হানড্রেড রোমান্টিক নাইটস্ – গিয়ােভানি বােকাসিও (দ্বিতীয় দিন ১ম-৬ষ্ঠ গল্প)

›› অনুবাদ  ›› ১৮+  

গিয়ােভানি বােকাসিও-র ডেকামেরন টেলস এর বাংলা অনুবাদ।

দ্বিতীয় দিন আরম্ভ হল। ফিলােমনা আজ কুইন। আজ গল্পের বিষয় : অনেক নির্যাতন বা কষ্ট ভােগ করে সহসা কেউ ভাগ্যবান হল এবং সুখের মুখ দেখল।

সূর্য উঠল, নতুন দিন আরম্ভ হল। প্রথম গাছের আগায় রােদ স্পর্শ করল তারপর সেই রােদ নামতে নামতে পাতার ফাক দিয়ে সবুজ মাঠে নাচতে লাগল। সাতটি মেয়ে আর তিনটি ছেলে পাখি ডাকার সঙ্গে সঙ্গে জেগে উঠে বাগানে বেরিয়ে এসেছে। শিশির-পড়া ভিজে ঘাস মাড়িয়ে তারা লতাকুঞ্জের আড়ালে লুকোচুরি খেলছে। হাসির কলকল আর পাখির কাকলী বড়ই শ্রুতিমধুর লাগছে।

শিশির শুকিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওরা ফিরে দৈনন্দিন কাজ সেরে ব্রেকফাস্ট খেয়ে বাগানে এসে গােল হয়ে বসল, মাঝখানে কুইন ফিলােমেনা। তার শিরে অলিভ পাতার মুকুট। সকলকে বড় সুন্দর দেখাচ্ছে। কুইন আজ নেফাইলকে গল্প বলতে অনুরােধ করল। নেফাইলও তৈরি হয়েই ছিল। সে তার গল্প আরম্ভ করল।

প্রথম গল্প

মার্তেলিনাে ভান করলাে যেন তার পক্ষাঘাত হয়েছে। তারপর সে গির্জায় প্রবেশ করে সেন্ট অ্যারিয়াের মৃতদেহের ওপর কিছুক্ষণ শুয়ে উঠে পড়ে বললাে, সে সম্পূর্ণ আরােগ্য লাভ করেছে কিন্তু তার ছল ধরা পড়ে গেল আর সঙ্গে সঙ্গে তার পিঠে কিল চড় পড়তে আরম্ভ করলাে। বিচারক তার ফাঁসির হুকুম দিলেন। আর কয়েক মিনিট দেরি হলে তার ফাসি হয়েও যেত কিন্তু সহসা সে বেঁচে গেল।

প্রিয় সখিরা, তােমরা তাে জান যে অনেক সময় কোনাে লােক অপরকে ঠকাতে গিয়ে নিজেই বিপদে পড়ে, মারধাের খায় আর খুব কম ঠগই বেঁচে পালাতে পারে। আমাদের আলােচনা অনুসারে ও প্যামপিনিয়ার নির্দেশে আমি এমনই একটা ঠগের গল্প বলবাে যে ফাসিকাঠে ঝুলতে ঝুলতে বেঁচে গেল।

বেশিদিনের কথা নয়। ট্রেভিসাে শহরে অ্যারিগাে নামে একজন জার্মান বাস করতাে। লােকটি খুবই দরিদ্র কিন্তু অত্যন্ত সৎ ও ধর্মপ্রাণ ছিল। সে মােট বয়ে কোনােরকমে নিজের অন্ন সংস্থান করতাে। তার শত্রু ছিল না।

শহরের লােকজন অ্যারিগােকে এতই শ্রদ্ধা করতাে যে সে যখন মারা গেল তখন শহরের বড় গির্জার সব ক’টি ঘণ্টা বাজতে থাকে। অন্তত আমি এইরকম শুনেছি। ঘণ্টাগুলি কেউ বাজায় নি, নিজেই বাজছিল। এই ঘণ্টাধ্বনি সকলকে অবাক করে দিয়েছিল। তারা ধরে নিল অ্যারিগাে দরিদ্র হলেও সে সাধারণ মানুষ নয়, একজন সেন্ট, সাধু।

ধনী দরিদ্র নির্বিশেষে শহরের সমস্ত মানুষ অ্যারিয়াের কুটিরে সমবেত হয়ে অ্যারিগাের মৃতদেহ সাধুজ্ঞানে তারা কাধে বয়ে বড় গির্জায় সযত্নে নিয়ে গেল।

শহরে যত অন্ধ, খঞ্জ বা বিকৃত অঙ্গের নরনারী ছিল তারা বড় গির্জায় ভিড় জমাতে লাগলাে কারণ তাদের ধারণা হল যে, এমন সাধু পুরুষের অঙ্গ স্পর্শ করলে তাদের প্রতিবন্ধকতা দূর হবে, অন্ধ আবার দেখতে পাবে, খঞ্জ আবার সােজা হয়ে হাঁটতে পারবে, বিকলাঙ্গও আরােগ্য লাভ করবে।

শহরে তখন যেমন ছােটাছুটি, কোলাহল, তর্কবিতর্ক, তেমনি উত্তেজনা। আর বড় গির্জার ভেতরে ও বাইরে তাে নিশ্চিদ্র ভিড়, মানুষ দূরের কথা একটাও ইদুরও বােধহয় ঢুকতে পারবে না। | সেই শহরে তিনজন ইটালীয় নাগরিক ছিল, স্ট্রেচি, মার্তেলিননা এবং মার্চিস। ঘুরতে ঘুরতে তার সেই সময়ে ট্রেভিস শহরে পৌছেছিল। এই তিনজন বহুরপী, নানা রকম ছদ্মবেশ ধরে এরা মজা দেখাতাে।

এরা তিনজন আগে ট্রেভিসাে শহরে আসে নি, তাই সহসা এই শহরে এসে এমন উত্তেজনা ও ভিড় দেখে অত্যন্ত কৌতূহলী হল।

ব্যাপার জানতে পেরে ওরা তিনজনে ঠিক করল ভেতরে গিয়ে দেখবে সত্যি কোনাে বিকলাঙ্গ অ্যারিগাের দেহ স্পর্শ করে সুস্থ স্বাভাবিক হয়ে উঠছে কিনা। তারা কি আবার দেখতে পাচ্ছে বা সােজ হয়ে হাঁটতে পারছে?

তখন তারা একটা সরাইখানায় গিয়ে নিজেদের জিনিসপত্তর জমা রাখল। কিন্তু ব্যাপার-স্যাপার দেখে ও খােজখবর নিয়ে মার্চিস বললাে, গির্জার ভেতরে তাে যাব কিন্তু গির্জায় প্রচণ্ড ভিড়। ভেতরে ঢােকা অসম্ভব। তার ওপরে গির্জার বাইরের চত্বরে শাসকের হুকুমে সশস্ত্র জার্মানরা কড়া পাহারা দিচ্ছে।

মার্তেলিননা ভারি ধূর্ত; ভাবল, ভারি তাে ভিড় আর জার্মান গার্ড, আমি ঠিক ভেতরে সেই সাধুর মৃতদেহের কাছে যাবে।

মার্চিস জিজ্ঞাসা করলাে, শুনি তুমি কেমন বাহাদুর, ভেতরে কি করে ঢুকবে?

মার্তেলিনাে বললাে, তাহলে শােন, আমি পক্ষাঘাত রােগী সাজবাে আর তােমাদের দু’জনের দুই কাধে ভর দিয়ে জনতাকে বলবাে, দয়া করে একটু পথ দিন বাবা। আমরা সাধুর কাছে যাব। তােমরাও অনুরােধ করবে। তা হলেই দেখাে সকলে আমাদের পথ ছেড়ে দেবে।

মার্তেলিনাের বুদ্ধি দেখে তার দুই স্যাঙাত লাফিয়ে উঠলাে, এমন নইলে মাথায় বাহাদুর বটে!

তখন ওরা তিন বন্ধু সেই সরাইখানায় ফিরে গিয়ে নিজেদের পোঁটলা-পুঁটলি নিয়ে একটা নির্জন জায়গায় গেল। সেখানে মার্তেলিননা তার নতুন রূপসজ্জায় সাজল। মুখের চেহারা বদলে দিল, হাতের আঙুলগুলাে কুঁকড়ে, হাত পা বেঁকিয়ে সে এক বীভৎস চেহারা। দেখে মনে হয়, এমন কুৎসিত লােকটার পক্ষাঘাত সারবে না। স্ট্রেচি ও মার্টিসও কিছু মেকআপ নিল। তারপর তিন বন্ধু চললাে বড় গির্জার দিকে। দুই বন্ধুর কাধে ভর দিয়ে অতি কষ্টে কোনােরকমে যেন মার্তেলিনাে হেঁটে চললাে। বলা যায় দুই বন্ধু তাকে টেনে নিয়েই চললাে।

পথে মাতোলিনােকে দেখে কতজন সহানুভূতি প্রকাশ করতে লাগল আবার কেউ ঐ বীভৎস চেহারা দেখে মুখ ফিরিয়ে নিল। বড় গির্জার সামনে ভীষণ ভিড়। রাস্তায় একটা কুকুর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না। এগিয়ে যায় কার সাধ্য। তখন দুই বন্ধু মার্তোলিনাে স্বয়ং বিকৃত কণ্ঠে বলতে লাগলাে, খঞ্জ নাচার বাবা, একটু পথ দাও বাবা, ভগবান তােমাদের মঙ্গল করবেন বাবা, সাধুবাবার কাছে যেতে দাও বাবা।

দয়াপরবশ হয়ে সকলে কোনাে রকমে পথ করে দিল। শেষ পর্যন্ত তারা সাধু অ্যারিয়াের মৃতদেহের গছে পৌছলাে। সামনেই সাধুর দেহ শায়িত। মৃতদেহ ঘিরে কয়েকজন ভদ্ৰব্যক্তি দাঁড়িয়ে আছেন। তারা মার্তোলিনােকে দেখে স্ট্রেচি ও মার্টিসকে বললাে সাধুর পাশে, গায়ে গা ঠেকিয়ে মার্তোলিনােকে শুইয়ে দিতে। সাধর দেহের স্পর্শ পেলে রােগী চাঙ্গা হয়ে উঠতে পারে। বন্ধুরা খুব সাবধানে ধীরে ধীরে মার্তেলিনােকে কাচের পুতুল জ্ঞান করে সাধু অ্যারিগাের পাশে শুইয়ে দিল। | মার্তেলিনাে সাধুর পাশে কিছুক্ষণ নিশ্চল হয়ে শুয়ে রইল। তারপর কৌশলী অভিনেতার মতাে আস্তে আস্তে কুঁকড়ে যাওয়া আঙুল ও বেঁকে যাওয়া হাত পা ধীরে ধীরে সােজা করতে লাগল যেন সাধুর স্পর্শে সে ক্রমশ আরােগ্য লাভ করছে। তারপর তাে এক সময়ে উঠেই বসলাে। এবং একটু পরে দাড়িয়ে উঠলাে।

আর সঙ্গে সঙ্গে “জয়সেন্ট অ্যারিগােরঃ জয় ইত্যাদি জয়ধ্বনিতে সারা গির্জা উত্তাল হয়ে উঠলাে। স্বয়ং যীশুই এমন অত্যাশ্চর্য কাণ্ড ঘটাতে পেরেছেন। | সকলের নজরকেই মার্তেলিনাে ফাকি দিল কিন্তু একজনের নজর ফাঁকি দিতে পারলাে না। গির্জার ভেতরে ফ্লোরেন্সের একজন লােক ছিল। মার্তেলিনাের অদ্ভুত চেহারা দেখে ও দু’জনের দ্বারা বাহিত হয়ে আসতে দেখে সে প্রথমে তাকে চিনতে পারেনি, কিন্তু মার্তেলিনােকে উঠে দাঁড়াতে দেখে সে তাকে চিনে ফেললাে।

-আরে এ ব্যাটা তাে সেই বহুরূপীটা। এর আবার পক্ষঘাত হলাে কখন ? ব্যাটা কতাে রঙ্গই যে জানে।

ফ্লোরেন্সের সেই লােকটি চিৎকার করে উঠলাে-ব্যাটা জোচ্চোর, ঠগ, কোনােকালেই ওর পক্ষাঘাত হয়নি। ব্যাটা বহুরূপী, বিভিন্ন সাজে সেজে খেলা দেখানােই ওর কাজ।এই তাে সেদিন ভালুক সেজে পায়ে ঘুঙুর বেঁধে দিব্যি নাচ দেখাচ্ছিল।

আর যায় কোথায় ? ভীষণ কলরব। কেউ জিজ্ঞাসা করলাে, তুমি বলতে চাও লােকাটার মােটেই পক্ষাঘাত হয়নি ? তবে ওর চেহারা হাত পা আঙুল অমন হল কি করে?

-ঐ বললুম, ব্যাটা বহুরূপী, নানা রূপ ধরতে ওস্তাদ।

ধরা পড়ে দুই স্যাঙাতকে নিয়ে মার্তেলিননা তখন কেটে পড়বার চেষ্টা করছে। কিন্তু উন্মত্ত জনতার ভিড় ঠেলে পালানাে অসম্ভব। ধর, ধর, ব্যাটাকে ধর, শয়তান জোচ্চোর, মতলববাজ ইত্যাদি ধ্বনিতে গির্জা মুখর। | অনেকেই তাকে ধরে ফেলল। ধস্তাধস্তিতে তার সব সাজসজ্জা অন্তর্হিত হয়ে আসল চেহারা বেরিয়ে পড়লাে। গায়ে চড়চাপড়, কিল, লাথি, ঘুষি গাট্টা পড়তে লাগলাে।

-ভগবানের দোহাই, আমাকে মেরাে না, নাক কান মুলছি, আমাকে ছেড়ে দাও বাবা। কাতর স্বরে বলতে লাগলাে, দুষ্ট মার্কেলিননা। কিন্তু কে তার আবেদন নিবেদন শােনে। যাকে বলে চোরের মার, তখন সেই মার তার ওপর পড়তে লাগলাে। অতি বুদ্ধির গলায় দড়ি। – স্ট্রেচি ও মার্চিসও ভীষণ ভয়ে পেয়ে গেছে। এবার বুঝি ওরা তাদের ধরে মারবে। মার্তেলিনােকে বাঁচাবার কোনাে চেষ্টা না করে তারা চুপ করে দাঁড়িয়ে সব দেখতে লাগলাে।

কিন্তু যখন ভিড়ের মধ্যে একজন বললাে, ওকে মেরে ফেল, তখন তাে আর নীরব দর্শক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা যায় না। জনতা তখন এতই ক্ষিপ্ত যে, তাকে হয়ত সত্যই মেরে ফেলতাে। মার্চিস দেখল এখনই কিছু একটা করতে হবে, নইলে তাে মজা করতে এসে ওর চরম সাজা হয়ে যাবে।

মর্চিস তথন কোনওরকমে ধাক্কাধাক্কি করে ভিড় ঠেলে গির্জার ভেতর থেকে বেরিয়ে এলাে। বাইরে সশস্ত্র জার্মানরা যেখানে গার্ড দিচ্ছিল সেখানে এসে তাদের ক্যাপটেনকে বললাে, শিগগির ভেতরে চল, একটা পকেটমার আমার পকেট থেকে এক’শ ফ্লোরিন মেরে দিয়েছে, শিগগির এসাে, নইলে ব্যাটা পালিয়ে যাবে।

মার্চিসেরও কিছু বুদ্ধি আছে বলতে হবে। যদি বলতাে একটা লােককে সকলে মারছে তাহলে গার্ডরা হয়ত যেত না কিন্তু পকেটমারের কথা বলাতে কাজ হলাে।

তখনি দশ-বারােজন গার্ড ‘হট যাও’ ‘হট যাও’ বলে ভিড় ঠেলে গির্জার ভেতরে ঢুকে গেল। মার্তেলিনাের তখন চরম অবস্থা। গা দিয়ে দরদর করে রক্ত গড়াচ্ছে, মাথা ফেটেছে। একটা হাতও হয়ত ভেঙেছে। দাঁত কয়েকটা উড়ে গেছে, পাজর ভেঙেছে।

জনতার হাত থেকে গার্ডরা মার্তেলিনােকে উদ্ধার করে তাকে সােজা নিয়ে গেল বিচারকের বাড়িতে। কয়েকজন লােকও তাদের অনুসরণ করে চললাে। লােকটা তাদের ঠকিয়েছে। তারা দেখতে চায় পাজি লােকটার কি সাজা হয়। কিন্তু মার্চিস যখন বিচারককে বললাে, লােকটা তার পকেট মেরেছে; তার একশ’ ফ্লোরিন কাটা গেছে তখন অন্য লােক যারা সঙ্গে গিয়েছিল, তারাও বলতে আরম্ভ করলাে তাদেরও পকেট মারা গেছে।

বিচারক ছিলেন খুব কড়া লােক। তিনি মার্তেলিনােকে আলাদা ডেকে নিয়ে জেরা করতে আরম্ভ করলেন কিন্তু মার্তোলিনাে ভাসা ভাসা উত্তর দিতে লাগলাে, তাকে কেন গ্রেফতার করা হল তা সে। বুঝতে পারছে না।

আসামী স্বীকার করছে না দেখে বিচারক বললেন, ব্যাটাকে থামের সঙ্গে বেঁধে ধােলাই দাও তাে হে। তাহলেই ওর পেট থেকে সব কথা বেরিয়ে আসবে তারপর, ফাসিকাঠে ঝােলাবাে। | মার্তেলিননা ভাবলাে সর্বনাশ। তখন সে করজোড়ে বললাে, হুজুর আমি অপরাধ স্বীকার করছি, কিন্তু ওদের বলতে বলুন আমি কোথায় ওদের পকেট মেরেছি এবং কত ফ্লোরিনইবা মেরেছি। তবেই আমি যা ঘটেছিল তা বলবাে।

বিচারক বললেন, ভালাে কথা বলেছ। তখন তিনি অভিযােগকারীদের একে একে ডাকিয়ে প্রশ্ন করতে লাগলেন, বলাে, কোথায় তােমার পকেট মারা গেছে? কত গেছে?

উত্তরে কেউ বলল সাতদিন আগে, কেউ বলল চারদিন আগে, আবার কেউ বললাে আজই।

মার্তেলিননা তখন বলল, ধর্মাবতার ওরা সবাই মিথ্যে কথা বলছে। আমি আজ মাত্র ঘণ্টা দুয়েক আগে এই শহরে এসেছি এবং আমি তা প্রমাণ করতে পারি। হা ভগবান, আমি কেন মরতে এই শহরে এলুম? শহরে এসে সাধু অ্যারিগাের অলৌকিক ব্যাপার শুনে তাকে দেখতে আমি গির্জার ভেতরে ঢুকেছিলুম অবশ্য কিছু কৌশল করে, ফলে আমার কপালে যা ঘটেছে তা তাে হুজুর দেখতেই পাচ্ছেন। আমি যে আজই সবেমাত্র এই শহরে এসেছি তার প্রমাণ আপনি পাবেন শহরে ঢােকবার প্রধান ফটকে শুল্ক দফতরের কর্তার কাছে। এবং যে সরাইয়ে উঠেছি তার মালিকও প্রমাণ দেবে। দয়া করে আমাকে মুক্তি দিন।

ইতিমধ্যে স্ট্রেচি ও মার্চিস শুনেছে যে বিচারক মার্তেলিনােকে থামে বেঁধে ধােলাই দেবার ব্যবস্থা করছেন। ব্যাপার তাে দেখা যাচ্ছে উলটো হয়ে গেল। ওকে তপ্ত কড়া থেকে জ্বলন্ত উনুনে ফেলে দেওয়া হল। ওকে তাে এখনি বাঁচানাে দরকার নইলে আরও মার খেলে যে ক’টা দাঁত বাকি আছে সে ক’টাও যাবে। যে ক’টা পাঁজর বাকি আছে সে ক’টাও ভাঙবে। তারপর বিচারক হয়ত ওকে ফাঁসিকাঠেই ঝলিয়ে দেবেন।

তখন ওরা দু’জনে বিচারকের সামনে হাজির হয়ে হাঁটু গেড়ে বসে করজোড়ে সত্যি যা ঘটেছিল তাই বললাে। বিচারক মনে মনে কৌতুক বােধ করলেন। ওদের কথা বােধহয় বিশ্বাস করলেন না। তবুও তিনি কিছু করলেন না।

স্যানড্রো আগােলান্তি নামে একজন ব্যক্তিকে তিনি ডেকে পাঠালেন। তার সঙ্গে দেশের রাজার বন্ধুত্ব ছিল। স্যানড্রো তাে ঘটনার বিবরণ শুনে হেসেই আকুল। তিনি মার্তেলিনােকে ডেকে আনতে বললেন। মার্তেলিননা শুধুমাত্র একটি ছেড়া কামিজ পরে বিচারকের সামনে দাঁড়িয়ে ঠকঠক করে কাপছে। বিচারক মার্তেলিনােও তার বন্ধুদের কথা বিশ্বাস করেন নি। মার্তেলিনােকে ভয় দেখিয়েছেন, তাকে ফাঁসিতে ঝুলতে হবে। ফাঁসুড়েকে খবর দেওয়া হয়েছে। তাই মার্তেলিননা ভয় পেয়ে ঠকঠক করে কাঁপছে। বিচারক ফ্লোরেন্সের মানুষদের মােটেই বিশ্বাস করতেন না।

মার্তেলিননা, তার দুই বন্ধু এবং সরাইওয়ালাকে সঙ্গে নিয়ে স্যানড্রো রাজসমীপে হাজির হল।

ফাঁসির রজ্জ্ব বুঝি গলায় পরানাে হয়েছে এই ভেবে মার্তেলিনাে মাঝে মাঝে গলায় হাত বুলিয়ে রাজাকে সত্যি কথাই বললাে। সে বললাে যে, সে শুধু মজা করতেই চেয়েছিল। তার কোনও অসৎ উদ্দেশ্য ছিল না। মহারাজা তাকে যদি দয়া করে মুক্তি দেন তাহলে সে আর অপেক্ষা করবে না, এই মুহূর্তেই শহর ছেড়ে চলে যাবে। | রাজা তাে মার্তেলিনাের স্বীকারােক্তি শুনে একচোট হাসলেন। তারপর ওকে মুক্তি দিলেন। রাজাকে দয়ালু বলতে হবে কারণ তিনি তিন বন্ধুকে নতুন পােশাক দেবার আদেশ দিলেন।

তারপর আর সেখানে দাঁড়াতে আছে? তিন বন্ধু হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। কাল বিলম্ব না করে ওরা সেই ট্রেভিসাে শহর ছেড়ে পালাল।

 

দ্বিতীয় গল্প

রিনালডাে দ্য আস্তিকে আক্রমণ করে দস্যুরা তার সবকিছু লুটপাট করে নেয়। তারপর নিঃসম্বল রিনালডাে ক্যাসেল গুইগ্লিয়েলমােতে পৌছয়। সেখানে একজন বিধবা মহিলা দয়াপরবশ হয়ে তাকে আশ্রয় দেয়। শেষ পর্যন্ত সে তার অপহৃত সামগ্রীগুলি ফেরত পেয়ে নিরাপদে নিজের বাড়ি ফিরে যায়।

নেফাইলের মুখে মার্তেলিনাের কাহিনী সকলে বেশ উপভােগ করলাে। এখন মজার কাণ্ডও ঘটে! ফিলােস্ট্রাটো তাে হেসেই খুন। তার হাসি কুইনকে আকৃষ্ট করলাে। পরবর্তী গল্প কুইন তাকেই বলতে বললাে। সে নেফাইলের পাশেই বসেছিল। নেফাইলের দিকে চেয়ে হেসে সে তার গল্প আরম্ভ করলাে।

ফিলােস্ট্রাটো বললাে, আমার গল্প বেশ মজার। এর মধ্যে ধর্ম পাবে, বিপদ পাবে আর চরম প্রেমলীলাও পাবে। যারা নিয়মিত ও ভক্তিভরে সেন্ট জুলিয়ানের প্রার্থনা করে, তাদের কপালে হয়ত দুরবস্থার পর এমন সৌভাগ্য জোটে; উত্তম পরিচর্যা, উত্তম আহার এবং উষ্ণ ও কোমল শয্যা।

ফেরারার মারকুইস আজো-র শাসনকালে রিনালডাে দ্য আস্তি নামে একজন সুদর্শন ব্যবসায়ী বলােনা শহরে ব্যবসা করে নতুন মালপত্র কিনে ও কিছু অর্থ নিয়ে বাড়ি ফিরছিল। ফেরারা পার হয়ে সে যখন তার ঘােড়ায় চেপে ভেরােনার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল তখন পথে তিনজন ব্যক্তির সঙ্গে তার দেখা হল। এদের দেখে তাে ব্যবসায়ী মনে হল, কিন্তু আসলে তারা দস্যু। ব্যবসায়ী সেজে দস্যুবৃত্তি  তাদের পেশা। ঐ তিনজন যেন একজন সঙ্গী পেল। তারা রিনালডাের সঙ্গে চলতে লাগল। তার অনুমান করলাে নােকটার সঙ্গে অনেক মালপত্র তাে রয়েছেই উপরন্তু টাকাপয়সাও আছে। একটা ভালো শিকার পাওয়া গেল।

দস্যুরা এমন ভান করতে লাগল ও কথা বলতে লাগলাে যেন তারাও রিনালডাের মতাে ব্যবসায়ী। রিনালডাে ওদের সন্দেহ করবার কোনাে অবকাশ পেল না। সে ভাবল এমন সঙ্গী পাওয়া ভাগ্যের কথা একা যাচ্ছিল পথে বিপদ ঘটতে পারে। সে মনে মনে সাহস পেল যদিও আর একটা ঘােড়ায় চেপে তার ভূত যাচ্ছিল কিন্তু ভৃত্যর ওপর তার ভরসা নেই।

কথা প্রসঙ্গে চিন্তার কথাও উঠলাে। একজন দস্যু রিনালডােকে জিজ্ঞাসা করলাে, মহাশয় আপনি ভ্রমণপথে বিশেষ করে কার প্রার্থনা করেন?

রিনালডাে বললাে, সত্যি কথা বলতে কি, আমি বেশি কিছু প্রার্থনা জানি না। আমি যীশু ও মেরি মাতার নাম নিয়ে সেন্ট জুলিয়ানের প্রার্থনা করি। আমি সুফলও পাই। পথে রাত্রে আমি ভালাে এক নিরাপদ আশ্রয়ই পাই। আমি দৈনিক তার প্রার্থনা না করে থাকতে পারি না। যদি কিছু অবহেলা করি তাহলে শুধুই যে আমি মানসিক অশাস্তি ভােগ করি তাই নয়, অবাঞ্ছিত কিছু একটা ঘটেও যায়।

সেই দস্যু জিজ্ঞাসা করল, আজ সকালে প্রার্থনা করেছেন? নিশ্চয়, উত্তর দিল রিনালডাে।

ছদ্মবেশী দস্যুটা তাে মনে মনে জানতাে তারা কি করবে। তােমাকে মজা দেখাচ্ছি। আজ রাত্রে তােমাকে নিরাপদ ও উত্তম আশ্রয় পাওয়াচ্ছি। কথাগুলি অবশ্য সে ও তার দুই সঙ্গী নিজের মনেই। বলেছিল। | রিনালডােকে দস্যু বললাে, যা মহাশয় আপনি যথার্থই বলেছেন, প্রার্থনার গুণ আছে। তবে কি জানেন আমরা প্রার্থনা করতে অভ্যস্ত নই। তবুও রাত্রে ভালাে আশ্রয় পেয়ে যাই। আজ রাতেই দেখা যাবে আমাদের মধ্যে কে ভালাে আশ্রয় পায়? আপনি ও আপনার ভৃত্য না আমরা? আপনি প্রার্থনা করেছেন কিন্তু আমরা তাে কোনও প্রার্থনাই করি না। এখন দেখি ভগবান দয়া করে কি করেন।

ওরা নানারকম গল্প করতে করতে পথ চলতে লাগল আর তিন দস্যু উপযুক্ত স্থান ও সুযােগ খুঁজতে লাগল কোথায় লােকটার সর্বনাশ করা যায়।

দিন ফুরালাে। সন্ধ্যা হল। তখন ওরা কাসেল গুইঙিয়েলমাে নামে কেল্লা শহর থেকে বেশ খানিকটা দূরে একটা নির্জন স্থানে এসেছে। একটা নদী পার হতে হবে। উপযুক্ত সুযােগ। এখানে চিৎকার করলে কেউ শুনতে পাবে না। তিন দস্যু রিনালডডাকে সহসা আক্রমণ করে তার মালপত্র টাকাপয়সা সব কিছু কেড়ে নিয়ে শুধু একটা কামিজ পরিয়ে ছেড়ে দিল। রিনালডাের ভৃত্য ভয় পেয়ে তার ঘােড়া ছুটিয়ে পালিয়ে গেল। রিনালডাের ঘােড়াটাও দস্যুরা নিয়ে গেল। রিনালডাের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া মালা সেই ঘােড়ার পিঠে বােঝাই করে নিয়ে যাবার আগে ব্যঙ্গ করে বলে গেল, এবার দেখা যাক তােমার ঐ সেন্ট জুলিয়ান, তুমি নিয়মিত যার প্রার্থনা করাে, সে তােমাকে এই শীতের রাত্রে মাথা গোঁজবার চাই দেন কিনা। আমরা কিন্তু থাকবার জন্যে ভালাে জায়গাই পাব। এই কথা বলে দস্যরা ঘােড়া ছুটিয়ে চলে গেল।

রিনালডাের ভৃত্য ঘােড়া ছুটিয়ে কেল্লা শহরে পৌছে একটা সরাইখানায় আশ্রয় নিয়েছে। মনিবের কথা সে যেন স্রেফ ভুলে গেল। আপনি বাঁচলে বাপের নাম। রিনালডাে খুবই বিপদে পড়লাে। একেই তাে নিঃসম্বল হয়ে গেল, তার উপর তুষারপাত আরম্ভ হল। কনকনে শীত, খালি পা, গায়ে শুধুমাত্র একটি কামিজ, অন্ধকারও ঘন হচ্ছে। পথ দেখা যায় না। শীতে বেচারা ঠকঠক করে কাঁপছে। দাঁতে দাঁতে লাগছে। কোথাও একটা ভাঙা কুটিরও দেখা যাচ্ছে না। ক্ষিধেও পাচ্ছে। শেষে কি শীতে জমে মরে যেতে হবে?

সেইদিনই দুপুরে ঐ অঞ্চলে একটা লড়াই হয়ে গেছে। দুই দল ঘরবাড়ি দোকানপাট সব জ্বালিয়ে দিয়েছে। লােকজন পালিয়ে গেছে। সেই কেল্লা-শহর গুইগ্লিয়েলমােতে পৌছতে না পারলে আশ্রয় পাবার কোনাে আশা নেই। কিন্তু সে কি ঐ শহরে শেষ পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে? ভৃত্যটাই-বা গেল কোথায়? তাকেও কি ডাকাতরা ধরে নিয়ে গেছে? এখন সেন্ট জুলিয়ান সহায়। সে যদি কেল্লা শহরে পৌছতে পারে তাহলে একটা আশ্রয় তিনি জুটিয়ে দিতে পারেন।

তুষারের স্তুপের ওপর দিয়ে নগ্নপদে অন্ধকার পথ হাতড়ে রিনালডাে কেল্লা-শহরের দিকে চলতে লাগলাে। অনুমান করলাে এখনও মাইলখানেক পথ যেতে হবে। ভগবান নিশ্চয়ই তার সহায় হবেন।

কেল্লা শহরে যখন পৌছল তখন শহরের গেট বন্ধ হয়ে গেছে, পরিখার ওপর থেকে পুলটাও তুলে দেওয়া হয়েছে। এখন উপায়! বেচারা মুষড়ে পড়ল। চোখে জল এসে গেল। কিন্তু হতাশ হলে তাে চলবে না , তাহলে মৃত্যু সুনিশ্চিত।

দেখা যাক প্রাচীরের গায়েই কোথাও একটু আশ্রয় পাওয়া যায় কিনা। কনকনে হাওয়া থেকে অন্তত দেহটা বাঁচাতে হবে।  রিনালডাের ভাগ্য ভালাে। শহরের প্রাচীর ঘেঁষে একটা বড় বাড়ি তার নজরে পড়ল। ঐ বাড়িটার নিচেই আশ্রয় নেওয়া যাক। অন্তত তুষারপাত থেকে নিজেকে বাঁচানাে যাবে তাে! তারপর সকাল পর্যন্ত যদি বেঁচে থাকে, শহরের ফটক খুললে তখন ভেতরে ঢােকার চেষ্টা করা যাবে।

যখন সে বাড়িটার নিচে পৌছল তখন দেখল দেওয়ালে একটা দরজা রয়েছে। দরজাটা কিন্তু বন্ধ। এটা বােধহয় গুপ্ত দরজা। যাই হােক দরজার গায়ে একটু আশ্রয় পাওয়া গেল। কোথাও থেকে সে কিছু শুকনাে খড় যােগাড় করে এনে বিছিয়ে তার ওপর শুয়ে পড়ল। ভীষণ ক্লান্ত।

শুয়ে শুয়ে সে আফশােস করতে লাগলাে, হায় সেন্ট জুলিয়ান, তােমায় এত ভক্তি করি, প্রার্থনা করতে একবারও ভুলি না, আর তুমি আমাকে আজ এ কি শাস্তি দিলে? পরীক্ষা করছাে? বেশ তাই করাে।

সেন্ট জুলিয়ান কিন্তু অলক্ষ্যে থেকে তাকে লক্ষ্য করছেন এবং প্রতিকার করতেও তিনি বিলম্ব করেন নি। 

সেই বাড়িতে অতি সুন্দরী ও লাবণ্যময়ী একটি বিধবা একা বাস করতেন। দাসদাসী অবশ্য ছিল। অমন সুন্দরী মহিলা ঐ তল্লাটে আর একজনও ছিল না। জনৈক মারকুইস অফ অ্যাজো মহিলার প্রেমে পাগল। মহিলা ছিল সেই মারকুইসের মিস্ট্রেস। ঐ বাড়িতে মারকুইস তাকে সযত্নে রেখেছে এবং নিয়মিত যাওয়া আসা করে।

সেই রাত্রেও মারকুইসের আসার কথা আছে। মারকুইস এসে স্নান করবে সেজন্যে বাথটবে গরম জল রাখা আছে। তার জন্যে নানারকম সুখাদ্যও রান্না করা হয়েছে। রাত্রে মারসুইস মহিলার কাছে থাকবে।

মহিলা মারকুইসের জন্যে অপেক্ষা করছে।

মারকুইস যখন তার প্রিয়পাত্রীর বাড়ি যাবার উপক্রম করছে ঠিক সেই সময়ে একজন দূত এসে বললাে, খুব জরুরি দরকার, তাকে এখনই এক জায়গায় যেতে হবে। মারকুইস কি আর করে। এটা বেশি জরুরি। দূতকে দিয়ে প্রিয়পাত্রীকে খবর পাঠালাে আজ রাত্রে সে তার কাছে যেতে পারবে না। তারপর ঘােড়া উঠে চলে গেল।

বলাবাহুল্য মহিলা আশাহত হল। কিন্তু কি করা যাবে!

মহিলা স্থির করলাে বাথটবে যখন গরম জল আছে, জলটা নষ্ট হয় কেন। সে নিজেই স্নান করবে, তারপর প্রসাধন করে একাই খেতে বসবে।

বস্তু উন্মােচন করে মহিলা বাথটবে নামলাে। বাঃ! বেশ আরাম! তার প্রেমিক মারকুইস তাকে বুঝি জড়িয়ে ধরল। বাথটবটা ছিল প্রায় সেই গুপ্ত দরজার গায়ে, যে দরজার ওপারে রিনালড়াে খড় বিছিয়ে শুয়ে ছিল।

রিনালড়াে শীতে ঠকঠক করে কাপছে। শীত এড়াবার জন্যে এপাশ ওপাশ করছে। দাত কিটকিট করছে, আওয়াজ হচ্ছে। মহিলা এইসব আওয়াজ শুনতে পেয়ে তার দাসীকে ডেকে বলল, ওপরে যা তো, দেখ ওপাশে দরজার নিচে কি আছে। মানুষ না কোনাে জন্তু? মানুষ হলে জিজ্ঞেস করবি সে এখানে কি করছে?

দাসী একটা ছােট লণ্ঠন হাতে নিয়ে ছাদে উঠল। তারপর নিচের দিকে ঝুঁকে ডান হাতে আলাে ঝুলিয়ে দেখলাে একটা লােক, পরনে যার শুধুমাত্র একটা কামিজ, পায়ে জুতাে বা মােজা নেই, শীতে ঠকঠক করে কাপছে। দাত ঠকঠক করছে। একবার বসছে, একবার শুচ্ছে। শীতে খুবই কাতর হয়েছে। কিন্তু লােকটার বয়স খুব বেশি নয়। দেখতেও ভালাে, চোর ডাকাত বলে মনে হয় না।

দাসী জিজ্ঞাসা করলাে, এ্যাই তুমি কে? এখানে কি করে এলে? কি করছাে?

সেন্ট জুলিয়ান বুঝি মুখ তুলে চাইলেন। রিনালডাে তার ইষ্টদেবতাকে ধন্যবাদ দিয়ে অত্যন্ত কাতরস্বরে বললাে, দয়া করে আমাকে ভেতরে কোথাও একটু ঢুকতে দাও। সারারাত এখানে পড়ে থাকলে জমে যাবাে।

দাসীর মনে খুব কষ্ট হলাে। কিন্তু কর্তার বিনা অনুমতিতে সে কিছুই করতে পারে না। রিনালডােকে বললাে, একটু অপেক্ষা করাে, আমি দেখছি।

দাসী ছাদ থেকে নেমে এসে তার কর্তাকে বলল, কোনও জন্তু নয়। একটা মানুষ শীতে ভীষণ কষ্ট পাচ্ছে। কোথা থেকে এলাে এখনও জিজ্ঞাসা করিনি। গায়ে শুধু একটা কামিজ, শীতে জমে যাবার উপক্রম। চেহারা বেশ ভালাে, ভদ্রলােক বলে তাে মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে ডাকাতের পাল্লায় পড়েছিল।

মহিলাও লােকটির দুর্দশা শুনে সমবেদনা প্রকাশ করলাে। বললাে, আহা রে! মানুষটা কত কষ্ট পাচ্ছে! যা ওকে ভেতরে নিয়ে আয়।

মহিলার কাছে দরজার চাবি ছিল, কারণ মারকুইস ঐ দরজা দিয়েই রাতের অন্ধকারে গােপনে তার মিস্ট্রেসের ঘরে ঢােকে। তার কাছে একটা ডুপ্লিকেট চাবি থাকে।

যা তুই ওকে ভেতরে নিয়ে আয়। গরম জল আছে, গরম খাবারও আছে। ভালােই হল, ওগুলাে আর নষ্ট হবে না। বাড়িতে অনেক ঘর আছে, ওকে একটা ঘরে অনায়াসে রাখা যাবে।

দাসী দরজা খুলতেই এক ঝলক ধারালাে হাওয়া ঘরে ঢুকলাে। দাসী তাড়াতাড়ি রিনালডােকে ঘরে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে তালা দিয়ে দিল।

ঘরের ভেতরটা গরম তবুও রিনালডাে শীতে ঠকঠক করে কাঁপছে। তার করুণ অবস্থা দেখে মহিলা বললাে, আর দেরি নয়। তুমি কামিজটা গা থেকে ফেলে দিয়ে বাথটবে নেমে পড়, গরম জল আছে।

দ্বিতীয়বার অনুরােধের আশা না করে রিনালডাে কামিজটা ফেলে দিয়ে গরম জলের টবে নেমে পড়ল। আঃ কি আরাম! সে তার ইষ্টদেবতাকে আর এক দফা ধন্যবাদ দিল। তার মনে হল, সে মরতে মরতে বেঁচে গেল। গরম জলে গা ডুবিয়ে কাপুনি কমল।

ইতিমধ্যে দাসী একটা শুকনাে তােয়ালে রেখে গেছে। গৃহকত্রী তার মৃত স্বামীর ব্যবহৃত হলেও পােশাক-আশাক প্রস্তুত রেখেছে। রিনালডাে স্নান করে উঠে গা মুছে শুকনাে পােশাক পরে মাথার চুল আঁচড়ে নতুন মানুষ। সে যেন তার জীবন ফিরে পেল। মহিলাকে অজস্র ধন্যবাদ জানাল।

রিনালডােকে মহিলা একটু ব্র্যান্ডি খাইয়ে দিল। রিনালডাে চাঙ্গা হয়ে উঠল। এবার সে প্রাণভরে সেন্ট জুলিয়ানকে কৃতজ্ঞতা জানাল।

ঘরে ফায়ার প্লেসে আবার কাঠ দেওয়া হয়েছে। ঘর বেশ গরম হয়েছে। দাসী এসে খবর দিল লােকটি স্নান করে পােশাক পরেছে। বেশ মানিয়েছে, চেহারা দেখে ও কথা শুনে মনে হচ্ছে ইনি কোনাে সম্মানিত ব্যক্তি।

তাহলে তুই ওকে এই ঘরে ডাক। আগুনের ধারে ওকে বসিয়ে ওর কথা শুনি। তাছাড়া ওকে খাওয়াতে হবে, কিছু যায়নি বােধহয়। রিনালডাে ঘরে এসে মহিলাকে অসংখ্য ধন্যবাদ ও আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানালাে। বললাে, আপনার জন্যই জীবন ফিরে পেলুম।

রিনালডাে যতক্ষণ কথা বলছিল মহিলা ততক্ষণ তার দিকে একদৃষ্টে চেয়েছিল। একবারও চোখ সরায় নি। কি যেন খুঁজছিল। দাসী ঠিকই বলেছে, লােকাটি সুদর্শন তাে বটেই উপরন্তু জমিদার-টমিদার হবে বােধহয়।

রিনালডাের মুখ থেকে তার দুর্দশার কাহিনী শুনে মহিলা তার সহানুভূতি জানাল। মহিলার কাছে রিনালডাে শুনল যে, তার আগে একটা ছােকরা ক্যাসেলে ঢুকেছে। এ খবর মহিলা শুনেছে। মনে হচ্ছে সে বােধহয় রিনালডাের ভৃত্য। যাক্, কাল সকালে খবর নিলে হবে।

দাসী টেবিলে খাবার সাজিয়ে দিল। মহিলা বললাে, রিনালডাে তােমার নিশ্চয়ই ক্ষিধে পেয়েছে। চলাে কিছু খাওয়া যাক। যেতে যেতে মহিলা ভালাে করে লক্ষ্য করলাে, লােকটাকে যে শুধু ভালাে লােক বলে মনে হচ্ছে তাই নয়, বেশ শক্তপােক্ত মানুষ। নারীর প্রতিও নিশ্চয় আকর্ষণ আছে। রসিক বলেও তাে মনে হচ্ছে।

মহিলা জানতাে যে আজ রাত্রে সে মারকুইসের বাহুবন্ধনে আবদ্ধ থাকবে। মারকুইস আসতে পারলাে না, কিন্তু একজন উপযুক্ত পুরুষ তাে জুটে গেল। ইতিমধ্যে তার প্রতিটি শিরা চঞ্চল হয়ে উঠেছিল, পুরুষ সঙ্গমের জন্যে মনে মনে প্রস্তুত। দাসীর সঙ্গেও পরামর্শ করলাে। হাসিমুখে দাসী সমর্থন জানাল। উৎসাহ দিল।

রিনালডােকে মহিলা বললাে, রিনালডাে তুমি অমন মনমরা হয়ে আছে কেন? কিছু মালপত্র আর কয়েকটা টাকা খোয়া গেছে তাে কি হয়েছে? ওর জন্যে চিন্তা কোরাে না। ওসব বাজে কথা মন থেকে তাড়িয়ে দাও। মনে করাে এটা তােমার নিজের বাড়ি। নাও, আজ একটু সুরা পান কর, ফুর্তি কর। তুমি তাে আমার স্বামীর পােশাক পরেছো, তােমাকে দেখে আমার তার কথা মনে হচ্ছে। শুধু তাই নয় তুমিই যে আমার স্বামী, জীবন ফিরে পেয়ে আমাকে আদর করবার জন্যে সামনে এসে দাঁড়িয়েছ। এসাে আমাকে জড়িয়ে ধরে চুম্বনে চুম্বনে তৃপ্ত করাে। এসাে এসাে প্রিয়তম, আমার আর দেরি সহ্য হচ্ছে না। আমার ঐ দেহ, সবকিছু তােমার।

রিনালডােও কম যায় না। সে বললাে, প্রিয়তমা তুমি আমার প্রাণ বাঁচিয়েছ। তােমাকে আমার অদেয় কিছু থাকতে পারে না। কয়েকটা চুম্বনে সে ঋণ শােধ হবার নয়।

মহিলার তখন চোখ কচক করছিল, বুক ফুলে ফুলে নিশ্বাস পড়ছিল। সত্যিই সে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারছিল না। রিনালডাে এটুকু বুঝতে পেরে সুন্দরী যুবতীকে জড়িয়ে ধরে বললাে, আমি তােমার কাছ কৃতজ্ঞ। এসাে প্রিয়, আমার চুম্বন নাও। বলে যুবতীকে সে জড়িয়ে ধরলো।

এরপর বলার প্রয়ােজন হয় না যে উভয়ে মদনরঙ্গে মত্ত হয়ে জড়াজড়ি করে কোমল ও উষ্ণ শয্যায় শুয়ে পড়লাে। এবং একসময়ে পরস্পরে সংযুক্ত হল। একবার নয়, কয়েকবার। যে পর্যন্ত না তারা রীতিমত পরিশ্রান্ত হল।

কাকভােরে অন্ধকার কেটে যাওয়ার আগে মহিলা ঘুম থেকে উঠে একটা থলের মধ্যে তার স্বামীর কয়েক প্রস্থ উত্তম পােশাক এবং পৃথক একটি ছােট থলেতে বেশ কিছু পরিমাণ অর্থ ভরে দিয়ে রিনালডােকে তুলে দিয়ে বললাে, শহরের কেউ ওঠবার আগেই তুমি বেরিয়ে যাও। মহিলারও ভয় আছে। যে, সে বিধবা। পরপুরুষকে নিয়ে রাত্রি কাটায় জানতে তাে পারলে ঢি ঢি পড়ে যাবে।

হাত মুখ ধুইয়ে, পােশাক পরিয়ে, কিছু খাইয়ে রিনালডােকে সে গুপ্ত দরজা দিয়ে বার করে দিল। বলে দিল, আর একটু পরে পরিখার ওপর পুল নামিয়ে দিয়ে শহরের গেট খুলে দেওয়া হবে। তারপর তুমি শহরে প্রবেশ কোরাে, যেন বাইরে থেকে আসছো।

শহরের গেট খােলার পর রিনালডাে শহরে ঢুকে তার ভৃত্যকে খুঁজে বের করলাে। ঘােড়ার পিঠে যে বাক্স ছিল সেই বাক্স থেকে রিনালডাে তার নিজের জামাকাপড় বার করে পরলাে, কারণ তার রাতের প্রিয়ার দেওয়া দামী পােশাক ভ্রমণের উপযােগী নয়।

রিনালডাে যখন তার ভৃত্যর ঘােড়ায় উঠতে যাচ্ছে ঠিক তখনি এক অবাক কাণ্ড তার চোখে পড়লাে। সেই তিনজন দস্যু ধরা পড়েছে। তাদের গ্রেফতার করে শহরে আনা হয়েছে। তারা অপরাধ স্বীকার করলাে। রিনালডাে তার জামাকাপড়, মালপত্তর, টাকাপয়সা সবকিছু ফেরত পেল—শুধু মােজার একজোড়া গার্টার পাওয়া গেল না। কোথাও পড়ে গেছে। যাগ্গে।

রিনালডাের একবার ইচ্ছে হল সে দস্যুদের বলে যে, এইবার যাচাই করে দেখাে প্রার্থনার ফল কি হতে পারে। কিন্তু তা না বলে সে নিজেই তার ইষ্টদেবতা সেন্ট জুলিয়ানের আর প্রস্থ প্রার্থনা করলাে অত্যন্ত ভক্তিভরে।

রিনালডাে নিরাপদে তার বাড়ি ফিরল। বিচারে দস্যু তিনজনের চরম দণ্ড হল। তারা আরও অনেক অপরাধ করেছিল। তাদের ফাঁসিকাঠে ঝুলতে হল।

 

তৃতীয় গল্প

তিনটি যুবক উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত পিতার অগাধ সম্পত্তি বেপরােয়াভাবে খরচ করে উড়িয়ে দিল। তাদের ভাইপাে নিঃসম্বল হয়ে বাড়ি ফিরছিল। পথে দেখা হল এক তরুণ যাজকের সঙ্গে। পরে জানতে পারলাে সে যাজক নয়, ছদ্মবেশে ইংলণ্ডের রাজকন্যা। দু’জনের বিয়ে হল এবং তিন কাকার লুপ্ত সম্পত্তি ও মানসম্মান ফিরিয়ে দিল।

বাঃ বেশ মজার গল্প বলেছে ফিলােপ্পাটো। সকলেই গল্পটার বেশ তারিফ করলাে। একেই বলে পুরুষস্য ভাগ্যম। মেয়েরা কিন্তু মুখ লুকিয়ে প্রচুর হাসাহাসি করলাে। একজন অপরিচিত ব্যক্তিকে দেখে বিধবার নিজের স্বামীকে মনে পড়তে পারে, তাই বলে তাকে একেবারে বিছানায় তোলা, এটা কি রকম হল!

তবে সে যুগে এরকম চলতাে। মেয়েরা বললাে, প্রার্থনারও একটা গুণ আছে। আলােচনা থামাবার পর এবার কে গল্প বলবে? কে আবার? ফিলােস্ট্রাটোর পাশেই বসেছিল প্যামপিনিয়া, প্রাক্তন কুইন, সেই বলুক। সকলে সমস্বরে সায় জানালাে।

প্যামপিনিয়া বললাে, প্রার্থনার সুফল বলাে, আর ভাগ্যের কথাই বলাে মানুষের মন বলেও একটা কথা আছে। মানুষের মনে কখন কি উদয় হয় আর কখন সে তার মনােবাসনা পূর্ণ করতে কি করে বসে কে বলতে পারে? এমন অভিজ্ঞতা আমাদেরও অনেকের আছে। গল্পেই সবকিছু ঘটে না, বাস্তব জীবনেও কত কি ঘটে কেউ বলতে পারে না। ভাগ্য মানুষকে নিয়ে কতরকম খেলা খেলে আর মানুষ যে কখন প্রেমে পড়ে তাও বলতে পারে না। আমি এইরকম একটা গল্প বলছি, মনে হয় তােমাদের ভালােই লাগবে। তাহলে সবাই স্থির হয়ে বসে মন দিয়ে শােন।

আমাদের শহরে মেসার টেবালডডা নামে একজন অভিজাত ব্যক্তি বাস করতেন। কেউ বলে টেবালডাে ছিল ল্যামবারতি পরিবারভুক্ত, আবার কেউ বলে তিনি ছিলেন আগােলানতি পরিবারভুক্ত। এরকম মনে হওয়ার কারণ টেবালডাের এক ছেলে আগােলানতি পরিবারের সঙ্গে ব্যবসা করতাে এবং ঘনিষ্ঠভাবে ঐ পরিবারের সঙ্গে যুক্ত ছিল এবং এখনও আছে।

তা ঐ ছেলে যে পরিবারভুক্তই হােক না কেন সে রীতিমত ধনী ছিল। প্রচুর অর্থ ও সম্পদের সে অধিকারী ছিল। তার তুল্য ধনী তখন শহরে আর কেউ ছিল না।

তার তিন ছেলে ছিল। বড় ছেলের নাম ল্যামবারতাে, মেজ ছেলের নাম টেবালডাে আর ছােট ছেলের নাম আগােলানতি। ছেলে তিনটিকে সকলে পছন্দ করত, তাদের আচরণ ছিল প্রশংসার যােগ্য।

বড় ছেলে ল্যামবারতাের বয়স যখন আঠারাে তখন তাদের ধনী পিতা মেসার টেবালডডা মারা গেলেন। তিন ছেলে পিতার অতুল বৈভবের মালিক হল। বাড়ি, অর্থ, আসবাব, রত্নালংকার, জমিজমা ও অন্যান্য সম্পদ। কত কোটি ফ্লোরিন কে জানে?

তিন ছেলে এতদিন তাে বেশ ভালােই ছিল। প্রাচুর্য থাকলেও পিতার মতাে হিসেবী ছিল না। সকলে ভেবেছিল এই তিন ছেলে পৈতৃক সম্পত্তি আরও বহুগুণে বাড়াতে পারবে। কিন্তু তাদের ধারণা অচিরে ভুল প্রমাণিত হল।

হাতে অত টাকা পেয়ে ওদের মাথা খারাপ হয়ে গেল। দু’হাতে টাকা ওড়াতে লাগল। মাত্র তাে দুটো হাত, দশটা হাত থাকলে দশ হাতেই টাকা ওড়াত। এছাড়া প্রয়ােজনের অতিরিক্ত দাসদাসী নিযুক্ত করলাে, সেরা ঘােড়া কিনে আস্তাবল ভরতে লাগলাে, ফুর্তি ও প্রমােদে গা ভাসিয়ে দিল। কত যে কুকুর আর বাজপাখি কিনল তার হিসেবে নেই, ঘন ঘন পার্টি দিতে লাগলাে। উপহার দেওয়ারই-বা সে কি বহর। জুয়াে খেলা তাে চলছেই। যা ইচ্ছে তাই করতে লাগলাে। টাকা নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে লাগলাে। ভেবেছিল বাবা যা রেখে গেছেন তা শেষ হবে না।

একদিন তারা চমকে উঠল যেদিন তাদের খাজাঞ্চি বললাে, অর্থভাণ্ডার প্রায় শূন্য। একটা ব্যতীত সব সিন্দুক খালি হয়ে গেছে। বাকি সিন্দুক শূন্য হতে আর বিলম্ব নেই। কিন্তু অকস্মাৎ ব্যয়সংকোচ করে তারা তাে নিজেদের ইজ্জত নষ্ট করতে পারে না! নগদ টাকা না থাকলেও রত্নালংকার আছে বাড়ি আছে, জমি আছে, দামী দামী আসবাব এবং আরও কত কি তাে আছে, তবে আর ভাবনা কি? সেইসব সম্পদ একে একে বাঁধা পড়তে লাগলাে বা বিক্রি হতে লাগলাে। কি দ্রুত হারে এইসব সামগ্রী ও সম্পদ বন্ধক পড়ছে বা বিক্রয় হচ্ছে সে দিকে তিন ছেলের খেয়াল ছিল না। একদিন তারা আবিষ্কার করলাে যে, তারা দেউলে হয়ে গেছে। নগদ টাকা কিছু নেই।

বড় ভাই ল্যামবারতাে তার দুই ভাইকে ডেকে পরামর্শ করলাে, এখন কি করা যায়? বাবার আশ্রয়ে নিরাপদে ও আরামে ছিল। এখন তাে ওরা দরিদ্র হয়ে পড়েছে। তবে পুরাে সর্বনাশ এখনও হয়নি, এখনও পথে বসতে হয়নি। যদি কিছু করতে হয় তাে এখনই করতে হবে।

নেই নেই করে তখনও যা বাকি ছিল সে সবই ওরা বিক্রি করে ভালাে টাকাই পেল! তারপর সেই টাকা নিয়ে তিন ভাই ইংলণ্ডে চলে গেল, কারণ পূর্বের মান-সম্মান নিয়ে এদেশে আর বাস করা যাবে না।

তাদের উচিত শিক্ষা হয়েছে। হয়েছে কি? দেখা যাক।

এবার তারা সতর্ক। লণ্ডনে ওরা একটা ছােট বাড়ি ভাড়া করলাে। খরচ খুব কমিয়ে দিল, যতটুকু না করলে নয় সেইটুকুই খরচ করতে লাগলাে। আর অযথা আড়ম্বর নয়। ওসব লােক দেখানাে ব্যাপার।

যে পরিমাণ অর্থ ওরা ইটালি থেকে এনেছিল, তারই একটা মােটা অংশ ওরা মহাজনী কারবারে লগ্নী করলাে। ডিউক, লর্ড, ব্যারনদের ওরা চড়া সুদে টাকা ধার দিতে লাগলাে। ব্যবসা জমে উঠল। প্রচুর আয় হল। আবার তারা ধনী হল।

এবার ওরা একে একে ইটালিতে ফিরে হৃতসম্পত্তি পুনরুদ্ধার করতে লাগলাে। আবার ওরা সমাজে প্রতিষ্ঠিত হল। তিন ভাই আইবুড়াে নাম ঘুচিয়ে বিয়ে করল।

ইংলণ্ডের ব্যবসা ওরা চালু রেখেছে, বন্ধ করেনি। ব্যবসাটা লাভজনক। সেই ব্যবসা দেখাশােনা, টাকা লগ্নী ও আদায়পত্র করার জন্যে ওরা ওদের বিশ্বাসী যুবক ভাইপাে আলসান্দ্রোকে লণ্ডনে পাঠাল। তিন ভাই ফ্লোরেন্সে রইলাে।

কিন্তু স্বভাব যাবে কোথায়? আবার তারা বেহিসেবীভাবে খরচ করতে আরম্ভ করলাে। আগেকার দুর্দশা ওরা ভুলে গেল। ফ্লোরেন্স ওদের আয় বলতে কিছু নেই, কিন্তু ব্যয় তাে আছে।

আলসান্দ্রো লণ্ডনে গিয়ে ব্যবসা আরও বাড়িয়েছে। সে সেখান থেকে কাকাদের মােটা টাকাই পাঠায়। তাইতে তিন কাকা খরচ চালায়। কাকারা ভাবে লণ্ডন থেকে তাে ভালােই টাকা আসছে, অতএব ভাবনা কি? ওড়াও পায়রা। টাকা আসতে দেরি হলে বা কখনও কম টাকা এলে ওরা ধার করতে আরম্ভ করলাে। ক্রমশ আয় অপেক্ষা ব্যয় বেড়ে চলল। এবং ধারের পরিমাণও।

এই সময়ে বােমা ফাটল।

ইংলণ্ডে ঘরােয়া যুদ্ধ বাধল। এক রাজা ও তার ছেলের সঙ্গে ধুন্ধুমার লড়াই। দেশ দুটো হল। আলসান্দ্রো যেসব ডিউক, লর্ড বা ব্যারনদের ক্যাসেল বন্ধক রেখেছিল সেসব তার হাতছাড়া হয়ে গেল। আয় বন্ধ হয়ে গেল। তবুও সে ইংলণ্ডে কিছু দিন রইল। তার আশা, বাপ ব্যাটায় শিগগির মিটমাট হয়ে বাবে, দেশে আবার শান্তি ফিরে আসবে। তার ব্যবসা আবার চালু হবে। বকেয়া সুদ আদায় হবে, বন্ধকী সম্পত্তির আবার সে দখল নিতে পারবে।

ফ্লোরেন্সে কিন্তু তিন ভাইয়ের জ্ঞানচক্ষু তখনও উন্মীলিত হয়নি। তারা ঋণ করেই চলেছে। লণ্ডন থেকে টাকা ঠিকই আসবে। তারা মুর্খের স্বর্গে বাস করতে লাগলাে। তাদের দুর্ভাগ্য, মুর্খের স্বর্গেও তিন ভাই বেশি দিন কাটাতে পারল না।

ইংলণ্ডে যুদ্ধ থামবার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না, টাকাও আসছে না। যেসব সম্পত্তি ওরা পুনরুদ্ধার করেছিল সেসব কবেই বিক্রি হয়ে গেছে। তারপর ঋণ করে সংসার খরচ চলছিল। সব কিছুর সীমা আছে। ঋণের পাহাড় জমে উঠল। সুদও দিতে পারছে না। মহাজনরা চাপ দিল। অস্থাবর যেসব সম্পত্তি ছিল তা বিক্রি করেও ঋণ শােধ হল না। অতএব তিন ভাইকে জেলে যেতে হল। তিন ভাইয়ের তিন বৌ ও তাদের ছেলেমেয়েরা রাস্তায় নামল। দুর্দশার চূড়ান্ত।

যুদ্ধ মিটমাটের আশায় আলসান্দ্রো ইংলণ্ডে কয়েকটা বছর রইল কিন্তু বৃথা। আলসান্দ্রো বুদ্ধিমান ও কর্মঠ, তাই সে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল কিন্তু অবস্থা এমন দাঁড়াল যে, তার নিজেরই খরচ আর চলে না! তাই সে ঠিক করল ইটালিতে ফিরে যাবে। আর দেরি করলে দেশে ফেরার জাহাজ ভাড়াটাও জুটবে না।

একদিন আবহাওয়া ভালাে দেখে নিজের দু’চারটে জামাকাপড় ও পথে লাগতে পারে এমন কিছু সামগ্রী পুঁটলি বেঁধে আলসান্দ্রো তার ঘােড়াটির পিঠে চেপে রওনা হল। ঘােড়ার রং লাল ছিল কি সাদা ছিল তা আমি বলতে পারব না। একাই যাচ্ছে, কোনাে সঙ্গী নেই।

একা যেতে যেতে গা ছম ছম করছে কিন্তু ব্ৰুগস ছাড়বার পর একটা বড় দলের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। দলের আগে চলেছে এক তরুণ অ্যাবট (মঠাধীশ), সঙ্গে কয়েকজন মংক (সাধু), বেশ কিছু সেবক। অ্যাবেটর পরনে সাদা পােশাক, সঙ্গে কয়েকজন সেবক, অনেক মালপত্র। পশ্চাতে ওদের পাহারা দিয়ে চলেছে দু’জন নাইট। এই নাইট দু’জন রাজার আত্মীয়। এই দু’জনের সঙ্গে আলসান্দ্রোর পরিচয় ছিল। ভালােই হল, আলসান্দ্রো ওদের দলে ভিড়ে গেল, সঙ্গীও পেল। কথা বলার লােক ও পেল। | চলতে চলতে আলসান্দ্রো নাইটদের তরুণ অ্যাবট ও মংকদের পরিচয় জিজ্ঞাসা করলাে এবং ওরা যাচ্ছেই বা কোথায় ?

একজন নাইট উত্তরে বললাে, সবার আগে যে তরুণ অ্যাবট যাচ্ছে উনি হলেন ইংলণ্ডের একটি বড় মঠের মঠাধীশ নিযুক্ত হয়েছেন। কিন্তু যে বয়সে মঠাধীশ হওয়া যায় ওঁর এখনও সেই বয়স হয়নি। তাই আমরা সকলে রােমে যাচ্ছি, মহামান্য পােপকে অনুরােধ করবাে যেন উনি এই তরুণকে কাজ চালিয়ে যাবার অনুমতি দেন। বয়সে তরুণ হলেও উনি এ কাজে দক্ষ। ভালােভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু সমস্ত ব্যাপারটা আমরা অত্যন্ত গােপন রেখেছি। জানােই তাে এখন যুদ্ধ চলছে। শত্রুপক্ষের কাছে কথাটা উঠলে আমাদের বিপদ ঘটতে পারে।

তরুণ মঠাধীশ বরাবর দলের অগ্রভাগেই যাচ্ছিলেন কিন্তু কিছু কথা বলবার জন্যে বা কোনও নির্দেশ দেবার জন্যে মাঝে মাঝে পিছিয়েও আসছিলেন।

দলে যে একজন মানুষ বেড়ে গেছে এ খবর তিনি জানতে পারেন নি। কিছু পরামর্শ করবার জন্যে তিনি রাস্তার এক পাশে তার ঘােড়া থামালেন। দলের সকলে যখন এগিয়ে আসছে তখন তিনি আলসান্দোকে দেখে তার প্রতি আকৃষ্ট হলেন। পৌরুষব্যঞ্জক কি সুন্দর চেহারা, চওড়া ছাতি, চওড়া কাঁধ, চওড়া কজি, খাড়া নাক, উজ্জ্বল চোখ। নবীন যুবক ভদ্র, বিনয়ী, মিষ্টভাষী। এমন যুবক তার চোখে বড় একটা পড়ে নি। ঠিক যেন রাজপুত্র!

তরুণ মঠাধীশ এতক্ষণ গম্ভীর হয়েছিলেন, খুব কম কথা বলছিলেন। ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত মনে হচ্ছিল। কিন্তু এই নবীন যুবকটিকে দেখেই তার মুখে হাসি ফুটল। তিনি তাকে তার পাশে ডাকলেন। তারপর দুজনে গল্প করতে করতে এগিয়ে চললেন। নাইট দু’জন দৃষ্টি বিনিময় করলাে।

মঠাধীশ আলসান্দ্রোর পরিচয় জিজ্ঞাসা করলেন। আলসান্দ্রো কিছু গােপন না করে সবই বললাে। বর্তমানে সে দুর্দশায় পড়েছে এবং মঠাধীশ যদি তাকে কোনাে কাজে লাগান তাহলে সে চিরকৃতজ্ঞ থাকবে।

আলসান্দ্রো যে পেশায় এতদিন নিযুক্ত ছিল সেটা মঠাধীশের মনঃপূত নয়, কিন্তু এটা তাে তার নিজের পেশা ছিল না, তার কাকাদের ব্যবসা সে তদারক করতাে। অতএব যুবককে ক্ষমা করা যেতে পারে। এই ভদ্র যুবকের স্পষ্ট স্বীকারােক্তি ও বলবার ভঙ্গি তরুণ মঠাধীশকে মুগ্ধ করলাে। কি চমৎকার ছেলেটি, এমন সুন্দর কোনাে ছেলের সঙ্গে তার আলাপ হয়নি। দু’জনে পরস্পরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে গেল। আলসান্দ্রোকে মঠাধীশ আশ্বাস দিল, তােমার কোনাে চিন্তা নেই। তােমার যাতে ভালাে হয় তা আমি নিশ্চয় দেখব। তবে তুমি ভগবানে বিশ্বাস রাখ, মনে রাখ সাহস, তুমি সংকট থেকে মুক্তি পাবে।

মঠাধীশ বললেন, আমিও তাে টাসকানি যাচ্ছি। তুমি আমাদের দলের একজন হয়ে আমার সঙ্গে চলাে। আলসান্দ্রো ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বললাে, আপনার সেবা করতে পারলে আমি নিজেকে ধন্য মনে করবাে। | ওরা এগিয়ে চললাে। মাঝে মাঝে বিশ্রাম নেয়, আবার পথ চলে। যতই দিন যায় মঠাধীশ আলসান্দ্রোর প্রতি ততই আকৃষ্ট হন। আলসান্দ্রো চোখের আড়াল হলে তিনি তার খােজ করেন। এ যেন পুরুষের প্রতি প্রেম নয়, যেন যুবক-যুবতীর প্রেম।

ওরা একটা ছােট শহরে এসে পৌঁছল। শহরে সরাইখানার সংখ্যা কম, যাও বা কয়েকটা আছে তেমন ভালাে নয়। আলসান্দ্রোর ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আছে এবং সে মঠাধীশের বিশ্বাসভাজন সচিব হয়ে উঠেছিল। তাই সে নিজে খুঁজতে লাগল শহরে একটা বাড়ি পাওয়া যায় কিনা। তাহলে সকলে এক জায়গায় থাকা যায়।

ইতিমধ্যে দলের সকলে কয়েকটা সরাইখানায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। আলসান্দ্রো ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসে দেখল মঠাধীশ একটা সরাইখানার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। ঘােড়া থেকে তখনও নামেন নি। এই সরাইখানায় একটাই ঘর খালি আছে। ঘরখানা ভালাে। | রাত্রি হয়ে গিয়েছিল। আলসান্দ্রো মঠাধীশকে বলল, আপনি এই সরাইখানাতেই থাকুন, আমি কোথাও একটা আজ্ঞা খুঁজে নেব।

মঠাধীশ বললেন, তাহলে এসাে আমরা একটু বিশ্রাম নিয়ে পরিষ্কার হয়ে খেয়ে নিই, তারপর তুমি খুঁজতে বেরিয়ে যাবে।।

আলসান্দ্রো রাজি হল। মঠাধীশ তার নিজের ঘরে চলে গেছেন ও পােশাক পরিবর্তন করে শুয়ে পড়লেন।

আলসান্দ্রো কিন্তু কোথাও আশ্রয় পেল না। যেসব সরাইখানায় দলের অন্য লােকেরা ছিল সেখানে হয়ত তিল ধারণের স্থান আছে কিন্তু তােক ধারণের স্থান নেই। তাই সে আবার মঠাধীশের সরাইখানায় ফিরে এসে সরাইওয়ালাকে বললাে, শােবার জন্যে একটু জায়গা করে দিন। | সরাইওয়ালা বললাে, অসম্ভব। তা তুমি এক কাজ করাে না! মঠাধীশের ঘরে মেঝেতে জায়গা আছে। আমি মেঝেতে একটা গদি পেতে দিচ্ছি, রাত্তিরটা কোনােরকমে কাটিয়ে দাও। তােমার মঠাধীশ জানতেও পারবে না, আমি চুপি চুপি দরজা খুলে ঘরের মেঝেতে-তােষক পেতে দিচ্ছি। বালিশও দেব। তুমি রীতিমত ক্লান্ত, শুয়ে পড়লেই ঘুমিয়ে পড়বে। মঠাধীশ নিশ্চয়ই কিছু মনে করবেন না। তােমাদের মধ্যে একজন নারী হলে না হয় কথা ছিল।

পুরনাে কাঠের সিঁড়ি বেয়ে ওরা দু’জনে আস্তে আস্তে ও সাবধানে ওপরে উঠল যাতে আওয়াজ হয়ে মঠাধীশের ঘুম ভেঙে না যায়। আলসান্দ্রো দেখল সরাইওয়ালা যা বলেছিল তা ঠিক, মেঝেতে একটা তােষক পেতে শােবার যথেষ্ট জায়গা আছে। সরাইওয়ালা তােষক পেতে বালিশ দিয়ে পা টিপে টিপে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। যাবার সময় দরজা বন্ধ করে দিয়ে গেল।

আলসান্দ্রো দেখল মঠাধীশ ঘুমােচ্ছন। সে তার জুতাে মােজা প্যান্ট ও কোট খুলে শুধুমাত্র লম্বা ঝলের একটি শার্ট পরে বিছানায় হাঁটু গেড়ে বসে ভগবানের যখন প্রার্থনা করছে, তখন মঠাধীশ ভাবছেন ভগবান আমার প্রার্থনা শুনেছেন, আমার মনােবাসনা তিনি পূর্ণ করবেন।

মঠাধীশ ঘুমােন নি। তিনি জেগে ছিলেন। প্রিয়তম নবীন যুবক বন্ধুর জন্যে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছিলেন। দরজা খােলার শব্দ শুনেই তিনি ঘুমের ভান করে চুপ করে নিশ্চল হয়ে শুয়ে রইলেন। আলসান্দ্রোকে ঘরে ঢুকতে দেখে তিনি পুলকিত হলেন। আজ যদি আমি এই সুযােগ নিতে না পারি তবে আবার কবে এমন সুযােগ আসবে কে জানে? | আলসান্দ্রো প্রার্থনা শেষ করে যেই শুতে যাবে অমনি মঠাধীশ তার সুরেলা কণ্ঠে বললেন, প্রিয়তম তুমি কষ্ট করে মেঝেতে শক্ত বিছানায় কেন শােবে! এসাে, আমার পাশে এসে শাও। বিছানাটা বেশ।

প্রিয়তমর সুরেলা কণ্ঠও নারীর মতাে, অন্ধকারে ভালাে দেখা না গেলেও মনে হল মাথার চুল যেন দীর্ঘ। আলসান্দ্রো গ্রাহ্য করলাে না। মঠাধীশ একে তরুণ, তায় কোনাে কোনাে তরুণের নারীসুলভ কিছু বৈশিষ্ট থাকে। সে বললাে, না বন্ধু, তােমার কষ্ট হবে। তােমার খাট দু’জনের উপযুক্ত নয়। আমি নিচেই ঘুমােতে পারবাে। মঠাধীশ ধমক দিয়ে বললাে, আরে উঠে এসাে তাে ? যা বলছি শােন, আমার একটুও অসুবিধে হবে না।

আলসান্দ্রো ভাবল মঠাধীশের সঙ্গে তার শুধু বন্ধুত্বই হয়নি, তার তিনি অনেক উপকার করেছেন এবং ভবিষ্যতেরও ভার নিয়েছেন অতএব তার অনুরােধ রক্ষা করা কর্তব্য।

আলসান্দ্রো বাটে উঠল এবং স্বল্পপরিসর হলেও ওরই মধ্যে সে পার্থক্য রাখবার চেষ্টা করলাে। কিন্তু মঠাধীশ তাকে কাছে টেনে নিয়ে জড়িয়ে ধরলাে। এ যে তরুণীর মতাে কোমল বাহু। তারপর মঠাধীশ আলসান্দ্রোর গালে, বুকে ও সারা অঙ্গে প্রেমিকার মতাে হাত বুলােতে লাগলাে। মঠাধীশও উত্তেজিত হয়েছিল। তার ঘন ঘন নিশ্বাস পড়ছিল, আলসান্দ্রোও উত্তেজিত হয়ে পড়লাে, তার বুক ঢিব ঢিব করতে লাগলাে। সে কার বজ্র আলিঙ্গনে বাঁধা পড়ল!

তখনি আলসান্দ্রোর সন্দেহ ভঞ্জন হল। মঠাধীশ তার একটি হাত নিয়ে নিজের বুকের ওপর রেখে বললাে, জামার ভেতরে তােমার হাত টিপে ধরাে! দুর বােকা, এতক্ষণেও বুঝতে পারাে নি যে আমি পুরুষ নই! দেখাে আমার বুকে কি লুকিয়ে রেখেছি।

অপূর্ব! আলসান্দ্রো আগে কখনও কোনও তরুণীর পুরন্ত ও কোমল স্তন অনুভব করার সুযােগ পায়নি। তার পৌরুষ জেগে উঠল। আলসান্দ্রো তন্বী তরুণীকে জড়িয়ে ধরে তাকে চুম্বন করতে গেল। তরুণী নিজের ঠোটে হাত রেখে বললাে, একটু অপেক্ষা করাে। তারপর উভয়েই মনােস্কামনা পরিপূর্ণভাবে পূর্ণ করবাে। তাড়াতাড়ি করতে নেই। দেখতেই পাচ্ছ আমি যুবক নই, যুবতী। আমার ভরা যৌবন, কিন্তু আমি এখনও কুমারী। আমি মহামান্য পােপের কাছে যাচ্ছি আমার বিবাহের অনুমতি নিতে, অথচ আমি কারও বাগদত্তা নই বা কোনাে পুরুষও নির্বাচন করিনি। তােমাকে দেখামাত্র আমি মনে মনে তােমাকে স্বামীত্বে বরণ করেছি, তােমার নিশ্চয়ই আপত্তি হবে না। কিন্তু তুমি যদি রাজি না হও তাহলে তুমি এখুনি আমার বিছানা থেকে উঠে যেখানে ইচ্ছে যাও।

ও আলসান্দ্রো তখনও তরুণীর আসল পরিচয় জানে না। কিন্তু যাকে রাজার দু’জন নাইট পাহারা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে এবং সঙ্গে যে পরিমাণ লটবহর ও লােকজন আছে, সে তরুণী নিশ্চয় কোনাে ধনী ও অভিজাত বংশের কন্যা।

আলসান্দ্রো তাে হাতে স্বর্গ পেয়েছে। সে তৎক্ষণাৎ সম্মতি জানাল। তরুণী তখন উঠে বসে একটি আংটি ও যীশুর ছবি বার করে তাকে শপথ করিয়ে আঙুলে আংটি পরিয়ে দিতে বললাে। আংটি পরানাের সঙ্গে সঙ্গে তরুণী আলসান্দ্রোকে জড়িয়ে ধরে তাকে চুম্বন করল। আলসান্দ্রোও সে চুম্বনে সাড়া দিল। উভয়েই নতুন, তাই শিখতে একটু সময় লাগলাে। তারপর গভীর রাত্রি পর্যন্ত পরস্পরের নিবিড় স্পর্শসুখে যাপন করল।

নিদ্রা যাবার আগে তারা স্থির করলাে সমস্ত ব্যাপারটাই উভয়ে গােপন রাখবে। তাই ভাের হওয়ার আগে আলসান্দ্রো ঘুম থেকে উঠে বেরিয়ে এলাে।

তরুণীও তার মঠাধীশের বেশ ধরে ঘর থেকে বেরিয়ে এলাে। কেউ জানতেও পারল না গত রাতে কি ঘটে গেছে। তবে দু’জনেই খুব খুশি। দুজনেই নতুন প্রেরণা পেয়েছে।

আবার যাত্রা শুরু হল এবং কয়েকদিন পরে তারা রােমে পৌছল।

মহামান্য পােপের দর্শনলাভের জন্যে কয়েকদিন অপেক্ষা করতে হল। তারপর যে দিন অনুমতি মিলল সেদিন মঠাধীশ আলসান্দ্রো ও নাইট দু’জনকে সঙ্গে নিয়ে মহামান্য পােপের কাছে গেল। মঠাধীশ’ প্রথমে শ্রদ্ধা জানাল। তারপর সে তার স্বভাবসিদ্ধ সুরেলা কন্ঠে বললােঃ

হােলি ফাদার, আপনাকে বলা বাহুল্য যে, সমস্ত মানুষ পাপ পরিহার করে নির্মল ও পবিত্র জীবন যাপন করতে চায়। আমিও তাই চাই এবং আমি বিবাহ করতে চাই। তাই আপনার আশীবাদ লাভের জন্যে এই বেশে অনেক পরিশ্রম সহ্য করে এসেছি। আপনার কাছে আমি কিছুই লুকবাে না। ইংলণ্ডের রাজা আমার পিতা। তার বেশ কিছু রত্নরাজি নিয়ে আমি পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছি, কারণ আমার পিতা স্কটল্যাণ্ডের বৃদ্ধ রাজার সঙ্গে আমার বিবাহ স্থির করেছিলেন। আপনি বুঝতে পারছেন আমি তরুণী, বৃদ্ধকে আমি কি করে বিবাহ করতে পারি? তবুও পিতার কথা ও মান রাখতে আমি হয়ত বৃদ্ধ পতিকে মেনে নিতুম, কিন্তু আমার ভয়, আমার যে বয়স সে বয়সে বৃদ্ধ পতির সঙ্গে আমি তৃপ্ত না হয়ে বিপথে যেতে পারি। চরিত্র হারাতে পারি। এবং আমার দুর্নাম তাে হবেই, সেই সঙ্গে আমার রাজবংশের সুনাম নষ্ট হবে। তাই আমি আপনার কাছে এসেছি, ঈশ্বর আপনার মুখ দিয়ে কি উপদেশ দেবেন। আমার মন বলছে ঈশ্বরের ইচ্ছা এই যুবককে আমি স্বামীত্বে বরণ করি, তা নইলে তিনি অভাবিতভাবে আলসান্দ্রোর সঙ্গে আমাকে মিলিয়ে দেবেন কেন? আলসান্দ্রো হয়ত রাজবংশের নয় কিন্তু বড় বংশের সন্তান এবং রাজপুত্র না হলেও রাজার সমস্ত গুণাবলী, বৈশিষ্ট্য ও বুদ্ধি ওর আছে। ও উপযুক্ত সম্মান এবং প্রাপ্য মর্যাদা আমাকে দেবে। আমি আলসান্দ্রোকে ছাড়া আর কাউকে পতিত্বে বরণ করতে পারবাে না। এমনকি, আমার পিতা আদেশ দিলেও অন্য কাউকে বিবাহ করবাে না। আপনার অনুমতি পেলেই আমি আমার সংকল্প ঘােষণা করে আলসান্দ্রোকে বিবাহ করে দেশে ফিরে যাব। এবং যে পর্যন্ত না মৃত্যু আমাদের বিচ্ছেদ ঘটায় সে পর্যন্ত আমরা একত্রে বাস করবাে।

এই তরুণী ইংলণ্ডের রাজকন্যা? এবং সেই রাজকন্যা তাকে বিবাহ করতে চায়? আলসান্দ্রো সত্যিই অবাক। ভাগ্য আর কাকে বলে? সে পথের ভিখারি হয়ে গিয়েছিল আর এখন ইংল্যাণ্ডের রাজ-জামাতা হতে চলেছে। এর চেয়ে আশ্চর্য আর কি হতে পারে?

নাইট দু’জন তাে রাজার লােক। রাজকন্যা একজন অজ্ঞাতকুলশীলকে বিবাহ করতে চাইছে জেনে তারা ক্ষেপে গেল, রাগে ফুঁসতে লাগল। মহামান্য পােপের প্রাসাদ না হলে তারা হয়তো এতক্ষণে খাপ থেকে তলােয়ার বার করে তার মুণ্ডচ্ছেদ করতাে। অতিকষ্টে তারা নিজেদের সম্বরণ করলাে। পুরুষবেশে রাজকন্যাকে দেখে পােপ স্বয়ং বিস্মিত হয়েছিলেন কিন্তু মেয়েটির দৃঢ় সংকল্প ও তার সারল্য পােপকে আকৃষ্ট করলাে। তিনি নাইট দু’জনকে শান্ত করে আলসান্দ্রো ও রাজকুমারীকে আশীর্বাদ করে তাদের বিবাহ দিতে সম্মত হলেন।

নির্দিষ্ট দিনে বর ও কনে উপযুক্ত সাজে সজ্জিত হয়ে যখন গির্জায় এলাে তখন নিমন্ত্রিত সকল ব্যক্তি মুগ্ধ। এমন সুন্দর যুগল বড় একটা দেখা যায় না। পােপ স্বয়ং কার্ডিনাল ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। অনুষ্ঠান ও ভােজসভার আয়ােজন তিনিই করিয়েছিলেন।

বিবাহ হয়ে গেল। পতি-পত্নী এবার রােম ত্যাগ করবে, কিন্তু আলসান্দ্রো বললাে সে একবার ফ্লোরেন্স যাবে। লােকমুখে এই সুখবর সেই শহরেও পৌছেছিল। শহরের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা তাদের সাদর সম্ভাষণ জানালাে।।

তিন ভাই অর্থাৎ আলসান্দ্রোর কাকারা তখন জেলখানায়। রাজকুমারী মহাজনদের সমস্ত ঋণ পরিশােধ করে দিয়ে তিন ভাইকে জেলখানা থেকে মুক্ত করে আনলেন। তাদের স্ত্রী ও সন্তানদের এনে সকলকে আবার তাদের পৈতৃক প্রাসাদে প্রতিষ্ঠিত করলেন। আলসান্দ্রোও তার কাকাদের বললাে, আর ভুল কোরাে না, এবার থেকে মিতব্যয়ী হয়ে সসম্মানে সংসার ধর্ম পালন করাে।

ওরা এবার ফ্লোরেন্স চললাে, সঙ্গে আগােলান্তিকে নিল। কয়েকদিন পরে ওরা প্যারিসে এসে উপস্থিত হল। প্যারিসের রাজা ওদের সসম্মানে নিজ প্রাসাদে অভ্যর্থনা জানালেন।

নাইট দু’জন প্যারিসে অপেক্ষা না করে আগেই ইংলণ্ডে চলে গিয়ে রাজাকে সবকিছু বুঝিয়ে বললাে। সব শুনে রাজা প্রীত হয়ে কন্যাকে ক্ষমা করলেন।

তারপর যখন রাজকুমারী তার স্বামী আলসান্দ্রোকে নিয়ে ইংলণ্ডে এলাে রাজা তখন সাড়ম্বরে তাদের স্বাগত জানালেন। জামাতাকে দেখে ও তার ব্যবহারে তিনি পরম প্রীত হলেন। জামাতাকে তিনি আর্ল অফ ওয়াল উপাধি প্রদান করলেন।

আলসান্দ্রো যে প্রখর বুদ্ধি রাখে এবং অত্যন্ত কৌশলী তার কিছু পরিচয় আগে পাওয়া গিয়েছিল যখন সে তার কাকাদের মহাজনী ব্যবসা বাড়াতে পেরেছিল কিন্তু সে যে আবার কূটনীতিক এবং রাজনীতিও বােঝে তা এবার জানা গেল।

আলসান্দ্রো নিজের চেষ্টায় পিতাপুত্রের বিবাদ মিটিয়ে দিল। যুদ্ধ থেমে গেল। দেশে শান্তি ফিরে এলাে, পিতা পুত্রের মিলন হল, দেশের লোেক আলসান্দ্রোকে সাধুবাদ জানাল, তারা ধন্য ধন্য করতে লাগল।

আলসান্দ্রোর চেষ্টায় আগােলান্তি ইংলণ্ডে তার সমস্ত লগ্নী অর্থ আদায় করতে সক্ষম হল এবং সমুদয় অর্থ নিয়ে ফ্লোরেন্সে ফিরে গেল। আলসান্দ্রো তাকেও নাইট উপাধিতে ভূষিত করলাে।

ইংলণ্ডে একটু থিতু হয়ে বসে আলসান্দ্রোও স্কটল্যাণ্ড পুনরুদ্ধার করল। রাজা অত্যন্ত সন্তষ্ট হয়ে তাকে কটল্যান্ডের রাজা করলেন। তার সুশাসনে স্কটল্যাণ্ডের মানুষ সুখে ও শান্তিতে বাস করতে গলাে।

তারপর? তারপর আর কি! আলসান্দ্রো পেয়েছিল মনের মতাে বৌ আর রাজকন্য পেয়েছিল মনের মতাে বর। এতএব তারা সুখেই জীবনটা কাটিয়ে দিল।

 

চতুর্থ গল্প

ল্যাওলফো রুফোলাে-র সর্বনাশ হয়ে গেল। সে কপর্দকশূন্য হয়ে গেল। অবশেষে সে জলদস্যু হয়ে গেল। জেনােয়াবাসী একদল নাকিকের হাতে সে ধরা পড়ল। তার জাহাজ ডুবি হল। ভাসমান একটা কাঠের সিন্দুক আশ্রয় করে সমুদ্রে ভাসতে ভাসতে সে প্রাণরক্ষা করতে পারলাে। সিন্দুকটায় মূল্যবান বহু রত্ন ছিল। শেষ পর্যন্ত রুফোলাে করফু বন্দরে এক মহিলার সহায়তায় আবার ধনী হল।

দরুণ গল্প বলেছে প্যামপিনিয়া। শুধু গল্পটাই নয় তার বলবার ভঙ্গিরও সকলে খুব প্রশংসা করলাে। এমন গল্প না হলে আসর জমে? এবার লরেতার পালা। লরেতা বললাে, আমিও প্যামপিনিয়ার মতাে একটা গল্প বলবাে, না, গল্প বলতে বলতে প্যামপিনিয়ার মতাে আমার গাল লাল হবে না, আমি তাে ওর মতাে সুন্দরী নই তবে গল্পটা তােমরা উপভােগ করবে, এটুকু বিশ্বাস আমি করতে পারি। তােমরা ভাই একটু মন দিয়ে শােন, তাহলে আমি উৎসাহ পাবাে।

ইটালির সমুদ্রের ধারে অনেক সুন্দর সুন্দর বালুবেলা ও সাজানাে শহর আছে কিন্তু রেজজিও আর জায়েতার মধ্যে যে মনছোঁয়া অঞ্চলটি আছে তার বুঝি তুলনা নেই। সালেরনাের কাছে আমালফি নামে যে বালবেলা সেটা সত্যই তুলনারহিত। আর মধ্যে রাভেলাে নামে যে ক্ষুদ্র শহরটি আছে সেটি বুঝি ফুলের বাগান। নানা রঙের বাড়ির মধ্যে কত রঙিন ফুলের মেলা আর তার কূলে আছড়ে পড়ছে নীল। সাগরের ঊর্মিমালা যেন ঝাকে ঝাকে বেলফুল আছড়ে পড়ছে।

এই শহরে ল্যাণ্ডলফো ফোলাে নামে একজন ধনী ব্যবসায়ী বাস করতাে। কিন্তু সে লােভী ছিল। যে ধন ছিল সে ধনে সন্তুষ্ট নয়। আরও চাই। আরও ধনী হবার চেষ্টায় অনেক নতুন ব্যবসায়ে সে তার অর্থ লগ্নী করতে লাগলাে। কিন্তু এমনই তার দুর্ভাগ্য যে সব ব্যবসাই ফেল পড়লো। তার সঞ্চিত অর্থভাণ্ডার প্রায় শূন্য কিন্তু সে উদ্যমী ছিল। নিরুৎসাহ হলে চলবে না। সেই অর্থ আর কিছু সম্পত্তি বেচে সে বেশ বড় একটা জাহাজ কিনল আর নানারকম সামগ্রী কিনে জাহাজ ভর্তি করলাে। অন্য দেশে গিয়ে মােটা লাভে সেইসব সামগ্রী বিক্রি করে আবার সে তার সিন্দুক ভর্তি করবে।

সাইপ্রাস দ্বীপের দিকে রুফোলাে তার জাহাজ ভাসাল। সাইপ্রাসের বড় বন্দরে পৌছে সে হতাশ হল। বন্দরে তখন জাহাজের বেশ ভিড়। সে যেসব সামগ্রী এনেছে ঐসব জাহাজেও সেইসব সামগ্রী আছে, কারও দাম তার চেয়ে কম। শেষ পর্যন্ত তাকে জিনিসগুলাে জলের দামে বেচে দিতে হল। খরচই উঠল না, তার সর্বনাশ হয়ে গেল।

না, বসে পড়লে চলবে না, কিছু একটা করতেই হবে। কাল ছিল কোটিপতি আর আজ ভিখারি? দেশের লােকের বিদ্রুপ সে সহ্য করতে পারবে না। যেভাবে হােক সে তার পূর্ব অবস্থা ফিরিয়ে আনবেই, চুরি, জোচ্চুরি যে করেই হােক। না পারলে সে মরবে, এই তার শেষ চেষ্টা। আবার সে সমুদ্র অভিযানে বেরবে, ধনী না হয়ে সে দেশে ফিরবে না। কিন্তু কি অভিযানে যাবে সে?

সে তার জাহাজখানা বেচে দিয়ে কিছু অর্থ সংগ্রহ করলাে আর বাড়িতে ঝড়তি-পড়তি যেসব মূল্যবান সম্পত্তি ছিল সে সমস্তই বেচে দিয়ে যে পরিমাণ টাকা পেল তা বড় কম নয়। সেই টাকায় সে একটা ছােট, হালকা এবং দ্রুতগামী মজবুত বােম্বেটে-জাহাজ কিনল। মানে সে এবার পাইরেট হবে, সমুদ্রে ডাকাতি করবে। জাহাজ লুটপাট করবে। অস্ত্রশস্ত্র ও লােকলস্কর যােগাড় করে সে জাহাজ ভাসিয়ে দিল। তার লক্ষ্য হল তুর্কিদের জাহাজগুলাে।

দুর্বার গতিতে সে লুটপাট চালাতে লাগল। লুট করা মালে তার জাহাজ ভর্তি হয়ে গেল। এগুলাে। বেচলে প্রচুর টাকা হবে। বেশি লােভ ভালাে নয়, তাতে ভরাডুবির সম্ভাবনা। এবার ঘরে ফেরা যাক। কিন্তু ভরাডুবিই হল।

ইটালি ফেরার পথে সে যখন গ্রীসের দ্বীপপুঞ্জগুলাের কাছে এসেছে, তখন প্রবল ঝড় উঠল, সমুদ্র উত্তাল হল। জাহাজ বাঁচানর জন্যে সে কোনওরকমে একটা খাড়িতে ঢুকল। ঝড় থামলে সমুদ্র শান্ত হলে তখন এখান থেকে বেরােন যাবে।

দু’দিন কাটল। ঝড় কমছে না। রুফোলাে তার জাহাজে বসে আছে। এমন সময় এক কাণ্ড ঘটলাে। জেনােয়ার দুটো জাহাজ কনস্ট্যান্টিনােপল থেকে ফিরছিল। সে দুটো জাহাজও ঝড়ের মুখে পড়েছিল। তারা নিজেদের বাঁচাবার জন্যে ঐ খাড়িতেই জাহাজ ঢুকিয়ে দিল।

জেনােয়ার জাহাজ দুটোর নাবিকরা জাহাজ চিনতে পারল। এই তাে সেই বােম্বেটে জাহাজ। ব্যাটাকে বাগে পাওয়া গেছে। অনেক উৎপাত আর লুটপাট করেছে। 

জাহাজ দুটো বড় ছিল, লােকলস্করও অনেক ছিল। আর সে দুটো এমন জায়গায় দাঁড়িয়েছিল যে তাদের এড়িয়ে পালানাে সম্ভব নয়।

দূরবীন দিয়ে রুফোলাে সবই লক্ষ্য করছে। ওদের মতিগতি ভালাে মনে হচ্ছে না। রুফোলাে সমস্যায় পড়ল।

জেনােয়া জাহাজের কাপ্তেনরা গােপনে কিছু তীরন্দাজ ডাঙায় নামিয়ে দিল যাতে ওপথ দিয়ে রুফোলাে পালাতে না পারে। তারপর তারা তাদের জাহাজ চালিয়ে নিয়ে গিয়ে রুফোলার জাহাজে ধাক্কা মারল। তাতেই তাে জাহাজ ঘায়েল। তারপর এই দুটো জাহাজ থেকে ঐ জাহাজে তলােয়ার হাতে নাকিকেরা লাফিয়ে নেমে পড়ল। প্রায় বিনা বাধায় ওরা জাহাজ দখল করলাে। নাবিকদের বন্দি করে নিজেদের জাহাজে নিয়ে এলাে। মালপত্তরও ভাগাভাগি করে নিল আর রুফোলােকে শুধু একটা হাফ প্যান্ট আর কামিজ পরিয়ে আটকে রাখলাে। তারপর জাহাজখানা ডুবিয়ে দিল। রুফোলাের ভরাডুবি হল।

পরদিন ঝড়ের গতি কমলাে এবং অন্য দিকে প্রবাহিত হতে লাগল। এই সুযােগে ওরা বাড়ি থেকে জাহাজ দু’খানা সমুদ্রে বার করে এনে পাল তুলে দিল। সারা দিনটা ভালােই কাটল কিন্তু সন্ধ্যার মুখে আবার ঝড় উঠলাে। ঝড়ের দাপট ভীষণ, সমুদ্রও উন্মত্ত। দুটো জাহাজ দু’দিকে ভেসে চলল।

দুর্ভাগ্যক্রমে রুফোলাে যে জাহাজখানায় ছিল সেই জাহাজখানা প্রচণ্ড ঝড় আর প্রবল স্রোতের বেগে ছুটে গিয়ে সেফাললামিয়ার কাছে এক ডুবন্ত পাহাড়ে আছড়ে পড়ে ভেঙে টুকরাে টুকরাে হয়ে গেল। যারা ডুবে গেল না তারা ভাসমান কাঠকুটরাে ধরে প্রাণ বাঁচাবার চেষ্টায় কোনাে রকমে জলের ওপর ভেসে রইলাে। কতক্ষণ ভেসে থাকতে পারবে কে জানে? এদিকে রাতের অন্ধকার নেমেছে।

জাহাজ থেকে যারা ছিটকে জলে পড়ল তাদের মধ্যে ছিল হতভাগা রুফোলাে। রুফোলাে এতক্ষণ ভাবছিল কপদশূন্য হয়ে দেশে ফেরা অপেক্ষা মৃত্যুই ভালাে কিন্তু জলে পড়ে সে প্রাণভয়ে ভীত হল। না, তাকে বাঁচতে হবে। তার ভাগ্য আবার তাে ফিরতে পারে!

সমুদ্রের যে ভয়ংকর অবস্থা তাতে সাঁতার চলবে না আর কতক্ষণই বা সাঁতার কাটতে পারবে? সে দেখল কাঠের তক্তা বা মাস্তুলের ভাঙা অংশ অবলম্বন করে কেউ কেউ জলে ভাসছে। সেও ঐরকম একটা অবলম্বন খুঁজতে লাগল।

ভাসমান কাঠের একটা সিন্দুক তার চোখে পড়ল, আর কিছু সে দেখতে পেল না। কি অদ্ভুত ব্যাপার! সিন্দুকটা যেন তাকেই খুঁজছিল। ভাসতে ভাসতে তার কাছেই এলাে। সিন্দুকটা তাকে ধাক্কা দেবে না তাে? তাহলে তাে সে ডুবে যাবে। কিন্তু সিন্দুক তাকে ধাক্কা মারল না। প্রায় তার পাশে এসে ভাসতে লাগল। ডুবন্ত লোেক তাে একাটা খড়কুটোও ধরতে চায়, এ তাে সিন্দুক।

তখন জাহাজে যেসব সিন্দুক নিয়ে যাওয়া হত তাদের ঢাকনাটা অর্ধগােলাকার হত। রুফোলাে- সিন্দুকটার ওপর ঘােড়ার মতাে চেপে বসলাে কিন্তু সে এতই ক্লান্ত ও দুর্বল হয়ে পড়েছিল যে, সে সিন্দুকের ওপর মাথা নামিয়ে সেটা আঁকড়ে ভাসতে লাগল। সিন্দুকেই সে আত্মসমর্পণ করলাে।  সিন্দুক তাকে যেখানে নিয়ে যাবে সেখানেই সে যাবে। আহার জোটবার তাে কোনাে সম্ভাবনা নেই।

কিন্তু তৃষ্ণা? গলা শুকিয়ে কাঠ কিন্তু পান করবার মতাে জল সে কোথায় পাবে? কোথায় ভাসছে, কোন্ দিকে যাচ্ছে, সে কিছুই বুঝতে পারছে না। যা হয় হবে। সে আর ভাবতে পারছে না।

সারারাত্রি সে সিন্দুক অবলম্বন করে জলে কোনােরকমে ভাসতে লাগল। এক সময়ে রাত্রি শেষ হয়ে সকাল হল। কিন্তু এ কি? তার সামনেই যে ডাঙা, সিন্দুকটা সেইদিকেই ভেসে চলেছে। কিন্তু সে ক্ষুধা-তৃষ্ণায় এত কাতর ও ক্লান্ত যে মাথা তুলতে পারছে না। রুফোলাে যে ডাঙা দেখেছিল সেটা হল করফু দ্বীপ। রুফোলাে তখন সিন্দুকটা দুহাতে আঁকড়ে ধরে আছে। দূর থেকে দেখলে বােঝা যাবে না কি বস্তু ভাসছে এবং তার ওপর কি রয়েছে, মানুষ না জন্তু।

ঝড় থেমে গেছে, সমুদ্র শান্ত হয়েছে, মেঘ কেটে যাচ্ছে। বালুবেলায় এক কৃষক রমণী বাসন পরিষ্কার করছিল। জলে ওটা কি ভাসছে? ওটার ওপর কি? সিন্দুকটা ভাসতে ভাসতে কাছে আসতে রমণী বুঝতে পারলাে একটা সিন্দুক ভাসছে, তার ওপর একটা মানুষ! দুটো হাত আর মাথা দেখা যাচ্ছে।

সিন্দুকটা তখন ডাঙা ছুই ছুই করছে। মানুষটাকে উদ্ধার করা এখনই দরকার, নইলে হয়ত ঢেউ আবার ওকে দূরে ঠেলে দেবে। রমণী তখন স্কার্ট গুটিয়ে জলে নেমে সিন্দুকটা ধরল। তার মেয়েও এসেছিল। দু’জনে রুফোলাে সমেত সিন্দুকটা ডাঙায় তুলল। দুজনে ধরাধরি করে রুফোলােকে ঘরে নিয়ে গেল। তারপর সিন্দুকটা ওরই মনে করে সেটাও ঘরের এক কোণে রেখে দিল।

মেয়েকে জল গরম করতে বলে রমণী রুফোলােকে ঠেস দিয়ে বসিয়ে তার মুখটা মুছিয়ে দিয়ে চামচে করে আস্তে আস্তে জল খাওয়াল। রুফোলাে তখনও চোখ চাইতে পারছিল না।

মেয়েটি গরম জল বেশ বড় একটা গামলায় ঢাললাে। রমণী রুফোলাের গা থেকে তার শার্ট প্যান্ট খুলে গরম জল দিয়ে গা মুছে স্নান করিয়ে দিল। স্নানের পর গা মুছিয়ে আবার ঠেস দিয়ে | বসিয়ে প্রথমে একটু সুরা পান করিয়ে দিল। তারপর বেশ খানিকটা মাংসের শুরুয়া খাইয়ে দিল।

এতক্ষণ পরে রুফোলাে চোখ মেলে চাইল, কিছু সুস্থ বােধ করলাে কিন্তু তখনও স্বাভাবিক হয়নি। কারণ সে যে এক রমণী ও যুবতীর সামনে উলঙ্গ হয়ে বসে আছে এটুকুও সে উপলব্ধি করতে পারছিল না।

যাই হােক তাকে শিশুর মতাে পরিচর্যা করতে লাগল। তার গা হাত পা মাসাজ করে জামাপ্যান্ট পরিয়ে তাকে শুইয়ে দিল। দয়াবতী রমণীর সেবায় রুফোলাে কয়েক দিনের মধ্যে সুস্থ হয়ে উঠল। এবার সে এখান থেকে যেতে পারবে। কিন্তু কোথায় যাবে কি করেই বা যাবে। সঙ্গে তাে একটাও ফ্লোরিন নেই। বসে বসে ভাবছে কি করা যায়।

এমন সময় সেই রমণী বলল, তােমার সিন্দুকটা নিয়ে যেও। 

সিন্দুক? তার মনে পড়লাে না। তখন রমণী মনে করিয়ে দিল। ঐ তাে সেই সিন্দুকটা। তুমি তাে ওটার ওপর উঠে ভাসতে ভাসতে এসেছে। তােমাদের বুঝি জাহাজডুবি হয়েছে? উঃ কি ভীষণ ঝাড়ই না হয়ে গেল।

সিন্দুকের কথা এবার রুফোলাের মনে পড়ল কিন্তু ঐ পুরনাে সিন্দুক বেচে আর কটা  ফ্লোরিনই বা পাওয়া যাবে।

তবুও রমণী তার মেয়েকে নিয়ে যখন কাজে বেরিয়ে গেল তখন সে ভাবল দেখা যাক সিন্দুকটায় কিছু আছে কিনা। হাত দিয়ে ঠেলতেই বুঝল সিন্দুকটা হালকা, নিশ্চয়ই কিছু নেই। তবুও অনেক চেষ্টা করলাে।

ঢাকা খুলে দেখল ভেতরে একটা কাঠের বাক্স রয়েছে। বাক্সটা প্রায় ভেঙে গেছে। সেটা সহজেই খােলা গেল। খুলতেই তার চোখ ঝলসে উঠল। ভেতরে রয়েছে কয়েক টুকরাে হীরে, অনেক মুক্তো, রত্নখচিত অনেকগুলাে আংটি। আরে, এর যে ঢের দাম। বিক্রি করলে সে আবার রীতিমত অর্থশালী।

এবার সে চালাক হয়েছে। দু দু’বার ঠকেছে, কাউকে কিছু বলা হবে না। মানুষ টের পেলে সে আক্রান্ত হবে, ও সব যাবে।

আপাতত রত্নগুলি লুকিয়ে রাখল। রমণী ফিরে আসতে সে একটা থলে চেয়ে নিল। নিজের পুরনাে জামা-প্যান্ট ও রমণী যা দিয়েছিল সেগুলি এবং রত্নগুলিও পুটলি বেঁধে সেই থলের মধ্যে ভরে নিল।

রমণীকে বলল, সিন্দুকটা আমার নয়। ওটা অবলম্বন করে আমি সমুদ্রে আমার প্রাণ বাঁচিয়েছি। ওটা ভােমার কাছেই থাক। এখনও মজবুত আছে। তােমার কাজে লাগবে। আর তােমাকে কি বলবাে, তুমি আমার মা। ডাঙায় ভেসে এলেও তুমি আমার যত্ন না করলে আমি নিশ্চয়ই মরতুম। ঐ সিন্দুক নয়, তুমিই আমার প্রাণ বাঁচিয়েছ। চিরজীবন তােমাকে আমি মনে রাখবাে, তােমার দয়া আমি কখনও ভুলব না।

রমণীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে থলেটা কাঁধে ঝুলিয়ে সে দরিদ্র বেশে কোনােরকমে একটা জাহাজে চেপে ইটালির ব্রিন্দিসি বন্দরে এলাে। সেখানে কয়েকজন বস্ত্র ব্যবসায়ীর সঙ্গে তার দেখা হল। এরা তার পরিচিত। তাদের সে জাহাজডুবির কথা বললাে কিন্তু সিন্দুকের নামই উচ্চারণ করলাে না। বলল, এক খণ্ড কাঠ অবলম্বন করে কোনােরকমে প্রাণ বাঁচিয়েছি।

বস্ত্র ব্যবসায়ীরা তখন তাকে নতুন পােশাক কিনে দিল, একটা ঘােড়াও দিল এবং রাহাখরচ বাবদ কিছু অর্থও দিল। রুফোলাে বললাে র্যাভলােতে ফিরে এসব সে পরিশােধ করে দেবে।

রুফোলাে একদিন ঘরে ফিরল। দু’একদিন পরে সে পুটলিটি খুলে রত্নগুলি বার করে ভালাে করে দেখল। রত্ন সে চেনে। এগুলি উৎকৃষ্ট শ্রেণীর। বাজারদর অপেক্ষা কিছু কম দামে সেগুলি বিক্রি করে সে যে অর্থ পেল তার পরিমাণ প্রচুর। দু’বার যে পরিমাণ অর্থ হারিয়েছিল এখন সে পেল তার দ্বিগুণ।

করফুর সেই দয়াবতী রমণীকে ভােলে নি। তার কন্যার বিবাহের যৌতুক বলে বেশ কিছু অর্থ সে পাঠিয়ে দিল আর বস্ত্র ব্যবসায়ীদের ঋণও সে পরিশােধ করে দিল। আর ব্যবসা নয়, লোভ তাে নয়ই, যা পেয়েছে যথেষ্ট পেয়েছে, এবার সে পায়ের ওপর পা তুলে আরামে জীবনটা কাটিয়ে দেবে।

 

পঞ্চম গল্প

পেরুজিয়া থেকে অ্যানড্রিউচিও নেপলসে এলাে ঘােড়া কিনতে। এক রাত্রে তার পর পর তিনটে বিপদ ঘটল, তিনটে বিপদ থেকেই সে উদ্ধার পেল, লাভ হল বেশ বড় একটি রুবি।

এবার গল্প বলার পালা মিয়ামমেত্তার। সে বললাে রুফোলাের অনেকগুলাে রত্ন লাভের কাহিনী শুনে তারও অনুরূপ একটা গল্প মনে পড়ছে। শুনেই বুঝবে গল্পটা বেশ মজার, লরেতার গল্পের মতােই এ গল্প তােমাদের মনে ধরবে।

পেরুজিয়াতে এক যুবক বাস করত। সে ঘােড়ার ব্যবসা করত। নেপলসে ঘােড়ার বড় হাট বসে। শুনে সে পাঁচশ সােনার ফ্লোরিন মুদ্রা একটা ব্যাগে ভরে আরও দু’-একজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে নেপলসে এলাে। বলতে গেলে সে এই প্রথম পেরুজিয়ার বাইরে এলাে, অতএব বাইরের জগৎ সম্বন্ধে তার ধ্যানধারণা কিছু কম। এক রবিবার সন্ধ্যায় ওরা নেপলসে এসে পৌছে একটি সরাইখানায় আশ্রয় নিল।

পরদিন সকালে অ্যানড্রিউচিও সরাইওয়ালার কাছ থেকে ঘােড়াহাটে যাবার রাস্তা কোদিকে, কোনদিকে যেতে হবে জেনে নিয়ে সরাইখানা থেকে বেরিয়ে পড়লাে। পথে লােকদের জিজ্ঞাসা করতে করতে সে ঘােড়াহাটে হাজির হল। অনেক রকম ঘােড়া জমায়েত করা হয়েছে। কয়েকটা ঘােড়া তার বেশ পছন্দ হল, দর কষাকষি করলাে ওটা কিন্তু একটাও কিনল না।

ভালাে দাম দিয়ে সে যে ভালাে ঘােড়া কিনতে পারে এটা জানাবার জন্যে সে সােনার ফ্লোরিন ভর্তি মােটা ব্যাগটা মাঝে মাঝে বার করে ঘােড়ার মালিকদের দেখাচ্ছিল। শহরে সে নতুন এসেছে। স্বর্ণমুদ্রা ভর্তি ব্যাগ যে অমনভাবে যখন তখন বার করে দেখাতে নেই সে বুদ্ধি তার নেই।

সে যখন তার ব্যাগ বার করে এক ঘােড়া মালিককে দেখাচ্ছিল ঠিক তখনি সিসিলিয়াবাসী এক চটুল সুন্দরী যুবতী সেখান দিয়ে যাচ্ছিল। ব্যাগ দেখে তার চোখ চকচক করে উঠল। মেয়েটি শুধুই সুন্দরী ও চটুল নয়, সে ছিল স্বৈরিণী এবং চতুর। অর্থের বিনিময়ে সে যে কোনও কাজ করতে পারতাে, কারণ সে অর্থলােভী ছিল। তখনি সে মনে মনে ঠিক করল যেভাবে হােক স্বর্ণমুদ্রা ভর্তি ঐ ব্যাগ তাকে দখল করতে হবে।

যুবতীর নাম ম্যাডােনা ফিয়ােরডালিমাে। যুবতী কিন্তু সেখানে দাঁড়াল না। তার সঙ্গে একজন বয়স্ক মহিলা ছিল। এই মহিলা ও সিসিলি দ্বীপবাসী। অনেক দিন পরে দেখলেও তার স্বদেশবাসী অ্যানড্রিউচিওকে সে চিনতে পেরে যুবতীকে বললাে, তুমি এগিয়ে যাও, আমি ওই ছােকরার সঙ্গে একুট কথা বলে যাচ্ছি।

মহিলা অ্যানড্রিউচিওকে সাদরে জড়িয়ে ধরলাে। অ্যানড্রিউ মহিলাকে চিনতে পারল। দু’জনে কুশল বিনিময় হল, অন্য কিছু কথাবার্তাও হল। ম্যাডােনা কিন্তু চলে যায়নি, সে একটু দূরে আড়ালে দাঁড়িয়ে এদের লক্ষ্য করছিল। চেনাশােনা ভালােই আছে মনে হয়। দেখা যাক কি করা যায়। ব্যাগটা হাতাতেইর হবে।

যুবতী ও সেই মহিলা আবার যখন মিলিত হল তখন যুবতী ঐ যুবক সম্বন্ধে নানা প্রশ্ন করবার আগে ঠাট্টা করে বললাে, তােমার স্বভাব গেল না, জানা নেই চেনা নেই একটা চকচকে ছোঁড়াকে দেখতে পেয়েই তাকে জড়িয়ে ধরলে, তার গালে চুমু খেলে, তুমি কি গাে?

সে কি? ওকে তাে আমি ওর ন্যাংটোবেলা থেকে জানি, ওদের হাঁড়ির খবর আমি জানি। হাঁড়ির খবর জান? বললেই হল? আচ্ছা বল তাে কি জান?

মহিলা গড় গড় করে আনড্রিউচিওর বাবা মা ভাই বােন থেকে নাম করে সাতগুষ্টির পরিচয় দিল। তবুও যুবতী আরও কয়েকটা প্রশ্ন করল। অ্যানড্রিউচিও সম্বন্ধে ম্যাডােনা যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করলাে। মহিলার কাছ থেকে ম্যাডােনা এটুকুও জেনে নিল অ্যানড্রিউচিও নেপলসে কেন এসেছে আর কোনাে সরাইখানায় উঠেছে।

সব কিছু জেনে নিয়ে মহিলা মনে মনে মতলব আঁটল ছােকরাকে কি করে ফাদে ফেলে মােহর ভর্তি ব্যাগটি হস্তগত করা যায়।

ম্যাডােনা বাড়ি ফিরে তার দাসীকে শিখিয়ে পড়িয়ে আনড্রিউচিওর সরাইখানায় পাঠাল। দাসীটিকে দেখতে বেশ ভালাে আর ম্যাডােনার খুব বিশ্বাসী। ম্যাডােনার বিষয়ে দাসী সবই জানে।

দাসী সরাইখানায় গিয়ে অ্যানড্রিউচিওর সঙ্গে দেখা করে বললাে, আপনিই অ্যানড্রিউচিও? বাঃ আপনাকে তাে বেশ সুন্দর দেখতে। তাই আমাকে আমার কী আপনার কাছে পাঠালেন। আপনার সঙ্গে তার কিছু কথা আছে। আপনি আমার সঙ্গে এখনই যদি যান তাে ভালাে হয়। 

চেহারার প্রশংসা শুনেই তাে অ্যানড্রিউ মনে মনে ভারি খুশি, এক ফাকে সে আয়নায় তার চেহারাটা একবার দেখে নিল। মনে মনে ভাবল যার দাসীকে দেখতে ভালাে তার কত্ৰী নিশ্চয় সুন্দরী। আমাকে আজ কোথাও দেখে নিশ্চয়ই আমার প্রেমে পড়ে গেছে।

দাসীকে জিজ্ঞাসা করল, তােমরা আমার ঠিকানা জানলে কি করে?

এটা কি বলছেন মহাশয়? আপনি একজন নামী লােক, পেরুজিয়া থেকে এসেছেন একপাল ঘােড়া কিনতে আর আপনি কোনাে সরাইখানায় উঠেছেন এ খবরটা আমরা কেন নেপলসের অনেকেই জানে। চলুন, আর দেরি করবেন না, আমার কী আপনার জন্যে অধীর হয়ে অপেক্ষা করছেন।

তাহলে একটু অপেক্ষা করাে, আমি চট করে পােশাকটা পালটে নিই।

অ্যানড্রিউচিও ঘরে ঢুকে তার সবচেয়ে ভালাে পােশাকটি পরল, চুলটা ভালাে করে আঁচড়ে নিল, গায়ে একটু আতর লাগিয়ে নিল। ব্যাগটা সঙ্গে নিতে কিন্তু ভুলল না। তারপর সরাই থেকে বেরিয়ে পড়ল। বেরােবার আগে সরাইখানায় তার সঙ্গীদের কিছু বলে এলাে না। | এক সুন্দরী তাকে ডেকে পাঠিয়েছে, তাকে দেখবার জন্যে। সে তখন ভীষণ ব্যস্ত, কাউকে কিছু বলার সময় কোথায়? আর তখন সে ইচ্ছেই বা কোথায়?

ম্যাডােনা থাকতাে নেপলসের ফ্রেশপট পাড়ায়। এ পাড়ার সুনাম নেই। পাড়ার মেয়েদের চেহারা দেখলেই বােঝা যায় এরা অধিকাংশই রূপােপজীবিনী। শহরের বারবণিতাদের সে দেখেনি তাই বােধহয় অ্যানড্রিউ তাদের ঠিক চিনতে পারলাে না। কোনাে পাড়ায় ঢুকলাে তাও বুঝতে পারলাে না। সুন্দরী মেয়েদের দেখে সে ধরে নিয়েছিল এটা নিশ্চয় অভিজাত পাড়া। একবার হাত দিয়ে দেখে নিল তার ব্যাগটা ঠিক আছে।

অ্যাড্রিউচিওকে দাসী ম্যাডোনার বাড়িতে নিয়ে এসে সাজানাে গােছানাে একটা ঘরে দাঁড় করিয়ে হাক দিল, তিনি এসেছেন।

ম্যাডােনা সিড়ি দিয়ে নেমে এলো। ঘর যেন আলাে হয়ে গেল, সুন্দর একটা সৌরভে ঘর ভরে গেল। ম্যাডোনা ঘরে ঢুকেই অ্যানড্রিউচিওকে জড়িয়ে ধরে তার দুই গালে চুমাে খেয়ে বললাে, উঃ কতদিন পরে তােকে দেখলুম, তােকে দেখতে ঠিক আমাদের বাবার মতো হয়েছে, তাই তাে তােকে চিনতে পেরেছি।

অ্যানড্রিউচিও সুন্দরীর শুধু উষ্ণ পরশই নয়, নিজের বুকে সুন্দরীর বুকের কোমলতা অনুভব করছিল। সে তখন কোন স্বর্গে চলে গিয়েছিল, কিন্তু সুন্দরী এ কি বলছে ? আমাদের বাবা! সুন্দরী কে তাহলে?

তুই আমাকে নিশ্চয় চিনতে পারিস নি? কি করেই বা পারবি বল, আমাকে তাের মনে থাকার কথা নয়। তুই বােধহয় আমার নামও শুনিস নি?

অ্যানড্রিউচিও ম্যাডােনাকে জড়িয়ে ধরেছিল কিন্তু তার কথাবার্তা শুনে তার আলিঙ্গন শিথিল হয়ে গেল, সুন্দরীর গালে চুমাে খেতে গিয়েও যেতে পারল না। সে একটু হতভম্ব হয়ে গেল।

আয় আমরা ওপরে গিয়ে বসি, বলে ম্যাডানা তার হাত ধরে ওপরে একটা ঘরে নিয়ে গিয়ে নাম সােফায় বসিয়ে তার গা ঘেঁষে বসে তার চুলে, গালে গায়ে হাত বােলাতে লাগল।

ঘরে দামী আসবাব, কারপেট ও পর্দা দেখে অ্যানড্রিউচিওর মনে হল এই যুবতী আর যেই হােক নিশ্চয় কোনাে অভিজাত পরিবারভুক্ত। গায়ে হাত বােলাতে বােলাতে যুবতীর চোখে জল এসে গেল। তার মুখের ভাব এমন যেন কতদিন পরে হারানিধিকে খুঁজে পেয়েছে।

একটু বােস, তােকে আগে একটু সরবত খাওয়াই তারপর সব বলছি।

সরবত খাওয়া শেষ হল, অতি স্বাদু সরবত। কিসের তৈরি কে জানে! কিন্তু এমন সুন্দর ও সুমিষ্ট সরবত সে কখনও খায়নি।

সরত যাওয়া শেষ হতে তার হাত থেকে গেলাস নিয়ে অন্যত্র রেখে দিয়ে, ম্যাডােনা অ্যানড্রিউচিওর বুকে তার বুক টিপে আর একবার আলিঙ্গন করে গালে চকচক করে কয়েকটা চুমু খেল। অ্যানড্রিউচিও অভিভূত।

ম্যাডােনা এবার তার পাশে বসে বললাে, অ্যানড্রিউচিও, তুই অবাক হচ্ছিস? নয় রে? আমি কেন তােকে জড়িয়ে ধরছি, চুমাে খাচ্ছি, চোখে জল এসে যাচ্ছে! ভাবছিস এসব আবার কি? তুই তাে আমার নামও শুনিস নি? কি করেই বা শুনবি? তাহলে বলি শােন, আমি তোের বােন। সম্পর্কের বােন নয়, তাের নিজের বােন, আমাদের বাবা এক।

সে কি বলছাে তুমি? আমার যে নিজের কোনও বােন নেপলসে থাকে এমন তাে শুনি নি।

সেই কথাই তাে তােকে বলতে যাচ্ছি। তুই আরও অবাক হবি সব কথা শুনলে। আমাদের বাবার নাম যে পিয়েতাে তা নিশ্চয়ই তােকে বলতে হবে না। তুই বােধহয় জানিসও না যে, ব্যবসা সূত্রে বাবা অনেক দিন পালেরমাে শহরে ছিল। বাবা তখন যুবক। বাবার ভদ্র ব্যবহারের জন্যে শহরে সবাই বাবাকে ভালােবাসত, সম্মান করত। কিন্তু বাবাকে সবচেয়ে ভালবাসত আমার মা। মা তখন বিধবা। মাও সুন্দরী ছিল। বাবার সঙ্গে মায়ের গভীর প্রেম হয় যার ফলে আমার জন্ম হল। আমিই তােমার সেই বােন, আমাদের মা আলাদা কিন্তু বাবা তাে এক। তাই তােমার জন্যে আমার নাড়ীর টান।

এরপর বাবা আর মাত্র চার পাঁচ বছর পালেরমােতে ছিল তারপর ব্যবসার জন্যেই সেই যে তিনি পেরুজিয়া চলে গেলেন আর ফিরে এলেন না। বাবা যে আমার মা ও এক শিশুকন্যাকে ফেলে চলে গেলেন এজন্যে আমার মা কোনও অনুযােগ করে নি। মা তার ভাগ্য জেনে নিয়েছিল। মা আমাকে বড় করলেন, লেখাপড়া শেখালেন। মায়ের অবস্থা ভালােই ছিল, টাকাপয়সা ছিল। ভালাে ঘরেই বিয়ে দিয়েছেন।

আর একটু সরবত খাবে? কিংবা একটু ভালাে ওয়াইন, তুমি খেলে আমিও একটু খাব। তা চলতে পারে।

ম্যাডােনা দু-গ্লাস ওয়াইন নিয়ে এলাে। ম্যাডােনা আবার কথা আরম্ভ করলাে। বললাে সিসিলিতে তখন যুদ্ধ বেধে উঠেছে। আমার স্বামী নেপলসের রাজা চার্লসের পক্ষে, সেজন্যে সিসিলিতে আমাদের থাকা সম্ভব হল না; অথচ সেই সময়ে আমি পেরুজিয়াতে দারুণ জনপ্রিয় হয়ে উঠছি। আমরা নেপলসে – চলে এলুম এবং সেই থেকে এখানেই আছি। এখানে আসার পর রাজা চার্লস আমাদের এখানে জমি বাড়ি দিয়ে ও আমার স্বামীকে ভালাে চাকরি দিয়ে সুপ্রতিষ্ঠিত করলেন। আমরা সুখেই আছি।

তােমার স্বামী কোথায় ?

সে কয়েকদিনের জন্যে বাইরে গেছে। তােমাকে দেখলে খুব খুশি হত। আমার ভাইটি রে, বলে ম্যাডােনা আর এক দফা ওর গালে সশব্দে চুমাে খেল।

এমন অন্তরঙ্গভাবে ও সুকৌশলে একবারও আমতা আমতা না করে ম্যাডােনা কাহিনীটা বলে গেল যে, অ্যানড্রিউচিও তা অবিশ্বাস বা কোথাও সন্দেহ করবার সুযােগই পেল না। সে বললাে, আশ্চর্য ব্যাপারে যে, বাবা বা মায়ের মুখে আমি কখনও তােমার নাম তাে শুনিই নি এমন কি তােমার বিষয়েও কিছুই শুনি নি। যাই হােক এই শহরে এসে আমার বােনকে পেয়ে আমার খুব ভালােই লাগছে কারণ এখানে তাে কাউকেই আমি চিনি না কিন্তু তুমি কি করে জানলে যে আমি নেপলসে এসেছি এবং আমিই তােমার ভাই!

তাহলে শােনও, আজ সকালে ঘােড়াহাটে তােমাকে দেখে আমার খটকা লাগল। বাবার চেহারার সঙ্গে এত সাদৃশ্য? তারপর তােমার মনে আছে নিশ্চয়ই যে, একজন মহিলা তােমাকে জড়িয়ে ধরে তােমার সঙ্গে কথা বলেছিল?

হ্যা, মনে পড়ছে, ওকে আমি অল্পস্বল্প চিনতুম, ও পেরুজিয়াতে থাকত।

ঐ মহিলাকে তাে আমি চিনি। ওকে আমি পরে জিজ্ঞাসা করে তােমার পরিচয় জানতে পারলুম এবং নিশ্চিন্ত হলুম যে তুমি আমার ভাই। তুমি কোনাে সরাইখানায় উঠেছ তাও ওর কাছ থেকেই জানতে পারলুম। চলাে বাগানে যাই, ঘরে গরম লাগছে।

বাগানে বেড়াতে বেড়াতে ম্যাডােনা তার ভাই’-এর বাড়ির কথা, নাম করে আত্মীয়স্বজনের খবরাখবরও জিজ্ঞাসা করলাে। বাগানে কিছুক্ষণ বেড়িয়ে ওরা আবার ঘরে ফিরে এলাে। অ্যানড্রিউচিও বললাে, তাহলে আমি যাই, আমার সঙ্গীরা আমার জন্যে সরাইখানায় অপেক্ষা করছে, একসঙ্গে যাওয়াদাওয়া করবাে তাে।

সে কি? আমি তােমাকে না খাইয়ে ছাড়ব নাকি? তাছাড়া বাইরে এখন কড়া রােদ, এই রােদে আমি তােমাকে ছেড়ে দেব নাকি? খাওয়াদাওয়া করে দুপুরে একটু ঘুমােবে। তােমাকে আমি আজ ছাড়ছি না, রাত্রেও এখানে থাকবে। তােমাকে এই প্রথম দেখলুম, আবার কবে দেখা হবে কে জানে?

সন্ধ্যাবেলায় অ্যানড্রিউচিও আর একবার বলল, ম্যাডােনা আজ ছেড়ে দাও, আমি সরাইখানায় ফিরে যাই, আবার সঙ্গীদেরকে কিছু বলে আসি নি, তারা ভাববে।

ম্যাডােনা চোখে জল এনে বলল, এই বুঝি বােনের প্রতি তােমার ভালবাসা? আমাকে কেউ ভালবাসে না।

আরে তুমি কাঁদছ কেন? আমি না হয় কাল সকালে আবার আসব।

না, তা হবে না। তুমি আজ আমার কাছে থাকবে, তােমার জন্যে বিশেষ রান্না হচ্ছে উৎকৃষ্ট গ্রীক সুরা আনিয়েছি। আমি বরঞ্চ আমার দাসীকে তােমার সরাইখানায় পাঠাচ্ছি সে খবর দিয়ে আসবে। তােমার ভগিনীপতি বাড়ি নেই, আমি একা, তুমি আজ থাক, কাল সরাইখানায় গিয়ে সঙ্গীদের বলে আবার বাড়িতে চলে আসবে, যে কদিন নেপলসে থাকবে আমার বাড়িতেই থাকবে।

অ্যানড্রিউচিও ভাবল, মন্দ কি? এখানে বেশ আরামেই থাকা যাবে। নিজের মায়ের পেটের বােন না হলেও কম কি, খুব যত্নআত্তি করছে। এমন আদর করে কেউ তাকে জড়িয়ে ধরে নি, কেউ তার গালে এমন মিষ্টি করে চুমােও খায় নি।

অ্যানড্রিউচিও বললাে, বেশ তাই হবে, তুমি কিন্তু বােন সরাইখানায় খবরটা পাঠিয়ে দাও।

এখনই খবর পাঠাচ্ছি, এই তাে ভাইয়ের মতাে কথা। বলে ম্যাডােনা তাকে আবার জড়িয়ে ধরে এবার গালে নয় ঠোটে চুমাে খেল আর সেই ফাকে দেখে নিল ওর কোমরে সেই ব্যাগটা তখনও গোঁজা রয়েছে।

অ্যানড্রিউচিওর ঠোটে কোনাে যুবতী কখনও চুম্বন করে নি, সে কি রকম হয়ে গিয়েছিল। তাই ম্যাডােনা যে তার কোমরে হাত বুলিয়ে কি দেখছে তা সে বুঝতেই পারে নি। উল্টে সে ম্যাডােনার গালে ছােট করে একটা চুমাে খেল।

লক্ষ্মী সােনা ভাই আমার, আমার বুকে হাত দিয়ে দেখ, তুমি আমার বুকে এসে গেছ। বলে অ্যানড্রিউচিও-র দুই হাত নিয়ে ওর দুই বুকে চেপে ধরল। অ্যানড্রিউচিও অভিভূত। বােন ভাইকে এত ভালােবাসতে পারে? তার তাে অনেক বন্ধু আছে, তাদের তাে বােনও আছে কিন্তু তাদের মধ্যে এত ভালােবাসা দেখেও নি, শােনেও নি।

রাত্রের খাওয়া বেশ ভালােই হল। ম্যাডােনা কয়েক পদ বেশ ভালো রান্না করিয়েছিল। সেই সঙ্গে গ্রীক সুরাও বেশ জমেছিল। খাওয়াদাওয়া সেরে ওরা পাশাপাশি বসে কিছুক্ষণ গল্প করলাে।

হাই তুলে এক সময়ে ম্যাডােনা বললাে, ঘুম পাচ্ছে। তুমি আমার ঘরে আমার বিছানাতেই ঘুমােও, একজন ছােকরা ভৃত্য তােমার ঘরে থাকবে। তােমার যদি কিছু দরকার হয় ওকে বােলাে, ও ব্যবস্থা করে দেবে। আমি পাশের ঘরেই থাকবাে, এসাে, একটা চুমাে খাই। গালে একটা চুমাে খেয়ে গুড নাইট বলে ম্যাডােনা চলে গেল। মুখে তার হাসি।

রাত্রিটা বেশ গরম। অ্যানড্রিউচিও তার মােটা জামাপ্যান্ট কোট ছেড়ে একটা ইজের ও ছােট শট পরল। সােনার ফ্লোরিন ভর্তি ব্যাগটা বালিশের নিচে রাখল। শােবার আগে সে বালক ভৃত্যকে জিজ্ঞাসা করলাে, এই ঘরের বাথরুম কোনাে দিকে?

একটা দরজা খুলে বালক ভৃত্য একটা সরু গলিপথ দেখিয়ে দিয়ে বললাে, সােজা চলে গেলেই বাথরুম পাবেন। বাথরুমের দরজাটা ঠেলবেন, খুলে যাবে।

অ্যানড্রিউচিৎ গলি দিয়ে সােজা গিয়ে বাথরুমের দরজা খুলে ভিতরে গেল। ভেতরে ঢুকে ও একটা চওড়া তক্তার ওপর পা দিতেই সেটা কি ভাবে উলটে গেল আর ও একদম নিচে মলমূত্রের ওপর পড়ে গেল। যাতে ও পড়ে যায় সেজন্যে কৌশলটা বােধহয় ম্যাডােনাই করে রেখেছিল। সেই নােংরা জায়গা থেকে অ্যানড্রিউচিও যখন উঠে দাঁড়াল তখন তার সারা দেহ, মাথা থেকে পা পর্যন্ত নােংরা হয়ে গেছে। দুর্গন্ধে বমি হবার উপক্রম।

সে বালকের নাম ধরে ডাকাডাকি আরম্ভ করলাে কিন্তু বালক কি করবে? তার তাে বাড়ি থেকে বেরােবার উপায় নেই। ম্যাডােনার ঘরে গিয়ে দরজার বাইরে থেকে কত্রীকে ডাকল। জাল বােন কোনাে উত্তর না দিয়ে তার শােবার ঘরে ফিরে এসে দেখল তার প্রিয় ভাই’-এর পােশাক খাটের একপাশে রাখা রয়েছে। সেগুলাে হাতড়ে কিছু পাওয়া গেল না কিন্তু মাথার বালিশটা তুলতেই সে ব্যাগটা পেয়ে গেল যেজন্যে সে এই ফাঁদ পেতেছিল। তার কৌশল ফলবতী হল।

ছেলেটাকে সতর্ক করে দিল, চুপ করে শুয়ে থাক। ও যত পারে ডাকুক, টু শব্দটি করবি না তাহলে চাবুক মেরে পিঠের চামড়া খুলে নেব।

ব্যাগটা নিয়ে সে তার ঘরে ফিরে এলাে। সে তাে এই মুহূর্তটির জন্য অপেক্ষা করছিল। ব্যাগটাতে ঠোট ছুঁইয়ে বললাে, তাের মালিককে বাজে অনেকগুলাে চুমাে খেয়েছি, তােকে একটা খাটি চুমাে খাই। ব্যাগটাকে চুমাে খেয়ে বুকে টিপে ধরল তারপর সেটা সিন্দুকে তুলে রেখে শুয়ে পড়ল। অ্যানড্রিউচিওকে সে ভূলে গেল।

বালকের নাম ধরে অ্যানড্রিউচিও অনেকবার বেশ জোরে ডেকেও যখন সাড়া পেল না তখন তার সন্দেহ হল। ওরা আমার ফ্লোরিনের ব্যাগ চুরি করবার মতলবে আমাকে ময়লার পাকে ফেলে দিল? তা নইলে আমার বিপদ শুনে কেউ না কেউ তাে সাড়া দেবে। হায় হায়, আমার সব গেল। এমনকি আমার জামাকাপড়ও।

সে রাস্তা দিয়ে ঘুরে ম্যাডােনার বাড়ির সামনে এসে দরজায় ধাক্কা দিতে দিতে চেঁচাতে লাগল। সাড়া না পেয়ে গালাগাল দিতে লাগল। পাড়ার লােকেরা ঘুম থেকে জেগে উঠে জানালা খুলে তাকে পাল্টা গাল দিতে লাগল।

ম্যাডােনার বাড়ির ওপরের ঘরের একটা জানালা খুলে সেই দাসী ঝাঝিয়ে উঠলাে, এই কে হে, তুমি অসভ্য বেয়াড়া লােক, ভদ্রপাড়ায় বাড়িতে দরজায় ধাক্কা দিচ্ছ, চেঁচামেচি করছে, যাও ভাগাে।

অ্যানড্রিউচিও দাসীকে দেখে যেন আশার আলাে দেখতে পেল। সে বলল, সে কি? তুমি আমাকে চিনতে পারছাে না? আমি অ্যানড্রিউচিও, ম্যাডােনা ফিয়ােরডালিমাে আমার বােন।

কি বাজে বকছাে? খুব মদ গিলেছ বুঝি, আমার মাদামের কোনও ভাই নেই, মাতলামি কোরাে না, যাও দূর হও—বলে সশব্দে জানালা বন্ধ করে দিল।

তবুও সে খানিকক্ষণ চেঁচামেচি করলাে, অনুনয় বিনয়ও করলাে কিন্তু কে সাড়া দেবে? তখন সে যেন ক্ষেপে গেল। রাস্তা থেকে একটা পাথর তুলে এনে দরজায় দমাদ্দম করে ঘা দিতে লাগল। প্রতিবেশীরা জেগে উঠে জানালা খুলে তাকে বকতে শুরু করলাে, বললাে, আমাদের ঘুমােতে দেবে না নাকি? মহিলার সঙ্গে তােমার যদি কোনও দরকার থাকে কাল সকালে এসাে।

অ্যানড্রিউচিও তখন পাগল হবার উপক্রম। তবুও চুপ করে না। অন্ধকারে সে ভালাে দেখতে পায়নি। ম্যাডােনারই বাড়ির কোনও একটা দরজা খুলে ম্যাডােনার এক পােষা গুণ্ডা বেরিয়ে এলাে। সে বললাে, মাতলামি করবার জায়গা পাস নি শালা? বেরাে এখান থেকে। ব্যাটা বলে কিনা মাদামের ভাই, যা এখনি চলে যা, নইলে এমন লাথি ঝাড়ব যে বাপের নাম ভুলে যাবি। যা।

এই কয়েকটা কথা লােকটা এমন স্বরে বললাে যে অ্যানড্রিউচিও ভয় পেয়ে গেল। লােকটার বিরাট চেহারা। সত্যিই যদি মারে! উলটো দিকের বাড়ি থেকেও একজন বললাে, ওহে কেটে পড়, ঐ লােকটা সাংঘাতিক। যদি প্রাণ বাঁচাতে চাও তাে এই তল্লাট ছেড়ে চলে যাও।

অ্যানড্রিউচিও এবার আর দেরি করলাে না। সেখান থেকে চলতে আরম্ভ করলাে। কিন্তু কোথায় যাবে? কোনদিকে যাবে? পথ চেনে না, অন্ধকার।

কিছুক্ষণ চলার পর সে অনুভব করলাে তার গা থেকে দুর্গন্ধ বেরােচ্ছে। সারা গা নােংরায় ভর্তি। কি করা যায়! সমুদ্রের দিকে যাওয়া যাক। সমুদ্রের জলে স্নান করে পরিষ্কার হবে।

হাঁটতে হাঁটতে সে রুগা ক্যাটালামা নামে রাস্তায় এসে যখন পৌছল তখন দেখল হাতে লণ্ঠন নিয়ে দুজন লােক তারই দিকে আসছে। ওরা আরক্ষা বাহিনীর লােক হতে পারে না কি দস্যু? কে জানে? বিপদের ঝুঁকি নিয়ে দরকার কি। গা ঢাকা দেওয়া যাক। কাছেই একটা খালি কুটির দেখতে পেয়ে সে তার ভেতরে ঢুকে পড়ল।

কিন্তু লণ্ঠন হাতে লােক দুটি সেই কুটিরে এসেই ঢুকলাে। অ্যানড্রিউচিও চুপটি করে এক কোণে দাঁড়িয়েছিল। লােক দু’জন তাকে প্রথমে দেখতে পায়নি কিন্তু লণ্ঠনধারীদের মধ্যে একজন নাক সিটকে বললাে, আরে বিশ্রী গন্ধ কোথা থেকে আসছে?

লণ্ঠন তুলে দেখতেই ওরা দেখল এক কোণে একটা লােক চোরের মতাে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ভয়ে কাপছে। একজনের কাধে লােহার কয়েকটা যন্ত্রপাতি ছিল, সেগুলাে সে নিচে নামিয়ে রেখে জিজ্ঞাসা করল, কে হে তুমি? এখানে কি করছাে?

অ্যালডিউচিও প্রথমে কিছু বললাে না। তারা ধমক দিতে অ্যানড্রিউচিও তার দুর্দশার কাহিনী বলল। লােক দুটা ছিল আসলে চোর, সিধ কেটে চুরি করে।

সব শুনে ওরা বুঝতে পারলাে কোনাে পাড়ায় ও কোনাে বাড়িতে ঘটনা ঘটেছে। ওরা বললাে, তুমি হয় বেঁচে গেছ। তুমি যদি বাড়ির বাইরে পড়ে না যেতে তাহলে তুমি নিশ্চিত খুন হতে। খুব বেঁচে গেছ তবে তােমার ঐ টাকা উদ্ধার হবার কোনও আশা নেই। ওর চেয়ে বরঞ্চ আকাশ থেকে কয়েকটা তারা নিয়ে নেওয়া সহজ। কিন্তু খবরদার তুমি এসব কথা আর কাউকে বলবে না। ওরা বড় সাংঘাতিক লােক, টের পেলে তােমার গলায় ছুরি বসিয়ে দেবে।

তারপর ওরা দু’জনে কি পরামর্শ করে ওকে বললাে, শােন, তােমাকে একটা কথা বলি। এই যন্ত্র পাতিগুলাে দেখে বােধহয় বুঝতে পারছাে আমরা সিধেল চোর। আমরা একটা কাজ করতে যাচ্ছি। তুমি তা খুব দুর্দশায় পড়েছ। তা তুমি যদি আমাদের সঙ্গে আসাে এবং সাহায্য করাে তাহলে কাজ উদ্ধার হলে তােমাকে তােমার ভাগ দেব। তুমি যা হারিয়েছ তার চেয়েও বেশিই পাবে। রাজি আছাে?

রাজি না হয়ে উপায় কি? রাজি না হলে এরা দু’জনেই হয়ত ওকে ডাণ্ডা পেটা করবে। সে সম্মতি জানাল।

সেই দিন নেপলসের আর্চবিশপ মেসার ফিলিপস মিনুতােলাের মৃত্যু হয়েছে এবং এক গির্জায় সন্ধ্যার সময় কবর দেওয়া হয়েছে। আর্চবিশপের দেহে সােনার সুতাের কাজ করা মূল্যবান পােশাক তাে ইে সঙ্গে অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রীও কিছু আছে। কিন্তু যে জিনিসটির প্রতি ঐ দু’জন চোরের লােভ হল পদ্মরাগ মণির একটি আংটি। সেটি আর্চবিশপের একটি আঙুলে পরানাে আছে। বিক্রি করলে এ করে পাঁচশ’ স্বর্ণমুদ্রা পাওয়া যাবে। কাজ উদ্ধার হলে অ্যানড্রিউচিওকে এই আংটিটা ওরা দেবে। সে যে পরিমাণ স্বর্ণমুদ্রা হারিয়েছে সেই পরিমাণ অর্থ তার উদ্ধার হবে। খুব ভালাে প্রস্তাব।

ওরা তখন অ্যানড্রিউচিওকে নিয়ে সেই গির্জার দিকে চললাে। অ্যানড্রিউচিওর গা থেকে তখনও দুর্গন্ধ বের হচ্ছে।

একজন চোর বললাে, আরে এ ব্যাটার গায়ের গন্ধ তাে সহ্য করা যাচ্ছে না। ব্যাটাকে পরিষ্কার করা হয়।

অপর চোর বললাে, ঠিক বলেছিস। শােন, কাছে একটা কুয়াে আছে, দড়ি বালতিও আছে, চাকায় গানাে। চল ব্যাটাকে সেখানে নিয়ে গিয়ে বেশ করে চান করিয়ে আনি। তার কাছে পৌছে দেখা গেল দড়িটা চাকায় লাগানাে আছে। কিন্তু বালতি নেই। কি করা যায় ? বেটাকে ঐ দড়ি দিয়ে বেঁধে কুয়াের মধ্যে নামিয়ে দেওয়া যাক। ওর স্নান হয়ে গেলে ও দড়িতে টান দিলে ওকে আবার ওপরে তুলে নেব।

দড়িতে বেঁধে ওকে কুয়াের মধ্যে নামিয়ে দেওয়া গেল কিন্তু চোর দু’জন হঠাৎ দেখল দু’জন পাহারাদার কুয়াের দিকেই আসছে। চোর দু’জন ভাবল পাহারাদাররা বুঝি ওদেরই ধরতে আসছে। ওদের দেখেই চোর দু’জন সটকে পড়ল। পাহারাদাররা কিন্তু চোরেদের দেখতে পায়নি। ওদের তেষ্টা পেয়েছিল, জল খাবার জন্য ওরা কুয়াের দিকে আসছিল। কুয়াের কাছে এসে ওরা দেখল দড়িটা ঝুলঝে, তার বালতিটা বুঝি কেউ কুয়ােয় নামিয়ে আর তােলে নি।

আর ঠিক তখনি অ্যানড্রিউচিও-র স্নান হয়ে গেছে। সে দড়ি টান দিচ্ছে। একজন পাহারাওয়ালা দড়ি ধরে ওপরের দিকে টানতে লাগল। ভারী মনে হল। তা তাে হতে পারে। বালতিটা তাে জলে ভর্তি।

ওরা না জেনে অ্যানড্রিউচিওকে যখন প্রায় কুয়াের পাড় পর্যন্ত তুলেছে, অ্যানড্রিউচিও তখন দড়ি ছেড়ে কুয়াের পাড় ধরেছে। কাকভিজে অ্যানড্রিউচিওকে দেখে পাহারাওয়ালা ভাবলাে, এ আবার কি, নিশ্চয় ভূত, এই ভেবে দড়ি ছেড়ে সে পালাল, তার সঙ্গীও তাকে অসুসরণ করল।

অ্যানড্রিউচিও কোনওরকমে ওপরে এসে দেখল তার সঙ্গী দু’জন নেই, কিন্তু সেখানে কয়েকটা অস্ত্র পড়ে রয়েছে। ব্যাপার কি বুঝতে না পেরে সে স্থির করল এখানে থাকা নিরাপদ নয়। সে চলতে লাগল। কিন্তু এবারও জানে না সে কোন দিকে কোথায় চলেছে। তার সরাইখানা খুঁজে পাবে কি? কাকেই বা জিজ্ঞাসা করবে? পথ তাে নির্জন ও অন্ধকার।

সেই চোর দু’জন সটকে পড়েছিল কিন্তু পালায় নি। তারা আলাে নিবিয়ে কিছু দূরে আড়াল থেকে কুয়াের দিকে নজর রাখছিল। পাহারাওয়ালার চলে যেতে ওরাও ওদের নতুন স্যাঙাতের খোজ নিতে আসছিল। পথে দেখা হয়ে গেল। ঘটনার বিবরণী শুনে তিনজনে খুব হাসাহাসি করলাে।

ওদিকে রাত্রি অনেক এগিয়ে গেছে। এখনই গির্জায় যাওয়া দরকার। ওরা তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে চললাে। গির্জার কাছে পৌছে চারদিকে ঘুরে দেখল কোনাে পাহারাদার নেই। তখন ওরা গির্জা প্রাঙ্গলে ঢুকে আর্চবিশপের কবরের কাছে এলাে।

এখনও সমাধি মন্দির নির্মাণের সব কাজ বাকি। কবরের ভেতরে কফিন নামিয়ে এখনও মাটি চাপ নেওয়া হয়নি। উন্মুক্ত কবরের ওপর আপাতত কয়েকটা ভারী মারবেল পাথর চাপা দেওয়া হয়েছে। সকাল হলেই সমাধি মন্দির নির্মাণের কাজ আরম্ভ হবে। ভাের হবার অনেক আগেই কাজ সেরে পালাতে পারবে চোরেরা। এই মতলব করে শাবল বার করে একটা বেশ বড় ভারী পাথর সরিয়ে ফেলল। যেই ফাক হল এখন তার ভেতরে একটা মানুষ নেমে যেতে পারবে।

একজন চোর অপরজনকে বললাে, এই তুই নিচে নাম। সে বলল, আমি নামব না।

প্রথমজনও নামতে রাজি হল না। তখন ওরা দুজনেই অ্যানড্রিউচিওকে বললাে, তাহলে বাপু তুমিই নাম, তােমাকে না খাটিয়ে এমনি লুটের ভাগ দেব নাকি।

চোর দু’জনও এই মতলব করে অ্যানড্রিউচিওকে সঙ্গী করে এনেছিল। ওকে কবরের মধ্যে নামিয়ে দেবে। সে জিনিসগুলাে ওদের হাতে তুলে দিলে ওরা ওকে পাথর চাপা দিয়ে পালিয়ে যাবে। ওরাও অপরকে বিশ্বাস করতে পারছিল না, যে নিচে নামবে তাকে যদি অপরজন চাপা দিয়ে পালিয়ে যায়? এই সন্দেহ পরস্পরের মধ্যে ছিল বলেই ওরা অ্যানড্রিউচিওকে সঙ্গে নিয়েছে।

অ্যানড্রিউচিও রাজি হল না। তখন চোর দু’জন বললাে, তুই নিচে না নামলে তােকে মালের ভাগ তাে দেবই না, উলটে এমন মার দেব যে হাত পা ভেঙ্গে যাবে, এখানে পড়ে থাকবি। এই লােহার ডাণ্ডা দেখেছিস তাে। তাের ভয় নেই, তােকে আমরা ঠিক তুলে নেব। মালেরও ভাগ দেব।

অ্যানড্রিউচিও ভয় তাে পেলই তার ওপর ভাবল, ও তাে এখন কর্পদকশূন্য; ঠিক আছে আমি নিচে নেমে জিনিসগুলাে বার করে ওদের বলব, আগে আমাকে তোলাে নইলে একটা জিনিস দেব না। তার মনে পড়ল চোরেরা বলেছিল আর্চ বিশপের আঙুলে পদ্মরাগ মণির একটি আংটি আছে। সেটাই সে আগে হাতিয়ে নেবে। ওদিকে আংটির দাবিদার কিন্তু ওরা দু’জনেই।

সে বললাে, ঠিক আছে আমিই নামব। এগােলেও মরবাে, পিছলেও মরবাে। ঝুঁকি নিয়েই দেখা যাক। আমি নামছি কিন্তু দেখ ভাই তােমরা বেইমানি করাে না। এটা গির্জা বলে কথা, এখানে বেইমানি করলে তােমরাও পার পাবে না। এই বলে সে কবরের মধ্যে ঝুপ করে নেমে পড়ল।

নিচে নেমে কফিনের ঢাকা খুলে অ্যানড্রিউচিও হাতড়ে হাতড়ে দেখল আর্চবিশপের আঙুলে সত্যিই বেশ বড় পাথর বসানাে একটা আংটি রয়েছে। সে তখনি আংটিটা খুলে নিয়ে নিজের আঙুলে পরে নিল। তারপর কফিনের ভেতর থেকে কয়েকটা মূল্যবান জিনিস ওদের হাতে তুলে দিয়ে বললাে, আর কিছু নেই, এবার আমাকে তুলে নাও।

একজন চোর বলল, সে কি রে? আংটি কই? দশ আঙুলের মধ্যে কোনও আঙুলে আংটি নেই। নাও আর দেরি করাে না, আমাকে উঠিয়ে নাও।

অপর চোর বললাে তাহলে বিশপের গায়ের জামাটা খুলে দে, জামার পকেটে আংটি থাকতে পারে। সে মিথ্যা কথা বললাে। তাছাড়া তার পক্ষে জামাটা একা খােলা সম্ভব ছিল না। তুই একবার ভালাে করে দেখ।

অ্যানড্রিউচিও খােজবার ভান করল। একটু পরে বললাে, আর কিছুই নেই। আরে বাপ, তোমাদের আগে কেউ এসে হয়ত সব হাতিয়ে নিয়ে গেছে।

চোর দু’জন সাব্যস্ত করল আসল মাল পদ্মরাগ মণির আংটিই যখন পাওয়া গেল না, তখন ব্যাটাকে তুলে কি হবে? ব্যাটা মিথ্যে কথা বলছে। ওরা তখন কিছু না বলে গর্তের মুখে পাথর দিয়ে দিল। ঠিক করলাে, ও নিশ্চয় ভয় পাবে, একটু পরে এসে আবার সরিয়ে জিজ্ঞাসা করবে।

ওদিকে পুব আকাশ ফর্সা হয়ে আসছিল। চোর দু’জন যখন গির্জা থেকে বেরােতে যাচ্ছে দেখল কয়েকজন লােক আসছে। ওরা হল মিস্ত্রি, ওদের ওপর নির্দেশ ছিল সূর্য ওঠবার আগে কাজ আরম্ভ করতে হবে। তাদের দেখেই চোর দু’জন আংটির আশা ত্যাগ করে পালাল।

বেচারা অ্যানড্রিউচিও পাথর চাপা পড়ে কেঁদে ফেলল। ইস! কি গরম আর কতরকম পােকা। তাকে কি এখানেই মরতে হবে?

যদিও বা সে সকাল পর্যন্ত বেঁচে থাকে তাহলে মিস্ত্রিরা যখন কাজে আসবে তখন তাে সে ধরা পতে যাবে এবং চুরি করতে আসার অপরাধে তাকে ফাঁসিকাঠে ঝুলতে হবে। হা ভগবান! এই তােমার মনে ছিল? কেন আমি ঘােড়া কিনতে নেপলসে এলুম?

এমন সময় অ্যানড্রিউচিও মাথার ওপর পাথর সরানাের আওয়াজ পেল। সে দম বন্ধ করে চুপ বসে রইল কিন্তু তার বুক বেশ জোরে ঢিব ঢিব করতে লাগল।

সে শুনতে পাচ্ছে মিস্ত্রিরা কেউ নিচে নামতে চাইছে না। তারা ভয় পাচ্ছে। তখন একজন যাজক তাদের বললেন, তােমরা ভয় পাচ্ছ কেন? উনি একজন পবিত্র মানুষ ছিলেন। উনি কি ভূত হয়ে গেছেন? তােমাদের ঘাড় মটকে দেবেন?

তবুও কেউ রাজি হল না। তখন যাজক বললেন, বেশ আমি নিজে নেমে তােমাদের দেখিয়ে দিচ্ছি। নামবার জন্যে তিনি আগে তার পা দুটো ঝুলিয়ে দিলেন। যেই না তিনি পা ঝুলিয়ে দিয়েছেন আর অ্যানড্রিউচিও সঙ্গে সঙ্গে তার পা দুটো জড়িয়ে ধরেছে।

ওরে বাপরে, বলে যাজক ভীষণ জোরে চিৎকার করে সজোরে পা-জোড়া তুলে নিয়ে পড়ি কি মরি করে দৌড়তে আরম্ভ করল। আর সেখানে কেউ দাঁড়ায়? বিশপ নিশ্চয় ভূত হয়ে গেছেন।

ততক্ষণে বেশ আলাে হয়েছে। অ্যানড্রিউচিও দেখল গর্তর ভেতরে কয়েকটা খাঁজ রয়েছে। খাজে পা দিয়ে সে ওপরে উঠে বিপরীত দিকে দিয়ে গির্জার বাইরে পালিয়ে এলাে। পদ্মরাগ মণির আংটি তার কপালেই ছিল।

ক্রমে সকাল হল। রাস্তায় লােক চলতে শুরু করল, জিজ্ঞাসা করে সে সরাইখানায় ফিরে এলাে। সঙ্গীরা ও সরাইওয়ালা বললাে, তাকে ওরা অনেক রাত্রি পর্যন্ত খোঁজাখুঁজি করেছে।

আনডিউচিও তখন আংটির কথা চেপে গিয়ে যা ঘটেছিল আনুপূর্বিক সব বলল। সরাইওয়ান তাকে পরামর্শ দিল, তাহলে তুমি আর দেরি করাে না, এখনই নেপলস ছেড়ে চলে যাও। সঙ্গে যাবাত, দিচ্ছি। পথে খেয়ে নিও। অ্যানড্রিউচিও পােশাক পরে তখনি সরাইখানা থেকে বেরিয়ে পড়ল।

 

ষষ্ঠ গল্প

মাদাম বেরিতােলা, তাঁর ছেলে দুটি হারিয়ে গেছে। মাদামকে দেখা গেল একটি দ্বীপে, সঙ্গে দুটি হরিণশিশু। তারপর মাদামকে দেখা গেল লুনিজিয়ানাতে। মাদাম সেখানে এক সম্ভ্রান্ত ও ধনী ব্যক্তির বাড়িতে দাসীবৃত্তি করছিলেন। মাদামের অজ্ঞাতে তার এক ছেলে ঐ ধনী ব্যক্তির কন্যার সঙ্গে প্রেম করে ধরা পড়ে। তার কারাদণ্ড হয়। সিসিলি দ্বীপে রাজা চার্লসের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হয়। মাদাম তার ছেলেকে চিনতে পারেন এবং তার ঐ ছেলের সঙ্গে ঐ মেয়েরই বিবাহ হয়। এবার অপর ছেলেটিকেও পাওয়া যায়। পুনর্মিলন হয় এবং মাদাম সমেত সকলে তাদের পূর্ব গৌরবে প্রতিষ্ঠিত হন।

গল্পর মতাে গল্প বলেছে বটে ফিয়ামমেত্তা। সকলেই প্রচুর আনন্দ পেল, হাসাহাসি করলাে এবং এমন উপভােগ্য একটা গল্প বলার জন্যে সকলে তাকে বাহবা দিল।

এবার এমিলিয়ার পালা। কুইন তাকে বললাে, আশা করি তােমার গল্পটাও এমনি উপভােগ্য হবে।

এমিলিয়া বললাে, বেশ তাে, তােমরা আমার গল্পটা আগে শােনাে তারপর বােলাে। যদিও এই কাহিনীর সমাপ্তি খুবই আনন্দময় কিন্তু গােড়ার দিকে কাহিনীর চরিত্রগুলােকে খুবই কষ্ট ভােগ করতে হয়েছিল। ভাগ্য কখন কাকে কোথায় নিয়ে যায় বা যাবে কেউ বলতে পারে না। তাহলে আরম্ভ করি।

তােমরা তাে ভাই সকলে জান যে সিসিলির রাজা দ্বিতীয় ফ্রেডরিকের মৃত্যুর পর ম্যানফ্রেড সিসিলির রাজা হয়েছিল। নেপলসে ম্যানফ্রেডের যত উপদেষ্টা ছিল তাদের মধ্যে তার সবচেয়ে বিশ্বাসভাজন ছিল অ্যারিগেতাে ক্যাপিচা। তার স্ত্রী ছিল নেপলসের মেয়ে, অত্যন্ত সম্রান্ত বংশের, অতীব সুন্দরী এবং মহীয়সী তার পুরাে নাম ম্যাডােনা বেরিতােলা কারাচ্চিয়ােলাে।

বলতে গেলে অ্যারিগেতাের পরামর্শ অনুসারেই রাজা ম্যানফ্রেড দেশ শাসন করতেন অর্থাৎ অ্যারিগেতাে ছিল সিংহাসনের পশ্চাতে মূল শক্তি। সবই বেশ চলছিল, এমন সময় রাজা চার্লস হঠাৎ যুদ্ধ ঘােষণা করে বেনেভেস্তোয় ম্যানফ্রেডকে পরাজিত করলাে ও তাকে হত্যা করলাে। ফলে ম্যানফ্রেডের পুরাে রাজত্বটাই চার্লস দখল করলাে।

অ্যারিগেতাে বুঝতে পারলাে সিসিলিবাসীর তথা নতুন রাজা তাকে বিশ্বাস তাে করবেই না উপরন্তু তাকে বন্দি করাও হতে পারে। অ্যারিগেতাে স্থির করল সে কয়েকজন সঙ্গীসহ সিসিলি থেকে পালাবে। কিন্তু সে ও তার সঙ্গীরা ধরা পড়ে গেল। তাদের এবং আরও অনেককে বন্দি করা হল।

অ্যারিগেতাের স্ত্রী ম্যাডােনা বেরিতােলা তখন স্বামীর কাছে ছিলেন না। এই দুঃসংবাদ শুনে তিনি ভীত হলেন। নতুন রাজা তাকেও বন্দি ও অপমানিত করতে পারে এমন আংশকা করে তিনি তার আট বছরের ছেলে জিউসফ্রেডিকে নিয়ে সবকিছু ফেলে রেখে নিঃসম্বল হয়ে লিপারি অভিমুখে যাত্রা করলেন। তিনি তখন সন্তানসম্ভবা। লিপারি পৌছবার কিছুদিন পরে একটি পুত্রসন্তান ভূমিষ্ঠ হল। তিনি তার নাম দিলেন দি আউটকাস্ট।

এবার তিনি স্থির করলেন ছেলে দুটিকে নিয়ে নেপলসে ফিরে যাবেন। সেইমত একজন নার্স নিযুক্ত করলেন। তারপর সকলে মিলে একটা ছােট জাহাজে উঠলেন। তার ইচ্ছে নেপলসে গিয়ে তিনি তার পিত্রালয়ে থাকবেন।

কিন্তু সবই বানচাল হয়ে গেল। প্রবল বাতাসের বেগে পালতােলা সেই ছোট জাহাজ নিজ পথ অনুসরণ করতে পারলাে না। ক্যাপটেন বাধ্য হয়ে জাহাজ ভেড়ালাে পােনজা দ্বীপের একটা খাড়িতে। প্রকল বাতাসে কমে গেল আবার জাহাজ ছাড়া হবে। আবহাওয়ার উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত ওরা দ্বীপে থাকবে।

অনেকে দ্বীপে অবতরণ করল। সেই সঙ্গে ম্যাডােনা বেরিতােলাও দ্বীপে অবতরণ করলেন। দ্বীপের একটা নির্জন জায়গা তার মনােমত হল। এখানে তিনি মাঝে মাঝে একা একা সরে বসেন আর স্বামীর কথা চিন্তা করেন। স্বামী জীবিত কি মৃত বা কি অবস্থায় আছে তা তিনি জানেন না। তিনি ধরে নিয়েছেন শত্রুপক্ষ তার স্বামীকে হত্যা করেছে। তাই নির্জন স্থানে এসে নীরবে অশ্রু বিসর্জন করেন।

একদিন তিনি সেই স্থান থেকে ফিরে এসে জাহাজ বা দ্বীপে কাউকে দেখতে পেলেন না, এমনকি নিজের ছেলে দুটিকেও না। ইতিমধ্যে জলদস্যুরা এসে সমস্ত যাত্রী ও মালসমেত পুরাে জাহাজখানাই অপহরণ করে নিয়ে গেছে। দূরে সমুদ্রের দিকে চেয়ে তিনি দেখতেও পেলেন একটা বড় জাহাজ দের ছােট জাহাজখানা দড়ি বেঁধে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।

স্বামী গেছেন, ছেলে দুটিও গেল। শোকে বিহ্বল হয়ে তিনি অসহায় হয়ে পড়লেন। প্রায় জ্ঞানলুপ্ত হয়ে তিনি অনেকক্ষণ ঘাসের ওপর পড়ে রইলেন। আর কি স্বামীপুত্রের সঙ্গে দেখা হবে? বিড়বিড় করে তিনি তাদের নাম উচ্চারণ করতে লাগলেন। এই দ্বীপে তাকেও হয়ত একাই পড়ে থাকতে হবে।

কিছুক্ষণ পরে তিনি কিছুটা সামলে উঠলেন। নিজেকেই নিজে সাহস দিলেন। যেভাবে হােক অন্তত পুত্রদের জন্যেও তাঁকে বেঁচে থাকতে হবে, চেষ্টা করতে হবে এই দ্বীপ থেকে উদ্ধার পাবার।।

তার একবার মনে হল ছেলে দুটো এই দ্বীপেই কোথাও হয়ত খেলা করছে। খুঁজে দেখা যাক না। তিনি খুঁজতে আরম্ভ করলেন। কত গিরি কন্দর গুহা তিনি খুঁজলেন, ছেলে দুটির নাম ধরে কত ডাকলেন। কিন্তু কোথাও তাদের পাওয়া গেল না। নিরাশ হলেন কিন্তু নিজেকেও তাে বাঁচতে হবে। বাস করার মতাে একটা গুহাও পাওয়া গেল। কিন্তু আহার তাে কিছুই নেই। সেই সকাল থেকে পেটে কিছুই পড়েনি। তারপর পরিশ্রমও হয়েছে। ক্লান্তি ও অবসাদ তাকে ঘিরে ধরেছে।

ঐ দ্বীপে এরকম ঘাস হয়, তার বীজ ও মূল খাওয়া যায়। খেতে খারাপ নয়। ক্ষুধায় জর্জরিত তিনি তাই আপাতত খেলেন। কাল সকালে গাছে ফলের সন্ধান করা যাবে এখন।

এবার সজল চোখে বসে ভাবতে লাগলেন তার ভবিষ্যৎ। তিনি সহসা দেখলেন একটা হরিণী তার দিকে এলাে কিন্তু কাছে এসেই চলে গেল এবং পাশেই একটা গুহায় ঢুকে পড়ল। একটু পরেই হরিণী গুহা থেকে বেরিয়ে বনের মধ্যে ঢুকে পড়ল। তার কি বকম কৌতুহল হল। তিনি পাশের গুহায় ঢুকলেন। দেখলেন সদ্য-প্রসূত দুটি হরিণ শাবক, বােধহয় কয়েক ঘণ্টা আগে ভূমিষ্ঠ হয়েছে। আহা কি সুন্দর দেখতে! বাচ্চা দুটি কেমন কুঁই কুঁই করছে এখনও চোখ খােলে নি।

তার হৃদয়ে মাতৃস্নেহ উথলে উঠল। তার বুকে তখনও দুধ ছিল। তিনি শাবকটিকে কোলে তুলে নিয়ে তার দুই স্তনে দুটি শাবকের মুখ লাগিয়ে দিলেন। তারা চুক চুক করে দুধ টানতে লাগল, যেন তারা নিজের মায়ের দুধ পান করছে।

পরে শাবক দুটি নিজের মায়ের দুধ পান করতাে আবার ম্যাডােনার দুধও পান করত। শাবক দুটি ও তাদের মাকে নিয়ে তিনি নির্জনতা অনেকটা কাটাতে পারলেন। অসুবিধা ছিল আহারের। দ্বীপে স্বাদু কোনাে ফল নেই। সেই ঘাসের বীজ ও মূল এবং ঝরনার জল হল তার খাবার।

মাঝে মাঝে ভাবতে ভাবতে অশ্রু বিসর্জন করেন। কী ছিলেন আহার বা আরাম কিছুরই অভাব ছিল না। স্বামীপুত্র নিয়ে কী সুখেই না ছিলেন আর এখন…। কিন্তু ভেবে কি হবে? ভাগ্যে যা আছে তাই হবে। স্বামী ও ছেলে দুটির কথা সর্বদা চিন্তা করেন। মাঝে মাঝে নিজের মন হালকা করবার জন্যে হরিণ শাবক দুটিকে আদর করেন, তাদের সঙ্গে কথা বলেন।

কয়েকটা মাস কেটে গেল। একমাত্র পরিধেয় জীর্ণ, কয়েক জায়গায় ছিড়ে গেছে, আর কিছু দিন পরে লজ্জা নিবারণ করবার কিছু থাকবে না। চুলে জট পড়েছে, ত্বক রুক্ষ, দৃষ্টি বিহবল। তবে মাঝে মাঝে কর্নার জলে স্নান করেন তাই দেহ কিছু পরিষ্কার রাখতে পেরেছেন।

এই সময়ে আর একটা ঘটনা ঘটল।

ম্যাডােনা বেরিতােলা যে জাহাজে নেপলস অভিমুখে যাচ্ছিলেন, ঝড়ের মুখে পড়ে সেই জাহাজখানা সাময়িক আশ্রয় নেবার উদ্দেশ্যে এই পােনজা খাঁড়িতে ঢুকে পড়েছিল—এই ঘটনাটাও সেইরকমই। একখানা ছােট জাহাজ ঝড়ের মুখে পড়ে দ্বীপের ঐ একই খাড়িতে ঢুকে পড়ল।

এই জাহাজে ছিলেন ধনী প্রভাবশালী অভিজাত মালেস্পাইনা পরিবারের বর্তমান কর্তা যার নাম কুরাডাে। আপুলিয়া রাজ্যের পবিত্ৰতীর্থ ক্ষেত্রগুলি ঘুরে তিনি ও তার উপযুক্ত সহধর্মিণী ঘরে ফিরছিলেন। ফেরার পথে এই বিপদ। তার এই বিপদ আশীর্বাদ রূপে দেখা দিয়েছিল ম্যাডােনা বেরিতােলার জীবনে।

ঝড় থামছে না, আবহাওয়া উন্নতি হচ্ছে না। তবে দ্বীপে ঝড় নেই বললেই হয়, অনেক শান্ত। জাহাজে বসে থাকতে ভালাে লাগছে না, একঘেয়ে লাগছে, হাত পা আড়ষ্ট হয়ে যাচেছ। দ্বীপে নেমে একটু বেড়ানাে যাক এই ভেবে কুরাডাে তার স্ত্রী, কুকুর ও কয়েকজন ভৃত্য নিয়ে দ্বীপে নামলেন। দ্বীপটা। জনহীন বলে মনে হচ্ছিল। কিছুক্ষণ বেড়িয়েই আবার জাহাজে ফিরে যাবেন।

মাদাম রেরিতােলা তখন নিজের গুহায় ছিলেন আর হরিণ শাবক দুটি চরতে বেরিয়েছিল। শাবক দুটি এতদিনে বেশ বড় হয়েছে। কুরাডাের কুকুর হরিণ শাবকদের দেখতে পেয়ে ঘেউ ঘেউ করে তাড়া করল। শাবক দুটি ছুটে গুহার ভেতর ঢুকে পড়লাে।

মাদাম বেরিতােলা চমকে উঠলেন। কুকুরের ডাক এখানে কোথা থেকে আসে? একটা ছোট লাঠি ছিল। কুকুর তখন গুহামুখে এসে পড়েছে। লাঠিটা নিয়ে তিনি কুকুরগুলােকে তাড়া করলেন। কুকুর কাকে তাড়া করে গেল দেখবার জন্যে কুরাডাে ও তার স্ত্রী গুহামুখে এসে রােদে পােড়া, শীর্ণকায়, দীর্ঘ কেশ, জীর্ণ বস্ত্র পরিহিতা এক রমণীকে দেখে আশ্চর্য হয়ে গেলেন।

মাদাম বললেন, মহাশয়, আপনার কুকুরগুলি সরিয়ে নিন, আমার বাচ্চা হরিগুলি ভয় পাচ্ছে।

ভাষা অত্যন্ত মার্জিত, কণ্ঠস্বরও মধুর। কে এই রমণী? কুরাডাে কুকুরগুলিকে তার ভৃত্যদের জিম্মা করে দিলেন তারপর রমণীর পরিচয় জিজ্ঞাসা করলেন, এই দ্বীপে তিনি কি করে এলেন জানতে চাইলেন। কথাবার্তা শুনে তার মনে হল রমণী সম্রান্ত বংশের সন্তান।

মাদাম বেরিতােলা তাে কিছুতেই আত্মপরিচয় দেবেন না। কারণ তার সংশয় ছিল, এই ব্যক্তি তাদের শত্রুপক্ষের হলে, আবার কি ক্ষতি করবে কে জানে? কিন্তু ভদ্রলােক ও মহিলার কথাবার্তা শুনে তার বােধহয় সংশয় দূর হয়েছিল, তবুও অনেকবার অনুরােধ করবার পর মাদাম বেরিতোেলা তার দুর্ভাগ্যের কথা এবং কি করে এই দ্বীপে পরিত্যক্ত হলেন সব খুলে বললেন।

কুরাডাে সব শুনে তাে অবাক।–আপনি অ্যারিগেতাে ক্যাপিচার পত্নী? কি আশ্চর্য! অরিগেতাে তাে আমার বন্ধু। তার সঙ্গে আমার বিশেষ পরিচয় আছে। আপনার এখানে থাকা হবে না, আপনি আমার সঙ্গে চলুন, আপাতত আমার বাড়িতেই আমার ভগিনীর মতােই সসম্মানে থাকবেন। তারপর রাজনীতির অবস্থা বুঝে যথােপযুক্ত ব্যবস্থা করা যাবে। আমি নিজেও অনেকদিন দেশছাড়া, হালফিল কোনাে খবর জানি না।

কিন্তু বেরিতােলা দ্বীপ ছেড়ে যেতে রাজি নন। তাঁর তখনাে আশা তার ছেলেরা একদিন এই দ্বীপেই ফিরে আসবে, তাছাড়া হরিণগুলি রয়েছে।

কুরাডে যখন বেরিতােলাকে রাজি করাতে পারলেন না তখন তিনি তার স্ত্রীকে বললেন, আমি জাহাজে ফিরে যাচ্ছি। জেনেশুনে বন্ধুপত্নীকে এখানে এভাবে ফেলে যেতে পারি না। তুমি আগে ওর ছেড়া পরিচ্ছদ বদলে দাও তারপর কিছু খাবার দাও। পরে যেভাবে পার বুঝিয়ে ওঁকে সঙ্গে নিয়ে চলাে।

বেরিতােলার দুঃখের কাহিনী শুনে কুরাডাের পত্নীরও চোখ সজল হয়ে উঠেছিল। তিনি জাহাজ থেকে বেরিতােলার জন্যে কিছু পােশাক, খাবার ও পানীয় আনালেন। কিন্তু নতুন পােশাক পরাতে ও খাবার খাওয়াতেও মাদাম কুরাডােকে যথেষ্ট বেগ পেতে হল।

অনেক কথা ও সময় ব্যয় করে ও অনেক অনুনয়ের পর বেরিতােলা যেতে রাজি হলেন। কিন্তু সঙ্গে তিনি হরিণগুলি নেবেন এবং তার পরিচিত কোনাে জায়গায় তিনি যাবেন না অর্থাৎ এমন জায়গায় তিনি যেতে চান যেখানে কেউ তাকে চিনতে পারবে না।

বেশ তাই হবে, মাদাম কুরাডাে বললেন, আপনাকে আমরা সুনিজিয়ানাতে আমাদের বাড়িতে সযত্নে রাখব। সেখানে অনেক জায়গা আছে, আপনার হরিণগুলি অবাধে চরে বেড়াতে পারবে।

বলতে কি হরিণী তার বাচ্চা দুটো নিয়ে বেরিতােলার কাছে এসে গিয়েছিল। বাচ্চা দুটো তাে তার গা ঘেঁষে বসলাে। বেরিতােলা তাদের গায়ে হাত বুলােতে লাগলেন।

সমুদ্র শান্ত হতে ম্যাডােনা বেরিতােলা তার হরিণগুলি নিয়ে জাহাজে উঠলেন। জাহাজের কর্মীদের কাছে তার পরিচয় গােপন রাখা হয়েছিল। তাই তারা প্রয়ােজন হলে বেরিতােলার একটা নাম ব্যবহার করত, সেটা হল ক্যাভরিউওলা, যার অর্থ হরিণী। একসময়ে জাহাজ ছেড়ে দিল।

লুনিজিয়ানাতে কুরাডাের মস্ত বড় ক্যাসল। বেরিতােলাকে নিয়ে মাদাম কুরাডাে সেই ক্যাসেলে উঠলেন। বেরিতােলা বিধবার সাজ নিলেন, সাদা পােশাক পরেন। এখানে তার পরিচয় তিনি মাদাম কুরাডাের সখি এবং প্রধান সেবিকা। তার ভালােই লাগছে। তিনি যে কুরাডাের আশ্রিতা একথা তাকে বুঝতেই দেওয়া হচ্ছে না। সকলে তাকে সম্মান করে ও ভালােবাসে। হরিণগুলিও ভালাে আছে, তাদের জন্যে বিশেষ খাদ্যের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

ওদিকে সেই জলদস্যুরা ম্যাডােনা বেরিতােলাকে পােনজা দ্বীপে একা ফেলে রেখে বাকি সকলকে তুলে নিয়ে গােটা জাহাজখানাই নিয়ে চলল। ওরা যদি জানতে পারত দ্বীপে একজন সুন্দরী মহিলা পড়ে আছে তাহলে দস্যুরা নিশ্চয় তাকে তুলে আনত। তার ছেলেও বােধহয় ভয়ে মায়ের কথা বলতে পারে নি।

জলদস্যুরা জাহাজভর্তি বন্দী ও মালপত্র নিয়ে জেনােয়া বন্দরে জাহাজের নােঙর ফেলল। তারপর বন্দীসমেত লুটের মাল ভাগাভাগি হল। লুটের কিছু মাল এবং ম্যাডােনা বেরিতােলার নার্স এবং তার ছেলে দুটি জনৈক মেসার গুয়াসপ্যারিনাে দ্য’ওরিয়া-এর ভাগে পড়ল। লােকটি নার্স ও ছেলে দুটিকে তার বাড়িতে পাঠিয়ে দিল—ওরা ক্রীতদাস হয়ে থাকবে, ঘরের সব কাজকর্ম করবে।

নার্স মেয়েটি খুব ভালাে। সে বেরিতােলার অনুগত ছিল। ছেলে দুটির জন্য তার বড় কষ্ট হতে লাগল। তাদের জন্য সে নীরবে অশ্রু বিসর্জন করতাে এবং অত্যাচার থেকে ছেলে দুটিকে বাঁচাবার চেষ্টা করতাে। তবে নার্সটি বুঝেছিল শুধু অশ্রু বিসর্জন করলেই ছেলেদের বাঁচানাে যাবে না। তাদের কষ্টও লাঘব করা যাবে না। নার্স তাদের ওরই মধ্যে যতটুকু পারতাে আরাম দেবার চেষ্টা করতাে।

নার্স বুদ্ধিমতী ছিল। তার আশংকা হয়েছিল যে এরা যদি ছেলেদের প্রকৃত পরিচয় জানতে পারে তাহলে হয়ত তাদের ওপর নির্মম অত্যাচার হবে, হয়ত ওদের মেরে ফেলতেও পারে। ওরা বেঁচে থাকলে হয়ত কোনাে একদিন ওদের বাপমায়ের কাছে ফিরে যেতেও পারে এবং সসম্মানে পূর্ব অবস্থায় প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। তাই সে তাদের পরিচয় গােপন রাখল। কেউ জিজ্ঞাসা করলে বলতাে ওরা তারই ছেলে।

বড় ছেলে জিউসফ্রেডির নাম সে বদলে নতুন নাম রাখল জিয়াননত্তো ডাই প্রােসিডা। কিন্তু ছােট ছেলের নাম আউটকাস্টই রইল। বড় ছেলেটিকে সে ভালাে করে তার বিপদের কথা বুঝিয়ে দিল এবং বার বার সাবধান করে দিল সে ভুলেও যেন কারও কাছে নিজের আসল নাম না বলে এবং পরিচয়ও না দেয়। এরা বড় সাংঘাতিক লােক, জানতে পারলেই দু’জনকে কেটে ফেলবে। নিতান্ত বালক হলেও বড় ছেলের কিছু বুদ্ধিশুদ্ধি ছিল।

এমনি ভাবে মেসার গুয়াসগ্যারিনাের বাড়িতে ওদের কয়েকটা বছর কেটে গেল। বলা বাহুল্য। ওরা খুব কষ্টে দিন কাটাচ্ছিল, না পেত ভালাে খেতে, না পরতে। এদিকে বাড়িতে ঝি চাকরের সব কাজই তাদের করতে হতাে।

জিয়াননষের বয়স যখন যােলাে তখন সে স্থির করলাে এমন ক্রীতদাস হয়ে আর থাকবে না। ভালাে খেতে পেত না তবুও তার চেহারা ভালাে হয়েছিল। স্বাস্থ্যও খারাপ হয়নি, গড়ন মজবুত হয়েছিল। একদিন সে বাড়ি থেকে পালিয়ে গেল। একটা যাত্রী জাহাজ জেনােয়া ও অ্যালেকজান্দ্রিয়া বন্দরের মধ্যে যেপ মারত। জিয়াননতো সেই জাহাজে একটা চাকরি পেয়ে গেল।

এই জাহাজের চাকরিও তার ভালাে লাগছিলাে না। এই চাকরিতে উন্নতির কোনাে সুযােগ নেই। সে ঐ জাহাজ ছেড়ে অন্য একটা জাহাজে চাকরি নিল তারপর সেই জাহাজ থেকেও পালাল এবং হাজির হল লুনিজিয়ানাতে এবং কুরাডাে মালেস্পাইনার বাড়িতে একটা চাকরি পেয়ে গেল।

ইতিমধ্যে মেসার ওয়াসপ্যারিনাের বাড়ি ছাড়বার পরে তিন-চার বছর কটে গেছেল। জিয়াননত্তোকে এখন যুবক বলা যায়। হাজার হােক বড় বংশের ছেলে তাে, চেহারাখানাও দর্শনীয় হয়েছে। এ বাড়িতে খাওয়া-দাওয়া ও মালিকদের ব্যবহার ভালাে।

এখানে এসে সে লােকপরম্পরায় শুনলাে যে তার বাবা এখনও বেঁচে আছে। রাজা চার্লস তাকে বন্দী করে রেখেছেন। এই বাড়িতেই তার মা-ও ছিলেন। মাঝে মাঝে মা ও ছেলেতে হয়ত দেখা হয়ে যেত কিন্তু কেউ কাউকে চিনতে পারতাে না। দুজনের কারুরই সন্দেহ হয়নি যে ওরা ভাগ্যমে একই বাড়িতে থাকতে পারে।

ইতিমধ্যে অনেকগুলাে বছর কেটে গেল, দু’জনের চেহারার পরিবর্তনও হল।

বাড়ির কর্তা কুরাডাের একটি কন্যা ছিল। নাম স্পাইনা। সুন্দরী, বয়স ষােলাের কিছু বেশি। দুখের বিষয় মেয়েটি বিধবা। বাপমায়ের কাছে ফিরে এসেছে।

বয়সের ধর্ম বলে একটা কথা আছে। জিয়াননড়ে সুদর্শন তরুন এবং স্পাইনাও তরুণী। উভয়ে উভয়ের প্রতি আকৃষ্ট হল এবং অচিরে তা গভীর প্রেমে পরিণত হল। ধরা না পড়লেও ওরা ক্রমশ সাহসী হয়ে উঠল, মাঝে মাঝে অসতর্কও হতাে। কয়েকবার দেহমিলনও হয়ে গেছে। অত বড় বাড়ি, কোথায় কে কি করছে কে তার খবর রাখে?

তাদের সাহস বােধহয় একটু বেশি বেড়ে গিয়েছিল। একদিন হাতেনাতে ধরা পড়ে গেল।

সেদিন কুরাডাে সপরিবারে বেড়াতে বেরিয়েছেন। যদি কোনাে প্রয়ােজন হয় এজন্যে জিয়াননত্তকে সঙ্গে নেওয়া হয়েছে। বেড়াতে বেড়াতে তারা একটা বনের ধারে এলেন। স্পাইনা ও জিয়াননত্ত ইচ্ছে করেই পেছিয়ে পড়েছিল। সকলের অলক্ষ্যে তারা বনের মধ্যে ঢুকে পড়লাে। চারিদিকে ঘন গাছ, ওরই মধ্যে এক জায়গায় লম্বা লম্বা ঘাস। তারা সেই ঘাসবনের মধ্যে একটা জায়গা বেছে পাশাপাশি বসে পড়লাে। বসে থাকতে থাকতে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়লাে।

তরুণ-তরুণীর আকর্ষণ এতই প্রবল হয় যে তারা সব ভুলে যায়। এরাও সহজেই সব ভুলে রতিমিলনে লিপ্ত হল। কত সময় যে পার হয়েছে সে খেয়ালও নেই।

ওদিকে মায়ের মনে খটকা লেগেছে। স্পাইনা কোথায় গেল? জিয়াননত্তোকেও তাে দেখা যাচ্ছে । স্বামীকে নিয়ে তিনি মেয়েকে খুঁজতে বেরােলেন। খুঁজতে খুঁজতে সেই ঘাসবনে এসে দু’জনে যা দেখলেন তা কোনদিনই তারা চিন্তা করতে পারেন নি। এত বড় বংশের মেয়ের এই নীচ মনােবৃত্তি! আর ভৃত্যের এ কী আস্পর্ধা!

কুরাডাে তৎক্ষণাৎ তার তিনজন ভৃত্যকে আদেশ দিলেন, ও দুটোকে বেঁধে ক্যাসেলে নিয়ে আয়। ক্রোধে, ক্ষোভে, অপমানে তিনি আত্মহারা হয়ে গেছেন। দুটোকেই তিনি হত্যা করবেন।

মেয়ের কীর্তিতে মা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। মেয়ে অত্যন্ত গর্হিত কাজ করেছে ঠিকই, তাকে কঠোর শাস্তিও দেওয়া উচিত, তা বলে হত্যা!

তিনি গিয়ে স্বামীকে বললেন, শয়তানীটাকে তুমি যা ইচ্ছে শাস্তি দাও, আমি বাধা দেব না বরং সমর্থন করবাে, কিন্তু তুমি এই বয়সে নিজ কন্যাকে হত্যার পাপে পাপী হবে কেন? আর সামান্য একটা চাকরকে হত্যা করেও নিজের হাত কলঙ্কিত নাই বা করলে। ওতে বাহাদুরী নেই। কে জানে ভবিষ্যতে এজন্যে তােমাকে হয়ত অনুতাপ করতে হবে। দোষ যখন দু’জনের সমান তখন দু’জনকেই শাস্তি দাও, তা বলে হত্যা আমি সমর্থন করতে পারছি না। মাথা ঠাণ্ডা করে ভেবে দেখ।

কুরাডাে পত্নীর কথা মন দিয়ে শুনলেন। তার যুক্তি অগ্রাহ্য করা যায় না। হত্যা এখনি করা যায় কিন্তু পরে যদি অনুতাপ করতে হয়। তিনি দু’জনকে কারাগারে পাঠালেন। সেই সঙ্গে আদেশ দিলেন অন্য কয়েদিদের যে পরিমাণে আহার দেওয়া হয় এদের আহার যেন তার চেয়ে কম দেওয়া হয় এবং অন্য কয়েদিরা যেসব সুবিধা পায় এদের যেন সেসব না দেওয়া হয়। ওরা দুজনেই কারাগারে বসে অনুশােচনা করুক, কেন ওরা এই পাপ কাজ করলাে? স্পাইনার মা ঠিকই বলেছে, এই হবে ওদের শাস্তি।

এক বছর কেটে গেল। কুরাডাে এখন স্বাভাবিক ভাবেই তার কাজ করে যাচ্ছেন। জেলখানায় একটা কথা জিয়াননত্তোর কানে গেল। সন্ত্রাসবাদী নেতা মেসার জিয়ান ডাই প্রােসিডার সঙ্গে হাত মিলিয়ে আরাগনের রাজা পিটার সিসিলিতে বিপ্লব ঘটিয়ে রাজা চার্লসের হাত থেকে দ্বীপটার দখল নিয়েছে। এ খবর কুরাডাে আগেই পেয়েছিলেন এবং তিনি উল্লসিত হয়েছিলেন। রাজা চার্লস তার জেলখানায় বসে খবরটা শুনে জিয়াননত্তো আপন মনে বিড় বিড় করে বলতে লাগলাে, হায় আমার কপাল, আমি যদি এখন কারাগারের বাইরে থাকতাম তাহলে আনন্দে দু’হাত তুলে নৃত্য করতাম। এই দিনটির জন্যে আমরা অপেক্ষা করছিলাম, গত চৌদ্দ বছর ধরে কি কষ্টই না করেছি। দু’ মুঠো আহারের জন্যে কত জায়গায় ছুটে বেরিয়েছি, কত অপমান নীরবে সহ্য করেছি। আর আজকেই কিনা আমি কারাগারে বন্দী? এ জীবনে আর ছাড়া পাব না, এইখানেই আমাকে মরতে হবে, কেউ জানবেও না আমি কে? কোনাে বংশের সন্তান?

কারাপাল কাছেই কোথায় দাঁড়িয়েছিলেন। কথাগুলাে তিনি শুনলেন। তিনি এগিয়ে গিয়ে জিয়াননত্তোকে বললেন, কি বকবক করছ? রাজায় রাজায় যুদ্ধ বলে কথা, এতে তােমার কি? সিসিলির সঙ্গে তােমার কি সম্পর্ক?

জিয়াননত্তো বললাে, আমার বাবার কথা মনে করে আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। আমি তখন বালকমাত্র, একটা দ্বীপ থেকে বােম্বেটেরা আমাকে অপহরণ করে। তবুও আমার মনে আছে যে সিংহাসনের পশ্চাতে থেকে আমার পিতাই তখন সিসিলি শাসন করতেন। তিনি আজ জীবিত কি মৃত তাও জানি না। ম্যানফ্রেন্ড তখন দ্বীপের রাজা ছিলেন, বাবা ছিলেন তার সর্বাপেক্ষা বিশ্বাসভাজন উপদেষ্টা।

কারপাল জিজ্ঞাসা করলেন, তাই নাকি? তা বাপু তােমার বাবার নামটা কি শুনি। কারাপালের কণ্ঠস্বরে ব্যঙ্গ।

এখন অবশ্য বাবার নাম আমি নির্ভয়ে বলতে পারি। তার নাম অ্যারিগেতাে ক্যাপিচা আর আমার নামও জিয়াননত্তো নয়, আমার প্রকৃত নাম জিউসফ্রেডি। একথা আমি নিঃসন্দেহে বলতে পারি যে আজ যদি আমি মুক্ত থাকতাম তাহলে সিসিলি ফিরে যেতাম এবং সরকারে কোনও একটা বড় পদ নিশ্চই পেতাম।

কারাপাল হলেও লােকটি ভালাে ছিল। সে কোনও মন্তব্য করল না। কিন্তু কুরাডােকে জিয়াননবের সব কথা বলল।

কুরাডাে যেন কারাপালের কথার কোনাে গুরুত্ব দিলেন না। কিন্তু তার মনে পড়ল প্রথম দর্শনে জিয়াননত্তোকে মনে হয়েছিল এ বােধহয় কোনাে বড় ঘরের ছেলে। কিন্তু বড়লােকদেরও তাে অবৈধ সন্তান থাকে। এ হয়ত সেই রকম কেউ হবে।

কুরাডাে ভাবলেন ব্যাপারটা যাচাই করা উচিত। ছােকরা জেলখানায় বন্দী থেকে মিথ্যা কেন বড়াই করবে? যাচাই করতেও কোনাে অসুবিধে নেই কারণ অ্যারিগেতাের পত্নীই তাে তার ক্যাসেলে রয়েছেন।

কুরাডাে ম্যাডােনা বেরিতােলাকে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, আচ্ছা ম্যাডাম, আপনার কি জিউসক্রেডি নামে কোনাে ছেলে ছিল? মহিলার চোখে জল এসে গেল। বললেন, আমাদের বড় ছেলেটির নাম ছিল জিউসফ্রেডি, সে আজ কোথায় জানি না, বেঁচে থাকলে তার বয়স এখন বাইশ বছর।

যদিও আগে ম্যাডােনা বেরিতােলা ছেলেকে ক্যাসেলে দেখেছিলেন কিন্তু কাছ থেকে ভালাে করে দেখার সুযােগ পান নি। তাছাড়া ছেলে স্বনামেও পরিচিত ছিল না। তাই দীর্ঘদিন পরে হলেও তিনি নিজ সন্তানকে চিনতে পারেননি।

কুরাডাে সিদ্ধান্ত করলেন, জিয়াননত্তো মিথ্যা বলে নি। জিউসফ্রেডি অর্থাৎ জিয়াননতো তার সম্মানিত বন্ধুর পুত্র। তাকে আর কারাগারে বন্দী করে রাখা যায় না। তিনি আরও ভাবলেন জিয়াননত্তোকে ও কন্যাকে মুক্তি দিয়ে এমন একটা কাজ করা যায় যাতে সকলের সম্মান পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।

কুরাডাে জিয়াননত্তোর সঙ্গে দেখা করে তাকে জেরা করে তার সমস্ত পূর্বকাহিনী জেনে নিলেন। না, কোনাে ভুল নেই। ছেলেটি সত্যি কথাই বলেছে। সে অ্যারিগেতাে ও বেরিতােলার সন্তান। তিনি জিয়াননত্তোকে বললেন, জিয়াননতো, আমি তােমাকে ভৃত্য মনে করতাম না, তােমার সঙ্গে আমি বরাবর ভালাে ব্যবহার করেছি। কিন্তু তুমি যে কাজ করেছ তা অত্যন্ত অন্যায়, আমার ও আমার মেয়ের সম্মান নষ্ট করেছ। অন্য কেউ হলে তােমাকে সঙ্গে সঙ্গে হত্যা করতাে। যাই হােক যা হবার তা হয়ে গেছে। তুমি তােমার যে পরিচয় দিলে তা আমি সত্যি বলে বিশ্বাস করেছি, তাই আমি স্থির করেছি যে আমার নিজের ও আমার কন্যার এবং তােমারও সম্মান ফিরিয়ে আনতে আমার কন্যার সঙ্গে তােমার বিবাহ দেব। আমার কন্যা বিধবা, সে তার বিবাহের সময় যৌতুক বাবদ প্রচুর অর্থ ও সম্পত্তি পেয়েছে। বিবাহের পর তােমরা দু’জনে যতদিন ইচ্ছা আমার ক্যাসেলে থাকতে পারবে। তােমাকে আমি আমার সন্তান মনে করবাে। আশা করি তােমার আপত্তি হবে না।

কারার অন্ধরালে থাকলেও এবং রুগ্ন হয়ে গেলেও জিয়াননত্তোর মন ভেঙে পড়েনি এবং স্পাইনার প্রতি তার প্রেমও হ্রাস পায় নি। সে ভেবে দেখল কুরাডাে যে প্রস্তাব দিলেন তার চেয়ে উত্তম আর কিছু হতে পারে না।

জিয়াননস্তে তার সম্মতি জানিয়ে বললাে, আমাকে আপনি ক্ষমা করবেন, আপনি নিশ্চয় জানেন বয়সের ধর্ম বলে একটা কথা আছে। আমরা উভয়ের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে এই কাজ করে ফেলেছি। আপনি নিজেও আপনার যুবক বয়সের কথা চিন্তা করে দেখুন—যুবকদের মন কোথায় ঘুরে বেড়ায়। আমরা যথেষ্ট সাজা পেয়েছি, প্রায়শ্চিত্তও করলাম। আপনার কন্যাকে আমি তার প্রাপ্য সম্মান দেব। তবে আর একবার ভেবে দেখুন, আপনি যে প্রস্তাব দিলেন তা আপনি আন্তরিকভাবেই দিচ্ছেন কিনা। নচেৎ আপনি আমাকে পুনরায় কারাগারে ফিরিয়ে দিন। এজন্যে আমি আপনাকে দোষ দেব না। আপনার প্রতি আমার সম্মান অটুটই থাকবে।

জিয়াননত্তোর সাহসকিতাপূর্ণ বক্তব্য শুনে কুরাডাে সন্তুষ্ট হলেন। তার প্রতি তার মনে একটা বিশ্বাস জন্মাল। তিনি তাকে আলিঙ্গন করলেন। এরপর তিনি স্পাইনাকেও সেখানে আনালেন। সেও দুর্বল, ক্ষীণকায়া ও বিবর্ণ হয়ে গেছে। কুরাডাে উভয়ের সামনে তার সংকল্পের কথা বললেন। তখন উভয়ে পরস্পরকে বিবাহ করবার প্রতিশ্রুতি দিল। কুরাডাে উভয়কে তৎক্ষণাৎ মুক্তি দিলেন। ব্যাপারটা কুরাডাে কিন্তু ওদের আপাতত গােপন রাখতে বললেন। তবে তাদের ক্যাসেলে ফিরিয়ে এনে তাদের পরিচর্যার ব্যবস্থা করে দিলেন।

যত না সুখাদ্য ও যত্ন পেয়ে তাদের স্বাস্থ্য আবার ফিরে এলাে, তার চেয়ে উভয়ের মিলিত। হবার আনন্দ দ্রুত তাদের হৃত স্বাস্থ্য ও কমনীয়তা ফিরিয়ে আনল।

কুরাডাে এবার স্থির করলেন খবরটা তিনি বেরিতােলা ও তার স্ত্রীকে জানাবেন। উভয়কে ডাকলেন এবং প্রথমে তিনি বেরিতােলাকে বললেন, মাদাম আমি যদি আপনার পুত্রকে আমার জামাতা করি এবং আপনার কাছে তাদের ফিরিয়ে দিই তাহলে আপনি কি বলেন? আপনার সম্মতি আছে কি?

বেরিতােলা বললেন, এর চেয়ে উত্তম আর কি হতে পারে? আপনার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ, আপনার ঋণও আমি পরিশােধ করতে পারবাে না। আমি আবার আশার নতুন আলাে দেখতে পাচ্ছি।

এরপর কুরাডাে নিজের পত্নীকে জিজ্ঞাসা করলেন, কি গাে, এমন ছেলেকে জামাতা করতে তােমার আপত্তি নেই তাে?

কুরাডাে-পত্নী উত্তর দিলেন, তুমি যদি একটা ভবঘুরেকে উপযুক্ত মনে করে তােমার জামাতা নির্বাচন করতে তাহলেও আমি আপত্তি করতুম না, আর এই তাে সম্রান্ত ও খ্যাতিমান বংশের ছেলে।

মা ও ছেলেতে তখনও কিন্তু দেখা হয়নি। কয়েক দিন কেটে গেল। জিয়াননভে অর্থাৎ জিউসফ্রেডি তার হৃত স্বাস্থ্য ফিরে পেয়েছে। অভিজাত বংশের পরিচ্ছদ পরে তাকে রূপবান মনে হচ্ছে। কুরাডাে তাকে ডেকে বললেন, জিউসফ্রেডি, তুমি তােমার মাকে দেখতে চাও?

—মা কোথায় তা তাে জানি না, তিনি বেঁচে আছেন কিনা তাও জানি না। মাকে যদি দেখতে পাই তাহলে অবশ্যই আমি আনন্দিত হব এবং সিসিলিতে ফিরে গিয়ে হারানাে সব কিছু উদ্ধার করতে পারবাে।

—জিউসফ্রেডি, তুমি তােমার মাকে কিছুদিন আগে দেখেছ কিন্তু চিনতে পার নি, একটু অপেক্ষা করাে।

কিছুক্ষণ পরে স্পাইনার মা মেয়েকে ও ভাবী বেয়ানকে সঙ্গে নিয়ে ঘরে এসে ঢুকলেন। জিউসফ্রেডি বিস্মিত, কারাগারে নিক্ষিপ্ত হবার আগে সে তাে এই মহিলাকে কয়েকবার দেখেছে, ইনিই যে তার মা সে বুঝতেও পারে নি।

মাদাম বেরিতােলা কয়েক সেকেণ্ড জিউসফ্রেডির দিকে চেয়ে রইলেন, তারপর তার বাল্যকালের কয়েকটা লক্ষণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলেন। না কোনাে ভুল নেই, এই তার হারানাে মানিক। তিনি জিউসফ্রেডিকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললেন। তারপর নিশ্চল। তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছেন।

স্পাইনা ও তার মায়ের শুশ্রুষায় তার জ্ঞান ফিরে এলাে। মা ও ছেলের পুনর্মিলন হল। খুশির জোয়ার বইল। মা ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা নিবেদন করলেন। তারপর মা ও ছেলে নিজেদের অতীত কাহিনী বিবৃত করল।

এরপর কুরাডাে বিবাহ ও বিরাট ভােজের আয়ােজন করতে নির্দেশ দিলেন। জিউসফ্রেডি তখন কুরাডােকে বললাে, আপনার প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। কিন্তু এখনও দুটি কাজ বাকি আছে, সে দুটি আপনাকে করে দিতে হবে। কাজ দুটি হল, জেনােয়া থেকে আমার ভাইকে উদ্ধার করে আনতে হবে আর সিসিলিতে লোক পাঠিয়ে আমাদের বাবার বর এনে দিতে হবে।

—নিশ্চই জিউসফ্রেডি, আমি আজই ব্যবস্থা করছি। তােমার ভাই জেনােয়াতে কোথায় আছে জানাে কি ?

-জানি। মেসার ওয়াসপ্যারিনাে দ্য’ওরিয়া নামে একজন লােক আমাদের দুই ভাই ও আমাদের নার্সকে তার বাড়িতে ক্রীতদাস করে রেখেছিল। নার্সকে ঝিয়ের মতাে ও আমাদের দুই ভাইকে চাকরের মতাে খাটাতাে। দীর্ঘদিন কেটে গেলেও আমার বিশ্বাস আমার ভাই আউটকাস্ট ও নার্স এখনও সেই বাড়িতেই আছে।

দু’জন চতুর অভিজ্ঞ লােক বেছে নিয়ে কুরাতে একজনকে পাঠাল জেনোয়াতে আর অপরজনকে সিসিলিতে অ্যারিগেতাের খবর আনতে।

কুরাডাের দূত জেনােয়াতে পৌছে গুয়াসপ্যারিনাের সঙ্গে দেখা করে জিউসক্রেডি বলেছিল সে সবই বললাে এবং কুরাডাে বড় ছেলে ও মায়ের জন্য যা করেছে সে সবই বলল।

সব শুনে ওয়াসপ্যারিনাে তাে অবাক। সে না জেনে অ্যারিগেতাের মতাে একজন নামী ব্যক্তির দুই ছেলে ও তাদের নার্সের সঙ্গে এমন গর্হিত আচরণ করছে।

ওয়াসপ্যারিনাে বললাে, কুরাডাের মতাে মহান ব্যক্তিকে সন্তুষ্ট করতে তিনি সবকিছু করবেন। -আমি আপনার বিশ্রাম ও আহারের ব্যবস্থা করছি। ইতিমধ্যে আমি আউটকাস্ট ও তার নার্সকে কুরাডাের কাছে পাঠাবার ব্যবস্থা করছি।

গুয়াসপ্যারিনাে ধূর্ত মানুষ। সে আগে যাচাই করে নিতে চায়। নার্সকে ডেকে সে জেরা করতে লাগলো। কুরাভাের দূত যা বলেছিল তা থেকে কোনও বিচ্যুতি হল না। সবই মিলে গেল। তবুও আরও কিছু খোঁজখবর নিয়ে গুয়াসপ্যারিনাে যখন নিশ্চিত হল যে আউটকাস্ট অ্যারিগেতার ছেলে তখন সে ওদের কুরাডাের কাছে পাঠাবার ব্যবস্থা করলাে।

গুয়াসপ্যারিনাে এবার সত্যিই লজ্জিত হল। এমন অভিজাত বংশের ছেলের সঙ্গে সে যে ব্যবহার করেছে তার কিছু প্রতিকার করা তার কর্তব্য। তার এগারাে বছরের একটি কন্যা আছে। সে ঠিক করলাে আউটকাস্টের সঙ্গে সে তার মেয়ের বিয়ে দেবে ও প্রচুর যৌতুক নেবে। অ্যারিগেতাের সঙ্গে কুটুম্বিতা স্থাপন গৌরবজনক। তার আরও একটা ভয় ছিল, যদিও না জেনে, তবুও তাে সে ছেলে দুটিকে ও তার নার্সকে চাকবের মতাে খাটিয়েছে, পেট ভরে খেতেও দেয় নি। এখন অ্যারিগেতাে আবার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে। সে প্রভাবশালী লােক, যদি তাকে ক্ষমা না করে তাহলে ওয়াসপ্যারিনাে বিপদে পড়বে। সেইজন্যে কন্যার সঙ্গে বিবাহ ও প্রচুর যৌতক পনের সিদ্ধান্ত সে গ্রহণ করল।

গুয়াসপ্যারিনো অ্যারিগেতাে বা তার পত্নীর অনুমতির অপেক্ষা করলাে না। সে আউকাস্টের সঙ্গে তার মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিল, তারপর সব সাজিয়ে গুছিয়ে জাহাজভর্তি উপহার সামগ্রী ও মেয়ে জামাই, তাদের নার্স, কুরাডাের দূত ও অন্য আত্মীয়-বন্ধুদের নিয়ে লেরিচি অভিমুখে যাত্রা করল। কারণ কুরাডো তখন লেরিচিতে তার ক্যাসেলে থাকবে।

করাড়ো তাদের সাদর অভ্যর্থনা জানিয়ে কাছেই অন্য একটা ক্যাসেলে তাদের থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন। ওদিকে স্পাইনার সঙ্গে জিউসফ্রেডিরও বিবাহ হয়ে গেছে। বিরাট ভােজের আয়ােজন চলছিল। এখন যেহেতু আর একজোড়া দম্পতি এসে গেল তখন ভােজ ও সভার আড়ম্বর আরও বড় করা হল।

আনন্দের কলরোেল শুরু হয়ে গেছে। দুই ভাই পরস্পরের সঙ্গে মিলিত হয়েছে, উপরন্তু নিলিত হয়েছে তাদের হারানাে মায়ের সঙ্গে এবং তাদের নার্সও সঙ্গে ফিরে এসেছে। দুর্যোগের রাত্রি ষ্টে আবার সূর্যোদয় হয়েছে তাই আলাের ও আনন্দের বন্যা বইতে আরম্ভ করেছে।

বাকি শুধু অ্যারিগেতাের খবর আসা। ভালাে খবর এলে আনন্দ তুঙ্গে উঠবে।

ভােজসভা বসে গেছে। অভিজাত ও ধনী পরিবারের নরনারীতে সভা পরিপূর্ণ। ও জমজমাট। কুরাডাে আড়ম্বরের ত্রুটি রাখেন নি। কি আসর ও মণ্ডপসজ্জায়, গীতবাদে অথব বিবিধ রকম সুখাদ্য ও পানীয়ের আয়ােজনে। সকলের দৃষ্টি সদ্য বিবাহিত নবদম্পতির দিকে।

ম্যাডােনা বেরিতােলা প্রার্থনা করছেন সিসিলি থেকে যেন সুখবর আসে। অতিথিরা নিজ নিজ আসন গ্রহণ করেছেন, আহার্য পরিবেশনে সবে আরম্ভ হয়েছে এমন সময় সিসিলি থেকে সুর নিয়ে দূত ফিরে এলাে। রাজা চার্লস অ্যারিগেতােকে কাটানিয়াতে বন্দী করে রেখেছিল। সিসিলির মানুষ চার্লসকে তাদের রাজা বলে মেনে নেয় নি। বিক্ষুব্ধ একটি দল ক্ষিপ্ত হয়ে কাটানিয়ার জেলখানা আজ করে কারাপাল ও কারারক্ষীদের হত্যা করে অ্যারিগেতােকে মুক্ত করে আনে। এই খবর প্রচারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জনজাগরণ। পিটার এগিয়ে আসেন। সিসিলিতে বিপ্লব আরম্ভ হয়ে যায়। তাতে হাতে সিসিলি দখলকারী ফরাসীরা নিহত হতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত তাদের জন্ম হয়। অ্যারিগেতােকে পিটার সসম্মানে তার হৃত আসনে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করেন।

এই খবর জানিয়ে দূত বললাে যে অ্যারিগেতাের সঙ্গে তার দেখা হয়েছে এবং তাঁর পত্নী : বড় ছেলেকেও পাওয়া গেছে, ছােট ছেলেকেও শীঘ্রই উদ্ধার করা হবে—এই সব সংবাদ পেয়ে সবাই যারপরনাই আনন্দিত। সকলকে সিসিলি নিয়ে যাবার জন্যে তিনি শীঘ্রই একটি জাহাজ পাঠাচ্ছেন।

এই খবর পেয়ে আনন্দোচ্ছাসে ভােজসভা উদ্বেল হয়ে উঠল। সে যে কি আনন্দ ও শুতেই বিনিময় তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এই আনন্দের ঢেউ একদিনে থেমে গেল না। আরও কয়েকদিন ধরে ভােজ ও নৃত্যগীত। গুয়াসপ্যারিনােও দূরে সরে ছিল না। সেও তার যথাসাধ্য আয়ােজন করেছিল। তাকে একটি আশ্বাস দিল যে অ্যারিগেতাে নিশ্চয় তাকে ক্ষমা করবেন ও তার কন্যাকে গ্রহণ করবেন। কুরাডো সঙ্গে তিনি যেমন বন্ধুর মতাে ব্যবহার করেন তার সঙ্গেও তিনি একই রকম ব্যবহার করবেন অ্যারিগেতাে ক্ষমাশীল ও মহান ব্যক্তি।

ইতিমধ্যে সিসিলি থেকে অ্যারিগেতাে প্রেরিত জাহাজ এসে গিয়েছিল। এবার যাবার পালা। ম্যাডােনা বেরিতােলা তার দুই পুত্র, দুই পুত্রবধু এবং তাদের নার্সকে নিয়ে জাহাজে উঠলেন। এ আগে কুরাডাে ও তার পত্নীর কাছে বিদায় নেবার সময় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন গুয়াসপ্যারিনাের কাছেও তিনি বিদায় নিলেন এবং তাকেও আশ্বস্ত করলেন। 

অনুকুল বাতাসে পাল তুলে জাহাজ ছেড়ে দিল। সিসিলির পালেরাম বন্দরে জাহাজ পৌঁছলে আরিগেতাে স্বয়ং তাদের নিজ বাড়িতে নিয়ে এলেন। সকলের চোখে আনন্দ। এরপর আর কোনাে বিপদ ঘটে নি, সকলে সুখে শান্তিতে বাস করতে লাগলাে। গল্প শেষ করে এমিলিয়া জিজ্ঞাসা করলাে, কি গাে কেমন লাগলাে? -ভালাে, ভালাে। সকলে হাততালি দিয়ে তাকে অভিনন্দিত করলাে।

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *