হানড্রেড রোমান্টিক নাইটস্ – গিয়ােভানি বােকাসিও (দ্বিতীয় দিন ৭ম-১০ম গল্প)

›› অনুবাদ  ›› ১৮+  

সপ্তম গল্প

ব্যাবিলনের সুলতান তাঁর কন্যাকে পাঠালেন অলগ্রেডের রাজার সঙ্গে বিবাহ দিতে। কিন্তু পথে নানারকম দুর্ঘটনা ঘটল এবং চার বছরের মধ্যে সুলতান-কন্যা নয়জন ব্যক্তির হাত বদল হল। শেষ পর্যন্ত উদ্ধার পেয়ে সে কুমারীরূপে তার বাবার কাছে ফিরে এসেছিল এবং সে আবার যাত্রা করে অলগ্রেভ পৌঁছে সেখানকার রানী হল।

এমিলিয়ার গল্প শুনে এখন সকলে খুবই আনন্দিত। কিন্তু সে যদি ম্যাডােনা বেরিতােলার দুঃখের কাহিনী আর একটু বিস্তারিত ভাবে বলতাে তাহলে এতক্ষণে বােধহয় সকলের চোখে জল এসে যেত। যাই হােক তার গল্প সকলে উপভােগ করেছিল। কুইন তখন প্যানিফিলােকে বললাে, এবার তােমার পালা। তুমি আমাদের এই রকমই চমৎকার একটি গল্প বলবে।

-তাহলে আমাদের প্রিয় বান্ধবীরা শোন, আমরা পুরুষরা যে কি চাই এবং কিসে আমাদের তৃপ্তি তা আমরা জানি না। এক দরিদ্র ভাবলাে সে যদি ধনী হয় তাহলে সে তার মতাে দরিদ্রদের অর্থ দান করবে। কিন্তু ভাগ্যক্রমে সে যখন ধনী হল তখন সে তার গরিব ভাইদের ভুলে গেল। উলটে তাদের উৎপীড়ন করতে লাগলাে। এক রাজা ভাবল, পাশের রাজ্য পেলে আর অন্য রাজ্য চাইবে না। কিন্তু প্রচুর রক্তপাত ও অজস্র নরহত্যা করে যখন সে পাশের রাজ্য দখল করলাে তার আরও রাজ্যের জন্যে লােভ বেড়েই চললাে। আর একজনের লােভ কোনও এক সুন্দরীর প্রতি। তাকে নিজ অঙ্কে ধারণ করবার জন্যে সে হত্যা করতেও কুণ্ঠিত হলাে না। কিন্তু যখন সুন্দরীকে লাভ করলাে সে নিরাশ হল। এ আর এমনকি সুন্দরী? আরও তাে সুন্দরী আছে, তাদেরও চাই।

আর তােমরা মেয়েরা যেমন অলংকার চাও—কিন্তু যতই পাও ততই তােমাদের লােভ বেড়ে যায়। তােমরা আরও রূপবতী হতে চাও কিন্তু এই রূপ যে অভিশাপ হতে পারে তারই একটি গল্প আমি বলব।

ভাগ্য কোথায় কখন কাকে নিয়ে যাবে কে বলতে পারে। আমি বলি কি ঈশ্বর ও নিজ ভাগ্যের ওপর সব ছেড়ে দেওয়াই ভালাে। অনেক লম্বা বক্তৃতা দিয়েছি, আর নয়, এবার গল্প শােনাে।

অনেক অনেক দিন আগে বেমিনেদাব নামে একজন সুলতান ব্যাবিলন শাসন করতেন। অলাতিয়েল নামে তার এক অতীব লাবণ্যময়ী ও সুন্দরী কন্যা ছিল। সুলতানের আরও পুত্র কন্যা ছিল কিন্তু অলাতিয়েলের মতাে রূপ কারও ছিল না। শুধু ব্যাবিলনে নয়, সকলের মতাে এমন সুন্দরী পৃথিবীতে আর কোথাও নেই। সে ছিল জগতের আলাে।

এখন হল কি, আরব হানাদাররা সুলতানের রাজ্য আক্রমণ করলাে। কিন্তু অলগারভের রাজা ঠিক সময়ে সাহায্য নিয়ে পৌঁছে যাবার ফলে সুলতান আরব হানাদারদের কচুকাটা করে তাড়িয়ে দিলেন।

এই সাহায্যের বিনিময়ে অলগ্রেভের রাজা অলাতিয়েলকে তার রানী করতে চাইলেন। মেয়ের রূপ দেখে রাজা মুগ্ধ।

সুলতান রাজি হলেন কারণ রাজা তার জান মান ও রাজ্য বাঁচিয়েছেন। অলাতিয়েলকে তিনি জাহাজে তুলে দিলেন। অলাতিয়েল একা নয়, সঙ্গে তার কয়েকজন পরিচারিকা তাে রইলই, এছাড়া বিশিষ্ট কয়েকজন নরনারী, সশস্ত্র রক্ষী এবং উপহার সামগ্রী, প্রচুর খাদ্য ও পানীয় নিয়ে জাহাজ ভর্তি করে দিলেন। সমুদ্রযাত্রায় মেয়ের কোনাে অসুবিধা বা কষ্ট না হয় সেদিকে ছিল তার কড়া নজর।

অনুকূল বাতাসে নাবিকরা জাহাজের সবকটা পাল তুলে জাহাজ ছেড়ে দিল। আবহাওয়াও চমৎকার ছিল। অ্যালেকজান্দ্রিয়া বন্দর ত্যাগ করার পর থেকে বেশ কয়েকদিন পর্যন্ত সমুদ্র শান্ত ছিল। কিন্তু সার্ডিনিয়া পার হবার পরই সমুদ্র অশান্ত হল। হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় আরম্ভ হল। জাহাজের গায়ে এবং ভেতরেও পর্বতপ্রমাণ ঢেউ আছড়ে পড়তে লাগল। সামাল সামাল রব উঠল। জাহাজ বুঝি আর রক্ষা করা যাবে না। নাবিকরা কৌশলী ছিল। দু’দিন ধরে তারা ঝড় আর উত্তাল সমুদ্রের সঙ্গে সংগ্রাম করলাে। ঝড় কমবার আশা দেখা যাচ্ছে না। তৃতীয় দিন থেকে ঝড়ের গতি আরও বাড়তে লাগলাে। জাহাজকে কিছুতেই নিয়ন্ত্রণে রাখা যাচ্ছে না, পাল ছিড়ে যাচ্ছে, মাস্তুল ভেঙে পড়ছে। এধার ওধার ভেঙে যাচ্ছে।

জাহাজ কিন্তু তখন জেরকা সমুদ্রতীর থেকে বেশি দূরে নয়। কিন্তু তীর তাে দেখা যাচ্ছে না। যে এত ঘন ও কালাে যে দিন রাত্রির তফাৎ বােঝা যাচ্ছে না; বােঝা যাচ্ছে না তারা এখন কোথায় আছে।। 

জাহাজকে আর বাঁচানাে যাবে না, জাহাজে থাকলে সকলকে ডুবে মরতে হবে। লাইফবােট নামাও। জাহাজের পরিচালকরা খালাসিদের গ্রাহ্য করে না, ওদের জীবনের মূল্য কি? আপনি বাঁচলে বাপের নাম। তারা স্বার্থপর হয়ে উঠলাে। সকলকে অগ্রাহ্য করে তারা লাইফবােট নামাতে লাগলাে। কিন্তু আর সকলে ছাড়বে কেন? নৌকোয় ওঠবার জন্যে মারামারি আরম্ভ হয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত সকলেই নৌকোয় উঠে পড়লাে, মেয়েদের কথা কারও মনে স্থান পেল না।

নৌকোয় যারা আগে উঠেছিল তারা পরে আসা নাবিকদের বাধা দিতে লাগল। তলােয়ার ও হােৱা বেরােল। এই অস্ত্রের ঘায়ে অনেকের জীবনলীলা শেষ হল। কিন্তু লাইফবােট জাহাজ নয় যে অনেক লােক ধরবে। বােট ভারী হয়ে গেল এবং সকলকে নিয়ে ডুবল। সমুদ্র এতই অশান্ত যে সাঁতার অসম্ভব। সকলেই ডুবে মরলাে।

জাহাজ তখন অনেক জায়গায় এমনভাবে ভেঙে গেছে যে তাকে আর জাহাজ বলা যাচ্ছে। না। প্রবল বাতাসে ডানা ভাঙা পাখির মতাে তাড়িত হয়ে জাহাজ মেজরকার তীরে গিয়ে আটকে গেল, নড়বার আর কোনাে শক্তি রইল না।

জাহাজে তখনও পড়ে রয়েছে সুলতানকন্যা ও তার পরিচারিকারা। প্রাণভয়ে ভীত হয়ে তারা সকলেই অজ্ঞান। তখন রাত্রি। জাহাজ এমনভাবে পড়ে গেছে যে ঝড়ও তাকে নড়াতে পারল না। অবশ্য ঝড়ের বেগ তখন অনেক কমে এসেছে। বলতে গেলে জাহাজ থেকে মূল তীরভূমিতে ঢিল ছেড়া যায়। তীরভূমি আর জাহাজের মধ্যে কিছু অংশে জল আছে।

ক্রমে সকাল হল। ঝড় বেশ কমে গেছে। এখন আর ঝড় বলা চলে না। বলা যেতে পারে জােরে বাতাস বইছে। বেলা বাড়ার সঙ্গে আকাশ ক্রমশ পরিষ্কার হল। অলাতিয়েল মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছিল। এখন আস্তে আস্তে চোখ খুললাে। পরিচারিকাদের নাম বরে একে একে ডাকতে লাগল। তার কণ্ঠ ক্ষীণ। অলাতিয়েলের মতাে তারাও কেউ মৃতপ্রায় বা অজ্ঞান। তারা কেউ অলাতিয়েলের ডাক শুনতে পেল না। তারা কেউ কাছেও নেই।

কাউকে দেখা যাচ্ছে না, কারও সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। জাহাজও তাে চলছে না। ব্যাপারটা কি ঘটছে বােঝা যাচ্ছে না। সে টলতে টলতে উঠে দাঁড়ালাে। তারপর দেখল তার প্রধান এবং অন্যান্য পরিচারিকারা ইতস্তত বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে আছে। বর্তমানে তার পক্ষে যতদূর সম্ভব চিৎকার করে প্রত্যেকের নাম ধরে সে ডাকতে লাগল। দু’একজন সাড়া দিল মাত্র, উঠল না। তবে দু’ একজন উঠল। তারা এখন কোথায়, জাহাজই বা কি অবস্থায় রয়েছে তা তারা বুঝতে পারছে না। জাহাজের সমস্ত মাঝিমাল্লাই বা কোথায় গেল? কিছুক্ষণ পরে তারা আবিষ্কার অলাে। জাহাজের ভেতরে বেশ খানিকটা জল ঢুকেছে, জাহাজ ভেঙে প্রায় চুরমার এবং চড়ায় আটকে আছে। তারা নিজেদের অসহায় ভেবে কাঁদতে লাগল। কেউ তাদের উদ্ধার না করলে তাদের কি হবে ভেবে ঠিক করতে পারলাে না।। এ দুপুর নাগাদ এমন একটা ঘটনা ঘটলাে যাতে তারা উদ্ধার পেয়েছিল কিন্তু তখনও তারা জানতে পারে নি।

এই অঞ্চলে পেরিকোন দা ভিসালগাে নামে একজন জমিদার ছিলেন। পরে তিনি ঘােড়ায় চড়ে তার একটা জমিদারি পরিদর্শন করে সমুদ্রের ধার দিয়ে ফিরে আসবার সব ভাঙা জাহাজখানা দেখতে পেলেন। সঙ্গে কয়েকজন পরিচারক ছিল। জাহাজখানা দেখেই তে তিনি বুঝেছেন কি ঘটেছে। তিনি তখনি তার এক পরিচারককে আদেশ দিলেন, তুমি এই অলর সাঁতরে পার হয়ে জাহাজে উঠে ভেতরটা দেখে এসে বললা অবস্থাটা কি। ভেতরে কোনাে জাত মানুষ আছে কিনা আর মালপত্তরই বা কি আছে? এ অনেক পরিশ্রম করে সেই পরিচারক জাহাজের ভেতরে ঢুকল। এদিক ওদিক দেখবার সময় সে দেখল এক কোণে অতীব সুন্দরী এক মহিলা এবং কয়েকজন রমণী রয়েছে। ওরা ভীষণ ভয় পেয়েছে। লােকটিকে দেখে ওরা প্রথমে কাঁপতে লাগল কিন্তু যখন বুঝল লােকটি তাদের ক্ষতি করবে না তখন তােরা কাঁদতে কাঁদতে তাদের করুণ অবস্থার কথা বলতে লাগল। মুশকিল হল কি লােকটি তাে ওদের ভাষা জানে না। অতএব কি বলল বুঝতে না পারলেও এরা বিপদে পড়েছে, এদের উদ্ধার করা দরকার এটুকু বুঝেছিল।

ইশারা ইঙ্গিতে পরিচারক তাদের বুঝিয়ে দিল যে ভয় পেয়াে না, আমি আবার ফিরে আসছি। পরিচালকের ফিরে গিয়ে পেরিকোনকে সব কিছু বলল।

পেরিকেন তখনি লােকজন ডেকে নৌকো আনিয়ে মেয়েদের উদ্ধার করলাে এবং জাহাজে যেসব দামী উপহার সামগ্রী ও অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী ছিল সবই সে তুলিয়ে আনাল। মেয়েদের এবং মালপত্তর তার ক্যাসেলে নিয়ে চলল।

মেয়েদের পরিচর্যা, আহার ও বিশ্রামের ব্যবস্থা করলাে। তারা ক্রমশ সুস্থ হল, দেহ মনে বল ফিরে পেল। কিন্তু তারা কোথা থেকে আসছে কোথায় যাচ্ছে কিছুই জানা গেল না কাজ তাদের ভাষা বােঝা যাচ্ছে না। এ ভাষা না বুঝলেও অলাতিয়েলের রূপের প্রতি পেরিকোন এতই আকৃষ্ট হল যে সে তােখনি ঠিক করলাে সুন্দরী অবিবাহিতা হলে তাকে সে বিবাহ করবে আর বিবাহিতা হলে তাকে রক্ষিত করে রাখবে। কয়েকদিন বিশ্রাম ও উপযুক্ত পরিচর্যার ফলে অলাতিয়েল যখন সম্পূর্ণ সুস্থ হয়েছে তার আগেকার স্বাস্থ্যও ফিরে পেয়েছে, তখন তার রূপ যেন ফেটে পড়তে চায়। পেরিকোন সে রূপ দেখে মুগ্ধ।

পেরিকেন নিজে বলবান, পরিশ্রমী ও করিতকর্মা পুরুষ। তার সব কয়টি রিপুও প্রবল। যতদূর সম্ভব সে মহিলার যত্ন নিতে লাগল, আরাম ও স্বাচ্ছন্দ্যের কোনাে ত্রুটি রাখল না।

পেরিকোনের মতলব অলাতিয়েল বুঝতে পারল কিন্তু তাকে কাছে ঘেষতেই দিল না। পেরিকোনও ছাড়বার পাত্র নয়।

অলাতিয়েল বুঝতে পারছে না সে কোনাে দেশে এসে পড়েছে তবে সে জানতে পারল যাদের মধ্যে সে এসেছে তারা খৃস্টান। সে তাদের সঙ্গে মানিয়ে চলতে লাগল। নিজের পরিচয় তাে সে দিতে পারে নি কারণ পরস্পরের ভাষা দুর্বোধ্য। বেচারী মানসিক যন্ত্রণা নীরবে ভােগ করছে কিন্তু যদি সে এখনও পর্যন্ত পেরিকোনকে প্রশয় দেয়নি কিন্তু মনে মনে বুঝেছিল যে আজ হােক কাল হােক তােকে আত্মসমর্পণ করতে হবে কারণ পেরিকেন তাকে ছাড়বে না, এরপরে হয়ত নির্যাতন করবে।

সে তার জীবিত তিনজন দাসীকে সতর্ক করে দিয়েছিল যে যতদিন না আমরা মুক্তির পথ দেখতে পাব ততদিন এখানে কারও কাছে আকারে প্রকারে ইশারা ইঙ্গিতেও নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করবি না। আর শােন, নিজেদের শুদ্ধ রাখবি, সতীত্ব হারাবি না। দাসীরা বলল, হ্যা তারা তার আদেশ পালন করবে।

দিন যাচ্ছে আর পেরিকোন একটু একটু করে তার লক্ষ্যবস্তুটির দিকে এগােচ্ছে। অলাতিয়েল যত বাধা দিচ্ছে পেরিকোনের লালসাও তত তীব্র হচ্ছে। সে যখন বুঝতে পারল অনুরােধ উপরােধে কাজ হবে না তখন কিছু কৌশল অবলম্বন করা যাক। তাতেও কাজ না হলে বলপ্রয়ােগ করবে।

পেরিকোন লক্ষ্য করেছিল যে সুন্দরী সুরাপান করতে ভালবাসে, বেশি নয়, অল্পস্বল্প। ধর্মে নিষিদ্ধ তাই অলাতিয়েল কখনও নিয়মিত সুরাপান করতাে না। এখানে এসে সে একটু-আধটু পান করতাে বটে তবে প্রতিদিন নয়, মাঝে মাঝে আচার-চাটনির মতাে মুখের স্বাদ বদলাত।

পেরিকেন এটা লক্ষ্য করেছিল তাই প্রতিবারই আহারের সময় সুস্বাদু অথচ বিভিন্ন স্বাদ, বর্ণ ও গন্ধে সুরা পরিবেশন করতে আদেশ দিল। অলাতিয়েলের একটু একটু করে নেশা ধরে গেল। সঙ্গে সুরা ছাড়া আহার তার রুচিকর লাগে না।

পেরিকোন ঠিক করলাে এই পথেই কাজ উদ্ধার করতে হবে।

পেরিকোন একটা ভােজসভার আয়ােজন করল। ভালাে ভালাে খাবার আর ভালাে ভালাে সুরার আয়ােজন করা হল। ভােজসভার মধ্যমণি অবশ্যই অলাতিয়েল। তার তুল্য সুন্দরী সেখানে আর একজনও ছিল না। পেরিকোনের মনে বেশ গর্বের ভাব, দেখছ তাে, কি উমদা চিজ আমি ঘরে তুলেছি।

পেরিকেন তার স্টুয়ার্ডকে গােপনে নির্দেশ দিল যে ঐ সুন্দরী মহিলার সুরাপাত্র কখনও খালি রাখবি না। খালি হলেই অন্য স্বাদের সুরা দিয়ে বলবি, একটু চেখে দেখুন, আগের চেয়ে এটা আরও ভালাে লাগবে, ওটুকু খেলে আপনার নেশা হবে না।

লােভে পড়ে ঐ একটু একটু করে খেতে খেতেই অলাতিয়েল অনেকটা খেয়ে ফেলল, বেশ একটু গােলাপী নেশা হল, দুঃখ-কষ্ট সব ভুলে গেল, রীতিমতাে ফুর্তি, ফুর্তিতে টরেটম।

আলাতিয়েল দেখল কয়েকটি যুবতী নৃত্য করেছে। তারাও নেশা করেছে। অলাতিয়েলও আর বসে থাকতে পারল না, সে-ও নিজে যে নাচ শিখেছিল সেই নাচ আরম্ভ করলাে। নাচ শেষ করে এসে বসতেই আরও খাদ্য ও সুরা। পেরিকেন বুঝল সুন্দরীকে আলিঙ্গন করতে আর বেশিক্ষণ অপেক্ষা। করতে হবে না।

ভােজসভা শেষ হল অনেক রাত্রে। অতিথিরা বিদায় নিল। চলবে কি অলাতিয়েল ভালাে করে ঈড়াতেই পারছে না। পেরিকোন ইশারায় বলল, চলাে সুন্দরী তােমাকে তােমার ঘরে পৌঁছে দিই।

অলাতিয়েল এলােমেলাে বকছে। পেরিকোন তার কোমড় জড়িয়ে ধরলাে। কোনাে বাধা পেল না। উলটে অলাতিয়েল তার দুই হাত পেরিকোনের কাধে রাখল। সে তাে তখন নিজের মধ্যে নেই। তাের খয়ালই নেই সে কোথায় আছে বা কি করছে।

নিজের ঘরে ঢুকে অলাতিয়েল প্রতিদিনের অভ্যাসমতাে শয়নের পূর্বে তার সমস্ত পােশাক ছেড়ে বলল, লজ্জা নেই, পুরুষমানুষটা যেন তার পরিচারিকা, তারপর সে তার বিছানায় শুয়ে পড়ল। বস্ত্র উন্মােচন করতে পেরিকোনও দেরি করলাে না। সমস্ত বস্ত্র ফেলে দিয়ে সে সুন্দরীর পাশে শুয়ে পড়ল এবং বলাই বাহুল্য তাকে জড়িয়ে ধরলাে।

অলাতিয়েলের এই প্রথম পুরুষ সঙ্গম। নেশাগ্রস্ত হলেও তার বেশ ভালােই লাগছিল। নারীকে উত্তপ্ত করবার নানা রঙ্গ পুরুষটির জানা ছিল। সুন্দরীও তাকে উৎসাহ দিচ্ছিল। বাকি রাতটুকু পরমানন্দে হল।

অলাতিয়েল সেই যে একবার স্বাদ পেয়ে গেল তাে থেকে নিজেকে সে মুক্ত করতে পারছে না। কোথায় হতে যাচ্ছিল রানী আর এখন হল জমিদারের শয্যাসঙ্গিনী।

ভাবছিল, মন্দ কি, রানীর হালে তাে বেশ সুখেই আছি। কিন্তু অবিরাম সুখ সকলের কপালে লেখা নেই।

পেরিকোনের একটি ভাই ছিল, নাম মারাততা, সুদর্শন পঁচিশ বছরের তরতাজা যুবক, সর্বদা যেন টগবগ করে ফুটছে। অলাতিয়েলকে সে দেখেছে এবং দেখে পর্যন্ত হাবুডুবু খাচ্ছে। ঐ সুন্দরীকে চাই। পেরিকোনের তুলনায় মারাতাে অধিকতর কাম্য। অলাতিয়েলও ওকে দেখেছিল এবং ওর প্রতি যে আকৃষ্ট হয়নি তা বলা যায় না।

পেরিকেন তার ভাইকে বােধহয় সন্দেহ করতাে তাই অলাতিয়েলকে পাহারা দেবার ব্যবস্থা করেছিল। মারাতাে দেখল সুন্দরীকে ছিনিয়ে আনতে হলে পাহারাওয়ালাদের ধোঁকা দিতে হবে। তাই সে এক ঘৃণ্য চক্রান্ত করলাে যার পরিণতি হয়েছিল মর্মান্তিক।

এই সময়ে শহরের বন্দরে মালভর্তি একটা জাহাজ ছিল। জাহাজখানার পরিচালক ছিল দু’জন জেনােয়াবাসী। জাহাজ মাল নিয়ে যাবে পিলােপনিজের ক্ল্যারেঞ্জা বন্দরে।

পাল খাটিয়ে জাহাজ প্রস্তুত, অনুকূল বাতাস বইলেই জাহাজ ছাড়বে। ঐ দু’জন জেনােয়াবাসীর কাছে মারাতাে প্রস্তাব করলাে সে ও একজন মহিলা তাদের জাহাজে যাত্রী হতে চায়। জাহাজের মালিকরা রাজি হল। তারা বলে দিল তাহলে যত শীঘ্র সম্ভব চলে এস, বাতাস উঠলেই আমরা জাহাজ ছেড়ে দেব। তােমার জন্যে অপেক্ষা করব না।

এইবার মারাতাের আসল সমস্যা সুন্দরীকে কি করে তাের দাদার বাড়ি থেকে বার করে এনে জাহাজে তুলবে? মারাতাের তাে দাদার বাড়ির অন্ধিসন্ধি সব চেনা। দু’জন বিশ্বাসী তােক সে বেছে নিল কাজ উদ্ধার করবার জন্যে।

রাত্রি যখন গভীর তখন মারাতাে তার সঙ্গী দু’জনকে নিয়ে চুপিসাড়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকলাে। কেউ তাদের দেখতে পায় নি। বাড়িতে ঢুকে একটা অন্ধকার জায়গায় ওরা কিছুক্ষণ লুকিয়ে রইল। কান পেতে শােনবার চেষ্টা করল কোনাে দিক থেকে কোনাে আওয়াজ আসছে কিনা। না, সারা বাড়ি নিস্তব্ধ। বিপদের কোনাে আশঙ্কা নেই।

তখন মারাতাে কোমর থেকে ধারালাে একখানা ছােরা বার করে বাগিয়ে ধরল, তারপর সুন্দরীকে নিয়ে পেরিকেন যে ঘরে শুয়ে আছে, পা টিপে টিপে সেই ঘরের সামনে এসে কিছুক্ষণ দাঁড়াল। ওরা ঘুমিয়েই পড়েছে। কোনাে শব্দ শােনা যাচ্ছে না। দরজা খােলা ছিল কিন্তু পর্দা ফেলা ছিল।

মারাতাে পর্দা সামান্য সরিয়ে দেখল দু’জনে পাশাপাশি ঘুমােচ্ছে। পেরিকোন খালি গায়ে চিত হয়ে শুয়ে আছে, সুন্দরী পাশ ফিরে শুয়ে আছে, একটা পাতলা চাদরে দেহ আবৃত।

মারাতাে মনে মনে খুব আনন্দিত। যদিও তার রগ দুটো দপ দপ করছিল। ছােরা বসাতে কোনাে অসুবিধে হবে না। সে খাটের দিকে এগিয়ে গেল, সঙ্গী দু’জন পিছনে। তারপর দু’হাত শক্ত করে ছোরা ধরে সজোরে পেরিকোনের বুকে বাঁ দিকে বসিয়ে দিল। ছােরা হৃৎপিণ্ড বিদ্ধ করলাে, সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু।

এবার মারাতাে সঙ্গীদের বলল, ঐ সিন্দুকে কিছু অলংকার ও জহরতাে আছে, আর যদি কোনাে দামী জিনিস পাস তাহলে পুঁটলি বেঁধে আমাকে দে। সঙ্গীরা সিন্দুক খুলে জিনিস বার করতে লাগল আর মারাতাে অলাতিয়েলকে ঘুম থেকে তুলে বলল, চুপ, একদম চেঁচাবে না, তােমার কোনাে ভয় নেই নইলে দেখছাে তাে পেরিকোনের যা অবস্থা তােমারও তাই হবে। সে বেচারী ভয়ে নির্বাক হয়ে রইল।

অলাতিয়েল ও অলংকার ইত্যাদির পুটলি নিয়ে মারাতাে জাহাজে উঠল। জাহাজে ওঠবার আগে সঙ্গীদের বিদায় করে দিয়েছিল। মারাতদের বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না কারণ অনুকূল বাতাস উঠল, জাহাজ ছেড়ে দিল।

মাত্র কয়েকদিনের তফাতে বিপদ ঘটায় অলাতিয়েল হতবাক ও ভীত, মাঝে মাঝে অশ্রুমােচন করে। কিন্তু কি করবে? সে তাে একা এবং অসহায়। তবে মারাতাে তার খুব যত্ন করতে লাগল, ভালাে ভালাে কথা বলতে লাগল। ভাষা না বুঝলেও মারাতাের আচরণ অলাতিয়েলের ভালােই লাগল, বলতাে কি মারাতাের আবেদনে সে সাড়া দিতেও থাকল এবং পেরিকোনের কথা শীঘ্রই ভুলে গেল। তখনও জানে না যে আবার শীঘ্রই সে হাত বদল হবে।

অলাতিয়েল যে সুন্দরী শ্রেষ্ঠ, তাকে দেখলেই পুরুষের মাথা ঘুরে যায় একথা তাে আমরা অনেকবার বলেছি, অতএব তাকে দেখে জাহাজের মালিক জেনােয়াবাসী দুই ভাইও যে তার প্রতি ভীষণভাবে আকৃষ্ট হবে এ আর আশ্চর্য কি?

তাই দুই ভাই পরামর্শ করতে লাগল কি করে সুন্দরীর মন তাদের দিকে ফেরানাে যায় অথচ মারাতাে যেন কিছু টের না পায়। দুজনেই সুন্দরীর প্রেমে পড়েছে, দু’জনেই চেষ্টা করছে অলাতিয়েলের। মন জয় করতে।

মারাতে হয় সর্বদা অলাতিয়েলকে আগলে রাখে অথবা তার ওপর কড়া নজর রাখে। দুই ভাই অলাতিয়েলের কাছে ঘেষারও সুযােগ পায় না। এদিকে মারাতাে কিন্তু টের পাচ্ছে না যে, অলাতিয়েলকে দুই ভাই তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেবার ষড়যন্ত্র করছে।

দুই ভাই সুযােগের অপেক্ষায় তক্কে তক্কে থাকে। একদিন একটা সুযােগ জুটে গেল এবং দুই ভাই সঙ্গে সঙ্গে তার সদ্ব্যবহার করলাে। বেশ ভালাে বাতাস বইছে, জলে কেটে জাহাজ তরতর করে এগিয়ে চলেছে। মারাতাে একেবারে জাহাজের ডকে গিয়ে দাঁড়িয়ে গভীরভাবে কিছু চিন্তা করছে। দুই ভাই কখন তার পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে তাে সে টের পায় নি।

দুই ভাই সহসা দু’দিক থেকে মারাতােকে তুলে ঝপাং করে সমুদ্রের জলে ফেলে দিল। কেউ হয়ত এ দৃশ্য দেখে থাকবে, দেখে থাকলেও কিছু করবার ছিল না। জাহাজ ততক্ষণে অনেক দূর এগিয়ে গেছে এবং কোনাে সামুদ্রিক জন্তু মারাতােকে আক্রমণ করে গভীর জলে টেনে নিয়ে গেছে।

কেউ একজন এই দৃশ্য দেখেছিল কারণ সে অলাতিয়েলকে দুঃসংবাদটি দিয়েছিল। দুঃসংবাদ শুনে অলাতিয়েল কেঁদে ফেলল। যাই হােক মারাতাে লােকটা খারাপ ছিল না, তার সঙ্গে ভালাে ব্যবহারই করছিল। এখন সে নিজেকে অসহায় ভাবল। তার বরাতে কি আছে কে জানে? কার পাল্লায় পড়বে তাই-বা কে জানে? ভগবান তাকে রূপ দিলেন কেন? সে এইসব চিন্তা করতে করতে কাঁদতে লাগল।

একটু পরেই দুই ভাই একটু সাজগােজ করে তার কাছে এসে তাকে সান্ত্বনা দিতে লাগল, অনেক ভালাে ভালাে কথা আর উজ্জ্বল ও সুনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা শােনালাে। অলাতিয়েল ওদের ভাষা জানে না। এক বর্ণও বুঝল না কিন্তু তাদের মনােভাব বুঝতে তার অসুবিধে হল না। সে কিছুটা আশ্বস্ত হল। দেখা যাক এরা তার সঙ্গে কি রকম ব্যবহার করে।

এইবার দুই ভাইয়ে দ্বন্দ্ব লাগল। দুই ভাইয়ের মধ্যে কে আগে সুন্দরীকে উপভােগ করবে? এ বলে আমি ও বলে আমি। প্রথমে যুক্তি, তারপর তর্ক, তারপর হাতাহাতি। সে ধুন্ধুমার ব্যাপার। হাতাহাতিতে যখন মীমাংসা হল না তখন দু’জনেই ছােরা বার করলাে। একজন অপরজনকে বলে তােকে আমি শেষ করবাে এবং সত্যিই এক ভাই শেষ হয়েও গেল। অপর ভাই গুরুতর আহত, বাঁচে কি মরে ঠিক নেই।

দুই ভাইয়ের কাণ্ড দেখে অলাতিয়েল ফাপরে পড়ল। এই ভাইটাও যদি মরে যায় তাহলে জাহাজে একা পড়ে যাবে আর মাঝিমাল্লাগুলােকে দেখলেই তাে মনে হয় এক-একজন এক-একটা রাক্ষস, তাকে ছিড়ে টুকরাে টুকরাে করে খাবে। কে তাকে দেখবে? দুই ভাইয়ের কয়েকজন আত্মীয় বা বন্ধু জাহাজে আছে কিন্তু এই ভাইটাও যদি মরে যায় তাহলে তাে ওরা এই সর্বনাশের জন্যে ওকে দায়ী করে ওর ওপর অত্যাচার চালাবে কি হয়তাে জলেই ফেলে দেবে।

যাই হােক অপর ভাই কিছু সুস্থ হয়ে তার বন্ধুবান্ধবদের বােঝাল যে তােমরা কিছু কোরাে না, সুন্দরীর কোনাে দোষ নেই। কারণ তােরা ইতিমধ্যে উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল। অলাতিয়েল আপাততঃ নিশ্চিন্ত বােধ করলাে কিন্তু তা ক্ষণস্থায়ী।

জাহাজে এসে ক্ল্যারেঞ্জা বন্দরে ভিড়ল। আহত ভাই অলাতিয়েলকে অপরের সহায়তায় জাহাজ থেকে নামিয়ে একটা সরাইখানায় উঠল। অচিরেই সেই অঞ্চলে অলাতিয়েলের আশ্চর্য রূপের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল এবং কথাটা ক্রমশঃ মােরিয়ার রাজকুমারের কানে উঠল। রাজকুমার তখন ক্ল্যারেঞ্জাতে কোনাে কাজে এসেছিল।

তাহলে তাে এমন অপূর্ব রূপসীকে একবার দেখতে হয়। রাজকুমার তাকে দেখে ভাবল সত্যিই অপূর্ব; কিন্তু সে যা শুনছিল এ তাে তাের চেয়ে অনেক বেশি সুন্দরী, এর তাে তুলনা নেই। এমন রূপসীকে যদি স্পর্শ করা না যায় তাহলে জীবনটাই বৃথা। রাজকুমারের আর কোনাে চিন্তা নেই, কি করে এই রত্নটিকে ঘরে তুলবে।

এই অঞ্চলে মােরিয়ার রাজকুমারের দোর্দণ্ড প্রতাপ। তাকে কোনােভাবেই অবহেলা করা যাবে না। তাই আহত ভাইয়ের বন্ধুদের কানে কথাটা যখন পৌঁছল যে স্বয়ং রাজকুমারের নজর পড়েছে এই আশ্চর্য রূপসীর ওপর তখন ওরা আর কোনাে ঝুঁকি না নিয়ে অলাতিয়েলকে রাজকুমারের প্রাসাদে পাঠিয়ে দিল।

রাজকুমার তাে খুশি হলই এমনকি অলাতিয়েলও। নিরাপদ একটা আশ্রয় তাে পাওয়া গেল । রাজকুমারও ওর ভাষা বােঝে না কিন্তু ওর রূপ তাে বটেই, চলাফেরা ও আচরণ দেখে বুঝল যে মেয়েটি যদিও বা রাজকন্যা না হয় তাহলেও নিশ্চয়ই কোনাে অভিজাত পরিবারের কন্যা। রাজকুমারের আকর্ষণ আরও তীব্র হল। রাজকুমার অলাতিয়েলকে বিলাস ও আরামে রাখতে যত্নবান হল। তার যে কোনাে অসুবিধে না হয়। বলতে কি রাজকুমার অলাতিয়েলকে রক্ষিত অপেক্ষা নিজের পত্নী মনে করতে লাগল।

অলাতিয়েলও সন্তুষ্ট। প্রথমত এটা রাজবাড়ি বলে কথা এবং অনেক বিপদের পর নিরাপদ ও আকর্ষণীয় একটা আশ্রয় সে পেয়েছে। বিশ্রাম ও আরাম পেয়ে তার মলিনতা ঘুচে গেল, রূপ যেন আরও শতগুণে বেড়ে গেল। দিকে দিকে তার রূপের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল।

রূপের এই খ্যাতি এথেনসের ডিউকের কানেও উঠল। ডিউক নিজেও সুদর্শন, সুরুচিপূর্ণ শক্তসমর্থ যুবক। নানা বিদ্যায় পারদর্শী। মােরিয়ার রাজকুমারের মতাে ডিউকও ভাবল এমন যার রূপ তাকে তাে অবশ্যই দেখা উচিত। ডিউক রাজকুমারের বন্ধু। মাঝে মাঝে ডিউক রাজকুমারে প্রাসাদে আসে বা রাজকুমার ডিউকের প্রাসাদে। সেই হিসেবে ডিউক একদিন মােরিয়ার রাজকুমারের প্রাসাদে এসে হাজির, সঙ্গে মেলা ভৃত্য, সেবক, লােক-লস্কর। ডিউককে রাজকুমার সাদর অভ্যর্থনা জানিয়ে যথাচিত মর্যাদার সঙ্গে আপ্যায়ন করলাে।

ডিউক একদিন কথা প্রসঙ্গে বলল, হ্যাঁ হে শুনছি নাকি তুমি একটি রূপসীরতুকে ঘরে তুলেছ? তার মতাে রূপসী নাকি সারা জাহাতে আর একজনও নেই।

রাজকুমার বলল, সারা জাহাতে বর্তমানে তাে নেই, অতীতেও ছিল না। এমন অতুলনীয় রূপ তুমি কখনও দেখা তাে দূরের কথা, কল্পনা করতেই পারবে না বন্ধু, নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারবে না।

বলাে কি হে, তাহলে তাে এই আশ্চর্য নারীরত্নকে একবার দেখতে হয়, ডিউক বলল।

নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই, আমার সঙ্গে এসাে, চক্ষু-কর্ণের বিবাদ ভঞ্জন হবে, বলে রাজকুমার ডিউককে অন্তঃপুরে নিয়ে গেল। ইতিমধ্যে অলাতিয়েলের কাছে খবর পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। রাজঅতিথিকে সংবর্ধনা জানাবার জন্য সেও প্রস্তুত হয়ে বসেছিল। দু’জনে ঘরে প্রবেশ করতে অলাতিয়েল যথারীতি সম্ভাষণ জানাল। তার মুখ উজ্জ্বল হল। আহা মরি মরি, ঘর যেন আরও উজ্জ্বল হল। ডিউক ভাবল, সত্যই আশ্চর্য, একেই বলে জগৎ আলােকরা রূপ।

দুই রাজকুমার রূপবতীর দু’পাশে বসলাে কিন্তু মুশকিল যে ওদের অনুরাগ উপলব্ধি করলেও অলাতিয়েল ওদের কথা বুঝতে পারল না। ডিউক বেশি বলছে না, সে মুগ্ধ হয়ে অপলক দৃষ্টিতে রূপসীর রূপসুধা পান করতে লাগল। এই নারী বােধহয় পৃথিবীর মানবী নয় নইলে মানুষের এমন অত্যাশ্চর্য রূপও কি সম্ভব? ডিউক মনে মনে সংকল্প করলাে এই যুবতীর অধসুধা পান না করা পর্যন্ত সে তৃপ্ত হতে পারবে না। যে কবে হােক রাজকুমারের প্রাসাদ থেকে সুন্দরীকে হরণ করতেই হবে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। 

অলাতিয়েলকে রেখে এক সময়ে দুই বন্ধু বিদায় নেয়। ডিউক নিজের ঘরে ফিরে এলাে। তার মনে হল এ আমি কি দেখলুম! এমন নিখুঁত সুন্দরীও হয়! পরমাসুন্দরী বললে কিছুই বলা হয় না। সমুদ্রের পাতলা ঝিনুকের মতাে কান, কান পর্যন্ত টানা টানা চোখ, হাত তাে নয় যেন পদ্মফুল, ধনুকের মতাে ভুরু, মুক্তাতুল্য শুভ্র দাঁত, ডালিমের মতাে আঙুলের নখ, গােলাপকুঁড়ির মতাে ঠোট, ঘন কালাে আঙুরের থােকার মতাে চুল, সারা দেহ থেকে মৃগনাভিতুল্য সৌরভ ঘরখানা আমােদিত করে রেখেছিল। না, এসব উপমাও বুঝি ঠিক হল না। মােরিয়ার রাজকুমারের মতাে সুখী যুবক এখন বােধহয় আর একজনও নেই।

ডিউক যতই চিন্তা করছে, সুন্দরীর প্রতি আকর্ষণও তত তীব্র হচ্ছে। উত্তেজিত হয়ে উঠছে, শিরা ফুলে উঠছে, কি করে এই অতুলনীয়াকে সে নিজের পালংকে তুলবে।

একটা কিছু করতেই হবে, ছলে বলে কৌশলে, যেভাবে হােক ঐ মেয়ে তার চাই। ডিউকের একজন বিশ্বাসী ভৃত্য ছিল, তার নাম চিউরিয়াচি। তার সঙ্গে ডিউক চূড়ান্ত চক্রান্ত রচনা করে ফেলল। চিউরিয়াচির সহায়তায় ডিউক তার লােকলস্কর, মালপত্র ও ঘােড়াগুলি এমনভাবে প্রস্তুত রাখল যে ওরা থাকলে যেন যে কোনাে সময়ে মােরিয়ার প্রাসাদ থেকে নিষ্ক্রান্ত হতে পারে।

গভীর রাত্রে অস্ত্র হাতে নিয়ে একজন সহযােগী নিয়ে ডিউক মােরিয়ার রাজকুমারের শয়নকক্ষে প্রবেশ করল। চিউরিয়াচি-ই সব কিছু গােপন ব্যবস্থা করে রেখেছিল যাতে ডিউক সকলের অগােচরে শয়নকক্ষে প্রবেশ করতে পারে। যদিও মৃদু বাতাস বইছিল তবুও রাত্রিটা বেশ গরম।

ঘরখানা বেশ বড়। ঘরে ঢুকে ওরা দেখল সুন্দরী পালংকে নিদ্রামগ্ন কিন্তু মােরিয়ার রাজকুমার সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে জানালার ধারে দাঁড়িয়ে দূরে সমুদ্রের দিকে চেয়ে আছে, হয়ত এই আশায় যে সমুদ্র থেকে আরও শীতল বাতাস এসে তার নগ্নদেহ শীতল করবে।

কি করতে হবে সে নির্দেশ ডিউক তার সহযােগীকে আগেই দিয়ে রেখেছিল। ডিউক নিজে পা টিপে জানালা পর্যন্ত এগিয়ে গিয়ে মােরিয়ার রাজকুমারের পিঠে ছােরাখানা বসিয়ে দিল। ছােরার অগ্রভাগ পিঠ ভেদ করে অপর দিকে বেরিয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু। তারপর মৃতদেহখানা তুলে ধরে জানালা দিয়ে বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিল।

সমুদ্রের ধারে কয়েকটা পুরনাে ভাঙা বাড়ি ছিল। লাশটা সেই ভাঙা বাড়িগুলাের মধ্যে কোথাও গিয়ে পড়ল। ঐ বাড়িগুলােতে লােকজনের যাওয়া-আসা ছিল না। ডিউক ভাবল ঐ লাশ আর কেউ দেখতে পাবে না। ইতিমধ্যে চিউরিয়াচিও সাহায্য করবার জন্য ঘরে এসেছে। ডিউকের সহযােগী ততক্ষণে দড়ির একটা ফাস তৈরি করে ফেলেছে এবং সে ফাসটা চকিতে চিউরিয়াচির গলায় গলিয়ে জোরে টেনে ধরলাে। শ্বাস বন্ধ হয়ে চিউরিয়াচি মারা গেল। তার লাশটাকেও সেই ভাঙা বাড়ির মধ্যে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হল।

ডিউক ও তার সঙ্গী দু’জনেই এখন সন্তুষ্ট, তাদের দুষ্কর্মের কেউ সাক্ষী রইল না। ঘরে তেলের একটা আলাে জ্বলছিল। ডিউক আলােটা নিয়ে সুন্দরীর পালংকের পাশে এসে দাঁড়াল। পাতলা একটা চাদরে দেহ আবৃত ছিল। ডিউক চাদরটা তুলে ফেলল। আহা! যেন পরিপূর্ণ জ্যোৎস্না। সুন্দরী তখন ঘুমােচ্ছে। ডিউক মুগ্ধ। নগ্ন অলাতিয়েলকে আরও সুন্দরী মনে হচ্ছে।

ডিউকের চোখের পাতা পড়ে না। কিন্তু দেরি করবার সময় নেই তা নইলে ডিউক বােধহয় তখনি সুন্দরীর ওপর ঝাপিয়ে পড়ত। সে যে বন্ধু ও বিশ্বাসী ভৃত্য হত্যার দায়ে পাপী সে অনুশােচনা তাকে একটুও স্পর্শ করেনি। তবুও ডিউক সুন্দরীকে স্পর্শ না করে থাকতে পারল না। সুন্দরী ভাবল রাজকুমারই বুঝি তাকে আদর করছে।

যাই হােক এবার ডিউক তার কয়েকজন লােক আনিয়ে অতি সাবধানে অলাতিয়েলকে এমনভাবে পালংক থেকে তুলে নিল যে অলাতিয়েল কিছু বুঝতেই পারল না। ওরা সকলের নজর এড়িয়ে নিঃশব্দে প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে এলাে এবং তাকে ঘােড়ার পিঠে তুলে সকলে তখনি স্থান ত্যাগ করে এথেন্স অভিমুখে যাত্রা করল।

ডিউক বিবাহিত। প্রাসাদে ডাচেস আছে। সুন্দরীকে যেখানে তােলা যাবে না তাই শহরের উপকন্তে ডিউকের আরও যে একটি বিলাসবহুল প্রমােশালা ছিল, অলাতিয়েলকে সেই প্রাসাদে তুলল। সমুদ্রসৈকতে প্রাসাদটি বড়ই মনােরম ও নির্জন। বাড়ি ঘিরে চারদিকে উদ্যান, উদ্যানে মর্মমূর্তি, ফোয়ারা। সুন্দরীর জন্য সকল রকম স্বাচ্ছন্দ্যের ব্যবস্থা করা হল।

এদিকে রেজায় মােরিয়ার রাজকুমারের সভাসদ ও বয়স্যরা সকাল হতে জমায়েত হয়েছে। ইতিমধ্যে অনেক বেলা হয়ে গেছে। কিন্তু রাজকুমার এখনও ঘুম থেকে ওঠেন নি। সূর্য মধ্যগগনে উঠল তারপর পশ্চিমদিকে ঢলে পড়ল। সকলে আশ্চর্য, দু’জনের মধ্যে একজনেরও এখনও ঘুম ভাঙল না?

শয়নকক্ষের দরজা খুলে দেখা যাক। দরজায় ধাক্কা দিতেই দরজা খুলে গেল। কিন্তু ঘর শূন্য।তখন সকলে ভাবল সুন্দরীকে নিয়ে এবং কাউকে কিছু না বলে রাজকুমার কোথাও গেছেন। এ নিয়ে আর কেউ কোনাে চিন্তা করলাে না।

শহরে একটা পাগলা ছিল। এমন পাগল সব শহরে পাড়ায় দু’এক জন দেখা যায়। তারা ইচ্ছামতাে যত্রতত্র ঘুরে বেড়ায়, দয়া করে কেউ কিছু খেতে দিলে খায়, পরিত্যক্ত বাড়িতে বা কারও বাড়ির বারান্দায় ঘুমােয়।

এখন এই শহরের পাগলটা ঘুরতে ঘুরতে কি খেয়ালে কে জানে সমুদ্রের ধারে পরিত্যক্ত সেই ভাঙা বাড়িগুলাের মধ্যে ঢুকেছে। ভাঙা বাড়ির এক জায়গায় পাগলা চিউরিয়াচির লাশ দেখতে পেয়ে তার গলায় বাধা দড়িটা ধরে টানতে টানতে রাস্তায় বার করে এনে হাঁটতে লাগল। তার মুখের ভাব দেখে মনে হচ্ছে যেন সে একটা মজার ব্যাপার ঘটাচ্ছে।

শহরের মানুষের কাছে চিউরিয়াচি অপরিচিত নয়। তারা মৃত চিউরিয়াচিকে দেখে অবাক। পাগলাকে তারা জিজ্ঞাসা করলাে, এই লাশ তুই কোথায় পেলি?

পাগলা পথ দেখিয়ে তাদের সেই ভাঙা বাড়ির মধ্যে নিয়ে গিয়ে জায়গাটা দেখিয়ে দিল। অনেক লোেক ভাঙা বাড়িগুলাের ভেতরে ঢুকেছিল। অচিরে প্রিন্সেরও মৃতদেহ আবিষ্কৃত হল। মৃত প্রিন্সকে দেখে শহরবাসী শােকে অভিভূত।

ভাঙা বাড়ি থেকে প্রিন্সের মৃতদেহ সযত্নে বার করে এনে তারা প্রিন্সের দেহ সসম্মানে কবর দিল।

বুঝতে কারও বাকি রইল না যে এমন ঘৃণ্য ও নৃশংস কাজ ডিউক অফ এথেন্স করেছে এবং অলাতিয়েলকে নিয়ে গােপনে পালিয়ে গেছে।

প্রজারা তােখন প্রিন্সের ভাইকে রাজসিংহাসন গ্রহণ করতে বলে বলল, এই নির্মম হত্যার প্রতিশােধ নিতে হবে। নতুন রাজা বুঝলেন যে এথেন্সের ডিউক তাদের আতিথ্যের সুযােগ নিয়ে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। প্রতিহিংসা নেওয়া অবশ্যই কর্তব্য। নতুন রাজা লােকলস্কর সৈন্যসামন্ত সংগ্রহ করে ডিউকের রাজ্য আক্রমণ করবার জন্যে অগ্রসর হল।

এথেন্সের ডিউকও খবর পেয়েছে যে মােরিয়ার নতুন রাজা সৈন্যসামন্ত নিয়ে তার রাজ্য আক্রমণ করতে আসছে অতএব সে নিজেও আক্রমণ করবার জন্যে প্রস্তুত হতে লাগল। প্রতিবেশী রাজ্যের রাজারাও সাহায্য করতে এগিয়ে এল। এদের মধ্যে প্রধান হলেন কনস্ট্যান্টিনােপলের রাজা। তিনি নিজে এলেন না কিন্তু তার ছেলে কনস্ট্যান্ট এবং ভাইপাে ম্যানুয়েলকে পাঠালেন।

সুশিক্ষিত ও অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত সৈন্যবাহিনীর অগ্রভাগে রইল কনস্ট্যান্ট ও ম্যানুয়েল। সৈন্যদের পরিচালনা করে তারা এথেন্সে পৌঁছলে ডিউক বিশেষ করে ডাচেস দুই ভাইকে সাদর অভ্যর্থনা জানাল। ডাচেস হলেন কনস্ট্যান্টের বােন তাই তার অভ্যর্থনা আরও প্রগাঢ় হল।

যুদ্ধ আসন্ন, চারিদিকে সাজ সাজ রব। সকলেই ব্যস্ত। এরই মধ্যে ডাচেস কনস্ট্যান্ট ও ম্যানুয়েলকে তার ঘরে ডেকে এনে আপ্যায়িত করতে করতে নিজের দুঃখের কাহিনী শােনাতে লাগল। ঐ মেয়েমানুষটা এসে তার সুখশান্তি নষ্ট করেছে। ডিউক তার দিকে ফিরেও চায় না, তাকে অবহেলা করছে। ডাচেস অনুরােধ করলাে তারা যেন ডিউককে ঐ কালনাগিনীর হাত থেকে যত শীঘ্র সম্ভব উদ্ধার করে।

কনস্ট্যান্ট ও ম্যানুয়েল অলাতিয়েলের কাহিনী কিছু শুনে এসেছিল। এখন ডাচেসের মুখ থেকেও অনেক কিছু শুনল। তাকে আশ্বস্ত করলাে তারা যথােপযুক্ত ব্যবস্থা করবে।

অলাতিয়েলকে কোথায় রাখা হয়েছে তা তারা ডাচেসের কাছ থেকে শুনে নিল।

অলাতিয়েলকে দেখবার জন্য কনস্ট্যান্ট ব্যগ্র হয়ে উঠেছিল। ওরা দুজনেই ডিউককে অনুরােধ করলে সুন্দরীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে। ডিউক রাজি হল এবং প্রিন্স যে ভুল করেছিল ডিউকও সেই ভুল করলে।

ডিউক ঠিক করলাে একটা বাগানবাড়িতে অলাতিয়েলকে নিয়ে আসবে, শহরের কয়েকজন গণমান্য নরনারীকে আমন্ত্রণ জানাবে আর সেই সঙ্গে বিরাট ভােজের আয়ােজন করবে।

ডিউক দেরি করে নি। শীঘ্রই অলাতিয়েলকে এক বাগানবাড়িতে এনে সুসজ্জিত মণ্ডপে বসিয়ে কনস্ট্যান্টের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল। বাছা বাছা কয়েকজন মাত্র ব্যক্তিকে ডিউক আমন্ত্রণ করেছিল।

কনস্ট্যান্টও অলাতিয়েলকে দেখে একেবারেই মুগ্ধ। তার দিক থেকে সে দৃষ্টি ফেরাতে পারছে না। এমন রূপ সে কখনও দেখে নি, কল্পনাও করতে পারে নি যে কোনাে নারী এমন রূপসী হতে পারে। এমন রূপসীর ওপর যে কোনাে পুরুষেরই লােভ হওয়া স্বাভাবিক। তাই ডিউক বিশ্বাসঘাতকরা করে অলাতিয়েলকে ছিনিয়ে এনে কোনাে অন্যায় করে নি।

অলাতিয়েলকে ছেড়ে আসতে কনস্ট্যান্টের খুব কষ্ট হচ্ছিল। সে বুঝতে পারল এমন রত্নটিকে ঘরেন। তােলা পর্যন্ত তার মনে শান্তি নেই। কি করে সুন্দরীকে অপহরণ করা যাবে সে নিয়ে সে চিন্তা করতে লাগল। সে যে ডিউকে রক্ষা করতে এসেছে সে কথা সে ভুলেই গেল। সে যে অলাতিয়েলকে দেখে মুগ্ধ হয়েছে একথা সে কাউকে জানতে দিল না।

ওদিকে প্রিন্স তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে ডিউকের সীমানায় এসে গেছে। কনস্ট্যান্ট, ম্যানুয়েল ও তার সেনাপতি এবং বাহিনী নিয়ে প্রিন্সের সঙ্গে মােকাবিলা করতে ডিউক যাত্রা করলাে। সীমান্তের কাছ বরাবর ডিউকের সেনাপতিরা গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় সৈন্য ও কামান মােতায়েন করলাে।

কনস্ট্যান্ট তখন অন্য কথা ভাবছে। সুন্দরীকে কি ভাবে অপহরণ করবে সেই কথাই সে চিন্তা করছে। ডিউক এখন তার প্রাসাদে নেই অতএব এই হল বিশেষ সুযােগ।

সীমান্তে কয়েক দিন পরে সে এমন ভান করলাে যেন সে খুব অসুস্থ। সে এখনি এথেন্সে ফিরে যেতে চায়। ডিউকের অনুমতি নিয়ে আর ম্যানুয়েলকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে কনস্ট্যান্ট মনের আনন্দে এথেন্সে বােনের কাছে ফিরে গেল। বােনও তাে মেয়েমানুষটাকে তাড়াতে চায় আর সেজন্যে ভায়ের সাহায্য দরকার। ভাইকে সে সর্বতােভাবে সাহায্য করবে।

ডাচেস কিন্তু বুঝতে পারে নি যে ভাই নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্যে কাজ করছে আর বােন ভাবছে ভাই যা কিছু করছে তার জন্যেই। ভাইকে ডাচেস সাবধান করে দিল যে সেকনস্ট্যান্টকে সাহায্য করছে এ কথা ডিউক যেন জানতে না পারে। ভাই বলল সে এমন ভাবে কাজ করবে যে ডিউক কেন কেউ জানতে পারবে না।

কনস্ট্যান্ট কয়েকজন বিশ্বাসী লােক সংগ্রহ করেছিল, তাদের সাহায্যে সে দ্রুতগতির ছােট একটা জাহাজ যােগাড় করে সেটি একটি বন্দরে প্রস্তুত রাখল।

তারপর কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে যে বাড়িতে অলাতিয়েল ছিল সেই বাড়িতে গেল। কনস্ট্যান্টকে দেখে অলাতিয়েল খুশি হল। কনস্ট্যান্ট নাকি তাকে উদ্ধার করবে।

কনস্ট্যান্ট গল্প করতে করতে অলাতিয়েলকে তার বাড়ির বাগানে গেটের কাছে এনে বলল, ডিউককে একটা জরুরী বার্তা পাঠাতে হবে। আমি এখন আসি, পরে দেখা হবে।

গেট থেকে সমুদ্র কাছেই, জাহাজখানাও কাছেই রাখা হয়েছিল। বাগান থেকে বেরােবার আগেই সে লুকিয়ে থাকা তার সঙ্গীদের ইশারা করে দিয়ে নিজে জাহাজে গিয়ে উঠল। সঙ্গীরা অলাতিয়েলকে ধরে তার মুখ বন্ধ করে দিয়ে জাহাজে এনে তুলল।

জাহাজে উঠে অলাতিয়েল কনস্ট্যান্টকে দেখে কেঁদে ফেলল। কনস্ট্যান্ট তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, কেঁদ না, তােমার কোনাে ভয় নেই। তােমার জন্যই আমার বােন ভীষণ মানসিক যন্ত্রণা ভােগ করছে, তার জন্যেই তােমাকে ডিউকের প্রাসাদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

লস্করদের কনস্ট্যান্ট আদেশ দিল নােঙর তােলাে, জাহাজ ছেড়ে দাও। জাহাজের মাঝিমাল্লারা দ্রুত জাহাজ চালিয়ে পরদিন ভােরে ইজিনা বন্দরে পৌঁছল।  সমুদ্রযাত্রার ক্লান্তি দূর করতে অলাতিয়েলকে নিয়ে কনস্ট্যান্ট বন্দরে নেমে শহরে ঢুকলাে। বেচারী অলাতিয়েল নিজের ভাগ্যকে দোষ দিচ্ছে। মাঝে মাঝে চোখের জল মুছছে, বলছে ভগবান তাকে এত রূপ দিল কেন?

শহরে কিছু সময় কাটিয়ে ওরা আবার জাহাজে উঠল। আবার জাহাজ ছেড়ে দিল। কয়েকদিন পরে ওরা চিয়স বন্দরে পৌঁছল। কনস্ট্যান্ট স্থির করলাে সে অলাতিয়েলকে নিয়ে এই শহরে কিছুদিন বাস করবে। এখানে লুকিয়ে থাকলে তার বাবা বা ডিউক তার সন্ধান পাবে না।

গােড়ার দিকে অলাতিয়েল কান্নাকাটি করলাে কিন্তু কনস্ট্যান্টের যত্নে ও ভদ্র ব্যবহারে সে আবার স্বাভাবিক হয়ে কনস্ট্যান্টের কাছে আত্মসমর্পণ করল অর্থাৎ সেই পুরনাে রুটিন।

তুর্কিদের রাজা অসবেক সমুদ্রপথে কোথাও যাচ্ছিল। স্মিনা বন্দরে এসে শুনল যে কনস্ট্যান্ট তার কয়েকজন রক্ষিতাকে নিয়ে চিয়স শহরে পরমানন্দে বাস করছে। অসবেক এই খবর শুনে কয়েকখানা জাহাজে সৈন্য নিয়ে গভীর রাত্রে শহরে নিঃশব্দে প্রবেশ করলাে।

কোনাে বাড়িতে কনস্ট্যান্ট আছে রাতের অন্ধকারে তা খুঁজে বার করা সম্ভব নয় তাই অসবেকের লােকজন এলােপাথাড়ি বাড়ি বাড়ি ঢুকে মেয়েদের টেনে বার করতে লাগল। যেসব পুরুষ জেগে উঠেছিল তাদের কচুকাটা করলাে, মেয়েদের বন্দী করে শহরে আগুন লাগিয়ে জাহাজে উঠল। জাহাজ বন্দর ছেড়ে স্মিনা পৌঁছল। লুণ্ঠিত মেয়েদের মধ্যে অলাতিয়েলও ছিল।

স্মিনায় এসে মেয়েদের মধ্যে অলাতিয়েলকে দেখে অসবেক খুশিতে ফেটে পড়ল। অলাতিয়েল তখন ঘুমােচ্ছিল। পরদিনই অসবেক অলাতিয়েলকে বিয়ে করলাে। পরের কয়েক মাস পরমানন্দে অতিবাহিত করলাে। চিয়স থেকে আসবার সময় অসবেক প্রচুর ধনসম্পত্তিও লুঠ করে এনেছিল, তার ওপর অলাতিয়েলের মতাে সুন্দরী ও যৌবনে ভরপুর একটি মেয়ে। পরমানন্দে দিন যে কাটবে তাতে আর সন্দেহ কি?

ওরা তাে পরমানন্দে দিন কাটাচ্ছে কিন্তু আর একদিকে আর এক কাণ্ড ঘটছে যা অসবেক টের পায় নি। কাপ্পাডােচিয়ার রাজ্য বেসানাের সঙ্গে সম্রাট এক চুক্তি করলাে। বেসানাে একদিকে থেকে অসবেককে আক্রমণ করবে আর অপর দিকে থেকে সম্রাট তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে সাঁড়াশি অভিযান চালাবেন। কিন্তু বেসানাে অতিরিক্ত কিছু দাবি করার জন্যে সম্রাট অভিযান আরম্ভ করতে পারছিলেন না, কিন্তু নিজ সন্তান কনস্ট্যান্টের বিপদ বুঝে সম্রাট বেসানাের দাবি অযৌক্তিক হলেও মেনে নিলেন এবং বেসানােকে বললেন আর দেরি না করে অসবেকের রাজ্য আক্রমণ করতে।

গুপ্তচর মারফত খবরটা অসবেকের কানে পৌছল। অসবেক দেখল এই দ্বিমুখী অভিযান তার পক্ষে সামলানাে সম্ভব হবে না, তাই সে তার কয়েকজন বিশ্বাসী অনুচরের জিম্মায় অলাতিয়েলকে স্পির্নায় রেখে সম্রাটের সৈন্যবাহিনীকে আক্রমণ করলাে, কিন্তু সে পরাজিতও নিহত হল।

বেসানাে সুবিধাবাদী। সে এই সুযােগে বিনা বাধায় স্বিনা প্রবেশ করলাে। বিজয়ী বেসানােকে স্বিনাবাসীর রাস্তার দু’ধারে দাঁড়িয়ে সম্বর্ধনা জানাল।

অলাতিয়েলকে যে কয়েকজন অনুচরের জিম্মায় অসবেক রেখে গিয়েছিল তার মধ্যে একজন ছিল অ্যান্টিওচো। তার বয়স হয়েছে, বলতে কি যুবতীর সঙ্গে প্রেম করার বয়স অতিক্রান্ত। অলাতিয়েলের প্রলােভন উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। অসবেকের বেতনভুক হলেও সে বিশ্বাসভঙ্গ করলাে। কন্যার বয়সী মেয়ের সে প্রেমে পড়ল।

অ্যান্টিওচোর একটা সুবিধে ছিল। সে অলাতিয়েলের ভাষা বুঝত। অলাতিয়েলও যেন হাতে স্বর্গ পেয়েছিল। এতদিন কেউ তার ভাষা বুঝত না, ইশারা ইঙ্গিতে মনের ভাব বােঝাতে হতাে। কারও সঙ্গে কথা বলতে না পেরে সে হাঁফিয়ে উঠছিল। কথা বলার একজন তােক পেয়ে সে বর্তে গেল।

দু’জনের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে উঠতে লাগল। মনিব তাে এখন যুদ্ধ করছে, রাস্তা পরিষ্কার। অ্যান্টিওচো তাের মনিবের প্রতি আনুগত্য, যে বিশ্বাস তার ওপর অর্পণ করা হয়েছে তা ভুলে গেল। সে অলাতিয়েলের সঙ্গে একই শয্যায় শয়ন করতে লাগল।

যখন খবর পৌঁছল যে অসবেক যুদ্ধে পরাজিত ও নিহত এবং বিজয়ী বেসাননা এগিয়ে আসছে তখন তারা আর অপেক্ষা করলাে না। তারা অসবেকের বেশ কিছু মূল্যবান সম্পদ নিয়ে শহর ছেড়ে গােপনে পলায়ন করে রােডস্ এ এলাে।

অ্যান্টিওচোর কপাল মন্দ। অলাতিয়েলকে সে বেশিদিন ভােগ করতে পারল না। গুরুতর এক পীড়ায় সে আক্রান্ত হল, বাঁচবার আশা তাকে ত্যাগ করতে হল।

অ্যান্টিওচোর বুঝল তার দিন ঘনিয়ে আসছে। রােডস-এ সাইপ্রাসবাসী তার এক অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিল। তাকে এবং অলাতিয়েলকে সে কাছে ডেকে বন্ধুকে অনুরােধ করলাে তার প্রেমিকার সমস্ত ভার নিতে এবং যাতে তার প্রেমিকা কষ্ট না পায় সেজন্যে সে তার সমস্ত সম্পদ ওদের দু’জনকে অর্পণ করলাে। বলা বাহুল্য যে সম্পদের অধিকাংশ ছিল অসবেকের প্রাসাদ থেকে চুরি করে আনা অর্থ ও স্বর্ণ।

বন্ধু ও অলাতিয়েলকে শয্যাপার্শ্বে ডেকে অ্যান্টিওচো তার বন্ধুকে বলল, আমার দিন শেষ হয়ে আসছে। আমার এইটুকুই সান্ত্বনা যে শেষ জীবন আমি পরমানন্দে কাটাতে পেরেছি, এজন্য আমি অলাতিয়েলের কাছে কৃতজ্ঞ। অলাতিয়েল তুমি আমাকে ভুলে যেও না। পরবর্তী জীবনে আমরা আবার মিলিত হবাে আর বন্ধু আমি আমার এই পরম প্রিয় রত্নটি তােমার হাতে দিয়ে নিশ্চিন্তে পরলােক যেতে পারব কারণ আমি জানি তুমি একে যত্নে রক্ষা করবে।

অ্যান্টিওচোর কথা শুনতে শুনতে দু’জনেই অশ্রুমােচন করলাে এবং তাকে কথা দিল যে তার সকল অনুরােধ ওরা রক্ষা করবে।

এর কয়েকদিন পরেই অ্যান্টিওচোর মারা গেল। সাইপ্রাসবাসী ও অলাতিয়েল তাকে সসম্মানে কবরস্থ করে রোডস ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিল। শীঘ্রই একটা জাহাজ সাইপ্রাস যাবে।

বন্ধু বলল, অলাতিয়েল তুমি আমার বন্ধুর প্রেমিকা ছিলে, আমি কিন্তু তােমাকে আমার বােন মনে করবাে, তা তুমি আমার সঙ্গে সাইপ্রাস যাবে তাে?

অলাতিয়েলও তাই মনে করলাে। বন্ধুকে বিশ্বাস করলাে। আশা করলাে তার অযত্ন হবে না। তাই সে বলল, অ্যান্টিচো আমার ভার তােমার ওপর দিয়ে গেছে অতএব আমি তােমার সঙ্গে সাইপ্রাস যাব।

বন্ধু বলল, বেশ চলাে, তােমার কোনাে চিন্তা নেই, আমি তােমার জন্যে যথাসাধ্য করবাে। বন্ধুর কথা তাে বাখতেই হবে।

ওরা দু’জনে জাহাজে উঠল। জাহাজে ওদের একটা ছােট কেবিন দেওয়া হল কারণ সেই বন্ধু বলেছিল ওবা স্বামী-স্ত্রী। কেবিনের মধ্যে শােবার বাংক দু’জনের উপযুক্ত নয়। বাধ্য হয়ে ওদের ঘন হয়ে শুতে হতাে। আগুনের পাশে শুকনাে ঘাস থাকলে তাতে আগুন ধরবেই এবং ধরতে বিলম্ব হল না। অচিরে ভাইবােন সম্পর্ক টুটে গেল। জাহাজ যখন সাইপ্রাসের পাফোস বন্দর নােঙর ফেলল তখন ওরা অবিবাহিত স্বামী-স্ত্রী। সেই ব্যবসায়ী বন্ধু অলাতিয়েলকে নিজের বাড়িতে তুলল।

এবার একটা ঘটনা ঘটল। যে কোনাে কাজেই হােক অ্যান্টিগােনাে নামে এক বৃদ্ধ পাফোস শহরে এলেন। তিনি শুধু বয়সেই বৃদ্ধ নন, জ্ঞানেও বৃদ্ধ তােবে বৃদ্ধ অর্থবান নয়। সাধারণ অবস্থা। বৃদ্ধ সাইপ্রাসের রাজার দৌত্যকার্যে দেশেবিদেশে যাওয়া আসা করলেও এবং কাজে সাফল্য লাভ করলেও অর্থ উপার্জন করতে পারেন নি বা ফাকি দিয়ে অর্থ উপার্জনের কৌশল শেখেন নি। তার সঙ্গে ঘটনাচক্রে একদিন অলাতিয়েলের দেখা হয়ে গেল।

অ্যান্টিওচোর সাইপ্রাসবাসী সেই বন্ধু ব্যবসা সূত্রে আরমেনিয়া গেছে। অলাতিয়েল বাড়িতে একাই আছে। সেদিন সে জানালার ধারে দাঁড়িয়ে রাস্তার দিকে চেয়ে দেখছে এমন সময় সেই বৃদ্ধ অ্যান্টিগােনাে সেই পথ দিয়ে যাচ্ছিল। ফুলের মতাে এমন সুন্দরীকে উপেক্ষা করে বা তার দিকে ক্ষণিকের জন্যও দৃষ্টি না ফেলে যাওয়া যায় না। অ্যান্টিগােনাের মনে হল এই অপূর্ব সুন্দরী যুবতীকে সে কোথায় যেন দেখেছে কিন্তু মনে করতে পারল না।

অলাতিয়েলের দুর্ভাগ্য। বেচারা এতােদিন নানা মানুষের হাতে খেলার পুতুলের মতাে ঘুরছে। এতে বলে ভাগ্যবিড়ম্বিতা। এবার বুঝি তার দুর্ভাগ্যের দিন শেষ হয়ে আসছে।

অলাতিয়েলও অ্যান্টিগােনােকে দেখেছিল এবং চিনতেও পেরেছিল। অ্যালেকজান্ড্রিয়াতে তার বাবার কাছে আসতে দেখেছে। অ্যান্টিগােনােকে দেখেই তার হৃদয় নেচে উঠল। এখন তাে সেই সাইপ্রাসবাসী শহরে নেই, সে একা। ঐ বৃদ্ধের সঙ্গে যােগাযােগ করে যদি এখান থেকে পালিয়ে নিজের বাড়িতে ফেরা যায়। তার মনে আশা জাগল। বিলম্ব না করে সে বৃদ্ধকে ডেকে পাঠাল।

বৃদ্ধ আসতে তাকে জিজ্ঞাসা করলাে, আপনি কি ফামাগুস্তার অ্যান্টিগােনাে। অ্যান্টিগােনাে বলল, হ্যা আমিই সেই লােক।

তখন ওলাতিয়েল নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না, বিহ্বল হয়ে বৃদ্ধকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল।

বৃদ্ধ অ্যান্টিগােননা তখন বলল, আমারও মনে হচ্ছিল আমি তােমায় কোথায় দেখেছি কিন্তু মনে করতে পারছি না, আশা করি তুমি তােমার পরিচয় জানাতে আপত্তি করবে না।

অলাতিয়েলও বুঝল সে ঠিক লােককেই চিনেছে। নিজেকে সংযত করে অলাতিয়েল জিজ্ঞাসা করলাে, আপনি কি কখনও আমাকে আলোড্রিয়াতে দেখেছেন?

অ্যালেকজান্ড্রিয়ার নাম উচ্চারণ করতেই অ্যান্টিগােনাের মনে পড়ল এ মেয়ে তাে সুলতানের মেরে এবং গুজব যে সেই মেয়ে জাহাজডুবি হয়ে মারা গেছে। যাক সেই মেয়ে যখন তার সামনে উপস্থিত তখন সে নিশ্চয়ই মারা যায় নি। তাই অ্যান্টিগােনাে সুলতান কন্যাকে সম্মান ও অভিবাদন জানাল।

অ্যান্টিগােনাে বলল, সারা মিশর দেশ জানে যে বেশ কয়েক বছর আগে তুমি জাহাজডুবি হয়ে মারা গেছ কিন্তু এখন তাে দেখছি সেটা শুধু গুজবই, তুমি বেঁচে তাে আছই কিন্তু তুমি সাইপ্রাসে কি করে এলে?

অলাতিয়েল তখন অ্যান্টিগােনােকে ভিতরে এসে কিছুক্ষণ বসতে অনুরােধ করলাে।

অ্যান্টিগােনাে বাড়ির ভেতরে এসে আসন গ্রহণ করার পর অলাতিয়েল বলল, সত্যিই জাহাজডুবি হয়েছিল এবং দীর্ঘদিন তার খবর না পেলে জনসাধারণ যে ধরে নেবে সে মারা গেছে এতে আর সন্দেহ কি?

অলাতিয়েল আবার কাদতে লাগল। বৃদ্ধ বলল, অধৈর্য হােয়াে না, শান্ত হয়ে তােমার কাহিনী আমাকে বলল। তুমি যাতে বিপদমুক্ত হতে পার তার ব্যবস্থা করতে হবে, অবশ্য যদি তুমি কোনাে বিপদে পড়ে থাক।

অলাতিয়েল তখন নিজেকে সংযত করে চোখের জল মুছে বলল, দীর্ঘদিন পরে আমি একটা চেনামুখ দেখলুম এবং আপনাকে আমার পিতা বলে মনে হল। যাই হােক আমি আমার দুর্ভাগ্যের কাহিনী আপনাকে বলছি এবং সব শুনে আপনি যদি আমার কাহিনী বিশ্বাস করেন তাহলে আপনি কোনাে উপায়ে আমাকে আমার পূর্ব অবস্থায় ফিরিয়ে দেবেন আর যদি বিশ্বাস না করেন তাহলে আমার দুখের কাহিনী আপনি কাউকে বলবেন না।

মেজরকার কাছে যেদিন জাহাজ ঝড়ে ভেঙে পড়ল, সেইদিন থেকে অলাতিয়েল তাের দুর্দশার কাহিনী বলতে বলতে কেঁদে ফেলল।

এই মর্মন্তুদ কাহিনী শুনতে শুনতে বৃদ্ধের চোখেও জল এসে যাচ্ছিল। সব শুনে সে কিছুক্ষণ ধরে চিন্তা করে বলল, তুমি নিশ্চিন্ত হও মা, এই দীর্ঘ দিনে তােমার পরিচয় যখন কেউ জানতে পারে নি তখন তােমাকে তােমার পিতার কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং তােমাকে তােমার পতিগৃহে পুনরায় পাঠাতে কোনাে অসুবিধে হবে না বলে আমি মনে করি। আশা করছি তুমি অলগ্রেভের রাজরানী হতে পারবে যা তােমার পিতার ইচ্ছা ছিল।

অলাতিয়েল আশার আলাে দেখতে পেল। জিজ্ঞাসা করলাে, কি করে তুমি তাে সম্ভব করতে পারবে? আমাকেই বা কি করতে হবে?

অ্যান্টিগােনাে বলল, আমি যে কাজে এখানে এসেছি সে কাজ এখন স্থগিত রেখে সব ব্যবস্থা করব। দেরি করা উচিত হবে না কারণ যে লােকটি তােমাকে এখানে আটক রেখেছে সে আরমেনিয়া থেকে যে কোনাে দিন ফিরে আসতে পারে। তুমি নিশ্চিন্ত থাক আমি ব্যবস্থা করছি।

অ্যান্টিগােনাে সেইদিনই ফামাগুস্তায় ফিরে গিয়ে রাজার সঙ্গে দেখা করে বললেন, মহারাজা আপনার অজানা নেই আপনার দীন সেবকরূপে আমি আপনার অনেক আদেশ পালন করছি, বিনিময়ে কিছু চাই নি, আমিই দরিদ্র আছি।

মহারাজ জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি বলতে চাও? সব খুলে বলাে।

তাহলে শুনুন মহারাজ, আমরা শুনে আসছি যে সুলতানের অপূর্ব সুন্দরী কন্যা জাহাজডুবি হয়ে। মারা গেছে কিন্তু সে জীবিত আছে এখন সে পাফোস বন্দরে রয়েছে। জাহাজডুবি থেকে নিজেকে কোনােরকমে সে বাঁচিয়ে রেখেছে কিন্তু এজন্যে তাকে অনেক কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে। কখনও প্রলােভিত হয়নি বা নিজের সম্মান বিলিয়ে দেয় নি। এখন সে তার পিতার কাছে ফিরে যেতে চায়। কিন্তু সুলতানের কাছে তাঁর কন্যাকে পৌঁছে দেবার সামর্থ্য আমার নেই তবে আপনি যদি দয়া করেন তাহলে আমি সুলতান-কন্যাকে পৌঁছে দিয়ে পারিতােষিক পেতে পারি। আমি আপনার কাছ থেকে শুধু এইটুকু অনুগ্রহ চাই। সুলতানও অবশ্যই আপনার এই সৎকার্য ভুলবেন না।

অ্যান্টিগােনাের এই মন্তব্য রাজার আভিজাত্যে ঘা দিল। কি? সামান্য এই কাজ আমি পারব না? রাজা তােখনি লােকলস্কর জাহাজ ইত্যাদির তাে ব্যবস্থা করে দিলেনই, সঙ্গে কয়েকজন সভাসদ ও সেবিকাও দিলেন যাতে সুলতান কন্যার কোননারকম অসুবিধা না হয়।

তার আগে পাফোস থেকে সুলতান কন্যাকে আনবার জন্যে অ্যান্টিগােনার সঙ্গে রক্ষীবাহিনী পাঠিয়ে দিলেন যাতে সুলতান কন্যা নিরাপদে ফামাগুস্তায় আসতে পারেন। রাজা সানন্দে অলাতিয়েলকে সাড়ম্বরে অভ্যর্থনা জানালেন। রানী স্বয়ং তাকে সাদরে অন্তঃপুরে নিয়ে গিয়ে তার সুবিধা অসুবিধা বিষয়ে খোঁজ নিলেন।

অলাতিয়েল বিশ্রাম নেবার পর রাজা ও রানী তার কাহিনী শুনতে চাইলেন। কি বলতে হবে অ্যাণ্টিগােনাে পূর্বেই তাে অলাতিয়েলকে শিখিয়ে দিয়েছিল তাই অলাতিয়েল সেইমতাে বিবৃতি দিল।

রাজা ও রানীর ইচ্ছা অলাতিয়েল তাদের কাছে আরও কয়েকটা দিন থাকুক কিন্তু অলাতিয়েল আর ধৈর্য ধরতে পারছে না, যত শীঘ্র সম্ভব বাবা মায়ের মুখ দেখবার জন্যে সে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। তাই রাজাও তাকে অ্যান্টিগােনাের দায়িত্বে জাহাজে তুলে দিলেন।

ব্যাবিলনের বন্দরে জাহাজ ভেড়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে খবর রটে গেল যে সুলতান কন্যা জীবিত আছে। এবং এই জাহাজেই সে ফিরে এসেছে। তাকে দেখাবার জন্যে বন্দরে লােক ভেঙে পড়ল। খবর পেয়ে স্বয়ং সুলতানও এলেন। হারানাে মেয়েকে পেয়ে তাকে জড়িয়ে ধরলেন। উভয়েই অমােচন করলাে।

কন্যাকে গ্রাসাদে পাঠিয়ে দিয়ে ফামাগুস্তার রাজা প্রেরিত সমস্ত লােককে সাদর অভ্যর্থনা জানিয়ে ও রাজাকে ধন্যবাদ দিয়ে প্রাসাদে এনে তাদের যথােপযুক্তভাবে আপ্যায়িত করলেন।

এই সকল আনুষ্ঠানিক পর্ব মিটতে কিছু সময় লাগল। ইতিমধ্যে অলাতিয়েলও সুস্থ ও স্বাভাবিক হয়েছে। সুলতান এবার কন্যাকে কাছে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন, মা তােমাকে ক্লিষ্ট ও ক্লান্ত মনে হচ্ছে। বােধহয় অনেক দুঃখ-কষ্ট সহ্য করেছ, কোথায় ছিলে এতদিন? কোনাে খবরও পাঠাতে পারনি, আমাকে সব বলাে।

সুলতানকেও কি কলতে হবে তাও অ্যান্টিগােনাে শিখিয়ে দিয়েছিল। অলাতিয়েল সেইমতাে তার বাবাকে বলতে আরম্ভ করলাে :

এখান থেকে জাহাজ ছাড়বার কুড়ি দিন পরে ভূমধ্যসাগরে আমাদের জাহাজ প্রবল ঝড়ের মুখে পড়ে আমার অজানা কোনাে তীরভূমিতে জাহাজ ধাক্কা খেয়ে ভেঙে পড়ল। আমি কোনাে রকমে প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলুম। জাহাজের মাঝিমাল্লা ও অন্যান্য যাত্রীদের কি হল আমি জানতেও পারলুম না। তখন অন্ধকার, কিছু জানারও উপায় ছিল না। ঝড়ের সময়টা যে কি ভয়ে কেটেছিল বলতে পারব না, ধরেই নিয়েছিলুম আমাদের বাঁচার কোনাে আশা নেই কিন্তু সকাল হতে দেখলুম এখনও মরে নি।

সমুদ্রতীরে জাহাজ ভেঙে পড়ার খবর পেয়ে জাহাজের মাল লুট করবার জন্যে চারদিক থেকে দস্যুদলের মতাে লোকজন ছুটে এল। ইতিমধ্যে আমার দু’জন দাসী আমাকে খুঁজে বার করে কোনােরকমে তীরে নামিয়েছে কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে দু’জন ষণ্ডামার্কা ছােকরা এসে আমার দুই দাসীকে দু’দিকে ধরে নিয়ে গেল। তারপর আমি আর তাদের দেখা পাই নি।

দুজন ছােকরা এসে আমাকে ধরলাে। আমি প্রবল বাধা দিতে লাগলুম, তাদের আঁচড়ে দিলুম, কামড় দিলুম, কিন্তু তাদের সঙ্গে আমি পারব কেন? তারা আমার চুল ধরে টানতে টানতে নিয়ে চলল। তাদের মতলব ছিল সামনে একটা ঘন বনের মধ্যে আমাকে নিয়ে যাওয়া কিন্তু বনে পৌঁছবার আগে একটা চৌমাথায় চারজন অশ্বারােহী এসে গেল। তাদের দেখেই ছােকরা দু’জন আমাকে ফেলে পালিয়ে গেল।

ঐ চারজন অশ্বারােহী সম্ভবতঃ রক্ষীবাহিনীর লােক। তারা আমাকে প্রশ্ন করতে লাগল। তাদের ভাষা বুঝতে পারি না, আকারে ইঙ্গিতে আমার বিপদের কথা তাদের বােঝাবার চেষ্টা করলুম। তারা কি বুঝল জানি না কিন্তু নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করে ওরা আমাকে একটা ঘােড়ার পিঠে বসিয়ে একটা কনভেন্টে নিয়ে গিয়ে নানেদের কাছে জিম্মা করে দিল। নানেরা আমাকে সাদরে ভেতরে নিয়ে গিয়ে আমার পরিচর্চা করলাে। পরে বুঝলুম এরা খ্রীস্টান এবং সেন্ট স্টিফেনের উপাসক। ওদের সঙ্গে থাকতে থাকতে ওদের ভাষাও কিছু বুঝতে পারতুম। তারা আমার পরিচয় জিজ্ঞাসা করেছিল কিন্তু ভয়ে আমি বলতে পারি নি যে আমি ভিন্ন ধর্মাবলম্বী এক সুলতানের কন্যা, তাহলে আমার বিপদ ঘটত। আমি তাদের বলেছিলুম যে, আমি সাইপ্রাসের এক গণমান্য ব্যক্তির কন্যা। আমার বিবাহের জন্য আমাকে ক্রিট দ্বীপে পাঠান হচ্ছিল, পথে জাহাজ ঝড়ের মুখে পড়ে এই বিপর্যয়।

বিপদ এড়াবার জন্য আমি তাদের ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান যথাসম্ভব মেনে চলতুম। কনভেন্টের যাকে সকলে অ্যাবেস বলতাে, তিনি আমাকে একদিন জিজ্ঞাসা করলেন আমি সাইপ্রাসে ফিরে যেতে চাই কিনা। উত্তরে আমি বললুম, এর বেশি আর কি আশা আমি করতে পারি।

আমি বরাবর ঐ কনভেন্টেই ছিলুম। মাত্র মাস দুই আগে একজন ফরাসী ভদ্রলােক তার পত্নী ও অন্যান্য আত্মীয়সহ ঐ কনভেন্টে এলেন। তারা যাবেন প্রভু যীশুর সমাধিতে শ্রদ্ধা অর্পণ করতে।

অ্যাবেস আমাকে তাদের হাতে তুলে দিয়ে বললেন পথে সাইপ্রাস দ্বীপে নেমে আমাকে যেন আমার পিতার নিকট পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা করা হয়। তারা সানন্দে রাজি হলেন এবং যতদিন তাদের সঙ্গে জাহাজে ছিলুম ততদিন তারা আমার যত্নের ত্রুটি করেন নি।

কিন্তু মনে মনে আমি শঙ্কিত কারণ আমার বাবা সত্যিই তাে সাইপ্রাস দ্বীপে নেই এবং তারা যখন আমাকে আমার পিতার নিকট নিয়ে যেতে চাইবে তখন আমি কি বলবাে? কি ঠিকানা দেব?

জাহাজ যতই পাফোস দ্বীপের নিকটবর্তী হয় আমার বুকও তত দুরুদুরু করে। কিন্তু আল্লার অসীম । তিনিও নিশ্চয় আমার জন্য চিন্তা করছিলেন তা নইলে জাহাজ বন্দরে ভেড়ার অব্যবহিত পরেই অ্যান্টিগােনােকে আমি কি করে দেখতে পাবাে?

জাহাজ থেকে নেমেই আমি অ্যান্টিগােনাের কাছে ছুটে গেলুম। সৌভাগ্যক্রমে আমার সহযাত্রী ফাসী পরিবার আমাদের ভাষা জানতেন না। অ্যান্টিগােনােকে আমি বললুম, পরে আমি তােমাকে সব বলবাে, এখন তুমি যেন তােমার হারানাে মেয়েকে খুঁজে পেয়েছ, এইরকম ভাব দেখাবে। অ্যান্টিগােনাের উপস্থিত বুদ্ধি ও কর্মতৎপরতার প্রশংসা করতে হয়। সে জরুরী অবস্থার সামাল দিয়ে এমন অভিনয় করলাে যেন সে সত্যিই তার হারানাে মেয়েকে খুঁজে পেয়েছে। যাই হােক সেই ফরাসী পরিবার সন্তুষ্ট হয়ে জাহাজে উঠে যাত্রা করল তারপর অ্যান্টিগােনাে ফামাগুস্তায় গিয়ে সাইপ্রাসের রাজার সহায়তায় আমাকে তােমার কাছে নিয়ে এল। সাইপ্রাসের রাজা ও রাণী আমার খুব যত্ন করেছেন। বাকি সব কাহিনী বাবা তুমি অ্যান্টিগােনাের মুখ থেকে শুনাে।

অ্যান্টিগােনাে বলল, মহামান্য সুলতান আপনার কন্যা সঠিক বিবরণী দিয়েছে শুধু একটি কথা বলে নি। সাইপ্রাসে পাফোস বন্দরে জাহাজে সেই ফরাসী পরিবার আমার কাছে আপনার কন্যার উচ্চ প্রশংসা করেছে। যে কনভেন্টে আপনার কন্যা এই দীর্ঘদিন ছিল সেই কনভেন্টের নানেরা আপনার কন্যার পবিত্র আচার-আচরণের ও চরিত্রের শুদ্ধতার উচ্চ প্রশংসা করেছে। বিদায় নেবার সময় ঐ ফরাসী পরিবার তাদের অগােপন করতে পারেন নি। আমিও আপনার কন্যার সাহসের প্রশংসা করছি, এমন কন্যা পিতামাতাকে গৌরবান্বিত করে।

সমস্ত বিবরণী শুনে সুলতান অত্যন্ত প্রীত হলেন। আল্লার কাছে তিনি প্রার্থনা নিবেদন করলেন। সাইপ্রাসের রাজার কাছে তিনি কৃতজ্ঞতা জানালেন এবং অ্যান্টিগােনােকে প্রচুর অর্থ ও উপঢৌকন দিলেন।

এরপর সুলতান অলগ্রেভের রাজার সঙ্গে যােগাযােগ করে সমস্ত বিবরণী পেশ করে জানতে চাইলেন যে, অলগ্রেভের রাজা এখনও তার কন্যাকে রানী করতে সম্মত আছেন কিনা।

তার ভাবী রানী জীবিত আছে জানতে পেরে অলগ্রেভের রাজা অত্যন্ত আনন্দিত হলেন কারণ এমন অশ্য ও অতুলনীয় সুন্দরী তার রানী হওয়া ভাগ্যের কথা। রাজা সানন্দে তার সম্মতি জানাল এবং অলাতিয়েলকে নিজ রাজ্যে আনবার জন্য জাহাজভর্তি বিশিষ্ট ব্যক্তিদের পাঠাল। সুলতান তাদের সাদর। অভ্যর্থনা জানিয়ে তাদের হাতে মেয়েকে তুলে দিলেন।

কৌতুকের ব্যাপার এই যে মেয়েকে অন্তত আটজন পুরুষ বহুবার উপভােগ করেছে কিন্তু সে তার স্বামীর পাশে যখন শয়ন করলাে স্বামী জানল তার পত্নী এখনও পর্যন্ত কুমারীই আছে। তবে তাদের বিবাহিত জীবন সুখের হয়েছিল। কথায় আছে যুবতীকে বার বার চুম্বন করলেও তার ওষ্ঠ ফুলের মতােই তাজা ও কোমল থাকে।

 

অষ্টম গল্প

অ্যান্টওয়ারপের কাউন্ট মিথ্যাভাবে অভিযুক্ত হয়ে সঙ্গে এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে ইংলণ্ডে গেলেন। সেখানে ছেলে ও মেয়েকে দুই ভিন্ন অভিজাত পরিবারে জিম্ম করে স্বেচ্ছায় আত্মগােপন করে রইলেন। পরিচয় গােপন রেখে ফ্রান্সের রাজার সেনাবাহিনীর অশ্বশালায় সহিসের চাকরি নিলেন। পরে তিনি নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করে আবার স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছিলেন।

অসাধারণ সুন্দরী মহিলার করুণ কাহিনী শুনে সখীর দল সহানুভূতি প্রকাশ করলাে। অনেকে দীর্ঘ। নিশ্বাস মােচন করলাে, কেউ অলাতিয়েলের জন্যে দুঃখ প্রকাশ করলাে, কেউ হয়ত ভাবল তার জীবনে এমন কেন ঘটে না, ভিন্ন পুরুষের সঙ্গে ভিন্ন অভিজ্ঞতা! যাই হােক যে সব প্রশ্ন মুলতুবি রেখে সকলে প্যানফিলাের শেষ মন্তব্য শুনে খুব হেসে ও ওর গায়ে পড়ল। প্যানফিলাের গল্প শেষ হয়েছে বুঝতে পেরে কুইন এলিসাকে বলল একটি গল্প বলতে। এলিসা সানন্দে রাজি হয়ে তাের গল্প আরম্ভ করলাে।

রােমান সাম্রাজ্য ভেঙে ফ্রান্সের হাত থেকে যখন জার্মানির হাতে চলে গেল তখন এই দুই দেশের মধ্যে শত্রুতা চরমে উঠল এবং তারা পরস্পরের সঙ্গে যুদ্ধ করতে লাগল। যুদ্ধ আর থামে না, এখানে ওখানে যুদ্ধ চলতেই থাকে। জার্মানিকে চরম আঘাত দেবার জন্যে এবং নিজ দেশ নিরাপদ করবার উদ্দেশ্যে ফ্রান্সের। রাজা ও তার পুত্র বন্ধুরাজ্য ও আত্মীয়দের সহায়তায় বিপুল বাহিনী গঠন করলেন। কিন্তু দেশ অশাসিত অবস্থায় ছেড়ে যুদ্ধে যাওয়া যায় না। দেশে শাসনব্যবস্থা চালু রাখতে হবে। দেশের শাসনভার বিশ্বস্ত ও যােগ্য ব্যক্তির ওপর অর্পণ করে যেতে হবে। এমন ব্যক্তি কে আছেন? তিনি হলেন গুয়ালতিয়েরি কাউন্ট অফ অ্যান্টওয়ারপ। তিনি সমরবিদ্যায় পারদর্শী এবং অভিজ্ঞ রাজনীতিক, সুবক্তা, রাজভক্ত ও নানা বিদ্যার । অধিকারী। যুদ্ধক্ষেত্রে তার প্রয়ােজনীয়তা থাকলেও দেশের শাসনভার এমন একজন যােগ্য ব্যক্তির হাতে ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্তে যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়া যায়। ফ্রান্সের রাজা ও তার পুত্র কাউন্টের হাতে দেশের শাসনভার । দিয়ে তাকে তাদের প্রতিনিধি বা ভাইসরয় নিযুক্ত করে যুদ্ধে গেলেন।

পিতাপুত্র যুদ্ধে যাবার পর থেকে গুয়ালতিয়েরি সুচারুরূপে দেশের শাসনব্যবস্থা চালু রাখলেন। যদিও তাকে স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল তথাপি তিনি কোনাে সিদ্ধান্তে উপনীত হবার আগে রানী ও পুত্রবধুর সঙ্গে। পরামর্শ করতেন। তাদের, গুয়ালতিয়েরি কখনও অমান্য করতেন না।

গুয়ালতিয়েরির বয়স চল্লিশ। সুদর্শন, মজবুত গঠন, মিষ্টভাষী এবং অভিজাত। চলনে বলেন পােশাকে। পরিচ্ছেদে আদর্শ পুরুষ। তার তুল্য চৌখস একজন নাইট তােখন ফ্রান্সে দ্বিতীয় কেউ ছিল না।

রাজা ও তার পুত্র যুদ্ধে যাবার পর এবং গুয়ালতিয়েরি ভাইসরয় নিযুক্ত হবার পর এক দুঃখজনক ঘটনা ঘটল। গুয়ালতিয়েরির পত্নী একটি পুত্র ও কন্যা রেখে মারা গেলেন। দু’টি সন্তানই অল্পবয়স্ক। গুয়ালতিয়েরি একা হয়ে পড়লেন। কিন্তু তিনি হতােদ্যম না হয়ে দুই মহিলার সঙ্গে পরামর্শ করে দক্ষতার সঙ্গে রাজকার্য চালিয়ে যেতে লাগলেন। কিন্তু ঘটনা অন্যরকম ঘটল।

রাজপুত্রবধু ওয়ালতিয়েরির মতাে সপ্রতিভ ও সুদর্শন পুরুষটির প্রতি আকৃষ্ট হলেন এবং অচিরে তার প্রেমে পড়লেন, নিবিড় ভাবে। স্বামী গেছে যুদ্ধে, বিরহ সহ্য করতে পারে না। উপযুক্ত এক পুরুষকে যদি সর্বদা সামনে দেখা যায় এবং মন যদি দুর্বল হয় তাহলে ভবিষ্যৎ-রাজরানীও প্রেমে পড়তে পারে; তার ওপর সেই পুরুষের যদি অন্য নারীতে আকর্ষণ না থাকে। যেহেতু সে রাজপুত্রের বধূ এবং প্রভাবশালিনী অতএব তার অধঃস্তন এক রাজকর্মচারী, সে যত উচ্চপদেই থাকুক না কেন, তাকে ডাকলেই তার আদেশ পালন করতে বাধ্য। এ তাে সহজ ব্যাপার। স্বামী যুদ্ধ থেকে না ফেরা পর্যন্ত এই লােকটির সঙ্গে প্রেম করা যাবে।

একদিন উপযুক্ত সময় বুঝে যুবরাজ-পত্নী কোনাে বিষয়ে জরুরী পরামর্শ করবার ছল করে শুয়ালতিয়েরিকে নিজের ঘরে ডেকে পাঠাল। গুয়ালতিয়েরি কিছুই সন্দেহ না করে তৎক্ষণাৎ যুবরাজ-পত্নীর ঘরে এলাে। ঘরে ঢুকে দেখল দ্বিতীয় কোনাে ব্যক্তি নেই। অবাক হলেও অস্বাভাবিক মনে করল না।।

যুবরাজ-পত্নী গুয়ালতিয়েরিকে শােফায় তার পাশে বসতে বলল কিন্তু কোনাে কথা বলল না। শুয়ালতিয়েরি দু’বার জিজ্ঞাসা করলাে তাকে কি জন্য ডাকা হয়েছে। কন্যা নিরুত্তর, গাল আরক্ত, চোখ ছলছল করছে, ঈষৎ কম্পমান যেন। কি ব্যাপার? গুয়ালতিয়েরি বুঝতে পারে না।

যুবরাজ-পত্নী শেষ পর্যন্ত মনস্থির করে বলেই ফেলল, তােমাকে আমি আমার প্রিয়, প্রিয় কেন প্রিয়তম বন্ধু বলেই সম্বােধন করছি। তুমি বুদ্ধিমান অতএব তােমার অজানা থাকার কথা নয় যে, ঘি ও আগুন পাশাপাশি থাকতে পারে না। আমি বলতে চাইছি যে পুরুষ ও রমণীচিত্ত দুর্বল। অবশ্য এমন দুর্বলচিত্ত হওয়ার যেমন কারণ ঘটে তেমনি সুযােগও আসে অর্থাৎ পুরুষ ও নারী পরস্পরের প্রেমে পড়ে। দু’জনে বিভিন্ন স্তরের হলেও তাদের দোষ দেওয়া যায় না, তারা ক্ষমার যােগ্য।

গুয়ালতিয়েরি অবাক হয়ে ভাবছে এসব কথার অর্থ কি! পুত্রবধূ কি বলতে চাইছে! বেশিক্ষণ অপেক্ষা রুতে হল না। মেয়ে বলল, এই আমারই অবস্থাই দেখ না, আমার রূপ আছে, যৌবন আছে, অর্থ আছে; কিছু প্রতিপত্তিও আছে, স্বামী কাছে নেই কবে ফিরবে জানি না। আমি অবহেলিত, শুকিয়ে যাচ্ছি। আমাকে উপভােগ করবার কেউ নেই অথচ আমি আমার দেহমনের দাবি উপেক্ষা করতে পারছি না। কিন্তু তুমি তাে বুঝেছ তাই আমি নিজেকে নিঃসহায় মনে করতে পারছি না। অবশ্য তুমি আমাদের নানাভাবে রক্ষা করছ। কিন্তু আমি আমার স্বামীর অবর্তমানে তােমার কাছ থেকে অতিরিক্ত কিছু আশা করতে পারি না কি? বিলাসিতায় জীবনযাপন করতে করতে আমার মন দুর্বল হয়েছে, যা চেয়েছি তাই পেয়েছি। আমার বিশ্বাস যা চাওয়া যায় তাই পাওয়া যায়। আমি প্রেমে পড়েছি, তােমার প্রতি আমার আকর্ষণ দুর্বার। জানি পরপুরুষের প্রতি আকর্ষণ বিবাহিতার পক্ষেঅন্যায়, নিন্দা রটতে পারে, কিন্তু ভেবে দেখ সবই গােপন রাখা যায়। তােমার মতাে যােগ্য পুরুষও আমি পাব না, তােমারও স্ত্রী নেই, আমাকে ফিরিয়ে দিয়াে না এই আমার কথা শেষ করতে না করতে রাজপুত্রবধূ ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল।

কিন্তু কাউন্ট দুর্বলচিত্ত নয়, প্রলােভিত হবার পাত্রও নয়। সে নাইট, বিশ্বাসভঙ্গ করতে জানে না, সে রাজভক্ত দেশপ্রেমী। মেয়ে তাে তার কণ্ঠলগ্না হতে চাইছে কিন্তু ওয়ালতিয়েরি বলল, এ অন্যায়, আমার প্রত আমার ওপর যে বিশ্বাস স্থাপন করে গেছেন আমি তাে ভাঙতে পারি না—বলে গুয়ালতিয়েরি মেয়েরই হাত ধরে সরিয়ে দিল আর সঙ্গে সঙ্গে মেয়ের সব প্রেম যেন উবে গেল, সে সাপিনীর মতাে ফোস করে উঠল।

বটে ? তােমার এত সাহস? সামান্য ভুইফোড় একটা নাইটের এত সাহস? আমাকে উপেক্ষা? দাঁড়াও তােমাকে মজা দেখাচ্ছি, তােমার কি হাল করি দেখ একবার, আমাকে চেনাে না।

কথাগুলাে বলেই মেয়ে নিজের হাত দিয়ে মাথার চুল এলােমেলাে করে দিল, জামার সামনের বােতামগুলাে পটাপট খুলে তাে ফেলল, কিছু অংশ ছিড়েও দিল আর সেই সঙ্গে চিৎকার করে লােক ডাকতে লাগল, এই কে কোথায় আছ শিগগির এস, কাউন্ট অফ অ্যান্টওয়ারপ আমার ওপর অত্যাচার করছে।

কাউন্ট তৎক্ষণাৎ নিজের বিপদ বুঝতে পারল। এ অবস্থায় তাদের কেউ দেখলে তার কথা বিশ্বাস করবে না। তাকে অপমানিত ও লাঞ্চিত হতে হবে, সাজা পেতে হবে এবং মিথ্যা অপবাদে দোষী হয়ে ভাত অপমান তাকে সহ্য করতে হবে অথচ সে সম্পূর্ণ নির্দোষ।

কাউণ্ট আর অপেক্ষা করলাে না। সে রাজপ্রাসাদ থেকে ছুটে বেরিয়ে নিজের বাড়ি এসে কিছু চিন্তা না করে আস্তাবল থেকে তেজী ঘােড়া বার করে ছেলেমেয়েকে সঙ্গে নিয়ে যত জোরে পারল ক্যালে বন্দরের দিকে ঘােড়া ছুটিয়ে দিল।

এদিকে রাজপ্রাসাদে রাজপুত্রবধূর চিৎকার শুনে লােকজন ছুটে এসেছে। কাউন্টকে দেখতে না। পেলেও মেয়ে যা বলল তার সব কথা সকলে বিশ্বাস করলাে। কাউন্ট তাে আচ্ছা পাজী, হারামজাদা। সকলে তার নিন্দা করতে লাগল। অতীতের কিছু ঘটনায় ঘােরা যেন ইঙ্গিতও পেল যে লােকটা মােটই ভালাে নয়, ভালােমানুষী তার মুখােশ।

কাউন্টকে গ্রেফতার করবার জন্য একদল প্রহরী কাউন্টের বাড়ি গেল কিন্তু তাকে বাড়িতে না পেয়ে জিনিসপত্তর ও বাড়ির আসবাব দরজা জানালা সবকিছু ভেঙে তছনছ করে দিল।

লতায় পাতায় জড়িয়ে বিস্তারিত এক অলীক কাহিনী যুদ্ধসীমান্তে রাজা ও তার ছেলের কানে উঠল। তাঁরা কোনাে অনুসন্ধান না করে কাউন্ট ও তার উত্তরাধিকারীদের জন্যে নির্বাসন দণ্ড এবং তাদের গ্রেফতারের জন্যে প্রচুর অর্থ পুরস্কার ঘােষণা করলাে, এমনকি তাদের মৃতদেহ আনলেও পুরস্কার দেওয়া হবে।

নির্দোষ হলেও অপরাধের বােঝা মাথায় নিয়ে কাউন্ট তাড়াতাড়ি ইংলণ্ডে এসে পৌঁছলেন, সঙ্গে অবােধ ছেলেমেয়ে। তার ভাগ্য ভাল যে পথে কেউ তাকে চিনতে পারে নি। এজন্যে তিনি কোথাও তার পরিচয় প্রকাশ করেন নি।

ইংলণ্ডে পৌঁছে তিনি তার মূল্যবান পােশাক পালটে ভবঘুরের মতাে ছেড়া ও মলিন পােশাক পরে লণ্ডনে পৌঁছলেন। লণ্ডন যাবার পথে তিনি তার ছেলে ও মেয়েকে নির্দেশ দিলেন। তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে নির্দেশ তিনি দিলেন তা হল এই যে, তাদের খুব কষ্ট সহ্য করতে হবে। এই কষ্ট যেন তারা সহ্য করে দ্বিতীয়টি হল এই যে, তারা কখনই যেন তাদের আসল পরিচয় প্রকাশ না করে; প্রকাশ করলে তারা ভীষণ বিপদে পড়বে ফলে তাদের মৃত্যুও হতে পারে। তারা শিশু হলেও বাবার সাবধান বাণী তারা মনে মনে বুঝতে পেরেছিল এবং প্রতিজ্ঞা করেছিল যে, তারা বাবার আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে। কাউন্ট ছেলে ও মেয়েকে পিতার নাম প্রকাশ করতেও নিষেধ করেছিলেন।

ছেলের নাম লুই, তার বয়স মাত্র নয় আর মেয়ের নাম ভায়ােলান্তি, তার বয়স সবে সাত। তারা যে পিতার নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিল তাে এই কাহিনী শুনলেই জানা যাবে।

কাউন্ট ব্যাপার আরও সহজ করবার জন্যে ছেলে ও মেয়ের নাম বদলে দিলেন। ছেলের নাম রাখলেন পেরেত্তো আর মেয়ের নাম রাখলেন জিয়ানেত্তা।

ছিন্ন ও মলিন বেশে তারা লণ্ডনে এসে রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষা করতে লাগল। এটা অস্বাভাবিক কিছু নয় কারণ তখন ফ্রান্সে যুদ্ধ চলতে থাকায় অনেক ফরাসী নরনারী লণ্ডনে চলে এসে ভিক্ষাপাত্র সম্বল করেছিল।

একদিন সকালে যখন তারা এক বড় গির্জার সামনে ভিক্ষা করছিল তখন ইংলণ্ডের রাজার এক মার্শালের পত্নী গির্জা থেকে বেরিয়ে এলেন। মহিলার চেহারায় ও পােশাকে-আশাকে আভিজাত্যের ছাপ দেখে মনে হয় তিনি স্নেহশীলা ও দয়াবতী। গির্জার বাইরে আসার পর পেরেত্তা ও জিয়ানেও তার দৃষ্টি আকর্ষণ করলাে।

সহানুভূতিমাখা স্বরে মহিলা কাউন্টকে জিজ্ঞাসা করলেন, এই ছেলেমেয়ে দুটি কি তার? তারা কোথা থেকে আসছে? উত্তরে কাউণ্ট বলল, ছেলে ও মেয়ে তারই। তারা পিকার্ডি থেকে আসছে। তারা ঘর ছাড়তে বাধ্য হয়েছে কারণ তার বড় ছেলে এমন একটা অপরাধ করেছে যে জন্যে তারা কোনােরকমেই দায়ী নয়।

মহিলা দয়ার্দ্র চিত্তে মেয়েটিকে দেখতে লাগলেন। মেয়েটি ফুটফুটে শান্ত একমাথা চুল, হরিণের মতাে চোখ। দেখেই তাকে ভালবাসতে ইচ্ছে করে। মেয়েটিকে মহিলার আদর করে কোলে তুলে নিতে ইচ্ছে করলাে।

কাউন্টকে মহিলা বললেন, তােমার মেয়েটি ভারি মিষ্টি, আমাকে দেবে? আমি ওকে সঙ্গে রাখব। ও যদি আমার বাড়িতে থাকে আমি ওকে সৎ শিক্ষা দেব এবং ও যদি আমার বাধ্য হয়ে বড় হয় তাহলে আমি ওকে সৎপাত্রের হাতে তুলে দেব। আমি তােমাকে কথা দিচ্ছি।

কাউন্ট তাে হাতে স্বর্গ পেল। মহিলার পরিচয় কাউন্ট জানতে পেরেছিল। এই দুঃস্থ অবস্থায় মেয়েটি যদি ভালাে আশ্রয় পায় তাহলে আপত্তির কি থাকতে পারে? কাউণ্ট সজল চোখে মেয়েকে মহিলার হাতে তুলে দিল।

কাউন্ট নিশ্চিন্ত হল। সেখানে আর অপেক্ষা করলাে না। ছেলের হাত ধরে আবার ভিক্ষা করতে করতে হাঁটতে হাঁটতে বাপ-বেটা দ্বীপের অপর প্রান্তে ওয়েলস প্রদেশে পৌঁছল। পথশ্রমে পিতাপুত্র উভয়েই ক্লান্ত। হাঁটা তাে তাদের অভ্যাস নেই তার ওপর এই দীর্ঘ পথ। কিছু সময় বিশ্রাম নিয়ে আবার তারা ভিক্ষা করতে বেরল। এখানে এক শহরে রাজার আর এক মার্শাল থাকতেন। বিরাট সীমানাওয়ালা ক্যাসেলের মতাে বাড়িতে অনেক দাসদাসী নিয়ে এই মার্শাল দাপটের সঙ্গে বাস করতেন। আর এই মার্শালের বাড়িতে কাউন্ট পেরেত্তোকে নিয়ে প্রায়ই ভিক্ষা করতে আসত। এই বাড়িতে ভালাে খাবার পাওয়া যেত।

খেলবার জন্যে এই বাড়ির মাঠে অনেক ছেলে জমায়েত হতাে। কিছু মার্শালের বা বাড়ির আর কারও ছেলে এবং কিছু প্রতিবেশীদের ছেলে। তারা দৌড়ঝাপ, বর্শা ছোঁড়া ইত্যাদির প্রতিযােগিতা করতাে। অন্য খেলাও খেলত। পেরেত্তোও এইসব ছেলেদের সঙ্গে খেলতাে আর করলাে। অনেক খেলা সে অনেকের চেয়ে ভালাে খেলত। তার খেলার ধরন মার্শালেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করলাে। ছেলেটির আচার আচরণও প্রশংসার যােগ্য। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন ছেলেটি কার?  তাঁকে বলা হল ছেলেটি একটি ভবঘুরের। সেই ভবঘুরের ছেলেকে নিয়ে ভিক্ষা করতে ক্যাসেলে আসে।

মার্শাল বললেন, তাহলে সেই ভবঘুরকে বলল যে, ছেলেটিকে আমি আমার কাছে রাখতে চাই। ছেলেটি শান্ত ও চালাক, গড়ে পিটে নিতে পারলে ভবিষ্যতে কাজের ছেলে হবে।

কাউণ্ট গুয়ালতিয়েরি মনে মনে তাে এই চাইছিল কিন্তু প্রস্তাব শুনে ভাব দেখাল যেন ছেলেকে ছেড়ে থাকতে তার কষ্ট হবে, তবুও মার্শাল যখন চাইছেন তখন তার কথা আমি তাে অবহেলা করতে পারি না। যাই হােক বেচারা রােজ পেট ভরে খেতে পায় না, এখন তাে খেয়ে বাঁচবে, ভালাে পরিবারে থাকলে ছেলের উন্নতিও হবে।

ছেলে ও মেয়ের ভালাে ব্যবস্থাই হল। কাউন্ট ঠিক করলাে সে আর ইংলণ্ডে থাকবে না। তাই সে একদিন সাগর পাড়ি দিয়ে আয়ারল্যান্ডে পৌঁছে স্ট্র্যাফোর্ডে এলাে। এখানে এক বড় জমিদার গ্রাম্য ব্যারনের বাড়িতে চাকরি নিল। কখনও চাকরের কাজ করে, কখনও আস্তাবলে সহিসের কাজ করে। অনেক কষ্ট সহ্য করে কাউন্ট ব্যারনের চাকরিতে অনেক দিন কাটাল। মুখ বুজে সব সহ্য করে কাউন্ট সব কাজ সুচারুরূপে সম্পন্ন করে। তার পরিচয় অবশ্যই গােপন ছিল।

এদিকে লণ্ডনে মেয়ে ভায়ােলান্তিকে সেই দয়াবতী মহিলা নিজের মেয়ের মতাে প্রতিপালন করছেন। ভায়ােলান্তিও মহিলাকে নিরাশ করে নি, তার আশা পূরণ করেছে। মহিলা ও তার স্বামী এবং বাড়ির সকলে এই ধীর স্থির বুদ্ধিমতী সপ্রতিভ মেয়েটিকে ভালবাসে, সে সকলের প্রিয়পাত্রী। এখন সে বড় হয়েছে, উজ্জ্বল স্বাস্থ্য ও মনভােলানাে রূপ তাকে লাবণ্যময়ী করে তুলেছে। পরিবারে সে বেশ সহজভাবে সকলের সঙ্গে মেলামেশা করে ও সকল অবস্থায় নিজেকে মানিয়ে নেয়। সে সকলের ভালবাসা আদায় করে নিতে পেরেছিল।

এই মহিলার বাড়িতে আশ্রয় পাওয়া পর্যন্ত শত চেষ্টা করেও মহিলা ভায়ােলান্তির আসল পরিচয় এমন কি তার পিতার নামটা পর্যন্তও জানতে পাবেননি কিন্তু পরিচয় তাে জানা দরকার। মেয়েটি বড় হয়েছে এবার তার বিয়ে দিতে হবে, উপযুক্ত পাত্র খুঁজতে হবে। ওপরে ঈশ্বর আছেন, তিনি সব জানেন, অন্যের অপরাধের জন্যে নির্দোষ মেয়েটি কত কষ্ট সহ্য করছে তাও তিনি জানেন, তাই তাে যােগ্যদের তিনি পুরস্কার দেন অকৃপণ হস্তে। শেষ পর্যন্ত কন্যা অপাত্রে পড়ে নি, যেমন বংশ তেমনি অভিজাত বংশেই তার বিয়ে হয়েছিল। একটু ধৈর্য ধরে তােমরা শােনাে, এলিসা বললাে। মহিলার একটি মাত্র পুত্র ছিল। উপযুক্ত পিতামাতার উপযুক্ত স্বাস্থ্যবান, সুদর্শন, মেধাবী, নম্র, সপ্রতিভ, রুচিবান ও শিক্ষিত। ছেলে পিতামাতার নয়নের মণি।

ছেলেটি জিয়ানেত্তার চেয়ে বয়সে ছয় বছরের বড়। জিয়ানেত্তার মতাে এমন স্নিগ্ধ ও সুন্দরী একটি মেয়েকে দেখে সে গভীরভাবে তাকে এত ভালবেসে ফেলল যে, অন্য যে কোনাে মেয়ের দিকে তার নজর যায় না। কিন্তু ছেলে জিয়ানেত্তার পরিচয় জানে না এবং তার পিতার মতাে সে ধরে নিয়েছে ও নিম্নবংশােদ্ভুতা, এর সঙ্গে তার বিবাহ অসম্ভব তাই সে তার ভালবাসার কথা কাউকে বলতে সাহস পায় না। সে মনে মনে তীব্র বেদনা অনুভব করে। মনের কথা কাউকে বলতে না পেরে মানসিক যন্ত্রণা নীরবে ভােগ করে।

এই নিদারুণ মর্মবেদনা ভােগ করতে করতে সে পীড়িত হয়ে পড়ল। সে ক্রমশ শীর্ণ হয়ে পড়ল এবং একদিন শয্যা গ্রহণ করলাে। পর পর অনেক চিকিৎসক ডাকা হল। তারা নানারকমভাবে পরীক্ষা। করে তার রােগ ধরতে পারল না নিরাময় তাে দূরের কথা। কোথায় বা কি কষ্ট ছেলেকে জিজ্ঞাসা করলে সে কোনাে উত্তর দেয় না।

পিতামাতার মনেও দারুণ কষ্ট ও দুশ্চিন্তা। হতাশ হয়ে তারা ভেঙে পড়ার মুখে। ছেলের জন্যে তারা কিছুই করতে পারছেন না, একমাত্র ঈশ্বরের কাছে ছেলের আরােগ্য কামনা করে প্রার্থনা করা ছাড়া।

একদিন একজন ডাক্তার রােগীকে পরীক্ষা করছে। এই ডাক্তার অল্পবয়স্ক কিন্তু রীতিমতাে বুদ্ধিমান। সকল বিষয়ে অনুসন্ধান না করে চিকিৎসা করে না এবং নানা বিষয়ে প্রশ্ন করে। ডাক্তার তখন রােগীর নাড়ী পরীক্ষা করছিল। জিয়ানেত্তা ডাক্তারের আদেশ পালন করছিল, এজন্যে তাকে মাঝে মাঝে রােগীর ঘরে আসতে হচ্ছিল। ডাক্তার লক্ষ্য করলাে যে, জিয়ানেত্তা যখন ঘরে প্রবেশ করছে তখনই রােগীর নাড়ী দ্রুত হচ্ছে। জিয়ানেত্তা যখন ঘরে থাকছে ততক্ষণই নাড়ী দ্রুততর চলছে। ডাক্তার এটা লক্ষ্য করলেন কিন্তু কিছু বললেন না। তারপর তিনি সবিস্ময়ে লক্ষ্য করলেন যে, জিয়ানেত্তা ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার পর রােগীর নাড়ী স্বাভাবিক হচ্ছে।

ডাক্তার তখনও রােগীর নাড়ী ধরে আছে। ডাক্তার জিয়ানেত্তাকে আবার ডাকলেন। জিয়ানেত্তা ঘরে আসার সঙ্গে সঙ্গে রােগীর নাড়ী আবার দ্রুতগতিতে চলতে আরম্ভ করলাে। জিয়ানেত্তাকে ডাক্তার ঘর থেকে চলে যেতে বলল। জিয়ানেত্তা ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরই রােগীর নাড়ী স্বাভাবিক হয়ে গেল।

ডাক্তার স্থির সিদ্ধান্তে না পৌঁছলেও অনুমান করল যে, সে রােগের উৎস জানতে পেরেছে। একটা সূত্র পাওয়া গেছে। এইটাই সম্ভবত রােগের কারণ। তার রােগী জিয়ানোর প্রেমে পড়েছে কিন্তু কোনাে কারণে কাউকে বলতে পারছে না।

পরীক্ষা শেষ করে ডাক্তার ঘরের বাইরে এসে রােগীর পিতামাতাকে একান্তে ডেকে বলল : আপনাদের ছেলের রােগ কোনাে ডাক্তার সারাতে পারবে না, তার আরােগ্য নির্ভর করছে জিয়ানোর ওপর। কিছু লক্ষণ আমি ধরতে পেরেছি যে, আপনাদের ছেলে গভীরভাবে মেয়েটির প্রেমে পড়েছে এবং এই সংবাদ সম্ভবত মেয়েটি জানে না। এরপর আপনারা কি করবেন তা আপনাদের ওপর নির্ভর করছে।

যাই হােক রােগের কারণ জানতে পারা গেছে। ভদ্রলােক ও মহিলা আপাতত নিশ্চিন্ত হলেন যে যথােপযুক্ত ব্যবস্থা নিলে ছেলে রােগমুক্ত হবে। ছেলে হয়ত সেরে উঠবে কিন্তু তারা সন্তুষ্ট হতে পারলেন না। অজ্ঞাতকুলশীল এক মেয়েকে তারা পুত্রবধূ করবেন কি করে?

ডাক্তার চলে যাবার পর তারা ছেলের ঘরে ঢুকলেন। ছেলেকে মা বললেন, বাপধন আমি বুঝতে পারছি তুমি একটা কিছু চাও কিন্তু তুমি সে কথা তােমার মাকেও বলছাে না। তুমি কি জান না যে, তােমার মঙ্গলের জন্যে আমরা সবকিছু করতে প্রস্তুত। এজন্যে যদি কিছু নিয়ম ভঙ্গ করতে হয় তা করতেও আমরা রাজি। যাই হােক মঙ্গলময় ঈশ্বর আমাদের পথ দেখিয়েছেন এবং আমরা নিশ্চিত্ত যে, এবার তুমি সেরে উঠবে। তােমার রােগের কারণ আমরা জানতে পেরেছি। তুমি কোনাে তরুণীকে ভালবেসেছ কিন্তু সে কথা প্রকাশ করতে তুমি লজ্জিত যদিও তােমার বয়সে এটা স্বাভাবিক। তুমি যদি সত্যিই কাউকে ভালাে না বাসতে তাহলে আমরা অবাক হতুম। তুমি আমার কাছে কিছু লকিও না, তুমি আমাকে সব খুলে বলাে, তােমার মনের ভার নামাও, তাহলে তুমি তাড়াতাড়ি সেরে উঠবে। সুস্থ ও স্বাভাবিক হয়ে জীবনের আনন্দ উপভােগ করতে পারবে। তুমি যা চাও তা তােমাকে দিতে আমরা চেষ্টার কোনাে ত্রুটি করব না। তােমার সুখ ও শান্তি আমাদের কাছে সব, তােমার দুঃখ আমাদের দুঃখ, তােমার সুখে আমাদের সুখ। তুমি তােমার লজ্জা ও ভয় বা সংকোচ ত্যাগ করে আমাদের স্পষ্ট করে বললাে, আমরা তােমার সুখ দেখতে চাই। আর যদি কিছু না করি তাহলে তুমি মনে করতে পার যে, এমন নিষ্ঠুর মাতা-পিতা আর নেই কিন্তু তুমি তাে জান আমরা তা নই।

মায়ের কথা শুনে যুবক প্রথমে ধাঁধায় পড়ল। মাকে কি বলবে স্থির করতে পারল না কিন্তু শেষ পর্যন্ত মনে জোর এনে সে ভাবল, তার জন্যে যদি কেউ কিছু করতে পারে তাে তার মাই সেই কাজ করতে পারবে। সে তার মাকে বলল, মা তুমি যা অনুমান করছ তা আমি স্বীকার করছি কিন্তু তােমাদের কিছু বলিনি তার কারণ এই যে, আমার ধারণা পিতামাতা একটা বয়স অতিক্রম করার পর সন্তানের মনােভাবকে গুরুত্ব দেয় না। সন্তান কিছু দাবি করলেও তারা উদাসীন থাকে। কিন্তু আমি বেশ বুঝতে পারছি যে আমার প্রতি তােমার সম্পূর্ণ সহানুভূতি আছে। সেই মেয়েটি কে তার নাম বলতে পারি যদি তুমি কথা দাও যে তুমি তােমার প্রতিজ্ঞা রাখবে। তবেই জেনাে আমি রােগমুক্ত হব।

মা বললেন, বেশ তুমি বলাে, আমরা নিশ্চয় একটা উপায় বার করতে পারব। মহিলার নিজে প্রতি একটা বিশ্বাস আছে যে তিনি সুষ্ঠুভাবে সব কাজ করতে পারেন।

ছেলে বলল, মা আমার এই রােগের জন্যে দায়ী জিয়ানেত্তা। তার তারুণ্য, সৌন্দর্য, নম্র আচরণ ও সুরুচি আমাকে আকৃষ্ট করেছে কিন্তু তার দিক থেকে কোনাে সাড়া না পেয়ে আমি আমার মনােভাবও প্রকাশ করতে পারি নি। তাকেও কিছু বলি নি বা ভাবে ভঙ্গিতে প্রকাশও করি নি। তােমার কাছে সব স্বীকার করলুম, এবার যদি তােমরা কথা না রাখতে পার, তাহলে আমি কোনােদিনই বিছানা ছেড়ে উঠতে পারব না।

ছেলেকে সান্ত্বনা দিয়ে মা বললেন, বাপধন এ আর এমন কি? তুমি মন শান্ত করাে, আমার ওপর সব ছেড়ে দিয়ে তুমি নিশ্চিন্ত থাক।

যুবকের মনে আশা সঞ্চারিত হল। সে দ্রুত আরােগ্য লাভ করতে লাগল। সে বুঝল তার মা তার জন্যে সব কিছু করবে। মা-ও ছেলের উন্নতি লক্ষ্য করে খুশি।

মা একদিন জিয়ানেত্তাকে আদর করে কাছে ডেকে একথা সেকথার পর জিজ্ঞাসা করলেন, জিয়ানেত্তা তুই কাউকে ভালবাসিস না? কোন্ ছেলেটিকে তোর ভালাে লাগে?

জিয়ানেত্তার সারা মুখ টকটকে লাল হয়ে উঠল। সে হতবুদ্ধি হয়ে পড়ল, কি বলবে ঠিক করতে পারল না। তারপর অতিকষ্টে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, কি বলছেন মাদাম, আমার মতাে এক গরিব মেয়ের কি কাউকে ভালবাসা সাজে? আমি গৃহচ্যুত, আমার ভবিষ্যৎ আমি জানি না, এমন মেয়ের কি ভালবাসার বিলাসিতার স্রোতে ভেসে যাওয়া যায় মাদাম? আপনিই বলুন।

ঠিক আছে, আর বলতে হবে না, তােমার যদি কোনাে ভালবাসার পাত্র না থাকে তাে আমরা তােমার জন্যে একটি ছেলেকে মনােনীত করে দেব। তােমার মতাে সজীব ও সুন্দর মেয়ের এমন একজন প্রেমিক থাকা দরকার যে তােমার মর্যাদা ও মূল্য বুঝে তােমাকে ধীরে ধীরে ফুটিয়ে তুলবে।

চোখ নিচু করে জিয়ানো বলল, আমি আর কি বলব মাদাম? আমার বাবা আমাকে যেদিন আপনার হাতে তুলে দিয়েছেন সেদিন থেকে আপনি আমাকে আপনার মেয়ের মতাে সযত্নে লালন কবে আসছেন। অতএব আপনার কোনাে ইচ্ছাকে আমার বাধা দেওয়া উচিত নয় কিন্তু আপনার প্রস্তাবে রাজি হতে পারছি না। আমি এমন কোনাে যুবককে ভালবাসতে পারি না যে পরে আমাকে তার পত্নীরূপে গ্রহণ করবে না। সে যদি আমাকে বিবাহ করে তাহলেই আমি তার সঙ্গে আলাপ করতে পারি। আমি আমার সম্মান ও বংশমর্যাদা রক্ষা করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, যতদিন পর্যন্ত আমি বাঁচব ততদিন পর্যন্ত আমি আমার সম্মান রক্ষা করবাে মাদাম।

জিয়ানোর এই স্পষ্ট ভাষণ শুনে কী মনে মনে অত্যন্ত প্রীত হয়ে মেয়েটির চরিত্রের দৃঢ়তা লক্ষ্য করে সন্তুষ্ট হলেন, কিন্তু এমন যে মেয়ের মনােভাব তিনি কি করে সেই মেয়েকে একটি যুবকের প্রেমে পড়াতে পারেন, তাই তিনি ভাবতে লাগলেন। নিজের ছেলের নাম উল্লেখ করলেও জিয়ানেত্তা যদি রাজি না হয়?

শােনাে শােনাে জিয়ানেত্তা, মনে করাে যৌবনােদীপ্ত অথচ অভিজাত ও ভদ্র ইংলণ্ডের রাজা তােমার মতাে সুন্দরী তরুণীর সঙ্গে প্রেম করতে চান, তাহলে কি তুমি তাকে ফিরিয়ে দেবে?

জিয়ানেত্তা তৎক্ষণাৎ জবাব দিল, মা রাজা হয়ত জোর করে আমাকে তার প্রাসাদ নিয়ে যেতে পারেন কিন্তু যদি তিনি আমাকে কুমারী মেয়ের মর্যাদা রক্ষা করতে ও উপযুক্ত সম্মান না দেন, তাহলে আমি তার কোনাে কথাই শুনব না।

স্বীকার করতে হবে মেয়েটির শুধু চারিত্রিক দৃঢ়তাই নেই, মনােবলও অসীম। তাই কী আপাতত আর কোনাে কথা বললেন না। তিনি স্থির করলেন মেয়েটিকে পরে আর একবার পরীক্ষা করে দেখবেন। কিন্তু তিনি মনে মনে একটা মতলব স্থির করে এ বিষয়ে তার ছেলেকেও বললেন। ছেলে সুস্থ হলে তিনি তাকে ও মেয়েটিকে একটি ঘরে বন্ধ করে দেবেন। ছেলেই মেয়ের কাছে তার প্রেম নিবেদন করে তাকে জয় করবার চেষ্টা করবে। আশা করা যায় মেয়ে রাজি হবে কারণ মেয়েটি জানে ছেলের অনেক সৎ গুণ আছে, সে ভদ্র ও বুদ্ধিমান। ইতিমধ্যে তিনি জিয়ানেত্তাকে কিছু স্বাধীনতা দেবেন, তার সঙ্গে প্রভুর মতাে ব্যবহার করবেন না, কথায় কথায় জিয়ানেত্তাকে আর হাঁটু মুড়ে বার বার অভিবাদন জানাতে হবে না, সৌজন্যমূলক ভাষাতেও কথা বলতে হবে না। ছেলে কিন্তু এই প্রস্তাবে রাজি হল না। ফল বিপরীত হল, তার অবস্থার অবনতি হতে লাগল। সে রীতিমতাে অসুস্থ হয়ে পড়ল।

ছেলের জন্যে মায়ের প্রাণ কেঁদে উঠল। তিনি জিয়ানেত্তাকে কাছে ডেকে তার মনের কথা আর একবার বললেন, কিন্তু অপরপক্ষ তাকে সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ না করলে সে কোনাে প্রস্তাবে রাজি নয়।

কত্ৰী তখন তার স্বামীর সঙ্গে পরামর্শ করলেন, কি করা যায়! জিয়ানোর ব্যবহার, কথাবার্তা ও তার চারিত্রিক দৃঢ়তায় উভয়েই সন্তুষ্ট। এমন মেয়ে অভিজাত পরিবারেও বড় একটা দেখা যায় না। তাদের শুধু আপত্তি যে মেয়েটি সম্রান্ত বংশের নয়, নেহাতই ভবঘুরের মেয়ে। কিন্তু ছেলের প্রাণ বাঁচাতে গেলে কি আর করা যাবে। মেয়েটির সঙ্গে বিয়ে না দিয়ে ছেলেটিকে মরতে দেওয়া যেতে পারে না। একমাত্র পুত্র বলে কথা। দু’জনে নানা পরামর্শ করে তারা ছেলেকে বললেন, তােমার কথায় আমরা রাজি। জিয়ানেত্তার সঙ্গেই তােমার বিয়ে দেব।

সব শুনে জিয়ানেত্তা শেষ পর্যন্ত রাজি হল। সে মনে মনে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিল। মঙ্গলময় তাকে ত্যাগ করেন নি। এরপরও কিন্তু জিয়ানেত্তা একবারও প্রকাশ করলাে না যে, সেও তাদেরই মতাে অভিজাত।

আর কোনাে বাধা রইল না। ছেলে রােগমুক্ত হল, সুস্থ হল, হৃদস্বাস্থ্য ফিরে পেল তারপর একদিন উভয়ের বিবাহ হয়ে গেল। মনের মতাে জীবনসঙ্গিনী পেয়ে ছেলে খুব খুশি, পরমানন্দে সে তাকে উপভােগ করতে লাগল। বাবা কিন্তু সর্বদা মনে মনে খুঁত খুঁত করে। পুত্রবধূর কোনাে বংশপরিচয় নেই, এই তার অভিযােগ।

এদিকে ওয়েলসে ইংল্যাণ্ডের রাজার মার্শালের বাড়িতে পেরােত্তো বড় হয়েছে। সে এখন রীতিমতাে যুবক এবং নানা গুণের জন্যে তার প্রভুর প্রিয়পাত্র হয়েছে। তাকে দেখতে হয়েছে রাজপুত্রের মতো। অপরিসীম তার সাহস। অশ্বচালনা, কুস্তি, তলােয়ার বা অন্য কোনাে অস্ত্র প্রতিযােগিতায় তার সমতুল্য যুবক আর একজনও ছিল না। সকলে তাকে পিকার্ডের পেরেত্তো বলে ডাকত এবং অচিরে তার নাম সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ল। মঙ্গলময় ঈশ্বর যেমন তার বােনকে ভােলেন নি, তেমনি পেরেত্তোকেও তিনি অবহেলা করেন নি।

এমন সময় প্লেগ মহামারী সারা ইংল্যাণ্ডে ছড়িয়ে পড়ল। দেশের অর্ধেক লােক মারা গেল, অনেকে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেল। সারা দেশের সে এক করুণ দৃশ্য, যেন শ্মশান।

পেরেত্তো যে পরিবারে আশ্রয় পেয়েছিল সেই পরিবারের কর্তা কর্তী, ছেলে মেয়ে, নাতি নাতনি, আত্মীয়রা সকলেই সেই মহামারীতে মারা গেল। বেঁচে রইল শুধু বিবাহযােগ্যা এক কন্যা। ঈশ্বরের কি অভিপ্রেত কে বলতে পারে তাই পেরেত্তোও বেঁচে গেল।

একদিন মহামারী দূর হল। সব কিছু ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে লাগল, লােকজন নিজ নিজ কাজ আরম্ভ করলাে। পরিবারে সেই যে বিবাহযােগ্যা মেয়েটি বেঁচে গিয়েছিল তার মাথার ওপর তখন কেউ নেই। পেরেত্তোর সকল গুণাবলী সম্বন্ধে মেয়েটি সজাগ ছিল। সে তার কয়েকজন মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী ও উৎসাহী প্রতিবেশীর সমর্থন পেয়ে পেরােত্তোকে স্বামীত্বে বরণ করে তাকে তাদের যাবতীয় সম্পত্তির উত্তরাধিকারী বলে ঘােষণা করলাে। ইংলণ্ডের রাজাও ওয়েলসে তার মার্শালের মৃত্যুসংবাদ পেয়েছিলেন। পিকার্ডের পেরেত্তোর সব খবরই তিনি জানতেন তাই মৃত মার্শালের স্থলে তিনি পেরেত্তোকে সেই অঞ্চলের মার্শাল নিযুক্ত করলেন।

অ্যান্টওয়ারপের কাউন্ট তাঁর নির্দোষ ছেলে ও মেয়েকে অপরের আশ্রয়ে ন্যস্ত করতে ঘটনাচক্রে বাধ্য হয়েছিলেন, এই হল সংক্ষেপে তাদের ইতিহাস।

ইতিমধ্যে আঠার বছরেরও বেশি সময় অতিবাহিত হয়েছে, কাউন্ট দ্রুত ও অকস্মাৎ প্যারিস ত্যাগ করবার পর। এখন তিনি বৃদ্ধ। আয়ারল্যাণ্ডেই সেই জমিদারের বাড়িতে এখনও তিনি সেই চাকরিতেই নিযুক্ত। দুর্ভাগ্যই তাকে এই অপরিসীম কষ্ট সহ্য করতে বাধ্য করেছে। এবার তার ইচ্ছা হল তার ছেলে মেয়ে সেইখানেই আছে কিনা বা তাদের ভাগ্যে কি ঘটেছে একবার খবর নেওয়া উচিত। শুধু উচিত বলে নয়, সন্তানদের দেখবার জন্যেও তার প্রাণ কেঁদে উঠল। বলা বাহুল্য যে বয়স তাে হয়েছেই উপরন্তু দীর্ঘদিন ধরে নানা অসুবিধা ও ক্লেশের ফলে তার চেহারার পরিবর্তন হয়েছে। সহসা কেউ তাকে দেখলে চিনতে পারবে না। তবে দীর্ঘদিন ধরে পরিশ্রম করার ফলে তার দেহ এখনও মজবুত, কর্মক্ষম ও পটু আছে। তার প্যারিসের বিলাসিতার জীবন হয়ত এতদিনে তাকে দুর্বল করে দিত।

দরিদ্র ও মলিনবেশী কাউন্ট ইংলণ্ডে গিয়ে ছেলেমেয়েকে একবার দেখবার জন্যে তার জমিদার মনিবের বাড়ি একদিন ত্যাগ করলেন। প্রথমে তিনি গেলেন পেরেত্তোর সন্ধানে ওয়েলসে। এসে দেখলেন ছেলে এখন এই অঞ্চলে ইংলণ্ড-রাজের মার্শাল নিযুক্ত হয়েছে। কি সুন্দর চেহারা হয়েছে। স্থানীয় মানুষ তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। কাউন্টের যে কি আনন্দ হল তা বলার নয়। কিন্তু কন্যা জিয়ানেত্তার ভাগ্যে কি ঘটেছে তা না জেনে তিনি তার পরিচয় প্রকাশ করতে অনিচ্ছুক।

ওয়েলস থেকে যাত্রা করে তিনি এসে একেবারে লণ্ডনে থামলেন। তারপর যে দয়াবতী মহিলার আশ্রয়ে তিনি কন্যাকে রেখে গিয়েছিলেন তার খোঁজ করতে লাগলেন। মেয়ে এখন ওখানে আছে কিনা সেটাও তাে জানা দরকার।

কাউন্ট যখন জানতে পারলেন সেই মহিলারই পুত্রের সঙ্গে জিয়ানেত্তার বিয়ে হয়েছে তখন তিনি আনন্দে আত্মহারা হয়ে প্রায় কেঁদেই ফেললেন।  ছেলে ও মেয়ে উভয়েই সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত দেখে তিনি নিজের দুঃখ কষ্টের কথা ভুলে গেলেন। মেয়েকে একবার দেখতে ইচ্ছে হল। তিনি সেই জীর্ণ বেশেই মেয়ের বাড়ির সামনে প্রতিদিন ঘােরাফেরা করতে লাগলেন। কাউন্ট একদিন জিয়ানেত্তার স্বামীর নজরে পড়লেন। এই ছেলের নাম জিয়াচেত্তে ল্যামিয়েনস। বৃদ্ধকে দেখে জিয়াচেত্তোর দয়া হল, কি অসহায় এই বৃদ্ধ। জিয়াচেত্তো তার এক ভৃত্যকে ডেকে বললাে, বৃদ্ধকে বাড়িতে ডেকে এনে কিছু খেতে দিতে। ভৃত্য তৎক্ষণাৎ আদেশ পালন করলাে।

জিয়াচেত্তো ও জিয়ানেত্তার ইতিমধ্যে কয়েকটি সন্তান হয়েছে। সব কটি বাচ্চাই দেখতে অত্যন্ত সুন্দর হয়েছে। বড়টি ছেলে, তার বয়স আট বৎসর। কাউন্ট যখন খাচ্ছিলেন তখন ছেলেমেয়ের দল বৃদ্ধের পাশে ভিড় করে মজা করতে আরম্ভ করল এবং তারা তাকে দাদু বলে সম্বােধন করতে লাগল। অথচ তারা জানে না বৃদ্ধ সত্যিই তাদের দাদু। একেই বােধহয় বলে নাড়ীর টান।

কিন্তু কাউন্ট তাে জানেন যে, এরা তার নাতি নাতনি; তাই তিনি তাদের সঙ্গে মিষ্টি ভাষায় মজার মজার কথা বলতে লাগলেন, আদর তাে করলেনই। ছেলেমেয়েরা বৃদ্ধের প্রতি এতদূর আকৃষ্ট হল যে, তাদের গৃহশিক্ষক বার বার ডাকা ও ভয় দেখানাে সত্ত্বেও তারা বৃদ্ধকে ছেড়ে যেতে অনিচ্ছুক। গৃহশিক্ষক তাদের শাস্তি দেবার ভয় দেখাল, তবুও নয়।

বাইরে ছেলেমেয়ের গােলমাল শুনে ব্যাপারটা কি জানবার জন্যে জিয়ানেত্তা নিজের ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে এসে কাণ্ড দেখে অবাক। কিন্তু ছেলেমেয়েকে তাে পড়তে বসতে হবে। তাই জিয়ানেত্তা তাদের বকাবকি আরম্ভ করলাে, বললাে শিক্ষকের কথা না শুনলে শাস্তি পেতে হবে। কিন্তু ছেলেমেয়েরা মায়ের কথা শুনতেও রাজি নয়। তারা বলে তাদের এই দাদু ভারি মজার, তাদের মাস্টারমশাইয়ের চাইতে কত ভালাে। না, ওরা দাদুকে ছেড়ে যাবে না। ছেলেমেয়ের কাণ্ড দেখে জিয়ানেত্তা ও কাউন্ট স্বয়ং হাসতে লাগলেন।

নিজ কন্যা হলেও বনেদী পরিবারে বাড়ির বৌ তাে বটে, তাই তাকে সম্মান জানাবার জন্যে কাউন্ট দরিদ্র ভবঘুরের মতােই উঠে দাঁড়িয়েছে। কন্যা তাকে চিনতে পারে নি কিন্তু মেয়েকে দেখে তার মনে হল যে তিনি রাজরানীকে দেখছেন। আনন্দে তার হৃদয় নৃত্য করতে লাগল।

শিশু জিয়ানেত্তার পিতার যে চেহারা মনে আছে তা ক্ষীণ হলেও দীর্ঘদিন পরে এক হতশ্রী বৃদ্ধ যার চুল দাড়ি পেকে গেছে, বেশবাস বিবর্ণ, তাকে দেখে জিয়ানেত্তার একবারও মনে হল না এই বৃদ্ধ তার পিতা। | জিয়ানেত্তা যখন দেখল শাস্তি দেবার ভয় দেখানাে সত্ত্বেও ছেলেমেয়েরা বৃদ্ধকে কিছুতেই ছেড়ে আসতে রাজি হচ্ছে না, তখন সে গৃহশিক্ষককে অনুরােধ করল ওদের ছুটি দিতে।

ছেলেমেয়েরা যখন বৃদ্ধকে ঘিরে লাফালাফি করছে আর জিয়ানেত্তা আপত্তি না করে তাদের দেখছে, ঠিক সেই সময়ে জিয়ানেত্তার শ্বশুর গৃহকর্তা ফিরে এসে এমন দৃশ্য দেখে বিরক্ত হলেন। তিনি তাে অজ্ঞাতকুলশীল জিয়ানেত্তাকে পুত্রবধু রূপে মেনে নিতে পারেন নি। তিনি ভুরু কুঁচকে বললেন, এই তাে হবে, যেমন মায়ের ছেলেমেয়ে তাদের স্বভাব তাে সেইরকম হবে। ওরা রাস্তার ভিখিরির সঙ্গে খেলবে না তাে কার সঙ্গে খেলবে। খেলুক, খেলুক, ওরই সঙ্গে খেলুক।

কথাগুলাে কাউন্টেরও কানে গেল, মনে মনে তিনি আহত হলেন। ইচ্ছে হলেও প্রতিবাদ করতে পারলেন না। এই দীর্ঘদিনে অনেক অপমান সহ্য করেছেন না-হয় আরও একটু সহ্য করলেন। প্যারিসের অবস্থা না জেনে তিনি তাে আত্মপ্রকাশ করতে পারেন না। জিয়ানোও হয়ত ভাবল সে তার পরিচয় প্রকাশ করতে পারতাে কিন্তু পিতার নিষেধ আছে।

বাচ্চারা যেভাবে বৃদ্ধকে নাস্তানাবুদ করছে তা দেখে জিয়াচেত্তে বিরক্ত হলেও বাধা দিল না। উপরন্তু সে নির্দেশ দিল যে বৃদ্ধ যদি বাড়িতে থাকতে চায় তাে থাকুক, ওকে কিছু কাজ দেওয়া হােক। এই প্রস্তাবে সানন্দে কাউন্ট রাজি হল কিন্তু সেই সঙ্গে বললাে যে, সে যদি ঘােড়া দেখাশােনার কাজ পায় তাে খুশি হবে। সে ঘােড়ার তদারকি করতে ভালবাসে, ঘােড়ার কাজই সে করে আসছে। ভালােই হবে, সে আস্তাবলে কাজ করার পর বাচ্চাদের সঙ্গে খেলা করতে পারবে, গল্প বলতেও পারবে।

কাউন্ট অফ অ্যান্টওয়ারপ ও তার সন্তানদের নিয়ে ভাগ্যদেবী যখন খেলা করছিলেন তখন ফ্রান্সের রাজার মৃত্যু হল। তার স্থলে রাজা হল তার সেই ছেলে যে-ছেলের স্ত্রীর জন্য আজ কাউষ্টের এই দুর্দশা, তাকে নির্বাসিতের জীবন যাপন করতে হচ্ছে।

বৃদ্ধ রাজা জার্মানদের সঙ্গে কয়েকটি শান্তিচুক্তি করে সাময়িকভাবে যুদ্ধবিরতি করাতে পেরেছিলেন। রাজার মৃত্যুর পর কয়েকটি চুক্তির মেয়াদ শেষ হল। ততদিনে তার পুত্র ফ্রান্সের রাজা হয়েছেন। তাই প্রতিশােধের স্পৃহা নিয়ে নতুন রাজা জার্মানদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে প্রবৃত্ত হলেন।

ইতিমধ্যে ফ্রান্সের রাজার সঙ্গে ইংলণ্ডের রাজার কুটুম্বিতা স্থাপিত হয়েছে। সেই সূত্রে ইংরেজরাজ পেরােত্তো এবং ল্যামিয়েনস জিয়াচেত্তোর অধীনে বিরাট এক অভিযাত্রী বাহিনী ফ্রান্সে পাঠানাে স্থির করলেন।

অ্যান্টওয়ারপের কাউন্ট স্বয়ং ফ্রান্সে যাবার একটা সুযােগ পেলেন। অভিযাত্রী বাহিনীর সঙ্গে অনেক ঘােড়া যাবে। ঘােড়া সম্বন্ধে অনেক তথ্য জিয়াচেত্তোকে কাউন্ট জানিয়েছিল। কাউন্টের পরামর্শে জিয়াচেত্তো তার আস্তাবলের অনেক উন্নতি সাধন করতে পেরেছিল। অশ্ব ব্যতীত অন্যান্য বিষয়েও কাউন্টের পরামর্শ শুনে জিয়াচেত্তো লাভবান হয়েছে। অভিযাত্রী বাহিনীর সঙ্গে কাউন্টও চললেন।

যুদ্ধ যখন চলছিল সেই সময়ে সেই রানী, যার জন্য কাউন্ট ও তার ছেলেমেয়ের এই বিপর্যয়, সেই রানী মরণােন্মুখ রােগে পড়ল। যখন বুঝতে পারলাে তার বাঁচবার আশা নেই তখন সে স্থির করলাে, সে যে ঘাের অন্যায় ও পাপ করেছে সেই পাপ স্বীকার করবে। তদনুসারে কয়েক আর্চবিশপকে খবর দেওয়া হল। সাধুপুরুষ হিসেবে এই আর্চবিশপের সুখ্যাতি ছিল। রানী তার সমস্ত পাপই স্বীকার করলাে এবং অনুরােধ করলাে যে কাউন্ট ও তার পুত্রকন্যাকে ফিরিয়ে এনে যেন স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠা করা হয়। নচেৎ মরেও তিনি শান্তি পাবেন না। এই অনুরােধ তিনি রাজাকেও করলেন এবং বললেন কাউন্ট যদি জীবিত না থাকেন তাহলে তার পুত্র ও কন্যাকে খুঁজে বার করে যথােপযুক্ত প্রায়শ্চিত্ত যেন করা হয়। এর কিছুকাল পরেই রানী মারা গেল।

রাজা সব শুনলেন। যােগ্য, মানী ও অনুরক্ত এক ভদ্র ব্যক্তির প্রতি যে ঘাের অন্যায় করা। হয়েছে, সেজন্যে রাজা অনুতাপ করতে লাগলেন। অবিলম্বে প্রতিকার করা উচিত। রাজা দেশেবিদেশে ব্যাপকভাবে এক ঘােষণা জারি করলেন যে, অ্যান্টওয়ারপের কাউন্ট ও তার পুত্রকন্যার যে সঠিক সংবাদ আনতে পারবে তাকে প্রচুর পুরস্কার দেওয়া হবে। রানী স্বীকারােক্তি করার পর কাউন্টের বিরুদ্ধে যেসব অভিযােগ ছিল সে সবই প্রত্যাহার করা হল। তিনি সম্পূর্ণ নির্দোষ। তিনি হদি বেঁচে থাকেন তাহলে তাকে তার পদে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা হবেই, চাই-কি উচ্চপদ ও আরও সম্মান দেওয়া হবে।

এই ঘােষণার কথা কাউন্টের কানে উঠল। তিনি তখন জিয়াচেত্তোকে অনুরােধ করলেন যে সে হাদি পেরেত্তো ও রাজার সঙ্গে তার দেখা করিয়ে দিতে পারে তাহলে রাজা যে খবর চান সেই খবর সে দিতে পারে।

কাউন্ট ভাবছিলেন এবার তিনি তার আসল পরিচয় প্রকাশ করবেন। তাই জিয়াচেত্তো ও পেরেতের সঙ্গে একত্র হবার পর বললেন :

পেরেত্তো শোন, জিয়াচেত্তোর সঙ্গে যে মেয়েটির বিয়ে হয়েছে সে তােমার বােন। জিয়াচেত্তো তার পত্নীর পক্ষ থেকে কোনাে যৌতুক পায়নি এবং তােমার বােন যৌতুক পাবার অধিকারী। অতত্রব আমি চাই রাজা যে বিরাট পরিমাণ পুরস্কার ঘােষণা করেছে সেটা সে আমাদের পরিচয় জানিয়ে দিয়ে দাবি করুক। রাজাকে সে বলবে তুমি পেরেত্তো, কাউন্ট অফ অ্যান্টওয়ারপের পুত্র এবং তােমার বােন ভায়ােলানতির সঙ্গে জিয়াচেত্তোর বিবাহ হয়েছে এবং আমি হলুম তােমার পিতা আন্টিওয়ারপের কাউন্ট স্বয়ং।

এ কথা শুনে পেরেত্তো বৃদ্ধকে নিরীক্ষণ করতে লাগলাে। পিতার যে চেহারা তার মনে ছিল তার সঙ্গে অনেক মিল লক্ষ্য করে, সে বুঝতে পারল ইনিই তার পিতা, তবে এখন বৃদ্ধ হয়েছেন। তার চোখে জল এসে গেল। পিতাকে প্রণাম করে তাকে জড়িয়ে ধরে বললাে, বাবা তােমাকে ফিরে পেয়ে আমাদের কি আনন্দ হচ্ছে!

কাউন্টের সব কথা শুনে জিয়াচেত্তো যত অবাক হল ততই আনন্দিত হল। সে যে কি করবে তা সে বুঝে উঠতে পারলাে না। সে মনে মনে লজ্জিত হল কারণ পরিচয় না জেনে সহিস ভেবে সে সবসময় কর্কশ কথা বলেছে। তারও চোখে জল এসে গেল। সে কাউন্টের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে ক্ষমা ভিক্ষা করলাে। কাউন্ট তার হাত ধরে তাকে তুলে বললেন যে তার কোনাে দোষ নেই, তিনি তাকে ক্ষমা করলেন।

তখন তিনজনে মিলে হাসিকান্নার মধ্য দিয়ে অনেক কথা বলাবলি কবলাে। পেরেত্তো ও জিয়াচেত্তো কাউন্টের জন্য নতুন পােশাক আনাল কিন্তু কাউন্ট এখন তা পরতে রাজি হলেন না। তিনি বলনে, তিনি যে সহিসের বেশে আছেন এই বেশেই জিয়াচেত্তো তাকে বাজার সামনে হাজির করে পরিচয় জানাক। তাহলে রাজা তার কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হবেন কারণ তার রানী অন্যায় করলেও রাজা কিছু অনুসন্ধান না করেই তাকে কঠোর দণ্ড দিয়েছিলেন। যেজন্যে তাকে অনেক অপমান ও কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে।

জিয়াচেন্তো তখন কাউন্ট ও পেরেত্তোকে নিয়ে রাজদরবারে গিয়ে রাজাকে বলল সে কাউন্ট অফ অ্যান্টওয়ারপ এবং তার পুত্রকে এখনি তার সমক্ষে হাজির করতে পারে। রাজা শুনে বললেন, বেশ তাহলে পুরস্কারের বিপুল অর্থ ও উপহারের অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী যা সাজানাে রয়েছে তা জিয়াচেত্তোকে দেওয়া হবে। অর্থ ও উপহারসামগ্রী তিন ভাগে ভাগ করে রাখা আছে। পরিমাণ দেখে জিয়াচেত্তো বিস্মিত।

জিয়াচেত্তো তখন সহিসবেশী কাউন্ট ও পেরেত্তোকে রাজার সামনে হাজির করে বললো, মহারাজ এই দেখুন পিতা ও পুত্রকে এবং এরই কন্যার সঙ্গে আমার বিবাহ হয়েছে। আমার পত্নী এখন এখানে নেই তবে ঈশ্বরের ইচ্ছায় আপনি তাকে শীঘ্রই দেখতে পাবেন।

আপাত হতবুদ্ধি রাজা সহিসবেশী বৃদ্ধকে কিছুক্ষণ ধরে লক্ষ্য করলেন। যদিও ইতিমধ্যে অনেক বছর কেটে গেছে, চেহারায় পরিবর্তন হয়েছে তথাপি শেষ পর্যন্ত তিনি কাউন্টকে চিনতে পারলেন অতি কষ্টে অশ্রু সম্বরণ করে তিনি কাউন্টকে আলিঙ্গন করলেন। পেরেত্তোকে আদর করলে। তিনি সঙ্গে সঙ্গে আদেশ জারি করলেন যে এখনই কাউন্টকে তার উপযুক্ত পােশাক ইত্যাদি এক তার বাড়ি ও সমস্ত সম্পত্তি ফেরত দেওয়া হােক। সেই সঙ্গে তার সেবক, ভৃত্য, অশ্ব, অশ্ববান চালক ও সহিস সবকিছুই ফিরিয়ে দেওয়া হােক। অযথা বিলম্ব যেন না হয়। উপরন্তু আরও বহু সম্পদ ও সম্মান কাউন্টকে দেওয়া হল।

পেরেত্তোকেও রাজা যথােপযুক্তভাবে সম্মানিত করে তার সংগ্রাম ও কাহিনী শুনতে চাইলেন। জিয়াচেত্তোকে রাজা তার ঘােষণা অনুযায়ী পুরস্কার দিলেন। কাউন্ট তাকে বললাে, এসব তুমি লণ্ডনে নিয়ে যাও এবং তােমার পিতাকে বােল যে তােমার পত্নী অর্থাৎ আমার কন্যা এবং তােমার ছেলেমেয়ে যারা আমার এবং তােমার পিতারও নাতি নাতনি তারা কেউ ভবঘুরে বা ভিখিরি বংশােদ্ভূত নয় অন্তত তাদের মায়ের দিক থেকে।

বিপুল পুরস্কার সঙ্গে নিয়ে জিয়াচেত্তো ইংলণ্ডে ফিরে তার মা, তার পত্নী ও পেরেত্তের পত্নীকেও প্যারিসে নিয়ে এল। তারা সকলে কাউন্টের প্রাসাদে পরমানন্দে বাস করতে লাগল। কাউন্ট তার পুত্র, কন্যা জামাতা পুত্রবধূকে যতদূর সম্ভব আদরযত্নে কাছে রাখলেন। তারপর তারা নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে ফিরে গেল।

কাউন্ট প্যারিসেই রইলেন এবং গৌরবের সঙ্গে রাজার ও দেশের সেবা করতে থাকলেন।

 

নবম গল্প

জেনােয়ার বারনাববার সঙ্গে আমব্রোগিউলাে প্রতারণা করলাে। ফলে বারনাবাের সমস্ত অর্থ ক্ষয় হল এবং সে তার পত্নীকে হত্যা করবার আদেশ দিল। পত্নী কিন্তু পলায়ন করলাে এবং পুরুষ সেজে সুলতানের চাকরি নিল। পরে সে সেই প্রতারককে খুঁজে বা করলাে এবং স্বামীকে প্রলােভিত করে অ্যালেকজান্ড্রিয়ায় নিয়ে এল আমব্রোগিউলােকে শাস্তি দেওয়ালাে। পত্নী এবার তার পুরুষের ছদ্মবেশ ত্যাগ করলাে এবং স্বামী বারনাকে ও প্রচুর অর্থ নিয়ে জেনােয়াতে ফিরে এল।

এলিসা মর্মস্পর্শী কাহিনী বলে তার পালা শেষ করলাে। তখন দলের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দরী ও লাবণ্যময়ী ফিলােমেনা যে হল কুইন সে তার সঙ্গীদের বলল ডায়ােনিওর সঙ্গে আমরা যে চুক্তি করেছি তা আমাদের পূরণ করা উচিত। এবার তাে গল্প বলতে বাকি আমি আর সে। তবে আমি আমার গল্পটা আগে বলবাে তারপর তার দাবি অনুসারে শেষ গল্পটা ডায়ােনিও বলবে। এই বলে ফিলােমেনা তার গল্প বলতে আরম্ভ করলাে

একটা চলতি কথা আছে যে প্রতারিত ব্যক্তি একদিন তার প্রতারকের ওপর শােধ নেবেই নেবে কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা যায় না এমন হয় না। তবুও এমন ঘটতেও দেখা যায়। তাই প্রিয় বান্ধবীরা আমি বাড়াবাড়ি বা অতিশয়ােক্তি না করে এমনই একটি কাহিনী বলবাে যেখানে প্রতারিত ব্যক্তি তার প্রতারকের ওপর প্রতিশােধ নিতে পেরেছিল। আমার গল্পটা তােমাদের ভালােই লাগবে এবং তােমরা ঠগ-জোচ্চোরদের এড়িয়ে চলবার শিক্ষা গ্রহণ করতে পারবে।

ছােট বড় ব্যবসায়ীরা নিজ নিজ উদ্দেশ্য সাধনের জন্যে প্যারিস নগরীতে ভিড় জমায়। একবার একদল সমৃদ্ধিশালী ব্যবসায়ী একই সরাইয়ে বাস করছিল। একদিন সন্ধ্যায় তারা রাতের খাওয়া শেষ করে জমিয়ে আড্ডা দিতে আরম্ভ করলাে। আড্ডায় যেমন আরম্ভ হয় বিষয় নিয়ে, তারপর নানা কাহিনী মুখে মুখে ঘুরতে থাকে। সেদিনের বিষয় বেশ জমে উঠেছিল কারণ তারা ইটালিতে নিজেদের স্ত্রীদের ছেড়ে এসেছে। তাদের নিয়েই আড্ডা জমাল।

একজন বললাে ইটালিতে আমার ঘরে আমার বৌ কি করছে জানি না তবে আমি যখনই প্যারিসে আসি এবং কোনাে মেয়ে আমার মনে ধরলে তাকে নিয়ে আমি চুটিয়ে প্রেম করি। বৌয়ের কথা তখন ভুলেই যাই।

দ্বিতীয় আর একজন বললাে, আরে ভাই ছাড় তাে ওসব কথা, আমাদের বৌরাই কি ছেড়ে দেয় নাকি? তারাও তাে রক্তমাংসের মানুষ। সুযােগ পেলে তারাও পরপুরুষকে ঘরে তােলে। অতত্রব এ হল বদলাবদলির কথা। স্বামী যখন অন্য নারীতে মত্ত তখন আমিই-বা ছাড়ব কেন? এই হল আমারও নীতি। তুমি কি বললা হে? বলে প্রশ্নটা সে তৃতীয় এক ব্যক্তির প্রতি ছুঁড়ে দিল।

তৃতীয় ব্যক্তিও তার দুই বন্ধুকে সমর্থন করলাে। তারপর দেখা গেল যে সকলেই ঐ একই নীতিতে বিশ্বাসী এবং এটা যে দূষণীয় নয় এমন মতও কেউ কেউ প্রকাশ করলাে।

কিন্তু জেনােয়ার বারনাবাে লােমেলিন ভিন্ন মত প্রকাশ করলাে। সে বলল, আমি ভাই তােমাদের কথা বলতে পারবাে না। তবে প্যারিসে এসে আমি যেমন অন্য কোনাে মেয়েকে নিয়ে মেতে উঠি না তেমনি জেনােয়াতে আমার স্ত্রীও একাই থাকে ও নিজের সব কাজকর্ম একাই করে। গর্ব করবাে না সত্যি কথাই বলছি আমার স্ত্রী সর্বগুণে গুণান্বিতা, পুরুষ যে কাজ পারে না এমন অনেক কাজ সে করতে পারে। বলতে কি সারা ইটালিতে এমন দ্বিতীয় একটি রমণী আছে কিনা আমার সন্দেহ। তার বয়স এখনও বেশি হয়নি, যৌবনরসে সে ভরপুর, সুন্দরী, রুচিশীলা, শালীনতা রক্ষায় সদা সচেষ্ট। নানা কাজ জানে যার মধ্যে তার সূচেব কাজ দেখবার মতাে, এ কাজে সে দারুণ নিপুণা। তারপর শোনাে সে খুব ভালাে রান্না করতে পারে আর অতিথিদের এমন চমৎকার ভাবে পবিবেশন করে যার তুলনা মেলা ভার। আরও শােনাে, সে অশ্বচালনায় পটিয়সী। বাজপাখি নিয়ে যেমন শিকার ধরতে পারে তেমনি তীর ছুঁড়ে লক্ষ্যভেদ করতেও পারে। বই পড়তে ভালবাসে, হিসেব রাখতে জানে, লিখতে পারে। এক কথায় বলতে কি সে আমাদের অনেকের কান কাটতে পারে।

স্ত্রীর আরও অনেক প্রশংসা করে সে বললাে, তার স্ত্রীর প্রধান গুণ সে পতিগতপ্রাণা, স্বামী ব্যতীত দ্বিতীয় পুরুষ সে জানে না, তার তুল্য সতী দেখা যায় না। শেষে বললাে, আমি যদি দশ বৎসর কিংবা বাকি জীবন যদি বাড়ি না ফিরি, তাহলে আমার স্ত্রী বাকি জীবন একাই কাটিয়ে দেবে, অন্য কোনাে পুরুষের আশ্রয় নেবে না।

আড্ডাধারীদের মধ্যে বারনাববার মতাে একজন যুবক ব্যবসায়ী ছিল। তার নাম আমব্রোগিউলে, তার বাড়ি ইটালিতে পিয়াচেঞ্জা শহরে। বৌয়ের প্রশংসায় পঞ্চমুখ বারনাবাের কথা শুনে সে হাে হাে করে হেসে উঠে বললাে, খুব যে বড়াই করছ বন্ধু। স্বয়ং সম্রাট কি তােমাকে এমন সব সুযােগসুবিধে অর্পণ করেছেন নাকি?

উত্তরে বারনাবাে বলল, সম্রাট কেন? ঈশ্বরই তাকে এইসব দান করেছেন, কে না জানে সম্রাট অপেক্ষা ঈশ্বর শক্তিশালী। তার স্বরে বিরক্তি।

আমব্রোগিউলাে তখন বললাে, বারনাবাে তুমি যা বলছ তাতে আমি একটুও সন্দেহ প্রকাশ করছি , সবই সত্যি। কিন্তু আমার মনে হয় মানুষের মনের খবর তুমি রাখাে না। তা যদি রাখতে তাহলে তুমি যেসব কথা জোরের সঙ্গে বললে তা বলতে না। তােমার চোখ থাকলে মানুষের মধ্যে কিছু দুর্বলতা লক্ষ্য করতে যা সব মানুষের আছে। আমরা আমাদের পত্নীদের বিষয়ে নানা কথা বলেছি তার সবই মিথ্যা নয়, যা ঘটে তাই-ই বলেছি। অতত্রব তােমার বৌ যে ব্যতিক্রম হবে এ আমি বিশ্বাস করতে পারি নি, ঠিক আছে, আমি ব্যাপারটা যাচাই করতে চাই অবশ্যই তােমার সম্মতি নিয়ে।

সে আরও বলতে লাগলাে, ঈশ্বর পার্থিব যা কিছু সৃষ্টি করেছেন তার মধ্যে মানুষ এবং পুরু মানুষই শ্রেষ্ঠ, তারপরে নারীর স্থান। পুরুষ অনেক বেশি সম্পূর্ণ, তার কাজেই তার প্রকাশ। পুরুষের মনের ও দেহের জোরও বেশি, সে তুলনায় নারী দুর্বল, এজন্যে তার দৈহিক গঠনই দায়ী। কিসে নারীর দুর্বলতা তা নিয়ে আমি আপাতত আলােচনা করছি না।

আমরােগিউলাের কথা শেষ হয়নি। সে বলছে, তাহলে দেখাে পুরুষের জোরই বেশি। যদি কোনাে নারী উপযাচিকা হয় তাকে পুরুষ ফিরিয়ে দেয় না কিন্তু যদি কোনাে নারীকে পুরুষ আকর্ষণীয় মনে করে, তাহলে সে ছলে বলে কৌশলে সেই নারীকে জয় করে নিজের মনের ইচ্ছে পূর্ণ করে। এইভাবেই পুরুষ নারীকে উপভােগ করে, মাসে একবার নয়, বার বার প্রতিবার। মনের দিক থেকেও নারী তাে একেই দুর্বল তার ওপর পুরুষ তাকে নানাভাবে প্রলােভিত করে, যা নারীর পক্ষে উপেক্ষা করা কঠিন। সে আত্মসমর্পণ করে। তােমার বৌ নিশ্চই নারী এবং অন্য নারীর মতােই রক্তমাংসে গঠিত। তাহলে অন্য নারী যে প্রলােভন উপেক্ষা করতে পারে না তা তােমার স্ত্রী-ই বা কি করে পারবে? অন্য নারীর পক্ষে যা প্রযােজ্য, তােমার স্ত্রীর পক্ষেও তাই প্রযােজ্য হতে বাধ্য। অতত্রব না জেনেশুনে স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছনাে ঠিক নয়।

বারনাবাে সংক্ষেপে যথাযথ উত্তর দিল। সে বললাে, দেখ বাপু আমি জাত বেনে, বেনের মতােই উত্তর দেব। তােমার কথা ঠিক, তবে সেসব মূখ ও নিলর্জুদের ক্ষেত্রে প্রযােজ্য। যাদের শালীনতাবােধ আছে, যাদের চরিত্র দৃঢ় তারা নিজেদের সম্মান রক্ষা করতে জানে এবং মনােবলের দিক থেকে পুরুষকেও পরাজিত করতে পারে এবং আমার স্ত্রী এইরকম একজন মহিলা।

আমব্রোগিউলাে হারবার মানুষ নয়। সে বললাে, অসতী নারীর সংখ্যাই বেশি, অনেকে নিজের প্রেম গােপন রাখে তাই আমরা তাদের সংখ্যা জানি না। তবে সতী থাকবে না কেন? আছে। তারা কারা? যাদের কাছে কোনাে পুরুষ যায় নি, যাদের কোনাে পুরুষ প্রলােভিত করে নি, যারা কুরূপা। আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি যে, সতী নারী আমি দেখি নি।

বারনাবাে বিরক্ত হয়ে বললাে, দেখ বাপু তর্কর শেষ নেই, তুমি তােমার যুক্তি দিয়ে আমার যুক্তি খণ্ডন করতে পারাে কিন্তু আমার দৃঢ় বিশ্বাস থেকে টলাতে পারবে না। যাই হােক তুমি খুব ধূর্ত বলে মনে হচ্ছে তবুও আমি তােমাকে একটা সুযােগ দিচ্ছি, সেই সঙ্গে ঝুঁকিও নিচ্ছি। তুমি জেনােয়াতে আমার বাড়ি যাও, আমার বৌয়ের সঙ্গে আলাপ করাে এবং দেখবে আমার কথা সত্যি কিনা কিন্তু যদি হেরে যাও তাহলে আমাকে হাজার ফ্লোরিন দিতে হবে।

আমব্রোগিউলাে বললাে, বারনাবাে তােমার মাথায় কি আছে জানি না কিন্তু আমি যদি জিতি এবং তােমাকে প্রমাণ এনে দিতে পারি, তাহলে তুমি আমাকে পাঁচ হাজার ফ্লোরিন দেবে। প্যারিস ছাড়বার পর আমি তিন মাসের মধ্যে ফিরে এসে তােমার কাছে প্রমাণ দাখিল করব, যার মধ্যে থাকবে তােমার স্ত্রীর ব্যক্তিগত ব্যবহারের কোনাে সামগ্রী। তবে তােমাকে একটা প্রতিজ্ঞা করতে হবে, এই তিন মাসের মধ্যে অর্থাৎ প্যারিসে না ফেরা পর্যন্ত তুমি জেনােয়া যাবে না বা তােমার স্ত্রীর কাছে কোনাে বার্তা পাঠাতে পারবে না।

বানাবাে সব শর্তে রাজি হল কিন্তু অন্য ব্যবসায়ীরা তাকে নিরস্ত করবার চেষ্টা করলাে। তারা সতর্ক করে দিল, বলল দরকার কি? যদি কিছু ঘটে যায় তাহলে তােমার সুখের সংসার ভাঙবে, অর্থনাশ হবে।

কিন্তু ওরা দু’জনেই কারও কথা শুনল না। কাগজ বার করে চুক্তিপত্র তৈরি করে তাতে নিজ নিজ স্বাক্ষর দিল। চুক্তিপত্রে সই ও সীলমােহর পড়ল, সাক্ষীরাও সই করলাে, কাজ পাকা হল। এরপর চুক্তিমতাে বারনাবাে প্যারিসেই রইল আর আমব্রোগিউলো সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত রাস্তায় যত শীঘ্র সম্ভব জেনােয়াসে হাজির হল। জেনােয়াতে পৌঁছে সে বারনাবাের বাড়ি খুঁজে বার করলাে কিন্তু তখনি তার বাড়িতে গিয়ে তার স্ত্রীর সঙ্গে আলাপ করলাে না। সে অন্য এক জায়গায় বাসা ভাড়া করে রইলাে, তাব। বারনাবাের স্ত্রীর সম্বন্ধে খোজ খবর নিতে লাগলাে। খোজ নিয়ে জানল যে, বারনাবাে যা বলেছে ? সবই ঠিক। বড় শক্ত ঘাঁটি, বারনাবাে-পত্নী কড়া ধাতের মানুষ, তার সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি করতে গেলে মার খেতে হবে, অপমানের বােঝা মাথায় নিয়ে ফিরতে হবে।

কিন্তু আমব্রোগিউলাে মানুষটা তাে ভালাে নয়। সে ঠিক করলাে বাজি যখন ধরেছে তখন যেভাবে হােক জিততে হবে। এক বৃদ্ধা ছিল, সে বারনাববার বাড়িতে নিয়মিত যেত। বানানাের বৌ বুড়িকে ভালবাসত।

আমব্রোগিউলাে তার দুরভিসন্ধিতে বুড়ির সাহায্য চাইল কিন্তু বুড়ি কিছুতেই রাজি হল না। তখন আমব্রোগিউলাে বুড়িতে কিছু উৎকোচ দিয়ে খুশি করে বললাে, বুড়িকে আর কিছু করতে হবে না, শুধু একটা কাঠের সিন্দুক বারনাববার বৌয়ের শয়ন ঘরে দু’একদিন রাখবার ব্যবস্থা করে দিতে হবে বুড়ি রাজি হল। দুষ্ট লোেক তখন তার মান অনুযায়ী একটা কাঠের সিন্দুক তৈরি করালাে। বুড়ি সরল মানুষ। আমব্রোগিউলাের বদ মতলব সে সন্দেহ করলাে না। তার নির্দেশমতাে বুড়ি আমব্রোগিউলেরে বউকে অনুরােধ করলাে যে সিন্দুকটা অন্য এক জায়গায় পাঠান হবে, তার বাড়িতে জায়গা নেই তাই সে সিন্দুকটা বারনাবাে মশাইয়ের বাড়িতে রাখতে চায়। কিন্তু সিন্দুকটা অন্য কোথাও রাখলে চলবে , গৃহিণীর শয়নঘরে রাখতে হবে। সিন্দুকটা নিরাপদে থাকবে।

একটা সিন্দুক রাখবে তাে কি হয়েছে? ঘরে জায়গা আছে। কিছু সন্দেহ না করে বারনাবাের কে তার শয়নঘরে সিন্দুক রাখতে দিতে রাজি হল। একসময়ে সিন্দুক ঘরে এসে গেল। সিন্দুকের ভেতরে যে আস্ত জান্ত জোয়ান একটা পুরুষ থাকতে পারে এ সন্দেহ বারনাববার বৌ একবারও করল না। সিন্দুকটা খুলেও দেখল না।

রাত্রি গভীর হল। ঘরে একটা মাত্র তেলের আলাে জ্বলছে। আমব্রোগিউলাে বুঝলাে মহিল। তখন গভীর নিদ্রায় নিদ্রিত। তখন সে কয়েকটা যন্ত্রের সাহায্যে সিন্দুক খুলে নিঃশব্দে বাইরে বেরিয়ে এলাে। ঘরখানা সে ভালাে করে দেখল, কোথায় কোন্ আসবাব আছে, কোথায় কি ছবি টাঙানাে। আছে, কোথায় আলাে ঝুলছে, খাটে কি বিছানা পাতা আছে, সবই সে উত্তমরূপে দেখে মুখস্থ করে নিল।

সে দেখল ছােট্ট একটি মেয়েকে নিয়ে মহিলা শুয়ে আছে। দু’জনেই গভীর ঘুমে অচেতন মহিলার দেহ একটা চাদরে আবৃত ছিল। চাদর তুলে সে মহিলার নগ্ন দেহ দেখল। বারনাবাে সত্যি কথাই বলেছিল, মহিলা অপূর্ব সুন্দরী। যখন বেশবাস পরিহিতা দেখেছে তখনও অপরুপা। সে অনুসন্ধান করতে লাগলাে মহিলার দেহে কোথাও কোনাে বিশেষ চিহ্ন তথা জড়ুল, তিল বা কত দাগ আছে কিনা। অবশেষে দেখল মহিলার বাম স্তনের নিচে কালাে একটা তিল আছে। তিল ফিকে ঘিয়ে সরু কয়েকগাছা ছােট ছােট সােনালি চুল আছে। ভালাে করে চিহ্নটি লক্ষ্য করে সে মহিলার দেহ আবৃত করে দিল। অতি কষ্টে সে নিজেকে সংযত করেছিল, তার বার বার ইচ্ছা হচ্ছিল মহিলার পাশে শুতে কিন্তু প্রাণভয়ে তা পারলাে না। কারণ সে খবর নিয়ে জেনেছিল এই মহিলা আর পাঁচজন সাধারণ মেয়ের মতাে হালকা নয়। চারিত্রিক দৃঢ়তা অসাধারণ তাই আমব্রোগিউলে মহিলাকে স্পর্শ করতেও সাহস করে নি।

তারপর সেই দুষ্ট লােক ঘরের জিনিসপত্র হাতড়াতে লাগল। মুদ্রা রাখার একটা ব্যাগ, বাক্স থেকে একটা ক্লোক, কয়েকটা আংটি, দু’একটা কারুকাজ করা কোমরবন্ধনী চুরি করে সিন্দুকে রেখে নিজেও সিন্দুকে ঢুকে বন্ধ করে দিল। আরও এক রাত্রি সে সিন্দুকের মধ্যে রইলাে। মহিলা কিছুই টের পেল না।

তৃতীয় দিন সকালে বুড়ি ফিরে এসে সিন্দুকটা ফিরিয়ে নিয়ে গিয়ে যথাস্থানে রেখে দিল। সিন্দুক থেকে বেরিয়ে বুড়িকে পুরস্কৃত করে এবং চুরি করা সামগ্রীগুলি নিয়ে আমব্রোগিউলাে চুক্তি অনুসারে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই পারিসে ফিরে এলাে।

তারপর সে বারনাবাে সমেত অন্যান্য ব্যবসায়ী, যারা চুক্তির দিন হাজির ছিল তাদের একত্র করে বললে সে তার কথা রেখেছে, সে বাজি জিতেছে। বারনাব তাে প্রথমে তার কথা বিশ্বাস করেনি কিন্তু আমব্রোগিউলাে একে একে তার স্ত্রীর শয়নকক্ষের বর্ণনা দিল নিখুঁতভাবে। ঘরটা কত বড়, কোথায় কি আসবাব আছে, কোথায় কোন্ ছবি টাঙানাে আছে, খাট কেমন, কি বিছানা পাতা আছে, আলােটা কেমন, কোথায় রাখা থাকে নির্ভুলভাবে বললাে এবং সবশেষে চুরি করে আনা সামগ্রীগুলি দেখিয়ে বললাে এগুলি বারনাবাের স্ত্রী তাকে উপহার দিয়েছে।

বারনাবাে স্বীকার করল যে আমব্রোগিউলাে শয়নঘরের নির্ভুল বর্ণনা দিয়েছে এবং সামগ্রীগুলিও সে সনাক্ত করে বললাে এসব অন্য উপায়ে আনা বা সংগ্রহ করা যেতে পারে। তার ভৃত্যরা হয়ত আমব্রোগিউলােকে সাহায্য করেছে। আরও কিছু সঠিক প্রমাণ না পেলে সে বিশ্বাস করতে পারছে না।

আমব্রোগিউলাে তখন ব্যঙ্গ করে বললাে, এত সব প্রমাণেও যখন তুমি সন্তুষ্ট নও তখন আমি তােমাকে মােক্ষম প্রমাণ দিচ্ছি। তাহলে ভালাে করে শোনাে, তােমার পত্নী জিনাভরার বাম স্তনের নিচে একটি ছােট কালাে তিল আছে আর সেই তিল ঘিরে বারােটি ক্ষুদ্র ও সরু সােনালি চুল আছে। ঠিক না?

বারনাবাে এবার ভেঙে পড়ল। সে এমন মানসিক তীব্র বেদনা অনুভব করলাে যে, তার মনে হল কে যেন তার বুকে আমূল ধারালাে ছােরা বসিয়ে দিল। তার মুখ নিস্প্রভ হল, গলা শুকিয়ে গেল । বারনাবাে কিছু বলতে পারলাে না। সে বাজি হেরে গেল।

অনেকক্ষণ পরে সে বললাে, আমব্রোগিউলাে যা বলল তা সত্যি। সে বাজি জিতেছে, আমি তাকে তার প্রাপ্য টাকা মিটিয়ে দেব। পরদিনই বারনাবাে বাজির পুরাে টাকাই তাকে দিয়ে দিল।

প্রতিশােধ নেবার স্পৃহা নিয়ে সে যত শীঘ্র সম্ভব জেনােয়া অভিমুখে যাত্রা করল। এমন পাপীয়সীর সে মুখ দেখবে না, তাকে সে খুন করবে। বারনাবাে জেনােয়া শহরে ঢুকল না। শহর থেকে কুড়ি মাইল দূরে তার একটা বাড়িতে এসে এক বিশ্বাসী অনুচরের হাতে স্ত্রীকে একটা চিঠি পাঠাল। সঙ্গে দুটো ঘােড়া দিল। চিঠিতে লিখল সে জেনােয়াতে ফিরে এসেছে, জিনাভরা যেন এই লােকের সঙ্গে তার কাছে তাড়াতাড়ি চলে আসে, এইজন্যে ঘােড়া পাঠান হল। কিন্তু সেই বিশ্বাসী অনুচরকে অন্য নির্দেশ দিল । তাকে বললাে, জিনাভরাকে নিয়ে আসবার সময় উপযুক্ত স্থান দেখে তাকে হত্যা করবে, কোনাে দয়া নয়। হত্যা করে ফিরে এসে খবর দেবে।

সেই অনুচব জেনােয়া পৌঁছে বারনাবাের স্ত্রীর হাতে চিঠি দিল। স্বামীর চিঠি পেয়ে স্ত্রী আনন্দিত। পরদিন সকালে উভয়ে যাত্রা করলাে। পথে গল্প করতে করতে পাহাড় ঘেরা নির্জন একটা জায়গায় তারা পৌঁছল। চারদিকে অরণ্য। বাইরে থেকে কিছু দেখা যায় না, মানুষও যাওয়া আসা করে না। নরহত্যার উপযুক্ত স্থান। কেউ কিছু জানতেও পারবে না।।

অনুচরের হাতে ধারালাে ও লম্বা একটা ছােরা ঝলসে উঠলাে। সে মহিলার একটা হাত ধরে বললাে, ভগবানের নাম না কারণ এখুনি তােমাকে মরতে হবে।

ছােরা দেখে তো জিনাভবা ভয় পেয়েছিল। তাকে হত্যা করা হবে শুনে সে আরও ভয় পেয়ে গেল। তবুও সাহস করে বলতে পাবলাে, তুমি আমাকে হত্যা করবে কেন? আমি তাে তােমার কোনাে ক্ষতি করি নি। দয়া করাে, আমাকে মেরাে না।

অনুচর বললাে, তােমার কথা ঠিক কিন্তু তােমার স্বামীর প্রতি এমন কোনাে অপরাধ করেছ, যে জন্যে তিনিই আমাকে আদেশ করেছেন তােমাকে হত্যা করতে। আমি যেন তােমার প্রতি দয়া না দেখাই, এ কথাও তিনি বলে দিয়েছেন। আমি যদি তার আদেশ পালন না করি তাহলে তিনি বলে দিয়েছেন, আমার গলায় ফাঁস লাগিয়ে গাছের ডালে ঝুলিয়ে দেবেন। তুমি জানাে আমি তােমার স্বামীর ওপর কতটা নির্ভরশীল অতত্রব আমার পক্ষে তার আদেশ পালন না করা অসম্ভব। ঈশ্বর জানেন আমি তােমার জন্য দুঃখিত কিন্তু আমার পক্ষে দ্বিতীয় পথ নেই। জিনাভরা কাঁদতে লাগল।

কান্না থামিয়ে জিনাভরা বলল, ঈশ্বরে যদি তােমার বিশ্বাস থাকে, তাহলে আমাকে দয়া করে খুন করাে না। শুধু একটা আদেশ পালনের জন্য এমন একজন নারীকে হত্যা করা কি উচিত যে তােমার কোনাে ক্ষতি করে নি। ঈশ্বর সাক্ষী আছেন, আমি আমার স্বামীর কোনাে ক্ষতি করিনি, কোনাে অপরাধও করিনি, যার জন্যে তিনি আমাকে হত্যা করার আদেশ দিতে পারেন। আমাকে হত্যা করলে ঈশ্বরের চোখে তুমি অপরাধী ও পাপী হবে। তাই বলছি তুমি আমাকে হত্যা না করলে তােমার মঙ্গল হবে,

নারীহত্যা করে তােমাকে কলঙ্কিত হতে হবে না। তুমি এক কাজ করাে। তুমি আমার গায়ের ওপরের পােশাকগুলাে নাও পরিবর্তে আমাকে তােমার এক প্রস্থ পুরুষের পােশাক দাও। আমার স্বামীর কাছে ফিরে গিয়ে আমার পােশাক দেখিয়ে বলতে পারবে আমাকে তুমি হত্যা করেছ। তুমি আমার জীবন দান করলে, আমি প্রতিজ্ঞা করছি আমি এখান থেকে দূরে এমন কোথাও চলে যাব যেখানে তােমরা বা আমার স্বামী বা এ অঞ্চলের কোনাে লোেক যায় না। সেখানে আমি ভিন্ন পরিচয়ে ও ভিন্ন বেশে বাস করবাে।

প্রভু পত্নীকে হত্যা করার ইচ্ছা সেই অনুচরেরও ছিল না। মহিলা যেসব যুক্তি দিলেন তা অগ্রাহ্য করা যায় না। তার মনে দয়ার উদ্রেক হল। মহিলার প্রস্তাব মতাে সে মহিলার বহিরাবরণ নিয়ে তাকে নিজের ব্যবহৃত পুরুষের এক প্রস্থ পােশাক দিল। তারপর মহিলার সঙ্গে যে অর্থ ছিল তা থেকে তাকে কিছু দিয়ে বার বার বলে দিল, তুমি চলে যাও কিন্তু সাবধান এই অঞ্চলে কেউ যেন তােমার মুখ না দেখে।

তারপর সেই অনুচর জিনাভরাকে সেই নির্জন অরণ্যঘেরা উপত্যকায় একা ছেড়ে জেনােয়ার নিকটে তার প্রভুর কাছে ফিরে গিয়ে বললাে আপনার আদেশ পালন করেছি, এতক্ষণে নেকড়ের পাল তার মৃতদেহ খেয়ে শেষ করেছে।

কিছুদিন পরে বারনাবাে জেনােয়াতে ফিরে এলাে, কিন্তু ঘটনা কোনােভাবে গােপন না থাকায় সে মর্মবেদনা অনুভব করতে লাগল।

জিনাভরা একা অসহায় কিন্তু তার মনােবল ভেঙ্গে পড়েনি। সে আপাতত পুরুষের পােশাক দিয়ে কোনােরকমে দেহ আবৃত করে রাতের মতাে আশ্রয়ের আশায় স্থান ত্যাগ করল। কিছুদূর হাঁটবার পর একটা কুটির দেখতে পেল। কুটিরে এক বৃদ্ধা বাস করতাে। সেখানে সে সাময়িক আশ্রয় পেল।

বৃদ্ধার সহায়তায় জিনাভরা পুরুষের সেই বেশ কাটছাঁট করে নিজের উপযােগী করে নিল। মাথার চুলও পুরুষের মতাে ছেটে নিল। পুরুষবেশে তাকে দেখে নাবিক বলে ভ্রম হতে পারে।

বৃদ্ধার আশ্রয় ত্যাগ করে সে সমুদ্রের দিকে হাঁটতে লাগল। হাঁটতে হাঁটতে একদিন সমুদ্রের তীরে। পৌঁছে দেখল অদূরে একটা জাহাজ রয়েছে। জাহাজের মালিক সেনর আচ চারাচ নামে এক ক্যাটালান ভদ্রলােক। পানীয় জল জাহাজে তােলবার জন্যে তিনি এই অলবেঙ্গা অঞ্চলে এসেছিলেন।

জিনাভরা ভদ্রলােকের সঙ্গে আলাপ করে অনুরােধ করল জাহাজে তার কেবিনবয়ের চাকরিটা দিতে। সে সেনরের সেবা করে তাকে সন্তুষ্ট করতে পারবে। জিনাভরা তার নাম বললাে সিকুরানাে ন ফিনেল। ভদ্রলােক রাজি হয়ে তাকে জাহাজে তুলে নিলেন এবং তাকে এক প্রস্থ নতুন পােশাক দিলেন। ছদ্মবেশী সিকুরানাে ভদ্রলােকের মনমতাে সেবাকাজ এমন চমৎকারভাবে সম্পন্ন করতে লাগলাে যে ভদ্রলােক পরম প্রীত হলেন। অবস্থা এমন হল যে এই বালক ছাড়া তার এক দণ্ড চলে না। সিকুরানাে তার সবকিছু হাতে হাতে ও ঠিক সময়ে জুগিয়ে যায়।

বায়ু অনুকূল হতেই জাহাজ ছেড়ে দিল। অল্প কিছুদিন পর জাহাজ অ্যালেকজান্ড্রিয়া বন্দরে ভিড়ল। কাটালান ভদ্রলােক তার জাহাজে কিছু বিশেষ জাতির বাজপাখি এনেছিলেন, সেগুলি সুলতানের কাছে বিক্রয় করা তার অভিপ্রায়।

বাজপাখি আদান প্রদানের সূত্রে ক্যাটালান ভদ্রলােকের সঙ্গে সুলতানের ঘনিষ্ঠতা হল । সুলতান মাঝে মাঝে ভদ্রলােককে ভােজনে আপ্যায়িত করতেন। ভদ্রলােকের সঙ্গে সিকুরানােও যেত।

এই বালকটির কর্মকুশলতা ও সদাচারণ সুলতানকে এতদূর আকৃষ্ট করলো যে, তিনি সেনর আন চারাচকে অনুরােধ করলেন বালকটিকে তার কাছে রেখে যেতে।

চারাচ অনিচ্ছুক হলেও সিকুরানােকে রেখে যেতে রাজি হল কারণ তিনি সুলতানকে অসন্তুষ্ট করলে ভবিষ্যতে ব্যবসা করা যাবে না। সিকুরানােকে সুলতানের কাছে রেখে পালে হাওয়া লাগতেই চারাচ অ্যালেকজান্ড্রিয়া বন্দর ত্যাগ করে চলে গেল।

সিকুরানাে তার নিখুঁত সেবার দ্বারা অচিরে সুলতানের মন কেড়ে নিল । সিকুরানাে ছাড়া সুলতানের চলে না।

সুলতানের রাজত্বের মধ্যে আক্রে অঞ্চলে বছরের এক বিশেষ মরশুমে বিরাট এক বাণিজ্যমেলা বসে। খ্রিস্টান ও সারাসেন সমেত নানা দেশের ব্যবসায়ীরা এই মেলায় যােগ দেয়। সমবেত ব্যবসায়ীদের তদারকি ও তাদের মালপত্রের নিরাপত্তার জন্য সুলতান রক্ষীসহ কোনাে একজন উচ্চপদস্থ রাজপুরুষকে ঐ মেলায় পাঠাতেন। রাজপুরুষকে সাহায্য করবার জন্যে কয়েকজন কর্মচারীও মেলায় যেত।

এবার মেলার সময় সুলতান স্থির করলেন যে, সব ভার দিয়ে সিকুরাননাকে পাঠাবেন কারণ সিকুরানাে স্থানীয় ও ইটালীয় ভাষা জানত ও নানাভাবে উপযুক্ত।

সিকুরানাে যথাসময়ে আক্রেতে এসে পৌছল। আগত ব্যবসায়ীদের মালপত্র রক্ষণাবেক্ষণের জন্যে রক্ষীবাহিনী পাঠন হল। সিকুরাননাকে তাদের ক্যাপটেন নিযুক্ত করা হল।

আক্রেতে এসে সিকুরানাে সুষ্ঠুভাবে তার কাজ সম্পন্ন করতে থাকলাে। ইটালির সিসিলি, পিজা, জেনােয়া, ভেনিস ও অন্যান্য অঞ্চল থেকে অনেক ইটালীয় ব্যবসায়ী এসছিল। হাজার হােক দেশের লােক তাে! সিকুরাননা তাদের মধ্যে অনেকের সঙ্গে আলাপ করতে লাগলাে।

মেলায় ঘুরতে ঘুরতে মালপত্তর দেখতে দেখতে ভেনিসের ব্যবসায়ীদের কোনাে একজনের দোকানে সিকুরানাে মুদ্রা রাখার একটি থলি ও কারুকার্যখচিত একটি কোমরবন্ধনী দেখে চিনতে পারলাে যে, এ দুটি তার হারানাে জিনিস। সে তার বিস্ময় গােপন রেখে বিক্রেতাকে জিজ্ঞাসা করলাে এই দুটি সামগ্রীর মালিক কে এবং এ দুটি বিক্রি করা হবে কিনা।

বিক্রেতা বলল, সামগ্রী দুটি আমারই তবে ও দুটি বিক্রয়ের জন্যে নয়। তবে আপনি যদি চান তাে আমি সানন্দে ও দুটি আপনাকে উপহার দিতে পারি, বলে সে হাসতে লাগল।

বিক্রেতা লােকটিকে অকারণে হাসতে দেখে সিকুরানাে ভাবলাে লােকটা বােধহয় তার ছদ্মবেশ ধরতে পেরেছে তাই হাসছে। কিন্তু সিকুরানাে অবিচল থেকে তাকে জিজ্ঞাসা করল, তুমি হাসছ কেন? একজন সৈনিক মেয়েলী জিনিস সম্বন্ধে খোজ করছে বলেই কি ?

সেই লােকটি আর কেউ নয়, স্বয়ং আমব্রোগিউলাে। প্রচুর মালপত্র নিয়ে সেও মেলায় এসেছে তবে পুরুষবেশী জিনাভরাকে সে চিনতে পারেনি। সিকুরানাের প্রশ্নের উত্তরে সে বলল, মহাশয় আমি যে ভাবে ও দুটি সামগ্রী সংগ্রহ করেছি তাই মনে পড়ায় হাসছি ।

সিকুরানাে বললাে, তাই বুঝি । তাহলে আপত্তি না থাকলে আমিও কি তােমার হাসির ভাগ পেতে পারি না?

উত্তরে আমব্রোগিউলাে বললাে, জিনিস দুটি আমাকে উপহার দিয়েছেন জেনােয়ার বানাবে লােমেলিন নামে এক ভদ্রলােকের পত্নী ডােনা জিনভরা। একরাত্রি আমি ডােনার সঙ্গে শুয়েছিলুম, তারই স্মৃতি হিসেবে ডােনা ও দুটি আমাকে উপহার দিয়েছিল। তবে আমার হাসির কারণ ভিন্ন, সেটা তার স্বামীর বােকামি। সে আমার সঙ্গে পাঁচ হাজার ফ্লোরিন বাজি রেখেছিল যে আমি কিছুতেই তার স্ত্রীকে প্রলােভিত করতে পারব না। আমিও বাজি রেখেছিলুম, হারলে বারনাবােকে হাজার ফ্লোরিন দেব। বাজি অবশ্যই আমি জিতেছি, আমার পকেটে পাঁচ হাজার ফ্লোরিন এসে গেছে। কিন্তু আমি বলি কি বারনবােটা বােকা, কোথায় নিজে প্রায়শ্চিত্ত করবে, নিজে কোনাে শাস্তি নেবে তা নয়, প্যারিস থেকে জেনােয়াতে ফিরে বৌটাকেই খুন করলাে।

কাহিনী শােনবার সময় সিকুরানাে অবিচলিত। এতদিন পরে সে তার স্বামীর ক্রোধের কারণ ও তাকে হত্যা করবার নির্দেশ দেওয়ার কারণ বুঝতে পারলাে। বুঝতে পারলাে তার এই দুঃখ-দুর্দশার জন্যে এই বদমাইশ লােকটাই দায়ী। মনে মনে সে প্রতিজ্ঞা করলাে লােকটাকে শাস্তি দিতেই হবে। প্রতিশােধ নিতেই হবে। লােকটা আবার হ্যা হ্যা করে হাসছে? রাগে তার গা জ্বলছিল কিন্তু পাছে কিছু সন্দেহ করে এজন্যে চোখের পলকটি ফেলেনি।

পরন্তু সে এমন ভাব দেখাল যেন গল্পটা সে খুব উপভােগ করেছে। আমব্রোগিউলাের সঙ্গে সে বন্ধুত্ব করলাে। তারপর মেলা শেষ হলে সে আমব্রোগিউলােকে বললাে তার সঙ্গে অ্যালেকজান্ড্রিয়াতে গিয়ে কিছুদিন থাকতে, এমন কি সে চাইলে সেখানে পাকাপাকিভাবে থেকে যেতেও পারে। | অ্যালেকজাণ্ডিয়া ফিরে সিকুরানাে আমব্রোগিউলাের মালপত্তর রাখবার জন্যে একটা গুদাম তৈরি করে দিল আর বললাে ব্যবসার জন্যে টাকার দরকার হলে তার অভাব হবে না। আমব্রোগিউলাে তাে খুব রাজি। ব্যবসা ছাড়া সিকুরানাে লােকটাকে অন্য লােভও দেখিয়েছিল।

এইবার প্রতিশােধ নিতে হবে। সে যে সম্পূর্ণ নির্দোষ এটা বারনাববার কাছে প্রমাণ করতে হবে। এই উদ্দেশ্যে সিকুরানাে তথা জিনাভরা ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে লাগল। জেনােয়াবাসী কিছু ব্যক্তির সঙ্গে সিকুরানাে আলাপ করে রাখলাে।

এদিকে পাঁচ হাজার ফ্লোরিন হারিয়ে বারনাবাে চরম দুরবস্থা ভােগ করছে। অজ্ঞাত থেকে সিকুরানাে তার বন্ধুদের বললাে বারনাববাকে আশ্রয় দিতে। সে যেন রােজ পেট ভরে খেতে পায়। ইতিমধ্যে সত্যি উদ্ঘাটনের জন্য উপযুক্ত সময় সে বেছে নেবে।

সিকুরানাে সুলতানের সঙ্গে আমব্রোগিউলাের আলাপ করিয়ে দিয়েছে এবং বারনাবাে ও তার পত্নীর কাহিনী আমব্রোগিউলােকে দিয়ে সুলতানকে বলিয়েছে। সুলতানও সে কাহিনী উপভােগ করেছেন এবং সত্যি বলে বিশ্বাসও করেছেন।

উপযুক্ত সময় বুঝে সিকুরানাে তার জেনােয়াবাসী বন্ধুদের সাহায্যে বারনাবােকে অ্যালেকজান্ড্রিয়াতে আনিয়েছে। এবার একদিন সে সুলতান ও বারনাবাের সমক্ষে আমব্রোগিউলােকে দিয়ে বারনাববার বৌএর কাহিনী বলাবে। কাহিনীটা অবশ্য আমব্রোগিউলাে রঙে রসে ফুলিয়ে বলতে ভালবাসে। সেই সময়ে সিকুরানাে সুযােগ বুঝে বদমাইশটার মুখােশ খুলে দেবে।

সুলতানের সঙ্গে পরামর্শ করে আমব্রোগিউলাে ও বারনাবােকে সিকুরানাে তার সামনে একদিন হাজির করলাে কিন্তু তার আগে সুলতানকে সে বলেছিল আমব্রোগিউলাে লােকটা পুরাে মিথ্যাবাদী। মূল ঘটনাটাই তার বানানাে।

তাই সকলে যখন সুলতানের সামনে হাজির হল তখন সুলতান রােকসায়িত নেত্রে আমব্রোগিউলাের দিকে চেয়ে বললেন, তােমার সেই গল্পটা আমরা আর একবার শুনতে চাই, কিন্তু দেখ বাপু আমার সন্দেহ তুমি সত্যি কথা বলছ না। যা ঘটেছে ঠিকঠাক না বললে তােমার কপালে ক্লেশ আছে।

আমব্রোগিউলাে নিজেকে অসহায় বােধ করে সিকুরানাের দিকে চাইল। ওর ওপর তার খুব বিশ্বাস ও বুঝি তাকে এই বিপদ থেকে রক্ষা করবে। কিন্তু সিকুরানাের চোখ সুলতানের চোখের চেয়ে আরও লাল।

সিকুরানাে রাগত স্বরে বললাে, সত্যি যা ঘটেছে তাই বলল, নইলে তােমায় অশেষ দুর্গতি ভােগ করতে হবে।

আমব্রোগিউলাে ভাবল সত্যি বললে বিপদ এড়ানাে যাবে, বড় জোর বাজির পাঁচ হাজার ফ্লোরিন দিতে হবে। এইরকম অনুমান করে আমব্রোগিউলা যা ঘটেছিল তার যথাযথ সত্যি ঘটনাই বলল।

তার বক্তব্য শেষ হতেই সিকুরানাে যেন সুলতানের পক্ষে উকিল এই রকম একটা ভাব নিয়ে বারনাবাের প্রতি ঝাঝিয়ে উঠল, সেনর আপনি তাে এই ঠক জোচ্চোরটার কথা এখন শুনলেন কিন্তু বদমাইশটা জেনােয়া থেকে ফিরে এসে যা বললাে, তা আপনার স্ত্রীর কাছে যাচাই করা দরকার মনে করেছিলেন কি?

বারনাবাে মাথা তুলতে পারলাে না। মাথা নিচু করেই বললাে, প্রথমে টাকার শােকেই আমি আত্মহারা হয়ে গিয়েছিলুম, তারপর ঘটনার বিবরণ শুনে আমি ক্রোধে দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে বিশ্বাস করেছিলুম যে, আমার স্ত্রী সত্যিই বিশ্বাসঘাতকতা করেছে সেইজন্যে আমি আমার এক বিশ্বস্ত ভৃত্যকে বলেছিলুম তাকে হত্যা করতে। আমার সেই লােক ফিরে এসে আমাকে খবর দেয় যে, সে আমার স্ত্রীকে হত্যা করে তার লাশ জঙ্গলে ফেলে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কয়েকটা নেকড়ে এসে সেই লাশ খেয়ে ফেলে।

সুলতান মন দিয়ে সব শুনছিলেন। ঘটনার গুরুত্বও বুঝছিলেন কিন্তু সিকুরানাের মতলব কি তা তিনি বুঝতে পারছিলেন না আর সে দু’জন লোেককে তার সামনে হাজির করলােই বা কেন?

সিকুরানাে এবার সুলতানকে উদ্দেশ্য করে বললাে, দেখুন শাহেনসা, ঐ মহিলাটিকে এক জোচ্চোর ও নির্মল হৃদয়ের এক স্বামীর সম্মুখীন হতে হয়েছিল। জোচ্চোরটা তাে স্বামীকে রিক্ত করে ছাড়লাে তারপর যা একেবারেই ঘটেনি এইরকম একটা মিথ্যা ও কাল্পনিক কাহিনী বলে পতিপ্রাণা সতীর সম্মানহানি ঘটাল। তার পবিত্র চরিত্রে কলংক লেপন করল। দুঃখের বিষয় যে স্বামী তার স্ত্রীর সঙ্গে দীর্ঘদিন বাস করেও তাকে চিনতে পারেন নি। সদ্য পরিচিত একটা লােকের কথা শুনে এবং স্ত্রীর কাছে গিয়ে তাকে একটা সুযােগও দিলেন না, তিনি ঘটনা শুনেই ক্ষেপে গেলেন এবং স্ত্রীকে খুন করিয়ে তার মাসে নেকড়ের পালের ভােজ্য করে দিলেন। তারপর দেখুন ঐ দুষ্ট লােকটা আর ঐ স্বামী সেই পত্নীর সঙ্গে বেশ কয়েকদিন অতিবাহিত করলাে, তার প্রতি শ্ৰদ্ধা ভক্তিও জানাল কিন্তু তাকে চিনতে পারল না। শাহেনসা আপনি যদি সব দিক বিচার করে বলেন যে স্বামী নির্দোষ, তাকে ক্ষমা করা হবে এবং জোচ্চোরটাকে সাজা দেওয়া হবে তাহলে আমি এখনি আপনার সামনে সেই হতভাগিনী মহিলাকে হাজির করতে পারি। অবশ্য মহিলা হাজির হলে স্বামী খুনের দায় থেকে অব্যাহতি পাবে। আমি এখন আপনার আদেশের অপেক্ষায় রইলুম।

সিকুরানাের ওপর সুলতানের অগাধ বিশ্বাস। তিনি বললেন, সিকুরানাে তুমি ব্যাপারটা যেভাবে পরিচালনা করলে তাতে আমি সন্তুষ্ট। তুমি যদি মহিলাকে হাজির করতে পারাে তাে এই দুঃখজনক ঘটনার পরিণতি উত্তম হবে, স্বামী স্ত্রী মিলিত হবে, অপরাধীও সাজা পাবে।

বারনাববার তখনও দৃঢ় ধারণা যে এই ছােকরা বাজে কথা বলছে। তার স্ত্রী বেঁচে থাকতে পারে না। তার স্ত্রী বিশ্বাসঘাতকতা করলেও তার ভৃত্য বিশ্বাসঘাতকতা করে নি।

আমব্রোগিউলাের বুকে তখন কম্পন শুরু হয়েছে। বাজির পুরাে অর্থ তাকে তাে ফেরত দিতেই হবে উপরন্তু কপালে আরও দুর্ভোগ আছে কিন্তু এই ছােকরা সত্যিই কি সেই মহিলাকে এখানে এখন হাজির করতে পারবে?

সুলতানের সম্মতি পেয়ে সিকুরানাে সুলতানের পদতলে পড়ে কাঁদতে লাগল। তারপর নিজেকে সংযত করে তার স্বাভাবিক মেয়েলী কণ্ঠে বললাে, শাহেনসা আমিই সেই হতভাগিনী জিনাভরা। ঐ বদমাইশটার জন্যে আমি গত ছ’ বছর কি ক্লেশই না সহ্য করেছি, বাধ্য হয়ে আমাকে পুরুষের বেশ নিতে হয়েছিল। স্বামীর দোষও অস্বীকার করতে পারি না, তিনি আমাকে হত্যার আদেশ দিয়েছিলেন, অবিশ্বাসিনী স্ত্রী মনে করে তাকে তাড়িয়ে দেওয়া নয় একেবারে খতম করে দেওয়ার মতলব।

তারপর সে তার বুকের সামনের অংশ উন্মুক্ত করে দেখাল যে সে সত্যিই নারী। তারপর সে আমব্রোগিউলােকে তীক্ষ্ণস্বরে জিজ্ঞাসা করল, শয়তান! সাহস থাকে এবার বলাে কবে কখন ও কোথায় তুই আমার পাশে শুয়েছিলি?

শয়তান আর কি উত্তর দেবে? সবই তাে অলীক। গভীর লজ্জা ও হতাশায় সে অধােবদন করে রইলাে, তার মুখ দিয়ে একটি শব্দও বেরােল না।

সুলতানও অবাক। সিকুরানাে যে পুরুষ নয় এমন সন্দেহ তার মনে একবারও উঁকি মারে নি। কাণ্ডকারখানা দেখে ও শুনে তিনি ভাবতে লাগলেন তিনি স্বপ্ন দেখছেন না তাে? বাহাদুর বটে এই মেয়ে, পুরুষদের সে কান কেটেছে।

সিকুরানাের বিচক্ষণতা, সৎ জীবন, সৎ আচরণ, বুদ্ধি ও বিচক্ষণতার তিনি উচ্চ প্রশংসা করে তার জন্যে মহিলাদের দামী পােশাকের আদেশ দিলেন এবং তার পরিচর্যার জন্যে কয়েকজন সেবিকা নিযুক্ত করলেন। বারনাবােকে সুলতান ক্ষমা করলেন।

স্ত্রীকে চিনতে পেরে ব্যথিত বারনাবাে স্ত্রীর সামনে হাঁটু গেড়ে বসে সানয়নে বার বার ক্ষমা ভিক্ষা করতে লাগল। জিনাভরার চোখেও জল এসে গেল। স্বামীকে তাে সে ক্ষমা না করলে কেউ তার দোষ দিত না কিন্তু তবুও সে স্বামীকে ক্ষমা করে দু’হাত দিয়ে টেনে বুকে তুলে নিল।

এবার আমব্রোগিউলাের পালা। সুলতান আদেশ দিলেন শহরের ধারে যে একটা টিলা আছে সেখানে শয়তানটাকে নিয়ে যাও। তারপর ওর সারা দেহে বেশ করে মধু মাখিয়ে একটা খুটির সঙ্গে বেঁধে রাখ। ভেঁয় পিপেড়ে, বিষাক্ত পােকা, পাখি আর তীব্র রৌদ্রতাপ ওর ব্যবস্থা করবে। এই আদেশ পালন করা হল। তারপর তার সম্পত্তি ও সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে দশ হাজার ডাবলুন পাওয়া গেল, সেই অর্থ জিনাভরাকে দেওয়া হল। এরপর সুলতান জিনাভরার সম্মানে বিরাট এক ভােজ দিলেন। সেই ভােজে বারনাবাে এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। সকলেই জিনাভরার ভূয়সী প্রশংসা করলেন।

জিনাভরাকে সুলতান হীরামাণিক্যখচিত স্বর্ণালংকার, রূপাের বাসন ও প্রচুর অর্থ উপহার দিলেন যার পরিমাণ আরও দশ হাজার ডাবলুন।  ওদের জেনােয়া ফিরে যাবার জন্য সুলতান সাজিয়ে গুছিয়ে একখানা জাহাজেরও ব্যবস্থা করে দিলেন। প্রচুর অর্থ ও সম্পদ নিয়ে ওরা যখন জেনােয়াতে ফিরে এল তখন শহরবাসীরা ওদের সাড়ম্বরে সাদর অভ্যর্থনা জানাল, বিশেষ করে জিনাভরাকে কারণ সকলে জানত সে জীবিত নেই। যতদিন সে জীবিত ছিল ততােদিন সে সকলের ভালােবাসা ও শ্রদ্ধা অর্জন করেছিল। মহীয়সী ও সতীর শিরােমণি বলে সে বিবেচিত হতাে।

আমব্রোগিউলাে উপযুক্ত সাজাই পেয়েছিল। শেষ পর্যন্ত মাটিতে তার শুধু কংকালটাই পড়েছিল। ভেঁয়ে পিপড়ে ও বিষাক্ত কীটকুল তার দেহের সমস্ত মাংস খেয়ে নিঃশেষ করে দিয়েছিল। সত্যের জয় হবেই হবে।

 

দশম গল্প

মােনাকোর প্যাগানিনাে মেসার রিচিয়ার্ডো দ্য চিনজিচা-র পত্নীকে অপহরণ করল। পত্নী কোথায় আছে খবর পেয়ে চিনজিচা সেখানে গিয়ে প্যাগানিনাের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে বলল তার পত্নীকে ফিরিয়ে দেওয়া হােক। প্যাগানিনাে এই শর্তে রাজি হল যে তার পত্নী স্বেচ্ছায় রাজি হয় তাহলে আপত্তি নেই। পত্নী রাজি হল না। অতত্রব চিনজিচা ফিরে গেল। চিনজিচার মৃত্যুর পরে সে প্যাগনিনাের পত্নী হল।

এমন সুন্দর একটা গল্প শুনে সকলেই কুইনের খুব প্রশংসা করলাে বিশেষ করে ডায়ােনিয়া কারণ এখনও তার গল্প বলা হয়নি। সে তার প্রশংসা শেষ করে বলতে আরম্ভ করলাে :

সমবেত মহিলাবৃন্দ, কুইনের গল্প শুনে আমার একটা বিপরীতমুখী গল্প বলতে ইচ্ছে করছে। আমি অবশ্য বারনাবাের মুর্খতা এবং যে সকল পুরুষরা পরস্ত্রীর সঙ্গে প্রেম করে তাদের নিন্দা করছি এবং সেই সকল রমণীদেরও যারা নিলাজ হয়ে পরপুরুষের সঙ্গে প্রেম করে। যাই হােক বারনাবাের ক্ষেত্রে পরিণতি সুখের হয়েছিল। আমরা জন্মের পর দোলনা থেকে আরম্ভ করে নারীদের সাহচর্যে জীবনের সবটাই অতিবাহিত করে নারী চরিত্র সম্বন্ধে সবই জানি, তারা কি চায় তাও জানি। আমি বারনাবাের মতাে এক মূর্খের গল্পই বলব এবং এই মূর্খের ধারণা ছিল যে তার শক্তি অসাধারণ এবং নিজ ইচ্ছানুসারে সে নারীকে বশ করতে পারবে। তার ধারণা যে কতদূর ভুল তা আমার গল্প শুনেই তােমরা বুঝবে।

পিজা শহরে মেসার রিচিয়ার্ডো দ্য চিনচিজা নামে এক ধনী বিচারক বাস করতেন যার সাহস ও শক্তি অপেক্ষা পুঁথিগত বিদ্যা অধিক আয়ত্ত ছিল, বলতে কি তার বুদ্ধি কিছু অতিরিক্ত ছিল। তার ধারণা ছিল বই পুঁথি পড়ে তিনি যে পরিমাণ বিদ্যা আয়ত্ত করেছেন তারই সাহায্যে তাঁর পত্নীকেও সন্তুষ্ট করে বশে রাখতে পারবেন।

তখনও তিনি বিবাহ করেন নি। একদিন আবিষ্কার করলেন যে তিনি যদি বিবাহ না করেন তাহলে অধীত বিদ্যা কার ওপর প্রয়ােগ করবেন ? সব বিদ্যাই কি বৃথা যাবে? তিনি অপরকে যে সব পরামর্শ দিতেন তার কিছু যদি নিজের ওপর প্রয়ােগ করতেন তাহলে তিনি বােধহয় বিবাহ করতেন না।

যাই হােক তিনি নিজের জন্যে পাত্রী খুজতে আরম্ভ করলেন। পিজা শহরে সুন্দরী কন্যা বিরল, প্রায় সকলেই কুরূপা কিন্তু মেসার লেত্তো ওয়ালান্দির কন্যাটি সুন্দরী। তার কাছে প্রস্তাব করতে তিনি ও কন্যার সঙ্গে চিনচিজার বিবাহ দিতে রাজি হলেন। পাত্র ধনী এবং বুদ্ধিজীবী, সৎ পাত্র, আপত্তির কারন নেই।

কন্যার নাম বারতােলােমিয়া। সাড়ম্বরে বিবাহ অনুষ্ঠিত হল, ভােজও উত্তম হল, নিমন্ত্রিতরা সাধুবাদ জানালেন। চিনচিজা সদ্য বিবাহিতা পত্নীকে ঘরে তুললেন। স্বামীগৃহে পা দিয়ে বারতােলেমিয়া খুশি।

বিবাহ পাকা করবার জন্যে প্রথম রাত্রে স্ত্রী-সহবাস করতে হবে। এই উদ্দেশ্যে চিনচিজা শয়নকক্ষে এলেন কিন্তু কাজ আরম্ভ না করতে না করতেই সব শেষ হয়ে গেল। মেধাবী বিচারক নিজেকে ধরে রাখতে পারেন নি। এজন্য তিনি লজ্জিত হন নি। ভাবলেন পুথিতে কোনাে একটা সূত্রের বােধহয় ভুল ব্যাখ্যা করেছে। পরে ভালাে করে বুঝে কাজ করলেই হবে। কিন্তু সদ্য বিবাহিতা কন্যা যে এই প্রথম রাত্রে চরম মুহূর্তটির জন্যে অপেক্ষা করছিল সে একেবারেই নিরাশ হল, বলতে কি স্বামীর যৌন ক্ষমতায় সন্দিহান হল।

পুথিতে যে সূত্র লেখা আছে তার ভুল ব্যাখ্যা করে যদিও তিনি স্ত্রী-সহবাসে কৃতকার্য হন নি এমন (ভবে থাকলেও পরদিন রাতে চিনচিজা তার ব্যর্থতার জন্যে মনে মনে অনুতাপ করতে লাগলেন। তাই দৈহিক ক্ষমতা ফিরিয়ে আনবার জন্যে বীর্যবর্ধক সুরা, শক্তিপ্রদায়ী বড়ি এবং কয়েক রকম ভেষজ গলাধঃকরণ করলেন।

এবার তিনি নিশ্চয়ই কৃতকার্য হবেন, হতেই হবে। তার শক্তি কি অন্য যুবক অপেক্ষা কিছু কম। এবার পাজি পুঁথি দেখে কাজ আরম্ভ করবেন তাহলে নিশ্চয় সাফল্য লাভ করবেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি তার নবনধূকেও পাজি পুঁথির প্রয়ােজনীয়তা বােঝাতে সচেষ্ট হলেন।

পাজি পুথির শুভদিন, শুভক্ষণ, গ্রহনক্ষত্রের সংস্থান, সাধুপুরুষদের জন্মমৃত্যুর বিশেষ তারিখ বিদ্যালয়ের ছাত্রদেরও মুখস্থ করতে হতাে। শহরে গির্জার সংখ্যা প্রচুর। এক একটি গির্জা এক এক সাধুর নামে উৎসর্গীকৃত। ফলে প্রায় প্রতিদিন কোনাে না কোনাে গির্জায় অনুষ্ঠান হতাে। শহরবাসীদের কিছু অনুষ্ঠান করতে হতাে বা বিশেষ নিয়ম পালন করতে হতাে। পাঁজিতে যেমন বিশেষ দিনে এলাচ ভক্ষণ নিষিদ্ধ লেখা থাকে তেমনি বিশেষ দিনে স্ত্রী সহবাস নিষিদ্ধও লেখা থাকে। তবে সাধারণ নবনারির এই নির্দেশ না মানলেও আমাদের বুদ্ধিজীবী ব্যক্তিটি এই নিয়ম কঠোরভাবে মানতে প্রস্তুত এবং স্ত্রীকে এই পবিত্র নিয়ম মানতে বললেন। ফলে পাঁজিতে আর স্ত্রী-সহবাসের তারিখ পাওয়া যায় না। প্রায় প্রতিদিনই কোনাে না কোনাে সাধু পুরুষের জন্ম বা মৃত্যু দিন এবং সেই দিন স্ত্রী-সহবাস বিধেয় নয়। এ ছাড়া যীশুর মৃত্যুবার শুক্রবার ও রবিবারের স্যাবাথ ডে তাে আছেই।

এর ওপর বিচারক মনে করতেন আদালতে যেমন ছুটি থাকে তেমনি শয়নঘরেও ছুটি থাকা উচিত। নববিবাহিত তরুণীর হৃদয়ে কত আশা, স্বামী সহবাসে উন্মুখ উদ্ভিন্নযৌবনা রাতের পর রাত চোখের জলে বালিশ ভেজায়। বেশ এক মেরুদণ্ডহীন স্বামীর পাল্লায় পড়া গেছে যা হােক। এ পত্নীৰ কামনা বাসনা বােঝে না। বােঝে শুধু পাজি আর পুথি আর আইন।

সমুদ্রের ধারে মন্তেনেরােতে বিচারকমশাইয়ের ছােট একটা সুন্দর বাগানবাড়ি ছিল। বাতাসবিহীন এক গ্রীষ্মের বিকেলে তিনি সাব্যস্ত করলেন এখানে খুব গরম, স্ত্রীকে নিয়ে সমুদ্রের ধারে তার বাগানবাড়িতে মিগ্ধ শীতল সমুদ্রের হাওয়া উপভােগ করে এলে মন্দ হয় না। স্ত্রীও যেতে রাজি হল।

মতেনেরােতে ভালােই লাগছে। স্ত্রীকে কিছু আনন্দ দেবার জন্যে চিনচিজা স্থির করলাে স্ত্রীকে নিয়ে একদিন নৌকাবিহার করবে। তাতে স্ত্রী আনন্দ পাবে। তদনুসারে সে স্থানীয় জেলেদের সঙ্গে ব্যবস্থা করে দু’খানা নৌকা ভাড়া করল। একটা নৌকায় সে এবং জেলে আর অপর নৌকায় তার স্ত্রী ও কয়েকজন মহিলা।

যে নৌকায় চিনজিচা ছিল সেই নৌকায় জেলে মাছ ধরছিল। মাছধরা দেখতে চিনজিচার ভালাে লাগছিল। মাছ ধরতে ধরতে তাদের নৌকা মেয়েদের নৌকা থেকে দূরে চলে গিয়েছিল।

চিনজিচা যখন মাছধরা দেখতে মগ্ন এবং স্ত্রীর নৌকা কোথায় তার খবর সে জানে না তখন আর এক কাণ্ড ঘটে গেল।

প্যাগানিনাে দ্য মেয়ার নামে কুখ্যাত এক জলদস্যু পরিচালিত ছােট একটা জাহাজ মেয়েদের নৌকার কাছে এসে পড়ল। দুটো নৌকাই তার নজরে পড়েছিল। বােম্বেটের জাহাজ দেখে নৌকা দুটি পালাবার চেষ্টা করলাে কিন্তু তীরে পৌছবার আগেই জাহাজখানা মেয়েদের নৌকার কম এসে পড়ল অথবা দূরবীন দিয়ে মেয়ে ভর্তি নৌকা দেখে প্যাগানিনাে সেই দিকেই তার জাহাজ চালিয়েছিল।

নৌকার মধ্যে বিচারক পত্নী বারতােললামিয়াকে সেরা সুন্দরী দেখে প্যাগানিননা তাকে নিজের জাহাজে তুলে নিল তারপর সে জাহাজ চালিয়ে চলে গেল। চিনজিচা কিছুই করতে পারলাে না। সে তীরে দাঁড়িয়ে শুধু ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল। স্ত্রী সহবাস করতে না পারলেও স্ত্রীর প্রতি সে অনুরক্ত ছিল তাই কিছু করতে না পেরে সে মর্মবেদনা অনুভব করতে লাগলাে। কি আর করবে সে? তার ক্ষমতাই বা কতটুকু। বােম্বেটেদের নিন্দা আর হা-হুতাশ করতে করতে সে পিজর রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়। কোন জলদস্যু তার স্ত্রীকে অপহরণ করল আর কোথায় নিয়ে গেল তাও সে জানে না।

অতীব সুন্দরী একটি নারীকে করায়ত্ত করতে পেরে প্যাগানিনাে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করল। সে বিয়ে করেনি, তাই স্থির করলাে মেয়েটিকে সে তার কাছে রাখবে।

বারতােলােমিয়া কিন্তু তখন খুব কাঁদছে। রীতিমতাে ভয় পেয়েছে।

প্যাগানিনাে তাকে সান্ত্বনা দিতে লাগলাে তারপর যখন রাত্রি এল তখন তাকে নিজের কেবিনে বিছানায় তুলে শুধু কথা নয় কাজ আরম্ভ করলাে। সে বােম্বেটেগিরি করে। পাঁজিপুঁথি, শুভদিন বা বারবেলার খবর সে রাখে না, ওসব সে কবে ভুলে গেছে। মেয়েও প্যাগানিনাের পেশীবহুল চেহারা, মেয়ে সম্বন্ধে তার অভিজ্ঞতা, কথা বলার ভঙ্গি ইত্যাদি দেখে প্যাগানিনাের বাড়ি মােনাকো যাবার আগে তার বুদ্ধিজীবী স্বামীর কথা ভুলে গেল। এতদিন সে যা চাইছিল তা পেয়েছে এবং তৃপ্ত হয়েছে। এই তাে পুরুষ। তার স্বামী একটা মানুষ নয়, মেষ। প্যাগানিনাে মনের আনন্দে সদলব্ধ নারীরত্নটিকে সুযােগ পেলেই উপভােগ করে কিন্তু বিবাহিত স্ত্রীর প্রাপ্য সম্মান তাকে দেয়। বােম্বেটে হলেও এসব গুণ তার ছিল।

কিছুদিন পরে চিনচিজা খবর পেল তার বৌ মােনাকোয় আছে। সে স্থির করলাে মােনাকোয় গিয়ে তার বুদ্ধিবলে ও ছিদ্রহীন যুক্তি দেখিয়ে প্যাগানিনাের কাছ থেকে বৌকে ঠিক ফিরিয়ে আনবে। তার তুখােড় যুক্তিতর্কের সামনে মূর্খ একটা বােম্বেটে দাঁড়াতেই পারবে না। তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে দেবার জন্যে বােম্বেটে যদি টাকাপয়সা চায় তা না হয় দেওয়া যাবে।

মনে মনে এইরকম প্রতিজ্ঞা করে চিনচিজা মােনাকোগামী জাহাজে চাপল। মােনাকো পৌঁছে চিনচিজ তার স্ত্রীকে দেখতে পেল। স্ত্রীও জানালা থেকে চিনচিজাকে পথ দিয়ে হেঁটে যেতে দেখেছিল। সন্ধ্যার পর প্যাগানিনাে বাড়ি ফিরতেই বারতােলােমিয়া তাকে সাবধান করে দিল ন্যাকা ভেড়ুয়াটা এখানে এসেছে। তার মতলব নিশ্চই বৌকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া। প্যাগানিনােব আত্মবিশ্বাস প্রবল, সে বললাে, আসতে দাও, করার আমি ঠিক করবো।

পরদিন সকালে মেসার রিচারডিও চিনচিজা প্যাগানিনাের কাছে এসে আলাপ করলো। এইভাবে কথাবার্তা আরম্ভ করলাে প্যাগানিনাের সঙ্গে তার যেন কতদিনের আলাপ, কতই না ঘনিষ্ঠতা। প্যাগানিনাে অন্য ভাব দেখাচ্ছে। সে যেন লােকটাকে চেনেই না তবুও দেখা যাক লােক কি বলে?

কথাবার্তা কিছুক্ষণ চলার পর চিনচিজা ভদ্র অথচ স্পষ্টভাষায় বলল সে তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে এসেছে। প্যাগানিনাে তাকে ফিরিয়ে দিক, সে যদি মুক্তিপণ দাবি করে তাহলে চিনচিজা তা দিতেও রাজি আছে। স্ত্রীকে সে সঙ্গে নিয়ে পিজায় ফিরবে।

আকর্ন বিস্তৃত হাসি হেসে প্যাগানিনাে বললাে, এ আবার একটা কথা হল? তুমি তােমার বৌকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবার জন্যে কষ্ট করে এতদূর এসেছ, নিশ্চয় তুমি তােমার বৌকে নিয়ে যাবে, বৌ বিহনে জানি তােমার কত কষ্ট হচ্ছে। অবশ্য যিনি আমার কাছে আছেন ও আমার সঙ্গে নিয়মিত শয়ন ও সহবাস করছেন তিনি তােমার বৌ কিনা জানি না। যদি তােমার বৌ হন তুমি নিয়ে যাবে তাতে আমার আপত্তি করার কি আছে?

প্যাগানিনাের কথা শুনে চিনচিজা উল্লসিত। কিন্তু একটা শর্ত আছে। চিনচিজা ভাবে কি আর শর্ত, ঐ মুক্তিপণ হবে বােধহয়। তাই বলে, বলাে তােমার কি শর্ত? আমি নিশ্চই যথাসাধ্য পালন করবাে।

প্যাগানিনাে বললাে, তােমাকে তাে সৎ লােক মনে হচ্ছে। যাই হােক মহিলার সঙ্গে তােমার দেখা করিয়ে দেব এবং তুমি দাবি করছাে মহিলা তােমার স্ত্রী, তাহলে তিনি তােমাকে চিনতে পারবেন।

চিনচিজা বললাে, নিশ্চই চিনতে পারবে কিন্তু তােমার শর্তটা কি বললাে না তাে? খােলসা করে।

শর্ত আর কিছু নয়, মহিলা যদি তােমাকে চিনতে পেরেও তােমার সঙ্গে যেতে না চান তাহলে তিনি আমার কাছেই থাকবেন। আমি একজন টগবগে যুবক, একজন যুবতী পােষবার আমার অধিকার আছে। কি? আমার শর্তে রাজি?

প্যাগানিননা বললাে, নিশ্চয়ই রাজি, সে আমার বিবাহিত পত্নী। সে আমাকে চেনে ও আমার সঙ্গেই আমার ঘরে যাবে। আমাকে দেখেই সে আমার গলা জড়িয়ে ধরবে। তােমার শর্ত অতি উত্তম, আমি রাজি, তুমি তার সঙ্গে আমার দেখা করিয়ে দাও।

বেশ তাহলে তাই হােক।

এই কথা বলে প্যাগানিনাে চিনজিচাকে একটা বড় ঘরে নিয়ে গিয়ে বসাল, তারপর বারতােললামিয়াকে খবর দিল। একটু পরেই বারতােলােমিয়া সেজেগুজে এসে ওদের কাছে বসল চিনচিজাকে সে ভূক্ষেপই করল না, যেন তাকে দেখেই নি, চেনে না, একবার চেয়ে দেখেই চোখ ফিরিয়ে নিল, যেন একজন অপরিচিত অতিথি ঘরে দাঁড়িয়ে আছে।

বুদ্ধিজীবী বিচারক তাে অবাক। কোথায় সে তাকে উৎফুন্ন হয়ে গলা জড়িয়ে ধরবে তা নয় আমাকে যেন চেনেই না। তখন সে ভাবলাে যে ওকে হারিয়ে যে মনােকষ্ট ভােগ করেছি তাতে হয়ত আমার চেহারার খুব পরিবর্তন হয়েছে তাই ও আমাকে চিনতে পারছে না। তাই বারােললামিয়াকে লক্ষ্য করে বললাে, ভদ্রে তােমাকে সেদিন নৌকায় চাপিয়ে সমুদ্রে বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার জন্যে আমি অনুতপ্ত কারণ সেজন্যে আমাকে অনেক মূল্য দিতে হয়েছে। তােমাকে হারিয়ে আমি যারপরনাই অতীব মনােকষ্ট দিন যাপন করছি, তুমি বিনা আমার ঘর অন্ধকার কিন্তু মনে আরও আঘাত পেলুম যখন দেখলুম তুমি আমাকে চিনতেই পারছ না অথচ এই কয়েকদিন আমি তােমার কথা ভেবে রাত্রে ঘুমােতে পারি নি। তুমি কি সত্যিই আমার নাম জানাে না? আমাকে তােমার স্বামী বলে চিনতে পারছ না? তােমাকে এই বাড়ি থেকে এই ভদ্রলােকের দাবি মতাে মুক্তিপণ দিয়ে তােমাকে আমার বাড়িতে নিয়ে যাবাে বলে আমি মােনাকোয় এসেছি আর তুমি আমাকে অবহেলা করছ?

এবার মহিলা তার দিকে চেয়ে নীরস কণ্ঠে বললাে, মহাশয় আপনি কি আমাকে কিছু বলছেন? আপনি আমাকে অন্য কেউ মনে করে ভুল করছেন কারণ আমি জোর করেই বলছি যে জীবনে আমি আপনাকে দেখি নি।

চিনচিজা বললাে, আরে এসব কি বলছ? ঠাট্টা তামাশা রাখাে, আমার দিকে একবার ভালাে করে চেয়ে দেখ, আমাকে ঠিক চিনতে পারবে। আমি তােমার স্বামী মেসার রিচারডিও দ্য চিনজিচা।

তখন মেয়ে বললাে, এ আপনি অত্যন্ত অন্যায় কথা বলছেন। আমার মতাে একজন মহিলার পক্ষে অন্য পুরুষের দিকে হাঁ করে চেয়ে দেখা শালীনতার বাইরে এবং অভদ্রতা। যাহােক আপনাকে আমার দেখা হয়ে গেছে, আগেও বলেছি আপনাকে আমি আগে দেখিনি। আপনাকে আমি চিনিও না। হল তাে? এবার আপনি দয়া করে বিদায় নিলে আমরা খুশি হব।

চিনজিচা ভাবল তার বৌ বুঝি প্যাগানিনাের ভয়ে কিছু স্বীকার করতে চাইছে না, আর এইজন্যেই বারবার বলছে আপনাকে আমি দেখি নি বা চিনি না।

তাই চিনজিচা প্যাগানিনাের কাছে প্রস্তাব করলাে, আমার স্ত্রী তােমার ভয়ে কিছুই স্বীকার করতে চাইছে না। তুমি যদি ওর ঘরে আমার সঙ্গে একা কিছুক্ষণ কথা বলতে দাও তাে ভালাে হয়।

প্যাগানিনাে এই শর্তে রাজি হল। মহিলার অনিচ্ছায় তাকে একা পেয়ে চিনজিচা তাকে চুম্বন করে চেষ্টা করবে না এবং মেয়েকে বললাে তুমি ওকে নিয়ে ঘরে যাও এবং ও যা জিজ্ঞাসা করবে তোমার ইচ্ছামতাে জবাব দেবে।

উত্তম প্রস্তাব। বারতােলােমিয়াকে অনুসরণ করে চিনজিচা ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিয়ে দু’জনেই আসন গ্রহণ করল।

এবার চিনজিচা মিষ্ট কণ্ঠে গদগদ স্বরে যতরকম সম্ভব মধুর সম্ভাষণ যথা প্রিয়তমে, আমার প্রীয়সরী, আমার চাদ, আমার রত্ন ইত্যাদি সম্ভাষণ দ্বারা তার মন ভেজাবার চেষ্টা। তুমি কি সত্যিই তােমার রিচিয়ারডােকে চিনতে পারছ না যে তােমাকে তার প্রাণ অপেক্ষা ভালবাসে? না? এটা কি করে সম্ভব? আমি কি এতই বদলে গেছি? সুন্দরী দয়া করে মুখ ভােলা, আমাকে আর বাের ভালাে করে দেখ।

বারতােলােমিয়া তার উচ্ছাস শুনতে শুনতে এতক্ষণ মুখ নিচু করে ফিকফিক করে হাসছিল। এবার বুঝিয়ে উঠল। সাপিনীর মতাে মাথা হেলিয়ে বলল, ন্যাকামি রাখাে ঢের হয়েছে। আমার স্মরণশক্তি অত দূর্বল নয়, তা কি মশাই জানেন না? আমি ভালাে করেই জানি যে গির্জায় তােমার সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েছিল কিন্তু তাজা এক তরুণীর তুমি স্বামী হতে পারনি। যতদিন তােমার ঘরে ছিলুম ততদিনে তুমি আমাকে শুধু তােমার বিদ্যা জাহির করতে আর পাঁজিপুথি দেখাতে, দিন তারিখের দোহাই দিতে তােমার মাথায় এক তিলও বুদ্ধি নেই। থাকলে নববধু স্বামীর কাছ থেকে যা চায় তা তুমি একদিন দিতে পারনি। কোথা থেকে দেবে? তুমি তাে অক্ষম, তােমার পৌরুষ নেই, তুমি পুরুষত্বহীন। পােশাক আশাক, অলংকার আর খাদ্যই সব নয়, নারীও পুরুষ সহবাস চায় কিন্তু লজ্জায় মুখ ফুটে বলতে পারে । তুমি কি তা পেরেছিলে?

পুথিপত্তর, পাজি আর আইনের বই যদি তােমার কাছে সব তাহলে তােমার উচিত ছিল সেইসব নিয়েই থাকা, ঘরে বৌ আনা তােমার উচিত হয়নি। বৌয়ের শরীরও রক্তমাংসে গড়া, তারও কামনা বাসনা আছে আর স্বামীর কর্তব্য তা চরিতার্থ করা। তা তুমি পার নি, চেষ্টাও করনি। কিন্তু আমার ভাগ্য ভালাে যে আমি এমন একজন মানুষের হাতে পড়েছি যে নারীর রূপ-যৌবনের মূল্য বােঝে, তার কাছে পাঁজির দিন তারিখ বেলা অবেলা কালবেলা মূল্যহীন, সে নারীকে দৈহিক তৃপ্তি দিতে পারে। এই ঘড়ে এই খাটেই আমি তার সঙ্গে দিন ও রাত্রি অনেক সময় একত্রে কাটিয়েছি মহানন্দে। অতএব ত যেখানেই আছি সেখানেই থাকব, কোথাও যেতে চাই না। যতদিন আমার যৌবন থাকবে ততদিন উপভােগ করব। তারপর যখন বয়স হবে তখন পাঁজি দেখে ব্রত পালন, উপবাস ইত্যাদি করার অনেক সময় পাবাে চাই কি তীর্থভ্রমণেও যাব। তুমি এখনি বিদায় হও, ঘরে গিয়ে যত পার পাঁজি দেখ, যা ইচ্ছে করাে, আমাকে মুক্তি দাও, তােমার সঙ্গে আমার আর কোনাে কথা নেই।

এত্তসব কথা ও মহিলার স্পষ্ট স্বীকারােক্তি শুনেও চিনজিচার লজ্জা হল না। সে বলল, হা প্রিয়তমে তুমি এসব কথা কি করে বলছাে? তুমি কি তােমার পিতামাতার এবং তােমার নিজের মান-সম্মান ও নারীধর্ম বিসর্জন দিয়েছ? তুমি এই লােকটার রক্ষিতারূপে বাস করতে চাও? এর চেয়ে পিজা শহরের এক নামী বিচারকের পত্নীর জীবন অধিকতর কাম্য নয়? তােমাকে নিয়ে এই লােকের কাজ যখন ফুরিয়ে যাবে সে তখন তােমাকে ছুঁড়ে ফেলে দেবে। লােকে হাসবে অথচ আমার বাড়িতে সসম্মানে তুমি গৃহকত্র রূপে বিরাজ করবে। যে তােমাকে সত্যিই ভালােবাসে তাকে ত্যাগ করে দৈহিক সুখের জন্যে তুমি এই পঙ্কিল জীবন বেছে নেবে? যাকগে যা হয়ে গেছে তা গেছে, তুমি আমার সঙ্গে ফিরে চলাে, আমি সব ভুলে তােমাকে ক্ষমা করে আদরযত্নে রাখব এবং তুমি যা চাও তা আমি যথাসাধ্য সম্ভব ও আমার সর্বশক্তি প্রয়ােগ করে তা পূরণ করবার চেষ্টা করবাে। চলাে প্রিয়তমে ফিরে চলাে, তুমি আমাকে ছেড়ে আসার পর থেকে আমার জীবন মরুভূমি হয়ে গেছে।

বারতেলামিয়া বললাে, অনেক বলেছ এবার থাম। আমার সম্মান আমার কাছে, তা আমি রাখতে জানি। তােমার হাতে দেবার আগে আমার বাবা মা কেন আর একবার চিন্তা করলেন না বুঝতে পারছি না। আমার সম্মান আমি বুঝব, কে কি বলবে আমি গ্রাহ্য করি না। আমি মনে করি আমি তােমার নয় পাগনিনাের স্ত্রী, বরঞ্চ যতদিন আমি পিজায় তােমার ঘরে ছিলুম ততদিন আমি নিজেকে তােমার রক্ষিতা মনে করতুম। তােমার কাছে পাজিই সব কিন্তু প্যাগানিনাে আমার মূল্য বােঝে, তার পৌরুষ আছে তার বাহুতে শক্তি আছে। সারারাত্রি আমি তার বাহুবলে আবদ্ধ থাকি, সে আমাকে আদর কবে দর্শন করে আর শোন আমি জোর করে বলছি এবং তুমি দেখে নিয় সে আমাকে কোনােদিন ত্যাগ করবে না।

তুমি বলছ যে সর্বশক্তি নিয়ােগ করে তুমি আমাকে তৃপ্তি দেবে? কিন্তু কি করে? তােমার আসল বস্তুটিতে হাতুড়ি মারলেও সজাগ হয় না তাে তুমি সর্বশক্তি নিয়ােগ করে কি করবে? আর এই কদিনে তােমার চেহারা আমারবিহনে মােটেই খারাপ হয়নি, দিব্যি নাদুসনুদুসটি হয়েছে, একটু ভুড়িও হয়েছে, এবার ঘরের ছেলে ঘরে যাও। তবে তােমার মুখ দেখে মনে হচ্ছে তােমার দিন ফুরিয়ে এসেছে, বেশি দিন বাঁচবে না। যাবার আগে একটা কথা শুনে যাও, প্যাগানিনাে যদি আমাকে ত্যাগ করে, অবশ্য আমি ভালাে করেই জানি সে আমাকে ত্যাগ করবে না, আমি কখনই তােমার ঘরে ফিরে যাব না। আমার সব কথা শুনলে তাে, এবার কেটে পড় নইলে আমি চিৎকার করে প্যাগানিনােকে ডেকে বলবাে তুমি আমার ওপর অত্যাচার করবার চেষ্টা করছে।

মেসার বিচিয়ারডাে চিনজিচা এবার সত্যিই বুঝল তার আর কোনাে আশা নেই। পুরুষত্বহীন হয়ে তরুণীকে বিয়ে করাই তার ভুল হয়েছিল, বােকামিও। প্যাগানিনাের সঙ্গেও তার কথা ফলপ্রসূ হয়নি।

হতাশ হয়ে সে পিজায় ফিরে ভেঙে পড়ল। বলতে গেলে সে পাগল হয়ে গেল। রাস্তা দিয়ে যখন চলে তখন কেউ কিছু উত্তর দিলে বিড়বিড় করে কি বলে কে জানে। সত্যিই সে বেশিদিন বাঁচল না।

চিনজিচার মৃত্যুর খবর প্যাগানিনাের কাছে পৌঁছল। প্যাগানিনাে জানত বারতােলোনিয়া তাকে গভীরভাবে ভালােবাসে। তখন সে তাকে যথাবিহিতভাবে বিয়ে করলাে এবং তারা পাজি ইত্যাদি তাকে তুলে দিয়ে মহানন্দে দিন রাত্রি কাটাতে লাগল।

গল্প শেষ হতে না হতেই সকলে হাসিতে ফেটে পড়ল। এত হাসি যাকে বলে হাসির ফোয়ারা এর সেই ফোয়ারা থামল না যে পর্যন্ত না সকলের চোয়াল ব্যথা করতে লাগল। ডায়ােনিয়ার মতে মত দিল যে বানাবােটা সত্যিই গাধার তুল্য মূখ।

এক সময়ে হাসি থামল। সেদিন গল্প বলতে আর কেউ বাকি রইল না। কুইনেরও মেয়াদ শেষ হয়। এবার নতুন কুইন চাই, তাই বর্তমান কুইন নিজের মাথার চুলের মুকুট খুলে নেফাইলের মাথায় পরিয়ে দিয়ে বললাে, প্রিয় ভগিনী আমি এতদ্বারা আপনাকে আমাদের ক্ষুদ্র জাতিগােষ্ঠীর রানী মনােনীত করিলাম। আপনি সুখে রানীত্ব করিতে থাকুন।

সকলে হাততালি দিয়ে নেফাইলকে অভিনন্দন জানাল। নেফাইল সুন্দরী, তার চোখ দুটি ভোরের তারার মতাে স্নিগ্ধ। মাথায় মুকুট পরে আনন্দে তার দুই গাল রক্তাভ হল।

মাথা নিচু করে সে বললাে, আমার পূর্ববর্তিনী যেভাবে চলছিলেন আমিও সেইভাবেই চলবে। ভিন্ন পথ ধরার আমার ইচ্ছে নেই তবে আমি যেহেতু কুইন সেহেতু আমার কিছু ব্যক্তিগত মত প্রকাশ্যে অধিকার আছে। সেই অধিকারে আমি কয়েকটি প্রস্তাব করছি। আশা করি প্রস্তাবগুলি তােমরা সুনবে। প্রস্তাবগুলি এমন কিছু নয় যে তােমরা মেনে নেবে না। তাহলে শােন।

কাল শুক্রবার, পরদিন শনি ও তার পরদিন রবিবার। এই তিনটি বারই আমাদের কাছে পবিত্র। শুক্র ও শনিবার আমরা যে আহার গ্রহণ করি তা আমাদের রুচিকর মনে হয় না। কিন্তু শুক্রবার আমাদের বিশেষভাবে পালন করা উচিত কারণ এদিন আমাদের প্রভু যীশুর মহাপ্রয়াণ দিবস, আমাদের জন্যই তিনি জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। আমি প্রস্তাব করি যে, ঐ দিনটি আমরা প্রার্থনা ও অন্যান্য শুচি অনুষ্ঠান দ্বারা পালন করবাে। শনিবার আমরা ঈশ্বরপুত্রের ভার্জিন মাতাকে বিশেষভাবে মুল করি ও এই উপলক্ষে আমরা আমাদের কেস ও সারা সপ্তাহে দেহে সঞ্চিত মলিনতা স্নান করে নির্মল ও শুদ্ধ হই। রবিবার অনশনের দিন।

আমার প্রস্তাব এই তিনটি দিন গল্প বলা বন্ধ থাকবে এবং আমরা প্রার্থনা, উপবাস ও অন্যান্য বিশেষ অনুষ্ঠান দ্বারা পালন করবাে।

আমাদের এখানে আসার চারদিন পূর্ণ হবে। আমাদের এখানে তারপরেও থাকতে দেখলে অব কেউ চলে আসতে পারে তাই আমি ঠিক করেছি আমরা এখান থেকে অন্যত্র সরে যাবাে। জায়গা নির্বাচন ও ব্যবস্থা আমি করেই রেখেছি।

নতুন জায়গায় গিয়ে রবিবার দুপুরে বিশ্রামের পর আমরা নতুন কর্মসূচি তৈরি করতে পারব। অর্থাৎ এরপর আমরা কি ধরনের গল্প বলবাে। আমি একটা বিষয়বস্তু স্থির করে রেখেছি। বিষয় হল কোনো নর বা নারী যা পেতে আগ্রহী তা সে তার চেষ্টার দ্বারা লাভ করবে অথবা হারানাে কিছু  ফিরে পাবে। এ বিষয়ের কাহিনী আমরা এখন থেকেই ভেবে রাখবার যথেষ্ট সময় পাবাে।

নতুন রানীর প্রস্তাব সকলে সানন্দে মেনে নিল। তারা আশা করলাে আগের গল্পগুলির মধ্যে এই গল্পগুলিও দারুণ উপভােগ্য হবে।

এরপর নতুন কুইন স্টুয়ার্ট ডেকে তার কাজ বুঝিয়ে দিল। নতুন যে জায়গায় যাওয়া হবে সেখানে কি করতে হবে এবং সেদিন সন্ধ্যায় কোথায় বসে আহার করা হবে, কিভাবে টেবিল চেয়ার সাজানাে। হবে সে বিষয়ে নির্দেশ দিল।

এরপর মেয়েরা তাদের তিনজন পুরুষ বন্ধু নিয়ে, ছােট একটি বাগানে গিয়ে কিছুক্ষণ আমােদআহাদ করল। তারপর রাত্রির আহার সমাপ্ত হবার পর রানীর অনুরােধে এমিলিয়া নৃত্য ও প্যামপিনিয়া গান আরম্ভ করলাে। আর সকলে গানের সঙ্গে কণ্ঠ মেলালাে। এরপর আরও কিছুক্ষণ নৃত্যগীতের পর সকলে নিজ নিজ শয্যায় গিয়ে শুয়ে পড়ল। এইভাবে ডেকামেরনের দ্বিতীয় দিনের সমাপ্তি হল।

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *