, অগ্নির উত্তাপ বড় প্রিয় বলে মনে হতে লাগল তপােবনবাসীদের। সন্ধ্যায় প্রজ্জ্বলিত সমিষের চারদিক ঘিরে ব্রহ্মচারীরা উপবেশন করে ঐক্যতানে পাঠাভ্যাস করতে লাগল। তারই মাঝে কেবল একজনের দৃষ্টি খুঁজতে লাগল গুরুকন্যা দেবযানীকে। সে আশ্বস্ত হল এই ভেবে। যে, সতীর্থ কচ বিদ্যাভ্যাস করছে তারই সন্নিকটে বসে। এ সময় গুরু সাধারণত অবস্থান করেন আপন কুটিরে।

দেবযানী স্বতন্ত্র কুটিরে থেকে গবাক্ষপথে লক্ষ করে অগ্নিকুণ্ডের চারদিকে উপবিষ্ট বিদ্যার্থীদের। তার মনে হয় ব্রহ্মচারী কচ যেন সবার থেকে স্বতন্ত্র। কী যেন এক দেবমহিমায় সে সারাক্ষণই উদ্ভাসিত। মন্ত্রোচ্চারণে তার কণ্ঠে স্বর্গীয় এক সুরধ্বনি সে শুনতে পায়। কচের প্রতি ঘন ঘন ফ্রহের সন্ধানী দৃষ্টি তাকে বিচলিত করে। সে জানে দ্রুহ সেনাপতি অসিলােমার পুত্র। সাধারণত সেনাপতি পুত্রেরা কৈশােরকাল থেকেই যুদ্ধবিদ্যা আয়ত্ত করাকেই প্রধান ব্রত বলে মনে করে। কিন্তু হু একেবারে ব্যতিক্রম। সে কৈশােরেই চলে এসেছে শান্তরসাস্পদ তপােবনে।

প্রথমদিকে দেবযানী ভেবেছিল দৈত্যকুলের উগ্রতা নেই ড্রহের অবয়বে। কিন্তু প্রস্ফুটিত তারুণ্যে সে লক্ষ করছে, তার দৃষ্টিতে কী যেন এক গুঢ় কামনার সন্ধান আহে। পথে তার মুখােমুখি হলে দুই সহসা থমকে দাঁড়ায়, কিছু যেন বলতে চায় সে। কিন্তু দুর্জয় সাহসের অভাবে তার রসনা স্তব্ধ হয়ে থাকে। কী বলতে চায় দ্রুহ? এখনও সঠিক তার বিশ্লেষণ তে পারেনি দেবযানী। | সমাপ্ত হল উত্তরবায়ুর শাসনকাল। রিক্তপত্র বৃক্ষশাখায় উগত হল নবকিশলয়। ধীরে ধীরে অশােকে, কিংশুকে, কৃষ্ণচূড়ায় দেখা দিল রক্তরাগ। ঋতুরাজ বসন্তের মুকুট রচনা করল আমঞ্জরী। কোকিলের কুহগীতে ঘােষিত হল ঋতুপতির আগমন। রুদ্ধ প্রেমের দ্বার উন্মুক্ত করে দিল দক্ষিণের উদ্ভ্রান্ত পবন। | এই ঋতুতে হের দৃষ্টি আরও সজাগ, আরও সচকিত হল। কারণে অকারণে সহসা সে আবির্ভূত হতে লাগল পুষ্পিত তরুতলে, কখনও বা তৃণাচ্ছাদিত ‘তরঙ্গিনীর কূলে কূলে।

সচকিত দেবযানীর সন্ধানী দৃষ্টিকে সে কিন্তু এড়াতে পারল না। সুকৌশলে দেবযানী ফ্রহের দৃষ্টিকে ফাকি দিয়ে তার প্রার্থিত তরুণের কাছে অভিসার যাত্রা করতে লাগল।

উজ্জ্বল এক তরুণীর সান্নিধ্যে এসে রে চিওও চঞ্চল হত, কিন্তু পরক্ষণেই সে নিজের প্রবৃত্তিকে শাসন করে তার উদ্দেশ্যসিদ্ধির পথ সন্ধান করত।

এক দ্বিপ্ররের বিশ্রামলগ্নে দেবযানী এল প্রিয়-সন্নিধানে। সে সময় বসন্তের দোল উৎসব উদ্যাপনের জন্য বিদ্যার্থীরা স্ব-স্ব গৃহে যাত্রা করেছিল। এসময় কিছুদিনের জন্য তাদের অবকাশযাপনের সুযােগ আসে। তাই গুরু শুক্রাচার্যও এসময় হিমালয় পরিক্রমায় বহির্গত হন। আশ্রমে থাকে কেবল দেবযানী আর দেবলােক থেকে আগত শুরু বৃহস্পতি-পুত্র কচ। সে কোনও অবকাশেই যায় না তার স্বধামে। | গুরু শুক্রাচার্য তার আশ্রমের সমস্ত ভার অর্পণ করে যান কন্যা দেবযানীর ওপর। কচের যাতে কোনওরূপ অসুবিধা না হয় সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে বলে যান কন্যাকে।

এই সুবর্ণ সুযােগটিকে কোনওমতেই নষ্ট হতে দেয় না দেবযানী। সে প্রতিটি মুহূর্তকে যেন সুস্বাদু মধুর মতাে পান করে নিতে চায়। | দ্বিপ্রহরের ছায়াবীথিতলে বসে কচ ভাবছিল তার স্বভূমি দেবলােকের কথা। যে বিদ্যা আহরণের জন্য সে এসেছে দৈত্যগুরু শুক্রাচার্যের আশ্রমে, সে বিষয়ে এখনও সে পায়নি কোনও পথের সন্ধান। তাই স্বাভাবিকভাবেই বিষয় হয়ে উঠেছে তার মন।

সঙ্গোপনে অন্তরাল থেকে এসে দুটি হাতের চম্পক অসুলিতে কে যেন ঢেকে দিল আনমনা কচের দৃষ্টি।

কচ দু’হাত তুলে সেই চম্পক অঙ্গুলিগুলি স্পর্শ করে বলল, আজ এ কী লীলা তােমার কলাবতী।

এবার দুটি হাত সরিয়ে নিয়ে কচের মুখােমুখি বসে দেবযানী বলল, এমন অন্যমনে এতক্ষণ কার ধ্যান করছিলে কচ? সে সৌভাগ্যবতীর কথা জানতে বড় ইচ্ছা করে সখা। কচ বলল, আমি এতক্ষণ নিঃসঙ্গ বসে দেবলােকের কথা ভাবছিলাম দেবযানী। সেখানে কি কোনও কন্যা-মনােহারিণী আমার সখার চিত্তকে আকর্ষণ করছিল।

কড় বলল, তুমি ছাড়া কোনও তরুণী এমনভাবে অধিকার করতে পারেনি আমার চিত্তকে। তুমি আমার প্রিয়সখী, একান্ত অন্তরবাসিনী।

দেবযানী বলল, কেবল সখ্যে কি পূর্ণ হয় তরুণ-তরুণীর অন্তর?

আমি মনে করি দেবযানী বন্ধুত্বের বন্ধনই চিরস্থায়ী করতে পারে দুটি হৃদয়ের সম্পর্ককে। এতে কি সম্পূর্ণ তৃপ্ত হয় দেহমন? কচ বলল, আরও একটু স্বচ্ছ হােক তােমার প্রশ্ন প্রিয়সখী।

দেবযানী হৃদয়ের গােপন ইচ্ছার কোমল কলিকাটিকে আর দল মেলতে দিল না। সে শুধু বলল, আজ একটা ইচ্ছা মনের মধ্যে প্রবল হয়ে উঠেছে সখা।

কী সে ইচ্ছা দেবযানী? বসন্ত পুষ্প কি আজ বৃথা ঝরে যাবে। সে কি সুশােভিত করবে না প্রিয়সকাতর কোনও তরুণীকে?

আর অধিক বাক্যব্যয় করতে হল না গুৰু শুক্রাচার্যের প্রিয় কন্যাটিকে। . কচ বলল, ক্ষণকাল তুমি এখানে উপবেশন করাে দেবযানী। বসন্ত পুষ্পভরণে একটি তরুণীকে সুসজ্জিত করবার দুর্লভ সৌভাগ্য আজ তুমি আমাকে লাভ করতে দাও।

পুষ্পচয়নের উদ্দেশ্যে বনান্তরালে চলে গেল কচ। বাম জানুতে চিবুক ন্যস্ত করে দেবযানী বসে রইল লীলাভরে। | কী অনিন্দ্যসুন্দর তাপস! আঁখি মুদ্রিত করে ধ্যানে বসলে সে কী মগ্ন মাধুর্য। দেবযানী অবগাহন করতে লাগল প্রেমাস্পদের চিন্তায়। | কথন সাজি ভরে কুসুম চয়ন করে পশ্চাতে এসে দাঁড়িয়েছে কচ তা জানতে পারেনি দেবযানী। কবরীতে কার করস্পর্শে প্রিয়চিন্তায় ছেদ পড়ল তার। আপালে ফিরে তাকাল সে।

কী ফুল এনেছ সখা। | তোমার বুদ্ধিতে কুফ কবরী সজার জন্য এনেছি কিংশুক। তোমার কমল সুশোভিত হবে শিরীষ কুসুমে। রক্তকরবীর মালায় তুমি বিরাজ করবে ইন্দ্রাণীর মহিমায়। দু’মণিবন্ধে শােভা পাবে হেমযুথির কঙ্কন। তােমার স্বল্পীর দেওয়া মঙুমেখলার জন্য এনেছি বক্ৰীকুসুম (বকফুল) আর রক্ত ও হলুদবর্ণের রঙ্গন। উনাছের মতাে সুক্ষ লতাতন্তু দিয়ে গাথা হবে তােমার পুস্পালঙ্কার।

দেবযানী উচ্ছ্বসিত কলকন্ঠে বলল, ত্রিভুবনে এমন কে আছে যে তার প্রিয়সীর জন্য এমন পুম্পালঙ্কারের কথা চিন্তা করতে পারে।

কচ বলল, স্থির হয়ে বেদিতে বােসে সখী, আমি আজ তােমাকে আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে সাজাই।

দেবযানী যেন স্থির প্রতিমা। তগত নিষ্ঠায় তাকে পুষ্পমণ্ডনে মণ্ডিত করে তুলল নিপুণ মালাকার কম।

সজ্জা সমাপ্ত হলে কচ বলল, সরসীর সােপানে গড়িয়ে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে একবার তাকাও দেবযানী। খুশি হলে পুরস্কার চেয়ে নেব তােমার কাছ থেকে। দেবযানী চলে গেল আশ্রম সরসীনীরে নিজ প্রতিবিম্ব দেখার জন্য। কিছু পরে ফিরে এল কচের সন্নিধানে। চোখে মুখে নতি বিস্ময়ের ছবি।

আমার এমন কী পুরস্কার আছে সথা যা দিয়ে তােমাকে সংবর্ধিত করতে পারি। | বন্ধুর প্রতি কিঞ্চিৎ উষ্ণতা।

হৃদয় মুক্ত করে বলাে বন্ধু।

আমি যে পুষ্পসজ্জায় তােমাকে সজ্জিত করেছি সেই আভরণে তুমি তােমার ছন্দিত নৃত্য পরিবেশন করাে, তাতেই তৃপ্ত হবে আমার হৃদয়।

শুরু হল নৃত্য। কখনও আশ্রম হরিণীর চারু কটাক্ষ, কখনও ‘তার চঞ্চল চরণ বিন্যাস। কখনও বা দু’বাহ বাড়িয়ে গগনচারী বিহঙ্গের মতাে বাতাসে ভেসে-চলা উপল-বিছানাে নদীর শক্ষিত ছন্দের মতাে বেজে ওঠা চরণের মঞ্জরী। এক দৃষ্টিনন্দন মহিমায় প্রিয়মিলন-সমুৎসুক হৃদয় নিয়ে অভিসার যাত্রা। কাছে এগিয়ে এসেও অধরা মাধুরী ছড়িয়ে নয়ন কটাক্ষ হেনে ফিরে যাওয়া। | সমস্তু হৃদয় মথিত হয়ে গেছে চর। এই অপ্রাপনীয়াকে পাবার জন্য তার অন্তরে জাগল অধীরতা।

মনে হল এই মুহূর্তে সে দেবলােক আগত শুরু বৃহস্পতির পুত্র নয়। সে কোনও উদ্দেশ্য নিয়ে দৈত্যগুরু শুক্রাচার্যের শিষ্যত্ব বরণ করেনি। সে এক উদ্ভ্রান্ত প্রেমিক, যে তার প্রেমিকার জন্য জীবনের সমস্ত উদ্দেশ্যকে বিসর্জন দিতে পারে। এই অপার আনন্দ মুহূর্তে তার মনে হল মৃত্যু কত রমণীয়। কী হবে তার মৃতসঞ্জীবনী বিদ্যা শিক্ষা করে। কীভাবেই বা সে প্রতারিত করবে এই লালক্ষ্মীকে। প্রেম তাে উদ্দেশ্যহীন আনন্দে ভেসে চলা। কখন তার কাছে এসে নীরবে দাঁড়িয়েছে দেবযানী। সে লক্ষ করছে তার প্রেমাস্পদকে।

একসময় নীরবতা ভঙ্গ করে দেবযানী মধুরাণ্ঠে প্রশ্ন করল, আমার এ নৃত্যকলা তােমার কেমন লাগল সখা।

অনির্বচনীয়। স্বৰ্গনটীদের নৃত্য দেখেছি আমি। সাধুবাদ দিয়েছি করতালিধ্বনিতে। কিন্তু তােমার এ নৃত্য নির্বাক করে দিয়েছে আমাকে।

এই প্রথম কচকে স্পর্শ করল দেবযানী। নিজের চম্পক অঙ্গুলির ভেতর কচর হস্ত ধারণ করে দেবযানী বলল, কী প্রয়ােজন সখা স্বর্গলােকে ফিরে যাবার, আমরা দুজনে কি এখানে প্রেমের স্বর্গ রচনা করতে পারি না?

সহসা উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল বসস্তবায়ু। দূর আম্রকুঞ্জে শােনা গেল কোকিলের কুহুতান।

দু’জনে পরিভ্রমণ করতে লাগল শ্যামল তৃণাচ্ছাদিত নদীতটে, কথা হল করস্পর্শে, আঁখিপাতে। সন্ধ্যালগ্নে স্নিগ্ধ দীপালােকে প্রিয়তমকে আরতি করল দেবযানী।। এ যেন প্রাণের দেবতাকে আরাত্রিকের অনুষ্ঠানে হৃদয়মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করা।

নিশীথকালে কিন্তু সংযমের সীমাকে অতিক্রম করল না প্রেমমুগ্ধ দুই তরুণ-তরুণী। দুটি পৃথক কুটিরে শয়ন করে তারা নিদ্রাহীন নিশিযাপন করল প্রিয়মিলন চিন্তায়।

রাত্রি প্রভাত হল আশ্রম-বলিক পক্ষীর কুজনে। আবাল্যের অভ্যাসবশে পূর্বাশ্য হয়ে প্রার্থনায় বসল ।

সবিতার বন্দনাস্ত্রোত্র উচ্চারণ করতে করতে প্রসারিত হতে লাগল অন্তর। সর্বকলুষতামসহর দেবদিবাকর আবির্ভূত হলেন কচের সম্মুখে।

যুক্তকরে নির্নিমেষ নয়নে কচ তাকিয়ে রইল সেই অগ্নিবর্ণ পুরুষের দিকে। সে শুনতে পেল বিভাবসুর অমৃতময় বাণী-কচ ভুলে যেয়াে না তােমার সত্য, তােমার মহৎ উদ্দেশ্যের কথা।

লীলারহস্য তােমার শক্তির দিকে তাকিয়ে আছে সমস্ত দেবলােক। নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থকে তুমি অতিক্রম করে যাও মঙ্গলের জন্য। | কচ নিমীলিত নেত্রে সূর্যের উদ্দেশে প্রণাম নিবেদন করল। ততক্ষণে মােহমুক্ত হয়ে গেছে তার অন্তর।

কচের আচরণে রূঢ়তা নেই, আছে কৃতঞ্জতা।

দেবযানীর মাঝে মাঝে মনে হল, কোথায় যেন ছন্দ কেটে যাচ্ছে। নৃত্য তার সমে এসে পেঁৗছেতে পারছে না। মাঝে মাঝে তাকে উদ্ভ্রান্ত করছে অভিমান। পরক্ষণেই কচের স্নিগ্ধ প্রশান্ত হাসিতে সরে যাচ্ছে তার মনের মেঘ-ছায়া।

এমন দিনে আশ্রমের হাওয়ায় লাগল বসন্তের দোলা। ফাগের রঙিন আবির ছড়িয়ে তপােবনে প্রবেশ করল সখা-পরিবৃতা দৈত্যরাজকন্যা শর্মিষ্ঠা। নৃত্যের ছন্দে, সংগীতের কলধ্বনিতে মুখরিত হল আশ্রম প্রাঙ্গণ। মুরলীর সুরে, মৃদঙ্গ-করতালের ধ্বনিতে অনুভূত হল বসন্তসখা মদনের অদৃশ্য উপস্থিতি।

সখী শর্মিষ্ঠার সঙ্গে নৃত্যে মাতল দেবযানী।

বৃষপর্বার প্রাসাদে মাঝে মাঝে অবস্থান করত তাঁর গুরুকন্যা দেবযানী। রাজনন্দিনীকে নৃত্যশিক্ষা দিতেন যে গন্ধর্ব, তার কাছে দেবযানীরও চলত নৃত্যবিদ্যার পাঠগ্রহণ।

মাঝে মাঝে গুরু-সন্নিধানে দুই সখীর চলত নৃত্যের প্রতিযােগিতা। কিন্তু কী আশ্চর্য কেউ। কাউকে পারত না অতিক্রম করতে। শুরু বলতেন, নৃত্যের আসরে এমন যুগলবন্দি অদৃষ্টপূর্ব।

সখি, দিব্যতনু ওই তরুণ তাপসটিকে ঠিক যেন বসন্তসখা মদন বলে মনে হল। কিন্তু আমি আশ্চর্য হচ্ছি এই ভেবে যে, এমন দিব্য তনুধারী অসুরকুলে তাে সম্ভব নয়।

হাসল সখী দেবযানী। অসামান্য তােমার দৃষ্টির স্বচ্ছন্দ। এই তনুধারী কোনও ব্রহ্মচারী অসুরকুলে সম্ভব নয়। ইনি দেবগুরু বৃহস্পতিপুত্র কচ। আমার পিতার শিষ্যত্ব গ্রহণ করবার অভিলাষে দেবলােক থেকে অসুরলােকে এই তরুণ তাপসের আগমন।

শর্মিষ্ঠা বলল, আমি আশ্চর্য হচ্ছি মহাগুরু বৃহস্পতি-পুত্র অসুরলােকে এসেছে আমাদের গুরুদেবের শিষ্যত্ব গ্রহণ করতে।

দেবযানী বলল, পিতা উপযুক্ত শিষ্যকে কখনও প্রত্যাখ্যান করেন না। সাদরে শকুলসম্ভব জেনেও বক্ষে স্থান দিয়েছেন।

শর্মিষ্ঠা মন্তব্য করল, আমাদের গুরু মহান। যতই হােক, আমাদের গুরুদেব তাে অসুরকুল সম্ভব নন। যদিও উনি আমার পিতাকে কেবল রাজা বলে নয়, শ্রেষ্ঠ একজন শক্তিমান পুরুষ হিসেবে আদরে আপন আত্মার আত্বীয় বলে মনে করেন। | দুই সখী চঞ্চলনৃত্যে বসন্তের কুসুমিত কাননকে চরণধ্বনিতে ঝংকৃত করে তুলল। মঞ্জরিত আম্রপল্লবের শাখায় শাখায় নৃত্যের ধ্বনির সঙ্গে সঙ্গে শুরু করে দিল সুমধুর পিকনি। রক্তপ্রদীপ জ্বালল অশােক তার ডালে ডালে। দুই সখীর চরণের আঘাতে অশােকতরু মঞ্জরিত হয়ে উঠল। নাচতে নাচতে ওরা একসময় এসে গেল সেই বেদির ওপরে যেখানে প্রতি প্রভাতে ধ্যানস্থ হয়ে বসে থাকে একটি আলােকত।

আলােচনায় উঠে এল একটি কথা। সখি, তােমার ভেতরে যৌবনের যে তরঙ্গ দেখতে পাচ্ছি সেজন্য তােমার তরশ ঋষিকুমারের কাছে কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।

শুধু কৃতজ্ঞতা। কেন নয়? কৃতজ্ঞতার কত মূল্য তুমি তা জাননা। অনেক নৃত্য একসঙ্গে করলাম, এখন আমি তােমাকে একটি গল্প শােনাই। তা হলে তুমি বুঝতে পারবে কৃতজ্ঞতার মূল্য।

শােনাও, আমি উন্মুখ হয়ে রইলাম সখী।

এমনই এক তপােবন। ঋষি চাবন আনন্দে বিহার করতেন তার নিজের তপােবনে। কিন্তু কঠিন কঠোর তপস্যায় একদিন শিলীভূত হয়ে গেল মহর্ষি চ্যবনের প্রাণ। অমনি সমস্ত আশ্রমে নেমে এল অনন্ত স্তব্ধতা। ফল ফলে না, ফুল ফোটে না, পাখি উড়ে চলে গেছে কোন সুরলােকে। শুদ্ধ ডালের মতাে নীরস, প্রাণহীন হয়ে গেছে ঋষির বাহুযুগল। ধীরে ধীরে ঋষির দেহ বল্মীকে পরিণত হল।

দেবযানী বলল, কী ভয়ংকর! ভয়ংকর হলেও একান্ত সত্য সখী।

একদিন”এলেন সপারিষদ মৃগয়ায় মহারাজ শর্যাতি। সঙ্গে এল তার একান্ত দুলালী কন্যা সহ পরিচারিকা পরিবৃতা হয়ে।

হঠাৎ যেন প্রাণহীণ প্রাসাদে উঠল কলধ্বনি। সহসা মৃদু পদসঞ্চারে কৌতুহলী সুকন্যা এক বীকের কাছে এসে দাঁড়াল। দুটো রত্ন জ্বলজ্বল করছে বশ্রীক-স্কুপের মধ্যে। সীমাহীন কৌতূহলে সে লক্ষ করতে লাগল সেই দুটি দীপ্ত মাণিক্যকে। কিন্তু রহস্য ভেদ করতে পারল না। অমনি কৌতুহলী সুকন্যা একটি কন্টক গ্রহণ করে সেই দুটি মণিকে ভেদ করল।

কী এক অসহা যন্ত্রণায় কম্পিত হতে লাগল সমস্ত বনস্থলি। চমকে উঠল রাজদুহিতা সুকন্যা।

ওদিকে মুগয়ারত সমস্ত সৈনিক বিকলাঙ্গ হয়ে গেল। কী আশ্চর্য ঋষির মহিমা। কারণ অনুসন্ধানের জন্য ছুটে এলেন মহারাজ শর্যাতি। অত্যন্ত ধর্মভীরু মানুষ তিনি। যখন জানলেন এই মহা অঘটনের নায়িকা তারই কন্যা, তখন নতজানু হয়ে বসলেন ঋষির কাছে। বললেন, প্রভু, আমার সমস্ত সৈন্য নিরপরাধ। অপরাধী, একমাত্র আমার কন্যা। আপনি তাকে। ক্ষমা করুন। সে অপরাধের যােগ্য শাস্তি প্রার্থনা করে। একথা শােনার পর হঠাৎ জেগে উঠল ঋষির অন্তরে প্রবল প্রতিহিংসা।

ঋষি বললেন, আমি সবাইকে ক্ষমা করে দিতে পারি। যদি তােমার কন্যা আমাকে পতিরূপে বরণ করে।

এগিয়ে এল সুকন্যা। যেহেতু আমি অপরাধ করেছি, আমি ঋষিকে পতিরূপে বরণ করব। অত্যন্ত ধর্মভীরু প্রজ্ঞাবান রাজা নতমস্তকে ঋষির সেই আত্মাকে শিরােধার্য করলেন। সেদিন থেকেই ঋষিবধুর মতো চ্যবনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠল সুকন্যার সংসার।

আশ্রম সরসীতে প্রভাতে স্নান করে সুকন্যা যখন ফিরে আসে তখন অপরূপ এক মহিমা বিরাজ করে চরাচরে।

একদিন আশ্রম সরােবরে স্নান সেরে সিক্তবসনে সম্পূর্ণ যৌবনভার নিয়ে উঠে আসছিল সুকন্যা। হঠাৎ পেছন থেকে তার আহ্বান ধ্বনিত হল। ফিরে তাকাল পরমাসুন্দরী রাজকন্যা ঋষিবধু সুকন্যা। দুই যুগলমূর্তি তাকিয়ে আছে তার দিকে।

সুন্দরী, এমন মিথ্যা যৌবনভার বহন করছ তুমি।

আমরা অশ্বিনীকুমার, তােমার পাণিপ্রার্থী। ওই জরাগ্রস্ত ঋষি তােমার যৌবনকে তৃপ্ত করতে পারবে না। তুমি আমাদের দুজনের একজনকে গ্রহণ করাে। সঙ্গে সঙ্গে আমরা তােমাকে নিয়ে চলে যাব স্বর্গলােকে।

একথা শােনাও আমার পাপ। কোনও পাপ নয়। প্রেম, ভােগ জীবনের এক অক্ষয় ধন। তুমি তাকে বঞ্চিত করতে পারাে । আচ্ছা আমরা তােমাকে একটা কথা বলি। আমরা তােমার স্বামীকে চিরযৌবন দান করব একটি শর্তে। তােমার স্বামী যৌবনপ্রাপ্ত হলে তােমার ওপর তার কোনও অধিকার থাকবে না।

সে কী করে সম্ভব অশ্বিনীকুমার!

৩াকে বলাে, এই সরােবরে আমরা তিনজনে স্নান করব। স্নানান্তে তিনজনেই একই দেহ ধারণ করব। তারপর তুমি যাকে নির্বাচন করবে তার কাছে তােমার চলে যেতে কোনও বাধা থাকবে না।

ঋষি চ্যবন খুশিমনে এ প্রস্তাবে সম্মতি দিলেন। সুকন্যা এসে দাঁড়ালেন পুষ্পমাল্যহাতে সরােবর সােপানে। তিনজনে ডুব দিল সলিলে। যখন জল থেকে তিনজন উঠে এল তখন অভিন্নকায়া, অপরূপ সৌন্দর্য। হাসিতে উদ্ভাসিত অশ্বিনীকুমারদ্বয়ের মুখ। একই মুখ ঋষি চ্যবনের। কেমন এক ম্যন ছায়াচ্ছন্ন।

এগিয়ে গেল সুকন্যা। তিনজনেই অভিন্ন। সে এগিয়ে গেল স্নান নতমুখে দাঁড়িয়ে থাকা ঋষি চ্যবনের দিকে। তার হাতের মালা পরিয়ে দিল ঋষি চাবনের কণ্ঠে।

অশ্বিনীকুমার লজ্জায় রাঙা হয়ে স্বর্গলােকে চলে গেল। ঋষি চ্যনের কণ্ঠলগ্ন হয়ে রইল সুকন্যা। আশ্চর্য কাহিনী তােমার শর্মিষ্ঠা। হাঁ, কাহিনী আশ্চর্যই বটে।

হাসি, গল্প, গান, নৃত্যে সারাটা দিন কাটিয়ে বৃষপর্বার কন্যা শর্মিষ্ঠা সখীদের কাছ থেকে বিদায় নিল।

সহসা দিগন্তের দিকে তাকিয়ে দেবযানী দেখল—নামে সন্ধ্যাতা আলস সােনার আঁচল-খসা হাতে দীপশিখা’। দিগন্তের দিকে তাকিয়ে দেবানী দেখল, দিকচক্রবালে তরঙ্গিত হচ্ছে অন্ধকার। আশ্রম-ধেনুরা অনেক আগেই ফিরে এসেছে গােঠ থেকে। কিন্তু সে কই? চঞ্চল হয়ে উঠল দেবযানীর অন্তর।। সৈকতিনী নদীর তীরে তীরে তার দুটো চরণ আর আঁখি ঘুরে বেড়াল। কিন্তু যার জন্যে তার

এত প্রতীক্ষা কিন্তু তাকে তাে দেখা গেল না চরাচরের কোথাও। অত্যন্ত বেদনাক্লিষ্ট মনে পায়ে পায়ে ফিরে এল দেবযানী তপােবনে।

এবার ধ্যানের সময় হয়েছে ভেবে দেবযানী চলে গেল কচের সাধনবেদির দিকে। যদি সেখানে তার সন্ধান পাওয়া যায়। | ছড়িয়ে পড়েছে জ্যোৎস্না আলাে। সে পায়ে পায়ে গিয়ে দাঁড়াল ধ্যানবেদির সম্মুখে। কেউ কোথাও নেই। কী আশ্চর্য! শিমুলের লাল কয়েকটা ফুল বেদির ওপর লুষ্ঠিত হয়ে পড়ে আছে।

মনে হল যেন একটা রক্তমাখা দেহখণ্ড বিকীর্ণ হয়ে পড়ে আছে ধ্যানবেদিতে। কী অদ্ভুত যােগাযােগ।

সে ছুটে গেল পিতার কুটিরে। পিতা, সবাই ফিরে এসেছে গােচারণ থেকে। কিন্তু আপনার দিব্যতনু বিদ্যার্থীটি এখনও তাে ফিরে এল না আশ্রমে।

সঙ্গে সঙ্গে শুক্ৰচার্য বসলেন ধ্যানে। তিনি দিব্যদৃষ্টিতে যা দেখলেন তাতে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। দৈত্যকুলােবেরা কচের দেহকে খণ্ড খণ্ড করে ছড়িয়ে ফেলে দিয়েছে বনস্থলিতে। উদ্বিগ্ন পুত্রীকে সেই সমাচার দেওয়ামাত্র দেবযানী হাহাকার করে কেঁদে উঠলেন। ওকে বাঁচান পিতা।

ঋষি বললেন, আমি বুঝেছি, দৈত্যকুলােবেরা ওই দিব্যতনু কচকে সহ্য করতে পারছে না। তাই খণ্ড খণ্ড করে কেটে চেষ্টা করেছে তার অস্তিত্ব বিলােপের।

বাঁচান পিতা, ওকে বাঁচান আপনার সঞ্জীবনী মন্ত্র প্রয়ােগ করে। না হলে আমার পক্ষে জীবিত থাকা সম্ভব হবে না।

শুক্রাচার্য ধ্যানে বসলেন। মৃতসঞ্জীবনী মন্ত্র উচ্চারণ করতে করতে তার সামনে এসে আবির্ভূত হল দেবযানীর সখা কক্ষ। অবিকল সেই তরুণকান্তি, সেই মনােহর দিব্যতনু। দুজনে পিতাকে প্রণাম করে দাড়াল।

পরদিন প্রভাতে বিদ্যাচর্চার সময় দৈত্যেরা দেখল যে বিদ্যার্থীর আসনখানি নিয়ে প্রতিদিনের মতাে গুরুপদপ্রান্তে বসে আছে দিব্যতনুধারী তরুণ তাপস কচ।

একান্তে সভা বসাল দৈত্যকুলােদ্ভবেরা। তারা চিন্তা করল আমাদের বৃদ্ধগুরুকে বিনাশ করতে হবে এবার। দৈত্যদের প্রাণরক্ষার সঙ্গে সঙ্গে যদি দেবকুলােদ্ভব কোনও ব্যক্তির প্রাণ রক্ষিত হয় তা হলে সে শুরুতে কোনও কাজ নেই।

এবার শেষ চেষ্টা করে দেখা যাক। সগােপনে কচকে হত্যা করে পরিণত করল সুরাসারে। গুরুর পানীয়ের সঙ্গে তাকে নিকৃত

দেবযানী কচকে দেখতে না পেয়ে এবারও ভেঙে পড়ল কান্নায়। শুক্ৰচাৰ্য বললেন, এবার করে জীবন ফিরিয়ে দেবার কোনও ক্ষমতাই আমার নেই। দেবযানী কেঁদে বলল, তা হলে আমার জীবনধারণের কোনও অর্থই রইল না।

শুক্ৰচার্য বললেন, তুমি তােমার পিতাকে চাও, না প্রেমাস্পদকে চাও? একথা কেন পিতা? আমি দুজনকেই চাই।

এবার দৈত্যেরা বড় অদ্ভুত কাজ করে বসে আছে। তাকে একেবারে আমার দেহের মধ্যে সুরার সঙ্গে প্রবিষ্ট করিয়ে দিয়েছে। সে কিন্তু আমার ভেতরে এখনও জীবিত রয়েছে। অসাধারণ তপস্যার শক্তি তার। তার জীবিত হওয়ার একটিমাত্র পথ আছে।

কী পথ পিতা?

আমার উদর বিদীর্ণ করে এবার তাকে আসতে হবে। আর তা হলে হবে আমার মৃত্যু। তাই বলছিলাম, তুমি কাকে চাও। | স্তব্ধ হয়ে রইল দেবযানী। বিদীর্ণ হয়ে যাচ্ছিল তার অন্তর।

কন্যার অবস্থা সবই বুঝলেন পিতা। তিনি বললেন, আমি আমার ভেতরে কচকে শিক্ষা দেব মৃতসঞ্জীবনী।

তারপর?

সে আমার উদরবিদীর্ণ করে বহিগত হবে। সে পরে বাইরে গিয়ে ওই মৃতসঞ্জীবনী মন্ত্রবলে আমাকে জীবিত করবে। এ মন্ত্রের এমনই প্রভাব, অন্যকে দান করলে দাতা কোনওদিনই আর সে মন্ত্র প্রয়ােগ করতে পারবে না। তখন কচের ইচ্ছার ওপরে আমার জীবন-মৃত্যু নির্ভর করবে।

গুরু শুক্রাচার্যের অভ্যন্তরে সুরারূপী কচ শিক্ষা করল মৃতসঞ্জীবনী। গুরুর মৃত্যু হল।

কচ কিন্তু বাইরে এসে উচ্চারণ করল মৃতসঞ্জীবনা মন্ত্র। শুরু সঞ্জীবিত হলেন। কিন্তু ভুলে গেলেন মন্ত্র প্রয়ােগ কৌশল।

এবার একটি খেলা খেলতে পারত দেবকুলােদ্ভব কচ। গুরুকে না বাঁচিয়ে সে প্রস্থান করতে পারত মৃতসঞ্জীবনী মন্ত্র নিয়ে স্বর্গলােকে। কিন্তু অকৃতজ্ঞ নয় সে। তাই শুরুকে জীবন দিয়ে সে প্রণাম নিবেদন করে উঠে দাঁড়াল। এই হল কচের মৃতসঞ্জীবনী শিক্ষার কাহিনী। দেবযানী তার একান্ত প্রেমাস্পদকে সঙ্গে নিয়ে সানন্দে ঘুরে বেড়াতে লাগল তপােবনে।। বলল, সখা, তুমি চিরদিন এখানে আমারই হয়ে থাকে। তুমি আমাকে তােমারই করে নাও। তা কী করে হয় দেবযানী?

তুমি আমার ভগ্নী বলে। কিন্তু এ অলৌকিক সম্পর্ক তুমি কোথায় পেলে? গুরু পিতার সমান। তার কন্যা ভগ্নীসমা।। এই সারা তপােবনে দু’জনেই তাে ষড়ঋতুর পর্ব কাটালাম। সেকি মিথ্যা? সেও সত্য, কিন্তু পাশাপাশি এও সত্য। আমি সত্য-মিথ্য কিছুই জানি না, শুধু তােমাকেই জানি। ৯ বলল, আরও একটি সত্য শােনন। শুক্রাচার্য, বৃহস্পতি, দু’জনেই এক পিতার সন্তান। বিস্মিত দেবযানী বলল, কী রকম?

কচ বলল, অগ্নিতে যে বীর্যপাত হয়েছিল তার দাহিকা শক্তি থেকে শুক্রচার্যের আবির্ভাব। আর অগ্নি যখন শীতল অঙ্গারে পরিণত হল, তখন তার থেকে আবির্ভূত হলেন বৃহস্পতি।

তা হলে এরা দু’জনে কি ভাই নয়? আমি বৃহস্পতি পুত্ৰ কচ আর তুমি শুক্রাচার্যের কন্যা দেবযানী। এই প্রত্যক্ষ প্রমাণে আমরা দু’জনেই ভ্রাতা ও ভগিনী।

দেবযানী সখেদে বলল, এতকাল পরিভ্রমণ করার সময়, এমন প্রেমবিহল মধুর বচনে দু’জনকে অভিষিক্ত করার পর তুমি সমস্ত বন্ধন ছিন্ন করে দেবলােকে চলে যাবে বলে আজ এই ভ্রাতা-ভগ্নীর প্রশ্ন তুলছ।

লজ্জায় নীরবে দাঁড়িয়ে রইল কচ। যত বেদনারই হােক, স্বর্গলােকে আমায় চলে যেতেই হবে সখী।

সক্ষোভে দেবযানী বলল, আমি অভিশাপ দিচ্ছি—তুমি যথাকালে এই মৃতসঞ্জীবনী বিদ্যা। ভুলে যাবে। তুমি যা শিক্ষা করেছ তা কখনও প্রয়োেগ করতে পারবে না।

কচ বলল, তথা। আমি প্রয়ােগ করতে পারব না সত্য কিন্তু অন্য যে জনকে আমি শিক্ষা দেব, তার এই সঞ্জীবনীমন্ত্র প্রয়ােগে কোনও বাধা থাকবে না।

অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠল দেবযানীর প্রাণ। সে তাকিয়ে রইল স্বালােকের দিকে। একটি আলােকবিন্দু দ্রুত জ্যোতির্লোকের পথরেখা ধরে স্বর্গে প্রস্থান করল।

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *